আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

রিফা’য়া ইবন রাফে’ইবন মলিক আয-যারকী (রা)

রিফায়া (রা)-এর ডাকনাম আবূ মু’য়াজ।১ তিনি মদীনার খাযরাজ গোত্রের ‘হুবলা’ শাখার সন্তান। পিতা রাফে’ ইবন মালিক (রা) এবং মাতা উম্মু মালিক বিন্ত উবাই ইবন সালূল। মাা মুনাফিক (কপট মুসলমান) নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর বোন।২

রিফায়া’র (লা) সম্মানিত পিতা রাফে’ (রা) ছিলেন খাযরাজ গোত্রের প্রথম মুসলমান। বাই’য়াতে আকাবার দুই বছর আগে পাঁচ/ছয়জন ইয়াসরিববাসীর সঙ্গে মক্কায় যান এবং ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) হতে বাই’য়াতে হন। তাঁর সম্মানিতা মাও মুসলমান হয়েছিলেন। এই মহিলার ভাই আবদুল্লাহ ইবন উবাই ছিল মদীনার কুফর ও নিফাকের কেন্দ্রবিন্দু। কিনতু তারই সহোদরা ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের উজ্জ্বল প্রদীপ স্বরূপ। রিফায়া (রা) এমনি এক মহান পারিবারে বেড়ে ওঠেন। পিতার সাথে মক্কায় যেয়ে আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে অংশগ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র হাতে বাই’য়াত করেন। তারপর মদীনায় ফিরে আসেন।৩

সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যোদ দেন। তাঁর বদরে যোগদানের কথা সাহীহ আল বুখারীর বর্ণনা দ্বারা প্রামণিত।৪ এ যুদ্ধে শত্র“ পক্ষে নিক্ষিপ্ত একটি তীর তাঁর চোখে আঘাত করে। রাসূল (সা) একটু থুথু দিয়ে দু’আ করলে তিনি সুস্থ হয়ে যান।৫ এই যুদ্ধে তাঁর অন্য দুই ভাইখাল্লাদ ও মালিক অংশগ্রহণ করেন।৬ উমাইর ইবন ওয়াহাব ছিল মক্কার কুরাইশদের এক নেতা। মক্কায় যারা রাসূলুল্লাহকে (সা) নানাভাবে কষ্ট দিত সে তাদের অন্যতম। রিফায়া বদরে তার ছেলে ওয়াহাবকে বন্দী করেন।৭

জামল ও সিফফীনের যুদ্ধে তিনি হযরত আলীর (রা) পক্ষে ছিলেন।৮ জামালের যুদ্ধে আয়িশা (রা), তালহা (রা) ও যুবাইরের (রা) যোদান বিষয়টি ভীষণ জটিল করে তোলে। রাসূলুল্লাহর (সা) চাচী াব্বাসের (রা) স্ত্রী উম্মুল ফাদল বিনত আল-হারেস মক্কা থেকে আলীকে চিঠি মারফত জানন যে, তালহা ও যুবাইর বসরায় গেছেন। এ খবর পেয়ে আলী দারুণ দুঃখ পেলেন। আক্ষেপের সুরে বললেন: তাঁদের আচরণে বিম্মিত হই। কারণ রাসূলে কারীমের ইনতিকালের পর আমরা নবী খান্দানের লোকেরা নিজেদেরকে খিলাফতের অধিক হকদার মনে করতে থাকি। আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা অন্যদেরকে খলীফা বানানো। ঝগড়া-বিবাদ ও অশান্তির কথা-বিবেচনা করে আমরা সব কিছু মেনে নিয়ে ধৈর্যধারণ করি। আল্লাহর শুকরিয়া যে, তার ফলাফল অতীব শুভ হয়েছে। এরপর লোকেরা বিদ্রোহী হয়ে খলীফা উসমানকে হত্যা করলো এবং কোন প্রকার জোর-জবরদস্তী ছাড়াই জনগণ আমাকে খলীফা নির্বাচন করলো। আমার হাতে বাই’য়াতকরীদের মধ্যে তালহা ও যুবাইরও ছিলেন। এক মাসও যেতে পারলো না, এখন তাদের সসৈন্য বসরায় যাওয়ার খর আসছে। হে আল্লাহ! আপনি এই ঝগড়া ও বিশৃংখলাকে দেখুন।

‘রিফায়া ইবন রাফে’ (রা) খলীফা আলীর (রা) ভাষণ শুনে বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন! রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর আমাদের মান-মর্যাদা ও দ্বীনের সাহায্য-সহায়তার প্রতি লক্ষ্য করে আমরা নিজেদেরকে খিলাফতের অধিক হকদার মনে করেছিলাম। তখন আপনরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে নিকট সম্পর্ক, ঈমানের অগ্রগামিতা এবং হিজরাত ইত্যাদির মত দুর্লভ সম্মান ও মর্যাদার দাবী করে আমাদের নিকট থেকে এক অধিকার চেয়ে নেন। আমরাও বিশআস করলাম যে, সত্য ও ন্যায়ের বাস্তবায়ন হচ্ছে, কিতাব ও সুনআহ অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। আপনাদের দাবী আমরা মেনে নিলাম এবং খিলাফত কুরাইশদের হাতে অর্পণ করলাম। মূলতঃ আমাদের তাই করা সঙ্গত লি। এখন আপনার হাতে বাই’য়াত হওয়ার পর কিছু লোক বিপক্ষ হিসেবে দাঁড়েিয়ছে। এটা নিশ্চিত যে, আপনি তাদের থেকে উত্তম এবং আমাদের দৃষ্টিতে আপনিি অধিকতর গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। এখন বলুন, আপনি কি চান? আমরা আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আছি।”

রিফায়া’র (া) ভাষণ শেষ হলে হাজ্জাজ ইবন গায়িয়্যা আল-আনসারী এগিয়ে বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন! এই বিষয়টির এখন ফয়সালা করে নিন। এই পথে আমি জীবন দানের জন্য প্রস্তুত। তরপর তিনি আনসারদের সুোবধন করে বললেন: তোমরা পূর্বে যেমন রাসূলুল্লাহকে (সা) সহায্য করেছিলে, একণ তেমনি আমীরুল মুমিনীনকে সাহায্য কর। এই শেষের সাহায্য হুবহু প্রথম সাহায্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও প্রথম সাহায্য ছিল অধিকতর ভালো ও সম্মানীয়।৯

আলী (রা) এই বতৃতা-ভাষণের পর একটি বাহিনী নিয়ে ইরাক যান। রিফায়া’ (রা)ও সঙ্গী ছিলেন।

রিফায়া’র (রা) মৃত্য সন নিয়ে সামান্য মতপার্থক্য আছে। ইবনকানে’ বলেন: তিনি হিজরী ৪১,  ৪২ অথবা ৪৩ সনে মরা যান। আর সেটা মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালের প্রথম দিকে।১০ মৃত্যুকালে মু’য়াজ ও ইবাইদ নামে দুই ছেলে রেখে যান।

রিফায়া’ থেকে বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সহীহ আল-বুখারী ও মুসলিমে তাঁর কয়েকটি হাদীস সংকলিত হয়েছে। বুখারী তিনটি হাদীস এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

রিফায়া’ (রা) রাসূলে কারীম (সা) ছাড়াও আবু বকর ও উবাদা ইবন সামিত থেক হাদীস শুনেছেন, আর তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে ইয়াহইয়া ইবন খালিদ, আলী ইবন ইয়াহইয়া এবং ছেলে মু’য়াজ ও উবাইদ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।১১

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ