আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

’আবদুল্লাহ ইবন যায়িদ (রা)

’আবদুল্লাহর (রা) ডকনাম আবূ মুহাম্মদ এবং উপাধি ‘সাহিবুল আযান’। তিনি মদীনার খাযরাজ গোত্রের সন্তান। তাঁর পিতা-পিতামহের নাম বর্ণনার ক্ষেত্রে রিজাল’ শাস্ত্রবিদরা বেশ এলামেলো করে ফেলেছেন। ইবন সা’দ তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ইবন হাজার ও মিাম আল-কুরতুবীও এই ওলট-পালটের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।১ ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন: তিনি একজন বদরী সাহাবী এবং যাঁকে সএপ্ন আযান দেখানো হয়েছিল।২ তিনি আকাবার দ্বিতীয় বাই’য়াতের (শপথ) একজন সদস্য। ইবন হিশাম আকাবায় বাই’য়াতকারীদের মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করে বলেছেন: তিনি বদরে যোগদান করেছেন এবং তাঁকে স্বপ্নে আযান দেখানো হয়েছিল। ইমাম জাাবীও একথা বলেছেন।৩

প্রথম হিজরী সনের আগ পর্যন্ত মানুষকে নামাযে সমবেত করার জন্য বিশেষ কোন পদ্ধতি চালু ছিল না। রাসূলে কারীম (সা) মদীনায় এসে মসজিদে নববী তৈরী কার পর নামাযের ঘোষনা দানের ব্যাপারে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলে। তিনি বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ পেলেন। কেউ বললেন, নামাযের সময় হলে মসজিদের ওপরে একটি পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হোক। কেউ প্রস্তাব করলেন, ঘণটা বাজানো হোক। এভাবে শিঙ্গা ফুঁকানো, আগুন জ্বালানো ইত্যাদি ্রস্তাবও দেওয়া হলো। কিন্তু কান প্রস্তাই রাসূলুল্লাহর (সা) মনপূত হলো না। কারণ সেগুলো ইহুদী –নাসারাসহ কোন না কোন ধর্মাবলীম্বীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও তখন এই ঘণ্টা জানানোর প্রস্তাবটির ওপর সকলে একমত হলেন। রাসূল (সা) এই প্রস্তাব অনুযায়ী ঘণ্টা বাজিয়ে মানুষকে নামাযে ডাকার জন্য অনুমতি দিয়ে বৈঠক শেষ করলেন।

সেদিন রাতেই আবদুল্লাহ (রা) স্বপ্নে দেখলেন যে, এক ব্যক্তি একটি ঘণ্টা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: বিক্রী করবে? লোকটি প্রশ্ন করলো: কি করবে? তিনি বললেন: নামযের সময় বাজানো। লোকটি বললো: এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি বলে দিচ্ছি। এই বলে আবদুল্লাহকে আযারে পদ ও বাক্যগুলি উচ্চারণ করে শিখিয়ে দিল। ঘুম থেকে জেগেই আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে  হাজরি হয়ে স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন। রাসূল (সা) বললেন: এ স্বপ্নসত্য স্বপ্ন। তুমি যাও, বিলালকে শিখিয়ে দাও। সে আযান দিক। আবদুল্লাহবিলালকেস্বপ্নে প্রাপ্ত আযান শেখলেন এবং বিলাল আযান দিলেন। এটাই ছিল ইসলামের প্রথম আযান এবং এভাবে আযানের সূচনা হয়।

বিলালের (রা) কণ্ঠে আযানের ধ্বনি শুনে ‘উমার (রা) গায়ের চাদর টানতে টানতে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে এসে বললেন: আল্লাহর কসম! আমিও সবপেন এই ব্যাগুলি শুনেছিলাম। রাসূলে কারীম (সা) দুইজন মুসমানের স্বপ্নের মিলের জন্য আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করেন।৪ আযানের পর লোকেরা নামাযের জন্য সারিবদ্ধ হলো। বিলাল (রা) ইকামাত দিতে যাবেন, এমন সময় ’আবদুল্লাহ বললেন, ইকামাত আমি বলবো।

আযনের জন্য বিলালকে (রা) নির্বাচন করার করণ হলো, আবদুল্লাহ চেয় তাঁর গলার আওয়ায ছিল বেশী বড়। সুতরাং সহীহ তিরমিযী গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) যখন আদুল্লাহকে বললেন, তুমি বিলালকে তোমার স্বপ্নে পাওয়া বাক্যগুলি শিখিয় দাও তখন একথাও বলেন যে, তোমার গলার আওয়ায অপেক্ষা তার গলার আওয়ায বড়।

এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, আযান যা মূলতঃ নামাযের ভূমিকা স্বরূপ এবং ইসলামে একটি বড় প্রতীক, তা ’আবদুল্লাহর (রা) মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বপ্নে অদৃশ্য থেকে আযানের শব্দ ও বাক্য লাভ, রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক তা সত্যায়ন এবং সর্ব সম্মতভাবে মুসলমানদের দ্বারা গৃহীত হওয়া-এ সবকিছুই আবদুল্লাহর (রা) জন্র এক ঈর্ষণীয় সম্মান ও মর্যাদা ছিল। আযানের প্রতিষ্ঠা ও প্রচলন সম্পর্কে এখানে আরো কিছু কথা বলা অগ্রাসঙ্গিক হবে না বলে আমরা মনে করি।

কিছু লোকের ধারণা উমার (রা) সর্বপ্রথম রাসূলকে (সা) আযানের প্রস্তাব দান করেন। সহীহ বুখারীর কেটি বর্ণনা দ্বারা এমনটিই বোঝা যায়। কিন্তু আসল ঘটনা হলো সেখানে আযানের বাক্যগুলির উল্লেখ পর্যন্ত নেই। শুধু এতটুকু আছে যে, উমার বললেন: আপনাদের মধ্য থেকে একজন রোক পাঠান যে নামাযের ঘোষণা দেবে। অতঃপর রাসূল (সা) বললেন: বিলাল ওঠো, নামাযের ঘোষণা দাও।৫

আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে উমার (রা) বিশ দিন পর্যন্ত স্বীয় স্বপ্নের কথা গোপন রাখেন। যখন বিলাল আযান দেন তখন তিনি নিজের সএপ্নর কথা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট প্রকাশ করে। রাসূল (সা) বললেন, তুমি আগে কেন বলনি? উমার (রা) বললেন: আবদুল্লাহ আমার আগেই প্রকাশ করে দিয়েছে। এ কারণে আমার লজ্জা হচ্ছিল।৬

উপরোক্ত বর্ণনাটি যে উমারের (রা) স্বভাব-বৈশষ্ট্যির পরিপন্থী, সে কথা বাদ দিলেও ঘটনাটি পারিপর্শ্বিক অবস্থার সাথে মিল খায় না। কারণ, আযান সম্পর্কে যতগুলি বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্যে যে বিষয়টি সকল বর্ণনায় এসেছে তা হলো, রাসূল (সা) দিনের বেলা পরামর্শ করেন। সেখানে একটি  সিদ্ধান্ত গহীত হয়। ’আবদুল্লাহর (রা) হাদীস দ্বারা জানা যায়, ঘণ্টা বাজানোর ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। মজলিস থেকে বাড়ী যান, রাতে স্বাপ্ন দেখেন এবং ফজরে আযান দেওয়া হয়। এই হিসাবে আবদুল্লাহর (রা) হাদীসটি বুখারী বর্ণিত ইবন উমারের (রা) হাদীসটির ব্যাখ্যা ও ভাষ্য। আবদুল্লাহ ইবন যায়িদের (রা) হাদীসটি ইমাম বুখারীর জানা ছিল। কিন্তু তাঁর নির্ধারিত শর্তের নিরীক্ষে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় সহীহ গ্রন্থে সংকলন করেননি।৭

প্রকৃতপক্ষে এইসব বর্ণনা দ্বারা কারো আগে পিছের ফয়সালা করা যায় না। সম্ভবতঃ ইমাম বুখারী এ কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তা না হলে তাবারানীর বর্ণনামতে আবু বকরও (রা) আযানের স্বাপ্ন দেখেন। ইমাম আল গাজালী আল-ওয়াসীর গ্রন্থ লিছেন দশজনেরও অধিক ব্যক্তি স্বপ্নে আযান দেখেছিলেন। শহরে তানবীহ গ্রন্থে চৌদ্দ ব্যক্তির কথা উল্লেখ আছে। তবে মুহাদ্দিসীনের নিকট এ সকল বর্ণনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নয়। শুধুমাত্র আবদুল্লাহ ইবন যায়িদ এবং কোন ােন সনদে ইবন উমারের (রা) বর্ণনাটি সঠিক ও প্রমাণের পর্যায়ে পৌঁছে। তার মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন যায়িদের বর্ণনাটি একাধিক সনদে এসেছে এবং সহাবীদের একটি দল এ কাহিনী বর্ণনা করেছেন।

যাই হোক আযানের স্বপ্ন যে কেউ প্রথমে দেখুন না কেন, ¯প্নটি ও তার ব্যাাখ্যা আবদুল্লাহ ইবন যায়িদের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। এ কারণে তিনি সাহিবুল আযান লকবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।৮

এত বড় গৌরবের অধিকারি হওয়ার পরেও আরো বহু সৌভাগ্য তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। হিজরী দ্বিতীয় সনে বদর যুদ্ধ হয়। এতে তিনি এবং তাঁর ভাই হুয়াইরিস ইবন যায়িদ অংশগ্রহণ করেন।৯ এর পরে খন্দক, উহুদসহ যত যুদধ হয়েছে সবগুরিতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। মক্কা বিজয় অভিযানে তিনি শরীক ছিলেন এবং বনু আল-হারেস ইবন খাযরাজের পতাকাটি ছিল তাঁর হাতে। বিদ্যায় হ্েজও তিনি অংশগ্রহণ করেন। এ সময় রাসূলে কারীম (সা) যখন ছাগল-উট বণ্টন করেছিলেন তখন তিনি নিকটে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাসূল (সা) তাঁকে কিছুই দেননি। কিন্তু তাঁর ভাগ্যে ছিল অন্য জিনিস। রাসূল (সা) মাথা ন্যাড়া ও নখ কাটার সময় তাঁকে কিছু কেশ ও নখ দান কনের। অবশিষ্ট কেশ ও নখগুলি অন্যদের মধ্যে বণ্টন করেন। এই কেশ ছিল মেহেন্দী রঞ্জিত। আবদুল্লাহর বংশধরদের মধ্যে এ কেশ ও নখ বরকতের প্রতীক হিসেবে বহুকাল রক্ষিত ছিল।১০

তাবুক অভিযান থেকে মদীনায় ফেরার পর রাসূলে কারীমের (সা) নিকট হিমইয়ার রাজন্যবর্গের পত্রসহ দূত আসে। পত্রে তাঁরা ইসলাম গ্রহণের কথা জানান। রাসূল (সা) তাঁদের পত্রের জবাব এবং তাঁদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান শেখানো ও যাকাত-সাদকা আদায়ের জন্য মু’য়াজ ইবন জাবালের নেতৃত্বে একট প্রতিনিধিল পাঠান। এই দলটির মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন যায়িদও ছিলেন।১১

আবদুল্লাহর (রা) ছেল মুহাম্মদ বলেন, আমার পিতা হিজরী ৩২ (বত্রিশ) সনে ৬৪ (চৌষট্টি) বছর বয়সে মদীনায় ইনতিকাল করেন। জানাযার নমায পড়ান খলীফা উসমান (রা)।১২ তবে আল-হাকেমসহ অনেকের ধারণা, তিনি উহুদে শাহাদাত বরণ করে। প্রমণ স্বরূপ তাঁরাএই ঘটনা উপস্থাপন করেন যে, একবার আবদুলÍাহর (রা) এক কন্যা উমারের (রা) নিকট এসে বরেন, আমার পিতা একজন বদরী সাহাবী এবং উহুদে শাহাদাত বণকারী। উমার (রা) বললেন, এখন তোমার দাবী কি? তারপর তিনি কিচু সাহায্য প্রাপ্তির আবেদন জানালে তিনি তা দান করেন।  এটা আল-হুলইয়ার বর্ণনা। তবে মুসনাদসহ রিজাল শাস্ত্রের প্রায় সকল গ্রন্থে হিজরী ৩২ সনর বর্ণনা এসেছে। তাছাড়া উহুদে শহীদ হওয়ার কথা হাকেম বললেনও তিনি আবার আল-মুসতাদরিক গ্রন্থে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।১৩

তাঁর সন্তানাদির মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ের কথা জানা যায়। ছেলের নাম ছিল মুহাম্মাদ। তাঁর জন্ম হয় রাসূলে কারীমের (সা) জবিদ্দশায়। তিনি বলেছেন, আমার পিতা না খাটো ছিলেন না লম্বা। ত৭ার দৈহিক গঠন ছিল মধ্যমাকৃতির।১৪ তিনি আরবীতে লিখতে জানতেন।১৫

আবদুল্লাহর (রা) এক পৌত্র শির ইবন মুহাম্মাদ একার উমার ইবন আবদিল আযীযের দরবারে যান এবং নিরে পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন: আমি একজন আকাবী বদরী ব্যক্তির পৌত্র-যাঁকে সএপ্ন আযান দেখানো হয়েছিল। তখন উমার পাশে উপস্থিত শামবাসীদেরকে কবিতার একটি শ্লোক আবৃত্তি করে শোনান।১৬

ইমাম বুখারী লিখেছেন, আযান বিষয়ে তাঁর সূত্রে একটি মাত্র হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযীও এ কথা সমর্থন করেছেন। কিনউ হাফেজ ইবন হাজার আল-আসকালাসী তাঁর সূত্রে বর্নিত ছয়টি হাদীস পেয়েছেন এবং তা তিনি একটি পৃথক অংশে সংকলন করেছেন বল উল্লেখ করেছেন।১৭ আল্লামাহ্ জাহাবী বলেছেন, তাঁর সনদে অল্প কয়েকট হাদীস পাওয়া যায়।১৮

আবদুল্লাহর (রা) মুখ থেকে যাঁরা হাদীস শুনেছন এবং বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: তাঁর ছেলে মুহাম্মদ, পৌত্র আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ, সা’ঈদ ইবন মুসায়্যিব, আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, আবূ বকর ইবন মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হাযাম প্রমুখ।১৯

অভাব ও দারিদ্রের মধ্যেও আল্লাহর রাস্তায় সবকিছু দান করা আখলাকের এক উন্নততর বৈশিষ্ট। আবদুল্লাহর (রা) বিষয় সম্পদ ছিল অতি সামান্য। যা দিয়ে তিনি পরিবরের ভারণ-পোষণ করতেন। বর্ণিত হয়েছে, একদিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ইে বাগিচাটি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) উদ্দেশ্যে সদাকা করে দিলাম এর পরেই তাঁর পিতা-মাতা রাসূলের (সা) খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই বাগিচাটির আয় দিয়েই আমরা জীবন ধারণ করি। রাসূল (সা) তখন তাঁদেরকে বাগিচাটি ফেরত দেন। কিছু দিন পর তাঁরা মরা গেলে তাঁদের দুই ছেলে এই বাগিচাটির উত্তরাধিকারী হন।২০

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ