কাদিয়ানী সমস্যা

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

Slide1

কাদিয়ানী সমস্যা

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

আমাদের কথা

পাকিস্তান স্বাধীন হবার পর ১৯৫৩ সাল নাগাদ পাকিস্তানের বিভিনন শহরে কাদিয়ানীদেরকে অমুসিলম ঘোষণার দাবীতে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠে। এ সময় মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদী (র) জনগণ যেন আইনের সীমা লংঘন না করে এবং শিক্ষিত শ্রেণী যাতে কাদিয়ানীদের ব্যাপারে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে এবং কাদিয়ানী সমস্যার যাতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারে সে উদ্দেশ্যে “কাদিয়ানী মাসআলা” নামে একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। পুস্তিকাটি সকল মহলের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়।

এদিকে পাঞ্জাবে কাদিয়ানী সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার ও জনগণের মধ্যকার দাংগা ভয়াবহরূপ ধারণ করে। এরূপ পরিস্থিতিতে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ ৫৩ সালের আটাশে মার্চ তারিখে মাওলানা মওদূদীসহ জামায়াতের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে কোন অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার করে। এটা ছিল মূলত সামরিক কর্তৃপক্ষের ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার নগ্ন বহিপ্রকাশ।

মাওলানাকে গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে “কাদিয়ানী মাআলা” পুস্তিকার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এ অভিযোগেই ৮ই মে তারিখে সামরিক আদালত মাওলানাকে ফাসীর আদেশ প্রদান করে। মূলত এটা ছিল একটা ছূতা। ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালারকে যেনো তেনো উপায়ে হত্যা করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর তীব্র বিরোধিতা ও ক্ষোভের মুখে তাঁরা তাঁর মৃত্যু দণ্ডাদেশ মওকুফ করে তারা মাওলানাকে যাবজ্জীবনের কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করে। কিন্তু বিশ মাস কারাবাসের পর মাওলানা বিনা শর্তে মুক্তি লাভ করেন।

মজার ব্যাপার হলো, সামরিক কর্তৃপক্ষ যে “কাদিয়ানী মাসআলা” পুস্তিকা প্রণয়নের অজুহাতে মাওলানাকে মৃত্যু দণ্ডাদেশ প্রদান করে সে পুস্তিকাটির কিন্তু তারা বাজেয়াপ্ত করেনি। লাহোরের সামরিক আদালতে তার বিচার চলাকালেই লাহোর শহরেই পুস্তিকাটি বাম্পার সেল চলছিল। মূলত পুস্তিকাটির কোথাও কোন উস্কানীমূলক কথা ছিল না। বরং তাতে তিনি প্রত্যক্ষ্য সংগ্রামের বিরোধিতা করেছেন। উল্লেখ্য, সে সময় জামায়াত বাদে অন্য সব দল একত্রিত হয়ে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট এ্যাকশন কর্মসূচী ঘোষণা করেছিল। জামায়াতের কেন্দ্রিয় মজলিসে শুরার প্রস্তাবেও এরূপ কর্মসূচী ঘোষণার নিন্দা করা হয়।

কাতিয়ানীরা যে মুসলমান নয়, অকাট্য যুক্তি প্রমাণ দিয়ে এ পুস্তিকায়ি তা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কাদিয়ানীদেরকে আইনগত ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করাই ছিল মাওলানার দাবী। এ দাবীর স্বপক্ষে  প্রয়োজনীয় তত্ত্ব ও তথ্য এ পুস্তিকায়ি সরবরাহ করা হয়েছে।এ দাবী আদায়ের লক্ষ্যে মাওলানা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলবার আহ্বান জানান। অবশেষে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। কাদিয়ানীরা যে, অমুসলিম এ ব্যাপারে উম্মতের গোটা আলেম সমাজ একমত।

১৯৫৩ সালের জানুয়ারী মাসে তৎকালীন পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় আলেমগণ একত্রিত হয়ে শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি নির্ধারক কমিটির সুপারিশমালা বিবেচনা করে কতিপয় প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে িএকটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এতে মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে যারা নিজেদের ধর্মীয় নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদেরকে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে ঘোষণার দাবীও বিশেভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী আলেমগণ হলেন:

১। মাওলানা মুফতী মোহাম্মদ হাসান সাহেব

২। আল্লামা সোলায়মান নদবী সাহেব

৩। মাওলানা আবূল হাসানাত সাহেব

৪। মাওলানা দাউদ গজনবী সাহেব।

৫। মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানী সাহেব

৬। মাওলানা আহমদ আলী সাহেব?

৭। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী সাহেব

৮। মাওলানা ইহতেশামূল হক সাহেব

৯। মাওলানা সামসুল হক ফরিদপুরী সাহেব

১০। মাওলানা আবদুল হামেদ কাদেরী বদায়ূনী

১১। মাওলানা মুফতী মোহাম্মদ শফী সাহেব

১২। মাওলানা মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী সাহেব

১৩। মাওলানা খায়ের মোহাম্মদ সাহেব

১৪। হাজী মোহাম্মদ আমীন সাহেব

১৫। হাজী আবদুস সামাদ সরবাজী সাহেব

১৬। মাওলানা আতহার আলী সাহেব

১৭। মাওলানা আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ সাহেব

১৮। মওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেব

১৯। মাওলানা হাবিবুর রহমান সাহেব

২০। মওলানা মোহাম্মদ সাদেক সাহেব

২১। মাওলানা হাবিবুল্লাহ সাহেব

২২। খলিফা হাজী তুরুঙ্গজয়ী সাহেব- প্রমুখ

বাংলাদেশে কাদিয়ানীদের তৎপরতা ইদানি বেশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদেরকে অমুসরিম ঘোষণার দাবীও বেশ জোরদার হচ্ছে। কিন্তু সরকার এখনো তাদের ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। হয়তো বা কাদিয়ানীরা যে অমুসলিম নয়, সে ব্যাপারে কারো কারো মধ্যে সংশয় থাকতে পারে। এ সংশয় নিরসনকল্পে আমরা ‘কাদিয়ানী মাসআলা’র বংগানুবাদ ‘কাদিয়ানী সমস্যা’ বইটি পুনঃ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম। মূল বইটি অনুবাদ হয়েছে ১৯৬৩ সালে সাধু ভাষায়। দীর্ঘদিন বইটি বাজারে ছিল না। সেই অনুবাদটির সাথেই আমরা এখন কাদিয়ানীদের প্রসংগে মাওলানার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাসায়েল ও মাসায়েল’ থেকে কতিপয় প্রশ্নোত্তর সংযোজন করে দিয়েছি। এতে পাঠকরা অধিকতর অবগতি লাভ করবেন বলে আশা করি।

এ বইটির সাথে আগ্রহী পাঠকগণ অবশ্যি মাওলানার খতমে নবুয়্যাত পুস্তিকাটি অধ্যয়ন করার অনুরোধ করছি। আর যে গ্রন্থটি এখনো উর্দূ ভাষা থেকে বংগানুবাদ হয়নি উর্দূ জানা ব্যক্তিগণকে মাওলানার সে গ্রন্থটিও এ প্রসঙ্গে পাঠ করার অনুরোধ করছি। গ্রন্থটির উর্দূ না্ম হলো ‘কাদিয়ানী মাসআলা আওর উসকে মাযহাবী, সিয়াসী আওর মাওয়াশিরাতি পাহলু’।

এ পুস্তিকাটির মাধ্যমে ইসলামের ভ্রান্ত ব্যাখ্যাকারীদের সম্পর্কে মুসলমানগণ সতর্কহলেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে। আমীন।

আবদুশ শহীদ নাসিম

পরিচালক

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী

বিসমিল্লাহির রহমানি রহীম

১৯৫৩ সালের জানুয়ারী মাসে করাচীতে একটি সর্বদলীয় ওলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মূলনীতি নির্ধারক কমিটির সুপারিশসমূহ বিচার বিবেচনার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় ৩৩ জন আলেম একত্রিত হইয়া কতিপয় প্রস্তাবসহ একটি সংশোধনী রিপোর্ট সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করন। তন্মধ্যে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে নিজেদের ধর্মীয় নেতা হিসাবে অনুসরণকারীদিগকে আলাদা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসাবে ঘোষণার দাবী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদে পাঞ্জাবী মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট আসন হইতে একটি আসন কাদিয়ানীদিগকে দেওয়ার জন্য উক্ত প্রস্তাবে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হইয়াছিল তাহাও প্রণিধানযোগ্য।

ওলামা সম্মেলনে গৃহীত অন্যান্য প্রস্তাবসমূহের যৌক্তিকতা সম্পর্কে কোন প্রকার দ্বিধা সন্দেহের অবকাশ নাই। এই কারণেই আজ পর্যন্তে কেহ সে বিষয়ে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা টু শব্দটিও করেন নাই। আলেম বিদ্বেষীরাও এ বিষয়ে কোন প্রকার ত্রুটি আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। যদি কেহ কোথাও কিছু বলিয়া থাকেন, তবে তা ‘ব্যর্থ প্রেমিকের দীর্ঘ নিঃশ্বাস’ ব্যতীত আর কিছুই নহে। শিক্ষিত সমাজে তাহার মূল্য নাই। কিন্তু সর্বদলীয় ওলামা সম্মেলনে গৃহীত এই বিশেষ প্রস্তাবটি কাদিয়ানী সমস্যার সঠিক সমাধান হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ শিক্ষিত লোক এখনও ইহার প্রয়োজন এবং যৌক্তিকতা পূর্ণরূপে অনুধাবন করিতে পারেন নাই বলিয়া মনে হয়। পাঞ্জাব এবং বাহওয়ালপূর ব্যতীত দেশের অন্যান্য অঞ্চল বিশেষ করিয়া পূর্ব অঞ্চলে জনসাধরণ এই সমস্যাটির গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে পারেন নাই। এই করণেই দেশবাসীর সম্মুখে সর্বদলীয় সম্মেলনে কাদিয়ানী সম্প্রদায় সম্পর্কে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা আবশ্যক। এই পুস্তিকাটির মাধ্যমে আমি সেই চেষ্টাই করিব।

কাদিয়ানীদের আচরণ

কাদিয়ানীদিগকে মুসলমান হইতে স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসাবে গণ্য করার দাবী যে, তাহাদেরই স্বেচ্ছাক্রমে অনুসৃত কর্মপন্থার স্বাভাবিক পরিণতি, তাহা সহজেই অনুধাবন করা যায়।

সাধারণ মুসলমানদের সহিত কাদিয়ানীদের যে বিরোধ তাহার প্রথম কারণ ‘খতমে নবুয়াত’ সম্পর্কে নতুন ও বিপরীত ব্যাখ্যা প্রচার। দীর্ঘ সাড়ে তের শত বৎসর যাবৎ সমগ্র মুসলিম জাহান “খতমে নবুয়াত” এর যে অর্থ এক বাক্যে স্বীকার করিতেছে তাহা এই যে, সাইয়েদুনা হযরত মোহাম্মাদ মোস্তফা (সা) আল্লাহ তায়ালার শেষ নবী এবং তাঁহার পরে আর কোন নবী প্রেরিত হইবে না।

খতমে নবুওয়তের নতুন ব্যাখ্যা

‘খতমে নবুওয়ত’ সম্পর্কে কোরআন শরীফে যে ঘোষণা রহিয়াছে এবং সাহাবায়ে কেরামগণ উক্ত ঘোষণার যে অর্থ গ্রহণ করিয়াছিলেন, উপরে তাহা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহাই মুসলমানদের ঈমান এবং বিশ্বাস। সুতরাং হুযুরে আকরামের (সা) পরে যে কোন ব্যক্তি নিজেকে নবী হিসাবে দাবী করিয়াছে, তারহার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনায় সাহাবাগণ আদৌ ইতস্তত করেন নাই। কিন্তু কাদিয়ানীরা ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এই বিষয়ে এক অভিনব তাফসীর আবিষ্কার করিয়া নতুন নবী আমদানীর পথ খোলাসা করিল। তাহারা “খাতিমুন্নাবিয়্যীন”-এর অর্থ করিল ‘নবীদের মোহার’-শেষ নবী নয়। সুতরাং হুযুরের (সা) পরে যে কোন নবী আসিবে (নাউযুবিল্লাহ) তাহাহর নবুওয়ত হযরতের নিকট সমর্থিত হইলেও সত্য বলিয়া গণ্য হইবে।

কাদিয়ানীদের এই দাবী সর্বজন বিদিত। এ সম্পর্কে কাদিয়ানীদের পুস্তিকাদি হইতে অসংখ্য প্রমাণ উপস্থিত করা চলে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ এখানে মাত্র তিনটি উধৃতি পেশ করিয়া ক্ষান্ত হইতে চাই।

(উর্দূ**************)

“খাতিমুন্নাবীয়্যীন” সম্পর্কে হযরত মসীহ মওউদ (আ) বলিয়াছেন যে, “খাতিমুন্নাবীয়্যীন” এর অর্থ তাহার মোহর ব্যতীত কাহারো নবুওয়াত সত্য বলিয়া স্বীকৃত হইতে পারে না। যখন মোহার লাগিয়া যায় তখনই তাহা প্রামাণ্য হয় এবং সত্যরূপে স্বীকৃত বলিয়া বিবেচিত হয়। তদ্রূপ হযরতের মোহর এবং সত্য বলিয়া যে নবুওয়াত স্বীকৃতি লাভ করে নাই তা খাটি এবং সত্য নহে।” –মোহাম্মাদ মনজুর ইলাহী রচিত “মলফুজাতে আহমদিয়া” ৫ম খণ্ড, ২৯০ পৃষ্ঠা।

(উর্দূ***********)

“আমরা ইহা অস্বীকার করি না যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতিমুন্নাবীয়্যীন। কিন্তু ‘খতম’ এর যে অর্থ ইহসানের অধিকাংশ লোক গ্রহণ করিয়াছে এবং যাহা রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহান মর্যাদার সম্পূণ পরিপন্থী। তাহা এই যে, তিনি নবুওয়তের ন্যায় বিরাট নেয়ামত হইতে নিজ উম্মতকে মাহরূম করিয়া গিয়েছেন, ইহা ঠিক নহে। বরং ইহার অর্থ এই যে, তিনি নবীদের মোহর ছিলেন। এখন তিনি যাহাকে নবী রূপে স্বীকার করিবেন সে-ই নবী হিসাবে গণ্য হইবে।– আমরা এই অর্থে তাহাকে খাতিমুন্নাবীয়্যীন বলিয়া বিশ্বাস করি।” –আলফজল পত্রিকা, কাদিয়ান, ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯।

(উর্দূ**********)

‘খাতিম মোহরকে বলা হয়। নবী করীম (সা) যখন মোহর তখন তাহার উম্মতের মধ্যে যদি নবী মোটেই না হয়, তবে তিনি মোহর হইলেন কিরূপে অথবা তাহা কিসের উপরে লাগিবে? –আলফজল, কাদিয়ান, ২২ মে, ১৯২২।

হাজার হাজার নবী

কোরআন শরীফের তাফসীর বা ব্যাখ্যা ঘটিত এই বিরোধ শুধু একটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাই। বরং কাদিয়ানীরা আরও অগ্রসর হইয়া প্রকাশ্যে ঘোষণা করিল- শুধু একজন নয় হাজার হাজার নবী আসিতে পারে এ কথা তাহাদের বিভিন্ন বিবৃতি এবং ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়। উদাহরণ স্বূপ নিম্নে কতিপয় উধৃত দেওয়া হইল।

(উর্দূ*************)

“একথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, হযরতের (সা) পরেও নবুওয়াতের দরজা খোলা রহিয়াছে।”

-মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ প্রণীত হাকিকতুন্নবওয়ত, ২২৮ পৃষ্ঠা।

(উর্দূ***************)

“তাহার অর্থাৎ মুসলমানেরা মনে করিয়াছে যে, আল্লাহ তায়ালার ভান্ডার শেষ হইয়া গিয়েছে।– তাহাদের এই কথার মূলে আল্লাহ তায়ালার মর্যাদা উপলব্ধি না করাই একমাত্র কারণ। নতুবা মাত্র একজন নবী কেন- আমি বলিব হাজার হাজার নবী আসিবে।”

-মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ, আনওয়ারে খেলাফত, ৬২ পৃষ্ঠা।

(উর্দূ************)

“আমার ঘাড়ের দুই দিকের তরবারী রাখিয়া আমাকে যদি বলা হয় যে, হযরতের (সা) পরে কোন নবী আসিবে না- তুমি এ কথা বল। তখনও আমি বলিব যে, তুমি মিথ্যাবাদী, কায্‌যাব। হযরতের পরে নবী আসিতে পারে, নিশ্চয়ই আসিতে পারে।” –আনওয়ারে খেলাফত, ৬৫ পৃষ্ঠা।

নবুওয়তের দাবী

এইভাবে নবুওয়াতের দরজা খুলিয়া স্বয়ং মির্জা গোলাম আহমদ নিজের নবওয়ত সম্পর্কে ঘোষণা করিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই কাদিয়ানীরা তাহাকে সত্য নবী হিসাবে গ্রহণ করি। প্রমাণ হিসাবে কাদিয়ানীরা অসংখ্য উক্তি উল্লেখ করা যায়। পাঠকগণের অবগতির জন্য এখানে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হইল।

(উর্দূ **********)

“মসীহে মওউদ অর্থাৎ মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী স্বরচিত পুস্তকসমূহে নিজের নবুওয়ত দাবীর সমর্থনে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। যেমন তিনি এক স্থানে লিখিয়াছেন যে, ‘আমি নবী এবং রসূল- এই আমার দাবী।’ ১৯০৮ সালের ৫ই মার্চ প্রকাশিত বদর পত্রিকা দ্রষ্টব্য। অথবাতিনি অন্যত্র যেরূপ লিখিয়াছেন: ‘আমি খোদার হুকুম অনুসারে একজন নবী। সুতরাং এখন যদি আমি তাহা অস্বীকার করি, তবে আমার গোনাহ হইবে। খোদা যখন আমার নাম নবী রাখিয়াছেন- তখন আমি কিরূপে তাহা অস্বীকার করিতে পারি। দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমি স্থিরনিশ্চিতভাবে এই দাবীর উপরই কায়েমথাকিব। (লাহোরের আখবারে আম পত্রিকার সম্পাদকদের নিকট প্রেরিত মির্জা গোলাম আহমদের চিঠি দ্রষ্টব্য)। মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পূর্বে অর্থাৎ ১৯০৮ সালের ২৩শে মে তারিখে হযরত মসীহ মওউদ এই পত্রখানা লিখিয়াছিলেন এবং তাহার মৃত্যু দিবসে অর্থাৎ ১৯০৮ সালের ২৬শে মে আখবারে আম পত্রিকায় তাহা প্রকাশিত হয়।” –মির্জা বশীরউদ্দীন আহমদ, কালেমাতুল ফছল এবং রিভিউ অব রিলিজনস পত্রিকার ৩য় বর্ষ, ১৪ সংখ্যা, ১১ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

(উর্দূ **********)

“অতএব ইসলামী শরীয়তে নবীর যে অর্থ করা হয় তদনুসারে হযরত সাহেব অর্থাৎ মির্জা ‘গোলাম আহমদ’ কোন মতে মাজাযী নবী নহেন বরং প্রকৃত নবী।” –মির্জা বশীরউদ্দীন মাহমুদ আহমদ প্রণীত হাকিকতুন্নবুওয়ত পুস্তকের ১৪৭ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

মুসলমানরা কাফের

নবুওয়ত দাবীর স্বাভাবিক পরিণতি এই যে, যদি কেহ নবীর উপরে ঈমান না আনে, তবে সে ব্যক্তি কাফের বলিয়া গণ্য হইতে বাধ্য। সুতরাং কাদিয়ানীরা তাহাই করিয়াছে। যে সমস্ত মুসলমান মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর উপরে নবী হিাবে ঈমান আনে নাই, তাহাদিগকে প্রকাশ্যভাবে বক্তৃতা এবং বিবৃতির মাধ্যমে কাফের বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। প্রমাণ হিসাবে এখানে কতিপয় উদৃতি দেওয়া হইল।

(উর্দূ **********)

“যে সকল মুসলমান হযরত মসীহে মওউদের প্রতি আস্থা জ্ঞান করে নাই –এমন কি যাহারা হযরত মসীহে মওউদের নাম পর্যন্ত শুনে নাই তাহারাও কাফের, ইসলামের বাহিরে।”

-মির্জা বশীরউদ্দীন মাহমুদ আহমদ প্রণীত আইনায়ে ছাদাকত পুস্তিকার ৩৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

(উর্দূ **********)

“যে ব্যক্তি মুসাকে মানে অথচ ঈসাকে মানে না, অথবা ঈসাকে মানে কিন্তু মুহাম্মাদকে মানে না, কিংবা মুহাম্মাদকে মানে কিন্তু মসীহে মওউদকে মানে না- সে ব্যক্তি শুধু কাফের নয় বরং পাক্কা কাফের এবং ইসলামের সীমা বহির্ভূত।” –মির্জা বশীরউদ্দীন আহমদ প্রণীত কালেমাতুল ফছলহইতে উধৃত রিভিউ অব রিলিজনস পত্রিকার ১১০ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

(উর্দূ **********)

“আমরা যেহেতু মির্জা সাহেবকে নবী হিসাবে স্বীকার করি এবং অ-কাদিয়ানীরা তাহাকে নবী বলিয়া স্বীকার করে না এই কারণে কোরআনে করীমের শিক্ষা অনুযায়ী একজন নবীকেও অস্বীকার করা যদি কুফরী হয়, তবে যাহারা আহমদী নয় তাহারাও কাফের।”

-গুরুদাসপুর সাবজজের এজলাসে মির্জা বশীরউদ্দীন মাহমুদ আহমদ প্রদত্ত বিবৃতি: ২৬-২৯শে জুন ১৯২২ প্রকাশিত আল ফজল পত্রিকা দ্রষ্টব্য।

কাদিয়ানীদের খোদা, ইসলাম, কোরআন

সাধারণ মুসলমানদের সহিত কাদিয়ানীদের শুধু মির্জা গোলাম আহমদ- এর নবুওয়ত দাবরি ভিত্তিতেই নহে বরং তাহাদের স্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী সকল বিষয়ে মৌলিক পার্থক্য রহিয়াছে। কাদিয়ানীদের মুখপাত্র আল ফজল পত্রিকায় ১৯১৭ সালের ২১ আগষ্ট সংখ্যায় প্রকাশিত ‘তোলাবা কো নাছায়েহ’ শীর্ষক খলিফা সাহেবের বক্তৃতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উক্ত বক্তৃতায় তিনি কাদিয়ানী ছাত্রদরে নিকট আহমদীদের সহিত অন্যান্য সম্প্রদায়ের পার্থক্য কতখানি –তাহা ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন।

আলোচ্য বক্তৃতায় তিনি বলেন:

(উর্দূ **********)

“নতুবা হযরত মসীহে মওউদ তো এই কথাও বলিয়াছেন যে, তাহাদের অর্থাৎ মুসলমানদের ইসলাম আলাদা, আমাদের ইসলাম আলাদা, তাহাদের খোদা আলাদা, আমাদের খোদা আলাদা, আমাদের হজ্ব আলাদা, তাহাদের হজ্ব আলাদা, এই ভাবে তাহাদের সহিত প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাদের বিরোধ রহিয়াছে।

আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

১৯৩১ সালের ৩০শে জুলাই তারিখে আলফজল পত্রিকায় খলিফা সাহেবের অন্য একটি বক্তৃতা প্রকাশিত হইয়াছে। তাহাতে দেখা যায় যে, মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর জীবদ্দশায় কাদিয়ানীদের জন্য আলাদা একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন সম্পর্কে যে আলোচনা চলিতেছিল তাহার উল্লেখ রহিয়াছে। তখন এই প্রশ্ন লইয়া কাদিয়ানীদের মধ্যে বিশেষ মতবিরোধ দেখা দিয়াছিল। একদল কাদিয়ানীর মতে আলাদা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠনের কোন প্রয়োজন ছিল না। তাহারা বলিত যে, “আমাদের সহিত সাধারণ মুসলমানদের পার্থক্য মাত্র কয়েকটি বিষয়ে, কিন্তু হযরত মসীহে মওউদ আলাইহেস সালাম তাহার সমাধান করিয়াছেন। তিনি সে সকল বিষয়ে প্রমাণাদি বলিয়া দিয়াছেন। অন্য সব বিষয়ে সাধারণ মাদ্রাসাসমূহে শিক্ষা লাভ করা যায়!” একটি দল এ মতের বিরোধিতা করিতেছিল।

ইতিমধ্যে মির্জা গোলাম আহমদ সাহেব সেখানে উপস্থিত হইলেন। তিনি সব  কথা শুনার পর নিজের রায় দিলেন। উক্ত রায় সম্পর্কে খলিফা সাহেব নিম্নলিখিত ভাষায় মন্তব্য করিয়াছেন:

(উর্দূ **********)

“এ কথা ভুল যে, অন্যান্যদের সহিত আমাদের বিরোধ শুধু ওফাতে মসীহ অথবা মাত্র কয়েকটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ। তিনি বলিয়াছেন যে, আল্লাহ তায়ালার সত্তা, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম, কোরআন, নামায, রেযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি মোটকথা তিনি বিস্তারিতভাবে বুঝাইয়া দিয়োছেন যে, তাহাদের সহিত প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাদের বিরোধ রহিয়াছে।”

মুসলমানদের সহিত সম্পর্ক ত্যাগ

এই ব্যাপক মতবিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি কাদিয়ানীদের হাতেই বাস্তবরূপ গ্রহণ করিল। তাহারা মুসলমানদের সাহিত সক্য প্রকার সম্পর্ক ত্যাগ করিয়া একটি আলাদা উম্মত হিসাবে নিজেদের সমাজ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করিল। ইহার প্রমাণ হিসাবেকাদিয়ানীদের রচনাবলী যে সাক্ষ্য দেয় তাহা এই:

(উর্দূ **********)

“হযরত মসীহে মওউদ (আ) অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করিয়াছেন যেন কোন আহমদী অন্যের পিচনে নাময না পড়ে। বিভিন্ন স্থান হইতে বহু লোক বার বার এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিতেছে। আমি বলিতেছি, তোমরা যতবার জিজ্ঞাসা করিবে ততবার আমি এই উত্তর দিব যে, অ-কাদিয়ানীদের পিছনে নামায পড়া জায়েয নাই, জায়েয নাই, জায়েয নাই।”

-মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ খলিফায়ে কাদিয়ানী রচিত আনওয়ারে খেলাফত-৮৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

(উর্দূ **********)

“অ-কাদিয়ানীগণকে মুসলমান মনে না করাই আমাদের উচিত। তাহাদের পিছনে নাময পড়াও আমাদের উচিত নহে। কারণ তাহারা খোদাতায়ালার একজন নবীকে অস্বীকার করে।” –আনওয়ারে খেলাফত, ৯০ পৃষ্ঠা।

মুসলমান শিশুরাও কাফের

(উর্দূ **********)

“যদি অ-কাদিয়ানীর কোন ছোট শিশু-সন্তান মারা যায় তবে তাহার জানাযার নামায কেন পড়া হইবে না? কারণ শিশুটি তো আর মসীহে মওউদকে অস্বীকার করে না। আমি এই প্রশ্নকারীকে জিজ্ঞাসা করিতে চাই যে, যদি এই কথা সত্যই হইবে- তবে হিন্দু এবং খৃস্টান শিশুদের জানাযা পড়া হয় না কেন? অ-কাদিনয়ানীদের সন্তানও অ-কাদিয়ানীই সাব্যস্ত হইবে। এই কারণেই তাহাদের জানাযা পড়া উচিত নহে।” –আনওয়ারে খেলাফত, ৯৩ পৃষ্ঠা।

মুসলমানদের সহিত বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন

(উর্দূ **********)

“যে কোন আহমদী নিজের কন্যা অ-কাদিয়ানীর সাথে বিবাহ দিবে তাহার সম্পর্কে হযরত মসীহে মওউদ অত্যন্ত রুষ্টভাব প্রকাশ করিয়াছেন। এক ব্যক্তি তাহার কাছে বার বার এ কথা জিজ্ঞাসা করিল এবং নানাপ্রকার ‍অসুবিধার কথা জানাইল। কিন্তু তিনি সেইলোকটিকে বলিলেন যে, মেয়েকে বসাইয়া (অবিবাহিত) রাখ; তথাপি অ-কাদিয়ানীর কাছে বিবাহ দিও না। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মৃত্যুর পরে সেইলোকটি নিজের মেয়েকে অ-কাদিয়ানীর কাছে বিবাহ দিলে প্রথম খলিফা তাহাকে ইমাদের পদ হইতে অপসারণ করেন, তাহাকে জামাত হইতে খারিজ করিয়া দেন; এবং তাহার খেলাফতের ৬ বৎসর কালের মধ্যে লোকটির তওবা পর্যন্ত কবুল করেন নাই; যদিও লোকটি বার বার তওবা করিতেছিল।” –আনওয়ারে খেলফত, ৯৩-৯৪ পৃষ্ঠা।

কাদিয়ানীদের মতে মুসলমান ও খৃষ্টান এক

(উর্দূ **************)

“নবী করীম (সা) খৃষ্টানদের সহিত যেরূপ ব্যবহার করিতেন, হযরত মসীহে মওউদ অ-কাদিয়ানীদের সহিত ঠিক সেই নীতি অনুযায়ী ব্যবহার করিতেন। অ-কাদিয়ানীদের সহিত আমাদের নামায আলাদা করা হইয়াছে। তাহাদিগকে আমাদের কন্যা দান হারাম করা হইয়াছে। তাহাদের জানাযা পড়িতে বারণ করা হইয়াছে। এখন আর বাকীই বা রহিল কি? যে বিষয়ে আমরা তাহাদের সহিত একত্র থাকিতে পারিব? পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপনের মূলসূত্র হইল এবাদতের ঐক্য। আর পার্থিব সম্পর্কের বুনিয়াদ হইল আত্মীয়তা স্থাপন। কিন্তু এই উভয় প্রকারের সম্পর্ক আমাদের জন্য হারাম করা হইয়াছে। তোমরা যদি বল যে, তাহাদের কন্য গ্রহণের অনুমতি তোমাদিগকে দেওয়া হইল কেন? তাহার উত্তর হইল যে, হাদিস দ্বারা একথা প্রমাণিত হইয়াছে যে, অনেক সময় নবী করীম (সা) ইহুদীগণকেও সালামের জওয়াব দিয়াছেন।” –কালেমাতুল ফসল, রিভিউ অব রিলিজন্‌স, ১৬৯ পৃষ্ঠা।

আমাদের দায়িত্ব

মুসলমানদের সহিত কাদিয়ানীদের এই সম্পর্কচ্ছেদ কেবল বক্তৃতা, বিবৃতি এবং রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে। বরং পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ নাগরিক ইহার সাক্ষ্য দিবেন যে, কাদিয়ানীরা কার্যত মুসলমানদের সংগে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া সম্পূর্ণ আলাদা একটি উম্মতে পরিণত হইয়াছে। তাহারা মুসলমানদের সহিত নামায পড়ে না, বিবাহ শাদীর ব্যাপারেও মুসলমানদের সহিত তাহাদের কোন সম্পর্ক নাই- মুসলমানদের জানাযার নামাযও পড়ে না। প্রকৃত অবস্থা যখন এই, তখন আর এমন কোন্‌ যুক্তিসংগত কারণ থাকিতে পারে; যে জন্য মুসলিমদিগকে তাহাদের সহিত একই উম্মতের বন্ধরে আবদ্ধ রাখা সম্ভব। বিভেদ-পার্থক্যের যে মতবাদ প্রকৃতপক্ষে কার্যকরী হইয়াছে এবং গত ৫০ বৎসর যাবত এই বিরোধ বর্তমান, তখন আর আইনগসংগত উপায়ে তাহা স্বীকার করা হইবে না কেন?

প্রকৃতপক্ষে কাদিয়ানী আন্দোলন ‘খতমে নবুওয়ত’-এর তাৎপর্য সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ দিয়াছে। পূর্বে শুধু মতবাদ হিসাবে ইহার গুরুত্ব উপলব্ধি করা বিশেষ আয়াসসাধ্য ছিল। পূর্বে যে কেহ এই প্রশ্ন করিতে পারিত যে, হযরত মুহাম্মাদের (সা) পরে নবীদের আগমন চিরতরে কেন বন্ধ করা হইয়াছে?কিন্তু কাদিয়ানীদের কার্যকলাপ দ্বারা, স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, মুসলিম জাতির ঐক্য এবং সংহতির উদ্দেশ্যে মাত্র একজন নবীর আনুগত্যের ভিত্তিতে সমগ্র তাওহীদবাদীকে একসূত্রে সংঘবদ্ধ করার মূলে আল্লাহ তায়ালার কত বড় রহমত ও মেহেরবানী নিহিত রহিয়াছে। এতদ্ব্যতীত নিত্য নূতন নবুওয়তের দাবীর ফলে জাতির অস্তিত্ব কিরূপে বিপন্ন হয়- তাহাও পরিষ্কাররূপে বুঝা গেল। কারণ নিত্য নূতন নবুওয়তের দাবী জাতিকে খণ্ড বিখণ্ড করিয়া ফেলে, উহার বিভিন্ন অংশকে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া দেয়। বর্তমানে আমাদের এই অভিজ্ঞতা যদি কোন কাজে লাগে- ইহা দ্বারা আমাদের জ্ঞানচক্ষু যদি খুলিয়া যায় এবং আমাদের যদি নূতন উম্মতকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে মুসলমান সমাজ হইতে ভিন্ন করিয়া ফেলি তবেই আর কোন দিন কেহ নবুওয়তের নূতন দাবীদার সাজিয়া মুসলমান সমাজে বিভেদ,বিষৃঙ্খলা সৃষ্টির সাহস পাইবে না। আমরা যদি একবার এই ধরনের অপচেষ্টার প্রশ্রয় দি-ই কিংবা সহ্য করি, তবে তাহার অর্থ এই দাঁড়াইবে যে, আমরা এই ধরনের কার্যকলাপে উৎসাহ দান করিতেছি। আমাদের এই সহিষ্ণুতা ভবিষ্যত একটি উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইবে এবং জাতীয় জীবনে বিচ্ছেদ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা মাত্র একটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকিবে না। বরং আমাদের সমাজ নিত্য নূতন বিভেদ বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হইবে এবং বিভেদ সৃষ্টির আশংকা কোন দিনই বিদূরিত হইবে না।

কূটতর্কের অবতারণা

এই সমস্ত মৌলিক যুক্তির প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা কাদিয়ানীদিগকে মুসলমান জাতি হইতে আইনত আলাদা করিয়া একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসাবে সরকারী ঘোষণার দাবী জানাইয়াছি। এই সমস্ত প্রমাণ ও যুক্তির কোন সন্তোষজনক উত্তর কাহারও কাছে নাই। কিন্তু সরাসরি তাহার প্রতিবাদ না করিয়া অপ্রাসঙ্গিক কতগুলি প্রশ্ন তোলা হইতেছে, যাহাতে জনসাধারণের দৃষ্টি মূল বিষয় হইতে সরিয়া অন্যত্র নিবদ্ধ হইতে পারে। যেমন বলা হয়, মুসলমানদের মধ্যে পূর্ব হইতে এমন কতকগুলি দল রহিয়াছে যাহারা একে অপরকে কাফের বলিয়া প্রচার করে। এখনও তাহা দেখা যায়। এই কারণেই যদি কোন দলকে মুসলিম জাতি হইতে বিচ্ছিন্ন করা হয় তবে শেষ পর্যন্ত জাতিরই কোন অস্তিত্ব থাকিবে না।

এই কথাও বলা হয় যে, মুসলমানদের মধ্যে কাদিয়ানী সম্প্রদায় ব্যতীত আরো কতিপয় দল রহিয়াছে, যাহারা শুধু মৌলিক ব্যাপারেই অধিকাংশ মুসলমানদের সহিত বিরোধিতা করে না- বরং তাহারা সাধারণ ‍মুসলমানদের সহিত আদৌ কোন সম্পর্ক না রাখিয়া, নিজেদের সমাজ সংস্থা গড়িয়া তুলিতেছে। তাহারাও তো কাদিয়ানীদের ন্যায় ধর্মীয় এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানদের সহিত সকল পকার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছে। সুতরাং এখন তাহাদিগকেও কি উম্মত হইতে আলাদা করা হইবে? অথবা কোন্ বিশেষ কারণে কাদিয়ানীদের সম্পর্কে এই ব্যবস্থার দাবী করা হইয়াছে। কাদিয়ানীদের সেই বিশেষ অপরাধটি কি? যে কারণে অন্যান্য সকল সম্প্রদায়কে বাদ দিয়া কেবল মাত্র তাহাদিগকে মুসলিম জাতি হইতে আলাদা করার জন্য এতটা পীড়াপীড়ি করা হইতেছে।

ভ্রান্ত ধারণা

অনেকের বদ্ধমূল ধারণা এই যে, “কাদিয়ানীরা আগাগোড়া খৃষ্টান, আর্য সমাজী এবং অন্যান্য আক্রমণকারীদের আঘাত হইতে ইসলামের হেফাযত করিয়া আসিতেছে। দুনিয়ার সবৃত্র তাহারা ইসলামের তাবলীগ করিতেছে? সুতরাং তাহাদিগকে কওম হইতে আলাদা করা কোন মতে শোভা পায় না।” শুধু তাহাই নহে, সম্প্রতি এ সম্পর্কে বিশেষ নির্ভরযোগ্য সূত্রে একথা আমরা জানিতে পারিয়াছি যে, আমাদের রাষ্ট্রনায়কগণ মনে করেন, কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনেক অবনতি ঘটিবে। কারণ, তাহাদের মতে ইংল্যাণ্ড আমেরিকায় পররাষ্ট্র সচিবের ব্যক্তিগত প্রভাব প্রতিপত্তি অনেক বেশী। সেখান হইতে কোন প্রকার সাহায্য পাইতে হইলে একমাত্র তাহার মারফতেই লাভ করা সম্ভব!

আমাদের জওয়াব

যেহেতু শেষোক্ত কথাটি বেশ একটু সংক্ষিপ্ত, এই কারণেই আমরা প্রথমে তাহার উত্তর দিব। অন্যান্য বিষয়ে পরে আলোচনা করিব। একথা যদি সত্য হয় যে, রাষ্ট্রনায়কগণের ধারণা ইহাই তবে আমাদের বিবেচনা মতে এই ধরনের নির্বোধ এবং স্থবির লোকদের নাগপাশ হইতে দেশ যত শীঘ্র মুক্ত হয় ততই মঙ্গল। যাহরা গোটা জাতির ভবিষ্যৎ মাত্র একজন কিংবা গুটিকতক লোকের খেয়াল খুশীর উপরে নির্ভরশীল মনে করে, তাহাদের হাতে একটি মুহূর্তের জন্যও নেতৃত্ব ন্যস্ত করা যায় না। ইংল্যাণ্ড এবং আমেরিকার কোন রাজনীতিবিদ এতটা মূর্খ নহেন যে, আট কোটি লোকের বসতিপূর্ণ একটি বিরাট দেশের অফুরন্ত উৎপাদন, সুযোগ-সুবিধা, ভৌগলিক গুরুত্ব ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য না রাখিয়া কেবল মাত্র একজন লোকের উপরে অধিক গুরুত্ব আরোপ করিবেন এবং এই দেশের সহিত যাবতীয আদান-প্রদান মাত্র একটি লোকের জন্যই করিবেন। সুতরাং সেই লোকটি অপসারিত হইলেই তাহারা বাকিয়া বসিবেন এবং অভিযোগ তুলিবেন যে, “যাঁহার সম্মানার্থে আমরা তোমাদিগকে ‘ভাত কাপড়’ দিতেছি, তোমরা তাহাকেই সরাইয়া দিয়াছ।” ইংল্যাণ্ড, আমেরিকার কোন রাজনীতিবিদ এতটা গণ্ডমূর্খ নহেন। বরং তাহারা যদি এই ধরনের মন্তব্য শুনিতে পান, তবে নিশ্চয়ই আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের বুদ্ধির বহর দেখিয়া নিজেদের অজ্ঞাতসারে হাঁসিয়া উঠিবেন। এবং তাহারা বিস্মিত হইবেন যে, এই ধরনের ‘শিমু ছাত্ররাই’ কি হতভাগ্য দেশের হর্তাকর্তা সাজিয়েছে! যাহারা সামান্য এই কথাটি পর্যন্ত বুঝে না যে, বহির্বিশ্বে আমাদের কাদিয়ানী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যতটুকু মান মর্যাদা দেখা যায় তাহার মূলে রহিয়াছে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব। এই বিশেষ পররাষ্ট্র সচিকটি ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানের মর্যাদা এবং গুরুত্বের আদৌ কোন কারণ নহেন।

কুফুরী ফতোয়া

এখন আমরা পূর্বোক্ত প্রশ্নগুলির উত্তর একটি একটি করিয়া বিস্তারিতভাবে পেশ করিব।

মুসলমান সমাজে নিসন্দেহে এই একটি ব্যাধির প্রকোপ রহিয়াছে। বিভিন্ন সম্প্রদায় একে অপরকে কাফের আখ্যা দিয়াছে। অনেকের মধ্যে এই  কুৎসিৎ ব্যধি এখনও দেখা যায়। কিন্তু ইহাকে প্রমাণ হিসাবে সামনে রাখিয়া কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে মুসলমান জাতির অন্তর্ভূক্ত রাখা একাধিক কারণেই সংগত নহে।

About শিবির অনলাইন লাইব্রেরী