আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

’উমাইর ইবন সা’দ (রা)

উমাইর ইবন সা’দ মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের ভাগ-বিমুখ একজন আনসারী সাহাবী। চারিত্রিক গুণÑবৈশষ্ট্যের জন্য তিনি নাসীজু ওয়াহদিহ উপাধি লাভ। করেন। তাঁকে এ উপাধি দান করন খলীফা উমার (রা)।১

উমাইরের শৈশব কালেই পিতা সা’দ উবাইদ মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর মা জুলাস ইবন সুওয়ায়িদকে দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন। মায়ের সাথে উমাইরও চলে যান জুলাসের তত্ত্বাবধানে। জুলাস তাঁকে নিজের সন্তানদের মত অত্যন্ত øেহ ও যতেœর সাথে প্রতিপালন করেন। ইবন হিশাম বলেন: এই জুলাস ও তাঁর ভাই াল-হারেস, দুইজনই ছিলেন মুনাফিক (কপট মুসলমান)।২

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, আবু যায়িদ ছিলেন মদীনার আনসারদের বিখ্যাত চার ক্বারীর অন্যতম। তাঁর আসল নাম সা’দ ইবন উবাইদ। আর আমাদের আলোচ্য এই মহান সাহাবীর সম্মানিত পিতার নামও ছিল সা’দ ইবন উবাইদ। এ কারণে অনেক ঐতিহাসিক, বিশেষতঃ ইবন সা’দ ভুল করেছেন। তাঁরা উমাইরকে ক্বারী আবু যায়িদ সা’দ ইবন উবাইদের পুত্র বলে উল্লে করেছেন। এটা তাঁদের এক মারাত্মক ভুল। যেমন বিনুল কালবী বলেছেন: ত৭ার পিতা সা’দ ইবন উবাইদ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।৩ অথচ উভয় সা’দের  মৃত্যুর সনের মধ্যে বিসম্তার ব্যবধান রয়েছে। তাাড়া ুমাইরের পিতা সা’দ ছিলেন আউস গোত্রের এবং আবু যায়িদ সা’দ ছিরেন খাযরাজ গোত্রের সন্তন। প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবন মালিক বলেছেন, আবু যায়িদ সম্পর্কে তাঁর চাচা। আর এটা তো স্বীকৃত যে, আনাস খাযরাজ গোত্রের লোক। তাছাড়া আবু যায়িদ কো বংশধর রেখে যাননি।৪

উমাইরের পালক পিতা জুলাসের তত্ত্বাবধানে থাকা কালেই সম্ভবত তিি ইসলামগ্রহণ করেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাহাবিয়্যাতের (রাসুলুল্লাহর (সা) সাহচর্য) পৌরব তো তিনি অর্জন করেছেন, তবে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কোন যুদ্ধে যাওয়ার মর্যাদা লাভ করতে পারেননি।৫ এর কারণ হলো রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় যুদ্ধে যাওয়ার বয়স তাঁর হয়নি। কোন কোনগ্রন্থকার বলেছেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও জিহাদে তিনি জুলারে সহগামী হতেন। এ প্রসঙ্গ তাঁরা তাবুক যুদ্ধের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।৬

খলীফা উমারের (রা) খিলাফতকালে সেনাপতি আবু উবায়দার সাথে তিনি শাম অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। উমার তাঁকে শামের একটি বাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করন। কিছুদিন পর তাঁকে হিমস ও দিমাশকÑএর ওয়ালী নিয়োগ করেন। উমারের (রা) ওফাত পর্যন্ত তিনি এ পদের বহাল ছিলেন। ইমাম যুহরী বলেন: সা’ঈদ ইবন আমির উবন হিজিম মৃত্যুবরণ করলে উমাইর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। উমারের নিহত হওয়া পর্যন্ত মুয়াবিয়া ও তিনি এক সাথে শামে ছিলেন। অতঃপর খলীফা সুমান উমাইরকে অপসরণ করে গোটা শাম মু’য়াবিয়ার অধীনে ন্যন্ত করেন।৭

সাফওয়ান ইবন আমর বলেন: মুয়াবিয়া গোটা শামের আমীর হিসেবে নিয়োগ লাভের পর হিমসের মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভষণ দেন। তাতে বলেন: ওহে হিমসবাসী! আল্লাহ তা’য়ালা সৎ ও যোগ্য আমীরদের দ্বারা আপনাদেরকে ধন্য করেছেন। আপনাদের প্রথম আমীর য়িাদইবন গানম। তিনি আমার চেয়ে ভলো লোক ছিলেন। আপনাদের দ্বিতীয় আমীর সা’ঈদ ইবন আমির। তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি। তারপর আপনাদের আমীর হলেন উমাইর। উমাইর অতি ভালো মানুষ। এখন আমি আপনাদের আমীর। আপনারা আমাকে জানবেন।৮

উমাইরের (রা) শামে থাকাকালের বেশ কিছু ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে কিচু তুলে ধরা হলো:

একবার কলীফা উমার (রা) একটি বাহিনীর অধিনায়ককরে তাঁকে শামে পাঠান। কিছু দিন পর খলীফার নিকট এসে বললেন: আমীরুল মুমিনীন! আমাদের অবস্থান এবং আমাদের শত্র“দের অবস্থানের মধ্যবর্তী স্থানে ‘আরাবসোস’ নামে একটি শহর আছে। এর অধিবাসীরা আমাদের গোপন তথ্য আমাদের শত্র“দের নিকট সরবরাহ করে থাকে। তার ওপর ভিত্তি করে শত্র“রা আমাদের সাথে এমন এমন আচরণ করে তাকে।

খলীফা বললেন: তুমি শহরের অধিবাসীদের শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবার প্রস্তাব দেবে। বিনিময়ে তাদেরকে একটি ছাগলের পরিবর্তে দুইটি ছাগল, একটি গরুর পরিবর্তে দুইটি গরু এবং এভাবে তাদের প্রত্যেকটি জিনিসের পরিবর্তে দুইটি জিনিস দান করবে। এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে আমাদের প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী আমরা তাদেরকে দ্বিগুণ জিনিস দান করবো। আর এ প্রস্তাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তাদের সাথে আমাদের যে চুক্তি আছে তা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে এক বছর অপেক্ষা করবে।

উমাইর আরজ করলেন: হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার এ অঙ্গিকারটি আমাকে একটু লিখিতভাবে দান করুন।

খলীফার অঙ্গিকার পত্রটি নিয়ে উমাইর শামে ফিরে গেলেন এবং আরাবসোরে’ ধ্বংস করে ফেলেছে। আরো নানা কথা তিনি শুনতে পেলেন। খলীফা তাঁর ওপর ভীষণ ক্ষেপ গেলেন। সাথে সাথে উমাইরকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। উমাইর মদীনায় খলীফার দরবারে হাজির হরেন। ক্ষুব্ধ খলীফা তাঁর মাথার ওপর ছড়ি ঝাঁকিয়ে বললেন: তুমি আরাবসোস’ ধ্বংস করে ফেলেছে! ‘উমাইর কোন উত্তর না দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। খলীফা দরবার থেকে উঠে ঘরে ফিরলেন। উমাইর সাক্ষাতের অনুতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁকে প্রদত্ত খলীফার অঙ্গিকার পত্রটি পাঠ করে শোনালেন। উমার মন্তব্য করলেন: আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।৯

খলীফা উমার (রা) তঁকে হিমসের ওয়ালী পাঠালেন। এক বছরের মধ্যে তাঁর কোন খবর পেলেন না। অবশেষে তিনি কাতিবকে (সেক্রেটারী) বললেন: আমার মনে হচ্ছে সে আমাদের আস্থা নষ্ট করেছে। তুমি তাঁকে লেখ: আমার এ পত্র পৌঁছা এবং পাঠমাত্র মুসলমানদের নিকট থেকে খাজনা, যাকাত যাকিছু আদায় করেছো তা নিয়ে মদীনায় চলে আসবে।’ চিঠি পেয়ে উমাইর বিলম্ব না করে একটি চামড়ার থলিতে সামান্য কিছু পাথেয় ও পানির একটি পিয়ালা ভরে কাঁধে ঝোলালেন এবং লাঠিটি হতে নিয়ে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করলেন।

মদীনা থেকে হিমসের দূরত্ব কয়েক শে মাইল। মদীনায় যখন পৌঁছলেন তখন তাঁর মাথার চুল লম্বা হয়ে গেছে। রোদ, ধুলোবালি ও দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সরাসরি খলীফার দরবারে পৌঁছে বললেন: আসসালামু আলাইকা ইয়া আমীরাল মুমিনীন!Ñআমিরুল মুমিনীন, আপনার প্রতি সালাম! খলীফা তাঁর দিকে চোখ তুলে দেবে বিষ্ময়ের সাথে প্রশ্ন করলেন: এ তোমার কী হাল হয়েছে? উমাইর বললেন: আপনি আমার আবার কি হাল দেখলেন? আমি কি সুস্থ নই? আমার ওপর কি দুনিয়াদারির ছোঁয়া লেগেছে? আমি কি দুনিয়ার শিং দুইটি ধরে টানাটানি করছি? খলীফা ধারণা করেছিলেন, ‘উমাইর হয়তো প্রচুর অর্থ-সম্পদ সাথে নিয়ে এসেছেন। তাই প্রশ্ন করলেন: হেঁটে এসেছো?

বললেন: হাঁ, হেঁটেই এসেছি।

Ñকেউ কি তোমাকে একটি বাহন দিয়ে সাহায্য করলো না?

Ñআমি কারো কাছে বাহন চাইনি, আর কেউ দেয়ওনি।

Ñ তারা খুব খারাপ মুসলমান হয়ে গেছে।

Ñ উমার! আল্লাহ আপনাকে মানুষের গীবত করতে নিষেধ করেছেন। আমি তো তাদেরকে ফজরের নামায জামায়াতে আদায় করতে দেখেছি।

খলীফা নির্দেশ দিলেন: উমাইরের নিয়োগ নবায়ন করা হোক। উমাইর বললেন: আমি আপনার অধীনে বা ভবিষ্যতে আর কারো অধীনে আর কোন দায়িত্ব পালন করবো না। কারণ, অপরাধ থেকে আমি মুক্ত থাকতে পারিনি। সেখানে খ্রীষ্টান জিম্মীকে আমি বলেছি, আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুন। ওহে উমার আপনি কি আমাকে এমন কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন? অন্য সাহাবীদের মত মৃত্যুবরণ না করে বেঁচে থাকলাম এবং যেদিন থেকে আপনার সাথ কাজ করছি সেটি আমার জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিন। এরপর তিনি খলীফার অনুমতি নিয়ে মদীনা থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি নিরিবিলি স্থানে চল যান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। একদিন খলীফার নে যেন মনে হলো, ‘উমাইর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। তাই তাঁকে পরীক্ষার জন্য এক শো দীনারসহ আল-হারেস নামক এক ব্যক্তিকে তাঁর কাছে পাঠালেন। যাওয়ার সময় লোকটিকে বললেন: তুমি উমাইরের কাছে একজন অতিথির ছদ্মবেশে যাবে। যদি তাঁর ওখানে পার্থিব ভোগ-বিলাসের কোন চিহ্ন দেখতে পাও তাহলে সাথে সাথে ফিরে আসবে। আর তাঁকে খুব করুণ অবস্থায় দেখলে এই এক শো দীনার তাঁকে দান করবে।

লোকটি চলে গেল। উমাইরের বাস্থানে পৌঁছে দেখলো, তিনি দেওয়ালের পাশে বসে বসে জামার ময়লা খুটে খুটে তাতে তালি লাগাচ্ছেন। লোকটি সালাম দিল। উমাইর সালামের জবাব দিলে তাকে থাকার অনুরোধ করলেন। লোকটি থেকে গেল।

উমাইর: কোথা থেকে আসা হচ্ছে?

Ñমদীনা থেকে।

Ñ আমীরুল মুমিনীনকে কেমন ছেড়ে এসেছেন?

Ñ একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি হিসেবে।

Ñ আমীরুল মুমেনীন কি এখন আর হুদ (শরী’য়াত নির্ধারিত শাস্তি) কায়েম করেন না?

Ñতিনি তাঁর এক ছেলেকে সম্প্রতি ব্যভিচারের শাস্তি দান করেছেন। ছেলেটি মারা গেছে।

Ñআল্লাহ, তুমি উমারকে সাহায্য কর। তোমার ভালোবাসা ছাড়া তাঁর মধ্যে আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই।

লোকটি উমাইরর গৃহে তিন দিন অতিথি হিসেবে থাকলো। এ তিনটি দিন শুধু যবের রুটিন কিছু টুকরো চিবিয়েই তকে কাটাতে হলো। এ অবস্থা দেখে লোকটি বললো: এ কয়টি দিন তো আপনি আমাকে প্রায় অভুক্তই রেখেছেন। এরপর সে দীনারগুলি বের করে উমাইরের দিকে এগিয়ে দিল। দীনার দেখামাত্র তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন: আমার প্রয়োজন নেই।’ একথা বলে দীনারের থলিটি তিনি লোকটির দিকে ঠেলে দিলেন। এ সময় উমাইরের সহধর্মিনী বললেন: আপনার প্রয়োজন না থাকলে যাদের প্রয়োজন আছে তাদের মধ্যেবিলি করুন।’ উমাইর বললেন: এগুলির ব্যাপারে কোন কিছু করার কোন অধিকার আমার নেই।’ তখন স্ত্রী তাঁর ওড়না ছিঁড়ে কয়েকটি টুকরো করেন। তারপর দীনাগুলি ভাগ করে সেই টুকরোগুলিতে বেঁধে আশেপাশের শহীদদের সন্তানদের মধ্যে বন্টন করে দেন।

এদিকে লোকটি খলীফা উমারের নিকট ফিরে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: উমাইর দীনারগুলি কি করেছ? আমি তো জানিনে’Ñলোকটি জবাব দিল। এরর খলীফা উমার (রা) দীনারগুলিসহ ুমাইরকে আসার জন্য লিখলেন। উমাইর খলীফার দরবারে হাজির হরেন। দীনারগুলি কি করেছো?Ñখলীফা জানতে চাইলেন। বললেন: আমার া ইচ্ছা হয়েছে করেছি। তার সাথে আপনার সম্পর্ক কি? না তোমাকে বলতেই হবে’Ñখলীফা জোর দিয়ে বললেন। উমাইর বললেন: আমি সেগুলি আমার আখিলাতের প্রয়োজনে আগে পাঠিয়ে দিয়েছি। খলীফা তখণ কচু খাদ্যদ্র্য ও দুইখানা কাপড় তাঁকে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। উমাইর তখন বললেন: খাদ্যের প্রয়োজন আমার নেই। বাড়ীতে আমি দুই সা পরিমাণ যব রেখে এসেছি। সেগুলি খেতে খেতেই আল্লাহ পাক হয়তো অন্য রিযিকের ব্যবস্থা করবেন। তবে কারপড় দুইখানি নেওয়া যেতে পারে। কারণ, আসার সময় আমি দেখে এসেছি, অমুকের মায়ের কাপড় নেই। সে ন্যাংটা প্রায়। একথা বলে কাপড় দুইখানি বগলদাবা করে বাড়ীতে ফিরে আসেন। এর অল্পদিন পরেই তিনি মারা যান।১০

ঊমারের (রা) মৃত্যু সন নিয়ে সীরাত শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদেও মধ্যে মতপার্থক্য আছে। কেউ কেউ বলেছেন, হিমসে তিনি স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন। আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে, মতান্তরে খলীফা ‘উমার অথবা ‘ঊসমানের (রা) সময়ে সেখানেই মারা যান।১১ একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি মদীনায় মারা যান এবং খলীফা উমার (রা) তাঁর জানাযার নামায পড়িয়েছেন।১২ অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘উমাইরের মৃত্যুও খবর পেয়ে খলীফা’ উমার (রা) তাঁর জন্য শোক প্রকাশ ও মাগফিরাত কামনা করেন। তারপর তিনি মদীনার ‘বাকী’ আল-গারকাদ’ গোরস্থানে যান। তাঁকে অনুসরণ করে আরো অনেকে লক্ষ্য করে বললেন: ‘আচ্ছা, আপনারা প্রত্যেক নিজ নিজ বাসনা প্রকাশ করুণ তো।’ তখন একজন বললো, ‘আমার যদি প্রচুর ধন-সম্পদ থাকতো, তাহলে তা দিয়ে আমি এত পরিমাণ দাস মুক্ত করতাম।’ আর একজন বললো: ‘আমার দেহে যদি অদমনীয় শক্তি হতো তাহলে আমি যমযম কূপ থেকে বালতি দিয়ে পানি তুলে হাজীদেও পান করাতাম।’ এভাবে আরো অনেকে নিজ নিজ মনোবাসনা ব্যক্ত করলো। সবশেষে ‘ঊমার (রা) বললেন: ‘আমি যদি উমাইর ইবন সা’দের মত আরো যোগ্য লোক পেতাম তাহলে মুসলমানদের কাজে আমি তাদেও সাহায্য নিতাম।১৩

হিমসের ওয়ালী থাকাকালে একদিন তিনি মসজিদেও মিম্বওে দাঁড়িয়ে ভাষণ দানকালে বলেন: ‘আপনারা জেনে রাখুন, ইসলাম একটি সুরক্ষা প্রাচীর ও একটি সুদৃঢ় দ্বার বিশেষ। ইসলামের প্রাচীর হলো সত্য ও ন্যায়। প্রাচীর ফেটে গেলে এবং দ্বার ভেঙ্গে গেলে ইসলাম পরাভূত হবে। তবে শাসক যতদিন কঠোর থাকবে ইসলাম ততদিন রক্ষক থাকবে। শাসকের কঠোরতার অর্থ এই নয় যে, সে তরবারি দ্বারা হত্যাযজ্ঞ চালাবে। তার অর্থ হলো, সত্যেও সাথে ফায়সালা করবে এবং ন্যায়কে আকড়ে থাকবে।১৪’ আবদুর রহমান ও মাহমুদ নামে দুই ছেলে তিনি রেখে যান।

‘উমাইর (রা) ছিলে মর্যাদাবান ও যুহ্হাদ (পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি উদাসীন) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম।১৫ সাহাবীদের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অতি উঁচু স্তরের। মুফাদ্দাল আল-গাল্লাবী বলেনঃ আনসারদের মধ্যে সর্বাধিক যাহিদ (দুনিয়াবিরাগী) ব্যক্তি তিনজনঃ আবুদ দারদা, শাদ্দাদ ইবন আউস ও ‘উমাইর ইবন সা’দ।১৬ ইবন সীরীন বলেন: খলীফা ‘উমার (রা) তাঁর চারিত্রিক মাধূর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর উপাধি দেন ‘নাসীজু ওয়াহদিহ’-সৃষ্টি; ও স্বভাব বৈশিষ্ট্যে একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।১৭

‘উমাইরের ছেলে আবদুর রহমান বলেনঃ’ আবদুল্লাহ ইবন উমার আমাকে বলেছেন: সাহাবীদের মধ্যে তোমার পিতার চেয়ে ভালো মানুষ ছিল না।১৮ ইবন সুমাই হিমসে যে সকল সাহাবী গমন করেন তাঁদেও প্রথম তাবকা বা শ্রেণীতে উমাইরের নামটি উল্লেখ করেছেন।১৯

স্বভাব ও নৈতিক চরিত্রে ‘উমাইর (রা) ছিলেন আদর্শ মানের। তাকওয়া-পরহিযগারীতে তাঁর সমকক্ষ কাউকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তাঁর মধ্যে ছিল তীব্র ঈমানী আবেগ। শৈশব থেকেই তাঁর অন্তরে ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান ও ভালোবাসার ব্যাপাওে তাঁর মধ্যে কপটতর লেশমাত্র ছিল না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাবুক যুদ্ধেও সময়ের একটি ঘটনায়। এ সময় তাঁর পালক পিতা আল-জুলাস রাসূলুল্লাহর (সা) শানে একটি আপত্তিকর মন্তব্য করে। উমাইর সাথে সাথে বিষয়টি রাসূলুল্লাহর (সা) অবহিত করেন। অথচ আল-জুলাসের আশ্রয়েই তিনি লালিত-পালিত এবং তখনও তাঁরই আশ্রিত।২০ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি দৃঢ় ঈমান ও গভীর ভালোবাস ছিল তাঁর নিকট সব কিছুর উর্দ্ধে।

আল-জুলাসের সাথে ‘উমাইরের ঘটনাটি ইবন হিশামসহ বিভিন্ন গ্রন্থকার বর্ণনা করেছেন। তাবুক যুদ্ধে যারা যোগদান করেনি আল-জুলাস তাদেও একজন। এ সময় আল-জুলাস একদিন ‘উমাইরের উপস্থিতিতে মন্তব্য করেন: ‘এই বক্তি (মুহম্মাদ (সা) সত্যবাদী হলে আমরা হবো গাধার চেয়েও অধম।’ ‘উমাইর কথাটি শুনে বললেন: আল্লাহর কসম, আল-জুলাস! আপনি সকলের চেয়ে আমার বেশী প্রিয় ব্যক্তি। আপনার অনুগ্রহ আমার ওপর সবচেয়ে বেশী। আপনার ওপর কোন বিপদ-মুসীবত আপতিত হলে আমি কষ্ট পাই সবচেয়ে বেশী। আপনি একটি মন্তব্য করেছেন। আমি যদি বলি আপনারা গাধার চেয়েও অধম তাহলে আপনাকে লজ্জা দেওয়া হবে। আর যদি চুপ থাকি তাহলে তাতে আমার দ্বীন ধংশ হবে। দ্বিতীয়টি অপেক্ষা প্রথমটি আমার নিকট অধিকতর সহজ।

‘উমাইরের এ প্রতিবাদ আল-জুলাসকে দারুণ ক্ষুব্ধ করে। সাথে সাথে ‘উমাইরের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার অঙ্গিকার করেন। এদিকে ‘উমাইর সাথে সাথে বিষয়টি রাসূলকে (সা) অবহিত করলেন। রাসূল (সা) তাদেও দুইজনকে এক সাথে ডেকে ব্যাপারটি সম্পর্কে জুলাসকে জিজ্ঞেস করলেন। আল-জুলাস হলফ করে বললেন: ‘উমাইর আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। সে যেমন বলেছে, আমি তেমন কিছু বলিনি। এভাবে আল-জুলাস ঘটনাটি একেবারেই অস্বীকার করলেন। কিন্তু নবী রাসূললের নিকট কোন সত্য গোপন থাকে না। ওহী ও ইলহামের মাধ্যমে তাঁরা সব কিছু জেনে যান। আল-জুলাসের ক্ষেত্রেও তাই হলো। আল্লাহ পাক ওহী নাযিল কওে তাঁর নবীকে সব কিছু জানিয়ে দিলেন। রাসূল (সা) তখন সূরা আত-তাওবার ৭৪ নং আয়তটি পাঠ করলেন।

“তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরী বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী হয়েছে। আর তারা কামনা করেছিল এমন বস্তুর যা তারা পায়নি। আর এসব তাই পরিণতি ছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদেরকে সম্পদশালী কওে দিয়েছিলেন নিজের অনুগ্রহের মাধ্যমে।”

রাসূলে কারীম (সা) যখন আয়াতটির শেষাংশ-‘বস্তুত এরা যদি তাওবা কওে নেয়, তা হবে তাদের জন্য মঙ্গল। আর যদি তা না মানে, তাহলে তাদেরকে আজাব দেবেন আল্লাহ তা’য়ালা, বেদনাদায়ক আজাব দুনিয়া ও আখিরাত।’- পাঠ করেন তখন আল-জুলাস বলে উঠলেন, আমি তাওবা করছি। ইবন ইসহাক বলেনঃ এ ঘটনার পর আল-জুলাস সত্যিকারভাবে মুসলামন হন। তাঁর বাকী জীবনে আর কোন ত্র“টি-বিচ্যুতি দেখা যায়নি। তাওবা কবুল হওয়ার খুশীতে আল-জুলাস ‘উমাইরকে আবার নিজ তত্ত্বাবধানে ফিরিয়ে নেন। আজীবন তাঁকে প্রতিপালন করেন। আয়ত নাযিলের পর রাসূল (সা) ‘উমাইরের কান ধরে বলেন: ছেলে, তোমার এ কান ঠিক শুনেছিল। ‘উরওয়া বলেন: এ ঘটনার পর ‘উমাইরের মর্যাদা সবার উর্দ্ধে উঠে যায়।২১

‘উমাইর (রা) থেকে রাসূলল্লাহর (সা) একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যারা রাবী হলেন, ছেলে মাহমুদ, আবূ তালাহ আল-খাওলানী, আবু ইদরীস আল-খাওলানী, রাশেদ ইবন সা’দ, হাবীব ইবন ‘উবায়েদ, যুহাইর ইবন সালেম প্রমুখ।২২

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ