আসান ফেকাহ – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নামাযের সময়

নামাযের সময় নিয়মানুবর্তিতার সাথে ফরয করা হয়েছে। [কুরআনে আছে- (আরবী*********)

-অতএব নামায কায়েম কর। বস্তুতঃ নামায মুমেনদের উপরে নিয়মানুবর্তিতার সাথে ফরয করা হয়েছে –(নিসা : ১: ১০৩)] ফরয নামাযগুলোর সময় কুরআন ও সুন্নাতের বিশ্লেষণ মুতাবিক পাঁচটি, যথা ফজর, যোহর, আসর, মাগরেব ও এশা। [নামাযের সময় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে- (আরবী**************)

নামায কায়েম কর সূর্য ঢলে যাওয়ার সময়ে, রাতের অন্ধকার পর্যন্তহ এবং ফজরে কুরআন পাঠ কর নিয়মানুবর্তিতার সাথে। ন্যিশ্চয় ফজরের পাঠ মশহুদ হয় (অর্থাৎ ফেরেশতাগণ এ নামাযের সাক্ষী থাকেন)। -(বনী ইসরাঈল: ৭৮)

সূর্য ঢলে যাওয়ার অর্থ মধ্যাহ্নের পর থেকে ক্রমশঃ তার তীব্রতা কম হতে থাকা। এ পরিবর্তন দিনে চারবার হয় এবং ‘দুলুক’ শব্দের দ্বারা তাই বুঝানো হয়েছে। যেমন:

(১) মধ্যাহ্নের পর যখন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে।

(২) দিনের শেষের কিদে যখন তার রশ্মি কমে আসে বেং তার মধ্যে হলুদ আভা দেখা যায়।

(৩) যে সময়ে সূর্য অস্ত যায়।

(৪) এমন সময় যখন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর লাল আভাটুকু বিলিন হয়ে অন্ধকার নেমে আসে।

এ হচ্ছে চার সময়, যখন যোহর, আসর, মাগরেব এবং এশার নামায কায়েম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফজরে কুরআন পাঠের অর্থ ‘ফজরের নামায’। কুরআনে নামাযের জন্যে ‘সালাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও আবর তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে নামায মনে করা হয়েছে। এর দ্বারা নামাযের এ অংশের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। ফজরের পাঠ মশহুদ হয়-অর্থাৎ রাতের নিদ্রা ও বিশ্রামের পর তখন মন-মেযাজ বড় প্রশান্ত থাকে, মানুষ তখন সজীবতা লাভ করে এবং সময়টাও বড়োই মনোরম ও নীরব থাকে।

উপরোক্ত আয়াতে যে চার নামাযের সদিকে সামগ্রিকভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে, কুরআনের অন্যত্র সে সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। (আরবী****************)

-এবং নামায কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তে এবং রাত কিছুটা অতীত হওয়ার পর –(হুদ :১১৪)।

দিনের দুই প্রান্তে নামাযের সুস্পষ্ট মর্ম ফযর এবং মাগরেবের নামায। রাত কিছুটা গভীর হওয়ার পর যে নামায তাহলো এশার নামায। (আরবী***************)

এবং তোমার রবের প্রশংসার সাথে তাসবীহ পাঠ কর সূর্য উদিত হওয়ার আগে এবং অস্ত যাওয়ার পূর্বে এবং রাতের কিচু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর। পুনরায় তসবীহ পাঠ কর এবং দিনের প্রান্তসমূহে। (তোয়াহা: ১৩০)

সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ফজরের নামায, অস্ত যাওয়ার আগে অর্থাৎ এশার নামায পড়ার কথা বলা হয়েছে। তারপর দিনের প্রান্তসমূহ হলো তিনটি, যথা, প্রাতঃকাল দুপুরের পর এবং সূর্যাস্তের পর। অর্থাৎ ফজর, যোহর এবং মাগরেব।

(আরবী********************)

অতএব আল্লাহর তসবীহ পাঠ কর যখন তোমার সন্ধ্যা হয়, এবং যখন তোমার সকাল হয়। আসমান এবং যমীনের প্রশংসা শুথু তাঁরই। (এবং তার তাসবীহ পাঠ কর)। তৃতীয় প্রহরে এবং যখন তোমার যোহরের সময় আসে- (রুম: ১৭-১৮)।

এখানে তাসবীহ অর্থ নামায। কুরআন এভাবে সময়ের নির্ধারণও করা হয়েছে। নতুবা শুধু তাসবীহ পাঠের সময় নির্ধারণের কি অর্থ হতে পারে? অতপর আল্লাহ তায়ালা নামাযের সময় সম্পর্কে বিশ্লেষণের জন্যে হযরত জিবরাঈল (আ) কে পাঠান। তিনি বনী (স)-এর নিকটে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক ওয়াক্তের সঠিক সময় বলে দেন।

নবী করীম (স) এরশাদ করেন,

জিবরাইল (আ) দু’বার বায়তুল্লাহর নিকটে আমাকে নামায পড়িয়ে দেন। প্রথম দিন যোহরের নামা এমন সময়ে পড়ান যখন সবেমাত্র পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে এবং চায়া জুতার তলা থেকে বড় ছিল না। তারপর আসরের নামায এমন সময় পড়ালেন যখন প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার সমান ছিল তারপর মাগরেবের নামায পড়ালেন যখন রোযাদার ইফতার করে। এশার নামায পশ্চিম আকাশের আভা বিলীন হওয়ার সাথে সাথে পড়ালেন তারপর ফজরের নামায এমন সময় পড়ালেন যখন রোযাদারদের জন্যে খানাপিনা হারামহয়ে যায়। দ্বিতীয়বার যোহর নামায তিনি এমন সময় পড়ালেন যখন প্রতিটি বস্তুর ছায়া তার সমান ছিল এবং আসর পড়ালেন এমন সময় যখন বস্তুর ছায়া দ্বিগুণ ছিল। মাগরেবের নামায পড়ালেন রোযাদারদের ইফতার করার সময় এবং এশা রাত এবং তৃতীয়াংশ অতীত হওয়ার পর। ফজরের নাময পড়ালেন উষার আলো ভালোভবে ছড়িয়ে পড়ার পর। অতপর তিনি আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, হে মুহাম্মদ (স), নবীদের নামায পড়ার এই হলো সময়সূচী। নামাযের সঠিক সময় ্ দু’সময়ের মধ্যে।

ফযরের সময়

উষার আলো প্রকাশ হওয়ার পর থেকে সুর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত থাকে।

যোহরের সময়

সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ার পর শুরু হয়। সময় তখন পর্যন্ত থাকে যখন প্রত্যেক জিনিসের ছায়া তার আসল ছায়া ব্যতীত দিগুণ হয়। যেমন এক হাত লম্বা, একটা লাকড়ির আসল ছায়া দুপুর বেলা চর আঙ্গুল ছিল। তারপর সে লাকড়ির ছায়া যখন দু’হাত চার আঙ্গুল হবে তখন যোহরের ওয়াক্ত চলে যাবে। কিন্তু সাবধানতার জন্যে যোহরের নামায এমন সময়ের মধ্যে পড়া উচিত যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া তার আসল ছায়া বাদে সমান হয় জুমার নামাযেরও এই সময়। তবে গরমের সময় একটু বিলম্বে পড়া ভাল। কিন্তু জুমার নামায সকল ঋতুতে প্রথম সময়ে পড়াই উত্তম।

আসরের সময়

যোহরের ওয়াক্ত খতম হলেই আসরের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় পর্যন্ত থাকে। অবশ্যি সূর্যে হলুদ বর্ণ এসে যাওয়ার পূর্বে আসরের নামায পড়া উচিত। হলুদ বর্ণ আসার পর নামায মাকরুহ হয়। কোন কারণে যদি আসরের নামায বিলম্বিত হয়ে যাওয়ার কারণে সূর্য হলুদ বর্ণ ধারণ করে, তাহলে নামায কাযা না করেই তখনই পড়ে নেয়া উচিত।

মাগরেবের সময়

সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে শুরু হয় এবং পশ্চিমাকাশের লাল বর্ণ শেষ হওয়া পর্যন্ত বাকী থাকে। মাগরেবের সময় হওয়ার সাথে সাথে পড়া মুস্তাহাব।

এশার সময়

পশ্চিামাকাশের লাল বর্ণের পর সাদা বর্ণ চলে যাওয়অর পর শুরু হয় এবং সুবহে সাদেক পর্যন্ত বাকী থাকে। পশ্চিমাকাশের সাদা বর্ণ সুর্যাস্তের আনুমানিক সোয়া ঘন্টা পর অন্ধকারে ঢেকে যায়। কিন্তু এশার নামায সাবধানতার জন্যে দেড় ঘন্টা পর পড়া উচিত।

এসব ফরয নামায ছাড়াও তিন নামায ওয়াজেব। নিম্নে সে সবের ওয়াক্ত বলা হলো।

বেতরের নামাযের সময়

এশার নামাযের পরেই বেতের পড়া উচিত। অবশ্যি যারা নিয়মিতভাবে শেষ রাতে উঠতে অভ্যস্ত তাদের জন্যে শেষ রাতে পড়া মুস্তাহাব। কিন্তু যদি সন্দেহ হয় যে, কি জানি যদি ঘুম না ভাঙে তাহলে মুস্তাহাব এই যে, এশার নামাযের পরেই তা পড়ে নিতে হবে।

দু’ঈদের নামাযের সময়

যখন সূর্যোয়ের পর তার হলুদ বর্ণ শেষ হওয়ার পর রৌদ্র তেজ হয়ে পড়ে তখন দু’ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং বলা পড়ার পূর্ব পর্যন্ত থাকে। তবে সর্বদা ঈদের নামায তাড়াতাড়ি পড়া মুস্তাহাব। [বেতেরের নামায ওয়াজেব। শরীয়তের শুধু তিন নাময ওয়অজেব। বেতের এবং দু’ঈদের নামায। অবশ্য মানতের নামাযও ওয়াজেব। প্রত্যেক নফল শুরু করার পর তা ওয়াজেব হয়ে যায়। কোন কারণে নামায নষ্ট হলে তা কাযা পড়া জরুরী হয়ে পড়ে।

নামাযের এ সময়গুলো সারা বিশ্বের জন্যে

নামাযের সময় নির্ধারণের যে নিয়ম উপরে বলা হলো তা দুনিয়ার সকল দেশের জন্যে। যেখানে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয় রাত ও দিন ছোটো হোক অথবা বড়ো হোক, নামাযের সময় সেখানে উপরোক্ত নিয়মেই নির্ধারণ করতে হবে। [মেরু প্রদেশগুলোর নিকটবর্তী ভুখণ্ডে যেখানে রাত ও দিনের মধ্যে অসাধারণ দূরত্ব হয় সেখানে নামাযের সময় নির্ধারণের ব্যাপারে ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা মওদূদী একটি প্রশ্নের জবাবে যা বলেছেন তা প্রনিধানযোগ্য। নিম্নের রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খন্ড থেকে প্রশ্ন ও উত্তর উদ্ধৃত করা হলো।

মরু অঞ্চলদ্বয়ের নিকটবর্তী দেশগুলোতে নামায রোযার সময়

প্রশ্ন: আমার এক ছেলে ট্রেনিং উপলক্ষে ইংলণ্ডে আছে। সে রোযার সময় সূচীল জন্যে মৌলিক নিয়ম পদ্ধতি জানতে চায়। বৃষ্টি, বাদল, কুয়াশা প্রভৃতির কারণে সেখানে সূর্য খুব কমই দেখা যায়। দিন কখনো খুব বড়ো, কখনও খুব ছোট হয়। কখনওআবার সূর্যোদয় ও সূর্য়াস্তের মধ্যে বিশ ঘন্টার তফাৎ হয়। তাহলে এমন অবস্থায় বিশ ঘন্টা বা বেশী সময় রোযা রাখতে হবে?

উত্তর: যেসব দেশে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সূর্য উদয় হয় ও অস্ত যায়, তা সেখানে রাত ছোটো অথবা বড়ো হোক সেখানে নামাযের সময় ঠিক ঐ নিয়মে নির্ধারণ করতে হবে যা কুরআন ও হাদীসে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ফজরের নামায সূর্যোগয়ের আগে যোহর বেলা গড়ার পর, আসর সূর্যাস্তেরে আগে মাগরেবের নামায সূর্যাস্তের পর এবং এশা রাত কিছুটা অতীত হওয়ার পর। এভাবে রোজা সুবহে সাদেক হওয়ার সময় থেকে শুরু হবে এবং সূর্যাস্তের পর পরই ইফতার করতে হবে। যেখানে যোহর এবং আসরের মধ্যে অথবা মাগরেব এবং এশার মধ্যে সময় ক্ষেপণ সম্ভব নয়, সেখানে দু’ওয়াক্তের নামায এক সাথে পড়বে।

আপনার ছেলে যেন তা সুবিধামতো আবহাওয়া অফিস থেকে জেনে নেয় যে, সেখানে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত কখন হয় এবং বেলা গড়ে কখন। সে অনুযায়ী নামাযের সময় ঠিক করে নেবে।

রোযার সময়ের ওখানকার দিন বড়ো হওয়ার জ্যন্যে ঘাসড়াবার দরকার নেই। ইবনে বতুতা রাশিয়ার বুলগেরিয়া শহর সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন গ্রীষ্মকালে সেখানে পৌছেন তখন রমযান মাস ছিল। সেখানে ইফতারের সময় নিয়ে সুবহে সাদেক পর্যন্ত মাত্র দু’ঘন্টা সময় পাওয়া যায়। এ অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে মুসলমানগণ ইফতারও করে, খানাও খায় এবং এশার নামাযও পড়ে। এশার নামাযর কিছুক্ষণ পরেই সুবহে সাদেক হয়ে যায়। তারপর ফজরের নামায পড়ে।

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী