আসান ফেকাহ – ১ম খণ্ড

মসজিদের বিবরণ

মদীনা শরীফে হিজরত করার পর নবী পাক (স)-এর সবচেয় বড় চিন্তা এই হলো যে, আল্লাহর এবাদতের জন্যে মসজিদ তৈরী করতে হবে। তাঁর বাসস্থানের নিকটে সাহল ও সুহাইল নামে দুই এতীম শিশুর কিছু জমি ছিল। নবী (স) তাদেরকে ডেকে নিয়ে তাদের কাছ থেকে সে জমি খরিদ করে নেন। তারপর মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা)-এর সাথে স্বয়ং নবী (স) তাঁর মুবারক হাত দিয়ে কাজ করতেন এবং ইট পাথর বয়ে আনতেন। তা দেখে একজন সাহাবী বলে উঠলেন।

(আরবী***********)

আমরা যদি চুপচাপ বসে থাকি এবং নবী (স) স্বহস্তে কাজ করেন, তাহলে আমাদের এ আচরণ আমাদেরকে গোমরাহ করে দেবে।

সাহাবায়ে কেরাম আগ্রহ ও আনন্দ সহকারে কাজ করছিলেন এবং কবিতা সুর করে গাইছিলেন-

(আরবী***********)

হে আল্লাহ! সত্যিকার যিন্দেগী তো হচ্ছে আখেরাতের যিন্দেগী। অতএব তুমি আনসার ও মুহাজেরীনের উপর রহম কর।

আসলে মসজিদ ইসলামী যিন্দেগীর এমন এক কেন্দ্রবিন্দু যার চার ধারেই মুসলমানের গোটা জীবন আবর্তিত হতে থাকে। এছাড়া কোন ইসলামী জনপদের ধারণাই করা যায় না। এ করণেই নবী (স) মদীনা পৌছার পরেই এই মসজিদ তৈরীর ব্যবস্থা করেন এবং নিজ হাতে ইট পাথর বয়ে নিয়ে মসজিদ তৈরী করেন।

মুসলমানদের মধ্যে দ্বীনী প্রাণ শক্তি উজ্জীবিত রাখার জন্যে, তাদের মধ্যে মিল্লাতের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাত্যিকার অনুভূতি পয়দা করার এবং তাদের বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে একত্রীভূত করার মাধ্যমেই হচ্ছে এই যে, মসজিদকে ইসলামী যিন্দেগীর কেন্দ্রবিন্দু বানাতে হবে এবং তার মধ্যে জামায়াতের সাথে নামায প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করতে হবে। এ উদ্দেশ্যেই হযরত মূসা (আ) এবং হযরত হারুন (আ) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল মিসরে কিছু ঘরবাড়ী নির্দিষ্ট করে নিয়ে সেখানে জামায়তসহ নামায কায়েম করার। এভাবে এ বাড়ী-ঘরগুলোকে মুসলমানদের যিন্দেগীর কেন্দ্র বিন্দু বানিয়ে বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলোকে একত্র করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

(আরবী***********)

আমরা মূসা (আ) এবং তার ভাইকে এই বলে নির্দেশ দিলাম মিসরে তোমাদের কওমের জন্যে কিছু ঘর দোর সংগ্রহ কর এবং কেবলা করে নামায কায়েম কর (ইনুনুস : ৮৭)।

আল্লাহর রসূল (স) মসজিদ তৈরী করতে এবং তা চালু রাখার জন্যে বিভিন্ন রকমের প্রেরণা দিয়েছেন। তাঁর এরশাদ হচ্ছে-

যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে মসজিদ তৈরী করে, তার জন্যে আল্লাহ জান্নাতে ঘর তৈরী করেন – (তিরমিযী, বুখারী)।

মসজিদ নির্মাণ করার অর্থ মসজিদের ঘর তৈরী করা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মসজিদ প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো তার মধ্যে আল্লাহর এবাদত করা, জামায়াতসহ নামায কায়েমের ব্যবস্থা করা। নতুবা এ কথা ঠিক যে, যদি এ উদ্দেশ্য পূরণ করা না হয় তাহলে মসজিদ অন্যান্য বাড়ী-ঘরের মতো একটি ঘর মাত্র হবে।

নবী (স) বলেন, সে ব্যক্তি আল্লাহর আরশের ছায়ার নীচে হবে যার মন সর্বদা মসজিদে লেগে থাকে- (বুখারী)।

অর্থাৎ কোন সময়ই মসজিদের চিন্তা তার মন থেকে দূর হয় না। এক ওয়াক্ত নামায আদায় করার পর অধীর হয়ে দ্বিতীয় ওয়াক্তের অপেক্ষা করে।

মুসলমানদের দ্বীনী যিন্দেগী জীবিত ও জাগ্রত রাখার জন্যে মসজিদের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের অনুমান করুন যে, নবী (স) মৃত্যু শয্যায় কষ্ট পাচ্ছেন তথাপি ঐ অবস্থায় বিছানা ছেড়ে উঠেছেন এবং দু’জন লোকের উপর ভর দিয়ে পা মুবারকদ্বয় মাটিতে টেনে হেঁচড়ে মসজিদে পৌছেছেন। তারপর জামায়াতে নামায আদায় করেন- (বুখারী)।

আল্লাহর কাছে এ গোটা দুনিয়ার মধ্যে শুধু ঐ অংশটুকু সবচেয়ে বেশী প্রিয় যেখানে আল্লাহর মসজিদ  প্রতিষ্ঠিত আছে। অতপর এটা কি করে হতে পারে যে, মুমেনদের মসজিদের সাথে অসাধারণ সম্পর্ক হবে না?

হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (স) বলেন-

আল্লাহর নিকটে ঐসব জনপদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় স্থান তাঁর মসজিদ এবং সবচেয়ে ঘৃণিত স্থান সে বস্তিগুলোর বাজার (মুসলিম)।

এক সময়ে নবী (স) মসজিদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঈমানের সুস্পষ্ট আলামত বলে বর্ণনা করেন। তারপর নির্দেশ দেন যে, মুসলমান সমাজে যারা মসজিদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখে এবং মসজিদের খেদমত করা তাদের প্রিয় কাজ হয়, তারা সত্যিকার ঈমানদার এবং তোমরা তাদের ঈমানের সাক্ষী থাক। এটা ঠিক যে, মুসলিম সমাজে এ সব লোকই শ্রদ্ধার পাত্র। তাদের অনুসরণ করা দ্বীন ও দুনিয়ার সৌভাগ্য।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, নবী (স) এরশাদ করেছেন-

যখন তোমরা কাউকে দেখবে যে, সে মজিদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখে এবং মসজিদ দেখাশুনা করে তাহলে তোমরা সাক্ষী থাক যে, সে ঈমানদার। এ জন্যে যে, আল্লাহ বলেন- (আরবী*************)

আল্লাহর মসজিদ তারাই আবাদ রাখে যারা আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর ঈমান রাখে।

উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিরমিযী এবং ইবনে মাজাহ।

মসজিদের আদব ও শিষ্টাচার

১. মসজিদে প্রবেশ করার সময় প্রথমে ডান পা রাখা উচিত। তারপর দরুদ শরীফ পড়ে- সেই দোয়া করা উচিত যা নবী (স) শিক্ষা দিয়েছেন। নবী (স) বলেন, তোমাদের মধ্যে যখন কেউ মসজিদে আসবে সে যেন নবীর উপর দরুদ পাঠায় এবং এ দোয়া করে (আরবী*************)

আয় আল্লাহ তোমার রহমতের দুয়ার আমার জন্যে খুলে দাও। (সহীহ মুসলিম)

২. মসজিদে প্রবেশ করে সর্ব প্রথম দু’রাকায়াত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নফল নামায পড়া উচিত। নবী (স) বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ মসজিদে এলে দু’রাকায়াত নামায না পড়া পর্যন্ত যেন সে না বসে। (বুখারী, মুসলিম)।

৩. মসজিদে নিশ্চিন্ত মনে বিনয়ের সাথে বসে থাকা উচিত। যাতে করে আল্লাহর মহত্ব ও তাঁর ভয় মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মসজিদে হৈ হল্লা করা, হাসি-ঠাট্টা এবং দুনিয়াবী কাজ-কর্মের আলেঅচনা করা, বেচা কেনা করা এবং এ ধরনের অন্যান্য দুনিয়াদারী কাজ –কর্ম করা মসজিদের মর্যাদার খেলাপ। নবী (স) এসব কাজ-কর্ম সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি বলেন-

এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ মসজিদের মধ্যে নিরেট দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে। তোমরা যেন এসব লোকের কথাবার্তায় শরীক না হও। আল্লাহ দ্বীন থেকে এ ধরনের উদাসীন লোকদের নামায কবুল করবেন না।

মসজিদের মহত্ব ও তার প্রতি শ্রদ্ধা এটাই দাবী করে যে, মানুষ ভীত কম্পিত হয়ে সেখানে প্রবেশ করে এবং যেখানই জায়গা পায় সেখানেই বিনীতভাবে বসে পড়ে। এটাতো মারাত্মক অন্যায় যে, মানুষ অন্যান্য লোকের ঘাড়ের উপর দিয়ে মানুষ ঠেলে সামনে যাবে। এটাও অন্যায় যে, ইমামের সাথে রুকু এবং রাকয়াত ধরার জন্যে মসজিদে হুড়মুড় করে দৌড়াবে। এভাবে দৌড়ানো মসজিদের মর্যাদার খেলাপ। রাকয়াত ধরা যাক না যাক নেহায়েত ভদ্রতা ও শালীনতার সাথে ধীর পায়ে মসজিদে চলা উচিত। নবী (স) বলেন, তোমাদের জন্যে জরুরী যে, তোমরা শান্তশিষ্ট হয়ে শালীনতাসহ মসজিদে থাকবে।

৪. মসজিদে দুর্গন্ধ জিনিস নিয়ে বা খেয়ে যাওয়া উচিত নয়। নবী (স) বলেন, রসুন-পিঁয়াজ খেয়ে যেন কেউ আমাদের মসজিদে না আসে। এ জন্যে যে, যেসব জিনিসে মানুষের কষ্ট হয়, তাতে ফেরেশতাদেরও কষ্ট হয় (বুখারী মুসিলম)।

৫. মসজিদে এমন ছোটো বাচ্চা নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যে পেশাব পায়খানা চাপলে বলতে পারে না। কারণ আশংকা যে, কখন পেশাব পায়খানা করে ফেলে কিংবা অন্যান্যভাবে মসজিদের সম্মান নষ্ট করে ফেলে। পাগলদেরও মসজিদে আসদে দেয়া উচিত নয় যাদের পাক নাপাক জ্ঞান নেই।

৬. মসজিদের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করা ঠিক নয়। মসজিদে ঢুকলেই তার হক হয়ে দাঁড়ায় যে, সেখানে প্রবেশকারী নামায পড়বে, অথবা যিকির ও তেলাওয়াত করবে। এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে এমনি এমনি বের হয়ে যাওয়া মসজিদের বেইযযতি করা হয়। ভুলে কেউ ঢুকে পড়লে স্মরণ হওয়া মাত্র বেরিয়ে আসা উচিত।

৭. কোন কিচু হারিয়ে গেলে মসজিদে জোরে জোরে চিৎকার করে তার ঘোষণা করা ঠিক নয়্ এভাবে কেউ মসজিদে ঘোষণা করলে নবী (স) তার উপর অসন্তুষ্ট হতেন এবং বলতেন- (আরবী**********)

আল্লাহ তোমার হারানো জিনিস ফিরিয়ে না দেন-(বুখারী)

৮. মসজিদের সাথে মনের গভীর সম্পর্ক রাখা উচিত। প্রত্যেক নামাযের সময় আনন্দ ও উৎসাহ সহকারে মসজিদে যাওয়া উচিত। নবী পাক (সা) বলেন-

কিয়ামতের ভয়ংকর দিনে যখন আল্লাহর আরশ ব্যতীত কোথাও কোন ছায়া থাকবে না। সেদিন সাত প্রকার লোক আরশের ছায়ার নীচে হবে। তাদের মধ্যে এক প্রকারে হবে যাদের দিল সিজদায় লেগে থাকতো।– (বুখারী)।

অর্থাৎ মসজিদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হবে। সর্বদা মসজিদে তার ধ্যানের বস্তু হয়। এক ওয়াক্ত নামায শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ওয়াক্তের জন্যে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে।

নবী (স) বলেন-

সকাল সন্ধায় মসজিদে যাতায়াতকারীদের জন্যে আল্লাহ তায়ালা তাদের মেহমানদারীর আয়োজন করেন। (বুখারী, মুসলিম)

নবী (স) আরও বলেন-

যে ব্যক্তি ঘরে অযু করে নামাযের জন্যে যায়, তার মসজিদে পৌছার পর আল্লাহ এতোটা খুশী হন যেমন ধারা মুসাফির সফর শেষে বাড়ী ফিরে এলে বাড়ীর লোকজন খুশী হয়- (ইবনে খুযায়মা)।

নবী (স) আরও বলেন-

সকালের অন্ধকারে যারা মসজিদে যায়, কেয়ামতের দিনে তার সাথে পরিপূর্ণ আলো থাকবে। (তাবারানী)।

হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব (রা) বলেন যে, নবী (স) বলেছেন-

 যে ব্যক্তি ভালভাবে অযু করলো, তারপর ঘর থেকে নামাযের জন্যে বেরুলো তার প্রতি ডান কদমের উপর একটি করে নেকী লেখা হবে। আর বাম কদমের উপর একটি করে গুনাহ মিটিয়ে দেয়া হবে। মসজিদ নিকটে হোক অথবা দূরে। তারপর মসজিদে পৌছার পর যদি পুরা জামায়অতের সাথে নামায আদায় করে তাহলে পুরা সওয়াব পাবে, কিছু নামায হওয় যাওয়ার পর শরীক হলে এবং সালামের পর বাকী নামায পুরা করলে- তবুও পুরা সওয়াব পাবে। আর যদি মসজিদে পৌছতে পৌছতে জামায়াত হয়ে যায় এবং সে একাকী মসজিদে নামায আদায় করে, তথাপিও পুরা সওয়াব পাবে –(আবু দাউদ)।

৯. মসজিদে সুগন্ধি প্রভৃতির ব্যবস্থা করা, মসজিদ পাক সাফ রাখা মসজিদের হক। আল্লাহর দৃষ্টিতে এ হচ্ছে জান্নাতবাসীদের কাজ। নব (স) বলেন, মসজিদ পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা, পাক সাফ রাখা, আবর্জনা বাহিরে ফেলা, মসজিদে সুগন্ধির ব্যবস্থা করা, বিশেষ করে জুমার দিনে মসজিদ খোশবুতে ভরপুর করা প্রভৃতি যাবতীয় কাজ মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে – (ইবনে মাজাহ, তাবারনী)।

তিনি আরও বলেন-

মসজিদের আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজটা হলো বেহেশতের সুন্দরী হুরপরীর মোহার- (তাবারানী)।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি মসজিদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করে সে প্রকৃত সুন্দরী হুরের মোহর আদায় করে।

হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) বলেন, একজন মেয়েলোক মসজিদে নববীতে ঝাড়ু দেয়ার কাজ করতো। হঠাৎ সে মারা গেল। লোক তাকে গুরুত্ব না দিযে দাফন করলো। নবী (স) কেও কোন খবর দিল না। নবী (স) যখন তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর জানতে পারলেন যে, সে মারা গেছে এবং সামান্য ব্যাপার মনে করে দাফন করা হয়েছে, তখন নবী (স) বলেন-

তোমরা আমাকে জানালে না কেন?

তারপর তিনি তার কবরে গিয়ে দোয়া করে বলেন, এ মেয়েলোকটির সবচেয়ে ভাল আমল এ ছিল যে, মসজিদ ঝাড়ু দেয়ার কাজ করতো। (বুখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, প্রভুতি)।

১০. মসজিদের আঙ্গিনায় অযু করা, কুলি করা অথবা অযু করে মসজিদে হাত ঝেড়ে পানি ছিঁটে ফেলা মাকরুহ। কিছু লোক অযু করার পর চেহারা এবং হাত মুছে ব্যবহৃত পানি মসজিদের মধ্যে ফেলে। এমন করা মসজিদের বেয়াদবী করা হয়। এভাবে কারো পায়ে অথবা কাপড়ে প্রবৃতিতে যে কাদামাটি লেগে থাকে তা মসজিদের দেয়ালে, খামে অথবা পর্দায় মুছে ফেলা মাকরাহ।

১১. জানাবাত অথবা হায়েয নেফাস অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া উচিত কোন অপরিহার্য কারণ ব্যতীত এরূপ অবস্থায় মসজিদ যাওয়া মাকরুহ তাহরীমি।

১২. মসজিদে ঘুমানো, অযথা শুয়ে শুয়ে অথবা বসে বসে সময় কাটানো মাকরুহ। অবশ্যি মুসাফিরের জন্যে থাকা এবং ঘুমানোর অনুমতি আছে। তারপর যারা এ’তেকাফ করেন তাদের মসজিদেই থাকতে এবং ঘুমাতে হবে।

১৩. সতর খোলা আছে এমন পোশাকে মসজিদে না যাওয়া উচিৎ। যেমন ধরুন, নেকাপ পরে অথবা কাপড় উপরে উঠিয়ে না যাওয়া উচিত। বরঞ্চ পোশাক আবৃত হয়ে আদবের সাথে যাওয়া উচিত।

১৪. মসজিদের দরজা বন্ধ করা উচিত নয়। কারণ যখন যার ইচ্ছা সে যেন নামায পড়তে পারে। অবশ্যি লট বহর জিনিসপত্র চুরি হওয়ার ভয় থাকলে দরজা বন্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু নামাযের সময় অবশ্যই দরজা খোলা রাখতে হবে। সাধারণ অবস্থায় মসজিদের দরজা বন্ধ রাখা মাকরুহ।

১৫. মসজিদে দস্তুরমত আযানস ও জামায়াতের ব্যবস্থা করা উচিত। এমন লোককে আযান দেয়ার জন্যে এবং ইমামতী করার জন্যে নিযুক্ত করা উচিত, যে মসজিদে আগমনকারী সমস্ত নামাযীর কাছে সামগ্রিকভাবে দ্বীন ও আখলাকের দিক দিয়ে উত্তম বলে বিবেচিত হয়। যতদূর সম্ভব এ বিষয়ে চেষ্টা করা দরকার যাতে করে আযান-ইমামতের জন্যে এমন লোক পাওয়অ যায়, যে নিছক আখেরাতের প্রতিদানের আশায় এ দায়িত্ব পালন করবে।

হযরত ওসমান ইবনে আবীল (আস (রা) বলেন, আমি নবী (স)-এর কাছে দরখাস্ত করে বললাম, আমাকে কওমের ইমাম বানিয়ে দিন।

নবী (স) বলেন-

তুমি তার ইমাম হও কিন্তু দুর্বল লোকদের খেয়াল রাখবে এবং এমন মুয়াযযিন নিযুক্ত করবে যে আযান দেয়ার পারিশ্রমিক নেবে না। (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, নাসায়ী)।

১৬. মসজিদ চালু রাখার জন্যে পুরোপুরি ব্যবস্থা করতে হবে। মসজিদ চালু রাখার অর্থ এই যে, তার মধ্যে আল্লাহর এবাদত করতে হবে এবং লোত যেন যিতির-ফিকির, তেলাওয়াত. নফল নামায প্রভৃতিতে মশগুল থাকে। আল্লাহ তায়ালার এরশাদ-

(আরবী**************)

এসব ঘরে যেগুলোকে আল্লাহ উচ্চ-উন্নত করতে এবং তার মধ্যে আল্লাহর নামের যিকির করতে অনুমতি দিয়েছেন। (নূর: ৩৬)

অর্থাৎ মসজিদের এ হক যে তার সম্ভ্রম শ্রদ্ধা করা হোক, তার মধ্যে যিকির-ফিকির করা হোক এবং আল্লাহর ইবাদতের ব্যবস্থা করা হোক এ মুমিনদের হক ও দায়িত্ব এবং তাদের ঈমানের সাক্ষ্য।

কুরআনে আছে- (আরবী************)

আল্লাহর মসজিদগুলোকে তো তারাই তৈরী করে সজীব ও আবাদ রাখে যারা আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর ঈমান রাখে –(তওবা: ১৭)।

কিন্তু আজকাল সাধারণত মানুষ মসজিদগুলোকে সুন্দ কারুকার্য সহকারে সাজিয়ে রঙিন আলো ঝলমল করে রাখার আশ্চর্য ধরনের ব্যবস্থা করে। বরঞ্চ তার জন্যে চাঁদাও আদায় করে যা আরো খারাপ। কিন্তু তারা মসজিদকে সজীব রাখার এবং আল্লাহর ইবাদতের সৌভাগ্যলাভ করার ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন থাকে। অথচ নবী পাক (স) এরশাদ করেন-

 আমাকে মসজিদ সুউচ্চ ও জাঁকজমকপূর্ণ করে বানাতে আদেশ দেয়া হয়নি। -(আবু দাউদ)।

হযরত ইবনে আব্বাস এ হাদীস শুনানোর পর লোকদের সাবধান করে দিয়ে বলেন-

“তোমরা তোমাদের মসজিদগুলোকে এমনভাবে সাজাতে থাকবে যেমন ইহুদী-নাসারা তাদের ইবাদতখানাকে করে।”

মসজিদ থেকে বেরুবার সয় প্রথমে বাম পা রাখতে হবে এবং তারপর এ দোয়া পড়তে হবে- (আরবী********)

আয় আল্লাহ আমি তোমার ফযল ও করম ভিক্ষা চাই।

১৮. মসজিদের ছাদের উপর পেশাব পায়খানা করা এবং যৌনকার্য করা মাকরুত তাহরীমি। যদি কেউ ঘরের মধ্যে মসজিদ বানিয়ে থাকে তাহলে পুরা ঘরের উপর মসজিদের হুকুম কার্যকর করা হবে না। বরঞ্চ অতটুকু মসজিদের হুকুমের মধ্যে আসবে যা নামাযের জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এমনিভাবে ওসব স্থানও মসজিদের হুকুমের আওতায় আসবে না যা ঈদাইন অথবা জানাযার জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

১৯. সাধারণত কোন পেশাজীবীর জন্যে এটা জায়েয নয় যে, সে মসজিদে বসে আপন কাজ করবে। তবে যদি এমন লোক মসজিদের হেফাযতের জন্যে মসজিদে বসে সাময়িকভাবে নিজের কাজ করে যেমন কোন দর্জি সেলাইয়ের কাজ করে অথবা লেখক লেখার কাজ করে তাহলে তা জায়েয হবে।

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী