আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কা’ব ইবন মালিক (রা)

কা’ব (রা) ইতিহাসের সেই তিন ব্যক্তির একজন যাঁরা আলস্যবশতঃ তাবুক যুদ্ধে যোগদানত থেকে বিরত থাকেন এবং আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সা) ও মুমিনদের বিরাগভাজনে পরিণত হন। অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁদের তাওবা কবুলের সুসংবাদ দিয়ে আয়াত নাযিল কারেন।১ হিজরতের ২৫ বছর পূর্বে ৫৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইয়াসরিবে জন্ম গ্রহণ করেন।২ তাঁর আনেকগুলো কুনিয়াতবা ডাক নাম ইতিহাসে ও সীরাত গ্রন্থেসমূহে বূর্ণিত রয়েছে। যথাঃ আবু ‘আবদুল্লাহ, আবু আবদির রহমান, আবু মুহাম্মাদ ও আবু বাশীর।৩ ইবনে হাজারের একটি বর্ণনায় জানা যায়, জন্মের পর তাঁর পিতা মালিক ইবন আবী কাব আমর ছেলের ডাকনাম রাখেন আবু বাশীর। ইসলাম গ্রহনের পর রাসূলে কারীম (সা) রাখেন আবু আবদিল্লাহ। তিনি পিতা- মাতার একমাত্র সন্তান।৪ মাতার নাম লায়লা বিনতু যায়িদ। পিতামাতা উভয়ে মদীনার খায়রাজ গোত্রের বনু সালিমা শাখার সন্তান।৫ তিনি একজন আকাবী ও উহুদী সাহাবী। ইবন আবী হাতেম বলেনঃ তিনি ছিলেন আহলুস সুফ্ফাহরও আন্যতম সদস্য।৬ পচিঁশ বছর বয়সে গোত্রীয় লোকদের সাথে বাই’য়াতে আকাবায় শরীক হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।৭

ইবনুল আসীর বলেনঃ প্রায় সকল সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে, কাব আকাবার শেষ বাই’য়াতে শরীক ছিলেন।৮ উরওয়া সেই সত্তর জনের মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করেছেন যাঁরা আকাবায় অংশ গ্রহন করে ছিলেন।৯ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে কা’ব বলেছেনঃ আমি বাইয়াতে আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ইসলামের ওপর অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলাম। তবে অপর একটি বর্ণনায় এসেছে। তিনি বলেন, আমি লায়লাতুল আকাবায় বাইয়াত থেকে বঞ্চিত হই।১০

কা’ব ইবন মালিক যে আকাবার শেষ বাইয়াতে শরীক ছিলেন তা ইবন ইসহাকের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে জানা যায়। এ বাইয়াতে বিস্তারিত বিবারণ কা’ব দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে। সীরাতু ইবন হিশামে কাবের জবানীতে তা হুবহু এসেছে সংক্ষেপে তার কিছু এখানে তুলে ধারা হলো।

ইবন ইসহাক কা’ব এর ছেলে আবদুল্লাহ ও মা’বাদ এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কা’ব মদীনা থেকে স্বগোত্রীয় পৌত্তলিক হাজীদর একটি কাফেলার সাথে মাক্কার উদ্দেশ্যে বের হন। এ কাফেলার সাথে পূবেই ইসলামের গ্রহণকারী কিছু মুসলামনও ছিলেন। তারা দ্বীন ও বুঝেছিলেন এবং নামায পড়তেন। এ কাফেলার তাঁদের বয়োজ্যেষ্ট নেতা আলÑবারা ইবন মারুর ও ছিলেন। চলার পথে তিনি একদিন বললেনঃ আমি আর এই কা’বার দিকে পিঠ করে নামায পড়তে চাইনে। এখানে থেকে কা’বার মুখ করেই নামায পড়বো। কা’ব ও অন্যরা তাঁর একথায় আপত্তি জানিয়ে বললেন, আমাদের নবী (সা) তো শামের বায়তুল মাকাদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায়  করতে থাকেন। তাঁর বিরোধীতা হয় আমরা এমনভাবে নামায পড়তে  চাইনা। এর পরও আল-বারা তাঁর মতে অটল থাকলেন।

পথে নামাযের সময় হলে আল-বারা কাবার দিকে, কা’বও অন্যরা শামের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে মক্কায় পৌঁছালেন। তাঁরা আল-বারা কে তাঁর এ কাজের জন্য তিরস্কার করেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হলোনা, তিনি স্বীয় মতে আনড় থাকলেন।

মক্কায় পৌঁছালে আল-বারা’কা’বার দিকে, কাব’ কে বললেনঃ তুমি আমাকে একটু রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে চলো। আসার পথে আমি যে কাজ করেছি সে ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেসা করতে চাই। তোমাদের বিরোধিতা করে আমার মনটা ভালো যাচ্ছে না। কা’বকে তাঁকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে চললেন। দুইজনের কেউই এর আগে রাসূলুল্লাহকে (সা) চিনত না এবং দেখেননি। পথে মাক্কার দুই ব্যক্তির সাথে তাঁদের দেখা হলো। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) অবস্থান সম্পর্কে জানাতে চাইলেন। তাঁরা বললোঃ আপনারা কি তাঁকে চেনেন? কা’ব ও আল-বারা জবাব দিলেনঃ না। তারা প্রশ্ন করলোঃ তাঁরা চাচা আব্বাসকে চেনেন? তাঁরা জবাব দিলোঃ হ্যাঁ, আব্বাস চিনি। ব্যবসা উপলক্ষে তিনি আমাদের ওখানে য়াতয়াত করন। তখন তারা বললোঃ আপনারা মাসজিদে ঢুকে দেখবেন আব্বাসের সাথে একটি লোক বসে আছেন। তিনি সেই ব্যক্তি।

কা’বও আল-বারা লোক দুইটির কথামত মসজিদে হারামে ঢুকে আব্বাসকে এবং তাঁর পাশে রাসূলুল্লাহর (সা) বসা দেখতে পেলেন। সালাম দিয়ে তাঁদের পাশে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আব্বাস কে বললেনঃ আবুল ফাদল! আপনি কি এ দুই ব্যক্তিকে চেনেন? আব্বাস বললেনঃ হাঁ ইনি আল-বারা ইবন মারুফ। তাঁর সম্প্রদায়ের নেতা। আর ইনি কা’ব ইবন মালিক। কা’ব বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সেই প্রশ্নবোধক শব্দটি আজও ভুলিনি- কবি? অথ্যাৎ রাসূলু (সা) আব্বাসকে প্রশ্ন করেনঃ একি সেই কবি কা’ব ইবন মালিক? আব্বাস জবাব দেনঃ হ্যঁ, ইন সেই কবি কা’ব। এরপর কা’ব বর্ণনা করেছেন, কিভাবে কেমন করে রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাৎ হলো এবং কোন কথার ওপর তাঁরা তার বাইয়াত করলেন।১১ রাসূল (সা)যে বারোজন নাকীব মনোনিত করেন, কা’ব একটি কবিতায় তাঁদের পরিচয়ও ধরে রেখেছেন।ইবন হিশাম সে কবিতাটিও বর্ননা করেছেন।১২

রাসূলে করীম (সা) মদীনায় এসে আনসার ও মাহাজিরদের মধ্যে দ্বীনী মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্খে প্রতিষ্টা করেন। আশারা মুবাশ্শারার সদস্য তালহা ইবন উবাইদুল্লাহর (রা) সাথে কা’বের এ সম্পর্কে প্রতিষ্টা হয়। একথা  ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন।১৩ তবে উরওয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে (সা) যুবাইর ও কাবের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্টা করে দেন।১৪ উহুদের দিন কা‘ব আহত হলে যুবাইর তাঁকে মুমূর্ষে অবস্থায় কাঁধে বহন করে নিয়ে আসেণ। সেদিন কা’ব মারা গেলে যুবাইর হতেন তাঁর উত্তরাধিকারী পরবর্তীকালে সূরা আল আনফারের ৭৫ নং আয়াত-‘বস্তুতঃ যারা উলুল আরহমা’ বা রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তাঁরা পরস্পর বেশী হকদার-নাযিল করে এ বিধান রহিত করা হয়।১৫

একমাত্র বদর ও তাবুক ছাড়া অন্য সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূল কারীমের (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেন। ইবনুল কালবীর মতে, তিনিবদর যোগদানকরেন।১৬ তবে অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞের নিকট এ মতটি স্বীকৃত হয়নি। আসল ঘটনা হলো, যে তাড়াহুড়ো ও দ্রুততার সাথে বদর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় তাতে অনেকের মত কা’বও অংশ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকেন। এ কারণে রাসূল (সা) কাউকে কিছুই বলেননি।

কা’ব বলেন: তাবুক পর্যন্ত একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধের আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেছি।ক্ষদরে যাঁরা যাননি, রাসূল (সা) তাঁদেরকে কোন প্রকার তিরস্কার করেননি। মূলতঃ রাসূল (সা) মদীনা থেকে বের হন আবু সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফিলার উদ্দেশ্যে। আর এদিকে কুরাইশরা মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ে আবূ সুফইয়ানের মুখোমুখিী হয় কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই। কা’ব আরও বলেন, বদর রাসূলুল্লাহর (সা) জীভনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে মানুষের নিটক বিবেচিত। তবে ‘লাইলাতুল ’আকাবা’-যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) হাতে ইসলামের ওপর বাই’য়াত (অঙ্গীকার) করেছিলাম, তার পরিবর্তে বদর আমার নিকট মোটেই প্রাধান্যযোগ্য নয়। এরপর একমাত্র তাবুক ছাড়া আর কোন যুদ্ধ থেকে পিছনে থাকিনি।১৭

তবে কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় কা’ব বদরে অশং করেছেন। ইবন ইসহাক কা’বের নামটি বদরে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।১৮ তাছাড়া একটি বর্ণনায় এসেছে, কা’ব বলেছেন: আমিমুসলমানদের সাথে বদরে যাই। যুদ্ধ শেষে দেখলাম পৌত্তলিক যোদ্ধাদের বিকৃত লাশমুসলিম শহীদদের সাথে পড়ে আছে। আমি ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থেকে চলে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ দেখতে পেলাম একজন পৌত্তলিক অস্ত্র সজ্জিত হয়ে মুসলিম শহীদদের অতিক্রম করছে। একজন অস্ত্রসজ্জিত যোদ্ধাও যেন তার অপেক্ষা করছিল। আমি একটু এগিয়ে এ দুইজনের ভাগ্য দেখার জন্য তাদের পিছনে দাঁড়ারাম। পৌত্তলিকটি ছিল বিরাট বপুধারী। আমি তাকিয়ে থাকতেই মুসলিম নৈকিটি তার কাঁধে তরবারির এমন এক শক্ত কোপ বসিয়ে দেয় যে, তার নিতম্ব পর্যন্ত পৌঁছে তাকে দুইভাগ করে ফেলে। তারপর লোকটি মুকের বর্ম খুলে ফেলে বলেঃ কা’ব কেমন দেখলে? আমি আবূ দুজানা।১৯ তবে অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁর বদরে অনুপস্থিত থাকার বর্ণনাগুলি সঠিক বলে মনে করেছেন।

উহুদ যুদ্ধে কা’ব তাঁর দ্বীনী ভাই তালহার (রা) সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই যুদ্ধে তিনি পরেন রাসূলুল্লাহর (সা) বর্ম এবং রাসূলুল্লাহ (সা) পরেন তাঁর বর্ম। রাসূল (সা) নিজ হাতে তাঁকে বর্ম পরিয়ে দেন। এই উহুদে তাঁর দেহে মোট এগারো স্থানে যখম হয়।২০ তবে বহু মুহাদ্দিস তাঁর দেহে সতোরোটি আঘাতের কথা বর্ণনা করেছেন।২১

এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলে কারীম (সা) শাহাদাত বরণ করেছেন। এতে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে ্কটো দারুণ হৈ চৈ পড়ে যায়। এ অবস্থায় কা’বই সর্বপ্রথম রাসূলকে (সা) দেখতে পান এবং গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠেন-রাসূল (সা) এই যে, এখানে। তোমরা এদিকে এসো। কা’ব  তখন উপত্যকার মধ্যস্থলে। রাসূল (সা) তখণ তাঁর হলুদ বর্ণের বর্ম দ্বারা তাঁকে ইঙ্গিত করে চুপ থাকতে বলেন।২২

উহুদের পরে যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে কা’ব (রা) দারুণ উৎসাহ ও উদ্দীপনাসহকারে যোগদান করেছেন। তবে ্ভাবতে আবাক লাগে যে, নবীর (সা) জীবনে প্রথম যুদ্ধ বদরের মত শেষ যুদ্ধ তাবুকেও তিনি যোগদান করতে ব্যর্থ হন। তাবুক ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ অভিযান। নানা কারণে একে কষ্টের যুদ্ধও বলা হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) রীতি ছিল, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে স্পষ্টভাবে কিচু বলতেন না। কিনউত এবার রীতি বিরুদ্ধ কাজ করলেন। এবার তিনি ঘোষণা করে দিলেন। যাতে দীর্ঘ ও কষ্টকর সফরের জন্য মুসলমানরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারে। কা’ব এই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য দুইটি উট প্রস্তুত করেন। তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি পূর্বের কোন যুদ্ধেই এতখানি সচ্ছল ও সক্ষম ছিলেন না, যতখানি এবার ছিলেন।

এ যুদ্ধের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) এতখানি গুরুত্বদান ও সতকর্তা অবলম্বনের কারণ এই ছিল যে, মূলতঃ সংঘর্ষটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের সুপার পাওয়ার প্রবল পরাক্রমশালী রোমান বাহিনীর সাথে। সাজ-সরঞ্জাম, সংখ্যা, ঐক্য ও অটুট মনোবলের দিক দিয়ে তাদের বাহিনী ছিল বিশ্বের সেরা ও শক্তিশারী বাহিনী।

নবম হিজরীর রজব মাস মুরু হয়েছে। প্রচন্ড গরমের মওসুম। রাসূল (সা) তাবুক অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন এবং সকলকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশও দিলেন।২৩ সংগত ও অসংগত নানা অজুহাতে মোট তিরাশিজন (৮৩) সক্ষম মসুলমান এ যুদ্ধে গমন থেকে বিরত থাকেন। তাদের কিচু ছিল মুনাফিক (কপট মুসলমান)। কারও বাগানের ফল পাকতে শুরু করেছিল, তা ছেড়ে যেতে তার ইচ্ছা হয়নি। কেউ ভয় পেয়েছিল প্রচন্ড গরম ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার। আবার কেউ ছির অতি দরিদ্র, যার কোন বাহন ছিল না।২৪

ইবন ইসহাক বলেন: যাঁরা সন্দেহ সংশয় বশতঃ নয়; বরংয় আলস্যবশতঃ যোগদানে ব্যর্থ হন তারা মোট চার জন। কা’ব ইবন মালিক, মুরারা ইবন রাবী, হিলাল ইবন উমাইয়্যা ও আবূ খায়সামা। তবে আবূ খায়সামা একেবারে শেষ মুহূর্তে তাবুকে পৌঁছেন ও রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হন।২৫কারও কারও মতে প্রচন্ড গরমের কারণে তাঁরা তাবুক গমনে বিরত থাকেন।২৬ রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। কা’ব (রা) প্রতিদিনই যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন; কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। দ্বিধা-দ্বধ্বে তাঁর সময় বয়ে যায়। তিনি প্রতিদিনই মনে মনে বলেতেন আমি যেতে পারবো। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টে যেত। যাত্রার উদ্যোগ নিয়ে আবার থেমে যেতেন। এ অবস্থায় একদিন মদীনায় খবর এলা, রাসূল (সা) তাবুক পৌঁছে গেছেন।

মদীনা ও তার আশা-পাশের সকল সক্ষম ব্যক্তি রাসূলুলÍাহর (সা) সাথে তাবুক চলে যান। কা’ব (রা) যখন মদীনা শহরে বের হতেন তখন শুধু শিশু, বৃদ্ধ ও কিচু মুনাফিক ছাড়া আর কোন মানুষের দেখা পেতেন না। লজ্জা ও অনুশোচনায় জর্জরিত হতেন। সুস্থ, সবল ও সক্সম হওয়া সত্ত্বেও কেন পিছনে থেকে গেলেন, সারাক্ষণ এই অনুশোচনার অনলে দগ্ধিভূত হতেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) সেনা বাহিনীর কোন দফতর ছিলনা। সুতরাং এত মানুষের মধ্যে কা’বারে মত একজন লোক এলো কি এলা না, তা তাঁর জানা াকার কা নয়। একমাত্র আল্লাহ পাকের ওহীই ছিল ত৭ার জানার মাধ্যম। তাবুক পৌঁছে একদিন তিনি কা’ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কোন এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার এত সময় কোথায় যে সে এখানে আসবে? মু’য়াজ ইবন জাবাল কাছেই ছিলেন। তিনি প্রতিবাদের সুরে বললেন, আমরা তো তাঁর মধ্যে খারাপ কোন কিছ ুদেখিনি। একথা শুনে রাসূল (সা) চুপ থাকলেন।

রোমানদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) কোন মারাত্মক সংঘর্ষ হলো না। উত্তর আরবের অনেক গোত্র জিযিয়ার বিনিময়ে সন্ধি করলো। রাসূল (সা) মদীনায় ফিরে এলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ফিরে আসার খবর কা;ব পেলেন। তাঁর অন্তরে তখন নানা রকম চিন্তার ঢেউ খেলছে। রাসূলুল্লাহর (সা) অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার উপায় কি, সে বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন পরিবারের লোকদের কাছে। তখনও এমন চিন্তাও তাঁর মনে উদয় হলো যে, সত্য অসত্য মিলিয়ে কিছু কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু পরক্ষণেই এ চিন্তা যেন কোথায় হাওয়া হয়ে যেত। এ করম দ্বিধা দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, কপালে যা আছে তাই হোক, কোনরকম ছল-চাতুরীর আশ্রয় তিনি নেবেন না। যা সত্য তাই বলবেন।

এর মধ্যে দলে আশি জনের মত লোক রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য আত্মাপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখলো। রাসূল (সা) তাদের সকলের ওজর-আপত্তি গ্রহণযেগ্য মনে কররেন। সকলের অপরাধ ক্ষমার জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করলেন এবং পুনরায় তাদের বাই’য়াত বা অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন।

কা’ব (রা) আসলেন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট। তাঁকে দেখে রাসল (সা) মৃদু হেসে বললেন: এসো। কা’ব সামনে এসে বসার পর প্রশ্ন করলেনঃ যুদ্ধে যাওনি কেন? কা’ব বললেনঃ আপনার কাছে কী আর গোপন করবো? দুনিয়ার কোন রাজা-বাদশাহ হলে নানারকম কথার জাল তৈরী করে তাকে খুশী করতাম। সে শক্তি আমার আছে।অ আমি তো একজন বাগ্মী ও তর্কবাগিশ। আমি আপনার নিকট সত্য গোপন করবো না। এতে হতে পারে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু মিথ্যা বললে এ মুহূর্তে আপনি খুশী হয়ে যাবেন। তবে আল্লাহ আপনাকে আমার ব্যাপারে নাখোশ করে দেবেন। আর তা আমার জন্য মোটেই সুখকর নয়। মূলতঃ আমার না যাওয়ার কোনকারণ ছিল না। আমি ছিলাম সুস্থ সবল এবং অর্থে-বিত্তেও যুদ্ধের সাজ-সরজ্ঞামে সমর্থ। তবুও আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি যেমে পরিনি। তাঁর কথা মুনে শুনে রাসূল (সা) বললেনঃ সত্য বলেছো। তুমি এখন যাও। দেখা যাক আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত দান করেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার থেকে উঠে আসার পর বনু সালেমার কিছু লোক তাঁকে বললো, আপনি এর আগে আর কোন অপরাধ করেননি। এটাই আপনার প্রথমবারের মত একটি অপরাধ। অথচ এর জন্য ভালোমত কোন ওজর ও আপত্তি উপস্থাপন করতে পারলেন না। অন্যদের মত আপনিও কিচু ওজর পেশ করতেন, রাসূল (সা) আপনার গোনাহ মাফের জন্য দু’আ করতেন, আর আল্লাহ মাফ করে দিতেন। কিন্তু তা আপনি পারলেন না। তাদের কথা শুনে কা’বের ইচ্ছা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ফিরে গিয়ে পূর্বের বর্ণনা প্রত্যাহাপর করেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি প্রশ্ন করলেন: আমার মত আর কেউ কি আছে? তিনি জানতে পেলেন, আরও দুইজন আছেন। তাঁরা হলেন: মুরারা ইবন রাবী ও হিলাল ইবন উমাইয়্যা। তঁ*ারা দুইজনই অতি নেক্কার বান্দা ও বদরী সাহাবী। তাঁরেদ নাম শুনে তিনি কিছুটা আশ্বাস্ত হলেন এবং নতুন করে ওজর পেশ করার ইচ্ছা দম ন করলেন।

রাসূলে কারীম (সা) পূর্বে উল্লেখিত তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবত াকে। মানুষ তাঁদের প্রতি আড় চোখে তাকিয়ে দেখতো। কোন কা বলতো না। মুরারা ও হিলাল নিজেদেরকে আপন আপন গৃহে আবদ্ধ করে রাখেন। দিন রাত তাঁরা শুধু কাঁদতেন। কা’ব ছিলেন যুবক। ঘরে বসে থাকা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল? পাঁচ ওয়াকত নামাযেই তিনি মসজিদে আসা যাওয়া করতেন, হাটে বাজারেও ঘোরাঘুরি করতেন। বিন্তু কোন মুসলমান ভুলেও তাঁর সাথে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন না।

কা’ব মসজিদে যেতেন এবং নামাযের পর রাসূলকে (সা) সালাম করতেন। রাসূল (সা) জায়নামাযে বসে থাকতেন। রাসূল (সা) সালামের জবাব দিচ্ছেন কিনা বা তাঁর ঠোঁট নড়ছে কিনা, কা’ব তা গভীরভাবে লক্ষ্য করতেন। তারপর আবার রাসূলুল্লাহর (সা) নিকটেই নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। চোখ আড় করে একটু  একটু করে রাসূলুল্লাহর (সা) দিকে তাকাতেন এবং রাসূলও (সা) তাকে আড় চোখে দেখতেন। যখন কা’ব নামায শেষ করে রাসূলুল্লাহর (সা) দিকে ফিরতেন তখণ তিনি কা’বের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন।

কা’বের (রা) সাথে তাঁর পরিবারের সদস্যদের আচরণও ছিল অভিন্ন। আবূ কাতাদাহ (রা) ছিলেন কা’বের চাচাতো ভাই। একদিন কা’ব বাড়ীর প্রাচীরের ওপর উঠে তাঁকে সালাম করলেন; কিন্তু কাতাদাহ জবাব দিলেন না। কা’ব তিনবার কসম খেয়ে বললেন, তুমি তো জান আমি আল্লা ও তাঁর রাসূলকে কত ভালোবাসি। শেষবার কাতাদাহ্ শুদু মন্তব্য করলেনÑবিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।

কাতাদাহর (রা) এমন জবাবে কা’ব (রা) দারুণ হত্যশ হলেন। আপন মনে বললেণ, এখন তো আমার ঈমানের ব্যাপারে সাক্ষী দেওয়ারও কেউ নেই। তাঁর চোখ থেকে অশ্র“ গড়িয়ে পড়লো। তিনি বাজারের দিকে বেরিয়ে গেলেন। এদিকে বাজারে তখণ শামের এক নাবাতী ব্যক্তি তাঁকে খুঁজছিলেন। কা’বকে দেখে লোকেরা ইঙ্গিত করে বললো, ঐ যে তিনি আসছেন। লোকটি কা’বের নামে লেখা গাসসানীয় রাজার একটি চিঠি নিয়ে এসেছিলো। তাঁর নিকট তেকে চিঠিটি নিয়ে কা’ব পড়লেন। তাঁতে লেখা ছিলÑ‘তোমার বন্ধু (রাসূল (সা) তোমরা প্রতি খুব অবিচার করেছেন। তুমি তো কোন সাধারণ ঘরের সন্তান নও। তুমি আমার কাছে চলে এসো। চিঠিটি পড়ে তিনি মন্তব্য করলেন, এটাও এক পরীক্ষা। চিঠিটি তিনি জ্বলন্ত চুলায় ফেলে দিলেন।

এভাবে চল্লিশ দিন কেটে গেল। চল্লিশ দিন পর রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট গিয়ে বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ হলো, তোমার স্ত্রী থেকে তুমি দূরে থাকবে। কা’ব জানতে চাইলেন, আমি কি তাঁকে তালাক দেব? তিনি বললেনঃ না। শুধু পৃথক থাকবে।

কা’ব (রা) বললেন, তুমি তোমার পিাত-মাতার কাছে চলে যাও। আমার ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সেখানেই থাক। অন্য দুইজনথÑহিলাল ও মুরারাকেও (রা) একই নির্দেশ দেওয়া হয়। হিলাল ছিলেন বৃদ্ধ। তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হয়ে স্বামী সেবার বিশেষ অনুমতি নিয়ে আসেন। কা’বের পরিবারের লোকেরা তাঁর স্ত্রীকেও বললেন, তুমিও রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যেয়ে স্বামী সেবার অনুমতি নিয়ে এসো। কিন্তু তিনি সম্মত হলেন না। বললেনঃ আমি যাব না। না জানি, রাসূলুল্লাহ (সা) কি বলবেন।

পঞ্চাশ দিনের মাথায় ফজরের নামায আদায় করে কা’ব (রা) ঘরের ছাদে বসে আছেন। ভাবছেন, এখন তো আমার জীবনটাই বোঝা হয়ে উঠেছে। আসমান-যমীন আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এ ধরণের আকাশ-পাতাল চিন্তা করছেন, এমন সময় সালা’ পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে কারও কষ্ঠস্বর ভেসে এলোঃ কা’ব শোন! তোমরার জন্য সুসংবাদ! তিনি বুঝলেন, তাঁর দু’আ ও তাওবা কাবুল হয়েছে। সাথে সাথে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আয়াদ করেন। নিজের ভূলের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন। কিছুক্ষণ পর দুই ব্যক্তি যাদের একজন ছিল ঘোড় সাওয়ার, এসে তাঁকে সুসংবাদ দান করেন। কা’ব নিজের গায়ের কাগড় খুলে তাদেরকে দান করেন। অতিরিক্ত কাপড় ছিল না তাই সেই দান করা কাপড় আবার চেয়ে নিয়ে পরেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ছুটে যান।

ইতিমধ্যে খবরটি মদীনায় ছড়িয়ে পড়েছে। দলে দলে মানুষ তাঁর বাড়ীর দিকে আসতে শুরু করেছে। পথে যার সাথেই দেখা হচ্ছে, তাঁকে মুবারকবাদ দিচ্ছে। তিনি মসজিদে নবনীতে পৌঁছে রাসূলকে (সা) সাহাবীদের মাঝে বসা অবস্থায় পেলেন। মসজিদে ঢুকতেই তালহা (রা) দৌড়ে এসে হাত মেলালেন। তবে অন্যরা নিজ নিজ স্থানে বসে থাকলেন। কা’ব (রা) এগিয়ে গিয়ে রাসূলে কারীমকে (সা) সালাম করলেন। তাবারানী বর্ণনা করেছেন; তাওবা কবুল হওয়ার পর কা’ব  রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে তাঁর দুইখানি পবিত্র হাত ধরে চুমু দিয়েছিলেন।২৭ তখন রাসূলে কারীমের চেহারা মুবািরক চাঁদের মত দীপ্তিমান দেখচ্ছিল। তিনি কা’বের (রা) উদ্দেশ্যে বললেনঃ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছি। তোমার জন্মের পর থেকে আজকের দিনটির মত এত ভালো দিন তোমার জীবনে আর আসেনি।

আপনি কি আমাকে ক্ষমা করেছেন? রাসূল (সা) বললেন: আমি কেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন।’ এ কথা বলে তিনি তাদের সম্পর্কে সদ্য নাযিল হওয়া সূরা তাওবার ১১৭ নং আয়াতটি পাঠ করে শোনান। আল্লা দয়অশীল নবীর প্রতি, এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যাঁরা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে চিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি ত৭াদের প্রতি দয়অশীল ও করুণাময়।’ তিলাওয়াত শেষ হলে আনন্দের আতিশয্যে কা’ব বলে উঠলেন।, ‘আমি আমার সমন্ত ধন সম্পদ সাদাকা করে দিচ্ছি।’ রাসূল (সা) বললেনঃ সব নয়, কিছু দানকর। কা’ব তাঁর খাইবারের সম্পত্তি দান করেন। এরপর তিনি মন্তব্য করেনঃ আল্লাহ আমার সততার জন্যই মুক্তি দিয়েছেন। আমি অঙ্গীকার করছি, বাকী জীবনে আমি শুধু সত্যই বলবো।

সত্য বলার জন্য কা’ব ও তাঁর অপর দুই সঙ্গীকে যে চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, ইসলামের ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত পাওয়া দুস্কার। এত বড় বিপদেও তাঁদের দৈর্য্যচ্যুতি ঘটেনি। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে তাঁদের সেই করুণ অবস্থা াতি চমঃকারভাবে চিত্রিত হয়েছেঃ

“এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পিছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিšতৃত হওয়ার সত্ত্বেও তাঁদের জন্য সস্কৃচিতহয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতিত আর কোন আশ্রয়স্থল নেইÑঅতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময় করুণাশীল। হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।” (সূরা তাওবা ১১৮-১১৯)

এ আয়াতে যাদেরকে পিছনে রাখা হয়েছিল বলা হয়েছে। এর অর্থ যুদ্ধ থেকে পিছনে থেকে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহর (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসার প্রতীক্ষার ছিলেন।

কা’ব বলেনঃ আমাদের তাওবাহ কবুল সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয় রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে। উম্মু সালামা তখন বললেনঃ হে আল্লাহ নবী! আমরা কি কা’বকে সুসংবাদটি জানিয়ে দেব? রাসূল (সা) বললেন: তাহলেতো মানুষের ঢল নামবে এবং তোমরা আর ঘুমাতে পারবে না।২৮

কা’বের (রা) মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। ইবন হিববান বলেন, তিনি আলীর (রা) শাহাদারে সময়কালে মারা যান। ইবন আবী হাতেম বলেন, মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে তিনি অন্ধ হয়ে যান। ইমাম বুখারী ত৭ার মৃত্যু সম্পর্কে শুধু এতটুকু উল্লেখ করেছেন যে, তিনি উসমানের মৃত্যুতে শোকগাথা রচনা করেছেন এবং মু’য়াবিয়া ও আলীর (রা) দ্বন্দ্বে তাঁর ভূমিকার বিষয়ে আমরা কোন তথ্য পাইনি। ইমাম বাগাবী বলেন, আমি জেনেছি, তিনি মু‘য়াবিয়ার (রা) খিলাফত কালে শামে মারা যান। আবুল ফারাজ আল ইসপাহানী কিতাবুল আগামী গ্রন্থে একটি দুর্বল সনদে উল্লেখ করেছেন যে, হাসসান ইবন সাবিত কা’ব ইববন মালিক ও আন-নূ’য়ান ইবন বাশীর (লা) একবার আলীর (রা) কাছে যান এবং উসমানের (রা) সত্যার বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে তর্কে লিপ্ত হন। তখন কা’ব (রা) উসমানের (রা) শানে তাঁর রচিত একটি শোকগাথা আবৃত্তি করে আলীকে শোনান। তারপর ত৭ারা সেখান থেকে উঠে সোজা মু’য়াবিয়ার কাছে চলে যান। মু’য়াবিয়া (রা) তাঁদেরকে উপযুক্ত মর্যাদা দান করেন।২৯

আল-হায়সাম ও আল-মাদায়িনীর মতে কা’ব হিজরী ৪০ সনে মারা যান। তবে তাঁর থেকে হিজরী ৫১ সনের কথাও বর্নিত হয়েছে। আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, হিজরী ৫০ সনে তাঁর মৃত্যুর কথা বর্ণিত আছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদধ ও সঠিক মত এই যে, হিজরী ৫০ থেকে ৫৫ (৬৭০-৬৭৩ খ্রীঃ)-এর মধ্যে প্রায় ৭৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।৩০

সীরাত গ্রন্থসমূহে ত৭ার পাঁচ ছেলের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেনঃ আবদুল্লাহ, উবায়দুল্লাহ, আবদুর রহমান. মা’বাদ ও মুহাম্মদ। শেষ জীবন কা’ব (রা) অন্ধ হয়ে যান।৩১ ছেলেরা তাঁকে হাত ধরে নিয়ে বেড়াপতেন।৩২ ইবন ইসহাক তাঁর ছেেেল আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: শেষ জীবনে আমার পিতা অন্ধ হয়ে গেলে আমি তাঁকে নিয়ে বেড়াতাম। আমি যখন তাঁকে জুম’আর নামাযের জন্য নিয়ে বের হতাম তখন আজান শোনার সাথে সাথে তিনি আবু উমামা আস’য়াদ আবিন খুরারার জন্যে মাগফিরাত কামনা করে দু’আ করতেন। জুরআর আজান শুনলেই তাঁকে আমি সব সময় এ কাজটি করতে দেখতাম। বিষয়টি আমার কাছে রহস্যজনক মন হলো। আমি একদন জুম’আর দিনে ত৭াকে নিয়ে বের হয়েছিল, পথে আজানের ধ্বনি শোনার সাথে সাথে তিনি আবু উমামার জন্য দু’আর করতে শুরু করেন। আমি বললামঃ আব্বা, জুম’আর আজান শুললেই আপনি এভাবে আবু উমামার জন্য দু’আ করেন কেন? বললেনঃ বাবা, রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার আগে সেই আমাদেরকে সমবেত করে সর্বপ্রথম জুরম’আর জামায়াত কায়েম করেন। সেটি অনুষ্ঠিত হতো হাররার বনু বায়দার হাযমুন নাবীত পাহাড়ের নাকী আলÑখাদিমাত’ নামক স্থানে। আমি প্রশ্ন করলাম: তখন আপনারা কতজন ছিলেন? বললেন: চল্লিশজন।৩৩

হাদীসের গ্রন্থসমূহে কা’বের বর্ণিত মোট আশিটি (৮০) হাদীস পাওয়া যায়।৩৪ তবে ইমাম জাহবী বলেন: ত৭ার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ত্রিশে পৌঁছবে। তারমধ্যে  তিনটি মত্তাফাক আলাইহি। একটি বুখারী ও দুইি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।৩৫ তিনি খোদ রাসূল (সা) ও উসাইদ ইবন হুদাইর (রা) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।৩৬

কা’ব (রা) থেকে যে সকল মনীষী হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কতিপয় ব্যক্তি হলেন: আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, জাবির ইবন আবদল্লিাহ ও আবু ইমামা আল-বাহিলী। উল্লেখিত তিনজইন হলেন সাহাবী। আর তাবেঈদের মধ্যে ইমাম বাকের, ‘আমর ইবন হাকাম ইবন সাওবান, আলী ইবন আবী তালহা উমার ইবন কাসীর ইবন আফলাহ, উমার ইবন আল-হাকাম ইবন রাফে, কা’বের  পাঁচ পুত্র ও পৌত্র আবদুর রহমান ইবন আবদিল্লাহ প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।৩৭

বালাজুরীর বর্ণনায় জানা যায়, রাসূল কারীম (সা) আসলাম, গিফারী ও জুহাইনা গোত্রের যাকাত-সাদাকা রহমান ইবন আবদিল্লাহ প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।৩৮

উসমানের (রা) শাহাদাতের দুঃখজনক ঘটনায় কা’ব (রা) একটি মারসিয়া (শোকগাথা) রচনা করেন এবং আলীকে (রা) আবৃত্তি করে শোনান। তার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ নিম্নরূপ:৩৯

১.উসমান তাঁর হাত দুটি গুটিয়ে নিলেন তারপর দ্বার রুদ্ধ করে দিলেন। তিনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করলেন, আল্লাহ উদাসীন নন।

২.গৃহে যারা ছিল তাদের বললেন, তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না। াযারা যুদ্ধ করেনি আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করুন।

৩.বন্ধুত্ব সৃষ্টির পর আল্লাহ কেমন করে তাঁদের  অন্তরে শত্র“তা, হিংসা ও বিধ্বেষ ঢেলে দিলেন?

৪.আর কল্যাণ কিভাবে তাঁদের দিকে পশ্চাদ্দেশ ফিরিয়ে উট পাখীর মত দৌড় দিল? আলী (রা) কবিতাটি শোনার পর মন্তব্য করলেনঃ উসমান আত্মাত্যাগ করেছেন। আর এ ত্যাগ ছিল অতীব দুঃখজনক। আর তোমরা তখণ ভীত হয়ে পড়েছিলে। সে ভীতি ছির অতি নিকৃষ্ট ধরনের।

আলী ও মুয়াবিয়ার (রা) মধ্যে যেদ্বন্দ্ব-ষংঘাত ঘটেছির তাতে কা’ব (রা) কোন পক্ষে যোগ না দিয়ে উভয়ের থেকে দূরে থাকেন।

সততা ও সত্য বলা ছিল কা’বের (রা) চরিত্রের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যকে যেভাবে তিনি ধারণ করেন সেভাবে অনেকেই ধারণ করতে পারেননি। দু’আ কবুল হওয়ার পর জীবনে কোন দিন বিন্দুমাত্র মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তিনি নিজেই বলেছেনঃ আল্লাহর কসম! যে দিন আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) সেই খথাগুলি বলেছিলাম সেদিন থেকে আজকের দিনটি পর্যন্ত আর কোন প্রকার মিথ্যা বলিনি।৪০ তাবুক যুদ্ধের পূর্বের জীবনটি ছিল তাঁর অতি পরিচ্ছন্ন। এ কারণে তার জীবনে যখন তাবুকের বিপর্যয় নেমে এলো তখণ তাঁর নিজ গোত্র বনু সালেমা তাঁকে বলতে পেরেছিল আল্লাহর কসম! তোমাকে তো আমরা এর পূর্বে আর কোন অপরাধ করতে দেখিনি।৪১

কা’ব (রা) ছিলেন তাঁর সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তৎকালীন আরব কবিদের মধ্যে যাঁরা বেশী বেশী কবিতা রচনা করেছেন তিনি তাঁদেরই একজন। জাহিলী আমলেও কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সাহিত্য সমালোচকদের মতে, তাঁর কবিতা খুবই উন্নতমানের।৪২ মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে যে তিনজন কবি কুরাইশ ও তাদের স্বগোত্রীয় কবিদের মুকাবিলায় দুর্ভেদ্য ব্যুহ রচনা করেন, কা’ব (রা) সেই ত্রয়ীর অন্যতম। তাঁরা ইসলামবিদ্বেষী কবিদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন।৪৩ ইবন সীরীন বলেন: এ তিন কবি হলেন, হাসসান ইবন সাবিত, ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও কা’ব ইবন মালিক। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের ম্েযধ শ্রেষ্ঠ কবি।৪৪

কা’ব ইসলাম গ্রহনের পর কুরাইশদের দেব-দেবীর সমালোচনা করে প্রচুর কবিতা রচনা করেছেন। তিনি একটি শ্লোকে বলেছেন:৪৫

আমরা আল-লাত, আল ‘উয্যা ও উদ্দাকে ভুলে যাব। তাদের গলার হার ও কানের দুল ছিনিয়ে নেব।’

রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারের প্রধান তিন কবির কবিতার বিষয় ছিল ভিন্ন। কা’বের কবিতার মূল বিষয় ছিল যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে কাফিরদের ান্তরে ভীতির সৃষিট করা এবং মুলসামানদের অন্তর থেকে ভীতি দূর করে তাদেরকে অটল ও দৃঢ় করা। ইবন সীরীন বলেনঃ৪৬ কা’ব তো কবিতায় যুদ্ধের কথা বলে কাফিরদের ভূয় দেখাতেন। বলতেন: আমরা এমন করেছি, এমন করছি বা করবো। হাসসান তাঁর কবিতায় কাফিরদের দোষ ক্রুটি এবং তাদের যুদধ বিগ্রহের কথা বর্ণনা করতেন। আর ইবন রাওয়াহী কুফরী এবং আল্লাহ ও রাসূলের অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতার উল্লেখ করে তাদেরকে ধিক্কার ও নিন্দা জানাতেন।

কা’বের (রা) ছেলে আবদুর রহমান বলেণ, আমার পিতা একদিন বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ, কবিদের সম্পর্কে আল্লাহ তো যা নাযিল করার তা করেছেন। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন: একজন প্রকৃত মুজাহিদ তার তরবারি ও জিহবা উভয়টি দিয়ে জিহাদ করে। আমার প্রাণযে সত্তার হাতে তার নামের শপথ! তোমরা তো শক্রুদের দিকে (জিহবা দিয়ে) তীরের ফলাই ছুড়ে মারছো।

ইবন ইসাহক বর্ণনা করেছেন। যখন সূরা আশ-শূ’য়ারার ২২৪ থেকে ২২৬ নং আয়াত- বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখনা যে, তারা প্রতি ময়দানেই কবি-হাসসান, আবদুল্লাহ ও কা’ব কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হলেন। তাঁরা বললেনঃ হে আল্লাহ নবী! আল্লাহ যখন এ আয়াত নাযিল করেছেন তখন তো অবশ্যই জেনেছেন, আমরা কবি। রাসূল (সা) তখন তাঁদেরকে আয়াতের ব্যতিক্রমী অংশ তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে খুব স্বরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে পাঠ করে শোনালেন। তারপর বললেন: এ হচ্ছো তোমরা।৪৮

কা’ব (রা) ইসলামের প্রতিপক্ষ কুরাইশদের নিন্দায় বহু শ্লোক রচনা করেছেন। আল্লাহ দরবারে অন্তরঃ তার একটি শ্লোক যে গৃহীত হয়েছে, সে কথা খোদ রাসূল (সা) বলেছেন। জাবির (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একদিন রাসূল (সা) কা’বকে বললেনঃ তুমি যে শ্লোকটি বলেছো, তাতে তোমার রব তোমাকে ভোলেননি। কা’ব জানতে চাইলেনঃ কোন শ্লোকটি? রাসূল (সা) তখন আবু বকরকে বললেন: আপনি শ্লোকটি একটু আবৃত্তি করুন তো। আবু বকর তখন শ্লোকটি আবৃত্তি করে শোনান।৪৯ প্রাচীন আরবী সূত্রসমূহে শ্লোকটি সংকলিত হয়েছে।৫০ শ্লোকটির অনুবাদ এখানে ওদয়া হলোঃ ‘সাখীনা ধারণা করেছে, সে তার রবকে (প্রভু) পরাভূত করবে। সকল বিজয়ীদের ওপর বিজয়ী (আল্লাহ) অবম্যই জয়ী হবেন।’

এখানে ‘সাখীন’ অর্থ আটা ও ঘি অথবা আটা ও খোরমা দিয়ে তৈরি এক প্রকার খাবার। এটি ছিল কুরাইশদের খুবই প্রিয় খাদ্য। তারা খেতও খুব বেশী বেশী। এ কারণে কবি কুরাইশদেরকে ‘সাখীনা’ বলেছেন। এ দ্বারা মূলতঃ তাদেরকে হেয় ও অপমান করা হয়েছে।৫১

কা’ব (রা) কবিতা রচনা করে রাসূলকে (সা) শোনাতেন। মাঝে মাঝে রাসূল (সা) তাতে কিছু শব্দ রদ-বদল করে সংশোধন করে দিতেন। কা’ব তা সবিনয়ে গ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে করতেন।৫২

সমকালীন আরব সমাজে কা’বের (রা) কবিতা এক অসাধারণ প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। রাসূলে কারীম (সা) হুনাইন যুদ্ধ শেষ করে যখন তায়েফের দিকে যাত্রা করেন প্রভাব ফেলে যে,  তারা তা শুনেই ইসলাম গ্রহণ করে। শ্লোক দু’টির অর্থ নিম্নরূপ:

‘তহিামা ও খায়বার থেকে আমরা সকল প্রকার হিংসা-বিদ্ভেষ বিদূরিত করে তরবারি কোষে আবদ্ধ করে ফেলেছি।

এখন আবার আমরা তাকে যে কোন দু’টির মধ্যে একটি স্বাধীনতা দিচ্ছি। যদি তরবারি কথা বলতে পারতো তাহলে বলতো এবার দাউস অথবা সাকীফের পালা।’

ইবনে সীরীন বলেনঃ দাউস গোত্র যখন উক্ত পংক্তি দুটি শুনলো তখন তারা ভীত হয়ে পড়লো। তারা বললো, এখন মুসলমান হয়ে যাওয়াই উচিত। তা না হলে আমাদের দশাও হবে অন্যদের মত। এরপর তারা একযোগে ইসলাম গ্রহণ করে।৫৩

কা’ব (রা) ইসলাম গ্রহণের পর থেকে জীবনের শেস দিন পর্যন্ত স্বীয় কাব্য প্রতিভাকে ইসলাম ও মুসলমানদের সেবায় নিয়োগ করেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি যেমন তরবারি হাতে তুলে নিয়েছেন তেমনিভাবে ভাষার যুদ্ধও চালিয়েছেন। তাঁর জীবনকালের ইসলামের ইতহিাসের সকল ঘটনা তিনি তাঁর কবিতায় ধরে রেখেছেন। বদর যুদ্ধের উবনুল হারেস মহীন হন। তাঁর স্বরণে রচনা করেন এক শোকগাথা।৫৪ উহুদ যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধের শহীদের সম্পর্কে বহু কবিতা তিনি রচনা করেছেন। এ যুদ্ধের অন্যতম শহীদ রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা সায়্যিদুশ শুহাদা হামযার (রা) স্মরণে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। এ সময় মক্কার পৌত্তলিক কবিদের সাথে ত৭ার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সীরাতে ইবন হিশামে তার একটি চিত্র পাওয়া যায়।৫৫

হামযার (রা) শানে রচিত একটি মরসিয়াতে তিনি হামযার বোন সাফিয়্যা বিনতু আবদিল মুত্তালিবকে লক্ষ্য করে বলছেন:৫৬

১.ওঠো সাফিয়্যা, ভেঙ্গে পড়োনা। হামযার স্মরণে বিলাপের জন্য নারীদের প্রতি আহবান জানাও।

২.মানুসের অন্তর কাঁপানো যে বিপদ আল্লাহর সিংহের ওপর আপতিত হয়েছে, সেজন্য দীর্ঘ ক্রন্দনে ক্লান্ত হয়ো না।

৩.তিনি ছিলেন পিতৃ-মাতৃহীনদের জন্য মর্যদার প্রতীক। অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় ছিলেন সিংহের মত।

৪.তাঁর সকল কর্ম দ্বারা তিনি শুধু আহমাদের সন্তুষ্টি এবং আরশ ও ইজ্জতের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহর খুশীই কামনা করতেন।

বীরে মা’উনায় রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিনিধিদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কবি কা’বের যবান  সোচ্চার হয়ে ওঠে তিনি হত্যাকারীদের নিন্দায় অনেক কবিতা রচনা করেন।৫৭ মদীনার ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের নির্বাসন ও ইহুদী নেতা কা’ব আশরাফের হত্যার চিত্র তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতায় ধরা পড়েছে। এ ঘটনা লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষ কবিদের নিন্দাবাদের জবাবও তিনি দিয়েছেন।৫৮

খন্দক যুদ্ধের চিত্রও তাঁর  কবিতায় ধরা পড়েছে। প্রতিপক্ষের বাহিনী ও কবিদের নিন্দায় তিনি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছেন।৫৯ বনু লিহইয়ানের যুদ্ধও তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে।৬০ জ্বি-কারাদের ঘটনায়ও তাঁকে সোচ্চার দেখা যায়।৬১ খায়বার বিজয়ের চিত্রও তাঁর কবিতায় বিধৃত হয়েছে।৬২ মূতার যুদ্ধের শহীদরা তাঁর হৃদয়ে দারুণ ছাপ ফেলেছে। তাঁদের স্বরণে তিনি রচনা করেছেন আবেগ-ভরা এক কাসীদা।৬৩ এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) এ মহান কবির জিহ্বা ইসলামের প্রথম পর্বের সকল ঘটনা ও যুদ্ধে সোচ্চার থেকে আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাব যথাযথ ব্যবহার করে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। তাঁর কিছু কিছু পংক্তি আরবী ভাষা সাহিত্যে প্রবাবদ-প্রবচনে পরিণত হয়েছে। রাওহ ইবন যানবা বলেন, কা’বের নিজ গোত্রের এক ব্যক্তির প্রশংসায় রচিত তাঁর একটি শ্লোক আরবী কাব্য গজতে সর্বাধিক বীরত্বব্যঞ্জক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।৬৪

তথ্যসূত্র:

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ