আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আসহাবে রাসূলের জীবনকথা

চতুর্থ খন্ড

ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

 

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

ভূমিকা

আল-হামদুলিল্লাহ। আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা’ (৪র্থ খন্ড) প্রকাশিত হচ্ছে। কয়েক বছর পূর্বে যখন আমরা এই বিশাল কাজে হাত দিয়েছিলাম তখন এতদূর এগুতে পারবো এমন আশা ছিল না। আমার মত  একজন অলস মানুষের জন্য কাজটি যে ভীষণ কঠিন তা আমি পরে উপলব্ধি করেছি। আল্লাহ পাকের সাহায্য এবং বন্ধু-বান্ধব ও পাঠকবর্গের উৎসাহে আমাকে এ কাজ এগিয়ে নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। আর বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক নাজির আহমাদ-এর পরামর্শ ও সহযোগিত না পেলে অনেক আগেই এ কাজ বন্ধ হয়ে যেত। এ কাজ যাঁরা যেভাবে সাহায্য করেছেন, আল্লাহ পাক তাঁদের সকলকে প্রতিদান দিন, এই কামনা করি।

চতুর্থ খন্ডে যে সকল মহান সাহাবীর জীবনের আলোচনা এসেছে তাঁরা সকলেই মদীনার আনসার সম্প্রদাযের। তথ্যসমূহ যথাসম্ভব নির্ভরেেযাগ্য সূত্রসমূহ থেকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি। সূত্রের নামও উল্লেখ করেছি। সাহাবায়ে কিরামের সম্মান  ও মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে শব্দ ব্যবহার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। তা সত্বেও কোথাও যদি কোন প্র্রকার তথ্য ও ভাষাগত অসংগতি  পাঠকবর্গের নিকট ধরা পড়ে তাহলে তা আমাকে জানালে সংশোধনের চেষ্টা করবো। বাংলার ঘরে ঘরে সাহাবায়ে কিরামের  বিশ্বাস ও কর্মের ছাপ পড়বে- এই আশা নিয়ে আমরা আমাদের কাজ করে যাব।আল্লাহ পাক আমার এই সমান্য শ্রম কবুল করুন আমীন।।

মুহাম্মদ আবদুল মা’বুদ

আরবী বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা-১০০০।

১ জানুয়ারী ১৯৯৮

১ রমাজান ১৪১৮

আনাস ইবন নাদার (রা)

নাম ‘আনাস’ পিতা ‘নাদর ইবন দাম দাম’ রাসূলল্লাহ (সা) খাদেম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের সম্মানিত চাচা।১ হযরত আনাস ইবনে মালিক বলতেনঃ‘ আমার চাচা আনাসের নামে আমার নাম রাখা হয়েছে।২ রাসূলুল্লাাহর (সা) সম্মানিত দাদা হযরত আবদুল মুত্তলিবের মা সালমা বিনতু ‘আমর ছিলেন এই আনাসের খান্দান বনু নাজ্জারের মেয়ে। সম্পর্কে তিনি আনাস ইবন নাদরের ফুফু। আনাস ইবন নাদর ছিলেন তাঁর খান্দানের রায়িস বা নেতা। মহিলা সাহাবী হযরত রুবাইয়্যা’ বিনতু নাদর ছিলেন তাঁর বোন। তাঁর মাও ছিলেন একজন সাহাবিয়্যা।৩ তাঁর জন্মসন সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

হযরত আনাম ইবন নাদর (রা) শেষ ‘আকাবায় ইসলাম গ্রহণ করেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বলেনঃ কোন অজ্ঞাত কারণে আমার চাচা আনাস ইবন নাদর বদর যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা) সদীনায় ফিরে এলে তিনি তাঁর সামনে হাজির হয়ে অনুতাপের সুরে বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! প্যেত্তলিক শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত আপনার প্রথম অভিযানে আমি অনুপস্থিত থেকে গেছি। আল্লাহর কসম, আগামীতে আল্লাহ যদি আমাকে তাদরে সাথে যুদ্ধ করার কোন সুযোগ দান করেন তাহলে আমি কি করি তা অবশ্যই আল্লাহ দেখবেন।

উহুদত যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী তৃতীয় সনে। এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে ময়দান ত্যাগ করেছিল  তখন তিনি আপন মনে বলে উঠলেনঃ ‘ হে আল্লাহ! এই মুসলসানরা যা করছে তার জন্য আমি আপনা র নিকট মাগফিরাত কামনা করছি।আর এই পৌত্তলিকরা যা করেছে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। এই বলে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। পথে সা’দ জান্নাত তো ঐখানে উহুদে। আল্লাহর কসম!আমি উহুদের দিকে থেকে জান্নাতের খোশবু পাচ্ছি। একথা বলতে বলতে বলেতে আনাস (রা) উহুদের ময়দানের দিকে ছুটে যান এবং অসীম সহসিকতার সথে যুদ্ধ করে শহাদাত বরণ  করেন। সা’দ বলেনঃ সেদিন তিনি যা করলেন, আমি তা করতে পারিনি। বালাজুরী বলেনঃ সুফাইয়ান ইবন উয়াইফ তাঁকে হত্যা করেন।৪

উহুদ যুদ্ধে হযরত আনাসের (রা) ভূমিকা বর্ণনা প্রসঙ্গে ইবন ইসাহক বলেনঃ উমার ইবনুল খাত্তাব ও তালহা ইবন ‘উবাউদুল্লাহ মুহাজির  আনসারদের সাথে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। আনাস সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন: আপনারা এভাবে বসে কেন? তারা বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) নিহত হয়েছেন।

আনাস বললেন: তিনি যদি মারাই গিয়ে থাকেন, আপনারা বেঁচে থেকে কী করবেন? উঠুন, রাসূলুল্লাহ (সা ) যে পথে জীবন ুিদয়েছেন আপনারাও সে পথে জীবন দিন। একথা বলে তিনি শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাপিয়ে পড়েন এবং শাহদাত বরণ করেন।৫

হযরত আনাস ইবন মলিক বলেছেন: তীর, বর্শা ও তরবারির আঘাতে আনাস ইবন নাদরের সারা দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। গুণে দেখা যায় তাঁর দেহে সত্তর মতান্তরে আশিটির অধিক আঘাত করা হয়েছে। কাফিরেরা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে তাঁর লাশ বিকৃত করে ফেলেছিল। তাঁর বোন রুবইয়্যা বিনতু নাদর ছাড়া আর কেউ  লাশ সনান্ত করতে পারেনি। তিনিও তা করতে সক্ষম হন তাঁর হাতের আঙ্গুল দেখে।৬ ইযরত আনাস ইবন নাদরের (রা) ঈমান যে  কত মজবুত ছিল তা তাঁর শাহাদাতের ঘটনা থেকে বুঝা যায়। উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনের যে সকল আয়াত নাযিল হযেছে তাতে তাঁর  মহান ব্যক্তিবর্গের প্রশংশা করা হয়েছে। আনাস ইবন মলিক (রা) বলেনঃ সূরা আল আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াতে’ মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদ পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে’ আমার চাচা আনাস উবন নাদরের শানে নাযিল হয়েছে।৭

সহীহ বুখারীতে আনাস ইবন মলিক থেকে বর্ণিত হয়েছে। রুবাইয়্যা বিনতু নাদর একবার এক আনসারী মহিলার মুখে চপেটাঘাত করে বসেন। তাতে তার  একটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। রুবাইয়্যার পক্ষে থেকে তাদের কাছে ক্ষমা চাওয় হয়; কিন্তু তারা ক্ষমা করতে অস্বীকার করে। তাদেরকে ুিদয়াত বা ক্ষতিপূরুন দানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তারা তাও প্রত্যাখ্যান করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এখন কিসাস বা বদলা অপরিহর্য। একথা শুনে আনাস ইবন নাদর বলে উঠলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! রুবাইয়্যার দাঁত ভাঙ্গা হবে? যিনি আপনাকে সত্যসহকারে পাঠিয়েছেন সেই সত্তার নামে শপথ! না না কক্ষণো দাঁত ভাঙ্গা হবে না।

এরপর ;আকাম্মিকভাবে বাদী পক্ষ দিয়াত গ্রহণে সম্মত হয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) মন্তব্য করেনঃ আল্লাহর এমন অনেক বান্দা আছে যারা তাঁর নামে কসম খেলেতিনি নিজেই তাদের কসম পূরণ করে দেন। তাদেরই একজন আনাস ইবন নাদর। সহীহ মুসলিমেও ঘটনাটি ভিন্ন সনদে ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে।৮

তথ্যসূত্র:

 

আল-বারা’ ইবন মালিক (রা)

আল-বারা’ইবন মলিক ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী ও রাসূলুল্লাহার (সা) স্নেহের খাদেম হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) বৈমাত্রের ভাই। একথা বলেছেন আবু হতেম। সা’দের মতে তিনি আনাসের সহোদর।তাঁদের উভায়ের মা প্রখ্যাত সাহাবিয়্যা হযরত উম্মু সুলাইম।১ ইবনুল আছীরের মতও তাই।২ তবে ইবন হাজার এমত সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, শুরাইক ইবন সামহার জীবনীতে দেখা যায়, তিনি আল-বারা ইবন মালিকের বৈমাত্রেয় ভাই। তাঁদের উভয়ের মা সামহা। পক্ষান্তরে আনাস ইবন মালিকের মা যে উম্মু সুলাইম. এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।৩ এছাড়া উম্মু সুলাইমের সন্তানদের যে পরিচয় বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় তার মোধ্য আল-বারা’র নামটি কোথাও নেই।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মদীনায় হিজরাতের পূর্বেই মদীনাবসীদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের হিড়িক পড়ে যায়। দলে দলে লোক মাক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবার অনেক মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) বিশেষ দূত হযরত মুস;য়াব ইবন উমাইরের (রা) দা’ওয়াতে মুসলামান হন। মদীনাবাসীদের ইসলাম গ্রহণের এধারা রাসূলুল্লাহার (সা) মদীনাায় আসার পরও অব্যাহত থাকে। হযরত বারা’ এর কোন এক সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।

একমাত্র বদর যুদ্ধ ছাড়া উহুদ, খন্দকসহ বাকী সকল অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।৪ হুদায়বিয়ার ‘বায়’য়াতে রিদওয়ানে ও তিনি শরীক ছিলেন।৫ প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফতকালে গোটা আরবে ভন্ড নবীদের উৎপাত শুরু হয়। এসময় ভন্ডনবী  মুসায়ালাম আল কাজ্জাবের সাথে ইয়ামাামর প্রান্তরে মুসলিম বাহিনির যে ভয়াবাহ যুদ্দ হয় তাতে আল বারা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ যুদ্ধে হযরত খালিদ ইবন ওয়ালিদ ছিলেন সেনাপতি। এক পর্যায়ে তিনি সেনাপতিকে লক্ষ করে বলেনঃ আপনি উঠে আদেশ করুন।’ তারপর নিজে ঘোড়ার ওপর সাওয়ার হয়ে আল্লাহর কিছু গুণগান পাঠ করে মুসুিলম বহিনিকে সম্বোধন করে বলেনঃ ওহে মদীনার অধিবাসীগণ! আজ তোমরা অন্তর থেকে মদীনার চিন্তা মুছে ফেলো। আজ তোমাদের অন্তরে শুধু আল্লাহ ও জ্ন্নাাতের স্মরণ বিদ্যমান থাকাই বাঞ্জণীয়।৬ তাঁর এমন হৃদয়গ্রাহী  ভাষণের পর গোটা বাহিনীর মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনার জোয়ার আসে। সৈন্যরা নিজ নিজ অশ্বে আরোহণ করে তাঁর সাথে সাথে এসে যোগ দেয়।

এ যুদ্ধে শত্র“পক্ষের এক নেতার সাথে হযরত বারা’র হাতাহতি যুদ্ধ হয়। লোকটি ছিল তাগড়া জোয়ান। বারা প্রথমে তার পা লক্ষ্য করে তরবারির এক আঘাত হনেন। আঘাতটি লক্ষ্যভেদী ছিলেন না। তবুও লোকটি ভয়ে গড়াগড়ি যেতে থাকে।এই সুযোগ হযরত বারা মুুর্হূত্যের মধ্যে নিজের তরবারি কোষবদ্ধ করে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তার তরবারিটি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে এমন একটি ঘা বসিয়ে দেন যে তার দেহটি দ্বিখন্ড হয়ে যায়।৭ তারপর বিদ্যুৎ গতিতে ধর্মত্যাগীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের বাগানের প্রাচীর পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যায়। বাগানের মধ্যে মুসায়লামা অবস্থান করছিল। মুসায়লামার অনুসারী সৈন্যর উদ্যান ঢুকে পড়ে এবং তার পাশে সমবেত হয়ে উদ্যানের ফটক বন্ধ করে দেয়। বারা ইবন মালিক তাদের পিছু ধাওয়া করে প্রাচীরের নিকট পৌঁছে রুদ্ধ  ফটকের সামনে থমকে দাঁড়ান। মুহুর্তের মধ্যে তিনি সিংহের মত গর্জে উঠেন এবং হুংকার ছেড়ে বলেনঃ ওহে জনমগুলী! আমি বারা ইবন মালিক। তোমারা আমার দিকে এসো, তোমরা আমার দিকে এসো মহযোদ্ধারা এগিয়ে এলে তিনি তাদের আরো বলেনঃ ওহে জনমগুলী! তোমারা আমাকে উদ্যানের অভ্যন্তারে তাদের মাঝে ছুড়ে মার। লোকেরা বললো: না, তা কেমন করে হয়। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! তোমরপা অবশ্যই আমাকে তাদের নিকট ছুড়ে মারবে। অতঃপর তাঁকে উচুঁ করে তুলে ধরা হয়। তিনি প্রাচীরের উপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন এবং মুহুর্তের মধ্যে অপেক্ষমান মুসলিম সৈন্যদের জন্য দরজা খুলে দেন। বিদ্যুৎবেেেগ মুসলিম সৈন্যরা একযোগে ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং প্রচন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়। উভয় পক্ষে প্রচুর হতাহত হয়।অভিশপ্ত মুসায়ালামা এখানে নিহত হয় এবং তার বাহিনী পরাজয়বরণ করে।৮ এই ইয়ামামার উদ্যান-ফাটকে বারা উবন মালিকের সাথে যাঁর যাঁর কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে যুদ্ধ করেন তাঁদের মধ্যে হযরত আব্বাদ ইবন বিশ্র শাহাদাহ বরণ করে।৯ আর এভানেই হযরত বারা একাই দশজন প্রতিপক্ষ সৈনিককে হত্যা করেন।১০ এই দুঃসহাসিক অভিযানে তাঁর সারা দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। তীর,বর্শা ও বল্লমের আশিটিরও বেশি আঘাত লাগে। বাহনের পিঠে উঠিয়ে তাঁকে শিবিরে আনা হয় এবং মাসাধিককাল চিকিৎসার পর আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন। হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ নিজ হাতে তাঁর ক্ষতে ব্যাঞ্জেজ লাগান এবং সম্পূর্ণ নিজের তত্ববাধানে তাঁর চিকিৎসা করেন।১১ হিজরী ১৭ সনে খলীফা হযরত উমার (রা) বসারত ওয়ালী হযরত মুগীরা ইবন শুবাকে (রা) অপসারণ করে সেখানে হযরত মূসা আল আশয়ারীকে (রা) নিয়োগ করেন। মদীনা থেকে যাত্রাকালে আবু মূসা যে ২৯ ব্যাক্তি কে সংগে করে নিরয়ে যান তাদের মধ্যে আল-বারা ইবন মালিক একজন।১২ হযরত আল-বারা ইবন মালিক ইরাকের হীরক যুদ্ধেও দারুণ সাহস ও রণকৌশলের পরিচয় দেন। নগরের একটি দুর্গ মুলিম বাহিনী আবরোধ করে রেখেছে। শুত্র“ বাহিনী ভিতর থেকে আগুনে পোড়ানোর প্রচন্ড গরম কাঁচাওয়ালা শিকল দুর্গ প্রাচীরের ওপর বিছিয়ে রেখেছে যাতে কোন মুসলিম সৈনিক প্রাচীরের কাছেই ঘেঁষতে সাহস না পায়। হযরত আনাস (রা) প্রাচীর টপকানোর জন্য সাহস করে অগ্রসর হলেন। দুর্গবাসীরা কৌশলে তাঁকে শিকলে জড়িযে ওপরের দিকে টেনে তুলতে থাকে। শিকল উপরে উঠছে, এমন সময় হযরত আল-বারা তা দেখে ফেলেন। ত্বরিৎ গতিতে তিনি ছুটে গিয়ে শিকল ধরে এমন হ্যাচকা টাান মারে যে তা ছিড়ে আনাস পড়ে যায় শিকল ধরে টানার কারণে তাঁর হাতের মাংষ উঠে গিয়ে হাঁড় বেরিয়ে যায়। তবে হযরত আনাস (রা) বেঁচে যান।১৩ হিজরী ১৭ থেকে ২০ সনে পারস্যের রামহুরমুয, তুসতার ও সোসা বিজিত হয়। পারস্য বাহিনী যখন রামহুরমুযে প্রতিরোধের উদ্দেশ্য আবার সম্মিলিত হয় তখন রণক্ষেত্র থেকে মুলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি সা’দ ইবন উবাদাকে লেখা হলো প্রচুর সৈন্য পাঠান এবং তাদের মধ্যে যেন সাহল ইবন আদী, আল-বারা’ ইবন মলিক, মাজা’যা  ইবন সাওর  প্রমুখ বাক্তিবর্গ থাকেন।১৪ পারস্যের তুসতার অভিযাসে তিনি হযরত আবু মূসা আল-আশয়ারীর (রা) বাহিনীর দক্ষিণভাগে অধিনায়ক ছিলেন।১৫ এই যুদ্ধে তিনি একাই একশো সৈন্য নিধন করেন।১৬ ‘তুসতারে’ যুদ্ধ চলছে। শত্র“ বাহিনী সুরক্ষিত দুর্গের অভ্যান্তরে অবস্থান নিয়েছে। এলোপাথাড়ি হামলা চালিয়ে তারা মুসলিম বাহিনীকে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করছে। ইবনুল আচীর বলেন, এ সময় তারা মুসলিম বাহিনীর ওপর ৮০টি হামলা চালায়।১৭ এমন অস্থায় একদিন হযরত আনাস (রা) তাঁর কাছে যেয়ে শোনেন,তিনি সুর করে একটি কবিতা অবৃত্তি করছেন আনাস (রা) বললেন:আল্লাহ আপনাকে এর চেয়ে উত্তম জিনিস আল কোরআন দান করেছেন। তাই সুর করে পাঠ করুন। আল-বারা বললেন সম্ভবতঃ আপনার আশঙ্কা হচ্ছে, না আমি কখন মারা যাই। আল্লাহর কাছে আমার কামনা,তিনি যেন এমনটি না করেন। মরলে আমি ময়দানেয় মরবো।১৮ হযারত রাসূলে কারীম (সা) একবার  তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেনঃ বিক্ষিপ্ত ও ধুলিমলিন কেশ বিশিষ্ট এমন অনেক ব্যক্তি, মানুষ হিসেবে যাদের কোন গুরুত্ব নেই; কিন্তু তাঁরা আল্লাহর নামে কসম খায়, আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। আল-বারা ইবন মালিক তাদের অন্যতম। ‘তুসতারে যখন মুসলিম বাহিনী শত্র“ বাহিনী দুর্গের পতন ঘটতে অক্ষম হয়ে পড়ে তখন তাঁদের হযরত রাসূলে কারীমের (সা) উপরোক্ত বাণী স্মরণ হয়। তাঁরা হযরত আল-বারা’র (রা) নিকট এসে আবদার করেন, আপনি আল্লাহর নামে একটু কসম খান। তিনি বললেন,‘হে আল্লাহ,আপনার নামে কসম খায়ে বলছি, আজ  আপনি মুসলমানদের একটু বিজয় দান করুন এবং আমকে রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন দান করে সম্মানিত করুন।১৯ এ সময় মুসলিম সৈন্যর দুর্গ অভ্যান্তরে প্রবেশের একটি সুড়ঙ্গ পথের সন্ধান পায়। হযরত আল-বারা হযরত মাজায’ কে (রা) সংগে নিয়ে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে ইযরত মাজায শত্র“দের নিক্ষিপ্ত একটি বড় পাথরের শাহাদাত বরণ করেন।২০ হযরত আল-বারা ও মুরযাবান আয’রা মুরযাবান আযার নামক এক পারসিক সৈনিকের সামনাসমনি পড়ে যান। সে হযরত আল-বারার (রা) পথ রোধ করে দাঁড়ায়। কিন্তু তিনি মুরযাবানকে হত্যা করে বীর বিক্রমে শত্রু বাহিনীর সকল প্রতিরোধ তছনছ করে দুর্গের দ্বার পর্যন্ত পৌছে যান। সেখানে খোদ হরমুযানের মুখোমুখি হন। দুই জনের মধ্যে তীব্র লড়াই হয়। অবশেষে হরমুযানের হাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেণ।হরমুযান তাকে হত্যা করে তাঁর অস্ত্র-শস্ত্র ও পোষাক-পরিচ্ছেদ হাতিয়ে নেয় এবং তা ্িত্রশ হাজারেরও বেশি মুদ্রায় বিক্র করে। তবে তাঁর এ সহসিকতায় রণক্ষেত্রে মুসরমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়।।ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে এটা হিজরী ২০ সনের ঘটনা। মতান্তারে হিজরী ১৯ অথবা ২৩ সনের ঘটনা।২১ আল্লামা যিরিক্লী বলেনঃ তিনি তুসতারে পূর্বে ফাটকে শাহাদাত বরণ করেন এবং সেখানেই তাঁরা কবর।২২ হযরত আল-বারা ইবন মালিক ছিলেন হযরত রাসূলে করীমের (সা) বিশিষ্ট সাহাবীদের অন্তর্গত। আনেক বছর যাবত তিনি রাসূলে পাকের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ নিঃসৃত অসংখ্য  হাদীস নিশ্চয় তিনি শুনে থাকবেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তাঁর বর্ণিত হাদীস তেমন দেখা যায় না সম্ভবতঃ জিহাদে ব্যস্ত থাকার কারণে এদিকে মনোযোগ দিতে পারেননি। আল-ইসতঅ’য়াব গ্রন্থকার লিখেছেনঃ আল-বারা ছিলেন মর্যাদাবার সাহাবীদের অন্তুর্গত।২৩ আল্লামা জাহাবী বলেছেন: তিনি ছিলেন মহান নেতাদের একজন। চরম সাহসী বীর, অশ্বরোহণ ও কঠিন বিপদের মুকাবিলায় ছিলেন একজন প্রবাদপুরুষ।২৪ এ কারণে হযরত উমার (রা) তাঁকে কখনো কোন বাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করেননি। অন্য সামরিক অফিসারদের একবার তিনি লেখেন: ‘বারা’ কে তোমরা কোন মুলিম বাহিনীর আমীর নিয়োগ করবে না। সে একজন মানুষ, সে একটি বারা বা বিপদ। সামনেই যাবে, পিছনে ফিরতে জানে না।অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে: ‘ সে একটি ধ্বংস। তবে বাহ্যত: তিনি দেখতে দুর্বল ছিলেন।২৫ ‘রিজালুন হাওলার রাসূল’ গ্রন্থকার খালিদ মুহাস্মদ বলেন: তাঁর ঐকান্তিক বাসানা ছিল শহীদ হয়ে মরার।আল্লাহ পাক তাঁর সে বাসনা পূরণ করেন। আল-মুসতাদরিক ইবন ইসহাক থেকে বর্ণনা করেছেন, আনাস ইবন মালিক বলতেন আল-বারা ইবন মালিক সুমধুর কন্ঠের অধিকারী ছিলেন। গান গাওয়ার সখও তাঁর ছিল হযরত আনাস বলতেন: বারা পুরুষদেরকে উট চরানোর গান গেয়ে শোনাতেন।২৬ একবার রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে এক সফরে তিনি একটি গান গচ্ছেন। রাসূল (সা) তা শুনে আল-বারা কে বলেন: মাহিলাদের কথা একটু মনে রেখ্ একথা শনে তিনি চুপ হয়ে যান।২৭

তথ্যসূত্র:

 

আল-বারা’ ইবনে মারুর (রাঃ)

নাম আল-বারা’ এবং ডাক নাম আবু বিশ্র। মদীনাদর বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু সালমা শাখার সন্তান। পিতা মা’রুর ইবন সাখার এবং মাতা আর রুবাব বিনতুন নু’মান। মা আউস গোত্রের নেতা হযরত সা’দ ইবন মুযাজের ফুফু।১ হযরত আল-বারা ইবন মারুর ছিলেন স্বীয় গোত্রের রয়িস বা নেতা। মদীনার বেশ কয়েকটি দুর্গ ও উদ্যান ছিল তাঁর মালিকানাধীন। তাঁর জন্ম সন সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না।২

হযরত আল-বারা ইবন মারুর যে আকার সর্বশেষ বইয়াতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। অনেকের মতে তিনি আকাবার প্রথম বাই‘য়াতে উপস্থিত ছিলেন এবং রাসূলূল্লাহর (সা) হাতে বাই‘য়াতে অংশ নিয়েছিলেন।৩ ইবনুল আসীরও বর্ণনাটি নকল করেছেন।৪ অনেকের মতে এই বর্ণনাটির কোন ভিত্তি নেই। একমত্র মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ব্যতিত আর কোন সীরাত বিশেষজ্ঞ এটি নকল করেননী।৫ হযরত আল-বরা’ ইবন মারুর যে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন তখন বাইতুল মাকদাস মুসলমাসদের কিবলা। মুসলমারা সে দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। একারণে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কা’বার দিকে মুখ করে নামায আদায় শুরু করলেন। ইমাম যুহুরী বলেছেন: আল-বারা ইবন মারুর প্রথম ব্যক্তি যিনি জীবিত ও মৃত উভয় আবস্থায় কা’বার দিকে মুখ করেছেন।৬ হযরত রাসূলে কারীম (সা) যখন বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতেন, সে সমযও তিনি কা’বামুখী হয়ে নামায আদায় করেছেন। রাসূল (সা) একথা জানতে পেরে তাঁকে বাইতুল মাকদাসের  দিকে মুখ করতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আমাকে তোমার কা’বামুখী করে দাও।৭ হযরত আল বারা ইবন মারুর আকাবার শেষ বাইয়াতের একজন সদস্য। এ বাইয়াতের অন্যততম সদস্য হযরত কা’ব ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন: হজ্বের মওসুমে, যে বার আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেছিলাম আমাদের কাওমের পৌত্তলিকদের সাথে আমারও মদীনসা থেকে বের হলাম। আমাদের সথে ছিলেন আমাদের বয়োঃজ্যেষ্ঠ নেতা আলÑবারা ইবন মারুর।যখন আমরা আল-বায়দা’র উপকণ্ঠে,তিনি আমাদের বললেন: এই তোমরা শোন! আমি একটি শিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। জানিনে তোমরা বামার সাথে একমত হবে কিনা। আমনা বললামঃ আবু বিশ্র! বলুন তে আপনার সিদ্ধান্ত কি? বললেনঃ আমি এই গৃহের (কা’বা) দিকে মুখ করে নামায আদায় করবো এবং তা কক্ষনো আমার টিছনে রাখবো না। আমরা বললামঃ আল্লাহর কসম! আপনি  এমনটি করবেন না। করণ, আমরা জানি, রাসূল (সা) কেবল শামের দিকেই মুখ করে নামায আদায় করেন। আমাদের এ অনুরোধের পরও তিনি বললেন: কসম আল্লাহর! আমি ঐদিকেই মুখ করে নামায আদার করবো! যখন নামাযের সময় হলো, তিনি কা’বা মুখী হয়ে দাঁড়ালাম শামের দিক মুখ করে! এভাবে আমরা মাক্কায় পৌচ্ছালাম।

মক্কায় পৌঁছে তিনি আমাকে বললেন: ভাতিজা!  আমাকে একটু রাসূলল্লাহর (সা) কাছে নিয়ে চলো।  আমি যা করেছি, সে বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চাই। কারণ, তোমাদের বিরোধিতা করে আমি অন্তরে একটু অস্বস্তি বোধ করছি। কা’ব বলেন: আমরা রাসূলের (সা) খোঁজ বেরিয়ে পড়লাম। আবতাহ উপত্যাকায় এক ব্যক্তির দেখা পেলাম। তাকে বললাম: আমাদেরকে একটু মুহাম্মদের সন্ধান দিতে পরেন? আল্লাহর কসম! মোটেয় না। সে প্রশ্ন করলোঃ তোমরা কি আব্বাসকে চেন? বললাম: হাঁ, তা চিনি। তিনি মাঝে মাঝে তিজারাতের উদ্দেশ্যে আমাদের ওখানে যান তো। সে বললো : মসজিদে ঢুকতেই তোমরা আব্বাসকে দেখতে পাবে। তাঁর সাথে যে লোকটি বসা,তিনিই মুহাম্মদ।

কা’ব বলেন: আমরা মসজিদে ঢুকে দেখতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) ও আব্বাস এক কোণে বসে আছেন। আমরা কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বসে পড়লাম। রাসূল (সা) ‘আব্বসকে লক্ষ্য করে বললেন: আবুল ফাদল! এ দুজনকে আপনি চেনেন। আব্বাস বললেন: হাঁ চিনি।ইনি আল-বারা ইবন মারুর তার গোত্রের নেতা।। আর ইনি কা’ব ইবন মালিক। রাসূল (সা) জিঞ্জেসা কররেন: সেই কবি কা’ব? আব্বাম বললেন হাঁ এবার আল-বারা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি মদীনা থেকে আসার পথে একটি সিদ্ধান্তে পৌছেচ্ছি। আমার ইচ্ছা, সে বিষয়ে আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বললেন: তা বিষয়টি একটু পরিস্কার করে বল। আল-বারা বললেন: আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছে,এই গৃহকে (কাবা) আর কক্ষনো পেছনে রাখবো না। এ দিকে মুখ করেই নামায আদায় করবো। রাসূল (সা) তাঁকে বললেন: তুমি ে য কিবরার ওপর ছিলে তার ওপর যদি একটিু ধৈর্য ধরে থাকতে। এরপর আল-বারা রাসূলের (সা) কিবলার দিকে ফিরে যান এবং আমাদের সাথে শামের দিকে মুখ করে নাময আদায় করের। তাঁর পরিবারের লোকেরা বলতো তিনি তাঁর কিবলার ওপরই মৃত্যুবরন করেছেন।

কা’ব বলেন: আমরা জানি তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) কিবলার দিকে প্রত্যার্তবন করেছিলেন এবং আমাদের সাথে শামের  ুদিকে মুখ করে নামাযও পড়েছিলেন। তারপর আমরা আইয়্যামে তাশরীকের মাঝামাঝি সমায়ে আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হওয়ার জন্য কথা দিলাম। আমাদের সাথে যে সকল মুষরিক (পৌত্তলিক) ছিল তাদের কাছে বিষয়টি গোপন রাখলাম। আমাদের সাথে জাবিরের বয়োবৃদ্ধ পিতা আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম ছিলেন। তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে তাঁর অল্পবয়স্ক ছেলে জাবির ইসলাম গ্রহন করেছিলেন এবং এই কাফিলায় ছিলেন।

কা’ব বলেনঃ আমরা সবাই মিলে আবদুল্লাহকে ঘিরে ধরে বললাম: জাবিরের আব্বা, আপনার জন্য আমদের দুঃখ হয়। আপনি যে বিশ্বাসের ওপর আছেন,তার ওপর যদি মারা যান তাহলে কালই এই আগুনের ইন্ধনে পরিনত হবেন। অথচ আল্লাহ একজন রাসূল পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর ওয়াহদানিয়্যাত ও ইবাদতের দিকে মানষকে আহবান জানাচ্ছেন। আপনার সম্পদ্রায়ের আনেক তাঁর প্রতি ঈমান এনে মুসলমান হয়েছে। আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতের জন্য আঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি। আমাদের একথার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বাই’য়াতে শরীক হন। অবশেষ মিনার সেই প্রতিশ্র“তি রাতটি এসে গেলে। মানুষ যখন গভীর ঘুমে অচেতেন, আমরা মরুভূমির কাতা পাখির ন্যায় শয্যা ছেড়ে উঠে পড়লাম এবং এক সময় আকাবায়ে সমবেত হলা। রাসূল (সা) চাচা আব্বাসকে সংগে নিয়ে আসলেন। মুহাম্মাদ ্পামাদের মধ্যে কেমন আছেন, তা তোমরা জান। তিনি স^ীয় সম্পদায়ের মধ্যে সম্মান ও নিরাপত্তার মধ্যে আছেন। আমরা তাঁকে রক্ষা করেছি। কিন্তু তিনি তোমাদের আহবানে সাড়া দিয়ে তোমাদের কাছেই যেতে চান। যদি তোমরা প্রতিশ্রুতি অঙ্গীকার পালন করতে পারবে বলে মনে কর তাহলে তাঁকে নিয়ে যাও। আর যদি অপমান ও লাঞ্জনার ভয় কর তাহলে তাকে নিজ কাওমে থাকতে দাও। তিনি তার নিজ সম্প্রদায়ের কাছে সম¥ান ও নিরাপত্তার মেধ্য আছেন।

আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! এবার আপনি কিছু বলুন। রাসূল (সা)বক্তব্য রাখলেন, আল্লাহর কাছে দুআ কররেন এবং কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করলেন। তারপর আমরা রাসুলুল্লাহকে (সা) বললাম: আপনার নিজের ও আপনার রবের জন্য আমাদের নিকট থেকে বা’য়াত গ্রহণ করুন। রাসূল (সা) বললেন: আমি আপনাদের নিকট থেকে এই কথার ওপর বাই’য়াতে গ্রহণ করছি যে,যা থেকে আপনারা আপনাদের সন্তানের ও নরীরে রক্ষা করে থাকেন তাথেকে আমাকেও রক্ষা করবেন।

জবাবে আল-বারা ইবন মারুর বললেন: হাঁ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, সেই সত্তার নামে শপথ, যা থেকে আমরা আমাদের জীবন ও নারীদের রক্ষা করি তা থেকে আপনাকেও রক্ষা করবো। অতপর আমরা রাসূলুল্লাাহর (সা) হাতে বাই’য়াত করলাম। আল-বারা ইবন মা’রুর আবেদন জানালেন:  ইয়া রাসূলুল্লাহর (সা) হতে বাই’য়্যত  করলাম। আল-বারা ইবন মারুর আবেদন জানালেন: ইয়া রাসূলুল্লাহর! আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে ুদিন আমরা বাইয়াত করি। রাসূল (সা) হতে বাড়িয়ে  দিলে তিনি হাতে হাত রাখেন এবং আমদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাই’য়াতকারী তিনি। তারপর অন্যরা একের পর এক বাই’য়াত করতে থকে।৮ ‘আকাবার শেষ বাই’য়াতে কে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে হাত রেখে বাই’য়াত করেন সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। বনু নাজ্জারের লোকেরা দাবী করেছেন, এ গৌরবের অধিকারী আস’য়াত ইবন যুরারা আর বনু আবদিল আশহালের লোকেরা দাবী করেছেন, আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান। তবে কা’ব ইবন মালিকের সূত্রে ইমাম যুহরী বলেছেন, এ অনন্য গৌরবের অধিকারী আল-বারা ইবন মারুর। এটি ছিল বনু  সালামার লোকদের বিশ্বাস।৯ ইবন ইসহাকও একতাও বলেছেন।১০ আল্লামা যিরক্লী বলেন: যে বার আনসাদের সত্তর জন ‘ আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর হতে বাইয়াত করেন। সেই বার সর্বপ্রথম আল-বারা ইবস মারুর আনসারদের পক্ষে থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কথা বলেন।১১  বাইয়াতের পর রাসূল (সা) তাঁকে ও জাবিরের পিতা আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবস হারামকে বনু সালামার নাকঅব ঘোষনণা করেন।১২  পূব্র্ইে উল্লেখ করা হয়েছে, এই শেষ আকাবায় প্রখ্যাত সাহাবী জাবির ইবন আবদিল্লাহর পিতা আবদুল্লাহ ইবন আমর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম সময় হযরত আল-বারা তাঁকে দুই প্রস্থ পরিচ্ছন কাপড় দেন এবং তিনি তাই পরে কালেমা পাঠ করেন।১৩ শেষ আকাবাব বাইয়াতে যে সকল নেতার সাথে তাঁদের ছেলেও অংশগ্রহণ করেছিল, আল-বারা তাদের একজন। তার ছেলে বিশর ইবন আল-বারাও সেদিব বাই‘য়াত করেছিলেন।১৪

নবুয়াতের দ্বাদশ বছরের জ্বিলহাজ্জ মাসে আকাবায়ে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই‘য়াত করেন। এর মাত্র দুই মাস পরে সফর মাসে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর সময় আসীয়াত করে যান, আমাকে কাবার দিকে মুখ করে কবরে রাখবে, আর আমার এক তৃতীয়াংশ সম্পদ রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য থাকবে। তিনি যেখানে ভালো মনে করেন সেখানে খরচ করবেন। ইবন ইসহাকের মতে এটা রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমনের  পূর্বের ঘটনা।১৫ ইবনুল আসীরের এই মত সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ তাঁর পূর্বে আরও দুই একজন মুসলানের মদীনায় মৃত্যুর কথা জানা যায়। তবে নকঅবদের মধ্যে সর্ব প্রথম তিনি ইনতিকাল করেন বলে আল্লামা  যিরিকলী  যে  মন্তব্য করেছেন তা সঠিক।১৬

হযরত রাসূলে কারীম (সা) হিজরাত করে মদীনায় আসলেন। সাহাবীদের সংগে নিয়ে তিনি আল-বারা কবরে যান এবং চার তাকবীরে সাথে তাঁর জনাযার নামায আদায় করেন। আর যে সম্পদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর অনুকূলে  অসীয়াত করে গিয়েছিলেন, তা তিনি গ্রহন করে পুনরায় আল-বারা ছেলেকে দান করেন।১৭

আবদুল্লাহ ইবনে আবী কাতাদাহ্ বলেছেনঃ মদীনায় আসার পার রাসূল (সা) সর্বপ্রথম আল-বারা ইবস মারুরের জানাযার নামায পড়ে। সংগীদের নিয়ে তিনি তাঁর কবরের কছে যান এবং কাতার বন্দী হযে তাঁর জন্য দু‘আ করেন:

(হে আল্লাহ, আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন, তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট হউন।)

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা) তার জন্য এই বলে দু‘আ করেনঃ১৮  হে আল্লাহ আপনি আল-বারা ইবন মা’রুরের প্রতি রহমত বর্ষন করুন। কিয়ামতের দিন আপনার ও তার মাঝে আড়াল না রাখুন এবং তাকে জান্নাতবসী করুন।)

হযরত আল-বারা মা-রুর (রা) সন্তানাদির তথ্য পাওয়া যায় না। সীরাতের গ্রন্থসমূহে শুধু এতটুকু পাওযা যায় যে বিশ্র নামে তার এক ছেলে ছিল এবং তিনি আকাবার শেষ বাইয়াতের শরীক হয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেছিলেন।১৯ হযরত আল-বারার মৃত্যার পর হযরত রাসূলে করীম (সা) তাকে বনু সালামর নেতা মনোনীত করেন। খাইবার যুদ্ধের সময় যয়নাব বিনতুল হারিস নাম্নী এক ইয়াহুদ মাহিলা ছাগলের গোশতের সাথে বিষ মিশিয়ে রাসূলুল্লাহকে (সা) খাওয়ায়। হযরত বিশরও সেই বিষ মিশ্রিত গোশত খেয়েছিলেন এবং তারই ক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন।২০

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে হযরত আল-বারা ইবন মারুর (রা) ইসলাম গ্রহণের পরই মক্কার কা‘বাকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং মরণকালেও সেই দিকে মুখ করে কবর দেওয়ার জন্য অসীয়াত করে যান। তখনও কিন্তু ইসলাম কা’বকে কিবলা বলে ঘোষনা দেয়নি। কেন তিনি এননটি করেন? তিনি কি বুঝেছিলেন ভবিষ্যতে কা’বাই হবে ইসলামের কিবলা? তাঁর কী সৌভাগ্য যে পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর পর  অনেক পরে তাঁরই গৃহে রাসূলুল্লাহর (সা) অবস্থানের সময় আল্লাহ পাক  ওহীর মাধ্যমে কা’বাকে কিবলা হিসেবে ঘোষনা করেন এবং রাসূল (সা) তারই গৃহে সর্বপ্রথম মক্কার দিকে মুখ করে নামায আদায় করেন।ঘটনাটি এই রকম: আল-বারা ইবন মারুরের স্ত্রী হযরত উম্মু বিশ্র (রা) আল-বারার বাড়ীতে হযরত রাসূলে করীমের (সা) জন্য একবার খাবার তৈরী করলেন। তিনি সেই খাবার খেয়ে সাহাবীদের নিয়ে জুহরের নামাযে দাঁড়িয়েছেন। দুই রাকায়াতে শেষ হতেই কা’বার দুকে মুখ করে নামায পড়ার নির্দেশ আসে। বাকী নামায তিনি কা’বার দিকে ফিরে আদায় করেন। এটা দ্বিতীয় হিজরীর শা’বান মতান্তারে রজব মাসের মাঝামাঝি মঙ্গলবারের ঘটনা।২১

আনসারী কবি আওন ইবন আইউব তাঁর একটি কাসীদায় আনাসরদের গৌরবসযয় কীর্তি কান্ড তুলে ধরেছেন। তারই একটি পংক্তিতে তিনি আল-বারা ইবন মারুর সর্বপ্রথম হিশাস পংক্তিটি তাঁর সীরাত গ্রন্থে সংকলন করেছেন।২২ সীরাত বিশেষজ্ঞগণ আল-বারা ইবন মারুর (রা) নিন্মের পাঁচটি বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন।২৩

সীরাত বিশেষজ্ঞগণ আল-বারা’ ইবন মা’রূরের (রা) নিুের পাঁচটি বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন:২৪

তথ্যসূত্র:

 

আল বারা ইবন ‘আযিব ’(রা)

মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের বনু হারেসা শাখার সন্তান আল-বারা’। আনসারী সাহাবী। কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু ‘উমার,মতাস্তারে আবু আমর বা আবুত তুফাইল।১ উবনুল আসীরের মতে আবু আমর সর্বধিক সঠিক।২ পিতা আযিব ইবনুল হারেস সাহাবী ছিলেন।৩ মাতা হাবীবা বিনতু আবী হাবীবা ইবনুল হুবাব, মতান্তাতরে উম্মুল খালিদ বিনতু সাবিত। মায়ের নাম যাই হোক না কেন তিনি বদরী সাহাবী আবু বুরদ্হা নিয়ার এর আপন বোন এবং প্রখ্যাত সাহাবী আবু সা’ঈদ আল খুদরঅর (রা) চাচতো বোন।৪  সাহীহাইন ও বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে  আল-বারা’র সম্মনিত পিতা আসির সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল-বারা বলেন: একবার আবু বকর (রা) আযিবের নিকট থেকে দশ দিরহাম দিয়ে একটি জিন কেনেন। তারপর তিনি আযিবকে বলেন আপনি আল-বারা কে একটু বলুন সে যেন জিনটি আমার বাড়ী পৌঁছে দিয়ে আসে। আযিব বললেন: না তা আমি বলছিনা যতক্ষণ না আপনি আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আপনার হিজরাতের সফরকাহিনী শুনাচ্ছেন। অগত্যা আবু বকর (রা) বলতে শুরু করলেন।৫  হযরত রাসূলে করীম (সা) যখন মদীনা হিজরাত করেন তখন আল-বারা নয় দশ বছরের কিশোর। মদীনায় তখন ইসলামের দা’ওয়াত জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মামা আকাবায় বাই’য়াত করেছেন এবং পিতাও তাওহীদ ও রিসালাতের স্বীকৃতি দিয়েছেন। এমনই দুইটি পরিবারে আল-বারা বেড়ে  ওঠেন। তাই যিরক্ল বলেছেন: তিনি ছোট্ট বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন।৬ সেই কৈশোরে তিনি ইসলামের হুকুম –আহকাম ও মাসালা-মাসায়িল শেখার জন্য আতœনিয়োগ করেন। মদীনায় তখন হযরত মুস’য়াব ইবন উমাইর ও ইবন উম্মে মাকতুমের (রা) মজলিস কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মূলত: তিনি শৈশবের শিক্ষা সেকানেই লাভ করেন। প্রথামে পবিত্র কুরআন পড়তে শুরু করেন। পরবর্তীকালে আল-বারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম মদীনায় আসেন মুস’য়াব ইবন উমাইর ও ইবন উম্মে মাকুতম। তাঁর দু’জন আমাদের কুরআন শেখাতেন। উমার ইবনুল খাত্তাব। তাদের পর আবু বকরকে সংগে নিয়ে আসেন রাসূলুল্লাহর (সা)। উৎফুল হতে আর কোন ব্যাপারে দেখিনি। তিনি যথন আসেন তখন আমি সাব্বিহ ইসমা বাব্বিকাল আ’লা’-এর মত মুফাসসাল সূরা মাত্র পড়েছি।৭ বদর যুদ্ধ যখন হয় তখন আল-বারা কৈশোর অতিক্রম করেননি। তাবে তাঁর ঈমানী আবেগ ছিল যেবৈনে ভরপুর। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে হাজির হলেন; কিন্তু যুদ্ধের বয়স না হওয়ায় তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। বদর যুদ্ধ সম্পর্কে হযরত আল-বারা’র একটি বর্ণনা আছে। তিনি বলেন: আমরা বলাবলি করতাম, বদর যুদ্ধ ছিল তিন শো দশজনের কিছু বেশী- তালুতের সাথে নদী অতিক্রম করেছিল তাদের সমসংখ্যক। আর তলুতের সাথে নদী অতিক্রম করেছিল কেবল ঈমানদাররা ব্যক্তিরাই। তিনি আরও বলেন: বদরে আমি ও ইবন উমার যুদ্ধের উপযোগী বয়স থেকে ছোট হয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহর (সা)  আামাদেরকে ফিরিয়ে দিলেন। বদরের দিন মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল ষাটের কিছু বেশি, আর আনসারদের সংখ্যা ছিল দুই শো চল্লিাশের কিছু বেশী।৮

হযরত আল-বারা সর্বপ্রথম কোন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা)  সাথে যোগ দেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা)  সাথে তার যুদ্ধের সংখ্যা মোট কত সে সম্পর্কে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। ইবনুলন আসীর ইবন আবদিল বার ইবন হিশাম, ওয়াকিদী ইবন সাদ, আল-ওসকারীর ত সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে তিনি সর্ব প্রথম খন্দক যুদ্ধে যোগদান করেন। ইবন হিশাম বলেনঃ রাসূল (সা) তাকে বদরে ফিরিয়ে দেন এবং খন্দকে অনুমতি দান করেন। তখন তাঁর বয়স পনোরো বছর।৯ ওয়াকীদী বলেনঃ ইবন উামার আল-বারা ইবন আযিব আবু সাঈদ আল-খুদরি ও যয়িদ ইবন আরকাম-এ চার জন সাদ মুহাম্মদ ইবন আযিবকে যুদ্ধে যোগ দেন। নাফে’র বর্ণনামতে এটাই সর্বাধিক সঠিক।১০ ইবন সা’দ মুহাম্মদ ইবন আযিবকে যুদ্ধে যাওয়ার আনুমতি দান করেন। তখন তার বয়স পনেরো বছর। এর পূর্বে তিনি অনুমতি দেননি।১১ উপরোক্ত মতপার্থক্যের কারণে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তিনি মোট কতটি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। যাঁরা তাঁর উহুদ শরীক হওয়ার কথা বলেছে, তাদের হিসাবে পনেরটি; আর যাঁরা উহুদ বাদ দিয়েছেন তাদের হিসেবে চৌদ্দটি।১২ আর এই যুদ্ধের সাথে যদি অন্য সফর যোগ করা হয় তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর মোট পনেরটি যুদ্দ করেছি। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহর (সা)  আঠোরটি সফরের সঙ্গী হয়েছি।১৩ খন্দক থেকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি যোগদান করেন। ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার বাই’য়াতে অংশ গ্রহন করেন। এ বছর রাসূল (সা) ১৪০০ সঙ্গী নিয়ে উমরার উদ্দেম্য মক্কায় যাচ্ছিলেন। এই কাফেলায় আল-বারা ও ছিলেন। পথিমধ্যে কুরাইশদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে রাসূল (সা) হুদাইবিয়া উপত্যকায় শিবির স্থাপন করেন।সঙ্গীরা বরলেন, এখানে তো পানি নেই। তবে সেখানে একটি মরা কূপ ছিল। রাসূল (সা) নিজের বান্ডিল থেকে একটি তঅর বের করে  একজনের হাত দিয়ে বললেন, যাও ঐ কূপের মদ্যে গেড়ে দিয়ে এসো। সে তীরটি হাতে নিয়ে কূপের মধ্যে নেমে গেঁড়ে দিয়ে আসতেই পানি উথলে উঠতে শুরু করলো।১৪ ইবন ইসহাক বলেছেন, আল-বারা দাবী করতেন তিনিই সেই ব্যক্তি যে হুদাইবিয়ার কূপে রাসূলের (সা) তীর গেড়ে ছিল।১৫ তবে ইবন হাজার আসকিলানী বলেন, প্রসিদ্ধ মাতে তীর গেড়ে ছিলেন নাজিয়াহ্ ইবন জুনদুব।১৬

এই হুদায়বিয়ার বাই’য়াত সম্পর্কে আযিবের একটি মন্তব্য বুখারী সহ সঅরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। আল-বারা বলতেন, লোকেরা মক্কা বিজয়কে আল-ফাত্হ বা মহা বিজয় বলে মনে করে। হাঁ, মক্কাকে বিজয় ও একটি বিজয়। তবে হুদাইবিয়ার দিনের বাই’য়াতে রিদওয়ানকে আমরা প্রকৃত বিজয় বলে মনে করি। সেই দিন আমরা রাসূলুল্লাহর (সা)  সাথে ১৪০০ লোক ছিলাম।১৭ তিনি হুনাইন যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন এবং খুব সাহসের সাথে শত্র“র মুকাবিলা করেছিলেন। বুখারী আবু ইসহাক থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বনু কায়েসের এক ব্যক্তিকে আল-বারা ইবন আযিবের নিকট প্রশ্ন করতে শুনেছেন। প্রশ্নটি এই রকম: আচ্ছা, হুনাইনের দিন আপনারা কি রাসূলুল্লাহর (সা)  ছেড়ে পালাননি। হাওয়াযিন গোত্র তীর চালনায় পারদর্শী। আমরা হামলা চালালে তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তভন আমরা গনীমাত সংগ্রহের জন্য ঝাপিয়ে পড়ি। বনু হাওয়াযিন আবার তীর দিয়ে আক্রমণ শুরু করে। আমি তখন রাসূলুল্লাহর (সা) তাঁর সাদা খচ্চরের ওপর বসে থাকতে এবং আবু সাফিয়াকে তার লাগাম ধরে রাখতে দেখেছি। খচ্চরের ওপর বনেস তিনি এই কথগুলি উচ্চারণ করছিলেন।

আমি নবী, একা মিথ্যা নয়। আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর। হে আল্লাহ, আপনার সাহায্য পাঠান।’

আল-বারা বলেন, যখন ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হলো তখন আমরা রাসূলুল্লাহকে (সা) ঘির আড়াল করে দাঁড়ালাম।১৮

তায়িফ যুদ্ধের এবং বিদায় হজ্জের পূর্বে হযরত রাসূলে কারীম (সা) ইয়ামানবাসীদের নিকট ইসলামের দা’ওয়াত পৌছানোর উদ্দেশ্যে একদল লোক সেখানে পাঠান। হযরত আল-বারা’ ইবন ’আযিবও সেই দলে ছিলেন। বায়হাকী বর্ণনা করেন, আল-বাা’ ইবন ’আযিব বলেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা) ইয়ামনবাসীদের নিকট ইসলামের দা’ওয়াত পৌছানোর উদ্দেশ্যে খালিদ ইবন ওয়ালীদকে সেখানে পাঠালেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ছয়মাস ধরে আমরা মানুষকে ইসলামের দা’ওয়াত দিলাম কিন্তু তেমন সাড়া পাওয়া গেল না। অত:পর রাসূল(সা) ইবন ’আলী ইবন আবী তালিবকে পাঠালেন এবং নির্দেশ দিলেন, খালিদের সাথে যারা আছে তাদের কেই ইচ্ছা করলে আলীর সাথে থেকে যেতে পারে। আল-বারা’ বলেন: আমি আলীর সাথে থেকে গেলাম। যখন আমরা হামাদান গোত্রে গেলাম, তারা আমাদের কাছে আসলো। যেয়ে আমাদের নিয়ে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে আমরা কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ালাম। আলী আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ইয়ামনবাসীদের প্রতি লেখা রাসূলুল্লাহর (সা) পত্রখানি পঠ করে শোনালেন। হামাদান গোত্রের লোকেররা ইসলাম গ্রহণ করলো। আলী তাদের ইসলাম গ্রহণের খবর জানিয়ে রাসুলকে (সা) পত্র লিখলেন। পত্র পাঠ করে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর মাথা উঠিয়ে দুইবার বললেন: ‘আস্সালামু’ আলা-হামাদান, ’আস্সালামু ’আলা-হামাদান।’১৯

খলীফা হযরত ’উমার ইবনুল খাত্তাবের খিলাফতকালে হিজরী ২০ সনে পারস্যের তুসতার বিজয়ে তিনি আবূ মুসা আল-আ’য়ারীর বাহিনীতে ছিলেন।২০ আবু আমর আশ-শায়বানী বলেন, আল-বারা’ ইবন ’আযিব হিজরী ২৪ সনে পারস্যের রায় জয় করেন।২১ ইমাম নাবাবী বলেন: আল-বারা’ ইবন আযিব ও তাঁর ভাই ’উবাইদ ইবন ’আযিব উট, সিফ্ফীন ও নাহ্রাওয়ানের-দ্ধগুলিতে আলীর পক্ষে যুদ্ধ করেন।২২

শেষ জীবনে তিনি কুফায় একটি বাড়ী তৈরী করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। এ সময় অন্ধ হযে যান।২৩

হিজরী ৭২ মতান্তরে ৭১ সনের হযরত মুসয়া’ব ইবন যুবাইর যখন কুফার আমীর তখন আল-বারা’ সেখানে ইনতিকাল করেন।২৪ ইতহাসে তাঁর এই সন্তানগুলির নাম পাওয়া যায়: আর-বারী’, ’উবাইদ, লুত, সুওয়াই ও ইযায়ীদ। তবে ইমাম নাবাবী বলেছেন: তিনি ইযায়ীদ ও সুওয়াইদ নামে দুই ছেলে রেখে যান।২৫ ইমাম নাবারীর এই মত সঠিকবলে মনে হয় না। কারণ ’তাহজীবুল কামাল ফী আসমায়র রিজাল’ গ্রন্থকার বলেছেন, তাঁর চার ছেলে- আল-রাবী, ’উবাইদ, লুত ও ইযায়ীদ তাঁদের পিতার নিকট থেকে হাদীস শুনেছে এবং বর্ণনাও করেছেন।২৬ ইযায়ী এক সময় আম্মানের আমীরও হয়েছিলেন।২৭ সুওয়াইদের জীবনীতে ইবন সা’দ লিখেছেন যে, সুওয়াইদ আম্মানের সর্বোত্তম আমীর হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিলেন।২৮ সম্ভবত” ইযায়ীদ ও সুওয়াইদ দুই জনই আম্মানের আমীর হয়েছিলেন।

হযরত আল-বারা’ ইবন ’আযিব সব সময় হাতে একটি সোনার আংটি পরতেন। লোকে বললো: সোনা তো পুরুষের জন্য হারাম। তিনি বললেন: শোন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) গনীমাতের মাল বন্টন করলেন। শুধু একটি আংটি থেকে গেল। তিনি এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর আমাকে ডেকে বললেন: ধর, এটা পরো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাকে পরাচ্ছেন। একণ তোমরাই বল, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাকে পরিয়েছেন, আমি তা কেমন করে খুলি?২৯

হযরত আল-বারা’ ইবন ’আযিব ছিলেন একজন অতি মর্যাদাবান সাহাবী। রাসূলুল্লাহ সা) হাদীসের প্রচার ও প্রসারে ছিলেন বিশেষ মনোযোগী। ঁতার সূত্রে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ৩০৫ টি। তারমধ্যে ২২টি মুত্তাফাক আলাইহি। ১৫টি বুখারী এবং ৬টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি বিশে সতর্কথা অবলম্বন করতেন। এ শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন। খোদ রাসূলে পাকের (সা) নিকট থেকে। এবার রাসূল (সা) তাঁকে একটি দু’আ শিখিয়ে দেন। তিনি আবার তা আল-বারা’র মুখ থেকে শুনতে চান। আল বারা’ ’বিাবিয়্যিকা’-এর স্থলে ‘বিরাসুলিকা’ পাঠ করেন। রাসূল (সা) শব্দটি তাঁকে শুধরে দেন।৩১ এর ফলাফল এই হয় যে, হাদীস বর্ণনার সময় তিনি যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতেন।

একবার তিনি স্বীয় বর্ণিত হাদীসের প্রকৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: যে সকল হাদীস আমি বর্ণনা করে থাকি তার সব আমি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে শুনিনি। আমরা উটের রাখালি ও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতাম। এ কারণে এসব রাসূলুল্লাহর (সা) মজলিসে হাজির থাকতে পারতাম না। আমার বর্ণিত হাদীসের অনেকগুলি অন্য সাহাবীদের নিকট থেকে শোনা।৩২

আল-বারা’ ইবন ’আযিব সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। যে সকল সাহাবীর নিকট থেকেি তনি হাদীস শুনে বর্ণনা করেছেন তাঁরা প্রত্যেকে আপন আপন স্তুরে নেতৃস্থানীয়। যেমন: বিলাল ইবন রাবাহ, সাবিত ইবন ওয়াদীয়া আল-আনসারী, হাস্সান সাবিত, আবু আইউব আল-আনসারী, আবু বকর ইবন আবী কুহাফা, ’আলী ইবন আবী তালিব ও ’উমার ইবনুল খাত্তাব।৩৩

যাঁরা তাঁর ছাত্র হওয়ার এবং তাঁর থেকে হাদীস বর্ণণার গৌরব লাভ করেন তাঁরা সকলে শ্রেষ্ঠ তাবে’ঈ। ‘তাহজীবুল কামাল’ গ্রন্থকার তাঁর এমন ৫০ জন তাবে’ঈ ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছেন। তারমধ্যে বিশেষ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা গেল: ইয়াদ ইবন লাকীত, সাবিত ইবন ’উবাইদ, হারাম ইবন সা’দ, তাঁর ছেলে আর-রাবী’ ইবনুল বারা, ’উবাদ ইবনুল বারা’, লুত ইবনুল বারা’, ইয়াযীদ ইবনুল বারা’, ইবনুল আবদির রহমান, সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, যায়িদ ইবন ওয়াহাব আল- জুহানী, সা’দ ইবন ’উবাইদা, আবু বুরদাহ্ ইবন আবী মুসা আল-আশ’য়ারী প্রমুখ।৩৪

তাঁর হাদীসের দারসে কো কোনসময় সাহাবীরাও হাজীর হয়েছেন। এমন কিছু সাহাবীর নাম সীরাতের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যা। তাঁরা আল-বারা’ সূত্রে হাদীসও বর্ণণা করেছেন। যেমন: ’আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-কথামী, আবু জুহাইফা ওয়াহাব ইবন ’আবদিল্লাহ প্রমুখ।৩৫ তাছাড়া অনেক সাহাবী হঠাৎ করে তাঁর দারসে হাজির হয়ে যেতেন। একদিন কা’ব ইবন হুজর (রা) আরো কয়েকজন সাহাবীর সাথেতার দারসে হাজির হয়েছেন।৩৬

তাঁর মজলিসে উপস্থিত ছাত্ররা নানা ধরনের প্রশ্ন কতো। কেউ প্রশ্ন করতো কুরআনের আয়াত সম্পর্কে, আবার কেই বা করতো ফিকাহর কোন মাসয়ালা বিষয়ে।

এক ব্যক্তি একবার সূরা আল-বাকারার ১৯৫নং আয়ত নিজের জীবনকে তোমরা ধ্বংসের সম্মুখীন করো না’- মস্পকের্ তাঁকে প্রশ্ন করলো। বললো: এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কি পৌত্তলিকদের ওপর আক্রমণ শামিল হবেনা? উত্তরে তিনি বললেন: তা কি করে হয়, কারণ, আল্লাহ তো রাসূলকে (সা) জিহাদের হুকুম দিয়ে বলেছেন” ‘আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করতে থাক, তুমি নিজের সত্তা ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে জিম্মাদার নও। তিুমি মুসলমানদেরকে উৎসাতি করতে থাক।’ (সূরা আন-নিসা: ৮৪) তিনি আরো বললেন: তুমি যে আয়াত পেশ করেছো তা হচ্ছে খরচের ব্যাপারে।’৩৬ অর্থাৎ এমন বিশ্বাস যেন না জন্মে যে, আল্লাহর পথে খরচ করলে ধ্বংস হয়ে যাবে। এমন বিশ্বাস হলে ধ্বংস।

অপর একটি বর্ণণায় এসেছে, লোকটি জানতে চেয়েছিল: উপরোক্ত আয়াত দ্বারা কি এ ব্যাক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে শত্র“র সাক্ষাৎ পেয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং মুতুবরণ করে? তিনি বললেন: না। বরং আয়াতের উদ্দেশ্য ঐ ব্যক্তি যে কোন পাপ করে। অত:পর বলে, আল্লাহ এ পাপ ক্ষমা করবেন না।৩৭

একবার আবদুর রহমান ইবন মুত’য়িমের এক বুন্ধ কিছু দিরহাম একটি নির্দিষ্ট সমরে জন্য বিক্রি করলেন। আবদুর রহমান তাঁর বন্ধুকে প্রশ্ন করলেন: এমন বিক্রী কি জায়েয? তিনি বললেন: হাঁ, জায়েয। আমি এর আগেও এভাবে বিক্রি করেছি, কেউ মন্দ বলেনি। আবদুর রহমান আল-বারা’ ইবন ’আযিবের নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। শুনে তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনীয় আসেন তখন আমরা এভাবে কেনা বেচা করতাম। তা দেখে তিনি বললেন: নগদা-নগদি হলে এমন বেচাকেনায় দোষ নেই। তবে বাকীহলে জায়েয হবে না। তারপর তিনি আবদুর রহমানাকে বললেন: তমি আরো নিশ্চিত হতে চাইলে যায়িদ ইবন আরকামের কাছে জিজ্ঞেস করতে পার। তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। আবদুর রহমান যায়িদ ইবন আরকামের কাছে যান। তিনি আল-বারা’র কথা সমর্থন করেন। ঘটনাটি বখারীতে বর্ণিত হয়েছে।

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে। আবুল মিনহাল বলেন: একবার আমি যাদি ইবন আকাম ও আল-বারা’ ইবন ইবন ’আযিবের কাছে ‘সারফ’ বা মুদ্রা বিনিমরে ব্যাপারে জিজ্ঞেস কলাম। আমি যখন তাঁদের একজনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম তখণ তিনি অন্য জনের কথা বলে বললেন: তাঁর কাছে জিজ্ঞেস কর। কারণ, তিনি আমার চেয়ে ভালো এভং আমার চেয়ে বেশি জানেন।৩৮

হযরত রাসূলের কারীমের প্রতি সীমাহীন মুহাব্বত, সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ এবং বিনয় ও ভীতি ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট। সুন্নাত অনুসরণেল ক্ষেত্রে অবস্থা এমন ছিল যে, তাঁর নামাযের প্রতিটি বিষয় রাসূলুল্লাহর (সা) অনুরূপ ছিল। একদিন তিনি পরিবারের লোকদের জড় করে বললেন: যেভাবে রাসূল (সা) ওজু করতেন এবং যেভাবেনামায পড়তেন, আজ আমি তোমাদের তা দেখাবো। কারণ, আল্লাহই জানেন, আমি আর কতদিন বাঁচবো। তিনি ওজু করে জুহর, ’আসন, মাগরিব ও ’ঈশার নামায সেইভাবে আদায় করেন। আর একদিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সিজদার অনুসরণ করে দেখান।৩৯ একবার আবু দাউদ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। আল-বারা’ প্রথমে সালাম করেন এবং তাঁর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে একচোট প্রাণখূলে হাসেন। পরে বলেন: জান, আমি এমনিট কেন করেছি? রাসূল (সা) একবার আমার সাথে এরূপ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, যখন দুইজন মুসলমান পরস্পর মিলিত হয় এভং নিজেদের কোন স্বার্থ প্রতিবন্ধক না হয় তখন তাদের পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।৪০

হাদীসে নামায্যের কাতারে ডান দিকে দাঁড়ানোর অনেক বেশি ফজীলাতের কথা এসেছে। এ কারণে তিনি ডান দিকে দাঁড়ানো পছন্দ করতেন।৪১

নিজের জান মাল থেকেও অনেক বেশী রাসূলকে (সা) ভালোবাসতেন। প্রতিটি কথা ও কাজে তার প্রমাণ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) চেহারা সুরাতের বর্ণণা যখন দিতেন তখন তাঁর প্রতি শব্দহতো প্রেম রসে সিক্তা। বলতেন: রাসূল (সা) ছিলেন জগতের সকল মানুষ থেকে সুন্দর। আমি লাল চাদর গায়ে জড়িয়ে দেখেছি, তা যতখানি রাসূল্লাহর (সা) গায়ে সুন্দর দেখাতো অন্যের গায়ে ততখানি নয়।৪২

একবার একজন প্রশ্নকরলো, রাসূলুল্লাহর (সা) মুবারাক চেহারার দীপ্তি কি তরবারির ঔজ্জল্যের মত ছিল? বললেন: না। চাঁদের মত ছিল।৪৩

তিনি রাসূলকে (সা) মেন গভীরভাবে ভালোবাসতেন তেমনি ভয়ও করতেন। তিনি বলেন: একবার আমি রাসূলের (সা) নিকট একটি বিষয় জিজ্ঞেস করতে চাইলাম; কিন্তু তাঁর প্রতি অত্যধিক ভীতির কারণে দুই বছর দেরী করলাম।৪৪

বিনয় ও নম্রতার তিনি ছিলেণ বাস্তব প্রতিচ্ছবি। অতি উঁচু মর্যাদার সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও অতি নগন্য মনে করতেন। একবার একি ব্যক্তি তাঁকে বললো, আপনার কত বড় খোশ কিসমত যে, আপনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্য্য লাভ এবং বাইয়াতে রিদওয়ানে শরীফ নেই, রাসূরুল্লাহর (সা) পরে আমরা কি কি করেছি।৪৫

তথ্যসূত্র:

 

হুবাব ইবনুল মুনজির (রা)

নাম হুবাব, ডাকনাম আবু ’উমার বা আবু ’আমর। পিতা মুনজির এবং মাতা শামূস বিনতু হাক্ক। মদীনার খাযরাজ গোত্রের সন্তান।১ আকাবার অন্যতম নাকীব এবং বিরে মা’উনার অনতম শহীদ আল-মুনজির ইবন ’আমর আস-সা’য়িদীর (রা) মামা।২ হানবীর মদীনায় হিজরাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বদর থেকেি নয়ে সকল ুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে খাযরাজ গোত্রর ঝান্ডা তাঁরই হাতে ছিল।৩ ইবন সা’দ বলেন: ‘তিনি যে বদর যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, এ ব্যাপারে প্রায় ইজমা হয়ে গেছে। তবে মুহাম্মদ ইবন ইসহাক তাঁকে বদরীদর মধ্যে গণ্য করেননি। আমাদের মতে এটা তাঁর ভুল। কারণ, বদরে হুবারের কর্মকান্ড অতি প্রসিদ্ধ।’৪

বদরের কাছাকাছি পৌঁছে রাসূল (সা) শিবির স্থাপনের জন্য অবতরণ করলেন। হুবাব আরজ করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখানে শিবির স্থাপনের সিদ্ধান্ত কি আল্লাহর পক্ষ থেকে, না আপনার নিজের? রাসূল(সা) বললেন: ্মার নিজের। হুবার বললেন: তাহলে এখানে নয়। আমাদেরকে শত্র“পক্ষের কাছাকাছি সর্বশেষ পানির কাছে নিয়ে চলুন। সেখানে আমরা একটি পারিন হাউজ তৈরী করবো, পাত্র দিয়ে উঠিয়ে সেই পানি পান করবো, আর শত্র“র সাথে যুদ্ধ করবো। এছাড়া অন্যসব ক’পের পানি আমরা ঘোলা করে ফেলবো। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হুবাব বললেন: আমরা হচ্ছি যোদ্ধা সম্প্রদায়। আমার মত হচ্ছে, একটিাত্র কূয়ো ছাড়া বাকি সবগুলি কূয়োর পানি ঘোলা করে ফেলা। যাতে কোন অবস্থানে আমাদের পানি কষ্ট না হয়। পক্ষান্তরে শত্র“রা পানির জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ে।

হুবারের পরামর্শ দানের পর জিবরীল (আ) এসে রাসূলকে (সা) জানান যে, হুবারের মতটিই সঠিক। অত:পর রাসূল (সা) হুবাবকে ডেকে বলেন, তোমার মতটিই সঠিক। একথা বলে তিনি গোটা বাহিনী সরিয়ে নিয়ে বদরের কূয়োর ধারে অবতরণ করেন।৫

এই বদর যুদ্ধে রাসূল (সা) তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন, এ কারণে তিনি ‘জু’আর-রায়’ বা সিদ্ধান্ত দানকারী হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। ইমাম সা’য়ালাবী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন:৬ ‘বদরে তিনি ছিলেন পরার্মদাতা। রাসূল (সা) পরামর্শ গ্রহণ করেন। জিবরীল (আ) এসে বলেন: ঞুবার যে মত পেশ করেছে তাই সঠিক। জাহিলী ’আমলেও তিনি অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত ও মতামত প্রদান করেছেন।’

মক্কায় যারা রাসূলুল্লাহকে (সা) সবচেয়ে বেশী উৎপীড়িত করেছিল নরাধম আবু কায়স ইবন আল-ফাকিহ তাদের অন্যতম। বদরে সে নিহত হয়। একটি বর্ণনা মতে হযরত হুবাবই তাকে হত্যা করেন।৭ এ যুদ্ধে তিনি হযরত বিলালের (রা) উৎপীড়ক উমাইয়্যা ইবন খালাফের একটি উরু তরবারির আঘাতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। তাছাড়া ’আম্মার ইবন ইযাসির ও তিনি একযোগে উমাইয়্যার ছেলে আলীকেও হত্যা করেন।৮ এ যুদ্ধে তিনি খালিদ ইবন আল-আ’লামকে বন্দী করেন।৯

উহুদ যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী এমন তোড়জোড় সহকারে মদীনার দিকি আসে যে, গোটা মদীনায় একটা শোরগোল পড়ে যায়। কুরাইশ বাহিনী মদীনার অনতিদূরে জুল হুলায়ফায় পৌঁছালে রাসূল (সা) দু’জন গুপ্তচর পাঠালেন এবং তাদের পিছনে হুবাবকেও পাঠালেন। তিনি শত্র“ বাহিনীর মধ্যে ঘুরে ঘুরে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন এবং শত্র“ বাহিনীর সংখ্যা সম্পর্কে একটি সঠিক ধারণা রাসূলুল্লাহকে (সা) দান করেন।১০ এ যুদ্ধেও খাযরাজ গোত্রের ঝান্ডা ছিল তাঁর হাতে। অনেকের ধারণা, ঝান্ডা বাহক তিনি নন, বরং সা’দ ইবন ’উবাদা।১১

এই উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানদের বিপর্যয় দেখা দেয় এবং মুসলিম বাহিনী হযরত রাসূলে কারীম (সা) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন যে ১৫ জন মুজাহিদ জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহকে (সা) ঘিরে রাখেন তাঁদের একজন ছিলেন এই হুবাব। এ যুদ্ধে তিনি মৃত্যুর জন্য বাই’য়াত করেছিলেন।১২

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনার ইহুদী গোত্র বনু কুরায়জা ও বনু নাদীরের বিষয়ে সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাইলে হুবার বলেন: আমরা তাদের বাড়ী ঘর ঘেরাও করে তাদের যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলবো। রাসূল (সা) তাঁর মতই গ্রহণ করেন।১৩

খাইবার যুদ্ধে খাযরাজ বাহিনীর একাংশের এবং হুনাইন যুদ্ধে গোটা খাযরাজ বাহিনীর ঝান্ডা বাহক ছিলেন তিনি।১৪ একটি বর্ণনা মতে তাবুক যুদ্ধের সময়ও রাসূল (সা) খাযরাজ বাহিনীর ঝান্ডা তাঁর হাতে তুলে দেন।১৫

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর মদীনার আউস ও খাযরাজ সহ গোটা আনসার সম্প্রদায়ের লোকেরা মসজিদে নববীর অনতিদূরে সাকীফা বনী সা’য়িদা নামক স্থানে সমবেত হয়ে পরবর্তী খলীফঅ নির্বাচনের ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা শুরু করে। আনসার নেতা সা’দ ইবন ’উবাদার একটি ভাষণের পর তাঁরা প্রায় তাঁকেই খলীফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। এদেিক আনসারদের এ সমাবেশের খবর আবু বকরের (সা) কানে গেল। তিনি ’উমারকে (রা) সাথে নিয়ে সেখানে ছুটে গেলেন। সেখানে খলীফা মুহাজির না আনসারদের মধ্য থেকে হবে, এনিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল বাক-বিতন্ডা হয়। এই বিতর্কে হযরত হুবাব ছিলেন হযরত আবু বকরের (রা) সাথে বিতর্কে লিপ্ত হন এবং দু’ পর্যায়ে দু’টি জ্বালামীয় ভাষণ দেন। হযরত আবু বকরের (রা) ভাষণ শেষ হলে হুবার উঠে দাঁড়ান এবং আনসারের সম্বোধন করে বলতে শুরু করেন:১৬

‘ওহে আনসার সম্প্রদায়! তোমাদের এ অধিকার তোমরা হাত ছাড়া করো না। জনগণ তোমাদেরই সাথে আছে। তোমাদের চরিত্রের ওপর আঘাত হানতে কেউ দু:সাহসী হবে না। তোমাদের মতামত ছাড়া কেউ কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সক্ষম হবে না। তোমরা হচ্ছো সম্মানী ধনবান, সংখ্যাগুরু, অভিজ্ঞ, সাহসী ও বুদ্ধিমান। তোমরা কি সিদ্ধান্ত নেবে তা দেখার জন্য মানুষ তাকিয়ে আছে। তোমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করোনা। বিভেদ সৃষ্টি করলে তোমাদের অধিকার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তোমাদের প্রতিপক্ষ মুহাজিররা তোমাদের দাবী যদি না-ই মানে তাহলে আমাদের মধ্যে থেকে একজন এবং তাদের মধ্য থেকে একজন মোট দু’জন আমীর হবেন।’

হযরত হুবারের (রা) এই দুই আমীরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হযরত ’উমার (রা) বলে ওঠেন: ‘দূর! এক শিং এর ওপর দু’জনের অবস্থান অসম্ভব।’ ’উমারের (রা) বক্তব্য শেষ হলে তিনি আবার বলতে শরু করেন: তোমরা নিজেদের আধিকার শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। এ ব্যাক্তির কথায় কান দিওনা। তাঁর কথা শুনলে তোমাদের ্এ ক্ষমতার অধিকার হাতছাড়া হয়ে যাবে। আমি আমার সম্প্রদায়ের আস্থাাভাজন ব্যক্তি এবং মানুষ আমার সিন্ধান্ত দ্বারা উপকৃত হয়। আল্লাহার কসম!  তোমরা চাইলে এ খিলাফতকে আমরা পাঁচ বছরের একটি উটের বাচ্চায় রুপান্তরিত করে ছাড়বো। তারপর তিনি মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ব্যাপারটি আপসাদের হাতে ছেড়ে দিতে আমরা কার্পণ্য করতাম না। যদি না আমাদের আশস্কা হাতো,যে সম্প্রদায়ের লোকদের পিতা ও ভ্রাতাদের আমরা হত্যা করেছি তারাই এটা হস্তগত করে নেই। তখন  তোমরা মরণই শ্রেয়ঃ অর্থ্যৎ ‘উমার (রা) আশ্বাস দিলেন এমনটি কক্ষনো হবেনা। আমাদের যাঁরা প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁদেরই একজনের হাত আমরা বাই‘য়াত করবো। যিনি তোমাদের ওপর কোনরকম অন্যায় অবিচার করবেন না’।

এত কিছু সত্ত্বেও তিনি উপস্থিত জনতাকে হযরত আবু বকরের (রা) হাতে বাই‘য়াত (আনুগত্যের শপথ) থেকে বিÍত রাখেতে পারলেন না। আনসারদের মধ্যে সর্ব প্রথম হযরত বাশীর ইবন সা‘দ (রা) আবু বকরের (রা) হাতে বাই‘য়াত করেন। তখন বাশীরকে লক্ষ্য করে হুবাব বলেন: তুমি নিজ সম্প্রদায়েরা বিরুদ্ধাচারণ করলে? তোমরা চাচাতো ভাইয়ের ইমারাত বা নেতৃত্বকে ঈর্ষা করলে? বাশীর জাবাব দিলেনঃ ‘তা নয়; বরং একটি সম্প্রদায়কে আল্লাহ যে অধিকার দিয়েছেন তা নিয়ে বিবাদ করা  আমি পছন্দ করিনি’।

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি ইনতিকাল কনে।১৭ তখন তাঁর বয়স হয়েছিল পঞ্চাস বছরের মত। বদর যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল তেত্রিশ বছর।১৮ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবুত তুফাইল ‘আমের ইবন ওয়াসিল তাঁর ছাত্র। তিনি হুবাবের সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন।১৯

কবিত্ব ছিল তৎকালীন আরবদের স্বাভাজাত গুণ। হযরত হুবাবের মদ্যেও এ গুণটি ছিল। তিনি কবিতা রচনা করেছেনর। ইতিহাসের কোন কোন গন্থে তাঁর নাম কিছু পংক্তি হয়েছে।২০  তাঁর কয়েকটি পংক্তির আনুবাদ নিম্নরুপ:

১.আল্লাহ তোমাদের দুজনের পিতামাতার ভলো করুন! তোমরা কি জাননা যে, মানুষ দু  রকমের অন্ধ ও চক্ষুস্মান?

২.আমরা এবং মুহাম্মদের দুশমনরা –সকলেই সিংহ- পুরুষ। যাদের হুংকার সারা বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

৩.তাবে পার্থক্য এই যে, আমরা তাঁকে সাহায্য করেছি এবং আশ্রয় দিয়েছি। আমরা ছাড়া তাঁর আর কোন সাহায্যকারী নেই।

তিনি একজন তুখোড় বক্তা ছিলেন। তাঁর ভাষা ছিল বিশুদ্ধ ও অলস্কারপূর্ণ। সাকীফা বনী সা‘য়িদায় তিনি যে দুটি ভাষণ দিয়েছিলেন তা পাঠ করলে তাঁর বাগ্নিতা ও আলস্কারিতা সস্পর্কে ধরনা ¯পষ্ট হয়ে ওঠে। আনসাররা যে ভিলাঠতের ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম, যে কথাটি তিনি একটি অলস্কার মন্ডিত বাক্যে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন: আল্লাহর কসম! তোমর যদি চাও তাহলে অবশ্যাই আমরা এ খিলাফতকে উপের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থ্যৎ ইচ্ছা করলে আমরা যুদ্ধকে শক্তিশালী করতে পারি। তেমনিভাবে তিনি আনসারদের মধ্যে স্বীয় মর্যাদা ও স্থান বর্ণনা করেন এভাবে: আমি আনসারদের চর্মরোগ্রস্থ উটের শরীর চুলকাবার খুঁটি এবং তাদরে দীর্ঘ ও ফলবান বৃক্ষের ঠেস দাসেনর খুঁঠি বা প্রাচীর।

আরবে চর্মরোগগ্রস্ত উটের জন্য একটি খুটি বা কাঠ গেঁড়ে দেওয়া হতো যাতে সে গা চলকাতে পারে এবং এর মধ্যে সে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। তেমনিভাবে যে খেজুর গাছটি লম্বা বা ফলবান হওয়ার কারণে  উপড়ে পড়ার আশস্ককা হতো,ততে ঠেস দিয়ে একটি খুঁটি পুতে দেওয়া হতো অথবা একটি প্রচীর খাড়া করে দেওয়া হতো হযরত হুবার নিজেরকে সেই খুঁটি ও প্রাচীরের সাথে তুলনা করেছেন।২১

তথ্যসুত্র:

 

কাতাদা ইবন নু’মান (রা)

নাম কাতাদা। ডাকনাম অনেকগুলি। যেমন: আবু ’উমার, আবু ’উসমান, আবু ’আমর ও আবু ’আবদিল্লাহ।১ মদীনার বিখ্যাত আউ গোত্রের বনু জাফার শাখার সন্তান।২ মা উনাইসা বিনতু কায়স নাজ্জার গোত্রের কন্যা এবং প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী ও (রা) তাঁর সন্তান। কাতাদা ও আবু সাঈদ আল-খুদরী বৈপত্রীয় ভাই।৩

তিনি সর্বশেষ ’আকাবার শপথে শরীক হন এবং ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াত করেন।৪ বদর সহ অন্য সকল যুদ্ধ ও অভিানে তিনি রাসুলুল্লাহর (সা) সাথে যোগ দেন।৫ উহুদ যুদ্ধে তিনি অকল্পনীয় ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দান করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন মুসলিম তীরন্দায বাহিনীর অন্যতম সদস্য। এ সময় রাসূল (সা) তাঁকে স্বীয় ‘আল-কাতুম’ নামক একটি ভাঙ্গা ধনুক দান করেছিলেন।৬

উহুদ যুদ্ধের এক সঙ্কটজনক পর্যায়ে হযরত রাসূলেকারীমকে (সা) মুশরিক তীরন্দাযরা তাদের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নিল। তাঁকেই লক্ষ্য করে তারা তীর ছুড়ছিলো। রাসুলুল্লাহর (সা) আশে পাশে তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুজাহিদ মাত্র। অন্যরা একদিক ওদিক বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। এ মুষ্টিমেয় মুজাহিদরা একজনের পর একজন নিজের বুক পেতে দিয়ে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তীর থেকে রাসূলকে (সা) আড়াল করে রাখছিলেন। এভাবেদশজন শহীদ হওয়ার পর হযরত কাতাদার পালা আসলো। তিনি ছিলেন একাদশ ব্যক্তি। তিনি রাসূলকে (সা) পিছনে রেখে শত্র“বাহিনীর দিকে বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেলেন। হঠাৎ শত্র“পক্ষের নিক্ষপ্তি একটি তীর ছুটে এসে তাঁর একটি চোখে আঘাত হানে। চোখটি কোটর থেকে ছিটকে গন্ডদেশে গড়িয়ে পড়ে। অন্য একটি বর্ণনা  মতে চোখটি একবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি তা হাতে ধরে রাখেন। লোকেরা ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিল। তিনি রাজী হলেন না। তিনি রাসুলুল্লহার (সা) নিকট আরজ করলেন: আমার এক স্ত্রী আছে। আমি তার প্রতি আসস্ত। তাকে আমি গভীরভাবে ভালোবাসী। আমার এ অবস্থায় সে আমাকে ঘৃণা করতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে আমি যা করেছি তা শুধু শাহাদাত লাভের জন্যই করেছি। রাসূল (সা) নিজ হাতে চোখটি আবর যথাস্থানে বসিয়ে দিয়ে দু’আ করেন: ‘হে আল্লাহ! কাতাদা তার মুখমন্ডল দ্বারা তোমার নবীকে (সা) রক্ষা করেছে। সুতরাং তুমি এখণ তার এ চোখটিকে অন্যটি অপেক্ষা সন্দুর ও তীক্ষè দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন করে দাও।’ রাসূলুল্লাহর (সা)  এ দুয়া কবুর হয়। এ চোখটি অন্যটি অপেক্ষা খবই সুন্দর হয় এবং দৃষ্টি শক্তিও তীক্ষè হয়।৭

পরবর্তীকালে তাঁর সন্তানদের কেউ একজন উমাইয়্যা খলীফঅ হযরত ’উমার ইবন ’আবদিল আযীযের দরবারে যান। তিনিতাঁর পরিচয় জানতে চাইলে একটি কবিতা নিজের পরিচয় দান করেন। এখঅনেতার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ দেয়া হলো:৮

‘আমি তো সেই ব্যক্তির সন্তান যার একটি চোখ তার গন্ডদেশে গড়িয়ে পড়েছিল। অত:পর নবী মু¯তফার হাত তাকে যথাস্থানে বসিয়ে দেয়।

তারপর তাপুর্বের মতহয়ে যায়। সেই চোখটির রূপ কী চমৎকার হয় এবং স্থাপনও হয় কত সুন্দর!

হযরত কাতাদার চোখটি কোন যুদ্ধ আহত হয় সে সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। বদর, ্হুদ ও খন্দক-এ তিনটি যুদ্ধের কথাই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মালিক, দারু কুতনী, বায়হাকী ও হাফেজ ইবন ’আবদিল বার উহুদ যুদ্ধের বর্ণণা সর্বাধিক সঠিক বলে মনে করছেন।৯

মক্কা বিজয় অভিযানে বনু জাফারের ঝান্ডা হযরত কাতাদার হাতেই ছিল।১০ হুনাইন যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে যাঁরা দৃঢ়পদ ছিলেন তিনি তাঁদের অন্যতম।১১

হীজরী ১১ সনে হযরত রাসূলে কারীম (সা) উসামা ইবন যায়িদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সিরিয়া সীমান্তের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মুহাজিরও আনসারদের প্রায় সকল উঁচু স্তরের সাহাবী এ বাহনীতে এ ছিলেন। হযরত কাতাদাও (রা)ছিলেণ এর একজন সদস্য।১২

তিনি হিজরী ২৩/খ্রীস্টাব্দ ৬৪৪, ৬৫ বছর বয়সে মদীনায় ইনতিকাল করেন। হযরত ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) তখন খিলাফতের মসনদে আসীন।১৩ খলীফা ’উমার (রা) জানাযার নামায পড়েন। ’উমার আবু সাঈদ আলী খুদরী ও মুহাম্মদ ইবন মাসলামা (রা)- এই তিনজন করবে নেমে তাঁকে সমাহিত করেন।১৪ ইমাম নাওয়াবী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা ও আল-হারেস ইবনু খুযায়মা এদুজন করবে নামেন।১৫

’উমার ও ’উবাইদ নামে তাঁর দুই ছেলের নাম জানা যায়। স্ত্রীর নাম জানা যায় না। তবে স্ত্রীর সাথে তাঁর গভীর প্রেম প্রীতির সম্পর্কের কথা জানা যায়।১৬ উহুদ যুদ্ধের পূর্বে তিনি বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত তাবে’ঈ মুহাদ্দিস হযরত ’আসিম ইবন ’উমার ইবন কাতাদার দাদা। ুহাম্মাদ ইবন ইসহাক তাঁর সূত্রে প্রচুর বর্ণণা নকল করেছেন।১৭ এই ’আসিম হি” ১২০ অথবা ১২৯ সনে ইনতিকাল করেন।১৮

তিনি ছিলেণ মর্যাদাবান সাহাবীদের একজন। শরীয়াতের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর নিকট জানতে চাইতেন। হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী ও আবু কাতাদার মত বিশিষ্ট সাহাবীরা যে তাঁর নিকট ফাতওয়া জিজ্ঞেস করতে তা হাদীসের গ্রস্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।১৯

হযরত কাতাদা ইবন নু’মানের (রা) বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা-৭ (সাত)্ তারমধ্যে ইমাম বুখারী এককভাবে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।২০

তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে আবু সাঈদ আল খুদরী, জহুজাইফা, মাহমুদ ইবন লাবীদ, ’উবাইদ ইবন হুনাইন, ’আয়াদা ইবন’ আবদিল্লাহ ও তাঁর ছেলে ’উমার ইবন কাতাদার মত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও আছেন।২১

তাঁর চরিত্রে যুহ্দ ও তাকওয়ার প্রাধান্য ছিল। একবার শুধু সূরা ইখলাস পাঠ করতে করতে রাত শেষ করে ফেলেন।২২

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় হযরত কাতাদার বংশের মধ্যে চুরির একটি ঘটনা ঘটে। চোরটি ছিল একজন মুনাফিক। সে চুরির দোষটা অন্যের ঘাড়ে চাপানোর পয়াতারা করে। হযরত কাতাদা তাকেই সন্দেহ করেছিলেন। তিনি তাঁর সন্দেহের কথা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট প্রকাশ করলে তিনি বেশ অনসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এদিকে যাকে সন্দেহ করা হয়েছিল সে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে নিতান্ত ভালো মানুষ সেজে কাতাদার এহেন সন্দেহের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ পাক সূরা আন-নিসার ১০৫ ১১৩ নং আয়াতগুলি নাযিল করে প্রকৃত ঘটনা রাসূলকে অবহিত করেন এবং একই সাথে কাতাদার সত্যবাদিতা ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।২৩

হযরত কাতাদার মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি মু’জিয়া প্রকাশের ঘটনা সীরাতের গ্রন্থসমূহে দেখা যায়। একদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ঘন অন্ধকার রাত। রাসূল (সা) ঈশার নামাযের জন্য আসলেন। কাতাদাও হাজির হলেন। বিদ্যুৎ চমকালে রাসুল (সা) কাতাদাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন: কাতাদা? তিনি জবাব দিলেন: আজ লোকের উপস্থিতি কম হবে-্ কেথা ভেবে আমি ইচ্ছে করেই হাজির হয়েছি। তখন রাসূল (সা) তাঁকে বললেন: ঘরে ফেলার সময় আমাদের কাছে এসো। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে দেকা করলেন। একটি খেজুরের শাখা তাঁর হাতে দিয়ে তিনি বললেন: ‘ধর। এটা হাতে থাকে তোমার সামনে দশজন এবং পিছনে দশজন আলোকিত করতে থাকেবে।  আর বাড়ী পৌঁছে ঘরের আশেপাশে কোথাও অন্ধকার দেকলে কোন কথা না বলেই এটা দ্বারা সেখানে আঘাত করবে। কারণ, সে শয়তান।’ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশমত খেজুর শাখাটি হাতের করে বাড়ী ফিরলেন। সত্যি সত্যিই বাড়ীর আঙ্গিনায় একটি শক্ত লোম বিশিষ্ট গোলাকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণী দেখতে পেলেন এবং সেই শাখাটি দিয়ে আঘাত করলে সেটা পালিয়ে যায়।২৪

তথ্যসূত্র:

 

খুযায়মা ইবন সাবিত (রা)

আবু ’আম্মারা খুযায়মা নাম এবং জু-আশ্ শাহাদাতাইন উপাধি। পিতা সাবিত ইবনুল ফাকিহ্ মদীনার আউস গোত্রের এবং মাতা কাবশা বিনতু আউস খাযরাজ গোত্রের সন্তান। আউস গোত্রের খাতম শাখার সন্তান হওয়ার কারণে তাঁকে খাতমী বলা হয়। তিনি একজন আনসারী সাহাবী।১ জাহিলী ও ইসলামী আমলে মদীনার আউস গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত নেতা এবং সাহসী বীর।২

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের পূর্বে কোন এক সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ’উমার ইবন ’আদী ইবন খারাশাকে সংগে নিয়ে নিজ গোত্রের মূর্তিগুলি ভেঙ্গে ফেলেন।৩ ইবন হিশাম বলেন: বনু খাতমার যাঁরা প্রথম পর্বে চুপে চুপে ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁরা হলেন ’উমার ইবন ’আদী, ’আবদুল্লাহ ইবন আউস ও খুযায়া ইবন সাবিত’।৪

ইবন সা’ দের মতে তিনি বদর যুদ্ধে যোগদান করেন এবং সিফফীনে মারা যান।৫ তবে গ্রহণ যোগ্য মতে তিনি  উহুদ ও তার পরবর্তী যুদ্ধ ও অভিযানগুলিতে অংশগ্রহণ করেন।৬ ইমাম জাহাবী সিফফীন যুদ্ধের আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে বলেন: যে সকল অবদরী সাহাবী সিফফীনে আলীর পক্ষে যোগ দেন তাঁদের মধ্যে খুযাইমা অন্যতম।৭ মক্কা বিজয় অভিযানে স্বীয় গোত্র বনু খাতমার ঝন্ডা ছি তাঁরই হাতে।৮ তিনি মূতা অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন: আমি মূতা অভিযানে অংশগ্রহণ করি এবং একদিন এক ব্যক্তির একটি শ্বেত-শুভ্ররতœ ছিনিয়ে নিই। যুদ্ধের পর আমি সেটি নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নকিট হাজির হই। তিনি সেটা আমাকে দান করেন এবং আমি তা খলিফা উমাারের (রা) সময়ে বিক্রী করে  খাতামা গোত্রের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগান ক্রয় করি।৯ উটের যুদ্ধে তিনি আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করলেও তরবারি কোষমুক্ত করেননি। সিফফিনে আলীর (রা) সাথে রণাঙ্গনে উপস্থিত হন এবং বলেনঃ আম্মার নিহত না  হওয়া পর্যন্ত এবং কারা তাঁকে হত্যা করে তা না দেখা পর্যন্ত আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবো না। কারণ আমি আল্লাহর রাসূলুল্লাহর (সা) বলতে শুনেছি: আম্মারকে একটি বিদ্রোহ গোষ্টী হত্যা করবে। অতঃপর মুয়আবিযার (রা) বহিনীর হাতে আম্মার   নিহত হলে তিনি মন্তব্য করেনঃ এখণ বিষয়টি ¯পষ্ট হয়েছে। এরপর সকল দ্বিধা-দ্ধন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে তরবারি কোষমুক্ত করে একটি কবিতার দুটি চরন গুন গুন করে আবৃত্তি করতে করতে ময়াদনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।১০ চরণ দুটির অর্থ নিম্নরুপ:

১. আমরা আল্লার হাতে বাইয়াত করেছি এবং যে ফিতনার ভয় করছি তার জন্য আবুল হাসানই যথেষ্ট।

২. আলীর মধ্যে শামবাসীদের সকল কল্যান বিদ্যমান: কিন্তুতাদের মধ্যে আলীর গুণাবলার কিছুমাত্র নেই।

এভাবে তিনি আলীর (রা) পক্ষে য্দ্ধু করে সিফফীনের ময়দানে শহদি হন। এটা হিজরী৩৭/খ্রীঃ ৬৭৫ সনের ঘটনা।১১  মৃত্যুকালে তিনি ‘আম্মার,উমার ও উমারা নামে তিনটি ছেলে-মেয়ে রেখে যান।

তিনি রাসূলুল¬াহর (সা) হাতে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ৩৮ (আচত্রিশ)১২ জাবির ইবন আবদিল্লাহ আম্মার উবন উসমান, ইবন হুনাইফ আমর ইবন মায়মূন আউদী, ইবরাহীম ইবন সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস, আবু আবদিল্লাহ জাদালী আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, আতো ইবন ইয়াসার প্রমুখের ন্যায় বিশিষ্ট সাহাবী ও তাবেঈ তাঁর সুত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ঈমানের দৃঢ়তা এবং রাসূলুল¬াহর (সা)  প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট। ঈমানী মজবতীর পরিচয় পাওয়া যায় একটি ঘটনা দ্বারা। একবার রাসূলুল¬াহর (সা)  এক আরব বেদুঈনের নিকট থেকে একটি ঘোড়া খরিদ করেন। লোকটির নাম সাওয়া ইবন কায়স আল-মুহাযিলী। এ ক্রয় বিক্রয়য়েরা সময় অন্য কেই উপস্থিত ছিল না। এ কারণে বিষয়টি কারো জানা ছিলনা। রাসূলুল¬াহর (সা) দর দাম ঠিক ও কথা পাকাপাকি করে লোজটিকে সংগে নিয়ে বাড়ীর দিকে চলতে থাকেন। পথিমধ্যে অন্য এক খরিদদার ঘোড়াটির মূল্য বেশি বলায় ঘোড়ার মালিক রাসূলুল¬াহর (সা) কে ডেকে বলে ঘোড়া যদি নিতে চান নিন, নইলে আমি এর কাছে বিক্রী করে দিই। কথাটি সে  এমন ভাবে বলে যেন রাসূলুল¬াহর (সা) সাথে তার বেচা কেনা হয়নি। রাসূলুল¬াহর (সা) বললেন, ঘোড়াটি তো আগেই আমার কাছে বিক্রী করে ফেলেছো। লোকটি বললো না, আমি বিক্রী করিনি। যদি আপনার কথা সত্য হয় তাহলে কোন সাক্ষী হাজির করুন। দু’জনের কথার মাঝাখানে মুসলিম জনাতা জড় হয়ে গেল। তারা বললো, রাসূল (সা) সত্য বলছেন। লোকটি অস্বীকার করে সাক্ষী হাজির করার দাবী জানাতে লাগলো। ইত্যবসরে হযরত খুযায়মা সেখানে উপস্থিত হলেন। সবকিছু শুনে তিনি বললেন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি রাসূলুল¬াহর (সা) এর নিকট ঘোড়টি বিক্রী করেছো।খুযায়মার এমন কথায় খোদ রাসূল (সা) বিস্মিত হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন: কিসের ভিত্তিতে তুমি এমন সাক্ষ্য দিলে? তুমি তো উপস্থিত ছিলেনা? খুযায়মা উত্তর দিলেন: ইয়া রাসূলুল¬াহর! আপনি যা নিয়ে এসেছেন আমি তা সবই সত্য বলে জেনেছি। আর একথাও জেনেছি, আপনি সত্য ছাড়া কিচুই বলেন না। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, খুযায়মা বলেনঃ আপনি আসমানে যে সব খবর দেন তাআমি বিশ্বাস করি। আর আপনি নিজে যা বলছেন তা আমি বিশ্বাস করবো না। সে দিনই হযরত রাসূলে করীম (সা) হযরত খুযায়মার একার সাক্ষ্যকে দু’জনের সামনে বলে ঘোষনা দেন এবং সে দিন থেকেই তাঁর লকব বা উপাধি হয় জূ আশ্- শাহাদাতাইন বা দু সাক্ষের অধিকার ব্যক্তি।১৩ আবু দাউদ ইমাম যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছে, রাসূল (সা) বলেছেন খুযায়মা একা কারো জন্য সাক্ষ্যই যত্থেষ্ট হবে।১৪

কোন কোন সীরাত গ্রন্থে দু’জন জূ আল্- শাহাদাতইন লকবধারী ব্যক্তিকে দেখা যায়। অন্য জন খুযায়মা ইবন সবিত ইবন শাম্মাস। দুজন কি একই ব্যক্তি না ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি তা বলা কঠিন। আল-ইসবা গ্রন্থের ২২৫১ ও ২২৫২ নং জীবনীতে দুটিতে তাঁদের বর্ণনা এসেছে।১৫ সহীহ বুখারীতে হযরত খুযায়ামর উপরোক্ত ঘটনাটি প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। হযরত যায়িদ ইবন সাবিত বর্ণনা করেন। আমরনা যখন মাসহাফ সংকলন করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত যা আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে শুনতাম, পেলাম না। তবে আয়াতটিশুধু খুযায়মা আনসারীর নিকটই ছিল। আর তার সাক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষ্যের সমান বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন।১৬ তাঁর সম্মান ও মর্যাদার আনেক কথা সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হযেছে। একবার তিনি স্বপ্নে দেখেন যে রাসূলে পাকের পবিত্র কপালে চুমু  দিচ্ছেন। স্বপ্নের কাথা রাসূলকে (সা) বলার পর তিনি বললেন: তুমি তোমার স্বপ্নকে বাস্তাবে রুপ দিতে পার। অতঃপর খুযায়াম উঠে এগিয়ে রাসলের (সা) পবিত্র কপালে চুমু দেন।১৭

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় তিনি স্বপ্ন দেখেন রাসূলক (সা) সিজাদ করছেন। একথা রাসূলের (সা) নিকট বরার পর রাসুর (সা) স্বীয় কপাল দ্বারা খুযায়মার কপাল স্পর্শ করেন।১৮ একবার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়েংর মধ্যে আভিজাত্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও কৌলিন্য নিওয় বাকয্দ্ধু হয়। তখন লোকেরা খুযামার নামটিও অতি গর্বের সাথে উল্লেখ করে বলে, আামাদের মধ্যে খুযায়ম আছেন যাঁর সাক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষ্যের সমান ঘোষণা দিয়েছেন।১৯

তথ্যসূত্র:

 

আবু দুজানা (রা)

আসল নাম সিমাক, ডাকনাম আবু দুজানা। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু সায়িদা শাখার সন্তান। খাযরাজ নেতা বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার (রা) চাচাতো ভাই। পিতার নাম খারাশা ইবন লাওজান, মতান্তরে আউস ইবন খারাশা এবং মাতার নাম হাযমা বিনতু হারমালা।১ আবু দুজানা একজন খ্যাতিমমান আনসারী সাহাবী এবং একজন সাহসী বীর। ইসলামের প্রচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিরাট আত্মত্যাগ স্বীকৃত।২

হিজরাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনায় এসে ’উতবা ইবন গাযওয়ানের (রা) সাথে তাঁর দ্বীনি ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।৩ ’আল্লামা ইবন হাজার (রহ) তাঁর বদরে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ঐক্যমতের কথা বর্ণণা করেছেন।৪ ইবন হিশামও তাঁর বদরে শরীক হওয়ার কথা বলেছেন।৫ বদরের যুদ্ধের দিন তাঁর মাথায় একটি লাল ফেটা বাঁধাা ছিল। মুসা ইবন মুহাম্মাদ বলেন: সেদিন জনতার মাঝে এ লাল ফেটার জন্যই তাঁকে স্পষ্টভাবে চেনা যাচ্ছিল।৬ মক্কায় যারা হযরত রাসূলে কারীমকে (সা) নির্মমভাবে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো, আবুল আসওয়াদ ইবনল মুত্তালিব ছিল তাদের অন্যতম। একটি বর্ণনামতে বদরে আবু দুজানা তার ছেলে আবু হাকীমা যাম’য়া ইবনুল আসওয়াদকে হত্যা করেন। তাছাড়া আবু মুসাফি’ আল-আশ’য়ারী ও মা’বাদ ইবন ওয়াহাবকেও হত্যা করেন।৭

আবু দুজানা উহুদ যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে ছিলেন। এবং চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তার সাথে অটল থাকেন। সেদিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে মৃতুর জন্য বাই’য়াত করেছিলেন। আনাস ইবন মালিক বলেন: যুদ্ধের পূর্বক্ষণে রাসূল (সা) একখানি তরবারি হাতে নিয়ে বললেন: এটি কে নিবে? উপস্থিত সকলেই হাতবাড়িয়ে দিলে বলে তখন সবাই চুপ থাকলো; কিন্তু আবু দুজানা বললেন: আমি পারবো এক হক আদায় করতে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু দুজানা রাসূলকে (সা) জিজ্ঞেস করলেন: এর হক কি?তিনি জবাব দিলেন: এ নিয়ে কোন মুসলমানকে হত্যা না করা, এটি নিয়ে কাফিরদের ভয়ে পালিয়ে না যাওয়া।৮

যুদ্ধের সময় মাথায় একটি লাল ফেটা বাঁধা ছিল তাঁর অভ্যাস। সেটা বাঁধলে বুঝা যেত তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহর (সা) হাত তেকে তরবারিখানি নিয়ে তিনি মাতায় ফেটা বাঁধলেন। তারপর একটা অভিজাত চলনে সৈনিকদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।৯ কিছুক্ষন পর কবিতার কিছু পংক্তি গুন গুন করে গাইতে গাইতে শত্র“বাহিনীর দিকে ধাবিত হলেন। দু’টি পংক্তির অর্থ নিম্নরূপ:১০

১.আমি সেই ব্যক্তি, যাকে আমার বন্দু পাহাড়ের পাদদেশে খেজুর বাগানের সন্নিকটে প্রতিশ্র“তি নিয়েছিলেন।

২.আমি যেন সৈনিকদের সারির শেষ প্রান্তে অবস্থান না করি। আর তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) তরবারি দ্বারা শত্র“ নিধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

উহুদের রণক্ষেত্রের দিকে তিনি অভিজাত ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়েছিলেন, তা দেখে রাসূল (সা) মন্তব্য করেছিলেন: যদিও এভাবে চলা আল্লাহর পসন্দ নয়, তবে এক্ষেত্রে কোন দোষ নেই।১১

হযরত যুবাইর ইবনুল ’আওয়াম বলেন, আবু দুজানার আগেই আমি তরবারিখানি চেয়েছিলাম। কিন্তু রাসূল (সা) আমাকে না দিয়ে দিলেন তাঁকে। অথচ আমি হলাম রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু সাফিয়্যা বিনতু আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। তাই তরবারিখানি তাঁকে দেওয়ার রহস্য জানার জন্য আমি তাকে অনুসরণ করলাম। তিনি রাসূল (সা) প্রদত্ত তরবারি হাতে নিয়ে অগ্রসর হলেন। যে দিকে এগুতে লাগলেন শত্র“দের মাঝে ত্রাস ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। একসময় তিনি পাহাড়রে ঢালে নেমে গেলেন, যেখানে কুরাইশ রমনীরা হিন্দার নেতৃত্বে রণসঙ্গিত গেয়ে তাদের সৈনিকদের উৎসাহিত করছিলো। তারা আবু দুজানাকে দেখে ভীত হয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করে দিল। কিন্তু কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো না। কিন্তু না, আবু দুজানা তারে কাউকে স্পর্শ করলেন না। ফিরে এলেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, হিন্দার মাথার ওপর তরবারি রেখে তিনি আবার তা উঠিয়ে নিলেমণ। যুবাইর তাঁর পিছনে ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। আবু দাজানা জবাব দিলেন: রাসূলুল্লাহর (সা) তরবারি দিয়ে অসহায় কোন নারীকে হত্যা করতে আমার ইচ্ছা হয়নি।১২

উহুদের বিপর্যয়ের সম যে মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূলকে (া) ঘিরে নিজেরে দেহকে ঢাল বানিয়ে অটল হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের মধ্যে আবু দুজানা অন্যতম।১৩ এদিন তিনি নিজের পিঠ পেতে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পিঠ রক্ষা করেছিলেন। তাই শত্র“র নিক্ষিপ্ত তীর বর্শার আঘাতেই তাঁর পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো।১৪

এ যুদ্ধেল এক পর্যায় পৌত্তলিক আবদুল্লাহ ইবন হুমাইদ, রাসূলকে (সা) হত্যার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। আবু দুজানা তাকে তরবারি দ্বারা প্রচন্ড আঘাত হেনে বলে ওঠেন: নে, আমি ইবন খারাশা। সেই আঘাতে নরাধম আদুল্লাহ ধরাশায়ী হয়। তখন হযরত রাসূল কারীম (সা) তাঁর জন্য ি বলে দু’আ করেন: হে আল্লাহ! তমি ইবন খারাশার প্রতি সন্তুষ্ট হও, আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট।১৫

রাসুল (সা) উহুদের যুদ্ধ শেষে রণক্ষেত্রে থেকে ফিরে এসে কন্যা ফাতিমাকে (রা) বললেন: লও, আমার তরবারিখানি ধুয়ে ফেল। আজ সে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে। হযরত আলীও (রা) ফাতিমার নিকট একই আবেদন করে বললেন: আজ আমি খুব লড়েছি। রাসূল (সা) তার জবাবে বললেন, হাঁ, তুমি যদি ভালো লড়ে থাক তাহলে সাহল ইবন হুনাইফ ও আবু  দুজানা-দু’জনই ভালো লড়েছে।১৬

আল্লাহপাক বনু নাদীরের যাবতীয় গণীমতের মালিকানা দান করেন রাসূলকে (সা)। তিনি সেই সম্পদ শুধুমাত্র প্রথম পর্বের মুহাজিরদের মধ্যে বণ্টন করেন। তবে সাহল ইবন হুনাইফ ও আবু দুজানা এ দুজন আনসারীকেও তাঁদের দারিদ্র্যের কারণে কিছু কিছু দান করেন। এ সময় আবু দুজানা কিছু ভূমি লাভ করেন যা বহু দিন পর্যন্ত ইবন খারাশার ভুমি নামে পরিচিত ছিল।১৭

একটি বর্ণনা মতে তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত রাসূলে কারীম (সা) খাযরাজ গোত্রের ঝান্ডাটি আবু দুজানার হাতে অর্পণ করেন।১৮

মোটকথা হযরত রাসুলেকারীমের (সা) জীবদদ্দশায় সংঘটিত সকল ুদধ ও অভিযানে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থকার লিখেছেন: রাসুলুল্লাহর (সা) সময়কালের সকল যুদ্ধে তার প্রশংসনীয় ভূমিকা ছিল।১৯

প্রথম খলীফঅ হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফতকালে সংঘটিত ইয়ামামার ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি চরম দু”সাহসের পরিচয় দেন। যুদ্ধটি ছিল ভন্ড নবী মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে। সে  তার একটি সুরক্ষিত উদ্যানের মধ্য থেকে মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করছিল। উদ্যানটি শক্তু প্রাচীর বেষ্টিত থাকার কারণে মুসলিম বাহিনী ভিতরে প্রবেশষের চেষ্ট করে ব্যর্থ হচ্ছিল। বিয়টি নিয়ে আবু দুজানা ভাবলেন। তারপর বললেন: ‘আমার মুসলমনা ভাইয়েরা! আমাকে ভিতরে ছুড়ে মার।’ এভঅবে তিনি প্রাচীর তো টপকালেন; কিন্তু পা ভেঙ্গে গেল। তা সত্ত্বেও প্রাচীরের ফটক থেকে শত্র“দের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেন এবং মুসলিম সৈন্যরা ভিতরে না ঢোকা পর্যন্ত নিজের স্থঅনে অটল থাকলেন। আবদুল্লাহ ইবন যায়িদ ও ওয়াহশীর সাথে তিনি ভন্ড মুসায়লামার হত্যায় অংশ গ্রহণ করেন। অবশেষে এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইবন সা’দের মতে এটা হিজরী ১২ সনের, আর আল্লামা যিরিকলীর মতে হি: ১১/খ্রী:৬৩২ সনের ঘটনা।২০

আবু দুজানার সূত্রে কোন হাদীস বর্ণিত না থাকলেও ‘ইবনুল আসীরের’ ভাষা” তিনি ছিলেন সম্মানিত সাহাবীদের একজন এবং তাঁদের মধ্যে উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি।’২১

প্রবল একটা ঈমানী আবেগ তাঁর মধ্যে ছিল। এর প্রমাণ তিনি দিয়েছেন ইামামার যুদ্ধে। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রমানতিনি দিয়েছেন উহুদ যুদ্ধে। এ যুদ্ধের এক মারাত্মক পযায়ে যখন মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে রাসূল (সা) থেকে দূরে ছিটকে পড়ে তখন যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সৈনিক তাঁর ধারে কাছে ছিলেন তাঁদের মধ্যে মুস’য়ার ইবন ’উমাইর ও আবু দুজানা ঢাল হিসেবে নিজেদের বুক পেতে দেন। মুসয়াব তো জীবনই দান করেন। আর আবু দুজানা নিজের দেহ ঝাঝরা করে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন।

তাঁর চলার ভঙ্গিটা ছিল এক বিশেষ ধরনের যা তখন রীতিমত একটা দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। ‘আল-মাশহারা’ নামে তাঁর একটি বর্ম ছিল। যদ্ধের সময় তিনি সেটা পরতেন। এ কারণে তাঁকে ‘জুল মাশহারা’ (আল মাশহারার অধিকারী) বলা হতো। তাঁকে ‘জু-আস্-সায়ফাইন’ও বলা হতো। কারণ উহুদে তিনি দু’টি তরবারি দিয়ে লড়েছিলেন। একটি নিজের এবং অপরটি রাসূলুল্লহার (সা) ‘জু-আস্-সায়ফাইন’ অর্থ দুই তরবারির অধিকারী।২২

আবু দুজানা একবার রোগশয্যায় শায়িত। এক ব্যক্তিতাঁকে দেখতে এলন। তিনি তাঁর চেহারায় নূরের ঝলক দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন: আপনার চেহেরা এমন উজ্জ্বল হওয়ার কারণ কি? তিনি বললেন: দু’টি অভ্যা ছাড়া আমার তেমন কোন ’আমল নেই। একটি হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় কোন কথা আম বলিনে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমার অন্তরটি সব সময় মুসলমানদের কল্যাণকামী।২৩ উপরোক্ত আলোচনা থেকে তাঁর কর্মময় জীবন চরিত্র ও গুণাবলী সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যায়।

তথ্যসূত্র:

 

কুলসূম ইবনুল হিদ্ম (রা)

ইসলামের ইতিহাসে হিজরাত অধ্যায় আলোচনা করতে গেলেই হযরত কুলসুম ইবনুল হিদমের (রা) পবিত্র নামটি বারবার এসে যায়। ইসলামের প্রচার প্রসারে তাঁর অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও যাঁরা অবদান রেখেছেন তাঁদেরকে তিনি যে আশ্রয় দিয়েছেন তাতেই স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর বিস্তারিত জীবন ইতিহাস পাওয়া যায় না।

তাঁর ডাকনামা আবু কায়স এভং আসল নাম কুলসূম। পিতা আলহিদম ইবন ইমরাউল কায়স। আউস গোত্রের বণী ’আমর ইবন ’আওফেরসন্তান। মদীনার কুবা পল্লীর অধিবাসী এবং রাসূলুল্লাহর (সা) একজন আনসার সাহাবী। হিজারাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর জীবনে বার্দ্ধক্য এসে গেছে। তাঁর ইসলাম গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরেই ঐতিহাসিক হিজরাত সংঘটিত হয়।১

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মকআ থেকে হিজরাত করে সর্বপ্রথম মদীনার উপকন্ঠে কুবা পল্লীতে ’আমর ইবন আওফ গোত্রে চারদিন অবস্থান করেন।২ সর্বাধিক সঠিক বর্ণণা মতে এ চারদিন হযরত রাসূলে কারীম (সা) ও তাঁর সফল সঙ্গীকে আতিথেয়তার দুর্লভ সৌভাগ্য যিনি অর্জণকরেন, তিনি এই কুলসূম ইবনুল হিদম (রা)। রাসূল (সা) ও আবু বকর (রা) কুবায় এসে তাঁর গৃহেই ওঠেন। এ ব্যাপারে ইবন ইসহাক, মুসসা ইবন ’উকবা ও আল-ওয়াকিদী ঐকম্যমত পোষন করেছেন।৩ ইবন ইসহাক বলেন: রাসূল (সা) কুবায় কুলসূমের গৃহে অবতরণ করেন। তবে কেউ কেই যে বলেছেন, কুলসূমের নয় বরং সা’দ ইবন খায়সামার গৃহে অবস্থান করেন, সে সম্পর্কে তিনি বলেন: রাসূল (সা) কুলসূমের গৃহে অবস্থান করতেন এবং সা’দের গৃহে লোকদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন। কারণ, সা’দ ছিলেন অবিবাহিত। তাঁর পরিবার পরিজন ছিলেন না। একারণে মক্কা থেকে আগত অবিবাহিত মুহাজিরগণ সা’দের গৃহেই আশ্রয় নিতেন। আর তাই ঐ গৃহটি অবিবাহিতদের আবাসস্থল বলে লোকেরা আখ্যায়িত করতো।৪ তাঁর গৃহে চারদিন অবস্থানের পর তিনি মদীনার মূল ভূখন্ডে আবু আইউব আল-আনসারীর (রা) গৃহে অবস্থান করেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) আগমনে তিনি এত খুশী হন যে বাড়ীর চাকর বাকরদেরকে চিৎকার করে হাঁক ডাক শুরু করেন। নাজীহ নামে তাঁর এক চারক ছিল। রাসূল (সা) তাঁর গৃহে উপস্থিত হলে তিনি নাজীহ, নাজীহ বলে ডাকাডাকি শুরু করেন। নাজীহ অর্থ সফলকাম। রাসূল (সা) এ নামকে শুভু লক্ষন বলে মনে করলেন। তিনি আবু বকরকে (রা) বললেন: ওহে আবু বকর। সফলকাম হয়েছ।৫

শুধুই কি হযরত রাসূলে াকরীম (সা) ও আবু বকর (রা) তাঁর গৃহে অতিথি হয়েছিলেন? না, তা নয়। আরো অনেকে মক্কা  থেকে এসে প্রথমে তাঁর ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আল-ওয়াকিদী বর্ণণা করেছেন, রাসূল (সা) কুবায় তাঁর গৃহে অবস্থান কালেই আলী (রা) ও সুহাইব (রা) মক্কা থেকে এসে সেখানেই রাসূলের (সা) সাথে মিলিত হন। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁদের যখন দেখা হয় যখন তার সামনে ছিল কুলসূম ইবনুল হিদমের উপস্থাপিত উম্মু জারজান নামক এক প্রকার উৎকৃষ্ট জাতের খেজুর। সুহাইব তখন ভীষণ ক্ষুধার্ত। তাছাড়া তাঁর চিল চোকের পীড়া। এ অবস্থায় তিনি সেই খেজুর ভীষণ আগ্রহের সাথে খেতে থাকেন। তাঁকে এভাবে থেতে দেখে রাসূল (সা) এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন: কুরাইশরা বন্দী করে আমার ওপর অত্যাচার করেছিল। তারপর আমার সকল ধন-সম্পদের বিনিময়ে আমার নিজের ও পরিবার পরিজনের জীবন ক্রয় করে খুব দ্রুত চলে এসেছি। রাসূল (সা) মন্তব্য করেন: তুমি লাভবান হয়েছো।৬

বালাজুরী কুলসূম ইবনুল হিদমের গৃহে আলীর (সা) অবস্থানকালের একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি সেখানে থাকাকালে লক্ষ্য করেন যে, প্রতিদিনই গভীর রাতে পাশের একটি বাড়র দরজা খোলা হয় এবং লোকজনের আনাগোনার শব্দ হয়। এতে তাঁর মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। একদিন তিনি পাশের বাড়ীর মহিলাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। মহিলাটি বলেন: জনাব, আমি একজন অনাথ বিধবা। সাইল ইবন হুনাইফ প্রতিদিন রাতে গোপনে মদীনার কাঠের তৈরী বিগ্রহগুলি ভেঙ্গে তার কাঠগুলি জ্বালানীর জন্য আমাকে দিয়ে যায়।৭ এর দ্বারা বুঝা যায় কুলসূমের বাড়ীতে তাঁর অবস্থান বেশ দীর্ঘ হয়।

তাছড়া আবু মা’বাদ আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা)৮ যায়িদ ইবন হারিসা (রা)৯ আবু াসদা কান্নায় ইবন হিসন (রা)১০ ও আবু কাবশা (রা)১১ মক্কা থেকে এসে সর্বপ্রথম তাঁরই আশ্রয়ে থাকেন। আল-হায়সাম ইবন ’আদীর মতে আবু ’উবাইদাহ ইবনুল জাররাহও (রা) প্রথমে তাঁর বাড়ীতে ওঠেন।১২ এভাবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে আরো অনেক মুহাজিরের নাম পাওয়া যাবে যাঁদেরকে তিনি সেই চরম দু:সময়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীম (সা)মদীনায় এসে হযরত হামযা ইবন ’আবদিল মুত্তালিবের (রা) সাথে কুলসূমের মুওয়াখাতা বা দ্বীনী ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকরে দেন।১৩

মদীনায় মসজিদে নাবাবী ও রাসূলুল্লাহর (সা) সহধর্মীনীরে আবাস্থলে নির্মানের কাজ যখন চললেচ তখনই তাঁর পরপারের ডাক এসে যায়। তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পরেই হ বদর যুদ্ধ। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কোন যুদ্ধ বা অভিযানে অংশ গ্রহনের সুযোগ তিনি পাননি।১৪ রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আসার পর এটাই ছিল কোন আনসারী সাহাবীর মৃত্যু। এর কিছুদনি পরেই ইসলামের একজন শ্রেষ্ঠ মুবাল্লিগ হযরত আবু উমামা (রা) ইনতিকাল করেন। তাছাড়া অন্য একজন আনসারী সাহাী হযরত আস’যাদ ইবন যুরারা তার কিছুদিন পর মারা যান।১৫ তাবারী ও ইবন কুতায়বা উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদেরমধ্যে মদীনায় সর্বপ্রথম কুলসূম ইবনুল হিদমই মারা যান। তারপর মারা যান আস’য়াদ ইবন যুরারা (রা)।১৬

তথ্যসূত্র:

 

শাদ্দাদ ইবন আউস (রা)

নাম শাদ্দাদ, কুণিয়াত বা ডাকনাম আবু ইয়া’লা আবু ’আবদির রহমান। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সন্তান। এ গোত্রের বিখ্যাত কবি ’শায়িরুর রাসূল’  ও ’শায়িরুল মানজিরা নামে খ্যাত হযরত হাসসান ইবন সাবিতের (রা) ভাতিজা। কবি হাসসান ছিলেন শাদ্দাদের পিতা আউস ইবন সাবিতের ভাই।১ মাতা সুরাইমা বনু নাজ্জারের আদী উপগোত্রের কন্যা।২

শাদ্দাদের সম্মিিনত পিতা হযরত আউস ইবন সবিত (রা) আকাবার শেষ বাইয়াত  (শপথ) এবং বদর যুদ্ধে শরীক হওয়ার গৌরব অর্জন করে। তিনি উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।৩

হযরত শাদ্দাদ ছিলেন একজন সাহাবী এবং একজন আমীর। খলীফা হযরত উমার (রা) তাকে হিমসের আমীর নিয়োগ করেন। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রা) শাহাদাত বরণ করলে তিনি সকল দায়িত্ব  থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইবাদাতে আতœনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন একজন বিশুদ্ধ ভাষী, ধৈর্যশীল ও বিজ্ঞ ব্যক্তি।৪ মদীনায় ইসলাম প্রচারের প্রথম পর্বেই তাঁর  চাচা সহ গোত্রের প্রায়ং সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিও তাঁদের সাথে ঈমান আনেন।৫ যেহেতি যুদ্ধে যাওয়ার বয়স তভনও শাদ্দাদের হয়নি, একারলে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সাথে কোন যুদ্ধে যাননি বলে জানা যায়। ইমাম বুখারীর মতে তিনি বদরে শরীক ছিলেন। আর এটা সঠিক নয় বলে আল্লামা ইবন আসকির ও আরো অনেক মন্তব্য করেছেন।৬

হিজরী ৫৮,খ্রীঃ ৬৭৭ সনে ৭৫ বছর বয়সে তিরি ফিলিস্তীনে ইন্তিকাল করেন এবং তাকে বাইতুল মাকদাসের দাফন করা হয়।৭ তাবে হিজরী ৪১, ৫৪, ও  ৬৪ সনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলেও ভিন্ন ভিন্ন মত আছে।৮

হাফেজ ও হাকেম বর্ণনা করেছের, হযরত শাদ্দাদ চার ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান। ছেরেরা হলেন : ইয়া’লা, মুহাম্মদ, আবদুল ওয়াহ্হাব ও আল মুনজির। ইয়া’লা নিঃসন্ত—ান অবস্থায় মারা যান। অন্যদের বংশধারার সন্ধান পাওয়া যায়। মেয়েটি আয্দ গোত্রে বিয়ে করেন এবং হিজরী ১৩০পর্যন্ত তার বংশধারার সন্ধান পাওয়া যায়। এ বছর আবু মুসলিম খুরাসীনর উথ্ন ও উমাইয়্যা রাজবংশের পতন হয়। আর এ বছরেই শাস ও বাইতুল মাকদাসে দারূণ এক ভূমিকম্প হয়। এ ঘটনায় এখানে বসাবাসরত আনসারদের বহু বংশদর নিহত হয়। শাদ্দাদের সন্তানরা বড়ী ধসে মারা যান। তবে তার ছেলে মুহাম্মাদ কোন রকম বেচে যান।তিনি পঙ্গু অবস্থায় খলীফা আল-মাহদীর সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) এক জোড়া হযরত শাদ্দাদের হিফাজতে ছিল। তার একখানা তাঁর কন্যার মাদ্যমে তাঁর সন্তানদরে হাতে চলে যায়। খলীফা আল-মাহদী যখন বাইতুল মাকদাস সফর করেন তখন জুতোখানি তাদের নিকট থেকে এক হাজার দীনার ও বিপুল উপঢৌকনের বিনিময়ে হাতিয়া নেন। অবশিষ্ট জুতোখানি সম্পর্কে জানাতে পারেন যে, মুহাম্মাদ ইবন শাদ্দাদের হিফাজতে আছে। আল-মাহাদা তিনি উপস্থিত হলে তিনি জুতোখানি দাবী করেন। তিনি অনেক অনুনয় ও বিনয় সহকারে বলেন যে, রাসূল (সা) যে সাম্মান এ জুতোর মাধ্যমে তার সঙ্গীকে দান করে গেছেন, আপনি তার বংশধরদের নিজকট থেকে তা ছিনিয়ে নিবেন না। আল-মাহদী রাজঅ হন এবং জুতো খনি তাদের কাছেই রাখার অনুমতি দান করেন।৯

হযরত শাদ্দাদ ছিলেন বিজ্ঞ সাহাবীদের অন্যতম। হযরত উবাদা ইবনুস সামিত (রা) ছিলেন উম্মাতের একজন স্তম্ভরুপ এবং সাহাবা সমাজে জ্ঞানের একটি কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলতেন, মানুষ হয় দুই ধরনের। কিছু হয় জ্ঞানী, তবে তারা খুব বদমেজাজী। আর কিছু হয় ধৈর্যশীল। কিন্তু  তারা মূর্খ ও অজ্ঞ। শাদ্দাদের মদ্যে জ্ঞান ও ধৈর্যের সমন্বয় ঘটেছিল।১০ হযরত আবুদদারাত (রা) বলতেন: কিছু মানুষণকে তো ইলম (জ্ঞান) দেওয়া হয়েছে কিন্তু হিল্ম (ধৈর্য) দেওয়া হয়নি তবে আবু ইয়াল শাদ্দাদের মাধ্যে এ দুটি সমাবেশ ঘটেছিল।১১ তিনি আরো বলতেনঃ  প্রত্যেক  উম্মাতের থাকে একজন ফকীহ্ (ধর্ম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ)। আর এ উম্মাতের ফকীহ হচ্ছেন শাদ্দাদ তাকে ইলম ও হিকমাত দান করা হয়েছে।১২

একবার মসজিদে জাবিয়ায় বসে কথা বলছেন হযরত ইবন গানাম, আবুদদারদা ও উবাদা ইবন সামিত। এমন সময় হযরত শাদ্দাদ এসে বরলেন: লোকেরা! আপনাদের নিয়ে আমার ভয় হয়। আর সে ভয়টা হচ্ছে, রাসূল (সা) বলেছেন, আমার উম্মাত প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে পড়বে এবং শিরকে লিপ্ত হবে। কথাটির শেষাংশ ছিল বিস্মিত হওয়ার মত। তাই  আবুদদারদা ও উবাদা প্রতবিাদ করলেন এবং নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে একটি হাদীস পেশ করলেন। হাদীসটি হলো, আরব উপদ্বীপে শয়তান তার উপাসন্যর ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়েছে। তাহলে আমাদের মুশরিক হওয়ার অর্থ কি? এ প্রশ্নটি তারা রাখলেন।

শাদ্দাদ বললেন, এক ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্য নামায পড়ে, যাকাত আদায় করে,ÑÑÑ তার সম্পর্কে আপনার কি ধারণা পোষণ করেন? তাঁরা জবাব দিলেন, সে মুশরিক (অংশীবাদী)। এর পর তিনি বলেন, আমি তার সম্পর্কে রাসূল (সা) নিকট থেকে শুনেছি, এ সকল কাজ যার লোক দেখেনোর উদ্দেশ্য করবে, সে হবে মুশরিক। হযরত আউফ হবন মালিকও ছিলেন তাদের সাথে। তিনি বললেন যতটুকু কর্ম রিয়া কর্ম যাতে শিরকের মিশ্রণ আছে  তা কবুল হবে না। এ  হিসেবে আমদের নিজেদের কর্মের উপর আস্থাবান হওয়া উচিত। হযরত শাদ্দাদ  উত্তরে বলেন: হাদীসে কুদসীতে  এসেছে মুশরিকদের যাবতীয় আমল তার উপাস্য বা মাবুদকে দেওয়া হবে। আল্লাহ তার মুহতাজ বা মুখাপেক্ষী নন।১৩ হযরত শাদ্দাদের এ অভিমত হুবহু কুরআনের বাণীর অনুরুপ। কুরআনে বলছে আল্লাহ কোন অবস্থাতেই শিরকের গুনাহ মাফ করবেন না। হাদীস শাস্ত্রে তার গভীর জ্ঞান ও বিচক্ষণতা ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি দরিায়াত ও নাকদ এর মূলনীতি অনুসরণ করতেন হযরত আবুজার আল- গিফারী (রা) ছিলেন যুহ্দ কিনায়াত (বৈরাগ্য ও অল্পেতুষ্টি) এর জন্য প্রসিদ্ধ। ভোগবাদী জীবনের বিরুদ্ধে তিনি গোটা শামে এক প্রচন্ড  আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার মত ও আন্দোলনের সপক্ষে তিনি বহু হাদীস বর্ণনা করেন। এতে হৈ চৈ পড়ে যায়। তার সম্পর্কে হযরত শাদ্দাদ (রা) বলেনঃ আবুজার রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে কোন হাদীস যাতে কোন কঠোরাত থাকতো শুনতেন। তারপর নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে তা প্রচার করতেন। রাসূল (সা) আবার এই কঠোরতায় কিছুটা শিথিলতা প্রদান করতেন। কিন্তু আবুজার তা জানতেন না। তিনি সেই কঠোরতার ওপর অটল থকেন।১৪ হযরত শাদ্দাদের (রা) সুত্রে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫০(পঞ্চাস)। আল্লামা যিরকলী বলেছেন এর সবগুলিই সাহীহাইনে বর্ণিত হয়েছে।১৫ এ সকল হাদীস তিনি রাসূল (সা) থেকে এবং কিছু কা’ব আল আহবার (রা) থেকে শুনেছেন।১৬ তাঁর থেকে হাদিীস বর্ণনা কারীদের আনেকেই ছিলেন শামের আধিবাসী। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম নিম্নে দেওয়া হলোঃ মাহমুদ ইবন লাবীদ, তাঁর দুই পুত্র মুহাম্মদ ও ইয়ালা, আবু আশ’য়াস সাফীন, দামরা ইবন হাবীব আবু ইদরীস খাওলানী, মুহামুদ ইবন রাবী, আবদুর রহমান ইবন গানামা, বাশীর ইবন কা’ব জুবাইর ইবন নুফাইর, আবু আসমা রাহবী, হাস্সান ইবন আতিয়্যা, উবাদা ইবন বাসানী হানজলী প্রমুখ।১৭ তিনি ছিলেন একজন আতি খোদাভীরু ‘আবেদ ব্যক্তি। আল্লাহর ভয়ে সব সময় কম্পিত থাকতেন। আধিকাংশ সময় রাতে আরাম করার জন্য শুয়ে যেতেন। কিছুক্ষন পর আবার  উঠে বসতেন এবং সারা রাত নামাযে দাঁড়িযে কাটিয়ে দিতেন। কখনো কখনো শোনা যেত, তিনি উচ্চারণ করছেন: আল্লাহুম্মা আন্নান নারা কাদ হালত বায়নী ওয়া বায়নান নাওম. হে খোদা! জাহান্নামের আগুন আমার এবং ঘুমের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহান্নাম আমার ঘুম দূর করে দিয়েছে। এখানে আসাদ ইবন বিদা‘য়ার একটি মন্তব্য উল্লেখযোগ্যঃ শাদ্দাদ যখন রাতে বিছানায় যেতেন তখন আল্লাহর বয়্যে অত্যন্ত অশান্ত ও ভীত থাকতেন।১৮ রাসূলুল্লাহর (সা) ও খিলাফাতে রাশেদার পর মুসলমানদের মধ্যে যে পরিবর্তন হচ্ছিল তিনি তীব্রভাবে অনুভব করতেন। উবাদা ইবন নাসী বলেনঃ একবার শাদ্দাদ ইবন আউস আমরা পাশ দিয়ে যাওয়া সময় আমার হাতটি ধরে তাঁর গৃহে  নিয়ে গেলেন তারপর বসে কাদতে শুরু করলেন। তা দেখে আমরাও কাঁদা শুরু করলাম। তিনি জিজ্ঞেসা করলেন: কাঁদছেন কেন? বললাম: আপনার কান্না দেখে আমরা কান্না পেয়েছে। তিনি বললেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহর একটি হাদীস মনে পড়েছে। তিনি বলেনছিলেন আমরা সবচেয়ে বেশী ভয় হয়  আমরা উম্মাতের প্রবৃত্তির গোটন কামনা বাসানার পূজারী ও শিরকে লিপ্ত হওয়ার। আম বললামঃ আপনার উম্ম্াত মুরিক হয়ে যাবেঃ বললেন হাঁ। তবে এমন নয় যে তারা চন্দ্র, সূর্য, মূর্র্তি, পাথরের পূজা করবে। তাদের মধ্যে রিয়া ও প্রবৃত্তির পূূজার প্রভাব দেখা দেবে। সকল মানুণ রোয়া রাখবে কিন্তু যখন তারা প্রবৃত্তি চাইবে সে নিঃসংকোচন তা ভেঙ্গে ফেলবে।১৯  বন্ধু বান্ধব, আন্তীয় ¯ব্জন রোগগ্রস্ত হলে তাদের দেখতে যাওয়া ও খোঁজ খবর নেওয়া তাঁর অভ্যাস ছিল। আবু আশ’য়াস সাগানী শামের  নিকটবর্তী দিমাশক মসজিদে থাকতেন। একবার শাদ্দাদ (রা) সানাবাহিনী সাথে পথ তার দেখা হলে। তিনি জিজ্ঞেসা করলেন: কোন দেিক যাচ্ছেন? শাদ্দাদ জবাব দিলেন, আমাদের এক ভাই অসুস্থ তাকে দেখতে যাচ্ছি। তিনিও সংগী হলেন। ভিতরে ঢুকে তিনি রোগিকে জিজ্ঞাসা করলেন: কি আবস্থা? জরাব এলো: ভালো আছি। হযরত শাদ্দাদ বললেনঃ আমি তোমাকে রোগ-ব্যধি গুনাহর কাফফারা হওয়ার সুসংবাদ শুনচ্ছি। হদীসে এসেছেঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর পরীক্ষায় তাঁর প্রশংসা করে এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্টি থাকে সে মায়ের পেটে থেকে ভুমিষ্ট হওয়া সদ্যাজাত শিশুর মত পাক পবিত্র হয়ে যায়।২০ মাক্কা বিজয়ের সময়কালে একদিন রাসূল (সা) মদীনার বাকী গোরস্তানে যান। হযরত শাদ্দাদ তখন সঙ্গে ছিলেন এবং রাসূল (সা) তার একটি হাত ধরেছিলেন।২১ এ ঘটনা দ্বারা রাসূলের (সা) সাথে তার সম্পর্ক অনুমান করা যায়।

কবার তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হন। তাঁর চেহারায় বিমর্ষতার ছাপ দেখে রাসূল (সা) জিজ্ঞেসা করলেনঃ কি হয়েছে? বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! তোমার জন্য পৃথিবী সংকীর্ণ। রাসূল (সা) বললেনঃ পৃথিবী তোমার জন্য সংকীর্ণ হবে না। শাম ও বাইতুল মাকদাস বিজিত হবে। তুমি ও তোমর সন্তানরা তাথাকর ইমাম হবে।২২ অক্ষরে অক্ষরে ও ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিনত হয়। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের সহ বাইতুল মাকদাসে বসতি স্থাপন করেন এবং গোটা শামের জ্ঞানও আধ্যতিœকতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

একাবার শাদ্দাদ জিহাদে গমনকারী একদল মুজাহিদকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। ারা তাকে তাদের সাথে আহার করার আমরন্ত্র জানালে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াতের পর থেকে খাবারটি কোথা থেকে এসেছে তা না জেনে যদি খাওয়ার অভ্যাস থাকতো তাহলে তোমাদের সাথে অবশ্যাই খেতাম।২৩ ইবন সা’দ খালিদ ইবন মা’দান থেকে বর্ণনা করেছেন, খালিদ বলেছেনঃ উবাদা ইবন সামিত ও শাদ্দাদ ইবন আউস অপেক্ষা অধিকতর বিশ্বস্ত, চিন্তাবিদ ও সন্তুষ্টচিত্ত ব্যক্তি  রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মধ্যে আর কেউ শামে জীবিত নেই।২৪

ল্ম উঠে যাওয়া ও ভুলে যাওয়া সম্পর্কে ও একটি হাদীস আওফ ইবন মালিক আল- আশাজাঈ (রা) রাসূল (সা) থেকে বর্ণনা করেন। এ সম্পর্কে এক ব্যক্তি শাদ্দাদকে (রা) প্রশ্ন করলে তিনি বলেনঃ আওফ সত্য বলেছে তারপর তিনি বলেনঃ সর্বপ্রথম কোন্ ‘ইলমটি উঠবে তাকি তোমাকে বলবো? সে বললো  হাঁ। বলেনঃ আল্লাহভীতি। এমন কি একজন আল্লাহ ভীরু লোকও তুমি দেখবে না।২৫ শাদ্দাদ ইবন আওস বলতেনঃ তোমরা কল্যাস ও মঙ্গলের সাবব বা কারণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাও না। তেমনিভাবে অকল্যান ও অমঙ্গল কারণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাওনা। কল্যানের  সবকিছু জান্নাতের এবং আকল্যাসের সবকিছু জাহান্নামের। আর এই দুনিয়া একটি উপস্থিত ভোগের বস্তু। সৎ ও অসৎ সকলেই তা ভোগ করে থাকে। আর  আখিরাত হচ্ছে সত্য অঙ্গীকার যেখানে রাজত্ব করেন মহাপরপাক্রমশালী রাজা। প্রত্যেকেরই আছে সন্তাননাদি তোমরা আখিরাতের সন্তান হও, দুনিয়ার সন্তান হয়োনা।২৬

তিনি ছিলেন খুবই ধৈর্যশীল ও স্বল্পভাষী। তাবে মানুষের সাথে যখন কথা বলতেন, তখন তা হতো খুবই মধুর ও চিত্তাকর্ষক। সাঈদ ইবন আবদিল আযীয বলেনঃ শাদ্দাদ দুইটি অভ্যাসে আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে। বলার সময় বাগিন্তাতায় এবং ক্রোধের সময় ধৈর্য, সহনশীলাতা ও মহানুভাবতায়।২৭ তিনি যে কত স্বল্পভাষী ছিরেন তার প্রমাণ মেল তার একটি মন্তব্য দ্বারা। একবার তিনি তার এক সঙ্গীকে বললেন, পথেয়টুকু নিয়ে এসো একটু খেলি। সঙ্গীটি বললোঃ এমন কথা তো আপনার মুখে কখনো শুনিনি! তিনি বলেনঃ আমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই মুখে রাগাম পরে নিযেছি। আজ অকস্মাৎ মুখ থেকে একথাটি বেরিয়ে গেল, তোমরা এটা ভুলে যাও। আর  কখনো এমনটি হবে না।২৮

একাবার হযরত মু’ য়াবিয়া (রা) হযরত শাদ্দাদকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ শাদ্দাদ বলুন তো আমি বলো না আলী ইবন আবী তালিব ভালো? আমাদের দুজনের মধ্যে কে আপনার নিকট সর্বধিক প্রিয়?শাদ্দাদ বললেনঃ আলী আগে হিজরাত করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বেশি ভালো কাজ করেছেন, আপনার চেয়ে বেশি সাহসী, আর তিনি আপনার চেয়ে বেশি প্রশস্ত হূদয়ের মানুষভ আর ভোলোবাসার কথা বলেছেন? আলী চলে গেছেন। আজ মানুষ আপনার কাছেবেশি আশা করে।২৯

তথ্যসূত্র:

 

মু’য়াজ ইবন আফরা (রা)

হযরত মু’য়াজের পিতার নাম আল-হারিস ইবন রাফা’য়া আন- নাজ্জারী এবং তার মাতার নাম আফরা বিনতু উবাইদ। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতার নামে তিনি পরিচিত নন। ইবন সা’দ বলেন: তাকে মায়ের সাতেই সম্পৃক্ত করা হয়।১ তাঁর মা আফরার প্রথম বিয়ে হয় আলÑহারিস ইবন রাফা’য়া আল-খাযরাজী সাথে। সেখানে তার দুছেলে- মু’য়াজ ও মুয়াওবিজ এর জন্ম হয়। এরপর তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আফরা হজ্জের উদ্দেশ্য মাক্কায় যান এবং সেখানে আল-বুকাইর ইবন আবদি ইয়ালীল আল-লাইসীকে বিয়ে করেন। সেখানে আকিল ইয়াস,ইমর ও খালিদ নামে চার ছেলের জন্মের পর আবার মদীনায় ফিরে আসেন। পূর্ব স^ামী আল-হারিস আবার তাকে ফিরিয়ে নেন। এবার ছেলে আওফ-এর জন্ম হয়।২ এ সবই ইসলাম পূর্বে জীবনের ঘটনা।

হযরত আফরা (রা) ছিলেন একজন ভাগ্যবতী মহিলা। ইসলাম গ্রহণ করে নিজে তোা সাহাবিয়্যা হওয়ার  গৌরব অর্জন করেন। তাছাড়া মু’য়াজ,  মু’য়াওবিজ ও আওফের মত তিনটি ছেলের মত মা হওয়ার দুর্লভ সম্মান ও অর্জন করেন। এ তিনটি ছেলেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ বদরের যোদ্ধে।৩ শেষোক্ত দুজন বদরের শহীদ।৪ শুধু তাই নয় তারাই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ট দুশন আবু জাহরকে এ বদরেই এক যোগে হামলা করে হত্যা করেন।

‘আকাবা উপত্যকায়ং রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে মদীসাবাসীদের বাইয়াত বা শপথ অনুষ্টিত হওয়ার আগেই তিনি মক্কায় গিয়ে মুসলামন হন। আরা পাঁচ ব্যক্তি ও সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন। অবশ্য এ ছ’জনের নামের ব্যাপারে সীরাত বিশেজ্ঞদের যথেষ্ট মত পার্থক্য আছে। যুহরী ও উরওয়ার  বর্ণনা মাতে মুয়াজ ইবন আফরাও তাদের একজন।৫

তাবারনী উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন্ হজ্জ মওসুমে আনসারদের কয়েক ব্যক্তি মক্কায় গিয়ে হজ্জ করলেন। তাঁরা হলেন মুয়াজইবন আফরা, আসয়াদ, ইবন যুরারা, রাফে ইবন মালিক, জাকওয়ান ইবন আবদিল কায়েস, আবুল হায়সাম ইবন আততায়্যিহান ও উওয়ায়িম ইবন সা’য়িদা (রা) খবর পেয়ে রাসূলু (সা) তাদের কাছে গেলেন এবং আল্লাহ যে তাকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন তা তাদেরকে জানালেন। তিনি কুরআন থেকে পাঠ করেও শোনালেন। তাঁর অত্যন্ত ধীর-স্থির ভাবে কান লাগিয়ে তাঁর বক্তব্য শুনলেন। আহলি কিতাবদের নিকট থেকে শেষ নবীর যে সকল গুন বৈশিষ্ট্যের কথা এবং তার দা’ওয়াতের বিষয় তাদের জানা ছিল তাতে রাসূলুল্লাহর (সা) দাবীর প্রতি তাঁদের আস্থা ও বিশ্বাস জান্মালো। তাঁরা ঈমান আনলেন। আগামী হজ্জ মওসুমে তাঁর সাথে আবার মিলিত হবেন এ অঙ্গীকার করে তাঁরা মদীনায় ফিরে এলেন।মদীনায় এসে তাঁরা চুপে চুপে মানূষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন এবং তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) আবির্ভাব ও তাঁর মিশন সম্পর্কে অবহিত করতে লাগলেন। মানুষকে কুরআন পড়ে পড়ে শোনাতে লাগলেন। তাঁর এমন ভাবে কাজ করলেন যে, আনসাদের এমন বাড়ি খুব কমই ছিল  যেখানে একজন লোকও মুসলামন হলো না।৬ ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনাকে কেউ কেউ আকাবার প্রথম বাইয়াত বা শপথ বরে উল্লেখ করেছেন। এ হিসেবে আকাবার বা’য়াত হয় তিনটি।

মদীনায় যখন বেশি কিছু লোক ইসলাম কবুল করলো এবং ঘরে ঘরে ইসলামের পরিচিতি গড়ে উঠলো তখন মদীনাবাসীরা মক্কা থেকে একজন লোক পাঠানোর জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট অনুরধ জানালো যিনি রাসূল (সা) প্রতিনিধি হিসেবে তাগেদরকে কুরআন শিখাবেন এবং দ্বীনের সঠিক তালীম দেবেন। রাসূল (সা) তাঁদের মদীনায় পাঠান। আবু নুয়াইম আল-হুলায়িয়্যা গ্রন্থে (১/১০৭) যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেনঃ মদীনাবাসীরা রাসূলুল্লাহর নিকট তাদের পৌছানোর জন্য মুয়াজ ইবন আফরা ও রাফে ইবন মলিককে মক্কায় পাঠান।৭

তাঁর ইসলাম গ্রহণ ও মক্কায় গমস সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মদ্যে নানা রকম ধারণা প্রচ।িলত আরেছ। যেমন ইবন সা’দ বলেন, বর্ণিত আছে মু’য়াজ ইবন আলÑহারিস ও রাফে ইবন মালিক আনসারদের প্রথম দু ব্যক্তি যাঁরা মক্কায়  গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবার এ কথাও বর্ণিত আছে যে তাঁদের দুজনকে আনসাদের সেই আট ব্যক্তির মধ্যে গণ্য করা হয় যাঁরা প্রথম দু’ ব্যক্তি  যাঁরা মক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ। আবার তাঁদেরকে সেই ছয় ব্যক্তির মধ্যেও গণ্য করা হয় যাঁদের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরাই আনসারদের মধ্যে সর্বপ্রথম মক্কায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। যাঁদের আগে আর কেই এমন করেননি। ওয়াকিদী ও মুহাম্মদ ইবন উমার বলেনঃ ছয় জনের বর্ণনাটি আমাদের নিকট সর্বাধিক সঠিক ও শক্তিশালী বলে মানে হয়।৮ সীরাত বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে প্রয় একমত যে তিনি আকাবার পরবর্তী দুটি বাই’য়াতে উপস্থিত ছিলেন।৯

হিজরাতের পর হযরত রাসূলে কারীম (সা) মা’মার ইবনুল হারিসের সাথে তাঁর দ্বীনি ভ্রাতৃ সম্পর্কে প্রতিষ্টা করে দেন।১০ হযরত মু’য়াজ তাঁর অন্য দু’ ভাই মু’য়াওবিজ ও আওফের সাথে বদরে অংশ গ্রহণ করেন। ইবন হিশাম বলেনঃ বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন।১১ হযতে ম’য়াজ ইবন আফরার বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ সম্পর্কে কারো দ্বিমত নেই। তবে এ যুদ্ধে ইসলামের চরম দুশমন আবু জাহলকে তাঁর হত্যা বা এ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ সম্পর্কে সীরাত ও হাদীস বিশেষজ্ঞদের দারুন মততবিরোধ আছে। বিভিন্ন বর্ণনা পর্যালোচনা করলে এ কথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় য়ে, তিনি আবু জাহলের হত্যায় অংশগ্রহণ করেন এবং বদর যুদ্ধে আহত হওয়ার পরও দীর্র্ঘদিন জীবিত ছিলেন। এখানে সংক্ষেপে কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরছি।বদর যুদ্ধের শুরুতে কুরাউশ পক্ষে তিন বীর, উতবা ও ওয়ালীধ ইবন উতবা হুস্কার ছেড়ে প্রতিপক্ষকে দ্বন্দ্বের আহবান জানায়। তখন মুসলিম বাহিনীর মধ্যে হতে সর্বপ্রথম হযরত আফরার তিন ছেলে মু’য়াজ, মুয়াওবিজও আওফ তরবারি হতে নিয়ে ময়দানের দিকে ধাবিত হন। কিন্তু হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাদেরকে বরত রাখেন। তিনি হযরত হামযা অন্যদেরকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। কিন্তু জিহাদের তীব্র আবেগে কি তাতে দমে থাকতে পারে? হযরত আবদুর রহমান ইবন আওফ একটি সারিতে দাড়িয়ে ছিলেন। তাঁর ডানেÑবামে দু পাশে তাঁর দু ভাই এম দাড়িয়ে গেলেন। আবুদর রহমান তাদেরকে চিনতেন না। এ কারণে নিজের দু’পাশে দু’ তরুণকে দেখে একচু হতাশা ও বীতি অনুভব করলেন। এর মধ্যে একজন ফিস ফিস করে জানতে চাইলেনঃ চাচ বলুন তো আবু জাহল কোন দিকে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেনঃ ভাতিজা তাকে দিয়ে কি করবে? তরুনটি বললেনঃ শনেছি সে রাসূলুল্লাহকে (সা)  গালি দেয়,এজন্য আমরা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছি যে, তাকে অবশ্যই হত্যা করবো। আর এ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে হরে জীবনও বিলিয়ে দেব। দ্বিতীয় তরুণও ঠিক একই কতা বললেন।

হযরত আবদুর রহমান দারুণ পুলকিত হলেন। তিনি চিছুটা গর্বও অনুভব করলেন এই ভেবে যে কত মাহান দু’ বক্তির মাঝখানেই না দাঁড়িয়ে! তিনি হাত দিয়ে ইশারা  করে বললেনঃ দেখ ঐ যে ক্ষাু জাহল হাঁটছে। এতটুকু বলতেই তাঁরা দুজন বাজ পাখীর ন্যায় ত্বরীৎ গতিতে ঝাপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন। ফিরে  এসে তাঁরা রাসূলকে (সা) এ হত্যার সুসংবাদ দান করেন। তখন তাদের দু’জনের তরবারিতে আবু জাহলের রক্ত বিদ্যমান।১২ সহীস মুসলিম গ্রন্থে এ দু’ তরুণের নাম মু’য়াজ ইবন আমর ইবনুল জামূঞ এবং মু’য়াজ ইবন আফরা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সহীহ বুখারীতে আফরা’র ছেলেদের কথা এসেছে। যা দ্বারা প্রমাণিত হয়, মুয়াজ ইবন আফরা ও তাঁর ভায়ের নরাধম আবু জাহলকে হত্যা করেছিলেন।

আল হাকেম (৩/৪২৫) ও আলÑ বায়হাকীর (৬/৩০৫) বর্ণনায় জানা যায়, ঐ দু’তরুণেরে একজন মুয়াজ ইবন আফরা এবং অন্য জন মু’য়াজ ইবন আমর ইবনুল জামূহ। তাঁরা আবু জাহলকে হত্যার পর দৌড়ে রাসূলকে (সা) সুসংবাদ দিতে এলে তিনি প্রশ করলেনঃ তোমাদের দুজনরে কে তাঁকে হত্যা করেছে? তাঁরা দু’জনই বললেনঃ হ্যাঁ তোমরা দু’ জনেই তাঁকে হত্যা করেছো, এরপর তিনি তাঁদের দু’জনকেই রণক্ষেত্রে ক্ষু জাহলের নিকট থেকে প্রাপ্ত জিনিসগুলি দান করেন।১৩

ইবন আবী খায়সামা ইবন ইসহাকের সুত্রে বর্ণনা করেছেন। মু’য়াজ বিন আফরা বলেছেনঃ আমি সুযোগ পেয়ে আবু জাহলকে তরবারি দিয়ে এমন আঘাত হানলাম যে তার পায়ের নালার মাঝামাঝি থেকে কেটে পড়ে গেল। সাথে সাথে আকরামা ইবন আবী জাহল আমার এক কাঁধে আঢ়াত করে বসলো। আমার সেই ঝোলানো  হাতটি পিছনের দিকে টেনে নিয়ে বেড়াতাম। তারপর সেটা যখন বেশি কষ্ট দিতে লাগলো তখন একদিন পা দিয়ে চেপে ধরে ছিড়ে ফেলে দেই। অবশ্য ইবন হিশাম ইবন ইসহাকের সুত্রে উপরোক্ত ঘটনা মু’য়াজ ইবন আমর ইবনুল জামূহ এর সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। আর তাঁর সহযোগী হিসেবে মু’য়াওবিজ ইবন আফরার কথা বলেছেন।১৪

আলÑইসতীয়াব গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন, বদর তিনি বনু যুরাই গোত্রের ইবন মায়িদ এর আঘাতে আহত হন।১৫ ইবন সা’দ এর মতে আফরার দুছেলে মু’য়াওবিজ ও আওফে এক কোপে আবু জাহলকে আক্রমন করেন। আবু জাহল পাল্টা আক্রমন করে তাদরে দুজনকেই হত্যা করে। এরপর আবু জাহল মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আবদুল্লাহমাসউদ বাকী কাজটুকু শেষ করে তাকে জাহান্নামে পাঠান।১৬ একটি বর্ণনা মতে এ বদর যুদ্ধে তিনি ইসলামের অন্য এক চরম দুশমন উমাইয়্যা ইবন খালফকে হত্যায় অংশগ্রহণ করেন।১৭

আবু জাহলের হত্যার ঘটনার মত হযতে মু’য়াজ ইবন আফরার মৃত্যুর সময় সম্পর্কে বেশ মতভেদ আছে। যেমন, বালাজুরী বলেনঃ মু’য়াজ ও তাঁর ভাই মু’য়াওবিজ বদরে শহীদ হন। তাঁদের ভাই আওফ জীবিত থাকেন। ইবনুল কালবী বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসেন। তারপর ছেলে আওফের দিকে ইশঅরা করে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই আমার সবচেয়ে খারাপ ছেলেটি রয়ে গেছে। রাসূল (সা) বললেনঃ না। তার মাদ্যমেই আফরা’র বংশধারা চলবে। কিন্তু ওয়কিদী বলেনঃবদরে আওফ ও মু’য়াজবিজ  শহীদ হন  এবং মু’য়াজ জীবিত থাকেন। তারপর ফিত্না অর্থ্যৎ আলীÑমুওবিয়ার (রা) দ্বন্দ্ব সংঘাতের সমং হিজরী ৩৭ নস ইনতিকাল করেন।১৮ আওফ ও মু;য়াওবিজ  যে বদরে শহীদ হন, একথা ইবন হিশামও বলেছেন।১৯

আবার কেউ কেউ বলেছেন। মু‘য়াজ বদরে বনু যুরইক গোত্রের ইবন মা‘য়িদা এর হতে আহত হন এবং তাতেই  পরে মদীনায় মারা যান। ইবন ইদরীস, ইবন ইসহাক থেকে বর্ণানা  করেছেন যে মু‘য়াজ খলীফা উসমানের (রা) সময় পযর্ন্ত বেঁচে ছিলেন। খলীফা ইবন খাইয়্যাত বলেছেনঃ দিসি আলী ইবন আবীঅ তালিবের (রা) খিলাফতকালে ইনতিকাল করেন।২০ যাই হোক তিনি যে বদরে শাহাদাত বরণ বা রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইনতিকাল করেননি তা প্রমাণিত হয় সীরাত গ্রন্থে সমূহে বর্ণিত তাঁর পরবর্তী জীবরে অনেক ঘটনাবালী দ্বারা। এখানে দুটি ঘটনা উল্লেখ করা হলোঃ

ওয়াদি উল কুরা মুসলামদের মধ্যে ভাগ করে দেন। তাঁর একটি অংশ মু‘য়াজ ইবন হযরত আবু আইউব আলÑআনসারীর (রা) আযাদকৃদ দাস আফলাহ বর্ণনা করেছেন। একাবর খলঅফা উামার (রা) প্রত্যেক বদরী সাহবীকে দেওয়ার জন্য খুব সুন্দর চাদর তৈরী করালেন। তার একটি মু‘য়াজ ইবন আফারকেও পাঠালেন। তারপর মু‘য়াজ আমাকে বললেনঃ চাদরিটি বিক্রী করে দাও। আমি পনেরো শো দিরহাম খরচ করে একটি মোটা ও পুরো চাদর তৈরীঅ করে আবার পাঠান। মুয়াজ চাদরটি হাতে নিয়ে সোচা উমারের (রা) নিকট চলে যান এবং জিজ্ঞাসা করেনঃ আপনি কি এটি পাঠিয়েছেন? উমার বললেনঃ হ্যাঁ। পূর্বে যেটি পাঠিয়েছিলাম, ঠিক সেরকম চাদর আপনার অন্যসব ভাইদের নিকটও পাঠিয়েছিলাম। শুনলাম আপনি সেটি পরেননি। মু‘য়াজ বললেনঃ আমিরুল মুমিনীন! এটা আমি পরবো না।২১ দুনিয়ার প্রতি তিনি যে কতখানি নিরাসক্ত ছিলেন তা উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝা যায়।

হযরত রাসূলে করীমকে (সা) তিনি প্রাণধিক ভালোবসতেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় নরাধম আবু জাহলের হত্যার ঘটনায়। এ ক্ষেত্রে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যে অপূর্ব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।

মদীনায় মসজিদে নববী যে স্থানে প্রতিষ্টিত, সে ভূ-খন্ডটি ছিল সাহল ও সুহাইল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের। রাসূল (সা) কুবা থেকে যে দিন মদীনার মূল ভূÑখন্ডে প্রবেশ করেন সে দিন তাঁর বহস উটটির লাগাম ছেড়ে দেওয়া ছিল। সে আল্লাহর নির্দেশে চলছিল এবং আল্লাহরই নির্দেশে সাহল ও সুহাইলের উক্ত ভূমিতে এসে বসে পড়ে। ইবন হিশামের বর্ণনামতে উক্ত ইয়াতীমদ্বয় তখন এই মু’য়াজ ইবন আফরার  তত্ত্বাধানে লালিত পালিত হচ্ছিল।২২ এতে বুভা যায়, তিনি ইয়াতীম ও অসহায়দের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন।

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে একবার হজ্জ করেন। এছাড়া আরো হজ্জ করেন। যার একটি বর্ণনা সুনানে নাসাঈ গ্রন্থে এসেছে।২৩ ইবন সা’দ তাঁর একাধিক স্ত্রী ও অনেকগুলো ছেলে মেয় ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এমন কি তাদের নামও বর্ণনা করেছেন।২৪

সানাসে নাসাঈ সহ বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত দু একটি হাদীস পাওয়া যায়।২৫

তথ্যসূত্র:

 

আবু লুবাবা (রা)

হযরত আবু লুাবাবরা (রা) আসল নামের ব্যাপারে যথেষ্ট মতেভেদ আছে। মুসা ইবন উকবা ও ইবন হিশাম বলেন, তাঁর নাম বাশীর। আর ইবন ইসহাকের মতে রাফা’য়া। তাফসীরে তাঁর নাম সারওয়ান বলে উল্লেখ করেছেন।১ বালাজুরঅর মতে রাফা’য়া হচ্ছে আবু লুবাবার ভাই তিনি আকাবার শেষ বা’ইয়াতে অংশ গ্রহণ করেন। বদরেও অংশ গ্রহণ করেন এবং খাইবার যুদ্ধে শহীদ হন। আল আবু লুবাবার নাম বাশীর।২  তাঁর আসল নাম যাই হোক না কেন, ইতিহাসে তিনি আবু লুবাবা নামেই খ্যাত। তাঁর পিতার নাম ‘আবদুল  মুনজির ইবন যুবাইর। মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের বনু আমর ইবন আওফ শাখার সন্তান। তিনি আকাবার শেষ বাইয়াতে (শপথ) অংশ গ্রহণ করেন এবং নিজ গোত্রের ‘নাকীব’ (দায়িত্বশীল) মনোনীত হন।৩

তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অধিকাংশ যুদেআধ অংশ গ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধের সময় বিশেষ সম্মান ও লাভ করেন। এ সফরে প্রতিটি উটের ওপর তিনজন করে আরোহী ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) উটের ওপর আবু লুবাবা ও আলী ইবন আবী তালিব (রা) ছিলেন। তার পালাক্রমে উটের পিঠেই ওফানাামা করছিলেনম ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি উটের পিঠেই থাকুন আমরা হেঁটে চলছি। কিন্তু রসূল (সা) বলছিলেন, তোমরা আমরা চেয়ে বেশি শক্তিশালী নও। আর এমনও নয় যে তোমাদের চেয়ে বেশী সওয়াবের প্রয়োজন আমার নেই।৪

ইবন ইসহাক বলেনঃ অনেক বলেছেন, আবু লুবাব ও আল হারিস ইবন হাতিব, রাসুল্লাহর (সা) সাথে বদরে দিকে যাত্রা করেন। কিছু দূর যাওয়ার পর পর থেকে রাসূল (সা) তাঁদের দুজনকে আবার মদীনায় ফেরত পাঠান। রাসূল (সা) আবু লুবাবকে মদীনার ইমারাতের দায়িত্ব ও দান করেন। যুদ্ধ শেষে রাসুল (সা) তাঁদের দুজনকেই  গনীমতের অংশ দেন এবং আসহবে বদরের মতোই তাঁদের সাথে আচারন করেন। মুসা উবন উকবা আবু লুবাবকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।৫ ইবন হিশাম বলেনঃ রাসূল (সা) আর রাওহা নামক স্থানে তাদের দজনকে ফেরত পাঠান।৬

হিজরী ২য় সনের শাওয়াল মসে মদীনার ইহুদী গোত্রের বনু কায়নুকার সাথে সংঘটিত যুদ্ধে এবং এই সনের জ্বিলহাজ্জ মাসে সংঘটিত সাবীক যুদ্ধে তিনি যোগদান করেননি। এ সময় রাসূল (সা) তাঁকে মদীসায় স্থালভিষিক্ত করে যান। রাসূল (সা) পনেরো দিন যাবত বনু কায়নুকা অবরোধ করে রাখেন্ এ সময় আবু লুবাবা মদীনায় ইমারাতের দায়িত্ব পালন করেন।৭

হিজরী ৫ম সনে খন্দক যুদ্বের সময় মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে মদীনায় ইহুদী গোত্রে বনু কুরায়জা কুরাইশ বাহিনীকে সাহায্য ও সহযোগীতা করে। যুদ্ধ শেষে রাসূল (সা) মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসার পরই জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি অস্ত্র রেখে দিয়েছেন? বললেনঃ হ্যাঁ জিবরল (আ) বললেনঃ কিন্তু ফেরেশতারা অস্ত্র রাখেনি। ইয়া মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনাকে বনু কুরায়াজার দিকে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি সে দিকেই যাচ্ছি এবং তাদেরকে নাড়া দিচ্ছি। রাসূলু (সা) তখন জুহরের নামায শেষ করে মাত্র ঘরে ফিরেছেন।

জিবরীলের (আ) এ কথার পর রাসূল (সা) সাথে সাথে ঘোষনা দিলেনঃ বনু কুরায়জা পৌছে ছাড়া কেউই আমার নামাজ পড়বে না। ঘোষনা অনুযায়ী সবাই বনু কুরায়জায় পৌঁছে। র্দীঘ ২৫ রাত তাদের দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয় এবং তাদেরকে আতœসমর্পণের আহাবান জানানো হয়্ অবশেষে  আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করে দেন। তারা তাদের পুরাতন বন্ধু  হযরত সা’দ ইবন মু’য়াজের (রা) শালিশী মেনে নিতে রাজি হয়।

মাদীনার আউস গোত্রের বনু আমর ইবন আওফ শাকার সাথে বনু কুরায়াজার সেই জাহিলী যুগ থেকে মৈত্রী চুক্তি ছিল। আবু লুবাবা ছিলেন এ গোত্রেরই লোক। এ কারণে তারা অবরুদ্দ অবস্থায় রাসূলুল্লাহার (সা) নিকট আবেদন জানায়: আমাদের কাছে আবু লুবাবাকে পাঠান, আমরা তাঁর সাথে একটু পরমর্শ করতে চাই। রাসূল (সা) তাদের আবেদ মঞ্জুর করেন এবং আবু লুবাবকে তাদের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেন।

আবু লুবাব বনু কুরায়াজায় পৌঁছালে ইহুদীরা তাঁর প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করে। তারা আবু লুবাবার নিকট তাদের সমস্যা তুলে ধরে। ইহুদী নারী ও শিশুরা কাঁদতে কাঁদতে দিশেহারার মত তার সামনে এসে দাড়িয়ে। দৃশ্যটি ছিল সত্যিই হৃদয়বিদারক। আবু লুবাবর অন্তর কোমল হয়ে যায়। তারা আবু লুবাবাকে প্রশ্ন করেঃ আমরা কি মুহাম্মদের নির্দেশ মেনে নেব? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তাবে সাথে সাথে নিরে গলার দিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত  করে বুঝিয়ে দেন যে তাদরেকে হত্যা করা হবে।

আবেগের বশে এ ইঙ্গিত তো করে ফেললেন। কিন্তু সাথে সাথে এ উপলদ্ধি জান্মালো যে এতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়েছে। তখন তাঁর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। তিনি সেখানে থেকে উঠে সোজা মসজিদে নববীতে চলে আসলেন এবং এটি মোটা ও ভারী বেড়ী দিয়ে নিজেকে মসজিদের একটি খুঁটির সাথে বেঁধে বললেনঃ যতক্ষন আল্লাহ আমার তাওবা কবুল না করেন, এভাবে বাঁধা অবস্থায় থাকবো।

এদিকে আবু লুবাবর ফিরতে দেরি দেখে একদিন রাসূল (সা) বললেনঃ আবু লুবাব কি তার মিশন শেষ করেছে? তখন লোকেরা রাসূলকে (সা) বিষয়টি অবগত করে। রাসূল (সা) যা হোক যা হয়েছে ভালোই হয়েছ্ েসে যদি সোজা আমার কাছে চলে আসতো আমি তার জন্য আল্লাহর কাছে ইসতিগফার করতাম। মোটকথ, বিশ মাতন্তরে দশ রাত বেড়ী বাঁধা অবস্থায় আবু লুবাবার অতিক্রান্ত হয়। নামায ও অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনের সময় তাঁর স্ত্রী বেড়ী খুলে দিতেন এবং প্রয়োজনে শেষ হলে আবার বেঁধে দিতেন্ পানাহার একেবারেই ছেড়ে দেন। শ্রবণ শক্তি কমে যায়, দৃষ্টি শক্তি ও ক্ষীণ হয়ে পড়ে। একদনি দুর্বলতার কারণে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আর তখনই আল্লাহর রহমত নাযিলের সময় হয়।

হযরত রাসূলে করীম (সা) সে দিন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামার (রা) ঘরে ছিলেন। প্রভাতের পূর্বেই আয়াত নাযিজ হয়। রাসূল (সা) একটু হেসে ওঠেন। তা দেখে হযর উম্মু সালামা (রা) বলেনঃ ইয়া  রাসূলুল্লাহ!  আল্লাহ আপনাকে সব সময় খুশী রাখুন। বলুন তো কি ব্যাপার? বললেনঃ আবু লুবাবর তাওবা কুল হয়েছে। উম্মু সালামা (রা) জানতে চাইলেন, আমি কি এ সুসংবাদ মানুষকে জানিয়ে দিতে পারি?  রাসূল (সা) বললেনঃ হাঁ তখনও হিজাবের আয়াতনাযিল হয়নি। উম্মম সালামা (রা) হুজরার দরজায় দাঁড়িয়ে  লোকদদেরকে বিষয়টি জানিয়ে দেন। লোকেরা আবু লুবাবাকে মুক্ত করার জন্য ছুটে যায়। কিন্তু তিনি বললেনঃ যখন ফজরের নামাযের জন্য মসজিদে আসেন তখননিজ হাতে তাঁকে বন্ধনমুক্ত করেন।

তাওবা কবুল লুবাবা (রা) দারুণ খুশী হন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ঐ বাড়ী ত্যাগ করতে চাই যেখনে আমি এ পাপে লিপ্ত হয়েছি। আমি আমার সকল সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য সাদাকা করে দিতে চাই। রাসূল (সা) বললেনঃ সব নয় বরং এক-তৃতীয়াংশই যথেষ্ট। তিনি  এক-তৃতীয়াংশই দান করেন।

হযরত আবু লুবাবর (রা) এ তাওবার পশ্চতে কি কারণ ছিল  সে সম্পর্কে অবশ্য সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। মা’মার ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন। অবু লুবাব তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার আপরাধে তাওবার এ পন্থা অবলম্বন করেন। হযরত ইবন আব্বাসও (রা) একথা বলেছেন, সূরা আতাওবার ১০২ নং আয়াতে আর কোন কোন লোক আছে যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেককাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়তো তাদরে ক্ষমা করে দিবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়, আবু লুবাবসহ আরও ৮/৯ জন সম্পর্কে নাযিজ হয। তারা তাবুব যুদ্ধে যোগদান না করে মদীনায় থেকে যায়। তারপর অনুতপ্ত হয়ে সকলে তওবা করে। তারা তাওবার পদ্ধতি হিসেবে নিজেদেরকে মসজিদের খুঁটিতে বেঁধে ফেলে। অতঃপর তাদের তাওবা কবুল হয়। তাদের সবচেয়ে ভলো কাজ এ তাওবা সবচেয়ে মন্দকাজ তাবুকে যোগদান না করা।

আবু আমারের মতে তাবুকের ঘটনায় নয়; বরং বনু কুরায়জার ঘটনায় আবু লুবাবা এ তাওবা  করেন। আব তারই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা আল আনাফালের ২৭ নং আয়াত ‘ হে ঈমানদারগণ! খিয়ানত করোনা আল্লাহর সাথে ও রাসূলের সাথে এবং খিয়ানত করোনা নিজেরদের পারস্পরিক ানানতে জেনে শুনে নাযিল হয়। আবু আমরাসহ অনেকের মতে আবু লুবাবা তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। যে সকল মুসলমান বিনা কারণে তাবুকে যোগদান করেননি তাঁদের সংখ্যা মাত্র তিন। তাঁরা হলেন মুরারা ইবন রাবী; হিলাল ইবন উমাইয়্যা এবং কাব ইবন মালিক (রা)। তাঁদের সাথে  আবু লুবাবকে যুক্ত করা ঠিক নয়। কারণ, সূরা আত্ তাওবার ১১৮ নং আয়াতে উপরোক্ত তিনজনের কথাই বলা হয়েছেঃ ্ এবং অপর তিনজনকে যাদের পিছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সস্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো আর তাা বুঝতে পারলো যে আল্লাহ ব্যাতিত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই-অত:পর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে।৮

হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয় অভিযানে বনু আমর ইবন আওফের ঝান্ডা ছিল হযরত আবু লুবাবর (রা) হতে। এছাড়া রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশঅয় সংঘটিত সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

তাঁর মৃত্যু সন নিয়ে দারুণ মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশের  মতে তিনি হযরত আলীর (রা) খিলাফতকালে মারা যান।  আবার একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত উসমানের (রা) শহাদাতের পর তিনি মারা যান। কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন যে, হিজরী ৫০ সন পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন।৯ মৃত্যু কালে সয়িব ও আবদুর রহমান নামে দুটি ছেলে রেখে যান।

হযরত আবু লুবাবা ছিলেন একজন অতি মর্যাদাবান সাহাবী। তিনি বহু বছর রাসূলুল্লাহর (সা০ সাহচর্যের সৌভাগ্য লাভ করেন। এ সময়ে রাসূলুল্লাহর (সা) বহু বানী শুনে থাকবেন। কিন্তু তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা অতি নগণ্য তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে অনেক বড় বড় সাহাবীও আছেন। যেমনঃ গযরদ আবদুল্লাহ ইবন  উমার (রা)। তাছাড়া তাবেঈনদের প্রথম তাবকার অনেকেই তাঁর ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এখানে প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলোঃ

আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ ইবন জাবির উব বরক ইবন আমর ইবন হাযমা সা’ঈদ ইবন মুসাইয়্যাব, আবদুর রহমান ইবনকাব ইবন মালিক,সালেম ইবন আবদিল্লাহ উবাইদুল্লাহ ইবন আবী ইয়াযিদ নাফে মাওলা ইবন উমার তাঁর দুছেলে সয়িব ও আবদুর রহমান।১০

হযরত আবু লুবাবা (রা) ইসলামের পূর্ণ অনুসারী ছিলেন। কুরআন ও নুন্নাহর আদেশ নিষেধ পূর্ণুেপে েেন চলতেন। মানবিক দুর্বলতার কারণে কক্ষনো কোন রকম ক্রটি বিচ্যুাতি হে য়গেলে তা বুঝতে  পারার সাথে একনিষ্টভবে তাওবা করতেন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আবু লুবাবা (রা) বনু কুরায়জার ব্যাপারে যে ভুল করেছিলেন এবং তাতে তাঁর চেয়ে বেশি পরিচ্ছন্ন ও উজ্জল করেছিল তাঁর তাওবা। আল্লাহ পাক স্বয়ং তাঁর তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষনা দিয়ে অহী নাডিল করেছেন, আর আল্লাহর রাসূল (সা) সন্তুষ্টি চিত্তে নিজ হাতে তাঁর বন্ধন খুলে দিয়েছেন।আবু লুবাবার (রা) এর চেযে বড় মর্যাদা এবং পাওয়া আর কি আছে? প্রকৃতপক্ষে অনুতপ্ত তাওবাকারী  অপরাধী আল্লাহর অতি প্রিয়। তিনি অতি খুটিনাটি বিষয়েও রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের ওপর আমলের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) মুখ থেকে সাপ মারার হাদীস শুনেছিলেন। এ কারণে সাপ দেখরেই মেরে ফেলতেন। আবু লুবাবর (রা) বাড়ীটি ছিল তাঁরই বাড়ীর একেবারে লাগোয়। একদিন তিনি বিন উমারকে (রা) বললেনঃ আপনার বাড়ীর দরজাটি একটু খুলুন,আমি এ পথেই মসজিদে যাব। ইবন উমার (রা) উঠে যেইনা দরজা খুলেছেন, অমনি একটি সাপ দেখতে পেলেন। ইবন উমার (রা) মারার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আবু-লুবাবা (রা) তাঁকে বাধা দিয়ে বললেনঃ রাসূল (সা) ঘরের সাপ মারতে নিষেধ করেছে।১১

আবু নু’য়াইম তাঁর আদÑদালায়িল’ (১৬০) গ্রন্থে আবু লুবাবর একটি বর্ণনা এনেছেন। তিনি বলেছেনঃ রাসূল (সা) এক জ্ম্মুার দিন মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে গিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে পানি দাও। আবু লুবাবা বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! খেজুর তো শুকানো জন্য উঠোনে রয়েছে। রাসূল (সা) বললেনঃ হে আল্লাহ আমদেরকে পানি দাও যতক্ষনা আবু লুবাব ল্যাংটা হয়ে ওঠে এবং নিজের পাজামা দিয়ে তার উঠোনের পানির নালা বন্ধ করে। তারপর এত  বৃষ্টি হতে থাকে যে লোকেরা আবু লুবাবকে বললোঃ রাসূল (সা) তোমার সম্পর্কে যা বলেছেন তানা করা পর্যন্ত বৃষ্টি থামবে না। আবু লুবাবকে তাই করলেন। বৃষ্টিও থেমে গেল।১২

এভাবে আবু লুবাবার (রা) জীবনের অনেক টুকরো টুকরো কথা সীরাতের গ্রন্থ সমুূহের পাতায় ছড়িয়ে আছে।

তথ্যসূত্র:

 

যায়িদ ইবন আরকাম (রা)

ভালো নাম যায়িদ। কুনিয়াত বা ডাক নামের ব্যাপারে দারুন মতভেদ আছে। যেমনঃ আবু উমার আবু আমের আবু সা’দ আবু উনাইস ইত্যাদি।১ পিতা আরকাম ইবন যায়িদ। মদীনার খায়রাজ গোত্রের বনু হারিস শাখার সন্তান। একজন আনসারী সাহাবী খুব অল্প বয়সে পিতৃহারা হন। হযরত আবদল্লাহ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনÍাওয়াহা (রা) ছিলেন একজন উচু মর্যাদার সাহাবী। সম্পর্কে তিনি যায়িদের চাচা। তিনি পিতৃহারা যায়িদকে তত্বাবাধানে নেন এংব লালন পালন করেন।২ আবদুল্লাহইবন রাওয়াহা (রা) আকাবরা বাইয়াতে (শপথ) শরীক ছিলেন। মূলতঃ তাঁরই প্রভাবে হযরত যায়িদ (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত যায়িদ উহুদ যুদ্ধে যেতে চায়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার বয়স না হওয়ায় হযরত হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে বিরত রাখেন। সর্ব প্রথম খন্দক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তবে একথাও বর্ণিত আছে যে, আল’মুরাইসী তাঁর জীবনের প্রথম সহীহ আল বুখারীতে এভবে তাঁর বর্ণনায় আছে রাসূল (সা) মোট ঊনিশটি যুদ্ধ  করেছেন তারমধ্যে আমি সতেরটিতে (১৭) শরীক ছিলাম।৩

মূতার যুদ্ধে চাচা আবদুল্লাহ ইবর রাওয়াহার ছিলেন বড়  মাপের কবি। তিনি পথে চলতে চলতে একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন যাতে তাঁর শাহাদাতের তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ পায়।যায়িদ কবিতাটি শুনে কাঁদতে শুরু করেন। ইবন রাওয়াহা ছড়ি ঝাঁকিয়া বলে ওঠেন, ওরে ছোটলোক আমরা শাহাদাতের ভাগ্য হলে তোর ক্ষতি কি?৪

খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে হযরত আলীর (রা) সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সিফফীন যুদ্ধে আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন। তাঁকে আলীর ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে গণ্য করা হয়।৫

হযরত যায়িদ (রা) শেষ জীবনে কূফার বনু কিন্দা মহল্লাহয় বাড়ী করে বসতি স্থাপন করেন। এ কূফা শহরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্য সন নিয়ে কিছু মতান্তর আছে। অনেকের মতে, আলÑমুখতার আসÑসাকাফীর বিদ্রোহের সময় হিজরী ৬৬  সনে মারা যান। তবে আলÑ হায়সামা ইবন আদী এবং আরো অনেকের মতে তাঁর মৃত্য সন হিজরী ৬৮ সন। অনেকে একথাও বলেছেন যে হযরত আল-হুসাইনের (রা) শাহাদাতের অল্প কিছু দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।৬

হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন তাঁর সময়ের জ্ঞান, মর্যাদা ও সম্মানের একটি কেন্দ্রবিন্দু। জ্ঞানের সন্ধানে মানুষ দূরÑদুরান্ত থেকে তাঁর কাছে ছুটে আসতো। এক ব্যক্তিতো কিসতাস এর শেষ প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিল তাঁর কাছে একটি মাসায়ালা জিজ্ঞেস করতে।৭ তিনি যেখানেই যেতেন হাদীসের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিরা তাঁর পাশে ভীড় জমাতো। একবার বসরা মতান্তরে মক্কায় গেলে হযরত আব্বাস (রা) বলেন, অমুক হাদীসটি যা আপনি বর্ণনা করে থাকেন, আবার আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।৮ একবার আতিয়্যা বললেন আপনি অমুক হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আমার আসার উদ্দেশ্য হলো, আপনার মুখ থেকেই  হাদীসটি শোনা। তিনি হাদীসটি বর্ণনা করলে আতিয়্যা বললেন আপনি এ বাক্যটিও তো বলেছিলেনÑ আমি যেমন শুনেছি তেমনই তোমাকে বর্ণনা করবো।৯

হাদীস ছাড়াও যে সকল  দু’আ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে শুনে মুখস্ত করেছিলেন, মানুষকে শিখাতেন, তাই আমরা তোমাদে কে শিখাচ্ছি। তাঁর বর্ণিত বহু দু’আ হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে সংকলিত হয়েছে।১০ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে হযরত যায়িদ (রা) দারুণ সতর্ক ছিলেন। আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা বলেন: আমরা তাঁর কাছে এসে আবেদন জানাতাম, আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনা করুন। বলতেনঃ আমি এখন বুড়ো হয়েছি এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনা করা বড় কঠিন কাজ।১১

একবার ইয়াযীদ ইবন হায়্যান, হুসাইন ইবন সাবরা ও আমর ইবন মুসলিম হাদীস শোনার জন্য তাঁর কাছে যান। প্রথমে তাঁর যায়িদের (রা) প্রশংসা করে বলেন, আল্লাহ আপনাকে বড় ফজীলাত দিয়েছেন। আপনি রাসূল্ল্লুাহর (সা) কামলিয়্যাত (পূর্ণতা) প্রত্যক্ষ করেছেন। হাদীস শুনেছেন,তাঁর সাথে যুদ্ধে গেছেন এবং তাঁর পিছনে নামায আদায় করেছেন। এর চেয়ে বড় মর্যাদার আর কিহতে পারে? আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা) কিছু হাদীস শোনান। জবাবে যায়িদ (রা) বললেনঃ ভতিজা আমি এখন বুড়ো হয়েছি, সেে সময়ও চলে গেছে। অনেক কথাই আজ স্মৃতি ও স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। হাদীসের একটি বড় ভান্ডার আজ ভুলে গেছি। এখন আমি যা কিছু বর্ণনা করি তাই শোন। যা নেই তার জন্য আমাকে কষ্ট দেওয়া তোমাদের উচিত হবে না।১২  এ কারণে হযরত যায়িদের  (রা) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মাত্র নব্বই (৯০) টি। তিনি হযরত রাসূলে করীম (সা) আলীর (রা) মুখ থেকে হাদীস শুনেছেন এবং তাই বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর সুত্রে যে সকল সাহাবী ও তাবেঈ হাদীস বর্ণনা করেছেন, এখানে তাঁদের বিশিষ্ট নাম উল্লেখ করা হলো।:

আনাস ইবন মালিক, আবদুল্লাহ ইবনুল আব্বাস, আবততুফাইল, আবু উসমান আনÑনাহদী, আবুদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, আবদে খায়র আলÑহামাদানী, তঊস, নাদার ইবন আনাস, আবু উমার শায়বানী, আবুল মিসহাল,আবদুর রহমান ইবন মাতয়িম, আবু ইসহাক আসÑসাবাঈ, মহাম্মাদ ইবন কা’ব আলÑকারাজী, আবু হামযা তালহা ইবন ইয়াযীদ,আবদুল্লাহ ইবন আলÑহারিস, আলÑবসর, কাসেম ইবন আওফ, আতিয়্যা আলÑআওফ, আবু মসলিম আল বাজালী প্রমুখ।১৩ হযরত যায়িদের (রা)  মধ্যে ইসলামের রুহানী বা আধ্যাতিœক শিক্ষা মাত্রায় বিকতি হয়েছিল। তবে বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় বনু মুসতালিক যুদ্ধের সময়ের একটি ঘটনায়। ঘটনাটি সংক্ষেপে এরুপঃ

বনু আলÑমুসালিক এর সংরক্ষিত জলাশয়ের নাম আলÑমুরাইসী। ইবন ইসহাকের মতে হিজরী ৬ এবং মূসা ইবন উকাবার মতে ৪ সনে এ জলাশয়ের পাশে রাসূলুল্লাহর (সা) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর এক যুদ্ধ হয়। যা ইতিহাসে আলÑমুরাইসী’র য্দ্ধু নামে খ্যাত। এ যুদ্ধে বনু মুসতালিফ শোচনিয়ভাবে পরাজিত হয়।১৪

রাসূল (সা) তাঁর বাহীনিসহ এ জলশায়ের পাশে শিবির স্থাপন করেছিলেন।সৈনিকরা এখান থেকেই পশুকে পানি পান করাতো। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) ছিল জাহ্জাহ্ ইবন মসউদ নামে বনু গিফর গোত্রের এক মজুর। তিনি উমারের (রা) ঘোড়াটি চরাতেন। একদিন ঘোড়াটি পানি পান করতে গিয়ে খওফ ইবন খাযরাজের হালীখা বা বন্ধু সিনান ইবন ওয়াবার আলÑজুহানী আনসারদের সাহায্য চেয়ে চিৎকার জুড়ে দেন। জাহ্জাহ্ বসে থাকলেন না।তিনিও মুহাজিরদরে সাহায্য চেয়ে আওয়াজ দেন। মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল এতে দারুন ক্ষুদ্র হয়। তখন তার নিকট তার গোত্রের একদল লোক উপস্থিত ছিল। তাদরে মধ্যে যায়িদ ইবন আরকামাও ছিলেন। তিনি এখন একজন তরুণ ব্যক্তি।

আবদুল্লাহ ইবন উবাই সুযোগ বুঝে তার গোত্রের লোকদের লক্ষ্য করে বললেনঃ মুসলিম মুহাজিররা আমাদের সাথে এমন আচারণ করলো? আমাদেরই ভূমিতে তারা আমাদেদেকে ঘৃনা করছে এবং আমদের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে গেছেভ মুহাজিরদের ব্যাপারটি যেন খাইয়ে মোটাতাজা করা সেই পালিত কুকুরের মত যে তার প্রভুকে খেয়ে ফেলে। আল্লাহর কসম মদীনায় ফিরতে পারলে আমরা তথাকার অভিজাতরা এই ইতরদেরকে বিতাড়িত করে ছাড়বে। মূলতঃ এটা তোমাদেরই কর্মফল। তোমাদের মাতৃভূমির দুয়ার তাদের জন্য খুলে দিয়েছো। তোমাদের যা আছে তা যদি তোমরা তাদেরকে ভাগ কর দিয়েছো। আল্লাহর কসম, তোমাদের মাতৃভুমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। মুনাফিক ইবন উবা এভাবে তার গোত্রীয় লোকদের সুপ্ত অনুভুতিেিত আঘঅত করে মুহাজিরদের বিরুদ্ধে ক্ষেপেয়ি তুলতে চেষ্টার ক্রটি করলো না। যায়িদ ইবন আরকাম (রা) চুপ করে তার সব কথা শুনলেন। তাঁর ঈমানী চেতনা তাঁকে এ মুনাফিকের কথাগুলি চেপে রাখতে দিলোনা। যদিও ইবন উবাই ছিল তাঁর স্বগোত্রীয় লোক। হযরত রাসূলে কারীম (সা) যুদ্ধের ব্যস্ততা শেস করে একটু বিশ্রামে আছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) তখন তাঁর কাছে বসা। এ সময় যায়িদ (রা) উপস্থিত হলেন এবং সব কথা খুলে বললেন। উমার (রা) রাগে ফেটে  পড়লেন এবং রাসূলকে (সা) পরামর্শ দিলেনঃ আপনি ইবন উবাইকে হত্যা করার জন্য  আব্বাদ ইবন বিশরকে নির্দেশ দিন। রাসূল (সা) বললেনঃ উমার লোকে যখন বলাবলি করবে মুহাম্মাত তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করেন। তখন কি হবে? না তা হয়না। তুমি বরং লোকদেরকে এখান থেকে চলার কথা জানিয়ে দাও। সাধারণত রসূল (সা) এমন সময় যাত্রা শুরু করতেন না ঘোষনা অনুযায়ী লোকদের যাত্রা শুরু করলো।

এ দিকে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই যখন জানালো যায়িাদ ইন আরকাম তার সব কথা রাসূলুলালাহর (সা) কানে পৌঁছে দিয়েছে তখন সে রাসূূলুল্লাহ (সা) কাছে ছুটে এসে হলফ করে বললোঃ যায়িদ যা বলেছে তার কিছুই আমি বলিনি। এমন কোন কথঅি আমি উচ্চারণল করিনি। েিস ছিল তার গোত্রেরে একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তি।  তাই যে সকল আনসার সাহাবী তখন উপস্থিত ছিলেন তাঁরা বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ সম্ভবত এ তরুণ ইন উবাইয়ের কথা বুঝতে ভুল করেছে এবং তার মূল বক্তব্য মনে রাখতে পারেনি। এভাবে তাঁরা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কথ বিশ্বাস করে তার পক্ষে সাফাই গাইলেন। যায়িদ (রা) চাচা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও (রা) তাকে তিরস্কার করলেন।

ইবন ইসহাক বলেনঃ রাসূল (সা) আলÑমুরাইসী থেকে যাত্রা করলেন। উসাইদ ইবন হুদাইর এসে বললেনঃ তোমাদের সাথী যে কথা বলেছে তা কি তোমর কানে পৌঁছেনি? উবই। সে কি বলেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (সা) যা শুনেছিলেন তাই তাঁকে বললেন। উসাইদ তখন বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম, আপনি তো সম্মানিত ও শক্তিশালী। এরপর তিনি আবদুলআহ ইবন উবারি প্রতি রকরুণা করার জন্য রাসূলকে (সা) আনুরোধ করেন।

এরপর রাসূল (সা) হিজাযের বাকায়া নামাক উঁচু ভূমিতে যাত্রা বিরতি করেন। আর সেখানেই সূরা আলÑমুনফিকুন নাযিল হয়। এতে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ও তার মত আন্য মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছিল। আর সেই সাথে ঘোষিত হয়েছে হযরত যায়িদের (রা) নিষ্ঠা ও সত্যবাদিতা। সূরাটি যেভাবে শুরু হয়েছে তা বুঝার জন্য এখানে প্রথম দুটি আয়াত অনুবাদ দেওয়া হলো:

‘মুনাফিকরা তোমার কাছে  এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন যে তুমি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এংব আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। তারা তাদের শপথসমূ বে ঢালরুপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে তা খুবই মন্দ।” সূরা আলÑমুনাফিকুন নাযিল হওয়ার পর রাসূল (সা) হযরত যায়িদের (রা) কান ধরে বলেন, এ সইে ব্যক্তি যার কান আল্লাহর হক পূর্ণরুপে আদায় করেছে।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আল মুরইসী থেকে সফর শুরু করার র হযরত যায়িদ (রা) বারবার রাসূললুল্লাহর  (সা) কাছে  আসতেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই মুনাফিক লোকটি আমাকে মিথ্যাবদী বলে গোটা সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। অতএব আমার সত্যায়ন ও এই ব্যাক্তির মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন সম্পর্কে অবশ্যই কুরআন নাযিল হবে। হঠৎ যায়িদ ইবন আরকাম দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) মধ্যে ওহী নাযিলের সময়ের লক্ষণাদি ফুটে উঠেছে। তিনি আশবাদী হলেন যে, এখন এ সম্পকের্ কোন  বোর ওজী রাযিল হবে। আবশেষে রাসূলুল্লাহ (সা) এই অবস্থা দূর হয়ে গেল। যায়িদ (রা) বলেনঃ আমার সাওয়ারী রাসূলুল্লাহ (সা) কাছ থেকে ঘোঁষে যাচ্ছিল। তিনি নিজের সাওয়ারীর ওপর থেকেই আমার কান ধরলেন এবং বললেন: হে বালক, আল্লাহ তোমার কথার সত্যায়ন করেছেন।

এ বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, সূরা মুনাফিকুন সফরের মধ্যেই নাযিল হয়েছে। কিন্তু ইমাম বাগাভীর (রহ) বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনায় পৌঁছে যান এবং যায়িদ ইবন আরকাম (রা) অপমানের ভয়ে ঘরে আতœগোপন করেন তখন এই সূরা নাযিল হয়।১৫

তিনি সুন্নতে নাবাবীর অনুসারণে বিন্দুমাত্র হরেফের করতেন না। জানাযার নামাযে তিনি চারতারবী বলতেন। একবার পাঁচ তাকবীর বললেন। এক ব্যক্তি হাত পেনে ধরে জিঞ্জাসা করলেন, বুল করেননি তো? বললেনঃএটাও রাসূলুল্লাহর  (সা) সুন্নাত। আমি একেবারেই ছেড়ে দিই কিভাবে?১৬

তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (রা) অতি ঘনিষ্ট জন। ে কান এক সময় অস্স্থু হলে রাসূল (সা) তাকে দেখতে যেতেন।১৭ একবার তিনি চোখের রোগে আক্রান্ত হলেন। রাসূল (সা) দেখতে গেলেন। সেরে ওঠার পর রাসূল  (সা) জিজ্ঞাসা করলেনঃ সবর করতাম এবং সাওয়াবের প্রত্যাশঅয় থাকতাম। রাসূল (সা) বললেনঃ এমন করল পাপমুক্ত  অবস্থায় আল্লাহর সান্নিধ্যে যেতে।১৮ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা) তাঁকে বললেনঃ এ রোগে তোমার কোন ক্ষতি হবেনা। কিন্তু আমার মৃত্যুর পর যদি তুমি বেচে থাক এবং অন্ধ হযে যাও তাহলে কি করবে? তিনি জবাবে দিলেনঃ আমি তখন সবর করবো এবং  সাওয়াবের প্রত্যাশায় থাকবো। রসূল (সা) বললেনঃ তাহলে তুমি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। রাসূললু­হর (সা) মৃত্যুর পর হযরত যায়িদ (রা) অন্ধ হয়ে যান।১৯

কারও সম্মান ও মর্যাদ ক্ষুন্ন হয় এমন আচারল ও মন্তব্য থেকে তিনি সব সময় বিরত থাকতেন। আর কারও মধ্যে এ ক্রটি দেখতে পেলে তার প্রতিবাদ করতেন। একবার হযরত আলী (রা) সম্পর্কে হযরত  মুগীর ইবন শুবা (রা) একটি আশোভন উক্তি করেন। সাথে সাথে হযরত যায়িদ (রা) বলেনঃ রসূল (সা) মৃতদেরকে খারাপ বলতে নিষেধ করেছেন। আলী (রা) মারা গেছেন। এখন তাকে খারাপ বলছেন কেন?

মানুষের বিপদ মুসীবতে খোঁজ-খবর নেওয়া এবং সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকা করা ছিল তাঁর স্বভাব। হাররার ঘটনায় হযরত আনাসের এক চেলৈ এবং তার কিছু আতœীয় বন্ধু মারা যান। হযরত যায়িদ (রা) সববেদনাও সহমর্মিতা প্রকাশ করে আনাসের (রা) কাছে একটি চিঠি লেখেন। তাতে তিনি বলেনঃ আমি আপনাকে আল্লাহর সুসংবাদ শুনাচ্ছি। রাসূল (সা) বলেছেঃ হে আল্লাহ আনাসার তাদর সন্তান-সন্তুতি অধঃস্তন পুরুষ, তাদের নাতী-নাতনী এবং তাদের সকল ছেলে মেয়েদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন।২০

তিনি তাঁর সমকালীন ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও গুণাবালীকে অত্যন্ত উদার চিত্তে স্বীকৃতি দিতেন। একারণে কেউ কোন বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেসা করতে এলে তাকে সেই বিষযে অভিঙ্গ ব্যক্তির কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। একবার আবুল মিনহাল আসলেন তাঁর কাছে ব্যায় সারফ সম্পর্কে জিঞ্জাসা করো। এ ব্যাপারে তিনি আমার চেয়ে ভলো এবড় বড় আলিমঃ আবুল মিনহাল বারা এর কাছে গেলেন। তিনি মাসায়ালার জবাব দিয়ে বললেনঃ আামি যা বলেছি এর সত্যতা যাচাই করে নিবে। যায়িদ ইবন আরকামের  নিকট থেকে। তিনি আমার চেয়ে বেশি এবং ভালো জানেন।

আমীর- উমারদের সাথে তাঁর উঠা বসা ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে ব্যবাসেয়র দ্বারা জীবিবা নির্বাহ করতেন।

হযরত যায়িদ ইবন আরাকাম ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিশ্বাস এবং ইবাদাত সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তা ছাড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ য়ে ব্যক্তি  নিষ্টার সাথে লা ইলাহা ইল্লাহল্লাহ পাঠ করবে, সে জান্নাতে যাবে। জিঞ্জাসা করা হলোঃ নিষ্ঠার সাথে পাঠ করার অর্থ কি? বললেনঃ আল্লাহর নিষেধ থেকে বিরত থাকা।২১

একাবর কিছু লোক কুবার মসজিদে চাশতের নামায পড়ছিলো। ঐ পথে কোথাও যাচ্ছিলেন। লোকদের নামায পড়তে দেখে বললেন, সম্ববত তাদের জানা নেই যে এ নামাযের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আছে।

তথ্যসূত্র:

যায়িদ ইবন সাবিত (রা)

রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম শ্রেষ্ট সাহাবী হযরত যায়িদ (রা) এর বেশ কয়েকটি উপনাম বা ডাকনাম সীরাত গ্রন্থসূমহে পাওয়া যায়। যেমনঃ আবু সাঈদ, আবু খারিজা, আবু আবদির রহমান ও আবু সাবিত।১ মুসলিম উম্মাহ তাকে অনেকগুলি উপধিতে ভূষিত করেছে। যেমনঃ হাবরুল উম্মাহ, কাতিুবুল ওহী ইত্যাদি। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতা সাবিত ইবন  দাহহাক এবং মাতা নাওয়ার বিনতু মালিক।২ নাওয়ার ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) খান্দনের মেয়ে।

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার পূর্বে মদীনার অধিবাসীদের পরস্পরের মধ্যে যে সব রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংঘর্ষ হয় তার মধ্যে বুয়াস যুদ্ধটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এ যুদ্ধে যায়িদের পিতা সাবিত নিহত ন। এটা হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। তখন যায়িদের বয়স মাত্র ছয় বছর। তিনি মায়ের তত্ত্বাধানে বড় হন। রসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিযরাতের সময় যায়িদ এগারো বছরের এক বালক মাত্র।৩

তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন মদীনায় ইসলামের ভিত্তি কুব একটা মজবুত হয়নি। মক্কা  থেকে হযরত রাসূলে কারীম (সা) প্রেরিত সুবাল্লিগ হযরত মুসা’য়াব ইবন উমাইর (রা) যখন মাদীায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন  তখন কোন এক সময়ে আতি অল্প বয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বালেগ হওয়ার পূর্বে ঈমান আনা যাদি কোন গৌরবের বিষয় হয় তাহলে হযরত যায়িদ সেই গৌরবের বিষয় হয় তাহলে হযরত যায়িদ সেই গৌরবের অধিকারী। জীবনের সূচনা থেকেই এভাবে তিনি শিরকের পস্কিলতা থেকে মুক্তি থাকেন।

তিনি ইসলাম গ্রহন পর থেকেই কুরআন পড়তে শুরু করলেন। মানুষ ও তাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। তিনি ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী ও তীক্ষè ধীশক্তির অধিকারী।৪ রাসূলুল্লাহর (সা) রবার নিয়ে গেল এবং এই বলে পরিচয় করে দিল যে, ছেলেটি নাজ্জার গোত্রের। এরই মধ্যে সে সতেরটি সূরার পাঠ শেষ করেছে। রাসূল (সা) তাঁর মুখ থেকে কুরআন তিলওয়াত শুনে খুব খুশি হলেন।৫ যায়িদ বলেনঃ তখন আমার বয়স মাত্র এগারো বছর।৬ বদর যুদ্ধের সময় তিনি তের (১৩Ñ) বছরের এক বালক মাত্র। যুদ্ধে যাওয়ার বয়স তখনো হয়নি। তবুও আনসারও মুহাজিরগণ যখন বদরের দিকে যাত্রা  করলেন তখন এ বালকও যুদ্ধে যাওয়ার সিন্ধান্ত নিলেন। তাঁরই মত ছোটদের একটি দলের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে উপস্থিত  হয়ে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যুদ্ধের বয়স না হওয়ার কারনে রাসূল (সা) তাদেরকে সান্তনা দিয়ে ফিরিয়ে দেন।৭

হযরত যায়িদ সর্ব প্রথম কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন সে বিষয়ে সীরাত বিশেঙ্গদের মতভেদ আছে। আনেকের ধারণা তিনি উহুদে যোগদান করেন। এটাই তাঁর বয়স ষোল পূর্ণ হয়ে গেছে। আবার আনেকে বলেছেন, খন্দক তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধ।৮ আল ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, যায়িদ ইবন সাবিত বলেনঃ আমাকে বদর ও উহুদে অংশ গ্রহনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। খন্দকে প্রথম অনুমতি পাই।৯ ইবন হিশামও বলেন, তাঁর বয়স কম হওয়ায় রাসূল (সা) অন্যদের সাথে তাঁকেও উহুদে ফিরিয়ে দেন।১০

হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থে যায়িদ ইবন সাবিতের একটি বর্ণনা সংলিত হয়েছে। তাদ্বারা বুঝা যায়, তিনি উহুদে অংশ গ্রহন করেছিলেন। তিনি বলেনঃ উহুদের দিন যুদ্ধ শেষে রাসূল (সা) আমাকে সা’দ ইবনুর রাবীকে খুঁজতে পাঠালেন। যাবার সময় বলে দিলেনঃ যাদি তাঁকে পাও আমার সালাম জানাবে। আর তাকে বলবে রাসূলুল্লাহ (সা) জানতে চেয়েছেন, তুমি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছো?

যায়িদ বলেনঃ আমি শহীদদের মাঝে ঘুরে ঘুরে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। এক সময় পেয়ে গেলাম। তখন তাঁর অন্তিম মুহূর্ত। সারা দেহে তাঁর তীর,বর্শ ও তারবারির সত্তরটি আঘাত। বললামঃ সা’দ  রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি সালাম এবং তোমার প্রতিও। তুমি বলবে, আমি জান্নাতের খোশবু লাভ করছি।১১

যাইহোক, খন্দক যুদ্ধে যে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। যায়িদ (রা) বলেনঃ রাসূল (সা) আমাকে খন্দকে আংশগ্রহণের অনুমতি দেন এবং এক খন্ড কুবতী (মিসরীয় সূক্ষè ও শুভ্র) বস্ত্র ও দান করেন।১২ খন্দক খনন ও মাটি বহনে অংশ নেন। এ অবস্থায় আম্মার একবার রাসূলুল্লাহর (সা) দৃষ্টিতে পড়লে তিনি মন্তব্য করেনঃ বেশ ভালো ছেলে তো।১৩ এই ঘটনাক্রমে একমসয় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এই অবস্থায় ইবন হাযাম একটু রসিকাত করে তাঁর কাঁধ থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেন। যায়িদ টের পেলেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছেই ছিলেন। তিনিও একটু রস করে ডাক দিলেনঃ ইয়া আবা রুকাদ! ওহে নিদ্রাকাতর ব্যক্তি ওঠো। তারপর তিনি লোকদের এ ধরনের মশাকারা করতে নিষেধ দেন।১৪ এই খন্দক থেকে নিয়ে পরবর্তীকালের সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।১৫

তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত যায়িদের (রা) গোত্র মালিক ইবন নাজ্জার ঝান্ডা প্রথম ছিল আম্মারা ইবন হাযামের হাতে। পরে রাসূল (সা) সেটি যায়িদের হাতে অর্পণ করেন। এতে আম্মার মানে করেন, হয়তো তাঁর কোন ক্রটি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার কোন ক্রটি হয়েছে কি? তিনি জবাব দেনঃ না, তেমন কিছু নয়। আমি কুরআনের বিষয়টি প্রতি লক্ষ্য রেখে একাজ করেছি। যায়িদ তোমার চেয়ে বেশি কুরআন পড়েছি। কুরআনই অগ্রাধিকারযোগ্য।১৬

খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফাতকালে ভন্ড নবী মুসায়ালামা আল-কাজ্জাবের সাথে ইয়ামামার যুদ্ধ হয়। এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যায়িদও (রা) অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর গায়ে একটি তীর লাগে। কিন্তু তিনি মারাতœক আঘাত থেকে বেঁচে যান।১৭ খলীফা উমারের (রা) আমালে খাইবার থেকে ইহুদীদের বিতাড়নের পর তথাকার ওয়াদি-উল-কুরা’ মুসলামানদের মধ্যে বন্টন করা হয়। যায়িদও (রা) একটি অংশ লাভ করেন।১৮

খলীফা উসমান (রা) যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা গ্রহবন্দী তখন মদীনার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিদ্রোহীদের সাথে লড়াবার জন্য খলীফার অনুমতি চান। এ সময় যায়িদ ইব্ন সাবিতও (রা) খলীফার সাথে দেখা করে বলেনঃ আনসাররা আপনার দরজায় হাজির আপনি চাইলে তারা আবারও আল্লাহর আনসার হিসাবে কাজ করতে প্রস্তুত। খলীফা বলেনঃ তোমারা যদি লড়াই করার ইচ্ছা করে থাক তাহলে তাতে আমার সম্মতি নাই।১৯

হযরত যায়িদ ইবন সাবিতের (রা) গোটা জীবন সৎকর্মের সমষ্টি। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) সেক্রেটারী। ওহী লিখতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি-পত্র লিখতেন এবং যে সব চিঠি-পত্র আসতো তা পাঠ করে শোনাতেন। পরবর্তীকালের খলীফা উমারেরও (রা) সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন।২০

পবিত্র কুরআন ইসলারে মূল ভিত্তি। এর সংগ্রহ ও সংকলন করার মহা গৌরবের অধিকারী হলেন কতিবুল ওহী যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।২১ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবনকাল পর্যন্ত হাড়, চামড়া খেজুরের পাতা  ও মুসামান হাফেজদের স্মৃতিতে কুরআন সংরক্ষিত ছিলো। বহু সাহাবী কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। এ কল হাফেজদের মধ্যে যায়িদও একজন।

হযরত রাসূলের কারীমের (সা) ইনতিকালের পর আরব উপদ্বীপের একদল মানুষ মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগ করা) হয়ে মুসায়লামা আলÑকাজ্জাবের দলে ভিড়ে যায়। সে ইয়ামামায়ে নিজেকে নবী বলে ঘোষনা করে। হযরত আবু বকর (রা) তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করেন। মুসয়ালামা ইয়ামামার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তবে এ যুদ্ধে ৭০ জন হাফেজ  কুরআন শাহাদাত বরণ করেন।

এ ঘটনার পর হযরত উমারের (রা) অন্তরে কুরআন সংগ্রহ করার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তিনি খলীফা আবু বকরকে (রা) বলেন, এভাবে হাফেজদের শাহাদাতের ধারা অব্যাহত থাকলে কুরআনের বিরাট অংশ এক সময় হারিয়ে যাবার আশংকা আছে। সুতারং বিলম্ব না করে গোটা কুরআন এক স্থানে সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নিন। খলীফা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন। তিনি যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে বলেন,  তুমি একজন বুদ্ধিমান নওজোয়ান। তোমার প্রতি সবার আস্থা আছে। তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ওহী লিখেছিলে। সুতারা এ কাজটি সম্পাদন কর।২২

হযরত যায়িদ (রা) বলেনঃ আল্লাহর কসম! তাঁরা আমাকে কুরআন সংগ্রহ করার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা করার চেয়ে একটি পাহাড় সরানোর দায়িত্ব দিলে তা আমার কাছে অধিকতর সহজ হতো।২৩ তিনি খলীফাকে বললেনঃ তা ঠিক। তবে ভালো কাজে অসুবিধা কি? তারপরেও যায়িদ কাজটি করতে ইতস্তত করতে থাকেন। খলীফা বিভিন্নভাবে বুঝানোর পর তিনি রাজী হয়ে গেলেন।২৪

এ কাজে যায়িদকে সহোযোগিতার জন্য খলীফা আবু বকর (রা) আরও একদল সাহাবাকে দিলেন। দলটির সংখ্যা ৭৫ বলে বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উবাই ইবন কা’ব ও সা’ ঈদ ইবনুল আসও (রা) ছিলেন। হযরত যায়িদ খেজুরের পাতা, পাতলা পাথর ও হাড়ের ওপর লেখা কুরআনের সকল অংশ সংগ্রহ করলেন। হাফেজদের পাঠের সাথে তা মিলিয়ে দেখলেন। তিনি নিজেও আল কুরআনের একজন হাফেজ ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে আল কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন।২৫

আয়াতের সত্যতা এবং বিশুদ্ধাতা যাচাইয়ের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্ক ও ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যেত। এক স্থানে পৌঁছে যায়িদ বললেন, এরপর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট রজমের আয়াত থেকে শুনেছিলাম। হযরত উমার (রা) বললেনঃ কিন্তু রাসূল (সা) তা লেখার  আনুতি দেননি।২৬ মোট কথা কঠোর পরিশ্রম করে হযরত যায়িদ (রা) এ গুরুত্বপূর্ন কাজ সমাপ্ত করেন।তাঁর দ্বারাই সম্পর্ণ আল কুরআন সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করা হয়।

একটি আয়াতের ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রমানের নিয়ম ধরা হয়েছিল প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে কম পক্ষে দু’ ব্যক্তি সাক্ষ্য। আয়াতটি ছিল হযরত আবু খুযায়মার (রা) নিকট। ইনি সেই আবু খুযায়মা যাঁরা একার সক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষোর সমান বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন। একারণে হযরত যায়িদ উক্ত আয়াতিটি ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন সাক্ষ্যের প্রযোজন মনে করেননি। তাছাড়া আয়তটি তাঁর নিজের জানা ছিল।২৭ হযরত যায়িদ (রা) কর্তৃক সংগৃহীত ও লিখিত কুরআন মাজীদের এ কপিটি খলীফা হযরত আবু বকর (রা) নিজের হিফাজতে রাখেন। তাঁর ইনতিকালের পর দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) হাতে হয়ে তা তাঁর কণ্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার (রা) এর হাতে পৌঁছে এবং সেখানে সংরক্ষিত হয়।২৮

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের (রা) খিলাফতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে যখন আল কুরআনের পাঠে তারতম্য দেখা দেয় তখন হযরত হুজায়ফা ইবনুল ইয়মান (রা) খলীফাকে পরামর্শ দেন যে, ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই আননি তা রোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। খলীফাও এর গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুধাবন করেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) সংগৃহিত আল কুরআনের কপিটি হযরত হাফসার (রা)নিকট থেকে চেয়ে নেন। তারপর হযরত যায়িদ ইবন সাবিত,আবদুল্লাহ ইবনুয্য়ুবাইর, সা’ঈদ ইনুল আসও আবদুর রহমান ইবনুল হারেস ইবন হিশাম (রা) এ চারজন বিশিষ্ট সাহাবিকে তার থেকে কপি করার নির্দেশ দেন। তাঁর হযরত আবু বকর (রা) ঐ মূল কটি থেকে পাঁচ কপি নকল করে দেন। খলীফা উসমান (রা) এই কপিগুলো খিলাফতের পাঁচটি অঞ্চেলে পাঠিয়ে দেন এবং হযরত আবু বকর (রা) কর্তৃক প্রস্তুকৃত মূল কপটি যা মাহসাফে সিদ্দীকী নামে প্রসিদ্ধ -আবার হযরত হাফসার (রা) নিকট ফিরিয়ে দেন।২৯ নিরক্ষর নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা) ওহী লেখার দায়িত্ব বিভিন্ন সাহাবীর ওপর অর্পণ করেছিলেন। এ সকল ভাগ্যবান সাহাবীর অন্যতম হলেন হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।

হযরত যায়িদ কলম, কাগজ, দোয়াত, খেজুর পাতা, চাওড়া ও পাতলা হাড়, পাথর ইত্যাদি নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে যেতেন। যখন ওহী অবতীর্ণ হতো রাসূল (সা) বলে, যেতেন, আর তিনি লিখে চলতেন। লেখা সম্পর্কে বিশেষ কোন নির্দেশ থাকলে রাসূল (সা) তা বলে দিতেন, আর যায়িদ তদানুযায়ী কাজ করতেন।

ইমামা বুখারী (রহ) আল-বারা (রা) থেকে বর্ণনা করেছের। যখন সূরা আন-নিসার ৯৫ নং আয়াতটি-

(গৃহে উপবিষ্ট মুসলমান এবং ঐ মুসলমান য়ারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে-সমান নয়।) নাযিজ হলো তখন রাসূল (সা) বললেনঃ কাঠ দোয়াত হাড়, নিয়ে যায়িদকে আমার কাছে আসতে বলো, যায়িদ এলে তিনি আয়াতটি লিখতে বললেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পিছনে তখন অন্ধ সাহাবী আমার ইবন উম্মে মাকতুম বসা ছিলেন। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ!আমার ব্যাপারে কি হুকুম? আমি তো একজন অন্ধ মানুষ। তখন যাদের কোন সঙ্গত ওযর নেই অংশটি নাযিল হয়। তখন রাসূল (সা) যায়িদকে আয়াতটি এভাবে সাজিয়ে বলেনঃ৩০ যায়িদ পরে অবতীর্ণ অংশটুকু হড়ের ফাটার মধ্যে লিখে নেন। কারন, যে হাড়টি মধ্যে পূর্বে আয়াতটি লেখা হয়েছিল তা ফাটা ছিল।৩১

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের সাথে সাথে আনসাদের মধ্যে খিলাফতের বিষয়টি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা সাকীফা বনী সায়িদায় সমবেত হন এবং তাদের নেতৃত্বের আসন অলস্কৃত করেন প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) তাঁরই মনোনীত ব্যক্তিরা সেখানে বক্তৃতা করছিলেন এবং আনসারদের একটি বড় দল ছিলেন তাঁর সমর্থক। এ মজলিসে যায়িদ ইবন সাবতও উপস্থিত  ছিলেন। কিন্তু জনতার মতেন বিরুদ্ধে তখন কথা বলা সহজ ছিল না। এ জন্য তিনি চুপ করে বসে থাকতেন।

তারপর হযরত আবু বকর উমার ও আবু বকর উবাইদাহ (রা) সাকীফা বনী সায়িদাÑয় পৌঁছালেন এবং মুহাজিরদের পক্ষ থেকে উমার (রা) খিলাফাতের বিষয়টি আলোচনা শুরু করলেন। তখন সর্ব প্রথম যে আনসারী ব্যক্তি তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেন তিনি যায়িদ ইবন সাবিত।

হযরত হুবাব ইবনুল মুনজির (রা) একজন আনসারী ও বদরী সাহাবী।  তিনি যখন তাঁর বক্তৃতায় দুই আমীরের তত্ব পেশ করে মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বললেনঃ আপনাদের মধ্য থেকে একজন এবং আমাদের মধ্যে থেকে একজন আমীর হবেন। এছাড়া আর কিছুতেই আপোষ হবেনা। তখন যায়িদ ইবন সাবিত উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর বক্ত্যব্যের প্রতিবাদ করে এক নতুন তত্ব দিলেন। তিনি বলেনঃ রাসূল (সা) ছিলেন একজন মুহাজির। এখন ইমাও হবেন একজন মুহাজির। আর আমরা যেমন ছিলাম রাসূলের (সা) আনসার তেমনিভাবে এখন হবো ইমামের আনসার। একথা বলে তিনি আবু বকরের (রা) একটি হাত ধরে আনসারদের লক্ষ্য করে বলেনঃ এই তোমাদের বন্ধু তোমার হাতে বাইয়াত কর।৩২

হযরত যায়িদ (রা) এ বক্তব্য ছিল তারই গোত্রের লোকদের বিপক্ষে। তা সত্ত্বেও  স্বীয় অনুভূতি প্রকাশ করতে কুন্ঠবোধ করেননি। তাঁর বক্তব্য শেষ হরে হযরত আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে যায তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বরেন, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান দিন। যদি এর বিপরীত কিছু বলা হতো তাহলে  আমার  হয়তো মনতাম না।৩৩

হযরত রাসূলে করীম (সা) মদীনায় আসার পর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ ও এলকার রাজা বাদশা, আমীর উমা, ও গোত্র প্রধানদের চিঠিপত্র বিভিন্ন সময় তাঁর নিকট আসতে থাকে। যার বেশীর ভাগই হতো সুরইয়সী ও ইবরানী হিব্র“ ভাষায়। মদীনায় তখন এ দুটি ভাষা জানতো শুধু ইহুদিরা। তাদের ছির আাবার ইসলামের সাথে চরম দুশমনী। এ কারণে উক্ত ভাষা দুটি আয়ত্ত করা ছিল মুসলমাদের একান্ত প্রয়োজন।

হযরত রাসূলে করীম (সা) এ প্রয়োজনে তীব্রভাবে অনুভব করলেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) মেধার পরিচয় পেয়ে তাঁকেই এ কাজের জন্য নির্বাচিত করলেন। এ প্রসঙ্গে হযরত যায়িদের (রা) একটি বর্ণনা উদ্ধৃত হলোঃ

রাসূল (সা) মদীনায় এলে আমাকে তাঁর সামনে হাজির করা হয়। তিনি আমাকে বললেনঃ যায়িদ আমার জন্য তুমি ইহুদিদের লেখা শিখ। আল্লাহর কসম! তারা আমার পক্ষ থেকেইবরানী ভাষায় যা কিছু লিখা থাকে তার ওপর আমার আস্থা হয় না। তাই আমি ইবরনী ভাষা শিখলাম। মাত্র আধা মাসের মধ্যে এতে দক্ষতা অর্জন করে ফেললাম। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) ইহুদীদেরকে কিছু লেখার দরকার হলে আমিই লিখতাম এবং রাসূলকে (সা) কিছু লিখলে আমিই তা পাঠ করে শুনাতাম।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূল (সা) আমাকে বললেনঃ যায়িদ তুমি কি সুরইয়ানী ভাষা ভালো জান? এ ভাষায় আমার কাছে টিঠি পত্র আসে। বললামঃ না। তিনি বললেনঃ তাহলে এ ভাষাটি লিখে ফেল। এরপর আমি মাত্র সতের দিনে ভাষাটি শিখে ফেললাম।৩৪

যায়িদের (রা) এই সীমাহীন মেধা ও জ্ঞানের কারণে হযরত রসূলে কারীম (সা) যাবতীয় লেখালেখির দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করেন। মুহাম্মদ ইব উমার বলেনঃ যায়িদ আরবী ও ইবরানীÑদু ভাষাতেই লিখতেন।৩৫ বালাজুরী বলেনঃ সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন উবাই ইবন কা’ব আলÑআনসারী। উবাই এর অনুপস্থিতিতে যায়িদ এ দায়িত্ব পালন করের। তাঁরা ওহী ছাড়াও রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি পত্র ও লিখতেন।৩৬  রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। হযরত আবু বকর (রা) ও উমারের (রা) খিলাফত কালেও এ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। তাবে তখন কাজের চাপ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় মুয়াইকিব আদÑদাওসীকে তাঁর  সহকারী নিয়োগ করা হয়।৩৭

ইসলামী হুকুমাতের একটি অতি মর্যাদাপূর্ন দফতর হলো বিচার বা কাজা। প্রসিদ্ধ মতে এ দফতারটি সৃষ্টি হয় হযরত ফারুকে আজমের খিলাফতকালে। রাষূল (সা) ও আবু বকরের (রা) আমলে পৃথকভাবে এ দফতরটি ছিল না। খলীফা হযরত উমার (রা) এর সূচনা করেন এবং হযরত যায়িদ ইবন সাবিতকে (রা) মদীনায় কাজী নিয়োগ করেন। তাবাকাত ইবন সা’দ ও আথবারুল কুজাত গ্রন্থে এসেছেঃ উমার (রা) যায়িদকে কাজী নিয়োগ কেরন এবং তাঁর ভাতাও বির্ধারণ করেন।৩৮

তখনও বিচারকের জন্য পৃথক আদালত ভবন বাড়ি নির্মাণ হয়নি। হযরত যায়িদের (রা) বড়িই ছিল দারুল কাজা বা বিচারলয়। ঘরের মেঝেতে ফরাশ বিছানো থাকতো। তিনি তার ওপর মাঝখানে বসতেন। রাজধানী মদীনা ও তার আশে পামের যাবতীয় মামলা মোকদ্দামা হযরত যায়িদের (রা) এজলাসে উপস্থিত হতো। এমন কি তৎকালীন খলীফা খোদ উমারের (রা) বিরুদ্ধেও এখানে মামলা দায়ের হয়েছে এবং তার বিচারও চলেছে।

ইমাম শা’বী বর্ণনা করেছেন। একবার খলীফা হযরত উমার (রা) ও হযরত উবাই ইবর কাবের (রা) মধ্যে একটি বিবাদ দেখা দিল। হযরত যায়িদের (রা) এজলাশে মুকাদ্দামা পেশ হলে। বিবাদী হিসাবে খলীফা উমার (রা) আদালতে হাজির হরেন। আধুনিক যুগে যেমন আাদালতে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানে বসার জন্য চেয়ার দানের নিয়ম হয়েছে, হযরত যায়িদ ও তমেনী খলীফাকে নিচের আসনের পাশে বসার স্তানে করে দেন। কিন্তু ইসলাম যে সাম্য ও মসাতার বিধান কায়েম করেছিল, সাহাবায়ে কিরাম (রা) তা অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। বিশেষত হযরত উমার(রা) তো এ ব্যাপারে ছিরেন আপোষহীন। তিনি বিচারক হযরত যায়িদের (রা) এ আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে বলেন, এ হলো আপনার প্রথম অবিচার। আমাকে আমার প্রতিপক্ষের সাথে বসা উচিত। অতঃপর বাদী বিবাদী উভয়ে আদালতের সাম্েন এক সাথে বসেন।

মামলার শুনানী শুরু হলো। হযরত উবাই (রা) ছিলেন বাদী। তিনি ছিলেন একটি বিষয়ের দাবীদার; পক্ষান্তরে উমার (রা) চিলৈলন অস্বীকারী। ইসলামী বিচার বিধি অনুাযায়ি অস্বীকারকরীর ওপর বসম বাশপথ দেওয়া ওয়াজিব। কিন্তু হযরত যায়িদ (রা)খিলাফতের সম্মান ও মর্যাদার প্রতিলক্ষরেখে বাদীকে বলেন, যদিও নিয়ম নয় তবুও আমি বলছি আপনি আমীরুল মুমিনীনকে কসম দানের বিষয়টি মাফ করেদিন। একথা শুনে আমীরুল মুমিনীন ক্ষোভের সাথে বললেনঃ যায়িদ ন্যায় বিচারক হতে পারবেন, যতক্ষন না উমাও সাধারন একজন মুসলমান তাঁর নিকট সমান হয়।৩৯

তৎকালীন খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে যদিও একাধিক স্থানীয় বাইতুল মাল ছিল, তবুও দারুল খিলাফা মদীনায় ছিল কেন্দ্রীয় বাইতুলমাল। হযরত যায়িদ (রা) ছিরেন এই কেন্দ্রীয় বাইতুলামলের দায়িত্বশীল। হিজরী ৩১ সনে খলীফা উসমান (রা) তাঁকে এ দায়িত্বে নিয়োগ কেরন। এই বাইতুলামলের কর্মচারীদের মধ্যে ওহাইব নামে যায়িদের (রা) একজন দাসও ছিলেন। তিনি চিরৈন খুবই বুদ্ধিমান। নানা কাজে যায়িদকে (রা) সাহায্য করতেন।

একদিন তিনি বাইতুল মালে কাজ করছেন। এমন সময় খলীফা উসমান (রা) সেখানে উপস্থিত হন। তিনি জিজ্ঞেসা করেনঃ এ কে? যায়েদ বলেনঃ আমার দাস। উসমান (রা) বলেনঃ আমাদের নিকট তার অধিকার আছে। কারণ সে মুসলমানদের সাহয্য করছে। মূলত তিনি বাইতুলমালের কাজের  প্রতি ইঙ্গিত  কারেন। তারপর তিনি দু হাজার দিরহাম তাঁর বেতন নির্ধারনের ইচ্ছা করেন। কিন্তু হযরত যায়িদ এক হাজার করার প্রস্তাব রাখেন। খলীফা তাতে রাজী হন। এভাবে তাঁর বেতন এক হাজার নির্ধারিত হয়।৪০ খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) আমালে মুহাজির ও আনসারদের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বেয়ে গঠিত মজলিসে শূরার একজন সম্মনিত সদস্য ছিলেন যায়িদ (রা)। খলীফা উমার (রা) উক্ত শূলাকে একটি উপদেষ্ট কাউন্সিলের রুপ দান করেন। যায়িদ (রা) তারও সদস্য ছিলেন।

হযরত যায়িদেরও (রা) মধ্যে ইল্ম ও দ্বীনের পূর্র্ণতার সাথে প্রশাসনিক যোগ্যতাও ছিল। তাঁর ওপর খলীফা উমারের (রা) এতখানি আস্তা ছিল যে, যখনি তিনি মদীনার বাইরে সফরে যেতেন, তাঁকেই স্থালাভিষিক্ত করে যেতেন। খলীফা উসমানও (রা) একই পন্থা অনুসারণ করেন। ইবন উমারের থেকে নাফে বর্ণনা করেছেন। উমার (রা) যখন হজ্জে যেতেন, যায়িদকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। উসমানও তাই করতেন।৪১

হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে মোট তিনবার খলীফার স্থলভিষিক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।  হিজরী ১৬ ও ১৭ সনে দু’বার। বালাজুরী বলেনঃ হিজরী ২৩ সনে রাসূলুল্লাহর (সা) সহধমির্নীদের সাথে নিয়ে উমার হজ্জ করেন। তখনও যায়িদ ইবন সাবিতকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।৪২ খলীফা উমার (রা) যখন শাম সফর করেন তখনও যায়িদকে (রা) দায়িত্ব দিয়ে যান। শামে পৌঁছে তিনি যায়িদের নিকট ওয পত্র লেখেন তাতে যায়িদরে সামটি খলীফার নিজের নামের আগেই উল্লেখ করেন। তিনি লেখেনঃ

-যায়িদ ইবন সাবিতের প্রতি উমার ইবনুল খাত্তাবের নিকট থেকে।৪৩

হযরত যায়িদ (র) অত্যন্ত সসতর্কতা ও যোগ্যতার সাথে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। হযরত উমার (রা) তাঁর দায়িত্ব পালনে খুশী হতেন এবং ফিরে এসে তাঁকে রাষ্টের পক্ষ থেকে কিছু না কিছু দান করতেন।

হাদীসে এসেছে, ঈমানের সত্তরটিও বেশী শাখা আছে। তার মধ্যে আমানদারী বা বিশ্বস্তাতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এমন কি রাসূলে (সা) বলেছেনঃ যার আমানতদারী নেই তার ঈমানও নেই। হযরত যায়িদ (রা) মধ্যে এ আমানাদতদারীর পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। তাই রাষ্ট্রের অর্থ বিষয়ক অনেক  গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব বিভিন্ন সময় তাঁর ওপর অর্পিত হয়েছে।

হযরত রাসূলে করীমের (সা) সময়কালে যে গনীমাতের মাল আসতো তার বেশীর ভাগ তিনি নিজ হাতে বন্টন করতেন। এতে একাজটি গুরুত্ব কত খানি তা বুঝা যায়। হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে ইযারমুকের যুদ্ধটি অতি প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীামতের বিপুল পরিমান সম্পদ বন্টনের ভার খলঅফা অর্পন করেছিলেন যায়িদের  ওপর। তাছাড়া খলীফা উমার (রা) যখন সাহাবাদের ভাতা নির্ধারণ করেন তখন আনাসাদের ভাতা বন্টনের দায়িত্ব তাঁকেই দেন। তিনি আয়ালী থেকে শুরু করেন। তারপর যাথাক্রমে আবদুল আশহাল, আউস, খাযরাজ প্রভৃতি গোত্রে বন্টন করে সব শেষে নিজের ভাতা গ্রহণ করেন।৪৪

হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন খলীফার দরবারের অতি ঘনিষ্টজন। হযরত উমারের (রা) নিকটতম ব্যক্তিগেদর মধ্যে তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে। খলীফা উসমানেরও (রা) তিনি বিশ্বাসভাজন ছিলেন। তাঁর খিলাফতের শেষ দিকে যখন চতুর্র্দিকে বিদ্রোহ ও অশান্তি ধূমায়িত হয়ে ওঠে তখনও যায়িদ (রা) ছিলেন খলীফার পক্ষে। সেই হাঙ্গামা ও বিশৃংখলার মধ্যে তিনি একদিন আনসারদের সম্বোধনরা করে বলেনঃ  ওহে আনসার সম্প্রদায়! তোমারা আরো একবার আল্লাহর আনাসার হও। দুঃখের বিষয় হযরত যায়িদের(রা) মত ব্যক্তির সে দিন ইতিহার সেই চরম ট্রাজেডী রুখতে পারেননি।

এই ব্যর্থতার কারণও ছিল। কিছু সাহাবায়ে কিরাম (রা) কেন যে হযরত উসমানের (রা) প্রতি সেদিন ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আবু আইউব আল-আনসারীর (রা) মত বিশিষ্ট সাহাবীও ছিলেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) কথার প্রতিবাদ করে বললেনঃ উসমানের সাহায্যের জন্য তুমি মানুষকে এজন্য উৎসাহিত করছে যে, তিনি তোমাকে বহু দাস দিয়েছেন। হযরত আবু আইউব (রা) ছিলেন বিশাল মর্যদার অধিকারী একজন আনসারী সাহাবী। তাঁর সামনে হযরত যায়িদের (রা) চুপ করে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিলনা।

তাহজীবুল কামাল গ্রন্থাকার হযরত যায়িদের (রা) একাধিক স্ত্রী ও ঊনত্রিশজন ছেলে-মেয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী হযরত সা’দ ইবন রাবী’ আল-আনাসারীর কণ্যা একজন।৪৫

হযরত সা’দ  ইবন রাবী ’ (রা) উহুদে শহাদাত বরণ করেন। দু’কন্যা ও স্ত্রী ও রেখে যান। স্ত্রী তখন গর্ভবর্তী। গর্ভের এই সন্তটিই উম্মু সা’দ বা উম্মুল আলা। ভালো নামস জামীলা। পরবর্তীকালে তিনিই যায়িদের (রা) সম্মানিত স্ত্রী। সা’দ (রা) যখন মারা যান তভন মীরামের আয়াতনাযিন হয়নি। এ কারণ জাহিলী প্রথা অনুযায়ী সাদের ভাই গোটা মীরাস আতœাসাৎ করে। তখনই রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মীরাসের আয়াত নাযিল হয়। তিনি সাদের (রা) ভাইকে ডেকে ২/৩ অংশ দু’ কন্যা এবং ১/২ অংশ স্ত্রীকে দিয়ে বাকী অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেন। তখনও গর্ভের সন্তানকে মীরাস দানের বিধান চালু হয়নি। পরবর্তীকালের খলীফা উমার (রা) গর্ভের সন্তানকে মীরস দানের বিধান চালু করলে হযরত যাযিদ স্ত্রীকে বললেনঃ তুমি যদি চাও তাহলে তোমার পিতার মীরাসের ব্যাপারে তোমার বোনদের সাথে কথা বলতে পার। কারণ, এখন আমীরুল মুমিনীন গর্ভের সন্তানদের মীরস ঘোষনা করেছেন। উম্মু সা’দ বললেনঃ না, আমি আমার বোনদের কাছে কিছুই চাইবো না।৪৬

হযরত যায়িদের (রা) সন্তানদের মধ্যে খারিজ ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তিনি বিখ্যাত সাতজন ফক্হীর অন্যত এবং উম্মু সা’ দের গর্ভজাত সন্তান। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান এবং একজন পৌত্রও নিজেদের যুগের বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা হাদীস শাস্ত্রের ইমাম হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর আযাদকৃত দাসের সংখ্যাও ছিল অনেক। তাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন সাবিত ইবন উবাইদ ও ওহাইব।

হযরত যায়িদের (রা) মৃত্যু সন সম্পর্কে প্রচুর মতভেদ আছে। ওয়াকিদীর মতে হিজরী ৪৫ সন। আলী-আল মদীনীর মতে হিঃ ৫১ আহমাদ ইবন হাম্বল ও আবু হাফ্স আলÑফাল্লাসের মতে হিঃ ৫১ এবং আলÑহায়সাম ইবন আদী ও অইয়াহইয়া ইবন মুঈেনের মতে হিঃ ৫৫ সনে তিনি মারা যান।৪৭ ইবন হাজার (রহ) বলেনঃ অধিকাংশের মতে হিজরী ৪৫ সনে তিনি মারা গেছেন।৪৮ মৃত্যাকলে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪/৫৫ বছর। মারওয়ান ইবন হাকাম তখন মদীনার আমীর। তাঁর সাথে যায়িদের (র) অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। তিনিই জানাযান নামায পড়ান।৪৯ তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে জনগন শোকভিত হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে জনগন শোকাভূত হয়ে পড়েন। হযরত আবু হুরাইরা (রা) তাঁর মৃত্যুর দিন মন্তব্য করেনঃ আজ হাবরুল উম্মাহ’ উম্মাতের ধর্মীয় নেতা চলে গেলেন।৫০ সালেম ইব আবদুল্লাহ বলেনঃ যায়িদ ইবন সাবিত যে দিন মারা যান সেদিন আমারা আবদুল্লাহ ইবন উমারের (রা) সংগে ছিলাম। আমি বললামঃ আজ  জনগণের শিক্ষক মারা গেলেন। ইবন উমার (রা) বললেনঃ আল্লাহ তাখে রহম করুন। উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি ছিলেন জনগণের শিক্ষক ও হাবর (ধর্মীয় নেতা)।৫১

প্রখ্যাত তাবেঈ ইবনুল মুসায়্যাব বলেনঃ আমি যায়িদ ইবন সাবিতের (রা) জানাযায় শরীক ছিলাম যখন তাঁকে কবরে নামানো হলো ইবন আব্বাস (রা) তোমারা যারা ইলম কিভাবে উঠে যায়  তা জানতে চাও তারা জেনে নাও এভবে ইলম উঠে যায়। আজ বহু ইলম চলে গলে। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে তিনি বলেনঃ আজ অনেক ইলম দাফন হয়ে গেল। হাত দিয়ে কবরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ এভাবে ইলম চলে যায়। একজন মানুষ মারা যায় এবং সে জানতে তা যদি অন্যরা না জানে তাহলে সে তার জ্ঞান নিয়েই কবরে চলে যায়।৫২ কবি হাসনাস ইÍ সাবিত (রা) একটি শোকাগাঁধা রচনা করেন। তাঁর একটি পংক্তি নিম্নরুপঃ৫৩

-হাস্সান ও তার পুত্রের পর কবিতার ছন্দ কে আর রচনা করবে?

বিরাআত, ফারেয়েজ, বিচার ও ফাতাওয় শাস্ত্রে হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। পবিত্র কুরআনের ভাষায় তিনি রাসখ ফিল ইলম (জ্ঞানে সুগভীর)। হযরত আবদ্ল্লুাহ ইবন আব্বাস (রা) যাকে সাহাবাদের মধ্যে ইলমের সাগর গণ্য করা হতো তিনিও যায়িদকে রাসেখ ফিল ইলম গন্য করতেন।৫৪ ইবনুল আসীরের মতে তিনি সাহাবা সমাজের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।৫৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) অন্যতম শ্রেষ্ট ছাত্র মাসরুক ইবন আজাদা বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবাদের মধ্যে ইলম জ্ঞান পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি। তাঁদের সকালের জ্ঞানের সমাবেশ ঘটেছে উমার, আলী আবদুল্লাহ মুয়াজ আবুদ দারদা ও যায়িদ ইবন সাবিত এই ছয়জনের মধ্যে। তিনি আরো বলেনঃ আমি দীনায় গিয়ে রাসূলুল্লহার (সা) সাহাবীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম,যায়িদ ইবন সাবিত আর রাসেখুনা ফিল ইলম এর অন্যতম ব্যক্তি।৫৬

ইসলাম যে সকল জ্ঞানÑবিজ্ঞানের ভিত্তিস্থাপন করেছে ইলমে কিরাআত তার মেধ্য বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। এ শাস্ত্রে হযরত যায়িদের পন্ডিত্য সাহাবায়ে কিরম ও তাবেঈনের প্রতিটি ব্যক্তি স্বীকার করতেন।

ইমাম শী’বীর মত শেষ্ট বিদ্বান তাবেঈ বলেনঃ যায়িদ ইলমে ফারায়েজের মত ইলমে কুরআতে ও সকল সাহাবীর ওপর শ্রেষ্টত্ব অর্জন করেছিলেন।৫৭

পবিত্র কুরআনের সাথে হযরত যায়িদের (রা) যে গভীর সম্পর্ক ছিল তার প্রমাণ  পাওয়া যায় তাঁর ইসলাম গ্রহণের সময়ের ঘটনা দ্বারা। মাত্র এগারো বছর বয়সে ১৭টি সূরা হিফজ করেন। অবশিষ্ট সূরা হিফজ করেন। জীবনে কুরআরন লেখালেখির মধ্যেই অতিবাহিত হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যখন যতটুকু ওহী নাযিল হতো তিনি জেনে লিখে নিতেন ও মুখস্থ করে ফেলতেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় গোটা কুরআন তাঁর মুখস্থ হয়ে যায়।৫৮ কাতাদাহ্ বলেনঃ চারজন তাঁদের সবাই আনাসার উবাই ইবন কা’ব মুয়াজ ইবন জাবাল, যায়িদ ইবন সাবিত ও আবু যায়িদ।৫৯ এ কারণে খলীফা আবু বকর (রা) যখন কুরআন সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নেনতখন এ দাযিত্ব পালনের জন্য যায়িদকে নির্বাচিত করেন। আর খলীফা উসমান যখন কুরআনের কপি তৈরী করান তখনও এ কাজে যায়িদের (রা) সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য মনে করেন।

হযরত উবাই ইবন কা’ব (রা) ছিলেন কুরার বা কুরআন পঠকদের নেতা। হযরত উমার (র) যায়িদকে তাঁরও ওপর প্রাধান্য দিতেন। আবদুর রহমান আসসুলামী একবার খলীফা উসমানকে কুরআন পাঠ করে শুনাতে চাইলে তিনি বললেন তাহলে তো তুমি আমাকে মানুষের কাজ থেকে বিরত রাখবে। তুমি বরং যায়িদ ইবন সাবিতের কাছে যাও। এ কাজের জন্য তাঁর হাতে বেশী সময় আছে। তাঁকে  শুনাও তাঁর ও আমার পাঠ একই। দু জনের পাঠে কোন ভিন্নতা নেই।৬০

হযরত যায়িদের কিরাআতের সিলসিলা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত চিল। সেহেতু তিনি কুরাইশদের মত পাঠ করতেন এ কারণে মানুষের ঝোঁক ছিল তাঁরই দিকে। হযরত উবাই ইবন কাবের জীবদ্দশায় যদিও তিনি এক্ষেত্রে সকলের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেননি,  তবে তাঁর মৃত্যুর পর গোটা মুসলিম বিশ্বের একক কেন্দ্রে পরিণত হন। বিভিন্ন অঞ্চলের মাসুষ মদীনায় তাঁর নিকট ছুটে আসতো।

গযরদ যায়িদ (রা) কুরআন মাজীদের যে কিরআত বা পাঠ প্রতিষ্টা করেন তা আজও বেঁচে আছে। ইবন আব্বাস, আবু আবদির রহমান, আসÑসুলামী, আবুল আলিয়া রাইয়্যাহী, আবু জাফর প্রমুখ ছিলেন কিরআত শাস্ত্রে তাঁর ছাত্র।৬১

পবিত্র কুরআনের পরেই মাহানবীর স্থান। তিনি অন্যদের মত বেশী হাদীস বর্ণনা করেননি। তবে তাঁর বৈশিষ্ট এই ছিল যে তিনি দিরায়াত বা যুক্তিকে কাজে লাগাতেন।  হযরত রাফে  ইবন খাদীজা (রা) বর্ণনা করলেন, রাসূল (সা) ভূমি ইজারা দিতে নিষেধ করেছেন। এ কথা যায়িদের (রা) কানে গেলে বললেনঃ  আল্লাহ রাফেকে ক্ষা করুন! তাঁর এত বেশি হাদীস বর্ণনার রহস্য আমর জানা আছে। আসল ঘটনা হলো। দু ব্যক্তি ঝগড়া করছিল। রাসূল (সা) তা দেখে বলেন এই যে যদি অবস্থা হয় তাহলে ইজারার ভিত্তিতে ভূমি চাষ করা উচিত নয়। রাফে শুধু শেষের অংশটুকু শুনেছেন।৬২

হযরত আয়িশা (রা) যুবইরের (রা) সন্তনাদের নিকট বর্ণনা করেন, যে রাসূল (সা) আসরের পরে তাঁর ঘরে দু রাকাত নামায আদায় করেছিলেন। তাঁরা এ দু’ রাকায়াতকে সুন্নাত মনে করে আদায় করা শুরু করেন। এ কথা যায়িদ (রা) জানতে পেরে বললেনঃ আল্লাহ আয়িশাকে ক্ষমা করুন! হাদীসের জ্ঞান তাঁর চেয়ে আমরা বেশী আছে। আসরের পরে নামায আদায়ের কারণ হলো, দুপুরে কয়েকজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সা) সাথেঞ সাক্ষাৎ করতে আসে। তারা প্রশ্ন করছিল, আর রাসূল (সা) উত্তর দিচ্ছিলেন। এভাবে জুহরের নামাজের সময হলে তা আদায় করেন। ঘরে ফেরার পর স্মরণ হয় যে, জুহরের ফরজের পরের দু’রাকা’য়াত সুন্নাত আদায় করেননি।তখন সেখানেই দু’রাকা’ য়েত নামায আদায় করেন। আল্লাহ আয়িশাকে ক্ষমা করুন। তাঁর চেয়ে আমর বেশী জানা আছে যে, রাসূল (সা) আসরে পরে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।৬৩

কোন হাদীস সহীহ হলে এবং সে সম্পর্কে তাঁর নিকট কেউ জিজ্ঞেসা করলে তিনি সমর্থন জানাতেন। একবার হযরত আবু সা’ঈদ খুদরী (রা) স্বৈরাচারী উমাইয়্যা শাসক মারওয়ানের সামনে সাহাবীদের মর্যদাবিষয়ক একটি হাদীস বর্ণনা করেন। মারওয়ানত বললেনঃ আপনি অসত্য বলছেন। যায়িদ ইবন সাবিত ও রাফে ইবন খাদীজা (রা) মারওয়ানের পাশে মঞ্চে বসে ছিলেন। আবু সা’ঈদ মারওয়ানকে বললেন, আপনি তাঁদের কাছে জিজ্ঞেসা করতে পারেন। মারওয়ান তা না করে আবু সা’ঈদকে মারার জন্য ছুড়ি তুলে ধরেন। তখন এ দুই মাহান সাহাবী আবু সা’ঈদের কথা সত্য বরে সামর্থন করেন।৬৪

হযরত যায়িদের (রা) অধিকাংশ হাদীস সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত। তাছাড়া আবু বকর উমার ও উসমান (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস বর্ণনা করেছেন।৬৫

হাদীস শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের তালিকা অনেক দীঘ। তাঁর কাছে যাঁরা হাদীস শুনেছেরন এবং তাঁঁর সুত্রে বর্ণনা করেছেন, এমন কয়েকজন বিখ্যাত সাহাবী ও তাবেঈর নাম এখানে উল্লেখ করা হলো।৬৬

ইবন আব্বাস, ইবন উমার, আনাস ইবন মালিক, আবু হুরাইরা, আবু সা’ঈদ খুদরী, সাহ্ল ইবন হুনাইফ, সাহ্ল ইবন সা’দ, আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আলÑখুতামী। এরা সকলে সাহাবী। সা’ঈদ ইবন মুসাইয়্যাব, কাসেম ইবন মুহাম্মদ, আবান ইবন উসমান, খারেজা ইবন যায়িদ (যায়িদের ছেলে এবং মীনার সপ্ত ফুকাহার এরকজন), সাহ্ল ইবন আবী হাসামা আবু আমার, মারওয়ান ইবন হাজম, ইবাইদ ইবন সাব্বাক, আতা ইবন ইয়াসার বুসর ইবন সা’ঈদ, হাজার আলÑমুদরী, তাউস, উরওয়া ইবন যুবাইর, সালমান ইবন যায়িদ, সাবিত ইবন উবাইদ, উম্মু সা’দ (যায়িদের স্ত্রী)। এছাড়া আরো আনেক। হযরত যায়িদের (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তুলনামূলকভবে অনেক কম। মাত্র ৯২ (বিরানব্বই) টি। তারমধ্যে পাঁচটি মুত্তফাক আলাইহি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বনের কারণে তাঁর হাদীসের সংখ্যা এত কম হয়েছে। অন্যথায় তাঁর অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে থাকা পড়েছে, বহু হাদীস শোনা এবং বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্যও হয়েছে। এত কম হাদীস বর্ণনার কারণ হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) একটি সতর্কবাণী। আর সে বানীই তাঁর মত আরও অনেককে বেশী হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে সংযমী করে তুলেছে। মুহাম্মদ ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাতে আনসারদের তৃতীয় তাবকায় তাঁকে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা জাহাবী তাজকিরাতুর হাফ্ফজ গ্রন্থে প্রথম তাবারয় তাঁর আলোচনা এনেছেন।

ফিকাহ্ শাস্ত্রে হযরত যায়িদ (রা) দারুণ পারদর্শী ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইফতার আসনে অধিষ্টিত হন। সাহ্ল ইবন আবী খায়সামা বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় মুহাজীরদের তিন ব্যক্তি ও আনসারদের তিন ব্যক্তি ফাতওয়া দিতেন। আনসারদের সেই তিন জনের একজন হলেন যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।৬৭ ইমাম শা’বী ও প্রখ্যাত তাবে’ঈ মাসরুক একই ধরনের কথা বর্ণনা করেছেন।৬৮ হযরত আবু বকর (রা) ও উমারের (রা) খিলাফতকালেও তিনি মদীনায় ইফতার মসনতেদ আসীন ছিলেন। শুধু তাই নয় হিজরী ৪৫ সন পর্যন্ত আমারণ এ পদে অধিষ্টিত থাকেন। ইবন সা’দ বর্ণণা করেছেন। খলীফা আবু বকর (রা) কোন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হলে কতিপয়  চিন্তাশীল ও ফিকাহবিদ আনাসার ও মুহজির সাহাবীর সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁদের  মধ্যে যায়িদ ইবন সাবিতও একজন। আর তাঁরই আবু বকর, উমার ও উসমানের (রা) যুদে ফাতওয়া দিতেন।৬৯

কাবীস ইবন জুওয়াইব বর্ণনা করেছেন যে উমার, উসমান,আলীর (রা) আমলে এমনকি হিজরী ৪০ সনে মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হিজরী ৪৫ সনে মৃত্যু পর্যন্ত যায়িদ (রা) মদীনার বিচার ও ফাতওয়া, কিরাআত ও ফারায়েজ শাস্ত্রের প্রধান ছিলেন।৭০ তাঁর যোগ্যতার পূর্ণ স্বীকৃতি খলীফা উমার (রা) দিয়েছেনভ তিনি যায়িদকে (রা) এত গুরুত্ব দিতেন যে তাঁকে মদীনার বাইরে কোথাও যাওয়ার অনুমতি দিতেন না। মদীনার বইরে বিভিন্ন স্থানে অতি গরুত্বপূর্ণ পদ শূণ্য হতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সম্পদনের জন্য উপযুক্ত লোকের প্রয়োজন দেখা দিত, আর সেজন্য খলীফার নিকট বিভিন্ন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হতো। তিনি তাঁদের কাউকে মনোনীত করতেন। কিন্তু যায়িদের নামাটি প্রস্তাব করা হেলই তিনি বলতেন, যায়িদ আমার হিসাবের বাইরে নেই। কিন্তু আমি কি করবো? মদীনাবাসী তাঁর মুখাপেক্ষী বেশী। কারণ তাঁর কাছে যা পারে অন্যার কাছে তা তারা পারে না।৭১

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার বলতেন, যায়িদ ছিলেন ফারুকী খিলাফতের একজন বড় আলীম। উমার (রা) সকল মানুষকে নানা দেশে ও শহরে ছড়িযে দিয়েছিলেন। ফাতওয়া ও সিন্ধন্ত দানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। কিন্তু যায়িদ মদীনায় বসে বসে মদীনাবাসী এবং সেখানে আগত লোকদের নিকট ফাতওয়া দিতেন।৭২

সুলায়মান ইবন ইয়াসার বলেনঃ ফাতওয়া, ফারায়েজ ও কিরাআতে উমার ও উসমান (রা) যায়িদের (রা) ওপর কাউকে প্রাধান্য দিতেন না।৭৩ প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত সা’ঈদ ইবন মুসায়্যাব একজন মস্তবড় মুজতাহিদ হওয়া সত্বেও ফাতওয়া বিচারে হযরত যায়িদের (রা) অনুসারী ছিলেন। তাঁর সামনে যখন কোন মাসয়ালা বা প্রশ্ন আসতো এবং মানুষ অন্যান্য সাহাবীর ইজতিহাদসমূহ বর্ণনা করতো তখন তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করতেন, এ ব্যাপারে যায়িদ কি বলেছেন? বিচার ফায়সালায় যায়িদ ছিলেন সবচেয় বেশী জ্ঞানী। আর যে সকল বিষয়ে কোন হাদীস পাওয়া যায় না সে সম্পর্কে মাতাত দানের ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশী অন্তদৃষ্টির অধিকারী। তাঁর কোন কথা থাকলে তাই বল।৭৪

ইমাম মালিক (রহ) ছিলেন মদীনার ইমাম। আজও তিনি ফিকাহ ও হাদীস শাস্ত্রে অগাণিত মানুষের ইমাম। তিনি বলতেন, উমারে (রা) পরে যায়িদ ইবন সাবিত ছিলেন মদীনার ইমাম। ইমাম শাফেঈও (রহ) ফারায়েজ শাস্ত্রের সকল মাসয়ালা হযরত যায়িদের তাকলীদ করেছেন।৭৫

ফকীহ সাহাবীদের তিনিটি তাবকা বা স্তর ছিল। এর প্রথম তাবকায় ছিল হযরত যায়িদের (রা) স্থান। তিনি জীবনে বিপুল পমিাণ ফতওয়া দিয়েছেন। সবগুলি একত্রে সংগ্রহ করা হলে বিরট আকারে একটি  বই হবে।৭৬

হযরত যায়িদের (রা) ফিকাহ্ তাঁর জীবনকালে জনগণের নিকট ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। হযরত সা’ঈদ ইবন মুসায়্যাব বলতেন, যায়িদ ইবন সাবিতের এমনস কোন কথা নেই যার ওপর মানুষ সর্বসম্মতভাবেব  আমল করেনি। সাহাবাদের মধ্যে বহু ব্যক্তি এমন ছিলেন  যাঁদের কথার ওপর কেউই আমল করেননি। কিন্তু হযরত যায়িদের (রা) ফাতওয়ার ওপর তাঁর জীবনকালেই পূর্ব Ñপশ্চিমে সকল মানুষ আমল করেছে।

মানুষের ধারণা  ফিক্হা শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ও প্রসারের নিমিত্ত হচ্ছেন চারজন সাহবী ব্যক্তিত্ব। যায়িদ ইবন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আবদুল্লাহ ইবন উমার ও আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)। তাঁদের শিষ্য শ্গারিদদের মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাহনে ইলমে দীনের ্রসার ঘওর। কিন্তু মদীনা ছিল ইসলামের উৎস ও নবীর (সা) আবাস স্থল। এ ঘটনা যায়িদ ও তাঁর ছাত্রদের বদৌলতে জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র পরিণত হয়।

ফকীহ সাহাবীদের দুটি মজলিস ছিল। একটির সভাপতি ছিলেন হযরত উমার (রা) আর অন্যটির হযরত আলী (রা)। হযরত যায়িদ (রা) ছিলেন উমারের (রা) মজলিসের সদস্য। এখানে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হতো এবং জটিল ও গুরুত্বপূর্ন মাসয়ালা সম্পর্কে সিন্ধান্ত গৃৃহীত হতো।

যে সকল বিষয় এখনো বাস্তবে ঘটেনি সে সম্পর্কে কোন প্রশ্নের জবাব তিনি দিতেন না খারেজা ইবন যায়িদ বর্ণনা করেন, কোন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেÑ এটা কি ঘটেছে, না ঘটেনি?  এ রকম প্রশ্ন না কে র তিনি কোন মতামত দিতেন না। বিষয়টি যদি বাস্তবে না ঘটতো তাহলে সে সম্পর্কে কিছুই বলতেন না।আর ঘটলে বলতেন।৭৭

হযরত যায়িদ (রা) সাধারণতঃ সব সময়ে জ্ঞান বিতরণে নিয়োজিত থাকতেন। তা সত্বেও সর্ব সাধারণের সুবিধার্যে মসজিদে নববীতে একটি নিদিষ্ট সময়ে ফাতওয়া ও মাসায়ালার জবাব দিতে বসতেন।

হযরত যায়িদের (রা) মাসায়ালাসমূহ ফিকাহর সকলের অধ্যায়ে পরিব্যাপ্ত।তার বিস্তারিত আলোচনা সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। এখানে সংক্ষেপে কয়েকটি মাসায়ালা তুলে ধরছি।

১. তিনি বলেছেন, ফরজ নামায ছাড়া অন্য নামায ঘর আদায় করা উত্তম।৭৮ তিনি বলেছেন, কাড়ীদে পরুশের সামায আদায় একটি নূর বা জ্যোতি বিশেষ। পুরুষ যখন ঘরে নামায়ে দাঁড়ায় তখন তার পাপসমূহ মাথার ওপর ঝুরন্ত অবস্থায় থাকে। একটি সিজদা দেওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তার পাপ মুছে দেন।৭৯

২. এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলো জুহর ও আসরে কি কিরআত আছে? বললেনঃ হ্যাঁ। রাসূল (সা) দীর্ঘ সময় ধরে এ দুটি নামায কিয়াম (দাড়িয়ে থাকা) করতেন এবং এ সমং তার ঠোঁট ও নাড়াচাড়া করতো।৮০ এর অর্থ এ নয় যে ইমামের পিছনে মুকতাদিরও কিরাআত করা উচিত। মূলতঃ প্রশ্নটি  ছিল ইমাম সম্পর্কে, মুকতাদি সম্পর্কে নয়। প্রশ্নের উদ্দেশ্যে হলো জুহর ও আসর নামাযে কি কিছু পড়া  হয়? যায়িদ ইবন সাবিত, আবু কাতাদাহ ও সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) থেকে যে সব বর্ণনা এসেছে তার কোনটি দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে. সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) পিছনে কিরআত করেছেন।

৩. কোন ব্যক্তি যদি নিজের বাসগৃহে নজের জীবদ্দশা পর্যন্ত কাউকে থাকার জন্য দান করে তাহলে তার মৃত্যুর পর তার ছেলেরা তার ওয়ারিস হবে। হযরত যায়িদের বর্ণনায় এর বিবরণ এসেছে। তিনি বলেছেনঃ

৪. হযরত যায়িদের মতে, যতদিন পর্যন্ত বাগানে ফল ভালো মত না আসে অথবা গাছে খেচুর  পরিপক্ক না হয় ততদিন তা আন্দাজে বেচাকেনা নাজায়েজ।৮১

ইসলাম পূর্ব আমলে মদীনায় গাছে  ফল পরিপক্ক হওয়ার আগেই বিক্রির প্রথা ছিল। এরত যকন ক্রেতার  লোকসান হতো তখন দু পক্ষের মধ্যে বিবাদ শুরু হতো। রাসূল (সা) মদীনায় এসে এর অবস্থা দেখে এ ধরনের কেনাবেচা করতে নিষেধ করেন।

ফিকাহর অন্য সকল অধ্যায়ের চেয়ে ফারায়েজ এর অধ্যায় ছিল হযরত যায়িদের বিশেষ পারদর্শিতা। রাসূলুল্লাহর (সা) একটি হাদীসে এসেছে:৮২ আমার উম্মতের সবচেয়ে বড় ফারায়েজ শাস্ত্রে ফরেজ বিশেষজ্ঞ যায়িধ ইবন সাবিত। রাসূলুল্লাহর (সা) এ নদ দ্বারা বুঝা যায় তিনি ফারায়েজ শাস্ত্রে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামও এ শাস্ত্রে তাঁর পন্ডিত্য স্বীকার করতেন। খলীফা উমার (রাা) তাঁর জাবীয়ার ঐতিহাসিক ভাষণে অগণিত শ্রোতার সামনে ঘোষণা করেনঃ ফারায়েজ স্মপর্কে কারো কিছু জিজ্ঞাসার থাকলে সে যেন যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট যায়।৮৩ তাঁর সমকালীন লোকেরা বলতো,যায়িদ ফারায়েজ ও কুরআনে অন্যদের অতিক্রম করে গেছেন।৮৪

ফারায়েজ শাস্ত্রটি বেশ জটিল। কুরআনে  এ মাস্ত্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ মাসায়ালা সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। তার বিস্তরিত ব্যাখ্যাÑ বিশ্লেষণ রাসূলুল্লাহর (সা) বানী, কর্ম এবং সাহাবায়ে কিরামের (সা) ফাতওয়া ও বিচার আচার থেকেই গ্রহণ করা হয়। কুরআনে মীরাস ওঅসীয়াত বিষয়ে যা কিছু এসেছে তা অতি চুম্বক কথায়। তাতে স্বমীÑস্ত্রী, পুত্রÑকন্যা, মাতা, পিতা, ভ্রাতাÑভগ্নি ইত্যাতি ধরনের ইত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ ঘোষণা করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এ সীমা লংঘন করবে সে হবে মূলত নিজের ওপর অত্যাচারী।

হযরত রাসূলে কারীম (সা) বিচার ফায়সালার  মধ্যোমে এই সংক্ষিপ্ত বিধানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর ইনতিকালের পর যায়িদ (রা) এ শাস্ত্রের এত উন্নতি সাধন করেন যে,তাঁর পরেই এ বিষয়ে গ্রন্থ রচিত হয় এবং বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রে পরিণত হয়। হযরত আবদুল্লাহ  ইবন উমারের (সা) মত জ্ঞানী ও উঁচু মর্যাদার সাহাবীরাও যায়িদের (রা) এর নিকট ফারায়েজ সংক্রান্ত মাসায়ালর সমাধান জানতে চাইতেন।

ইয়ামামরা নিহত অধিবাসীদের ব্যাপার হযরত আবু বকর (রা) হযরত যায়িদের (রা) ফাতওয়া অনুযায়ী ফায়সারা করেন। অর্থ্যৎ যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদেরই মৃতদের ওয়ারিস নির্ধারণ করেন। মৃতদেরকে পরস্পর ওয়ারিস নির্ধরাণ করেননি।৮৫

আমওয়াসের তা’উন মাহমারীতে যখন গোত্রের পর গোত্র মৃত্যু বরণ করে তখন উমার (রা) যায়িদের (রা) উল্লেখিত মতের ওপর ভিত্তিতে সমাধান দেন। এমন কি হযরত আবদুল্লাহ ইবনর আব্বাস (রা) যাঁকে উম্মাতের তত্ত্বজ্ঞনী ও জ্ঞানের সাগর বলা হয়, তিনিও যায়িদের (রা) সমাধানে নিশ্চিত হতেন।

একদিন তিনি ছাত্র আকরামকে একথা বরে পাঠালেন, তুমি যায়িদকে জিজ্ঞেসা করে এসো যে,এক ব্যক্তি স্ত্রী ও মাতা পিতা রেখে মারা গেছে, তার মীরাস কিভাবে বন্টিত হবে? যায়িদ বললেন, স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকী অর্ধেকের একÑতৃতীয়াংশ মাতা এবং অবশিষ্ট যা থাকবে তা পাবে পিতা। ইবন আব্বাসের (রা) ধারনো ছিল ভিন্ন। তিনি মনে করতেনর মাতা পাবে একÑতৃতীয়াংশ। এজন্য আবার জানতে চাইলেন, এরকম বন্টন কি কি কুরআনে আছে, না এা আপনার নিজের মত? যায়িদ (রা) বললেন, এ  আমার ইজতিহাদ। আমি মাতাকে পিতার ওপর প্রাধান্য দিতে পারিনে।৮৬

খিরাফতের প্রতন্ত অঞ্চল থেকে জনগণ লিখিত আকার ফাতওয়া চেয়ে চিঠি লিখতো। তিনিও লিখিত জবাব দিতেন। আমীর মু’য়াবিয় (রা) একবার চিঠি মারফত দাদার অংশ সস্পর্কে  যায়িদের (র) ফাতওয়া জানতে চান। হযরত যায়িদ (রা) জবাবে যে লিখিত ফাতওয়াটি দান করেন তা কানযুল উম্মাল গ্রন্থে বর্ণিত হযেছে। তিনি সেই চিঠিতে খলীফা উমার (রা) ও উসমান যেখাবে দাদার অংশ বন্টন করেছিলেন তা উল্লেখ করেন।৮৭

হযরত যায়িদ (র) ফারয়েজের নানা ধারনের জিজ্ঞসা বা মাসয়ালর সমাধান খলীফা উমারের (রা) আমলেই বিন্যাস করেন।৮৮ তাঁর বোধা ও বুদ্ধিতে নতুন সম্যসার উদয় হতো আর তিনি তার সামাধান বের করতেন। পরবর্তীাকলে এ সব সমাধান এ শাস্ত্রের অবিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত হয়।

হযরত যায়িদ (রা) দাদা মীরাসের ব্যাপারে যে সিদ্ধন্ত দান করেন সাহাবাদের মধ্যে অনেকেই তার  বিরোধীতা ছিলেন। তবে জনতার সমর্থর তার পক্ষেই ছিল। ফারায়েজ শাস্ত্রে দাদার মীরাস একটি দারুণ মতবিরোধ পূূর্ণ মাসায়াল। এমন কি হযরত যায়িদ (রা) এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম বুখারী আল Ñফারায়েজ অধ্যায়ে দাদার মীরাস শিােনামে একটি অনুচ্ছেদ এনেছেন। তাতে তিনি এ মতবিরোধের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি একাথাও বলেছেন এ বিষয়ে ইবন উমার আলী, ইবন মাসউদ, ও যায়িদের (রা) বিভিন্ন রকম কথা বর্ণিত হয়েছে।৮৯ তবে যে মতের ওপর হযরত যায়িদের (রা) শেষ জীবন পর্যন্ত অটল ছিলেন উামর ও উসমান (রা) সেটাই প্রয়োগযোগ্য মনে করেছেন।

ইসলামের ইতিহাসে হযরত উমার (রা) সর্বপ্রথম দাদার অংশ গ্রহণ করেন। তাঁর এক পৌত্র মারা গেলে তিনি নিজেকে তার যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী মনে করতে থাকেন। লোকেরা এর বিরোধীতা মত পোসন করতে থাকে। একদিন হযরত উমার যখন হযরত যায়িদের (রা) বাড়ীতে উপস্থিত হরেন তখন তিনি চিরুনী করছিলেন এবং দাসী তার চুল পরিপাটি করে দিচ্ছিলেন। হযরত যায়িদ (রা) খলীফাকে বললেন, কষ্ট করে আসার কি প্রয়োজন ছিল, ডেকে পাঠালেই তো পারতেন। খলীফা বললেন একটি মাসায়ালা সম্পর্কে পরামর্শ করতে এসেছি। যদি আপনার ওপর কোন রকম বাধ্যবাধকতা নেই। যায়িদ এ অবস্থায় মতামত দিতে অস্ককৃতি জানালেন। উমার ফিলে গেলেন। অন্য একদিন আবার গেলেন। যায়িদ বললেনম আমার সিন্ধান্ত আমি লিখিতভাবে জানাবো। অতঃপর তিনি শাজারার আকৃতিতে বিন্যাস  করে অংশ বন্টন করেন। হযরত উমার (রা) জনগনের উদ্দেশ্যে ভাষণ দানকালে বলেন, যায়িদ ইবন সাবিত এটি লিখে আামার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি তা চালু করছি।৯০

হযরত যায়িদের  (রা) ইলমে ফারায়েজ গ্রন্ধাবন্ধ করেন এবং এর বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয়ে গবেষনা করে নতুন নতুন মাসায়ালাও সৃষ্টি করেন। তবে এর মধ্যে তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উদ্ভবধন হলো মাসায়ালা অওলে। কিছু লোকে ধারণা আওলের উদ্ভাবক হলে হযরত আব্বাস (রা)। কিন্তু এ দারণা বর্ণনা ও যুক্তি উভয়ের পরিপন্থি।

প্রথমত: এ ধারণার পশ্চাতে তেমন কোন সনদ নেই। দ্বিতীয়ত: হযরত আব্বাসের (রা) ফারায়েজ শাস্ত্রে তেমন বুৎপত্তি ছিলনা। এ কারণে এ জাতীয় উদ্ভবনা তাঁর প্রতি আরোপ করা যুক্তির পরিপন্থি।

হযরত যায়িদ (রা) ফারায়েজ শাস্ত্রেও যতটুকু খিদমাত করেছেন তা উপরোক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীমের বানীÑ আমর উম্মাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারায়েজ বিশেষজ্ঞ হচ্ছে যায়িদ’ Ñ অক্ষরে অক্ষরে  সত্যে পরিণত হয়েছে। হযরত যায়িদের (রা) অসাধারণ বুদ্ধি তীক্ষè, মেধা ও অভিনব চিন্তাশক্তী দেখে সে যুগের উলামাÑমাশায়েখ দারুন বিস্মিত হয়েছেন। উলুমে শারা’য়িয়্যা ছাড়াও পার্থিব জ্ঞান বিজ্ঞানে তিনি যে কতখানি পারদর্শী ছিলেন সে সম্পর্কেও কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন। এখানে তার কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

যায়িদ (রা) রাসুলে কারীমের (সা) নির্দেশে মুতাবিক হিব্র“ ও সুরইয়ানী ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর মেধা এত তীক্ষè ছিল যে মাত্র পনেরো দিনের চেষ্টায় এ ভাষা দুটিতে এতখানি দক্ষতা অর্জন করেন যে, আনায়াসে চিঠি লিখতে সক্ষম হন।  পরে আরো চর্চার ফলে এতখানি উন্নতি হয় যে তাওরাত ও ইনজীলের ভাষাসমূহ একজন আলেমে  পরিণত হন। মাসউদী লিখেছেন, তিনি ফার্সী, রোমান হাবশী ভাষাগুলোও জানতেন। এগুলি তিনি শিখেছিলেন মদীনায় যারা এ ভাষা জানতো তাদের নিকট থেকে।৯১

তৎকালীন আরবে হিসাব বা অংক শাস্ত্রের তেমন প্রচলন ছিলনা। এ কারণে ইসলামের প্রথম পর্বে খারাজের হিসাবপত্র অথবা রোমান অথবা ইরানীরা করতো। আরববাসী হাজারের ওপর গণান করতে জানতো না। আরবীতে হাজারেরও ওপর সংখ্যার জন্য কোন শব্দও ছিলনা। কিন্তু যায়িদের (রা) অংকে এতখানি পারদর্শিতা ছিল যে, ফারায়েজ শাস্ত্রেও অতি জটিল ও সূক্ষè মাসায়ালা সমূহ ও অংক দ্বারা সমাধান করতেন। তাছাড়া অর্থ সম্পর্দেও বন্টনও করতে পারতেন। হিজরী ৮ম সনে হুনাইনর যদ্ধ হয়। এতে প্রায় বারো হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করে। তাঁরই আদমশুমারী ও প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী রাসূলে (সা) মালে গানীমত বন্টন করেন। প্রথমে তিনি মানুষের সংখ্যা অবগত হন। তারপর মালে গানীমত উক্ত সংখ্যার ওপর বিছিয়ে দেন। এননিভাবে ইয়ারমুকের যুদ্ধেও মালে গনীমাত মদীনায় আসলে যায়িদই (রা) তা বন্টন করেন।৯২

ইসলামÑপূর্ব আরবে লেখার তেমন প্রচলন ছিলনা, সুপ্রাচীন কালের বর্ণনা সমূহ তারা স্মৃতিতে বংশপরম্পর ধরে রাখতো। যায়িদ (রা) লিখতে জানতেন এবং তার সমকালে তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত লেখক। বিভিন্ন ফরমান চুক্তিপত্র চিঠিপত্র লেখা ছাড়াও সুন্দও অস্কন ও জানতেন।

খলীফা উমারের (রা) সময়ে আরবের বিখ্যাত দুর্ভিক্ষ আম্মুর রামাদাহ দেখা দেয়। এ দুর্ভিক্ষ মুকাবিলার জন্য তিনি মিসরের গভর্ণর আমর ইবনুল আসাকে (রা) খাদ্যশস্য পাঠতে বলেন। আমার ইবনুল আস (রা) বিশটি জাহাজ বোঝাই  করে খাদ্য শস্য রাজধানী মাদীনায় পাঠান। উমার (রা) অত্যন্ত  বিচলিতভবে জাহাজের প্রতীক্ষায় থাকেন। যায়িদ সহ আরো কিছু সাহাবীকে সংগে নিয়ে তিনি মদীনার নিকটবর্ত জার নামক বন্দরে চলে যান। খাদ্যশস্য ভর্তি জাহাজ এলে সেখানে দুটি গুদাগম বানিয়ে তাতে সংরক্ষন করেন। তিনি যায়িদকে দুর্ভিক্ষ কবলিত মাসুষের একটি তালিকা ও তাদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দকৃত শস্যেও পরিমাণ লেখা তাকে এমন একটি ফর্দ তৈরী করতে নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের ভিত্তিতে যায়িদ একটি রেজিস্টার তৈরী করেন, প্রত্যেককে একটি কাগজের চাকতি দেন যার নিচে উমারের (রা) সীলÑমোহর লাগানো ছিল। চাকতি তৈরী ও তাতে মহোর লাগানোর ঘটনা ইসলামে ছিল এটাই প্রথম। আর এর রুপকার ছিলেন যায়িদ।

ইসলামের আসল উদ্দেশ্য হলো মহত্তম চারিত্রের পূর্ণতা সাধন। তাঁর চরিত্রের যে সকল গুণÑবৈশিষ্ট উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তা হলো হুব্বে রাসূল, ইত্তেবায়ে রাসূল, আমর বিল মারুফ, শাসকদের প্রতি উপদেশ নসীহত ও মুসলি উম্মার কল্যাণ কামনা।

রাসূলের প্রতি প্রবল ভালবাসার কারণে অধিকাংশ সময় তাঁর দরবারে উপস্থিত থাকতেন। প্রত্যূষে ঘুম থেকে উঠে সোজা রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে যেতেন। কোন কোন সময় এত সকালে যেতেন যে, রাসূলের (সা) সাতেই সেহরী খেতেন। রাসূল (সা) তাঁকে স্বীয় কক্ষে ডেকে নিতেন।৯৩

একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গিয়ে দেখতে পান, তিনি খেজুর দিয়ে সেহরী খাচ্ছেন। তাঁকেও আহারে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। যায়িদ বললেন, আমি রোযা রাখার ইরাদা করেছি। রাসূল (সা) বললেন আমরাও তো এটাই ইরাদা। সেদিন হযরত যায়িদ রাসূলের (সা) সঙ্গে সেহরী খান। কিছুক্ষন পর নামাযের ওয়াকত হলে তিনি রাসূলের (সা) সাথে মসজিদে যান এবং তাঁর সাথে নামায আদায় করেন।৯৪

যায়িদ (রা) অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে যেতেন। রাসূল (সা) তাঁর সাথে এতখানি খোলামেলা ছিলেন যে কখনো কখনো নিজের হাঁটু যায়িদের রানের ওপর রেখে যেতেন। একদিন তো এ অবস্থায় ওহী নায়িল হয়। যায়িদ বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাঁটু এ সময় এত ভারী মনী হচ্ছিল যে তার ভার সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মনে হচ্ছিল যে আমার রান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। কিন্তু বেয়াদবী হয় এ ভায়ে তিনি উহ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। চুপ করে বসে থাকতেন।৯৫

রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ পালন বিন্দুমাত্র হেরফের বরদাশত করতেন না। একবার শামে গেলেন আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নিকট। তাঁর কাছে একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। মু’য়াবিয়ার (রা) এক ব্যক্তিকে হাদীসটি লিখে রাখার জন্য বললেন। যায়িদ (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি তাঁর লিখিত অংশটুকু মুছে দেন।৯৬

আমীর উমারাদের সামনেও তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের প্রচারের ব্যাপারে চুপ থাকতেন না। মারওয়ান ইবনুল তখন মদীনার গভর্ণর। তিনি মাগরিব নামাযে ছোট ছোট সুরা পড়তেন। যায়িদ বললেন, এমনটি করেন কেন? রামূল (সা) তো বড় বড় সূরাও পড়তেন।৯৭

সাহাবা ও তাবেঈনদের কেউ কখনো অজ্ঞতাবশত সুন্নাতের পনিপন্থী কোন কাজ করে বসলে যায়িদ তাঁকেও সতর্ক করে দিতেন। একবার গুরাইবীল ইবন সা’দ (রা) বাজারে একটি পাখি ধরেন। যায়িদ তো তা দেখে ফেলেন। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে এক থাপ্পড় মারেন এবং পাখিটি ছিনিয়ে উড়িয়ে দেন। তারপর তাঁতে লক্ষ্য করে বলেন, ওরে নিজের শক্র, তোমার জানা নেই যে, রাসূল (সা) মদীনাকে হারাম ষোঘণা করেছেন!৯৮

একবার তিনি শুরাহবীলকে বাগানে জাল পাততে দেখে চেঁচিয়ে উঠালেনÑ এখানে শিকার করা নিষেদ্ধ।৯৯

শাম থেকে এক ব্যক্তি মদীনায় এলো যয়তুনের তেল বিক্রী করতে। আনেক ব্যবসায়ী কথাবার্তা বললো। আবদুল্লাহ ইবন উমার কথাবার্তা বলে তেল খরীদ করেন নিলেন। মাল সেখানে থাকতেই দ্বিতীয় ক্রেতা পাওয়া গেল। সে আবদুল্লাহ ইবন উমারকে বললেন, আমি আপনাকে এত লাভ দিচ্ছি। আমার কাছে বিক্রী করে দিন। ইবন উমার রাজী হয়ে গেরেন। তিনি কথা পাকাপাকি করার জন্য তার হাতের ওপর স্বীয় হাত রাখবেন, এমন সময় পিছন থেকে একজন তাঁর হাত টেনে ধরেন। তিনি তাকিয়ে দেখেন যায়িদ ইবন সাবিত। তিনি ইবন উমারকে বললেন, এখন বেচো না। প্রথমে মাল এখানে থেকে সরিয়ে নাও। কারণ রাসূল (সা) এমনভবে বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন।১০০

একবার তিনি দুপুরের সময় মদীনার গভর্ণর মারওয়ানের বাড়ী থেকে বের হলেন। শিষ্য শাগারিদরা তা দেখে ফেলে। তারা মনে করলো, হয়তো বিশেষ কোন প্রয়োজনে গিয়েছিলেন। তারা এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করেলো। যায়িদ বললেন, এ সময় তিনি কয়েকটি হাদীস জিজ্ঞেসা করেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছি, তিনটি অভ্যাসের ব্যাপারে মুসলামনের অন্তর বিরুপ ভাব জন্মবে না। তাহলো আল্লাহর জন্য কাজ রার শাসকদের নসীহত করা জামায়াতের সাথে থাকা।১০১

উবাদা ইবন সামিত ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সাহাবী। একবার তিনি বায়তুল মাকদাস গেলেন। সেখানে একজন থাবাতী ব্যক্তিকে  তাঁর বহানটি একটু ধরতে বললেন। সে ধরতে অস্বীকৃতি জানালো। উবাদা তাকে খুব ধমকালেন এবং মারলেন। কথাটি খলীফা উমারের কানে গেল। তিনি উবাদাকে বললেন আপনি এ কেমন কাজ করলেন? উবাদা বললেন আমি তাঁকে ঘোড়াটি একটু ধরতে বলামা আর সে অস্বীকার করলো। উমার মেজাজটা একটু গরম। আমি তাকে মেরে বসলাম। উমার বললেন, আপনি বদলা বা কিসাসের জন্য প্রস্তুত হোন। সেখানে যায়িদ ইবন সাবিত উপস্থিত ছিলেন। তিনি এভাবে একজন সাহাবীর অপমান সহ্য করতে পারলেন না। উমারকে বললেন, আপনি একজন গোলামের বদলায় নিজের ভাইকে মারবেন? তাঁর একথার পর উমার কিসাকেস পরিবর্তে শুধু দিয়াত ধার্য করেন। উবাদাকে (রা) দিয়াত আদায় করতে হয়।১০২

এমনি আর একটি ঘটনা। উমার (রা) যখণ শামে ছিলেন তখন একদিন খবর পেলেন যে, একজন মুসলাম একজন জিম্মীকে হত্যা করেছে। উমার হত্যাকারী মুসলামকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। যায়িদ অতিকষ্টে খলীফাকে বুঝালেন এবং কিসাসের পরিবর্তে দিয়াতে রাজী করেন।১০৩

স্বভাগত ভাবেই তিনি চুপচাপ থাকতে ভালবাসতেন। খলীফাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজার রাখতেন। খলীফা উমারের অন্যতম সঙ্গী ও পারিষদ ছিলেন। খলীফা উসমানের (রা) সাথে তাঁর এত গভীর সম্পর্ক ছিল যে, লোকে তাঁকে উসমান (রা) তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন। আলী মুয়াবিয়ার (রা) দ্বন্দ্বে আলীর (রা) পক্ষে কোন যুদ্ধে অংশ নেননি, তা সত্বেও তিনি আলীকে দারুণ ভালোবাসতেন এবং তাঁর মাহাতœ্য ও মর্যাদার প্রবক্তা ছিলেন। আমীর মুয়াবিয়ার (রা) সাথেও সুসম্পর্ক ছিল। শামে গেলে তাঁর গৃহেই উঠতেন।১০৪

মারওয়ান ছিলেন তাৎকালীন আরব বিশ্বের একজন অতি বিখ্যাত রাজনীতিবিদ। যায়িদের (রা) ছিল তাঁর সাথেন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন না। একদিন যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে রাজনীতি বিষয়ক কিছু প্রশ্ন করেন। যায়িদ জবাব দিচ্ছেন, এমন সময় তিনি বুঝতে পারলেন কিছু লোক পর্দার আড়াল থেকে তাঁর বক্তব্য লিখে নিচ্ছে। যায়িদ তক্ষুণি বলে উঠলেন, মাফ করবেন, এতক্ষণ আমি যা কিছু বলেছি তা সবই আমার ব্যক্তিগত মতামত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। একদনি যায়িদ (রা) যখন ঘোড়ায় চড়তে যাবেন, ইবন আব্বাস তাঁর জিনিসটি ধরে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। যায়িদ (রা) বললেনঃ আপনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই। দয়া করে আপনি সরে যান। তিনি বললেনঃ আমাদের উলামা ও বড়দের সাথে এমন আচরণ করার জণ্য আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যায়িদ বললেনঃ আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন। ইবন আব্বাস (রা) হাত বাড়িয়ে দিলে যায়িদ হাতে চুমু দিয়ে বললেনঃ আমাদেরকে ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নবীর (সা) পরিবার পরিজনদের সাথে এমন আচারণ করতে করার জন্য।১০৫

মে মারওয়ান ইবনুল হাকাম, আবু সাঈদ আলÑখুদরী (রা) মতে একজন উচুঁ মর্যদা সাহাবীকে মারার জন্য ছড়ি উঠিয়েছিলেন, তিনিও যায়িদকে (রা) অতন্ত্য সম্মান করতেন। দরাবারে গেলে মারওয়ান তাঁকে আসানের পাশেই বসাতেন।যায়িদ (রা) অন্যান্য সাহাবী ও তাবেঈদেরকে মাঝে মধ্যে চিঠির মাধ্যমে উপদেশ দিতেন। প্রখ্রাত সাহবী উবাই ইবন কা’বকে (রা) তিনি এমনি একটি উপদেশমূলক চিঠি লিখেছিলেন। সীরাত ও হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে।১০৬

সত্য কতা বলতে কাকেও পরোয় করতেন না। তাবারানী বর্ণনা করেছেন। খলীফা উমার (রা) একদিন গোপনে খবর পেলেন আবু মিহ্জান আসÑসাকাফী নামক একব্যক্তি তার এক বন্ধুর সাথে ঘরের মধ্যে মদ পান করছে। তিনি তৎক্ষণাত রওয়না দিলেন এবং সোজা তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। সেখানে আবু মিহ্জানকে বললেনঃ একাজটি আপনি ঠিক করেননি। কারণ আল্লাহ ক্ষাপনাকে গুপ্তচাগিরি করতে নিষেধ করেছেন। উমার (সা) সাতে সঙ্গীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেনঃ এ কি বলে? যায়িদ ইবন সাবিত ও আবদুর রহমান ইবন আলÑআরকান (রা)Ñ বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন, সে ঠিক বলেছে। এ এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। উমার (রা) তাকে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসেন।১০৭

যায়িদ (রা) পরিবার পরিজন ও আতœীয় স্বজনদের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। ঘুমানোর সময় দু’আ করতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পরিবার পরিজনের স্বাচ্ছন্দ ও প্রাচুর্য কামনা করি। আর কোন আতœীয়ের সাথে আতœীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে তার বদ দুআ থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। পরিবার পরিজনদের মধ্যে তিনি খুব রসিক হতেন যেসন মজলিসে হতেন অত্যন্ত গম্ভীর।১০৮

তাঁকে নিয়ে তাঁর নিজ গোত্রে খাযরজীদের গর্বের অন্ত ছিলনা। মদীনার চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র আউস ও খাযরাজ।ইসলাম গ্রহণের পরেও তারা মাঝে মাঝে নানা বিষয় নিয়ে একে অপরের ওপর আভিজাত্য ও শ্রেষ্টত্ব দাবী করত। এমনিভাবে একাবর খাযাজীরা বললো, আমাদের মধ্যে এমন  চার ব্যক্তি যাঁদের সমকক্ষ কেউ তোমাদের মধ্যে নেই। তাঁরা রাসূর্লুলাহর (সা) জীবদ্দশায় গোটা কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁদের একজন যায়িদ ইবন সাবিত।১০৯

যায়িদের (রা) জীবন ও কর্ম ছোট কোন প্রবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব নয়। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থ সমূহে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র:

 

আমার ইবন আল-জামূহ (রা)

হযরত আমর ইবন আলÑ জাহামূহের (রা) পিতার নাম আলÑ জামাহূ ইবন যায়িদভ মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু সালামা শাকার সন্তান। একজন আনসারী সাহাবী।১ জন্ম সন ও প্রথম জীবন সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ইবন ইসহাক তাঁর মাগাযীতে বলেনঃ তিনি বনু সালামা তথ্য গোটা আনাসার সম্প্রদায়ের একজন নেতা ও সম্মনিত ব্যক্তি ছিলেন।২ তাছাড়া জাহিলী আমলে তিনি তাদের ধর্মীয় নেতাও ছিলেন। তাদের মূর্তি উপাসনা কেন্দ্রের বা মুতাওয়াল্লীও ছিলেন।৩

তাঁর ঘরে কাঠের নির্মিত একটি বিগ্রহ ছিল তার নাম ছিল মানাত। বিগ্রহটিকে তিনি সীমাহীন তাজীম করতেন।৪ এর মধ্যে মক্কায় ইসলামের ধ্বনি উথিত হলো। কিছু লোক মদীনা থেকে মক্কায় আসলেন এবং আকাবার দ্বিতীয় শপথে অংশগ্রহণ করে আবার মদীনায় ফিরে গেলেন। এই দুই দলে আমারের ছেলে মুয়াজও ছিলেন।

মদীনায় ফিরে এসে তাঁরা খুব জোরেশোরে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন এবং অতি দ্রুত তথাকার অলি গলি তাকবীর ধ্বনিতে প্রতিধ্বনি হয়ে উঠলো। এরই মধ্যে বুন সালামার কিছু তরুণ ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, যে কোনভাবে তাঁদের সম্মনিত নেতা আমরকে ইসলামের সুশীলত ছায়ায় আনতে হবে। তাঁর ছেলে মুয়াজ চেষ্টার কোন ক্রটি করলেন না। এক পর্যায়ে তাঁদের মথায় নতুন এক খেয়াল চাপলো।

তাঁর ছেলে মুয়াজ বন্ধু ইবন হায়াসাম মতান্তরে মুয়াজ ইবন জাবারল ও অন্যদের সংগে করে রাতে বাড়ীতে আসতেন এবং সকলের অগোচলে অতি সন্তর্পণে আমরের অতিপ্রিয় বিগ্রহটি তুলে নিয়ে দূরে কোন ময়লাÑআবর্জনার গর্তে ফেলে আসতে লাগলেন। সকালে আমার তাঁর প্রিয় বিগ্রটির এমন দারুন দশা দেখে দারুণ দুঃখ পেতেন। আবার সেটা কুড়িয়ে এনে ধুয়ে মুছে সুগন্ধি লাগিয়ে পূর্ব স্থানে রেখে দিতেন। এ প্রক্রিয়া কিছু দিন যাবত চলতে লাগলো। অবশেষে একদনি নিরুপায় হয়ে বিগ্রটির কাঁধে একখানি তরবারি ঝুলিয়ে বললেন, কারা তোমাদের সাথে এমন অশোভন আচরণ করছে আমার তা জানা নেই। যদি জানতে পররতাম, তাদের উচিত শিক্ষা দিতাম। এই থাকলো তরবারি তুমি কিছু করতে পারলে কর।

তরুণরা তখন আর একটি নতুন খেলা খেললেন। তাঁরা রাতরে অন্ধকারে বিগ্রহটি উঠিয়ে নিয়ে তরবারিটি সরিয়ে নিলেন এবং তার সাথে একটি মরা কুকুর বেঁধে ময়লার গর্তে ফেলে রাখলেন। সকালে আমার তাঁর উপাস্যের এমন অবমাননা দেখে ক্ষিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে সঠিক পথের দিশা পেলেন। প্রৃত সথ্য তাঁর চোর ধরা পড়লো। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর তখনকার সেই অনুভুতিক তিনি একটি কবিতায ধরে রেখেছেন। একানে তার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ দেওয়া হল।

১. আল্লাহর নামের শপথ! যদি তুমি ইলাহ হতে তাহলে ময়লার গর্তে এভাবে কুকুর সাথে এক রশিতে বাঁধা থাকতে না।

২. সকল প্রশংসা মাহান আল্লাহর, যিনি দানশীল, সৃষ্টির রিযিকদাতা ও দ্বীনের বিধান দানকারী।

৩. তিনিই আমাকে বাঁচিয়েছেন করের অন্ধকারে বন্দী হওয়ার পূর্বে। অন্য একটি কবিতায় তিনি বেলনঃ

১. আমি পূতঃ পবিত্র আল্লাহর নিকট তাওবা করছি। আমি আল্লাহর আগুন থেকে ক্ষমা ভিক্ষা করছি।

২. প্রকাশ্য ও গোপনে আমি তাঁর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রশংসা করছি।৫

ইবন ইসহাক ‘আমার ইবন আলÑজামূহের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ভিন্ন একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। বনু সালামের তরুণদের সাথে আমরে স্ত্রীÑপুত্রও ইসরাম গ্রহণ করলেন। একদিন আমার স্ত্রীকে বললেন, এসব যুবক কি করে তার শেষ না দেখা পর্যন্ত তুমি তোমার পরিবারের কাউকে তাদের দলে ভিড়াতে দিওনা। স্ত্রী বললেনঃ আমি না হয় তা করলাম; কিন্তু আপনার ছেলে এই ব্যক্তি৬ সম্পর্কে কি সব কথাবার্তা বলে তাকি আপনি শোনেন? আমর বললেনঃ সম্ভবত সে ধর্মত্যাগী হয়েছে। স্ত্রী বললেনঃ না সে তার গোত্রীয় লোকদের সাথে ছিল। তাকে এখানো পাঠানো হয়েছে। আমর স্ত্রী জিজ্ঞসা করলেনঃ তুমি কি এই লোকটির কোন কথা শুনেছো? বললোঃ হ্যাঁ, শুনেছি। এরপর সূরা আলÑফাতিহার প্রথম থেকে পাঠ করে শোনালেন। আমর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন এভাবেঃ এতি মিষ্টিমধুর বাণী! তার সবই বাণীই কি এমন? স্ত্রী বললেনঃ হায়রে আমার কপাল!  এর চেয়েও ভালো। আপনার গোত্রীয় লোকদের মত আপনিও কি বাইয়াত বা শপথ করতে চান? বললেনঃ না আমি তা করছি না। আমি একটু মানাত দেবীর সাথে পরামর্শ করতে চাই। দেখি সে কি বলে। আরবদের প্রথা ছিল তারা মানাতের কথা শুনতে চাইলে একজন বৃদ্ধা তার পিছনে দাড়িয়ে তার পক্ষে উত্তর দিত। আমর মানাতের কাছে আসলে বৃদ্ধাটি অদৃশ্য কত কথা বলে উড়াচ্ছে, আর তুমি নিরব শ্র্যেতা হয়ে দাড়িয়ে আছ। এ ব্যক্তি তোমার ইবাদত করতে নিষেধ করছে। তোমাকে পরিত্যাগ করতে বলছে। আমি তোমার পরামর্শ ব্যতীত তারহতে বাইয়াত করতে চাইনা। বল, আমি কি করতে পারি। তিনি দীর্ঘক্ষর্ণ পরামর্শ চাইলেনঃ কিন্তু মাানাত কোন সাড়া দিল না। তারপর তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে বললেনঃ সম্ভবত তুমি রাগ করেছো। ঠিক আছে এখন থেকে তোমার সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মানাতের মূতির্টি ভেঙ্গে গুঁড়ো করে ফেললেন।৭

হযরত আমরেরইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে আরো কিছু অপ্রসিদ্ধ মতামত আছে। ইবনুল আসীর বলেন, একটি বর্ণনা মতে তিনি আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত ও বদরের তাবাকাত বা স্তরে উল্লেখ করেননি।৮ কালবী বলেছেন তিনি আনাসারদের মধ্যে সর্বশেষ ইসলাম গ্রহণকারী।৯

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এসে আনাসার মুহাজিরদের মধ্যে যে দ্বীনী ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্টা করে দেন, একটি বর্ণনা মতে তাতে উবাইদা ইবনুল হারেস ও আমরের মধ্যে এ সম্পর্ক প্রতিষ্টত হয়।১০

বদর যুদ্ধে হযরত আমরের (রা) যোগদানের ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে সঠিক মত এই যে তিনি বদরে যোগদান করেননি। কোন কারণে তিনি পায়ে আঘাত পান এবং খোঁড়া হয়ে যান। এ অবস্থায়ও তিনি যুদ্ধে যেতে চাইলেন ছেলেরা রাসূলুল্লাহ (সা) অনুমতি নিয়ে তাঁকে তাঁর সংকল্প থেকে বিরত রাখেন। তাঁরা বোঝান যে এ অবস্থায় তাঁর ওপর জিহাদ ফরজ নয়।

উহুদের রণÑদামামা বেজে উঠলো। আমর ছেলেদের ডেকে বললেন, তোমরা আমাকে বদরে যেতে দাওনি। এবার আমি তোমাদের কোন নিষেধ মানবো না। এ যুদ্ধে আমি যাবই। ইবন ইসহাক ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ আমর ইবন আলÑজামূহ ছিলেন মারাতœক ধরনের খোঁড়া। সিংহের মত তাঁর চার ছেলে ছিল। সকল কাজ ও ঘটনায় তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে থাকতেন। উহুদের দিনে তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে মাজুর (অক্ষম) করেছেন। আপনার যুদ্ধে যাওয়ার দরকার নেই। আমর (রা) খোঁড়তে খোঁড়াতে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললেনঃ আমার ছেলেরা আমাকে যুদ্ধে যেতে বারণ করছে। আল্লাহর কসম! এ খোঁড়া পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমি জান্নাতে যেতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ আল্লাহ তো  আপনাকে মাজুর করেছেন। জিহাদ আপনার ওপর ফরজ নয়। একথার পরও আমরকে তাঁর সিদ্ধান্তে অটল দেখে রাসূলু (সা) তাঁর ছেলেদের বললেনঃ তোমার আর তাঁকে বাধা দিওনা। আল্লাহ পাক হয়তো তাঁকে শাহাদাত দান করবেন।১১

ইমাম সুহাইলী বলেনঃ অন্যরা আরো বলেছেন, আমার বাড়ী থেকে বের হওয়র সয়ম অন্তরে সবটুকু বিনীত ভাব ঢেলে দিয়ে দু’আ করেনঃ

ইলাহী! তুমি আর আমাকে মদীনায় ফিরিয়ে এনো না। আল্লাহ পাকের দরবারে তাঁর এ আকুল আবেদন কবুল হয় যায়। তিনি শহীদ হন।১২

উহুদ যুদ্ধ শুরু হলো। আমরও প্রাণপণ করে যুদ্ধে করছেন। প্রচন্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। তখন তিনি ছেলে খাল্লাদকে সাথে নিয়ে পৌত্তলিক বাহিনীর ওপর প্রচন্ড আক্রমন চালালেন। দারুণ সাহসিকাতর সাথে যুদ্ধ করে পিতা ও পুত্র এক সাথে শাহাদাত বরণ  করেন। হযরত আমরের (রা) তীব্র বাসনা ও রাসূলুল্লাহর (সা) ভবিষ্যদ্বানী সত্যে পরিণত হলো। তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে জান্নাতে পৌছে গেলেন। এটা হিজরী ৩য়/ খ্রীঃ ৬২৫  সনের ঘটনা।১৩

যুদ্ধ ক্ষেত্রে হযরত আমরের (রা) প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে। রাসূল (সা) পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। লাশটি দেখে চিনতে পেরে থমকে দাড়ালেন। বললেনঃ আল্লাহ তাঁর কোন কোন কসম পূরণ করেন। আমার তাদেরই একজন। আমি তাঁকে খুড়িয়ে খুঁড়িয়ে জান্নাতের হাঁটতে দেখতে পাচ্ছি। আমর ও খাল্লাদের (সা) ঘাতক আলÑআসওয়াদ ইবন জাউন।১৪

আমরের (রা) শাহাদাতের খবর তাঁর স্ত্রীর কাছে পৌঁছালে তিনি একটি উট নিয়ে আসেন স্বামী ও ভাই আবদুল্লাহ ইবন আমর (জাবির (রা) পিতা) এর লাশ দুটি উটের পিঠে উঠিয়ে বাড়ীতে নিয়ে যান। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত হয়, উহুদের রণÑক্ষেত্রেই সকল শহীদকে দাফন করা হবে। রাসূল (সা) আমরের স্ত্রীর নিকট থেকে লাশ দুটি ফিরিয়ে আনেন এবং উহুদের সকল শহীদের সাথে দাফন করেন।১৫ ইবন ইসহাক বনু সালমার কতিপয় সম্মানীয় বৃদ্ধ ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদের শহীদদের দাফনের সময় বলেনঃ তোমরা আমর ইবন জামূহ ও আবদুল্লাহ  ইবন হারামের দিকে একটু লক্ষ্য রেখো। দুনিয়াতে তারা একই সারিতে সারিবদ্ধ ছিল। তাদেরকে একই কবরে দাফন কর।১৬ তাদেরকে এক কবরে একই সাথে দাফন করা হয়।

তবে ইমাম সুহাইলী বর্ণনা করেন, যে আমরের ছেলেরা তাঁর লাশ মদীনায় আনার জণ্য একটি উটের ওপর উঠান। উট অবাধ্য হয়ে যায়। শত চেষ্টা করেও তাঁরা উটটি মদীনার দিকে আনতে পারলেন না। তখন তাদের স্মরণ হলো পিতার অন্তিম দু’ আটির কথা: প্রভু হে আমাকে, আর মদীনায় ফিরে এনো না। তারা আর অহেতুক চেষ্টা করলেন না। পিতাকে তাঁরা তাঁর নিহত হওয়ার স্থলেই দাফন করেন।১৭

ইমাম মালিক আলÑমুওয়াত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।  উহুদে শাহাদাত প্রাপ্ত আমর ইবন জামূঞ ও আবদুল্লাহ ইবন আমরকে পানির নালার ধারে এক সাথে কবর দেওয়া হয়। বহু বছর পর স্রোতে কবরটি ভেঙ্গে যায় এবং লাশ দুটি সম্পর্ন অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে পড়ে। যেন তাঁরা গতকার মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্যত্র কবর দেওয়ার জন্য লাশ দুটি তোলা হয়। আবদুল্লাহ ছিলেন আহত। তাঁর একটি হাত ক্ষত স্থানটির ওপর রাখা এভাবেই তাঁদেরকে আবার দাফন করা হয়। উহুদের যুদ্ধ ও এই ঘটনার মাঝখানে মসয়ের ব্যবধানি ছল প্রায় ৪৬ (ছিচল্লিশ) বছর।

জাবির বলেনঃ কবর থেকে তোলার পর আমি আমার পিতাকে দেখলাম তিনি যেন কবরে ঘুমিয়ে আছেন। দেহের কোন অংশ বিন্দুমাত্র বিকৃত হয়নি। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো তাঁদের দাফনের আবস্থা কিরুপ দেখেছিলেন? বললেনঃ এক টুকরো কাপড় দিয়ে দেখলাম তিনি মুখসহ উপর দিক ঢাকা ছিল। আর পায়ের দিকে ছল হারমাল নামক এাক প্রকার ঘাস। এ দুটি বস্তুও অক্ষত ছিল।১৮

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আমরের (রা) ছিল চার ছেলে। তাঁরা সকলে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সকল যুদ্ধ ও ঘটনায় শরীক ছিলেন। সীরাত গ্রন্থে সমূহে দুইজনের নাম পাওয়া যায়। মুয়াজ ও খাল্লাদ। মুয়াজ (রা) পিতপার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত বা শপথে অংশ গ্রহণ করার গৌরব অর্জণ করেন। খাল্লাদ (রা) উহুদের অন্যতম শহীদ। এছাড়া আমরের (রা) আবু আয়মান নামক এক দাসও এ যুদ্ধে শহীদ হন।১৯  একজন মুসলামনের জন্য এর চেয়ে আর বড় গৌরব ও সম্মানের আর কি হতে পারে?

আমরের (রা) গর্বিত স্ত্রীর নাম ছিল হিন্দা বিনতু আমর। বানু সালামার এক নেতা, উহুদের শহীদ আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হ ারামের বোন এবং প্রখ্যাত সাহাবী জাবির ইবন আবদিল্লাহর (রা) আপন ফুফু।

আমর (রা) ছিলেন দীর্ঘদেহী, উজ্জল গৌর বর্ণের। মাথার চুল ছিল কোঁকড়ানো। পা ছিল খোঁড়া।২০ অতিথি সেবা ও দানশীলতা হচ্ছে আরবদের প্রাচীন ঐতিহ্য। তাঁর দানমীলতার জন্য রাসূল করীম (সা) তাঁকে বনু সালামার নেতা ঘোষণা করেন। ঘটনাটি এই রকম। একবার বনু সালামার কিছু লোক রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসলো। তিনি জিজ্ঞেসা করলেনঃ তোমাদের নেতা কে? তারা বললোঃ জাদ্দা ইবন কায়স। সে একজন কৃপণ ব্যক্তি। তাদের কথা শুনে রাসূল বললেনঃ কৃপণতার চেয়ে নিকৃষ্ট রোগ আর নেই। তোমাদের নেতা বরং আমর ইবন আলÑজামূহ।২১ অবশ্য ইমাম যুহরীর একটি বর্ণনা বিশর ইবন আলÑবারার নামটি এসেছে।২২ এ ঘটনাকে আনসারদের একজন কবি কাব্যাকারে বর্ণনা করেছেন।২৩ তার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ নিম্নরুপঃ

১, রাসূল (সা) বললেনÑ আর তাঁর কথাইতো সত্য তোমাদের নেতা কে?

২, তারা বলরোঃ জাদ্দা ইবন কায়স যদিও সে আমাদের নেতৃত্ব দেয় সে একজন কৃপণ।

৩, সে এমন এক যুবক যে পৃথিবীবাসীর প্রতি কোন পদক্ষেপ নেয়না এব ংকারো প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ায় না।

৪, অতএব, তিনি আমর ইবন জামূহকে নেতা বানালেন তাঁর দানশীলাতর জন্য। দানশীলতার কারণে নেতৃত্ব দানের অধিকার আমরেরই।

৫, কোন সাহায্যেপ্রার্থী তাঁর কাছে এলে তিনি তাঁর সম্পদ তাকে দেন। আর বলেন, এগুলি লও এবং আগামীকাল আবার এসো।

রাসূল কারীমের প্রতি ছিল তার প্রচন্ড ভক্তি ও ভালোবাসা। রাসূল (সা) যখন কোন শাদী করতেন তিনি নিজ উদ্যেগে তার ওলীমা করতেন।২৪

তথ্যসূত্র:

 

‘আমর ইবন হায্ম (রা)

‘আমর (রা) এর ডাকনাম আবু আদ-দাহ্হাক। মতান্তরে আবু মুহাম্মদ। পিতা হায্ম ইবন যায়িদ মদীনার খায়ার গোত্রের বুন নাজ্জর শাখার ছেলে এবং মাতা বনু সায়িদা শাখার মেয়ে।১ হযরত আম্মার ইবন হায্ম (রা) যিনি আকাবার বাইয়াতে শরীক ছিলেন, আমার বৈমাত্রীয় ভাই।২

ইসলামের সূচনা পর্বে ও হিজরাতের সময় পর্যন্ত আমার চিলৈন প্রাপ্ত বয়স্ক। এ কারণে তিনি যে কখন ইসলাম গ্রহণ করেন তা সঠিকভবে নির্ণয় করা যায় না। সম্ভবতঃ নিজের পরিবারের লোকদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।৩

যুদ্ধে যাওয়ার বয়স না হওয়ার কারণে  বদর ও উহুদ যুদ্ধে যোগদান করতে পারননি। ইবন হিশাম বলেনঃ রাসূলে (সা) বয়স কম হওয়ায় উমামা ইবন যায়িদ আবদুল্লাহ ইবন উমার ইবন আল খাত্তাব ইবন সাবিত, আল বারা ইবন আমির, আমর ইবন হায্ম ও উসাইদ ইবন জুাহইরেকে উহুদ যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি দেননি।তাঁরা যেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু রাসূল (সা) তাঁদেরকে ফিরিয়ে দেন। খন্দক যুদ্ধের সময় যোগদানের অনুমতি দেন।৪ ইবন ইসহাক বলেনঃ আমর বলেনঃ পনেরো বছর বয়েসে খন্দক যুদ্ধে যোগদান করেন।৫ খন্দক পরবর্তী সকল যুদ্ধে তিনি অয়শ নেন।তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধ খন্দক।৬

ইবন ইসহাক বলেনঃ রাসূল (সা) হিজরী দশ সনের রাবীউল আওয়াল অথবা জামাদিউল আওয়াল মাসে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে নাজরানের বনু আল হারিস ইবন কা’ব এর নিকট পাঠান। যাওয়ার সময় তাঁকে নির্দেশ দেন, তাদের সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার আগে তিনবার তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেবে। তারা সে দাওয়াত গ্রহণ করলে তাদেরকে তুমি তো মেনে নেবে। প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। খালিদ সেখানে পৌঁছে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা গ্রহণ করে। খালিদের আপ্রাণ চেষ্টায় নাজরানের অধিবাসীরা ইসলাম কবুল করে। খালিদ সেকানে অবস্থান করে তাদেরকে ইসলামে বিভিন্ন বিষয়, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা) সুন্নাত শিক্ষা দিতে থাকেন।

এক পর্যায়ে খালিদ (রা) নাজরানের সঠিক অবস্থা বর্ণনা করে রাসূলকে (সা) পত্র লেখেন। উত্তরে রাসূলও (সা) একটি পত্র খালিদকে (রা) পাঠন। তাতে তিনি বনু আলÑহারিসের একটি প্রতিনিধিদল সংগে করে মদীনায় আসার জন্য খালিদকে নির্দেশ দেন। খালিদ একটি প্রতিনিধি দল সাথে নিয়ে মদীনয় আসেন। প্রতিনিধিদলের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ইবন হিশাম বলেনঃ এ দলটি শাওয়াল মাসের শেষ অথবা জুল কা’দাহ মাসের প্রথম স্বদেশে ফিরে যায়। তাদের ফিরে যাওয়র পর রাসূল (সা) মাত্র চার মাস জীবিত ছিলেন। ইবন হিশাম আরো বলেন, প্রতিনিধিদলটি ফিরে যাওয়ার পর রাসূল (সা) তাদেরকে দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞানদান ইসলামের মৌলিক বিষয় সমূহ ব্যাখ্যা, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের শিক্ষা দান এবং যাকাত ও সাদাকা আদায়ের জন্য আমর ইবন হায্মাকে পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে তাদের কাছে পাঠান। যাত্রার পূর্বে তাঁর দায়িত্বের পরিধি এবং কর্ম পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে রাসূর (সা) তাঁকে একখানি লিখিত অঙ্গীকার পত্র দান করেন।৭ এখানে পত্রটি ভাবর্থ দেওয়া হলোঃ

বিসমিল্লাহ রাহমনির রহীম। এ আল্লাহ ও রাসূলের ঘোষণা, হে ঈমানদার ব্যক্তিগণ তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর যখন তাকে ইয়ামেনে পাঠানো হচ্ছে। তিনি তাকে সকল ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কারণ আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আল্লাহর নির্দেশ মতে সত্যসহকারে মানুষের অর্থ সম্পদ গ্রহণ করার।

তুমি মানুষের কল্যাণের সুসংবাদ দেবে এবং ভালো কাজের আদেশ করবে। কুরআনর শিক্ষা দেবে, তাদের সামনে কুরআনের গভীর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করবে এবং তাদেরকে খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করবে। কেউ পবিত্র অবস্থায় ছাড়া কুরআন স্পর্শ করতে পরবে না। মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব কার্তব্য তাদেরকে অবহিত করবে। মুনষ হক বা সত্যের ওপর থাকলে তাদের প্রতি কমল হবে, তারা অত্যাচারি হলে কঠের হবে। করাণ আল্লাহ অত্যাচার অপসন্দ করেন এবং অত্যাচার করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ সাবধান! অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। মানুষকে জান্নাত ও জান্নাতের কাজসমূহের সুসংবাদ দেবে।তেমনিভাবে জাহান্নাম ও জাহান্নামের কাজগুলি সম্পর্কে সতর্ক করে দেবে।

মানুষের সাথে হদ্যতার সম্পর্কে গড়ে তুলবে। যতে তারা দ্বীন বুঝতে পারে। হজ্জ্বের নিদর্শনসমূহ, সুন্নাত ও ফরজসমূহ এবং সে সম্পর্কে আল্লাহ যা বর্নণা করেছেন তা তাদেরকে অবহিত করবে। হজ্জের আকবর সম্পর্কে জানাবে। হজ্জ দুই প্রকারঃ হজ্জে আকবর ও হজ্জে আসগর। উমার হচ্ছে হজ্জে আসগর। মানুষকে একখানা ছোট কাপড়ে নামায পড়তে নিষেধ করবে। দুই কাধের ওপর আর একখানি কাপড় পেচানো থাকরে একটি ছিদ্র দিয়ে মাথাটি আকাশের উচু হয়ে আছে। মাথার দিকে চুলের বেনী বাঁধতে নিষেধ করবে।

উত্তেজিত হয়ে গোত্রে ও সম্প্রদায়েকে জানাতে মানুষকে নিষেধ করবে। তাদের আহবান হবে কেবল আল্লাহর দিকে। কেউ আল্লাহর দিকে না ডেকে গোত্র ও সম্প্রদায়ের দিকে আহবা জানালো তরবারী দিয়ে মাথাটি কেটে ফেলবে। যাতে, তাদের আহবান হয় এক আল্লাহর দিকে। মানুষেকে পরিপূর্ণরুপে অজু করতে আদেশ করবে। আল্লাহ যেমন মুখমন্ডল, কনুই পর্যন্ত হাত, গিরা দুই পা ধুইতে এবং মাথা মাসেহ করতে বলেছেন, সেইভাবে। সঠিক সময়ে নাময আদায় করতে ও যথাযথভাবে রুকুÑ সিজদা করতে আদেশ করবে। সকালের নামায অন্ধাকরে জুহরের নামায সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে গেলে, আসরের নামায সূর্য পৃথিবীর দিকে পিছনে দিলে এবং মাগরিবের নামায রাতের আগমন ঘটলে আদায় করতে মানুষকে আদেশ করবে। মাগরিবের নামায আকাশে নক্ষত্র দেখা যায় এমন সময় পর্যনত দেরী করবে না। রাতের প্রথম ভাগে ঈশার নামায আদায় করতে বলবে। জুম’আর নামাযের আজান হলে সক কাজ বন্ধ করে জুম’আর নামাযে যেতে বলবে। যাওয়ার আগে গোসল করতে বলবে।

যে কোন ইয়াহুদী অথবা নাসারা নিষ্টাসহকারে মুসলাম এবং ইসলামের বিধিÑবিধান মেনে চলবে সে সত্যিকার মুমিন বলে বিবেচিত হবে। মুমিনদের সামান অধিকার যেমন সে ভোগ করবে, তেমনি সামান দায়িত্ব ও কর্তব্যও তার ওপর বর্তাবে। আর যে ইয়াহুদী ও নাসারা তার নিজ ধর্মে থেকে যাবে তাকে কোন রকম বাধা দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে নারীÑপরুস, স্বাধীন ও দাস  নির্বিশেষে প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্কের ওপর পূর্ণ এক দীনার অথবা তাঁর রাসূলের। যে তা দিতে অস্বীকার করবে সে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও মুমিন সকলের শত্র“। মুহাম্মাদের ওপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। ওয়াস সালামু আলাইহি ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু।

নাজরানের সরকার পরিচালনার পাশাপাশি ধর্মিয় ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব ও তাঁর হাতে ন্যস্ত ছিল। তিনি শিক্ষাদান ও তাবলীগের দায়িত্বেও পালন করতেন। ইবনুল আসীর বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে নাজরানবাসীদেরকে ফিকাহ ও কুরআন শিক্ষা দান ও তাদের নিকট থেকে যাকাত ও সাদাকা আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করেন।৮

ইবন হাজার বলেনঃ রাসূল (সা) আমরকে যখন নাজরানে পাঠান তখান তাঁর বয়স মাত্র সতেরো বছর। ইবন সা’দাও এ কথা বলেছেন।৯ কিন্তু তাঁদের এ কথা সঠিক নয় বলে মনে হয়। কারণ সীরাত ও ইতিহাসের সকল গ্রন্থে একাত বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি হিজরী দশ সনে নাজারানে যার।আর একথাও বর্ণিত হয়েছে যে খন্দক যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল পনেরো বছর। ইবন হাজর তাঁর তাহজীবুত তাহজীব’ (৮/৯) গ্রন্থেও বলেছেন তিনি পনেরো বছর বয়েসেই খন্দক যুদ্ধে যোগদান করেন। আর একথাও তো সত্য যে খন্দক যুদ্ধ হয় হিজরী পঞ্চম সনে। অতএব ডহজরী দশ সনে কোন অবস্থাতে তাঁর বয়স বিশ বছরের কম হতে পারে না।

হযরত ‘আমর (রা) মদীনা থেকে নাজরান যাওয়ার সময় স্ত্রীকেও সয়গে নিয়ে যান। স্ত্রীর নাম ছিল উমর্ ানাজরানর পৌছার পর সেই বছরই তাঁদের এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে।পিতা-মাতা সন্তানের নাম রাখেন মুহাম্মাদ এবং ডাক নাম আবু সুলায়মান। এ খবর মদীনায় রাসূলের (সা) নিকট পৌঁছালে তিনি সন্তানের নাম মুহাম্মাদ ও ডাকনাম আবু আবুদল মালিক রাখার জন্য লিখে পাঠান।১০ ইমাম আল হাযেমী এই মুহাম্মাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেনঃ যাদেরকে ইয়ামেনের নাজরানের প্রতি সম্পৃক্ত করা হয়েছে, আবু আবুদল মালিক মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হায্ম তাদের একজন। তাঁকে নাজরানী বলা হয়। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে হিজরী দশ সনে সেখানে জন্ম গ্রহণ করেন। মদীনায় আনসাররা আল-হাররা এর দিনে তাঁকেই ওয়ালী মানোনীত করেন এবং হিজরী ৬৩ সনে তিনি আল-হাররা এর ঘটনায় শাহাদাত বরণ করেন।১১

হযরত আমরের (রা) দুই স্ত্রী। প্রথমার নাম উমরা। তিনি আবদুল্লাহ ইবন আল-হারিস আল-গাসসানীর কন্যা। এই আবদুল্লাহ ছিলেন মীনায় বহিরাগত এবং মদীনায় সায়িদা গোত্রের হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ।১২ দ্বিতীয়ার নাম সাওদা বিনতু হারিস।১৩ আমরের (রা) জীবনেরশেষ দিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

আমরের (রা) সন—ানদের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে ছেলে মুহাম্মাদ, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় জন্ম গ্রহণ করেন, খ্যাতিমান হয়েছিলেন। তিনি উমার (রা) ও অন্যদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তাঁর পিতাকে দেওয়া রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠিটি তিনি লোকদের  দেখিয়ে বলতেন, এ হচ্ছে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি চিঠি। তিনি আমর ইবন হায্মকে ইয়ামনে পাঠানোর সময় তাঁকে দিয়েছিলেন।১৪ প্রখ্যাত মুজতাহিদ ও ফকীহ কাজী আবু বকর ছিলেন এই মুহাম্মাদের পুত্র।১৫

গভীর জ্ঞান, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তীক্ষè বিচার ক্ষমতা এবং শরীয়াতের বিধি বিধানে অপরিসীম দখল ছিল তাঁর। এর প্রমাণ পাওয়া যায় রাসূল (সা) কর্তৃক তাঁকে নাজরানের ওয়ালী নিয়োগের মাদ্যমে। মাত্র বিশ বছর বয়সে শাসন পরিচালনার মত গুরুদায়িত্ব পালন এবং কুরআন হাদীস শিক্ষাদান তাঁর আসাধারন যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বক্ষর বহন করেন।

রাসূলুল্লাহর (সা)  বেশ কিছু হাধীস তাঁর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষত নাজরান যাওয়ার প্রক্কালে রাসূলে করীম (সা) যে লিখিত পুস্তিকাটি তাঁকে দান করেন তা আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবন হিব্বান, দ ারেমী প্রমুখ মাহাদ্দিসীন বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের কয়েক জনের নাম এখানে দেওয়া হলোঃ

স্ত্রী সাওদা, পৌত্র আবু বকর, পুত্র মুহাম্মাদ, নাদর ইবন আবদুল্লাহ সালামী এবং যিয়াদ ইবন সুয়াইম আল-হাদরামী।১৬

আমরের (রা) চরিত্রের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট লো সততা ও সত্যবাদিতা। কারও রক্তচক্ষু কখনো তাঁকে সত বলা থেকে বিরত রাখতে পরেননি। প্রখ্যাত সাহাবী আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) সম্পর্কে রাসূলে করীম (সা) ভবিষ্যৎদ্বাণী করেন যে,একটি বিদ্রোহী দল তাঁকে হত্য করবে। সিফফীনে যুদ্ধে আম্মার (রা) পক্ষে যুদ্ধ করা মুয়াবিয়ার (রা) বাহিনীর হাতে শহীদ হন। আম্মার (রা) আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধ কের মুয়াবিয়ার (রা) পৃষ্টপোষক আমর ইবনুল আসের (রা) নিকট এবং বলেনঃ আম্মার তো নিহত হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) বানী আছেঃ তাঁকে একটি বিদ্রোহী দল হত্যা করবে। এরপর তিনি যান মুয়াবিয়ার (রা) নিকট। বলেনঃ আম্মার তো নিহত হয়েছে। আমি রাসূলুল্লাহ (সা) বলতে শুনেছিঃ তাকে একটি বিদ্রোহী দল হত্যা করবে। মুয়াবিয়া (রা) বললেনঃ দুমি তোমার যুক্তিতে ভুল করছো। আমার কি তাকে হত্যা করছি? তাকে হত্যা করেছে আলী ও তার সংগীরা। তাঁরাই তাঁকে আমাদের বর্শা ও তরবারির সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি।১৭

মু’য়াবিয়া (রা) তখন খলীফা। একবার আমার (রা) গেলেন খলীফার দরবারে এবং তাঁর শাসনের প্রতি ইঈিত করে তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস শোনালেন।তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখে শুনেছি, কিয়ামতের দিন রাজাকে তার প্রজাদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।১৮

মুসনাদে আবু ইয়ালা গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, মুয়াবিয়া (রা) যখন স্বীয় পুত্র ইয়াযিদের জন্য বাইয়াত শপথ গ্রহণ করেন তখন একবার তাঁর সাথে আমরের  (রা) শক্ত বাকযুদ্ধ হয়।১৯

আমরের (রা) মৃত্যু সন নিয়ে মতবিরোধ আছে। হিজরী ৫১, ৫৩,ও ৫৪ সনে তাঁর মৃত্যুর কথা বর্ণিত হয়েছে। আবু নু’য়াইমা বলেন, আমর ইবন হাযম উমারের (রা) খিলাফতকালে মৃত্যু বরণ করেন। ইবরাহীম ইবন মুনজিরও তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে একই কথা বলেছেন। তবে হিজরী পঞ্চাশ সনের পর মারা গেছেন বলে যে সকল মত বর্ণিত হয়েছে। ইবন হাজার তার কোন একটি সঠিক বলে মত প্রকাশ করেছেন। কারণ, মুয়াবিয়ার (রা) সাথে তাঁর যে ঝগড়া হয় তা বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে। সুতারং উমারের (রা) খিলাফতাকলে তাঁর মৃত্যুর প্রশ্নই উফে না। তিনি মদীনায় মারা যান।২০

‘আমর ইবন হায্ম বলেনঃ রাসূল (সা) একদিন আমাকে একটি কবরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলেনঃ নেমে এসো। কবরে শায়িত ব্যক্তিকে কষ্ট দিও না।২১

তথ্যসূত্র:

 

কা’ব ইবন মালিক (রা)

কা’ব (রা) ইতিহাসের সেই তিন ব্যক্তির একজন যাঁরা আলস্যবশতঃ তাবুক যুদ্ধে যোগদানত থেকে বিরত থাকেন এবং আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সা) ও মুমিনদের বিরাগভাজনে পরিণত হন। অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁদের তাওবা কবুলের সুসংবাদ দিয়ে আয়াত নাযিল কারেন।১ হিজরতের ২৫ বছর পূর্বে ৫৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইয়াসরিবে জন্ম গ্রহণ করেন।২ তাঁর আনেকগুলো কুনিয়াতবা ডাক নাম ইতিহাসে ও সীরাত গ্রন্থেসমূহে বূর্ণিত রয়েছে। যথাঃ আবু ‘আবদুল্লাহ, আবু আবদির রহমান, আবু মুহাম্মাদ ও আবু বাশীর।৩ ইবনে হাজারের একটি বর্ণনায় জানা যায়, জন্মের পর তাঁর পিতা মালিক ইবন আবী কাব আমর ছেলের ডাকনাম রাখেন আবু বাশীর। ইসলাম গ্রহনের পর রাসূলে কারীম (সা) রাখেন আবু আবদিল্লাহ। তিনি পিতা- মাতার একমাত্র সন্তান।৪ মাতার নাম লায়লা বিনতু যায়িদ। পিতামাতা উভয়ে মদীনার খায়রাজ গোত্রের বনু সালিমা শাখার সন্তান।৫ তিনি একজন আকাবী ও উহুদী সাহাবী। ইবন আবী হাতেম বলেনঃ তিনি ছিলেন আহলুস সুফ্ফাহরও আন্যতম সদস্য।৬ পচিঁশ বছর বয়সে গোত্রীয় লোকদের সাথে বাই’য়াতে আকাবায় শরীক হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।৭

ইবনুল আসীর বলেনঃ প্রায় সকল সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে, কাব আকাবার শেষ বাই’য়াতে শরীক ছিলেন।৮ উরওয়া সেই সত্তর জনের মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করেছেন যাঁরা আকাবায় অংশ গ্রহন করে ছিলেন।৯ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে কা’ব বলেছেনঃ আমি বাইয়াতে আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ইসলামের ওপর অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলাম। তবে অপর একটি বর্ণনায় এসেছে। তিনি বলেন, আমি লায়লাতুল আকাবায় বাইয়াত থেকে বঞ্চিত হই।১০

কা’ব ইবন মালিক যে আকাবার শেষ বাইয়াতে শরীক ছিলেন তা ইবন ইসহাকের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে জানা যায়। এ বাইয়াতে বিস্তারিত বিবারণ কা’ব দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে। সীরাতু ইবন হিশামে কাবের জবানীতে তা হুবহু এসেছে সংক্ষেপে তার কিছু এখানে তুলে ধারা হলো।

ইবন ইসহাক কা’ব এর ছেলে আবদুল্লাহ ও মা’বাদ এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কা’ব মদীনা থেকে স্বগোত্রীয় পৌত্তলিক হাজীদর একটি কাফেলার সাথে মাক্কার উদ্দেশ্যে বের হন। এ কাফেলার সাথে পূবেই ইসলামের গ্রহণকারী কিছু মুসলামনও ছিলেন। তারা দ্বীন ও বুঝেছিলেন এবং নামায পড়তেন। এ কাফেলার তাঁদের বয়োজ্যেষ্ট নেতা আলÑবারা ইবন মারুর ও ছিলেন। চলার পথে তিনি একদিন বললেনঃ আমি আর এই কা’বার দিকে পিঠ করে নামায পড়তে চাইনে। এখানে থেকে কা’বার মুখ করেই নামায পড়বো। কা’ব ও অন্যরা তাঁর একথায় আপত্তি জানিয়ে বললেন, আমাদের নবী (সা) তো শামের বায়তুল মাকাদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায়  করতে থাকেন। তাঁর বিরোধীতা হয় আমরা এমনভাবে নামায পড়তে  চাইনা। এর পরও আল-বারা তাঁর মতে অটল থাকলেন।

পথে নামাযের সময় হলে আল-বারা কাবার দিকে, কা’বও অন্যরা শামের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে মক্কায় পৌঁছালেন। তাঁরা আল-বারা কে তাঁর এ কাজের জন্য তিরস্কার করেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হলোনা, তিনি স্বীয় মতে আনড় থাকলেন।

মক্কায় পৌঁছালে আল-বারা’কা’বার দিকে, কাব’ কে বললেনঃ তুমি আমাকে একটু রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে চলো। আসার পথে আমি যে কাজ করেছি সে ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেসা করতে চাই। তোমাদের বিরোধিতা করে আমার মনটা ভালো যাচ্ছে না। কা’বকে তাঁকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে চললেন। দুইজনের কেউই এর আগে রাসূলুল্লাহকে (সা) চিনত না এবং দেখেননি। পথে মাক্কার দুই ব্যক্তির সাথে তাঁদের দেখা হলো। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) অবস্থান সম্পর্কে জানাতে চাইলেন। তাঁরা বললোঃ আপনারা কি তাঁকে চেনেন? কা’ব ও আল-বারা জবাব দিলেনঃ না। তারা প্রশ্ন করলোঃ তাঁরা চাচা আব্বাসকে চেনেন? তাঁরা জবাব দিলোঃ হ্যাঁ, আব্বাস চিনি। ব্যবসা উপলক্ষে তিনি আমাদের ওখানে য়াতয়াত করন। তখন তারা বললোঃ আপনারা মাসজিদে ঢুকে দেখবেন আব্বাসের সাথে একটি লোক বসে আছেন। তিনি সেই ব্যক্তি।

কা’বও আল-বারা লোক দুইটির কথামত মসজিদে হারামে ঢুকে আব্বাসকে এবং তাঁর পাশে রাসূলুল্লাহর (সা) বসা দেখতে পেলেন। সালাম দিয়ে তাঁদের পাশে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আব্বাস কে বললেনঃ আবুল ফাদল! আপনি কি এ দুই ব্যক্তিকে চেনেন? আব্বাস বললেনঃ হাঁ ইনি আল-বারা ইবন মারুফ। তাঁর সম্প্রদায়ের নেতা। আর ইনি কা’ব ইবন মালিক। কা’ব বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সেই প্রশ্নবোধক শব্দটি আজও ভুলিনি- কবি? অথ্যাৎ রাসূলু (সা) আব্বাসকে প্রশ্ন করেনঃ একি সেই কবি কা’ব ইবন মালিক? আব্বাস জবাব দেনঃ হ্যঁ, ইন সেই কবি কা’ব। এরপর কা’ব বর্ণনা করেছেন, কিভাবে কেমন করে রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাৎ হলো এবং কোন কথার ওপর তাঁরা তার বাইয়াত করলেন।১১ রাসূল (সা)যে বারোজন নাকীব মনোনিত করেন, কা’ব একটি কবিতায় তাঁদের পরিচয়ও ধরে রেখেছেন।ইবন হিশাম সে কবিতাটিও বর্ননা করেছেন।১২

রাসূলে করীম (সা) মদীনায় এসে আনসার ও মাহাজিরদের মধ্যে দ্বীনী মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্খে প্রতিষ্টা করেন। আশারা মুবাশ্শারার সদস্য তালহা ইবন উবাইদুল্লাহর (রা) সাথে কা’বের এ সম্পর্কে প্রতিষ্টা হয়। একথা  ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন।১৩ তবে উরওয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে (সা) যুবাইর ও কাবের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্টা করে দেন।১৪ উহুদের দিন কা‘ব আহত হলে যুবাইর তাঁকে মুমূর্ষে অবস্থায় কাঁধে বহন করে নিয়ে আসেণ। সেদিন কা’ব মারা গেলে যুবাইর হতেন তাঁর উত্তরাধিকারী পরবর্তীকালে সূরা আল আনফারের ৭৫ নং আয়াত-‘বস্তুতঃ যারা উলুল আরহমা’ বা রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তাঁরা পরস্পর বেশী হকদার-নাযিল করে এ বিধান রহিত করা হয়।১৫

একমাত্র বদর ও তাবুক ছাড়া অন্য সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূল কারীমের (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেন। ইবনুল কালবীর মতে, তিনিবদর যোগদানকরেন।১৬ তবে অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞের নিকট এ মতটি স্বীকৃত হয়নি। আসল ঘটনা হলো, যে তাড়াহুড়ো ও দ্রুততার সাথে বদর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় তাতে অনেকের মত কা’বও অংশ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকেন। এ কারণে রাসূল (সা) কাউকে কিছুই বলেননি।

কা’ব বলেন: তাবুক পর্যন্ত একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধের আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেছি।ক্ষদরে যাঁরা যাননি, রাসূল (সা) তাঁদেরকে কোন প্রকার তিরস্কার করেননি। মূলতঃ রাসূল (সা) মদীনা থেকে বের হন আবু সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফিলার উদ্দেশ্যে। আর এদিকে কুরাইশরা মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ে আবূ সুফইয়ানের মুখোমুখিী হয় কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই। কা’ব আরও বলেন, বদর রাসূলুল্লাহর (সা) জীভনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে মানুষের নিটক বিবেচিত। তবে ‘লাইলাতুল ’আকাবা’-যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) হাতে ইসলামের ওপর বাই’য়াত (অঙ্গীকার) করেছিলাম, তার পরিবর্তে বদর আমার নিকট মোটেই প্রাধান্যযোগ্য নয়। এরপর একমাত্র তাবুক ছাড়া আর কোন যুদ্ধ থেকে পিছনে থাকিনি।১৭

তবে কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় কা’ব বদরে অশং করেছেন। ইবন ইসহাক কা’বের নামটি বদরে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।১৮ তাছাড়া একটি বর্ণনায় এসেছে, কা’ব বলেছেন: আমিমুসলমানদের সাথে বদরে যাই। যুদ্ধ শেষে দেখলাম পৌত্তলিক যোদ্ধাদের বিকৃত লাশমুসলিম শহীদদের সাথে পড়ে আছে। আমি ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থেকে চলে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ দেখতে পেলাম একজন পৌত্তলিক অস্ত্র সজ্জিত হয়ে মুসলিম শহীদদের অতিক্রম করছে। একজন অস্ত্রসজ্জিত যোদ্ধাও যেন তার অপেক্ষা করছিল। আমি একটু এগিয়ে এ দুইজনের ভাগ্য দেখার জন্য তাদের পিছনে দাঁড়ারাম। পৌত্তলিকটি ছিল বিরাট বপুধারী। আমি তাকিয়ে থাকতেই মুসলিম নৈকিটি তার কাঁধে তরবারির এমন এক শক্ত কোপ বসিয়ে দেয় যে, তার নিতম্ব পর্যন্ত পৌঁছে তাকে দুইভাগ করে ফেলে। তারপর লোকটি মুকের বর্ম খুলে ফেলে বলেঃ কা’ব কেমন দেখলে? আমি আবূ দুজানা।১৯ তবে অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁর বদরে অনুপস্থিত থাকার বর্ণনাগুলি সঠিক বলে মনে করেছেন।

উহুদ যুদ্ধে কা’ব তাঁর দ্বীনী ভাই তালহার (রা) সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই যুদ্ধে তিনি পরেন রাসূলুল্লাহর (সা) বর্ম এবং রাসূলুল্লাহ (সা) পরেন তাঁর বর্ম। রাসূল (সা) নিজ হাতে তাঁকে বর্ম পরিয়ে দেন। এই উহুদে তাঁর দেহে মোট এগারো স্থানে যখম হয়।২০ তবে বহু মুহাদ্দিস তাঁর দেহে সতোরোটি আঘাতের কথা বর্ণনা করেছেন।২১

এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলে কারীম (সা) শাহাদাত বরণ করেছেন। এতে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে ্কটো দারুণ হৈ চৈ পড়ে যায়। এ অবস্থায় কা’বই সর্বপ্রথম রাসূলকে (সা) দেখতে পান এবং গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠেন-রাসূল (সা) এই যে, এখানে। তোমরা এদিকে এসো। কা’ব  তখন উপত্যকার মধ্যস্থলে। রাসূল (সা) তখণ তাঁর হলুদ বর্ণের বর্ম দ্বারা তাঁকে ইঙ্গিত করে চুপ থাকতে বলেন।২২

উহুদের পরে যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে কা’ব (রা) দারুণ উৎসাহ ও উদ্দীপনাসহকারে যোগদান করেছেন। তবে ্ভাবতে আবাক লাগে যে, নবীর (সা) জীবনে প্রথম যুদ্ধ বদরের মত শেষ যুদ্ধ তাবুকেও তিনি যোগদান করতে ব্যর্থ হন। তাবুক ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ অভিযান। নানা কারণে একে কষ্টের যুদ্ধও বলা হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) রীতি ছিল, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে স্পষ্টভাবে কিচু বলতেন না। কিনউত এবার রীতি বিরুদ্ধ কাজ করলেন। এবার তিনি ঘোষণা করে দিলেন। যাতে দীর্ঘ ও কষ্টকর সফরের জন্য মুসলমানরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারে। কা’ব এই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য দুইটি উট প্রস্তুত করেন। তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি পূর্বের কোন যুদ্ধেই এতখানি সচ্ছল ও সক্ষম ছিলেন না, যতখানি এবার ছিলেন।

এ যুদ্ধের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) এতখানি গুরুত্বদান ও সতকর্তা অবলম্বনের কারণ এই ছিল যে, মূলতঃ সংঘর্ষটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের সুপার পাওয়ার প্রবল পরাক্রমশালী রোমান বাহিনীর সাথে। সাজ-সরঞ্জাম, সংখ্যা, ঐক্য ও অটুট মনোবলের দিক দিয়ে তাদের বাহিনী ছিল বিশ্বের সেরা ও শক্তিশারী বাহিনী।

নবম হিজরীর রজব মাস মুরু হয়েছে। প্রচন্ড গরমের মওসুম। রাসূল (সা) তাবুক অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন এবং সকলকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশও দিলেন।২৩ সংগত ও অসংগত নানা অজুহাতে মোট তিরাশিজন (৮৩) সক্ষম মসুলমান এ যুদ্ধে গমন থেকে বিরত থাকেন। তাদের কিচু ছিল মুনাফিক (কপট মুসলমান)। কারও বাগানের ফল পাকতে শুরু করেছিল, তা ছেড়ে যেতে তার ইচ্ছা হয়নি। কেউ ভয় পেয়েছিল প্রচন্ড গরম ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার। আবার কেউ ছির অতি দরিদ্র, যার কোন বাহন ছিল না।২৪

ইবন ইসহাক বলেন: যাঁরা সন্দেহ সংশয় বশতঃ নয়; বরংয় আলস্যবশতঃ যোগদানে ব্যর্থ হন তারা মোট চার জন। কা’ব ইবন মালিক, মুরারা ইবন রাবী, হিলাল ইবন উমাইয়্যা ও আবূ খায়সামা। তবে আবূ খায়সামা একেবারে শেষ মুহূর্তে তাবুকে পৌঁছেন ও রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হন।২৫কারও কারও মতে প্রচন্ড গরমের কারণে তাঁরা তাবুক গমনে বিরত থাকেন।২৬ রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। কা’ব (রা) প্রতিদিনই যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন; কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। দ্বিধা-দ্বধ্বে তাঁর সময় বয়ে যায়। তিনি প্রতিদিনই মনে মনে বলেতেন আমি যেতে পারবো। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টে যেত। যাত্রার উদ্যোগ নিয়ে আবার থেমে যেতেন। এ অবস্থায় একদিন মদীনায় খবর এলা, রাসূল (সা) তাবুক পৌঁছে গেছেন।

মদীনা ও তার আশা-পাশের সকল সক্ষম ব্যক্তি রাসূলুলÍাহর (সা) সাথে তাবুক চলে যান। কা’ব (রা) যখন মদীনা শহরে বের হতেন তখন শুধু শিশু, বৃদ্ধ ও কিচু মুনাফিক ছাড়া আর কোন মানুষের দেখা পেতেন না। লজ্জা ও অনুশোচনায় জর্জরিত হতেন। সুস্থ, সবল ও সক্সম হওয়া সত্ত্বেও কেন পিছনে থেকে গেলেন, সারাক্ষণ এই অনুশোচনার অনলে দগ্ধিভূত হতেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) সেনা বাহিনীর কোন দফতর ছিলনা। সুতরাং এত মানুষের মধ্যে কা’বারে মত একজন লোক এলো কি এলা না, তা তাঁর জানা াকার কা নয়। একমাত্র আল্লাহ পাকের ওহীই ছিল ত৭ার জানার মাধ্যম। তাবুক পৌঁছে একদিন তিনি কা’ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কোন এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার এত সময় কোথায় যে সে এখানে আসবে? মু’য়াজ ইবন জাবাল কাছেই ছিলেন। তিনি প্রতিবাদের সুরে বললেন, আমরা তো তাঁর মধ্যে খারাপ কোন কিছ ুদেখিনি। একথা শুনে রাসূল (সা) চুপ থাকলেন।

রোমানদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) কোন মারাত্মক সংঘর্ষ হলো না। উত্তর আরবের অনেক গোত্র জিযিয়ার বিনিময়ে সন্ধি করলো। রাসূল (সা) মদীনায় ফিরে এলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ফিরে আসার খবর কা;ব পেলেন। তাঁর অন্তরে তখন নানা রকম চিন্তার ঢেউ খেলছে। রাসূলুল্লাহর (সা) অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার উপায় কি, সে বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন পরিবারের লোকদের কাছে। তখনও এমন চিন্তাও তাঁর মনে উদয় হলো যে, সত্য অসত্য মিলিয়ে কিছু কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু পরক্ষণেই এ চিন্তা যেন কোথায় হাওয়া হয়ে যেত। এ করম দ্বিধা দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, কপালে যা আছে তাই হোক, কোনরকম ছল-চাতুরীর আশ্রয় তিনি নেবেন না। যা সত্য তাই বলবেন।

এর মধ্যে দলে আশি জনের মত লোক রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য আত্মাপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখলো। রাসূল (সা) তাদের সকলের ওজর-আপত্তি গ্রহণযেগ্য মনে কররেন। সকলের অপরাধ ক্ষমার জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করলেন এবং পুনরায় তাদের বাই’য়াত বা অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন।

কা’ব (রা) আসলেন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট। তাঁকে দেখে রাসল (সা) মৃদু হেসে বললেন: এসো। কা’ব সামনে এসে বসার পর প্রশ্ন করলেনঃ যুদ্ধে যাওনি কেন? কা’ব বললেনঃ আপনার কাছে কী আর গোপন করবো? দুনিয়ার কোন রাজা-বাদশাহ হলে নানারকম কথার জাল তৈরী করে তাকে খুশী করতাম। সে শক্তি আমার আছে।অ আমি তো একজন বাগ্মী ও তর্কবাগিশ। আমি আপনার নিকট সত্য গোপন করবো না। এতে হতে পারে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু মিথ্যা বললে এ মুহূর্তে আপনি খুশী হয়ে যাবেন। তবে আল্লাহ আপনাকে আমার ব্যাপারে নাখোশ করে দেবেন। আর তা আমার জন্য মোটেই সুখকর নয়। মূলতঃ আমার না যাওয়ার কোনকারণ ছিল না। আমি ছিলাম সুস্থ সবল এবং অর্থে-বিত্তেও যুদ্ধের সাজ-সরজ্ঞামে সমর্থ। তবুও আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি যেমে পরিনি। তাঁর কথা মুনে শুনে রাসূল (সা) বললেনঃ সত্য বলেছো। তুমি এখন যাও। দেখা যাক আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত দান করেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার থেকে উঠে আসার পর বনু সালেমার কিছু লোক তাঁকে বললো, আপনি এর আগে আর কোন অপরাধ করেননি। এটাই আপনার প্রথমবারের মত একটি অপরাধ। অথচ এর জন্য ভালোমত কোন ওজর ও আপত্তি উপস্থাপন করতে পারলেন না। অন্যদের মত আপনিও কিচু ওজর পেশ করতেন, রাসূল (সা) আপনার গোনাহ মাফের জন্য দু’আ করতেন, আর আল্লাহ মাফ করে দিতেন। কিন্তু তা আপনি পারলেন না। তাদের কথা শুনে কা’বের ইচ্ছা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ফিরে গিয়ে পূর্বের বর্ণনা প্রত্যাহাপর করেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি প্রশ্ন করলেন: আমার মত আর কেউ কি আছে? তিনি জানতে পেলেন, আরও দুইজন আছেন। তাঁরা হলেন: মুরারা ইবন রাবী ও হিলাল ইবন উমাইয়্যা। তঁ*ারা দুইজনই অতি নেক্কার বান্দা ও বদরী সাহাবী। তাঁরেদ নাম শুনে তিনি কিছুটা আশ্বাস্ত হলেন এবং নতুন করে ওজর পেশ করার ইচ্ছা দম ন করলেন।

রাসূলে কারীম (সা) পূর্বে উল্লেখিত তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবত াকে। মানুষ তাঁদের প্রতি আড় চোখে তাকিয়ে দেখতো। কোন কা বলতো না। মুরারা ও হিলাল নিজেদেরকে আপন আপন গৃহে আবদ্ধ করে রাখেন। দিন রাত তাঁরা শুধু কাঁদতেন। কা’ব ছিলেন যুবক। ঘরে বসে থাকা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল? পাঁচ ওয়াকত নামাযেই তিনি মসজিদে আসা যাওয়া করতেন, হাটে বাজারেও ঘোরাঘুরি করতেন। বিন্তু কোন মুসলমান ভুলেও তাঁর সাথে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন না।

কা’ব মসজিদে যেতেন এবং নামাযের পর রাসূলকে (সা) সালাম করতেন। রাসূল (সা) জায়নামাযে বসে থাকতেন। রাসূল (সা) সালামের জবাব দিচ্ছেন কিনা বা তাঁর ঠোঁট নড়ছে কিনা, কা’ব তা গভীরভাবে লক্ষ্য করতেন। তারপর আবার রাসূলুল্লাহর (সা) নিকটেই নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। চোখ আড় করে একটু  একটু করে রাসূলুল্লাহর (সা) দিকে তাকাতেন এবং রাসূলও (সা) তাকে আড় চোখে দেখতেন। যখন কা’ব নামায শেষ করে রাসূলুল্লাহর (সা) দিকে ফিরতেন তখণ তিনি কা’বের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন।

কা’বের (রা) সাথে তাঁর পরিবারের সদস্যদের আচরণও ছিল অভিন্ন। আবূ কাতাদাহ (রা) ছিলেন কা’বের চাচাতো ভাই। একদিন কা’ব বাড়ীর প্রাচীরের ওপর উঠে তাঁকে সালাম করলেন; কিন্তু কাতাদাহ জবাব দিলেন না। কা’ব তিনবার কসম খেয়ে বললেন, তুমি তো জান আমি আল্লা ও তাঁর রাসূলকে কত ভালোবাসি। শেষবার কাতাদাহ্ শুদু মন্তব্য করলেনÑবিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।

কাতাদাহর (রা) এমন জবাবে কা’ব (রা) দারুণ হত্যশ হলেন। আপন মনে বললেণ, এখন তো আমার ঈমানের ব্যাপারে সাক্ষী দেওয়ারও কেউ নেই। তাঁর চোখ থেকে অশ্র“ গড়িয়ে পড়লো। তিনি বাজারের দিকে বেরিয়ে গেলেন। এদিকে বাজারে তখণ শামের এক নাবাতী ব্যক্তি তাঁকে খুঁজছিলেন। কা’বকে দেখে লোকেরা ইঙ্গিত করে বললো, ঐ যে তিনি আসছেন। লোকটি কা’বের নামে লেখা গাসসানীয় রাজার একটি চিঠি নিয়ে এসেছিলো। তাঁর নিকট তেকে চিঠিটি নিয়ে কা’ব পড়লেন। তাঁতে লেখা ছিলÑ‘তোমার বন্ধু (রাসূল (সা) তোমরা প্রতি খুব অবিচার করেছেন। তুমি তো কোন সাধারণ ঘরের সন্তান নও। তুমি আমার কাছে চলে এসো। চিঠিটি পড়ে তিনি মন্তব্য করলেন, এটাও এক পরীক্ষা। চিঠিটি তিনি জ্বলন্ত চুলায় ফেলে দিলেন।

এভাবে চল্লিশ দিন কেটে গেল। চল্লিশ দিন পর রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট গিয়ে বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ হলো, তোমার স্ত্রী থেকে তুমি দূরে থাকবে। কা’ব জানতে চাইলেন, আমি কি তাঁকে তালাক দেব? তিনি বললেনঃ না। শুধু পৃথক থাকবে।

কা’ব (রা) বললেন, তুমি তোমার পিাত-মাতার কাছে চলে যাও। আমার ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সেখানেই থাক। অন্য দুইজনথÑহিলাল ও মুরারাকেও (রা) একই নির্দেশ দেওয়া হয়। হিলাল ছিলেন বৃদ্ধ। তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হয়ে স্বামী সেবার বিশেষ অনুমতি নিয়ে আসেন। কা’বের পরিবারের লোকেরা তাঁর স্ত্রীকেও বললেন, তুমিও রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যেয়ে স্বামী সেবার অনুমতি নিয়ে এসো। কিন্তু তিনি সম্মত হলেন না। বললেনঃ আমি যাব না। না জানি, রাসূলুল্লাহ (সা) কি বলবেন।

পঞ্চাশ দিনের মাথায় ফজরের নামায আদায় করে কা’ব (রা) ঘরের ছাদে বসে আছেন। ভাবছেন, এখন তো আমার জীবনটাই বোঝা হয়ে উঠেছে। আসমান-যমীন আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এ ধরণের আকাশ-পাতাল চিন্তা করছেন, এমন সময় সালা’ পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে কারও কষ্ঠস্বর ভেসে এলোঃ কা’ব শোন! তোমরার জন্য সুসংবাদ! তিনি বুঝলেন, তাঁর দু’আ ও তাওবা কাবুল হয়েছে। সাথে সাথে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আয়াদ করেন। নিজের ভূলের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন। কিছুক্ষণ পর দুই ব্যক্তি যাদের একজন ছিল ঘোড় সাওয়ার, এসে তাঁকে সুসংবাদ দান করেন। কা’ব নিজের গায়ের কাগড় খুলে তাদেরকে দান করেন। অতিরিক্ত কাপড় ছিল না তাই সেই দান করা কাপড় আবার চেয়ে নিয়ে পরেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ছুটে যান।

ইতিমধ্যে খবরটি মদীনায় ছড়িয়ে পড়েছে। দলে দলে মানুষ তাঁর বাড়ীর দিকে আসতে শুরু করেছে। পথে যার সাথেই দেখা হচ্ছে, তাঁকে মুবারকবাদ দিচ্ছে। তিনি মসজিদে নবনীতে পৌঁছে রাসূলকে (সা) সাহাবীদের মাঝে বসা অবস্থায় পেলেন। মসজিদে ঢুকতেই তালহা (রা) দৌড়ে এসে হাত মেলালেন। তবে অন্যরা নিজ নিজ স্থানে বসে থাকলেন। কা’ব (রা) এগিয়ে গিয়ে রাসূলে কারীমকে (সা) সালাম করলেন। তাবারানী বর্ণনা করেছেন; তাওবা কবুল হওয়ার পর কা’ব  রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে তাঁর দুইখানি পবিত্র হাত ধরে চুমু দিয়েছিলেন।২৭ তখন রাসূলে কারীমের চেহারা মুবািরক চাঁদের মত দীপ্তিমান দেখচ্ছিল। তিনি কা’বের (রা) উদ্দেশ্যে বললেনঃ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছি। তোমার জন্মের পর থেকে আজকের দিনটির মত এত ভালো দিন তোমার জীবনে আর আসেনি।

আপনি কি আমাকে ক্ষমা করেছেন? রাসূল (সা) বললেন: আমি কেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন।’ এ কথা বলে তিনি তাদের সম্পর্কে সদ্য নাযিল হওয়া সূরা তাওবার ১১৭ নং আয়াতটি পাঠ করে শোনান। আল্লা দয়অশীল নবীর প্রতি, এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যাঁরা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে চিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি ত৭াদের প্রতি দয়অশীল ও করুণাময়।’ তিলাওয়াত শেষ হলে আনন্দের আতিশয্যে কা’ব বলে উঠলেন।, ‘আমি আমার সমন্ত ধন সম্পদ সাদাকা করে দিচ্ছি।’ রাসূল (সা) বললেনঃ সব নয়, কিছু দানকর। কা’ব তাঁর খাইবারের সম্পত্তি দান করেন। এরপর তিনি মন্তব্য করেনঃ আল্লাহ আমার সততার জন্যই মুক্তি দিয়েছেন। আমি অঙ্গীকার করছি, বাকী জীবনে আমি শুধু সত্যই বলবো।

সত্য বলার জন্য কা’ব ও তাঁর অপর দুই সঙ্গীকে যে চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, ইসলামের ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত পাওয়া দুস্কার। এত বড় বিপদেও তাঁদের দৈর্য্যচ্যুতি ঘটেনি। পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে তাঁদের সেই করুণ অবস্থা াতি চমঃকারভাবে চিত্রিত হয়েছেঃ

“এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পিছনে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিšতৃত হওয়ার সত্ত্বেও তাঁদের জন্য সস্কৃচিতহয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতিত আর কোন আশ্রয়স্থল নেইÑঅতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময় করুণাশীল। হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।” (সূরা তাওবা ১১৮-১১৯)

এ আয়াতে যাদেরকে পিছনে রাখা হয়েছিল বলা হয়েছে। এর অর্থ যুদ্ধ থেকে পিছনে থেকে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহর (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসার প্রতীক্ষার ছিলেন।

কা’ব বলেনঃ আমাদের তাওবাহ কবুল সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয় রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে। উম্মু সালামা তখন বললেনঃ হে আল্লাহ নবী! আমরা কি কা’বকে সুসংবাদটি জানিয়ে দেব? রাসূল (সা) বললেন: তাহলেতো মানুষের ঢল নামবে এবং তোমরা আর ঘুমাতে পারবে না।২৮

কা’বের (রা) মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। ইবন হিববান বলেন, তিনি আলীর (রা) শাহাদারে সময়কালে মারা যান। ইবন আবী হাতেম বলেন, মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে তিনি অন্ধ হয়ে যান। ইমাম বুখারী ত৭ার মৃত্যু সম্পর্কে শুধু এতটুকু উল্লেখ করেছেন যে, তিনি উসমানের মৃত্যুতে শোকগাথা রচনা করেছেন এবং মু’য়াবিয়া ও আলীর (রা) দ্বন্দ্বে তাঁর ভূমিকার বিষয়ে আমরা কোন তথ্য পাইনি। ইমাম বাগাবী বলেন, আমি জেনেছি, তিনি মু‘য়াবিয়ার (রা) খিলাফত কালে শামে মারা যান। আবুল ফারাজ আল ইসপাহানী কিতাবুল আগামী গ্রন্থে একটি দুর্বল সনদে উল্লেখ করেছেন যে, হাসসান ইবন সাবিত কা’ব ইববন মালিক ও আন-নূ’য়ান ইবন বাশীর (লা) একবার আলীর (রা) কাছে যান এবং উসমানের (রা) সত্যার বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে তর্কে লিপ্ত হন। তখন কা’ব (রা) উসমানের (রা) শানে তাঁর রচিত একটি শোকগাথা আবৃত্তি করে আলীকে শোনান। তারপর ত৭ারা সেখান থেকে উঠে সোজা মু’য়াবিয়ার কাছে চলে যান। মু’য়াবিয়া (রা) তাঁদেরকে উপযুক্ত মর্যাদা দান করেন।২৯

আল-হায়সাম ও আল-মাদায়িনীর মতে কা’ব হিজরী ৪০ সনে মারা যান। তবে তাঁর থেকে হিজরী ৫১ সনের কথাও বর্নিত হয়েছে। আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, হিজরী ৫০ সনে তাঁর মৃত্যুর কথা বর্ণিত আছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদধ ও সঠিক মত এই যে, হিজরী ৫০ থেকে ৫৫ (৬৭০-৬৭৩ খ্রীঃ)-এর মধ্যে প্রায় ৭৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।৩০

সীরাত গ্রন্থসমূহে ত৭ার পাঁচ ছেলের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেনঃ আবদুল্লাহ, উবায়দুল্লাহ, আবদুর রহমান. মা’বাদ ও মুহাম্মদ। শেষ জীবন কা’ব (রা) অন্ধ হয়ে যান।৩১ ছেলেরা তাঁকে হাত ধরে নিয়ে বেড়াপতেন।৩২ ইবন ইসহাক তাঁর ছেেেল আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: শেষ জীবনে আমার পিতা অন্ধ হয়ে গেলে আমি তাঁকে নিয়ে বেড়াতাম। আমি যখন তাঁকে জুম’আর নামাযের জন্য নিয়ে বের হতাম তখন আজান শোনার সাথে সাথে তিনি আবু উমামা আস’য়াদ আবিন খুরারার জন্যে মাগফিরাত কামনা করে দু’আ করতেন। জুরআর আজান শুনলেই তাঁকে আমি সব সময় এ কাজটি করতে দেখতাম। বিষয়টি আমার কাছে রহস্যজনক মন হলো। আমি একদন জুম’আর দিনে ত৭াকে নিয়ে বের হয়েছিল, পথে আজানের ধ্বনি শোনার সাথে সাথে তিনি আবু উমামার জন্য দু’আর করতে শুরু করেন। আমি বললামঃ আব্বা, জুম’আর আজান শুললেই আপনি এভাবে আবু উমামার জন্য দু’আ করেন কেন? বললেনঃ বাবা, রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার আগে সেই আমাদেরকে সমবেত করে সর্বপ্রথম জুরম’আর জামায়াত কায়েম করেন। সেটি অনুষ্ঠিত হতো হাররার বনু বায়দার হাযমুন নাবীত পাহাড়ের নাকী আলÑখাদিমাত’ নামক স্থানে। আমি প্রশ্ন করলাম: তখন আপনারা কতজন ছিলেন? বললেন: চল্লিশজন।৩৩

হাদীসের গ্রন্থসমূহে কা’বের বর্ণিত মোট আশিটি (৮০) হাদীস পাওয়া যায়।৩৪ তবে ইমাম জাহবী বলেন: ত৭ার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ত্রিশে পৌঁছবে। তারমধ্যে  তিনটি মত্তাফাক আলাইহি। একটি বুখারী ও দুইি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।৩৫ তিনি খোদ রাসূল (সা) ও উসাইদ ইবন হুদাইর (রা) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।৩৬

কা’ব (রা) থেকে যে সকল মনীষী হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কতিপয় ব্যক্তি হলেন: আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, জাবির ইবন আবদল্লিাহ ও আবু ইমামা আল-বাহিলী। উল্লেখিত তিনজইন হলেন সাহাবী। আর তাবেঈদের মধ্যে ইমাম বাকের, ‘আমর ইবন হাকাম ইবন সাওবান, আলী ইবন আবী তালহা উমার ইবন কাসীর ইবন আফলাহ, উমার ইবন আল-হাকাম ইবন রাফে, কা’বের  পাঁচ পুত্র ও পৌত্র আবদুর রহমান ইবন আবদিল্লাহ প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।৩৭

বালাজুরীর বর্ণনায় জানা যায়, রাসূল কারীম (সা) আসলাম, গিফারী ও জুহাইনা গোত্রের যাকাত-সাদাকা রহমান ইবন আবদিল্লাহ প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।৩৮

উসমানের (রা) শাহাদাতের দুঃখজনক ঘটনায় কা’ব (রা) একটি মারসিয়া (শোকগাথা) রচনা করেন এবং আলীকে (রা) আবৃত্তি করে শোনান। তার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ নিম্নরূপ:৩৯

১.উসমান তাঁর হাত দুটি গুটিয়ে নিলেন তারপর দ্বার রুদ্ধ করে দিলেন। তিনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করলেন, আল্লাহ উদাসীন নন।

২.গৃহে যারা ছিল তাদের বললেন, তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না। াযারা যুদ্ধ করেনি আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করুন।

৩.বন্ধুত্ব সৃষ্টির পর আল্লাহ কেমন করে তাঁদের  অন্তরে শত্র“তা, হিংসা ও বিধ্বেষ ঢেলে দিলেন?

৪.আর কল্যাণ কিভাবে তাঁদের দিকে পশ্চাদ্দেশ ফিরিয়ে উট পাখীর মত দৌড় দিল? আলী (রা) কবিতাটি শোনার পর মন্তব্য করলেনঃ উসমান আত্মাত্যাগ করেছেন। আর এ ত্যাগ ছিল অতীব দুঃখজনক। আর তোমরা তখণ ভীত হয়ে পড়েছিলে। সে ভীতি ছির অতি নিকৃষ্ট ধরনের।

আলী ও মুয়াবিয়ার (রা) মধ্যে যেদ্বন্দ্ব-ষংঘাত ঘটেছির তাতে কা’ব (রা) কোন পক্ষে যোগ না দিয়ে উভয়ের থেকে দূরে থাকেন।

সততা ও সত্য বলা ছিল কা’বের (রা) চরিত্রের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যকে যেভাবে তিনি ধারণ করেন সেভাবে অনেকেই ধারণ করতে পারেননি। দু’আ কবুল হওয়ার পর জীবনে কোন দিন বিন্দুমাত্র মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তিনি নিজেই বলেছেনঃ আল্লাহর কসম! যে দিন আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) সেই খথাগুলি বলেছিলাম সেদিন থেকে আজকের দিনটি পর্যন্ত আর কোন প্রকার মিথ্যা বলিনি।৪০ তাবুক যুদ্ধের পূর্বের জীবনটি ছিল তাঁর অতি পরিচ্ছন্ন। এ কারণে তার জীবনে যখন তাবুকের বিপর্যয় নেমে এলো তখণ তাঁর নিজ গোত্র বনু সালেমা তাঁকে বলতে পেরেছিল আল্লাহর কসম! তোমাকে তো আমরা এর পূর্বে আর কোন অপরাধ করতে দেখিনি।৪১

কা’ব (রা) ছিলেন তাঁর সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তৎকালীন আরব কবিদের মধ্যে যাঁরা বেশী বেশী কবিতা রচনা করেছেন তিনি তাঁদেরই একজন। জাহিলী আমলেও কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সাহিত্য সমালোচকদের মতে, তাঁর কবিতা খুবই উন্নতমানের।৪২ মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে যে তিনজন কবি কুরাইশ ও তাদের স্বগোত্রীয় কবিদের মুকাবিলায় দুর্ভেদ্য ব্যুহ রচনা করেন, কা’ব (রা) সেই ত্রয়ীর অন্যতম। তাঁরা ইসলামবিদ্বেষী কবিদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন।৪৩ ইবন সীরীন বলেন: এ তিন কবি হলেন, হাসসান ইবন সাবিত, ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও কা’ব ইবন মালিক। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের ম্েযধ শ্রেষ্ঠ কবি।৪৪

কা’ব ইসলাম গ্রহনের পর কুরাইশদের দেব-দেবীর সমালোচনা করে প্রচুর কবিতা রচনা করেছেন। তিনি একটি শ্লোকে বলেছেন:৪৫

আমরা আল-লাত, আল ‘উয্যা ও উদ্দাকে ভুলে যাব। তাদের গলার হার ও কানের দুল ছিনিয়ে নেব।’

রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারের প্রধান তিন কবির কবিতার বিষয় ছিল ভিন্ন। কা’বের কবিতার মূল বিষয় ছিল যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে কাফিরদের ান্তরে ভীতির সৃষিট করা এবং মুলসামানদের অন্তর থেকে ভীতি দূর করে তাদেরকে অটল ও দৃঢ় করা। ইবন সীরীন বলেনঃ৪৬ কা’ব তো কবিতায় যুদ্ধের কথা বলে কাফিরদের ভূয় দেখাতেন। বলতেন: আমরা এমন করেছি, এমন করছি বা করবো। হাসসান তাঁর কবিতায় কাফিরদের দোষ ক্রুটি এবং তাদের যুদধ বিগ্রহের কথা বর্ণনা করতেন। আর ইবন রাওয়াহী কুফরী এবং আল্লাহ ও রাসূলের অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতার উল্লেখ করে তাদেরকে ধিক্কার ও নিন্দা জানাতেন।

কা’বের (রা) ছেলে আবদুর রহমান বলেণ, আমার পিতা একদিন বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ, কবিদের সম্পর্কে আল্লাহ তো যা নাযিল করার তা করেছেন। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন: একজন প্রকৃত মুজাহিদ তার তরবারি ও জিহবা উভয়টি দিয়ে জিহাদ করে। আমার প্রাণযে সত্তার হাতে তার নামের শপথ! তোমরা তো শক্রুদের দিকে (জিহবা দিয়ে) তীরের ফলাই ছুড়ে মারছো।

ইবন ইসাহক বর্ণনা করেছেন। যখন সূরা আশ-শূ’য়ারার ২২৪ থেকে ২২৬ নং আয়াত- বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখনা যে, তারা প্রতি ময়দানেই কবি-হাসসান, আবদুল্লাহ ও কা’ব কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হলেন। তাঁরা বললেনঃ হে আল্লাহ নবী! আল্লাহ যখন এ আয়াত নাযিল করেছেন তখন তো অবশ্যই জেনেছেন, আমরা কবি। রাসূল (সা) তখন তাঁদেরকে আয়াতের ব্যতিক্রমী অংশ তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে খুব স্বরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে পাঠ করে শোনালেন। তারপর বললেন: এ হচ্ছো তোমরা।৪৮

কা’ব (রা) ইসলামের প্রতিপক্ষ কুরাইশদের নিন্দায় বহু শ্লোক রচনা করেছেন। আল্লাহ দরবারে অন্তরঃ তার একটি শ্লোক যে গৃহীত হয়েছে, সে কথা খোদ রাসূল (সা) বলেছেন। জাবির (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একদিন রাসূল (সা) কা’বকে বললেনঃ তুমি যে শ্লোকটি বলেছো, তাতে তোমার রব তোমাকে ভোলেননি। কা’ব জানতে চাইলেনঃ কোন শ্লোকটি? রাসূল (সা) তখন আবু বকরকে বললেন: আপনি শ্লোকটি একটু আবৃত্তি করুন তো। আবু বকর তখন শ্লোকটি আবৃত্তি করে শোনান।৪৯ প্রাচীন আরবী সূত্রসমূহে শ্লোকটি সংকলিত হয়েছে।৫০ শ্লোকটির অনুবাদ এখানে ওদয়া হলোঃ ‘সাখীনা ধারণা করেছে, সে তার রবকে (প্রভু) পরাভূত করবে। সকল বিজয়ীদের ওপর বিজয়ী (আল্লাহ) অবম্যই জয়ী হবেন।’

এখানে ‘সাখীন’ অর্থ আটা ও ঘি অথবা আটা ও খোরমা দিয়ে তৈরি এক প্রকার খাবার। এটি ছিল কুরাইশদের খুবই প্রিয় খাদ্য। তারা খেতও খুব বেশী বেশী। এ কারণে কবি কুরাইশদেরকে ‘সাখীনা’ বলেছেন। এ দ্বারা মূলতঃ তাদেরকে হেয় ও অপমান করা হয়েছে।৫১

কা’ব (রা) কবিতা রচনা করে রাসূলকে (সা) শোনাতেন। মাঝে মাঝে রাসূল (সা) তাতে কিছু শব্দ রদ-বদল করে সংশোধন করে দিতেন। কা’ব তা সবিনয়ে গ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে করতেন।৫২

সমকালীন আরব সমাজে কা’বের (রা) কবিতা এক অসাধারণ প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। রাসূলে কারীম (সা) হুনাইন যুদ্ধ শেষ করে যখন তায়েফের দিকে যাত্রা করেন প্রভাব ফেলে যে,  তারা তা শুনেই ইসলাম গ্রহণ করে। শ্লোক দু’টির অর্থ নিম্নরূপ:

‘তহিামা ও খায়বার থেকে আমরা সকল প্রকার হিংসা-বিদ্ভেষ বিদূরিত করে তরবারি কোষে আবদ্ধ করে ফেলেছি।

এখন আবার আমরা তাকে যে কোন দু’টির মধ্যে একটি স্বাধীনতা দিচ্ছি। যদি তরবারি কথা বলতে পারতো তাহলে বলতো এবার দাউস অথবা সাকীফের পালা।’

ইবনে সীরীন বলেনঃ দাউস গোত্র যখন উক্ত পংক্তি দুটি শুনলো তখন তারা ভীত হয়ে পড়লো। তারা বললো, এখন মুসলমান হয়ে যাওয়াই উচিত। তা না হলে আমাদের দশাও হবে অন্যদের মত। এরপর তারা একযোগে ইসলাম গ্রহণ করে।৫৩

কা’ব (রা) ইসলাম গ্রহণের পর থেকে জীবনের শেস দিন পর্যন্ত স্বীয় কাব্য প্রতিভাকে ইসলাম ও মুসলমানদের সেবায় নিয়োগ করেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি যেমন তরবারি হাতে তুলে নিয়েছেন তেমনিভাবে ভাষার যুদ্ধও চালিয়েছেন। তাঁর জীবনকালের ইসলামের ইতহিাসের সকল ঘটনা তিনি তাঁর কবিতায় ধরে রেখেছেন। বদর যুদ্ধের উবনুল হারেস মহীন হন। তাঁর স্বরণে রচনা করেন এক শোকগাথা।৫৪ উহুদ যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধের শহীদের সম্পর্কে বহু কবিতা তিনি রচনা করেছেন। এ যুদ্ধের অন্যতম শহীদ রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা সায়্যিদুশ শুহাদা হামযার (রা) স্মরণে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। এ সময় মক্কার পৌত্তলিক কবিদের সাথে ত৭ার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সীরাতে ইবন হিশামে তার একটি চিত্র পাওয়া যায়।৫৫

হামযার (রা) শানে রচিত একটি মরসিয়াতে তিনি হামযার বোন সাফিয়্যা বিনতু আবদিল মুত্তালিবকে লক্ষ্য করে বলছেন:৫৬

১.ওঠো সাফিয়্যা, ভেঙ্গে পড়োনা। হামযার স্মরণে বিলাপের জন্য নারীদের প্রতি আহবান জানাও।

২.মানুসের অন্তর কাঁপানো যে বিপদ আল্লাহর সিংহের ওপর আপতিত হয়েছে, সেজন্য দীর্ঘ ক্রন্দনে ক্লান্ত হয়ো না।

৩.তিনি ছিলেন পিতৃ-মাতৃহীনদের জন্য মর্যদার প্রতীক। অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় ছিলেন সিংহের মত।

৪.তাঁর সকল কর্ম দ্বারা তিনি শুধু আহমাদের সন্তুষ্টি এবং আরশ ও ইজ্জতের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহর খুশীই কামনা করতেন।

বীরে মা’উনায় রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিনিধিদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কবি কা’বের যবান  সোচ্চার হয়ে ওঠে তিনি হত্যাকারীদের নিন্দায় অনেক কবিতা রচনা করেন।৫৭ মদীনার ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের নির্বাসন ও ইহুদী নেতা কা’ব আশরাফের হত্যার চিত্র তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতায় ধরা পড়েছে। এ ঘটনা লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষ কবিদের নিন্দাবাদের জবাবও তিনি দিয়েছেন।৫৮

খন্দক যুদ্ধের চিত্রও তাঁর  কবিতায় ধরা পড়েছে। প্রতিপক্ষের বাহিনী ও কবিদের নিন্দায় তিনি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছেন।৫৯ বনু লিহইয়ানের যুদ্ধও তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে।৬০ জ্বি-কারাদের ঘটনায়ও তাঁকে সোচ্চার দেখা যায়।৬১ খায়বার বিজয়ের চিত্রও তাঁর কবিতায় বিধৃত হয়েছে।৬২ মূতার যুদ্ধের শহীদরা তাঁর হৃদয়ে দারুণ ছাপ ফেলেছে। তাঁদের স্বরণে তিনি রচনা করেছেন আবেগ-ভরা এক কাসীদা।৬৩ এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) এ মহান কবির জিহ্বা ইসলামের প্রথম পর্বের সকল ঘটনা ও যুদ্ধে সোচ্চার থেকে আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাব যথাযথ ব্যবহার করে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। তাঁর কিছু কিছু পংক্তি আরবী ভাষা সাহিত্যে প্রবাবদ-প্রবচনে পরিণত হয়েছে। রাওহ ইবন যানবা বলেন, কা’বের নিজ গোত্রের এক ব্যক্তির প্রশংসায় রচিত তাঁর একটি শ্লোক আরবী কাব্য গজতে সর্বাধিক বীরত্বব্যঞ্জক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।৬৪

তথ্যসূত্র:

হাস্সান ইবন সাবিত (রা)

সীরাতের গ্রন্থসমূহ হাস্সানের (রা) অনেকগুলি ডাকনাম বা কুনিয়াত পাওয়া যায়। আবুল ওয়ালীদ, আবুল মাদরাব, আবুল হুসাম ও আবূ আবদির রহমান। তবে আবুল ওয়ারীদ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।১ তাঁর লকব বা উপাধি ‘শায়িরু রাসূলিল্লাহ’ বা রাসূলুল্লাহর (সা) কবি। তাঁর পিতার নাম সাবিত ইবন আল-মুনজির এবং মাতার নাম আল-ফুরাই’য়া বিনতু খালিদা।২ ইবন সা‘দ আল-ওয়াকিদীর সূত্রে তাঁর মায়ের ানম আল-ফুরাইয়া বিনত হুরাইস বলে উল্লেখ করেছেন।৩ তাঁরা উভয়ে মদীনার বিখ্যাত নাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর (সা) মাতুল গোত্র বনু নাজ্জারে সন্তান হওয়ার কারণে রাসূলে পাকের (সা) সাথে আত্মীয়তা ও রক্তের সম্পর্ক ছিল।৪ মা আল-ফুরাইয়া ইসলামের আবির্ভাব কাল পেয়েছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবিয়্রাতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।৫ তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের বিখ্যাত নেতা সা‘দ ইবন উবাদার (রা) চাচাতো বোন।৬ হযরত হাসসান (রা) তাঁর কবিতার একটি চরণে মা আল-ফুরাইয়া’র নামটি ধরে রেখেছেন।৭ প্রখ্যাত সাহাবী শাদ্দাদ ইবন আউস (রা) হাস্সানের (রা) ভাতিজা।৮ হাস্সান (রা) একজন সাহাবী, রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারী কবি, দুনিয়ার সকল ঈমানদার কবিদের ইমাম এবং তাঁর কাব্য প্রতিভা রুহুল কুদুস জিবরীল দ্বারা সমর্থিত।৯

ইবন সাল্লাম আল-জামহী বলেনঃ হাস্সানের পিতা সাবিত ইবন আল-মুনজির ছিলেন তাঁর সম্প্রদায়ের একজন নেতা ও সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁর দাদা আল-মুনজির প্রাক-ইসলামী আমলে ‘সুমাইয়া’ যুদ্ধের সময় মীদনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের বিচারক হয়ে তাদের মধ্যে ফায়সালা করেছিলেন। কবি হাস্সানের কবিতায় তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। একবার মুযানিয়্যা গ্রো কবির পিতাকে বন্দী করেছিল। কবির গোত্র তাঁকে ছাড়িয়ে আনার জন্য ফিদিয়ার প্রস্তাব দিলে তারা প্রত্যাখ্যান করে। দীর্ঘদিন বন্দী থাকার পর তাঁর পিতার  প্রস্তাবেই বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে তিনি মুক্ত হন।১০ হাস্সানের দাদা আল-মুনজির ছিলেন খুবই উদার ও শান্তিপ্রিয় মানুষ।

হাস্সান হিজরাতের প্রায় ষাট বচর পূর্বে ৫৬৩ খ্রীষ্টাব্দে ইয়াসরিবে (মদীনা) জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে নির্মিত মসজিদে নব্বীর পশ্চিম প্রান্তে বাবে রহমতের বিপরীত দিকে অবস্থিত ‘ফারে’ কিল্লাটি ছির তাঁদের পৈত্রিক আবাসস্থল। হাস্সানের কবিতায় এর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।১১ কবি হিসেবে বেড়ে ওঠেন এবং কবিতাকে জীবকিার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রাচীন আরবের জিল্লাক ও হীরার রাজপ্রাসাদে যাতায়াত ছিল। তবে গাস্সানীয় সম্রাটদের প্রতি একটু বেশী দুর্বল ছিরেন। হাস্সানের সাথে ত৭াদের একটা গভীর হৃদ্যতার সম্পর্কে গড়ে ওঠে। তিনি তাঁদের প্রশংসায় বহু সুন্দর সুন্দর কবিতা রচনা করেছেন। তার কিছু অংশ সাহিত্য সমালোচকগণ হাস্সানের শ্রেষ্ঠ কবিতার মধ্যে গণ্য করেছেন।১২ সম্রাটগণও প্রতিদানে তাঁর প্রতি যথেষ্ট বদান্যতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁদের এ সম্পর্ক ইসলামের  পরেও বিদ্যমান ছিল।১৩

গাস্সানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট জাবালা ইবন আল-আয়হাম। তাঁর প্রশংসাংয় কবি হাস্সান অনেক কবিতা রচনা করেছেন। খলীফা উমারের (রা) খিলাফতকালে গোটা শামে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হলে এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পরাজয়ের পর জাবালা ইবন আল-আয়হাম ইসলাম গ্রহণ করে কিচুকাল হিজাযে বসবাস করেন। এ সময় একবার হজ্জ করতে যান। কা’বা তাওয়াফের সময় ঘটনাক্রমে ত৭ার কাপড়ের আঁচল এক আরব বেদুঈনকে একইভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার নির্দেশ দিরে। জাবালা আত্মাপক্ষ সমর্থন করে বলরেন: আমি একজন রাজা। একজন বেদুঈন কিভাবে আমাকে থাপ্পড় মাতে পারে? উমার (রা) বললেন: ইসলাম আপনাকে ও তাকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। জাবালা বিষয়টি একটু ভেবে দেখার কথা বলে সময় চেয়ে নিলেন। এরপর রাতের আঁধারে রোমান সাম্রাজ্যে পালিয়ে যান। পরবর্তীকালে ইসলাম ত্যাগ করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।১৪

এই রোমান সাম্রাজ্যে অবস্থানকালে পরবর্তীকালে একবার মু’য়াবিয়া (রা) প্রেরিত এক দূতের সাথে জাবারার সেখানে সাক্ষাৎ হয়। জাবালা তাঁর নিকট হাস্সানের কুশল জিজ্ঞেস করেন। দূত বলেন: তিনি এখন বার্দ্ধক্যে জর্জরিত। অন্ধ হয়ে গেছেন। হাস্সানকে দেওয়ার জন্য জাবালা তাঁর হাতে এক হাজার দীনার দানকরেন। দূত মদীনায় ফিরে আসলেন এবং কবিকে মসজিদে নববীতে পেরেন। তিনি কবিকে বলরেন: আপনার বন্ধু জাবালা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। কবি বললেন: তহালে তুমি যা নিয়ে এসেছো তা দাও। দূত বরলেন: আবুল ওয়ালীদ, আমি কিচু নিয়ে এসেছি তা আপনি কি করে জানলেন? বললেন: তাঁর কাছ থেকে যখনই কোন চিঠি আসে, সাথে কিছুনা কিছু থাকেই।১৫

আল-আসমা’ঈ বণৃনা করেছেন। একবার এক গাস্সানীয় সম্রাট দূত মারফত কবি হাস্সানের নিকট পাঁচ শো দীনার ও কিচু কাগড় পাঠিয়েছিরেন। দূতকে বলে দিয়েছিলেন, তিনি যদি জীবিত না থাকেন তাহলে কাপড়গুলো কবরের ওপর বিছিয়ে দেবে এবং দীনারগুলি দ্বারা একটি উট খরীদ করে তার কবরে পাশে জবেহ করবে। দূত মদীনায় এসে কবির সাক্ষাৎ পেলেন এবং কথাগুলি বললেন। কবি বললেন: তুমি আমাকে মৃতই পেয়েছো।১৬

গাস্সানীয় রাজ দরবারের মত হীরার রাজ দরবারেও কবি হাস্সানের প্রঅভাব প্রতিপত্তি ছিল। জুরজী যায়দান বলেন: প্রাক-ইসলামী আমলে যে সকল খ্যাতিমান আরব কবির হীরার রাজ দরবারের আসা-যাওয়া ছিল এবং আপনা কাব্য-প্রতিভা বলে সেখানে মর্যাদার আসনটি লাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হাস্সান অন্যতম।১৭

ইসলাম-পূর্বকারে কবি হাস্সান ইয়াসরিবের চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র আউস ও খাযরাজের মধ্যে যে সকল যুদ্ধ হতো তাতে নিজ গোত্রের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতেন। আর এখান থেকেই প্রতিপক্ষ আউস গোত্রের দুই শ্রেষ্ঠ কবি কায়স ইবন খুতাইম ও আবী কায়স ইবন আল-আসলাত-এর সাথে কাব্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।১৮

হাস্সানের চার পুরুষ অতি দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। প্রত্যেকে একশো বিশ বছর করে বেঁচে ছিলেন। আরবের আর কোন খান্দানের পরপর চার পুরুষ এত দীর্ঘ জীবন লাভ করেনি হাস্সানের প্রপিতামহ হারাম, পিতামহ আল-মুনজির, পিতা সাবিত এবং তিনি নিজে-পেেত্যকে ১২০ বছর বেঁচে ছিলেন।১৯

হাস্সান যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর জীবনে বার্দ্ধক্য এসে গেছে। মদীনায় ইসলাম প্রচারের সূচনা পর্বে তিনি মুসলমান হন। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের সময় হাস্সানের বয়স হয়েছিল ষাট বছর।২০ ইবন ইসহাক হাস্সানের পৌত্র আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হিজরাতের সময় তাঁর বয়স ষাট, এবং রাসূলুল্লাহর (সা) বয়স তিপ্পান্ন বছর ছিল। ইবন সা’দ আরো বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ষাট বছর জাহিলিয়্যাতের এবং ষাট বছর ইসলামের  জীবন লাভ করেন।২১

রাসূলুল্লাহর (সা) আবির্ভাব বিষয়ে ইবন ইসহাক হাস্সানের একটি বর্ণনা নকল করেছেন। হাস্সান বলেন: আমি তখন সাত/আট বছরের এক চালাক=-চতুর বালক। যা কিচু শুনতাম, বুঝতাম। একদিন এক ইহুদীকে ইয়াসরিবের একটি কল্লিার ওপর উঠে চিৎকার করে মানুষকে কাডতে শুনলাম। মানুষ জড় হলে সে বলতে লাগলো: আজ রাতে আহমাদের লক্ষত্র উদিত হয়েছে। আহমাদকে আজ নবী করে দুনিয়ায় পাঠানো হবে।২২

ইবনুল কালবী বলেন: হাস্সান ছিরেন একজন বাগ্মী ও বীর। কোন এক রোগে তাঁর মধ্যে ভীরুতা এসে যায়। এরপর থেকে তিনি আর যুদ্ধের দিকে তাকাতে পারতেন না এবং কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণও করেননি।২৩ তবে ইবন ‘আব্বাসের (রা) একটি বর্ণনায় জানা যায়, তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আল্লামাহ ইবন হাজার ‘আসকালানী লিখেছেন: একবার ইবন আববাসকে বলা হলো হাস্সান-আল-লা’ঈন’ (অভিশপ্ত হাস্সান) এসেছে। তিনি বললেন: হাস্সান অভিশপ্ত নন। তিনি জীবন ও জিহবা দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে জিহাদ করেছেন।২৪ আল্লামাহ্ জাহাবী বলেন, এ বণৃনা দ্বারা প্রমাণিত হয় তিনি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন।২৫

হাস্সানের (রা) যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সম্পর্কে যে সবকথা প্রচলিত আছে তা এই বর্ণনায় বিপরীত। খন্দক মতান্তরে উহুদ যুদ্ধের সময় রাসূল (সা) মুসলিম মহিলাদেরকে হাস্সানের ফারে দূর্গে নিরাপত্তার জন্য রেখে যান। তাদের সাথে হাস্সানও ছিলেন। এই মহিলাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু সাফিয়্যা বিনত ‘আবদিল মুত্তলিবও ছিলেন। একদিন এক উহুদীকে তিনি কিল্লার চতুর্দিকে গুর ঘুর করতে দেখলেন। তিনি প্রমাদ গুণলেন যদি সে মহিলাদের অবস্থান জেনে যায় তাহলে ভীষণ বিপদ আসতে পারে। কারণ রাসূল (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে তখন প্রত্যক্ষ জিহাদে লিপ্ত। তিনি হাস্সানকে বললেন, এই ইহুদীকে হত্যা কর। তা না হলে সে আমাদের অবস্থানের কথা ইহুদীদেরকে জানিয়ে দেবে। হাস্সান বললেন, আপনার জানা আছে আমার নিকট এর কোন প্রতিকার নেই। আমার মধ্যে যদি সেই সাহসই থাকতো তাহলে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথেই থাকতাম। সাফিয়্যা তখন জিনেই তাঁবুর একটি খুঁটি হাতে নিয়ে ইহুদীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন। তারপর হাস্সানকে বলেন, যাও, এবার তার সঙ্গের জিনিসগুলি নিয়ে এসো। যেহেতু আমি নারী, আর সে পুরুষ, তাই একাজটি আমার দ্বারা হবে না। এ কাজটি তোমাকে করতে হবে। হাস্সান বললেন, ঐ জিনিসের প্রয়োজন নেই।২৬

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। সাফিয়্যা লোকটিকে সহ্যার পর মাথাটি কেটে এসে হাস্সাকে বলেন, ধর, এটা দূর্গের নীচে ইহুদীদের মধ্যে ফেলে এসো। তিনি বললেন: এ আমার কাজ নয়। অতঃপর সাফিয়্যা নিজেই মাথাটি ইহুদীদের মধ্যে ছুড়ে মারেন। ভয়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।২৭

হাস্সান (রা) সশরীরে না হরেও জিহবা দিয়ে রাসূলে কারীমের সাথে জিহাদ করেছেন। বনু নাদীরের যুদ্ধে রাসূল (সা) যখন তাদেরকে অবরুদ্ধ করেন এবং তাদের গাছপালা জ্বালিয়ে দেন তখন তার সমর্থনে হাস্সান কবিতা রচনা করেন। বনু নদীর ও মক্কার কুরাইশদের মধ্রে দ্বিপাক্ষিক সাহায্য ও সহযোগিতা চুক্তি ছিল। তাই তিনি কবিতায় কুরাইশদের নিন্দা করে বলেন, মুসলমানরা বুন নাদীরের াবগ-বাগিচা জ্বালিয়ে ছিল, তোমরা তাদের  কোন উপকারে আসনি। এ কবিতা মক্কায় পৌঁছালে কুরাইশ কবি আবু সুফইয়ান ইবনুল হারিস বলেন: আল্লাহ সর্বদা তোমাদের এমন কর্মশক্তি দান করুন, যাতে আশে-পাশের আগুনে খোদ মদীনা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আর আমরা দূরে বসে তামাশা দেখবো।২৮

হিজরী পঞ্চম সনে ‘আল-মুরাইসী’ যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফেরার সময় একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। সুযোগ সন্ধ্যানী মুনাফিকরা তিলকে তাল করে ফেলে। তারা আয়িশার (রা) পূতঃপবিত্র চরিত্রের ওপর অপবাদ দেয়। মুনফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ছিল এ ব্যাপারে সকলের অগ্রগামী। কতিপয় প্রকৃত মুসলমানও তাদের এ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকে পড়েন। যেমন হাস্সান, মিসতাহ ইবন উসাসা, হামনা বিন্ত জাহাশ প্রমুখ। যখন আয়িশার (রা) পবিত্রতা ঘোষণা করে আল কুরআনের আয়াত নাযিল হয় তখন রাসূল (সা) অপবাদ দানকারীদের ওপর কুরআনের নির্ধারিত ‘হদ’ (শাস্তি) আশি দুররা জারি করেন। ইমাম যুহরী থেকে সাহীহাইনে একথা বর্ণিত হয়েছে।২৯ অবশ্য ানেকে ‘হদ’ জারি বিষযটি অস্বীকার করেছেন।৩০

অনেকে অবশ্য হাস্সানের জীবন, কর্মকাণ্ড এবং তাঁর কবিতা বিশ্লেষণ করে এ মত পোষণ করেছেন যে, কোনভাবেই তিনি ইফ্ক’ বা অপবাদের ঘটনায় জড়িত ছিলেন না। যেহেতু তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে দাঁড়িয়ে মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশদের আভিজাত্যের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছিলেন এবং আরববাসীর নিকট তাদের হঠকারিতার স্বরূপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিরেন, একারণে পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণকারী কুরাইশরা নানাভাবে তাঁকে নাজেহাল করেছেন। তাঁরা মনে করেন, ইফ্ক’-এর ঘটনায় হাস্সানের নামটি জড়ানোর ব্যাপারে যারা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, তাদের পুরোধা সাফওয়ান ইবন মু’য়াত্তাল। হাস্সান আয়িশার (রা) শানে অনেক অনুপম কবিতা রচনা করেছেন। একটি চরণে তিনি ইফক’-এর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ান্য একডিট চরণে যারা তাঁর নামটি জড়ানোর ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেছেন, সেই সব কুরাইশ মুহাজিরদের কঠোর সমালোচনা করেছেন।৩১

‘ইফ্ক’-এর ঘটনায় তাঁর জড়িয়ে পড়ার যত বর্ণনা পাওয়া যায়, সীরাত বিশেষজ্ঞরা সেগুলিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। একারণে পরবর্তীকালে বহু সাহাবী ও তাবে’ঊ তাঁকে ভালো চোখে দেখেননি। অনেকে ত৭াকে নিন্দা-মন্দ করেছেন। তবে খোদ আয়িশা (রা) ও রাসূল (সা) ত৭াকে ক্ষমা করেছিলেন। একথা বহু বর্ণনায় জানা যায়। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। হাস্সানকে মুমিনরাই ভালোবাসে এবং মুনফিকরাই ঘৃণা করে। তিনি আরো বলেছেন: হাস্সান হচ্ছে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রতিবন্ধক।৩২ কেউ আয়িশার (রা) সামনে হাস্সানকে (রা) খারাপ কিছু বললে তিনি নিষেধ করতেন।

হাস্সান (রা) শেষ জীবনে অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একবার আয়িশার (রা) গৃহে আসেন। তিনি যদি বিছিয়ে হাস্সানকে (রা) বসতে দেন। এমন সময় আয়িশার (রা) ভাই আবদুর রহমান (রা) উপস্থিত হন। তিনি বোনকে লক্ষ্য করে বলেনঃ আপনি তাঁকে পদির ওপর বিসয়েছেন? তিনি কি আপনার চরিত্র নিয়ে এসব কথা বলেননি? আয়িশা (রা) বললেনঃ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে কাফিরদের জবাব দিতেন শক্রুদের জবাব দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) অন্তরে শান্তি দিতেন। এখন তিনি ান্ধ হয়েছেন। আমি আশা করি, আল্লা আখিরাতে তাঁকে শাস্তি দেবেন না।৩৩

প্রখ্যাত তাবে’ঈ মাসরূক বলেন: একবার আমরা আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে দেখলাম হাস্সান সেখানে বসে বসে আয়িশার (রা) প্রশংসায় রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। তার মধ্যে এই পংক্তিটিও ছিল:

‘সাহ্সানুল রাযাবুন মা তুযান্ন বিরীবাতিন’-অর্থাৎ তিনি পূতঃপবিত্র, শক্ত আত্মাসম্মানবোধ সম্পন্ন ভদ্রমহিলা, তাঁর আচরণে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। পরনিন্দা থেকে মুক্ত অবস্থায় তাঁর দিনের সূচনা হয়।

পংক্তিটি শোনার পর আয়িশা (রা) মন্তব্য করলেন: কিন্তু আপনি তেমন নন।’ আশিয়াকে (রা) বললাম: আপনি তাকে এখানে আসার অনুমতি দেন কেন? আল্লরাহ তা’য়ালা তো ঘোষণা করেছেন, ইফ্ক-এ যে অগ্রহণী ভুমিকা রেখেছে, তার জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি। (সূরা: আন-নূর-১১) ‘আয়িশা (রা) বললেন: তিনি ান্ধ হয়ে গেছেন। তাঁর কাজের শাস্তি তো তিনি লাভ করেছেন। অন্ধত্বের চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে কুরাইশদের প্রতিরোধ করেছেন এবং তাদের কঠোর নিন্দা করেছেন।৩৪

‘উরওয়া বলেন: একবার আমি ফুরাই’য়ার ছেলে হাস্সানকে আয়িশার (রা) সামনে গালি দিই। আয়িশা (রা) বললেনঃ ভাতিজা, তুমি কি এমন কাজ থেকে বিরত হবে না? তাঁকে গ্যালি দিওনা। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে কুরাইশদের জবাব দিতেন।৩৫

একবার কতিপয় মহিলা আয়িশার (রা) উপসিথতিতে হাস্সানকে নিন্দমন্দ করে। আয়িশা (রা) তাদেরকে বললেন: তোমরা তাঁকে নিন্দামন্দ করোনা। আল্লাহ তা’য়ালা যে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দানের অঙ্গিকার করেছেন, তিনি তা পেয়ে গেছেন। তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন। আমি আশা করি তিনি কুরাইশ কবি আবু সুফইয়ান ইবনুল হারিসের কবিতার জবাবে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসায় যে কবিতা রচনা করেছেন তার বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন। একথা বলে তিনি হাস্সানের হাজাওতা মুহাম্মাদান ফা আজাবতু আনহু’ কবিতাটির কয়েকটি লাইন পাঠ করেন।৩৬

উল্লেখখিত বর্ণনাসমূহ দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) কবি হাস্সানকে ক্ষমা করেছিলেন। এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আয়িশার (রা) সাথে তাঁর সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর হাস্সান (রা) দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। ত৭ার মৃত্যু সময় নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য আছে। আবন ইসহাকের মতে িিতনি হিজরী ৫৪ সনে মারা যান। আল হায়সাম ইবন আদী বলেন: হিজরী ৪০ সনে মারা যান। ইমাম জাহাবী বলেন: তিনি জাবালা ইবন আল-আয়হাম ও আমীর মু’য়াবিয়ার দরবারে গিয়েছেন। তাই কইবন সা’দ বলেছেন: মু’য়াবিয়ার খিলাফতকালে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে, তিনি হিজরী ৫৪/খ্রীঃ ৬৭৪ সনে ১২০ বছর বয়সে মারা যান।৩৭

আবু’ উবায়েদ আল-কাসেম ইবন সাল্লাম বলেন: হিজরী ৫৪ সনে হাকীম ইবন হিযাম’ আবু ইয়াযীদ হুয়াইতিব ইবন আবদিল উয্যা, সা’ঈদ ইবন ইয়ারবু আল মাখযুমী ও হাস্সান ইবন সাবিত আল-আনসারী মৃত্যুবরণ করেন। এঁদের প্রত্যেকে ১২০ বছর জীবন লাভ করেছিলেন।৩৮

হাস্সানের (রা) স্ত্রীর নাম ছিল সীরীন। তিনি একজন মিসরীয় কিবতী মহিলা। আল-বায়হাকী বর্ণনা করেছেন। রাসূলে কারীম (সা) সাহাবী হযরত হাতিব ইবন বালতা’য়াকে (রা) ইস্কান্দারিয়ার শাসক ‘মাকুকাস’-এর নিকট দূত হিসেবে পাঠান। মাকুকাস রাসূলুল্লাহর (সা) দূতকে যথেষ্ট সমাদর করেন। ফেরার সময় তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য কিছু উপহার পাঠান। এই উপহার সামগ্রীর মধ্যে তিনটি কিবতী দাসীও ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা) ছেলে ইবরাহীমের মা মারিয়্যা আল কিবতিয়্যা (রা) এই দাসী ক্রয়ের একজন। অন্য দুইজন দাসীর মধ্যে রাসূল (সা) হাস্সান ইবন সাবিত ও মুহাম্মদ ইবন কায়স আল-আবদীকে একটি করে দান করেন। হাস্সানকে প্রদত্ত দাসীটি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন মারিয়্যা আল-কিবতিয়্যার বোন। নাম ছিল সীরীন। তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হাস্সানের (রা) ছেলে আবদুর রহমান। এই আবদুর রহমান এবং রাসূলুল্লাহর (সা) ছেলে ইবরাহীম ছিলেন পরস্পর খালাতো ভাই।৩৯

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ফারে’ পর্বতের দূর্গ ছিল হাস্সানের (রা) পৈতৃক বাসস্থান। আবু তালহা (রা) যখন বীরহা’ উদ্যান ত৭ার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সাদাকা হিসেবে বণ্টন করে দেন তখন সেখান থেকে একটি অংশ লাভ করেন। এরপর তিনি এখানে বাসস্থান নির্মাণ করেন। স্থানটি আল-বাকী’র নিকটবর্তী। পরে আমীর মু’য়াবিয়া (রা) তাঁর নিকট থেকে সিটি খরীদ করে সেখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। যা পরে কাসরে বনী হুদায়লা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কারো কারো ধারণা যে, রাসূল (সা) এ ভূমি তাঁকে দান করেন। কিন্তু তা সঠিক নয়। উপরে উল্লেখিত আমাদের বক্তব্য সাহীহ বুখারীর বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত।

হাস্সানের (রা) মাথার সামনের দিকে এক গোছা লম্বা চুল ছিল। তিনি তা দুই চোখের মাঝখানে সব সময় ছেড়ে রাখতেন। ভীষণ বাক্পটু ছিলেন। এ কারণে বলা হতো, তিনি ত৭ার জিহবার আগা নাকের আগায় ছোঁয়াতে পারতেন। তিনি বলতেন, আরবের কোন মিষ্টভাষীই আমাকে তুষ্ট করতে পারে না। আমি যদি আমার জিহ্বার আগা কারো মাথার চুলের ওপর রাখি তাহলে সে মাথা ন্যাড়া হয়ে যাবে। আর যদি কোন পাথরের ওপর রাখি তাহলে তা বিদীর্ণ হয়ে যাবে।৪০

হাস্সান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেষযোগ্য হলেনঃ আল-বারা’ ইবন আযিব, সা’ঈদ ইবন মুসাঢ্যিব, আবূ সালামা ইবন আবদির রহমান, উওওয়া ইবন খুরাইর আবুল সাহান মাওলা নবী নাওফাল, খারিজা ইবন যায়িদ ইবন সাবিত, ইয়াহইয়া ইবন আবদির রহমান ইবন হাতিব আয়িশা আবু হুরাইরা, সুলায়মান ইবন ইয়াসার আবদুর রহমান ইবন হাসসান প্রমুখ।৪১ ইবন সা’দ হাস্সানকে (রা) দ্বিতীয় তাবকায় (স্তর) উল্লেখ করেছেন।৪২

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর প্রথম দুই খলীফা আবূ বকর ও উমারের (রা) খিলাফতকালে হাস্সানের (রা) কোন রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায় না। উসমানের (রা) খিলাফতের সময় ত৭র মধ্যে রআবার আসাবিয়্যাতের (অন্ধ পক্ষপাতিত্ব) কিচু লক্ষণ দেখা যায়। তিনি খলীফা উসমানের (রা) পক্ষ নিয়ে বনু উমাইয়্যাকে আলীর (রা) বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন। খলীফা উসমান (রা) বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদাত বরণ করলে তিনি বনু হাশিম, বিশেষতঃ আলীকে (রা) ইঙ্গিত করে কিছু কবিতা রচনা করেছেন।৪৩

হাস্সানের (র) জীবনে কবিত্ব একটি স্বতন্ত্র শিরোনাম। কাব্য প্রতিভা সর্বকালে সকল জাতি-গোষ্ঠীর নিকট সমাদৃত। বিশেষ করে প্রাক-ইসলামী আরবে এ গুণটির আবার সবচেয়ে বেশী কদর ছিল। কবিতা চর্চা ছিল সেকালের আরববাসীর এক বিশেষ রুচি। তৎকালীন আরবে কিছু গোত্র ছিল কবির খনি বা উৎস খ্যাত। উদাহরণ স্বরূপ কায়স, রাবী’য়া, তামীম, মুদার, য়ামন প্রমুখ গোত্রের নাম করা যায়। এ সকল গোত্রে অসংখ্য আরবী কবির জন্ম হয়েছে। মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় ছির শেষোক্ত য়ামন গোত্রের অন্তর্ভূক্ত। হাস্সানের (রা) পৈত্রিক বংশধারা উপরের দিকে এদের সাথে মিলিত হয়েছে।

উপরে উল্লেখিত গোত্রসমূহের মধ্যে আবার কিচু খান্দানে কবিত্ব বংশানুক্রমে চলে আসছিল। হাস্সানের (রা) খান্দানটি ছির তেমনই। উপরের দিকে তাঁর পিতামহ ও পিতা, নীচের দিকে তাঁর পুত্র আবদুর রহমান, পৌত্র সা’ঈদ ইবন আবদির রহমান এবং তিনি নিজে সকলেই ছিরেন ত৭াদের সমকালে একেকজন শ্রেষ্ঠ কবি।৪৪ হাস্সানের (রা) এক মেয়েও একজন বড় মাপের কবি ছিলেন। হাস্সান (রা) তাঁর বার্দ্ধক্যে এক রাতের কবিতা রচনা করতে বসেছেন।  কয়েকটি শ্লোক রচনার পর আর ছন্দ মিলাতে পারছেন না। তাঁর অবস্থা বুঝতে পেরে মেয়ে বললেন: বাবা, মনে মনে হচ্ছে আপনি আর পাররছন না। বললেন: ঠিকই বলেছো। মেয়ে বললেন: আমি কি কিচু শ্লোক মিলিয়ে দেব? বললেন: পারবে? মেয়ে বললেন: হাঁ, তা পারবো। তখন বৃদ্ধ একটি শ্লোক বললেন, আর তার সাথে মিল রেখে একই ছন্দে মেয়েও একটি শ্লোক রচনা করলেন। তখন হাস্সান বললেন: তুমি যতদিনজীবিত আছ আমি আর একটি শ্লোক ও রচনা করবো না। মেয়ে বললেন: তা হয় না; বরং আমি আর আপনার জীবদ্দশায় কোন কবিতা রচনা করবো না।৪৫

প্রাক-ইসলামী ‘আমলের অগণিত আরব কবির অনেকে ছিলেন’ আসহাবে মুজাহ্হাবাত’ নামে খ্যাত। মুজাহ্হাবাত’ শব্দটি জাহাব’ থেকে নির্গত। ‘জাহাব’ অর্থ স্বর্ণ। যেহেুত এ সকল কবিদের কিছু অনুপম কবিতা স্বর্নের পানি দ্বারা লিখিত হয়েছিল, এজন্য সেই কবিতাগুলিকে ‘মুজাহ্হাবাত’ বলা হতো। আর ‘আসহাব’ শব্দটি ‘সাহেব’ শব্দের বহুবচন। যার অর্থ ‘অধিকারী, মালিক।’ সুতরাং’ আসহাবে মুজাহ্হাবাত’ অর্থ স্বর্ণ দ্বারা লিখিত কবিতা সমূহের অধিকারী বা রচয়িতাগণ। পরবর্তীকালে প্রত্যেক কবির সর্বোত্তম কবিতাটিকে মুজাহ্হাব’ বলা হতে াকে। হাস্সানের (রা) ‘মুজাহ্হাবার’ প্রম পংক্তি নিম্নরূপ:৪৬

আরবী হবে

(লা’আমরু আবীকাল খায়রু হাক্কান লিমা বিনা…………..)

আরবী কবিদের চারটি তাবকা বা স্তর। ১. জাহিলী বা প্রাক-ইসলামী কালের কবি, ২.মুখাদরাম-যে সকল কবি জাহিলী ও ইসলামী উভয় কাল পেয়েছেন, ৩. ইসলামী-যারা ইসলামের অভ্যূদয়ের পর জন্মগ্রহণ করেন এবং কবি হয়েছেন, ৪. মুহদাস-আব্বাসী বা পরবর্তীকালের কবি। এ দিক দিয়ে হযরত হাস্সান দ্বিতীয় স্তরের কবি। তিনি জাহিলী ও ইসলাম-উভয়কালেই পেয়েছেন।৪৭

কাব্য প্রতিভায় হাস্সান (রা) ছিলেন জাহিলী আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ইমাম আল-আসমা’ঈ বলেন: হাস্সানের জাহিলী আমলের কবিতা শ্রেষ্ঠ কবিতাসমূহের অন্তর্গত।৪৮

হাস্সানের (রা) কাব্য জীবনের দুইট অধ্যায়। একটি জাহিলী ও অন্যটি ইসলামী! যদিও দুইটি ভিন্নধর্মী অধ্যায়, তথাপি একটি অপরটি থেকে কোন অংশে কম নয়। জাহিলী জীবনে তিনি গাস্সান ও হীরার রাজন্যবর্গের স্তুতি ও প্রশংসাগীতি রচনার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। ইসলামী জীবনে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসা, তাঁর পক্ষে প্রতিরোধ ও কুরাইশদের নিন্দার জন্য। তিনি সমকালীন শহরে কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি বলে স্বীকৃত। বিদ্রপাত্মাক কবিতা রচনায় অতি দক্ষ। আবু উবায়দাহ্ বলেন: অন্য কবিদের ওপর হাস্সানের মর্যাদা তিনটি  কারণে। জাহিলী আমলে তিনি আনসারদের কবি, রাসূলুল্লাহর (সা) নুবুওয়াতের সময়কালে ‘শা’য়িরুর রাসূল’ এবং ইসলামী আমলে গোটা য়ামনের কবি।৪৯

জাহিলী আরবে উকাজ মেলায় প্রতি বছর সাহিত্য-সংস্কৃতির উৎসব ও প্রতিযোগিতা হতো। এ প্রতিযোগিতায় হাস্সানও অংশগ্রহণ করতেন। একবার তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি আন-নাবিগা আয্-যুবইয়ানী (মৃতঃ ৬০৪ খ্রীঃ) ছিলেন এ মেলার কাব্য বিচারক। কবি হাস্সান ছিলেন একজন প্রতিযোগী। বিচারক আন-নাবিগা, আল-শা’শাকে হাস্সানের তুলনায় শ্রেষ্ঠ কবি বলে রায় দিলে হাস্সান তার প্রতিবাদ করেন এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ কবি বলে দাবী করেন।৫০

আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী বলেন: আল-আ’শা আবু বাসীর প্রথমে কবিতা পাঠ করেন। তারপর পাঠ করেন হাস্সান ও অন্যন্যা কবিরা। সর্বশেষে তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি আল-খান্সা বিনত’ আমর তাঁর কবিতা পাঠ করেন। তাঁর পাঠ শেষ হলে বিচারক আন-নাবিগা বলেন: আল্লাহর কসম! একটু আগে পঠিত আবু বাসীর আল-আ’শার কবিতাটি যদি আমি না শুনতাম তাহলে অবশ্যই বলতাম, তুমি জিন ও মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর এ রায় শোনার সাথে সাথে হাস্সান উঠে দাঁড়ান এবং বলেন: আল্লাহর কসম! আমি আপনার পিতা ও আপনার চেয়ে বড় কবি। আন-নাবিগা তখন নিজের দুইটি চরণ আবৃত্তি করে বলেনঃ ভাতিজা! তুমি এ চরণ দুইটির চেয়ে সুন্দর কোন চরণ বলতে পারবে কি? তখন হাস্সান তাঁর কথার জন্য লজ্জিত হন।৫১ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আন-নাবিগার কথার জবাবে হাস্সান তাঁরÑ

আরবী হবে

(লানা আল-জাফানাতুল গুররু ইয়াল মা’না বিদদুজা) পংক্তি দুইটি আবৃত্তি করেন। আন-বাবিগা তখন পংক্তি দুইটির কঠোর সমালোচনা করে হাস্সানের দাবী প্রত্যাখ্যান করেন।৫২

হাস্সান (রা) জাহিলী জীবনেই কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি লাভ করেন। গোটা আরবে এবং পার্শ্ববর্তী রাজ দরবারসমূহে তিনি খ্যাতিমান কবিদের তালিকায় জিনের নামটি লেখাতে সক্ষম হন। এরই মধ্রে ত৭র জীবনের ষাটটি বছর পেরিয়ে গেছে। এরপর তিনি ইসলারেম দা’ওয়াত রাভ করলেন। রাসূল (সা) মদীনায় হিজরাত করে আসলেন। হাস্সানের কাব্য-জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা হলো। তিনি স্বীয় কাব্য প্রতিভার যথাযথ হক আদায় করে ‘শা’য়িরুর রাসূল’ খিতাব অর্জন করলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরাত করে আসার পর মক্কার পর মক্কার কুরাইশরা এ আশ্রয়স্থর থেকে তাঁকে উৎখাতের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এক দিকে তারা সম্মুখ সময়ে অবতীর্ণ হয়, অন্যদিকে তারা তাদের কবিদের লেলিয়ে দেয়। তারা আল্লাহর রাসূল, ইসলাম ও মুসলমনাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রচনা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুত করে কবিতা রচনা করতো এবং আরববাসীদেরকে তাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতো। এ ব্যাপারে মক্কার কুরাইশ কবি আবু সুফইয়ান ইবনুল হারেস ইবন আবদিল মুত্তালিব, ‘আবদুল্লাহ ইবন যাব’য়ারী, ’আমর ইবনুল আস ও দাররার ইবনুল খাত্তাব অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ও নিন্দাসূচক কবিতা রাসূল (সা) সহ মুসলমানদেরকে অস্থির করে তোলে।

এ সময় মদীনায় মুহাজিরদের মধ্যে আলী (রা) ছিলেন একজন নামকরা কবি। মদীনার মুসলমানরা তাঁকে অনুরোধ করলো মক্কার কবিদের জবাবে একই কায়দায় ব্যঙ্গ কবিতা রচনার জন্য। আলী (রা) বললেন, রাসূল (সা) আমাকে অনুমতি দিলে আমি তাদের জবাব দিতে পারি।  একথা রাসূলুল্লাহর (সা) কানে গেলে তিনি বললেন, আলী একাজের উপযুক্ত নয়। যারা আমাকে তরবারি দিয়ে সাহায্য করেছে, আমি আলীকে তাদের সাহায্যকারী করবো। হাস্সান উপস্থিত দিছেন। তিনি নিজের জিহ্বা টেনে ধরে বললেন: আমি সানন্দে এ দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। তাঁর জিহ্বাটি ছিল সাপের জিহ্বার মত, এক পাশে কালো দাগ। তিনি সেই জিহ্বা বের করে স্বীয় চিবুক স্পর্শ করলেন। তখন রাসূল (সা) বললেন, তুমি কুরাইশদের হিজা (নিন্দা) কিভাবে করবে? তাতে আমারও নিন্দা হয়ে যাবে না? আমিও তো তাদেরই একজন হাস্সান বরলেন: আমি আমার নিন্দা ও ব্যঙ্গ থেকে আপনাকে এমনভাবে বের করে আনবো যেমন আটা চেলে চুল ও অন্যান্র ময়লা বের করে আনা হয়। রাসূল (সা) বললেন: তুমি নসবনামার (কুষ্ঠি বিদ্যা) ব্যাপারে আবু বকরের সাহায্য নেবে। তিনি কুরাইশদের নসব বিদ্যায় বিষে পারদর্শী। তিনি আমার নসব তোমাকে বলে দেবেন।৫৩

জাবির (রা) বলেন। আহযাব যুদ্ধের সময় একদিন রাসূল (সা) বললেন: কে মুসলমানদের মান-সম্মা রক্ষা করতে পারে? কা’ব ইবন মালিক বললেন: আমি। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বললেন: আমি। হাস্সান বললেন: আমি রাসূল (সা) হাস্সানকে বললেন: হাঁ, তুমি। তুমি তাদের হিজা (নিন্দা) কর। তাদের বিরুদ্ধে রুহুল কুদুস জিবরীল তোমাকে সাহায্য করবেন।৫৪

হাস্সান (রা) আবু বকরের (রা) নিকট যেতেন এবং কুরাইশ বংশের বিভিন্ন শাখা, ব্যক্তির নসব ও সম্পর্ক বিষয়ে নানা প্রশ্ন করতেন। আবু বকর বলতেন, অমুক অমুক মহিলাকে মুক্ত রাখবেন। তাঁরা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) দাদী। অন্য সকল মহিলাদের সম্পর্কে বলবেন। হাস্সান সে ময় কুরাইশদের নিন্দায় একটি কাসীদা রচনা করেন। তাতে তিনি কুরাইশ সন্তান আবদুল্লাহ, যুবাইর, হামযা, সাফিয়্যা, আব্বাস ও দারবার ইবন আবদিল মুত্তালিবকে বাদ দিয়ে একই গোত্রের তৎকালীন মুশরিক নেতা ও কবি আবু সুফইয়ান ইবনুল হারেস-এর মা সুমাইয়্যা ও তার পিতা আল-হারেসের তীব্র নিন্দা ও ব্যঙ্গ করেন।

উল্লেখ্য যে, এই আবু সুফইয়ান ইবনুল হারেস ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ও দুধ ভাই। ইসলামপূর্ব সময়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর খুবই ভাব ছিল। নুবুওয়াত প্রাপ্তির পর তার সাথে দুশমনি শুরু হয়। তিনি ছিলেন একজন কবি। রাসূল (সা) ও মুসলমানদের নিন্দায় কবিতা রচনা করতেন। মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হুনাইন যুদ্ধে যোগদান কনের। এই আবু সুফইয়ানের নিন্দায় হাস্সান রচনা করেন এক অববদ্য কাসীদা। তার কয়েকটি শ্লোকের ানুবাদ নিম্নরূপ:৫৫

১.তুমি মুহাম্মদের নিন্দা করেছো, আমি তাঁর পক্ষ থেকে জবাব দিয়ে।ি আর এর প্রতিদান রয়েছে আল্লাহর কাছে।

২.তুমি নিন্দা করেছো একজন পবিত্র, পুণ্যবান ও সত্যপন্থী ব্যক্তির। যিনি আল্লাহর পরম বিশ্বাসী এবং অঙ্গিকার পালন করা যাঁর স্বভাব।

৩.তুমি তাঁর নিন্দা কর? অথচ তুমিতো তাঁর সময়ক্ষ নও। অতএব, তোমাদের নিকৃষ্ট ব্যক্তিরা তোমাদের উৎকৃষ্টদের জন্য উৎসর্গ হোক।

৪.অতএব, আমার পিতা, তাঁর পুত্র এবং আমার মান-ইজ্জত মুহাম্মদরে মান-সম্মান রক্ষায় নিবেদিত হোক।

হাস্সানের (রা) এ কবিতাটি শুনে সুফইয়ান ইবনুল হারিস মন্তব্য করেন: নিশ্চয় এর পিছনে আবু বকরের হাত আছে। এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসায় ও কাফিরদের নিন্দায় ৭০টি বয়েত (শ্লোক) রচজনায় জিবরীল (আ) তাঁকে সাহায্য করেন।৫৬

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কাব্যের প্রতিরোধ ব্যুহ রচনায় হাস্সানের (রা) এমন প্রয়াসে রাসূলে কারীম (সা) দারুণ খুশী হতেন। একবার তিনি বলেনঃ ‘হাস্সান! আল্লাহ রাসূলে পক্ষ থেকে তুমি জবাব দাও। হে আল্লাহ! তুমি তাকে রুহুল কুদুস জিবরীলের দ্বারা সাহায্য কর।’৫৭

আর একবার রাসূল (সা) হাস্সানকে (রা) বললেন: ‘তুমি কুরাইশদের নিন্দা ও বিদ্রুপ করতে থাক, জিবরীল তোমার সাথে আছেন।৫৮

একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূল (সা) বলেন: আমি আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে কুরাইশ কবিদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের প্রত্যুত্তর করতে বললাম। সে সুন্দর প্রত্যুত্তর করলো। আমি কা’ব ইবন মালিককেও বললাম তাদের জবাব দিতে। সে উত্তম জবাব দিল। এরপর আমি হাস্সান ইবন সাবিতকে বললাম। সে যে জবাব দিল তাদে সে নিজে যেমন পরিতৃপ্ত হলো, আমাকেও পরিতৃপ্ত করলো।৫৯

হাস্সানের (রা) কবিতা মক্কার পৌত্তলিক কবিদের মধ্রে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো সে সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন: ‘হাস্সানের কবিতা তাদের মধ্যে তীরের আঘাতের চেয়েও তীব্র আঘাত করে।’৬০

‘আয়িশা (রা) থেকে উরওয়া বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) তাঁর মসজিদে হাস্সানের জন্য একটি মিন্বর তৈরী করারন। তার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি কাফির কবিদের জবাব দিতেন।৬১ তিনি এ মিন্বরে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসা ও পরিচিতিমূলক কবিতা পাঠ করতেন এবং কুরাইশ কবিদের জবাব দিতেন, আর রাসূল (সা) তা শুনে দারুণ তুষ্ট হতেন।৬২ এ কারণে ‘আয়িশা (রা) একবার রাসূলুল্লাহর (সা) পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, তিনি তেমনই ছিলেন যেমন হাস্সান বলেছে।৬৩

হিজরী নবম সনে (খ্রীঃ ৬৩০) আরবের বিখ্যাত গোত্র বনু তামীমের ৭০ অথবা ৮০ জনের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এলা। এই দলে বনু তামীমের আয্-যিবিরকান ইবন বদরের মত বাঘা কবি ও উতারিদ ইবন হাজিরের মত তুখোড় বক্তাও ছিলেন। তখন গোটা আরবে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। তার আগের বছর মক্কাও বিজিত হয়েছে। তখন গোটা আরবে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে। তার আগের বছর মক্কাও বিজিত হয়েছে। জনসংখ্রা, শক্তি ও মর্যাদার দিক দিয়ে গোটা বনু তামীমের তখন ভীষণ দাপট। তারা রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে উপস্থিত হয়ে আরবের প্রথা অনুযায়ী বললো: ‘মুহাম্মাদ! আমরা এসেছি আপনার সাথে গর্ব ও গৌরব প্রকাশের প্রতিযোগিতা করতে। আপনি আমাদের খতীবদের ানুমতি দেওয়া হলো। তখন বনু তামীমের পক্ষে তাদের শ্রেষ্ঠ খতীব উতারিদ ইবন বদর দাঁড়ালেন এবং তাদের গৌরব ও কীর্তির বর্ণনা দিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে জবাব দিলে প্রখ্যাত খতীব সাবিত ইবন কায়স। তারপর বনু তামীমের কবি যিবিরকান ইবন বদর দাঁড়ালেন এবং তাদের গৌরব ও কীর্তি কথায় ভরা স্বারচিত কাসীদা পাঠ কররেন। তাঁর আবৃত্তি শেস হলে রাসূল (সা) বললেন: হাস্সান, ওঠো! লোকটির জবাব দাও।’ হাস্সান দাঁড়িয়ে প্রতিপকষ কবির একই ছন্দ ও অন্তমিলে তাৎক্ষণিকভাবে রচিত এক দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। তাঁর এ কবিতা পক্ষ-বিপক্ষের সকলকে দারুণ মুদ্ধ করে। বনু তামীমের শ্রোতার এক বাক্যে সেদিন বলে, মুহাম্মদের খতীব আমাদের খতীব অপেক্ষা এবং ত৭ার কক্ষি আমাদের কবি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।৬৪

হাস্সানের (রা) জাহিলী কবিতার বিষয়বস্তু ছিল গোত্রীয় ও ব্যক্তিগত মাদাহ (প্রশংসা) ও হিজা (নিন্দা ও ব্যঙ্গ বিদ্রুপ)। তাছাড়া শোকগাঁথা, মত পানের আড্ডা ও মদের বর্ণনা, বীরত্ব, গর্ব ও প্রেম সংগীত রচনা করেছেন। ইসলামী জীবনের কবিতায় তিনি অন্তর দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসা করেছেন, আর নিন্দা করেছেন পৌত্তলিকদের যারা আল্লাহ রাসূল ও ইসলামের সাথে দুশমনী করেছে।

ইসলাম তাঁর কবিতায় সততা ও মাধুর্য দান করেছে। কবিতায় তিনি ইসলামের বহু বিষয়ের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। কবিতায় পবিত্র কুরআনের প্রচুর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। এ কারণে যারা আরবী কবিতায় গাতনুগতিকতার বন্ধন ছিন্ন করে অভিনবত্ব আনয়নের চেষ্টা করেছেন,হাস্সানকে তাদের পুরোধা বলা সঙ্গত। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসা গীতি বা না’ তে রাসূল রচনার সূচনাকারী তিনিই। আরবী কবিতায় জাহিলী ও ইসলামী আমলে মাদাহ (প্রশংসা গীতি) রচনায় যাঁরা কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, হাস্সান তাদের অন্যতম।৬৫

ইবনুল আসীর বলেনঃ পৌত্তলিক কবিদের নিন্দা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অপপ্রচারের জবাব দানের জন্য তৎকালীন আরবের তিনজন শ্রেষ্ঠ কবি মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁরা হলেন হাস্সান ইবন সাবিত, কা’ব ইবন মালিক ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। হাস্সান ও কা’ব প্রতিপক্ষ কবিদের জবাব দিতেন তাদেরই মত বিভিন্ন ঘটনা, যুদ্ধ-বিগ্রহের জয়-পরাজয়, কীর্তি ও গৌরব তুলে ধরে। আর আবদুল্লাহ তাদের কুফরী ও দের দেবীর পূজার কথা উল্লেখ করে ধিক্কার দিতেন। তাঁর কবিতা প্রতিপক্ষের ওপর তেমন বেশী প্রভাব ফেলতো না। তবে ান্য দুইজনের কবিতা তাদেরকে দারুণভাবে আহত করতো৬৬

হাস্সান (রা) আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি কুরাইশদের অবাধ্যতা ও তাদের মূর্তিপূজার উল্লেখ করে নিন্দা করতেন না। কারণ, তাতে মেন ফল না হওয়ারই কথা। তারা তো রাসূলকে (সা) বিশ্বাসই করেনি। আর মূর্তি পূজাকেই তারা সত্য বলে বিশ্বাস করতো। তাই তিনি তাদের বংশগত দোষ-ক্রুটি, নৈতিকতার স্বলন, যুদ্ধে পরাজয় ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরে তাদেরকে চরমভাবে আহত করতেন। আর একাজে আবু বকর (রা) তাঁকে জ্ঞান ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন।

প্রাচীন আরবী কবিতার যতগুলি বিষয় বৈচিত্র আছে তার সবগুলিতে হাস্সানের (রা) পদচারণা পাওয়া যায়। এখানে সংক্ষেপে তাঁর কবিতার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো:

১.উপমার অভিনবত্ব: একথা সত্য যে প্রাচীন কবিতা কোন উন্নত সভ্যতার মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। তবে একথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, বড় সভ্যতা দ্বারা তা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছে। আরব সভ্যতার সত্যিকার সূচনা হয়েছে পবিত্র কুরআনের অবতরণ ও রাসূলুল্লাহর (সা) আবির্ভাবের সময় থেকে। কুরআন আরবী বাচনভঙ্গি ও বাক্যালস্কারের সবচেয়ে বড় বাস্তব মুজিয়া। এই কুরআন ানেক বড় বড় বাগীকে হতবাক করে দিয়েছে। এ কারণে সে সময়ের যে কবি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁর মধ্যে বাকপটুতা ও বাক্যালঙ্কারের এক নতুন শক্তির সৃষ্টি হয়। এ শ্রেণীর কবিদের মধ্যে হাস্সান ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। এ শক্তি ত৭ার মধ্যে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশী দেখা যায়।

পবত্রি কুরআনে সাহাবায়ে কিরামের গুণ বৈশিষ্ট্যের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছেÑ

সিজদার চিহ্ন তাদের মুখমণ্ডলে স্পষ্ট বিদ্যামন। হাস্সান উক্ত আয়াতকে উসমানের (রা) প্রশংসায় রূপক হিসেবে ব্যবহার করে হত্যাকারীদের ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:৬৭

তারা এই কাঁচা-পাকা কেশধারী, ললাটে সিজদার চিহ্ন বিশিষ্ট লোকটিকে জবাই করে দিল, যিনি তাসবীহ পাঠ ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করতেন।’

এই শ্লোকে কবি উসমানের চেহারাকে সিজদার চিহ্নধারী বলেছেন। তৎকারীন আরবী কবিতায় এ জাতীয় রূপকের প্রয়োজ সম্পূর্ণ নতুন।

২. চমৎকার প্রতীকের ব্যবহার: আরবী অলঙ্কার শাস্ত্রে ‘তাতবী’ বা ‘তাজাওয়ায’ নামে এক প্রকার প্রতীকের নাম দেখা যায়। তার অর্থ হলো, কবি কোন বিষয়ের আরোচনা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু অকম্মাৎ অতি সচেতনভাবে তা ছেড়ে দিয়ে এমন এক বিসয়ের বর্ণনা কনে যাতেতাঁর পূর্বের বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। হাস্সানের কবিতায় এ জাতীয় প্রতীক বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আরবে অসংখ্য গোত্র দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমির মধ্যে বসবাস করতো। তারা ছিল যাযাবর। সেখানে পানি ও পশুর চারণভূমি পাওয়া যেত সেখানেই তাঁবু গেড়ে অবস্থায়ী বাসস্থান পড়ে তুরতো। পানি ও পশুর খাদ্য শেষ হলে নতুন কোন কোন স্থানের দিকে যাত্রা করতো। এভাবে তারা এক স্থান থেকে ান্য স্থানে ঘুরে বেড়াতো। আরব কবিরা তাদের কাব্যে এ জীবনকে নানভাবে ধরে রেখেছেন। তবে হাস্সান বিষয়টি যেভাবে বর্ণনা করেছে তাতে বেশ অভিনবত্ব আছে। তিনি বলছেন : ‘জাফ্নার সন্তানরা তাদের পিতা ইবন মারিয়্যার কবরের পাশেই থাকে, তিনি খুবই উদার ও দানশীল।’

প্রশংসিত ব্যক্তি যেহেতু আরব বংশোদ্ভুত। এ কারণে তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গি করে বলে দিলেন, এঁরা আরব হলেও যাযবর নন, বরং রাজন্যবর্গ। কোন রকম ভীতি ও শঙ্কা ছাড়াই তাঁরা তাঁদের পিতার কবরের আশে-পাশেই বসবাস করেন। তাঁদের বাস্থান সবুজ-শ্যামল। একারণে তাঁদের স্থান থেকে স্থানান্তরে ছুটে বেড়ানোর প্রয়োজন পড়েনা।

৩. রূপকের অভিনবত্ব: আরব কবিরা কিছু কথা রূপক অর্থে এবং পরোক্ষে বর্ণনা করতেন। যেমন: যদি উদ্দেশ্যে হয় একথা বলা যে, অমুক ব্যক্তি অতি মর্যাদাবান ও দানশীল, তাহলে তাঁরা বলতেন, এই গুণগুলি তার পরিচ্ছেদের মধ্যেই আছে। হাস্সানের (রা) কবিতায় রূপকের অভিনবত্ব দেখা যায়। যেমন একটি শ্লোকে তিনি চলতে চান, আমরা খুবই কুলিন ও সন্তুন্তু। কিন্তু কথাটি তিনি বলেছেন এভাবে: ‘সম্মান ও মর্যদা আমাদের আঙ্গিনায় ঘর বেঁধেছে এবং তার খুঁটি এত মজবুত করে গেঁড়েছে যে, মানুষ তা নাড়াতে চাইলেও নাড়াতে পারে না।’ এই শ্লোকে সম্মান ও মর্যদার ঘর বাঁঢ়া, সুদৃঢ় পিলার স্থাপন করা এবং তা টলাতে মানুষের অক্ষম হওয়া এ সবই আরবী কাব্যে নতুন বর্ণনারীতি।

৪. ছন্দ, অন্তমিল ও স্বর সাদৃশ্যের আশ্চর্য রকমের এই সৌন্দর্য তাঁর কবিতায় দেখা যায়। শব্দের গাঁখুনি ও বাক্যের গঠন খুবই শক্ত, গতিশীল ও সাবলীল। প্রথম শ্লোকের প্রথম অংশের শেষ পদের শেষ বর্ণটি তাঁর বহু কাসীদার প্রতিটি শ্লোকের শেষ পদের শেষ বর্ণ দেখা যায়। আরবী ছন্দ শাস্ত্রে যাকে কাফিয়া’ বলা হয়। আরবী বাক্যের এ ধরনের শিল্পকারিতা এর আগে কেবল ইমরুল কায়সের কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। তবে তাঁর পরে বহু আরব কবি নানা রকম শিল্পকারিতার সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। আব্বাসী আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবি আবুল আলা আল-মা’য়াররীর একটি বিখ্যাত কাব্যের নাম নুযুমু মালা ইয়ালযাযু’। কবিতা রচনায় এমন কিছু বিষয় তিনি অপরিহার্যরূপে অনুসরণ করেছেন, যা আদৌ কবিতার জন্য প্রয়োজন নয়। তাঁর এ কাব্যগ্রন্থটি এ ধররেন কবিতার সমষ্টি। এটা তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।

৫. হাস্সানের কবিতার আর একটি বৈশিষ্ট হলো, তিনি প্রায়ই এমন সব শব্দ প্রয়োগ করেছেন যা ব্যাপক অর্থবোধক। তিনি হয়তো একটি ভাব স্পষ্ট করতে চেয়েছেন এবং সেজন্য এমন একটি শব্দ প্রয়োগ করেছেন যাতে উদ্দিষ্ট বিষয়সহ আরো অনেক বিষয় সুন্দরভাবে এসে গেছে।৬৮

৬. অতিরঞ্জন ও অতিকথন: হাস্সানের ইসলামী কবিতা যাবতীয় অতিরঞ্জন ও অতিকথন থেকে মুক্ত বলা চলে। একথা সত্য যে কল্পনা ও অতিরঞ্জন ছাড়া কবিতা হয় না। তিনি নিজেই বলতেন, মিথ্যা বলতে ইসলাম নিষেধ করেছে। এ কারণে অতিরঞ্জন ও অতিকথন, যা মূলতঃ মিথ্যারই নামান্তরÑআমি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি।৬৯

শুধু তাই নয়, তাঁর জাহিলী আমলে লেখা কবিতায়ও এ উপাদান খুব কম ছিল। আর এ কারণে তৎকারীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি আন-নাবিগা কবি হাস্সানের একটি শ্লোকের অবমূল্যায়ন করলে দুই জনের মধ্যে ঝগড়া হয়।৭০

হাস্সানের ইসলামী কবিতার মূল বিষয় ছিল কাফিরদের প্রতিরোধ ও নিন্দা করা। কাফিরদের হিজা ও নিন্দা করে তিনি বহু কবিতা রচনা করেছেন। তবে তাঁর সেই কবিতাকে অশ্ললতা স্পর্শ করতে পারেনি। তৎকারীন আরব কবিরা ‘হিজা’ বলতে নিজ গোত্রের প্রশংসা এবং বিরোধী গোত্রের বিন্দা বুঝাতো। এই নিন্দা হতো খুবই তীর্যক ও আক্রমণাত্মক। এ কারণে কবিরা তাদের কবিতায় সঠিক ঘটনাবলী প্রাসঙ্গিক ও মনোরম ভঙ্গিক তুলে ধরতো।জাহিলী কবি যুহাইর ইবন আবী-সুলমার জিহা’ বা নিন্দার একটি স্টাইল আমরা তার দুইটি শ্লোকে লক্ষ্য করি। তিনি ‘হিস্ন’ গোত্রের নিন্দায় বলেছেন:৭১

‘আমি জানিনে। তবে মনে হয় খুব শিগ্গী জেনে যাব। ‘হিস্ন’ গোত্রের লোকেরা পুরুষ না নারী? যদি পর্দানশীল নারী হয় তাহলে তাদের প্রত্যেকে কুমারীর প্রাপ্য হচ্ছে উপহার।’

যুহাইরের এ শ্লোকটি ছিল আরবী কবিতার সবচেয়ে কঠোর নিন্দাসূচক। এ কারণে শ্লোকটি উক্ত গোত্রের লোকদের দারুণ পীড়া দিয়েছিল। হাস্সানের নিন্দাবাদের মধ্যে শুধু গালিই থাকতো না, তাতে থাকতো প্রতিরোধ ও প্রতিউত্তর। তাঁর ষ্টাইলটি ছিল অতি চমৎকার। কুরাইশদের নিন্দায় রচিত তাঁর একটি কবিতার শেষের শ্লোকটি সেকালে এতখানি জনপ্রিয়তা পায় যে তা প্রবাদে পরিণত হয়। শ্লোকটি নিম্নরূপ:

‘আমি জানি যে তোমার আত্মীয়তা কুরাইশদের সংগে আছে। তবে তা এ রকম যেমন উট শাবকের সাথে উট পাখীর ছানার সাদৃশ্য হয়ে থাকে।’৭২

পরবর্তীকালে কবি ইবনুল মুফারিরগ উল্লেখিত শ্লোকটির ১ম পংক্তিটি আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নিন্দায় প্রয়োগ করেছেন।৭৩ আল-হারেস ইবন’ আউফ আল-মুররীর গোত্রের বসতি এলাকায় রাসূলুল্লাহ (সা) প্রেরিত একজন মুবাল্লিগ নিহত হলে কবি হাস্সান তার নিন্দায় একটি কবিতা রচনা করেন। তিনি বলেন:

‘যদি তোমরা প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে থাক তাহলে তা এমন কিছু নয়। কারণ, প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করা তোমাদের স্বভাব। আর প্রতিশ্র“তি ভঙ্গের মূল থেকেই প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ অঙ্কুরিত হয়।’

হাস্সানের এই বিদ্রুপাত্মক কবিতা শুনে আল-হারেসের দুই চোখে অশ্র“র প্লাবন নেমেয় আসে। সে রাসূলুল্লাহ (সা) দরবারে ছুটে এসে আশ্রয় প্রার্শনা করে এবং হাস্সানকে বিরত রাখার আবেদন জানায়।৭৪

হাস্সান (রা) চমৎকার মাদাহ বা প্রশংসা গীতি রচনা করেছেন। আলে ইনানের প্রশংসায় তিনি যে সকল কবিতা রচনা করেছেন তার দুইটি শ্লোকে এ রকম:

‘যারা তাদের নিকট যায় তাদেরকে তারা ‘বারদী’ নদীর পানি স্বচ্ছ শরাবের সাথে মিথিয়ে পান করায়।’

এই শ্লোকটিরই কাছাকাছি একটি শ্লোকে রচনা করেছেন কবি ইবন কায়স মুস’য়াব ইবন যুবাইরের প্রশংসায়। কিন্তু যে বিষয়টি হাস্সানের শ্লোকে ব্যক্ত হয়েছে তা ইবন কায়সের শ্লোকে অনুপস্থিত।৭৫

অন্য একটি শ্লোকে তিনি গাসসানীয় রাজন্যবর্গের দানশীলতা ও অতিথিপরায়ণতার একটি সুন্দর চিত্র এঁকেছেন চমৎকার ষ্টাইলে। ‘তাঁদের গৃহে সব সময় াতিথিদের এত ভিড় থাকে যে তাঁদের কুকুরগুলিও তা দেখতে অভ্যন্ত হয়ে গেছে। এখন আর তারা নতুন আগন্তুককে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না।’

আরবী কাব্য জগতের বিখ্যাত তিন কবির তিনটি শ্লোক প্রশংসা বা মাদাহ কবিতা হিসেবে সর্বোত্তম। এ ব্যাপারে প্রায় সকলে একমত। তবে এ তিনটির মধ্যে সবচেয়ে ভালো কোনটি সে ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। কবি হুতাইয়্যা হাস্সানের এ শ্লোকটিকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন। কিন্তু অন্যারা আবুত ত্বিহান ও নাবিগার শ্লোক দুইটিকে সর্বোত্তম বলেছেন।৭৬ ইমাইয়্যা খলীফা আবদুল মালিক ছিলেন একজন বড় জ্ঞানী ও সাহিত্য রসিক মানুষ। তাঁর সিদ্ধান্ত হলো, ‘আরবরা যত প্রশংসাগীতি রচনা করেছে তার ম্েয সর্বোত্তম হলো হাস্সানের শ্লোকটি।’৭৭ তিনি রাসূলে কারীমের প্রশংসায় যে সকল কবিতা রচনা করেছেন তার ষ্টাইল ও শিল্পকারিতায় যথেষ্ট নতুনত্ব আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রশংসায় রচিত একটি শ্লোকে তিনি বলেছেন ‘অন্ধকার রাতে রাসূলুল্লাহ (সা) পবত্র ললাট অন্ধকারে জ্বলন্ত প্রদীপের আলোর মত উজ্জ্বল দেখায়।’

হাস্সান (রা) জাহিলী ও ইসলামী জীবনে অনেক মারসিয়া বা শোকগাঁথা রচনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইনতিকাল ছিল মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় শোক ও ব্যথা। হাস্সান রচতি কয়েকটি মারসিয়ায় সে শোক অতি চমৎকাররূপে বিধৃত হয়েছে। ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাতে মারসিয়াগুলি সংকলন করেছেন।

হাস্সান ছিলেন একজন দীর্ঘজীবনের অধিকারী অভিজ্ঞ কবি। তাছাড়া একজন মহান সাহাবীও বটে। এ কারণে তাঁর কবিতায় পাওয়া প্রায় প্রচুর উপদেশ ও নীতিকথা। কবিতায় তিনি মানুষকে উন্নত নৈতিকতা অর্জন করতে বলেছেন। সম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ বিষয়ে দুইটি শ্লোক:

‘অর্থ-সমএদর বিনিময়ে আমি আমার মান-সম্মান রক্ষা করি। যে অর্থ-সম্মাদে সম্মান রক্ষা পয়না আল্লাহ তাতে সমৃদ্ধি দান না করুন!

সম্পদ চলে গেলে তা অর্জন করা যায়; কিন্তু সম্মানক্ষার বার অর্জন করা যায় না।’৭৯

মানুষের সব সময় একই রকম থাকা উচিত। প্রাচযর্যের অধিকারী হলে ধরাকে সরা জ্ঞান করা এবং প্রাচুর্য চলে গেলে ভেঙ্গে পড়া যে উচিত নয়, সে কথা বলেছেন একটি শ্লোকে:

‘অর্থ-সম্পদ আমার লজ্জা-শরম ও আত্মা-সম্মানবোধেকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি। তেমনিভাবে বিপদ-মুসবিত আমার আরাম-আয়েশ বিঘিœত করতে পারেনি।’৮০

অত্যাচারের পরিণতি যে শুভ হয় না সে সম্পর্কে তাঁর একটি শ্লোক:

‘আমি কোন বিষয় সম্পর্কে অহেতুক প্রশ্ন ও অনুসন্ধান পরিহার করি। অধিকাংশ সময় গর্ত খননকারী সেই গর্তের মধ্যে পড়ে।’৮১

তিনি একটি শ্লোকে মন্দ কথা শুনে উপেক্ষা করার উপদেশ দিয়েছেন:

‘মন্ত খতা শুনে উপেক্ষা কর এবং তার সাথে এমন আচরণ কর যেন তুমি শুনতেই পাওনি।’৮২

লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় জীবন যাপন সম্পর্কে তিনি বলেন:

‘তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে তাদের চারণভূমি ান্যদের জন্য বৈধ করে দিয়েছি। তাই শক্ররা সেখানে অপকর্ম সম্পন্ন করেছে।

তোমরা কি মৃত্যু থেকে পালাচ্ছো? দুর্বলতার মৃত্যু তেমন সুন্দর নয়।’৮৩

‘আবদুল কাহির আল-জুরজানী বলেছেন, হাস্সানের রচিত কবিতার সকল পদের মধ্যে একটা সুদৃঢ় ঐক্য ও বন্ধন দেখা যায়। এমন কি সম্পূর্ণ বাক্যকে একটি শক্তিশালী রশি বলে মনে হয়।৮৪

একালের একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সমালোচক বুটরুস আল-বুসতানী বলেন: ‘হাস্সানের কবিতার বিশেষত্ব কেবল তাঁর মাদাহ ও হিজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার রয়েছে এক বড় ধরনে বিশেষত্ব। আর তা হচ্ছে তাঁর সময়ের  ঘটনাবলীর একজন বিশ্বস্ত ঐতিহাসিকের বিশেষত্ব। কারণ, তিনি বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিভিন্ন ঘটনাবল্ ীএ সকল যুদ্ধে মুসলিম ক্ষে যাঁরা শহীদ হয়েছে এবং বিরোধী পক্ষে যারা নিহত হয়েছে তাদের অনেকের নাম তিনিকবিতায় ধরে রেছেনে।। আমরা যখন ত৭ার কবিতা পাঠ করি তখন মনে হয়, ইসলামের প্রথম পর্বের ইতিহাস পাঠ করছি।”৮৫

প্রাচীন আরবের অধিবাসীরা দেহাতী ও শহুরেÑএই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। মক্কা, মদীনা ও তায়েপের অভিাসীরা ছিল শহরবাসী। অবশিষ্ট সকল অঞ্চলের অধিবাসীরা ছির দেহাতী বা গ্রাম্য। বেশীর ভাগ খ্যাতিমান কবি ছিলেন গ্রাম অঞ্চলের। এর মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু কবি শহরেও জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে হাস্সানের স্থান সর্বোচ্চ।৮৬

ইবন সাল্লাম আল-জামহী বলেন: ‘মদীনা, মক্কা, তায়িক, ইয়ামামাহ, বাহরাইনÑএর প্রত্যেক গ্রামে অনেক কবি ছিরেন। তবে মদীনার গ্রাম ছির কবিতার জন্য শীর্ষে। এখানকার শ্রেষ্ঠ কবি পাঁচজন। তিনজন খাযরাজ ও দুইজন আউস গোত্রের। খাযরাজের তিনজন হলেন: কায়স ইবনুল খুতাইম ও আবু কায়স ইবন আসলাত। এঁদের মধ্যে হাস্সান শ্রেষ্ঠ।৮৭ আবু ‘উবায়দাহ বলেন: ‘শহুরে কবিদের মধ্যে হাস্সান সর্বশ্রেষ্ঠ।৮৮ একথা আবু আমর ইবনুল আলাও বলেছেন। কবি আল-হুতাইয়্যা বলেন: তোমরা আনসারদের জানিয়ে দাও, তাদের কবিই আরবের শ্রেষ্ঠ কবি।’৮৯ আবুল ফরাজ আল-ইসফাহানী বলেন: হাস্সান শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। খোদ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: ইমারাইল কায়স হচ্ছে দোযখী কবিদের পতাকাবাহী এবং হাস্সান ইবন সাবিত তাদের সকলকে জান্নাতের দিকে চালিত করবে।৯০

ইমাম আল-আসমা’ঈ বলেন: অকল্যাণ ও অপকর্মে কবিতা শক্তিশালী ও সাবলীল হয়। আর কল্যাণ ও সৎকর্মে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই যে হাস্সান, তিনি ছিলেন জাহিলী আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ইসরাম গ্রহণের পর তাঁর কবিতার মান নেমে যায়। তাঁর জাহিলী কবিতাই শ্রেষ্ঠ কবিতা।’৯১

হাস্সানের (রা) বার্দ্ধক্যে একবার তাঁকে বলা হলো, আপনার কবিতা শক্তিহীন হয়ে পড়েছে এবং তার পর বার্দ্ধক্যের ছাপ পড়েছে। বললেন: ভাতিজ্য! ইসলাম হচ্ছে মিথ্যার প্রতিবন্ধক। ইবনুল আসীর বলেন, হাস্সানের একথার অর্থ হলো কবিতার বিষয়বস্তুতে যদি অতিরঞ্জন থাকে তাহলে চমৎকার হয়। আর যে কোন  অতিরঞ্জনই ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যাচার, যা পরিহারযোগ্য। সুতরাং কবিতা ভালো হবে কেমন করে?৯২

বুটরুস আল-বুসতানী হাস্সানের (রা) কবিতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন: ‘আমরা দেখতে পাই হাস্সান তাঁর জাহিলী কবিতায় ভালো করেছেন। তবে সে কালের শ্রেষ্ঠ কবিদের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি। আর তাঁই ইসলামী কবিতার কিছু অংশে ভালো করেছেন। বিশেষতঃ হিজা ও ফখর (ন্দিা ও গর্ব) বিষয়ক কবিতায়। তবে অধিকাংশ বিষয়ে দুর্বলতা দেখিয়েছেন। বিশেষতঃ রাসূলের (সা) প্রশংসায় রচিত কবিতায় ও তাঁর প্রতি নিবেদিত শোকগাঁথায়। তবে ঐতিহাসিক তথ্যের দিক দিয়ে এ সকল কবিতা অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ইসলামী কবিতায় এমন সব নতুন ষ্টাইল দেখঅ যায় যা জাহিলী কবিতায় ছিল না। ইসলামী আমলে হাস্সান একজন কবি ও ঐতিহাসিক এবং একই সাথে একজন সংস্কারবাদী কবিও বটে। রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক কবিদের পুরোধা।’৯৩

একবার কবি কা’ব ইবন যুহাইর একটি শ্লোকে গর্ব করে বলেনঃ কা’বের মৃত্যুর পর কবিতার ছন্দ ও অন্তমিলের কি দশা হবে? শ্লোকটি শোনার সাথে সাথে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত কিব সাম্মাখের ভাই তোমরূয বলে উঠলেন: আপনি অবশ্যই সাবিতের ছেলে তীক্ষ্মধী হাস্সানের মত কবি নন।৯৪ যাই হোক, তিনি যে একজন বড় মাপের কবি ছিলেন তা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য।

হাস্সানের (রা) সকল কবিতা বহুদিত যাবত মানুষের মুখে মুখে ও অন্তরে সংরক্সিত ছিল। পরে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়। ত৭ার কবিতার একটি দিওয়ান আছে যা ইবন হাবীব বর্ণনা করেছেন। তবে এতে সংকলিত বহু কবিতা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। ইমাম আল-আসমা’ঈ একবার বললেন: হাস্সান একজন খুব বড় কবি। একথা শুনে আবু হাতেম বললেন: কিন্তু তাঁর অনেক কবিতা খুব দুর্বল। আল-আসামা’ঈ বললেন: তাঁর প্রতি আরোপিত অনেক কবিতাই তাঁর নয়।৯৫ ইবন সাল্লাম আল-জামিহী বলেন: হাস্সানের মানবস্পন্ন কবিতা অনেক। যেহেতু তিনি কুরাইশদের বিরুদ্ধে প্রচুর কবিতা লিখেছেন, এ কারণে পরবর্তীকালে বহু নিম্নমানের কবিতা তাঁর প্রতি আরোপ করা হয়েছে। মূলতঃ তিনি সেসব কবিতার রচয়িতা নন।৯৬

হাস্সানের (রা) নামে যাঁরা বানোয়াট কবিতা বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন প্রখ্রাত সীরাত বিশেষঞ্জ মুহাম্মদ ইবন ইসহাক। তিনি তাঁর মাগাযীতে হাস্সানের (রা) প্রতি আরোপিত বহু বানোয়াট কবিতা সংকরন করেছেন। পরবর্তীকালে ইবন হিশাম যখন ইবন ইসহাকের মাগাযীর আলোকে তাঁর আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ সংকলন করেন তখন বিষয়টি তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। তখন তিনি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রাচীন আরবী কবিতার তৎকালীন পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞদের, বিশেষতঃ বসরার বিখ্যাত রাবী ও ভাষাবিদ আবু যায়িদ আল-আনসারীর শরণাপন্ন হয়। তিনি ইবন ইসহাক বর্ণিত হাস্সানের কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন, আর তার কিছু সঠিক বলে মত দিতেন, আর কিছু তাঁর নয় বলে মত দিতেন। এই পন্ডিতরা যে সকল কবিতা হাস্সানের নয় বলে মত দিয়েছেন তাঁরও কিচু কবিতা ইবন হাবীব বর্ণনা করেছেন। আর তা দিওয়ানেও সংকলিত হয়েছে।।৯৭

প্রকৃতপক্ষে হাস্সানের (রা) ইসলামী কবিতায় যথেষ্ট প্রক্ষেপণ হয়েছে। এ কারণে দেখা যায় তাঁর প্রতি আরোপিত কিচু কবিতা খুবই দুর্বল। মূলতঃ এ সব কবিতা তাঁর নয়। আর এই দুর্বলতা দেখেই আল-আসমা’ঈর মত পণ্ডিতও মন্তব্য করেছে যে, হাস্সানের ইসলামী কবিতা দারুণ দুর্বল।

হাস্সানের (রা) কবিতার একটি দিওয়ান ভারত ও তিউনিসিয়া থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে সেটি ১৯১০ সনে প্রফেসর গীব মেমোরিয়াল সিরিজ হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশ পায়। লন্ড, বার্লিন, প্যারিস ও সেন্টপিটার্সবুর্গে দিওয়ানটির প্রাচীন হন্তলিখিত কপি সংরক্ষিত আছে।৯৮

শেষ জীবনে একবার হাস্সান (রা) গভীর রাতে একটি অনুপম কবিতা রচনা করে। সাথে সাথে তিনি ফারে’ দুর্গের ওপর উটে চিৎকার দিয়ে নিজ গোত্র বনু ক্বায়লার লোকদের তাঁর কাছে সমবেত হওয়ার আহবান জানান। লোকেরা সমবেত হলে তিনি তাদের সামনে কবিতাটি পাঠ করে বলেন: আমি এই যে কাসীদাটি রচনা করেছি, এমন কবিতা আরবের কোন কবি কখনও রচনা করেননি। লোকেরা প্রশ্ন করলো: আপনি কি একথা বলার জন্যই আমাদেরকে ডেকেছেন? তিনি বললেন: আমার ভয় হলো, আমি হয়তো এ রাতেই মারা যেতে পারি। আর সে ক্ষেত্রে তোমরা আমার এ কবিতাটি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে।৯৯

আল-আসামা’ঈ বর্ণনা করেছেন: সেকালে ছোট মঞ্চের ওপর গানের আসর বসতো। সেখানে বর্তমান সময়ের মত অশ্লীর কোন কিছু হতো না। বনী নাবীতে এরকম একটি বিনোদনের আসর বসতো। বার্দ্ধক্যে হাস্সান (রা) যখন অন্ধ হয়ে যান তখন তিনি এবং তাঁর ছেলে এ আসরে উপস্থিত হতেন। একদিন দুইজন গায়িকা তাঁর জাহিলী আমলে রচিত একটি গানে কষ্ঠ দিয়ে গাইতে থাকলে তিনি কছাদতে শুরু করেন। তখন তাঁর ছেলে গায়িকাদ্বয়কে বরতে থাকেন: আরো গাও, আরো গাও।১০০ তাঁর মানসপটে তখন অতীত জীবনের স্মৃতি ভেসে উঠেছিল।

হাস্সানের (রা) মধ্যে স্বভাবগত ভীরুতা থাকলেও নৈতিক হাসহ ছিল অপরিসীম। একবার খলীফা উমার (লা) মসজিদে নব্বীর পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। দেখলেন, হাস্সান মসিজিদে কবিতা আবৃত্তি করছেন। ‘উমার বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) মসজিদে কবিতা পাঠ? হাস্সান গর্জে উঠলেন: উমার! আমি আপনাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তির উপস্থিতিতে এখানে কবিতা আবৃত্তি করেছি। ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয়ে সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের সূত্রে হাসীদসটি বর্ণনা করেছেন। উমার (রা) বললেন: সত্য বলেছো।১০১

হাস্সান (রা) ইলমান-পূর্ব জীবনে মদ পান করতেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহনের পর মদ চিরদিনের জন্য পরিহার করেন। একবার তিনি তাঁর গোত্রের কতিপয় তরুণকে মদপান করতে দেখে ভীষণ ক্ষেপে যান। তখন তরুণরা তাঁর একটি চরণ আবৃত্তি কলে বলে, আমরা তো আপনাকেই অনুসরণ করছি। তিনি বললেন, এটা আমার ইসলাম-পূর্ব জীবনের কবিতা। আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহনের পর আমি মদ স্পর্শ করিনি।১০২

হাস্সানের মধ্যে আমরা খোদাভীতির চরম রূপ প্রত্যক্ষ করি। কুর্শা কবিদের সংগে যখন তাঁর প্রচন্ড বাক্যুদ্ধ চলছে, তখন কবিদের নিন্দায় নাযিল হলো সূরা আশ-শু’য়ারার ২২৪ নং আয়াত। রাসূলুল্লাহর (সা) তিন কবি হাস্সান, কা’ব ও আবদুল্লাহ কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ আয়াতের আওতায় তো আমরাও পড়েছি। আমারও তো কাব্য চর্চা করি। আমাদের কি দশা হবে? তখন রাসূল (সা) তাঁদেরকে আয়াতটির শেষাংশ অর্থাৎ ব্যতিক্রমী অংশটুকু পাঠ করে বলেন, এ হচ্ছো তোমরা।১০৩

হাস্সান (রা) সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারের কবি ছিলেন। তিনি মসজিদে নববীতে রাসূলকে (সা) স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। এ ছিল এক বড় গৌরবের বিষয়। তাঁকে যথার্থই ‘শায়িরুল ইসলাম’ ও শায়িরুল রাসূল’ উপাধি দান করা হয়েছিল। ইসলাম গ্রহনের পর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর পাশে থেকে কুরাইশ, ইহুদী ও আরব পৌত্তলিকদের প্রতি বিষাক্ত তীরের ফলার ন্যায় কথামালা ছুড়ে মেরে আল্লাহর রাসূলের (সা) মর্যাদা ক্ষা ও সমুন্নত করেছেন।

রাসূলে কারীম (সা) যখন যুদ্ধে যেতেন তখন তাঁর সহধর্মীগণকে হাস্সান (রা) তাঁর সুরক্ষিত ‘ফারে’ দুর্গের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে রাসূল (সা) তাঁকে গণীমতের অংম দিতেন। এমন কি উম্মুল মুমিনীন মারিয়্যা আল-কিবতিয়্যার বোন সীরীনকেও (রা) তুলে দেন হাস্সানের হাতে। খুলাফায়ে রাশেদীনের দরবারেও ছিল তাঁর বিশেষ মর্যাদা। খলীফাগণ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলতেন এবং তাঁর জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেন। এভাবে একটি একটি করে হাস্সানের (রা) সম্মান ও মর্যাদার বিষয়গুলি গণনা করলে দীর্ঘ তালিকা তৈরী হবে।

তথ্যসূত্রে:

 

আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা)

আবদুল্লাহ (রা) নদীনার বিখ্যাত ইহুদী গোত্র বনু কায়নুকার সন্তান। তাঁর বংশধারা উপরের দিকে ইউসুফ আলাইহিস সালামে গিয়ে মিলিত হয়েছে।১ তাঁর উপনাম দুইটি: আবু ইউসুফ ও আবুল হারেস। পিতার নাম সালাম ইবন হারেস। মদীনার খাযরাজ গোত্রের একটি শাখা বনুাউফ। এই বনু ‘আউফের একটি  উপ-শাখার নাম ‘কাওয়াকিল’। আবদুল্লাহ আবন সালাম প্রাচীন জাহিলী আরবের রেওয়ান অনুযায়ী এই কাওয়াকিল গোত্রের হানীফ বা চুক্তিবদ্ধ বন্ধু ছিলেন। পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিতে পরিণত হন।২ ইসলাম পূর্ব জাহিলী আমলে তাঁর নাম ছিল ‘হুসাইন’। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) নামটি পরিবর্তন করে আবদুল্লাহ রাখেন।৩

আবদুল্লাহ ইবন সালামের (রা) ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি হাদীস ও সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কেত বিভিন্ন বর্ণনায় যে কথাগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাহলো, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি একজান ড় ইহুদী ধর্মগুরু হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাওরাতে রাসূলুল্লাহর (সা) আগমন কাল ও তাঁর পরিচয় সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তা তাঁর জানা ছিল। অনেকের মত তিনিও শেষ নবীর প্রতীক্ষায় ছিলেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় এসে সর্বপ্রথম কুবার বনু আমর ইবন আউফ গোত্রে যখন ওঠেন তখন তিনি একটি খেজুর গাছের মাথায়। এক ব্যক্তি তাঁকে রাসূলের (সা) আগমন খবর দিলে তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে তাঁর সাথে প্রথস সাক্ষাৎ করেন এবং প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারেন তিনি নবী। তারপর রাসূল (সা) যখন মদূনার মূল ভুখণ্ডে এসে আবু আইউব আল-আনসারীর গৃহে অবস্থান গ্রহণ কনের তখন আবদুলÍাহ আবার আসেন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে। এই সাক্ষাতে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর অনেক কথা হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় নানা ভাবে এ সব কথা এসেছে।৪ এখানে আমরা কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরছি।

আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলতেন: আমার পিতার নিকট আমি তাওরাতের পাঠ ও ব্যাখ্যা শিখেছিরাম। একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) পরিচয়, নিদর্শন, গুণাবলী ও তাঁর কর্মকাণ্ডসম্পর্কিত একটি আয়াত তিনি পড়ালেন। তারপর বললেন: তিনি যদি হারূনের বংশধর হন তাহলে তাঁর ানুসরণ করবে, অন্যথায় নয়। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাতের পূর্বে মারা যান।

অতঃপর একদিন রাসূল (সা) মদীনায় আসলেন। আমি তখন বাগানে খেজুর পাড়ছিলাম আর আমার ফুফু খালেদা বিনতুল হারেস খেজুর কুড়াচ্ছিরেন। এই সময় ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলতে লাগলো: আরবের অধিকারী ব্যক্তি আজ এসে গেছেন। একথা শুনে আমি কাঁপতে শুরু করলাম এবং জোরে তাকবীর দিলাম। আমার বৃদ্ধা ফুফু আমার এ অবস্থা দেখে বললেন: ওরে খবীছ, তোমার যা হাল হয়েছে, মুসা ইবন ইমরানও যদি আসতেন তাহলেও এর চেয়ে বেশী হতোনা। আমি বললাম: ফুফু! তিনি মুসারই ভাই এবং তাঁরই দ্বীনের ওপর আছেন। তিনি যা নিয়ে এসেছিলেন ইনিও তাই নিয়ে আসেছেন।

আমি গাছ থেকে নেমে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গেলাম। তাঁর অবয়ব প্রত্যক্ষ করলাম এবং তাঁকে চিনলাম। আমি তাঁকে আমার পিতার কথা বললাম। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। পরে আমার ফুফুও ইসলাম গ্রহণ করেন।৫

আবদুল্লাহ ইবন সালাম আরো বলেন: রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় পদার্পণ করলে মানুষ তাঁর কাছে ভীড় করলো। আমিও গেলাম। আমি দেখেই বুঝলাম এই চেহারা কোন ভণ্ড-মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি তাঁর মুখ থেকে সর্বপ্রথম এই কথাগুলি শুনলাম: ‘ওহে জনমণ্ডলী! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, মানুষকে আহার করাও, আত্মীয়তার সম্পর্কে অক্ষুণœ রাখ এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়থÑতাহলে নির্বিঘেœ জান্নাতে প্রবেশ করবে।’৬

রাসূলুল্লাহর (সা) মক্কা থেকে কুবা পৌঁছার পর আবদুল্লাহ ইবন সালামের প্রথম যে সাক্ষাৎ হয় উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা সম্ভবত সেই সাক্ষাতের কথা বলেছেন। রাসূল (সা) তিনদিন কুবায় বিশ্যাম নেওয়ার পর মদীনার মূল ভূখণ্ডের দিকে যাত্রা করেন। পথে সকলেরর অনুরোধ-উপরোধ উপেক্ষা করে আবু আইউব আল-আনসারীর গৃহে অবস্থান গ্রহণ  করেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম এ সময় আবার রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হন। আর এ সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছেন আনাস (রা)।

আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার পর আবদুল্লাহ ইবন সারাম সাক্ষাৎ করতে আসেন। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সা) লক্ষ্য করে বলেন: আমি আপনাকে এমন তিনটি প্রশ্ন করতে চাই যার উত্তর কেবল নবীরাই জানেন।৭

ক) কিয়ামতের প্রথম আলামত বা নিদর্শন কি?

খ) জান্নাতের অধিবাসীদের প্রথম খাবার কি?

গ) সন্তান পিতা অথবা মাতার সদৃশ হয় কেন?

রাসূল (সা) বললেন: এই মাত্র জিবরীল কথাগুলি আমাকে বলে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন: ফিরিশতাদের মধ্যে এই জিবরীলই তো ইহুদীদের দুশমন। রাসূল (সা) বললেন: কিয়ামতের প্রথম আলামত হলো, পূর্ব থেকে একটি আগুন বের হবে এবং মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে পশ্চিমে সমবেত করবে। জান্নাাতের অধিবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তানের পিতা-মাতার সাদৃশ্যের কারণ হলো, পুরুষের পানি আগে বের হলে সন্তান তার দিকে ঝুঁকবে, আর স্ত্রীর পানি আগে বের হলে সন্তান তাঁর দিকে। এ জবাব শুনে আবদুল্লাহ বললেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল।

এরপর আবুদল্লাহ ইবন সালাম বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহুদীরা একটি মিথ্যাবাদী সম্প্রদায়। আমি একজন আলিম (জ্ঞানী) পিতার আলিম সন্তান। তেমনিভাবে একজন রয়িস (নেতা) পিতার রয়িস সন্তান। আপনি ইহুদীদের ডেকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। তবে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা তাদের কাছে গোপন রাখবেন। তাঁর কথা মত রাসূল (সা) ইহুদীদের ডেকে তাদের সামনে ইসলামের দা’ওয়াতে পেশ করলেন। এক পর্যায়ে তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: তোমাদের মধ্রে আবদুল্লাহ ইবন সারাম কে? তারা বললো: তিনি তো আমাদের প্রাক্তন রয়িসের ছেলে বর্তমান রয়িস। ‘আলিম পিতার আলিম সন্তান। রাসূল (সা) বললেন: আচ্ছা, তিনি কি ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন? তারা বললো: কক্ষণো না।

এদেিক আবুদল্লাহ ইবন সালাম তখন ঘরের এক কোণে লুকিয়ে আছেন। রাসূল (সা) তাঁকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত কররেন। তিনি কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ করতে করতে বেরিয়ে এসে ইহুদী সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা আল্লাহকে একটু ভয় কর। তোমরা ভালো করেই জান এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর দ্বীন সত্য।

তাঁর আবেদন সত্ত্বেও ইহুদীরা ঈমান আনলো ন। বরং এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে তারা যে অপমানিত হলো তাতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তারা আবদুল্লাহলকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলো: তুমি একজন ভণ্ড, মিথ্যাবাদী ও বিশ্বাসঘাতক। তুমি আমাদের সম্প্রদায়ের একজন নিকৃষ্টতম ব্যক্তি। তোমার বাবাও ছিল একজন ইতর।

আবদুল্লাহ তখন বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি দেখলেন তো। আমি এরই ভয় পাচ্ছিলাম।৮ যখন ইহুদীরা রাসূলুল্লাহর (সা) দা’ওয়াতে প্রত্যাখ্রান করে চলে গেল তণ পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহক্বাফের দশম আয়াতটি নাযিল হলো।৯

আবদুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে ভিন্নমতও আছে। ইমাম শা’বী থেকে বির্ণত হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহর ওফাতের দুই বছর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন।১০ ইমাম জাহাবী বলেন, এ একটি ব্যতিক্রমী ও প্রত্যাখ্রাত বর্ণনা। কারণ, সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাত ও মদীনায় আগমনের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন।১১ ইবন সা’দ বলেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমেরন পর প্রথমভাগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইহুদীদের একজন ‘হাব্র বা ধর্মগুরু।১২

বদর ও উহুদ যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবন সালামের যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মত পার্থক্য আছে ইবন সা’দের মতে তিনি সর্বপ্রথম খন্দক যুদ্ধে যোগদান করেন। এ কারনে তাঁকে সাহাবীদের তৃতীয় তাবকা (স্তর) খন্দকের যোদ্ধাদের সাথে উল্লেখ করেছেন। খন্দকের পর থেকে সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।

খলীফা উমারের (রা) বাইতুল মাকদাস সফরকালে তিনি সফরসঙ্গী ছিলেন। আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, বায়তুল মাকদাস ও জাবিয়া বিজয়ের তিনি অন্যতম অংশীদার ছিলেন।১৩

বিদ্রোহীরা যখন খলীফা উসমানকে (রা) গৃহে অবরুদ্ধ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে তখন সেই দুর্যোগময় মমুহূর্তে তিনি একদিন সাক্ষাৎ করে বলেন: আমরা সাহায্যের জন্য প্রস্তুত। এখন এভাবে আপনার ঘরে বসে থাকা ঠিক হবে না। বাইরে যেয়ে সমবেত জনতাকে বিক্ষিপ্ত করে দিন। এ কথ বলে আবদুল্লাহ নিজেই জনতার সামনে এসে একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। বাষণটি বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তার সারাংশ নিম্নরূপ:

“ওহে জনমণ্ডলী জাহিলী ’আমলে আমার নাম ছিল হুসাইন। রাসূলুল্লাহ আমার নাম দেন আবদুল্লাহ। কুরআন পাকের এ আয়াতগুলি আমার সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।

১)আর বনী ইসরাঈলের একজন সাক্ষী এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে এতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, আর তোমরা অহঙ্কার করছো। (সূরা আল-আহক্বাফ-১০)

২)কাফেররা বলে: আপনি রাসূল নন। বলে দিনঃ আমার ও তোমাদের মধ্যে প্রকৃষ্ট সাক্ষী হচ্ছেন আল্লাহ এবং ঐ ব্যক্তি, যার কাছে (আসমানী) গ্রন্থের জ্ঞান আছে। (সূরা রা’দ-৪৩)

আল্লাহর তরবারি এখন পর্যন্ত কোষবদ্ধ আছে এবং আপনাদের এই শহর- রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাত স্থলকে ফিরিশতারা তাদের আবাসভূমি বানিয়ে রেখেছেন। অতএব আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। তাঁকে (উসমানকে) হত্যা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহর কসম! যদি আপনারা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন তাহলে আপনাদের প্রতিবেশী ফিরিশতাগণ মদীনরা ত্যাগ করবেন। আর এখন পর্যন্ত যে তরবারি কেষবদ্ধ আছে তা বেরিয়ে পড়বে এবং কিয়াতম পর্যন্ত তা আর কোষবদ্ধ হবে না।”

তাঁর এ ভাষণ কঠোর হৃদয় বিদ্রোহীদের ওপর কোন প্রভাব ফেরতে পারলো না। বরং এর উল্টো ফর দেখা দিল। তাদের দুভৃাগ্য ও হঠকারিতা আরো বেড়ে গেল। তারা বললোঃ “এই ইহুদী ও উসমান-দুই জনকেই হত্যা কর।”১৪

অন্য একটি বণৃনায় এসেছে। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলেন: ‘উসমান যখন গৃহবন্দী তখন আমি একদিন তাঁকে সালাম জানাতে গেলাম। আমি ত৭ার গৃহে প্রবশে করতেই তিনি বললেন: আমার ভাই স্বাগতম! গত রাতে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) এই জানালা দিয়ে দেখেছি। তিনি বললেন: উসমান! তোমাকে তারা অবরুদ্ধ করেছে? বললাম: হাঁ। বরলেন: তোমাকে তারা তৃষ্ণার্ত রেখেছে? বললাম: হ্যাঁ। তারপর তিনি আমাকে একটি পানিভর্তি বালতি দিলেন। আমি পান করে পিপাসা নিবারণ করলোম। তিনি আমাকে বললেন: তুমি চাইলে তাঁদের বিরুদ্ধে তোমাকে বিজয়ী করবো। আর ইচ্ছা করলে আজ আমার সাথে ইফতার করতে পার। আমি তাঁর সাথে ইফতার করাকে বেছে নিয়েছি। তিনি সেই দিন নিহত হন।১৫

খলীফা আলী (রা) মদীনার পরিবর্তে কুফাকে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নিলে আবুদল্লাহ তাঁকে বলেন, “আপনি মদীনার মসজিদে রাসূলুল্লাহর (সা) মিম্বর ত্যাগ করবেন না। এটা ত্যাগ করলে আর কখনও তা যিয়ারত করতে পারবেন নরা।” আলী (রা) তখন মন্তব্য করেন “বেবচারা বড় সরল ও সৎ মানুষ।১৬

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। আলী (রা) বলেন: আমি ঘোড়ার পিঠে উঠার জন্য যখন জিনে পা রাখছি ঠিক সেই সশয় আবুদল্লাহ ইবন সালাম আমার কাছে এসে বলেন: কোথায় যাচ্ছেন? বললামঃ ইরাক। বললেন: সেখানে গেলে আপনি তরবারির ধার লাভ করবেন। বলালম ৎ আমি আগেই একথাটি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি।১৭

খলীফা আলী ও আলীর মু’য়াবিয়ার (রা) ঝগড়া ও বিবাদে তিনি জড়াননি। একটি কাঠের তৈরী তরবারি সঙ্গে নিয়ে এ বিবাদ থেকে সযতেœ দূরে থাকেন।১৮

সকল সীরাত বিশেষজ্ঞ একমত যে, তিনি আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৪৩ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন।১৯ তিনি দুই ছেলে রেখে যান। ত৭াদের নাম ইউসুফ ও মুহাম্মদ। উভয়ের জন্ম হয় রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায়। ইউসুফ ছিলেন বড়। তাঁর জন্মের পর রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে কোলে নেন, মাথায হাত রাখেন এবং ইউসুফ নাম রাখেন।২০

আবদুল্লাহর দৈনিক পঠনের তেমন বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে একথা জানা যায় যে, বার্দ্ধক্যে দুর্বলতার দরুন লাঠি নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং প্রয়োজনে তাতে ঠেস দিতেন।২১ মুখমণ্ডলে খোদাভীতির ছাপ সর্বদা প্রতিভাত হতো।২২

আবদুল্লাহর (রা) বুকটি ভরা ছিল তাওরাত, ইনজীল, কুরআন মাজীদ ও হাদীসে নববীর জ্ঞানে। তাওরাতে তাঁর সীমাহীন পারদর্শিতা সম্পর্কে আল্লামাহ জাহাবী লিখেছেন:২৩

“আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাঁর সময়ে মদীনায় আহলি কিতাবদের সবচেয়ে বড় ‘আলিম ছিলেন।”

ইসলাম গ্রহণের পর কুরআন ও হাদীসের প্রতি মনোযোগ দেন এবং এর জ্ঞানে সকলের আস্থা ভাজনে পরিণত হন। এর চেয়ে মর্যাদার বিয়ষ আর কি হতে পারে যে, আবু হুরাইরাহÑযিনি সাহাবীদের মধ্যে হাদীসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী পারদর্শী ছিলেন, তিনিও আবদুল্লাহর নিকট হাদীস জিজ্ঞেস করতেন। একবার আবু হুরাইরাহ গেছেন শামে। সেখানে তিনি কা’ব ইবন আহ্বারের নিকট এই হাদীসটি বর্ণনা করেন: ‘জুম’আর দিন এমন একটি মুহুর্তে আছে তখন যদি কোন বান্দাহ আল্লাহ নিকট কিচু চায় তাহলে তিনি অবশ্যই তা তাকে দান করেন।’ হাদীসটি শোনার পর কা’ব কিছুটা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকেন। তারপর অবম্য আবু হুরাইরার বর্ণনার সাথে একমত পোষণ করেন।

এদিকে তিনি (আবু হুরাইরাহ) মদীনায় পিরে এসে আবুদল্লাহ ইবন সালামের নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তিনি শুনে মন্তব্য করেন: কা’ব মিথ্য বলেছে। তখন আবু হুরাইরাহ বলরেন: শেষে তিনি আমার কথা মেনে নিয়েছেন। আবদুল্লাহ বললেন: আপনি কি জানেন সেটা কোন সময়? এ প্রশ্ন শুনে আবু হুরাইরাহ তাঁর পিছু নিলেন এবং সময়টি বলার জন্য ত৭াকে ানুরোধ করতে লাগলেন। তখন আবুদল্লাহ বললেন: আসর ও মাগরিবের মাঝখানের সময়। আবু হুরাইরাহ বললেন: আসর ও মাগরিবের মাঝখানে তো কোন নামায নেই। এ কেমন করে হয়? আবদুল্লাহ বললেন: আপনার হয়তো জানা নেই যে, রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি নামাযের প্রতীক্ষায় বসে থাকে সে যেন নামাযের মধ্যেই থাকে।২৪

হাদীসে এম পারদর্শিতা সত্ত্বেও তাঁর থেকে মাত্র পাঁচিশটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।২৫ তাঁর মুখ থেকে হাদীস শুনে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে অনেক সাহাবী আছেন যেমন: আনাস ইবন মালিক, যুরারাহ ইবন আওফা, আবু হুরাইরাহ, আবদুল্লাহ ইবন মা’কিল, আবদুল্লাহ ইবন হানজালা প্রমুখ। এছাড়া ত৭ার বিশেষ কয়েকজন ছাত্রের নামঃ খারাশা ইবন আল-হুর, কায়স ইবন উবাদ, আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান, হামযাহ ইবন ইউসুফ (পৌত্র), উমার ইবন মুহাম্মদ (পৌত্র), আওফ ইবন মালিক, আবু বুরাদাহ্ ইবন আবী মুসা, আবু সা’ঈদ আল-মুকরী, উবাদাহ্ আয-যারকী, আতা ইবন ইয়াসার, উবাইদুল্লাহ ইবন জায়শ আল-গিফারী, যুররাহ্ ইবন আওফা, ইউসুফ ও মুহাম্মদ (দুই পুত্র)।২৬

সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে আবুদল্লাহ ইবন সালামের সম্মান ও মর্যাদা ছিল অতি উঁচুতে। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট আলিম সাহাবীদের অন্যতম। বিখ্যাত সাহাবী মু’য়াজ ইবন জাবালের অন্তিম সময় যখন ঘনিয়ে এলা তখন তাঁকে বলা হলো, আমাদেরকে কিছু উপদেরশ দিন। বললেন: আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি। তবে আমার সাথে ইলম বা জ্ঞান উঠে যাচ্ছে না। যে ব্যক্তি তা তালাশ করবে, সে লাভ করবে। তোমরা আবুদ দারদা, সালামান আল-ফারেসী, আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ ও আবদুল্লাহ ইবন সালামের নিকট ইলম (জ্ঞান) তালাশ করবে। আবদুল্লাহ ছিলেন ইহুদী। পরে মুসলমান হন। আমি রাসূলুল্লাহর (সা) তাঁর সম্পর্কে বলতে শুনেছি: সে দশম জান্নাতী ব্যক্তি।২৭

সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) বলেছেন। আমি একমাত্র আবদুলÍাহ ইবন সালাম ছাড়া পৃথিবীতে বিচরণকারী কোন ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে (সা) একথা বলতে শুনিনি: সে একজন জান্নাতের অধিকারী ব্যক্তি। তাঁরই সম্পর্কে নাযিল হয়েছে সূরা আল-আহক্বাফের ১০ নংয় আয়াতটি।২৮

মুস’য়াব ইবন সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস তাঁর পিতা সা’দ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এক পেয়ালা সারীদ’ আনা হলো। তিনি খাওয়ার পর কিচু অবশিষ্ট থাকলো। রাসূল (সা) বললেন: এই ফাঁক দিয়ে একজন জান্নাতী ব্যক্তি প্রবেশ করবে এবঙ এই এঁটেটুকু খেয়ে ফেলবে। সা’দ বলেন: আমি আমার ভাই উমাইরকে ওজু করতে পাঠিয়েছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম, সে এসে এঁটেটুকু খেয়ে ফেলুক। কিন্তু তাঁর আগেই আবদুল্লাহ ইবন সালাম এসে তা খেয়ে ফেলে।২৯

আবদুল্লাহ এত বড় মর্যদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও খুবই বিনয়ী ছিলেন। কেউ ত৭ার সামান্য প্রশংসা করলে ক্ষেপে যেতেন। কায়স ইবন উবাদ বলেন: আমি মদীনার মসজিদে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আসলেন, যাঁর চেহারায় খোদাভীতির ছাপ দ্যিমান ছিল। লোকেরা হললোঃ ইনি একজন  জান্নাতী ব্যক্তি। এরপর তিনি দুই রাকা’য়াত সংক্ষিপ্ত নামায আদায় করলেন। তিনি যখন মসজিদে থেকে বের হলেন, আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। তিনি তাঁর ঘরে ঢুকলেন, আমিও পিছনে পিছনে ঢুকলাম। আমি তাঁর সাথে কথা বলে পরিচিত হওয়ার পর বললাম: আপনি যখন মসজিদে প্রবশ করেন তখন লোকেরা এমন এমন কথা বলাবলি করছিল। তিনি বললেনঃ সুবহানাল্লাহ! কোন মানুষের এমন কথা বলা উচিত নয় যা সে জানেনা। আমি তোমাকে বলছি: আমি একটি স্বপ্ন দেখে রাসূলুল্লাহকে (সা) বললাম। স্বপ্নটি এরূর: আমি যেন একটি সবুজ উদ্যান দেখতে পেলাম। যার মঝখানে রয়েছে একটি লোহার খুঁটি। খুুঁটির গোড়া মাটিতে এবং আগা আকাশে। আগায় একটি রশি বাঁধা। আমাকে বলা হলো: খুঁটি বেয়ে উপরে ওঠো। আমি উঠে রশি ধরলাম। তখন আমাকে বলা হলো: শক্তভাবে আঁকড়ে থাক। রশিটি আমার হাতে াকা অস্থায় আমি ঘুম েেক জেগে উঠি। সকালে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে স্বপ্নটি বর্ণনা করলাম। রাসূল (সা) বললেন: উদ্যানটি হলো ইসলামের উদ্যান, আর খুঁটি হলো ইসলামের খুঁটি। আর রশি হলো ইসলামের রশি। তুমি আমরণ ইসলামের ওপর থাক।ে বর্ণনাকারী কায়স বলেন: সেই লোকটি হলেন আবদুল্লাহ ইবন সালাম।৩০

খারাশা ইবনুল হুর স্বপ্নটি একটু ভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন।৩১ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর স্বপ্নের বিবরণ শুনে বলেন: ইসরামের শক্ত রশি আঁকড়ে থাকা অবস্থায় তোমার মৃত্যু হবে।৩২

আবদুল্লাহর (রা) বিনয়ের আরো বহু ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। একবার তিনি লাকড়ীর একটি বোঝা মাথায় করে চলেছেন। তা দেখে লোকেরা তাঁকে বললো: এমন কাজ করা থেকে আল্লাহ আপনাকে রেহাই দিয়েছেন। তিনি বললেন: হাঁ, ঠিক। তবে আমি এ কাজের মাধ্যমে আমার অহঙ্কার ও আভিজাত্য চুরমার করতে পাই। কারণ আমি রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছি: যার অন্তরে একটি সরিষার দানা পরিমাণ ‘কিবর’ বা অহঙ্কার থাকবে সে জান্নাতে প্রবশে করবে না।৩৩

আবদুলালাহর (রা) মধ্রে সত্য ও সততার সীমাহীন আবেগ ও শক্তি ছিল। শেষ জীবনে তিনি বলতেন, তোমাদের যদি আর একবার কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ বেঁধে যায়, আর সে সময় যদি আমার মধ্যে শক্তি না থাকে তাহলে একটি চৌকির ওপর আমাকে বসিয়ে দুই পক্ষের মাঝখানে রেখে দেবে।৩৪

আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একবার সালমান আল-ফারেসী (রা) তাঁকে বললেন: ভাই! আমাদের দুইজনের মধ্যে যে আগে মারা যাব তাকে স্বপ্নে দেখার চেষ্টা করবো যে জীবিত থাকবো। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন: এটা কি সম্ভব? সালমান বললেণ: হ্যাঁ, সম্ভব। ঈমানদার ব্যক্তির রূহ মুক্ত থাকে। পৃথিবীর যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে। আর কাফির ব্যক্তির রূহ থাকে বন্দী। সালমান মারা গেলেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বলেন: একদিন আমি মধ্যরাতে ঘুমিয়ে পড়েছি। সালমান এসে আমাকে সালাম দিলেন। আমি সালামের জবাব দিয়ে বললাম: আবু আবদিল্লাহ! আপনি আপনার বাসস্থান কেমন পেয়েছেন? বললেন: ভালো। আপনি তাওয়াককুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা) আঁকড়ে াকবেন। তাওয়াককুল খুব ভালো জিনিস। একাটি তিনি তিনবার বললেন। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছ। আবুদলÍাহ প্রশ্ন করলেন: আপনি কোন আমলটি সবচেয়ে ভালো পেয়েছেন? বললেন: তাওয়াককুলকে আমি বিস্ময়কর জিনিস হিসেবে পেয়েছি।৩৫

আবু বুরদাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন: একবার আমি মদীনায় গিয়ে আবদুল্লাহ ইবন সালামের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন: তুমি কি আমার বাড়ীতে যাবে না? চল, তোমাকে ছাতু ও খোরমা খাওয়াবো। আমি গেলাম। তিনি আমাকে বললেন: দেখ, তোমরা এমন এক অঞ্চলে বাস কর যেখানে সুদ প্রচলিত। তোমার যদি কোন ব্যক্তির কাছে কিচু পাওনা থাকে, আর সে তোমাকে পশুর খাদ্র কিচু ভূষিও উপহার দেয়, তুমি তা নিবে না। কারণ তা সুদ হয়ে যাবে।৩৬ অন্য একটি বর্ণনায় ঘটনাটি একটু ভিন্নভাবে এসেছে।৩৭

আবুদল্লাহ ইবন সালামের (রা) শানে পবত্রি কুরআনের সূরা আল-আহক্বাফ ও সূরা আর-রাদ-এর যথাক্রমে ১০ নং ও ৪৩ নং আয়াত দুইটি ছাড়াও আরো দুইটি আয়তা নাযিল হয়েছে বলে কোন কোন মুফাসসির মত প্রকাশ করেছেন। ইবন ইসহাক ইবন আববাসের (রা) সূত্রে বণৃনা করেছেন। সূরা আলে ইমরানের ১১৩ ও ১১৪ নং আয়াত দুইটি আবদুল্লাহ ইবন সালাম ও সা’লাবা ইবন সা’ইয়ার প্রশংসায় নাযিল হয়েছে।৩৮ আল্লাহ তাঁদের প্রশংসায় বলেন:

তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সিজদা করে। তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়, অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হলো সৎকর্মশীল।

এভাবে স্বয়ং আল্লাহ পাক আবুদল্লাহ ইবন সালামের (রা) মর্যাদার সনদ দান করেছেন। তিনি কত মহান ব্যক্তি ছিলেন তা আল্লাহ তা’য়ালার এ ঘোষনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র:

 

সাহল ইবন সা’দ (রা)

তাঁর ভালো নাম সাহ্ল। ডাকনাম কয়েকটি। যেমন: আবুল ‘আব্বাস, আবু মালিক ও আবু ইয়াহইয়া। পিতার নাম সা’দ ইবন মালিক। মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনু সায়িদার সন্তান। একজন বিখ্যাত আনসারী সাহাবী। পিতা সা’দও সাহাবী ছিলেন।১

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের পাঁচ বছর পূর্বে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর পিতা নাম রাখেন ‘হুয্ন’। রাসূল (সা) মদীনায় আসার পর পরিবর্তন করে তাঁর নাম রাখেন ‘সাহল’। একথা ইবন বিব্বান বর্ণনা করেছেন।২ হিজরাতের পূর্বেই তাঁর পিতা সা’দ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং তিনি মুসরমান হিসেবেই বেড়ে ওঠেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মদীনা আগমনের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। হিজরী দ্বিতীয় সনে বদর যুদ্ধের সময় তিনি সাত বছরের এক বালক মাত্র। যুদ্ধে তোড়জোড় চলছে, এতমন সময় তার পিতা হযরত সা’দ ইনতিকাল করেন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। বদর যুদ্ধের পর রাসূল (সা) গনীমতের একটি অংশ তাঁর মরহুম পিতাকেও দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি বদর যুদ্ধে যোগদানের সংকল্পন করেছিলেন।

হিজরী তৃতীয় সনে উহুদ যুদ্ধের সময় তাঁর সম বয়সী ছেলেদের সাথে মিলে মদীনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীম (সা) আহত হয়ে রক্তরঞ্জিত হয়েছিলেন। যখন তাঁর সেই রক্ত সাফ করা হয়েছিল, তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।৩

হিজরী পঞ্চম সনে যখন খন্দক যুদ্ধ হয় তখন তিনি ধশ বছরের বালক মাত্র। তা সত্ত্বেও তীব্র আবেগ ও উৎসাহ ভরে খন্দক খননে অংশ নেন এবং কাঁধে করে মাটি বহন করেন।৪ মোট কথা হিজরী এগারো সনে রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের সময় তাঁর বয়স মাত্র। পনেরো বছর। তখনও তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার বয়স হয়নি।

খিলাফতে রাশেদার সময় কালের তাঁর জীবনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। হিজরী ৭৪ সনে স্বৈরাচারী ও উৎপীড়ক উমাইয়্যা শাসক হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের রোষানলে পড়েন। হাজ্জাজ তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন: আপনি খলীফা উসমানকে সাহায্য করেননি কেন? তিনি বলেন: করেছি। হাজ্জাজ বলেন: সত্য বলছে না। এরপর তিনি অপমান ও লাঞ্ছনার প্রতীক স্বরূপ ত৭ার ঘাড়ে ছাপ মেরে দেওয়ার দির্নেশ দেণ। হাজ্জাজের এ অপকর্মের হাত থেকে হযরত আনাস ও জাবির ইবন আবদিল্লাহর মত মর্যাদাবান সাহাবীদ্বয়ও রেহাই পাননি। হাজ্জাজের এ কাজের উদ্দেশ্যে ছিল যাতে মানুষ তাঁদের থেকে দূরে াকে এবং তাঁদের কায় কান না দেয়।৫

ইমাম যুহরী বলেন: রাসূলুল্লাহর ইনতিকালের সময় সাহল ইবন সা’দের বয়স হয়েছিল ১৫ বছর। আর তিনি হিজরী ৯১ সনে মদীনায় মারা যান। ওয়াকিদীর মতে তিনি এক  শো বছর জীবন লাভ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন ছিয়ানব্বই বছর বা তার চেয়ে কিছু বেশী।৬ ইবন হাজারের মতে হিজরী ৮৮ সনে তিনি যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স ১০০ বছরের উর্দ্ধে।৭ ইবন আবী দাউদের ধারণা, তিনি ইসকান্দারিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। কাতাদা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মিসরে মারা যান। ইবন হাজার বলেন, এ সব ধাণণা মাত্র।৮ ওয়াকিদী বলেন: একথা বর্ণিত আছে যে, মদীনায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী জাবির ইবন আবদিল্লাহ। তবে সঠিক এই যে, জিরী ৯১ সনে সাহল ইবন সা’দ আস-সা’য়িদী মদীনায় মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী।৯ তাঁর জীবনের শেষ ভাগে মদীনায় আর কোন সাহাবী ছিলেন না। ইসলামী খিলাফতের অন্যান্য অঞ্চলও তখন সাহাবীদের বরকত থেকে প্রায় মাহরূম হয়ে পড়েছিল। তিনি নিজেই বলতেন: আমি মারা গেলে ‘কালার রাসূল (রাসূল বলেছেন) বলার কেউ থাকবে না।

হযরত সাহল ইবন সা’দ ছিলেন খ্যাতিমান সাহাবীদের একজন। বিশিষ্ট সাহাবীদের মুত্যুর পর তিনি জনগণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। অতি আবেগ ও উৎসাহের সাথে অগণিত মানুষ হাদীস শোনার জন্য তাঁর কাছে ভীড় জমাতো।

রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় যদিও তিনি অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন, বতুও বহু হাদীস শুনেছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালেরর পর হযরত উবাই ইবন কা’ব আসিম ইবন ‘আদী, ‘আমার ইবন আবাসা প্রমুখ খ্যামিান সাহাবীর নিকট থেকে এ শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। মারওয়ান যদিও সাহাবী ছিলেন না, তবুও তাঁর নিকট থেকে কিছু হাদীস তিনি গ্রহণ করেছেন।১০

সাহাবী ও তাবে’ঈদের অনেকেই তাঁর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তাঁদের বিশেষ কয়েকজনের মাত্র এখানে উল্লেখ করা হলো:

আবু হুরাইরা, ইবন আব্বাস, সা’ঈদ ইবন মুসায়্যিব, আবু হাযিম ইবন দাীনায, যুহরী, আবু সুহাইল সুবহী, ‘আব্বাস ইবন সাহল (ছেলে), ওয়াফা ইবন শুরাইহ হাদরামী, ইয়াহইয়া ইবন মায়মুন হাদরামী, আবদুল্লাহ ইবন আবদির রহমান ইবন আবী জুবাব, আমর ইবন জাবির হাদরামী প্রমুখ।১১

হরত সাহল ইবন সা’দ (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সর্বমোট ১৮৮ টি। তার মধ্যে ২৮টি মুত্তাফাক আলাইহি।১২

হযরত রাসূল কারীমকে (সা) তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিটি কাজ ও আচার-আচরণ অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। রাসূল (সা) একটি কাঠোর খুঁটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। একবার তিনি একটি মম্বরের কথা বললেন। হযরত সাহল সাথে সাথে জঙ্গলে চলে যান এবং মিম্বরের জন্য কাঠ কেটে নিয়ে আসেন।১৩ একবার তিনি নিজ হাতে রাসূলকে (সা) ‘বুদা’য়া’ কূপের পানি পান করিয়েছিলেন। একথা তিনি বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, এটা মদীনার একটি কূপ। মদীনাবাসীরা তাতে ময়লা-আবর্জনা ফেলতো। তবে কূপটি বড় ছিল এবং তাতে অনেক ঝর্ণা ছিল।১৪

সত্য বলা ছিল হযরত সাহলের (রা) চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তাঁর জীবদ্দশায় একবার মাওয়ান বংশের এক ব্যক্তি মদীনার আমীর হয়ে আসেন। তিনি হযরত সাহলকে (রা) ডেকে হযরত আলীকে (রা) গালি দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সেই শ্বৈরাচারী শাসকের নির্দেশ পালন করতে কঠোরভাবে অম্বীকার করেন। তখন সেই আমীর আদার করেন, অন্ততঃ এতটুকুই বলেন যে, ‘আবু তুরাবের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ জবাবে হযরত সাহল বলেনঃ আবু তুরাব ছিল আলীর প্রিয়তম নাম। রাসূল (সা) তাঁকে এ নামে ডেকে খুশী হতেন। এরপর তিনি আলীর (রা) আবু তুরাব নাম করণের ব্যাখ্যা করে শোনালে আমীর চুপ হয়ে যান।১৫

একবার সাহল ইবন সা’দ, আবু জার, ‘উবাদা ইবনুস সামিত, আবু সা’ঈদ আল-খুদরী, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা ও ষষ্ঠ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে একথার ওপর বাই’য়াত করেন যে, আলÍাহর ব্যাপারে তাঁরা কোন তিরষ্কারকারীর তিরস্কারের পরোয়া করবেন না।১৬ তাঁর জীবন-ইতহিাস একথা প্রমাণ করে যে, আমরণ তিনি এ বাই’য়াতের ওপর অটল ছিলেন।

তাঁর হাদীসের দারসের মজলিসে কেউ উদাসীন বা অমনোযোগী থাকলে তিনি ভীষণ ক্ষেপে যেতেন। এ ধরনের একটি ঘটনা তাবারানী তাঁর আল-কাবীর’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আবু হাসেম বলেন, একবার এক মজলিসে তিনি হাদীস শোনাচ্ছেন। শ্রোতাদের কেউ কেউ তখন নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছিল। িিন ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বললেন: এদেরকে দেখে রাখ। আমার দু’চোখ রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যা কিছু দেখেছে, দু’কান যা কিছু শুনেছে, আমি তাই এদের নিকট বর্ণনা করছি, আর এরা তা না কক্ষনো ফিরে আসবো না। আমি জানতে চাইলাম। কোথায় যাবেন? বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে যাব। বললাম: আপনার ওপর এখন তো আর জিহাদ ফরজ নয়। আপনি এখন ঘোড়ার ওপর বসতে পারেন না, তরবারি দিয়ে আঘাত করার শক্তি রাখেন না এবং তীর-বর্শাও ছুড়তে পারেন না।

বললেন: আবু হাসেম! আমি ময়দানে গিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে থাকবো। একটা অজানা তীর বা পাথর উড়ে এসে আমাকে আঘাত করবে এবং আল্লাাহ তাতেই আমাকে শাহাদাত দান করবেন।১৭

তথ্যসূত্র:

সাহল ইবন হুনাইফ (রা)

নাম সাহল, ডাকনাম আবু সা’দ আবু ‘আবদিল্লাহ, আবুল ওয়ালীদ ও আবু সাবেত। পিতা হুনাইফ ইবন ওয়াহিব এবং মাতা হিন্দা বিন্তু রাফে’। মদীনার আউস গোত্রের সন্তান। ক্ষিখ্যাত আনসারী বচদরী সাহাবী।১ তাঁর ভাই আব্বাদ ইবন হুনাইফ ছির মদীনার অন্যতম মুনাফিক। মসজিদে দিরার’ যারা নির্মাণ করেছিল, সে তাদের একজন।২

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আসার আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর ও তিনি রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে ঘুরে ঘুরে মদীনার বিভিন্ন স্থানের বিগ্রহগুলি ভেঙ্গে ফেলতেন। কাঠের বিগ্রহগুলি ভেঙ্গে তাঁরা সেই কাঠ দরিদ্র মসুলমানদের গৃহে জ্বালানীর জন্য পৌঁছে দিতেন। হযরত আলী (রা) মদীনায় হিজরাতের পর কুবায় কুলছুম ইবন হাদামের গৃহে কিছুদিন অব্সথান করেন। তার পাশেই ছিল এক মহিলার বাড়ী। প্রতিদিন গভীর রাতে সেই বাড়ীর দরজা খোলার শব্দ তিনি শুনতে পেতেন। তারপর একজন লোকের ভিতে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার সাড়া পেতেন। একদিন তিনি বিষয়টি জানার জন্য মিহলাকে বিজ্ঞেস করলেন। মহিলাটি বললেন: আমি একজন বিধবা মুসলিম নারী। প্রতিদিন রাতে যিনি এখানে আসেন, তিনি সাহল ইবন হুনাইফ। তিনি রাতে গুরে ঘুরে মূর্তি ভাঙ্গেন এবং তার কাঠগুলি আমার জ্বালানীর জন্য দিয়ে যান।৩

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনায় আসর পর আলীর (সা) সাথে তাঁর দ্বীনী ভ্রীতৃ-সম্পর্ক স্থাপন করে দেন।৪

বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূসুল্লাহর (সা) সাথে সংশগ্রহণ করেন।৫ উহুদ যুদ্ধের বিপর্যয়ের সময় যে ১৫ জন সাহাবী জীবন বাজি রেখে রাসূসুল্লাহর (সা) সাথে ময়দানে অটল াকেন তিনি তাঁদের অন্যতম।৬ সেদিন তিনি রাসূসুল্লাহর (সা) নিকট মরণের শপ করেছিলেন। রাসূলকে (সা) সংঙ্গের লোকদের তখন বলেছিরেন, তোমরা তাকে তীর দাও, এ হচ্ছে সাহল।’ হযরত উমার (রা) পরবর্তী কালে কোন সংকট হুমূর্তে সাহল উপস্থিত াকলে তাঁকে সৌভাগ্যের প্রতীক ধরে নিয়ে বলতেন, সাহল আছে, কোন ভাবনা নেই।৭ উহুদ যুদেÍ পর হযরত আলী (রা) ফাতিমার নিকট এসে তরবারি এগিয়ে দিলে বললেন: এই লও তরবারি যা মোটেই নিন্দিত নয়।’ একা শুনে রাসূল (সা) বললেন: ‘তুমি ভালো যুদ্ধ করেছো। তবে সাহল ও আবু দুজানা-উভয়ে ভালো যুদ্ধ করেছে।’৮

হযরত আলী (রা) খলীফা নির্বাচিত হলে তিনি তিনি তাঁর পক্ষে ছিলেন। আলী (রা) যখন ইরাকে যান তখন ত৭াকে মদীনার আমীর নিয়োগ করেন।৯ এক সময় খলীফা তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি মদীনা ছেড়ে কূফায় চলে যান।১০ উটের যুদ্ধের পর হযরত আলী (রা) তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন।১১ সিফ্ফীন যুদ্ধের তিনি আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন।১২ যুদ্ধ শেষে তিনি কূফায় চলে যান। এসময় তাঁকে ‘ফারেস’-এর আমীর নিয়োগ করা হয়।১৩ কিন্তু ততাকার অধিবাসীরা বিদ্রোহী হয়ে তাঁকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেয়। হযরত আলী (রা) তাঁর স্থলে যিয়াদ ইবন আবীহকে তথাকার আমীর নিয়োগ করেন।১৪

মদীনা থেকে ইহুদী গোত্র বনু নাদীর বিতাড়িত হওয়ার পর তাদের তেকে আটককৃত ধন-সম্পদ রাসূল (সা) মুহাজিরদের মধ্রে বন্টন করে দেন। আনসারদের মধ্যে সাহল ইবন হুনাইফ ও আবু দুজানা সিমাক ইবন খারাশা নিজেদের চরম দারিদ্রের কথা প্রকাশ করলে রাসূল (সা) তাদেরকেও কিছু দেন।১৫ আল্লামা সুহাইলীর মতে মোট তিনজন আনসারকে বনু নাদীরের সম্পদ থেকে অংশ দেওয়া হয়েছিল।১৬

ওয়াকিদী ও আল-মাদায়িনী বলেন, সাহল ইবন হুনাইফ হিজরী ৩৮ সনে কূফায় ইনতিকাল কেরন। হযরত আলী (রা) তাঁর জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। আবদুল্লাহ ইবন মা’কাল বলেন: আমি আলীর সাথে সাহল ইবন হুনাইফের জানাযার নামায পড়েছি। এ নামাযে তিনি ছয় তাকবীর বলরেন। কেউ একজন এর প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, হুনাইফ ছিরেন বদরী সাহাবী। আমি ছয় তাকবীরের দ্বারা অন্যদের ওপর বদরীদের ফজীলাতের কথা তোমাদের জানাতে চেয়েছি।১৭

মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে রেখে যান। তাঁরা হলেন: আবু কউমামা আস’য়াদ ও আবদুল্লাহ। প্রথমজন রাসূলুল্লাহর জীবদ্দশায় জন্ম গ্রহণ করেন।১৮

হযরত রাসূল কারীমের (সা) মদীনায় আসার নয় মাসের মাথায় তাঁর একজন অতি প্রয় আনসারী সাহাবী আস’য়াদ ইবন যুরারা ইনতিকাল করেন। তিনি ছিলেন বাই’য়াতে আকাবার সময় মনোনীত ১২ নাকীবের নাকীবুল নুকাবা বা প্রধান নাকীব। তাঁর মৃত্যুর পর রাসূল (সা) তাঁর একটি মেয়েকে নিজ দায়িত্বে লালন-পালন করেন এবং তাঁকে এই সাহল ইবন হুনাইফের সাথে বিয়ে দেন। তাঁরই পেটে জন্মগ্রহণ করেন আবু উমামা ইবন সাহল।১৯

তিনি ছিলেন খুবই সুদর্শন ব্যক্তি। চেহারায় একটা পবিত্রতার ছাপ বিরাজমান ছিল। দৈহিক গঠন ছির অতি সুন্দর। একাবর এক যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে একই বাহনের পিঠে আরোহী ছিলেন। সেখানে ছিল একটি ঝর্ণা। সেই ঝর্ণায় তিনি গোসল এ কেমন অপরূপ দেহ তার? আমি তো এমনটি আর কখনো দেখিনি।’ এতে হযরত সাহলের কুনজর লাগে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শরীরে ভীসণ জ্বর এসে যায়। রাসূল (সা) এর কারণ জানতে চাইলেন। লোকরা ঘটনাটি বর্ণনা করলো। তিনি তাদের কথা শুনে বললেন, মানুষ তার। ভাইয়ের শরীর অথবা ধন-সম্পদ দেখে এবং তার জন্য দু’আ করে না। এ জন্য নজর লেগে যায়। নজর সত্য।২০

আল্লামা যিরিকলী সাহীবহাইনে তাঁর থেকে বর্ণিত চল্লিশটি হাদীস সংকরিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।২১ তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) ও যায়িদ ইবন সাবিত থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। বহু তাবে’ঙ্গ তাঁর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:

আবু ওয়ায়িল, উবাইদ ইবন সাববাক, ‘আবদুল রহমান ইবন আবী লায়লা, ‘উবাইদুল্লাহ ইবন, ‘আবদিল্লাহ ইবন, ‘উতবা, সীরীন ইবন ‘আমার, রাবাব প্রমুখ।২২

তিনি সব সময় সকল প্রকার মতভেদ থেকে দূরে থাকতেন। সিফফীন থেকে ফিরে আসার পর ছাত্র আবু ওয়ায়িল বললেন: আমাদের কাছে কিছু ঘটনা বর্ণনা করুন। বললেন: কী বর্ণনা করবো? কঠিন সমস্যা। একটি ছিদ্র বন্ধ করলে আরেকটি খুলে যায়।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও উদ্যমী। কিন্তু মানুষ তাঁর সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা পোষণ করতো। এ সম্পর্কে তিনি বললেতন, এ তাঁদের মতের দোষ। আমি কাপুরুষ নই। যে কাজের জন্যই আমি তলোয়ার উঠিয়েছি, তা চিরকালের জন্য সহজ করে দিয়েছি। হুদাইবিয়ার দিন লড়াই করা যদি রাসূলুল্লাহর (সা) ইচ্ছার বিরোধি না হতো, আমি সে দিনও লড়তে প্রসউত ছিলাম।২৩

তথ্যসূত্র:

নু‘মান ইবন বাশীর (রা)

সীরাতের গ্রন্থাবলীতে হযরত নু‘মানের (রা) দুইটি কুনিয়াত বা ডাকনাম পাওয়া যায়: আবূ ‘আবদিলÍাহ ও আবূ মুহাম্মদ। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের সন্তান। তিনি একজন আমীর, খতীব, শা‘রিয়, আলিম ও অন্যতম আনসারী সাহাবী।১ তাঁর পিতা বাশীর ইবন সা‘দও একজন বড় মাপের সাহাবী।২ তিনি বদর যুদ্ধের যোগদান করেছিলেন।৩

বাশরি ইবন সা‘দ (রা) শেষ ‘আকাবায় সত্তর, মতান্তরে পঁচাত্তর জন আনসারের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই‘য়াত করেন। বদর, উহুদসহ সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালেরর পর মদীনার সাকীফা বনী সা‘য়েদাহতে খলীফা নির্বাচনের যে সমাবেশ হয় তাতে সর্ব প্রথম এই বাশরি ইবন সা‘দ আবূ বকরের (রা) হাতে বাই‘য়াতে করেন।৪ হিজরী ১২ সনে সেনাপতি খালিদ ইবন ওয়ালীদের (রা) নেতৃত্বাধীনে তিনি ভণ্ডুনবী মসায়রামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে আয়নুত তামা’-এর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।৫

নু‘মানের (রা) মায়ের নাম উমরাহ বিনত রাওয়াহা। তিনি বিখ্যাত কবি সাহাবী ও শহীদ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহান (রা) বোন।৬ তিনিও রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীয়্যাত বা সাহচর্য্যরে গৌরব অর্জন করেন।

এমনই এক পবিত্র ও মহান পবিবারে নুমানের (রা) জন্ম। ইবন সা‘দ বলেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাতের চৌদ্দ মাসের মাথায় রবিউল আখের মাসে জন্মগ্রহণ করেন। এটা মদীনাবাসীদের বর্ণনা। কুফাবাসীরা অবশ্য ভিন্নতম পোষণ করেন। তাঁরা নু‘মান থেকে এমন বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন যাতে তিনি-‘আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি’-বলেছেন। তারা বলেন, মদীনাবাসীরা তাঁর জন্ম সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তার থেকে িিতন বয়সে যে বড়, তার এ বর্ণনাসমূহ দ্বারা তা বুঝা যায়। বালাজউরী বলেন: হিজরী দ্বিতীয় সনে আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। আর এ সনেই জন্মগ্রহণ করেন আন-নু‘মান বাশীর। রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আসার পর আনসারদের ঘরে জন্ম গ্রহণকারী প্রথমি শশু নু‘মান। রাসূল (সা) ত৭ার তাহনীক করেন।৮ (খেজুর বা অন্য কিছু চিবিয়ে শিশুর মুখে দেওয়াে তাহনীক’ বলে) তাঁর জন্মের ছয় মাস পরে জন্মলাভ করেন আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা)। পরবর্তীকালে তাই তিনি বলতেন, আন-নু‘মান ইবন বাশীর আমার চেয়ে ছয় মাসের বড়।৯ ইমাম বুখারীর মতে, তাঁর জন্ম হিজরাতের বছরে।১০

ইমাম জাহাবী হযরত নু‘মানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: তিনি হিজরী দ্বিতীয় সনে জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে হাদীস শুনেছেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে তাঁকে শিশু সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করেছেন।’১১

ইসলামের ইতিহাসে হিজরী দ্বিতীয় সনের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ বছরের গুরুতেই মক্কার কুরাইশ ও তার আশে পাশের অন্যান্য গোত্রের সাথে মদীনার মুসলমানদের সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটতে থাকে। যার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে বদর যুদ্ধের মাধ্যমে। এ বছর যে সকল শিশু জন্মগ্রহণ করে তাদের ওপর এই বিল্পবী সময় ও ঘটনার একটা প্রকাব হয়তো পড়ে থাকবে। এ কারণে আন নু‘মান ও আবদুল্লাহ প্রত্যেকেই পরবর্তী জীবনে বড় বড় বিপ্লবে নেতৃত্ব দান করেছেন।

নু‘মানের পিতা-পমাতা তাঁকে খুব ভারোবাসতেন। পিতা তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে গিয়ে তাঁর জন্য দু’আ চাইতেন। মা তাঁকে এত বেশী ভালোবাসতেন যে, অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করে সকল ধন-সম্পদ তাঁর নামে লিখে দিতে চাইতেন। একবার তিনি এ ব্যাপারে স্বামীর রাজী করেন এবং সাক্ষী হিসেবে রাসূলুল্লাহকে (সা) মনোনীত করেন। বাশীর (রা) ছেলে নুমানকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলেন, আপনি সাক্ষী থাকুন আমি আমার অমুক অমুক ভূমি এই ছেলেকে দান করছি। রাসূল (সা) বললেন: তুমি কি তোমার অন্য সন্তানদের অংশও এভাবে দিয়েছো? বললেন: না, দিইনি। রাসূল (সা) বললেন: তাহলে আমি তো এমন অবিচারের সাক্ষী হতে পারিনে। একথা শোনার পর বাশীল তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।১২

হেঁটে বেড়ানোর বয়স হলে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যেতেন। একবার তায়েফ থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কিছু আঙ্গুর এলা। তিনি নুমানের হাতে দুইটি ছড়া দিয়ে বলণেল, একটি তোমার এবং একটি তোমার মায়ের। নুমান বাড়ী ফেরার পথে দুইটি ছড়াই খেয়ে ফেরেন। বাড়ী এসে আঙ্গুরের ব্যাপারে কাউকে কিছু বললেন না। কয়েক দিন পর রাসূল (সা) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: মাকে আঙ্গুর দিয়েছিলে? জবাব দিলেন: না। রাসূল (সা) কথন ত৭ার কানমলা দিয়ে বললেন: ওরে ঠকবাজ!১৩

সেই শৈশবকালেই নুমান নামায ও অন্যান্য ইবাদতের প্রতি মনেযোগী হন। রাসূলুল্লাহর (সা) বিভিন্ন আচরণ মনোযোগ সহকারে দেখতেন এবং স্বরণ রাখার চেষআটা করতেন। মসজিদে মিম্বরের কাছাকাছি বসে রাসূলুল্লাহর (সা) ওয়াজ-নসীহত ও বতৃতা-ভাষণ শুনতেন।১৪ একবার তিনি দাবী করে বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) রাত্রিকালীন নামায সম্পর্কে আমি অধিকাংশ সাহাবীদের থেকে বেশী জানি।১৫ শবে কদরে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে জেগে নামায পড়তেন।১৬

হিজরী ১১ সনের রাবী’উল আওয়াল মাসে রাসলে কারীম (সা) ইনতিকাল করেন। তখন নুমানরে বয়স মাত্র আট বছর সাত মাস। সুতরাং প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফার সময়ে নুমানের বিশেষ কোন কর্মতৎপরতা দেখা যায় না। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, উসমান (রা) বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী নায়িলা (রা) স্বামীর রক্তমাথা জামাসহ নুমানকে (রা) শামে পাঠান।১৭ এ ঘটনার পর থেকে তাঁকে তৎকালীন ইতিহাসের অন্যতম এক চরিত্র হিসেবে দেখা যায়।

আলীর (রা) খিলাফতকালে মুয়াবিয়ার (রা) সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। এই বিরোধে তিনি মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন। এটা অবাক হওয়ার মত ব্যাপার যে, গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে গুটিকয়েক লোক তখন মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষ নেন, তিনি তাঁরে একজন। বিভিন্ন গ্রন্থে একথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আমীর মুয়াবিয়া (রা) ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইবনুল আসীর বলেছেন: তাঁর ভালোবাসা ছিল মুয়াবিয়ার প্রতি। এ কারণে মুয়াবিয়া ও তাঁর ছেলে ইয়াযীদের প্রতি তাঁর টান ছিল।১৮ বিনিময়ে মুয়াবিয়া (রা) তাঁকে বড় বড় পদ দান করেন। আলীর (রা) পক্ষ থেকে আয়নুত তামার-এর শাসক ছিলেন মালিক ইবন কা’ব আল-আবহাবী। আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নির্দেশে নুমান (রা) তথাকার অস্ত্র গুদামে আক্রমণ চালান।১৯

নুমান সিফফীন যুদ্ধ মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষে যোগদান করেন।২০ ফুদালা ইবন উবাইদের পরে হিঃ ৫৩ সনে মুয়াবিয়া (রা) তাঁকে দিমাশকের কাজী নিযোগ করেন।২১ ইয়ামন মুয়াবিয়ার (রা) অধীনে এল উসমান ইবন আস সাফাফীর পরে তিনি নুমানকে (রা) তথাকার ওয়ালী নিয়োগ করেন। এ হিসাবে উমাইয়্যা রাজ বংশের পক্ষ থেকে তিনি ছিলেন ইয়ামনের তৃতীয় ওয়ালী।২২

হিজরী ৫৯ সনে মুয়াবিয়া (রা) ত৭াকে কূফায় ওয়ালী নিয়োগ করেন। প্রায় সাত মাস এই পদে অধিষ্টিত ছিরেন। মুয়াবিয়া (রা) ইনতিকালেরর পর তাঁর পুত্র ইয়াযীদ খলীফার পদে আসীন হন। তিনি ইমাম হুসাইন (রা), আবুদল্লাহ ইবন উমার (রা) ও আবদুল্লাহ ইবন মুবাইরকে (রা) তাঁর আনুগত্যের জন্য চাপ দিলেন। ইমাম হুসাইন (রা) ইয়াযীদের আনুগত্য মেনে নিতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃত জানালেন। একদিকে কূফা থেকে আলীর (রা) অনুসারীদের চিঠি ইমাম হুসাইনের (রা) নিকট পৌঁছতে লাগলো। এ সকল চিঠিতে তারা ইমাম হুসাইনকে (রা) খলীফা হিসেবে মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছিল। এ কারণে। ইমাম হুসাইন (রা) অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য মুসলিম ইবন আকীলকে কূফায় পাটালেন। মুসলিম ক’ফায় পৌছলে শহরের অধিকাংশ অধিবাসী ইমামের প্রতি আস্থার ঘোষণা দিল। প্রায় বারো হাজার মানুষ মুসলিমের হাতে বাই‘য়াতে গ্রহণ করেন। নুমান (রা) তখন কূফায় ওয়াল্ ীসব খবরই তিনি পাচ্ছিলেন; কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবর্তে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন।

কিন্তু যখন মুখতার ইবন উবাইদের গৃহে আলীর (রা) অনুসারীদের বৈঠক হলো এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, ইয়াযীদের প্রতি কৃত বা ইয়াত (আনুগত্যের শপথ) ভঙ্গ করা হবে। তখন নুমান (রা) কূফায় মসজিদের মিন্বরে দাঁড়িয়ে একটি ভাষণ দান করেণ। ভাষণটির সারকথা নিুরূপ:

‘ওহে জনমগুলী! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। অশান্তি ও মতভেদ সৃষ্টির ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। কারণ, তাতে প্রাণহানি ঘটে, রক্তপাত হয় এবঙ সম্পদ লুটপাট হয়।। কেউ আগ বাড়িয়ে আমার সাথে সংঘাতে লিপ্ত না হলে আমি তার সাথে সংঘাতে বড়াবো না। কোন খারাপ কথা বরবো না, গালিগালাজ করবো না। কারো চরিত্রে অবাদ দান অথবা খারাপ ধারণা পোষণের কারণে পাকড়াও করবো না। কিন্তু আপনারা যদি বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে আমার ও ইমামের বিরুদ্ধাচরণে নামেন, তাহলে সইে আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। যখক্ষণ তরবারি হাতল আমার হাতের মুঠোয় থাকবে, আমি আপনাদের মারতে থাকবো। এতে একটি লোকও যদি আমার পাশে না থাকে, বতুও আমি বিরত হবো না। তবে আমি আশা করি, আপনাদের মধ্যে বাতিলের অনুসারীদের অপেক্ষা সত্যক্ষে জানে এমন লোকের সংখ্যাই অধিক হবে।”

উক্ত সমাবেশে বনী উমাইয়্যার নিষ্ঠাবান সমর্থক ও বন্ধু আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম উপস্থিত ছিলেন। শত্র“র প্রতি সরকারের ওয়ালীর এমন দুর্বল অবস্থান দেখে তিনি মর্মাহত হন। ক্ষোভের সাথে তিনি নু‘মানকে বলেন: ‘এ ব্যাপারে আপনার অবস্থান অতি দুর্বল। এখন কোমল হওয়ার সময় নয়; শক্রুর বিরুদ্ধে এখন আপনার কঠোর হওয়া উচিত।’ জবাবে নু‘মান বললেন:

‘আমি আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণে শক্ত হওয়ার চেয়ে তাঁর অনুগত্যে দুর্বল থাকা বেশী পছন্দ করি। আর আল্লাহ যে পর্দাটি টেনে দিয়েছেন তা ছিন্ন করা সমীচীন মনে করিনা।’ আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম সমাবেশ থেকে ফিরে ইয়াযীদকে লিখলেন: ‘মুসলিম ইবন আকীল কূফায় ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে। যদি আপনার ্খানকার শাসন কর্তৃত্বের প্রয়োজন থাকে তাহলে আপনার আদেশ-নিষেধ কার্যকর করতে সক্ষম হবেন। নু‘মান একজন ভীরু লোক, অথবা তিনি ইচ্ছা কইে ভীরু ও দুর্বল সেজেছেন।’ ঠিক একই সময় একই রকম চিঠি ইয়াযীদকে লেখেন আমআতরা ইবন উকবা ও উমার ইবন সা’দ ইবন আবী ওয়াককাস। এ সকল চিঠি পাওয়ার পর ইয়াযীদ কূফায় ওয়ালীর পদ থেকে নু‘মান ইবন বাশীরকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদকে নিয়োগ করেন। আর নু‘মান চলে যান শামে।২৩ এটা হিজরী ৬০ (ষাট) সনের ঘটনা।২৪

অতঃপর ইয়াযীদ তাঁকে হিমস-এর ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং ইয়াযীদের মৃত্যু পর্যন্ত এ পদে বহাল থাকেন। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, মু‘য়াবিয়া (রা) তাঁকে কূফা থেকে সরিয়ে হিমস-এ নিয়োগ করেন।২৫

হিজরী ৬৪ সনে ইয়াযীদ ইবন মু‘য়াবিয়ার মৃত্যুর পর নু‘মান শামের অধিবাসীদেরকে আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) প্রতি আনুগত্যের আহবান জানান এবং তাঁর পক্ষ থেকে তিনি হিমস-এর ওয়ালী নিযুক্ত হন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে  তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু পরে নিজেই খিলাফতের দাবীদার হিসেবে মানুষের বাই’য়াত গ্রহণ করতে থাকেন। কিন্তু এ বর্ণনা সঠিক নয়। কারণ, যদি এমন ঘটনা আদৌ ঘটতো তাহলে আতিহাস ও সীরাতের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলীতে তা বর্ণিত হতো। কিন্তুু অধিকাংশ গ্রন্থ এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব।

নু‘মানের (রা) মত আরো অনেকে শামে ইবন যুবাইয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এ অবস্থা দেখে মারওয়ান শামে যান এবং একটি বাহিনী প্রস্তুত করে দাহহাক ইবন কায়সের বিরুদ্ধে পাঠান। দাহহাক ছিলেন ইবন যুবাইয়ের পক্ষ থেকে শামের কয়েকটি অঞ্চলের শাসক। নু’মান এ সংবাদ পেয়ে শুরাহবীল ইবন জুল-কিলাবার নেতৃত্বে কিছু সৈন্য দাহহাকের সাহায্যে পাঠান। মারজে রাহিত’ নামক স্থানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং দাহহাক পরাজিত ও নিহত হন। এ সংবাদ পেয়ে নু’মান রাতের অন্ধকারে হিমস থেকে সরে পড়ার চেষ্টা করেন। মারওয়ান তাঁকে ধাওয়া করে ধরার জন্য খালিদ ইবন আদী আল-কিলা’ঈর নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠান।

হিম্স-এর অদূরে বীরীন নামক এক পল্লীতে তিনি খালিদের মুখোমুখি হন। খালিদ তাঁকে হত্যা করে মাথাটি কেটে এবং পরিবার পরিজনকে বন্দী করে মারওয়ানের সামেন হাজির করে। নু‘মানের স্ত্রী তাঁর স্বামীর এমন নির্মম পরিণতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি স্বামীর ছিন্ন মস্তকটি তাঁর কোলে দেওয়ার জন্য মারওয়ানের নিকট আবেদন জানিয়ে বলেন: এ মস্তকের হকদার আমি। আমাকেই দেওয়া হোক।

মারওয়ানের নির্দেশে লোকেরা নুমানের (রা) মাথাটি তাঁর স্ত্রীর কোলে চুড়ে মারে। এটা হিজরী-৬৫ সনের প্রথম দিকের, মতান্তরে ৬৪ সনের শেষ দিকের ঘটনা। তখন নুমানের (রা) বয়স ছিল ৬৪ বছর।২৬ ইবন হাযাম বলেন: মারওয়ান নু’মানকে হত্যার মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতায় আরোহনকে উদ্বোধন করেন।

‘আব্বাসী আমলের প্রখ্যাত কবি আবুল আলা আল-মা’য়াররীর জন্মস্থান ‘মায়’য়াররাতুন নু’মান। স্থানটির পূর্ব নাম ছিল শুধু ‘মা’য়াররা’। নু’মান একবার সেখানে ভ্রমণে যান। তখন ত৭ার একটি ছেলে মারা যান এবং তাকে সেখানে দাফন করা হয়। সেখান থেকে স্থানটি আন-নু’মানের প্রতি আরেপ করে মা’য়ারাতুন নু’মান হিসাবে প্রসিদ্ধি পায়।২৭

নু’মানের (রা) স্ত্রী ছিলেন আরবের ‘কাল্ব’ গোত্রের মেয়ে। তাঁর সম্পর্কে একডিট আজব কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তিনি এক সময় মু’য়াবিয়ার (রা) অন্দর মহলে ছিলেন।। মু’য়াবিয়া একদিন ইয়াযীদের মা মাবসূনকে বললেন, তুমি যেয়ে একবার এই মহিলাকে দেখে এসো তো। মাবসূন তাঁকে দেখে এসে বললেন, রূপ ও সৌন্দর্য্যে এ মহিলা অন্যান্য। কিন্তু তাঁর নাভরি নীটে একটি তিল আছে। এ কারণে সে তর স্বামীর ছিন্ন মস্তক নিজের কোলে ধারণ করবে।

এই মহিলাকে প্রথমে হাবীব ইবন মাসলামা বিয়ে করেন। তাঁর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি নিহত হলে স্ত্রী হিসাবে তাঁর কর্তিত মাথা কোলে ধারণ করেন। এভাবে মাবসূনের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়।২৮

নু’মান (রা) সন্তানদের মধ্যে তিনটি ছেলে মুহাম্মাদ, বাশীর ও ইয়াযীদ খ্যাতিমান হন। বহুদিন যাবত মদীনা ও বাগদাদে তাঁর বংশধারা বিদ্যমান ছিল।২৯

হাদীস ও ফিকাহ্-তে নু’মানের (রা) গভীর জ্ঞান ছিল। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন ও অন্যান্য বাস্ততার দরুন যদিও তিনি জ্ঞান বিতরণের মহান দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, তবে তিনি যেখানেই শাসকের দায়িত্ব নিয়ে গেছেন, সেই স্থানটি ফিকাহ ও হাদীস চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর সামনে অসংখ্য মামলা আসেতো, তিনি স্বীয় জ্ঞান ও মেধা দ্বারা তা ফয়সালা করতেন।

রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের সময় যদিও তিনি আট বছরের বালক মাত্র, তবুও অনেক হাদীস তাঁর স্মৃতিতে সংরক্সিত ছিল। পরবর্তীকালে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (লা) ও উমারের (লা) সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। তাঁদের নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন। তাছাড়া তাঁর মামা আবদুলÍাহ ইবন রাওয়াহার (রা) নিকট থেকেও বহু হাদীস শুনেছেন।৩০

হাদীস গ্রহণ ও বর্ণনার ব্যাপারে তিনি ছিরেন দারুণ সর্তক ও রক্ষণশীল। তা সত্ত্বেও তাঁর সনদে মোট ১২৪ (একশত চব্বিশ) টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তারমধ্যে পাঁচটি হাদীস বুখারী ও মুসিলিম মুত্তাফাক আলাইহি এবং বুখারী অন্য একটি ও মুসলিম অন্য চারটি হাদীস এককভাবে বর্ণনা করেছেন।৩১ তনি বিচার-পায়সালার সময় হাদীসের উদ্ভৃতি দিতেন। একবার একটি মামলার বিচারের সময় বললেন, আমি এ মামলার ফায়সালা এমনভাবে করবো যেমন ফায়সালা করেছিলেন রাসূল (সা) এক ব্যক্তির মামলার।৩২

তিনি শরী’য়াতের বিধি-বিধান সম্পর্কিত মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতেন। াধিকাংশ সময় এ জাবাব দিতেন খুবতা বা বক্ততা-ভাষণের মধ্যে। তাঁর খুবতা বা ভাষণ হতো দুই প্রকার: ধর্মীয় ও রাজনৈতিক। তিনি ছিরেন একজন অসাধারণ বাগ্মী ব্যক্তি। তাঁর ভাষণ হতো অতি বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায়। বাচন ও প্রকাশ ভঙ্গিতে তাঁর যে নৈপুণ্য ছিল তার স্বীকৃতি দিয়েছেন সিমাক ইবন হারব এভাবে: ‘আমি যে সকল মানুষের ভাষণ শুনেছি, তাঁদের মধ্যে নু’মান ইবন বাশীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী বলে মনে হয়েছে।’৩৩

খুতবার মধ্যে স্তান-কাল অনুযায়ী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্জালন করতেন। যেমন, একবার তিনি খুবতার মধ্যে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনেছি। ‘শুনেছি’ বলার সাথে সাথে আঙ্গুল দিয়ে দুই কানের দিকে ইঙ্গিত করলেন।৩৪ একবার ভাষণে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) অবস্থা বর্ণনা করেন এবাবে: ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য নিুমানের খোরমাও রাসূলুল্লাহ (সা) জুটতো না। আর এখন নানা জাতের উৎকৃষ্ট কোরমা ও মাখন ছাড়া তোমাদের রুচি হয় না।’৩৫

একবার তিনি মিম্বারে দাাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। ভাষণে জামা’য়াতবদ্ধ জীববকে আল্লাহর রহমত এবয় বিচ্ছিন্নতাকে আল্লাহর আযাব ও অভিশাপ হিসেবে চিত্রিত করলেন। সমাবেশে প্রখ্যাত ইমাম আল-বাহিলীও উপস্থিত ছিলেন। ভাষণ শেষে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বললেন: ‘তোমাদের ওপর আস্-সাওয়াদ আল-আ’জাম’-এর অনুসরণ ফরজ।৩৬

বক্ততা-ভাষণের সময় তাঁর মুখ থেকে যাঁরা হাদীস শুনেছেন তাঁদের সংখ্যা অগণিত। ত৭ার বিশিষ্ট ছাত্রদের কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো: শা’বী, হুমাইদ ইবন ‘আবদির রহমান, খায়সামা ইবন আবদির রহমান, সালেম ইবন আবিল জু’দ, আবু ইসহাক সুবাঈ’, আবদুর মালিক ইবন উমাইর ইয়াসী’ আল-কন্দিী, হাবীব ইবন সালেম (নু’মানের সেক্রেটারী), আবদুল্লাহর ইবন আবদিল্লাহ ইবন উতবা, উরওয়া ইবন যুবাইর, আবু কিলাবা আল-জুরমী, আবু সালামা আল-আসওয়াদ, গায়রায আবী সুফরাহ, আযহার ইবন আবদিল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবন ুন’মান আবু সাল্লাম মামত’র প্রমুখ।৩৭

নু’মান (রা) ছিলেন একজন সাহিত্য ও কাব্যরসিক মানুষ। গদ্য সাহিত্যে যেমনতাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায়, তেমনিভাবে কাব্য সাহিত্যেও তাঁর পদচারণা দেখা যায়। তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। সীরাতের গ্রন্থসমূহে কিচু কবিতা তাঁর নামে সংকলিত হয়েছে। আল-কুরতুবী আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থে তাঁর কিছু কবিতা তাঁর নামে সংকলিত হয়েছ। আল-কুরতুবী আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থে তাঁর কিচু শ্লোক সংকলন করেছেন। তাঁর কবিতার এটি দিওয়াও আছে।৩৮

নু’মান (রা) বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদ, হৈ-হাঙ্গামা, নানা ধরনের ওলট-পালট ও বিপ্লবের সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও যুলুম-অত্যাচার একেবারেই পসন্দ করতেন না। তিনি অত্যন্ত দয়ালু এবং কোমর মনের মানুষ ছিরেন। ঝগগড়া-বিবাদে কঠোরতা ও শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে মমতা ও ভালোসাবা দ্বারা মানুষের মন জয় করতেন। ঐতিহাসিক তাবারী বলেছেন: তিনি ছিরেন একজন বিচক্ষণ ধৈর্যশীর এবং আবেদ ব্যক্তি। যিনি মানুষকে ক্ষমা করতে ভালোবাসতেন।’

মুসলিম ইবন আকীলের ঘটনা এবং এ সম্পর্কে নু’মানের (রা) ভাষণ, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে তাঁর সহনশীল ও উদার নীতির রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একবার তিনি কায়স ইবন্ াল-হায়সামকে একটি চিঠিতে লেখেন: ‘তুমি একজন দারুণ হতভাগ্য ব্যক্তি। আমরা রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখেছি এবং ত৭ার হাদীস (বাণী) শুনেছি। আর তোমরা না তাঁকে দেখেছো, না তাঁর মুখ থেকে হাদীস মুনেছো। তিনি বলেছেন: কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ধারাবাহিক ফেতনা-ফাসাদ দেখঅ দেবে। তখন মানুষ সকারে মুসলমান হলে সন্ধ্যা হতে না হতে আবার াকফির হয়ে যাবে। মানুষ সামান্য পার্থিক সুযোগ-সুবিধার লোভে নিজের দ্বীন বিক্রি করবে।৩৯ তবে তঁর এ কোমল ও নম্র স্বভাব ভীরুতা ও কাপুরুষতার কারণে ছিল না। তিনি যেমন ধৈর্য ও সহনশীলতার ক্ষেত্রে ছিলেন অনন্য, তেমনি ছিলেন বীরত্ব ও সাহকিতায় অতুলনীয়।

তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের দামশীল ব্যক্তি। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আপ্রাণ চেষ্টো করতেন। তিনি যখন হিমস-এর ওয়ালী তখন একবার কবি আল-আ’শ আল-হামাদানী তাঁর নিকট এসে বললেন, আমি ইয়াযীদের নিকট সাহায্যের আবেদন করেছি, কন্তিু তিনি কোন সাড়া দিলেন না। এখন এসেছি আপনার কাছে। আত্মীয়তার হক কিচু আদায় করুন। আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করুন। নু’মানের (রা) হাতে তখন কোন অর্থ ছিল ন। তিনি শপথ করে বললেন, আমার কাছে কিচুই নেই। তারপর কিচু চিন্তা অর্থ ছিল না। তিনি শপথ করে বললেন, আমার কাছে কিছুই নেই। তারপর কিছু চিন্তা করে বললেন: ‘হুঁ!’ এরপর মসজিদের মিন্বরে দাঁড়িয়ে সমবেত প্রায় বিশ হাজার লোকের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। যার সারকথা নিুরূপ:৪০

ওহে জনমগুলী! আল-আ’শ আল-হামাদীনী আপনাদের এক চাচার ছেলে। অভিজাত বংশের একজন মুসলিম। তার কিছু অর্থের প্রয়োজন। আর এ উদ্দেশ্রেই সে আপনাদের নিকট এসেছে। এখন আপনাদের ইচ্ছা কি? জনতা সমস্বরে বলে উঠলো: আপনি যা বলবেন আমরা তা শুনবো। তিনি বললেন: আমার কোন নির্দেশ নেই। জনতা বললো: তাহলে আমরা এখানে উপস্থিত প্রত্যেকে এক দীনার করে দান করবো। তিনি বলনেনঃ না। দুইজনে এক দীনার করে দিন। সকলে সম্মত হলে তিনি বললেন: আমি বাইতুলমাল থেকে তাঁকে এ অর্থ দিয়ে দিচ্ছি। যখন বেতন/ভাতার অর্থ আসবে তখন সকলের কাছ থেকে উসূল করা হবে। নু’মান (রা) এভাবে ঋণগ্রন্থ আল-আ’শাকে দশ হাজার দীনার দানের ব্যবস্থা করেন। এটা আল-ইসতীয়াব গ্রন্থকারের বর্ণনা। উসুদুল গাবা গ্রন্থকার ইবনুল আসীর বলেন, চল্লিশ হাজার। কবি আল-আ’শা আল-হামাদানী এ জন্য নু’মানের (রা) প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ ছিলেন। নু’মানের (রা) প্রশংসায় তিনি একটি কবতিাও রচনা করেছেন। কবিতাটির কয়েকটি শ্লোকের অর্থ নিুরূপ:৪১

১.প্রয়োজনের সময় দানশীল নু’মান ইবন বাশীরের মত আর কাউকে পাইনি।

২.তিনি যখন কোন কথা বলেন তখন সে কথা পূর্ণ করেন। তিনি সেই ব্যক্তির মত নন যে জনগণের প্রতি ধোঁকাবাজির রশি ঝুলিয়ে দেয়।

৩.যদি তিনি একজন আনসারী না হতেন তাহলে আমি সেই ব্যক্তির মত হতাম, যে কোথাও যেয়ে কিছু না পেয়েই ফিরে আসে।

৪.আমি যখন নু’মানের অকৃতজ্ঞ হবো তখন আমার ম্যধ থেকে কৃতজ্ঞতার স্ববাব বিলীপন হয়ে যাবে। আর অকৃতজ্ঞ মানুষের মধ্যে ভালো কিছু থাকে না।

শৈশবে নু’মান (রা) যেহেতু রাসূলে কারীমের (সা) াতি সান্নিধ্রে থাকার সুযোগ পেয়েছিরেন, এ কারণ তাঁর খুঁটিনাটি অনেক আচার-আচরণের বর্ণনা দিতে সক্ষম হয়েছন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে তাঁর এ ধরনের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) রাতের ইবাদাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দুইকানি পা ফুলে যেত।৪২ তেমনিভাবে তিনি বণৃনা করেছেন, রাসূল (সা) কিভাবে নামাযরে কাতার সোজা করতেন এবং কাতার সোজা করার প্রতি কতখানি গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেন: একদিন রাসূল (সা) দেখেন এক ব্যক্তি বুক কাতারের বাইরে চলে গেছে। তখন তিনি বলেন: ওহে আল্লাহর বান্দারা! হয় তোমরা তোমাদের কাতার সোজা করবে, না হয় আল্লাহ তোমারে মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন।৪৩

‘উম্মুল মুমিনীন আ’য়িশা (রা) ছিলেন আবু বকর সিদ্দীকের (রা) কন্যা। নু’মান (রা) বলেন: একদিন আবু বকর গেলেন মেয়ে-জামাই-এর সাথে দেখা করতে। ভিতরে ঢোকার অনুমতি চেয়ে শুনতে পেলেন রাসূলুল্লাহর (সা) কথার উপরে মেয়ে আ’য়িশার চড়া গলার কথা। তিনি ঢুকেই রাসূলুল্লাহর (সা) কথার উপরে কথা বলছো-এই বলে মেয়েকে থাপপড় মারতে উদ্যত হলেন। রাসূল (সা) দ্রুত মাঝখানে দাঁড়িয়ে আ’য়িশাকে মার থেকে বাঁচালেন। আবু বকর রাগান্বিত অবস্থায় মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তখন রাসূল (সা) আ’য়িশাকে বললেন: দেখলে তো, তোমাকে আমিমার থেকে বাঁচালাম? কিচুদিন পর আবু বকর আবার মেয়ে-জামাইর বাড়ী গেলেন। দেখলেন, তাঁদের স্মপর্কে স্বাভাবিক। তখন তিনি বললেন: তোমাদের শান্তির সময় তোমরা আমাকে প্রবেশের অনুমতি দাও, আবার যুদ্ধের সময়ও ানুমতিদিয়ে থাক। তখন রাসূল (সা) বলেন: আমরা এই করেছি, আমরা এই করেছি।৪৪

একদিন তিনি মিন্বরে দাঁড়িয়ে বলেন: রাসূলুল্লাহর (সা) এই মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন: যে ব্যক্তি অল্পে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা, সে বেশীরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞাত প্রকাশ করেনা সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। আল্লাহর অনুগহের কথা স্বীকার করাই হচ্ছে তা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, আর স্বীকার না করা হচ্ছে াকৃতজ্ঞতা।

এভাবে আল্লাহর রাসূলের (সা) জীবনের নানা দিক তাঁর বিভিন্ন বণৃনায় ফুটে উঠেছে।

নু’মান (রা) ইতিহাসের এক বিভ্রান্তির অধ্যায়ে মু’য়াবিয়া (রা) ও তাঁর পুত্র ইয়াযীদের পক্ষ অবলম্বন করলেও কোথাও কারো প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করেছেন, এমন কোন তথ্য পাওয়া যয় না। সেত্যর ওপর যে তিনি অটল ছিলেন তার প্রামণ পাওয়া যায় আবদুল্লাহ বিন জুবাইরের (রা) প্রতি আগুগত্য প্রকাশ করে জিীভন দানের মধ্যে। কূফার মসনদ ত্যাগ করেছেন বতুও ইমাম হুসাইনের প্রতিনিধি মুসলিম ইবন আকীলের সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াতে রাজী হননি। রাসূলে কারীমের (সা) সাহচর্যের কল্যাণে এমন উন্নত নৈতিকতার অধিকারী হতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: 

সামুরা ইবন জুনদুব আল ফাযারী (রা)

সামুরা আল ফাযারীর (রা) অনেকগুলি কুনিয়াত বা ডাকনাম সীরাতের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। যথা: আবূ সাঈধ, আবূ আবদির রহমান, আবূ আবদিল্লাহ, আবূ সুলায়মান ও আবূ মুহাম্মদ।১ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) একজন সাহাবী। ইতিহাসে তিনি একজন সাহসী নেতা হিসাবে প্রসিদ্ধ।২ ইমাম জাহাবী বলেন: তিনি ছিরেন আলিম (জ্ঞানী) সাহাবীদের একজন।৩

সামুরা (রা) মদীনার আনসার সম্প্রদায়ের সন্তান নন। মূলত তিনি বনু ফাযারার সন্তান। ইবন ইসহাক বলেন: তিনি মদীনার আনসারদের একজন হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ বন্ধু ছিলেন।৪ তাঁর পিতা জুনদুব ইবন হিলাল আল ফাযারী ছিলেন বসরার অধিবাসী। সামুরা বসরায় জন্মগ্রহণ করেন। শিশু বয়সেই সামুরা পিতৃহারা হন। তাঁর মা তাঁকে নিয়ে মদীনায় আসেন এবং আনসারদের কাউকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ কনের। তবে শর্ত দেন, যে তাঁকে বিয়ে করবেন, সন্তান সামুরাসহ তাঁর সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণে রাজী থাকতে হবে। মুররী ইবন শায়বান ইবন সা’লবা তাঁর এ শর্ত মেনে নিয়ে ত৭াকে বিয়ে করেন। সামুরা (রা) তাঁর এই সৎ পিতা মুররী ইবন শায়বানের তত্ত্বাবধান ও øেহছায়ায় বেড়ে ওঠেন।৫

সামুরা (রা) হিজরাতের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। যুদ্ধে যাওয়ার বয়স না হওয়ায় তিনি হিজরী দ্বিতীয় সনের বদর যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি পাননি। উহুদ যুদ্ধের সময় আরো কিছু আনসার কিশোরের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার আশায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হন। রাসূল (সা) সামুরার একজন সাথীকে নির্বাচন করেন এবং তাঁকে ফিরিয়ে দেন। তখন সামুরা বলেন: আপনি তাকে নির্বাচন করলেন এবং আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। অথচ আমি তার চেয়েও শক্তিশাল্ ীবিশ্বাস না হলে আমাদের কুস্তি লাগিয়ে দেখতে পানের। তাঁর কথা শুনে রাসূল (সা) তাঁদের দুজনের কুস্তি লাগার নির্দেশ দেন। কুস্তিতে সামুরা তাঁর প্রতিপক্ষ কিশোরকে উুঁচু করে ফেলে দেন। তাই দেখে রাসূল (সা) ত৭াকেও রণক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি দান করেন।৬ ইবন হিশাম বলেন: রাসূল (সা) সামুরা ইবন জুনদুব ও রাফে’ ইবন খাদীজকে উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তখন তাঁদের দুইজনেরই বয়স পনেরো বছর।৭ উহুদের পর থেকে সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।

রাসূলে কারীমের (সা) জীবনকালে তিনি মদীনায় বসবাস করেন। পরে তিনি বসায় বসতি স্থাপন করে।৮ হিজরী ৫০ সনে কূফার ওয়ালী মুগীরা ইবন শু’বার (রা) মৃত্যুর পর মু’য়াবিয়া (রা) কূফার সাথে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে বসরার ইমারাতের দায়িত্বও যিয়াদ ইবন সুমাইয়্যার ওপর অর্পণ কনের। যিয়াদ সামুরাকে (রা) স্বীয় প্রতিনিধি ও সহকারী হিসাবে নিয়োগ করেন। যিয়াদ ছয় মাস করে বসরা ও কূফায় অবস্থান করতেন। সামুরাও উভয় স্থানে তাঁর অনুপস্থিতির সময় দায়িত্ব পালন করতেন। যিয়াদ বসরায় থাকলে তিনি কূফায় এবং তিনি কূফায় থাকলে সামুরা বসরায়-এভাবে।৯

যিয়াদের শাসনকাল নানা দিক দিয়ে স্বরণযোগ্য। তাঁর সময়ে শাস্তি ও নিরাপত্তার প্রতি এত অধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো যে, কোনপ্রকার বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ তাঁর সময়ে বসরা ও কূফায় দেখা দিতে পারেনি। খারেজী বিপ্লবপন্থীদের একটি দল, যারা পূর্ব থেকেই সোখানে বিদমান ছিল, একবার মাথা উঁচু করলে ভালোমত তাদের দমন করা হয়।

চুতর্থ খলীফা আলীর (রা) জীবদ্দশায় খারেজীদের উদ্ভাব হয়। এক সময় তারা আলীরই (রা) অনুসারী ছিল। পরে তারা অশাস্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী দল হিসাবে নিজেদেরকে পরাজিত হয় এবং তাদের অনেক সাহসী যোদ্ধা মারা যায়। তবে তাদেরকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। সুযোগ পেলেই তারা মাথা উঁচু করে বিদ্রোহের পতাকা উডডীন করতো। এই উগ্রপন্থািদের হাতে বহু সাহাবীসহ অসংখ্য নিরপরাধ মুসলমানের রক্ত ঝরেছে। খলীফা আলী (রা) শাহাদাত বরণ করেন এই পথভ্রষ্ট চরমপন্থেিদর হাতে।১০ বসরা ও কূফা ছিল তাদের মূল কেন্দ্র। ুযয়াদ তাদের নির্মূল ও চিশ্চিন্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত সামুরার (রা) সিদ্ধান্তের সাথে মিলে যায়।১১ ইবন হাজার বলেন: সামুরা ছিলেন খারেজীদের প্রতি ভীষণ কঠোর।১২ ইতিহাস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে দেখা যায়, ুযয়াদ ও তাঁর ছেলে উবায়দ্ল্লুাহ বসরায় প্রায় সত্তর হাজার লোক হত্যা করেন। আর এর সাথে সামুরাও জড়িত ছিলেন।১৩ ইমাম জাহাবী বলেছেন: সামুরা (লা) বহু মানুষ হত্যা করেছেন।১৪

আমের ইবন আবী আমের বলেন: আমরা ইউনুস ইবন হাবীবের মজলিসে বসা ছিলাম। উপস্থিত লোকেরা বললো: এই যমীন যে পরিমাণ রক্ত চুষেছে পৃথিবীর আর কোন ভূ-খণ্ড তেমন চোষেনি। এখানে সত্তর হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আমি ইউনুসকে কথাটি হত্যা কিনা তা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: হাঁ। প্রম্ণ করা হলো: এ কাজ কারা করেছে? বললেন: যিয়াদ, তাঁর ছেরে উবায়দুল্লাহ ও সামুরা।১৫ ইমাম আল কুরতুবী বলেন: সামুরার নিকট কোন খারেজীকে আনা হলে তিনি তাকে হত্যা করতেন এবং বলতেন: আকাশের নীচে এ হচ্ছে নিকৃষ্টতম নিহত ব্যক্তি। কারণ, তারা মুসলমানদের কাপির বলে এবং মানুষের রক্ত ঝরায়।”১৬

সামুরার এমন কঠোরতার কারণে খারেজীরা ছিল তাঁর প্রতি ভীষণ ক্ষুদ্ধ। তারা সামুরাকে খারাপ জানতো। তাঁর এরূপ আচরণের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাতো। পক্সান্তরে বসরার তৎকালীন জ্ঞানী গুনীরা যাঁদের মধ্যে ইবন সীরীন ও হযরত হাসান আল বসরীর মত খ্যাতিমান লোকও আছেন, তাঁর প্রশংসা করতে। তাঁরা সামুরার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দিতেন।১৭

ইতিহাস ও সূীরাতের গ্রন্থাবলীতে উল্লেখিত এ সকল তথ্য দেখে আজ আমাদের মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, সামুরার (রা) মত একজন সাহাবীর হাত মানুষের রক্তে রঞ্জিত হতে পারে কিভাবে এর উত্তরে বলা যেতে পারে, ইতিহাসের সকল তথ্য হাদীসের মত সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। হতে পারে তৎকালীন গোলযোগপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ অপবাদ তাঁর প্রতি আরোপ করা হয়েছে। এমন নজীর ইতিহাসে বিরল নয়।

তাছাড়া ইতিহাসের এ অধ্যায়টি বুঝার জন্য খারেজীদের উদ্ভব, বিকাশ, তাদের দর্শন, সর্বোপরি বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি তাদের নির্মম আচরণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঠিক ইতিহাস আমাদের জানা থাকা দরকার। তারা একটি চরমপন্থী অসংখ্যা নিরপরাধ মানুষ। নিবির্চচারে তারা হত্যা করেছে বিরুদ্ধবাদীদের। রাসূলুল্লাহর (সা) বিপুলসংখ্যাক সাহাবী তাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। সামুরার (রা) মন্তব্যেও এই সত্য ফুটে উঠেছে, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একজন শাসক হিসেবে তাদের প্রতি নির্মম হওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আর এ কারণ ইবন সীরীন ও হযরত হাসান আল বসরীর মত শ্রেষ্ঠ মনীষীরা তাঁকে অকুষ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, রাসূলুল্লাহর (সা) একজন মাহন সাহাবী অন্যায়ভাবে মানুষের রক্ত ঝরাতে পারেন না।

হিজরী ৫৩ সনে যিয়াদের মৃত্যু হলে রাষ্ট্র প্রশাসন ব্যবস্থায় কিচু পরিবর্তন হয়। বসরা এবং কূফা দুইটি স্বতন্ত্র প্রদেশের মর্যাদা লাভ করে এবং দুই প্রদেশে দুইজন ওয়ালী নিয়োগ লাভ করেন। সামুরা বসরার ওয়ালী হন এবং প্রায় একবছর এ পদে বহাল থাকেন।১৮ হিজরী ৫৪ সনে আমীর মু’য়াবিয়ার (র) নির্দেশে এ পদ থেকে তিনি অপসারিত হন।

সামুরা ইবন জুনদুবের (রা) মৃত্যু সন নিয়ে মত পার্থক্য আছে। হিজরী ৫৮, ৫৯ ও ৬০ সনের কথা বর্ণিত হয়েছে।১৯ ইবনু ইমাদ আল হাম্বলী হিজরী ৬০ সনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।২০ তিনি বসরা না কূফায় মারা যান, সে সম্পর্কে মতভেদ আছে।২১ কেউ কেউ বলেছেন, তিনি বসরার ওয়ালী ছিলেন এবংয় কূফায় মারা যান। আবার একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কূফায় মৃত্যুবরণকারী রাসূলুল্লাহর (সা) সর্বশেষ সাহাবী।২২

মাসুরার (রা) মৃত্যু হয় অস্বাভাবিক ভাবে। শেষ জীবনে তিনি ভীষণ ঠন্ডা অনুভব করতেন। চিকিৎসা স্বরূপ দীর্ঘদিন গরম পানিতে বসে শরীর গরম করতেন। অবশেষে এটা কালব্যাধিতে রূপ নেয়। একদিন ভীষণ ঠাণ্ডা  অনুভব করতে থাকেন। তাঁর চারপাশে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হরো; কিন্তু কোন কাজ হলো না। তিনি বললেন, আমার পেটে যে কি অবস্থা হচ্ছে, তা বুঝাবো কি করে। এমন এক অস্থিরতার মধ্যে হাঁড়ির গরম পানিতে বসতে গিয়ে টগবগ করে পুটন্ত পানিতে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন।২৩ হিলাল ইবন উমাইয়া বলেন, তিনি সেঁক দিতে গিয়ে াসতর্ক অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা যান। যদি এ বর্ণনা সত্য হয় তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) ভবিষ্যদ্বাণীর অর্থ ছির দুনিয়ার আগুন। আখেরাতের আগুন নয়।২৪ ইবন আবদিল বার বলেন, সামুরার এভাবে মৃত্যু হওয়াতে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়।

হযরত সামুরার (রা) মৃত্যু সম্পর্কে রাসূলে কারীমের (সা) একটি ভবিষ্যদ্বাণী রিজাল ও সীরাত শাস্ত্রে গ্রন্থসমূহে দেখা যায়। আনাস ইবন হাকীম আদ-দাব্বী বলেন, আমি মদীনায় ঘোরাফেরা করছিরাম। হঠাৎ আবূ হুরাইয়ার সাথে দেখা হলো। ান্য কোন কথা বলার আগেই তিনি সামুরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস কররেন। আমি সামুরা বেঁচে থাকার খবর দিলে খুব খুশী হরেন। তারপর বললেন: আমরা দশজন এক বাড়ীতে একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ছিরাম। এক সময় তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের সবার মুখের দিকে তীক্ষèভাবে তাকারেন। তারপর দরজার দুইটি বাজু ধরে  বরলেন: আখেরুকুম মাওতান ফিন নার।’Ñতোমাদের মধ্রে সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী আগুনে যাবে অথবা আগুনে পুড়ে মৃত্যু হবে। আমাদের সেই দশজনের আটজন মারা গেছে। বেঁচে আছি আমি ও সামুরা। এখন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের চেয়ে আর কোন কিছু প্রিয়তর আমার কাছে নেই।২৫ কোন কোন বর্ণনায় দশজনের স্থলে তিনজনের কথা এসেছে। তারা হলেন: সামুরা, আবূ মাহজুরা ও আবূ হুরাইরা।২৬

উল্লেখিত দলটির মধ্য থেকে হযরত সামুরা যে সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করেছেন, সে ব্যাপারে কোন দ্বিতম নেই। তবে আবূ মাহজুরা ও আবূ হুরাইয়ার (রা) মধ্যে কে আগে মারা গেছেন সে ব্যাপারে মত পার্থক্য দেখা যায়। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় আবূ হুরাইরা (রা) আগে মারা গেছেন। বালাজুরী বলেন: সামুরা বসরায় এবং আবূ মাহজুরা মক্কায় জীবিত ছিলেন। তাই হিজায তেকে কেউ বসরায় গেলে াসমুরা জিজ্ঞেস করতেন আবূ মাহজুরা সম্পর্কে, আবার কেউ বসরা থেকে মক্কায় গেলে আবূ মাহজুরা জিজ্ঞেস করতেন সামুরা সম্পর্কে। এবাবে একদিন আবূ মাহজুরা মারা যান সামূরার আগে।২৭

আউস ইবন খারিদ বলেন: আমি আবূ মাহজুরার কাছে গেরে তিনি সামূরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। আবার সামুরার কাছে গেরে তিনি আবূ মাহজুরা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।২৮ কিন্তু পূর্বে উল্লেখিত আনাস ইবন হাকীমের বর্ণনা এবং তাউসের একটি বণৃনা দ্বারা বুঝা যায় আবূ হুরাইরার আগেই আবূ মাহজুরা মারা যান। যেমন তাউস বলেন: কেউ আবূ হুরাইরাকে ভয় দেখাতে চাইলে বলতোঃ সামুরা মারা গেছেন একথা শুনেই তিনি হঠাৎ চিৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে যেতেন।২৯

সামুরার (রা) সন্তানদের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে সুলায়মান ও সা’দ নামে তাঁর যে দুই ছেলে ছিল, একথা জানা যায়। তিনি ছিলেন জ্ঞানী ও অতি মর্যাদাবান সাহাবীদের একজন। রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দমায় যদিও তিনি ছিলেন একজন তরুণ, তবুও রাসূলুল্লাহর (সা) অসংখ্য হাদীস স্মৃতিতে ধারণ করেন। ইমাম আল-কুরতুবী বলেন: তিনি ছিলেন বেশী পরিমাণে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনাকারী হাদীসের হাফেজদের একজন।৩০ তাহজীবুত তাহজীব গ্রন্থে বলা হয়েছে, ত৭ার বণিৃত হাদীসের লিখিত একটি কপি ত৭ার ছেলে কাছে ছিল।৩১ ইবন সীরীন বলেন,এই পুস্তিকাটি ছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার।৩২

সামুরা (রা) হাদীস স্মৃতিতে ধরে রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। স্মৃতিশক্তিও ছিল অসাধারণ যা কিছু স্মৃতিতে ধরে রাখতে চাইতেন, পারতেন। রাসূলে কারীম (সা) নামাযের মধ্রে দুইটি স্থানে চুপ থাকতেন। একটি তাকবীর তাহরীমার পরে যখন সুবহানাকা আল্লাহুম্মা’ পড়তেন। ান্যটি সূরা ফাতিহা পাঠের পর যখন আমীন’ বলতেন। এ বিষয়টি সামুরার স্মৃরণ ছির এবং তিনি তা আমলও করতেন। কিন্তু ইবরান ইবন হুসাইনের (রা) বিষযটি মনে ছিলনা। একবার সামুরা (রা) নামাযে রাসূলুল্লাহর (সা) আমলের অনুসরণ করলে ইমরান (রা) প্রতিবাদ করলেন। বিষয়টি উল্লেখ করে সঠিক তথ্য জানার জন্য মদীনার উবাই ইবন কা’বকে (রা) চিঠি লেখা হরো। জবাবে তিনি লিখলেন, সামুরা সত্য বলেছে। তাঁর ঠিকই স্মারণ আছে।৩৩

একবার ভাষণ দানকালে তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করেন। শ্রোতাদের মধ্যে সালাবা ইবন আবআদ আল-আবদী ছিলেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয়বার যখন সামুরা হাদীসটি বর্ণনা করেন, তখন শব্দের মধ্রে কোন তারমতম্য দেখা গলেনা।৩৪ প্রখর স্মৃতিশক্তির াধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হাদীস বণৃায় দারুণ সতর্ক ও রক্ষণশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন: আমি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে বহু কিচু শুনেছি। কিন্তু বয়ঃজ্যেষ্ঠ সাহাবীদের প্রতি আমার আদব তার সব বণৃনা থেকে আমাকে বিরত রাখে। তাঁরা আমার চেয়ে বয়সে বড়। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে আমি ছিরাম একজন তরুণ। তা সত্ত্বেও যা কিচু শুনতাম, স্মৃতিতে ধারণ করতাম।৩৫

কখনো কখনো তিনি হাদীস বণৃনা করতেন এবং তাতে কারো মনে কোনপ্রকার সন্দেহ দেখা দিলে তিনি জবাব দিয়ে তা দূর করতেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) একটি মুজিযার বর্ণনা শুনে প্রশ্ন করলো: খাবার কি বেড়ে গিয়েছিল? তিনি বললেন: বিস্ময়ের কি আছে? তবে আসমান ছাড়া আ কোথা থেকে এ বৃদ্ধি ঘটেছিল?৩৬

সামুরা সরাসবি রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবূ উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ থেকে শোনা হাদীস র্বণনা করেছেন। বিভিন্ন গ্রন্থ তাঁর সনদে মোট ১২৩ টি (্একশত তেইশ) হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ত৭ার থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ কয়েকজন হলো:

ইমরান ইবন হুসাইন, শা’বী, ইবন আবী লায়লা, ‘আলী ইবন রাবী’য়া, ‘আবদুল্লাহ ইবন বুরাইদা, হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, মুতরিফ ইবন শুখাইর, আবুল আলা আল-আতারাদী, কুদামা ইবন ওয়াবরা, যাযিদ ইবন উকবা, রাবী ইবন উমাইলা, হিলাল বিন লিয়াফ, আবূ নাদরা আল-আবদীম সা’লাবা ইবন আববাদ, আবূ কিলাবা আল-জারমী, সুলায়মান ইবন সামুরা।৩৭

সামুরার (রা) মধ্যে বহুবিধ চারিত্রিক সৌন্দর্য্য বিদ্যমান ছিল। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন বলেন: তিনি ছিরেন একজন গরম আমানতদার ও সত্যভাষী ব্যক্তি। ইসলাম ও মুসলমানদেরকে প্রাণি দয়ে ভালোভাসতেন।’৩৮ রাসূলুল্লাহর (সা) অভ্যাস ও সুন্নাতের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।৩৯

আরবে আহনাফ’ নামক এক ব্যক্তি বিশেষ একধরনেরর তরবারি তৈরী করেন, যা হানাফিয়্যা’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা) নিকটও একখানি এই তরবারি ছিল। সামুরা (রা) তার একটি নকল তৈরী করেন। তাঁর শাগরিদদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবন সীরীনও তার নকল তৈরী করেন।৪০

তথ্যসূত্র:

আবুল ইয়াসার কা’ব ইবন ‘আমর (রা)

মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনু সালেমা শাখার সন্তান আবুল ইয়াসার কা’ব (রা) ইতিহাস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে ত৭াকে শুধু আবুল ইয়াসার অথবা কা’ব অথবা উভয় নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা ‘আমর ইবন আব্বাস এবং মাতা নুসাইবা বিনত আযহার আল-মুররী। তিনিও বনু সালেমা গোত্রের কন্যা।১ ইমাম জাহাবী তাঁর পিতার নাম ‘উমার এবং আবুল ইয়সারকে আনসারদের অন্যতম স্তম্ভ বলে উল্লেখ করেছেন।২

আল-‘আকাবার দ্বিতীয় বাই’য়াতে (শপথ) তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ইসলামের ঘোষণা দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতে (আনুগত্যের শপথ) করেন। অনেকে তখন তাঁর বয়স বিশ বছর বলে উল্লেখ করেছেন।৩

ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরসহ পরবর্তীকালের সকল যুদ্ধে রাসূলে কারীমের (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেছেন।৪ বদর যুদ্ধে তিনি দারুণ সাহস ও বাহাদুরী দেখান। মক্কার পৌত্তলিক বহিনীর ঝাণ্ডা ছিল প্রখ্রাত মুহাজির সাহাবী মুসয়াব ইবন উমাইরের আপন ভাই আবু ‘আযীয ইবন উমাইরের হাতে। তিনি ঝটিকা বেগে অগ্রসর হয়ে তার হাত থেকে ঝাণ্ডা ছিনিয়ে নেন এবং তাকে বন্দী করেন।৫ এ যুদ্ধে তিনি মুনাববিহ ইবন হাজ্জাজ নামক এক পৌত্তলিক সৈনিককে হত্যা করেন।৬ তাছাড়া হযরত আব্বাসকে বন্দী করে রাসূলে কারীমের (সা) সামনে হাজির করেন। রাসূল (সা) আবুল ইয়াসারের ছোট-খাট দেহ এবং আব্বাসের বিশাল দেহের প্রতি তাকিয়ে অবাক হয়ে যান। তিনি আবুল ইয়াসারকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি আব্বাসকে কেমন করে বন্দী করলে? আবুল ইয়াসার বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁকে বন্দী করার ব্যাপারে আমাকে এমন এক ব্যক্তি সাহায্য করেছে যাকে এর আগে বা পরে আর কখনো আমি দেখিনি। লোকটি দেখতে  এমন। তাঁর কথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: তাকে বন্দী করার ব্যাপারে কোন মহান ফিরিশতা আমাকে সাহায্য করেছেন।৭ ইমাম আহমাদ আল-বরার সূত্রে বর্ণনা করেছেন: এ ব্যক্তি আমাকে বন্দী করেনি। আমাকে ব্দী করেছে অন্য এক ব্যক্তি, যে দেখতে এমন। তাঁর কথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: কোন ফিরিশতা তাকে সাহায্য করেছে।৮

ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন। বদরের কুরাইশ বন্দীদেরকে মদীনায় স্থানান্তরের জন্য রাসূল (সা) তাদেরকে সাহাবীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। মুস‘য়াব ইবন উমাইরের আপন ভাই আবূ আযীয ইবন উমাইর ছিরেন বন্দীদের একজন। তিনি পড়েন মুস‘য়াব ও আবুল ইয়সারের দায়িত্ব। আবুল ইয়াসারই তাকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে বন্দী করেছিলেন। মদীনার দিকে চলার পথে মুস‘য়াব তাঁর ভাই আবু আযীযের দুই হাতশক্ত করে বাঁধার জন্য আবুল ইয়াসারকে বলেন। একথা শুনে আবূ াাযীয দুঃখের সাথে বলেন: ভাই, আমার ব্যাপারে তুমি এ কথাও বলতে পারলে? মুস‘য়াব বললেন: তুমি নও, এখন এই আবুল ইয়াসার আমার ভাই।৯ ইমাম বুখািরী তাঁর তারীখে আবুল ইয়সারের বদরে যোগদানের কথা বলেছেন। ইবন হিশাম তাঁকে বদরীদের মধ্যে গণনা করেছেন।১০ বালাজুরী বলেছেন, বদর যুদ্ধের সময় থ৭ার বয়স বত্রিশবছর ছিল।১১ কিন্তু পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ বছর বয়সে তিনি আকাবার দ্বিতীয় বাই‘য়াতে অংশ গ্রহণ করেন। তাহলে বদরের সময় বয়স বত্রিশ বছর হয় কি করে?

আবুল ইয়সার খায়বার যুদ্ধে যোদ দেন। তাঁর সাথে জড়িত খায়বারের একটি ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী শত্র“ বাহিনীর দুর্গ অবরোধ করে আছেন। এ সময় এক রাতে প্রতিপক্ষ জনৈক ইহুদীর এক পাল ছাপল বকরীর গোশত খাওয়াতে পারবে? আবুল ইয়সার সাথে সাথে বলে উঠলেন: আমি পারবো। একভা বলেই তিনি বকরীর পালের দিকে ছুটে গেলেন। বকরীগুরি তখন দুর্গের আভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল। তিনি পিছন দিকের দুইটি ধরে ফেললেন এবয় তাদেরকে দুই বগলে চেপে ধরে নিয়ে এলেন। সঙ্গীরা বকরী দুইটি জবেহ করে রান্না করেছিল।১২

সিফ্ফীন ও পরবর্তী অন্যান্য ঘটনায় তিনি আলরি (রা) পক্ষে যোগদান করেছিলেন।১৩ বদরী সাহাবীদের মধ্যে তখন তিনি একাই বেঁচে।১৪

হিজরী ৫৫ সনে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। কেউ কেউ বলেছেন, বদরী সাহাবীদের মধ্যে তিনি সর্বশেষে মারা যান।১৫ শেস জীবনে তিনি খায়বারের ঘটনাটি বর্ণনা করতেন, আর রসিকতা করে বলতেন, আমার কাছ থেকে তোমরা গ্রহণ কর। সাহাবীদের মধ্যে এখন আমিই শুধু বেঁচে আছি।১৬ একথা দ্বারা তিনি শুধু বদরী সাহাবীদের কথা বুঝাতেন। মৃত্যুকালে ত৭ার বয়স হয়েছিল সত্তর বছরের উর্দ্ধে। অনেকে এক শো বিশ বছরের কথা বলেছেন। কিন্তু তা সঠিক নয়।

আবুল ইয়সারারের দেহটি ছিল স্থুল ও বেঁটে। তবে পেশী ছিল পাকানো রশির মত শক্ত। পেটটি ছিল মোটা।১৭

তিনি খুব কম হাদীস র্বণনা করতেন। তবে যা করতেন তাতে সীমাহীন সতকর্তা থাকতো। একবার উবাদাহ ইবন ওয়ালীদের নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) দুইটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন তিনি নিজের চোখ ও কানের ওপর আঙ্গুল রেখে বলেন, আমার এ চোখ এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে এবং এ কান রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছে।১৮ ইমাম মুসলিম তাঁর দুইটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীস দুইটির ক্রমিক সংখ্যা হলো ৩০০৬ ও ৩০০৭। তবে ইমাম বুখারী তাঁর কোন হাদীস বর্ণনা করেননি।১৯

তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উবাদাহ ইবন আল-ওয়ালীদ মূসা ইবন তালহা, উমার ইবন হাকাম ইবন রাফে, হানজালা ইবন কায়স যারকী, সায়ফী-মাওলা আবূ আইউব আল-আনসারী এবং রিবা’ঈ ইবন খারাশ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।২০ তিনি ছিলেন খুবই দয়ারু ও নবম দিলে মানুষ। বনু হারামের জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট  কিছু ঋণী ছিলেন। একদিন তাগাদা দিতে তার বাড়ীর দরজায় গিয়ে নাম ধরে ডাক দিরেন। কিন্তু কোন সাড়া পেলেন না। মনে করলেন, লোকটি বাড়ী নেই। তিনি ফিরে আসলেন এমন সময় একটি ছোট্ট ছেলে দৌঁড়ে এলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আব্বা কোথায়? ছেলেটি বললো, তিনি তো আমার মায়ের চৌকির নীচে লুকিয়ে আছেন। তখন তিনি চিৎকার করে বরলেন, এখন বেরিয়ে এসো। তুমি কোথায় আছ তা আমার জানা হয়ে গেছে। লোকটি বেরিয়ে এলো এবং তার অভাবের কাহনিী বর্ণনা করলো। আবুল ইয়াসারের অন্তর কোমল হয়ে গেল। লোকটির নিকট থেকে ঋণের দলিলটি চেয়ে নিয়ে লেখাগুলি কেটে দিলেন। তারপর বললেন, সম্ভব হলে পরিশোধ করবে। অন্যথায় সকল ঋণ মাফ করে দিলাম।২১

দাসী-দাসীদের সাথে তিনি সাম্য ও সমতার আচরণে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজেও তা কাজে পরিণত করতেন। একদিন উবাদাহ ইবন ওয়ালীদ হাদীস শোনার জন্য তাঁর নিকট এসে দেখলেন, তাঁর দাসের সামনে এক গাদা বই। িিন নিজের এক প্রস্থ চাদর ও একটি লুঙ্গি পরে আছেন। দাসের শরীরেও একই পোশাক। উবাদাহ বললেন, চাচা, ভালো হয় পোশাক একই জাতীয় এক জোড়া করে হলে। আপনি তার লুঙ্গিটি নিয়ে নিন এবং আপনার চাদরটি তাকে দিয়ে দিন। আথবা আপনার লুঙ্গিটি তাঁকে দিয়ে তার চাদরটি আপনি নিন। আবুল ইয়সার তাঁর কথা শুনে তাঁর মাথার ওপর হাত রেখে দু’আ করলেন। তারপর বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ হচ্ছে, তোমরা যা পরবে দাসদেরও তাই পরতে দেবে, তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তাই খেতে দেবে।২২

ইমাম আবূ দাউদ ও নাসাঈ আবুল ইয়সারের সূত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি দু’আ বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) বলতেন: হে আল্লাহ! আমি ধ্বংস থেকে তোমার আশ্রয় চাই। আমি আশ্রয় চাই পতন থেকে। পানিতে ডোবা, আগুনে পুড়ে যাওয়া ও বার্দ্ধক্য থেকেও তোমার আশ্রয় চাই। আরো আশ্রয় চাই মৃত্যুর সময় শয়তানের প্ররাচনা থেকে এবং তোমার রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে পলায়ণপর অবস্থায় ও বিষাক্ত জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গের দংশনে মৃত্যু থেকে।২৩

তথ্যসূত্র:

আসিম ইবন সাবিত ইবন আবিল আকলাহ (রা)

ভারো নাম ‘আসিম, ডাকনাম আবু সুলাইমান। পিতা সাবিত ইবন আবিল আকলাহ কায়েস এবং মাতা আশ-শামুস বিনতু আবী আমীর।১ এই ’আসিম ছিলেন দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের পুত্র প্রখ্যাত তাবেঈ আসিমের নানা।২ মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের সন্তান।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সীরাত বিশেষজ্ঞগণ তাঁকে আগে-ভাগেই ইসলাম গ্রহণকারী আনসারদের একজন বলে উল্লেখ রেছেন।৩ রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এসে হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের সাথে তাঁর মুয়াখাতবা ভ্রাতৃসম্পর্ক গড়ে দেন।৪

হযরত আসিম বদর ও উহুদল যুদ্ধে অশংগ্রহণ করেন।৫ বদর যুদ্ধের পূবর্ েহযরত রাসূলে কারীম (সা) সকল যোদ্ধাকে একত্র করে যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে মতবিনিময় করলেন। এক পর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আচ্ছা, বলতো তোমরা কিভাবে লড়বে? সাথে সাথে হযরত আসিম তীর-ধুনক হাতে করে দাাঁড়িয়ে গেলেন এবং বরলেন: দু’শো হাতের ব্যবধানে হলে তীর ছুড়বো। তার চয়ে নিকটে হলে নিযা এবং তার চেয়ে আরো নিকটে হলে তরবারি দিয়ে আঘাত করবো। তাঁর একথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: যুদ্ধের নিয়ম এটাই। আসিম যেভাবে লড়ে, তোমরা সেভাবেই লড়বে।৬

বদর যুদ্ধে মক্কার পৌত্তরিক বাহিনীর পতাকা প্রথমে তালহা ইবন আবীতালহার হাতে ছিল। হযরত আলীর হাতে সে নিহত হলে তার ভাই আবু সা’দ ইবন আবী তালহা তা তুলে নেয়। হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াককাসের হাতে সে নিহত হলে উসমান বা উসাম ইবন তালহা তা উঠিয়ে নেয়। হযরত হামযার হাতে সে নিহত হয় এবং মুসাফি ইবন তালহা সেটি তুলে নেয়। হযরত আসিম ইবন সাবিত তাকে হত্যা করেন। তারপর তার ভাই আল-জুলাস ইবন তালহা মতান্তরে কিলাব ইবন তালহা পতাকাটি তুলে ধরে। হযরত আসিম তীর মেয়ে তাকেও হত্যা করেন।৭

হযরত আসিম এই বদরে কুরাইশদের আর একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তি উকবা ইবন আবী মুয়াইতকে হত্যা করেন। এই উকবা ছিল একজন অতি নীচ প্রকৃতি লোক। সে ছিল মককায় রাসূলুল্লাহর (সা) চরম দুশমনদের একজন। নানাভাবে রাসূলকে (সা) কষ্ট দিত। ঝুড়ি ভরে ময়লা-আবর্জনা এনে রাসূলুল্লাহর (সা) ঘরের দরজায় ফেলে রাখতো। একদিন তো রাসূল (সা) সিজদাবনত আছেন, কোথা থেকে এই নরাধম ছুটে এসে তাঁর মাথার ওপর এমনভাবে চেপে বসে যে, নবীজীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। আর একদিনের ঘটনা, নবীজী সিজদায় আছেন। এই পাষন্ড কোথা থেকে মরা ছাগলের নাড়িভুঁড়ি কাঁধে করে এসে রাসূলুল্লাহর (সা) মাথায় ঢেলে দেয়। এহেন পাপিষ্ঠ বদরে মুসরমানদের হাতে বন্দী হলো। রাসূলে কারীমের নির্দেশে হযরত আসিম তাঁকে হত্যা করেন।৮ অবশ্য ইবন হিশাম বলেন: যুহরী ও আরো অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, উকবাকে হত্যা করেন হযরত আলী ইবন আবী তালিব (রা)।৯

তিনি উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইসলামের জন্য কিভাবে জবিনকে বাজি রাখতে হয় তার একটি নজীরবিহীন দৃষ্টান্তহ তিনি এ যুদ্ধে রেখে গেছেন। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলিম  বাহিনীর বিজয় হয়। কিন্তু একটি গিরিপথে রাসূল (সা) কর্তৃক মোতায়েনকৃত তীরন্দায বাহিনী রাসূলের (সা) নির্দেশ ভুরে তাদের স্থান ছেড়ে দেয় এবং গনিমাত কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে একদল পৌত্তলিক সৈনিক সেই গিরিপথ দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই আকম্মিক হামালায় বিজয়ী মুসরিম বহিনীর ওপর দারুণ বিপর্যয় নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম  বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। তারা তাদের অধিনায়ক রাসূল (সা) থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। এমন দুর্যোগময় মুহূর্তে পনেরো জন মুজাহিদ পাহাড়ের মত অটল হয়ে শত্র“র মুকাবিলা করেন। তাঁদেরই একজন হযরত আসিম ইবন সাবিত। এই উহুদদের দিন আট বক্তি মৃত্যুর জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেন। তাঁরা হলেন: আলী, যুবাইর, তারহা, আবু দুজানা, আল-হারিস ইবনুস সাম্মাহ, হুবাব ইবনুল মুনজির, আসিম ইবন সাবিত ও সাহল ইবন হুনাইফ। কিন্তু সেদিন ত৭াদের কেউই মারা যাননি।১০ ইবন সা’দ বলেন: উহুদে যখন সবাই পালিযে যায় তন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে মৃত্যুর জন্য বাইয়াত করেন।১১ তিনি ছিলেন এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর দক্ষ তীরন্দাযদের অন্যতম।১২

এই উহুদে তিনি পৌত্তলিক বহিনীর সদস্য তালহা ইবন আবী তারহার দুই পুত্র মুসাফি’ ও আল-হারিস মতান্তরে আল-জুলাসকে হত্যা করেন। তাদের দুইজনের দেহেই তিনি অতি সার্থকভাবে তীর বিদ্ধ করেন। মারাত্মক আহত অবস্থায় উভয়কে তাদের মা সুলাফা বিনতু সা’দের  কাছে আনা হয়। মা ছেলে মুসাফি’র মাথা কোলের ওপর রেখে জিজ্ঞেস করে: ববাছাধন! তোমার দেহে এমনভাবে তীর বিদ্ধ করেছে কে? সে বলে: আমি শুনতে গেলাম এক ব্যক্তি আমার প্রতি তীর ছুড়ে বলে উঠলো! এই লও, আমি ইবন আবিল আকলাহ। তখন সুলাফা কসম খায়, যদি সে কোন দিন আসিমের মাথা হাতে পায তাহলে সে তাঁর খুলিতে মদ পান করবে।১৩ আল্লাহ পাক তার এ কসম পূর্ণ করেননি।

এই উহুদে হযরত আসিম মককার আর এক াকৃতজ্ঞ দুরাচারীকে হত্যা করেন। তার নাম আবু উজ্জাহ আমর ইবন আবদিল্লাহ। এই লোকটি বদরে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তখন সে এই বলে রাসূলুল্লাহর (সা) অনুকম্পা ভিক্ষা করে যে, একটি বড় পরিবারের ভরন-পোষণের দায়িত্ব তার কাঁধে এবং সেই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (সা) তার প্রতি উদারতা দেখান। জীবনে সে আর কোনদিন রাসূলুল্লাহর (সা) বিরুদ্ধে ঘর থেকে বের হবে নাÑএই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তিনি তাকে মুক্তি দেন। এই আবু ইজ্জাহ কিন্তু উহুদ যুদ্ধের সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কুরাইশদের সাথ মককা থেকে বের হবেনা। সে তাদের বলেছিল, মুহাম্মদ আমার সাথে ভালো ব্যবহার এবং আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমি তার প্রতিদান এভাবে দিতে পানি না। কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারেনি। মককার সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা ও উবাই ইবন খালাফের চাপচাপিতে শেষ পর্যন্ত সে তাদের সাথে উহুদে আসে যুদ্ধ করতে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এবারও সে মুসলমনাদের হাতে ধরা পড়ে। আগের মত এবারও সে রাসূলুল্লাহর (সা) অনুকম্পা ভিক্ষা করে। উত্তরে রাসূল (সা) তাকে একটি চমৎকার কথা বলেন: একজন মুমিন (বিশ্বাসী) একই গর্তের সাপ বা বিচ্ছু দ্বারা দুইবার দংশিত হতে পারে না। তুমি কি ভেবেছো, মককায় ফিরে গিয়ে তোমার লোকদের বলবে, আমি মুহাম্মদকে দুইবার ধোঁকা দিয়েছি?

ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বুকাইর ইবন মিসমারর সূত্রে আবু ইজ্জাহর উহুদে বন্দী হওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: মুশরিকরা উহুদ থেকে পিছনে সরে গিয়ে দিনের প্রথম ভাগে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণ পর তারা সেখানে থেকে প্রস্থান করে। কিন্তু আবু ইজ্জাহ তখনও ঘুমিয়ে। এদিকে বেলা বেড়ে গেল। কুরাইশ বাহিনীর অনুসরণকারী মুসলিম বাহিনীর লোকেরা সেখানে এসে উপস্থিত হলো। হযরত আসিম ইবন সাবিত আবু ইজ্জাহকে সেখানে গেয়ে বন্দী করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট হাজির করেন। রাসূল (সা) তাঁর প্রাণ ভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেন। হযরত আসিম তার ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।’১৪ অবশ্য ান্য একটি বর্ণনামতে আবু ইজ্জাহর হত্যাকারী হযরত যুবাইর।১৫

হযরত আসিম (রা) হিজরী ৪র্থ সনে আর-রাজী-এর ঘটনায়  হুজাইল গোত্রের লোকদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এই ঘটনার বর্ণনায় ইমাম বুখারী ও অন্যান্য সীরাত বিশেজ্ঞদের মধ্যে কিছুটা অমিল দেখা যায়। এখানে সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হচ্ছে:

’আর-রাজী ছিরো হুজাইল গোত্রের একটি পানির কুপের নাম। এর পাশেই ঘটনাটি ঘটেছিল। তাই ইতিহাসে তা ইওমুল রাজী-এর ঘটনা নামে পরিচতি। ইমাম বুখারী আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) আসিম ইবন সাবিতের নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি গোয়েন্দা দল পাঠালেন। তাঁরা মদীনা থেকে যাত্রা করে উসফান ও মককার মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছালে হুজাইল গোত্রের বনু লিহইয়ান শাখা তা টের পায়। তারা এক শো তীরান্দায লোক নিয়ে দলটির ানুসরণ মুরু করে। এক পর্যায়ে দলটি যেখানে অবস্থান করেছিলো সেখানে পৌঁছে তারা খেজুরের আঁটি কুড়িয়ে পায় এবং তা দেখে তারা নিশ্চিত হয় যে দলটি মদীনা থেকে এসেছে। আঁটি পেয়ে তারা বলাবলি করেছিলো, এতো ইয়াসরিবের খেজুর। তারা দ্রুত অনুসরণ করে দলটি ঘিরে ফেলে। শত্র“র উপস্থিতি টের পেয়ে হযরত আসিম তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে একটি উুঁচ শক্ত টিলার ওপর আশ্রায় নেন।১৬

ইমাম বুখারীর উপরোক্ত বর্ণনা থেকে একটু ভিন্নতা দেখা যায় মুহাম্মদ ইবন ইসহাক, মুসা ইবন উকবা ও উরওয়া ইবন যুবাইরের বর্ণনায়। তবে মাগাযী শাস্ত্রে মুহাম্মদ ইবন ইসহাক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ইমাম শাফে’ঈ বলেছেন, কেউ মাগাযী (যুদ্ধ-বিগ্রহের কাহিনী) জানতে চাইলে তাকে মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।১৭

মুহাম্মদ ইবন ইসহাক আসিম ইবন উমার থেকে বর্ণনা করেছেন। উহুদ যুদ্ধের পর আল-আদল ও আল-কারাহ গোত্রদ্বয়ের কিছু লোক মদীনায় এসে বললো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কিছু লোক মুসলমান হয়েছে। আমাদের সাথে আপনার কিচু সঙ্গী পাঠান, যারা আমাদেরক দ্বীনের জ্ঞান দান করবেন, কুরআন পড়াবেন এবং ইসলামী শরীয়াত শেখাবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে ছয় ব্যক্তিকে পাঠালেন। তাঁরা হলে: (১) মারসাদ ইবন আবী মারসাদ আল-গানাবী, (২) খালিদ ইবনুল বুকাইর আল-লাইসী, (৩) আসিম ইবন সাবিত, (৪) খুবাইব আদী, (৫) যায়িদ ইবনুল দাসহান (৬) আবদুল্লাহ ইবন তারিক। দলনেতা ছিলেন মারসাদ ইবন আবী মারসাদ। মুসা ইবন উকবাও ইবন ইসহাকের মত বর্ণনা করেছেন।১৮

ইবন ইসহাক বলেন: তাঁরা ঐ লোকগুলির সাথে যাত্রা করলেন। হিজাযের দিকে আল-হাদয়ার’ কাছাকাছি হুজাইল গোত্রের আর-রাজী’ কুপের নিকট পৌঁছালে সাথের লোকগুলি বিশ্বাস ভঙ্গ করে দলটির ওপর আক্রমণের জন্য হুজাইল গোত্রের সাহায্য চেয়ে চিৎকর শুরু করে দিল। সাথে সাথে হুজাইল গোত্রের লোকেরা অস্ত্র হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো এবং চারদিক থেকেদলটিকে ঘিরে ফেললো। এই মুষ্টিমেয় লোক তাদের সাথে লড়বার জন্য হাতিয়ার তুলে নিলো। তখন হুজাইল গোত্রের লোকেরা বললো: আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে হত্যার উদ্দেশ্য আমাদের নেই। তবে মককাবাসীদের হাতে তোমাদেরকে তুলে দিয়ে বিনময়ে কিছু লাভ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।১৯ আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সাথে অঙ্গীকার করছি এবং তোমাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছি, আমরা তোমাদেরকে তুলে দিয়ে বিনিময়ে কিছু লাভ কাই আমাদের প্রত্যুত্তরে মারসাদ, খালিদ ও আসিম বললেন: আল্লাহর কসম! আমরা কোন মুশরিকের অঙ্গীকার ও চুক্ িকক্ষণো গ্রহণ করবো না। ইমাম বুখারী বলেন:এই সময় আসিম বলেছিলেন: আমি কাফিরের জিম্মায় যাব না। ইমাম বুখারী বলেন: এই সময় আসিম বলেছিলেন: আমি কাফিরের জিম্মায় যান না। হে আল্লাহ! আপনার নবীকে আমাদের খবর পৌঁছে দিন।২০ ইবন ইসহাক বলেন, এই সময় আসিম কেটি কবিতা পাঠ করেছিলেন, তার কয়েকটি পংক্তি নিুরূপ:২১

‘আমার কী যুক্তি থাকতে পারে, যখন আমি একজন শক্তিমান, দক্ষ তীরান্দায?

একটি ধনুকও আছে, আর তাতে আছে শক্ত ছিলো।

তার পিট থেকে উড়ে যয় লম্বা-চওড়া তীরে ফলা।:আর মৃত্যু? তাই তো সত্য, আর জীবন-তাাে মিথ্যা।

আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন রখেছেন, তাতো আসবে,

আর মানুষ, সে তো তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।

আমার মা হবেন নাককাটাÑ

যদিনা আমি তাদের সাথে লড়াই করি।’

এমনি ধরনের আরো কিছু পংক্তি সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।২২

‘আসিম কবিতার পংক্তি উচ্চারণ করতে করতে কাফিরদের প্রতিতীর ছুড়ছিলেন। তীর শেষহয়ে গেলে বর্শার চালাতে লাগলেন। এক সময় তাও ভেঙ্গে গেলে এবার থাকলো তরবারি তাই চালালেন। শাহাদাতের ক্ষণিক পূর্বে তিনি দু’আ করলেন:

‘আমি আবু সুলাইমান! আমার মত রোকেরাই তীর নিক্ষেপ করে। এ গৌরব লাভ করেছি সম্মানিত লোকদের থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে। শত্র“র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মারসাদ ও খালিদ শহীদ হয়েছে।২৩

ইমাম বুখারী বলেন:অতপর আসিম সহ তাঁর সঙ্গীরা যুদ্ধে হলে। শত্র“দের তীরে বিদ্ধ হয়ে আসিম তাঁর ছয়জন সঙ্গীসহ শাহাদাত বরণ করেন। বেঁচে থাকেন খুবাইব, যায়িদ ও অন্য এজন। কাফিরদের প্রতিশ্র“তি পেয়ে তারা আত্মাসমর্পণ করলেন। হাতের মধ্যে পেয়েই কাফিররা প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে তাঁদেরইে ধনুকের সূতা খুলে হাত-পাঁ বেঁধে ফেলে। এ েেদখে তাঁদেরে মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি বলে উঠলেন: এ হলো প্রথম ধোঁকা। একথা বলে তিনি তাদের সাথে চলতে একেবারেই অস্কীকার করলেন। তারা ানেক টানাহেঁচড়া করলো’ কিন্তু কিচুতেই তাঁকে নিতে পারলো না। শেষে কাফিররা তাঁকেও হত্যা করে। অবশিষ্ট দুইজনকেও মককায় নিয়ে হত্যাকরা হয়।২৪

হযরত আসিমকে (রা) হত্যার পর বনু হুজাইল তাঁর মাথা মককর এক মহিলা সুলাফা বিনতু সা’দÑএর কাছে বিক্রীয় সিদ্ধান্ত নিল। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসিম উহুদ যুদ্ধে এই মহিলার দুই ছেলেকে হত্যা করেন। তাই সে কসময খেয়েছিল, যদি কখনো আসিমকে হাতের মুঠোয় পায় তাহলে তাঁর মাথার খুলিতে মদ পান করবে।২৫৫সে আরো ঘোষনা দেয়, যে ব্যক্তি তাঁর মাথা এনে দেবে তাকে একশো উট পুরস্কার দেওয়া হবে।২৬ তাছাড়া তিনি বদরে পৌত্তরিক কুরাইশদের এক বড় নেত উকবা ইবন আবী মু’য়াইতকে হত্যা করেছিলেন। এজন্য তারাও আসিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে দারুণ খুশী হয়েছিল। তারা এই বলে উল্লাস প্রকাশ করেছিল যে, যাক, শেষ পর্যন্ত উকবার হত্যাকারীর পার্থিব জীবনের অবসান হয়েছে। তারা তাঁর দেহ আগুনে জবারিয়ে ভম্মিভূত করে তাদের পতিশোধ স্পৃহা নিবারণ করতে চেয়েছিল।২৭ কিন্তু আল্লাহ পাক তাদের কারও বাসনা পূরণ করেননি।

এদিকে হযরত আসিম মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহর দরবারে এই বরে দু’আ করেছিলেন যে, হে আল্লাহ! কোন মুশরিক যেন আমাকে স্পর্শ না করে এবং আমিও যেন তাদের কাউকে স্পর্শ না করি। আলÍাহ পাক তাঁর দু’আ কবুল করেছিলেন। তিনি মৌমাছি বা বোলতা পাঠিয়ে কাফিরদের স্পর্শ থেকে তাঁর রক্ষা করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত উরওয়া বলেন: মুশরিকরা তাঁর লাশের দিকে যাওয়ার উদ্যোগী হতেই কোথা থেকে এক ঝাঁক মৌমাছি এসে তাদেরকে এমনভাবে কামড়াতে শুরু করে যে, তারা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায়। দিনের আলোতে তারা অকৃতকার্য হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, রাতের আঁধারে পাশের কাছে যাবে। কিন্তু রাতের আঁধর নামতে না নামলে মুঘলধারে বৃষ্টি হয়। সে প্লাবনের প্রবল স্রোতে হযরত আসিমের লাশটি যে কোথায ভেসে যায় মুশরিকরা তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার কোন হদিস পায়নি। ইব সা’দ বলেন: হিজরাতের ছত্রিশ মাসের মাথায় সপর মাসে আর-রাজী’র এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। হযরত উমার যখন শুনলেন, মেওমাছি তাঁর দেহ রক্ষা করেছে, তখন মন্তব্য করলেন: একজন বিশ্বাসী বান্দাহকে আল্লাহ হিফাজত করেছে। জীবন ও মরণ উভয় অবস্থায় আল্লাহ তাঁকে মুশরিকের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেছেন। যেহেতু মৌমাছি তাঁকে রক্ষা করেছেন, এ কারণে ইতিহাসে তিনি হামিউদ দাার নামে পরিচিত।২৮

আর-রাজী’র এই বষাদময় ঘটনার পর হুজাইলীদের নিন্দায় মদীনার ইসলামী কবিরা সরব হয়ে ওঠেন। হাসসান ইনসাবিত আবু যায়িদ আল-আনসারী প্রমুখ কবি তাদের এ অপকর্মের নিন্দা এবং শহীদদের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করে। সীরাতু ইবন হিশাম সহ বিভিন্ন গ্রন্থে তার কিছু সংকলিত হয়েছে।২৯ হাসসান ইবন সাবিতের একটি মরছিয়া বা শোকগাঁথার দুইটি পংক্তি নিুরূপ:

আমার জীবনের শপথ! হুজাইল ই. মুদরিক দারুণ অপরাধ করেছে, খুবাইব ও আসিমের ব্যাপারে তারা দুর্নাম কুড়িয়েছে।৩০

হযরত ইবন আক্ষাস বলেন: আর-রাজী’র খবর মদীনায় পৌঁছালে মুনাফিকরা মন্তব্য করলো, এই হতভাগ্য লোকগুলো তাদের ঘরেও থাকলো না, তাদের নেতার বাণীও পৌঁছাতে পারলো না অথবা তারা জীবনের বিনিময়ে ােন কল্যাণও লাভ করাে না। তখন আল্লাহ পাক সূরা আল-বাকারার ২০৪ নং আয়াতটি নাযিল করেনঃ৩১

আর এমন কিছু লোক আছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাদের চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক।

হযরত আসিমের এক ছেলের নাম মুহাম্মদ। তৎকালীন আরবের বিখ্যাত কবি আল-আহওয়াস এই মুহাম্মদের পৌত্র।৩২

শত্র“ ঈমান, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি গভীর মুহাব্বত, পরিচ্ছন্ন মন, অতুলনীয় সাহস ইত্যাদি গুণ হযরত আসিমের চরিত্রের উজ্জলতম দিক।

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: মদীনার চিত্র বৈরী দুি গোত্রÑআউস ও খাযরাজ নিজ নিজ গোত্রের কৃতি সন্তানদের নাম নিয়ে গর্ব কতো। আউসবলতো, হানজালাÑযাঁকে ফিরিশতারা গোসল দিয়েছিল, সা’দ ইবন মু‘য়াজÑযাঁর মৃত্যুতে আরশ কেঁপে উঠেলিলো, আসিম ইবন সাবিত যাঁর দেহ আলÍাহ মৌমাছি দ্বারা রক্ষা করেছিলাম, মুযাইমা ইবন সাবিত যাঁর একার সাক্ষ্য দুজিনের সমানÑএাঁ সবাই আউস গোত্রের সন্তান।৩৩

তথ্যসূত্র :

 

আল হারেসা ইবন সুরাকা (রা)

আল হারেসা ইবনসুরাকা মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতা সুরাকা বিন হারেস এবং মাতা রাবী বিনতু নাদার। তাঁর ডাক নাম উম্মুল হারেসা। মা রাবী ছিরেন একজন উঁচুস্তরের সাহাবী এবং সাহাবী রাসূলুল্লাহর (সা) খাদেম আনাস ইবন মালিকের আপন ফুফু।১

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আগমনের পূর্বেই পিতার মৃত্যু হয়। মা জীবিত ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবিয়্যাতের মর্যাদা লাভের গৌরব অর্জন করেন। মায়ের সাথে ছেলেও ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা) আস-সায়িত ইবন উসমান ইবন মাজ’উনের (রা) সাথে তাঁর দ্বীনে ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করেছেন।২

বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। বদরে যাত্রার নির্দেশ লাভের পর তিনিই সর্বপ্রথম ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে চলতে শুরু করেন।৩ রাসূল (স) তাঁকে পর্যাবেক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে েিজর সংগে রাখেন।৪ তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তিনি যখন একটি ঝরনয় পানি পান করছিলেন তখন হিববান ইবন আরাফাত নিক্ষিপ্ত একট তীরের আঘাতে শাহাদাত বণ করেন।৫ বর্ণিত আছে, আনসারদের মধ্যে সর্বপ্রথম শহীদ তিনি। তবে কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তিনি উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। পূর্বোক্ত র্বণনাটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।৬

রাসূলুল্লাহর (সা) বদর থেকে মদীনায় ফিরে এলেন। আল হারেসার মা ছুটে এসে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল হারেসাকে আমি কতখানি ভালোবাসি তা আপনি জানে। যদি সে জান্নাতের  অধিকারী হয়ে থাকে তাহলে তো সবর করলাম। অন্যথায় আপনি দেখবেন আমি কি করি। রাসূলুল্লাহর (সা) বললেন: এসব তুমি বলছো কি? জান্নাতের সংখ্যা তো একটি বা দু’টি নয়। জান্নাত অনেক। আল হারেসা সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত আল ফিরদাউসের অধিকারী হয়েছে।৭ এই খোশখবর শুনে মা রাবী’ আনন্দে আ্মহারা হয়ে যান। মৃদু হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগেন: নাজ, নাজ ইয়া আল হারেসা-সাবাশ, সাবাশ, ওহে আল-হারেসা।৮

আল হারেসা ছিলেন দারুণ মাতৃভক্ত। উসুদুল গাবা’ গ্রনথকার লিখেছেন! তিনি ছিলেন মায়ের ভীষণ অনুগত ও বাধ্য।৯

একবার রাসূলে কারীম (সা) কেথাও যাচ্ছিরেন। পথে আল হারেসার সাথে দেখা। বললেন: হারেসা! আজ তোমারসকাল হলো কি অবস্থায়? হারেসা বললেন: এমন অবস্থায় যে আমি একজন খাঁটি মুসলমান। রাসূল (সা) বললেন: একটু ভেবে বল। প্রত্যেকটি কথার একটি গূঢ় ততত্ব থাকে। আল হারেসা আরজ কলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! দুনিয়া থেকে মুখ পিরিয়ে নিয়েছি। রাত কাটে ইবাদাত-বন্দেগীতে এবং দিন কাটে রোযা রেখে। বর্তমান মুহূর্তে আমি যেন নিজেকে আরশের দিকে যেতে দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে জান্নাতীরা জান্নাতের দিকে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামের দিকে চলছে। তাঁর কথা শোনর পর রাসূল (সা) বললেন: আল্লাহ যে বান্দার অন্তরকে আলোকিত করেন, সে অন্তর আর আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়না। আল হারেসা আরজ করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার শাহাদাতের জন্য দু’আ করুন। তিনি দু’আ করলেন। সে দু’আ কবুল হয়। বদর যুদ্ধের সময় তার বাস্তবায়ন হয়। তিনি শহাদাত বণ করেন।১০

তথ্যসূত্র:

আল-হারেস ইবন আস্-সিম্মাহ্ (রা)

আল-হারেস (রা)-এর ডাকনাম সা’ঈদ। পিতা আস সিম্মাহ ইবন আমর এবং মাতা তুমাদুর বিনতু আমর। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের শাখার সন্তান।১

রাসূলে কারীমের (সা) মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সবর ও ইসতিকলাল, ধৈর্য ও দূঢ়তার প্রতীক সুহাইব আল-রূমীর (রা) সাথেত৭র মুওয়াখাত বা দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।২

মূসা ইবন উকবা ইবন ইসহাক ও অন্যরা তাঁকে  বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বলে উল্লেখ করেছেন।৩ রাসূলে কারীমের (সা) সাথে বদরে যাত্রা করেন এবং রাওহা’ নামক স্থানে যাওয়ার পর কোন কারণে দেহের ােন হাড় ভেঙ্গে গেলে রাসূল (সা) তাঁকে মদীনয় ফেরত পাঠান। তবে যুদেÍদ শেষ তাঁকে বদরের গনীমাত (যদ্ধলব্ধ সম্পদ) ও সওয়াবের আংশীদার ঘোষণা করেন।৪

উহুদ যুদ্দের এক পর্যায়ে মুসলিম বনিী যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে তখন আল-হারেস দারুণ সাসের পরিচয় দেন। তিনি কুরাইশ বাহিনীর সদস্য উসমান ইবন আবদিল্লাহ ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুরীর বর্ম, ঢাল, তরবারি ইত্যাদি কেড়ে নিয়ে তাকেহত্যা করেন। এ খবর রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পৌঁছলে তিনি মনতব্য করেন: সকল প্রশংসা সেই আলÍাহ যিনি তাকে এ সুযোগ দান করেছেন।৫ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য য, আবদুলআহ ইবন জাহাশ (রা) এই উসমানকে ইতিপূর্বে নাখলায় টহলদানের সময় বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসেন। এরপর সে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত হয়ে আবার কুরাইশদের সাথে যোগ দেয়। উহুদে আল হারেস যখন তাকে হত্যা করছিলেন তখন উবাইদ ইবন হাজেয আল-আমেরীর দৃষ্টিগোচর হয়। সে অতর্কিত আল-হারেসের কাঁধে তরবারির প্রচণ্ড আঘাত হানে। আল-হারেস মারাত্মকভাবে আহত হন। দূর থেকে আবু দুজানাছুটে এস উবাইদ ইবন হাজেযকে আক্রমণ করে ধরাশীয়া করে ফেলেন। এরপর তাকে হত্যা করে খন্ড বিখন্ড করে ফেলেন।৬ রাসূল (সা) আল-হারেসকে নিহত উসমানের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম দান করেন।

উহুদে যখন মুসলমানরা বিক্ষিপ্ত হয়ে রাসূল (সা) থেকে ছিটকে পড়ে তখনও যে কয়েক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে অটল থাকেন, আল-হারেস ইবন আস-সিম্মাহ তাঁদের অন্যতম।৭ ইবন ইসহাক বলে, উহুদরে বিপর্যয়ের সময় মুসলমানরা যখন জানলো যে, রাসূল (সা) জীবিত হআছেন এবং তাঁকে  চিনতে পারাে তখনসবাই সেদিকে ছুটলো। এরপর আবু বকর, উমার আলী, তালহা, যুবাইর, আল-হারেস ইবন আস-সিম্মাহ সহ আরো কিছু মুসলমান রাসূলকে (সা) নিয়ে উপত্যকার দিকে যান।৮

উহুদের উিপত্যকায় রাসূলে কারীম (সা) সাহাবেিদর বেষ্টনীয় মধ্যে ঠেস দিয়ে বসা আছেন। এমন সময় মক্কার পৌত্তলিক নেতা উবাই ইবন খারাফ একেবারে কাছাকাছি এসে রাসূলকে (সা) সম্বোধন করে বললো: ওহে মুহাম্মদ! তুমি বেঁচে গেলে আমি বাঁচবো না। সাহাবীরা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কেউ একজন কিতাকে রুখবে?  বললেন: না তার দরকার নেই। যখন সে আরো কাছাকাছি এলা, রাসূল (সা) আল-হাসের ইবন আস-মিম্মাহর হাতথেকে ত৭ার নিযাটি নিলেন। তারপর ুবাই ইবন খালাফের মুখোমুখি হয়ে তার গলায় সামান্য খোঁচা দিলেন। আর তাতেই সে তার অতি প্রিয় ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে ছুটে পালালো।

ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায়থাকতে ইবাই ইবন খালাফের সাথে দেখা হলে সে বরতো: মুহাম্মদ! আমার বিশআস ওর ওপর সোয়ার হয়েই আমি তোমাকেহত্যা করবো। রাসূল (সা) বলতেন: না, তা পারবেনা। বরং আমিি তোমাকে হত্যা করবো ইনশাআল্লাহ। রাসূল (সা) তার গলায় যে খোঁচটির দিয়েছিলেন, তা ছিল অতি সামান্য। খোঁচা খেয় সে অস্থিরভাবে স্বপক্ষীয় লোকদর নিকট দৌড়ে গিয়ে  বলতে থাকে: আল্লাহ কসম! মুহাম্মদ আমাকেমেরে ফেলেছে। তার সাথীরা বললো: তোমার তো ুিই হয়নি। তুমিমনে হয় পালগ হয় গেছো। সে বললো: মুহাম্মদ মক্কায় থাকতে আমাকে বলতো: আমি তোমকে হত্যা করবো। আল্লাহর কসম! আমার প্রতি সে যদি কেবল থুথু নিক্ষেপ করতো তাতেই আমার মৃত্রু হতো।’ আল্লাহর এই দুশমন কুরাইশ কাফেলার সাথে মকআর ফেরার পথে সারাফ’ নামক স্থানে মারা যায়।৯ আসলে সে বুঝেছিল, আঘাত যত সামান্যই হোক, মুহাম্মাদের মুখ থেকে যে কথা উচ্চারিত হয়েছ তা সত্রে পরিণত হবেই।

উহুদ যুদ্ধে এক পর্যায়ে রাসূলে কারীম (সা) আল-হারেসকে জিজ্ঞেসকরলেন: তুমি কি আবদুর রমান ইবন আওফকে দেখেছো? বললেন: হাঁ ইয়া রাসূলালÍাহ! তিনি তো পাহাড়ের পাদদেশে পৌত্তরিকদের ভীড়ের মধ্যে ছিলেন। আমি তাঁর দিকে যাওয়ার জন্য মনস্থির করছিলাম। এমন সময় আপনার প্রতি আমার দৃষ্টি পড়লো। আমি এ দিকে চলে এলা। রাসূল (সা) বললেন: ফিরিশতারা তাঁর পক্ষে লড়ছে। একথা শোনার সাথে সাথে আল-হারেস ছুটে গেলেণ আবদুর রমানের দি।ে দেখলেন, ত৭ার সামনে কাফিরদের সাতটি রাশ পড়ে আছে তিনি আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করলেন: এদের সকলকে কি আপনি একাই হত্যা করেছেন? আবদুর রমান বললেন: এই আরতাত ইবন আবদির শুরাইবীল এবং ওকেÑএ দু’জনকে তো আমি হত্যা করেছি। কিন্তু অন্যদের হত্যকারী আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। আল-হারেস তখন বললে: রাসূল (সা) ঠিক কথাই বলেছেন। তাবারানী এ বর্ণনাটি সংকলন।১০

উহুদ যুদ্ধে শেষ পর্যায়ে রাসূল (সা) সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আল-হাসের সংগে সংগে তাঁর খোঁজে বের হলেন। তাঁর ফিরতে দেরী হচ্ছে দেখে আলী’ (রা) তাঁকে খুঁজতে বের হলেন।  আলী তখন একটি কবিতার দু’টি চরণ শুন শুন করে আবৃত্তি করছিলেন। তার অর্থ নিুরূপ:

‘প্রভু হে, আল-হাসে ইবন আস-সিম্মাহ একজন বন্ধুবৎসল এবং আমাদের মধ্যে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে গিয়ে সে হারিয়ে গেছে। আর সে যেখানেই যায় জান্নাত তালাশ করে।:১১

ইবন হিশাম চরণ দু’টি একটু ভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। তনি একথাও বলেছেন, চরণ দু’টি আলীর নয়।১২

এরপর আলী (রা) আল হারেসের দেখা পেলেন। তাঁরা উভয়ে হামযাকে (রা) মৃ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলন এবং ফিরে এসে রাসূলকে (সা) খবর দিলেন। এদিকে কাফিরা তাঁর অন্য সঙ্গীদের হত্যা করে; ন্তিু তিনি তা জানতেন না। তিনি আমর ইবন উমাইয়্যার সাথে একটি গাছের নীচে বসে ছিলেন। হঠাৎ আকাশে শুক জতীয় পাখী দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বুঝত পারলেন কিছু একটা ঘটেছে। আমরকে সংগে করে সেই দিকে চললেন। দেখলেন, এক স্থানে বেশ কিছু মুসলমানের রক্তাক্ত ও ধুলিমলিন লাশ বিগলিত অবস্থায়পড়ে আছে। এদৃশ্য দেখে তিনি সঙ্গী আমরকে বললেন, এখন আমাদের উচিত মদীনায় ফিরে গিযে বিষয়টি তাঁকে জানাাে। এখল বল তোমার ইচ্ছা কি? আল-হারেস বললেন: যেখানে আল-মুনজির ইবন আমর নিহত হয়েছেন, আমি কিভাবে সেখন থেকে পালিয়ে যেতে পারি? লোকে বলবে, আল-মুনজির নিহত হয়েছেন, আর আমরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। এরপর তিনি বলবে আল-মুনজির নিহত হয়েছেন আমি কিভাবে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারি? লোকে বলবে আল-মুনজির নিহত হয়েছেন, আর আমরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। এরপর তিন আমরকে সংগে করে শত্রদের দিকে অগ্রসরন হন। প্রতিপক্ষ ছিল সুসজিজ্ত এবং সংখ্যায় অনেক। তারা বৃষ্টির মত তীর নিক্সেপ করে আল-হরেসের সারা দেহ ঝাঝরা করে ফেলে। তিনি ঘটনা স্থলেই শাহাদাতবণ করেন। ত৭ার সংগী আমর শত্র“ পক্ষের হাতে বন্দী হন। আমের ইবন আততুফাইল যখন জানতে পারে যে বন্দীআমর মুদার গোত্রের লোক তখন সে তাঁর মাথার সামনের দিকের চুল মুড়ে দিয়ে মুক্ত করে দেয়। কারণ তার মা মান্নত করেছিল যে, সে একটি বন্দী মুক্ত করবে। এভাবে আমের তার মায়ের মান্নত পূণ করে। এটা হিজরাতের ৩৬ মাসের মাথায় সফর মাসে সংঘটিত হয়।১৩

আল-হারেসের কে ছেলে সাদ সিফফীনে আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধগিয়ে শাহাদাত বরণ করেন। সাদের মায়ের নাম ছিল উম্মুল হাকাম খাওলা বিনতু উকবা। তাঁর অন্য একটি ছেরেন নাম আবুল জুহাইম। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্য লাভে ধন্য হন এবয় রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হাদীসও বর্ণনা করেন। তাঁর মায়ের নাম উতাইলা বিনতু কা’ব। ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে বলেছেন, মদীনা ও বাগদাদে এখনও আল-হারেসের বংশধর বিদ্যামন আছে।১৪ আল-হারেসের মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর কিছু শ্লোক সংকলিত হয়েছে।১৫

তথ্যসূত্র:

’উমাইর ইবন সা’দ (রা)

উমাইর ইবন সা’দ মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের ভাগ-বিমুখ একজন আনসারী সাহাবী। চারিত্রিক গুণÑবৈশষ্ট্যের জন্য তিনি নাসীজু ওয়াহদিহ উপাধি লাভ। করেন। তাঁকে এ উপাধি দান করন খলীফা উমার (রা)।১

উমাইরের শৈশব কালেই পিতা সা’দ উবাইদ মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর মা জুলাস ইবন সুওয়ায়িদকে দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন। মায়ের সাথে উমাইরও চলে যান জুলাসের তত্ত্বাবধানে। জুলাস তাঁকে নিজের সন্তানদের মত অত্যন্ত øেহ ও যতেœর সাথে প্রতিপালন করেন। ইবন হিশাম বলেন: এই জুলাস ও তাঁর ভাই াল-হারেস, দুইজনই ছিলেন মুনাফিক (কপট মুসলমান)।২

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, আবু যায়িদ ছিলেন মদীনার আনসারদের বিখ্যাত চার ক্বারীর অন্যতম। তাঁর আসল নাম সা’দ ইবন উবাইদ। আর আমাদের আলোচ্য এই মহান সাহাবীর সম্মানিত পিতার নামও ছিল সা’দ ইবন উবাইদ। এ কারণে অনেক ঐতিহাসিক, বিশেষতঃ ইবন সা’দ ভুল করেছেন। তাঁরা উমাইরকে ক্বারী আবু যায়িদ সা’দ ইবন উবাইদের পুত্র বলে উল্লে করেছেন। এটা তাঁদের এক মারাত্মক ভুল। যেমন বিনুল কালবী বলেছেন: ত৭ার পিতা সা’দ ইবন উবাইদ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।৩ অথচ উভয় সা’দের  মৃত্যুর সনের মধ্যে বিসম্তার ব্যবধান রয়েছে। তাাড়া ুমাইরের পিতা সা’দ ছিলেন আউস গোত্রের এবং আবু যায়িদ সা’দ ছিরেন খাযরাজ গোত্রের সন্তন। প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবন মালিক বলেছেন, আবু যায়িদ সম্পর্কে তাঁর চাচা। আর এটা তো স্বীকৃত যে, আনাস খাযরাজ গোত্রের লোক। তাছাড়া আবু যায়িদ কো বংশধর রেখে যাননি।৪

উমাইরের পালক পিতা জুলাসের তত্ত্বাবধানে থাকা কালেই সম্ভবত তিি ইসলামগ্রহণ করেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাহাবিয়্যাতের (রাসুলুল্লাহর (সা) সাহচর্য) পৌরব তো তিনি অর্জন করেছেন, তবে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কোন যুদ্ধে যাওয়ার মর্যাদা লাভ করতে পারেননি।৫ এর কারণ হলো রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় যুদ্ধে যাওয়ার বয়স তাঁর হয়নি। কোন কোনগ্রন্থকার বলেছেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও জিহাদে তিনি জুলারে সহগামী হতেন। এ প্রসঙ্গ তাঁরা তাবুক যুদ্ধের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।৬

খলীফা উমারের (রা) খিলাফতকালে সেনাপতি আবু উবায়দার সাথে তিনি শাম অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। উমার তাঁকে শামের একটি বাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করন। কিছুদিন পর তাঁকে হিমস ও দিমাশকÑএর ওয়ালী নিয়োগ করেন। উমারের (রা) ওফাত পর্যন্ত তিনি এ পদের বহাল ছিলেন। ইমাম যুহরী বলেন: সা’ঈদ ইবন আমির উবন হিজিম মৃত্যুবরণ করলে উমাইর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। উমারের নিহত হওয়া পর্যন্ত মুয়াবিয়া ও তিনি এক সাথে শামে ছিলেন। অতঃপর খলীফা সুমান উমাইরকে অপসরণ করে গোটা শাম মু’য়াবিয়ার অধীনে ন্যন্ত করেন।৭

সাফওয়ান ইবন আমর বলেন: মুয়াবিয়া গোটা শামের আমীর হিসেবে নিয়োগ লাভের পর হিমসের মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভষণ দেন। তাতে বলেন: ওহে হিমসবাসী! আল্লাহ তা’য়ালা সৎ ও যোগ্য আমীরদের দ্বারা আপনাদেরকে ধন্য করেছেন। আপনাদের প্রথম আমীর য়িাদইবন গানম। তিনি আমার চেয়ে ভলো লোক ছিলেন। আপনাদের দ্বিতীয় আমীর সা’ঈদ ইবন আমির। তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি। তারপর আপনাদের আমীর হলেন উমাইর। উমাইর অতি ভালো মানুষ। এখন আমি আপনাদের আমীর। আপনারা আমাকে জানবেন।৮

উমাইরের (রা) শামে থাকাকালের বেশ কিছু ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে কিচু তুলে ধরা হলো:

একবার কলীফা উমার (রা) একটি বাহিনীর অধিনায়ককরে তাঁকে শামে পাঠান। কিছু দিন পর খলীফার নিকট এসে বললেন: আমীরুল মুমিনীন! আমাদের অবস্থান এবং আমাদের শত্র“দের অবস্থানের মধ্যবর্তী স্থানে ‘আরাবসোস’ নামে একটি শহর আছে। এর অধিবাসীরা আমাদের গোপন তথ্য আমাদের শত্র“দের নিকট সরবরাহ করে থাকে। তার ওপর ভিত্তি করে শত্র“রা আমাদের সাথে এমন এমন আচরণ করে তাকে।

খলীফা বললেন: তুমি শহরের অধিবাসীদের শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবার প্রস্তাব দেবে। বিনিময়ে তাদেরকে একটি ছাগলের পরিবর্তে দুইটি ছাগল, একটি গরুর পরিবর্তে দুইটি গরু এবং এভাবে তাদের প্রত্যেকটি জিনিসের পরিবর্তে দুইটি জিনিস দান করবে। এ প্রস্তাব গ্রহণ করলে আমাদের প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী আমরা তাদেরকে দ্বিগুণ জিনিস দান করবো। আর এ প্রস্তাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তাদের সাথে আমাদের যে চুক্তি আছে তা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে এক বছর অপেক্ষা করবে।

উমাইর আরজ করলেন: হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার এ অঙ্গিকারটি আমাকে একটু লিখিতভাবে দান করুন।

খলীফার অঙ্গিকার পত্রটি নিয়ে উমাইর শামে ফিরে গেলেন এবং আরাবসোরে’ ধ্বংস করে ফেলেছে। আরো নানা কথা তিনি শুনতে পেলেন। খলীফা তাঁর ওপর ভীষণ ক্ষেপ গেলেন। সাথে সাথে উমাইরকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। উমাইর মদীনায় খলীফার দরবারে হাজির হরেন। ক্ষুব্ধ খলীফা তাঁর মাথার ওপর ছড়ি ঝাঁকিয়ে বললেন: তুমি আরাবসোস’ ধ্বংস করে ফেলেছে! ‘উমাইর কোন উত্তর না দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। খলীফা দরবার থেকে উঠে ঘরে ফিরলেন। উমাইর সাক্ষাতের অনুতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁকে প্রদত্ত খলীফার অঙ্গিকার পত্রটি পাঠ করে শোনালেন। উমার মন্তব্য করলেন: আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।৯

খলীফা উমার (রা) তঁকে হিমসের ওয়ালী পাঠালেন। এক বছরের মধ্যে তাঁর কোন খবর পেলেন না। অবশেষে তিনি কাতিবকে (সেক্রেটারী) বললেন: আমার মনে হচ্ছে সে আমাদের আস্থা নষ্ট করেছে। তুমি তাঁকে লেখ: আমার এ পত্র পৌঁছা এবং পাঠমাত্র মুসলমানদের নিকট থেকে খাজনা, যাকাত যাকিছু আদায় করেছো তা নিয়ে মদীনায় চলে আসবে।’ চিঠি পেয়ে উমাইর বিলম্ব না করে একটি চামড়ার থলিতে সামান্য কিছু পাথেয় ও পানির একটি পিয়ালা ভরে কাঁধে ঝোলালেন এবং লাঠিটি হতে নিয়ে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করলেন।

মদীনা থেকে হিমসের দূরত্ব কয়েক শে মাইল। মদীনায় যখন পৌঁছলেন তখন তাঁর মাথার চুল লম্বা হয়ে গেছে। রোদ, ধুলোবালি ও দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সরাসরি খলীফার দরবারে পৌঁছে বললেন: আসসালামু আলাইকা ইয়া আমীরাল মুমিনীন!Ñআমিরুল মুমিনীন, আপনার প্রতি সালাম! খলীফা তাঁর দিকে চোখ তুলে দেবে বিষ্ময়ের সাথে প্রশ্ন করলেন: এ তোমার কী হাল হয়েছে? উমাইর বললেন: আপনি আমার আবার কি হাল দেখলেন? আমি কি সুস্থ নই? আমার ওপর কি দুনিয়াদারির ছোঁয়া লেগেছে? আমি কি দুনিয়ার শিং দুইটি ধরে টানাটানি করছি? খলীফা ধারণা করেছিলেন, ‘উমাইর হয়তো প্রচুর অর্থ-সম্পদ সাথে নিয়ে এসেছেন। তাই প্রশ্ন করলেন: হেঁটে এসেছো?

বললেন: হাঁ, হেঁটেই এসেছি।

Ñকেউ কি তোমাকে একটি বাহন দিয়ে সাহায্য করলো না?

Ñআমি কারো কাছে বাহন চাইনি, আর কেউ দেয়ওনি।

Ñ তারা খুব খারাপ মুসলমান হয়ে গেছে।

Ñ উমার! আল্লাহ আপনাকে মানুষের গীবত করতে নিষেধ করেছেন। আমি তো তাদেরকে ফজরের নামায জামায়াতে আদায় করতে দেখেছি।

খলীফা নির্দেশ দিলেন: উমাইরের নিয়োগ নবায়ন করা হোক। উমাইর বললেন: আমি আপনার অধীনে বা ভবিষ্যতে আর কারো অধীনে আর কোন দায়িত্ব পালন করবো না। কারণ, অপরাধ থেকে আমি মুক্ত থাকতে পারিনি। সেখানে খ্রীষ্টান জিম্মীকে আমি বলেছি, আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুন। ওহে উমার আপনি কি আমাকে এমন কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন? অন্য সাহাবীদের মত মৃত্যুবরণ না করে বেঁচে থাকলাম এবং যেদিন থেকে আপনার সাথ কাজ করছি সেটি আমার জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিন। এরপর তিনি খলীফার অনুমতি নিয়ে মদীনা থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি নিরিবিলি স্থানে চল যান এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। একদিন খলীফার নে যেন মনে হলো, ‘উমাইর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। তাই তাঁকে পরীক্ষার জন্য এক শো দীনারসহ আল-হারেস নামক এক ব্যক্তিকে তাঁর কাছে পাঠালেন। যাওয়ার সময় লোকটিকে বললেন: তুমি উমাইরের কাছে একজন অতিথির ছদ্মবেশে যাবে। যদি তাঁর ওখানে পার্থিব ভোগ-বিলাসের কোন চিহ্ন দেখতে পাও তাহলে সাথে সাথে ফিরে আসবে। আর তাঁকে খুব করুণ অবস্থায় দেখলে এই এক শো দীনার তাঁকে দান করবে।

লোকটি চলে গেল। উমাইরের বাস্থানে পৌঁছে দেখলো, তিনি দেওয়ালের পাশে বসে বসে জামার ময়লা খুটে খুটে তাতে তালি লাগাচ্ছেন। লোকটি সালাম দিল। উমাইর সালামের জবাব দিলে তাকে থাকার অনুরোধ করলেন। লোকটি থেকে গেল।

উমাইর: কোথা থেকে আসা হচ্ছে?

Ñমদীনা থেকে।

Ñ আমীরুল মুমিনীনকে কেমন ছেড়ে এসেছেন?

Ñ একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি হিসেবে।

Ñ আমীরুল মুমেনীন কি এখন আর হুদ (শরী’য়াত নির্ধারিত শাস্তি) কায়েম করেন না?

Ñতিনি তাঁর এক ছেলেকে সম্প্রতি ব্যভিচারের শাস্তি দান করেছেন। ছেলেটি মারা গেছে।

Ñআল্লাহ, তুমি উমারকে সাহায্য কর। তোমার ভালোবাসা ছাড়া তাঁর মধ্যে আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই।

লোকটি উমাইরর গৃহে তিন দিন অতিথি হিসেবে থাকলো। এ তিনটি দিন শুধু যবের রুটিন কিছু টুকরো চিবিয়েই তকে কাটাতে হলো। এ অবস্থা দেখে লোকটি বললো: এ কয়টি দিন তো আপনি আমাকে প্রায় অভুক্তই রেখেছেন। এরপর সে দীনারগুলি বের করে উমাইরের দিকে এগিয়ে দিল। দীনার দেখামাত্র তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন: আমার প্রয়োজন নেই।’ একথা বলে দীনারের থলিটি তিনি লোকটির দিকে ঠেলে দিলেন। এ সময় উমাইরের সহধর্মিনী বললেন: আপনার প্রয়োজন না থাকলে যাদের প্রয়োজন আছে তাদের মধ্যেবিলি করুন।’ উমাইর বললেন: এগুলির ব্যাপারে কোন কিছু করার কোন অধিকার আমার নেই।’ তখন স্ত্রী তাঁর ওড়না ছিঁড়ে কয়েকটি টুকরো করেন। তারপর দীনাগুলি ভাগ করে সেই টুকরোগুলিতে বেঁধে আশেপাশের শহীদদের সন্তানদের মধ্যে বন্টন করে দেন।

এদিকে লোকটি খলীফা উমারের নিকট ফিরে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: উমাইর দীনারগুলি কি করেছ? আমি তো জানিনে’Ñলোকটি জবাব দিল। এরর খলীফা উমার (রা) দীনারগুলিসহ ুমাইরকে আসার জন্য লিখলেন। উমাইর খলীফার দরবারে হাজির হরেন। দীনারগুলি কি করেছো?Ñখলীফা জানতে চাইলেন। বললেন: আমার া ইচ্ছা হয়েছে করেছি। তার সাথে আপনার সম্পর্ক কি? না তোমাকে বলতেই হবে’Ñখলীফা জোর দিয়ে বললেন। উমাইর বললেন: আমি সেগুলি আমার আখিলাতের প্রয়োজনে আগে পাঠিয়ে দিয়েছি। খলীফা তখণ কচু খাদ্যদ্র্য ও দুইখানা কাপড় তাঁকে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। উমাইর তখন বললেন: খাদ্যের প্রয়োজন আমার নেই। বাড়ীতে আমি দুই সা পরিমাণ যব রেখে এসেছি। সেগুলি খেতে খেতেই আল্লাহ পাক হয়তো অন্য রিযিকের ব্যবস্থা করবেন। তবে কারপড় দুইখানি নেওয়া যেতে পারে। কারণ, আসার সময় আমি দেখে এসেছি, অমুকের মায়ের কাপড় নেই। সে ন্যাংটা প্রায়। একথা বলে কাপড় দুইখানি বগলদাবা করে বাড়ীতে ফিরে আসেন। এর অল্পদিন পরেই তিনি মারা যান।১০

ঊমারের (রা) মৃত্যু সন নিয়ে সীরাত শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদেও মধ্যে মতপার্থক্য আছে। কেউ কেউ বলেছেন, হিমসে তিনি স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলেন। আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে, মতান্তরে খলীফা ‘উমার অথবা ‘ঊসমানের (রা) সময়ে সেখানেই মারা যান।১১ একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি মদীনায় মারা যান এবং খলীফা উমার (রা) তাঁর জানাযার নামায পড়িয়েছেন।১২ অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘উমাইরের মৃত্যুও খবর পেয়ে খলীফা’ উমার (রা) তাঁর জন্য শোক প্রকাশ ও মাগফিরাত কামনা করেন। তারপর তিনি মদীনার ‘বাকী’ আল-গারকাদ’ গোরস্থানে যান। তাঁকে অনুসরণ করে আরো অনেকে লক্ষ্য করে বললেন: ‘আচ্ছা, আপনারা প্রত্যেক নিজ নিজ বাসনা প্রকাশ করুণ তো।’ তখন একজন বললো, ‘আমার যদি প্রচুর ধন-সম্পদ থাকতো, তাহলে তা দিয়ে আমি এত পরিমাণ দাস মুক্ত করতাম।’ আর একজন বললো: ‘আমার দেহে যদি অদমনীয় শক্তি হতো তাহলে আমি যমযম কূপ থেকে বালতি দিয়ে পানি তুলে হাজীদেও পান করাতাম।’ এভাবে আরো অনেকে নিজ নিজ মনোবাসনা ব্যক্ত করলো। সবশেষে ‘ঊমার (রা) বললেন: ‘আমি যদি উমাইর ইবন সা’দের মত আরো যোগ্য লোক পেতাম তাহলে মুসলমানদের কাজে আমি তাদেও সাহায্য নিতাম।১৩

হিমসের ওয়ালী থাকাকালে একদিন তিনি মসজিদেও মিম্বওে দাঁড়িয়ে ভাষণ দানকালে বলেন: ‘আপনারা জেনে রাখুন, ইসলাম একটি সুরক্ষা প্রাচীর ও একটি সুদৃঢ় দ্বার বিশেষ। ইসলামের প্রাচীর হলো সত্য ও ন্যায়। প্রাচীর ফেটে গেলে এবং দ্বার ভেঙ্গে গেলে ইসলাম পরাভূত হবে। তবে শাসক যতদিন কঠোর থাকবে ইসলাম ততদিন রক্ষক থাকবে। শাসকের কঠোরতার অর্থ এই নয় যে, সে তরবারি দ্বারা হত্যাযজ্ঞ চালাবে। তার অর্থ হলো, সত্যেও সাথে ফায়সালা করবে এবং ন্যায়কে আকড়ে থাকবে।১৪’ আবদুর রহমান ও মাহমুদ নামে দুই ছেলে তিনি রেখে যান।

‘উমাইর (রা) ছিলে মর্যাদাবান ও যুহ্হাদ (পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি উদাসীন) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম।১৫ সাহাবীদের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অতি উঁচু স্তরের। মুফাদ্দাল আল-গাল্লাবী বলেনঃ আনসারদের মধ্যে সর্বাধিক যাহিদ (দুনিয়াবিরাগী) ব্যক্তি তিনজনঃ আবুদ দারদা, শাদ্দাদ ইবন আউস ও ‘উমাইর ইবন সা’দ।১৬ ইবন সীরীন বলেন: খলীফা ‘উমার (রা) তাঁর চারিত্রিক মাধূর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর উপাধি দেন ‘নাসীজু ওয়াহদিহ’-সৃষ্টি; ও স্বভাব বৈশিষ্ট্যে একক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।১৭

‘উমাইরের ছেলে আবদুর রহমান বলেনঃ’ আবদুল্লাহ ইবন উমার আমাকে বলেছেন: সাহাবীদের মধ্যে তোমার পিতার চেয়ে ভালো মানুষ ছিল না।১৮ ইবন সুমাই হিমসে যে সকল সাহাবী গমন করেন তাঁদেও প্রথম তাবকা বা শ্রেণীতে উমাইরের নামটি উল্লেখ করেছেন।১৯

স্বভাব ও নৈতিক চরিত্রে ‘উমাইর (রা) ছিলেন আদর্শ মানের। তাকওয়া-পরহিযগারীতে তাঁর সমকক্ষ কাউকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তাঁর মধ্যে ছিল তীব্র ঈমানী আবেগ। শৈশব থেকেই তাঁর অন্তরে ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ঈমান ও ভালোবাসার ব্যাপাওে তাঁর মধ্যে কপটতর লেশমাত্র ছিল না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাবুক যুদ্ধেও সময়ের একটি ঘটনায়। এ সময় তাঁর পালক পিতা আল-জুলাস রাসূলুল্লাহর (সা) শানে একটি আপত্তিকর মন্তব্য করে। উমাইর সাথে সাথে বিষয়টি রাসূলুল্লাহর (সা) অবহিত করেন। অথচ আল-জুলাসের আশ্রয়েই তিনি লালিত-পালিত এবং তখনও তাঁরই আশ্রিত।২০ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি দৃঢ় ঈমান ও গভীর ভালোবাস ছিল তাঁর নিকট সব কিছুর উর্দ্ধে।

আল-জুলাসের সাথে ‘উমাইরের ঘটনাটি ইবন হিশামসহ বিভিন্ন গ্রন্থকার বর্ণনা করেছেন। তাবুক যুদ্ধে যারা যোগদান করেনি আল-জুলাস তাদেও একজন। এ সময় আল-জুলাস একদিন ‘উমাইরের উপস্থিতিতে মন্তব্য করেন: ‘এই বক্তি (মুহম্মাদ (সা) সত্যবাদী হলে আমরা হবো গাধার চেয়েও অধম।’ ‘উমাইর কথাটি শুনে বললেন: আল্লাহর কসম, আল-জুলাস! আপনি সকলের চেয়ে আমার বেশী প্রিয় ব্যক্তি। আপনার অনুগ্রহ আমার ওপর সবচেয়ে বেশী। আপনার ওপর কোন বিপদ-মুসীবত আপতিত হলে আমি কষ্ট পাই সবচেয়ে বেশী। আপনি একটি মন্তব্য করেছেন। আমি যদি বলি আপনারা গাধার চেয়েও অধম তাহলে আপনাকে লজ্জা দেওয়া হবে। আর যদি চুপ থাকি তাহলে তাতে আমার দ্বীন ধংশ হবে। দ্বিতীয়টি অপেক্ষা প্রথমটি আমার নিকট অধিকতর সহজ।

‘উমাইরের এ প্রতিবাদ আল-জুলাসকে দারুণ ক্ষুব্ধ করে। সাথে সাথে ‘উমাইরের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার অঙ্গিকার করেন। এদিকে ‘উমাইর সাথে সাথে বিষয়টি রাসূলকে (সা) অবহিত করলেন। রাসূল (সা) তাদেও দুইজনকে এক সাথে ডেকে ব্যাপারটি সম্পর্কে জুলাসকে জিজ্ঞেস করলেন। আল-জুলাস হলফ করে বললেন: ‘উমাইর আমার সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। সে যেমন বলেছে, আমি তেমন কিছু বলিনি। এভাবে আল-জুলাস ঘটনাটি একেবারেই অস্বীকার করলেন। কিন্তু নবী রাসূললের নিকট কোন সত্য গোপন থাকে না। ওহী ও ইলহামের মাধ্যমে তাঁরা সব কিছু জেনে যান। আল-জুলাসের ক্ষেত্রেও তাই হলো। আল্লাহ পাক ওহী নাযিল কওে তাঁর নবীকে সব কিছু জানিয়ে দিলেন। রাসূল (সা) তখন সূরা আত-তাওবার ৭৪ নং আয়তটি পাঠ করলেন।

“তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরী বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী হয়েছে। আর তারা কামনা করেছিল এমন বস্তুর যা তারা পায়নি। আর এসব তাই পরিণতি ছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদেরকে সম্পদশালী কওে দিয়েছিলেন নিজের অনুগ্রহের মাধ্যমে।”

রাসূলে কারীম (সা) যখন আয়াতটির শেষাংশ-‘বস্তুত এরা যদি তাওবা কওে নেয়, তা হবে তাদের জন্য মঙ্গল। আর যদি তা না মানে, তাহলে তাদেরকে আজাব দেবেন আল্লাহ তা’য়ালা, বেদনাদায়ক আজাব দুনিয়া ও আখিরাত।’- পাঠ করেন তখন আল-জুলাস বলে উঠলেন, আমি তাওবা করছি। ইবন ইসহাক বলেনঃ এ ঘটনার পর আল-জুলাস সত্যিকারভাবে মুসলামন হন। তাঁর বাকী জীবনে আর কোন ত্র“টি-বিচ্যুতি দেখা যায়নি। তাওবা কবুল হওয়ার খুশীতে আল-জুলাস ‘উমাইরকে আবার নিজ তত্ত্বাবধানে ফিরিয়ে নেন। আজীবন তাঁকে প্রতিপালন করেন। আয়ত নাযিলের পর রাসূল (সা) ‘উমাইরের কান ধরে বলেন: ছেলে, তোমার এ কান ঠিক শুনেছিল। ‘উরওয়া বলেন: এ ঘটনার পর ‘উমাইরের মর্যাদা সবার উর্দ্ধে উঠে যায়।২১

‘উমাইর (রা) থেকে রাসূলল্লাহর (সা) একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যারা রাবী হলেন, ছেলে মাহমুদ, আবূ তালাহ আল-খাওলানী, আবু ইদরীস আল-খাওলানী, রাশেদ ইবন সা’দ, হাবীব ইবন ‘উবায়েদ, যুহাইর ইবন সালেম প্রমুখ।২২

তথ্যসূত্র:

 

রাফে’ ইবন মালিক ইবন’ আজলান (রা)

আবু মালিক ও আবু রিফা’য়া ডাকনাম। আসল নাম রাফে’। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের সন্তান। পিতা মালিক ইবন ‘আজলান।

মদীনার আনসার সম্প্রদায় একটি অতি সৌভাগ্যবান গোষ্ঠী বা দল। বিশেষতঃ সত্তর মতান্তওে পচাত্তর জনের একটি দল। তাঁদেও মধ্যে আবার আগে ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়ে মর্যাদার তারতম্য আছে। আনসারদেও মধ্যে বনু নাজ্জার ও খাযরাজ গোত্র আগে ভাগে ইসলামের আহবানে সাড়া দানের ক্ষেত্রে প্রায় সমান সমান। তবে এ ব্যাপাওে তাঁদের সকল সম্মান, মর্যাদা ও কৌলিন্য কিন্তু তাঁদেরই দুই ব্যক্তির জন্য। সেই দুই মহান ব্যক্তি হলেন: মু’য়াজ ইবন ‘আফরা’ ও রাফে’ ইবন মালিক ইবন ‘আজলান।

রাসূলে কারীম (সা) মক্কায় ইসলামের দা’ওয়াত দিয়ে চলেছেন। বিশেষতঃ হজ্জ মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগযোগ করে তাদেরকে ইসলামের দা’ওয়াত দিচ্ছেন। মক্কায় রাসূলুল্লাহর (সা) নুবুওয়াতী যিন্দেগীর এমনই এক পর্যায়ে মদীনার খাযরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তি ‘উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। এই ছয় সদস্যের দলটির সাথে মু’য়াজ ও রাফে’ ছিলেন। তাঁদের মক্কায় উপস্থিতির খবর পেয়ে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করলেন। তাঁরা ধীরস্থির ভাবে মনোযোগ সহকারে রাসূলুল্লাহর (সা) বক্তব্য শোনেন। তারপর তাঁদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম মু’য়াজ ও রাফে’ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) করে মুসলমান হন।

তাবাকাতে ইবন সা’দা-এ বর্ণিত হয়েছে, সেইবার মদীনা থেকে মু’য়াজ ও রাফে’- কেবল এই দুই জনই গিয়েছিলেন। তাঁরা মক্কায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহর (সা) আতœপ্রকাশের কথা শুনতে পেলেন। এক পর্যায়ে তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর কথা শুনলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।  সা’দ ইবন আবদুল হামীদের বর্ণনা অনুযায়ী দুইজনের মধ্যে এই রাফে’ প্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াত করেন। তিনি আরো বলেন, খাযরাজ গোত্রের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।  বালাজুরী বলেন: রাফে’ আনসারদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।

ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর মদীনায় ফিরে আসলেন এবং খুব জোরেশোওে ইসলাম প্রচারের কাজে আতœনিয়োগ করলেন। ইবনুল আসীর বলেনঃ

‘যখন তাঁরা মদীনায় ফিওে এসে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন তখন গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এমন কোন ঘর ছিল না যেখানে রাসূলুল্লাহর (সা) চর্চা হতো না’।  এর পরের বছর রাফে বারো ব্যক্তি এবং তার পরের বছর ৭০/৭৫ ব্যক্তির সাথে পর পর দুই বার মক্কায় যান এবং ঐতিহাসিক বাই’য়াতে আকাবায় অংশগ্রহণ কওে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতে করেন। সর্বশেষ বাই’য়াতের সময় তিনি বনু যুরাইক- এর ‘নাকীব’ বা দায়িত্বশীল মনোনীত হন।

একটি বর্ণনায় এসেছে, মদীনায় কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁরা সর্বসম্মতভাবে মু’য়াজ ও রাফে’কে মক্কায় পাঠান। উদ্দেশ্য, তাঁরা রাসূলুল্লাহকে (সা) অনুরোধ করবেন, তিনি যেমন মদীনায় একজন প্রচারক পাঠান, যিনি মদীনায় আল কুরআন শিক্ষা দেবেন। তাঁদেও আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল (সা) মুস’য়াব ইবন ‘উমাইরকে মদীনায় পাঠান।

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরত করে আসার পর সা’ঈদ ইবন যায়িদ ইবন ‘আমর ইবন নুফাইলের সাথে রাফে’র দ্বীনী ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা কওে দেন।

রাফে’র ইসলামী জীবনের সময়কাল খুবই স্বল্প। এ স্বল্পসময়ে মাত্র দুইটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়-বদও ও উহুদ। বদওে তাঁর যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য আছে। ইবন ইসহাক তাঁকে বদরী সাহাবীদেও মধ্যে গণ্য করেননি। মূসা ইবন ‘উকবা ইমাম ইবন শিহাব আয-যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাফে’ বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।  এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো খোদ রাফে’র মন্তব্য যা ইমাম বুখারী সংকলন করেছেন। রাফে’ বলেছেন: ‘এতে আমি খুশী নই যে, আকাবার পরিবর্তে বদরে অংশগ্রহণ করি।’  যদিও তিনি এ মন্তব্য দ্বারা তাঁর বদরের চেয়ে ‘আকাবা’র অধিক গুরত্বের কথা বুঝাতে চেয়েছেন, তবে এ দ্বারা তাঁর বদরে যোগদান না করার কথাও বুঝা যায়। ঐতিহাসিক বালাজুরী বলেন: রাসূল (সা) যখন মদীনা থেকে বদরের দিকে যাত্রা করেন তখন মদীনার অনেকের মত রাফে’ও মনে করেন, রাসূল (সা) কোন যুদ্ধে যাচ্ছেন না। আর এ কারণেই তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী হননি।

রাফে’ (রা) হিজরী তৃতীয় সনের উহুদ যুদ্ধে অংশ্রগ্রহণ করেছিলেন। ইসলামী যিন্দেগীর এটাই তাঁর প্রথম ও শেষ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

রাফে’ (রা) ইসলামী জীবনের সংক্ষিপ্ত সময়ে বিভিন্ন প্রকার দ্বীনী সেবা প্রদান করেন। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুবাল্লিগ (প্রচারক)। সেই প্রথম পর্যায়ে মদীনায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে তাঁর বিরাট অবদান আছে। ইসলাম গ্রহণের পর গোটা মদীনায় কিভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটানো যায়- এটাই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা ও ফিকর। তাই তিনি প্রতিবছর ছুটে গেছেন মদীনা থেকে মক্কায় এবঙ গোপনে ‘আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হয়েছেন এবং জরুরী হিদায়াত ও নির্দেশ নিয়ে মদীনায় ফিরে এসছেন। আকাবার সর্বশেষ বাই’য়াতের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নির্বাচিত দ্বাদশ নাকীবের অন্যতম নাকীব হিসাবে অর্পিত মহাদায়িত্ব সার্থকভাবে পালন করেছেন।

বর্ণিত আছে রাফে’ সবার আগে সূরা ইউসূফ মদীনায় নিয়ে আসেন। মদীনার সকল মসজিদেও পূর্বে মসজিদে বানু যুরাইকে সর্বপ্রথম কুরআন পঠিত হয়েছিল। আর সে পাঠক ছিলেন তিনি। মক্কায় রাসূরুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতের সময় যতটুকু আল কুরআন তাঁর ওপর নাযিল হয়েছিল, তিনি তা লিখে সাথে করে মদীনায় নিয়ে এসেছিলেন এবং নিজ খান্দানের সকলকে সমবেত কওে তা পাঠ কওে শুনিয়েছিলেন।

এমন একটি বর্ণনাও আছে যে, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় থেকে যান। সূরা ত্বাহা নাযিল হওয়ার পর তা লিখে মদীনায় নিয়ে আসেন। মোটকথা, এমনি ধরনের আরো বহু সেবা তিনি দান করেন।

হাকেম তাঁর আল-মুসতাদরিক গ্রন্থে রাফে’ ইবন মালিকের একটি হাদীস সংকলন করেছেন। হাদীসটির বর্ণনাকারী তাঁর পৌত্র মু’য়াজ ইবন রিফা’য়া ইবন রাফে’।

তথ্যসূত্র:

 

যায়িদ ইবনে দাসিনা (রা)

হযরত যায়িদের (রা) পিতার নাম দাসিনা ইবনে মু’য়াবিয়া। মদীনার খাযরাজ গোত্রের ‘বনু বায়্যাদা’ শাখার সন্তান।  তিনি যে কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তাঁর জীবনের অন্যান্য ঘটনাবলী দ্বারা বুঝা যায়, মদীনায় ইসলামী দা’ওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন ইসলামের গ্রহণের পর বেশী দিন এ পার্থিব জীব ভোগ করার সুযোগ পাননি। রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশে দ্বীনের দা’ওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে গিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন।

উহুদ যুদ্ধেও পওে, ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, আদাল ও করা গোত্রের কিছু লোক রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে আবেদন জানায়, কুরআন ও শরীয়াতের তা’লীম ও তারবিয়াত দিতে পারে এমন কিছু লোক আমাদের ওখানে পাঠান সেখানে ইসলামের প্রসার ঘটেছে। তাদের এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত রাসূলে কারীম (সা), খুবাইব ইবনে আদী ও যায়িদ ইবনে দাসিনাসহ মোট ছয়জনকে সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁরা মদীনা থেকে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে তাঁরা হুজাইল গোত্রের আর-রাজী’ নামক জলাশয়ের পাশে মুশরিকদের (পৌত্তলিক) দ্বারা আক্রান্ত হন। হযরত খুবাইব ও যায়িদ (রা) তাদেও হাতে বন্দী এবং অন্যরা শহীদ হন। তাঁদেও দু’জনকে হাত বেঁধে মক্কায় নিয়ে যায় এবং হুজাইল গোত্রের দু’বন্দীর বিনিময়ে তাদেরকে কুরাইশদের নিকট অর্পণ করে। সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা মুসলমানদের হাতে নিহত তার পিতা উমাইয়্যা ইবন খালাফের হত্যার বদলা নেওয়ার জন্য যায়িদ ইবন দাসিনাকে গ্রহণ করে পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারবে ভেবে সে দারুণ পুলকিত হয়ে ওঠে।

মক্কার পৌত্তলিকরা অনেক চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শেও পর সিদ্ধান্ত নিল যে, যায়িদকে ‘তানঈম’ নামক স্থানে হত্যা করা হবে। সাফওয়ানের ছিল ‘নিস্তাস’ নামে একটি দাস। সাফওয়ান তাঁদের দু’জনকে বধ্য-ভূমিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দিল। সেখানে পৌঁছার পর তাঁরা এক আজব পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। আবু সুফইয়ান যায়িদকে (রা) লক্ষ্য করে বললেন: যায়িদ, তোমাকে আল্লাহর নামে কসম করে বলছি। তুমি সত্য কথা বলবে। যদি তোমার স্থলে মুহাম্মদকে আনা হয়, তাঁকে হত্যা করা হয়, আর তুমি তোমার ঘওে নিরাপদে ফিওে যাও-তুমি কি তা পসন্দ করবে? যায়িদ (রা) ধীর-স্থিও ভাবে জবাব দিলেন: মুহাম্মদেও গায়ে কাঁটার একটি আঁচড় লাগুক আর আমি আমার পরিবারের লোকদের মধ্যে নিরাপদে অবস্থান করি- এ আমার মোটেই পছন্দ নয়।

আবু সুফইয়ান তার এ জবাব শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। অবলীলাক্রমে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল- মুহাম্মদের সঙ্গী-সাথীরা তাকে যে পরিমাণ ভালবাসে, দুনিয়ার কারো কোন বন্ধু তাকে এতখানি ভালোবাসেনা। এরপর তাদের নির্দেশ নিসতাস তাঁকে হত্যা করে। এটা হিযরী তৃতীয় মতান্তওে চতুর্থ সনের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। কোন কোন বর্ণনায় ‘বীওে মাউনার’ ঘটনায় হযরত যায়িদ (রা) বন্দী ও শহীদ হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘গাযওয়াতুর রাজী ও বীওে মাউনা’- অধ্যায়ে ইবন ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, এটা উহুদের পরের ঘটনা। তাঁর বর্ণনায় আরো বুঝা যায়, ‘আর-রাজী ও বীরে মাউনা দু’টি সম্পূর্ণ পৃথক ঘটনা। আর আর-রাজী’র ঘটনায় খুবাইবের সাথে যায়িদ মক্কায় নিহত হন।

মূসা ইবন ‘উকরা তাঁর মাগাযীতে বর্ণনা করেছেন, খুবাইব ও যায়িদকে একই দিনে হত্যা করা হয়। আর সেদিন মদীনায় রাসূলকে (সা) বলতে শুনা যায় “ওয়া আলাইকুমা আও ওয়া আলাইকাস্ সালামু।”

‘উরওয়া ও মূসা ইবন ‘উকবা বলেনঃ কুরাইশরা যায়িদকে ফাঁসিতে ঝুলানোর পূর্বে তার দেহ তীওে মেওে ঝাঝরা করে তাঁর ঈমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করে। কিন্তু এতে তাঁর ঈমান ও আতœসমর্পণের ইচ্ছার বৃদ্ধিই ঘটে।

ইবন ইসহাক ইবন ‘আব্বাসের (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ‘আর-রাজী’র’ নায়করা এমন অসহায়ভাবে নিহত হলে মদীনার মুনাফিকরা বলতে লাগলোঃ এই হতভাগাদের জন্য দুঃখ হয়, যারা এমন অসহায়ভাবে শেষ হয়ে গেল। তারা না তাদের পরিবার-পরিজনদেও মধ্যে থাকলো, আর না তারা তাদেও বন্ধুর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারলো। তখন আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২০৪ নং আয়াতটি নাযিল করেনঃ  “-আর এমন কিছু লোক রয়েছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্যস্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃত পক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক।”

‘আর-রাজী’র শহীদদেও সম্পর্কে আল্লাহ পাক সূরা আল-বাকারার ২০৭ নং আয়াতটি নাযিল করেনঃ

“-আর মানুষের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদেও জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।”

তথ্যসূত্র:

 

কায়স ইবন সা’দ ইবন’ উবাদা (রা)

হযরত কায়সের (রা) একাধিক ডাকনাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। যেমনঃ ‘আবুল ফাদল, আবু ‘আবদিল্লাহ ও আবু আবদিল মালিক। ইবন হিব্বান ‘আবুল কাসেম নামটি উল্লেখ করেছেন।  মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের সায়িদা শাখার সম্মানিত সদস্য। একজন আনসারী সাহাবী খাযরাজ গোত্রের বিখ্যাত নেতা ও বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সা’দ ইবন উবাদা তাঁর পিতা এবং ফুকাইহা বিনতু ‘উবাইদ ইবন দুলাইম মাতা। পিতা-মাতা ছিলেন পরস্পর চাচাতো ভাই-বোন।  তাঁর পূর্ব পুরুষের লোকেরা ছিলেন মদীনার বিখ্যাত জনসেবক ও শ্রেষ্ঠ নেতা। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিযরতের পূর্বে হযরত কায়স ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সকল যুদ্ধ ও অভিযানে হযরত কায়স অংশ গ্রহণ করেন।  ইমাম যুহরী বলেন, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) পতাকাবাহীদের অন্যতম।  হিজরী ৮ম সনের ‘জায়শুল খাবাত’ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। যুদ্ধটি ছিল মুসলমানদের জন্য একটি বিরাট পরীক্ষা। ৩০০ (তিনশো) সদস্যের এক বাহিনী নিয়ে, যার মধ্যে হযরত আবু বকর ও ‘উমারও ছিলেন- আবু ‘উবায়দা উবনুল জাররাহ সমুদ্র উপকূলের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে ১৫ (পনেরো) দিন অবস্থান করেন। সংগে নেওয়া খাদ্য-খাবার ফুরিয়ে যায়। গোটা বাহিনী প্রচন্ড খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হন। সৈনিকরা ক্ষুধার জ্বালায় গাছের ঝরা পাতা খেতে থাকেন। ‘খাবাত’ অর্থ ঝরা পাতা। যেহেতু এ বাহিনীরা সৈনিকেরা গাছের পাতা খেয়েছিলেন, একারণে এই বাহিনী ‘জায়শুল খাবাত’ বা ঝরা পাতার বাহিনী নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে। হযরত কায়স এ দুঃসময়ে তিনটি করে উট ধার নিয়ে জবেহ করেন। তিনবার মোট নয়টি উট ধার নিয়ে জবেহ করে গোটা বাহিনীর বেঁচে থাকার মত খাবারের ব্যবস্থা করেন। অতিরিক্ত ধার দেনা হয়ে যাচ্ছে দেশে অধিনায়ক আবু ‘উবায়দাহ (রা) তাঁকে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেন।  একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘জায়শুল খাবাত’ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে হযরত আবু বকর ও হযরত ‘উমার (রা) তাঁর এমন বেপরোয়া উট জবেহ করা দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলেন, যদি এ যুবককে বিরত না রাখা হয় তাহলে সে তার পিতার সকল সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলবে। তারপর তাঁরা দু’জন বাহিনীর অন্য সদস্যদের বুঝিয়ে নিেেজদের স্বপক্ষে এনে কায়সকে উট জবেহ থেকে নিবৃত করেন।  যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে লোকেরা তাঁর এ আচরণের কথা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উল্লেখ করলে তিনি বললেন: দানশীলতা অবশ্যই এ বাড়ীর এক বৈশিষ্ট্য।

মক্কা বিজয় অভিযানে তিনি হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সফরসঙ্গী ছিলেন। মক্কায় প্রবেশকালে আনসারদের ঝান্ডা প্রথমতঃ সা’দ ইবন উবাদার হাতে ছিল। এক পর্যায়ে রাসূল (সা) সেটি তার হাত নিয়ে কায়সের হাতে তুলে দেন।  বিভিন্ন যুদ্ধে ঝান্ডা বহনকারী ছাড়াও রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশাতে খিলাফতের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এ সময় শাসন-শৃংখলার দায়িত্ব যে সকল ব্যক্তির উপর ন্যস্ত হয়, কায়স তাদের মধ্যে অন্যতম।

হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে কায়সের মর্যাদা ছিল কোন আমীরের দরবারে পুলিশের একজন সর্বাধিনায়কের মর্যাদার মত।

হয়রত আলীর দরবারেও তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল। ইবন ইউনুস বলেনঃ তিনি মিসর বিজয়ে অংশ গ্রহণ করেন এবং সেখানে বাড়ী তৈরী করেন। তারপর আলী (রা) তাঁকে মিসরের আমীর নিয়োগ করেন।  হযরত মুয়াবিয়া (রা) নানাভাবে বিরুদ্ধাচরণ করেও মিসরে কোন রকম হাঙ্গামা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হন। অবশেষে কুফাবাসীদের ক্ষেপিয়ে তুলে আলী (রা) দ্বারা তাঁকে বরখাস্ত করাতে সক্ষম হন। তাঁর স্থলে আলী (রা) মুহাম্মদ ইবন আবী বকরকে ওয়ালী নিয়োগ করেন। এ সম্পর্কে ইবন সীরীন বলেনঃ আলী (রা) কায়স ইবন সা’দকে হিজরী ৩৬ সনে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন এবং হিজরী ৩৭ সনে বরখাস্ত করেন। কারণ, আলীর (রা) বন্ধুরা তাঁকে এ কথা বুঝায় যে, কায়স মুয়াবিয়ার (রা) সাথে গোপন আঁতাত করেছে। যখন তাঁকে অপসারণ করে তার স্থলে মুহাম্মদ ইবন আবী বকরকে নিয়োগ করা হয় তখন তিনি বুঝতে পারেন যে, আলীকে (রা) বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এরপরেও আলীর (রা) সাথে তাঁর সদ্ভাব বজায় থাকে এবং সকল ব্যাপারে আলী (রা) তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন।  মিসর শাসন করা মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত আমীর মু’য়াবিয়া (রা) ও আমর ইবনুল ‘আসের (রা) কর্ম-কৌশল অশান্তির এক প্রবাহ সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে যা খিলাফতের বন্ধনকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়।

হযরত কায়স (রা) মিসর থেকে সোজা মদীনায় চলে আসেন। মারওয়ান তখন মদীনায়। তিনি কায়সকে ভয় দেখালে তিনি মদীনা ছেড়ে কুফায় চলে যান এবং সেখানে হযরত আলীর (রা) সাথে বসবাস করতে থাকেন।

আলীর (রা) সাথে সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সিফ্ফীন যুদ্ধের দিনগুলিতে তিনি আলীর (রা) বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন। এ যুদ্ধের দিনগুলিতে তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন। তার দু’টি পংক্তি নিম্নরূপঃ

সেই ঝান্ডা যা আমরা নবীর সাথে বহন করেছি।

তখন জিব্রাইল ছিলেন আমাদের সাহায্যকারী।

আমরা সেই জাতি, যখন তারা যুদ্ধ করে

তখন দেশ বিজয় না হওয়া পর্যন্ত

তাদের তরবারি ধরা হাতটি প্রলম্বিত হতে থাকে।

এর পূর্বে তিনি উটের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তিনি নিজের গোত্রের সকল লোকের সাথে যোগদান করেন। এ যুদ্ধের শুরুতে হযরত আলী (রা) নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষকে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতি আহবান জানানোর জন্য আবু আইউব আল-আনসারী ও কায়সকে (রা) খারেজী সম্প্রদায়ের নিকট পাঠান। আবদুল্লাহ ইবন সানজার খারেজীর সাথে তাঁদের আলোচনা হয়। তিনি বলেন, আলীর আনুগত্য ও অনুসরণ আমাদের মনপূত নয়। ‘উমার ইবনুল খাত্তারের (রা) মত কেউ হলে আমরা তাঁকে খলীফা বলে মানতে রাজী হতাম। জবাবে কায়স (রা) বললেন, আমাদের মধ্যে আলী ইবন আবী তালিব (রা) আছেন। আপনাদের মধ্যে তাঁর সমকক্ষ কেউ থাকলে তাঁর নাম পেশ করুন। তিনি বললেন, না, আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই। কায়স বললেন, তাহলে আপনাদের সতর্ক হওয়া উচিত। অশান্তি ও বিশৃংখলা আপনাদের অন্তরে শিকড় গেড়ে বসেছে।

হযরত কায়স (রা) সর্ব অবস্থায় আলীর (রা) একজন বিশ্বাসভাজন বন্ধু ছিলেন। হিঃ ৪০ সনে আলী (রা) শাহাদাত বরণ করেন। খিলাফতের দায়িত্ব ইমামন হাসানের (রা) ওপর অর্পিত হয়। হযরত কায়স (রা) ইমাম হাসানকে সমর্থন জানান। এদিকে আলীর (রা) শাহাদাতের খবর পেয়ে হযরত মু’য়াবিয়ার (রা) এক বাহিনী পাঠান। হযরত কায়স (রা) পাঁচ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী, যাঁদের প্রত্যেকের মাথা ছিল মুড়ানো এবং যাঁরা মৃত্যুর জন্য শপথ করেছিল- নিয়ে মু’য়াবিয়ার (রা) সিরীয় সৈন্যদের প্রতিরোধ করার জন্য ‘আনবার’ পৌছেন। আমীর মু’য়াবিয়ার বাহিনী ‘আনবার’ অবরোধ করেন। এর মধ্যে ইমাম হাসান (রা) ও মু’য়াবিয়ার মধ্যে সন্ধি হয়ে যায়। ইমাম হাসান (রা) ‘আনবার’ শহরটি মু’য়াবিয়া (রা) বাহিনীর হাতে অর্পণ করে মাদায়েনে তাঁর কাছে চলে যাওয়ার জন্য কায়সকে (রা) লেখেন।

ইমামের চিঠি পেয়ে হযরত কায়স দারুণ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি তাঁর বাহিনীর সকল সদস্যকে একত্র করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ তোমরা কী চাও? তোমাদের ইচ্ছা হলে আমি তোমাদেরকে সাথে নিয়ে আমরণ লড়বো। আর তোমরা যদি চাও তাহলে আমি আমীর মু’য়াবিয়ার নিকট থেকে তোমাদের জন্য আমান বা নিরাপত্তার অঙ্গীকার নিতে পারি। সৈনিকেরা বললো, আপনি আমাদের জন্য নিরপত্তার অঙ্গীকার নিন। তিনি তাই করেন এবং সহযোদ্ধাদের নিয়ে মাদায়েন চলে যান।

মাদায়েন থেকে হযরত কায়স (রা) মদীনার দিকে যাত্রা করেন। পথে মদীনা পৌছা পর্যন্ত প্রতিদিন সঙ্গীদের জন্য একটি করে নিজের উট জবেহ করতেন। মদীনায় এসে তিনি সম্পূর্ণ নির্জন বাস অবলম্ন করেন এবং আমরণ এক্যগ্রচিত্তে আল্লাহর জিকর ও ইবাদাতে মশগুল থাকেন।

খলীফা ইবন খাইয়্যাত, ওয়াকিদী ও আরো অনেকের মতে হযরত কায়স হিজরী ৬০ সনে হযরত মু’য়াবিয়ার (রা) ফিলাফতকালের শেষ দিকে মদীনায় ইনতিকাল করেন। ইবন হিব্বানের মতে তিনি মু’য়াবিয়ার ভয়ে মদীনা থেকে সরে অন্যত্র পালিয়ে থাকেন এবং হিজরী ৮৫ সনে খলীফা আবদুল মালিকের সময় মারা যান। ইবন হাজার আসকালানীর মতে প্রথমোক্ত মতটি সর্বাধিক সঠিক।

মৃত্যুর পূর্বে কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। মদীনার বহু অধিবাসী তাঁর কাছে আর্থিকভাবে ঋণী ছিল। এ কারণে ঋণগ্রস্থরা তাঁকে দেখতে আসতে লজ্জিত হচ্ছিলো। একথা বুঝতে পেরে তিনি ঘোষণা দেন, আমি আমার সকল পাওনা মাফ করে দিলাম। এ ঘোষণা ছড়িয়ে পড়তেই তাঁকে এক নজর দেখার জন্য জনতার মিছিল শুরু হয়ে যায়। লোকের প্রচন্ড ভিড়ে তার বাড়ীর সিঁড়িটি এক সময় ভেঙে পড়ে।

হযরত কায়সের (রা) এক ছেলের নাম ছিল ‘আমের।  তিনি পিতা কায়সের সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত কায়স ছিলেন স্থুলকায় ও দীর্ঘ দেহী। ‘আমর ইবন দীনার বলেন: তাঁর ছিল বিশাল একটি দেহ ও ছোট্ট একটি মাথা। এত লম্বা ছিলেন যে, গাধার পিঠে সাওয়ার হলে পা মাটিতে গিযে ঠেকতে।  মুখে তাঁর কখনও দাড়ি গজায়নি। আনসাররা রসিকতা করে বলতো, নিজেদের পয়সায় আমরা কায়সের জন্য কিছু পশম কিনতে চাই।

তিনি ছিলেন ‘আলিম সাহাবীদের অন্যতম। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীদের প্রচার ও প্রসার। জীবনের কোন পর্যায়ে তিনি এ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। মিসরের আমীর থাকা কালেও সেখানের মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে হাদীস বর্ণনা করতেন।  হাদীদের গ্রন্থসমূহে তাঁর পিতা সা’দ ইবন ‘উবাদা, ‘আবদুল্লাহ ইবন হানজালা প্রমুখ থেকে বর্ণনা করছেন। এই শেষোক্ত ব্যক্তি ছিলেন বয়সে কায়সের চেয়ে ছোট।  তিনি মোট ১৬ (ষোল) টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। একথা বলেছেন ‘আল্লামা যিরিক্লী।

হযরত কায়সের নিকট থেকে বহু লোক হাদীস শুনেছেন এবং তাঁর সনদে হাদীস বর্ণনাও করেছেন। এখানে তাঁর বিখ্যাত কয়েকজন ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলোঃ আনাস ইবন মালিক, সা’লাবা ইবন আবী মালিক, আবু মায়সারা, ‘আবদুর রহমান ইবন আবীলায়লা, আবু ‘আম্মার আজ-জাহাবী, গুরাইব ইবন হুমাইদ হামাদানী, আশ-শা’বী, ‘আমর ইবন শুরাহবীল, ‘উরওয়া ইবন যুবাইর, মায়মূন ইবন আবী শায়ব, মুহাম্মদ ইবন আবদির রহমান ও আবু তামীম আল-জায্শানী।

হযরত কায়স ছিলেন একজন বড় মাপের চিন্তাশীল মানুষ। কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গেলে অনেক ভবে-চিন্তে দিতেন। ইসলামের বিধি-বিধানের ব্যাপারেও তাঁর মধ্যে ছিল একটা পরিচ্ছন্ন মুক্ত চিন্তার ছাপ। যেমন একবার এক ব্যক্তি তাঁকে সাদাকাযে ফিতরার ব্যাপারে প্রশ্ন বসলো। তিনি বললেন, যাকাতের হুমুমের পূর্বে রাসূল (সা) সাদাকায়ে ফিতরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু যাকাত ফরজ হওয়ার পর সাদাকায়ে ফিতরের নির্দেশও দেননি, আবার নিষেধও করেননি। পূর্ববর্তী নির্দেশের ভিত্তিতেই আমরা এখনও আদায করছি।  হযরত রাসূলে কারীমের (সা) আখলাক ও স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দারুণ প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর। রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমাত, পার্থিব ভোগ-বিলঅসিতার প্রতি অনীহা, তাকওয়া, দানশীলতা, চিন্তা ও অনুধ্যান, বীরত্ব ও সাহসিকতা, উদারতা, সকলকে সমানভাবে ভালোবাসা ইত্যাদি ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ মাধুর্য।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) খিদমাত ও সুযোগ পাওয়া ছিল দ্বনি ও দুনিয়ার সৌভাগ্য। সকল সাহাবী এই সৌভাগ্য অর্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা ও সাধনা করতেন। হযরত কায়সও (রা) এ গৌরব ও সৌভাগ্যের একজন অধিকারী। মুসনাদে ইমাম আহমাদে এসেছেঃ

“তাঁর পিতা তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) সেবায় নিয়োগ করেন।  ইমাম বুখারী তাঁর তারীখে মারয়াম ইবন আ’সয়াদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি কায়স ইবন সা’দকে দেখেছি। তিনি দশ বছর রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমাত করেছেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি ছিল তাঁর অপরিমিত ভক্তি ও শ্রদ্ধ। একদিন রাসূল (সা) গেলেন সা’দ ইবন ‘উবাদার গৃহে। ফেরার সময় হলে সা’দ নিজের একটি গাধা আনালেন এবং পিঠে একটি চাঁদর বিছালেন। রাসূল (সা) গাধার ওপরে, আর কায়স তার পাশে হাঁটতে শুরু করলেন। রাসূল (সা) তাঁকে পিছনে উঠে বসতে বললেন। কিন্তু তিনি ইতস্তত ভাব প্রকাশ করলেন। তখন রাসূল (সা) বললেন: হয় আমার বাহনের পিঠে উঠে বস, নয়তো ফিরে যাও। রাসূলুল্লাহর (সা) পাশাপাশি বসা আদবের খিলাফ মনে করলেন। তাই ফিরে গেলেন।

উদারতা ও দানশীলতা ছিল তাঁর চরিত্রে এক উজ্জ্বল দিক। আসমাউর রিজাল শাস্ত্রকারগণ তাঁর চিত্তের প্রসস্ততার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ইবনুল আসীর বলেনঃ

“তিনি ছিলেন অন্যতম জ্ঞানী ও মর্যাদাবান সাহাবী এবং আরবের অন্যতম চালাক ও দানশীল ব্যক্তি।” এ উদারতা ও দানশীলতা ছিল একান্তই তাঁর স্বভাবগত। কিন্তু এ স্বভাব গঠনে দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি, মাতা-পিতা ও খান্দানের স্বভাব বৈশিষ্ট্যের যে বড় প্রভাব ছিল তা অনস্বীকার্য।’ জায়শুল খাবাত’ যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফিরে পিতার কাছে যখন সৈনিকদের অনাহার ও খাদ্যাভাবের কথা বর্ণনা করছিলেন তখন পিতা তাঁকে বললেন, তুমি উট জবেহ করে আহার করাতে পারতে। তিনি বললেন, আমি তো তাই করছি। দ্বিতীয় পর্যায়ের খাদ্যভাবের কথা বর্ণনা করলে পিতা একই কথা বলেন এবং পুত্রও একই উত্তর দিলেন। এভাবে তৃতীয় পর্যায়ের অনাহারের কথা বর্ণনা করা হলে পিতা তাঁকে একই কথা বললেন। তখন তিনি অভিযোগের সুরে বললেন, আমি তো তাই করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে বিরত রাখা হয়েছে।  জাবির থেকে বর্ণিত হয়েছে, এ যুদ্ধে তিনি মোট নয়টি উট জবেহ করেছিলেন।  এই ‘জায়শুল খাবাত’ যুদ্ধে হযরত আবুবকর ও হযরত ‘উমার (রা) কায়সের (রা) উট জবেহ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তা সা’দ ইবন ‘উবাদার (রা) কানে পৌঁছুলে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে ছুটে যান এবং তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে বলেন, ইবন আবু কুহাফা ও ইবন খাত্তাব (আবু বকর ও উ’মার) কেন আমার ছেলেকে কৃপণ বানাতে চেয়েছে- একথার জবাব আপনি দিন।

যে পিতা এমন দরিয়া দিল, তাঁর পুত্র কেমন দানশীল হতে পারেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। উসুদুল গাবা গ্রন্থাকর বলেন: তাঁর দানশীলতা সম্পর্কে বহু কাহিনী প্রচলিত আছে। দীর্ঘ হয়ে যাবে তাই উল্লেখ করলাম না।  রাসুল (সা)  বলেছেনঃ দাশীলতা এ বাড়ীর এক বৈশিষ্ট্য।  অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা) সম্পর্কে বলেছেনঃ সে