আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সাবিত ইবন কায়স (রা)

সাবিতের (রা) ডাকনাম আবু মুহাম্মাদ বা আবু ’আবদির রহমান। ‘খতীবু রাসূলিল্লাহ’ (রাসূলুল্লাহর বক্তা) তাঁর উপাধি।১ মদীনার খাযরাজ গোত্রের সন্তান। পিতা কায়স ইবন শাম্মাস। তাাত তাঈ গোত্রের কন্যা হিন্দা, মতান্তরে কাবশা বিনত ওয়াকিদ। আদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও উমরা বিনত রাওয়াহা তাঁর বৈপিত্রীয় ভাই-বোন।২

সাবতি (রা) ছিলেন অতি মর্যাদাবান সাহাবীদের একজন। রাসূলুল্লাহর (সা) হিজরাতের পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেন। ইবন ইসহাক বলেন: একটি বর্ণনা মতে রাসূল (সা) আম্মার ইবন ইয়াসিরের সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।৩

রাসূল কারীম (সা) মক্কা থেকে ইয়াসরিবে পদার্পণ করলে গোটা শহরবাসী তাঁকে বরণ করার জন্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। আনাস (রা) বলেন: এই উপলক্ষে সাবিত একটি ভাষণ দান করেন। ভাষণের কে পর্যায়ে তিনি বলেন: ‘আমরা আপনাকে সেই সব জিনিস থেকেরক্ষা করবো যা থেকে আমরা নিজেদের জীবন ও সন্তানদের রক্ষা করে থাকি। কিন্তু বিনিময়ে আমরা কী পাব? জবাবে রাসূল (সা) বলেন: তোমরা জান্নাত পাবে। তখন সমবেত জনতা সমন্বরে বলে ওঠে: আমরা এ বিনমিয়ে রাজি।৪

সাগাযী শাস্ত্রবিদরা সাবিতকে (রা) বদরী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করেননি। তবে ইবন হাজার আল-আসকিলানী তাহজীবুত তাহজীব’ গ্রন্থে তাঁকে বদরী সাহাবী বলে মত প্রকাশ করেছেন।৫ মাগযী শাস্ত্রবিদরা বলেছেন: তাঁর সর্বপ্রথম যুদধ হলো উহুদ। তারপর সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।৬ বাই’য়াতে রিদওয়ানেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।৭

হিজরী ৫ম সনে মদীনার উহুদী গোত্র বনু কুরায়জার অবরোধ ও বিতাড়ন অভিযানে সাবিত (রা) অংশগ্রহণ করেন। বনু কুরায়জা অবশেষ তাদের পুরাতন বন্ধু সা’দ ইবন মু’য়াজের হাতে তাদের ভাগ্য ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। সা’ঈ ইবন মু’য়াজের বিচারে তাদের অপরাধী পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। ইবন সিহাক ইবন শিহাব আয-যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ সময় সাবিত ইবন কায়স যান যাবীর ইবন বাত আল-কুরাজীব সাথে দেখা করতে। এ যাবীর ছিল বনু কুরায়জার এক বৃদ্ধ ইহুদী। জাহিলী আমলের বু’য়াস যুদ্ধে সাতি বন্দী হলে এই যাবীর তাঁকে ছেড়ে দেয়। এই ঋণ পরিশোধের আশায় এ বিপদের সময় সাবিত তার সমনে যান। যাবীর তখণ কে বৃদ্ধ। সে বসাবিতকে বললো: আবু আবদির রহমান, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছো? সাবিত বললেন: আমার মত মানুষ কি আপনার মত মানুষকে ভুলতে পারে? আমি আজ এসেছি আপনার ঋণ পরিশোধের আশায়।যাবীর বললো: মহৎ ব্যক্তি মহৎ ব্যক্তিদের প্রতিদান দেয়।

এরপর সাবিত রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ওপর যাবীরের একটি বড় অনুগ্রহ আছে। আমি তার প্রতিদান দিতে চাই। তর রক্ত আমাকে দান করুন। রাসূল (সা) তাঁর আবেদন মঞ্জুর করে বলেন: হাঁ, তাই হোক। সাবিত যাবীরের নিকট যেয়ে বলেন: রাসূল (সা) তোমাারর্ তা আমাকে দান করেছেন। আর আমি তা আমাকে ফিরিয়ে দিলাম। যাবীর বললো: এখন আমি একজন পরিবার-পরিজনহীন বৃদ্ধ, জীবন দিয়ে আমার কি হবে? সাবিত রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ফিরে গিয়ে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যাবীরের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাকে দান করুন। রাসূল (সা) বললেন: হাঁ, তারা তোমার। সাতি যাবীরের নিকট ফিরে গিয়ে বললেন: রাসূল (সা) তোমার পরিবার-পরিজন ও সনতানদেরকে ামাকে দান করেছেন। আমি তাদের সকলকে তোমাকে দিলাম। তখন বৃদ্ধ যাবীর বললো: হিজাযের একটি পরিবার-যাদের কোন অর্থ-সম্পদ নেই, তারা বাঁচবে কেমন করে? সাবিত আবার রাসূলুল্লাহর (স) নিকট এসে তাদের অর্থ, সম্পদ চেয়ে নিলেন এবং যাবীরের নিকট ফিরে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) যে তার সকল সম্পদ ফেরত দিয়েছেন, সে কথা তাকে জানালেন।

এরপর বৃদ্ধ বললো: ওহে সাবিত! চীনা আয়নার মত যে যুবকের চেহারা, সেখানে গোত্রের সকর কুমারী মেয়ের চেহারা দেখা যে, সেই কা’ব ইবন আসাদের রিণতি কি হয়েছে? সাবিত বললো: সে তো নিহত হয়েছে। যাবীর বললো: আমাদের আনন্দ-বিপদে যে ব্যক্তি আগে আগে থাকতো, আমরা পালালে যে আমাদের রক্ষা করতো, সেই আযযাল ইবন সামায়াল এর কি দশা হয়েছে? সাবিত বললেন: সেও নিহত হয়েছে। যাবীর আবার জানতে চাইলো: মজলিস দুইটি অর্থাৎ বনু কাঃব ইবন কুরায়জা ও বনু আমর বিন কুরায়জার পরিণতি কি হয়েছে? সাবিত বললো: তাদেরকে হত্যার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যাবীর বললো: ওহে সাবিত! তোমার ওপর আমার যে অনুগ্রহা আছে, তার বিনিময়ে তুমি আমাকে আমার কাওমের পরিণতি বরণ করার সুযোগ করে দাও। আল্লাহর কসম! তাদের অবর্তমানে আমার বেঁচে থেকে ােন লাভ নেই। তাদের ছড়া শুদু জীবন নিয়ে বেঁচে থাকর ধৈর্য আমার নেই।৮

হিজরী ৬ষ্ঠ সনে বনু আল-মুসতালিক যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে শত্র“ পক্ষের নেতার কন্যা জুওয়াইরিয়্যা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করে সাহায্য প্রার্থনা করেন। রাসূল (সা) তাঁর চুক্তিকৃত সোনা পরিশোধ করে চিরদিনের জন্য তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেন। অতঃপর তাঁর সম্মাতিক্রমে তাঁকে বিবাহ সন্ধনে আবদ্ধ করে উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা দান করেন।৯

এই বনু আল-মুসতালিকের যুদ্ধের সময় ইফক বা মিথ্যা ও বানোয়াট কলঙ্ক আরোপের ঘটনা ঘটে। যা মূলতঃ উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) ও সাফওয়ান ইবনুল মু’য়াত্তালকে কেন্দ্র করে মুনাফিকরা রটনা করে। এই ঘটনা রাসূলে কারীম (সা) সহ গোটা মুসলিম সমাজের কিছুদিনের জন্য ভীষণ বিব্রতকর অবসথায় ফেলে। কিছু সরলপ্রাণ মুসলমানও এ মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্র্তা হয়। ইতিহাস ও রিজাল শাস্ত্রের গ্র্থসমুহে দেখা যায় শা’য়িরুর রাসূল হাসসান ইবন সাবিতও এর সাথে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সফওয়ান ও তাঁর মুদর গোত্রের সমালোচনায় কেটি কবিতাও রচনা করেন। যখন এই ঘটনর রহস্য উম্মোচন করে কুরআনের আয়াত নাযিল হলো তখন সাফওয়ান একদিন তরবারি হাতে নিয়ে হাসসানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ সময় সাবিত ইবন কায়স পাশেই ছিলেন। তিনিদ্রু সাফওয়ানকে ধরে তাঁর হাত দুইটি গলার সাথে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। এ বাধা অবস্থায় তাঁকে বনু আল-হারেস ইবনুল খাযরাজের মহল্লআয় নিয়ে যান। সেখানে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সাথে দেখা হয়। তিনি বলেন: এ কি? সাবিত বলেন: হাসসানকে সে তরবারি দিয়ে মেরে ফেলুক তাতে কি তুমি খুশী হবে? আল্লাহর কসম! এই সাফওয়ানতো তাঁকে হত্যা করেই ফেলেছিল। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বললেন: তুমি যা করেছো তাকি রাসূল (সা) জেনেছেন? সাবিত বললেন: না। আবদুলÍাহ বললেন: তাহলে তুমি খুব দুঃসাহসের কা করেছো। তাকে ছেড়ে দাও। সাবিত তাকে ছেড়ে দিলেন। তারপর সবাই রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসলেন এবং পুরো ঘটনা তাঁকে খুলে বললেন। তারপর সবাই রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আসলেন এবঙ পুরো ঘটনা তাঁকে খুলে বললেন। রাসূল (সা) তাঁদের মধ্যে একটা আপোষ করে দেন।১০

হিজরী নবম সনে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বনু তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল আসে। বেদুঈন কালচার অনুযায়ী তারা সোজা রাসূলুল্লাহর (সা) ঘরের দরজায় এসে হাঁক দেয়: মুহাম্মদ! বাইরে আসুন।’ রাসূল (সা) বাইরে এসে তাদের সাথে আলোচনায় বসেন। এক পযৃায়ে আরবের প্রথা অনুযায়ী তারা তাদের তুখোড় বক্তা উতারিদ ইবন হাজিরকে দাঁড় করিযে দেয় তাদের সম্মান ও প্রতিপত্তির কথা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট তুলে ধরার জন্য। উতারিদ এক দীর্ঘ ভাষণে তার গোত্রের গৌরব ও কীর্তির কথা বর্ণনা করে।তার ভাষণ শেষ হলে রাসূল (সা) তার জবাব দানের জন্য সাবিত ইবন কায়সকে নির্দেশ দেন। সবিত অতি বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও ইসলামের পরিচয় তুরে ধরেন। তার ভাষণ শেষে বনু তামীমের প্রতিনিধিদল মন্তব্র কর: আমাদের বাবার শপথ! তাঁর খতীব (বক্তা) আমাদের খতীব অপেক্ষা উত্তম। রাসূল (সা) ও মুসলমানরাও তাঁর ভষণ শুনে দারুণ খুশী হন।১১

এ প্রসঙ্গে ইবন হিশাম বলেন: সাবিত দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তিনি বলেন:১২ আকাশ ও পৃথিবী যে আল্লাহ সৃষ্টি, সকল প্রশংসা তাঁর। যিনি আকাশ-পৃথিবীর সবকিচু র্ধিারণ করেছেন। যাঁর কুরসী তাঁর জ্ঞানের সমান প্রশস্ত। তাঁর অনুগ্রহ ও করুণা ছাড়া কোন কিছুই হতে পারে না। এ তাঁরইকুদরাত যে, তিনি আমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন, তাঁর সর্বোত্তম সৃষ্টিকে রাসূল মনোনীত করেছেন। বংশের দিক দিয়ে তাঁকে সম্মানিত এবং সত্যবাদী করেছেন। তাঁর নিকট কিতাব নাযিল করে সৃষ্টির প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করেছেন। সুতরাং তিনি সৃষ্টিজগতের মধ্যে সর্বোত্তম সত্তায় পরিণত হয়েছেন। তিনি মানুষকে তাঁর প্রতি ঈমান আনার আহবানজানান। সে আহবানে সাড়া দিয়ে তাঁর কাওমের মুহাজিরগণ তাঁর প্রতি ঈমান আনেন। তাঁরা বংশগতভাবে সর্বাধিক সম্মানিত, চেহারার দিক দিয়ে সর্বাধিক সুদর্শন ও কর্মের দিক দিয়ে সর্বোত্তম মানষ। তাঁদের পরে রাসূলের আহবানে সাড়া দানকারী জনগণ আমরা। আমরা আল্লাহর আনসার এবং তাঁর রাসূলের উযীর। আমরা মানুষের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে, সে আমাদের হাত থেকে তাঁর জীবন ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আর যে অস্বীকার করবে তার বিরুদ্ধে আমরা চিরকাল জিহাদ করবো। তাকেহত্রা করা আমাদের জন্য খুবই সহজ। আমরা বক্তব্য এতটুকু। আমি আল্লাহর নিকট আমার নিজের এবং সকল মুসলিম নর-নারীর জন্য ক্ষমা ও ইসতিগফার কামনা করি। ওয়াসসালামু আলাইকুম।

এই হিজরী নবম সনেই মুসায়লামা আল-কাজ্জাব বনু হানীফার একদল লোক সংগে করে মদীনায় আসে। খবর পেয়ে রাসূলে কারীম (সা) সাবিত ইবন কায়সকে সংগে করে মুসায়লামার অবস্থান স্থল আল-হারিস ইবন কুরায়েরে গৃহে যান। রাসূলে কারীমের (সা) হাতে ছিল একটি ছড়ি। আরোচনর এ পর্যায়ে মুসায়লাম বললো: আপনি যদি আপনার পরে আমাকে খলীফা বানাাে প্রতিশ্র“তি দেন, তাহলে আমি আপনার অনুসারী হতে পারি। রাূল (সা) বললেন: খিলাপাত দূরে থাক, আমি আমার হাতের এই ছড়িটিও তোমাকে দেওয়ার উপযুক্ত মনে করিনে। আল্লাহ তোমার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা হবেই। আমি তোমার পরিণতি স্বপ্নে দেখেছি। তোমার আর কো কথা থাকলে এই সাবিত আছে, তাকেই বলো। আমি যাচ্ছি।১৩

রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর মদনিার আনসারগণ তাদের নেতা সা’দ ইবন ক্ষাদাকে খলীফা নির্বাচিত করার উদ্দেশ্যে সকীফা বনী সা’য়েদায় সমবেত হয়। এ খবর আবু বকরের (রা) কানে পৌঁছলে তিনি ুমার (রা) ও অন্যদের সংগে নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত হন। সেখানে ানেকের মত সাবিত ইবন কায়সও জনগণকে লক্ষ্য করে একটি ভাষক দেন। তার কিছু অংশ নিুরূপ: আম্মা বাঃদ! আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী আনসর এবং ইসলামের সৈনিক। আর আপনারা মুহাজিরগণ, একটি ছোট্ট সম্প্রদায়। এরপর কিচু লোক আমাদেরকে খিলাফত থেকে বঞ্চিত করতে চায়। এটাই আশ্চার্য় বিষয়।’ জবাবে আবু বকর (রা) বলেন: তুমি যা বলেছো, তা ঠিক। তবে খলীফা কুরাইশদের মধ্য থেকেই হতে হবে।

আবু বকর (রা) খলীফা হওয়ার পইে ভণ্ড নবী তুলাইহার বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)। আনসার মুজাহিদরা ছিলেন সাবিতের পরিচালনাধীন।১৪

হিজরী বারো সনে ভণ্ড নবী মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালিত হয়। সাবিত (রা)ও অভিযানে শরীফ ছিলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলমানদের পরাজয় হয় এবং মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। এ সময় আনাস (রা) তাঁকে বলেন: চাচা, যা হয়েছে আপনি দেখলেন তো। সাবিত তখন সুগন্ধি মাখছিলেন। তিনি বললেন: এটা যুদেধর কোন পদ্ধতি নয়।  রাসূলুল্লাহর (সা) সময় মানুষ এভাবে যুদ্ধ করতো না। হে আল্লাহ! এই লোকেরা য করেছে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।১৫ তিনি আরও বলেন: এই সকল লোক ও তারা যার পূজারী এবং তারা যা করেছে, সব কিছুর জন্য দুঃখ হয়। এরপর যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন এবং মুসায়লামার দূর্গের ফটকে দাঁড়ানো এক সৈকিককেহত্যা করেন এবং নিজেও শাহাদাত বরণ করেন।১৬

তাঁর দেহের বর্মটি অবিকৃত অবস্থায় ছিল। একজন মুসলিম সৈনিক সেটি খুলে নেয়। এক রাতে অন্য একজন মুসরিম নৈসিক স্বপ্নে দেখেন যে, সাবিত (রা) তাকে বলছেন, অমুক মুসলমান আমার দেহ থেকে বমৃটি খুলে নিয়েছে। তুমি খালিদকে বল, তিনি যেন তর কাছ থেকে বর্মটি নিয়ে নেন এবং মদীনায় পৌঁছে আবু বকরকে বলেন: সাবিত এত পরিমাণ ঋণী আচে। এই বর্মটি বিক্রী করে তা যেন পরিশেধ করে দেন। আর আমার অমুক দাসটিও যেন মুক্ত করে দেন। খঅলিদ (রা) সেই লোকটির নিকট থেকে বর্মটি নিয়ে নেন এবং আবু বকর (া) সাবিতের অসীয়াত মত কাজ করন। এ ঘটনা সহীহ বুখারীতে সংক্ষেপে উল্লেখ আছে। তে তাবারানী আনসের (রা) সনদে      বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।১৭

সাবিত (রা) বেশ কয়েকজন বংশধর রেখে যান। তাঁর কে মেয়ে ছিল; কিন্তু তার নাম জানা যায় না। ছেলেদের নাম: মুহাম্মদ ইয়াহইয়া, কায়স আবদুল্লাহ, ইসমা’ঈল আবান মুহাম্মদ, ইয়াসহয়িাহ ও আবদুল্লাহ আল-হাররার দিন শাহাদাত বণ করেন।১৮ তাঁর এক পৌত্র আদী ইবন আবান কূফার একজন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ছিলেন।১৯

সাবিতের স্ত্রীর নাম ছিল জামীলা। তিনি ছিলেন মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূলের কন্যা। ২০ জীবনের এক পর্যায়ে সবিতের (রা সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হযে যায়। ইমাম জাহাবী বলেন, সাবিত সেই ব্যক্তি যাঁর স্ত্রী জামীলা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে অভিযোগ করে বলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আর সাবিতের সঙ্গে নেই। রাসূল (সা) বললেন: তুমি কি তার বাগান তাকে ফেরত দিতে চাও? বললেন: হাঁ। এরপর জামীলা সােিতর নিকট থেকে খুলা তলাক নেন।২১ বর্ণিত হয়েছে, এ সময় জামীলা সন্তান সম্ভাবা ছিলেন। তালাক গ্রহণের কিছু দিন পর একটি পুত্র সন্তান প্রসবকরেন। সন্তানটি কাপড়ে পেঁটিয়ে পিতা সাবিতের নিকট পাঠানো হয়। সাবিত শিশুটিকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে গেলে তিনি তাহনীক করে মুহাম্মদ নাম রাখেন। পিতা তার লালন-পালনের জন্য একজন ধাত্রী নিযোগ করেন।২২

সাবিত (লা) রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে যাঁরা হাদসি বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তঁর সন্তানরা। যেমন: মুহাম্মদ, কায়স ও ইসমা’ঈল। তছাড়া আনাস ইবন মালিক, আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। সহীহ গ্রন্থে তাঁর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।২৩

ইবন ইসহাক বলেন: সাবিত (রা) ছিলে উচ্চ কষ্ঠস্বরের অধিকারী ও বিশুদ্ধভাষী, বাগ্মী পুরুষ।২৪ মদনিার  আসার সম্প্রদায় তাঁকে তাদের খতীব (বক্তা) নির্বাচন করেন। রাসূলে কারীমও (সা) তাঁকে স্বীয় দরবারে খতীবের মর্যাদা দান করেন।২৫ ইমাম আল-কুরতুবী বলেন: তিনি ছিলেন আনসারদের খতীব। পরবর্তীকালে খতীবু রাসূলিল্লাহ’ (রাসূলুল্লাহর খতীব) উপাধি লাভ করেন, যেমন হাস্সান ইবন সাবিত (রা) লাভ করেন ‘শা’য়িরু রাসূলুল্লাহ’ (রাসূলুল্লাহর (সা) কবি) উপাধি।২৬

সাবিতের (রা) চরিত্রের সুন্দরমত বৈশিষ্ট্য হলো রাসূলে পাকের (সা) প্রতি সীমাহীন শ্রদধা ও ভালোবাসা। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে না-জানি কোন বেয়াদবী হয়ে যায়, সব সময় তিনি এ ভয়ে থাকতেন। ইমাম মুসলম আাসের (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। যখন সূরা আল-হুজুরাত এর দ্বিতীয় আয়াত মুমিনগণ! তোমরা নীর কষ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কষ্ঠস্বর উঁচু করো না এবঙ তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচু স্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলোনা। এতে ােমাদের কর্ম নিস্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও যাবে না।’ নাযিল হলো তখন হযরত সাবিত ঘরের দরযা বন্ধ করে বসে থাকলেন। তিনি বলতে লাগলেন: আমি একজন জাহান্নামের মানুষ। রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট যাওয়া আসাও ছেড়ে দিলেন। একদিন রাসূল (সা) সা’দ ইবন মু’য়াজকে জিজ্ঞেস করলেন: আবু আমার! সাবিতের কি হয়েছে? সে কি অসুস্থ? সা’দ বললেন: না, সে ভালো আছে। কোন অসুবিধের কথা তো আমি জানিনে। এরপর সা’দ সাবিতের নিকট এসে রাসূলুল্লাহর (সা) কথা তাঁকে বললেন। তখন সাবিত বললেন: সূরা আল-হুজুরাতের এ আয়াত নাযিল হয়েছে। আরতোমরা তো জান আমি তোমাদের  সকলের চেয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট জোরে কথা বলি। আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি। সা’দ তাঁর একথা রাসূলুল্লাহর (সা) জানালে তিনি বললেন: না, সে জাহান্নামী নয়, সে জাননাতের অধিকারী।২৭ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে সাবিত (রা) বলেন: আমি একজন উঁচু কষ্ঠস্বরের মানুষ। আমার ভয় হচ্ছে, আমার সব আমল বরবাদ হয় গেছে কিনা। একথা শুনে রাসূল (সা) বললেন: সাবিত, তুমি তাদের কেউ নও! শুভ ও কল্যাণের সাথে এ পৃথিবীতে তুমি বাঁচবে বেং শুভ ও কল্যাণের উপর মৃত্যু হবে।২৮

যখন সূরা আন-নিসার ৩৬তম আয়াতের এই অংশÑনিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে’Ñনাযিল হলো তখন সাবিত (রা) ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। রাসূল (সা) তাঁকে না দেখে খোঁজা লোক পাঠালেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সুন্দরকে ভালোবাসি। আমি পছন্দ কর আমার সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব। আমার ভয় হচ্ছে আমি এ আয়াতের আওতায় পড়ে গিয়েছি কিনা।। রাসূল (সা) বললেন: তুমি তাদের অন্তভূক্ত নও। তোমর পার্থিব জীভন হবে প্রশংসিত। আর তেমার এ জীবনের সমাপ্তি হবে শাহাদাতের মাধ্যমে এবং আখেরাতে তুমি হবে জান্নাতের অধিবাসী।২৯

সাবিতের (রা) ছেরে মুহাম্মাদ বরেন: একবার তার পিতা সাবিত রাসূলকে (সা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ভয় হয়, আমি ধ্বংস হয়ে না যাই। রাসূল (সা) প্রশ্ন করলেন: কেন? সাবিত বললেণ: আমার যে কাজ করিনি তার জন্য আমাদের প্রশংসা করা হোক, এমন ইচ্ছাপোষন করতে আলÍাহ আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। অথচ আমার মনে হয়েছে আমি প্রশংসা পছন্দ করি। আল্লাহ আমাদেরকে গর্ব ও অহঙ্কার  করতে বারণ করেছেন। অথচ আমি সুন্দরকে ভালোবসি। আপার কষ্ঠস্বরের উপর আমাদের কষ্ঠস্বর উঁচু কতে আমাদেরকে বারণ করা হয়েছে। কিন্তু আমি একজন উচ্চকষ্ঠের মানুষ। তাঁর কথা শেষ হলে রাসূল (সা) বললেন: সাবিত! তুমি কি প্রংশসিত অবস্থায় জীবন যাপন, শহীদ অবস্থায় মৃ্যুবরণ এবং আখেরাতে জান্নাতে প্রবেশ করা পছন্দ কর না? সাবিত বললেন: হাঁ, করি ইয়া রাসূলাল্লাহ! সত্যি, দুনিয়াতে তাঁর জীবনট হয়েছে প্রশংসিত এবং মসায়লামা আল-কাজ্জারের সাথে যুদ্ধে তিনি শহীদ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।৩০ হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁর সম্পর্কে আরো বলেছেন: সাবিত কতই না ভালো মানুষ।৩১

রাসূলে কারীম (সা) য তাঁকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতেন তার প্রমণ পাওয়া যায় বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে। একবার সাবিত (রা) অসুখে পড়লে রাসূল (সা) তাঁকে দেখতে যান এবং তাঁর সুস্থতা কামনা করে দু’আ করেন এই বলে: ‘হে মানুষের প্রভু! আপনি সাবিত ইবন কায়সের কষ্ট দূর করে দিন।৩২

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ