আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

যায়িদ ইবন সাবিত (রা)

রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম শ্রেষ্ট সাহাবী হযরত যায়িদ (রা) এর বেশ কয়েকটি উপনাম বা ডাকনাম সীরাত গ্রন্থসূমহে পাওয়া যায়। যেমনঃ আবু সাঈদ, আবু খারিজা, আবু আবদির রহমান ও আবু সাবিত।১ মুসলিম উম্মাহ তাকে অনেকগুলি উপধিতে ভূষিত করেছে। যেমনঃ হাবরুল উম্মাহ, কাতিুবুল ওহী ইত্যাদি। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতা সাবিত ইবন  দাহহাক এবং মাতা নাওয়ার বিনতু মালিক।২ নাওয়ার ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) খান্দনের মেয়ে।

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার পূর্বে মদীনার অধিবাসীদের পরস্পরের মধ্যে যে সব রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংঘর্ষ হয় তার মধ্যে বুয়াস যুদ্ধটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এ যুদ্ধে যায়িদের পিতা সাবিত নিহত ন। এটা হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। তখন যায়িদের বয়স মাত্র ছয় বছর। তিনি মায়ের তত্ত্বাধানে বড় হন। রসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিযরাতের সময় যায়িদ এগারো বছরের এক বালক মাত্র।৩

তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন মদীনায় ইসলামের ভিত্তি কুব একটা মজবুত হয়নি। মক্কা  থেকে হযরত রাসূলে কারীম (সা) প্রেরিত সুবাল্লিগ হযরত মুসা’য়াব ইবন উমাইর (রা) যখন মাদীায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন  তখন কোন এক সময়ে আতি অল্প বয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বালেগ হওয়ার পূর্বে ঈমান আনা যাদি কোন গৌরবের বিষয় হয় তাহলে হযরত যায়িদ সেই গৌরবের বিষয় হয় তাহলে হযরত যায়িদ সেই গৌরবের অধিকারী। জীবনের সূচনা থেকেই এভাবে তিনি শিরকের পস্কিলতা থেকে মুক্তি থাকেন।

তিনি ইসলাম গ্রহন পর থেকেই কুরআন পড়তে শুরু করলেন। মানুষ ও তাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। তিনি ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী ও তীক্ষè ধীশক্তির অধিকারী।৪ রাসূলুল্লাহর (সা) রবার নিয়ে গেল এবং এই বলে পরিচয় করে দিল যে, ছেলেটি নাজ্জার গোত্রের। এরই মধ্যে সে সতেরটি সূরার পাঠ শেষ করেছে। রাসূল (সা) তাঁর মুখ থেকে কুরআন তিলওয়াত শুনে খুব খুশি হলেন।৫ যায়িদ বলেনঃ তখন আমার বয়স মাত্র এগারো বছর।৬ বদর যুদ্ধের সময় তিনি তের (১৩Ñ) বছরের এক বালক মাত্র। যুদ্ধে যাওয়ার বয়স তখনো হয়নি। তবুও আনসারও মুহাজিরগণ যখন বদরের দিকে যাত্রা  করলেন তখন এ বালকও যুদ্ধে যাওয়ার সিন্ধান্ত নিলেন। তাঁরই মত ছোটদের একটি দলের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে উপস্থিত  হয়ে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যুদ্ধের বয়স না হওয়ার কারনে রাসূল (সা) তাদেরকে সান্তনা দিয়ে ফিরিয়ে দেন।৭

হযরত যায়িদ সর্ব প্রথম কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন সে বিষয়ে সীরাত বিশেঙ্গদের মতভেদ আছে। আনেকের ধারণা তিনি উহুদে যোগদান করেন। এটাই তাঁর বয়স ষোল পূর্ণ হয়ে গেছে। আবার আনেকে বলেছেন, খন্দক তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধ।৮ আল ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, যায়িদ ইবন সাবিত বলেনঃ আমাকে বদর ও উহুদে অংশ গ্রহনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। খন্দকে প্রথম অনুমতি পাই।৯ ইবন হিশামও বলেন, তাঁর বয়স কম হওয়ায় রাসূল (সা) অন্যদের সাথে তাঁকেও উহুদে ফিরিয়ে দেন।১০

হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থে যায়িদ ইবন সাবিতের একটি বর্ণনা সংলিত হয়েছে। তাদ্বারা বুঝা যায়, তিনি উহুদে অংশ গ্রহন করেছিলেন। তিনি বলেনঃ উহুদের দিন যুদ্ধ শেষে রাসূল (সা) আমাকে সা’দ ইবনুর রাবীকে খুঁজতে পাঠালেন। যাবার সময় বলে দিলেনঃ যাদি তাঁকে পাও আমার সালাম জানাবে। আর তাকে বলবে রাসূলুল্লাহ (সা) জানতে চেয়েছেন, তুমি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছো?

যায়িদ বলেনঃ আমি শহীদদের মাঝে ঘুরে ঘুরে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। এক সময় পেয়ে গেলাম। তখন তাঁর অন্তিম মুহূর্ত। সারা দেহে তাঁর তীর,বর্শ ও তারবারির সত্তরটি আঘাত। বললামঃ সা’দ  রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি সালাম এবং তোমার প্রতিও। তুমি বলবে, আমি জান্নাতের খোশবু লাভ করছি।১১

যাইহোক, খন্দক যুদ্ধে যে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। যায়িদ (রা) বলেনঃ রাসূল (সা) আমাকে খন্দকে আংশগ্রহণের অনুমতি দেন এবং এক খন্ড কুবতী (মিসরীয় সূক্ষè ও শুভ্র) বস্ত্র ও দান করেন।১২ খন্দক খনন ও মাটি বহনে অংশ নেন। এ অবস্থায় আম্মার একবার রাসূলুল্লাহর (সা) দৃষ্টিতে পড়লে তিনি মন্তব্য করেনঃ বেশ ভালো ছেলে তো।১৩ এই ঘটনাক্রমে একমসয় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এই অবস্থায় ইবন হাযাম একটু রসিকাত করে তাঁর কাঁধ থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেন। যায়িদ টের পেলেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছেই ছিলেন। তিনিও একটু রস করে ডাক দিলেনঃ ইয়া আবা রুকাদ! ওহে নিদ্রাকাতর ব্যক্তি ওঠো। তারপর তিনি লোকদের এ ধরনের মশাকারা করতে নিষেধ দেন।১৪ এই খন্দক থেকে নিয়ে পরবর্তীকালের সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।১৫

তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত যায়িদের (রা) গোত্র মালিক ইবন নাজ্জার ঝান্ডা প্রথম ছিল আম্মারা ইবন হাযামের হাতে। পরে রাসূল (সা) সেটি যায়িদের হাতে অর্পণ করেন। এতে আম্মার মানে করেন, হয়তো তাঁর কোন ক্রটি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার কোন ক্রটি হয়েছে কি? তিনি জবাব দেনঃ না, তেমন কিছু নয়। আমি কুরআনের বিষয়টি প্রতি লক্ষ্য রেখে একাজ করেছি। যায়িদ তোমার চেয়ে বেশি কুরআন পড়েছি। কুরআনই অগ্রাধিকারযোগ্য।১৬

খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফাতকালে ভন্ড নবী মুসায়ালামা আল-কাজ্জাবের সাথে ইয়ামামার যুদ্ধ হয়। এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যায়িদও (রা) অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর গায়ে একটি তীর লাগে। কিন্তু তিনি মারাতœক আঘাত থেকে বেঁচে যান।১৭ খলীফা উমারের (রা) আমালে খাইবার থেকে ইহুদীদের বিতাড়নের পর তথাকার ওয়াদি-উল-কুরা’ মুসলামানদের মধ্যে বন্টন করা হয়। যায়িদও (রা) একটি অংশ লাভ করেন।১৮

খলীফা উসমান (রা) যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা গ্রহবন্দী তখন মদীনার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিদ্রোহীদের সাথে লড়াবার জন্য খলীফার অনুমতি চান। এ সময় যায়িদ ইব্ন সাবিতও (রা) খলীফার সাথে দেখা করে বলেনঃ আনসাররা আপনার দরজায় হাজির আপনি চাইলে তারা আবারও আল্লাহর আনসার হিসাবে কাজ করতে প্রস্তুত। খলীফা বলেনঃ তোমারা যদি লড়াই করার ইচ্ছা করে থাক তাহলে তাতে আমার সম্মতি নাই।১৯

হযরত যায়িদ ইবন সাবিতের (রা) গোটা জীবন সৎকর্মের সমষ্টি। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) সেক্রেটারী। ওহী লিখতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি-পত্র লিখতেন এবং যে সব চিঠি-পত্র আসতো তা পাঠ করে শোনাতেন। পরবর্তীকালের খলীফা উমারেরও (রা) সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন।২০

পবিত্র কুরআন ইসলারে মূল ভিত্তি। এর সংগ্রহ ও সংকলন করার মহা গৌরবের অধিকারী হলেন কতিবুল ওহী যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।২১ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবনকাল পর্যন্ত হাড়, চামড়া খেজুরের পাতা  ও মুসামান হাফেজদের স্মৃতিতে কুরআন সংরক্ষিত ছিলো। বহু সাহাবী কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। এ কল হাফেজদের মধ্যে যায়িদও একজন।

হযরত রাসূলের কারীমের (সা) ইনতিকালের পর আরব উপদ্বীপের একদল মানুষ মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগ করা) হয়ে মুসায়লামা আলÑকাজ্জাবের দলে ভিড়ে যায়। সে ইয়ামামায়ে নিজেকে নবী বলে ঘোষনা করে। হযরত আবু বকর (রা) তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করেন। মুসয়ালামা ইয়ামামার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তবে এ যুদ্ধে ৭০ জন হাফেজ  কুরআন শাহাদাত বরণ করেন।

এ ঘটনার পর হযরত উমারের (রা) অন্তরে কুরআন সংগ্রহ করার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তিনি খলীফা আবু বকরকে (রা) বলেন, এভাবে হাফেজদের শাহাদাতের ধারা অব্যাহত থাকলে কুরআনের বিরাট অংশ এক সময় হারিয়ে যাবার আশংকা আছে। সুতারং বিলম্ব না করে গোটা কুরআন এক স্থানে সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নিন। খলীফা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন। তিনি যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে বলেন,  তুমি একজন বুদ্ধিমান নওজোয়ান। তোমার প্রতি সবার আস্থা আছে। তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ওহী লিখেছিলে। সুতারা এ কাজটি সম্পাদন কর।২২

হযরত যায়িদ (রা) বলেনঃ আল্লাহর কসম! তাঁরা আমাকে কুরআন সংগ্রহ করার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা করার চেয়ে একটি পাহাড় সরানোর দায়িত্ব দিলে তা আমার কাছে অধিকতর সহজ হতো।২৩ তিনি খলীফাকে বললেনঃ তা ঠিক। তবে ভালো কাজে অসুবিধা কি? তারপরেও যায়িদ কাজটি করতে ইতস্তত করতে থাকেন। খলীফা বিভিন্নভাবে বুঝানোর পর তিনি রাজী হয়ে গেলেন।২৪

এ কাজে যায়িদকে সহোযোগিতার জন্য খলীফা আবু বকর (রা) আরও একদল সাহাবাকে দিলেন। দলটির সংখ্যা ৭৫ বলে বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উবাই ইবন কা’ব ও সা’ ঈদ ইবনুল আসও (রা) ছিলেন। হযরত যায়িদ খেজুরের পাতা, পাতলা পাথর ও হাড়ের ওপর লেখা কুরআনের সকল অংশ সংগ্রহ করলেন। হাফেজদের পাঠের সাথে তা মিলিয়ে দেখলেন। তিনি নিজেও আল কুরআনের একজন হাফেজ ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে আল কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন।২৫

আয়াতের সত্যতা এবং বিশুদ্ধাতা যাচাইয়ের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্ক ও ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যেত। এক স্থানে পৌঁছে যায়িদ বললেন, এরপর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট রজমের আয়াত থেকে শুনেছিলাম। হযরত উমার (রা) বললেনঃ কিন্তু রাসূল (সা) তা লেখার  আনুতি দেননি।২৬ মোট কথা কঠোর পরিশ্রম করে হযরত যায়িদ (রা) এ গুরুত্বপূর্ন কাজ সমাপ্ত করেন।তাঁর দ্বারাই সম্পর্ণ আল কুরআন সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করা হয়।

একটি আয়াতের ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রমানের নিয়ম ধরা হয়েছিল প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে কম পক্ষে দু’ ব্যক্তি সাক্ষ্য। আয়াতটি ছিল হযরত আবু খুযায়মার (রা) নিকট। ইনি সেই আবু খুযায়মা যাঁরা একার সক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষোর সমান বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন। একারণে হযরত যায়িদ উক্ত আয়াতিটি ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন সাক্ষ্যের প্রযোজন মনে করেননি। তাছাড়া আয়তটি তাঁর নিজের জানা ছিল।২৭ হযরত যায়িদ (রা) কর্তৃক সংগৃহীত ও লিখিত কুরআন মাজীদের এ কপিটি খলীফা হযরত আবু বকর (রা) নিজের হিফাজতে রাখেন। তাঁর ইনতিকালের পর দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) হাতে হয়ে তা তাঁর কণ্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার (রা) এর হাতে পৌঁছে এবং সেখানে সংরক্ষিত হয়।২৮

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের (রা) খিলাফতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে যখন আল কুরআনের পাঠে তারতম্য দেখা দেয় তখন হযরত হুজায়ফা ইবনুল ইয়মান (রা) খলীফাকে পরামর্শ দেন যে, ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই আননি তা রোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। খলীফাও এর গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুধাবন করেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) সংগৃহিত আল কুরআনের কপিটি হযরত হাফসার (রা)নিকট থেকে চেয়ে নেন। তারপর হযরত যায়িদ ইবন সাবিত,আবদুল্লাহ ইবনুয্য়ুবাইর, সা’ঈদ ইনুল আসও আবদুর রহমান ইবনুল হারেস ইবন হিশাম (রা) এ চারজন বিশিষ্ট সাহাবিকে তার থেকে কপি করার নির্দেশ দেন। তাঁর হযরত আবু বকর (রা) ঐ মূল কটি থেকে পাঁচ কপি নকল করে দেন। খলীফা উসমান (রা) এই কপিগুলো খিলাফতের পাঁচটি অঞ্চেলে পাঠিয়ে দেন এবং হযরত আবু বকর (রা) কর্তৃক প্রস্তুকৃত মূল কপটি যা মাহসাফে সিদ্দীকী নামে প্রসিদ্ধ -আবার হযরত হাফসার (রা) নিকট ফিরিয়ে দেন।২৯ নিরক্ষর নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা) ওহী লেখার দায়িত্ব বিভিন্ন সাহাবীর ওপর অর্পণ করেছিলেন। এ সকল ভাগ্যবান সাহাবীর অন্যতম হলেন হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।

হযরত যায়িদ কলম, কাগজ, দোয়াত, খেজুর পাতা, চাওড়া ও পাতলা হাড়, পাথর ইত্যাদি নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে যেতেন। যখন ওহী অবতীর্ণ হতো রাসূল (সা) বলে, যেতেন, আর তিনি লিখে চলতেন। লেখা সম্পর্কে বিশেষ কোন নির্দেশ থাকলে রাসূল (সা) তা বলে দিতেন, আর যায়িদ তদানুযায়ী কাজ করতেন।

ইমামা বুখারী (রহ) আল-বারা (রা) থেকে বর্ণনা করেছের। যখন সূরা আন-নিসার ৯৫ নং আয়াতটি-

(গৃহে উপবিষ্ট মুসলমান এবং ঐ মুসলমান য়ারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে-সমান নয়।) নাযিজ হলো তখন রাসূল (সা) বললেনঃ কাঠ দোয়াত হাড়, নিয়ে যায়িদকে আমার কাছে আসতে বলো, যায়িদ এলে তিনি আয়াতটি লিখতে বললেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পিছনে তখন অন্ধ সাহাবী আমার ইবন উম্মে মাকতুম বসা ছিলেন। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ!আমার ব্যাপারে কি হুকুম? আমি তো একজন অন্ধ মানুষ। তখন যাদের কোন সঙ্গত ওযর নেই অংশটি নাযিল হয়। তখন রাসূল (সা) যায়িদকে আয়াতটি এভাবে সাজিয়ে বলেনঃ৩০ যায়িদ পরে অবতীর্ণ অংশটুকু হড়ের ফাটার মধ্যে লিখে নেন। কারন, যে হাড়টি মধ্যে পূর্বে আয়াতটি লেখা হয়েছিল তা ফাটা ছিল।৩১

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের সাথে সাথে আনসাদের মধ্যে খিলাফতের বিষয়টি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা সাকীফা বনী সায়িদায় সমবেত হন এবং তাদের নেতৃত্বের আসন অলস্কৃত করেন প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) তাঁরই মনোনীত ব্যক্তিরা সেখানে বক্তৃতা করছিলেন এবং আনসারদের একটি বড় দল ছিলেন তাঁর সমর্থক। এ মজলিসে যায়িদ ইবন সাবতও উপস্থিত  ছিলেন। কিন্তু জনতার মতেন বিরুদ্ধে তখন কথা বলা সহজ ছিল না। এ জন্য তিনি চুপ করে বসে থাকতেন।

তারপর হযরত আবু বকর উমার ও আবু বকর উবাইদাহ (রা) সাকীফা বনী সায়িদাÑয় পৌঁছালেন এবং মুহাজিরদের পক্ষ থেকে উমার (রা) খিলাফাতের বিষয়টি আলোচনা শুরু করলেন। তখন সর্ব প্রথম যে আনসারী ব্যক্তি তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেন তিনি যায়িদ ইবন সাবিত।

হযরত হুবাব ইবনুল মুনজির (রা) একজন আনসারী ও বদরী সাহাবী।  তিনি যখন তাঁর বক্তৃতায় দুই আমীরের তত্ব পেশ করে মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বললেনঃ আপনাদের মধ্য থেকে একজন এবং আমাদের মধ্যে থেকে একজন আমীর হবেন। এছাড়া আর কিছুতেই আপোষ হবেনা। তখন যায়িদ ইবন সাবিত উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর বক্ত্যব্যের প্রতিবাদ করে এক নতুন তত্ব দিলেন। তিনি বলেনঃ রাসূল (সা) ছিলেন একজন মুহাজির। এখন ইমাও হবেন একজন মুহাজির। আর আমরা যেমন ছিলাম রাসূলের (সা) আনসার তেমনিভাবে এখন হবো ইমামের আনসার। একথা বলে তিনি আবু বকরের (রা) একটি হাত ধরে আনসারদের লক্ষ্য করে বলেনঃ এই তোমাদের বন্ধু তোমার হাতে বাইয়াত কর।৩২

হযরত যায়িদ (রা) এ বক্তব্য ছিল তারই গোত্রের লোকদের বিপক্ষে। তা সত্ত্বেও  স্বীয় অনুভূতি প্রকাশ করতে কুন্ঠবোধ করেননি। তাঁর বক্তব্য শেষ হরে হযরত আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে যায তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বরেন, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান দিন। যদি এর বিপরীত কিছু বলা হতো তাহলে  আমার  হয়তো মনতাম না।৩৩

হযরত রাসূলে করীম (সা) মদীনায় আসার পর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ ও এলকার রাজা বাদশা, আমীর উমা, ও গোত্র প্রধানদের চিঠিপত্র বিভিন্ন সময় তাঁর নিকট আসতে থাকে। যার বেশীর ভাগই হতো সুরইয়সী ও ইবরানী হিব্র“ ভাষায়। মদীনায় তখন এ দুটি ভাষা জানতো শুধু ইহুদিরা। তাদের ছির আাবার ইসলামের সাথে চরম দুশমনী। এ কারণে উক্ত ভাষা দুটি আয়ত্ত করা ছিল মুসলমাদের একান্ত প্রয়োজন।

হযরত রাসূলে করীম (সা) এ প্রয়োজনে তীব্রভাবে অনুভব করলেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) মেধার পরিচয় পেয়ে তাঁকেই এ কাজের জন্য নির্বাচিত করলেন। এ প্রসঙ্গে হযরত যায়িদের (রা) একটি বর্ণনা উদ্ধৃত হলোঃ

রাসূল (সা) মদীনায় এলে আমাকে তাঁর সামনে হাজির করা হয়। তিনি আমাকে বললেনঃ যায়িদ আমার জন্য তুমি ইহুদিদের লেখা শিখ। আল্লাহর কসম! তারা আমার পক্ষ থেকেইবরানী ভাষায় যা কিছু লিখা থাকে তার ওপর আমার আস্থা হয় না। তাই আমি ইবরনী ভাষা শিখলাম। মাত্র আধা মাসের মধ্যে এতে দক্ষতা অর্জন করে ফেললাম। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) ইহুদীদেরকে কিছু লেখার দরকার হলে আমিই লিখতাম এবং রাসূলকে (সা) কিছু লিখলে আমিই তা পাঠ করে শুনাতাম।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূল (সা) আমাকে বললেনঃ যায়িদ তুমি কি সুরইয়ানী ভাষা ভালো জান? এ ভাষায় আমার কাছে টিঠি পত্র আসে। বললামঃ না। তিনি বললেনঃ তাহলে এ ভাষাটি লিখে ফেল। এরপর আমি মাত্র সতের দিনে ভাষাটি শিখে ফেললাম।৩৪

যায়িদের (রা) এই সীমাহীন মেধা ও জ্ঞানের কারণে হযরত রসূলে কারীম (সা) যাবতীয় লেখালেখির দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করেন। মুহাম্মদ ইব উমার বলেনঃ যায়িদ আরবী ও ইবরানীÑদু ভাষাতেই লিখতেন।৩৫ বালাজুরী বলেনঃ সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন উবাই ইবন কা’ব আলÑআনসারী। উবাই এর অনুপস্থিতিতে যায়িদ এ দায়িত্ব পালন করের। তাঁরা ওহী ছাড়াও রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি পত্র ও লিখতেন।৩৬  রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। হযরত আবু বকর (রা) ও উমারের (রা) খিলাফত কালেও এ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। তাবে তখন কাজের চাপ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় মুয়াইকিব আদÑদাওসীকে তাঁর  সহকারী নিয়োগ করা হয়।৩৭

ইসলামী হুকুমাতের একটি অতি মর্যাদাপূর্ন দফতর হলো বিচার বা কাজা। প্রসিদ্ধ মতে এ দফতারটি সৃষ্টি হয় হযরত ফারুকে আজমের খিলাফতকালে। রাষূল (সা) ও আবু বকরের (রা) আমলে পৃথকভাবে এ দফতরটি ছিল না। খলীফা হযরত উমার (রা) এর সূচনা করেন এবং হযরত যায়িদ ইবন সাবিতকে (রা) মদীনায় কাজী নিয়োগ করেন। তাবাকাত ইবন সা’দ ও আথবারুল কুজাত গ্রন্থে এসেছেঃ উমার (রা) যায়িদকে কাজী নিয়োগ কেরন এবং তাঁর ভাতাও বির্ধারণ করেন।৩৮

তখনও বিচারকের জন্য পৃথক আদালত ভবন বাড়ি নির্মাণ হয়নি। হযরত যায়িদের (রা) বড়িই ছিল দারুল কাজা বা বিচারলয়। ঘরের মেঝেতে ফরাশ বিছানো থাকতো। তিনি তার ওপর মাঝখানে বসতেন। রাজধানী মদীনা ও তার আশে পামের যাবতীয় মামলা মোকদ্দামা হযরত যায়িদের (রা) এজলাসে উপস্থিত হতো। এমন কি তৎকালীন খলীফা খোদ উমারের (রা) বিরুদ্ধেও এখানে মামলা দায়ের হয়েছে এবং তার বিচারও চলেছে।

ইমাম শা’বী বর্ণনা করেছেন। একবার খলীফা হযরত উমার (রা) ও হযরত উবাই ইবর কাবের (রা) মধ্যে একটি বিবাদ দেখা দিল। হযরত যায়িদের (রা) এজলাশে মুকাদ্দামা পেশ হলে। বিবাদী হিসাবে খলীফা উমার (রা) আদালতে হাজির হরেন। আধুনিক যুগে যেমন আাদালতে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানে বসার জন্য চেয়ার দানের নিয়ম হয়েছে, হযরত যায়িদ ও তমেনী খলীফাকে নিচের আসনের পাশে বসার স্তানে করে দেন। কিন্তু ইসলাম যে সাম্য ও মসাতার বিধান কায়েম করেছিল, সাহাবায়ে কিরাম (রা) তা অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। বিশেষত হযরত উমার(রা) তো এ ব্যাপারে ছিরেন আপোষহীন। তিনি বিচারক হযরত যায়িদের (রা) এ আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেন, এ হলো আপনার প্রথম অবিচার। আমাকে আমার প্রতিপক্ষের সাথে বসা উচিত। অতঃপর বাদী বিবাদী উভয়ে আদালতের সাম্েন এক সাথে বসেন।

মামলার শুনানী শুরু হলো। হযরত উবাই (রা) ছিলেন বাদী। তিনি ছিলেন একটি বিষয়ের দাবীদার; পক্ষান্তরে উমার (রা) চিলৈলন অস্বীকারী। ইসলামী বিচার বিধি অনুাযায়ি অস্বীকারকরীর ওপর বসম বাশপথ দেওয়া ওয়াজিব। কিন্তু হযরত যায়িদ (রা)খিলাফতের সম্মান ও মর্যাদার প্রতিলক্ষরেখে বাদীকে বলেন, যদিও নিয়ম নয় তবুও আমি বলছি আপনি আমীরুল মুমিনীনকে কসম দানের বিষয়টি মাফ করেদিন। একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন ক্ষোভের সাথে বললেনঃ যায়িদ ন্যায় বিচারক হতে পারবেন, যতক্ষন না উমাও সাধারন একজন মুসলমান তাঁর নিকট সমান হয়।৩৯

তৎকালীন খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে যদিও একাধিক স্থানীয় বাইতুল মাল ছিল, তবুও দারুল খিলাফা মদীনায় ছিল কেন্দ্রীয় বাইতুলমাল। হযরত যায়িদ (রা) ছিরেন এই কেন্দ্রীয় বাইতুলামলের দায়িত্বশীল। হিজরী ৩১ সনে খলীফা উসমান (রা) তাঁকে এ দায়িত্বে নিয়োগ কেরন। এই বাইতুলামলের কর্মচারীদের মধ্যে ওহাইব নামে যায়িদের (রা) একজন দাসও ছিলেন। তিনি চিরৈন খুবই বুদ্ধিমান। নানা কাজে যায়িদকে (রা) সাহায্য করতেন।

একদিন তিনি বাইতুল মালে কাজ করছেন। এমন সময় খলীফা উসমান (রা) সেখানে উপস্থিত হন। তিনি জিজ্ঞেসা করেনঃ এ কে? যায়েদ বলেনঃ আমার দাস। উসমান (রা) বলেনঃ আমাদের নিকট তার অধিকার আছে। কারণ সে মুসলমানদের সাহয্য করছে। মূলত তিনি বাইতুলমালের কাজের  প্রতি ইঙ্গিত  কারেন। তারপর তিনি দু হাজার দিরহাম তাঁর বেতন নির্ধারনের ইচ্ছা করেন। কিন্তু হযরত যায়িদ এক হাজার করার প্রস্তাব রাখেন। খলীফা তাতে রাজী হন। এভাবে তাঁর বেতন এক হাজার নির্ধারিত হয়।৪০ খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) আমালে মুহাজির ও আনসারদের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বেয়ে গঠিত মজলিসে শূরার একজন সম্মনিত সদস্য ছিলেন যায়িদ (রা)। খলীফা উমার (রা) উক্ত শূলাকে একটি উপদেষ্ট কাউন্সিলের রুপ দান করেন। যায়িদ (রা) তারও সদস্য ছিলেন।

হযরত যায়িদেরও (রা) মধ্যে ইল্ম ও দ্বীনের পূর্র্ণতার সাথে প্রশাসনিক যোগ্যতাও ছিল। তাঁর ওপর খলীফা উমারের (রা) এতখানি আস্তা ছিল যে, যখনি তিনি মদীনার বাইরে সফরে যেতেন, তাঁকেই স্থালাভিষিক্ত করে যেতেন। খলীফা উসমানও (রা) একই পন্থা অনুসারণ করেন। ইবন উমারের থেকে নাফে বর্ণনা করেছেন। উমার (রা) যখন হজ্জে যেতেন, যায়িদকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। উসমানও তাই করতেন।৪১

হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে মোট তিনবার খলীফার স্থলভিষিক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।  হিজরী ১৬ ও ১৭ সনে দু’বার। বালাজুরী বলেনঃ হিজরী ২৩ সনে রাসূলুল্লাহর (সা) সহধমির্নীদের সাথে নিয়ে উমার হজ্জ করেন। তখনও যায়িদ ইবন সাবিতকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।৪২ খলীফা উমার (রা) যখন শাম সফর করেন তখনও যায়িদকে (রা) দায়িত্ব দিয়ে যান। শামে পৌঁছে তিনি যায়িদের নিকট ওয পত্র লেখেন তাতে যায়িদরে সামটি খলীফার নিজের নামের আগেই উল্লেখ করেন। তিনি লেখেনঃ

-যায়িদ ইবন সাবিতের প্রতি উমার ইবনুল খাত্তাবের নিকট থেকে।৪৩

হযরত যায়িদ (র) অত্যন্ত সসতর্কতা ও যোগ্যতার সাথে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। হযরত উমার (রা) তাঁর দায়িত্ব পালনে খুশী হতেন এবং ফিরে এসে তাঁকে রাষ্টের পক্ষ থেকে কিছু না কিছু দান করতেন।

হাদীসে এসেছে, ঈমানের সত্তরটিও বেশী শাখা আছে। তার মধ্যে আমানদারী বা বিশ্বস্তাতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এমন কি রাসূলে (সা) বলেছেনঃ যার আমানতদারী নেই তার ঈমানও নেই। হযরত যায়িদ (রা) মধ্যে এ আমানাদতদারীর পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। তাই রাষ্ট্রের অর্থ বিষয়ক অনেক  গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব বিভিন্ন সময় তাঁর ওপর অর্পিত হয়েছে।

হযরত রাসূলে করীমের (সা) সময়কালে যে গনীমাতের মাল আসতো তার বেশীর ভাগ তিনি নিজ হাতে বন্টন করতেন। এতে একাজটি গুরুত্ব কত খানি তা বুঝা যায়। হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে ইযারমুকের যুদ্ধটি অতি প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীামতের বিপুল পরিমান সম্পদ বন্টনের ভার খলঅফা অর্পন করেছিলেন যায়িদের  ওপর। তাছাড়া খলীফা উমার (রা) যখন সাহাবাদের ভাতা নির্ধারণ করেন তখন আনাসাদের ভাতা বন্টনের দায়িত্ব তাঁকেই দেন। তিনি আয়ালী থেকে শুরু করেন। তারপর যাথাক্রমে আবদুল আশহাল, আউস, খাযরাজ প্রভৃতি গোত্রে বন্টন করে সব শেষে নিজের ভাতা গ্রহণ করেন।৪৪

হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন খলীফার দরবারের অতি ঘনিষ্টজন। হযরত উমারের (রা) নিকটতম ব্যক্তিগেদর মধ্যে তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে। খলীফা উসমানেরও (রা) তিনি বিশ্বাসভাজন ছিলেন। তাঁর খিলাফতের শেষ দিকে যখন চতুর্র্দিকে বিদ্রোহ ও অশান্তি ধূমায়িত হয়ে ওঠে তখনও যায়িদ (রা) ছিলেন খলীফার পক্ষে। সেই হাঙ্গামা ও বিশৃংখলার মধ্যে তিনি একদিন আনসারদের সম্বোধনরা করে বলেনঃ  ওহে আনসার সম্প্রদায়! তোমারা আরো একবার আল্লাহর আনাসার হও। দুঃখের বিষয় হযরত যায়িদের(রা) মত ব্যক্তির সে দিন ইতিহার সেই চরম ট্রাজেডী রুখতে পারেননি।

এই ব্যর্থতার কারণও ছিল। কিছু সাহাবায়ে কিরাম (রা) কেন যে হযরত উসমানের (রা) প্রতি সেদিন ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আবু আইউব আল-আনসারীর (রা) মত বিশিষ্ট সাহাবীও ছিলেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) কথার প্রতিবাদ করে বললেনঃ উসমানের সাহায্যের জন্য তুমি মানুষকে এজন্য উৎসাহিত করছে যে, তিনি তোমাকে বহু দাস দিয়েছেন। হযরত আবু আইউব (রা) ছিলেন বিশাল মর্যদার অধিকারী একজন আনসারী সাহাবী। তাঁর সামনে হযরত যায়িদের (রা) চুপ করে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিলনা।

তাহজীবুল কামাল গ্রন্থাকার হযরত যায়িদের (রা) একাধিক স্ত্রী ও ঊনত্রিশজন ছেলে-মেয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী হযরত সা’দ ইবন রাবী’ আল-আনাসারীর কণ্যা একজন।৪৫

হযরত সা’দ  ইবন রাবী ’ (রা) উহুদে শহাদাত বরণ করেন। দু’কন্যা ও স্ত্রী ও রেখে যান। স্ত্রী তখন গর্ভবর্তী। গর্ভের এই সন্তটিই উম্মু সা’দ বা উম্মুল আলা। ভালো নামস জামীলা। পরবর্তীকালে তিনিই যায়িদের (রা) সম্মানিত স্ত্রী। সা’দ (রা) যখন মারা যান তভন মীরামের আয়াতনাযিন হয়নি। এ কারণ জাহিলী প্রথা অনুযায়ী সাদের ভাই গোটা মীরাস আতœাসাৎ করে। তখনই রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মীরাসের আয়াত নাযিল হয়। তিনি সাদের (রা) ভাইকে ডেকে ২/৩ অংশ দু’ কন্যা এবং ১/২ অংশ স্ত্রীকে দিয়ে বাকী অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেন। তখনও গর্ভের সন্তানকে মীরাস দানের বিধান চালু হয়নি। পরবর্তীকালের খলীফা উমার (রা) গর্ভের সন্তানকে মীরস দানের বিধান চালু করলে হযরত যাযিদ স্ত্রীকে বললেনঃ তুমি যদি চাও তাহলে তোমার পিতার মীরাসের ব্যাপারে তোমার বোনদের সাথে কথা বলতে পার। কারণ, এখন আমীরুল মুমিনীন গর্ভের সন্তানদের মীরস ঘোষনা করেছেন। উম্মু সা’দ বললেনঃ না, আমি আমার বোনদের কাছে কিছুই চাইবো না।৪৬

হযরত যায়িদের (রা) সন্তানদের মধ্যে খারিজ ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তিনি বিখ্যাত সাতজন ফক্হীর অন্যত এবং উম্মু সা’ দের গর্ভজাত সন্তান। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান এবং একজন পৌত্রও নিজেদের যুগের বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা হাদীস শাস্ত্রের ইমাম হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর আযাদকৃত দাসের সংখ্যাও ছিল অনেক। তাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন সাবিত ইবন উবাইদ ও ওহাইব।

হযরত যায়িদের (রা) মৃত্যু সন সম্পর্কে প্রচুর মতভেদ আছে। ওয়াকিদীর মতে হিজরী ৪৫ সন। আলী-আল মদীনীর মতে হিঃ ৫১ আহমাদ ইবন হাম্বল ও আবু হাফ্স আলÑফাল্লাসের মতে হিঃ ৫১ এবং আলÑহায়সাম ইবন আদী ও অইয়াহইয়া ইবন মুঈেনের মতে হিঃ ৫৫ সনে তিনি মারা যান।৪৭ ইবন হাজার (রহ) বলেনঃ অধিকাংশের মতে হিজরী ৪৫ সনে তিনি মারা গেছেন।৪৮ মৃত্যাকলে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪/৫৫ বছর। মারওয়ান ইবন হাকাম তখন মদীনার আমীর। তাঁর সাথে যায়িদের (র) অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। তিনিই জানাযান নামায পড়ান।৪৯ তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে জনগন শোকভিত হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে জনগন শোকাভূত হয়ে পড়েন। হযরত আবু হুরাইরা (রা) তাঁর মৃত্যুর দিন মন্তব্য করেনঃ আজ হাবরুল উম্মাহ’ উম্মাতের ধর্মীয় নেতা চলে গেলেন।৫০ সালেম ইব আবদুল্লাহ বলেনঃ যায়িদ ইবন সাবিত যে দিন মারা যান সেদিন আমারা আবদুল্লাহ ইবন উমারের (রা) সংগে ছিলাম। আমি বললামঃ আজ  জনগণের শিক্ষক মারা গেলেন। ইবন উমার (রা) বললেনঃ আল্লাহ তাখে রহম করুন। উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি ছিলেন জনগণের শিক্ষক ও হাবর (ধর্মীয় নেতা)।৫১

প্রখ্যাত তাবেঈ ইবনুল মুসায়্যাব বলেনঃ আমি যায়িদ ইবন সাবিতের (রা) জানাযায় শরীক ছিলাম যখন তাঁকে কবরে নামানো হলো ইবন আব্বাস (রা) তোমারা যারা ইলম কিভাবে উঠে যায়  তা জানতে চাও তারা জেনে নাও এভবে ইলম উঠে যায়। আজ বহু ইলম চলে গলে। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে তিনি বলেনঃ আজ অনেক ইলম দাফন হয়ে গেল। হাত দিয়ে কবরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ এভাবে ইলম চলে যায়। একজন মানুষ মারা যায় এবং সে জানতে তা যদি অন্যরা না জানে তাহলে সে তার জ্ঞান নিয়েই কবরে চলে যায়।৫২ কবি হাসনাস ইÍ সাবিত (রা) একটি শোকাগাঁধা রচনা করেন। তাঁর একটি পংক্তি নিম্নরুপঃ৫৩

-হাস্সান ও তার পুত্রের পর কবিতার ছন্দ কে আর রচনা করবে?

বিরাআত, ফারেয়েজ, বিচার ও ফাতাওয় শাস্ত্রে হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। পবিত্র কুরআনের ভাষায় তিনি রাসখ ফিল ইলম (জ্ঞানে সুগভীর)। হযরত আবদ্ল্লুাহ ইবন আব্বাস (রা) যাকে সাহাবাদের মধ্যে ইলমের সাগর গণ্য করা হতো তিনিও যায়িদকে রাসেখ ফিল ইলম গন্য করতেন।৫৪ ইবনুল আসীরের মতে তিনি সাহাবা সমাজের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।৫৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) অন্যতম শ্রেষ্ট ছাত্র মাসরুক ইবন আজাদা বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবাদের মধ্যে ইলম জ্ঞান পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি। তাঁদের সকালের জ্ঞানের সমাবেশ ঘটেছে উমার, আলী আবদুল্লাহ মুয়াজ আবুদ দারদা ও যায়িদ ইবন সাবিত এই ছয়জনের মধ্যে। তিনি আরো বলেনঃ আমি দীনায় গিয়ে রাসূলুল্লহার (সা) সাহাবীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম,যায়িদ ইবন সাবিত আর রাসেখুনা ফিল ইলম এর অন্যতম ব্যক্তি।৫৬

ইসলাম যে সকল জ্ঞানÑবিজ্ঞানের ভিত্তিস্থাপন করেছে ইলমে কিরাআত তার মেধ্য বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। এ শাস্ত্রে হযরত যায়িদের পন্ডিত্য সাহাবায়ে কিরম ও তাবেঈনের প্রতিটি ব্যক্তি স্বীকার করতেন।

ইমাম শী’বীর মত শেষ্ট বিদ্বান তাবেঈ বলেনঃ যায়িদ ইলমে ফারায়েজের মত ইলমে কুরআতে ও সকল সাহাবীর ওপর শ্রেষ্টত্ব অর্জন করেছিলেন।৫৭

পবিত্র কুরআনের সাথে হযরত যায়িদের (রা) যে গভীর সম্পর্ক ছিল তার প্রমাণ  পাওয়া যায় তাঁর ইসলাম গ্রহণের সময়ের ঘটনা দ্বারা। মাত্র এগারো বছর বয়সে ১৭টি সূরা হিফজ করেন। অবশিষ্ট সূরা হিফজ করেন। জীবনে কুরআরন লেখালেখির মধ্যেই অতিবাহিত হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যখন যতটুকু ওহী নাযিল হতো তিনি জেনে লিখে নিতেন ও মুখস্থ করে ফেলতেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় গোটা কুরআন তাঁর মুখস্থ হয়ে যায়।৫৮ কাতাদাহ্ বলেনঃ চারজন তাঁদের সবাই আনাসার উবাই ইবন কা’ব মুয়াজ ইবন জাবাল, যায়িদ ইবন সাবিত ও আবু যায়িদ।৫৯ এ কারণে খলীফা আবু বকর (রা) যখন কুরআন সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নেনতখন এ দাযিত্ব পালনের জন্য যায়িদকে নির্বাচিত করেন। আর খলীফা উসমান যখন কুরআনের কপি তৈরী করান তখনও এ কাজে যায়িদের (রা) সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য মনে করেন।

হযরত উবাই ইবন কা’ব (রা) ছিলেন কুরার বা কুরআন পঠকদের নেতা। হযরত উমার (র) যায়িদকে তাঁরও ওপর প্রাধান্য দিতেন। আবদুর রহমান আসসুলামী একবার খলীফা উসমানকে কুরআন পাঠ করে শুনাতে চাইলে তিনি বললেন তাহলে তো তুমি আমাকে মানুষের কাজ থেকে বিরত রাখবে। তুমি বরং যায়িদ ইবন সাবিতের কাছে যাও। এ কাজের জন্য তাঁর হাতে বেশী সময় আছে। তাঁকে  শুনাও তাঁর ও আমার পাঠ একই। দু জনের পাঠে কোন ভিন্নতা নেই।৬০

হযরত যায়িদের কিরাআতের সিলসিলা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত চিল। সেহেতু তিনি কুরাইশদের মত পাঠ করতেন এ কারণে মানুষের ঝোঁক ছিল তাঁরই দিকে। হযরত উবাই ইবন কাবের জীবদ্দশায় যদিও তিনি এক্ষেত্রে সকলের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেননি,  তবে তাঁর মৃত্যুর পর গোটা মুসলিম বিশ্বের একক কেন্দ্রে পরিণত হন। বিভিন্ন অঞ্চলের মাসুষ মদীনায় তাঁর নিকট ছুটে আসতো।

গযরদ যায়িদ (রা) কুরআন মাজীদের যে কিরআত বা পাঠ প্রতিষ্টা করেন তা আজও বেঁচে আছে। ইবন আব্বাস, আবু আবদির রহমান, আসÑসুলামী, আবুল আলিয়া রাইয়্যাহী, আবু জাফর প্রমুখ ছিলেন কিরআত শাস্ত্রে তাঁর ছাত্র।৬১

পবিত্র কুরআনের পরেই মাহানবীর স্থান। তিনি অন্যদের মত বেশী হাদীস বর্ণনা করেননি। তবে তাঁর বৈশিষ্ট এই ছিল যে তিনি দিরায়াত বা যুক্তিকে কাজে লাগাতেন।  হযরত রাফে  ইবন খাদীজা (রা) বর্ণনা করলেন, রাসূল (সা) ভূমি ইজারা দিতে নিষেধ করেছেন। এ কথা যায়িদের (রা) কানে গেলে বললেনঃ  আল্লাহ রাফেকে ক্ষা করুন! তাঁর এত বেশি হাদীস বর্ণনার রহস্য আমর জানা আছে। আসল ঘটনা হলো। দু ব্যক্তি ঝগড়া করছিল। রাসূল (সা) তা দেখে বলেন এই যে যদি অবস্থা হয় তাহলে ইজারার ভিত্তিতে ভূমি চাষ করা উচিত নয়। রাফে শুধু শেষের অংশটুকু শুনেছেন।৬২

হযরত আয়িশা (রা) যুবইরের (রা) সন্তনাদের নিকট বর্ণনা করেন, যে রাসূল (সা) আসরের পরে তাঁর ঘরে দু রাকাত নামায আদায় করেছিলেন। তাঁরা এ দু’ রাকায়াতকে সুন্নাত মনে করে আদায় করা শুরু করেন। এ কথা যায়িদ (রা) জানতে পেরে বললেনঃ আল্লাহ আয়িশাকে ক্ষমা করুন! হাদীসের জ্ঞান তাঁর চেয়ে আমরা বেশী আছে। আসরের পরে নামায আদায়ের কারণ হলো, দুপুরে কয়েকজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সা) সাথেঞ সাক্ষাৎ করতে আসে। তারা প্রশ্ন করছিল, আর রাসূল (সা) উত্তর দিচ্ছিলেন। এভাবে জুহরের নামাজের সময হলে তা আদায় করেন। ঘরে ফেরার পর স্মরণ হয় যে, জুহরের ফরজের পরের দু’রাকা’য়াত সুন্নাত আদায় করেননি।তখন সেখানেই দু’রাকা’ য়েত নামায আদায় করেন। আল্লাহ আয়িশাকে ক্ষমা করুন। তাঁর চেয়ে আমর বেশী জানা আছে যে, রাসূল (সা) আসরে পরে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।৬৩

কোন হাদীস সহীহ হলে এবং সে সম্পর্কে তাঁর নিকট কেউ জিজ্ঞেসা করলে তিনি সমর্থন জানাতেন। একবার হযরত আবু সা’ঈদ খুদরী (রা) স্বৈরাচারী উমাইয়্যা শাসক মারওয়ানের সামনে সাহাবীদের মর্যদাবিষয়ক একটি হাদীস বর্ণনা করেন। মারওয়ানত বললেনঃ আপনি অসত্য বলছেন। যায়িদ ইবন সাবিত ও রাফে ইবন খাদীজা (রা) মারওয়ানের পাশে মঞ্চে বসে ছিলেন। আবু সা’ঈদ মারওয়ানকে বললেন, আপনি তাঁদের কাছে জিজ্ঞেসা করতে পারেন। মারওয়ান তা না করে আবু সা’ঈদকে মারার জন্য ছুড়ি তুলে ধরেন। তখন এ দুই মাহান সাহাবী আবু সা’ঈদের কথা সত্য বরে সামর্থন করেন।৬৪

হযরত যায়িদের (রা) অধিকাংশ হাদীস সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত। তাছাড়া আবু বকর উমার ও উসমান (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস বর্ণনা করেছেন।৬৫

হাদীস শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের তালিকা অনেক দীঘ। তাঁর কাছে যাঁরা হাদীস শুনেছেরন এবং তাঁঁর সুত্রে বর্ণনা করেছেন, এমন কয়েকজন বিখ্যাত সাহাবী ও তাবেঈর নাম এখানে উল্লেখ করা হলো।৬৬

ইবন আব্বাস, ইবন উমার, আনাস ইবন মালিক, আবু হুরাইরা, আবু সা’ঈদ খুদরী, সাহ্ল ইবন হুনাইফ, সাহ্ল ইবন সা’দ, আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আলÑখুতামী। এরা সকলে সাহাবী। সা’ঈদ ইবন মুসাইয়্যাব, কাসেম ইবন মুহাম্মদ, আবান ইবন উসমান, খারেজা ইবন যায়িদ (যায়িদের ছেলে এবং মীনার সপ্ত ফুকাহার এরকজন), সাহ্ল ইবন আবী হাসামা আবু আমার, মারওয়ান ইবন হাজম, ইবাইদ ইবন সাব্বাক, আতা ইবন ইয়াসার বুসর ইবন সা’ঈদ, হাজার আলÑমুদরী, তাউস, উরওয়া ইবন যুবাইর, সালমান ইবন যায়িদ, সাবিত ইবন উবাইদ, উম্মু সা’দ (যায়িদের স্ত্রী)। এছাড়া আরো আনেক। হযরত যায়িদের (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তুলনামূলকভবে অনেক কম। মাত্র ৯২ (বিরানব্বই) টি। তারমধ্যে পাঁচটি মুত্তফাক আলাইহি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বনের কারণে তাঁর হাদীসের সংখ্যা এত কম হয়েছে। অন্যথায় তাঁর অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে থাকা পড়েছে, বহু হাদীস শোনা এবং বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্যও হয়েছে। এত কম হাদীস বর্ণনার কারণ হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) একটি সতর্কবাণী। আর সে বানীই তাঁর মত আরও অনেককে বেশী হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে সংযমী করে তুলেছে। মুহাম্মদ ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাতে আনসারদের তৃতীয় তাবকায় তাঁকে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা জাহাবী তাজকিরাতুর হাফ্ফজ গ্রন্থে প্রথম তাবারয় তাঁর আলোচনা এনেছেন।

ফিকাহ্ শাস্ত্রে হযরত যায়িদ (রা) দারুণ পারদর্শী ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইফতার আসনে অধিষ্টিত হন। সাহ্ল ইবন আবী খায়সামা বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় মুহাজীরদের তিন ব্যক্তি ও আনসারদের তিন ব্যক্তি ফাতওয়া দিতেন। আনসারদের সেই তিন জনের একজন হলেন যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।৬৭ ইমাম শা’বী ও প্রখ্যাত তাবে’ঈ মাসরুক একই ধরনের কথা বর্ণনা করেছেন।৬৮ হযরত আবু বকর (রা) ও উমারের (রা) খিলাফতকালেও তিনি মদীনায় ইফতার মসনতেদ আসীন ছিলেন। শুধু তাই নয় হিজরী ৪৫ সন পর্যন্ত আমারণ এ পদে অধিষ্টিত থাকেন। ইবন সা’দ বর্ণণা করেছেন। খলীফা আবু বকর (রা) কোন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হলে কতিপয়  চিন্তাশীল ও ফিকাহবিদ আনাসার ও মুহজির সাহাবীর সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁদের  মধ্যে যায়িদ ইবন সাবিতও একজন। আর তাঁরই আবু বকর, উমার ও উসমানের (রা) যুদে ফাতওয়া দিতেন।৬৯

কাবীস ইবন জুওয়াইব বর্ণনা করেছেন যে উমার, উসমান,আলীর (রা) আমলে এমনকি হিজরী ৪০ সনে মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হিজরী ৪৫ সনে মৃত্যু পর্যন্ত যায়িদ (রা) মদীনার বিচার ও ফাতওয়া, কিরাআত ও ফারায়েজ শাস্ত্রের প্রধান ছিলেন।৭০ তাঁর যোগ্যতার পূর্ণ স্বীকৃতি খলীফা উমার (রা) দিয়েছেনভ তিনি যায়িদকে (রা) এত গুরুত্ব দিতেন যে তাঁকে মদীনার বাইরে কোথাও যাওয়ার অনুমতি দিতেন না। মদীনার বইরে বিভিন্ন স্থানে অতি গরুত্বপূর্ণ পদ শূণ্য হতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সম্পদনের জন্য উপযুক্ত লোকের প্রয়োজন দেখা দিত, আর সেজন্য খলীফার নিকট বিভিন্ন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হতো। তিনি তাঁদের কাউকে মনোনীত করতেন। কিন্তু যায়িদের নামাটি প্রস্তাব করা হেলই তিনি বলতেন, যায়িদ আমার হিসাবের বাইরে নেই। কিন্তু আমি কি করবো? মদীনাবাসী তাঁর মুখাপেক্ষী বেশী। কারণ তাঁর কাছে যা পারে অন্যার কাছে তা তারা পারে না।৭১

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার বলতেন, যায়িদ ছিলেন ফারুকী খিলাফতের একজন বড় আলীম। উমার (রা) সকল মানুষকে নানা দেশে ও শহরে ছড়িযে দিয়েছিলেন। ফাতওয়া ও সিন্ধন্ত দানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। কিন্তু যায়িদ মদীনায় বসে বসে মদীনাবাসী এবং সেখানে আগত লোকদের নিকট ফাতওয়া দিতেন।৭২

সুলায়মান ইবন ইয়াসার বলেনঃ ফাতওয়া, ফারায়েজ ও কিরাআতে উমার ও উসমান (রা) যায়িদের (রা) ওপর কাউকে প্রাধান্য দিতেন না।৭৩ প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত সা’ঈদ ইবন মুসায়্যাব একজন মস্তবড় মুজতাহিদ হওয়া সত্বেও ফাতওয়া বিচারে হযরত যায়িদের (রা) অনুসারী ছিলেন। তাঁর সামনে যখন কোন মাসয়ালা বা প্রশ্ন আসতো এবং মানুষ অন্যান্য সাহাবীর ইজতিহাদসমূহ বর্ণনা করতো তখন তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, এ ব্যাপারে যায়িদ কি বলেছেন? বিচার ফায়সালায় যায়িদ ছিলেন সবচেয় বেশী জ্ঞানী। আর যে সকল বিষয়ে কোন হাদীস পাওয়া যায় না সে সম্পর্কে মাতাত দানের ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশী অন্তদৃষ্টির অধিকারী। তাঁর কোন কথা থাকলে তাই বল।৭৪

ইমাম মালিক (রহ) ছিলেন মদীনার ইমাম। আজও তিনি ফিকাহ ও হাদীস শাস্ত্রে অগাণিত মানুষের ইমাম। তিনি বলতেন, উমারে (রা) পরে যায়িদ ইবন সাবিত ছিলেন মদীনার ইমাম। ইমাম শাফেঈও (রহ) ফারায়েজ শাস্ত্রের সকল মাসয়ালা হযরত যায়িদের তাকলীদ করেছেন।৭৫

ফকীহ সাহাবীদের তিনিটি তাবকা বা স্তর ছিল। এর প্রথম তাবকায় ছিল হযরত যায়িদের (রা) স্থান। তিনি জীবনে বিপুল পমিাণ ফতওয়া দিয়েছেন। সবগুলি একত্রে সংগ্রহ করা হলে বিরট আকারে একটি  বই হবে।৭৬

হযরত যায়িদের (রা) ফিকাহ্ তাঁর জীবনকালে জনগণের নিকট ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। হযরত সা’ঈদ ইবন মুসায়্যাব বলতেন, যায়িদ ইবন সাবিতের এমনস কোন কথা নেই যার ওপর মানুষ সর্বসম্মতভাবেব  আমল করেনি। সাহাবাদের মধ্যে বহু ব্যক্তি এমন ছিলেন  যাঁদের কথার ওপর কেউই আমল করেননি। কিন্তু হযরত যায়িদের (রা) ফাতওয়ার ওপর তাঁর জীবনকালেই পূর্ব Ñপশ্চিমে সকল মানুষ আমল করেছে।

মানুষের ধারণা  ফিক্হা শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ও প্রসারের নিমিত্ত হচ্ছেন চারজন সাহবী ব্যক্তিত্ব। যায়িদ ইবন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আবদুল্লাহ ইবন উমার ও আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)। তাঁদের শিষ্য শ্গারিদদের মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাহনে ইলমে দীনের ্রসার ঘওর। কিন্তু মদীনা ছিল ইসলামের উৎস ও নবীর (সা) আবাস স্থল। এ ঘটনা যায়িদ ও তাঁর ছাত্রদের বদৌলতে জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র পরিণত হয়।

ফকীহ সাহাবীদের দুটি মজলিস ছিল। একটির সভাপতি ছিলেন হযরত উমার (রা) আর অন্যটির হযরত আলী (রা)। হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন উমারের (রা) মজলিসের সদস্য। এখানে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হতো এবং জটিল ও গুরুত্বপূর্ন মাসয়ালা সম্পর্কে সিন্ধান্ত গৃৃহীত হতো।

যে সকল বিষয় এখনো বাস্তবে ঘটেনি সে সম্পর্কে কোন প্রশ্নের জবাব তিনি দিতেন না খারেজা ইবন যায়িদ বর্ণনা করেন, কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেÑ এটা কি ঘটেছে, না ঘটেনি?  এ রকম প্রশ্ন না কে র তিনি কোন মতামত দিতেন না। বিষয়টি যদি বাস্তবে না ঘটতো তাহলে সে সম্পর্কে কিছুই বলতেন না।আর ঘটলে বলতেন।৭৭

হযরত যায়িদ (রা) সাধারণতঃ সব সময়ে জ্ঞান বিতরণে নিয়োজিত থাকতেন। তা সত্বেও সর্ব সাধারণের সুবিধার্যে মসজিদে নববীতে একটি নিদিষ্ট সময়ে ফাতওয়া ও মাসায়ালার জবাব দিতে বসতেন।

হযরত যায়িদের (রা) মাসায়ালাসমূহ ফিকাহর সকলের অধ্যায়ে পরিব্যাপ্ত।তার বিস্তারিত আলোচনা সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। এখানে সংক্ষেপে কয়েকটি মাসায়ালা তুলে ধরছি।

১. তিনি বলেছেন, ফরজ নামায ছাড়া অন্য নামায ঘর আদায় করা উত্তম।৭৮ তিনি বলেছেন, কাড়ীদে পরুশের সামায আদায় একটি নূর বা জ্যোতি বিশেষ। পুরুষ যখন ঘরে নামায়ে দাঁড়ায় তখন তার পাপসমূহ মাথার ওপর ঝুরন্ত অবস্থায় থাকে। একটি সিজদা দেওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তার পাপ মুছে দেন।৭৯

২. এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলো জুহর ও আসরে কি কিরআত আছে? বললেনঃ হ্যাঁ। রাসূল (সা) দীর্ঘ সময় ধরে এ দুটি নামায কিয়াম (দাড়িয়ে থাকা) করতেন এবং এ সমং তার ঠোঁট ও নাড়াচাড়া করতো।৮০ এর অর্থ এ নয় যে ইমামের পিছনে মুকতাদিরও কিরাআত করা উচিত। মূলতঃ প্রশ্নটি  ছিল ইমাম সম্পর্কে, মুকতাদি সম্পর্কে নয়। প্রশ্নের উদ্দেশ্যে হলো জুহর ও আসর নামাযে কি কিছু পড়া  হয়? যায়িদ ইবন সাবিত, আবু কাতাদাহ ও সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) থেকে যে সব বর্ণনা এসেছে তার কোনটি দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে. সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) পিছনে কিরআত করেছেন।

৩. কোন ব্যক্তি যদি নিজের বাসগৃহে নজের জীবদ্দশা পর্যন্ত কাউকে থাকার জন্য দান করে তাহলে তার মৃত্যুর পর তার ছেলেরা তার ওয়ারিস হবে। হযরত যায়িদের বর্ণনায় এর বিবরণ এসেছে। তিনি বলেছেনঃ

৪. হযরত যায়িদের মতে, যতদিন পর্যন্ত বাগানে ফল ভালো মত না আসে অথবা গাছে খেচুর  পরিপক্ক না হয় ততদিন তা আন্দাজে বেচাকেনা নাজায়েজ।৮১

ইসলাম পূর্ব আমলে মদীনায় গাছে  ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই বিক্রির প্রথা ছিল। এরত যকন ক্রেতার  লোকসান হতো তখন দু পক্ষের মধ্যে বিবাদ শুরু হতো। রাসূল (সা) মদীনায় এসে এর অবস্থা দেখে এ ধরনের কেনাবেচা করতে নিষেধ করেন।

ফিকাহর অন্য সকল অধ্যায়ের চেয়ে ফারায়েজ এর অধ্যায় ছিল হযরত যায়িদের বিশেষ পারদর্শিতা। রাসূলুল্লাহর (সা) একটি হাদীসে এসেছে:৮২ আমার উম্মতের সবচেয়ে বড় ফারায়েজ শাস্ত্রে ফরেজ বিশেষজ্ঞ যায়িধ ইবন সাবিত। রাসূলুল্লাহর (সা) এ নদ দ্বারা বুঝা যায় তিনি ফারায়েজ শাস্ত্রে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামও এ শাস্ত্রে তাঁর পন্ডিত্য স্বীকার করতেন। খলীফা উমার (রাা) তাঁর জাবীয়ার ঐতিহাসিক ভাষণে অগণিত শ্রোতার সামনে ঘোষণা করেনঃ ফারায়েজ স্মপর্কে কারো কিছু জিজ্ঞাসার থাকলে সে যেন যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট যায়।৮৩ তাঁর সমকালীন লোকেরা বলতো,যায়িদ ফারায়েজ ও কুরআনে অন্যদের অতিক্রম করে গেছেন।৮৪

ফারায়েজ শাস্ত্রটি বেশ জটিল। কুরআনে  এ মাস্ত্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ মাসায়ালা সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। তার বিস্তরিত ব্যাখ্যাÑ বিশ্লেষণ রাসূলুল্লাহর (সা) বানী, কর্ম এবং সাহাবায়ে কিরামের (সা) ফাতওয়া ও বিচার আচার থেকেই গ্রহণ করা হয়। কুরআনে মীরাস ওঅসীয়াত বিষয়ে যা কিছু এসেছে তা অতি চুম্বক কথায়। তাতে স্বমীÑস্ত্রী, পুত্রÑকন্যা, মাতা, পিতা, ভ্রাতাÑভগ্নি ইত্যাতি ধরনের ইত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ ঘোষণা করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এ সীমা লংঘন করবে সে হবে মূলত নিজের ওপর অত্যাচারী।

হযরত রাসূলে কারীম (সা) বিচার ফায়সালার  মধ্যোমে এই সংক্ষিপ্ত বিধানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর ইনতিকালের পর যায়িদ (রা) এ শাস্ত্রের এত উন্নতি সাধন করেন যে,তাঁর পরেই এ বিষয়ে গ্রন্থ রচিত হয় এবং বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রে পরিণত হয়। হযরত আবদুল্লাহ  ইবন উমারের (সা) মত জ্ঞানী ও উঁচু মর্যাদার সাহাবীরাও যায়িদের (রা) এর নিকট ফারায়েজ সংক্রান্ত মাসায়ালর সমাধান জানতে চাইতেন।

ইয়ামামরা নিহত অধিবাসীদের ব্যাপার হযরত আবু বকর (রা) হযরত যায়িদের (রা) ফাতওয়া অনুযায়ী ফায়সারা করেন। অর্থ্যৎ যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদেরই মৃতদের ওয়ারিস নির্ধারণ করেন। মৃতদেরকে পরস্পর ওয়ারিস নির্ধরাণ করেননি।৮৫

আমওয়াসের তা’উন মাহমারীতে যখন গোত্রের পর গোত্র মৃত্যু বরণ করে তখন উমার (রা) যায়িদের (রা) উল্লেখিত মতের ওপর ভিত্তিতে সমাধান দেন। এমন কি হযরত আবদুল্লাহ ইবনর আব্বাস (রা) যাঁকে উম্মাতের তত্ত্বজ্ঞনী ও জ্ঞানের সাগর বলা হয়, তিনিও যায়িদের (রা) সমাধানে নিশ্চিত হতেন।

একদিন তিনি ছাত্র আকরামকে একথা বরে পাঠালেন, তুমি যায়িদকে জিজ্ঞেসা করে এসো যে,এক ব্যক্তি স্ত্রী ও মাতা পিতা রেখে মারা গেছে, তার মীরাস কিভাবে বন্টিত হবে? যায়িদ বললেন, স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকী অর্ধেকের একÑতৃতীয়াংশ মাতা এবং অবশিষ্ট যা থাকবে তা পাবে পিতা। ইবন আব্বাসের (রা) ধারনো ছিল ভিন্ন। তিনি মনে করতেনর মাতা পাবে একÑতৃতীয়াংশ। এজন্য আবার জানতে চাইলেন, এরকম বন্টন কি কি কুরআনে আছে, না এা আপনার নিজের মত? যায়িদ (রা) বললেন, এ  আমার ইজতিহাদ। আমি মাতাকে পিতার ওপর প্রাধান্য দিতে পারিনে।৮৬

খিরাফতের প্রতন্ত অঞ্চল থেকে জনগণ লিখিত আকার ফাতওয়া চেয়ে চিঠি লিখতো। তিনিও লিখিত জবাব দিতেন। আমীর মু’য়াবিয় (রা) একবার চিঠি মারফত দাদার অংশ সস্পর্কে  যায়িদের (র) ফাতওয়া জানতে চান। হযরত যায়িদ (রা) জবাবে যে লিখিত ফাতওয়াটি দান করেন তা কানযুল উম্মাল গ্রন্থে বর্ণিত হযেছে। তিনি সেই চিঠিতে খলীফা উমার (রা) ও উসমান যেখাবে দাদার অংশ বন্টন করেছিলেন তা উল্লেখ করেন।৮৭

হযরত যায়িদ (র) ফারয়েজের নানা ধারনের জিজ্ঞসা বা মাসয়ালর সমাধান খলীফা উমারের (রা) আমলেই বিন্যাস করেন।৮৮ তাঁর বোধা ও বুদ্ধিতে নতুন সম্যসার উদয় হতো আর তিনি তার সামাধান বের করতেন। পরবর্তীাকলে এ সব সমাধান এ শাস্ত্রের অবিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত হয়।

হযরত যায়িদ (রা) দাদা মীরাসের ব্যাপারে যে সিদ্ধন্ত দান করেন সাহাবাদের মধ্যে অনেকেই তার  বিরোধীতা ছিলেন। তবে জনতার সমর্থর তার পক্ষেই ছিল। ফারায়েজ শাস্ত্রে দাদার মীরাস একটি দারুণ মতবিরোধ পূূর্ণ মাসায়াল। এমন কি হযরত যায়িদ (রা) এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম বুখারী আল Ñফারায়েজ অধ্যায়ে দাদার মীরাস শিােনামে একটি অনুচ্ছেদ এনেছেন। তাতে তিনি এ মতবিরোধের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি একাথাও বলেছেন এ বিষয়ে ইবন উমার আলী, ইবন মাসউদ, ও যায়িদের (রা) বিভিন্ন রকম কথা বর্ণিত হয়েছে।৮৯ তবে যে মতের ওপর হযরত যায়িদের (রা) শেষ জীবন পর্যন্ত অটল ছিলেন উামর ও উসমান (রা) সেটাই প্রয়োগযোগ্য মনে করেছেন।

ইসলামের ইতিহাসে হযরত উমার (রা) সর্বপ্রথম দাদার অংশ গ্রহণ করেন। তাঁর এক পৌত্র মারা গেলে তিনি নিজেকে তার যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী মনে করতে থাকেন। লোকেরা এর বিরোধীতা মত পোসন করতে থাকে। একদিন হযরত উমার যখন হযরত যায়িদের (রা) বাড়ীতে উপস্থিত হরেন তখন তিনি চিরুনী করছিলেন এবং দাসী তার চুল পরিপাটি করে দিচ্ছিলেন। হযরত যায়িদ (রা) খলীফাকে বললেন, কষ্ট করে আসার কি প্রয়োজন ছিল, ডেকে পাঠালেই তো পারতেন। খলীফা বললেন একটি মাসায়ালা সম্পর্কে পরামর্শ করতে এসেছি। যদি আপনার ওপর কোন রকম বাধ্যবাধকতা নেই। যায়িদ এ অবস্থায় মতামত দিতে অস্ককৃতি জানালেন। উমার ফিলে গেলেন। অন্য একদিন আবার গেলেন। যায়িদ বললেনম আমার সিন্ধান্ত আমি লিখিতভাবে জানাবো। অতঃপর তিনি শাজারার আকৃতিতে বিন্যাস  করে অংশ বন্টন করেন। হযরত উমার (রা) জনগনের উদ্দেশ্যে ভাষণ দানকালে বলেন, যায়িদ ইবন সাবিত এটি লিখে আামার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি তা চালু করছি।৯০

হযরত যায়িদের  (রা) ইলমে ফারায়েজ গ্রন্ধাবন্ধ করেন এবং এর বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয়ে গবেষনা করে নতুন নতুন মাসায়ালাও সৃষ্টি করেন। তবে এর মধ্যে তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উদ্ভবধন হলো মাসায়ালা অওলে। কিছু লোকে ধারণা আওলের উদ্ভাবক হলে হযরত আব্বাস (রা)। কিন্তু এ দারণা বর্ণনা ও যুক্তি উভয়ের পরিপন্থি।

প্রথমত: এ ধারণার পশ্চাতে তেমন কোন সনদ নেই। দ্বিতীয়ত: হযরত আব্বাসের (রা) ফারায়েজ শাস্ত্রে তেমন বুৎপত্তি ছিলনা। এ কারণে এ জাতীয় উদ্ভবনা তাঁর প্রতি আরোপ করা যুক্তির পরিপন্থি।

হযরত যায়িদ (রা) ফারায়েজ শাস্ত্রেও যতটুকু খিদমাত করেছেন তা উপরোক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীমের বানীÑ আমর উম্মাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারায়েজ বিশেষজ্ঞ হচ্ছে যায়িদ’ Ñ অক্ষরে অক্ষরে  সত্যে পরিণত হয়েছে। হযরত যায়িদের (রা) অসাধারণ বুদ্ধি তীক্ষè, মেধা ও অভিনব চিন্তাশক্তী দেখে সে যুগের উলামাÑমাশায়েখ দারুন বিস্মিত হয়েছেন। উলুমে শারা’য়িয়্যা ছাড়াও পার্থিব জ্ঞান বিজ্ঞানে তিনি যে কতখানি পারদর্শী ছিলেন সে সম্পর্কেও কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন। এখানে তার কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

যায়িদ (রা) রাসুলে কারীমের (সা) নির্দেশে মুতাবিক হিব্র“ ও সুরইয়ানী ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর মেধা এত তীক্ষè ছিল যে মাত্র পনেরো দিনের চেষ্টায় এ ভাষা দুটিতে এতখানি দক্ষতা অর্জন করেন যে, আনায়াসে চিঠি লিখতে সক্ষম হন।  পরে আরো চর্চার ফলে এতখানি উন্নতি হয় যে তাওরাত ও ইনজীলের ভাষাসমূহ একজন আলেমে  পরিণত হন। মাসউদী লিখেছেন, তিনি ফার্সী, রোমান হাবশী ভাষাগুলোও জানতেন। এগুলি তিনি শিখেছিলেন মদীনায় যারা এ ভাষা জানতো তাদের নিকট থেকে।৯১

তৎকালীন আরবে হিসাব বা অংক শাস্ত্রের তেমন প্রচলন ছিলনা। এ কারণে ইসলামের প্রথম পর্বে খারাজের হিসাবপত্র অথবা রোমান অথবা ইরানীরা করতো। আরববাসী হাজারের ওপর গণান করতে জানতো না। আরবীতে হাজারেরও ওপর সংখ্যার জন্য কোন শব্দও ছিলনা। কিন্তু যায়িদের (রা) অংকে এতখানি পারদর্শিতা ছিল যে, ফারায়েজ শাস্ত্রেও অতি জটিল ও সূক্ষè মাসায়ালা সমূহ ও অংক দ্বারা সমাধান করতেন। তাছাড়া অর্থ সম্পর্দেও বন্টনও করতে পারতেন। হিজরী ৮ম সনে হুনাইনর যদ্ধ হয়। এতে প্রায় বারো হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করে। তাঁরই আদমশুমারী ও প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী রাসূলে (সা) মালে গানীমত বন্টন করেন। প্রথমে তিনি মানুষের সংখ্যা অবগত হন। তারপর মালে গানীমত উক্ত সংখ্যার ওপর বিছিয়ে দেন। এননিভাবে ইয়ারমুকের যুদ্ধেও মালে গনীমাত মদীনায় আসলে যায়িদই (রা) তা বন্টন করেন।৯২

ইসলামÑপূর্ব আরবে লেখার তেমন প্রচলন ছিলনা, সুপ্রাচীন কালের বর্ণনা সমূহ তারা স্মৃতিতে বংশপরম্পর ধরে রাখতো। যায়িদ (রা) লিখতে জানতেন এবং তার সমকালে তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত লেখক। বিভিন্ন ফরমান চুক্তিপত্র চিঠিপত্র লেখা ছাড়াও সুন্দও অস্কন ও জানতেন।

খলীফা উমারের (রা) সময়ে আরবের বিখ্যাত দুর্ভিক্ষ আম্মুর রামাদাহ দেখা দেয়। এ দুর্ভিক্ষ মুকাবিলার জন্য তিনি মিসরের গভর্ণর আমর ইবনুল আসাকে (রা) খাদ্যশস্য পাঠতে বলেন। আমার ইবনুল আস (রা) বিশটি জাহাজ বোঝাই  করে খাদ্য শস্য রাজধানী মাদীনায় পাঠান। উমার (রা) অত্যন্ত  বিচলিতভবে জাহাজের প্রতীক্ষায় থাকেন। যায়িদ সহ আরো কিছু সাহাবীকে সংগে নিয়ে তিনি মদীনার নিকটবর্ত জার নামক বন্দরে চলে যান। খাদ্যশস্য ভর্তি জাহাজ এলে সেখানে দুটি গুদাগম বানিয়ে তাতে সংরক্ষন করেন। তিনি যায়িদকে দুর্ভিক্ষ কবলিত মাসুষের একটি তালিকা ও তাদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দকৃত শস্যেও পরিমাণ লেখা তাকে এমন একটি ফর্দ তৈরী করতে নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের ভিত্তিতে যায়িদ একটি রেজিস্টার তৈরী করেন, প্রত্যেককে একটি কাগজের চাকতি দেন যার নিচে উমারের (রা) সীলÑমোহর লাগানো ছিল। চাকতি তৈরী ও তাতে মহোর লাগানোর ঘটনা ইসলামে ছিল এটাই প্রথম। আর এর রুপকার ছিলেন যায়িদ।

ইসলামের আসল উদ্দেশ্য হলো মহত্তম চারিত্রের পূর্ণতা সাধন। তাঁর চরিত্রের যে সকল গুণÑবৈশিষ্ট উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তা হলো হুব্বে রাসূল, ইত্তেবায়ে রাসূল, আমর বিল মারুফ, শাসকদের প্রতি উপদেশ নসীহত ও মুসলি উম্মার কল্যাণ কামনা।

রাসূলের প্রতি প্রবল ভালবাসার কারণে অধিকাংশ সময় তাঁর দরবারে উপস্থিত থাকতেন। প্রত্যূষে ঘুম থেকে উঠে সোজা রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে যেতেন। কোন কোন সময় এত সকালে যেতেন যে, রাসূলের (সা) সাতেই সেহরী খেতেন। রাসূল (সা) তাঁকে স্বীয় কক্ষে ডেকে নিতেন।৯৩

একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গিয়ে দেখতে পান, তিনি খেজুর দিয়ে সেহরী খাচ্ছেন। তাঁকেও আহারে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। যায়িদ বললেন, আমি রোযা রাখার ইরাদা করেছি। রাসূল (সা) বললেন আমরাও তো এটাই ইরাদা। সেদিন হযরত যায়িদ রাসূলের (সা) সঙ্গে সেহরী খান। কিছুক্ষন পর নামাযের ওয়াকত হলে তিনি রাসূলের (সা) সাথে মসজিদে যান এবং তাঁর সাথে নামায আদায় করেন।৯৪

যায়িদ (রা) অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে যেতেন। রাসূল (সা) তাঁর সাথে এতখানি খোলামেলা ছিলেন যে কখনো কখনো নিজের হাঁটু যায়িদের রানের ওপর রেখে যেতেন। একদিন তো এ অবস্থায় ওহী নায়িল হয়। যায়িদ বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাঁটু এ সময় এত ভারী মনী হচ্ছিল যে তার ভার সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মনে হচ্ছিল যে আমার রান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। কিন্তু বেয়াদবী হয় এ ভায়ে তিনি উহ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। চুপ করে বসে থাকতেন।৯৫

রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ পালন বিন্দুমাত্র হেরফের বরদাশত করতেন না। একবার শামে গেলেন আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নিকট। তাঁর কাছে একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। মু’য়াবিয়ার (রা) এক ব্যক্তিকে হাদীসটি লিখে রাখার জন্য বললেন। যায়িদ (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি তাঁর লিখিত অংশটুকু মুছে দেন।৯৬

আমীর উমারাদের সামনেও তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের প্রচারের ব্যাপারে চুপ থাকতেন না। মারওয়ান ইবনুল তখন মদীনার গভর্ণর। তিনি মাগরিব নামাযে ছোট ছোট সুরা পড়তেন। যায়িদ বললেন, এমনটি করেন কেন? রামূল (সা) তো বড় বড় সূরাও পড়তেন।৯৭

সাহাবা ও তাবেঈনদের কেউ কখনো অজ্ঞতাবশত সুন্নাতের পনিপন্থী কোন কাজ করে বসলে যায়িদ তাঁকেও সতর্ক করে দিতেন। একবার গুরাইবীল ইবন সা’দ (রা) বাজারে একটি পাখি ধরেন। যায়িদ তো তা দেখে ফেলেন। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে এক থাপ্পড় মারেন এবং পাখিটি ছিনিয়ে উড়িয়ে দেন। তারপর তাঁতে লক্ষ্য করে বলেন, ওরে নিজের শক্র, তোমার জানা নেই যে, রাসূল (সা) মদীনাকে হারাম ষোঘণা করেছেন!৯৮

একবার তিনি শুরাহবীলকে বাগানে জাল পাততে দেখে চেঁচিয়ে উঠালেনÑ এখানে শিকার করা নিষেদ্ধ।৯৯

শাম থেকে এক ব্যক্তি মদীনায় এলো যয়তুনের তেল বিক্রী করতে। আনেক ব্যবসায়ী কথাবার্তা বললো। আবদুল্লাহ ইবন উমার কথাবার্তা বলে তেল খরীদ করেন নিলেন। মাল সেখানে থাকতেই দ্বিতীয় ক্রেতা পাওয়া গেল। সে আবদুল্লাহ ইবন উমারকে বললেন, আমি আপনাকে এত লাভ দিচ্ছি। আমার কাছে বিক্রী করে দিন। ইবন উমার রাজী হয়ে গেরেন। তিনি কথা পাকাপাকি করার জন্য তার হাতের ওপর স্বীয় হাত রাখবেন, এমন সময় পিছন থেকে একজন তাঁর হাত টেনে ধরেন। তিনি তাকিয়ে দেখেন যায়িদ ইবন সাবিত। তিনি ইবন উমারকে বললেন, এখন বেচো না। প্রথমে মাল এখানে থেকে সরিয়ে নাও। কারণ রাসূল (সা) এমনভবে বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন।১০০

একবার তিনি দুপুরের সময় মদীনার গভর্ণর মারওয়ানের বাড়ী থেকে বের হলেন। শিষ্য শাগারিদরা তা দেখে ফেলে। তারা মনে করলো, হয়তো বিশেষ কোন প্রয়োজনে গিয়েছিলেন। তারা এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করেলো। যায়িদ বললেন, এ সময় তিনি কয়েকটি হাদীস জিজ্ঞেসা করেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছি, তিনটি অভ্যাসের ব্যাপারে মুসলামনের অন্তর বিরুপ ভাব জন্মবে না। তাহলো আল্লাহর জন্য কাজ রার শাসকদের নসীহত করা জামায়াতের সাথে থাকা।১০১

উবাদা ইবন সামিত ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সাহাবী। একবার তিনি বায়তুল মাকদাস গেলেন। সেখানে একজন থাবাতী ব্যক্তিকে  তাঁর বহানটি একটু ধরতে বললেন। সে ধরতে অস্বীকৃতি জানালো। উবাদা তাকে খুব ধমকালেন এবং মারলেন। কথাটি খলীফা উমারের কানে গেল। তিনি উবাদাকে বললেন আপনি এ কেমন কাজ করলেন? উবাদা বললেন আমি তাঁকে ঘোড়াটি একটু ধরতে বলামা আর সে অস্বীকার করলো। উমার মেজাজটা একটু গরম। আমি তাকে মেরে বসলাম। উমার বললেন, আপনি বদলা বা কিসাসের জন্য প্রস্তুত হোন। সেখানে যায়িদ ইবন সাবিত উপস্থিত ছিলেন। তিনি এভাবে একজন সাহাবীর অপমান সহ্য করতে পারলেন না। উমারকে বললেন, আপনি একজন গোলামের বদলায় নিজের ভাইকে মারবেন? তাঁর একথার পর উমার কিসাকেস পরিবর্তে শুধু দিয়াত ধার্য করেন। উবাদাকে (রা) দিয়াত আদায় করতে হয়।১০২

এমনি আর একটি ঘটনা। উমার (রা) যখণ শামে ছিলেন তখন একদিন খবর পেলেন যে, একজন মুসলাম একজন জিম্মীকে হত্যা করেছে। উমার হত্যাকারী মুসলামকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। যায়িদ অতিকষ্টে খলীফাকে বুঝালেন এবং কিসাসের পরিবর্তে দিয়াতে রাজী করেন।১০৩

স্বভাগত ভাবেই তিনি চুপচাপ থাকতে ভালবাসতেন। খলীফাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজার রাখতেন। খলীফা উমারের অন্যতম সঙ্গী ও পারিষদ ছিলেন। খলীফা উসমানের (রা) সাথে তাঁর এত গভীর সম্পর্ক ছিল যে, লোকে তাঁকে উসমান (রা) তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন। আলী মুয়াবিয়ার (রা) দ্বন্দ্বে আলীর (রা) পক্ষে কোন যুদ্ধে অংশ নেননি, তা সত্বেও তিনি আলীকে দারুণ ভালোবাসতেন এবং তাঁর মাহাতœ্য ও মর্যাদার প্রবক্তা ছিলেন। আমীর মুয়াবিয়ার (রা) সাথেও সুসম্পর্ক ছিল। শামে গেলে তাঁর গৃহেই উঠতেন।১০৪

মারওয়ান ছিলেন তাৎকালীন আরব বিশ্বের একজন অতি বিখ্যাত রাজনীতিবিদ। যায়িদের (রা) ছিল তাঁর সাথেন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন না। একদিন যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে রাজনীতি বিষয়ক কিছু প্রশ্ন করেন। যায়িদ জবাব দিচ্ছেন, এমন সময় তিনি বুঝতে পারলেন কিছু লোক পর্দার আড়াল থেকে তাঁর বক্তব্য লিখে নিচ্ছে। যায়িদ তক্ষুণি বলে উঠলেন, মাফ করবেন, এতক্ষণ আমি যা কিছু বলেছি তা সবই আমার ব্যক্তিগত মতামত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। একদনি যায়িদ (রা) যখন ঘোড়ায় চড়তে যাবেন, ইবন আব্বাস তাঁর জিনিসটি ধরে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। যায়িদ (রা) বললেনঃ আপনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই। দয়া করে আপনি সরে যান। তিনি বললেনঃ আমাদের উলামা ও বড়দের সাথে এমন আচরণ করার জণ্য আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যায়িদ বললেনঃ আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন। ইবন আব্বাস (রা) হাত বাড়িয়ে দিলে যায়িদ হাতে চুমু দিয়ে বললেনঃ আমাদেরকে ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নবীর (সা) পরিবার পরিজনদের সাথে এমন আচারণ করতে করার জন্য।১০৫

মে মারওয়ান ইবনুল হাকাম, আবু সাঈদ আলÑখুদরী (রা) মতে একজন উচুঁ মর্যদা সাহাবীকে মারার জন্য ছড়ি উঠিয়েছিলেন, তিনিও যায়িদকে (রা) অতন্ত্য সম্মান করতেন। দরাবারে গেলে মারওয়ান তাঁকে আসানের পাশেই বসাতেন।যায়িদ (রা) অন্যান্য সাহাবী ও তাবেঈদেরকে মাঝে মধ্যে চিঠির মাধ্যমে উপদেশ দিতেন। প্রখ্রাত সাহবী উবাই ইবন কা’বকে (রা) তিনি এমনি একটি উপদেশমূলক চিঠি লিখেছিলেন। সীরাত ও হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে।১০৬

সত্য কতা বলতে কাকেও পরোয় করতেন না। তাবারানী বর্ণনা করেছেন। খলীফা উমার (রা) একদিন গোপনে খবর পেলেন আবু মিহ্জান আসÑসাকাফী নামক একব্যক্তি তার এক বন্ধুর সাথে ঘরের মধ্যে মদ পান করছে। তিনি তৎক্ষণাত রওয়না দিলেন এবং সোজা তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। সেখানে আবু মিহ্জানকে বললেনঃ একাজটি আপনি ঠিক করেননি। কারণ আল্লাহ ক্ষাপনাকে গুপ্তচাগিরি করতে নিষেধ করেছেন। উমার (সা) সাতে সঙ্গীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেনঃ এ কি বলে? যায়িদ ইবন সাবিত ও আবদুর রহমান ইবন আলÑআরকান (রা)Ñ বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন, সে ঠিক বলেছে। এ এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। উমার (রা) তাকে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসেন।১০৭

যায়িদ (রা) পরিবার পরিজন ও আতœীয় স্বজনদের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। ঘুমানোর সময় দু’আ করতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পরিবার পরিজনের স্বাচ্ছন্দ ও প্রাচুর্য কামনা করি। আর কোন আতœীয়ের সাথে আতœীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে তার বদ দুআ থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। পরিবার পরিজনদের মধ্যে তিনি খুব রসিক হতেন যেসন মজলিসে হতেন অত্যন্ত গম্ভীর।১০৮

তাঁকে নিয়ে তাঁর নিজ গোত্রে খাযরজীদের গর্বের অন্ত ছিলনা। মদীনার চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র আউস ও খাযরাজ।ইসলাম গ্রহণের পরেও তারা মাঝে মাঝে নানা বিষয় নিয়ে একে অপরের ওপর আভিজাত্য ও শ্রেষ্টত্ব দাবী করত। এমনিভাবে একাবর খাযাজীরা বললো, আমাদের মধ্যে এমন  চার ব্যক্তি যাঁদের সমকক্ষ কেউ তোমাদের মধ্যে নেই। তাঁরা রাসূর্লুলাহর (সা) জীবদ্দশায় গোটা কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁদের একজন যায়িদ ইবন সাবিত।১০৯

যায়িদের (রা) জীবন ও কর্ম ছোট কোন প্রবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব নয়। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থ সমূহে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ