আসান ফেকাহ – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সিজদায়ে সহুর বয়ান

সহু অর্থ ভুলে যাওয়া। ভুলে নামাযের মধ্যে কিছু বেশী-কম হয়ে গেলে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয় তা সংশোধনের জন্যে নামাযের শেষ বৈঠকে দু’টি সিজদা করা ওয়াজেব হয় তাকে বলে সিজদায়ে সহু।

সহু সিজদার নিয়ম

নামাযের শেষ বৈঠকে ‘আত্তাহিয়্যাতেরৎ পর ডান দিকে সালাম ফিরাতে হবে। তারপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সিজদায়ে যেতে হবে। নামাযের অন্যন্য সিজদার নিয়মে দু’সিজদা করে আত্তাহিয়্যাত, দরুদ, প্রভৃতি পড়ে দু’দিকে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করতে হবে।যেসব অবস্থায় সিজদা সহু ওয়াজেব হয়

১. ভুলে নামযের কোন ওয়াজেব ছুটে গেলে, যেমন সূরা ফাতেহা পড়া ভুলে যাওয়া অথবা সূরা ফাতেহার পর কোন সূরা পড়তে ভুলে যাওয়া।

২. কোন ওয়াজেব আদায় করতে বিলম্ব হলে, ভুলে হোক কিংবা কিছু চিন্তা করতে গিয়ে হোক যেমন কোন লোক সূরা ফাতেহা পড়ার পর চুপ করে থাকলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবর কোন সূরা পড়লো।

৩. কোন ফরয আদায় করতে বিলম্ব হলে অথব ফরয আগে করা হলো যেমন, কেরায়াত করার পর রুকু করতে বিলম্ব হলো [এখানে বিলম্বের অর্থ এই যে, এ সময়ের মধ্যে এক সিজদা বা রুকু করা যায়।] অথবা রুকুর আগেই সিজদা করা।

৪. কোন ফরয বার বার আদায় করা। যেমন দু’রুকুর পর পর করা হলো।

৫. কোন ওয়অজেবের রূপ পরিবর্তন করা হলো। যেমন সিররী নামাযে জোরে কেরায়াত করা অথবা জাহরী নামাযে আস্তে কেরায়াত করা।

সহু সিজদা মাসয়ালা

১. নামাযের ফরযের কোনটি যদি স্বেচ্ছায় ছুটে যায় অথবা ভুলে, তাহলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে কোন ওয়াজেব ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলে নামায নষ্ট হবে। সিজদা সহু করলেও নামায সহীহ হবে না। নামায পুনরায় পড়তে হবে।

২. এক বা একাধিক ওয়াজেব ছুটে গেলে একই বার দু’ সিজদা করলেই যথেষ্ট হবে। এমন কি নামাযের সকল ওয়াজেব ছুটে গেলেও দু’ সিজদা যথেষ্ট, দু’য়ের বেশী সহু সিজদা করা ঠিক নয়।

৩. যদি কেউ ভুলে দাঁড়ানো অবস্থায় সূরা ফাতেহার আগে আত্তাহিয়্যাত পড়ে তাহলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে না। কারণ ফাতেহার আগে আল্লাহর হামদ ও সানা পড়া হয় এবং আত্তাহিয়্যাতের মধ্যে হামদ ও সানা আছে। তবে যদি কেরায়াতের পর অথা দ্বিতীয় রাকয়অতে কেরায়াতের এগ বা পরে আত্তাহিয়্যাত পড়লে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে।

৪. ভুলৈ কোন ‘কাওমা’ বাদ পড়লে অথবা দু’ সিজদার মাঝখানে জালসা না হলে সহু সিজদা করা জরুরী হয়।

৫. যদি কেউ কা’দা উলা করতে ভুলে যায় এবং বসার পরিবর্তে একেবারে উঠে দাঁড়ায়, তারপর মনে পড়লে যেন বসে না পড়ে, বরঞ্চ নামায পুরা করে নিয়ম মুতাবেক সহু সিজদা করবে। আর যদি পুরাপুরি না দাঁড়ায়, সিজদার নিকটে থাকে তাহলে বসে পড়বে। তখন সহু সিজদার দরকার হবে না।

৬. যদি কেউ দু’ বা চার রাকয়াত বিশিষ্ট ফরয নামাযে কা’দায়ে আখীরা***১ ভুলে গেল এবং বসার পরবর্তে উঠে দাঁড়িয়ে গেল এখন যদি সিজদা করার আগে তার মনে হয় তাহলে বসেই নামায পুরা করে সহু সিজদা করবে। তাতেই ফরয নামায দুরস্ত হবে। যদি সিজদা করার পর মনে হয় যে, ‘কা’দা’ আখীরা করেনি, তাহলে আর বসবে না বরঞ্চ এক রাকয়অত মিলিয়ে চার রাকয়াত বা দু’রাকয়অত পুরা করবে। এ অবস্থায় সিজদা সহুর দরকার নেই। এ রাকায়াতগুলা নফল হয়ে যাবে। ফরয নামায পুনরায় আদায় করতে হবে। মাগরেবের ফরযে যদি ভুল হয়ে যায় তাহলে পুনরায়

****১ ফেকাহর পরিভাষাগুলো দ্রষ্টব্য-বইয়ের প্রথমে দেয়া আছে।

পঞ্চম রাকায়াত পড়বে না। চতুর্থ রাকয়াতের বসে নামায পুর করবে। কারণ নফল নামায বেজোড় হয় না। নবী (স) বলেন-

নফল নামাযের রাকয়অত দুই দুই করে- (ইলমুল ফেকাহ)।

৭., সূরা ফাতেহা পড়া ভুলে গেলে অথবা দোয়া কুনুত ভুলে গেলে অথবা আত্তাহিয়্যাত পড়া ভুলে গেল অথবা ঈদুল ফেতের-ঈদুল আযহার অতিরিক্ত তাকবীল ভুলে গেলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে।

৮. মাগরেব, এশা বা ফজরের জাহরী নামাযগুলোতে ইমাম যদি ভুলে কেরায়াত আস্তে পড়ে তাহলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে।

৯. ইমামের যদি কোন ওয়াজেব ছুটে যায় এবং সহু সিজদা ওয়াজেব হয় তাহলে মুক্তাদীকেও সহু সিজাদ করতে হবে। আর  ‍মুক্তাদীর যদি কোন ওয়াজেব ছুটে যায় তাহলে না ‍না মুক্তাদীর সহু সিজদা ওয়াজেব হবে আর না ইমামের।

১০. সূরা ফাতেহার পর যদি কেউ সূরা মিলাতে ভুলে যায় অথবা সূরা প্রথমে পড়লো পরে সূরা ফাতেহা, তাহলে সূলা ফাতেহার পর অন্য সূলা পড়বে এবং শেষ কা’দার পর অবশ্যই সহু সিজাদ করবে।

১১. যদি ফরয নামাযের প্রথম দু’রাকায়াতে অথবা এক রাকয়াতে কেউ সূরা মিলাতে ভুলে যায়, তাহলে পরের রাকয়াতগুলোতে সূরা মিলিয়ে সহু সিজদা করে নামায পুরা করবে।

১২. সুন্নাত অথবা নফল নামাযের মধ্যে সূলা মিলাতে কেউ যদি ভুলে যায় তাহলে সিজদা সহু অনিবার্য হবে।

১৩. যদি চার রাকয়অত ফরয নামায কেউ শেষ রাকয়অতে এত সময় পর্যন্ত বসলো যতোক্ষণে ‘আত্তাহিয়্যাত’ পড়া যায়। তারপর তার সন্দেহ হলো যে, এটা তার কাদায়ে উলা এবং সালাম ফেরার পরিবর্তে পঞ্চম রাকায়াতের জন্যে উঠে দাঁড়ালো। এখন সিজদা করার আগে তার মনে হয়, তাহলে বসে নামায পুরা করবে এবং নিয়ম মাফিক সহু সিজদা করবে এবং সালাম ফিরাবে। আর যদি পঞ্চম রাকয়াতের সিজদা করে ফেলে তাহলে ষষ্ঠ রাকয়াত মিলিয়ে নেবে এবং সহু সিজদা করে নামায পুরা করবে। এ অবস্থায় তার ফরয নামায সহীহ হবে অতিরিক্ত ‍দু’রাকায়াত নফল গণ্য হবে।

১৪. চার রাকায়াত ফরয নামাযের শেষ দু’রাকয়াতে কোন একাকী লোক বা ইমাম যদি সূরা ফাতেহা পড়া ভুলে যায়, তাহলে সিজদা সহু ওয়াজেব হবে না। তবে যদি সুন্নাত ও নফল নামাযে ভুলে যায় তাহলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে। এ জন্যে যে, ফরয নামাযের শেষের রাকয়াতগুলোতে ফাতেহা পড়া ওয়াজেব নয় । সুন্নতা নফলে প্রত্যেক রাকয়াতে সূরা ফাতেহা ওয়াজেব।

১৫. যদি কেউ ভুলে এক রাকয়াতে দু’রুকু করে অথবা এক রাকয়াতে তিন সিজদা করে অথবা সূরা ফাতেহা দু’বার পড়ে তাহলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে। কারণ সূরা ফাতেহা একবার পড়া ওয়াজেব।

১৬. যদি ‘কাদায়ে উলাতে’ আত্তাহিয়্যাতের পরে কেউ দরুদ পড়া শুরু করে এবং ‘আল্লাহুম্ম সালে আলা মুহাম্মদ’ এর পরিমাণে পড়ে ফেলে অথবা এতটা সময় চুপচাপ বসে থাকে, তাহলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে।

১৭. যদি কোন মসবুক তার অবশিষ্ট নামায পুরা করতে গিয়ে কোন ভুল করে তাহলে শেষ বৈঠকে তার সহু সিজদা করা ওয়াজেব হবে।

১৮. কেউ যোহর অথবা আসরের ফরয নামাযের দু’রাকায়াত পড়লো, কিন্তু মনে করলো যে চার রাকায়াত পড়েছে এবঙ তরপর সালাম ফিরালো। তারপর মনে হলো যে, দু’রাকয়াত পড়েছে। তাহলে বাকী দু’রাকায়অত পড়ে নামায পুরা করবে এবং সহু সিজদা করবে।

১৯. কারো নামাযে সন্দেহ হলো যে, তিন রাকায়াত পড়লো, না চার রাকায়াত তাহলে এ ধরনের সন্দেহ তার যদি এই প্রথম বার ঘটনাক্রমে হয়ে থাকে এবং সাধারণত এ ধরনের সন্দেহ হয় না, তাহলে সে পুনরায় নামায পড়বে। কিন্তু যদি তার প্রায়ই এরূপ সন্দেহ হয় তাহলে তার প্রবল ধারণা যেদিকে হবে সেদিকে আমল করবে। আর কোন দিকেই যদি ধারা প্রবল না হয় তাহলে কম রাকয়াতই ধরবে। যেমন কেউ যোহর নামাযে সন্দেহ হলো যে, তিন রাকায়অত পড়লো না চার রাকায়াত এবং কোন দিকেই তার ধারণা সুস্পষ্ট হচ্ছে না, তাহলে এমন অবস্থায় তিন রাকায়াতই মনে করে বাকী এক রাকয়াত পুরা করবে। এবং সহু সিজদা দিবে।

২০. নামাযের সুন্নাত অথবা মুস্তাহাব ছুটে গেলে সহু সিজদা দরকার হয় না। যেমন নামাযের শুরুতে সানা পড়তে কেউ ভুলে গেল, অথবা রুকু এবং সিজদার তসবিহ পড়তে ভুলে গেল, অথবা রুকুতে যেতে এবং উঠতে দোয়া ভুলে গেল অথবা দরুদ শরীফ এবং তার পরের দোয়া ভুলে গেল, তাহলে সহু সিজদা ওয়াজেব হবে না।

২১.নামাযে যদি এমন ভুল হয় যার জন্যে সহু সিজদা ওয়াজেব কিন্তু সহু সিজদা না করেই নাময শেষ করা হলো। তারপর মনে হলো যে ভুলে সহু সিজদা দেয়া হয়নি। যদি মুখ কেবলার দিকে থাকে এবং কারো সাথে কথা বলা না হয় তাহলে সংগে সংগেই সহু সিজদা করে আত্তাহিয়্যাত ও দরুদের পর সালাম ফিরাবে।

২২. কেউ এক রাকায়াতে ভুলে এক সিজদা করলো। এখন যদি কা’দায়ে আখীরায় আত্তাহিয়্যাত পড়ার আগে প্রথম রাকয়াতে অথবা দ্বিতীয় রাকয়অতে অথবা যখনই মনে হবে সিজদা করতে হবে এবং নিয়ম মাফিক সহু সিজদা দিতে হবে। যদি ‘আত্তাহিয়্যাত’ পড়ার পর সিজদার কথা মনে হয় তাহলে সিজদা আদায় করে পুনর্বার ‘আত্তাহিয়্যাত’ পড়বে এবং সহু সিজদা করে কা’দা অনুযায়ী নামায পুরা করতে হবে।

২৩. সফরের মধ্যে কসর করা ওয়াজেব হবে। কিন্তু কেউ যদি ভুলে কসর না করে পুরা চার রাকায়অত পড়লো, তাহলে এ অবস্থায় শেষ রাকয়াতে নিয়ম মুতাবিক সহু সিজদা করা ওয়াজেব হবে। এ অবস্থায় এ নামায এভাবেই সহীহ হবে যে, প্রথম দু’রাকায়াত ফরয এবংশেষ দুরাকায়াত নফল হবে।

 

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী