আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নু‘মান ইবন বাশীর (রা)

সীরাতের গ্রন্থাবলীতে হযরত নু‘মানের (রা) দুইটি কুনিয়াত বা ডাকনাম পাওয়া যায়: আবূ ‘আবদিলÍাহ ও আবূ মুহাম্মদ। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের সন্তান। তিনি একজন আমীর, খতীব, শা‘রিয়, আলিম ও অন্যতম আনসারী সাহাবী।১ তাঁর পিতা বাশীর ইবন সা‘দও একজন বড় মাপের সাহাবী।২ তিনি বদর যুদ্ধের যোগদান করেছিলেন।৩

বাশরি ইবন সা‘দ (রা) শেষ ‘আকাবায় সত্তর, মতান্তরে পঁচাত্তর জন আনসারের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই‘য়াত করেন। বদর, উহুদসহ সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালেরর পর মদীনার সাকীফা বনী সা‘য়েদাহতে খলীফা নির্বাচনের যে সমাবেশ হয় তাতে সর্ব প্রথম এই বাশরি ইবন সা‘দ আবূ বকরের (রা) হাতে বাই‘য়াতে করেন।৪ হিজরী ১২ সনে সেনাপতি খালিদ ইবন ওয়ালীদের (রা) নেতৃত্বাধীনে তিনি ভণ্ডুনবী মসায়রামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে আয়নুত তামা’-এর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।৫

নু‘মানের (রা) মায়ের নাম উমরাহ বিনত রাওয়াহা। তিনি বিখ্যাত কবি সাহাবী ও শহীদ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহান (রা) বোন।৬ তিনিও রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীয়্যাত বা সাহচর্য্যরে গৌরব অর্জন করেন।

এমনই এক পবিত্র ও মহান পবিবারে নুমানের (রা) জন্ম। ইবন সা‘দ বলেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাতের চৌদ্দ মাসের মাথায় রবিউল আখের মাসে জন্মগ্রহণ করেন। এটা মদীনাবাসীদের বর্ণনা। কুফাবাসীরা অবশ্য ভিন্নতম পোষণ করেন। তাঁরা নু‘মান থেকে এমন বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে তিনি-‘আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি’-বলেছেন। তারা বলেন, মদীনাবাসীরা তাঁর জন্ম সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তার থেকে িিতন বয়সে যে বড়, তার এ বর্ণনাসমূহ দ্বারা তা বুঝা যায়। বালাজউরী বলেন: হিজরী দ্বিতীয় সনে আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। আর এ সনেই জন্মগ্রহণ করেন আন-নু‘মান বাশীর। রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আসার পর আনসারদের ঘরে জন্ম গ্রহণকারী প্রথমি শশু নু‘মান। রাসূল (সা) ত৭ার তাহনীক করেন।৮ (খেজুর বা অন্য কিছু চিবিয়ে শিশুর মুখে দেওয়াে তাহনীক’ বলে) তাঁর জন্মের ছয় মাস পরে জন্মলাভ করেন আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা)। পরবর্তীকালে তাই তিনি বলতেন, আন-নু‘মান ইবন বাশীর আমার চেয়ে ছয় মাসের বড়।৯ ইমাম বুখারীর মতে, তাঁর জন্ম হিজরাতের বছরে।১০

ইমাম জাহাবী হযরত নু‘মানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: তিনি হিজরী দ্বিতীয় সনে জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে হাদীস শুনেছেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে তাঁকে শিশু সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করেছেন।’১১

ইসলামের ইতিহাসে হিজরী দ্বিতীয় সনের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ বছরের গুরুতেই মক্কার কুরাইশ ও তার আশে পাশের অন্যান্য গোত্রের সাথে মদীনার মুসলমানদের সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটতে থাকে। যার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে বদর যুদ্ধের মাধ্যমে। এ বছর যে সকল শিশু জন্মগ্রহণ করে তাদের ওপর এই বিল্পবী সময় ও ঘটনার একটা প্রকাব হয়তো পড়ে থাকবে। এ কারণে আন নু‘মান ও আবদুল্লাহ প্রত্যেকেই পরবর্তী জীবনে বড় বড় বিপ্লবে নেতৃত্ব দান করেছেন।

নু‘মানের পিতা-পমাতা তাঁকে খুব ভারোবাসতেন। পিতা তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে গিয়ে তাঁর জন্য দু’আ চাইতেন। মা তাঁকে এত বেশী ভালোবাসতেন যে, অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করে সকল ধন-সম্পদ তাঁর নামে লিখে দিতে চাইতেন। একবার তিনি এ ব্যাপারে স্বামীর রাজী করেন এবং সাক্ষী হিসেবে রাসূলুল্লাহকে (সা) মনোনীত করেন। বাশীর (রা) ছেলে নুমানকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলেন, আপনি সাক্ষী থাকুন আমি আমার অমুক অমুক ভূমি এই ছেলেকে দান করছি। রাসূল (সা) বললেন: তুমি কি তোমার অন্য সন্তানদের অংশও এভাবে দিয়েছো? বললেন: না, দিইনি। রাসূল (সা) বললেন: তাহলে আমি তো এমন অবিচারের সাক্ষী হতে পারিনে। একথা শোনার পর বাশীল তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।১২

হেঁটে বেড়ানোর বয়স হলে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যেতেন। একবার তায়েফ থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কিছু আঙ্গুর এলা। তিনি নুমানের হাতে দুইটি ছড়া দিয়ে বলণেল, একটি তোমার এবং একটি তোমার মায়ের। নুমান বাড়ী ফেরার পথে দুইটি ছড়াই খেয়ে ফেরেন। বাড়ী এসে আঙ্গুরের ব্যাপারে কাউকে কিছু বললেন না। কয়েক দিন পর রাসূল (সা) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: মাকে আঙ্গুর দিয়েছিলে? জবাব দিলেন: না। রাসূল (সা) কথন ত৭ার কানমলা দিয়ে বললেন: ওরে ঠকবাজ!১৩

সেই শৈশবকালেই নুমান নামায ও অন্যান্য ইবাদতের প্রতি মনেযোগী হন। রাসূলুল্লাহর (সা) বিভিন্ন আচরণ মনোযোগ সহকারে দেখতেন এবং স্বরণ রাখার চেষআটা করতেন। মসজিদে মিম্বরের কাছাকাছি বসে রাসূলুল্লাহর (সা) ওয়াজ-নসীহত ও বতৃতা-ভাষণ শুনতেন।১৪ একবার তিনি দাবী করে বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) রাত্রিকালীন নামায সম্পর্কে আমি অধিকাংশ সাহাবীদের থেকে বেশী জানি।১৫ শবে কদরে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে জেগে নামায পড়তেন।১৬

হিজরী ১১ সনের রাবী’উল আওয়াল মাসে রাসলে কারীম (সা) ইনতিকাল করেন। তখন নুমানরে বয়স মাত্র আট বছর সাত মাস। সুতরাং প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফার সময়ে নুমানের বিশেষ কোন কর্মতৎপরতা দেখা যায় না। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, উসমান (রা) বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী নায়িলা (রা) স্বামীর রক্তমাথা জামাসহ নুমানকে (রা) শামে পাঠান।১৭ এ ঘটনার পর থেকে তাঁকে তৎকালীন ইতিহাসের অন্যতম এক চরিত্র হিসেবে দেখা যায়।

আলীর (রা) খিলাফতকালে মুয়াবিয়ার (রা) সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। এই বিরোধে তিনি মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন। এটা অবাক হওয়ার মত ব্যাপার যে, গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে গুটিকয়েক লোক তখন মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষ নেন, তিনি তাঁরে একজন। বিভিন্ন গ্রন্থে একথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আমীর মুয়াবিয়া (রা) ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইবনুল আসীর বলেছেন: তাঁর ভালোবাসা ছিল মুয়াবিয়ার প্রতি। এ কারণে মুয়াবিয়া ও তাঁর ছেলে ইয়াযীদের প্রতি তাঁর টান ছিল।১৮ বিনিময়ে মুয়াবিয়া (রা) তাঁকে বড় বড় পদ দান করেন। আলীর (রা) পক্ষ থেকে আয়নুত তামার-এর শাসক ছিলেন মালিক ইবন কা’ব আল-আবহাবী। আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নির্দেশে নুমান (রা) তথাকার অস্ত্র গুদামে আক্রমণ চালান।১৯

নুমান সিফফীন যুদ্ধ মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষে যোগদান করেন।২০ ফুদালা ইবন উবাইদের পরে হিঃ ৫৩ সনে মুয়াবিয়া (রা) তাঁকে দিমাশকের কাজী নিযোগ করেন।২১ ইয়ামন মুয়াবিয়ার (রা) অধীনে এল উসমান ইবন আস সাফাফীর পরে তিনি নুমানকে (রা) তথাকার ওয়ালী নিয়োগ করেন। এ হিসাবে উমাইয়্যা রাজ বংশের পক্ষ থেকে তিনি ছিলেন ইয়ামনের তৃতীয় ওয়ালী।২২

হিজরী ৫৯ সনে মুয়াবিয়া (রা) ত৭াকে কূফায় ওয়ালী নিয়োগ করেন। প্রায় সাত মাস এই পদে অধিষ্টিত ছিরেন। মুয়াবিয়া (রা) ইনতিকালেরর পর তাঁর পুত্র ইয়াযীদ খলীফার পদে আসীন হন। তিনি ইমাম হুসাইন (রা), আবুদল্লাহ ইবন উমার (রা) ও আবদুল্লাহ ইবন মুবাইরকে (রা) তাঁর আনুগত্যের জন্য চাপ দিলেন। ইমাম হুসাইন (রা) ইয়াযীদের আনুগত্য মেনে নিতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃত জানালেন। একদিকে কূফা থেকে আলীর (রা) অনুসারীদের চিঠি ইমাম হুসাইনের (রা) নিকট পৌঁছতে লাগলো। এ সকল চিঠিতে তারা ইমাম হুসাইনকে (রা) খলীফা হিসেবে মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছিল। এ কারণে। ইমাম হুসাইন (রা) অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য মুসলিম ইবন আকীলকে কূফায় পাটালেন। মুসলিম ক’ফায় পৌছলে শহরের অধিকাংশ অধিবাসী ইমামের প্রতি আস্থার ঘোষণা দিল। প্রায় বারো হাজার মানুষ মুসলিমের হাতে বাই‘য়াতে গ্রহণ করেন। নুমান (রা) তখন কূফায় ওয়াল্ ীসব খবরই তিনি পাচ্ছিলেন; কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবর্তে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন।

কিন্তু যখন মুখতার ইবন উবাইদের গৃহে আলীর (রা) অনুসারীদের বৈঠক হলো এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, ইয়াযীদের প্রতি কৃত বা ইয়াত (আনুগত্যের শপথ) ভঙ্গ করা হবে। তখন নুমান (রা) কূফায় মসজিদের মিন্বরে দাঁড়িয়ে একটি ভাষণ দান করেণ। ভাষণটির সারকথা নিুরূপ:

‘ওহে জনমগুলী! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। অশান্তি ও মতভেদ সৃষ্টির ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। কারণ, তাতে প্রাণহানি ঘটে, রক্তপাত হয় এবঙ সম্পদ লুটপাট হয়।। কেউ আগ বাড়িয়ে আমার সাথে সংঘাতে লিপ্ত না হলে আমি তার সাথে সংঘাতে বড়াবো না। কোন খারাপ কথা বরবো না, গালিগালাজ করবো না। কারো চরিত্রে অবাদ দান অথবা খারাপ ধারণা পোষণের কারণে পাকড়াও করবো না। কিন্তু আপনারা যদি বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে আমার ও ইমামের বিরুদ্ধাচরণে নামেন, তাহলে সইে আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। যখক্ষণ তরবারি হাতল আমার হাতের মুঠোয় থাকবে, আমি আপনাদের মারতে থাকবো। এতে একটি লোকও যদি আমার পাশে না থাকে, বতুও আমি বিরত হবো না। তবে আমি আশা করি, আপনাদের মধ্যে বাতিলের অনুসারীদের অপেক্ষা সত্যক্ষে জানে এমন লোকের সংখ্যাই অধিক হবে।”

উক্ত সমাবেশে বনী উমাইয়্যার নিষ্ঠাবান সমর্থক ও বন্ধু আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম উপস্থিত ছিলেন। শত্র“র প্রতি সরকারের ওয়ালীর এমন দুর্বল অবস্থান দেখে তিনি মর্মাহত হন। ক্ষোভের সাথে তিনি নু‘মানকে বলেন: ‘এ ব্যাপারে আপনার অবস্থান অতি দুর্বল। এখন কোমল হওয়ার সময় নয়; শক্রুর বিরুদ্ধে এখন আপনার কঠোর হওয়া উচিত।’ জবাবে নু‘মান বললেন:

‘আমি আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণে শক্ত হওয়ার চেয়ে তাঁর অনুগত্যে দুর্বল থাকা বেশী পছন্দ করি। আর আল্লাহ যে পর্দাটি টেনে দিয়েছেন তা ছিন্ন করা সমীচীন মনে করিনা।’ আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম সমাবেশ থেকে ফিরে ইয়াযীদকে লিখলেন: ‘মুসলিম ইবন আকীল কূফায় ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। যদি আপনার ্খানকার শাসন কর্তৃত্বের প্রয়োজন থাকে তাহলে আপনার আদেশ-নিষেধ কার্যকর করতে সক্ষম হবেন। নু‘মান একজন ভীরু লোক, অথবা তিনি ইচ্ছা কইে ভীরু ও দুর্বল সেজেছেন।’ ঠিক একই সময় একই রকম চিঠি ইয়াযীদকে লেখেন আমআতরা ইবন উকবা ও উমার ইবন সা’দ ইবন আবী ওয়াককাস। এ সকল চিঠি পাওয়ার পর ইয়াযীদ কূফায় ওয়ালীর পদ থেকে নু‘মান ইবন বাশীরকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদকে নিয়োগ করেন। আর নু‘মান চলে যান শামে।২৩ এটা হিজরী ৬০ (ষাট) সনের ঘটনা।২৪

অতঃপর ইয়াযীদ তাঁকে হিমস-এর ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং ইয়াযীদের মৃত্যু পর্যন্ত এ পদে বহাল থাকেন। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, মু‘য়াবিয়া (রা) তাঁকে কূফা থেকে সরিয়ে হিমস-এ নিয়োগ করেন।২৫

হিজরী ৬৪ সনে ইয়াযীদ ইবন মু‘য়াবিয়ার মৃত্যুর পর নু‘মান শামের অধিবাসীদেরকে আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) প্রতি আনুগত্যের আহবান জানান এবং তাঁর পক্ষ থেকে তিনি হিমস-এর ওয়ালী নিযুক্ত হন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে  তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু পরে নিজেই খিলাফতের দাবীদার হিসেবে মানুষের বাই’য়াত গ্রহণ করতে থাকেন। কিন্তু এ বর্ণনা সঠিক নয়। কারণ, যদি এমন ঘটনা আদৌ ঘটতো তাহলে আতিহাস ও সীরাতের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলীতে তা বর্ণিত হতো। কিন্তুু অধিকাংশ গ্রন্থ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব।

নু‘মানের (রা) মত আরো অনেকে শামে ইবন যুবাইয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এ অবস্থা দেখে মারওয়ান শামে যান এবং একটি বাহিনী প্রস্তুত করে দাহহাক ইবন কায়সের বিরুদ্ধে পাঠান। দাহহাক ছিলেন ইবন যুবাইয়ের পক্ষ থেকে শামের কয়েকটি অঞ্চলের শাসক। নু’মান এ সংবাদ পেয়ে শুরাহবীল ইবন জুল-কিলাবার নেতৃত্বে কিছু সৈন্য দাহহাকের সাহায্যে পাঠান। মারজে রাহিত’ নামক স্থানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং দাহহাক পরাজিত ও নিহত হন। এ সংবাদ পেয়ে নু’মান রাতের অন্ধকারে হিমস থেকে সরে পড়ার চেষ্টা করেন। মারওয়ান তাঁকে ধাওয়া করে ধরার জন্য খালিদ ইবন আদী আল-কিলা’ঈর নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠান।

হিম্স-এর অদূরে বীরীন নামক এক পল্লীতে তিনি খালিদের মুখোমুখি হন। খালিদ তাঁকে হত্যা করে মাথাটি কেটে এবং পরিবার পরিজনকে বন্দী করে মারওয়ানের সামেন হাজির করে। নু‘মানের স্ত্রী তাঁর স্বামীর এমন নির্মম পরিণতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি স্বামীর ছিন্ন মস্তকটি তাঁর কোলে দেওয়ার জন্য মারওয়ানের নিকট আবেদন জানিয়ে বলেন: এ মস্তকের হকদার আমি। আমাকেই দেওয়া হোক।

মারওয়ানের নির্দেশে লোকেরা নুমানের (রা) মাথাটি তাঁর স্ত্রীর কোলে চুড়ে মারে। এটা হিজরী-৬৫ সনের প্রথম দিকের, মতান্তরে ৬৪ সনের শেষ দিকের ঘটনা। তখন নুমানের (রা) বয়স ছিল ৬৪ বছর।২৬ ইবন হাযাম বলেন: মারওয়ান নু’মানকে হত্যার মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতায় আরোহনকে উদ্বোধন করেন।

‘আব্বাসী আমলের প্রখ্যাত কবি আবুল আলা আল-মা’য়াররীর জন্মস্থান ‘মায়’য়াররাতুন নু’মান। স্থানটির পূর্ব নাম ছিল শুধু ‘মা’য়াররা’। নু’মান একবার সেখানে ভ্রমণে যান। তখন ত৭ার একটি ছেলে মারা যান এবং তাকে সেখানে দাফন করা হয়। সেখান থেকে স্থানটি আন-নু’মানের প্রতি আরেপ করে মা’য়ারাতুন নু’মান হিসাবে প্রসিদ্ধি পায়।২৭

নু’মানের (রা) স্ত্রী ছিলেন আরবের ‘কাল্ব’ গোত্রের মেয়ে। তাঁর সম্পর্কে একডিট আজব কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তিনি এক সময় মু’য়াবিয়ার (রা) অন্দর মহলে ছিলেন।। মু’য়াবিয়া একদিন ইয়াযীদের মা মাবসূনকে বললেন, তুমি যেয়ে একবার এই মহিলাকে দেখে এসো তো। মাবসূন তাঁকে দেখে এসে বললেন, রূপ ও সৌন্দর্য্যে এ মহিলা অন্যান্য। কিন্তু তাঁর নাভরি নীটে একটি তিল আছে। এ কারণে সে তর স্বামীর ছিন্ন মস্তক নিজের কোলে ধারণ করবে।

এই মহিলাকে প্রথমে হাবীব ইবন মাসলামা বিয়ে করেন। তাঁর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি নিহত হলে স্ত্রী হিসাবে তাঁর কর্তিত মাথা কোলে ধারণ করেন। এভাবে মাবসূনের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়।২৮

নু’মান (রা) সন্তানদের মধ্যে তিনটি ছেলে মুহাম্মাদ, বাশীর ও ইয়াযীদ খ্যাতিমান হন। বহুদিন যাবত মদীনা ও বাগদাদে তাঁর বংশধারা বিদ্যমান ছিল।২৯

হাদীস ও ফিকাহ্-তে নু’মানের (রা) গভীর জ্ঞান ছিল। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন ও অন্যান্য বাস্ততার দরুন যদিও তিনি জ্ঞান বিতরণের মহান দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, তবে তিনি যেখানেই শাসকের দায়িত্ব নিয়ে গেছেন, সেই স্থানটি ফিকাহ ও হাদীস চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর সামনে অসংখ্য মামলা আসেতো, তিনি স্বীয় জ্ঞান ও মেধা দ্বারা তা ফয়সালা করতেন।

রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের সময় যদিও তিনি আট বছরের বালক মাত্র, তবুও অনেক হাদীস তাঁর স্মৃতিতে সংরক্সিত ছিল। পরবর্তীকালে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (লা) ও উমারের (লা) সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। তাঁদের নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন। তাছাড়া তাঁর মামা আবদুলÍাহ ইবন রাওয়াহার (রা) নিকট থেকেও বহু হাদীস শুনেছেন।৩০

হাদীস গ্রহণ ও বর্ণনার ব্যাপারে তিনি ছিরেন দারুণ সর্তক ও রক্ষণশীল। তা সত্ত্বেও তাঁর সনদে মোট ১২৪ (একশত চব্বিশ) টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তারমধ্যে পাঁচটি হাদীস বুখারী ও মুসিলিম মুত্তাফাক আলাইহি এবং বুখারী অন্য একটি ও মুসলিম অন্য চারটি হাদীস এককভাবে বর্ণনা করেছেন।৩১ তনি বিচার-পায়সালার সময় হাদীসের উদ্ভৃতি দিতেন। একবার একটি মামলার বিচারের সময় বললেন, আমি এ মামলার ফায়সালা এমনভাবে করবো যেমন ফায়সালা করেছিলেন রাসূল (সা) এক ব্যক্তির মামলার।৩২

তিনি শরী’য়াতের বিধি-বিধান সম্পর্কিত মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতেন। াধিকাংশ সময় এ জাবাব দিতেন খুবতা বা বক্ততা-ভাষণের মধ্যে। তাঁর খুবতা বা ভাষণ হতো দুই প্রকার: ধর্মীয় ও রাজনৈতিক। তিনি ছিরেন একজন অসাধারণ বাগ্মী ব্যক্তি। তাঁর ভাষণ হতো অতি বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায়। বাচন ও প্রকাশ ভঙ্গিতে তাঁর যে নৈপুণ্য ছিল তার স্বীকৃতি দিয়েছেন সিমাক ইবন হারব এভাবে: ‘আমি যে সকল মানুষের ভাষণ শুনেছি, তাঁদের মধ্যে নু’মান ইবন বাশীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী বলে মনে হয়েছে।’৩৩

খুতবার মধ্যে স্তান-কাল অনুযায়ী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্জালন করতেন। যেমন, একবার তিনি খুবতার মধ্যে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনেছি। ‘শুনেছি’ বলার সাথে সাথে আঙ্গুল দিয়ে দুই কানের দিকে ইঙ্গিত করলেন।৩৪ একবার ভাষণে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) অবস্থা বর্ণনা করেন এবাবে: ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য নিুমানের খোরমাও রাসূলুল্লাহ (সা) জুটতো না। আর এখন নানা জাতের উৎকৃষ্ট কোরমা ও মাখন ছাড়া তোমাদের রুচি হয় না।’৩৫

একবার তিনি মিম্বারে দাাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। ভাষণে জামা’য়াতবদ্ধ জীববকে আল্লাহর রহমত এবয় বিচ্ছিন্নতাকে আল্লাহর আযাব ও অভিশাপ হিসেবে চিত্রিত করলেন। সমাবেশে প্রখ্যাত ইমাম আল-বাহিলীও উপস্থিত ছিলেন। ভাষণ শেষে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বললেন: ‘তোমাদের ওপর আস্-সাওয়াদ আল-আ’জাম’-এর অনুসরণ ফরজ।৩৬

বক্ততা-ভাষণের সময় তাঁর মুখ থেকে যাঁরা হাদীস শুনেছেন তাঁদের সংখ্যা অগণিত। ত৭ার বিশিষ্ট ছাত্রদের কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: শা’বী, হুমাইদ ইবন ‘আবদির রহমান, খায়সামা ইবন আবদির রহমান, সালেম ইবন আবিল জু’দ, আবু ইসহাক সুবাঈ’, আবদুর মালিক ইবন উমাইর ইয়াসী’ আল-কন্দিী, হাবীব ইবন সালেম (নু’মানের সেক্রেটারী), আবদুল্লাহর ইবন আবদিল্লাহ ইবন উতবা, উরওয়া ইবন যুবাইর, আবু কিলাবা আল-জুরমী, আবু সালামা আল-আসওয়াদ, গায়রায আবী সুফরাহ, আযহার ইবন আবদিল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবন ুন’মান আবু সাল্লাম মামত’র প্রমুখ।৩৭

নু’মান (রা) ছিলেন একজন সাহিত্য ও কাব্যরসিক মানুষ। গদ্য সাহিত্যে যেমনতাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায়, তেমনিভাবে কাব্য সাহিত্যেও তাঁর পদচারণা দেখা যায়। তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। সীরাতের গ্রন্থসমূহে কিচু কবিতা তাঁর নামে সংকলিত হয়েছে। আল-কুরতুবী আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থে তাঁর কিছু কবিতা তাঁর নামে সংকলিত হয়েছ। আল-কুরতুবী আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থে তাঁর কিচু শ্লোক সংকলন করেছেন। তাঁর কবিতার এটি দিওয়াও আছে।৩৮

নু’মান (রা) বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদ, হৈ-হাঙ্গামা, নানা ধরনের ওলট-পালট ও বিপ্লবের সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও যুলুম-অত্যাচার একেবারেই পসন্দ করতেন না। তিনি অত্যন্ত দয়ালু এবং কোমর মনের মানুষ ছিরেন। ঝগগড়া-বিবাদে কঠোরতা ও শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে মমতা ও ভালোসাবা দ্বারা মানুষের মন জয় করতেন। ঐতিহাসিক তাবারী বলেছেন: তিনি ছিরেন একজন বিচক্ষণ ধৈর্যশীর এবং আবেদ ব্যক্তি। যিনি মানুষকে ক্ষমা করতে ভালোবাসতেন।’

মুসলিম ইবন আকীলের ঘটনা এবং এ সম্পর্কে নু’মানের (রা) ভাষণ, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে তাঁর সহনশীল ও উদার নীতির রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একবার তিনি কায়স ইবন্ াল-হায়সামকে একটি চিঠিতে লেখেন: ‘তুমি একজন দারুণ হতভাগ্য ব্যক্তি। আমরা রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখেছি এবং ত৭ার হাদীস (বাণী) শুনেছি। আর তোমরা না তাঁকে দেখেছো, না তাঁর মুখ থেকে হাদীস মুনেছো। তিনি বলেছেন: কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ধারাবাহিক ফেতনা-ফাসাদ দেখঅ দেবে। তখন মানুষ সকারে মুসলমান হলে সন্ধ্যা হতে না হতে আবার াকফির হয়ে যাবে। মানুষ সামান্য পার্থিক সুযোগ-সুবিধার লোভে নিজের দ্বীন বিক্রি করবে।৩৯ তবে তঁর এ কোমল ও নম্র স্বভাব ভীরুতা ও কাপুরুষতার কারণে ছিল না। তিনি যেমন ধৈর্য ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে ছিলেন অনন্য, তেমনি ছিলেন বীরত্ব ও সাহকিতায় অতুলনীয়।

তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের দামশীল ব্যক্তি। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আপ্রাণ চেষ্টো করতেন। তিনি যখন হিমস-এর ওয়ালী তখন একবার কবি আল-আ’শ আল-হামাদানী তাঁর নিকট এসে বললেন, আমি ইয়াযীদের নিকট সাহায্যের আবেদন করেছি, কন্তিু তিনি কোন সাড়া দিলেন না। এখন এসেছি আপনার কাছে। আত্মীয়তার হক কিচু আদায় করুন। আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করুন। নু’মানের (রা) হাতে তখন কোন অর্থ ছিল ন। তিনি শপথ করে বললেন, আমার কাছে কিচুই নেই। তারপর কিচু চিন্তা অর্থ ছিল না। তিনি শপথ করে বললেন, আমার কাছে কিছুই নেই। তারপর কিছু চিন্তা করে বললেন: ‘হুঁ!’ এরপর মসজিদের মিন্বরে দাঁড়িয়ে সমবেত প্রায় বিশ হাজার লোকের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। যার সারকথা নিুরূপ:৪০

ওহে জনমগুলী! আল-আ’শ আল-হামাদীনী আপনাদের এক চাচার ছেলে। অভিজাত বংশের একজন মুসলিম। তার কিছু অর্থের প্রয়োজন। আর এ উদ্দেশ্রেই সে আপনাদের নিকট এসেছে। এখন আপনাদের ইচ্ছা কি? জনতা সমস্বরে বলে উঠলো: আপনি যা বলবেন আমরা তা শুনবো। তিনি বললেন: আমার কোন নির্দেশ নেই। জনতা বললো: তাহলে আমরা এখানে উপস্থিত প্রত্যেকে এক দীনার করে দান করবো। তিনি বলনেনঃ না। দুইজনে এক দীনার করে দিন। সকলে সম্মত হলে তিনি বললেন: আমি বাইতুলমাল থেকে তাঁকে এ অর্থ দিয়ে দিচ্ছি। যখন বেতন/ভাতার অর্থ আসবে তখন সকলের কাছ থেকে উসূল করা হবে। নু’মান (রা) এভাবে ঋণগ্রন্থ আল-আ’শাকে দশ হাজার দীনার দানের ব্যবস্থা করেন। এটা আল-ইসতীয়াব গ্রন্থকারের বর্ণনা। উসুদুল গাবা গ্রন্থকার ইবনুল আসীর বলেন, চল্লিশ হাজার। কবি আল-আ’শা আল-হামাদানী এ জন্য নু’মানের (রা) প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ ছিলেন। নু’মানের (রা) প্রশংসায় তিনি একটি কবতিাও রচনা করেছেন। কবিতাটির কয়েকটি শ্লোকের অর্থ নিুরূপ:৪১

১.প্রয়োজনের সময় দানশীল নু’মান ইবন বাশীরের মত আর কাউকে পাইনি।

২.তিনি যখন কোন কথা বলেন তখন সে কথা পূর্ণ করেন। তিনি সেই ব্যক্তির মত নন যে জনগণের প্রতি ধোঁকাবাজির রশি ঝুলিয়ে দেয়।

৩.যদি তিনি একজন আনসারী না হতেন তাহলে আমি সেই ব্যক্তির মত হতাম, যে কোথাও যেয়ে কিছু না পেয়েই ফিরে আসে।

৪.আমি যখন নু’মানের অকৃতজ্ঞ হবো তখন আমার ম্যধ থেকে কৃতজ্ঞতার স্ববাব বিলীপন হয়ে যাবে। আর অকৃতজ্ঞ মানুষের মধ্যে ভালো কিছু থাকে না।

শৈশবে নু’মান (রা) যেহেতু রাসূলে কারীমের (সা) াতি সান্নিধ্রে থাকার সুযোগ পেয়েছিরেন, এ কারণ তাঁর খুঁটিনাটি অনেক আচার-আচরণের বর্ণনা দিতে সক্ষম হয়েছন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে তাঁর এ ধরনের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) রাতের ইবাদাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দুইকানি পা ফুলে যেত।৪২ তেমনিভাবে তিনি বণৃনা করেছেন, রাসূল (সা) কিভাবে নামাযরে কাতার সোজা করতেন এবং কাতার সোজা করার প্রতি কতখানি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেন: একদিন রাসূল (সা) দেখেন এক ব্যক্তি বুক কাতারের বাইরে চলে গেছে। তখন তিনি বলেন: ওহে আল্লাহর বান্দারা! হয় তোমরা তোমাদের কাতার সোজা করবে, না হয় আল্লাহ তোমারে মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন।৪৩

‘উম্মুল মুমিনীন আ’য়িশা (রা) ছিলেন আবু বকর সিদ্দীকের (রা) কন্যা। নু’মান (রা) বলেন: একদিন আবু বকর গেলেন মেয়ে-জামাই-এর সাথে দেখা করতে। ভিতরে ঢোকার অনুমতি চেয়ে শুনতে পেলেন রাসূলুল্লাহর (সা) কথার উপরে মেয়ে আ’য়িশার চড়া গলার কথা। তিনি ঢুকেই রাসূলুল্লাহর (সা) কথার উপরে কথা বলছো-এই বলে মেয়েকে থাপপড় মারতে উদ্যত হলেন। রাসূল (সা) দ্রুত মাঝখানে দাঁড়িয়ে আ’য়িশাকে মার থেকে বাঁচালেন। আবু বকর রাগান্বিত অবস্থায় মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তখন রাসূল (সা) আ’য়িশাকে বললেন: দেখলে তো, তোমাকে আমিমার থেকে বাঁচালাম? কিচুদিন পর আবু বকর আবার মেয়ে-জামাইর বাড়ী গেলেন। দেখলেন, তাঁদের স্মপর্কে স্বাভাবিক। তখন তিনি বললেন: তোমাদের শান্তির সময় তোমরা আমাকে প্রবেশের অনুমতি দাও, আবার যুদ্ধের সময়ও ানুমতিদিয়ে থাক। তখন রাসূল (সা) বলেন: আমরা এই করেছি, আমরা এই করেছি।৪৪

একদিন তিনি মিন্বরে দাঁড়িয়ে বলেন: রাসূলুল্লাহর (সা) এই মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন: যে ব্যক্তি অল্পে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা, সে বেশীরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞাত প্রকাশ করেনা সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। আল্লাহর অনুগহের কথা স্বীকার করাই হচ্ছে তা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, আর স্বীকার না করা হচ্ছে াকৃতজ্ঞতা।

এভাবে আল্লাহর রাসূলের (সা) জীবনের নানা দিক তাঁর বিভিন্ন বণৃনায় ফুটে উঠেছে।

নু’মান (রা) ইতিহাসের এক বিভ্রান্তির অধ্যায়ে মু’য়াবিয়া (রা) ও তাঁর পুত্র ইয়াযীদের পক্ষ অবলম্বন করলেও কোথাও কারো প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করেছেন, এমন কোন তথ্য পাওয়া যয় না। সেত্যর ওপর যে তিনি অটল ছিলেন তার প্রামণ পাওয়া যায় আবদুল্লাহ বিন জুবাইরের (রা) প্রতি আগুগত্য প্রকাশ করে জিীভন দানের মধ্যে। কূফার মসনদ ত্যাগ করেছেন বতুও ইমাম হুসাইনের প্রতিনিধি মুসলিম ইবন আকীলের সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াতে রাজী হননি। রাসূলে কারীমের (সা) সাহচর্যের কল্যাণে এমন উন্নত নৈতিকতার অধিকারী হতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ