আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা)

আবদুল্লাহ (রা) নদীনার বিখ্যাত ইহুদী গোত্র বনু কায়নুকার সন্তান। তাঁর বংশধারা উপরের দিকে ইউসুফ আলাইহিস সালামে গিয়ে মিলিত হয়েছে।১ তাঁর উপনাম দুইটি: আবু ইউসুফ ও আবুল হারেস। পিতার নাম সালাম ইবন হারেস। মদীনার খাযরাজ গোত্রের একটি শাখা বনুাউফ। এই বনু ‘আউফের একটি  উপ-শাখার নাম ‘কাওয়াকিল’। আবদুল্লাহ আবন সালাম প্রাচীন জাহিলী আরবের রেওয়ান অনুযায়ী এই কাওয়াকিল গোত্রের হানীফ বা চুক্তিবদ্ধ বন্ধু ছিলেন। পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিতে পরিণত হন।২ ইসলাম পূর্ব জাহিলী আমলে তাঁর নাম ছিল ‘হুসাইন’। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) নামটি পরিবর্তন করে আবদুল্লাহ রাখেন।৩

আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি হাদীস ও সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কেত বিভিন্ন বর্ণনায় যে কথাগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাহলো, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি একজান ড় ইহুদী ধর্মগুরু হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাওরাতে রাসূলুল্লাহর (সা) আগমন কাল ও তাঁর পরিচয় সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তা তাঁর জানা ছিল। অনেকের মত তিনিও শেষ নবীর প্রতীক্ষায় ছিলেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় এসে সর্বপ্রথম কুবার বনু আমর ইবন আউফ গোত্রে যখন ওঠেন তখন তিনি একটি খেজুর গাছের মাথায়। এক ব্যক্তি তাঁকে রাসূলের (সা) আগমন খবর দিলে তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে তাঁর সাথে প্রথস সাক্ষাৎ করেন এবং প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারেন তিনি নবী। তারপর রাসূল (সা) যখন মদূনার মূল ভুখণ্ডে এসে আবু আইউব আল-আনসারীর গৃহে অবস্থান গ্রহণ কনের তখন আবদুলÍাহ আবার আসেন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে। এই সাক্ষাতে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর অনেক কথা হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় নানা ভাবে এ সব কথা এসেছে।৪ এখানে আমরা কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরছি।

আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলতেন: আমার পিতার নিকট আমি তাওরাতের পাঠ ও ব্যাখ্যা শিখেছিরাম। একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) পরিচয়, নিদর্শন, গুণাবলী ও তাঁর কর্মকাণ্ডসম্পর্কিত একটি আয়াত তিনি পড়ালেন। তারপর বললেন: তিনি যদি হারূনের বংশধর হন তাহলে তাঁর ানুসরণ করবে, অন্যথায় নয়। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাতের পূর্বে মারা যান।

অতঃপর একদিন রাসূল (সা) মদীনায় আসলেন। আমি তখন বাগানে খেজুর পাড়ছিলাম আর আমার ফুফু খালেদা বিনতুল হারেস খেজুর কুড়াচ্ছিরেন। এই সময় ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলতে লাগলো: আরবের অধিকারী ব্যক্তি আজ এসে গেছেন। একথা শুনে আমি কাঁপতে শুরু করলাম এবং জোরে তাকবীর দিলাম। আমার বৃদ্ধা ফুফু আমার এ অবস্থা দেখে বললেন: ওরে খবীছ, তোমার যা হাল হয়েছে, মুসা ইবন ইমরানও যদি আসতেন তাহলেও এর চেয়ে বেশী হতোনা। আমি বললাম: ফুফু! তিনি মুসারই ভাই এবং তাঁরই দ্বীনের ওপর আছেন। তিনি যা নিয়ে এসেছিলেন ইনিও তাই নিয়ে আসেছেন।

আমি গাছ থেকে নেমে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গেলাম। তাঁর অবয়ব প্রত্যক্ষ করলাম এবং তাঁকে চিনলাম। আমি তাঁকে আমার পিতার কথা বললাম। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। পরে আমার ফুফুও ইসলাম গ্রহণ করেন।৫

আবদুল্লাহ ইবন সালাম আরো বলেন: রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় পদার্পণ করলে মানুষ তাঁর কাছে ভীড় করলো। আমিও গেলাম। আমি দেখেই বুঝলাম এই চেহারা কোন ভণ্ড-মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি তাঁর মুখ থেকে সর্বপ্রথম এই কথাগুলি শুনলাম: ‘ওহে জনমণ্ডলী! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, মানুষকে আহার করাও, আত্মীয়তার সম্পর্কে অক্ষুণœ রাখ এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়থÑতাহলে নির্বিঘেœ জান্নাতে প্রবেশ করবে।’৬

রাসূলুল্লাহর (সা) মক্কা থেকে কুবা পৌঁছার পর আবদুল্লাহ ইবন সালামের প্রথম যে সাক্ষাৎ হয় উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা সম্ভবত সেই সাক্ষাতের কথা বলেছেন। রাসূল (সা) তিনদিন কুবায় বিশ্যাম নেওয়ার পর মদীনার মূল ভূখণ্ডের দিকে যাত্রা করেন। পথে সকলেরর অনুরোধ-উপরোধ উপেক্ষা করে আবু আইউব আল-আনসারীর গৃহে অবস্থান গ্রহণ  করেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম এ সময় আবার রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হন। আর এ সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছেন আনাস (রা)।

আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার পর আবদুল্লাহ ইবন সারাম সাক্ষাৎ করতে আসেন। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) লক্ষ্য করে বলেন: আমি আপনাকে এমন তিনটি প্রশ্ন করতে চাই যার উত্তর কেবল নবীরাই জানেন।৭

ক) কিয়ামতের প্রথম আলামত বা নিদর্শন কি?

খ) জান্নাতের অধিবাসীদের প্রথম খাবার কি?

গ) সন্তান পিতা অথবা মাতার সদৃশ হয় কেন?

রাসূল (সা) বললেন: এই মাত্র জিবরীল কথাগুলি আমাকে বলে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন: ফিরিশতাদের মধ্যে এই জিবরীলই তো ইহুদীদের দুশমন। রাসূল (সা) বললেন: কিয়ামতের প্রথম আলামত হলো, পূর্ব থেকে একটি আগুন বের হবে এবং মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে পশ্চিমে সমবেত করবে। জান্নাাতের অধিবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তানের পিতা-মাতার সাদৃশ্যের কারণ হলো, পুরুষের পানি আগে বের হলে সন্তান তার দিকে ঝুঁকবে, আর স্ত্রীর পানি আগে বের হলে সন্তান তাঁর দিকে। এ জবাব শুনে আবদুল্লাহ বললেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল।

এরপর আবুদল্লাহ ইবন সালাম বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহুদীরা একটি মিথ্যাবাদী সম্প্রদায়। আমি একজন আলিম (জ্ঞানী) পিতার আলিম সন্তান। তেমনিভাবে একজন রয়িস (নেতা) পিতার রয়িস সন্তান। আপনি ইহুদীদের ডেকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। তবে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা তাদের কাছে গোপন রাখবেন। তাঁর কথা মত রাসূল (সা) ইহুদীদের ডেকে তাদের সামনে ইসলামের দা’ওয়াতে পেশ করলেন। এক পর্যায়ে তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: তোমাদের মধ্রে আবদুল্লাহ ইবন সারাম কে? তারা বললো: তিনি তো আমাদের প্রাক্তন রয়িসের ছেলে বর্তমান রয়িস। ‘আলিম পিতার আলিম সন্তান। রাসূল (সা) বললেন: আচ্ছা, তিনি কি ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন? তারা বললো: কক্ষণো না।

এদেিক আবুদল্লাহ ইবন সালাম তখন ঘরের এক কোণে লুকিয়ে আছেন। রাসূল (সা) তাঁকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত কররেন। তিনি কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করতে করতে বেরিয়ে এসে ইহুদী সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা আল্লাহকে একটু ভয় কর। তোমরা ভালো করেই জান এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর দ্বীন সত্য।

তাঁর আবেদন সত্ত্বেও ইহুদীরা ঈমান আনলো ন। বরং এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে তারা যে অপমানিত হলো তাতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তারা আবদুল্লাহলকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলো: তুমি একজন ভণ্ড, মিথ্যাবাদী ও বিশ্বাসঘাতক। তুমি আমাদের সম্প্রদায়ের একজন নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। তোমার বাবাও ছিল একজন ইতর।

আবদুল্লাহ তখন বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি দেখলেন তো। আমি এরই ভয় পাচ্ছিলাম।৮ যখন ইহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সা) দা’ওয়াতে প্রত্যাখ্রান করে চলে গেল তণ পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহক্বাফের দশম আয়াতটি নাযিল হলো।৯

আবদুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে ভিন্নমতও আছে। ইমাম শা’বী থেকে বির্ণত হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহর ওফাতের দুই বছর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।১০ ইমাম জাহাবী বলেন, এ একটি ব্যতিক্রমী ও প্রত্যাখ্রাত বর্ণনা। কারণ, সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাত ও মদীনায় আগমনের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন।১১ ইবন সা’দ বলেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমেরন পর প্রথমভাগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইহুদীদের একজন ‘হাব্র বা ধর্মগুরু।১২

বদর ও উহুদ যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবন সালামের যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মত পার্থক্য আছে ইবন সা’দের মতে তিনি সর্বপ্রথম খন্দক যুদ্ধে যোগদান করেন। এ কারনে তাঁকে সাহাবীদের তৃতীয় তাবকা (স্তর) খন্দকের যোদ্ধাদের সাথে উল্লেখ করেছেন। খন্দকের পর থেকে সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।

খলীফা উমারের (রা) বাইতুল মাকদাস সফরকালে তিনি সফরসঙ্গী ছিলেন। আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, বায়তুল মাকদাস ও জাবিয়া বিজয়ের তিনি অন্যতম অংশীদার ছিলেন।১৩

বিদ্রোহীরা যখন খলীফা উসমানকে (রা) গৃহে অবরুদ্ধ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে তখন সেই দুর্যোগময় মমুহূর্তে তিনি একদিন সাক্ষাৎ করে বলেন: আমরা সাহায্যের জন্য প্রস্তুত। এখন এভাবে আপনার ঘরে বসে থাকা ঠিক হবে না। বাইরে যেয়ে সমবেত জনতাকে বিক্ষিপ্ত করে দিন। এ কথ বলে আবদুল্লাহ নিজেই জনতার সামনে এসে একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। বাষণটি বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তার সারাংশ নিম্নরূপ:

“ওহে জনমণ্ডলী জাহিলী ’আমলে আমার নাম ছিল হুসাইন। রাসূলুল্লাহ আমার নাম দেন আবদুল্লাহ। কুরআন পাকের এ আয়াতগুলি আমার সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।

১)আর বনী ইসরাঈলের একজন সাক্ষী এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে এতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আর তোমরা অহঙ্কার করছো। (সূরা আল-আহক্বাফ-১০)

২)কাফেররা বলে: আপনি রাসূল নন। বলে দিনঃ আমার ও তোমাদের মধ্যে প্রকৃষ্ট সাক্ষী হচ্ছেন আল্লাহ এবং ঐ ব্যক্তি, যার কাছে (আসমানী) গ্রন্থের জ্ঞান আছে। (সূরা রা’দ-৪৩)

আল্লাহর তরবারি এখন পর্যন্ত কোষবদ্ধ আছে এবং আপনাদের এই শহর- রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাত স্থলকে ফিরিশতারা তাদের আবাসভূমি বানিয়ে রেখেছেন। অতএব আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। তাঁকে (উসমানকে) হত্যা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহর কসম! যদি আপনারা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন তাহলে আপনাদের প্রতিবেশী ফিরিশতাগণ মদীনরা ত্যাগ করবেন। আর এখন পর্যন্ত যে তরবারি কেষবদ্ধ আছে তা বেরিয়ে পড়বে এবং কিয়াতম পর্যন্ত তা আর কোষবদ্ধ হবে না।”

তাঁর এ ভাষণ কঠোর হৃদয় বিদ্রোহীদের ওপর কোন প্রভাব ফেরতে পারলো না। বরং এর উল্টো ফর দেখা দিল। তাদের দুভৃাগ্য ও হঠকারিতা আরো বেড়ে গেল। তারা বললোঃ “এই ইহুদী ও উসমান-দুই জনকেই হত্যা কর।”১৪

অন্য একটি বণৃনায় এসেছে। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলেন: ‘উসমান যখন গৃহবন্দী তখন আমি একদিন তাঁকে সালাম জানাতে গেলাম। আমি ত৭ার গৃহে প্রবশে করতেই তিনি বললেন: আমার ভাই স্বাগতম! গত রাতে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) এই জানালা দিয়ে দেখেছি। তিনি বললেন: উসমান! তোমাকে তারা অবরুদ্ধ করেছে? বললাম: হাঁ। বরলেন: তোমাকে তারা তৃষ্ণার্ত রেখেছে? বললাম: হ্যাঁ। তারপর তিনি আমাকে একটি পানিভর্তি বালতি দিলেন। আমি পান করে পিপাসা নিবারণ করলোম। তিনি আমাকে বললেন: তুমি চাইলে তাঁদের বিরুদ্ধে তোমাকে বিজয়ী করবো। আর ইচ্ছা করলে আজ আমার সাথে ইফতার করতে পার। আমি তাঁর সাথে ইফতার করাকে বেছে নিয়েছি। তিনি সেই দিন নিহত হন।১৫

খলীফা আলী (রা) মদীনার পরিবর্তে কুফাকে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নিলে আবুদল্লাহ তাঁকে বলেন, “আপনি মদীনার মসজিদে রাসূলুল্লাহর (সা) মিম্বর ত্যাগ করবেন না। এটা ত্যাগ করলে আর কখনও তা যিয়ারত করতে পারবেন নরা।” আলী (রা) তখন মন্তব্য করেন “বেবচারা বড় সরল ও সৎ মানুষ।১৬

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। আলী (রা) বলেন: আমি ঘোড়ার পিঠে উঠার জন্য যখন জিনে পা রাখছি ঠিক সেই সশয় আবুদল্লাহ ইবন সালাম আমার কাছে এসে বলেন: কোথায় যাচ্ছেন? বললামঃ ইরাক। বললেন: সেখানে গেলে আপনি তরবারির ধার লাভ করবেন। বলালম ৎ আমি আগেই একথাটি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি।১৭

খলীফা আলী ও আলীর মু’য়াবিয়ার (রা) ঝগড়া ও বিবাদে তিনি জড়াননি। একটি কাঠের তৈরী তরবারি সঙ্গে নিয়ে এ বিবাদ থেকে সযতেœ দূরে থাকেন।১৮

সকল সীরাত বিশেষজ্ঞ একমত যে, তিনি আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৪৩ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন।১৯ তিনি দুই ছেলে রেখে যান। ত৭াদের নাম ইউসুফ ও মুহাম্মদ। উভয়ের জন্ম হয় রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায়। ইউসুফ ছিলেন বড়। তাঁর জন্মের পর রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে কোলে নেন, মাথায হাত রাখেন এবং ইউসুফ নাম রাখেন।২০

আবদুল্লাহর দৈনিক পঠনের তেমন বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে একথা জানা যায় যে, বার্দ্ধক্যে দুর্বলতার দরুন লাঠি নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং প্রয়োজনে তাতে ঠেস দিতেন।২১ মুখমণ্ডলে খোদাভীতির ছাপ সর্বদা প্রতিভাত হতো।২২

আবদুল্লাহর (রা) বুকটি ভরা ছিল তাওরাত, ইনজীল, কুরআন মাজীদ ও হাদীসে নববীর জ্ঞানে। তাওরাতে তাঁর সীমাহীন পারদর্শিতা সম্পর্কে আল্লামাহ জাহাবী লিখেছেন:২৩

“আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাঁর সময়ে মদীনায় আহলি কিতাবদের সবচেয়ে বড় ‘আলিম ছিলেন।”

ইসলাম গ্রহণের পর কুরআন ও হাদীসের প্রতি মনোযোগ দেন এবং এর জ্ঞানে সকলের আস্থা ভাজনে পরিণত হন। এর চেয়ে মর্যাদার বিয়ষ আর কি হতে পারে যে, আবু হুরাইরাহÑযিনি সাহাবীদের মধ্যে হাদীসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী পারদর্শী ছিলেন, তিনিও আবদুল্লাহর নিকট হাদীস জিজ্ঞেস করতেন। একবার আবু হুরাইরাহ গেছেন শামে। সেখানে তিনি কা’ব ইবন আহ্বারের নিকট এই হাদীসটি বর্ণনা করেন: ‘জুম’আর দিন এমন একটি মুহুর্তে আছে তখন যদি কোন বান্দাহ আল্লাহ নিকট কিচু চায় তাহলে তিনি অবশ্যই তা তাকে দান করেন।’ হাদীসটি শোনার পর কা’ব কিছুটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকেন। তারপর অবম্য আবু হুরাইরার বর্ণনার সাথে একমত পোষণ করেন।

এদিকে তিনি (আবু হুরাইরাহ) মদীনায় পিরে এসে আবুদল্লাহ ইবন সালামের নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তিনি শুনে মন্তব্য করেন: কা’ব মিথ্য বলেছে। তখন আবু হুরাইরাহ বলরেন: শেষে তিনি আমার কথা মেনে নিয়েছেন। আবদুল্লাহ বললেন: আপনি কি জানেন সেটা কোন সময়? এ প্রশ্ন শুনে আবু হুরাইরাহ তাঁর পিছু নিলেন এবং সময়টি বলার জন্য ত৭াকে ানুরোধ করতে লাগলেন। তখন আবুদল্লাহ বললেন: আসর ও মাগরিবের মাঝখানের সময়। আবু হুরাইরাহ বললেন: আসর ও মাগরিবের মাঝখানে তো কোন নামায নেই। এ কেমন করে হয়? আবদুল্লাহ বললেন: আপনার হয়তো জানা নেই যে, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি নামাযের প্রতীক্ষায় বসে থাকে সে যেন নামাযের মধ্যেই থাকে।২৪

হাদীসে এম পারদর্শিতা সত্ত্বেও তাঁর থেকে মাত্র পাঁচিশটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।২৫ তাঁর মুখ থেকে হাদীস শুনে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে অনেক সাহাবী আছেন যেমন: আনাস ইবন মালিক, যুরারাহ ইবন আওফা, আবু হুরাইরাহ, আবদুল্লাহ ইবন মা’কিল, আবদুল্লাহ ইবন হানজালা প্রমুখ। এছাড়া ত৭ার বিশেষ কয়েকজন ছাত্রের নামঃ খারাশা ইবন আল-হুর, কায়স ইবন উবাদ, আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান, হামযাহ ইবন ইউসুফ (পৌত্র), উমার ইবন মুহাম্মদ (পৌত্র), আওফ ইবন মালিক, আবু বুরাদাহ্ ইবন আবী মুসা, আবু সা’ঈদ আল-মুকরী, উবাদাহ্ আয-যারকী, আতা ইবন ইয়াসার, উবাইদুল্লাহ ইবন জায়শ আল-গিফারী, যুররাহ্ ইবন আওফা, ইউসুফ ও মুহাম্মদ (দুই পুত্র)।২৬

সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে আবুদল্লাহ ইবন সালামের সম্মান ও মর্যাদা ছিল অতি উঁচুতে। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট আলিম সাহাবীদের অন্যতম। বিখ্যাত সাহাবী মু’য়াজ ইবন জাবালের অন্তিম সময় যখন ঘনিয়ে এলা তখন তাঁকে বলা হলো, আমাদেরকে কিছু উপদেরশ দিন। বললেন: আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি। তবে আমার সাথে ইলম বা জ্ঞান উঠে যাচ্ছে না। যে ব্যক্তি তা তালাশ করবে, সে লাভ করবে। তোমরা আবুদ দারদা, সালামান আল-ফারেসী, আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ ও আবদুল্লাহ ইবন সালামের নিকট ইলম (জ্ঞান) তালাশ করবে। আবদুল্লাহ ছিলেন ইহুদী। পরে মুসলমান হন। আমি রাসূলুল্লাহর (সা) তাঁর সম্পর্কে বলতে শুনেছি: সে দশম জান্নাতী ব্যক্তি।২৭

সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) বলেছেন। আমি একমাত্র আবদুলÍাহ ইবন সালাম ছাড়া পৃথিবীতে বিচরণকারী কোন ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে (সা) একথা বলতে শুনিনি: সে একজন জান্নাতের অধিকারী ব্যক্তি। তাঁরই সম্পর্কে নাযিল হয়েছে সূরা আল-আহক্বাফের ১০ নংয় আয়াতটি।২৮

মুস’য়াব ইবন সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস তাঁর পিতা সা’দ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এক পেয়ালা সারীদ’ আনা হলো। তিনি খাওয়ার পর কিচু অবশিষ্ট থাকলো। রাসূল (সা) বললেন: এই ফাঁক দিয়ে একজন জান্নাতী ব্যক্তি প্রবেশ করবে এবঙ এই এঁটেটুকু খেয়ে ফেলবে। সা’দ বলেন: আমি আমার ভাই উমাইরকে ওজু করতে পাঠিয়েছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম, সে এসে এঁটেটুকু খেয়ে ফেলুক। কিন্তু তাঁর আগেই আবদুল্লাহ ইবন সালাম এসে তা খেয়ে ফেলে।২৯

আবদুল্লাহ এত বড় মর্যদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও খুবই বিনয়ী ছিলেন। কেউ ত৭ার সামান্য প্রশংসা করলে ক্ষেপে যেতেন। কায়স ইবন উবাদ বলেন: আমি মদীনার মসজিদে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আসলেন, যাঁর চেহারায় খোদাভীতির ছাপ দ্যিমান ছিল। লোকেরা হললোঃ ইনি একজন  জান্নাতী ব্যক্তি। এরপর তিনি দুই রাকা’য়াত সংক্ষিপ্ত নামায আদায় করলেন। তিনি যখন মসজিদে থেকে বের হলেন, আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। তিনি তাঁর ঘরে ঢুকলেন, আমিও পিছনে পিছনে ঢুকলাম। আমি তাঁর সাথে কথা বলে পরিচিত হওয়ার পর বললাম: আপনি যখন মসজিদে প্রবশ করেন তখন লোকেরা এমন এমন কথা বলাবলি করছিল। তিনি বললেনঃ সুবহানাল্লাহ! কোন মানুষের এমন কথা বলা উচিত নয় যা সে জানেনা। আমি তোমাকে বলছি: আমি একটি স্বপ্ন দেখে রাসূলুল্লাহকে (সা) বললাম। স্বপ্নটি এরূর: আমি যেন একটি সবুজ উদ্যান দেখতে পেলাম। যার মঝখানে রয়েছে একটি লোহার খুঁটি। খুুঁটির গোড়া মাটিতে এবং আগা আকাশে। আগায় একটি রশি বাঁধা। আমাকে বলা হলো: খুঁটি বেয়ে উপরে ওঠো। আমি উঠে রশি ধরলাম। তখন আমাকে বলা হলো: শক্তভাবে আঁকড়ে থাক। রশিটি আমার হাতে াকা অস্থায় আমি ঘুম েেক জেগে উঠি। সকালে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে স্বপ্নটি বর্ণনা করলাম। রাসূল (সা) বললেন: উদ্যানটি হলো ইসলামের উদ্যান, আর খুঁটি হলো ইসলামের খুঁটি। আর রশি হলো ইসলামের রশি। তুমি আমরণ ইসলামের ওপর থাক।ে বর্ণনাকারী কায়স বলেন: সেই লোকটি হলেন আবদুল্লাহ ইবন সালাম।৩০

খারাশা ইবনুল হুর স্বপ্নটি একটু ভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন।৩১ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর স্বপ্নের বিবরণ শুনে বলেন: ইসরামের শক্ত রশি আঁকড়ে থাকা অবস্থায় তোমার মৃত্যু হবে।৩২

আবদুল্লাহর (রা) বিনয়ের আরো বহু ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। একবার তিনি লাকড়ীর একটি বোঝা মাথায় করে চলেছেন। তা দেখে লোকেরা তাঁকে বললো: এমন কাজ করা থেকে আল্লাহ আপনাকে রেহাই দিয়েছেন। তিনি বললেন: হাঁ, ঠিক। তবে আমি এ কাজের মাধ্যমে আমার অহঙ্কার ও আভিজাত্য চুরমার করতে পাই। কারণ আমি রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছি: যার অন্তরে একটি সরিষার দানা পরিমাণ ‘কিবর’ বা অহঙ্কার থাকবে সে জান্নাতে প্রবশে করবে না।৩৩

আবদুলালাহর (রা) মধ্রে সত্য ও সততার সীমাহীন আবেগ ও শক্তি ছিল। শেষ জীবনে তিনি বলতেন, তোমাদের যদি আর একবার কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ বেঁধে যায়, আর সে সময় যদি আমার মধ্যে শক্তি না থাকে তাহলে একটি চৌকির ওপর আমাকে বসিয়ে দুই পক্ষের মাঝখানে রেখে দেবে।৩৪

আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একবার সালমান আল-ফারেসী (রা) তাঁকে বললেন: ভাই! আমাদের দুইজনের মধ্যে যে আগে মারা যাব তাকে স্বপ্নে দেখার চেষ্টা করবো যে জীবিত থাকবো। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন: এটা কি সম্ভব? সালমান বললেণ: হ্যাঁ, সম্ভব। ঈমানদার ব্যক্তির রূহ মুক্ত থাকে। পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে। আর কাফির ব্যক্তির রূহ থাকে বন্দী। সালমান মারা গেলেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলেন: একদিন আমি মধ্যরাতে ঘুমিয়ে পড়েছি। সালমান এসে আমাকে সালাম দিলেন। আমি সালামের জবাব দিয়ে বললাম: আবু আবদিল্লাহ! আপনি আপনার বাসস্থান কেমন পেয়েছেন? বললেন: ভালো। আপনি তাওয়াককুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা) আঁকড়ে াকবেন। তাওয়াককুল খুব ভালো জিনিস। একাটি তিনি তিনবার বললেন। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছ। আবুদলÍাহ প্রশ্ন করলেন: আপনি কোন আমলটি সবচেয়ে ভালো পেয়েছেন? বললেন: তাওয়াককুলকে আমি বিস্ময়কর জিনিস হিসেবে পেয়েছি।৩৫

আবু বুরদাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন: একবার আমি মদীনায় গিয়ে আবদুল্লাহ ইবন সালামের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন: তুমি কি আমার বাড়ীতে যাবে না? চল, তোমাকে ছাতু ও খোরমা খাওয়াবো। আমি গেলাম। তিনি আমাকে বললেন: দেখ, তোমরা এমন এক অঞ্চলে বাস কর যেখানে সুদ প্রচলিত। তোমার যদি কোন ব্যক্তির কাছে কিচু পাওনা থাকে, আর সে তোমাকে পশুর খাদ্র কিচু ভূষিও উপহার দেয়, তুমি তা নিবে না। কারণ তা সুদ হয়ে যাবে।৩৬ অন্য একটি বর্ণনায় ঘটনাটি একটু ভিন্নভাবে এসেছে।৩৭

আবুদল্লাহ ইবন সালামের (রা) শানে পবত্রি কুরআনের সূরা আল-আহক্বাফ ও সূরা আর-রাদ-এর যথাক্রমে ১০ নং ও ৪৩ নং আয়াত দুইটি ছাড়াও আরো দুইটি আয়তা নাযিল হয়েছে বলে কোন কোন মুফাসসির মত প্রকাশ করেছেন। ইবন ইসহাক ইবন আববাসের (রা) সূত্রে বণৃনা করেছেন। সূরা আলে ইমরানের ১১৩ ও ১১৪ নং আয়াত দুইটি আবদুল্লাহ ইবন সালাম ও সা’লাবা ইবন সা’ইয়ার প্রশংসায় নাযিল হয়েছে।৩৮ আল্লাহ তাঁদের প্রশংসায় বলেন:

তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সিজদা করে। তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়, অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হলো সৎকর্মশীল।

এভাবে স্বয়ং আল্লাহ পাক আবুদল্লাহ ইবন সালামের (রা) মর্যাদার সনদ দান করেছেন। তিনি কত মহান ব্যক্তি ছিলেন তা আল্লাহ তা’য়ালার এ ঘোষনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ