আসান ফেকাহ – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইমামতির বর্ণনা

ইমাম নির্বাচন

নামাযের ইমামতি একটি বিরাট দ্বীনী মর্যাদ এবং দায়িত্ব। এ রসূলের উত্তরাধিকারীর মর্যাদা। এ জন্যে খুব সাবধানতার সাথে ইমাম নির্বাচন করতে হবে। এমন ব্যক্তির উপর এ দায়িত্ব ন্যস্ত করতে হবে যিনি সামগ্রিকভাবে সকল নামাযীর চেয়ে অধিক উত্তম ও মর্যাদাসম্পন্ন, যিনি এলেম ও পরহেজগারী, ত্যাগ ও কুরবানি এবং দ্বীনের ব্যাপারে দুরদর্শিতা ও সুক্ষ্ম বিচর বিবেচনায় সকলের উর্ধে। যিনি মসজিদের মধ্যে মুসলমানদের ইমামও হবেন এবং ব্যবহারিক জীবনেও তাদের পথ প্রদর্শক ও নেতা হবেন।

মৃত্যু শয্যা থেকে নবী পাক (স) যখন মসজিদে যেতে অপরাগ হন, তখন তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা)কে তিনি মনোনীত করেন যিনি সামগ্রিকভাবে গোটা উম্মতের মধ্যে সকলের শ্রেষ্ঠ ছিলেন। ঘরের মহিলাগণ দু’বার আপাত্তি করে বলেন যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক অত্যন্ত নরমমনা লোক বলে নিজেকে সামলাতে পারবেন না। তথাপি নবী (স) তিন বার বললেন, আবু বকর (রা) কে নামায পড়িয়ে দিতে বল। তারপর হযরত আবু বকর (রা) নামায পড়ান।

প্রকৃতপক্ষে নামায দ্বীনী যিন্দেগীর উৎস। নামাযের মধ্যে আল্লাহর দরবারে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকারী তিনিই যিনি এ মর্যাদর উপযুক্ত এবং সামগ্রিকভাবে দ্বীনি গুণাবলীতে সকলের চেয়ে অধিক মর্যাদাশীল, হযরত আবু মাসউদ (রা) বলেন নবী (স) বলেছেন-

মুসলমানদের ইমাম ঐ ব্যক্তি হতে পারেন যিনি সকলের চেয়ে অধিক কুরআন পাঠকারী। যদি এ গুণে সকলেই সমান হয়, তাহলে যিনি সকরের চেয়ে সুন্নাত ও শরীয়তের জ্ঞান রাখেন। যদি এ ব্যপারেও সকলে সমান হন তাহলে যিনি সকলের আগে হিযরত করেছেন। যদি এ ব্যাপারেও সকলে সমান হলে যার বয়স সবচেয়ে বেশী- (মুসলিম)।

অধিত কুরআন পাঠকারী সেই ব্যক্তিকে বলে যার কুরআনের সাথে বিশেষ মহব্বত ও সম্পর্ক হবে। যিনি বেশী বেশী তেলাওয়াত করেন এবং কুরআনের হাফেয, ভালবাবে কুরআন পড়তে পারেন। যিনি কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণা করতে পারেন এবং যিনি কুরআনের দাওয়াত ও হিকমত উপলব্ধি করেছেন। এ গুণ যদি সকলের মধে্য পাওয়া যায় তাহলে এমন ব্যক্তিকে ইমাম বানাতে হবে যিনি সুন্নাত ও শরীয়ত সম্পর্কে বেশী অভিজ্ঞ এবং দ্বীনের আহকাম ও মাসয়ালা-মাসায়েল সম্পর্কে অধিক অভিজ্ঞ।

হিজরতে অগ্রগামী  হওয়ার অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি দ্বীনের পথে অগ্রগামী এবং ত্যাগ ও কুরবানীতে সকলের সেরা। এসব গুণাবলী সকলের মধ্যে সমানভাবে থাকলে যিনি সকলের চেয়ে বেশী তাঁকেই প্রাধান্য দিতে হবে।

ইমামতির মাসয়ালা

১. কোন মহিলার জন্যে জায়য নয় যে, তিনি পুরুষের ইমামতি করবেন। হযরত জাবের (রা) বলেন, কোন মহিলা যেন কোন পুরুষের ইমামতি না করে একথা নবী (স) বলেছেন। -(ইবনে মাজাহ)

২. যদি মহিলাদের ইমামতি মহিলা করেন তাহলে কাতারের মাঝখানে দাঁড়াতে হবে আগে নয়।

৩. ইমামের জন্যে প্রয়োজন যে, মুক্তাদীগণের প্রয়োজন এবং অসুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে কুরআন পড়বেন এবং রুকূ সিজদা দীর্ঘ করবেন না। মুক্তাদীদের প্রতি খেয়াল না করে লম্বা লম্বা সূরা পড়া এবং লম্বা লম্বা রুকু সিজদা করা মাকরুহ তাহরীমি।

নবী (স) বলেন-

তোমাদের কেউ যদি নামায পড়ায় তো তার উচিত হালকা নামায পড়াবে। এ জন্যে যে, মুক্তাদীদের মধ্যে অসুস্থও থাকে,  দুর্বল লোকও থাকে এবং বুড়ো লোকও থাকে। তবে যদি একা নামায পড়ে তাহলে যতো লম্বা খুশী পড়তে পারে। -(বুখকারী, মুসলিম)

হযরত মাআয (রা) এশার নামাযে লম্বা সূরা পড়তেন। তারপর নবী (স)-এর নিকট এ নিয়ে অভিযোগ করা হলো। নবী (স) হযরত মাআযের উপর খুব রাগ করে বলেলেন-

মাআয তুমি কি মানুষকে ফেতনার মধ্যে জড়িত করতে চাও?

তারপর তিনি তাঁকে বলেন- (আরবী************) এ ধরনের সূরাগুলো পড়বে। -(বুখারী, মুসলিম)

নবী (স) স্বয়ং নিজের বেলায় বলেন,

আমি নামায পড়াতে শুরু করলে মনে করি যে, নামায লম্বা পড়ি। কিন্তু আমার কানে বাচ্চাদের কান্নার আওয়ায পৌছলে নামায সংক্ষেপ করি। এ জন্যে যে, আমি জানি বাচ্চা কাঁদলে মায়ের মনে কত কষ্ট হয়। -(বুখারী)

৪. ইমামের তাকবীর মুক্তাদী পর্যন্ত পৌঁছাবার জন্যে মাঝখানে মুকাব্বের ঠিক করে দেয়া জায়েয, যে ইমামের তাকবীর শুনে তাকবীর বলতে এবং তার তাকবীর শুনে মুক্তাদীগণ সিজদা ও নামাযের অন্যন্য আরকান আদায়  করবে।

৫. ফাসেক, বদকার এবং বেদআতা লোককে ইমাম বানানো মাকরূহ তাহরীমি। তবে কোন সময় এমন লোক ছাড়া যদি আর কাউকে না পাওয়া যায়, তাহলে মাকরূহ হবে না।

৬. যে কোন ফেকাহর অনুসারী লোককে ইমাম বানানো এবং তার পেছনে নামায জায়েয। ইমামের নামায যদি তার ফেকাহর দিক দিযে সহীহ হয় তাহলে সকল মুক্তাদীর নামায সহীহ হবে তারা যে কোন ফেকাহের অনুসরী হোক না কেন।

৭. যদি কোন ব্যক্তি মাগরেব, এশা অথবা ফজরের ফরয নামায একাকী পড়ে এবং কেউ এসে তার মুক্তাদী হয় তাহলে ঐ ইমামের জোরে জোরে কেরায়াত করা ওয়াজেব হবে। যদি সূরা ফাতেহা অথবা তার পরের সূরা সে পড়ে থাকে তথাপি উচ্চ শব্দে পুনরায় তা পড়তে হবে। কারণ এসব নামাযের ইমামের জন্যে উচ্চ শব্দে কেরায়াত করা ওয়াজেব। অবশ্যি সূরা ফাতেহা দুবার পড়ার জন্যে সুহু সিজদা করা ওয়াজেব হবে।

৮. এমন কোন ব্যক্তিকে ইমাম বানানো মাকরূহ যার রোগের কারণে সাধারণত মানুষ ঘৃণা বোধ করে। যেমন কুষ্ঠ বা এ জাতীয় কোন রোগ হ।ে

৯. এমন কোন সুশ্রী বালককে ইমাম বালককে ইমাম বানানো মাকরূহ যার দাড়ি উঠেনি।

১০. যে ব্যক্তির ইমামতিতে মুক্তাদী সন্তুষ্ট নয় তার ইমামতি করা উচিত নয়। কওমের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইমামতি করা মাকরু তাহরীমি।

১১. যদি কখনো কারো বাড়ীতে নামায পড়া হয় তাহলে বাড়ীর মালিকই ইমামতির হকদার। তবে তিনি নিজে কাউকে আগে বাড়িযে দিলে তাতে দোষ নেই। তেমনি কোন মসজিদে নির্ধারিত ইমাম থাকলে তিনিই ইমামতির হকদার। তবে তিনি স্বয়ং অন্য কাউকে ইমাম বানালে দোষ হবে না।

১২. ইমামের নামায কোন কারণে নষ্ট হলে সকল নামাযীর নামায নষ্ট হয়ে যাবে, নামায নষ্ট হওয়ার বিষয় নামাযের মধ্যেই জানতে পারা যাক অথবা নামাযের পর। নামাযের পর জানতে পারা গেলে ইমামের জন্যে জরুরী হবে সকল মুক্তাদীকে তা জানিয়ে দেয়া যেন তারা পুনরায় নামায পড়তে পারে।

১৩. ইমামের দায়িত্ব এই যে, তিনি মুক্তাদীগণকে কাতার সোজা ও বরাবর করার জন্যে বলবেন যে, তারা যেন এসে অপরের সাথে মিলে গিয়ে দাঁড়ায় এবং দু’জনের মাঝে কোন ফাঁক না থাকে।

১৪. পুরুষ শুধু মেয়েদের ইমামতিও করতে পারে- এ অবস্থায় যে, মেয়েদের মধ্যে অবশ্যই কেউ তার মুহাররম মেয়েলোক হতে হবে অথবা ঐসব মেয়েলোক ছাড়া একজন পুরুষ জামায়াতে শরীক হতে হবে।

মেশিনের সাহয্যে ইমামতি

টেপরেকর্ডে কোন ইমামের আওয়ায রেকর্ড করে অথবা গ্রামোফোনের সাহায্যে জামায়াতে নামযের রেকর্ড তৈরী করে তার এক্তেদায় জামায়াতে নামায পড়া জায়েয হবে না। এমনি ভাবে যদি কেউ রেডিওর সাহায্রে দূর দূরান্তর থেকে নামাযের ইমামতি করে তাহলে তার একতেদায় নামায জায়েয হবে না। [ আল্লামা মওদূদী (র) এক প্রশ্নের জবাবে এ প্রসংগে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:

প্রশ্ন : রেডিও এমন একটি প্রচার মাধ্যম যা এক ব্যক্তির কথা ও শব্দ হাযার হাযার মাইল দূর পর্যন্ত পৌছিয়ে দেয়। এভঅবে গ্রামোফোনের রেকর্ডেও মানুষের আওয়ায সংরক্ষণ করা যায় তারপর আবার বিশেষ পদ্ধতিতে তার পুনরাবৃত্তি করা যায়। এখন প্রশ্ন এই যে, যদি কোন ইমাম হাযার হাযার মাইল দূর থেকে রেডিওর সাহায্যে ইমামতি করে অথবা কোন গ্রামোফোন রেকর্ডে কোন আওয়ায সংরক্ষণ করে তা আবার পুনর্বার বাজানো যায়। তাহলে এসব যান্ত্রিক আওয়াজের এক্তেদা করে নামাযের জামায়াত করা কি জায়েয হবে?

জবাব: রেডিওতে এক ব্যক্তির ইমামতীতে দূর দূরান্তের নামায পড়া অথবা কোন জামায়াতের নামায পড়া নীতিগতভাবেই সহীহ নয়। তার কারণগুলো যদি তলিয়ে দেখেন তাহলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।

ইমামের কাজ শুধু নামায পড়ানো নয়। বরঞ্চ তিনি এক দিক দিয়ে স্থানীয় জামায়াতের নেতা। তাঁর কাজ হচ্ছে এই যে, তিনি লোকের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করবেন, তাদের চরিত্র, আচার-ব্যবহার এবং স্থানীয় অবস্থার প্রতি নযর রাখবেন। তারপর অবস্থা ও প্রয়োজনবোধে তাঁর খোতবার মাধ্যমে অথবা অন্য কোন সুযোগে তাদের সংশোধনের ও হেদায়েত দানের দায়িত্ব পালন করবেন। এটা অবশ্যি অন্য কথা যে, অন্যান্য ব্যাপারের সাথে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানেরও অবনতি ঘটেছে। কিন্তু সক অবস্থায় মূল প্রতিষ্ঠানকে তার প্রকৃত রূপে কায়েম রাখা প্রয়োজন। যদি রেডিওতে নামায শুরু হয় অথবা গ্রামোফোনের মাধ্যমে ইমামতি ও খোতবা দেয়ার কাজ নেয়া যেতে থাকে, তাহলে ইমামতির প্রকৃত প্রাণশক্তিই চিরদিনের জন্যে নষ্ট হয়ে যাবে।

নামায অন্যান্য ধর্মের মতো নিছক ‘পূজা’ নয়। অতএব তার ইমামতী তেকে ব্যক্তিত্বকে দূরীভূত করে দেয়া এবং তার মধ্যে ‘যান্ত্রিকতা’ সৃষ্টি করা প্রকৃতপক্ষে তার মর্যাদা ও মূল্য নষ্ট করে দেয়া।

তা ছাড়াও যদি কোন কেন্দ্রী স্থান থেকে কোন ব্যক্তি রেডিও অথবা গ্রামোফোনের সাহায্যে ইমামতি ও খোতবা দেয়ার কাজ করে এবং স্থানীয় ইমমতি খতম করে দেয়, তাহলে এটা এমন একটা কৃত্রিম সমরূপতা (Uniformity) হবে যা ইসলামের গণতান্ত্রিক প্রাণশক্তিকে (Spirit) বিনষ্ট করে দেবে এবং একনায়কত্বের পথ প্রশস্ত করবে। এ জিনিস ঐসব ব্যবস্থাপনার মেযাজ-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রাখে, যার দ্বারা লোককে একই নেতার সার্বিকভাবে অনুগত বানাবার নীতি অবলম্বন করা হয়। যেমন, ফ্যাসিজম এবং কমিউনিজম। কিন্তু ইসলাম একজন কেন্দ্রীয় ইমাম অথবা আমীরে কর্তৃত্বকে এতোটা সর্বব্যাপী বানাতে চায় না যাতে করে স্থানীয় লোকের কর্তৃত্ব একেবারে তার হাতে চলে যায় এবং স্বয়ং তাদের মধ্যে নিজের স্বার্থ সম্পর্কে চিন্তা করার, নিজেদের বিষয়াদি বুঝবার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যোগ্যতার বিকাশ হতে পারবে না। নবী (স)-এর যুগ ছিল সর্বোত্তম যুগ (খায়রুল করুন)। তখন ইমাম নিছক পুজারীর ভূমিকা পালন করতেন না যার কাজ শুধু কিছু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা। বরঞ্চ তাঁরা স্থানীয় নেতা হিসেবে নিয়োজিত হতেন। তাঁদের কাজ ছিল তা’লীম ও তাযকিয়া এবং সমাজ ও তামাদ্দুনের সংস্কার-সংশোধন করা। স্থানীয় জামায়াতগুলো এ উদ্দেশ্যে তৈরী করতে হতো যে বড় ও কেন্দ্রী জামায়াতের কল্যাণ ও  উন্নয়নে নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী তারা অংশগ্রহণ করবে। এ ধরনের মহান ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য রেডিও অথবা গ্রামোফোনের দ্বারা কি করে পূর্ণ হতে পারে? যন্ত্র মানুষের বিকল্প কিছুতেই হতে পারে না। বরঞ্চ সহায়ক হতে পারে, এসব কারণে আমি মনে করি যান্ত্রিক ইমামতি’ ইসলামী প্রাণশক্তির একেবারে পরিপন্থী। -(রাসালে ও মাসায়েল, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৫৬-আবুল আ’লা মওদূদী)।]

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী