আসান ফেকাহ – ২য় খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হজ্জের প্রকার

হজ্জ তিন প্রকার এবং প্রত্যেকের পৃথক পৃথক মাসায়েল রয়েছে। (১) হজ্জে এফরাদ, (২) হজ্জে কেরান, (৩) হজ্জে তামাত্তু।

হজ্জে এফরাদ

এফরাদের আভিধানিক অর্থ একাকী করা, এক কাজ করা প্রভৃতি। শরীয়াতের পরিভাষায় এফরাদ ঐ হজ্জকে বলে যার সাথে ওমরাহ করা হয় না, শুধু হজ্জের ইহরাম বাধা হয় এবং হজ্জের রীতি পদ্ধতি পালন করা হয়। এফরাদ হজ্জকারীকে মুফরেদ বলা হয়। মুফরেদ এহরাম বাধার সময় শুধু হজ্জে নিয়ত করবে এবং পূর্ব বর্ণিত হজ্জের রুকনগুলো পালন করবে। মুফরেদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

হজ্জে কেরান

কেরান শব্দের অর্থ দুটো জিনিসকে একত্রে মিলানো।পরিভাষা হিসেবে হজ্জ ও ওমরার এহরাম এক সাথে বেধে উভয়ের রুকন পালন করাকে হজ্জে কেরান বলে। এ হজ্জকারীকে কারেন বলে।

হজ্জে কেরান এফরাদ ও তামাত্তু থেকে উৎকৃষ্ট। (ইমাম শাফেয়ীর মতে এফরাদ উৎকৃষ্ট এবং ইমাম মালেকের মতে তামাত্তু উৎকৃষ্ট। এজন্যে যে হজ্জে তামাত্তুর উল্লেখ কুরআনে আছে। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, কুরবানীর পশু সাথে থাকলে কেরান উৎকৃষ্ট, না থাকলে তামাত্তু উৎকৃষ্ট। আহলে হাদীসের মতে হজ্জে কেরান ওমরা ও হজ্জের জন্যে একই তাওয়াফ ও সায়ী যথেষ্ট।)

হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (র) বলেন, নবী (স) বলেছেন, হজ্জ ওমরাহ একত্রে মিলিয়ে আদায় কর। এজন্যে যে, এ দুটো দারিদ্র্য ও গুনাহ এমনভাবে নির্মূল করে দেয় যেমন আগুনের চুল্লি লোহা ও সোনা চাঁদির ময়লা নির্মূল করে দেয়। (তিরমিযি)

কেরানের মাসায়েল

১. হজ্জের মাসগুলোতে ওমরাহ করা কারেনের জন্যে জরুরী।

২. হজ্জে কেরানে ওমরার তাওয়াফ হজ্জের তাওয়াফের আগে করা ওয়াজিব।এবং ওমরার জন্যে পৃথক তাওয়াফ ও সায়ী এবং হজ্জের জন্যেও পৃথক।

৩. কেরানের ওমরায় সকল কাজ সমাধার পর হজ্জের কাজ শুরু করা মসনুন।

৪. কারেনের ওমরার পর মস্তক মুণ্ডন বা চুল ছাটা নিষেধ।

৫. কারেনের জন্যে ওমরার তাওয়াফ এবং হজ্জের তাওয়াফে কুদুম এক সাথে করা জায়েয বটে এবং উভয়ের সায়ীও এক সাথে করা জায়েয, কিন্তু এসব করা সুন্নাতের খেলাপ।

৬. কারেনের জন্যে কুরবানী ওয়াজিব। এ কুরবানী এমন শুকরিয়া আদায়ের জন্যে যে, আল্লাহ হজ্জ ওমরা এক সাথে আদায় করার সুযোগ দিয়েছেন। কুরবানীর সামর্থ্য না থাকলে দশ রোযা রাখা ওয়াজিব। তিন রোযা কুরবানীর দিনের আগে এবং সাত রোযা আইয়ামে তাশরীকের পর। কুরআন বলে-

*******আরবী*********

যার কুরবানী দেয়ার সামর্থ্য নেই, সে তিন দিন রোযা রাখবে হজ্জের সময়ে এবং সাত রোযা রাখবে যখন তোমরা হজ্জ শেষ করে ফিরবে, এ মোট দশ দিন।

৭. হজ্জে কেরান ও তামাত্তু শুধু তাদের জন্যে যারা মীকাতের বাইরের অধিবাসী তাদেরকে আফাকী বলা হয়। কুরআন বলেঃ

*******আরবী*********

এ (তামাত্তু ও কেরান) তাদের জন্যে যাদের পরিবার মসজিদে হারামের থাকে না। যারা মীকাতের ভেতরের অধিবাসী তাদের জন্যে শুধু হজ্জে এফরাদ।

হজ্জে তামাত্তু

তামাত্তু শব্দের অর্থ কিছুক্ষণের জন্যে সুযোগ সুবিধা ভোগ করা।পারিভাষিক অর্থে হজ্জে তামাত্তু যাকে বলা হয়, তাহলো এই যে, ওমরাহ ও হজ্জ সাথে সাথে করা। এমনভাবে করা যে, এহরাম পৃথক পৃথক বাধবে এবং ওমরাহ করার এহরাম খুলবে এবং ঐসব সুযোগ ভোগ করবে যা ইহরাম অবস্থায় হারাম ছিল। তারপর হজ্জের এহরাম বেধে হজ্জ করবে। এ ধরনের হজ্জে যেহেতু ওমরাহ ও হজ্জের মধ্যবর্তী সময়ে এহরাম খুলে হালাল বস্তু উপভোগ করার সময় পাওয়া যায়, সেজন্যে একে হজ্জে তামাত্তু বলে।

কুরআন বলে

*******আরবী*********

অতএব যে ব্যক্তি হজ্জের দিনগুলোর মধ্যে ওমরার ফায়দা লাভ করতে চায় তার জন্যে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানী।

হজ্জে তামাত্তু এফরাদ থেকে ভালো। এজন্যে যে এর মধ্যে দুটো ইবাদাত এক সাথে জমা করার সুযোগ পাওয়া যায়। আর কিছু অধিক ইবাদাত পদ্ধতি সমাধা করার সৌভাগ্য লাভ করা যায়।

হজ্জে তামাত্তুর দুটো উপায় আছে। একটি এই যে, কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয় এই যে, হাদীর পশু সাথে করে নিবে না। প্রথমটি দ্বিতীয়টি থেকে উৎকৃষ্ট।

তামাত্তুর মাসায়েল

১. তামাত্তুকারীর জন্যে জরুরী যে, সে ওমরার তাওয়াফ হজ্জের মাসগুলোতে করবে। (হজ্জে মাসগুলো হলো, শাওয়াল, যুলকাদ ও যুলহজ্জের প্রথম দশ দিন) অথবা অন্ততপক্ষে ওমরার তাওয়াফের অধিকাংশ চক্কর হজ্জের সময়কালের মধ্যে হতে হবে।

২. তামাত্তু হজ্জের জন্যে জরুরী এই যে, ওমরাহ ও হজ্জের তাওয়াফ একই বছর হতে হবে। কেউ যদি এক বছর ওমরার তাওয়াফ করে এবং দ্বিতীয় বছর হজ্জের তাওয়াফ, তাহলে তাকে তামাত্তুকারী বলা যাবে না।

৩. তামাত্তুর জন্যে জরুরী এই যে, প্রথমে ওমরার এহরাম বাধতে হবে এবং এটাও জরুরী যে, হজ্জের এহরাম বাধার পূর্বে ওমরার তাওয়াফ করে ফেলতে হবে।

৪. তামাত্তুকারীর জন্যে জরুরী এই যে, ওমরাহ ও হজ্জের এহরামের মাঝখানে আলমাম করবে না। আলমামের অর্থ ওমরার এহরাম খোলার পর আপন পরিবারের মধ্যে গিয়ে পড়বে না। তবে কুরবানীর পশু সাথে করে আনলে তামাত্তু সহীহ হবে।

৫. হজ্জে তামাত্তু শুধু তাদের জন্যে যারা মীকাতের বাইরের অধিবাসী। যারা মক্কায় অথবা মীকাতের ভিতরে বসবাস করে তাদের জন্যে তামাত্তু ও কেরান মাকরূহ তাহরিমী। (ইলমুল ফেকাহ)

৬. তামাত্তুকারীর জন্যে তাওয়াফে কুদুম করা মসনুন এবং তার উচিত তাওয়াফে যিয়ারতে রমল করা।

৭. কারেনের মতো তামাত্তুকারীর জন্যেও কুরবানী ওয়াজিব। সামর্থ্য না থাকলে দশ রোযা করবে হজ্জের সময় কুরবানীর দিনের আগে তিন রোযা এবং আইয়ামে তাশরীকের পর সাত রোযা।

৮. তামাত্তুকারী যদি কুরবানীর পশু সাথে না এনে থাকে তাহলে ওমরার সায়ী এবং মাথা মুন্ডানোর পর এহরাম খুলবে। সাথে কুরবানীর পশু আনলে এহরাম খুলবে না, ১০ই যুল হজ্জ কুরবানী করার পর এহরাম খুলবে।

নবীর বিদায় হজ্জ

নবী (স) এর সাহাবী হযরত জাবের (রা) এর ভাষায়ঃ

মদীনায় শেষ সাহাবী হযরত জাবের (রা) তার মৃত্যুর পর মদীনায় আর কোনো সাহাবী ছিলেন না। তিনি খুব বৃদ্ধ হয়েছিলেন এবং বয়স হয়েছিল নব্বইয়েরও বেশী। দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ সে সময়ের ঘটনা যখন হযরত হুসাইন (রা) এর পৌত্র মুহাম্মাদ বিন আলী অর্থাৎ ইমাম বাকের হযরত জাবের (রা) এর খেদমতে হাজির হন। ইমাম বাকের (র) বলেন, আমরা কয়েকজন তার খেদমতে হাজির হলে তিনি প্রত্যেকের নাম ও অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। যখন আমি বললাম যে, আমি হযরত হুসাইনের পৌত্র, তখন তিনি খুবই স্নেহ সহকারে আমার মাথায় হাত বুলালেন। তারপর আমার কোরতার বুকের বোতাম খুলে আমার ঠিক বুকের মাঝখানে হাত রাখলেন। তখন আমার পূর্ণ যৌবন। তিনি বড়ো খুশী হয়ে বললেন, খোশ আমদেদ আমার ভাইপো। তুমি তো হুসাইনের স্মৃতি চিহ্ন। বল, কি জন্যে এসেছ। আমি বলতে লাগলাম ————-। তিনি দৃষ্টিশক্তিহীন ছিলেন। এমন সময় নামাযের সময় হলো। তিনি একটা ছোট চাদর গায়ে দিয়ে ছিলেন। তাই নিয়ে নামাযের  জন্যে দাঁড়িয়ে গেলেন। চাদর এতো ছোট ছিল যে, যখন তা কাঁধের ওপর রাখতেন তখন তা পড়ে যেত। এটাই তিনি গায়ে দিয়ে রাখলেন অথচ বড়ো চাদর নিকটেই রাখা ছিল। তিনি আমাদেরকে নামায পড়িয়ে দিয়ে মুক্ত হলেন তখন আমি আরজ করলাম, হযরত আমাদেরকে নবী (স) এর বিদায় হজ্জের বিবরণ শুনিয়ে দিন।

তিনি হাতের আঙুলের নয় পর্যন্ত গুণে বললেন, রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা আসার পর ন বছর হজ্জ করেননি। হিজরতের দশম বছরে তিনি জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করে দিলেন যে, তিনি হজ্জে যাবেন। এ খবর পাওয়া মাত্র বহু লোক মদীনায় জমায়েত হতে লাগলো। প্রত্যেকেই এ আশা করছিল যে, সে হজ্জের সফরে নবীর সাথী হবে, তার হুকুম মেনে চলবে এবং তিনি যা করবেন তারাও তাই করবে।

অবশেষে মদীনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় এসে গেল। সমস্ত কাফেলা নবীর সাথে রওয়ানা হয়ে যুলহুলায়ফা পৌঁছে অবস্থান করলো।

এখানে এক বিশেষ ঘটনা ঘটলো। কাফেলার একজন মহিলা, হযরত আবু বকর (রা) এর স্ত্রী আসমা বিনতে ওমাইস (রা) সন্তান প্রসব করলেন। তিনি নবীকে জিজ্ঞেস করলেন এ অবস্থায় আমার কি করা উচিত। নবী (স) বললেন, এ অবস্থায় এহরামের জন্যে গোসল কর এবং এ অবস্থায় অন্যান্য মেয়েদের মতো ল্যাংগোট বাধ।

তারপর নবী (স) যুলহুলায়ফায় নামায পড়লেন। নামাযের পর উটনী কাসওয়ার ওপর সওয়ার হলেন। উটনী তাকে নিয়ে নিকটস্থ উচ্চ প্রান্তর বায়দায় পৌছলো। বায়দার ওপর থেকে যখন আমি চারদিকে তাকালাম তখন দেখলাম যতদূর দেখা যায় চারদিকে ডানে বামে শুধু মানুষ থৈ থৈ করছে। কিছু সওয়ারীর ওপরে, কিছু পায়ে হেটে। নবী ছিলেন আমাদের মাঝে। তার ওপর কুরআন নাযিল হচ্ছিল। তিনি কুরআন ভালোভাবে উপলব্ধি করছিলেন বলে আল্লাহর হুকুমে যা কিছু করতেন আমরাও তাই করতাম। এখানে পৌঁছে তিনি উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়লেন-

*******আরবী*********

আয় আল্লাহ বান্দাহ তোমার দরবারে হাজির। তোমার ডাকে তোমার দরবারে হাজির হয়েছি। তোমার কোনো শরীক নেই। আমি হাজির আছি। প্রশংসার হকদার তুমি এবং দয়া অনুগ্রহ ও পুরস্কার দেয়ার অধিকার তোমারই। শাসন কর্তৃত্বে তোমার (এ ব্যাপারে) কোনো শরীক নেই।

সকলেই উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়লো। তারা কিছু কথা যোগ করলো কিন্তু নবী (স) প্রতিবাদ করলেন না। তিনি তার তালবিয়া সর্বদা পড়তে থাকেন।

হযরত জাবের (রা) বলেন, এ সফরে আমাদের নিয়ত ছিল হজ্জ করার, ওমরাহ আমাদের করার কথা ছিল না। অবশেষে যখন আমার নবী পাকের সাথে বায়তুল্লাহ পৌঁছলাম, তখন তিনি প্রথমে হিজরে আসওয়াদে চুমো দিলেন। তারপর তাওয়াফ শুরু করলেন। প্রথমে তিন চক্করে তিনি রমল করলেন এবং পরের চার চক্করে সাধারণ গতিতে চাললেন। তারপর মাকামে ইবরাহীম এসে এ আয়াত তেলাওয়াত করলেনঃ

*******আরবী*********

এবং মাকামে ইবরাহীমকে নিজের জন্যে ইবাদাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর।

তারপর তিনি এমনভাবে দাঁড়ালেন যে, মাকামে ইবরাহীম তার এবং বায়তুল্লাহর মাঝখানে ছিল। এখানে তিনি দু রাকাত নামায পড়লেন, প্রথমে রাকাতে *******আরবী********* এবং দ্বিতীয় রাকাতে *******আরবী********* পড়লেন। তারপর হিজরে আসওয়াদের নিকটে এসে তাকে চুমো দিলেন। তারপর সাফা পাহাড়ের দিকে চললেন। সাফার নিকটে পৌঁছে পড়লেন *******আরবী********* এবং বললেন *******আরবী********* আমি সাফা থেকে সায়ী শুরু করছি যেভাবে আল্লাহ এ আয়াতে তার উল্লেখ করে শুরু করেছেন।

অতএব তিনি সাফার ওপরে এতোটা উঁচুতে উঠলেন যে বায়তুল্লাহ স্পষ্ট তার চোখের সামনে এলো। তিনি কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি তাওহীদ ও তাকবীরে মশগুল হলেন।

তিনি পড়লেনঃ

*******আরবী*********

আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও একক, তার কোনো শরীক নেই। শাসন কর্তৃত্ব তার এবং তিনি প্রশংসার হকদার। তিনি সব কিছুর ওপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও একক । তিনি তার ওয়াদা পূরণ করেছেন অর্থাৎ দ্বীনকে সমগ্র আরবে বিজয়ী করে দিয়েছেন।তিনি তার বান্দাহকে সাহায্য করেছেন এবং কাফের মুশরিকের দলকে তিনি একাকীই পরাস্ত করেছেন।

তিনি তিনবার একথাগুলো আবৃত্তি করলেন এবং দোয়া করলেন। তারপর নীচে মেনে মারওয়ার দিকে চললেন। মারওয়াতে তাই বললেন যা সাফায় বলেছিলেন। এভাবে শেষ চক্কর পুরো করে মারওয়ায় পৌঁছলেন। এখানে তিনি সাথীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি ওপরে ছিলেন এবং সাথীগণ নীচে।

তিনি বলেন-

একথা শুনে সুরাকা বিন মালেক দাড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ এ হুকুম কি শুধ এ বছরের জন্যে, না চিরদিনের জন্য। (মক্কাবাসীদের নিকটে হজ্জের মাসগুলোতে স্থায়ীভাবে ওমরাহ করা কঠিন গুনাহ মনে করা হতো। সুরাকা বিন মালেক দেখলেন যে, হজ্জের মাসগুলোতে তাওয়াফ ও সায়ীকে স্থায়ীভাবে ওমরা গণ্য করা হচ্ছে। তাই তিনি এ প্রশ্ন করেন।)

প্রথমে যদি একথা অনুভব করতাম যা পরে অনুভব করলাম, তাহলে হাদীর পশু সংগে আনতাম না। তাহলে এ তাওয়াফ ও সায়ীকে ওমরার তাওয়াফ ও সায়ী গণ্য করে ওমরায় পরিণত করতাম ও ইহরাম খুলে ফেলতাম। তোমাদের মধ্যে যারা হাদীর পশু সাথে আনেনি, তারা এসে ওমরার তাওয়ায় ও সায়ী মনে করে ইহরাম খুলতে পারে।

নবী (স) জবাবে বলেন, শুধু এ বছরের জন্যে নয়, চিরদিনের জন্য।

হযরত জাবের (রা) অতঃপর বলেন, হযরত আলী (রা) ইয়ামেন থেকে নবী জন্যে অনেক কুরবানীর পশু নিয়ে মক্কায় পৌঁছান। তিনি দেখলেন তার বিবি হযরত ফাতেমা ইহরাম খুলে ফেলেছেন। রঙ্গিন কাপড়ও পরেছেন এবং সুরমা লাগিয়েছেন। এসব হযরত আলী (রা) ভালো মনে না করে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হযরত ফাতেমা (রা) বলেন, আব্বাজান আমাকে এর হুকুম দিয়েছেন। অর্থাৎ নবী (স) ইহরাম খোলার হুকুম দিয়েছেন।

নবী (স) হযরত আলীর দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করনে, তুমি ইহরাম বেধে তালবিয়া পড়ছিলে তখন কি নিয়ত করেছিলে- শুধু হজ্জের নিয়ত করেছিলে, না হজ্জ ও ওমরাহ উভয়ের নিয়ত করেছিলে?আলী (রা) বলেন, আমি বলেছিলাম, আয় আল্লাহ আমি ঐ জিনিসের ইহরাম বাধছি, যার ইহরাম তোমার রাসূল বেধেছেন।

নবী (স) বলেন, আমি যেহেতু আমার সাথে হাদীর পশু এনেছি, সে জন্যে আমার ইহরাম খোলার কোনো সুযোগ নেই। তুমিও আমার মতো নিয়ত করেছ। অতএব তোমারও ইহরাম খোলার উপায় নেই।

হযরত জাবের (রা) বলেন, ইয়ামেন থেকে হযরত আলী নিয়ে আসা উট ও নবীর উটের মোট সংখ্যা ছিল একশ। (কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায় যে, নবী (স) সাথে করে ৬৩টি উট এনেছিলেন এবং হযরত আলী (রা) ইয়ামেন থেকে এনেছিলেন ৩৭টি উট।)

সকল সাহাবী নবীর নির্দেশ অনুযায়ী ইহরাম খুলে ফেলেন এবং চুল মুণ্ডন করে বা কাটিয়ে হালাল হয়ে গেলেন। তবে নবী (স) এবং যেসব সাহাবী হাদী সাথে এনেছিলেন ইহরাম অবস্থায় রইলেন।

তারপর ৮ই যুলহজ্জ লোক হজ্জের ইহরাম বাধে যারা ওমরার পর ইহরাম খুলেছিল। নবী (স) কাসওয়ার পর সওয়ার হয়ে মিনা রওয়ানা হন। এখানে তিনি যোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজর এ পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন। ফজরের নামাযের পর কিছুক্ষণ তিনি মিনায় অবস্থান করেন। সূর্য ভালোভাবে ওপরে উঠে এলে তিনি আরাফাতের দিকে রওয়ানা হন। তিনি আদেশ করেন যে, নিমরা (নিমরা প্রকৃতপক্ষে এমন এক স্থান যেখানে হেরেমের সীমানা শেষ হয়ে আরাফাতের সীমানা শুরু হয়। জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশগণ হেরেমের সীমানারে ভেতরে মাশয়ারুল হারামের নিকটে অবস্থান করতো এবং সাধারণ লোক অবস্থান করতো আরাফাতের ময়দানে। এজন্যে কুরাইশগণের ধারনা ছিল যে, নবী (স) ঐ স্থানেই অবস্থান করবেন। কিন্তু তিনি অবস্থান করার প্রকৃত স্থানেই তাঁবু খাটাবার আদেশ পূর্বাহ্ণেই করে দিয়েছিলেন।)নামাক স্থানে তার জন্যে যে পশমের তাঁবু খাটানো হয়। কুরাইশগণ নিঃসন্দেহ ছিল যে, নবী (স) মাশয়ারুল হারামের নিকটেই অবস্থান করবেন। কারণ, জাহেলিয়াতের যুগে সর্বদা তাই করা হতো। কিন্তু নবী (স) মাশয়ারুল হারামের সীমা অতিক্রম করে আরাফাতের সীমার মধ্যে প্রবেশ করেন। নিমরা নামক স্থানে তার নির্দেশে যে তাঁবু খাটানো হয়েছিল তার মধ্যে তিনি অবস্থান করেন।

তারপর বেলা যখন পড়ে গেল তখন তিনি কাউসারের পিঠে হাউদা বাধতে বলেন। হাউদা বাধা হলে তিনি উটনীর পিঠে চড়ে ওড়না প্রান্তরে পৌঁছান। ওখানে একটা উঁচু স্থানে উটের পিঠ থেকে জনতার সামনে ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন-

সমবেত জনতা! অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা এবং অবৈধভাবে কারো সম্পদ হস্তগত করা তোমাদের জন্য হারাম। এটা ঠিক ঐরূপ হারাম যেমন আজকের দিন তোমাদের জন্য হারাম (এবং তোমরা হারাম মনে কর)।

ভালো করে বুঝে নাও যে, জাহেলিয়াতের যুগের সব কিছুই আমার পায়ের তলায় নিবিষ্ট করা হল। এবং জাহেলিয়াতের যুগের খুন মাফ করা হলো। সকলের আগে আমার বংশের খুন অর্থাৎ রবিয়া বিন হারিস বিন আবদুল মুত্তালিবের পুত্রের খুন মাফ করার ঘোষণা করছি। রবিয়ার পুত্র বনি সাদ কাবিলায় দুধ পানের জন্য থাকত। তাকে হাযিল কাবিলার লোক খুন করে।

জাহেলিয়াত যুগের সকল সূদের দাবী পরিত্যক্ত হলো। এ ব্যাপারে আমি সকলের প্রথমে আমার চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের সূদের দাবী প্রত্যাহার করার ঘোষণা করছি। আজ তার সকল সূদের দাবী শেষ হয়ে গেল।

সমবেত জনগণ! মহিলাদের অধিকার সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আল্লাহর আমানত স্বরূপ তোমরা তাদেরকে তোমাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছ। তাদেরকে উপভোগ করা আল্লাহর কালেমা এবং আইন অনুযায়ীই তোমাদের জন্য হালাল হয়েছে। তোমাদের স্ত্রীদের ওপর বিশেষ হক এই যে, যাদেরকে তোমরা তোমাদের বাড়ীতে আসা পছন্দ কর না, তাদেরকে যেন তোমাদের শয্যার ওপর বসতে তারা সুযোগ না দেয়। তারা যদি এ ভুল করে বসে তাহলে তাদেরকে মামুলী শাস্তি দিতে পার। তাদের বিশেষ হক তোমাদের ওপর এই যে, তোমরা সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের খোরাক পোশাকের ব্যবস্থা করবে।

আমি তোমাদের মধ্যে হেদায়াতের এমন উৎস রেখে যাচ্ছি যদি তাকে তোমরা মজবুত করে ধর এবং তার নির্দেশে চল, তাহলে তোমরা কখনো সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। হেদায়াতের এ উৎস হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব।

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা আমার সম্পর্কে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌছিয়ে দিয়েছি কিনা। বল সেদিন তোমরা আমার সম্পর্কে আল্লাহর কাছে কি জবাব দেবে?

সমবেত জনতা এক বাক্য বললো আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি তাবলীগের হক আদায় করেছেন। আপনি সব কিছু পৌছিয়ে দিয়েছেন। নসীহত দানকারী ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে কোনো কাজই বাকী রাখেননি।

একথার পর নবী (স) তার শাহাদত আঙ্গুলি আসমানের দিকে উঠিয়ে মানুষের দিকে ইংগিত করে বললেন- আয় আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাক; আয় আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাক, আয় আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাক; আমি তোমার পয়গাম, তোমার আহকাম তোমার বান্দাহদের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছি এবং তোমার বান্দাহগনও সাক্ষী যে, আমি তাবলীগের হক আদায় করেছি।

তারপর হযরত বিলাল (রা) আযান দিলেন ও একামত বললেন। নবী (স) যোহরের নামায পড়ালেন। তারপর হযরত বেলাল (রা) দ্বিতীয়বার একামত বললেন এবং নবী (স) আসর নামায পড়ালেন। যোহর আসর এক সাথে পড়ার পর তিনি ঐ স্থানে এলেন যেখানে অবস্থান করা যায়। তারপর তিনি তার কাসওয়ার দিকে মুখ বড়ো বড়ো প্রস্তর খন্ডের দিকে করে দিলেন এবং সমবেত জনগণ তার সামনে হয়ে গেল। জনতা ছিল সওয়ারী বিহীন ও পদব্রজে। নবী (স) কেবলামুখী হলেন এবং ওখানেই অবস্থান করলেন। অবশেষে সূর্য অস্তমিত হলে তিনি আরাফাত থেকে মুযদালাফার দিকে রওয়ানা হলেন এবং উসামা বিন যায়েদকে তার পেছনে উটের পিঠে বসিয়ে নিলেন। মুযদালফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশা এক সাথে পড়লেন। আযান হলো এবং দু নামাযের জন্যে দুবার একামত হলো। এ দু নামাযের মধ্যে তিনি কোন সুন্নাত নফল পড়লেন না। তারপর তিনি বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়লেন। অবশেষে সুবহে সাদেক হয়ে গেল। আযান ও একামতের পর তিনি ফজরের নামা আদায় করলেন। নামাযের পর তিনি মাশয়ারুল হারামের নিকটে এসে কেবলামুখী দাড়িয়ে তসবিহ তাহলীলে মশগুল হলেন। পূর্বদিক যখন বেশ ফর্সা হয়ে গেল তখন সূর্য ওঠার আগেই সেখান থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হলেন। এবার তিনি তার উটর পেছন দিকে ফযল বিন আব্বাসকে বসিয়ে নেন। যখন তিনি মুহার উপত্যকার মাঝে পৌঁছালেন তখন উটনীর গতি দ্রুত করে দেন। মুহার প্রান্তর থেকে বের হয়ে মাঝপথ ধরলেন যা বড়ো জুমরার নিকটে গিয়ে বের হয়েছে। তারপর ঐ জুমরায় পৌঁছে যা গাছের নিকট ছিল, তিনি পাথর মারলেন। জুমরাতে সাতটি ছোট ছোট পাথর মারলেন এবং মারার সময় আল্লাহু আকবার বললেন। এসব পাথর নিচু স্থান থেকে মারলেন। পাথর মারা শেষ করে কুরবানী করার স্থানে গেলেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি কুরবানী যবেহ করলেন। বাকীগুলো হযরত আলী (রা) এর দায়িত্বে ছেড়ে দিলেন। তিনি হযরত আলীকে তার হাদীর মধ্যে শরীক করেছিলেন তারপর প্রত্যেক কুরবানী থেকে এক এক টুকরা নেবার হুকুম করলেন। তা নিয়ে রান্না করা হলো। তারপর নবী (স) এবং হযরত আলী (রা) এ গোশতের কিছু খেলেন এবং শুরবা পান করলেন। তারপর নবী উটনীর পিঠে চড়ে যিয়ারতের জন্যে বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলেন। মক্কায় পৌঁছে যোহর নামায পড়লেন। নামায শেষে তিনি আবদুল মুত্তালিব পরিবারের লোকদের কাছে এলেন যারা যমযমের পানি তুলে লোকদের পান করাচ্ছিল। তিনি বললেন, বালতি ভরে পানি তুলে লোকদের পান করাও। যদি আমার এ আশংকা হতো যে আমাকে দেখে লোক তোমাদের সাথে বালতি টেনে তুলতাম। তারা নবীকে বালতি ভরে পানি দিল এবং নবী তার থেকে পান করলেন। (মুসলিম-জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন আতিয়া থেকে বর্ণিত)

About মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী