আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

যায়িদ ইবনে দাসিনা (রা)

হযরত যায়িদের (রা) পিতার নাম দাসিনা ইবনে মু’য়াবিয়া। মদীনার খাযরাজ গোত্রের ‘বনু বায়্যাদা’ শাখার সন্তান।  তিনি যে কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তাঁর জীবনের অন্যান্য ঘটনাবলী দ্বারা বুঝা যায়, মদীনায় ইসলামী দা’ওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কারণ, তিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন ইসলামের গ্রহণের পর বেশী দিন এ পার্থিব জীব ভোগ করার সুযোগ পাননি। রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশে দ্বীনের দা’ওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে গিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন।

উহুদ যুদ্ধেও পওে, ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, আদাল ও করা গোত্রের কিছু লোক রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে আবেদন জানায়, কুরআন ও শরীয়াতের তা’লীম ও তারবিয়াত দিতে পারে এমন কিছু লোক আমাদের ওখানে পাঠান সেখানে ইসলামের প্রসার ঘটেছে। তাদের এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হযরত রাসূলে কারীম (সা), খুবাইব ইবনে আদী ও যায়িদ ইবনে দাসিনাসহ মোট ছয়জনকে সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁরা মদীনা থেকে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে তাঁরা হুজাইল গোত্রের আর-রাজী’ নামক জলাশয়ের পাশে মুশরিকদের (পৌত্তলিক) দ্বারা আক্রান্ত হন। হযরত খুবাইব ও যায়িদ (রা) তাদেও হাতে বন্দী এবং অন্যরা শহীদ হন। তাঁদেও দু’জনকে হাত বেঁধে মক্কায় নিয়ে যায় এবং হুজাইল গোত্রের দু’বন্দীর বিনিময়ে তাদেরকে কুরাইশদের নিকট অর্পণ করে। সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা মুসলমানদের হাতে নিহত তার পিতা উমাইয়্যা ইবন খালাফের হত্যার বদলা নেওয়ার জন্য যায়িদ ইবন দাসিনাকে গ্রহণ করে পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারবে ভেবে সে দারুণ পুলকিত হয়ে ওঠে।

মক্কার পৌত্তলিকরা অনেক চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শেও পর সিদ্ধান্ত নিল যে, যায়িদকে ‘তানঈম’ নামক স্থানে হত্যা করা হবে। সাফওয়ানের ছিল ‘নিস্তাস’ নামে একটি দাস। সাফওয়ান তাঁদের দু’জনকে বধ্য-ভূমিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দিল। সেখানে পৌঁছার পর তাঁরা এক আজব পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। আবু সুফইয়ান যায়িদকে (রা) লক্ষ্য করে বললেন: যায়িদ, তোমাকে আল্লাহর নামে কসম করে বলছি। তুমি সত্য কথা বলবে। যদি তোমার স্থলে মুহাম্মদকে আনা হয়, তাঁকে হত্যা করা হয়, আর তুমি তোমার ঘওে নিরাপদে ফিওে যাও-তুমি কি তা পসন্দ করবে? যায়িদ (রা) ধীর-স্থিও ভাবে জবাব দিলেন: মুহাম্মদেও গায়ে কাঁটার একটি আঁচড় লাগুক আর আমি আমার পরিবারের লোকদের মধ্যে নিরাপদে অবস্থান করি- এ আমার মোটেই পছন্দ নয়।

আবু সুফইয়ান তার এ জবাব শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। অবলীলাক্রমে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল- মুহাম্মদের সঙ্গী-সাথীরা তাকে যে পরিমাণ ভালবাসে, দুনিয়ার কারো কোন বন্ধু তাকে এতখানি ভালোবাসেনা। এরপর তাদের নির্দেশ নিসতাস তাঁকে হত্যা করে। এটা হিযরী তৃতীয় মতান্তওে চতুর্থ সনের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। কোন কোন বর্ণনায় ‘বীওে মাউনার’ ঘটনায় হযরত যায়িদ (রা) বন্দী ও শহীদ হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘গাযওয়াতুর রাজী ও বীওে মাউনা’- অধ্যায়ে ইবন ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, এটা উহুদের পরের ঘটনা। তাঁর বর্ণনায় আরো বুঝা যায়, ‘আর-রাজী ও বীরে মাউনা দু’টি সম্পূর্ণ পৃথক ঘটনা। আর আর-রাজী’র ঘটনায় খুবাইবের সাথে যায়িদ মক্কায় নিহত হন।

মূসা ইবন ‘উকরা তাঁর মাগাযীতে বর্ণনা করেছেন, খুবাইব ও যায়িদকে একই দিনে হত্যা করা হয়। আর সেদিন মদীনায় রাসূলকে (সা) বলতে শুনা যায় “ওয়া আলাইকুমা আও ওয়া আলাইকাস্ সালামু।”

‘উরওয়া ও মূসা ইবন ‘উকবা বলেনঃ কুরাইশরা যায়িদকে ফাঁসিতে ঝুলানোর পূর্বে তার দেহ তীওে মেওে ঝাঝরা করে তাঁর ঈমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করে। কিন্তু এতে তাঁর ঈমান ও আতœসমর্পণের ইচ্ছার বৃদ্ধিই ঘটে।

ইবন ইসহাক ইবন ‘আব্বাসের (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ‘আর-রাজী’র’ নায়করা এমন অসহায়ভাবে নিহত হলে মদীনার মুনাফিকরা বলতে লাগলোঃ এই হতভাগাদের জন্য দুঃখ হয়, যারা এমন অসহায়ভাবে শেষ হয়ে গেল। তারা না তাদের পরিবার-পরিজনদেও মধ্যে থাকলো, আর না তারা তাদেও বন্ধুর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারলো। তখন আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারার ২০৪ নং আয়াতটি নাযিল করেনঃ  “-আর এমন কিছু লোক রয়েছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্যস্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃত পক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক।”

‘আর-রাজী’র শহীদদেও সম্পর্কে আল্লাহ পাক সূরা আল-বাকারার ২০৭ নং আয়াতটি নাযিল করেনঃ

“-আর মানুষের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদেও জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।”

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ