আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

‘আবদুল্লাহ ইবন’ আমর ইবন হারাম (রা)

নাম আবু জাবির আবদুল্লাহ। পিতা ‘আমর ইবন হারাম এবং মাতা আর-রাবাব নিতু কায়স। মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনু সুলামা শাখার সন্তন।১ রাসূলুল্লাহর (সা) বহু হাদীস বর্ণনাকারী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবিরের (রা) গার্বিত পিতা। বনু সুলামার একজন সম্মানিত নেতা ও সন্ত্রান্ত ব্যক্তি। তিনি একজন ‘আকাবী, বদরী ও উহুদের শহীদ।২ বালাজুরী বলেন: তিনি একজন আকাবী, বদরী ও নাকীব।৩

ইসলাম-পূর্ব সময়ের আরবের লোকেরা মক্কার কা’বায় গিয়ে হজ্জ ও উমরা আদায় করতো। নবুওয়াতের এয়োদশ বছরে হজ্জ মওসুমে ইয়াসরিববাসীদের পাঁচ শো সদস্েযর একটি বিরাট কাফিলা হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় যায়। তখন পর্যন্ত ইয়াসরিবে মুস’য়াব ইবন উমাইরের (রা) হাতে গোপনে ও প্রকাশ্যের ইসলাম গ্রহণকারীরা ছাড়াও অনেক গৌত্তলিক এ কাফেয়ার ছিল। আবদুল্লাহও ছিলেন এ কাফিলার একজন সদস্য। তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি।৪ এ সফরে তাঁর ছেলে জাবিরও সুমলমান অবস্থায় অংশগ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে আনসারী সাহাবী কা’ব ইন মালিক বলেনঃ৫ “আমরা ইয়াসবির থেকে হজ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। মক্কায় গৌছে আইয়্যামে তাশরীকের মাঝামাঝি কোন এক রাতে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথ আকাবা উপত্যকায় মিলিত হওয়ার কথা পাকাপাকি করলাম। হজ্জ শেষ করলাম এবং সাক্ষাতের নির্ধারিত রাতটিও এসে গেলে। আমাদের সংগে ছিলেন আবু জাবির আবদুল্লাহ ইন আমর। তিনি একজন নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাঁকেও আমরা সফরসঙ্গী করেছিলাম। পৌত্তলিক সফলসঙ্গীদের কাছে আমরা আমাদের গ্লান-পরিকল্পনা গোপন রাখতাম। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কিছু আগে আমরা তাঁকে বললাম: ‘আবু জাবির! আপনি আমাদের একজন নেতা। আপনি একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি। যে বিশ্বাস নিয়ে আপনি আছেন, তার ওপর মারা গেলে কালই জাহান্নামের আগুনে জ্বলবেন। এভাবে এক পর্যায়ে আমরা তাঁকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলাম এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আকাবায় নির্ধারিত সাক্ষাতের সময়ের কথাও জানালাম। তিনি তক্ষুণি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আমাদের সাথে আকাবার বা ইয়াতে শরীক হন। রাসূল (সা) তাঁকে বনু সুলামার নাকীব বা দায়িত্বশীল মনোনীত করেন।”

বালাজুরী বলেন:৬ তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর নিজের পরনের অপবিত্র পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে ফেলে আল-বারা’ ইবন মা’রূরের দেওয়া দু’খানি কাপগ পরেন। আকাবার এই শেষ শপথে তাঁরা পিতা-পুত্র অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। আবদুল্লাহ বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। হিজরী তৃতীয় সনের উহুদ যুদ্ধেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন এবং শাহাদাতের অনন্ত গৌরবের অধিকারী হন। এটা হিজরাতের বত্রিশ মাসের মাথায় শাওয়াল মাসের ঘটনা।৭

ইজুত যুত্থে সুরাফিবতের (কপট মুসলমান) সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাই মদীনার বাইরে গিয়ে কুরাইশ বাহিনীকে প্রতিরোধ করা ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে। রাসূল (সা) উহুদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সে তার সমর্থকদের নিকট এসে বলে: তিনি আমার পরামর্শ গ্রহণ না করে তাঁর ছোকরাদের কথা শুনছেন। আমরা জােিন, কিসের অন্য আমাদের জীবন বিপন্ন করবো।’-এই বলে সে তার তিন শো সঙ্গীসহ ফিরে চললো।

এ সময় আবুদল্লাহ ইবন আমর কিচু মুসলমান সঙ্গীকে নিয়ে তার সাথে দেখা করে বলেন: ‘তোমাদের ধ্বংস হোক! তোমাদের লজ্জা করে না? তোমাদের নারীদের এবং তোমাদের আবাসভূমি রক্ষার জন্য যুদ্ধ কর।’ বিশেষতঃ মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে ভীষণ তিরস্কার ও লাগমন্দ করে বলেন: ‘আল্লাহর নামে আমি তোমাদের বলছি, তোমরা তোমাদের সম্প্রদায় ও নবীকে এভাবে শক্রু সামনে ছেড়ে দিয়ে অপমান করোনা।’ উত্তরে তারা বলে: ‘আমরা যদি যুদ্ধে পারদর্শী হতাম, তোমাদের সাথে যেতাম।’ উত্তরে তারা বলেনঃ ‘আমরা যদি যুদ্ধে পরাদর্শী হতাম, তোমাদের সাথে যেতাম। এভাবে তোমাদেরকে শক্রু হাতে সমপূণ করতাম না।’ যখণ তারা রণক্ষেত্রে ফিরে যেতে কোনভাইে রাজী হলো না তখন তিনি বললেন: ‘আল্লাহ তার শক্রদের দূর করে দিন। তোমাদের হাত থেকে আল্লাহ তাঁর নবীকে রক্ষার অন্য একাই যথেষ্ট।’ এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আলে ইমরানের ১৬৭ নং আয়াতটি নাযিল করেন।৮

উহুদ যুদ্ধের আগের দিন রাতে তিনি ছেলে জাবিরকে ডেকে বললেন: বাবা, আগামীকালের প্রথম শহীদ আমি হতে চাই। রাসূলুল্লাহর (সা) পরে তুমিই আমার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। আমি তোমাকে বাড়িতে রেখে যাচ্ছি। তোমার বোনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে এবং আমার যে ঋণ আছে তা পরিশোধ করবে।৯

দিনের বেলা তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো। হযরত আবদুল্লাহ দারুণ সাহবের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করলেন। তিনিই হলেন দিনের প্রথম শহীদ।১০ উসামা ইন ‘উনাইদ তাঁকে হত্যা করে।১১ বালাজুরী হত্যকারী হিসেবে সুফইয়ান ইবন আবদি শামস আস-সুলামীর নাম উল্লেখ করেছেন।১২ পৌত্তলিকরা তাঁর লাশ কেটেকুটে একেবারে বিকৃত করে ফেলে।

ফেলে জাবরি বলেন: আমার পিতার শাহাদাতের খরব শুনে ছুটে এসে দেখলাম, লাশ একটি চাদর দিয়ে ঢাকা। আমি মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে মুখে চুমু দিতে লাগলাম। রাসূল (সা) দেখলেন কিন্তু নিষেধ করলেন না। আমি কাঁদতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীরা নিষেধ করতে লাগলেন; কিন্তু রাসূল (সা) নিষেধ করলেন না। আমার ফুফু ফাতিমা বিনতু আমর কাঁদতে লাগলেন। রাসূল (সা) বললেণ: তুমি কাঁদ বা না কাঁদ লাশটি তোমরা উঠিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ফিরিশতারা ডানা দিয়ে তাঁকে ছায়া দিতে জিজ্ঞেস করলেন। উপস্থিত লোকেরা বললো: আবদুল্লাহর বোনের।১৩

তাঁকে উহুদে দাফন করা হয়। উহুদের শহীদদেরকে দু’জন অথবা তিনজন করে এক কবরে দাফন করা হয়।১৪ জাবির বলেন: উহুদের শহীদ আমার পিতা ও মামার লাশ মদীনায় আনা হচ্ছিল। পথিমধ্রে রাসূলুল্লাহর (সা) ঘোষণা-শহীদদেরকে শাহাদাতের স্থলেই দাফন করা হবে-শুনে তাঁদেরকে আবার উহুদে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানেই দাফন করা হয়। মালিক ইবন আনাস বলেন: আবদুল্লাহ ইবন আমর ও আমার ইন আল-জামুহকে একই কাফনে ও একই কবরে দাফন করা হয়।১৫ বুখারীর বর্ণনায় মামার স্থলে চাচা বর্ণিত হয়েছে।১৬ আসলে আমর ইবন আল-জামূহ আবদুল্লাহর ভাই নন; বরং ভগ্নিপতি।১৭ বনু সুলামার এক বৃদ্ধ ব্যক্তির সূত্রে ইন ইসহাক বর্ণনা করেছেন: উহুদরে লাশ দাফনের সময় রাসূল (সা) বলেন: তোমরা আমর ইবন আল-জামূহ ও আবদুল্লাহ ইবন হারামের দিকে একটু লক্ষ্য রেখ। তারা দু’জন দুনিয়াতে ছিল অকৃত্রিম বন্ধু। তাঁদেরকে একই কবরে দাফন করবে।১৮

দাফনের ছয় মাস পর হযরত জাবির পিতার লাশটি কবর থেকে তুলে অন্য একটি কবরে দাফন করেন। তখন কেবল কান ছাড়া গোটা দেহ এমন অক্ষম ছিল যে, মনে হচ্ছিলো কিছুক্ষণ আগেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।১৯ এর ৪৬ বছর পর লাশটি আবার কবর থেকে তোলা হয়। জার বর্ণনা করেছেন। কবরটি ছিল একটি পানির নালার ধারে। একবার প্লাবনের সময় তাতে পানি প্রবেশ করে। কবরটি খোড়া হয়। দেখা গেল, আবদুল্লাহর মুখে, সেখানে আঘাত পেয়েছিলেন তাঁর একটি হাত সেই ক্ষতের ওপর। হাতটি সরিয়ে দিলে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো। হাতটি আবার সেখানে রেখে দিলে রক্ত ঝরা বনধ হয়ে গেল। জাবির বলেন: ‘আমি দেখলাম আমার পিতা যেন কবরে ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর দেহে কম-বেশী কোন রকম পরিবর্তন হয়নি। জাবিরকে প্রশ্ন করা হলো: তাঁর কাফনটি কেমন ছিল? বললেন: কাফনেরও কোন পরিবর্তন হয়নি। একই অবস্থায় ছিল। অথচ এর মধ্যে ৪৬টি (ছেচল্লিশ) বছর চলে গেছে।

জাবির (রা) পিতার মৃত দেহে কিছু সুগন্ধি লাগানোর পরামর্শ চাইলে সাহাবীরা অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন: তাঁদের ব্যাপারে নতুন করে আর কিছুই করবে না। তারপর অন্য এক স্থানে দাফন করা হয়।২০

হযরত আবদুল্লাহর (রা) মৃত্যুকালে ছেলে হযরত জাবির (রা) ছাড়া আরো নয়জন মেয়ে রেখে যান। তাদের মধ্যে ছয়জন ছিল অপ্রাপ্ত বয়স্ক।২১ তিনি অনেক ঋণের বোঝা রেখে যান। সহীহ বুখারীতে এর বিবরণ এসেছে। এসব ঋণ হযরত জাবির (রা) পরিশোধ করেন। হযরত জাবিরের (রা) জীনীতে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি।২২ জাবির বলেন: আমার পিতা অনেক দেনা রেখে যান। মৃত্যুর পর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললাম: আমার বাবা অনেক দেনা করে গেছেন। কিন্তু খেজুর আছে। আপনি চলুন যাতে পাওনাদাররা সব নিয়ে না যায়। রাসূল (সা) গেলেন এবং খেজুরের ¯তৃপের ওপর বসে পাওনাদারদেরকে ডেকে ডেকে তাদের পাওনা পরিশোধ করেন। তার পরেও সমপরিমাণ খেজুর থেকে যায়।২৩

হযরত আবদুল্লাহ ছিলেন অতি সম্মানিত ও অতি উঁচু মর্যাদার অধিকারী সাহাবীদের একজন। বনু সালামা গোত্রে ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য তিনি যে চেষ্টা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ রাতে যেভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেন, খোদ রাসূলে কারীম (সা) তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। সুনানু নাসাঈ গ্রন্থে এসেছে, রাসূল (সা) বলেছেন: আল্লাহ গোটা আনসার সম্প্রদায়কে আমাদের পক্ষ থেকে ভালো প্রতিদান দিন, বিশেষ করে আমর ইন হারামের বংশধর (আবদুল্লাহ ও তাঁর সন্তান) ও সা’দ ইবন উবাদাকে।২৪ জামে’ তিরমিজী গ্রন্থে এসেছে। উহুদের ঘটনার পর একবার রাসূল (সা) জাবিরকে মলিন ও বিমর্ষ দেখে প্রশ্ন করলেন: কি হয়েছে?

জবাব দিলেন: আব্বা শহীদ হয়েছেন এবং অনেকগুলি সন্তান রেখে গেছেন। তাদেরই চিন্তা আমাকে সর্বক্ষণ অস্থির করে রেখেন। রাসূল (সা) বলেছেন: একটি সুসংবাদ শোন, আল্লাহ আড়াল ছাড়া কারো সাথে সামনা-সামনি কথা বলেন না। কিন্তু তিনি তোমার আব্বার সাথে সামনা-সামনি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ ইবন আমর! তুমি কি পছন্দ করে? জবাবে তোমার আব্বা বলেছেন, আমার পছন্দ এই যে, আমি আবার পৃথিবীতে ফিরে যাই এবং আপনার রাস্তায় জিহাদ করে আবার শহীদ হই।২৫ আল্লাহ বলেছেন, এ হয়না। পৃথিবী থেকে যে একবার আসে যে একবার আসে সে আর ফিরে যেতে পারে না। তখন তিনি বলেছেন, তাহলে আমার সম্পর্কে কিচু ওহী পাঠান। তখণ এ আয়াতটি নাযিল হয়:

Ñযারা আল্লাহর পথে, জীবন দেয় তাদেরকে মৃত ভেবো না। বরং তারা আল্লাহর নিকট জীবিত। যাদেরকে আহার দেওয়া হয়।২৬

হযরত আবদুল্লাহর (রা) এর চেয়ে বড় গৌরব অহস্কারের আর কি আছে যে, আজ চৌদ্দ শো বছর পরেও আমরা তাঁকে স্মরণ করছি। হয়তো আরো হাজার হাজার বছর পরেও এভাবে মানুষ তাঁকে স্মরণ করবে।

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ