আসান ফেকাহ – ২য় খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

যেসব ওজরের কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে

যেসব ওজরের কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে তা হলো দশটি। তার বিবরণ নিম্নরূপ:

(১) সফর, (২) রোগ (৩) গর্ভধারণ (৪) স্তন্যদান (৫) ক্ষুধা তৃষ্ণার প্রাবল্য (৬) বার্ধক্য ও দুর্বলতা (৭) জীবন নাশের ভয় (৮) জেহাদ (৯) বেহুঁশ হওয়া (১০) মম্তিষ্ক বিকৃতি।

১। সফর

শরীয়াত তার যাবতীয় হুকুমের মধ্যে বান্দাহর সহজসাধ্যতার প্রতি লক্ষ্য রেখেছে। কোনো ব্যাপারেও তাকে অযথা কষ্ট ও সংকীর্ণতার সম্মুখীন করা হয়নি। বস্তুত কুরআন পাকে রোযা ফরয হওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করতে গিয়ে মুসাফির ও রোগীর অক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে এবং রোযা না রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

*******আরবী*********

অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে তার জন্যে অপরিহার্য যে, সে যেন রোযা রাখে। আর যে ব্যক্তি রোগী অথবা সফরে আছে, সে অন্যান্য দিনে রোযা রেখে তার হিসেব পুরো করবে। (সূরা আল বাকারাঃ ১৮৫)

১. সফর যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, এবং তার মধ্যে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থাক অথবা দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হোক, সকল অবস্থায় মুসাফিরের রোযা না রাখার অনুমতি আছে। অবশ্যই যে সফরে কোনো অসুবিধা নেই, তাতে রোযা রাখাই মুস্তাহাব যাতে করে রমযানের ফযিলত ও বরকত লাভ করা যায়। কিন্তু পেরেশানি ও অসুবিধা হলে রোযা না রাখা ভালো।

২. যদি রোযার নিয়ত করার পর অথবা রোযা শুরু হয়ে যাওয়ার পর কেউ সফরে রওয়ানা হয়। তাহলে সেদিনের রোযা কাযা জরুরী। কিন্তু রোযা ভেঙে দিলে কাফফারা দিতে হবে না।

৩. যদি কোনো মুসাফির দুপুরের আগে কোথাও মুকীম হয়ে যায় এবং ঐ সময় পর্যন্ত রোযা নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ সে করেনি, তাহলে তার জন্যেও সেদিন রোযা রাখা জরুরী, কিন্তু রোযা নষ্ট করলে কাফফারা দিতে হবে না।

৪. যদি কোনো মুসাফির কোনো স্থানে মুকীম হওয়ার ইরাদা করে, ১৫দিনের কমই ইরাদা করুক না কেন, তথাপি তার উচিত যে, সে রোযা রাখে, এ দিনগুলোতে রোযা না রাখা মাকরূহ। আর যদি ১৫ দিন থাকার ইরাদা করে তাহরে তো রোযা না রাখা জায়েয নয়।

২। রোগ

১.যদি রোযা রাখার কারণে কোনো রোগ সৃষ্টির আশংকা হয় অথবা এ ধারণা হয় যে, ওষুধ না পাওয়ার কারণে অথবা আহার না পাওয়ার কারণে রোগ বেড়ে যাবে, অথবা যদি এ ধারণা হয় যে, স্বাস্থ্য বিলম্বে লাভ হবে তাহলে এসব অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি আছে। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, এমন ধারণা করার সংগত কারণ থাকতে হবে। যেমন ধরুন, কোনো নেক ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক পরামর্শ দেয় অথবা নিজের বার বার অভিজ্ঞতা হয়েছে অথবা প্রবল সম্ভাবনা থাকে। নিছক অমূলক ধারণার ভিত্তিতে রোযা না রাখা জায়েয নয়।

২. যদি কারো নিজের নিছক এ ধারণা হয় যে সম্ভবত রোযা রাখলে রোগ সৃষ্টি হবে অথবা বেড়ে যাবে যার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, অথবা কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তার বা হেকীমের পরামর্শ নেয়া হয়নি এবং রোযা রাখা হলো না, তাহলে গোনাহগার হবে এবং তার কাফফারাও দিতে হবে।

৩. কোনো বেদীন চিকিৎসক, যে শরীয়াতের মর্যাদা ও গুরুত্ব অনুভব করে না, তার পরামর্শ অনুযায়ী চলাও ঠিক নয়।

৩। গর্ভ

১. যদি কোনো স্ত্রীলোকের প্রবল ধারণা হয় যে, রোযা রাখলে তার পেটের সন্তানের ক্ষতি হবে অথবা স্বয়ং তার ক্ষতি হবে, তাহলে তার জন্যে রোযা না রাখার অনুমতি আছে।

২. যদি রোযার নিয়ত করার পর কোনো মেয়ে মানুষ জানতে পারে যে, তার গর্ভসঞ্চার হয়েছে এবং তার সুস্পষ্ট ধারণা হয় যে, রোযা রাখলে তার ক্ষতি হবে তাহলে তার জন্যে এ অনুমতি আছে যে, সে রোযা ভেঙে ফেলবে। তারপর কাযা করবে। তার কাফফারা দিতে হবে না।

৪। স্তন্যদান

১. রোযা রেখে স্তন্যদান যদি প্রবল ধারণা হয় যে, প্রসূতির ভয়ানক ক্ষতি হবে, যেমন দুধ শুকিয়ে যাবে এবং বাচ্চা ক্ষুধায় ছটফট করবে অথবা তার জীবনেই আশংকা হয়, তাহলে তার রোযা না রাখার অনুমতি আছে।

২. যদি পারিশ্রমিক দিয়ে দুধ খাওয়ানো যেতে পারে এবং বাচ্চাও যদি অন্য কারো দুধ খায়, তাহলে রোযা না রাখার দুরস্ত নয়, আর যদি বাচ্চা অন্য কারো দুধ খেতেই চায় না, তাহলে রোযা না রাখার জায়েয আছে।

৩. পারিশ্রমিক নিয়ে যে দুধ খাওয়ায়, তারও যদি এ প্রবল ধারণা হয় যে, রোযা রাখার কারণে তার বাচ্চা অথবা স্বয়ং তার ক্ষতি হবে, তাহলে সে রোযা ছেড়ে দিতে পারে।

৪. কোনো মেয়ে মানুষ ঠিক রমযানের দিনেই দুধ খাওয়ানোর কাজ শুরু করলো। ঐ দিন যদি সে রোযার নিয়তও করে থাকে তবুও তার রোযা না রাখা জায়েজ। রোযা ভাঙ্গার জন্য কাযা করতে হবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না।

৫। ক্ষুধা-তৃষ্ণার তীব্রতা

কোনো ব্যক্তি রোগী তো নয়, কিন্তু রোগের কারণে এতোটা দুর্বল হয়েছে যে, রোযা রাখলে পুনরায় অসুস্থ হওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে, তাহলে তার জন্যে রোযা না রাখার অনুমতি আছে।

৬। দুর্বলতা ও বার্ধক্য

কোনো ব্যক্তি বার্ধক্যের কারণে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার জন্যে অনুমতি আছে যে,সে রোযা রাখবে না। আর এমন ব্যক্তির সম্পর্কে এ আশা তো করা যায় না যে, সুস্থ হয়ে কাযা করবে। এজন্যে তার ওয়াজিব যে, সে রোযার ফিদিয়া দেবে তখনই দিক বা পরে। ফিদিয়ার পরিমাণ সাদকায়ে ফিতরের সমান।

৭। জীবনের আশংকা

যদি কঠোর পরিশ্রমের কারণে জীবনের আশংকা হয় অথবা কেউ যদি এ বলে বাধ্য করে যে, রোযা রাখলে তাকে মেরে ফেলবে, অথবা নিষ্ঠুরভাবে মারপিট করবে অথবা কোনো অঙ্গ কেটে দেবে, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্যেও রোযা না রাখার অনুমতি আছে।

৮। জিহাদ

দীনের দুশমনের বিরুদ্ধে জিহাদের নিয়ত আছে এবং এ ধারণা হয় যে, রোযা রাখলে দুর্বল হয়ে পড়বে তাহলে রোযা না রাখার  অনুমতি আছে।

*কার্যত জেহাদ চলছে তখনও রোযা না রাখার অনুমতি আছে।

*কার্যত জেহাদ চলছে না, কিন্তু শীঘ্রই সংঘর্ষের আশংকা রয়েছে, এমন অবস্থায়ও অনুমতি আছে।

*রোযা রাখার পর যদি এমন অবস্থার সম্মুখীন হয় তাহলেও রোযা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি আছে। তার জন্যে কাফফারা দিতে হবে না।

৯। হুশ না থাকা

কেউ যদি বেহুশ হয়ে যায় এবং কয়েকদিন ধরে বেহুশ থাকে, এ অবস্থায় যেসব রোযা রাখা হবে তার কাযা ওয়াজিব হবে। তবে যে রাতে সে বেহুশ হয়েছে তার পরদিন যদি তার দ্বারা এমন কোনো কাজ না হয় যার দ্বারা রোযা নষ্ট হয় এবং এটাও যদি জানা যায় যে, সে রোযার নিয়ত করেছে বা করেনি, তাহলে সেদিন তার রোযা ধরা হবে এবং তার কাযা করতে হবে না। অবশ্যই পরের দিনগুলোর কাযা করতে হবে।

১০। মস্তিষ্ক বিকৃত হওয়া

যদি কেউ পাগল হয়ে পড়ে এবং রোযা রাখতে না পারে তাহলে তার দুটি উপায় রয়েছেঃ

এক – কোনো সময়েই পাগলামি ভালো হচ্ছে না। এমন অবস্থায় রোযা বিলকুল মাফ-কাযা ফিদিয়া কিছুই দরকার নেই।

দুই – কোনো সময়ে পাগলামি ভালো হয়ে যাচ্ছে তাহলে এ অবস্থায় কাযা করতে হবে।

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী