আসান ফেকাহ – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কসর নামাযের বয়ান

শরীয়ত মুসাফিরকে সফরে নামায সংক্ষিপ্ত করার সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ যেসব নামায চার রাকায়াতের তা দু’ রাকয়াত পড়বে। আল্লাহ বলেন- (আরবী*****************)

-যখন তোমরা যমীনে ভ্রমণ করতে বেরুবে, তখন নামায সংক্ষিপত্ করলে কোন দোষ নেই- (নেসা: ১০১)।

নবীর এরশাদ হচ্ছে-

এ একটি সাদকা যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন, এ সদকা তোমরা গ্রহণ কর- (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী প্রভৃতি)।

কসর নামাযের হুকৃম

আপন বস্তি বা জনপদ থেকে বের হওয়ার পর ‍মুসাফিরের জন্যে নামায কসর পড়া ওয়াজেব। পুরা নামায পড়লে গুনাহগার হবে –(এলমুল ফেকাহ, ২য় খণ্ড পৃ. ১৩০, দুররে মুখতার, প্রবৃতি)।

হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা ) বলেন- আমি নবী (স), আবু বরক (রা), ওমর (রা) এবং ওসমান (রা) এর সাথে সফল করেছি। আমি কখনো দেখিনি যে তাঁরা দু’রাকায়াতের বেশী ফরয নামায পড়েছেন- (বুখারী, মুসলিম)। কসর শুধু ঐসব নামাযে যা চার রাকায়াত ফরয। যেমন যোহর, আসর ও এশা। যার মধ্যে দুই বা তিন রাকায়াত ফরয, তাতে কোন কম করা যাবে না। ফজরের দু এবং মাগরেবে তিন রাকায়াতই পড়তে হবে।

সফরে সুন্নাত এবং নফলের হুকুম

ফজর নামাযের সুন্নাত ত্যাগ করা ঠিক নয়। মাগরেবের সুন্নাতও পড়া উচিত, বাকী ওয়াক্তের সুন্নাতগুলো সম্পর্কে না পড়ার এখতিয়ার আছে। তবে  সফর চলতে থাকলে শুধু ফরয পড়া ভালো এবং সুন্নাত ছেড়ে দেবে। সফরের মধ্যে কোথাও কোথাও অবস্থান করলে পড়ে নেবে। বেতর পুরা পড়তে  হবে- কারণ তা ওয়াজেব। সুন্নাত, নফল ও বেতরে নামাযের কসর নেই। বাড়ীতে যত রাকয়াত, সফরেও তত রাকয়াত পড়তে হবে।

কসরের দুরত্ব

যদি কেউ তার বাড়ী তেকে এমন স্থানে সফর করার জন্যে বের হয় যা তার বাড়ী বা বস্তি থেকেজ তিন দিনের দূরত্ব হয়, তাহলে তার কসর করা ওয়াজেব। তিন দিনের দুরত্ব আনুমানিক ছত্রিশ মাইল। যদি কেউ মধ্যম গতিতে দৈনিক পায়ে হেটে চলে তাহলে ছত্রিশ মাইলের বেশী যেতে পারবে না। যে জন্যে যদি কেউ অন্তত ছত্রিশ মােইল সফর করার উদ্দে্শ্যে বাড়ী থেকে বের হয় তা সে পায়ে হেঁটে তিন দিনে সেখানে পৌছুক অথবা দ্রুতগাম যানবাহনে কয়েক ঘন্টায়-পৌঁছুক সকল অবস্থায় তাকে নামায কসর পড়তে হবে। [আল্লামা মওদূদী (র) –এর বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার দ্বারা এ সত্যের প্রতি আলোকপাত করা হয় যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে সফর কাকে বলে। কোন এক ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন-

ইংরেজী মাইলের হিসাব কত দীর্ঘ সফরে কসর নামায ওয়াজেব হবে? তার উত্তরে আল্লামা মওদীদী (র) বলেন, এ বিষয়ে ফকীহগণ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

কসর নামাযের জন্যে কমপক্ষে নয় মাইল এবং উর্ধে ৪৮ মাইল সফরের নেসাব নির্ণয় করা হয়েছে। মতভেদের কারণ এ িযে, নবী পাক (স)-এর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট উক্তি বর্ণিত নেই সুস্পষ্ট নস (***) বা উক্তির অবর্তমানে যেসব দলীলের ভিত্তিতে এন্তেবাদ করা হয়েছে অর্থাৎ শরয়ী সিদ্ধান্ত করা হয়েছে তার মধ্যে মতান্তরের অবকাশ আছ্ এটাই সঠিক একটা বিশেষ বিন্দু অতিক্রম করলেই সফরের হুকুম লাগাতে হবে, কসরের জন্যে এ ধরনের দূরত্ব নির্ধারণ শরীয়ত প্রণেতার অভিলাষ নয়। শরীয়ত প্রণেতা সফর বলতে কি বুঝায় তা সাধারণভাবে প্রচলিত রীতিনীতির উপর ছেড়ে দিয়েছেন এবং প্রত্যেক ব্যক্তি এটা সহজে বুঝতে পারে যে, কখন সে সফরে এবং কখন নয়। এটা ঠিক যে, যখন আমরা শহর থেকে গ্রামের দিকে আনন্দ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি অথবা গ্রাম তেকে শহরে বেচা কেনার জন্যে যাই, তখন আমাদের মধ্যে মুসাফির হওয়া অনুভূতি কখনো হয় না। পক্ষান্তরে প্রকৃতপক্ষেই যখন আমাদের সফর করতে হয় তখন স্বয়ং সফরের অবস্থা অনুভব করি। এ অনুভূতি অনুযায়ী কসর অথবা পুরা নামায পড়া যেতে পারে। খুব ভালো করে বুঝে নিতে হবে যে, শরীয়তের ব্যাপারে সে ব্যক্তি মনের ফতোয়াই নির্ভরযোগ্য যে শরীয়ত মেনে চলার ইচ্ছা করে, বাহানা খুঁজে বেড়ায় না- (রাসায়েল ও মাসায়েল, ১ম খন্ড পৃ. ১৬৭)।]

কসর শুরু করার স্থান

সফরে রওয়ানা হওয়ার পর মুসাফির যতোক্ষণ তার অধিবাসের ভিতরে থাক,ততোক্ষণ পুনা নামায পড়বে। অধিবাস বা বস্তির বাইরে চলে গেলে কসর পড়বে। বস্তির স্টেশন যদি তার বাসস্থানের ভেতর হয় তাহলে কসর পড়বে না, পুরা নামায পড়বে। আর যদি বাইরে হয় তাহলে কস পড়বে।

কসরের মুদ্দৎ

মুসাফির যতোদিন আর ‘ওয়াতনে আসলীতে’ (পরিভাসা দেখুন) ফিরে না আসবে ততোদিন কসর পড়তে থাকবে। ফরকালে কোথা যদি পনেরো দিন বা তার বেশী সময় অবস্থানের ইচ্ছা করে তাহলে সে স্থান তার ওয়াতনে একামত’ (পরিভাষা দেখুন) বলে বিবেচিত হবে। ‘ওয়াতনে একামতে’ পুরা নামায পড়তে হবে। যদিও পনেরো দিন থাকা নিয়ত করার পর তার কম সময় সেখানে অবস্থঅন করে। আর কোনো স্থানে পনেরো দিনের কম থাকার ইচ্ছঅ কিন্তু কোন কারণে সেখানে বার বার আটকা পড়ছে অর্থাৎ যাবে যাবে করেও যাওয়া হচ্ছে না তাহলে কসরই পড়বে। এভাবে অনিশ্চিয়তার মধ্যে যদি কয়েক মাস অতীত হয় তবুও সে স্থান ‘ওয়াতনে একামত’ বলে বিবেচিত হব না এবং সেখানে কসরই পড়তে হবে।

কসরের বিভিন্ন মাসয়ালা

১. যদি সফরকালে ভুলে কেউ চার রাকয়াত নামায পড়ে ফেলে এমনভাবে যে, দ্বিতীয় রাকয়াতে বসে ‘আত্তাহিয়্যাত’ পড়েছে, তাহসে সহু সিজদা করে নেবে। এ অবস্থায় দু’রাকয়াত ফরয এবং দু’রাকয়াত নফল হবে। এ নাময দুরস্ত হবে। কিন্তু যদি দ্বিতীয় রাকয়াতে বসে ‘আত্তাহিয়্যাত’ না পড়ে থাকে তাহলে এ চার রাকয়াত নফল হবে। করস নামায পুনরায় আদায় করতে হবে।

২. সফলকালে যদি কযেক স্থানে অবস্থান করার ইচ্ছা থাকে- কোথাও পাঁচ দিন, কোথাও দশদিন, কোথাও বার দিন, কোথাও পনের দিন থাকার ইচ্ছা নেই- তাহলে পুরা সফরে কসর পড়তে হবে।

৩. বিয়ের পর কোন মেয়ে যদি স্থায়ীভাবে শশুর বাড়ী থাকা শুরু করে, তাহলে তার ‘ওয়াতনে আসলী’ তখন ঐ স্থান হবে যেখানে সে তার স্বামীর সাথে থাকবে। এখন যদি সে এখান থেকে বাপের বাড়ী বেড়াতে যায় এবং শ্বশুর বাড়ী থেকে বাপের বাড়ির দূরত্ব যদি ৩৬ মাইল হয় তাহলে বাপের বাড়ীতে কসর পড়তে হবে। তবে হ্যাঁ যদি শ্বশুড় বাড়ী কয়েকদিনের জন্যে যায় এবং বাপের বাড়ী স্থায়ীভাবে থাকার ইচ্ছা হয় তাহলে বিয়ের আগে যেটা ‘ওয়াতনে আসলী’ ছিল, সেটাই তার ওয়াতনে আসলী থাকবে।

৪. কোন মহিলা যদি তার স্বামীর সাথে অথবা কোন কর্মচারী তার মালিকের সাথে অথবা কোন পুত্র তার পিতার সাথে সফর করে, অর্থাৎ সফরকারী যদি এন কোন ব্যক্তি হয় যে, অপরের অধীন এবং অনুগত, তাহলে এ অধীন ব্যক্তির ইচ্ছা বা নিয়ত মূল্যহীন হবে। এ অবস্থায় সে মহিলা, অথবা কর্মচারী অথবা পুত্র যদি কোথাও পনেরো দিন থাকার নিয়তও করে তথাপি সে মুকীম হতে পারবে না, যদি তার স্বামী অথবা মুনিব অথবা পিতা ১৫ দিনের নিয়ত না করে।

৫. মুকীম মুসাফিরের পিছনে নামায পড়তে পারে। ‍মসাফির ইমামের উচিত হবে ঘোষণা করে দেয়া যাতে করে ইমাম দু’রাকয়াত পড়ে সালাম ফিরালে মুকীম ‍মুক্তাদী যেন উঠে বাকী দু’রাকয়াত পুরা করতে পারে।

৬. মুসাফিরের জন্যে মুকীম ইমামের পেছনে নাময পড়া দুরস্ত আছে। এ অবস্থায় ইমামের অনুসরণে চার রাকয়াত ফরযই পড়বে, কসর করবে না।

৭. যদি কেউ কোথাও অবস্থান সম্পর্কে কিছু ঠিক করেনি অথবা ১৫ দিনের কম নিয়ত করেছে কিন্তু নামাযের মধ্যে ১৫ দিনের বেশী থাকার নিয়ত করলো তাহলে সে ব্যক্তি নামায পুরা পড়বে, কসর করবে না।

৮. সফরে যেসব নামায কাযা হবে বাড়ী ফেরার পর তা কসর কাযা পড়বে। ঠিক তেমনি বাড়ী থাকা কালীন কিছু নামায কাযা হলো এবং তঠাৎ সফরে যেতে হলো, তাহলে সফরে কাযা নামায পুরাই পড়তে হবে কসর  পড়বে না।

সফরে একত্রে দু’নামায

হজ্জের সফরের মধ্যে ‘জময়ো বাইনাস সালাতাইন’ অর্থাৎ দু’ওয়াক্ত নামায একত্রে পড়া মসনূন। ৯ই যিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে যোহর ও আসরের নামায যোহরের ওয়াক্তে একত্রে পড়া হয়। আযান একবার দেয়া হয় এবং একামত উভয় নামাযের জন্যে পৃথক পৃথক দেয়া হয় যেহেতু আসরের সময় নির্দিষ্ট সময়ের আগে পড়া হয় সে জন্যে মানুষকে জানিয়ে দেয়ার জন্যে একামত পৃথকভাবে দেয়া হয়।

তারপর সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ‍মুযদালফার দিকে হাজীগণ রওয়ানা হন। এবং মুযদালাফায় পৌঁছে মাগরেব এবং এশার নামায একত্রে পড়েন। কেউ যদি মুযদালফার পথে মাগরেব পড়েন তাহলে তা দুরস্ত হবে না তা পুনরায় পড়তে হবে।

হজ্জের সফর ব্যতীত অন্য কোন সফরে একত্রে দু’নামায জায়েয নয়। অবশ্য ‘জময়ে’ সূরী’ (পরিভাষা দ্রঃ) জায়েয। জময়ে সূরী অর্থ এই যে, প্রথম নামায বিলম্ব করে শেষ ওয়াক্তে পড়া এবং দ্বিতীয় নামায প্রথম ওয়াক্তে পড়া। এভাবে প্রকাশ্যত এটাই মনে হবেযে, দু’নামায একত্রে পড়া হচ্ছে। কিনন্তু প্রকৃতপক্ষে দু’টি নামায তাদের আপন আপন ওয়াক্তেই পড়া হচ্ছে। [আহলে হাদীসের নিকট প্রত্যেক সফরে একত্রে দু’নামায জায়েয। শুধু জময়ে সূলীই জায়েয নয়, বরঞ্চ ‘জময়ে’ হাকীকিও’। জময়ে হাকীকির অর্থ এই যে, দু’ওয়াক্তের নামায একসাথে একই ওয়াক্তে পড়া। তার দু’টি উপায়।:-

** এক এই যে, দ্বিতীয় নামাযের সময় হওয়ার পূর্বেই প্রথম নামাযের ওয়াক্তে এক সাথে পড়ে নেয়া। যেমন বেলা গড়ার পর যোহরে নামাযর সাথে আসরের নামায পড়া। একে জময়ে’ তাকদমি বলে।

** দ্বিতীয় এই যে, প্রথম নামায বিলম্ব করে দ্বিতীয় নামাযের ওয়াক্তে দুই নামায একত্রে পড়া। যেমন, যোহরের নামা বিলম্ব করে আসরের ওয়াক্তে যোহর এবং আসর নামা একত্রে পড়া। একে জময়ে’ তা’খীর বলে। আহলে হাদীরে মতে জময়ে’ সূরী, জময়ে তাকদীম এবং জময়ে তা’খীর তিনটিই জায়েয। প্রয়োজন অনুসারে মুসাফিরের যাতে সুবিধা হয়, তার উপর আমল করবে। সফর চলা কালেও তা করা যেতে পারে এবং কোথাও অবস্থানকালেও করা যেতে পারে। এ সবই সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত আছে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী (স) সফরকালে ঘরে থাকতেই যদি বেলা গড়ে যেতো, তাহলে প্রথমে তিনি যোহর এবং আসরের নামায একত্রে পড়ে তারপর রওয়ানা হতেন। আর যদি ঘরে থাকতে বেলা না গড়াতো তাহলে তিনি যাত্রা শুরু করতেন এবং যখন আসরে ওয়াক্ত হতো তখন যোহর এবং আসর একত্রে পড়তেন। ঠিক এমনি রওয়ানা হওয়ার পূর্বে যদি ঘরে থাকতেই বেলা ডুবে যেতো তাহলে তিনি মাগরেব এবং এশা একত্রে পড়ে রওয়ানা হতেন। আর যদি ঘরে থাকতে বেলা না ডুবতো তাহলে তিনি বেরিয়ে পড়তেন এবং যখন এশার সময় হতো তখন সওয়ারী থেকে নেমে মাগরেব এবং এশা একত্রে পড়তেন। -(মুসনাদে আহমদ)।

হযরত মাআয বিন জাবাল (রা) তবুকের একটি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

নবী (স) তবুক অভিযানকালে সূর্য গড়ার পূর্বে যাত্রা শুরু করতে চাইলে যোহর নামায বিলম্বিত করে আসরের সাথে একত্রে পড়তেন। আর যদি বেলা গড়ার পর রওয়ান হতেন তাহলে যোহরের ওয়াক্তে যোহর এবং আসরে নামায একত্রে পড়তেন এবং তারপর যাত্রা শুরু করতেন। সূর্য ডোবার আগে রওয়ানা হলে মাগরেব নামায বিলম্বিত করে এশার নামাযের সাথে পড়তেন। বেলা ডোবার পরে রওয়ানা হলে এশার নামায মাগরেব নামাযের সাথে মিলিয়ে পড়তেন। (তিরমিযী)।]

 

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী