আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – চতুর্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কাতাদা ইবন নু’মান (রা)

নাম কাতাদা। ডাকনাম অনেকগুলি। যেমন: আবু ’উমার, আবু ’উসমান, আবু ’আমর ও আবু ’আবদিল্লাহ।১ মদীনার বিখ্যাত আউ গোত্রের বনু জাফার শাখার সন্তান।২ মা উনাইসা বিনতু কায়স নাজ্জার গোত্রের কন্যা এবং প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী ও (রা) তাঁর সন্তান। কাতাদা ও আবু সাঈদ আল-খুদরী বৈপত্রীয় ভাই।৩

তিনি সর্বশেষ ’আকাবার শপথে শরীক হন এবং ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাই’য়াত করেন।৪ বদর সহ অন্য সকল যুদ্ধ ও অভিানে তিনি রাসুলুল্লাহর (সা) সাথে যোগ দেন।৫ উহুদ যুদ্ধে তিনি অকল্পনীয় ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দান করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন মুসলিম তীরন্দায বাহিনীর অন্যতম সদস্য। এ সময় রাসূল (সা) তাঁকে স্বীয় ‘আল-কাতুম’ নামক একটি ভাঙ্গা ধনুক দান করেছিলেন।৬

উহুদ যুদ্ধের এক সঙ্কটজনক পর্যায়ে হযরত রাসূলেকারীমকে (সা) মুশরিক তীরন্দাযরা তাদের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নিল। তাঁকেই লক্ষ্য করে তারা তীর ছুড়ছিলো। রাসুলুল্লাহর (সা) আশে পাশে তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুজাহিদ মাত্র। অন্যরা একদিক ওদিক বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। এ মুষ্টিমেয় মুজাহিদরা একজনের পর একজন নিজের বুক পেতে দিয়ে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তীর থেকে রাসূলকে (সা) আড়াল করে রাখছিলেন। এভাবেদশজন শহীদ হওয়ার পর হযরত কাতাদার পালা আসলো। তিনি ছিলেন একাদশ ব্যক্তি। তিনি রাসূলকে (সা) পিছনে রেখে শত্র“বাহিনীর দিকে বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেলেন। হঠাৎ শত্র“পক্ষের নিক্ষপ্তি একটি তীর ছুটে এসে তাঁর একটি চোখে আঘাত হানে। চোখটি কোটর থেকে ছিটকে গন্ডদেশে গড়িয়ে পড়ে। অন্য একটি বর্ণনা  মতে চোখটি একবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি তা হাতে ধরে রাখেন। লোকেরা ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিল। তিনি রাজী হলেন না। তিনি রাসুলুল্লহার (সা) নিকট আরজ করলেন: আমার এক স্ত্রী আছে। আমি তার প্রতি আসস্ত। তাকে আমি গভীরভাবে ভালোবাসী। আমার এ অবস্থায় সে আমাকে ঘৃণা করতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে আমি যা করেছি তা শুধু শাহাদাত লাভের জন্যই করেছি। রাসূল (সা) নিজ হাতে চোখটি আবর যথাস্থানে বসিয়ে দিয়ে দু’আ করেন: ‘হে আল্লাহ! কাতাদা তার মুখমন্ডল দ্বারা তোমার নবীকে (সা) রক্ষা করেছে। সুতরাং তুমি এখণ তার এ চোখটিকে অন্যটি অপেক্ষা সন্দুর ও তীক্ষè দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন করে দাও।’ রাসূলুল্লাহর (সা)  এ দুয়া কবুর হয়। এ চোখটি অন্যটি অপেক্ষা খবই সুন্দর হয় এবং দৃষ্টি শক্তিও তীক্ষè হয়।৭

পরবর্তীকালে তাঁর সন্তানদের কেউ একজন উমাইয়্যা খলীফঅ হযরত ’উমার ইবন ’আবদিল আযীযের দরবারে যান। তিনিতাঁর পরিচয় জানতে চাইলে একটি কবিতা নিজের পরিচয় দান করেন। এখঅনেতার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ দেয়া হলো:৮

‘আমি তো সেই ব্যক্তির সন্তান যার একটি চোখ তার গন্ডদেশে গড়িয়ে পড়েছিল। অত:পর নবী মু¯তফার হাত তাকে যথাস্থানে বসিয়ে দেয়।

তারপর তাপুর্বের মতহয়ে যায়। সেই চোখটির রূপ কী চমৎকার হয় এবং স্থাপনও হয় কত সুন্দর!

হযরত কাতাদার চোখটি কোন যুদ্ধ আহত হয় সে সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। বদর, ্হুদ ও খন্দক-এ তিনটি যুদ্ধের কথাই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মালিক, দারু কুতনী, বায়হাকী ও হাফেজ ইবন ’আবদিল বার উহুদ যুদ্ধের বর্ণণা সর্বাধিক সঠিক বলে মনে করছেন।৯

মক্কা বিজয় অভিযানে বনু জাফারের ঝান্ডা হযরত কাতাদার হাতেই ছিল।১০ হুনাইন যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে যাঁরা দৃঢ়পদ ছিলেন তিনি তাঁদের অন্যতম।১১

হীজরী ১১ সনে হযরত রাসূলে কারীম (সা) উসামা ইবন যায়িদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সিরিয়া সীমান্তের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মুহাজিরও আনসারদের প্রায় সকল উঁচু স্তরের সাহাবী এ বাহনীতে এ ছিলেন। হযরত কাতাদাও (রা)ছিলেণ এর একজন সদস্য।১২

তিনি হিজরী ২৩/খ্রীস্টাব্দ ৬৪৪, ৬৫ বছর বয়সে মদীনায় ইনতিকাল করেন। হযরত ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) তখন খিলাফতের মসনদে আসীন।১৩ খলীফা ’উমার (রা) জানাযার নামায পড়েন। ’উমার আবু সাঈদ আলী খুদরী ও মুহাম্মদ ইবন মাসলামা (রা)- এই তিনজন করবে নেমে তাঁকে সমাহিত করেন।১৪ ইমাম নাওয়াবী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা ও আল-হারেস ইবনু খুযায়মা এদুজন করবে নামেন।১৫

’উমার ও ’উবাইদ নামে তাঁর দুই ছেলের নাম জানা যায়। স্ত্রীর নাম জানা যায় না। তবে স্ত্রীর সাথে তাঁর গভীর প্রেম প্রীতির সম্পর্কের কথা জানা যায়।১৬ উহুদ যুদ্ধের পূর্বে তিনি বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত তাবে’ঈ মুহাদ্দিস হযরত ’আসিম ইবন ’উমার ইবন কাতাদার দাদা। ুহাম্মাদ ইবন ইসহাক তাঁর সূত্রে প্রচুর বর্ণণা নকল করেছেন।১৭ এই ’আসিম হি” ১২০ অথবা ১২৯ সনে ইনতিকাল করেন।১৮

তিনি ছিলেণ মর্যাদাবান সাহাবীদের একজন। শরীয়াতের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর নিকট জানতে চাইতেন। হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী ও আবু কাতাদার মত বিশিষ্ট সাহাবীরা যে তাঁর নিকট ফাতওয়া জিজ্ঞেস করতে তা হাদীসের গ্রস্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।১৯

হযরত কাতাদা ইবন নু’মানের (রা) বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা-৭ (সাত)্ তারমধ্যে ইমাম বুখারী এককভাবে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।২০

তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে আবু সাঈদ আল খুদরী, জহুজাইফা, মাহমুদ ইবন লাবীদ, ’উবাইদ ইবন হুনাইন, ’আয়াদা ইবন’ আবদিল্লাহ ও তাঁর ছেলে ’উমার ইবন কাতাদার মত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও আছেন।২১

তাঁর চরিত্রে যুহ্দ ও তাকওয়ার প্রাধান্য ছিল। একবার শুধু সূরা ইখলাস পাঠ করতে করতে রাত শেষ করে ফেলেন।২২

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় হযরত কাতাদার বংশের মধ্যে চুরির একটি ঘটনা ঘটে। চোরটি ছিল একজন মুনাফিক। সে চুরির দোষটা অন্যের ঘাড়ে চাপানোর পয়াতারা করে। হযরত কাতাদা তাকেই সন্দেহ করেছিলেন। তিনি তাঁর সন্দেহের কথা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট প্রকাশ করলে তিনি বেশ অনসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এদিকে যাকে সন্দেহ করা হয়েছিল সে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে নিতান্ত ভালো মানুষ সেজে কাতাদার এহেন সন্দেহের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ পাক সূরা আন-নিসার ১০৫ ১১৩ নং আয়াতগুলি নাযিল করে প্রকৃত ঘটনা রাসূলকে অবহিত করেন এবং একই সাথে কাতাদার সত্যবাদিতা ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।২৩

হযরত কাতাদার মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) একটি মু’জিয়া প্রকাশের ঘটনা সীরাতের গ্রন্থসমূহে দেখা যায়। একদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ঘন অন্ধকার রাত। রাসূল (সা) ঈশার নামাযের জন্য আসলেন। কাতাদাও হাজির হলেন। বিদ্যুৎ চমকালে রাসুল (সা) কাতাদাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন: কাতাদা? তিনি জবাব দিলেন: আজ লোকের উপস্থিতি কম হবে-্ কেথা ভেবে আমি ইচ্ছে করেই হাজির হয়েছি। তখন রাসূল (সা) তাঁকে বললেন: ঘরে ফেলার সময় আমাদের কাছে এসো। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে দেকা করলেন। একটি খেজুরের শাখা তাঁর হাতে দিয়ে তিনি বললেন: ‘ধর। এটা হাতে থাকে তোমার সামনে দশজন এবং পিছনে দশজন আলোকিত করতে থাকেবে।  আর বাড়ী পৌঁছে ঘরের আশেপাশে কোথাও অন্ধকার দেকলে কোন কথা না বলেই এটা দ্বারা সেখানে আঘাত করবে। কারণ, সে শয়তান।’ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশমত খেজুর শাখাটি হাতের করে বাড়ী ফিরলেন। সত্যি সত্যিই বাড়ীর আঙ্গিনায় একটি শক্ত লোম বিশিষ্ট গোলাকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণী দেখতে পেলেন এবং সেই শাখাটি দিয়ে আঘাত করলে সেটা পালিয়ে যায়।২৪

তথ্যসূত্র:

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ