আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আমর ইবন সাবিত ইবন ওয়াক্শ (রা)

‘আমর (রা)Ñএর উপাধি ুসাইরাম’। আর এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। তিনি মদীনার আউস গোত্রের আবদুল আশহাল শাখার সন্তান। পিতার নাম সাবিত ইবন ওয়াকশ এবং মাতার নাম লায়লা মতান্তরে লুবাবা বিনত ইয়ামান। প্রখ্যাত সহাবী হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানের (রা) বোন। উহুদের শহীদ সালাম ইবন সাবিত (রা) ‘আমরের ভাই।১

‘আমর (রা) প্রথম দিকে ইসলামের প্রতি ভীষণ বিরূপ ছিলেন। তাঁর গোত্রের প্রায় সকল নারী-পুরুষ সা’দ ইবন মু’য়াজের (রা) চেষ্টায় মুসলমান হয়ে যান। কিন্তু তখনও তিনি নিজের পুরাতন বিশ্বাস ও ধর্মের ওপর অটল থাকেন। বালাজুরী বলেন: তিি ইসলামের ব্যাপারে দারুণ সংশয়ের মধ্যে ছিলেন। উহুদের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং শহীদ হন। জীবনে কখনও নামায না পড়েও জান্নাতে প্রবেশ করেছেন।২

রাসূলে কারীম (সাঃ) যখন উহুদ যুদ্ধের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন তখন হঠাৎ করে আমরের (রা) অন্তরে সত্যের প্রতি কপ্রবল আবেগ সৃষ্টি হলো। সুানে আবী দাউদ প্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। জাহিলী আমলে তাঁর সূদী কারবার ছিল। অনেকের নিকট তাঁর বকেয়া অর্থ পাওনা ছিল। তিনি এই  বকেয়া অর্থ উসূল করে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ, ইসলাম সূদী লেনদেন নিষিদ্ধ গোষণা করেছিল। উহুদ যুদ্ধের সময় সম্ভবতঃ তাঁর বকেয়া পাওনা আদায় হয়ে গিয়েছিল। আর তখনই তিনি মুসলমান হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন।৩

উহুদে যাত্রার সময় উসাইরামের’ খান্দান আবদুল আশহালের লোকো সহ সকল সাহাবী রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ছিলেন। উহুদের যোদ্ধারা চলে যাওয়ার পর মদীনার প্রতিটি মহল্লায় এটা ভয়স্কর নীরবতা নেমে আসে। উসাইরাম চারদিকে চারদিকে এমন নীরব ও নির্জন অবস্থা দেখে ঘরে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন: আমাদের খান্দানের লোকেরা কোথায় গেছে? উত্তর পেলেন: উহুদে।

যদিও তিনি তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি। তাসত্ত্বেও যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হলেন এবং ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে উহুদের দিকে চললেন। সোজা উহুদে অবস্থানরত রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পৌঁছে জিজ্ঞেস করলেন: আমি আগে যুদ্ধ করবো, না মুসলমান হবো? রাসূল (স) বললেন: দুইটিই করবে। আগে মুসলমান হও, পরে যুদ্ধে যাও। তিনি আরজ করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! জীবনে এক রাকা’য়াত নামাযও আমার পড়া হয়নি। এ অভস্থায় যদি আমি মারা যাই তাহলে আমার জন্য কি ভালো হবে? বললেন: ‘হাঁ, ভালো হবে।’ অতঃপর তিনি কালেমা পাঠ করে মুসলনান হলেন।

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তরবারি হাতে নিয়ে রণক্ষেত্রের দিকে চরলেন। তিনি যে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, মুসলিম যোদ্ধাদের তা জানা ছিল না। তাই তাঁরা তাঁকে বললেন: ‘তুমি এখন থেকে ফিরে যাও। তিনি তাদেরকে বললেন: আমিও মুসলমান হয়েছি।’

যুদধ শুরু হলো। দারুণ বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে শত্র“র বিরুদ্ধে লড়লেন। শত্র“বাহিনীর ভিতরে ঢুকে পড়লে বহু আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হলে। আঘাত এত মারাত্মক ছল য, রণক্ষেত্রে নিস্তেজ হয়ে পড়ে ছিলেন, উঠারও শক্তি ছিল না। যুদ্ধ শেষে আবদুল আশহাল গোত্রের লোকেরা শহীদদের খোঁজে বের হয়ে, দেখলেন তাঁদের ইসাইরাম মৃতদের মধ্যে পড়ে আছে। শ্বাস-প্রশ্বাস তখনও চালু আছে। তারা জিজ্ঞেস করলেন: ‘তুমি এখানে এভাবে কেন? সম্ভবতঃ গোত্রের টানে এখানে এসেছো? তিনি বললেন: ‘না। আমি ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করেছি।’

রণক্ষেত্র থেকে উঠিয়ে তাঁকে বাড়ীতে আনা হলো। গোটা খান্দানে তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়লো। আবদুল আশহাল খান্দনের নেতা সা’দ ইবন মু’য়াজ (রা) খবর পেয়ে তাঁর বাড়ীতে ছুটে গেলেন এবং তাঁর বোনের কাছে কি ঘটেছে তা জানতে চাইলেন। মাুষের এ যাতায়াতের মধ্যেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে রাসূলে কারীম (সা) মন্তব্য করলেন: ‘আল্প শ্রমে প্রচুর বিনিময় লাভ করেছে।’ কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা) বলেছিলেন: ‘নিশ্চিত সে জান্নাতীদের অন্তর্গত।’

যেহেতু আমরের (রা) এ ঘটনাটি ছিল কিছুটা অস্বাভাবিক ধরনের। এ কারণে লোকেরা তাঁকে স্মরণ রাখর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। আবু হুরাইরা (রা) তাঁর নিষ্য-শাগরিদদেরকে প্রশ্ন করতেন: ‘সে আচ্ছা, তোমরা কি এমন কোন ব্যক্তির নাম জান যিনি জীবনে কখনও নামায আদায় করেননি, অথচ সোজা জান্নাতে চলে গেছেন?’ যখন কেউ উত্তর দিতে পারতো না তখন তিনি বলতেন: ‘তিনি আবদুল আশহালের উসাইরাম।:৪

উহুদে তাঁর ভাই সালামা ইবন সাবিত শাহাদাত বরণ করেন আু সুফইয়ান ইবন হারবের হাতে এবং তিনি নিজে আঘাতপ্রাপ্ত ও পরে শাহাদাত বরণ করেন দাররার ইবনুল খাততাবের হাতে।৫

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ