আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আল-হারেস ইবন আস্-সিম্মাহ্ (রা)

আল-হারেস (রা)-এর ডাকনাম সা’ঈদ। পিতা আস সিম্মাহ ইবন আমর এবং মাতা তুমাদুর বিনতু আমর। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের শাখার সন্তান।১

রাসূলে কারীমের (সা) মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সবর ও ইসতিকলাল, ধৈর্য ও দূঢ়তার প্রতীক সুহাইব আল-রূমীর (রা) সাথেত৭র মুওয়াখাত বা দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।২

মূসা ইবন উকবা ইবন ইসহাক ও অন্যরা তাঁকে  বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বলে উল্লেখ করেছেন।৩ রাসূলে কারীমের (সা) সাথে বদরে যাত্রা করেন এবং রাওহা’ নামক স্থানে যাওয়ার পর কোন কারণে দেহের ােন হাড় ভেঙ্গে গেলে রাসূল (সা) তাঁকে মদীনয় ফেরত পাঠান। তবে যুদেÍদ শেষ তাঁকে বদরের গনীমাত (যদ্ধলব্ধ সম্পদ) ও সওয়াবের আংশীদার ঘোষণা করেন।৪

উহুদ যুদ্দের এক পর্যায়ে মুসলিম বনিী যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে তখন আল-হারেস দারুণ সাসের পরিচয় দেন। তিনি কুরাইশ বাহিনীর সদস্য উসমান ইবন আবদিল্লাহ ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুরীর বর্ম, ঢাল, তরবারি ইত্যাদি কেড়ে নিয়ে তাকেহত্যা করেন। এ খবর রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পৌঁছলে তিনি মনতব্য করেন: সকল প্রশংসা সেই আলÍাহ যিনি তাকে এ সুযোগ দান করেছেন।৫ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য য, আবদুলআহ ইবন জাহাশ (রা) এই উসমানকে ইতিপূর্বে নাখলায় টহলদানের সময় বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসেন। এরপর সে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত হয়ে আবার কুরাইশদের সাথে যোগ দেয়। উহুদে আল হারেস যখন তাকে হত্যা করছিলেন তখন উবাইদ ইবন হাজেয আল-আমেরীর দৃষ্টিগোচর হয়। সে অতর্কিত আল-হারেসের কাঁধে তরবারির প্রচণ্ড আঘাত হানে। আল-হারেস মারাত্মকভাবে আহত হন। দূর থেকে আবু দুজানাছুটে এস উবাইদ ইবন হাজেযকে আক্রমণ করে ধরাশীয়া করে ফেলেন। এরপর তাকে হত্যা করে খন্ড বিখন্ড করে ফেলেন।৬ রাসূল (সা) আল-হারেসকে নিহত উসমানের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম দান করেন।

উহুদে যখন মুসলমানরা বিক্ষিপ্ত হয়ে রাসূল (সা) থেকে ছিটকে পড়ে তখনও যে কয়েক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে অটল থাকেন, আল-হারেস ইবন আস-সিম্মাহ তাঁদের অন্যতম।৭ ইবন ইসহাক বলে, উহুদরে বিপর্যয়ের সময় মুসলমানরা যখন জানলো যে, রাসূল (সা) জীবিত হআছেন এবং তাঁকে  চিনতে পারাে তখনসবাই সেদিকে ছুটলো। এরপর আবু বকর, উমার আলী, তালহা, যুবাইর, আল-হারেস ইবন আস-সিম্মাহ সহ আরো কিছু মুসলমান রাসূলকে (সা) নিয়ে উপত্যকার দিকে যান।৮

উহুদের উিপত্যকায় রাসূলে কারীম (সা) সাহাবেিদর বেষ্টনীয় মধ্যে ঠেস দিয়ে বসা আছেন। এমন সময় মক্কার পৌত্তলিক নেতা উবাই ইবন খারাফ একেবারে কাছাকাছি এসে রাসূলকে (সা) সম্বোধন করে বললো: ওহে মুহাম্মদ! তুমি বেঁচে গেলে আমি বাঁচবো না। সাহাবীরা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কেউ একজন কিতাকে রুখবে?  বললেন: না তার দরকার নেই। যখন সে আরো কাছাকাছি এলা, রাসূল (সা) আল-হাসের ইবন আস-মিম্মাহর হাতথেকে ত৭ার নিযাটি নিলেন। তারপর ুবাই ইবন খালাফের মুখোমুখি হয়ে তার গলায় সামান্য খোঁচা দিলেন। আর তাতেই সে তার অতি প্রিয় ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে ছুটে পালালো।

ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায়থাকতে ইবাই ইবন খালাফের সাথে দেখা হলে সে বরতো: মুহাম্মদ! আমার বিশআস ওর ওপর সোয়ার হয়েই আমি তোমাকেহত্যা করবো। রাসূল (সা) বলতেন: না, তা পারবেনা। বরং আমিি তোমাকে হত্যা করবো ইনশাআল্লাহ। রাসূল (সা) তার গলায় যে খোঁচটির দিয়েছিলেন, তা ছিল অতি সামান্য। খোঁচা খেয় সে অস্থিরভাবে স্বপক্ষীয় লোকদর নিকট দৌড়ে গিয়ে  বলতে থাকে: আল্লাহ কসম! মুহাম্মদ আমাকেমেরে ফেলেছে। তার সাথীরা বললো: তোমার তো ুিই হয়নি। তুমিমনে হয় পালগ হয় গেছো। সে বললো: মুহাম্মদ মক্কায় থাকতে আমাকে বলতো: আমি তোমকে হত্যা করবো। আল্লাহর কসম! আমার প্রতি সে যদি কেবল থুথু নিক্ষেপ করতো তাতেই আমার মৃত্রু হতো।’ আল্লাহর এই দুশমন কুরাইশ কাফেলার সাথে মকআর ফেরার পথে সারাফ’ নামক স্থানে মারা যায়।৯ আসলে সে বুঝেছিল, আঘাত যত সামান্যই হোক, মুহাম্মাদের মুখ থেকে যে কথা উচ্চারিত হয়েছ তা সত্রে পরিণত হবেই।

উহুদ যুদ্ধে এক পর্যায়ে রাসূলে কারীম (সা) আল-হারেসকে জিজ্ঞেসকরলেন: তুমি কি আবদুর রমান ইবন আওফকে দেখেছো? বললেন: হাঁ ইয়া রাসূলালÍাহ! তিনি তো পাহাড়ের পাদদেশে পৌত্তরিকদের ভীড়ের মধ্যে ছিলেন। আমি তাঁর দিকে যাওয়ার জন্য মনস্থির করছিলাম। এমন সময় আপনার প্রতি আমার দৃষ্টি পড়লো। আমি এ দিকে চলে এলা। রাসূল (সা) বললেন: ফিরিশতারা তাঁর পক্ষে লড়ছে। একথা শোনার সাথে সাথে আল-হারেস ছুটে গেলেণ আবদুর রমানের দি।ে দেখলেন, ত৭ার সামনে কাফিরদের সাতটি রাশ পড়ে আছে তিনি আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করলেন: এদের সকলকে কি আপনি একাই হত্যা করেছেন? আবদুর রমান বললেন: এই আরতাত ইবন আবদির শুরাইবীল এবং ওকেÑএ দু’জনকে তো আমি হত্যা করেছি। কিন্তু অন্যদের হত্যকারী আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। আল-হারেস তখন বললে: রাসূল (সা) ঠিক কথাই বলেছেন। তাবারানী এ বর্ণনাটি সংকলন।১০

উহুদ যুদ্ধে শেষ পর্যায়ে রাসূল (সা) সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আল-হাসের সংগে সংগে তাঁর খোঁজে বের হলেন। তাঁর ফিরতে দেরী হচ্ছে দেখে আলী’ (রা) তাঁকে খুঁজতে বের হলেন।  আলী তখন একটি কবিতার দু’টি চরণ শুন শুন করে আবৃত্তি করছিলেন। তার অর্থ নিুরূপ:

‘প্রভু হে, আল-হাসে ইবন আস-সিম্মাহ একজন বন্ধুবৎসল এবং আমাদের মধ্যে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে গিয়ে সে হারিয়ে গেছে। আর সে যেখানেই যায় জান্নাত তালাশ করে।:১১

ইবন হিশাম চরণ দু’টি একটু ভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তনি একথাও বলেছেন, চরণ দু’টি আলীর নয়।১২

এরপর আলী (রা) আল হারেসের দেখা পেলেন। তাঁরা উভয়ে হামযাকে (রা) মৃ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলন এবং ফিরে এসে রাসূলকে (সা) খবর দিলেন। এদিকে কাফিরা তাঁর অন্য সঙ্গীদের হত্যা করে; ন্তিু তিনি তা জানতেন না। তিনি আমর ইবন উমাইয়্যার সাথে একটি গাছের নীচে বসে ছিলেন। হঠাৎ আকাশে শুক জতীয় পাখী দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বুঝত পারলেন কিছু একটা ঘটেছে। আমরকে সংগে করে সেই দিকে চললেন। দেখলেন, এক স্থানে বেশ কিছু মুসলমানের রক্তাক্ত ও ধুলিমলিন লাশ বিগলিত অবস্থায়পড়ে আছে। এদৃশ্য দেখে তিনি সঙ্গী আমরকে বললেন, এখন আমাদের উচিত মদীনায় ফিরে গিযে বিষয়টি তাঁকে জানাাে। এখল বল তোমার ইচ্ছা কি? আল-হারেস বললেন: যেখানে আল-মুনজির ইবন আমর নিহত হয়েছেন, আমি কিভাবে সেখন থেকে পালিয়ে যেতে পারি? লোকে বলবে, আল-মুনজির নিহত হয়েছেন, আর আমরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। এরপর তিনি বলবে আল-মুনজির নিহত হয়েছেন আমি কিভাবে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারি? লোকে বলবে আল-মুনজির নিহত হয়েছেন, আর আমরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। এরপর তিন আমরকে সংগে করে শত্রদের দিকে অগ্রসরন হন। প্রতিপক্ষ ছিল সুসজিজ্ত এবং সংখ্যায় অনেক। তারা বৃষ্টির মত তীর নিক্সেপ করে আল-হরেসের সারা দেহ ঝাঝরা করে ফেলে। তিনি ঘটনা স্থলেই শাহাদাতবণ করেন। ত৭ার সংগী আমর শত্র“ পক্ষের হাতে বন্দী হন। আমের ইবন আততুফাইল যখন জানতে পারে যে বন্দীআমর মুদার গোত্রের লোক তখন সে তাঁর মাথার সামনের দিকের চুল মুড়ে দিয়ে মুক্ত করে দেয়। কারণ তার মা মান্নত করেছিল যে, সে একটি বন্দী মুক্ত করবে। এভাবে আমের তার মায়ের মান্নত পূণ করে। এটা হিজরাতের ৩৬ মাসের মাথায় সফর মাসে সংঘটিত হয়।১৩

আল-হারেসের কে ছেলে সাদ সিফফীনে আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধগিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। সাদের মায়ের নাম ছিল উম্মুল হাকাম খাওলা বিনতু উকবা। তাঁর অন্য একটি ছেরেন নাম আবুল জুহাইম। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্য লাভে ধন্য হন এবয় রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হাদীসও বর্ণনা করেন। তাঁর মায়ের নাম উতাইলা বিনতু কা’ব। ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে বলেছেন, মদীনা ও বাগদাদে এখনও আল-হারেসের বংশধর বিদ্যামন আছে।১৪ আল-হারেসের মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর কিছু শ্লোক সংকলিত হয়েছে।১৫

তথ্যসূত্র:

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ