আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সাহল ইবন হুনাইফ (রা)

নাম সাহল, ডাকনাম আবু সা’দ আবু ‘আবদিল্লাহ, আবুল ওয়ালীদ ও আবু সাবেত। পিতা হুনাইফ ইবন ওয়াহিব এবং মাতা হিন্দা বিন্তু রাফে’। মদীনার আউস গোত্রের সন্তান। ক্ষিখ্যাত আনসারী বচদরী সাহাবী।১ তাঁর ভাই আব্বাদ ইবন হুনাইফ ছির মদীনার অন্যতম মুনাফিক। মসজিদে দিরার’ যারা নির্মাণ করেছিল, সে তাদের একজন।২

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আসার আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর ও তিনি রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে ঘুরে ঘুরে মদীনার বিভিন্ন স্থানের বিগ্রহগুলি ভেঙ্গে ফেলতেন। কাঠের বিগ্রহগুলি ভেঙ্গে তাঁরা সেই কাঠ দরিদ্র মসুলমানদের গৃহে জ্বালানীর জন্য পৌঁছে দিতেন। হযরত আলী (রা) মদীনায় হিজরাতের পর কুবায় কুলছুম ইবন হাদামের গৃহে কিছুদিন অব্সথান করেন। তার পাশেই ছিল এক মহিলার বাড়ী। প্রতিদিন গভীর রাতে সেই বাড়ীর দরজা খোলার শব্দ তিনি শুনতে পেতেন। তারপর একজন লোকের ভিতে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার সাড়া পেতেন। একদিন তিনি বিষয়টি জানার জন্য মিহলাকে বিজ্ঞেস করলেন। মহিলাটি বললেন: আমি একজন বিধবা মুসলিম নারী। প্রতিদিন রাতে যিনি এখানে আসেন, তিনি সাহল ইবন হুনাইফ। তিনি রাতে গুরে ঘুরে মূর্তি ভাঙ্গেন এবং তার কাঠগুলি আমার জ্বালানীর জন্য দিয়ে যান।৩

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনায় আসর পর আলীর (সা) সাথে তাঁর দ্বীনী ভ্রীতৃ-সম্পর্ক স্থাপন করে দেন।৪

বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূসুল্লাহর (সা) সাথে সংশগ্রহণ করেন।৫ উহুদ যুদ্ধের বিপর্যয়ের সময় যে ১৫ জন সাহাবী জীবন বাজি রেখে রাসূসুল্লাহর (সা) সাথে ময়দানে অটল াকেন তিনি তাঁদের অন্যতম।৬ সেদিন তিনি রাসূসুল্লাহর (সা) নিকট মরণের শপ করেছিলেন। রাসূলকে (সা) সংঙ্গের লোকদের তখন বলেছিরেন, তোমরা তাকে তীর দাও, এ হচ্ছে সাহল।’ হযরত উমার (রা) পরবর্তী কালে কোন সংকট হুমূর্তে সাহল উপস্থিত াকলে তাঁকে সৌভাগ্যের প্রতীক ধরে নিয়ে বলতেন, সাহল আছে, কোন ভাবনা নেই।৭ উহুদ যুদেÍ পর হযরত আলী (রা) ফাতিমার নিকট এসে তরবারি এগিয়ে দিলে বললেন: এই লও তরবারি যা মোটেই নিন্দিত নয়।’ একা শুনে রাসূল (সা) বললেন: ‘তুমি ভালো যুদ্ধ করেছো। তবে সাহল ও আবু দুজানা-উভয়ে ভালো যুদ্ধ করেছে।’৮

হযরত আলী (রা) খলীফা নির্বাচিত হলে তিনি তিনি তাঁর পক্ষে ছিলেন। আলী (রা) যখন ইরাকে যান তখন ত৭াকে মদীনার আমীর নিয়োগ করেন।৯ এক সময় খলীফা তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি মদীনা ছেড়ে কূফায় চলে যান।১০ উটের যুদ্ধের পর হযরত আলী (রা) তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন।১১ সিফ্ফীন যুদ্ধের তিনি আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন।১২ যুদ্ধ শেষে তিনি কূফায় চলে যান। এসময় তাঁকে ‘ফারেস’-এর আমীর নিয়োগ করা হয়।১৩ কিন্তু ততাকার অধিবাসীরা বিদ্রোহী হয়ে তাঁকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেয়। হযরত আলী (রা) তাঁর স্থলে যিয়াদ ইবন আবীহকে তথাকার আমীর নিয়োগ করেন।১৪

মদীনা থেকে ইহুদী গোত্র বনু নাদীর বিতাড়িত হওয়ার পর তাদের তেকে আটককৃত ধন-সম্পদ রাসূল (সা) মুহাজিরদের মধ্রে বন্টন করে দেন। আনসারদের মধ্যে সাহল ইবন হুনাইফ ও আবু দুজানা সিমাক ইবন খারাশা নিজেদের চরম দারিদ্রের কথা প্রকাশ করলে রাসূল (সা) তাদেরকেও কিছু দেন।১৫ আল্লামা সুহাইলীর মতে মোট তিনজন আনসারকে বনু নাদীরের সম্পদ থেকে অংশ দেওয়া হয়েছিল।১৬

ওয়াকিদী ও আল-মাদায়িনী বলেন, সাহল ইবন হুনাইফ হিজরী ৩৮ সনে কূফায় ইনতিকাল কেরন। হযরত আলী (রা) তাঁর জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। আবদুল্লাহ ইবন মা’কাল বলেন: আমি আলীর সাথে সাহল ইবন হুনাইফের জানাযার নামায পড়েছি। এ নামাযে তিনি ছয় তাকবীর বলরেন। কেউ একজন এর প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, হুনাইফ ছিরেন বদরী সাহাবী। আমি ছয় তাকবীরের দ্বারা অন্যদের ওপর বদরীদের ফজীলাতের কথা তোমাদের জানাতে চেয়েছি।১৭

মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে রেখে যান। তাঁরা হলেন: আবু কউমামা আস’য়াদ ও আবদুল্লাহ। প্রথমজন রাসূলুল্লাহর জীবদ্দশায় জন্ম গ্রহণ করেন।১৮

হযরত রাসূল কারীমের (সা) মদীনায় আসার নয় মাসের মাথায় তাঁর একজন অতি প্রয় আনসারী সাহাবী আস’য়াদ ইবন যুরারা ইনতিকাল করেন। তিনি ছিলেন বাই’য়াতে আকাবার সময় মনোনীত ১২ নাকীবের নাকীবুল নুকাবা বা প্রধান নাকীব। তাঁর মৃত্যুর পর রাসূল (সা) তাঁর একটি মেয়েকে নিজ দায়িত্বে লালন-পালন করেন এবং তাঁকে এই সাহল ইবন হুনাইফের সাথে বিয়ে দেন। তাঁরই পেটে জন্মগ্রহণ করেন আবু উমামা ইবন সাহল।১৯

তিনি ছিলেন খুবই সুদর্শন ব্যক্তি। চেহারায় একটা পবিত্রতার ছাপ বিরাজমান ছিল। দৈহিক গঠন ছির অতি সুন্দর। একাবর এক যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে একই বাহনের পিঠে আরোহী ছিলেন। সেখানে ছিল একটি ঝর্ণা। সেই ঝর্ণায় তিনি গোসল এ কেমন অপরূপ দেহ তার? আমি তো এমনটি আর কখনো দেখিনি।’ এতে হযরত সাহলের কুনজর লাগে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শরীরে ভীসণ জ্বর এসে যায়। রাসূল (সা) এর কারণ জানতে চাইলেন। লোকরা ঘটনাটি বর্ণনা করলো। তিনি তাদের কথা শুনে বললেন, মানুষ তার। ভাইয়ের শরীর অথবা ধন-সম্পদ দেখে এবং তার জন্য দু’আ করে না। এ জন্য নজর লেগে যায়। নজর সত্য।২০

আল্লামা যিরিকলী সাহীবহাইনে তাঁর থেকে বর্ণিত চল্লিশটি হাদীস সংকরিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।২১ তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) ও যায়িদ ইবন সাবিত থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। বহু তাবে’ঙ্গ তাঁর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:

আবু ওয়ায়িল, উবাইদ ইবন সাববাক, ‘আবদুল রহমান ইবন আবী লায়লা, ‘উবাইদুল্লাহ ইবন, ‘আবদিল্লাহ ইবন, ‘উতবা, সীরীন ইবন ‘আমার, রাবাব প্রমুখ।২২

তিনি সব সময় সকল প্রকার মতভেদ থেকে দূরে থাকতেন। সিফফীন থেকে ফিরে আসার পর ছাত্র আবু ওয়ায়িল বললেন: আমাদের কাছে কিছু ঘটনা বর্ণনা করুন। বললেন: কী বর্ণনা করবো? কঠিন সমস্যা। একটি ছিদ্র বন্ধ করলে আরেকটি খুলে যায়।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও উদ্যমী। কিন্তু মানুষ তাঁর সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা পোষণ করতো। এ সম্পর্কে তিনি বললেতন, এ তাঁদের মতের দোষ। আমি কাপুরুষ নই। যে কাজের জন্যই আমি তলোয়ার উঠিয়েছি, তা চিরকালের জন্য সহজ করে দিয়েছি। হুদাইবিয়ার দিন লড়াই করা যদি রাসূলুল্লাহর (সা) ইচ্ছার বিরোধি না হতো, আমি সে দিনও লড়তে প্রসউত ছিলাম।২৩

তথ্যসূত্র:

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ