আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আবুল ইয়াসার কা’ব ইবন ‘আমর (রা)

মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনু সালেমা শাখার সন্তান আবুল ইয়াসার কা’ব (রা) ইতিহাস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে ত৭াকে শুধু আবুল ইয়াসার অথবা কা’ব অথবা উভয় নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা ‘আমর ইবন আব্বাস এবং মাতা নুসাইবা বিনত আযহার আল-মুররী। তিনিও বনু সালেমা গোত্রের কন্যা।১ ইমাম জাহাবী তাঁর পিতার নাম ‘উমার এবং আবুল ইয়সারকে আনসারদের অন্যতম স্তম্ভ বলে উল্লেখ করেছেন।২

আল-‘আকাবার দ্বিতীয় বাই’য়াতে (শপথ) তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ইসলামের ঘোষণা দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতে (আনুগত্যের শপথ) করেন। অনেকে তখন তাঁর বয়স বিশ বছর বলে উল্লেখ করেছেন।৩

ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরসহ পরবর্তীকালের সকল যুদ্ধে রাসূলে কারীমের (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেছেন।৪ বদর যুদ্ধে তিনি দারুণ সাহস ও বাহাদুরী দেখান। মক্কার পৌত্তলিক বহিনীর ঝাণ্ডা ছিল প্রখ্রাত মুহাজির সাহাবী মুসয়াব ইবন উমাইরের আপন ভাই আবু ‘আযীয ইবন উমাইরের হাতে। তিনি ঝটিকা বেগে অগ্রসর হয়ে তার হাত থেকে ঝাণ্ডা ছিনিয়ে নেন এবং তাকে বন্দী করেন।৫ এ যুদ্ধে তিনি মুনাববিহ ইবন হাজ্জাজ নামক এক পৌত্তলিক সৈনিককে হত্যা করেন।৬ তাছাড়া হযরত আব্বাসকে বন্দী করে রাসূলে কারীমের (সা) সামনে হাজির করেন। রাসূল (সা) আবুল ইয়াসারের ছোট-খাট দেহ এবং আব্বাসের বিশাল দেহের প্রতি তাকিয়ে অবাক হয়ে যান। তিনি আবুল ইয়াসারকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি আব্বাসকে কেমন করে বন্দী করলে? আবুল ইয়াসার বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁকে বন্দী করার ব্যাপারে আমাকে এমন এক ব্যক্তি সাহায্য করেছে যাকে এর আগে বা পরে আর কখনো আমি দেখিনি। লোকটি দেখতে  এমন। তাঁর কথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: তাকে বন্দী করার ব্যাপারে কোন মহান ফিরিশতা আমাকে সাহায্য করেছেন।৭ ইমাম আহমাদ আল-বরার সূত্রে বর্ণনা করেছেন: এ ব্যক্তি আমাকে বন্দী করেনি। আমাকে ব্দী করেছে অন্য এক ব্যক্তি, যে দেখতে এমন। তাঁর কথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: কোন ফিরিশতা তাকে সাহায্য করেছে।৮

ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন। বদরের কুরাইশ বন্দীদেরকে মদীনায় স্থানান্তরের জন্য রাসূল (সা) তাদেরকে সাহাবীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। মুস‘য়াব ইবন উমাইরের আপন ভাই আবূ আযীয ইবন উমাইর ছিরেন বন্দীদের একজন। তিনি পড়েন মুস‘য়াব ও আবুল ইয়সারের দায়িত্ব। আবুল ইয়াসারই তাকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বন্দী করেছিলেন। মদীনার দিকে চলার পথে মুস‘য়াব তাঁর ভাই আবু আযীযের দুই হাতশক্ত করে বাঁধার জন্য আবুল ইয়াসারকে বলেন। একথা শুনে আবূ াাযীয দুঃখের সাথে বলেন: ভাই, আমার ব্যাপারে তুমি এ কথাও বলতে পারলে? মুস‘য়াব বললেন: তুমি নও, এখন এই আবুল ইয়াসার আমার ভাই।৯ ইমাম বুখািরী তাঁর তারীখে আবুল ইয়সারের বদরে যোগদানের কথা বলেছেন। ইবন হিশাম তাঁকে বদরীদের মধ্যে গণনা করেছেন।১০ বালাজুরী বলেছেন, বদর যুদ্ধের সময় থ৭ার বয়স বত্রিশবছর ছিল।১১ কিন্তু পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ বছর বয়সে তিনি আকাবার দ্বিতীয় বাই‘য়াতে অংশ গ্রহণ করেন। তাহলে বদরের সময় বয়স বত্রিশ বছর হয় কি করে?

আবুল ইয়সার খায়বার যুদ্ধে যোদ দেন। তাঁর সাথে জড়িত খায়বারের একটি ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী শত্র“ বাহিনীর দুর্গ অবরোধ করে আছেন। এ সময় এক রাতে প্রতিপক্ষ জনৈক ইহুদীর এক পাল ছাপল বকরীর গোশত খাওয়াতে পারবে? আবুল ইয়সার সাথে সাথে বলে উঠলেন: আমি পারবো। একভা বলেই তিনি বকরীর পালের দিকে ছুটে গেলেন। বকরীগুরি তখন দুর্গের আভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল। তিনি পিছন দিকের দুইটি ধরে ফেললেন এবয় তাদেরকে দুই বগলে চেপে ধরে নিয়ে এলেন। সঙ্গীরা বকরী দুইটি জবেহ করে রান্না করেছিল।১২

সিফ্ফীন ও পরবর্তী অন্যান্য ঘটনায় তিনি আলরি (রা) পক্ষে যোগদান করেছিলেন।১৩ বদরী সাহাবীদের মধ্যে তখন তিনি একাই বেঁচে।১৪

হিজরী ৫৫ সনে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। কেউ কেউ বলেছেন, বদরী সাহাবীদের মধ্যে তিনি সর্বশেষে মারা যান।১৫ শেস জীবনে তিনি খায়বারের ঘটনাটি বর্ণনা করতেন, আর রসিকতা করে বলতেন, আমার কাছ থেকে তোমরা গ্রহণ কর। সাহাবীদের মধ্যে এখন আমিই শুধু বেঁচে আছি।১৬ একথা দ্বারা তিনি শুধু বদরী সাহাবীদের কথা বুঝাতেন। মৃত্যুকালে ত৭ার বয়স হয়েছিল সত্তর বছরের উর্দ্ধে। অনেকে এক শো বিশ বছরের কথা বলেছেন। কিন্তু তা সঠিক নয়।

আবুল ইয়সারারের দেহটি ছিল স্থুল ও বেঁটে। তবে পেশী ছিল পাকানো রশির মত শক্ত। পেটটি ছিল মোটা।১৭

তিনি খুব কম হাদীস র্বণনা করতেন। তবে যা করতেন তাতে সীমাহীন সতকর্তা থাকতো। একবার উবাদাহ ইবন ওয়ালীদের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) দুইটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন তিনি নিজের চোখ ও কানের ওপর আঙ্গুল রেখে বলেন, আমার এ চোখ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে এবং এ কান রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছে।১৮ ইমাম মুসলিম তাঁর দুইটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস দুইটির ক্রমিক সংখ্যা হলো ৩০০৬ ও ৩০০৭। তবে ইমাম বুখারী তাঁর কোন হাদীস বর্ণনা করেননি।১৯

তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উবাদাহ ইবন আল-ওয়ালীদ মূসা ইবন তালহা, উমার ইবন হাকাম ইবন রাফে, হানজালা ইবন কায়স যারকী, সায়ফী-মাওলা আবূ আইউব আল-আনসারী এবং রিবা’ঈ ইবন খারাশ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।২০ তিনি ছিলেন খুবই দয়ারু ও নবম দিলে মানুষ। বনু হারামের জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট  কিছু ঋণী ছিলেন। একদিন তাগাদা দিতে তার বাড়ীর দরজায় গিয়ে নাম ধরে ডাক দিরেন। কিন্তু কোন সাড়া পেলেন না। মনে করলেন, লোকটি বাড়ী নেই। তিনি ফিরে আসলেন এমন সময় একটি ছোট্ট ছেলে দৌঁড়ে এলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বা কোথায়? ছেলেটি বললো, তিনি তো আমার মায়ের চৌকির নীচে লুকিয়ে আছেন। তখন তিনি চিৎকার করে বরলেন, এখন বেরিয়ে এসো। তুমি কোথায় আছ তা আমার জানা হয়ে গেছে। লোকটি বেরিয়ে এলো এবং তার অভাবের কাহনিী বর্ণনা করলো। আবুল ইয়াসারের অন্তর কোমল হয়ে গেল। লোকটির নিকট থেকে ঋণের দলিলটি চেয়ে নিয়ে লেখাগুলি কেটে দিলেন। তারপর বললেন, সম্ভব হলে পরিশোধ করবে। অন্যথায় সকল ঋণ মাফ করে দিলাম।২১

দাসী-দাসীদের সাথে তিনি সাম্য ও সমতার আচরণে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজেও তা কাজে পরিণত করতেন। একদিন উবাদাহ ইবন ওয়ালীদ হাদীস শোনার জন্য তাঁর নিকট এসে দেখলেন, তাঁর দাসের সামনে এক গাদা বই। িিন নিজের এক প্রস্থ চাদর ও একটি লুঙ্গি পরে আছেন। দাসের শরীরেও একই পোশাক। উবাদাহ বললেন, চাচা, ভালো হয় পোশাক একই জাতীয় এক জোড়া করে হলে। আপনি তার লুঙ্গিটি নিয়ে নিন এবং আপনার চাদরটি তাকে দিয়ে দিন। আথবা আপনার লুঙ্গিটি তাঁকে দিয়ে তার চাদরটি আপনি নিন। আবুল ইয়সার তাঁর কথা শুনে তাঁর মাথার ওপর হাত রেখে দু’আ করলেন। তারপর বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ হচ্ছে, তোমরা যা পরবে দাসদেরও তাই পরতে দেবে, তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তাই খেতে দেবে।২২

ইমাম আবূ দাউদ ও নাসাঈ আবুল ইয়সারের সূত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি দু’আ বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) বলতেন: হে আল্লাহ! আমি ধ্বংস থেকে তোমার আশ্রয় চাই। আমি আশ্রয় চাই পতন থেকে। পানিতে ডোবা, আগুনে পুড়ে যাওয়া ও বার্দ্ধক্য থেকেও তোমার আশ্রয় চাই। আরো আশ্রয় চাই মৃত্যুর সময় শয়তানের প্ররাচনা থেকে এবং তোমার রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে পলায়ণপর অবস্থায় ও বিষাক্ত জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গের দংশনে মৃত্যু থেকে।২৩

তথ্যসূত্র:

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ