আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আসিম ইবন সাবিত ইবন আবিল আকলাহ (রা)

ভারো নাম ‘আসিম, ডাকনাম আবু সুলাইমান। পিতা সাবিত ইবন আবিল আকলাহ কায়েস এবং মাতা আশ-শামুস বিনতু আবী আমীর।১ এই ’আসিম ছিলেন দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের পুত্র প্রখ্যাত তাবেঈ আসিমের নানা।২ মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের সন্তান।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সীরাত বিশেষজ্ঞগণ তাঁকে আগে-ভাগেই ইসলাম গ্রহণকারী আনসারদের একজন বলে উল্লেখ রেছেন।৩ রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এসে হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের সাথে তাঁর মুয়াখাতবা ভ্রাতৃসম্পর্ক গড়ে দেন।৪

হযরত আসিম বদর ও উহুদল যুদ্ধে অশংগ্রহণ করেন।৫ বদর যুদ্ধের পূবর্ েহযরত রাসূলে কারীম (সা) সকল যোদ্ধাকে একত্র করে যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে মতবিনিময় করলেন। এক পর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আচ্ছা, বলতো তোমরা কিভাবে লড়বে? সাথে সাথে হযরত আসিম তীর-ধুনক হাতে করে দাাঁড়িয়ে গেলেন এবং বরলেন: দু’শো হাতের ব্যবধানে হলে তীর ছুড়বো। তার চয়ে নিকটে হলে নিযা এবং তার চেয়ে আরো নিকটে হলে তরবারি দিয়ে আঘাত করবো। তাঁর একথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: যুদ্ধের নিয়ম এটাই। আসিম যেভাবে লড়ে, তোমরা সেভাবেই লড়বে।৬

বদর যুদ্ধে মক্কার পৌত্তরিক বাহিনীর পতাকা প্রথমে তালহা ইবন আবীতালহার হাতে ছিল। হযরত আলীর হাতে সে নিহত হলে তার ভাই আবু সা’দ ইবন আবী তালহা তা তুলে নেয়। হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াককাসের হাতে সে নিহত হলে উসমান বা উসাম ইবন তালহা তা উঠিয়ে নেয়। হযরত হামযার হাতে সে নিহত হয় এবং মুসাফি ইবন তালহা সেটি তুলে নেয়। হযরত আসিম ইবন সাবিত তাকে হত্যা করেন। তারপর তার ভাই আল-জুলাস ইবন তালহা মতান্তরে কিলাব ইবন তালহা পতাকাটি তুলে ধরে। হযরত আসিম তীর মেয়ে তাকেও হত্যা করেন।৭

হযরত আসিম এই বদরে কুরাইশদের আর একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তি উকবা ইবন আবী মুয়াইতকে হত্যা করেন। এই উকবা ছিল একজন অতি নীচ প্রকৃতি লোক। সে ছিল মককায় রাসূলুল্লাহর (সা) চরম দুশমনদের একজন। নানাভাবে রাসূলকে (সা) কষ্ট দিত। ঝুড়ি ভরে ময়লা-আবর্জনা এনে রাসূলুল্লাহর (সা) ঘরের দরজায় ফেলে রাখতো। একদিন তো রাসূল (সা) সিজদাবনত আছেন, কোথা থেকে এই নরাধম ছুটে এসে তাঁর মাথার ওপর এমনভাবে চেপে বসে যে, নবীজীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। আর একদিনের ঘটনা, নবীজী সিজদায় আছেন। এই পাষন্ড কোথা থেকে মরা ছাগলের নাড়িভুঁড়ি কাঁধে করে এসে রাসূলুল্লাহর (সা) মাথায় ঢেলে দেয়। এহেন পাপিষ্ঠ বদরে মুসরমানদের হাতে বন্দী হলো। রাসূলে কারীমের নির্দেশে হযরত আসিম তাঁকে হত্যা করেন।৮ অবশ্য ইবন হিশাম বলেন: যুহরী ও আরো অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, উকবাকে হত্যা করেন হযরত আলী ইবন আবী তালিব (রা)।৯

তিনি উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইসলামের জন্য কিভাবে জবিনকে বাজি রাখতে হয় তার একটি নজীরবিহীন দৃষ্টান্তহ তিনি এ যুদ্ধে রেখে গেছেন। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলিম  বাহিনীর বিজয় হয়। কিন্তু একটি গিরিপথে রাসূল (সা) কর্তৃক মোতায়েনকৃত তীরন্দায বাহিনী রাসূলের (সা) নির্দেশ ভুরে তাদের স্থান ছেড়ে দেয় এবং গনিমাত কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে একদল পৌত্তলিক সৈনিক সেই গিরিপথ দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই আকম্মিক হামালায় বিজয়ী মুসরিম বহিনীর ওপর দারুণ বিপর্যয় নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম  বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। তারা তাদের অধিনায়ক রাসূল (সা) থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। এমন দুর্যোগময় মুহূর্তে পনেরো জন মুজাহিদ পাহাড়ের মত অটল হয়ে শত্র“র মুকাবিলা করেন। তাঁদেরই একজন হযরত আসিম ইবন সাবিত। এই উহুদদের দিন আট বক্তি মৃত্যুর জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেন। তাঁরা হলেন: আলী, যুবাইর, তারহা, আবু দুজানা, আল-হারিস ইবনুস সাম্মাহ, হুবাব ইবনুল মুনজির, আসিম ইবন সাবিত ও সাহল ইবন হুনাইফ। কিন্তু সেদিন ত৭াদের কেউই মারা যাননি।১০ ইবন সা’দ বলেন: উহুদে যখন সবাই পালিযে যায় তন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে মৃত্যুর জন্য বাইয়াত করেন।১১ তিনি ছিলেন এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর দক্ষ তীরন্দাযদের অন্যতম।১২

এই উহুদে তিনি পৌত্তলিক বহিনীর সদস্য তালহা ইবন আবী তারহার দুই পুত্র মুসাফি’ ও আল-হারিস মতান্তরে আল-জুলাসকে হত্যা করেন। তাদের দুইজনের দেহেই তিনি অতি সার্থকভাবে তীর বিদ্ধ করেন। মারাত্মক আহত অবস্থায় উভয়কে তাদের মা সুলাফা বিনতু সা’দের  কাছে আনা হয়। মা ছেলে মুসাফি’র মাথা কোলের ওপর রেখে জিজ্ঞেস করে: ববাছাধন! তোমার দেহে এমনভাবে তীর বিদ্ধ করেছে কে? সে বলে: আমি শুনতে গেলাম এক ব্যক্তি আমার প্রতি তীর ছুড়ে বলে উঠলো! এই লও, আমি ইবন আবিল আকলাহ। তখন সুলাফা কসম খায়, যদি সে কোন দিন আসিমের মাথা হাতে পায তাহলে সে তাঁর খুলিতে মদ পান করবে।১৩ আল্লাহ পাক তার এ কসম পূর্ণ করেননি।

এই উহুদে হযরত আসিম মককার আর এক াকৃতজ্ঞ দুরাচারীকে হত্যা করেন। তার নাম আবু উজ্জাহ আমর ইবন আবদিল্লাহ। এই লোকটি বদরে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তখন সে এই বলে রাসূলুল্লাহর (সা) অনুকম্পা ভিক্ষা করে যে, একটি বড় পরিবারের ভরন-পোষণের দায়িত্ব তার কাঁধে এবং সেই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (সা) তার প্রতি উদারতা দেখান। জীবনে সে আর কোনদিন রাসূলুল্লাহর (সা) বিরুদ্ধে ঘর থেকে বের হবে নাÑএই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তিনি তাকে মুক্তি দেন। এই আবু ইজ্জাহ কিন্তু উহুদ যুদ্ধের সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কুরাইশদের সাথ মককা থেকে বের হবেনা। সে তাদের বলেছিল, মুহাম্মদ আমার সাথে ভালো ব্যবহার এবং আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমি তার প্রতিদান এভাবে দিতে পানি না। কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারেনি। মককার সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা ও উবাই ইবন খালাফের চাপচাপিতে শেষ পর্যন্ত সে তাদের সাথে উহুদে আসে যুদ্ধ করতে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এবারও সে মুসলমনাদের হাতে ধরা পড়ে। আগের মত এবারও সে রাসূলুল্লাহর (সা) অনুকম্পা ভিক্ষা করে। উত্তরে রাসূল (সা) তাকে একটি চমৎকার কথা বলেন: একজন মুমিন (বিশ্বাসী) একই গর্তের সাপ বা বিচ্ছু দ্বারা দুইবার দংশিত হতে পারে না। তুমি কি ভেবেছো, মককায় ফিরে গিয়ে তোমার লোকদের বলবে, আমি মুহাম্মদকে দুইবার ধোঁকা দিয়েছি?

ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বুকাইর ইবন মিসমারর সূত্রে আবু ইজ্জাহর উহুদে বন্দী হওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: মুশরিকরা উহুদ থেকে পিছনে সরে গিয়ে দিনের প্রথম ভাগে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণ পর তারা সেখানে থেকে প্রস্থান করে। কিন্তু আবু ইজ্জাহ তখনও ঘুমিয়ে। এদিকে বেলা বেড়ে গেল। কুরাইশ বাহিনীর অনুসরণকারী মুসলিম বাহিনীর লোকেরা সেখানে এসে উপস্থিত হলো। হযরত আসিম ইবন সাবিত আবু ইজ্জাহকে সেখানে গেয়ে বন্দী করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট হাজির করেন। রাসূল (সা) তাঁর প্রাণ ভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেন। হযরত আসিম তার ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।’১৪ অবশ্য ান্য একটি বর্ণনামতে আবু ইজ্জাহর হত্যাকারী হযরত যুবাইর।১৫

হযরত আসিম (রা) হিজরী ৪র্থ সনে আর-রাজী-এর ঘটনায়  হুজাইল গোত্রের লোকদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এই ঘটনার বর্ণনায় ইমাম বুখারী ও অন্যান্য সীরাত বিশেজ্ঞদের মধ্যে কিছুটা অমিল দেখা যায়। এখানে সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হচ্ছে:

’আর-রাজী ছিরো হুজাইল গোত্রের একটি পানির কুপের নাম। এর পাশেই ঘটনাটি ঘটেছিল। তাই ইতিহাসে তা ইওমুল রাজী-এর ঘটনা নামে পরিচতি। ইমাম বুখারী আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) আসিম ইবন সাবিতের নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি গোয়েন্দা দল পাঠালেন। তাঁরা মদীনা থেকে যাত্রা করে উসফান ও মককার মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছালে হুজাইল গোত্রের বনু লিহইয়ান শাখা তা টের পায়। তারা এক শো তীরান্দায লোক নিয়ে দলটির ানুসরণ মুরু করে। এক পর্যায়ে দলটি যেখানে অবস্থান করেছিলো সেখানে পৌঁছে তারা খেজুরের আঁটি কুড়িয়ে পায় এবং তা দেখে তারা নিশ্চিত হয় যে দলটি মদীনা থেকে এসেছে। আঁটি পেয়ে তারা বলাবলি করেছিলো, এতো ইয়াসরিবের খেজুর। তারা দ্রুত অনুসরণ করে দলটি ঘিরে ফেলে। শত্র“র উপস্থিতি টের পেয়ে হযরত আসিম তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে একটি উুঁচ শক্ত টিলার ওপর আশ্রায় নেন।১৬

ইমাম বুখারীর উপরোক্ত বর্ণনা থেকে একটু ভিন্নতা দেখা যায় মুহাম্মদ ইবন ইসহাক, মুসা ইবন উকবা ও উরওয়া ইবন যুবাইরের বর্ণনায়। তবে মাগাযী শাস্ত্রে মুহাম্মদ ইবন ইসহাক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ইমাম শাফে’ঈ বলেছেন, কেউ মাগাযী (যুদ্ধ-বিগ্রহের কাহিনী) জানতে চাইলে তাকে মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।১৭

মুহাম্মদ ইবন ইসহাক আসিম ইবন উমার থেকে বর্ণনা করেছেন। উহুদ যুদ্ধের পর আল-আদল ও আল-কারাহ গোত্রদ্বয়ের কিছু লোক মদীনায় এসে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কিছু লোক মুসলমান হয়েছে। আমাদের সাথে আপনার কিচু সঙ্গী পাঠান, যারা আমাদেরক দ্বীনের জ্ঞান দান করবেন, কুরআন পড়াবেন এবং ইসলামী শরীয়াত শেখাবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে ছয় ব্যক্তিকে পাঠালেন। তাঁরা হলে: (১) মারসাদ ইবন আবী মারসাদ আল-গানাবী, (২) খালিদ ইবনুল বুকাইর আল-লাইসী, (৩) আসিম ইবন সাবিত, (৪) খুবাইব আদী, (৫) যায়িদ ইবনুল দাসহান (৬) আবদুল্লাহ ইবন তারিক। দলনেতা ছিলেন মারসাদ ইবন আবী মারসাদ। মুসা ইবন উকবাও ইবন ইসহাকের মত বর্ণনা করেছেন।১৮

ইবন ইসহাক বলেন: তাঁরা ঐ লোকগুলির সাথে যাত্রা করলেন। হিজাযের দিকে আল-হাদয়ার’ কাছাকাছি হুজাইল গোত্রের আর-রাজী’ কুপের নিকট পৌঁছালে সাথের লোকগুলি বিশ্বাস ভঙ্গ করে দলটির ওপর আক্রমণের জন্য হুজাইল গোত্রের সাহায্য চেয়ে চিৎকর শুরু করে দিল। সাথে সাথে হুজাইল গোত্রের লোকেরা অস্ত্র হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো এবং চারদিক থেকেদলটিকে ঘিরে ফেললো। এই মুষ্টিমেয় লোক তাদের সাথে লড়বার জন্য হাতিয়ার তুলে নিলো। তখন হুজাইল গোত্রের লোকেরা বললো: আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে হত্যার উদ্দেশ্য আমাদের নেই। তবে মককাবাসীদের হাতে তোমাদেরকে তুলে দিয়ে বিনময়ে কিছু লাভ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।১৯ আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সাথে অঙ্গীকার করছি এবং তোমাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছি, আমরা তোমাদেরকে তুলে দিয়ে বিনিময়ে কিছু লাভ কাই আমাদের প্রত্যুত্তরে মারসাদ, খালিদ ও আসিম বললেন: আল্লাহর কসম! আমরা কোন মুশরিকের অঙ্গীকার ও চুক্ িকক্ষণো গ্রহণ করবো না। ইমাম বুখারী বলেন:এই সময় আসিম বলেছিলেন: আমি কাফিরের জিম্মায় যাব না। ইমাম বুখারী বলেন: এই সময় আসিম বলেছিলেন: আমি কাফিরের জিম্মায় যান না। হে আল্লাহ! আপনার নবীকে আমাদের খবর পৌঁছে দিন।২০ ইবন ইসহাক বলেন, এই সময় আসিম কেটি কবিতা পাঠ করেছিলেন, তার কয়েকটি পংক্তি নিুরূপ:২১

‘আমার কী যুক্তি থাকতে পারে, যখন আমি একজন শক্তিমান, দক্ষ তীরান্দায?

একটি ধনুকও আছে, আর তাতে আছে শক্ত ছিলো।

তার পিট থেকে উড়ে যয় লম্বা-চওড়া তীরে ফলা।:আর মৃত্যু? তাই তো সত্য, আর জীবন-তাাে মিথ্যা।

আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন রখেছেন, তাতো আসবে,

আর মানুষ, সে তো তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।

আমার মা হবেন নাককাটাÑ

যদিনা আমি তাদের সাথে লড়াই করি।’

এমনি ধরনের আরো কিছু পংক্তি সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।২২

‘আসিম কবিতার পংক্তি উচ্চারণ করতে করতে কাফিরদের প্রতিতীর ছুড়ছিলেন। তীর শেষহয়ে গেলে বর্শার চালাতে লাগলেন। এক সময় তাও ভেঙ্গে গেলে এবার থাকলো তরবারি তাই চালালেন। শাহাদাতের ক্ষণিক পূর্বে তিনি দু’আ করলেন:

‘আমি আবু সুলাইমান! আমার মত রোকেরাই তীর নিক্ষেপ করে। এ গৌরব লাভ করেছি সম্মানিত লোকদের থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে। শত্র“র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মারসাদ ও খালিদ শহীদ হয়েছে।২৩

ইমাম বুখারী বলেন:অতপর আসিম সহ তাঁর সঙ্গীরা যুদ্ধে হলে। শত্র“দের তীরে বিদ্ধ হয়ে আসিম তাঁর ছয়জন সঙ্গীসহ শাহাদাত বরণ করেন। বেঁচে থাকেন খুবাইব, যায়িদ ও অন্য এজন। কাফিরদের প্রতিশ্র“তি পেয়ে তারা আত্মাসমর্পণ করলেন। হাতের মধ্যে পেয়েই কাফিররা প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে তাঁদেরইে ধনুকের সূতা খুলে হাত-পাঁ বেঁধে ফেলে। এ েেদখে তাঁদেরে মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি বলে উঠলেন: এ হলো প্রথম ধোঁকা। একথা বলে তিনি তাদের সাথে চলতে একেবারেই অস্কীকার করলেন। তারা ানেক টানাহেঁচড়া করলো’ কিন্তু কিচুতেই তাঁকে নিতে পারলো না। শেষে কাফিররা তাঁকেও হত্যা করে। অবশিষ্ট দুইজনকেও মককায় নিয়ে হত্যাকরা হয়।২৪

হযরত আসিমকে (রা) হত্যার পর বনু হুজাইল তাঁর মাথা মককর এক মহিলা সুলাফা বিনতু সা’দÑএর কাছে বিক্রীয় সিদ্ধান্ত নিল। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসিম উহুদ যুদ্ধে এই মহিলার দুই ছেলেকে হত্যা করেন। তাই সে কসময খেয়েছিল, যদি কখনো আসিমকে হাতের মুঠোয় পায় তাহলে তাঁর মাথার খুলিতে মদ পান করবে।২৫৫সে আরো ঘোষনা দেয়, যে ব্যক্তি তাঁর মাথা এনে দেবে তাকে একশো উট পুরস্কার দেওয়া হবে।২৬ তাছাড়া তিনি বদরে পৌত্তরিক কুরাইশদের এক বড় নেত উকবা ইবন আবী মু’য়াইতকে হত্যা করেছিলেন। এজন্য তারাও আসিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে দারুণ খুশী হয়েছিল। তারা এই বলে উল্লাস প্রকাশ করেছিল যে, যাক, শেষ পর্যন্ত উকবার হত্যাকারীর পার্থিব জীবনের অবসান হয়েছে। তারা তাঁর দেহ আগুনে জবারিয়ে ভম্মিভূত করে তাদের পতিশোধ স্পৃহা নিবারণ করতে চেয়েছিল।২৭ কিন্তু আল্লাহ পাক তাদের কারও বাসনা পূরণ করেননি।

এদিকে হযরত আসিম মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহর দরবারে এই বরে দু’আ করেছিলেন যে, হে আল্লাহ! কোন মুশরিক যেন আমাকে স্পর্শ না করে এবং আমিও যেন তাদের কাউকে স্পর্শ না করি। আলÍাহ পাক তাঁর দু’আ কবুল করেছিলেন। তিনি মৌমাছি বা বোলতা পাঠিয়ে কাফিরদের স্পর্শ থেকে তাঁর রক্ষা করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত উরওয়া বলেন: মুশরিকরা তাঁর লাশের দিকে যাওয়ার উদ্যোগী হতেই কোথা থেকে এক ঝাঁক মৌমাছি এসে তাদেরকে এমনভাবে কামড়াতে শুরু করে যে, তারা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায়। দিনের আলোতে তারা অকৃতকার্য হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, রাতের আঁধারে পাশের কাছে যাবে। কিন্তু রাতের আঁধর নামতে না নামলে মুঘলধারে বৃষ্টি হয়। সে প্লাবনের প্রবল স্রোতে হযরত আসিমের লাশটি যে কোথায ভেসে যায় মুশরিকরা তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার কোন হদিস পায়নি। ইব সা’দ বলেন: হিজরাতের ছত্রিশ মাসের মাথায় সপর মাসে আর-রাজী’র এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। হযরত উমার যখন শুনলেন, মেওমাছি তাঁর দেহ রক্ষা করেছে, তখন মন্তব্য করলেন: একজন বিশ্বাসী বান্দাহকে আল্লাহ হিফাজত করেছে। জীবন ও মরণ উভয় অবস্থায় আল্লাহ তাঁকে মুশরিকের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেছেন। যেহেতু মৌমাছি তাঁকে রক্ষা করেছেন, এ কারণে ইতিহাসে তিনি হামিউদ দাার নামে পরিচিত।২৮

আর-রাজী’র এই বষাদময় ঘটনার পর হুজাইলীদের নিন্দায় মদীনার ইসলামী কবিরা সরব হয়ে ওঠেন। হাসসান ইনসাবিত আবু যায়িদ আল-আনসারী প্রমুখ কবি তাদের এ অপকর্মের নিন্দা এবং শহীদদের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করে। সীরাতু ইবন হিশাম সহ বিভিন্ন গ্রন্থে তার কিছু সংকলিত হয়েছে।২৯ হাসসান ইবন সাবিতের একটি মরছিয়া বা শোকগাঁথার দুইটি পংক্তি নিুরূপ:

আমার জীবনের শপথ! হুজাইল ই. মুদরিক দারুণ অপরাধ করেছে, খুবাইব ও আসিমের ব্যাপারে তারা দুর্নাম কুড়িয়েছে।৩০

হযরত ইবন আক্ষাস বলেন: আর-রাজী’র খবর মদীনায় পৌঁছালে মুনাফিকরা মন্তব্য করলো, এই হতভাগ্য লোকগুলো তাদের ঘরেও থাকলো না, তাদের নেতার বাণীও পৌঁছাতে পারলো না অথবা তারা জীবনের বিনিময়ে ােন কল্যাণও লাভ করাে না। তখন আল্লাহ পাক সূরা আল-বাকারার ২০৪ নং আয়াতটি নাযিল করেনঃ৩১

আর এমন কিছু লোক আছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাদের চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক।

হযরত আসিমের এক ছেলের নাম মুহাম্মদ। তৎকালীন আরবের বিখ্যাত কবি আল-আহওয়াস এই মুহাম্মদের পৌত্র।৩২

শত্র“ ঈমান, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি গভীর মুহাব্বত, পরিচ্ছন্ন মন, অতুলনীয় সাহস ইত্যাদি গুণ হযরত আসিমের চরিত্রের উজ্জলতম দিক।

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: মদীনার চিত্র বৈরী দুি গোত্রÑআউস ও খাযরাজ নিজ নিজ গোত্রের কৃতি সন্তানদের নাম নিয়ে গর্ব কতো। আউসবলতো, হানজালাÑযাঁকে ফিরিশতারা গোসল দিয়েছিল, সা’দ ইবন মু‘য়াজÑযাঁর মৃত্যুতে আরশ কেঁপে উঠেলিলো, আসিম ইবন সাবিত যাঁর দেহ আলÍাহ মৌমাছি দ্বারা রক্ষা করেছিলাম, মুযাইমা ইবন সাবিত যাঁর একার সাক্ষ্য দুজিনের সমানÑএাঁ সবাই আউস গোত্রের সন্তান।৩৩

তথ্যসূত্র :

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ