আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

রাফে’ ইবন মালিক ইবন’ আজলান (রা)

আবু মালিক ও আবু রিফা’য়া ডাকনাম। আসল নাম রাফে’। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের সন্তান। পিতা মালিক ইবন ‘আজলান।

মদীনার আনসার সম্প্রদায় একটি অতি সৌভাগ্যবান গোষ্ঠী বা দল। বিশেষতঃ সত্তর মতান্তওে পচাত্তর জনের একটি দল। তাঁদেও মধ্যে আবার আগে ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়ে মর্যাদার তারতম্য আছে। আনসারদেও মধ্যে বনু নাজ্জার ও খাযরাজ গোত্র আগে ভাগে ইসলামের আহবানে সাড়া দানের ক্ষেত্রে প্রায় সমান সমান। তবে এ ব্যাপাওে তাঁদের সকল সম্মান, মর্যাদা ও কৌলিন্য কিন্তু তাঁদেরই দুই ব্যক্তির জন্য। সেই দুই মহান ব্যক্তি হলেন: মু’য়াজ ইবন ‘আফরা’ ও রাফে’ ইবন মালিক ইবন ‘আজলান।

রাসূলে কারীম (সা) মক্কায় ইসলামের দা’ওয়াত দিয়ে চলেছেন। বিশেষতঃ হজ্জ মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগযোগ করে তাদেরকে ইসলামের দা’ওয়াত দিচ্ছেন। মক্কায় রাসূলুল্লাহর (সা) নুবুওয়াতী যিন্দেগীর এমনই এক পর্যায়ে মদীনার খাযরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তি ‘উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। এই ছয় সদস্যের দলটির সাথে মু’য়াজ ও রাফে’ ছিলেন। তাঁদের মক্কায় উপস্থিতির খবর পেয়ে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করলেন। তাঁরা ধীরস্থির ভাবে মনোযোগ সহকারে রাসূলুল্লাহর (সা) বক্তব্য শোনেন। তারপর তাঁদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম মু’য়াজ ও রাফে’ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) করে মুসলমান হন।

তাবাকাতে ইবন সা’দা-এ বর্ণিত হয়েছে, সেইবার মদীনা থেকে মু’য়াজ ও রাফে’- কেবল এই দুই জনই গিয়েছিলেন। তাঁরা মক্কায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহর (সা) আতœপ্রকাশের কথা শুনতে পেলেন। এক পর্যায়ে তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর কথা শুনলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।  সা’দ ইবন আবদুল হামীদের বর্ণনা অনুযায়ী দুইজনের মধ্যে এই রাফে’ প্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াত করেন। তিনি আরো বলেন, খাযরাজ গোত্রের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।  বালাজুরী বলেন: রাফে’ আনসারদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।

ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর মদীনায় ফিরে আসলেন এবং খুব জোরেশোওে ইসলাম প্রচারের কাজে আতœনিয়োগ করলেন। ইবনুল আসীর বলেনঃ

‘যখন তাঁরা মদীনায় ফিওে এসে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন তখন গোটা আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এমন কোন ঘর ছিল না যেখানে রাসূলুল্লাহর (সা) চর্চা হতো না’।  এর পরের বছর রাফে বারো ব্যক্তি এবং তার পরের বছর ৭০/৭৫ ব্যক্তির সাথে পর পর দুই বার মক্কায় যান এবং ঐতিহাসিক বাই’য়াতে আকাবায় অংশগ্রহণ কওে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতে করেন। সর্বশেষ বাই’য়াতের সময় তিনি বনু যুরাইক- এর ‘নাকীব’ বা দায়িত্বশীল মনোনীত হন।

একটি বর্ণনায় এসেছে, মদীনায় কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁরা সর্বসম্মতভাবে মু’য়াজ ও রাফে’কে মক্কায় পাঠান। উদ্দেশ্য, তাঁরা রাসূলুল্লাহকে (সা) অনুরোধ করবেন, তিনি যেমন মদীনায় একজন প্রচারক পাঠান, যিনি মদীনায় আল কুরআন শিক্ষা দেবেন। তাঁদেও আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল (সা) মুস’য়াব ইবন ‘উমাইরকে মদীনায় পাঠান।

রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় হিজরত করে আসার পর সা’ঈদ ইবন যায়িদ ইবন ‘আমর ইবন নুফাইলের সাথে রাফে’র দ্বীনী ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা কওে দেন।

রাফে’র ইসলামী জীবনের সময়কাল খুবই স্বল্প। এ স্বল্পসময়ে মাত্র দুইটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়-বদও ও উহুদ। বদওে তাঁর যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য আছে। ইবন ইসহাক তাঁকে বদরী সাহাবীদেও মধ্যে গণ্য করেননি। মূসা ইবন ‘উকবা ইমাম ইবন শিহাব আয-যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাফে’ বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।  এ বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো খোদ রাফে’র মন্তব্য যা ইমাম বুখারী সংকলন করেছেন। রাফে’ বলেছেন: ‘এতে আমি খুশী নই যে, আকাবার পরিবর্তে বদরে অংশগ্রহণ করি।’  যদিও তিনি এ মন্তব্য দ্বারা তাঁর বদরের চেয়ে ‘আকাবা’র অধিক গুরত্বের কথা বুঝাতে চেয়েছেন, তবে এ দ্বারা তাঁর বদরে যোগদান না করার কথাও বুঝা যায়। ঐতিহাসিক বালাজুরী বলেন: রাসূল (সা) যখন মদীনা থেকে বদরের দিকে যাত্রা করেন তখন মদীনার অনেকের মত রাফে’ও মনে করেন, রাসূল (সা) কোন যুদ্ধে যাচ্ছেন না। আর এ কারণেই তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী হননি।

রাফে’ (রা) হিজরী তৃতীয় সনের উহুদ যুদ্ধে অংশ্রগ্রহণ করেছিলেন। ইসলামী যিন্দেগীর এটাই তাঁর প্রথম ও শেষ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

রাফে’ (রা) ইসলামী জীবনের সংক্ষিপ্ত সময়ে বিভিন্ন প্রকার দ্বীনী সেবা প্রদান করেন। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুবাল্লিগ (প্রচারক)। সেই প্রথম পর্যায়ে মদীনায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে তাঁর বিরাট অবদান আছে। ইসলাম গ্রহণের পর গোটা মদীনায় কিভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটানো যায়- এটাই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা ও ফিকর। তাই তিনি প্রতিবছর ছুটে গেছেন মদীনা থেকে মক্কায় এবঙ গোপনে ‘আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হয়েছেন এবং জরুরী হিদায়াত ও নির্দেশ নিয়ে মদীনায় ফিরে এসছেন। আকাবার সর্বশেষ বাই’য়াতের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নির্বাচিত দ্বাদশ নাকীবের অন্যতম নাকীব হিসাবে অর্পিত মহাদায়িত্ব সার্থকভাবে পালন করেছেন।

বর্ণিত আছে রাফে’ সবার আগে সূরা ইউসূফ মদীনায় নিয়ে আসেন। মদীনার সকল মসজিদেও পূর্বে মসজিদে বানু যুরাইকে সর্বপ্রথম কুরআন পঠিত হয়েছিল। আর সে পাঠক ছিলেন তিনি। মক্কায় রাসূরুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াতের সময় যতটুকু আল কুরআন তাঁর ওপর নাযিল হয়েছিল, তিনি তা লিখে সাথে করে মদীনায় নিয়ে এসেছিলেন এবং নিজ খান্দানের সকলকে সমবেত কওে তা পাঠ কওে শুনিয়েছিলেন।

এমন একটি বর্ণনাও আছে যে, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় থেকে যান। সূরা ত্বাহা নাযিল হওয়ার পর তা লিখে মদীনায় নিয়ে আসেন। মোটকথা, এমনি ধরনের আরো বহু সেবা তিনি দান করেন।

হাকেম তাঁর আল-মুসতাদরিক গ্রন্থে রাফে’ ইবন মালিকের একটি হাদীস সংকলন করেছেন। হাদীসটির বর্ণনাকারী তাঁর পৌত্র মু’য়াজ ইবন রিফা’য়া ইবন রাফে’।

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ