আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – পঞ্চম খন্ড

যায়নাব বিন্ত জাহাশ (রা)

উম্মুল মু’মিনীন হযরত যায়নাব এর ডাকনাম ছির উম্মু হাকাম। তাঁর পিতা ছিলেন বনু আসাদ ইবন খুযায়মা গোত্রের জাহাশ ইবন রাবাব আল-আসাদী এবং মাতা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফুফু উমায়মা বিনত ‘আবদিল মুত্তালিব। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) আপন ফুফাতো বোন। হযরত যায়নাবের (রা) দুই ভাই-‘উবায়দুল্লাহ ইবন জচাহাশ ও আবু আহমাদ ইবন জাহাশ হযরত আবু সুফইয়ানের (রা) দুই মেয়ে যথাক্রমে উম্মু হাবীবা ও ফারি‘আকে বিয়ে করেন। তাঁর আর এক ভাই ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ (রা) উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। কাফিররা তাঁর পেট ফেড়ে লাশ বিকৃত করে ফেলে। তাঁকে তাঁর মামা হযরত হামযার (রা) সাথে উহুদ প্রান্তরে একই কবরে দাফন করা হয়। হামনা বিনত জাহাশ ও উম্মু হাবীবা বিনত জাহাশ হযরত যায়নাবের দুই বোন। দুই জনেরই মেয়েলী রোগ ‘ইসতিহাজা’ ছিল। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট প্রায়ই এ সম্পর্কিত নানা মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতেন। একারেণ হাদীসে তাঁদের উল্লেখ দেখা যায়।

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ এবং তাঁর অন্য সকল ভাই-বোন প্রথম পর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারুল আরকামে যাওয়ার আগেই মুসলমান হন। তারপর তাঁরা সবাই হাবশায় হিজরত করেন। সেখানে তাঁদের ভাউ ‘উবায়দুল্লাহ খ্রিস্টান হয়ে যান এবং তার স্ত্রী হযরত উম্মু হাবীবা (রা) ইসরামের উপর অটল থাকেন। পরে নাজ্জাশীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বিয়ে করেন। অতঃপর তাঁরা সকলে মক্কায় ফিরে আসেন। কিছুদিন পর ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও আবু আহমাদ ইবন জাহাশ আপন পরিবারবর্গ ও বোনদের নিয়ে মদীনায় হিজরাত করেন।

হযরত যায়নাব (রা) ইসলামের আদি-পর্বেই মুসলমান হন। ইবনুল আসীর বলেনঃ

আরবী হবে

তিনি ছিলেন আদিপর্বের মুসলমান।

বিয়ে

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বায় আযাদকৃত দাস ও পালিত পত্র যায়িদ ইবন হারিসার সাথে তাঁর বিয়ে দেন। পৃথিবীতে ইসলাম যেভাবে সাম্য ও সমতার শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে এবং যেভাবে সকল স্তরের মানুষকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে ইতিহাসে তার অগণিত দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। তবে হযরত যায়নাবের (রা) বিয়ের ঘটনাটি ছিল সাম্য ও সমতার বাস্তব শিক্ষার ভিত্তিস্বরূপ। এ কারণে তা এ জাতীয় সকল দৃষ্টান্তের উপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব লাভ করেছে।

পবিত্র কা‘বার খাদিম হিসেবে গোটা আরবে কুরাইশ খান্দান, বিশেষত বনু হাশিমের যে উঁচু মর্যাদা ও সম্মানের আসন ছিল, তৎকালীন ইয়ামেনের কোন বাদশাহও তার সমকক্ষতার দাবী করতে দুঃসাহসী হতো না।

কিন্তু ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি ঘোষনা করে তাকওয়া ও আল্লাহভীতিকে এবং ঘোষণা করে যে, যে কোন ধরনের গর্ব, আভিজাত্য ও কৌলিন্য জাহিলিয়াতের প্রতীক। এই ভিত্তিতে হযরত যায়িদ যদিও দৃশ্যত একজন দাস ছিলেন, তবুও যেহেতু ইসলাম তাঁর দ্বারা সীমাহীন শক্তি লাভ করে, এ কারণে হাজাশ হাজার স্বাধীন ব্যক্তি থেকেও তাঁকে শ্রেষ্ঠতম গণ্য করা হতো। ইসলামী সাম্যের বাস্তব শিক্ষাদান ছাড়া এই বিয়ের আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল। ইবনুল আসীর তা বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ

আবরী হবে

-রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়িদের সাথেতাঁর বিয়ে এজন্য দিয়েছিলেন, যাতে যায়িদ তাঁকে কিতাবুল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের (সাল¬াল¬াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল-াম) সুন্নাতের তা‘লীম ও তারবিয়াত দান করেন।

কুরাইশরা বংশের বড়াই করতো। বংশ নিয়ে তাদের গৌরবের অন্ত ছিল না। বিন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়নাব বিনত জাহাশের বিয়ে দিলেন যায়িদ ইবন হারিসার সাথে। যায়িদ ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রীতিভাজন ব্যক্তি। হযরত খাদীজা (রা) ও হযরত আবু বকর (রা) যে সময়ে মুসলমান হন, যায়িদও সে সময় মুসলমান হন।

অধিকাংশ অভিযানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরাইশ নেতাদের উপর তাঁকে পরিচালক নিয়োগ করতেন। যায়িদ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এত কাছের মানুষ হয়ে যান যে, তিনি যায়িদ ইবন মুহাম্মদ হিসেবে প্রসিদ্ধি পান। তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। এতসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন দাস। আর যায়নাবের ছিল বংশ কৌলিন্য। প্রথম থেকেই এ বিয়েতে হযরত যায়নাবের মত ছিল না। তিনি রাসূলুল্লা্হকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সরাসরি বলে দিয়েছিলেন-

আবরী হবে

তাকে নিজের জন্য পছন্দ করিনে। কিন্তু সবশেষে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশে রাজী হন। কারণ, তখন সূরা আল আহযাবের এ আয়াত নাযিল হয়ঃ

আরবী হবে

অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে সিদধান্ত দান করেন তখন কোন মুমিন নারী পুরুষের কোন প্রকার ইখতিয়ার থাকে না।

বিয়ের পর এক বচর দুইজন একসাথে থাকেন কিনতু প্রেম-প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠলো না। দিন দিন সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়ে উঠলো। হযরত যায়িদ (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এসে অভিযোগ করলেন এবং তালাক দানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

আবরী হবে

-যায়িদ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এসে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যায়নাব তাঁর কঠোর বাক্যবানে আমাকে বিদ্ধ করে। আমি তাঁকে তালাক দিতে চাই।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত যায়িদকে তালাক দান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কুরআন পাকে সে চেষ্টা এভাবে বিধৃত হয়েছে।

আরবী হবে

-যখন আপনি সেই ব্যক্তিকে যার প্রতি আল্লাহ ও আপনি অনুগ্রহ করেছেন, বলছিলেন যে, তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শত চেষ্টা সত্ত্বেও হযরত যায়নাব ও হযরত যায়িদের (রা) বিয়ে টিকলো না। হযরত যায়িদ (রা) ত৭াকে তারাক দিয়েই ছাড়লেন।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি হযরত যায়িদের (রা) সাথে হযরত যায়নাবের (রা) বিয়েটি হয় রাসূরুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইচ্ছায়। এ বিয়েতে যায়নাবের মোটেই মত ছিল না। যায়নাব ছিরেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বোন। বোধ-বুদ্ধি হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে লালন পালনকরেন। তাই যখন তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে খুশী করার জন্য নিজেই বিয়ে করার ইচ্ছে পোষণ করতে লাগলেন। কিন্তু যেহেতু তখনও পর্যন্ত মুসলিমদের মন-মানসে জাহিলী যুগের প্রথ্য ও সংস্কারের প্রভাব কিছুটা বিদ্যমান ছিল, এ কারণে তিনি নিজের মনের ইচ্ছা চেপে রাখেন। কারণ, যায়িদ ছিলেন তাঁর পালিত পুত্র। আর জাহিলী সমাজ আপন ঔরসজাত পুত্র ও পালিত পুত্রের মধ্যে কোন পার্থক্য করতো না। যায়নাব ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল-াম) পালিত পুত্র যায়িদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী। তাঁকে বিয়ে কররে মুনাফিক ও কাফিররা হৈচৈ বাধিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করছিলেন। কিন্তু যেহেতু পালিত পুত্রের বিচ্ছেদপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে না করার প্রথাটি ছির একটি জাহিলী সংস্কার মাত্র, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (রা) ইচ্ছা ছির তার মূলোৎপাটন করা, এ কারণে আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে সময়ের মনের ইচ্ছাটি প্রকাশ করে দেন এভাবেঃ

আরবী হবে

-‘আপনি আপনার অন্তরে এমন কথা গোপন করে রাখছেন যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিচ্ছেন। আর আপনি মানুষকে ভয় করছেন, অথচ আল্লাহকে ভয় করা আপনার জন্য অধিকতর সঙ্গত।’

ইমাম তিরমিযী বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি ওহীর কোন কিচু গোপন করতেন তাহলে এ আয়াতটিই করতেন। কারণ আল্লাহ এ আয়াতে রাসূলুলত্মাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি গোপন ইচ্ছা প্রকাশ করে দিয়েছেন।

সহীহ মুসলিম হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। হযরত যায়নাবের (রা) ‘ইদ্দাত’ কাল শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত যায়িদকেই তাঁর কাছে এই বলে পাঠালেন যে, তুমি তাঁর কাছে আমার বিয়ের পয়গাম নিয়ে যাও। যায়িদ (রা) যেয়ে দেখেন যায়নাব (রা) আটা চটকাচ্ছেন। যায়িদ বলছেন, তাঁর প্রতি দৃষ্টি পড়তেই আমার অন্তরে তাঁর সম্পর্কে এক বড় ধরনের সম্ভ্রম বোধ সৃষ্টি হয়। আমি তাঁর প্রতি চোখ তুলে তানোর হিম্মত হারিয়ে ফেলি। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছেন। আমি একটু পেছনে সরে আসি। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত যায়িদ (রা) যায়নাবের (রা) ঘরের দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে বলেন, যায়নাব! আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পয়গাম নিয়ে এসেছি। হযরত যায়নাব জনাব দিলে, ‘এখন আমি কাজ করছি। আল্লাহর কাছে ইসখিারা ব্যতীত কিছু বলতে পারিনে।’ এ কথা বলে তিনি মাসজিদের দিকে যেতে শুরু করেন। এদিকে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এ আয়াত নাযিল করেনঃ

আরবী হবে

-‘‘পরে যায়িদ যখন তার নিকট হতে নিজের প্রয়োজন পূর্ণ করে নিল তখন আমরা তাকে (তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে) তোমার সাথে বিয়ে দিলাম। যেন নিজেদের মুখ-ডাকা পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিন লোকদের কোন অসুবিধে না থাকে-যখন তারা তাদের নিকট হতে নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করে নেয়। আল্লাহর আদেশ তো বাস্তবায়ন হতেই হবে। এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, যায়নাবের সাথে মোতার বিয়ের কাজটি আমিই সমাধা করে দিলাম। এ কারণে যায়নাব রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী হয়ে যান। এ ব্যাপারে যায়নাবের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন প্রয়োজন ছির না। ইবন ইসহাক বলেছেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে হযরত যায়নাবের (রা) বিয়ের কাজটি আঞ্জাম দেন হযরত আবু আহমাদ ইবন জাহাশ (রা)। হতে পারে পরে সামাজিকভাবে বিয়ে হয়েছিল এবং সেই কাজটি করেন আবু আহমাদ ইবন জাহাশ। কিন্তু সহীহ মুসলিমে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে যে, উপরোক্ত আত নাযিলের পর রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) কোন পূর্ব অনুমতি ছাড়াই যায়নাবের (রা) নিকট উপস্থিত হন। সাহীহাইনের একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত যায়নাব (রা) তাঁর সতীনদের নিকট এই বলে গর্ব করতেন যে, আপনাদের বিয়ে আপনাদের অভিভাবকরা দিয়েছেন, আর আমার বিয়ে দিয়েছেন কোদ আল্লাহ তা‘আলা। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিয়ের কাজটি সম্পন্ন হয় ৫ম হিজরীর জিলকা‘দ মাসে।

সূরা আল আহযাবের ৩৭তম আয়াতে আলআহ বলছেন, ‘আমরা তাকে (তালাকপ্রাপ্তা মহিলা যায়নাবকে) তোমার সাথে বিয়ে দিলাম।’ এই কথাগুলি ও ব্যবহৃত শব্দগৃলি দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিয়ে নিজের ইচ্ছা ও কামনার ভিত্তিতে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশেই করেন।

উক্ত আয়াত হতে একথা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীর দ্বারা এ কাজটি করিয়েছেন একটি বিশেষ প্রয়োজন পূরণ ও কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে। যা এ পন্থা ভিন্ন অন্য কোন উপায়ে অর্জিত হওয়া সম্ভবপর ছিল না। আরবে মুখ-ডাকা আত্মীয়দের সম্পর্কে অত্যন্ত মারাত্মক ধরনের ভূল প্রথা প্রচলিত হয়েছিল এবং যুগযুগ ধরে অব্যাহতভাবে তা চলে আসছিল পূর্ণ দাপটের সাথে। তা উৎখাত করার একটি মাত্র উপায় কার্যকর ও সফল হতে পারতো। আর তা হলো আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তা শিকড়সহ উপড়ে ফেলবেন। অতএব স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে তাঁর স্ত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা এই বিয়ে করাননি। একটি অত্যন্ত বড় ও অতিশয় প্রয়োজনীয় কাজের লক্ষ্যেই তিনি তা করিয়েছিলেন।

হযরত যায়নাবের (রা) সথে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ে তো হয়ে গেল। কিন্তু ইসলামের দুশমনরা বড় হৈ চৈ করে বাজার গরম করে তুললো এই বলে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পুত্র-বধূকে বিয়ে করেছেন, অথচ তাঁর নিজের উপস্থাপিত শরীয়াতের আইনেও পুত্র-বধূকে বিয়ে করা পিতার জন্য হারাম করা হয়েছে। এর জবাবে আল্লাহ পাক নাযিল করেন সূরা আল-আহযাবের ৪০তম আয়াতঃ

আরবী হবে

-(হে জনগণ) মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারও পিতা নয়, বরং আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী মাত্র। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞানী।

‘মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারও পিতা নয়।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তির পরিত্যক্ত স্ত্রীকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ে করেছেন সে তো রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুত্রই ছিল না। কাজেই তার পরিত্যক্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন কখনও হারাম ছিল না। তোমরা নিজেরাই জান যে, নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদতেই কোন পুত্র সন্তান বর্তমান নেই।

বিরুদধবাদীদের দ্বিতীয় প্রশ্ন এই ছিল যে, মুখ-ডাকা পুত্র যুদি প্রকৃত ঔরজাত পুত্র না-ও হয়, বতুও তার পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা খুব বেশি হলেও জায়েয হতে পারে। কিন্তু তাকে বিয়ে করতেই হবে এমন কোন প্রয়োজন তো ছিল না। এর জবাবে বলা হয়েছেঃ ‘সর্বোপরি তিনি আল্লাহর রাসূল।’ অর্থাৎ যে হালাল ও জায়েয কাজ তোমাদের ভুল প্রথার কারণে শুধু শুধুই হারাম বিবেচিত হয়ে আসছে, সে বিষয়ে সকল ভুল-ভ্রান্তির মূলোৎপাটন করে দেওয়া রাসূল হওয়ার কারণেই হযরত মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তব্য। তাছাড়া তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোন রাসূল আসা তো দূরের কথা, কোন নবী পর্যন্তও আসবেন না। কাজেই তাঁর জীবনকালে কোন আইন ও সমাজের কোন সংশোধনী যদি অকার্যকর ও অবাস্তবায়িত থেকে যায়, তবে তা পরবর্তী কোন নবীর দ্বারা সম্পন্ন হওযার প্রশ্নই উঠতে পারেনা। কাজেই এই জাহিলী কু-প্রথা বিলুপ্ত করা তাঁর নিজের পক্ষেই একান্ত বর্তব্য হয়ে দেখা দিয়েছে। তারপর আলোচ্য বিষয়ের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপের জন্য বলা হয়েছেঃ ‘আল্লাহ সর্ববিষয়েই জ্ঞানী।’ অর্থাৎ আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, এখনই শেষ নবীর দ্বারা এ কু-প্রথা বিলোপ করে দেওয়া একান্ত জরুরি। তা না হলে তার পরে এমন কোন ব্যক্তি দুনিয়ায় থাকবে না যার দ্বারা এহেন মজবুত কু-প্রথা দূর করা সম্ভব হবে।

ওলীমার অনুষ্ঠান

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত যায়নাবকে (রা) স্ত্রী হিসেবে ঘরে আনার পর ওলীমার আয়োজন করেন। আয়োজন অর্থ এই নয় যে, তিনি রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেন। তবে হযরত যায়নাবের (রা) ওলীমা তুলনামূলকভাবে একটু জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল দুপুর বেলা মতান্তরে রাতের বেলা। হযরত আনাস (রা) বলেন, ‘রাসূল (সাল¬াল-াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) আমাদের সকলকে রুটি ও গোশত খাওয়ান।’ আমাদের রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য এটা রাজকীয় আয়োজনই বটে। কারণ, দিনের পর দিন যে পরিবারের লোকদের শুধু দুধপান করে কাটতে হোত, তাঁদের পক্ষে তিন শো লোকের জন্য গোশত রুটির ব্যবস্থা করা জাঁকজমকপূর্ণই বলা চলে। এ কারণে পরবর্তীকালে হযরত যায়নাব (রা) তাঁর সতীনদের সামনে গর্ব করে বলতেন, কেবল আমার বিয়েতেই হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোশত-রুটি দিয়ে ওলীমা করেন। ইবন সা‘দ এই ওলীমার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ

আবরী হবে

-‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর অন্য কোন স্ত্রীর ওলীমা সেভাবে করেননি যেভাবে যায়নাবের (রা) ওলীমা করেছিলেন। তিনি যায়নাবের (রা) ওলীমা করেন ছাগলের গোশত দিয়ে।’ হযরত আনাস (রা) বলেন, এতো ভালো ও এত বেশি খাবারের আয়োজন তিনি অন্য কোন স্ত্রীর ওলীমাতে করেননি।

হযরত আনাসের (রা) সম্মানীতা মা হযরত উম্মু সুলাইম (রা), যিনি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খালা হতেন,. হযরত যায়নাবের (রা) ওলীমায় নবীগৃহে কিচু খাবার পাঠিয়েছিলেন। খাদ্যসামগ্রী প্রস্ত্তত হয়ে গেলে হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে ডাকার জন্য খাদেম আনাসকে (রা) পাঠান। তিন শো মেহমান হসবেত হন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দশজন দশজন করে খাবারের ব্যবস্থা করেন। লোকেরা দলে দলে এসে খেয়ে চলে যাচ্ছিলেন। দাওয়াতী মেহমানবরা পেট ভরে আহার করেন।

আবু হতেম থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন এক-স্ত্রীর সাথে প্রথম শিলন উপলক্ষে উম্মু, সুলাইম ‘হাউস’ নামক (খেজুর, আকিত ও চর্বি দ্বারা তৈরি) এক প্রকার খাবার তৈরি করে পিতল বা কাঠেল পাত্রে ঢালেন। তারপর ছেলে আনাসকে ডেকে বলেনঃ এটা রাসূলুল্লাহর (রা) নিকট নিয়ে যেয়ে বলবে, আমাদের পক্ষ থেকে সামান্য হাদিয়া। আনাস বলেনঃ মানুষ সে সময় দারুণ অন্নকষ্টে ছিল। আমি পাত্রটি নিয়ে যেয়ে বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা উম্মু সুলাইম আপনাকে পাঠিয়েছেন। তিনি আপনাকে সালামও পেশ করেছেন এবং বলেছেন, এ হচ্ছে আমাদের পক্ষ থেকে সামান্য হাদিয়া। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেনঃ ওটা ঘরের এক কোণে রাখ এবং অমুক অমুককে ডেকে আন। তিনি অনেক লোকের নাম বললেন। তাছাড়া আরও বললেনঃ পথে যে মুসলমানদের সাথে দেখা হবে, সাথে নিয়ে আসবে। আনাস বলেনঃ যাদের নাম তিবিললেন তাদেরকে তো দাওয়াত দিলাম। আমি ফিরে এসে দেখি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল-াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) গোটা বাড়ী, সুফফা ও হুজরা-সবই লোকে লোকারণ্য। বর্ণনাকারী আনাসকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তা কত লোক হবে? বললেনঃ প্রায় তিন শো। আনাস বলেনঃ রাসূল (সাল-াল¬াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) আমাকে খাবার পাত্রটি আনতে বলেন। আমি কাছে নিয়ে এলাম। তিনি তার ওপর হাত রেখে দু‘আ করলেন। তারপর বললেনঃ তোমরা দশজন দশজন করে বসবে, বিসমিল্লাহ বলবে এবং প্রত্যেকে নিজের পাশ থেকে খাবে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ মত সবাই পেট ভরে খেলো। তারপর তিনি আমাকে বললেনঃ পাত্রটি উঠাও। আনাস বলেনঃ আমি এগিয়ে এসে পাত্রটি উঠালাম। তার মধ্যে তাকিয়ে দেখলাম। কিন্তু আমি বলতে পারবো না, যখন রেখেছিরাম তখন বেশি ছিল, না যখন উঠালাম। এ ছিল হযরত যায়নাবের (রা) ওলীমার সময়ের ঘটনা।

আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে একটি সুসভ্য জাতিতে পরিণত করতে চান। তাই তিন জাহিলী যুগের মানুষের মধ্যে যে বর্বর ও অসভ্য রীতি-নীতি চালু ছিল তার কিচু বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে হযরত যায়নাবের (রা) ওলীমার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল কনের।

আরবী হবে

-হে ঈমানদার লোকেরা তোমরা নবীর ঘরে মধ্রে বনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ো না; আর না এসে খাওয়ার সময়ের অপেক্ষায় বসে থাকবে। তবে তোমাদেরকে যদি খাওয়ার দাওয়াত দেয়া হতে তবে অবশ্যই আসবে। কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে সংগে সংগে সরে পড়। কথায় মশগুর হয়ে বসে থেকো না। তোমাদের এ ধরনের আচরণ নবীকে কষ্ট দেয়। কিন্তু সে লজ্জায় বলে না। আর আল্লাহ সত্য কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন না।’

উপরোক্ত আয়াতে আরবদের কয়েকটি বদ-অভ্যাসের প্রতিবাদ করা হয়েছে।

১। প্রাচীনকালে আবরবাসীরা অকুণ্ঠচিত্তে একজন আরেকজনের ঘরে প্রবেশ করতো। কারো সাথে সাক্ষাৎ করার প্রয়োজন হলে তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আওয়ায দেওয়া এবং অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করার কোন বাধ্য বাধকতা কারও ছির না। বরং ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে নারী ও শিশুদের নিকট জিজ্ঞেস করতো যে, গৃহস্বামী ঘরে আছে কি না। এই জাহিলী রীতি নানা প্রকারের দোষ-ক্রুটির কারণ হয়ে দাঁড়াতো। অনেক সময় এর দরুণ বিভিন্ন রকমের নৈতিক বিপর্যয়কারী অবাঞ্ছানীয় ঘটনাবলীর সূচনা হয়ে যেত। এ কারণে সর্বপ্রথম নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাসগৃহে নিকটবর্তী কোন বন্ধু বা দূরবর্তী কোন আত্মীয় বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে নিয়ম ঘোষণা করা হয়। পরে সূরা আন-নূর এর মাধ্যামে এ নিয়ম সকল মুসলমানের ঘরের জন্য সাধারণভাবে চালু করা হয়।

২। আরবদের মধ্যে আরেকটি বদ-অভ্যাস ও কু-প্রথা চালু ছিল। তারা কোন বন্ধু বা সাক্ষাতের লোকের ঘরে আহারের সময় দেখে উপস্থিত হতো, অথবা এ ধরনের লোকের ঘরে এসে আহারের সময় পর্যন্ত বসে থাকতো। স্বাভাবিকভাবেই এরূপ অবস্থায় গৃহস্বামী দারুণ বিব্রতকরণ অবস্থায় পড়ে যেত। তাই আল্লাহ ত‘আলা এ আয়াতে এই বদ অভ্যাস পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। আদেশ দিয়েছে যে, কারও ঘরে খাওয়ার উদ্দেশ্যে কেবল তখনই যাবে যখন গৃহস্বামী খাওয়ার দাওয়াত দিবে। এই আদেশ কেবলমাত্র নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরের জন্য ছিল না। বরং এই নয়িম সাধারণভাবে সব মুসলিমের ঘরের সাধারণ প্রচলিত রীতিতে পরিণত হবে। এ উদ্দেশ্যে নমুনাস্বরূপ রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরের কথা বলা হয়েছে মাত্র।

৩। এ আয়াতে আরেকটি বদ-অভ্যাসের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সমাজে এমন লোকেও দেখা যায়, যারা কারও বাড়ীতে আমন্ত্রিত হয়ে খাওয়ার জন্য যায় এবং খাওয়া শেষ হওয়ার পরও অহেতুক ধর্ণা দিয়ে বসে থাকে। আর পরস্পরে কথাবার্তার এমন এক ধারাবাহিকতা শুরু করে দেয় যে, তা আর শেষ হতেই চায় না। এর দুরুণ বাড়ীর মালিক ও ঘরের লোকদের কি অসুবিধা হয়, তা তারা মোটেই চিন্তা করে দেখে না। অনেকে রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত অসুবিধায় ফেলতো। তিনি তাঁর সীমাহীন ভদ্রতা ও বিনম্র স্ববাবের কারণে এসব মন্ত্রণা নীরবে সহ্য করে যেতেন। শেষ পর্যন্ত হযরত যায়নাবের (রা) ওলীমার দিন এরূপ একটি ঘটনা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যন্ত্রণার চূড়ান্ত করে ছাড়ে। মূলত আয়াতটি নাযিলের কারণ সেই ঘটনা।

হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিশেষ খাদিম হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, রাত্রিকালে ছিল এই ওলীমার দাওয়াত। সাধারণ লোকেরা দাওয়াত খেয়ে বিদায় হয়ে চলে গেল। কিন্তু এই দুই তিনজন লোক ঠায় বসে নানা কথাবার্তায় মশগুল হয়ে রইল।

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অতিষ্ঠ হয়ে এক সময় উঠে পড়লেন এবং অন্দর মহলে বেগমদের নিকট হতে একবার ঘুরে আসলেন। ফিরে এসে তিনি দেখতে পেলেন, লোকগুলি অবিচলভাবে বসে আছে। তিনি আবার ভেতরে গেলেন ও ‘আয়িশার (রা) ঘরে গিয়ে বসলেন, অনেক রাত অতিবাহিত হওয়ার পর যখন তিনি জানতে পারলেন যে, লোকগুরি চলে গেছে, তখন তিনি যায়নাবের (রা) গরে গমন করেন। এ ঘটনার পর স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলারই লোকদের এই বদ-অভ্যাস সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়ার আবশ্যক হয়ে পড়লো। হযরত আনাসের বর্ণনামতে আলোচ্য আয়াত ঠিক এই ঘটনা সম্পর্কেই নাযিল হয়।

উপরে উল্লেখিত ঘটনার পর হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরের দরজায় পর্দা টানিয়ে দেন এবং মানুষকে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এটা পঞ্চম হিজরীর জিলকা‘দা মাসের ঘটনা।

হযরত যায়নাবের (রা) বিয়ের মধ্যে এমন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা আর কোথাও পাওয়া যায় না। সংক্ষেপে তা নিম্নরূপঃ

  1. পালিত ও ধর্মপুত্রকে যে ঔরসজাত পুত্রের সমান জ্ঞান করা হতো, সেই ভ্রান্তি দূর হয়।
  2. দাস ও স্বাধীন ব্যক্তির মধ্যে মর্যাদার যে পর্বত পরিমাণ ব্যবধান ছিল তা দূর করে ইসলামী সাম্যের বাস্তব দৃষ্টান্ত এ বিয়েতে প্রতিষ্ঠিত হয়। দাস যায়িদকে আরবের সর্বশ্রেষ্ট ও সর্বাধিক অভিজাত খান্দান বনু হাশিমের সম-মর্যদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
  3. এ বিয়েকে কেন্দ্র করে হিজাবের হুকুম নাযিল হয় অথবা বলা চলে এ বিয়ে ছির হিজাবের হুকুম নাযিলের পটভূমি।
  4. এ বিয়ের জন্য ওহী নাযিল হয়।
  5. এ বিয়ের ওলীমা হয় জাঁকজমকপূর্ণভাবে।

এ সবের কারণে হযরত যায়নাব (রা) তাঁরান্য সতীনদের সামনে গর্ব করতেন। একদিন তো তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেই বসলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল¬াল-াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম), আমি আপনার অন্য কোন বিবির মত নই। তাঁদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাঁর বিয়ে তাঁর পিতা, ভাই অথবা খান্দানের কোন অভিভাবক দেননি। একমাত্র আমি-যার বিয়ে আল্লাহ তা‘আলা আসমান থেকে আপনার সাথে সম্পন্ন করেছেন। আপনার ও আমার দাদা একই ব্যক্তি, আর আমার ব্যাপারে জিবরীল (আ) হলেন দূত।

ইমাম জাহাবী হলেনঃ আরবী হবে।

-‘আল্লাহ যায়নাবকে তাঁর নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে কোন অভিভাবক ও সাকষী ছাড়াই বিয়ে দেন।’

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিবিগণের মধ্যে যাঁরা হযরত ‘আয়িশার (রা) সমকক্ষতা দাবী করতে পারতেন তাঁদের মধ্যে হযরত যায়নাব (রা) অন্যতম। এ ব্যাপারে খোদ ‘আয়িশার (রা) মন্তব্য ছিল এ রকমঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিবিগণের মধ্যে একমাত্র তিনিই আমার সমকক্ষতার দাবীদার ছিলেন।

হযরত যায়নাবের (রা) এ দাবীর যৌক্তিকতাও ছিল। কারণ, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) ফুফাতো বোন এবং রূপ ও সৌন্দর্যের অধিকারী। রাসূলুল্লাহও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সব সময় তাঁখে খুশী রাখতে চাইতেন। হযরত যায়নাবরে (রা) চরিত্রে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা খুব কম নারীর মধ্যেই পাওয়া যেত। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নৈকট্য লাভের ব্যাপারে হযরত ‘আয়িশা (রা) ও তাঁর মধ্যে ভিতরে ভিতরে একটি প্রতিযোগিতার মনোভাব কাজ করতো। যা নারী স্বাভাবের দাবী অনুযায়ীাএকপ্রকার পবিত্র ঈর্ষার রূপ লাভ করে। যাকে শরীয়াতের পরিভাষায় ‘গিবতা’ বলে। পবিত্র ঈর্ষা কথাটি একজন্য বলেছি যে, হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তাঁদের একজনের অন্যজন সম্পর্কে যে সকল ধারণা, মতামত ও মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে, তাতে কোনভাবেই অপবিত্র ঈর্ষার যে সকল ধারণা, মতামত ও মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে, তাতে কোনভাবেই অপবিত্র ঈর্ষার ভাব ফুটে উঠে না। কারণ প্রকৃত ঈর্ষা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। প্রতিপক্ষের ভালা কোন কিচুই সে দেখতে পারে না এবং সহ্যও করতে পারে না। কিন্তু তাঁরা কেউই এমন ছিলেন না। রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র সুহবতের বরকতে তাঁরা এত উদার ও মহানুভব হয়ে গিয়েছিলেন যে, একজন অপরজনের ভালো গুণগুরি অকপটে স্বীকার করেছেন। আমরণ মানুষের কাছে তা প্রচার করে গেছেন। এ কাজ কেবল বড় মাপের মানুষেরাই করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘ইফক-এর ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। হযরত ‘আয়িশার (রা) বোন হযরত হামনা বিনত জাহাশও জড়িয়ে পড়নে। তিনি মনে করেন, এই সুযোগে বোন যায়নাবের (রা) সতীন ও প্রতিদ্বন্দ্বী ‘আয়িশার (রা) কাবু করতে পারলে বোন যায়নাব অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যাবেন। বোনের শুভ চিন্তায় তিনি এই নোংরা ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন।

আমাদের দেখার বিষয় হলো, এ সময় হযরত যায়নাবের (রা) ভূমিকা কি ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী সতীনকে ঘায়েল করার, পথের কাঁটা দূর করার চমৎকার একটা সুvাগ। এমন মোক্ষম সুযোগ জগতের কোন সতীন হাতছাড়া করেছে বলে জানা যায় না। কিন্তু হযরত যায়নাব (রা) নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার যে স্তরে উন্নীত হয়েছিলেন তাতে তাঁর মত লোকের পক্ষে এমন নোংরা ষড়যন্ত্রের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন এমন কল্পনা করা যায় কেমন করে! তাই হযরত ‘আয়িশার (রা) সে দুর্যোগের দিনে একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশা (রা) সম্পর্কে হযরত যায়নাবের (রা) মতামত জাতে চাইলেন। হযরত যায়নাব (রা) অভ্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বললেন,

আরবী হবে

‘‘আমি তাঁর মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিচুই জানিনে।’’ পরে হযরত ‘আয়িশার (রা) পবিত্রতা ঘোষণা করে আল-কুরআনের দশটি আয়াত নাযিল হয়। আর সেই সাথে হযরত যায়নাবের (রা) সত্যবাদিতা ও উন্নত নৈতিকতাও প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত ‘আয়িশার (রা) আজীবন হযরত যায়নাবের (রা) এ ঋণ মনে রেখেছেন। সারা জীবন তিনি মানুষের কাছে সে কথা বরেছেন। যায়বাবের (রা) মধ্যে যত গুণাবলী তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, অকপটে তা মানুষকে জানিয়েছেন।। ইবন হাজার আল-আসকিলানী (রহ) লিখেছেনঃ

আরবী হবে

-হযরত আয়িশা (রা) ‘ইফক’-এর ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত যায়নাবের (রা) ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

হযরত ‘আয়িশার (রা) মত প্রখর বুদ্ধিমতী, বিদূষী ও মহিয়সী নারী যখন হযরত নায়নাবের (রা) প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তখন তাঁর মর্যাদ ও স্থান যে কোন স্তরে তা অনুমান করতে আর কোন ব্যাখ্যা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর খোদাপ্রদত্ত তীক্ষ্ণ মেধা দিয়ে গভীরভাবে অতি নিকট থেকে হযরত যায়নাবকে (রা) পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন করেছিলেন। হাদীসের গ্রন্থাবলীতে হযরত ‘আয়িশার (রা) যেসব উক্তি ছড়িয়ে আছ তাতেই হযরত যায়নাবের (রা) প্রকৃত মর্যাদ ফুটে উঠেছে। হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

আরবী হবে

-‘আমি যায়নাবের (রা) চেয়ে কোন মহিলাকে বেশি দীনদার, বেশি পরহেযগার, বেশি সত্যভাষী, বেশি উদার, দানশীল, সৎকর্মশীল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বেশি তৎপর দেখিনি। শুধু তাঁর মেজাজে একটু তীক্ষ্ণতা ছিল। তবে তার জন্য তিনি খুব তাড়াতাড়ি লজ্জিত হতেন।’

আল্লামা ইবন ‘আবদিল বার হযরত যায়নাব (রা) সম্পর্কে হযরত ‘আয়িশার (রা) নিম্নোক্ত মন্তব্যটি বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

-দীনের ব্যাপারে আমি যায়নাবের (রা) চেয়ে ভালো কোন মহিলা কক্ষণো দেখিনি।

ইবন সা‘দ হযরত ‘আয়িশার (রা) নিম্নোক্ত মন্তব্যটি সংকলন করেছেনঃ

আরবী হবে

-আল্লাহ যায়নাব বিনত জাহশে প্রতি সদয় হোন! সত্যিই তিনি দুনিয়াতে অতুলনীয় সম্মান ও মর্যাদ লাভ করেছেন। আল্লাহ স্বয়ং তাঁর নবীর সাথে তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁর উপলক্ষে আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছে।

হযরত ‘আয়িশা (রা) আরও বলেছেনঃ ‘রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরকালে তাঁর সাথে সর্বপ্রথম মিলিত হওয়ার এবং জান্নাতে তাঁর স্ত্রী হওয়ার সুসংবাদ দান করেগেছেন।’

হযরত উম্মু সালামা (রা) তাঁর সম্পর্কে বলেছেনঃ

আরবী হবে

অর্থাৎ তিনি ছিলেন কুব বেশি সৎকর্মশীলা, বেশি সাওম পালনকারিনী ও বেশি বেশি সালাত আদায়কারিনী।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট হযরত যায়নাবের (রা) যে একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল সে কথা বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়। একবার একটি ব্যাপারে ‘আযওয়াজে মুতাহ্হারাত’ (পবিত্র সহধর্মিণীগণ) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাজী করানো জন্য হযরত ফাতিমাকে (রা) দূত হিসেবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পাঠান। কিন্তু তিনি দূতিয়ালীতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। তখন সকলে একমত হয়ে এই দূতিয়ালীর জন্য নির্বাচন করেন হযরত যায়নাবকে (রা)। কারণ তাঁদের সকলের দৃষিআটতে তিনিই এ কাজের যোগ্য ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট গিয়ে অত্যন্ত প্রবলভাবে একথা প্রমাণ করতেচান যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) এই মর্যাদার যোগ্য নন। হযরত ‘আয়িশা (রা) পাশে বসেই চুপ করে তাঁর বক্তব্য শুনছিরেন, আর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চেহারা মুবারকের প্রতি আড় চোখে চেচচেয়ে দেখছিলেন। হযরত যায়নাবের (রা) বক্তব্য শেষ হলে হযরত ‘আয়িমা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ানুমতি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং এমন শক্তিশালী বক্তব্য উপস্থাপন করেন যে, যায়নাব (রা) নিরুত্তর হয়ে যান। তখণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ এমন কেন হবে না, আবু বকরের মেয়ে তো।

হযরত যায়নাব (রা) ছিলেন খুবই দানশীল, দরাজহস্ত, আল্লাহ-নির্ভর ও অল্পে তুষ্ট মহিলা। ইয়াতিম, দুঃস্থ ও অভাবগ্রস্তদের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত হতেন। গরীব-দুঃখীদের প্রতিতাঁর দয়া-মমতার শেষ ছিল না। ইবন সা‘দ বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

-‘যায়নাব বিনত জাহশ দিরহাম-দীনের কিছুই রেখে যাননি। যা কিছুই তাঁর হাতে আসতো দান করে দিতেন। তিনি ছিলেন গরীব-মিসকীনদের আশ্রয়স্থল।

হযরত যায়নাব (রা) একজন হস্তশিল্পী ছিলেন। তিনি নিজ হাতে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চামড়া দাবাগাত করে পাকা করতেন এবং তার থেকে যে আয় হতো তা সবই অভাবী মানুষদের দান করতেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে। যায়নাব (রা) হাতে সূতা কেটে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুদ্ধবন্দীদেরকে দিতেন। আর তারা কাপড় বুনতো। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুদ্দের কাজে তা ব্যবহার করতেন। তাঁর দানের হাত এমন ছিল যে, খলীফা হযরত ‘উমার (রা) তাঁর জন্য বাৎসরিক বারো হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করে দেন; কিন্তু তিনি কখনও তা গ্রহণ করেননি। একবার ‘উমর (রা) তাঁর এক বছরের ভাতা পাঠারেন। হযরত যায়নাব দিরহামগুলি একণানা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। তারপর বাযরাহ ইবন রাফে‘কে নির্দেশ দেন দিরহামগুলো আত্মীয় স্বজন ও গরীব মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করার জন্য। বাযরাহ বললেন, এতে আমাদেরও কি কিছু অধিকার আছে? তিনি বললেন কাপড়ের নিচে যেগুল আছে সেগুলি তোমার। সেগুলি কুড়িয়ে গুদদেখা গেল পঞ্চাশ মতান্তরে পঁচাশি দিরহাম। সব দিরহাম বণ্টন করার পর তিনি দু‘আ করেন এই বলেঃ

আরবী হবে

‘হে আল্লাহ! আগামীতে এই অর্থ যেন আমাকে আর না পায়। কারণ এ এক পরীক্ষা।’

এ খবর হযরত ‘উমারের (রা) কানে গেল। তিনি মন্তব্য করলেনঃ

আরবী হবে

‘‘এ এমন মহিলা যার থেকে শুধু ভালো আশা করা যায়।’’ তারপর হযরত ‘উমার (রা) কিছুক্ষণ তাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন এবং সালাম বলে পাঠান। তিনি যায়নাবকে (রা) বলেন, আপনি যা কিছু করেছেন সবই আমি জেনে গেছি। ফিরে গিয়ে তিনি আরও এক হাজার দিরহাম তাঁর খরচের জন্য পাঠান। নিতি সেগুলিও আগের মত খরচ করে ফেলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন, হযরত যায়নাবের (রা) উপরোক্ত দু‘আ কবুল হয় এবং তিনি সে বছরই ইনতিকাল করেন।

হযরত যায়নাব যে চূড়ান্ত পর্যায়ে খোদাভীরু, বিনয়ী ও ‘আবিদা মহিলা ছিলেন তার সাক্ষ্য দিয়েছেন খোদ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুহাজিরদের মধ্যে গনীমতের মাল বণ্টন করছিলেন। মাঝখানে হযরত যায়নাব তাঁকে কিছু বলে ওঠেন। সাথে সাথে হযরত ‘উমার (রা) তাঁকে এক ধমক লাগান। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘উমারকে (রা) বলেন, তাকে কিছু বলো না। সে একজন বড় আবিদ ও যাহিদ মহিলা।

মৃত্যুঃ

খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) খিলাফতকালে হিজরী ২০ সনে হযরত যায়নাব (রা) ইনতিকাল করেন। সে বছরই মিসর বিজয় হয়। হাফেজ ইবন হাজারে মতে তিনি তিপ্পান্ন বছর জীবন পেয়েছিলেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত এটাই। কিন্তু ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে হযরত যায়নাবের (রা) মোট জীবনকাল পঞ্চাশ বছর। আর যা অধিকাংশের মতের পরিপন্থী। আল-ওয়াকিদী আরও বলেছেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ে সময় তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর; পক্ষান্তরে অন্যদের মতে আটত্রিশ বছর।

জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত তাঁর দানের স্বভাব বিদ্যামন ছিল। নিজের কাফনের ব্যবস্থা নিজেই করে যান। তবে তিনি আপনজনদের বলে যান, আমার মৃত্যুরপর উমার (রা) কাফনের কাপ পাঠাতে পারেন, যদি তেমন হয় তাহলে দুইটির যেকোন একটি কাফন গরীব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিবে। হযরত ‘উমার (রা) পাঁচখানা কাপড় পাঠান এবং তাই দিয়ে কাফন দেওয়া হয়। আর হযরত যায়নাব (রা) যে কাপড় রেখে গিয়েছিলেন তাঁর বোন হাফসা তা দান করে দেন। তিনি আরও অসীয়াত করে যান যে, রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে খাটিয়াতে করে কবরের কাছে নেওয়া হয়েছিল, তাঁকেও যেন সেই খাটিয়াতে উাঠানো হয়। তিনিই প্রথম মহিলা যাঁকে হযরত আবু বকরের (রা) পরে এই খাটিয়ায় ওঠানো হয়। তাঁর দুইটি অসীয়াতই পালিত হয়। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বিবিগণ তাঁকে গোসল দেন।

খলীফা হযরত ‘উমর (রা) তাঁর জানাযার নামায পার এবং আল-বাকী’ গোরস্তানে দাফন করা হয়।

রাবী‘আ ইবন ‘আবদিল্লাহ বলেনঃ ‘আমি ‘উমারকে (রা) দেখলাম, তাঁর এক কাঁধে দুররা ঝোলানো। সেই অবস্থায় সামনে গেলেন এবং চার তাকবীরের সাথে যায়নাবের (রা) জানাযার নামায পড়ালেন, কবরের উপরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তিনি কবরের পাশে ছিলেন।

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী সুলাইত (রা) বলেনঃ আমি আবু আহমাদ ইবন জাহাশকে [যায়নাবের (রা) ভাই] দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে যায়নাবের (রা) লাশবাহী খাটিয়া বহন করছেন। তিনি ছিলেন অন্ধ। আমি শুনলাম, ‘উমর (রা) তাঁকে বলছেন, আবু আহমাদ, তুমি খাটিয়া থেকে সরে এসো, যাতে মানুষের চাপে কষ্ট না পাও। আবু আহমাদ বললেনঃ ‘উমার, তাঁরই অসীলায় আমরা সব কল্যাণ লাভ করেছি। আমার এই কান্না আমার ভিতরের তীব্র জ্বালাকে প্রশমিত করছে। ‘উমর বললেনঃ ঠিক আছে, থাক, থাক।

হযরত যায়নাবকে (রা) যখন দাফন করা হচ্ছিল ঠিক সেই সময় একজন কুরাইশ যুবক দুইখানা মিসরীয় রঙ্গিন কাপড়সসেজে, চুলে চিরুনী করে উপস্থিত হয়। ‘উমার (রা) তাঁর মাথার উপর ছড়ি তুলে ধরে বলেন, তুমি যেভাবে এসেছো তাতে মনে হচ্ছে আমরা খেলা করছি। এখানে প্রবীণরা তাঁদের মাহকে দাফন করছে। তখন ছিল প্রচন্ড গরমের দিন। যেখানে কবর খোঁড়া হচ্ছিল হযরত ‘উমার (রা) সেখানে তাঁবু টানিয়ে দেন। বলা হয়ে থাকে যে, এ ছিল প্রথম তাঁবু যা বাকী‘র কোন কবরের উপর টানানো হয়েছিল। লাশ কবরে নামাvার সময় হযরত ‘উমার (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বিবিগণের নিকট জানতে চান যে, তাঁর কবরে কে কে নামবে? তাঁরা বলেণ, জীবদ্দশায় যারা তাঁর কাছে যাওয়া-আসা করতো তারা নামবে। অতঃপর হযরত ‘উমারের (রা) নির্দেশে মুহাম্মদ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবন জাহাশ, উসামা বিন যায়িদ, ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী আহমাদ ইবন জাহাশ ও মুহাম্মাদ ইবন তালহা (রা) কবরে নামেন। তাঁরা সকলে ছিলেন হযরত যায়নাবের (রা) আত্মীয় স্বজন।

হযরত যায়নাবের (রা) মৃত্যুতে হযরত ‘আয়িশা (রা) দারুণ শোকাভিভূত হন। তিনি তাঁর সেই সময়ের অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবেঃ

আরবী হবে

‘‘তিনি প্রশংসিত ও অতুলনীয় অবস্থায় চলে গেলেন। ইয়াতীম ও বিধবাদের অস্থির করে রেখে গেলন।’’ হযরত যায়নাব (রা) সেদিন মারা যান সেদিন মদীনায় গরীব-মিকীন ও অভাবী মানুষরা শোকে আহজারি শুরু করে দেয়।

হযরত রাসূল কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারে উৎপন্ন ফসল থেকে হযরত যায়নাবরে (রা) জন্য এক শো ওয়াসাক শস্য নির্ধারণ করে দিলেছিলেন।

হযরত যায়নাব (রা) উত্তরাধিকার হিসেবে ধুশু একটি বাড়ী রেখে যান। উমাইয়্যা খলীফা ওয়ালীদ ইবন ‘আবদিল মালিক তাঁর খিলাফতকালে পঞ্চাশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তাঁর নিকট-আত্মীয়দের থেকে বাড়ীটি খরীদ করে মসিজিদে ননবীর সাথে মিলিয়ে দেন।

হযরত যায়নাব (রা) খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন। হাদীসের গ্রন্থাবলীতে তাঁর বর্ণিত মাত্র এগারোটি হাদীস সংকলিত হয়েচে। তার মধ্যে দুইটি মুত্তাফাক ‘আলাইহি। তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে হযরত উম্মু হাবীবা (রা), যায়নাব বিনত আবী সালামা, মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদিল্লাহ ইবন জাহাশ, কুলসুম বিনত তালাক এবং দাস মাজকুর বিশেষ উল্লেকযোগ্য।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পূর্বে একবার তাঁর বিবিগণের কাছে বলেনঃ

আরবী হবে

-‘‘তোমাদের মধ্যে খুব দ্রুত সেই আমার সাথে মিলিত হবে যার হাত সবচেয়ে বেশি লম্বা।’’ তিনি হাত লম্বা দ্বারা রূপক অর্থে দানশীলতা বুঝিয়েছেন। কিন্তু সম্মাণিত বিবিগণ শব্দগত অর্থ বুঝেছিলেন। এ কারণে তাঁরা একত্র হয়ে পরস্পর পরস্পরের হাত মেপে দেখতেন যে, কার হাত বেশি লম্বা। যায়নাব (রা) ছিলেন ছোট কাট মানুষ। যায়নাব বিনত জাহাশের (রা) ইনতিকাল না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এমন করতেন। কিন্তু তিনি যখন সবার আগে মারা গেলেন তখন গভীরভাবে চিন্তা করে তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথার তাৎপর্য বুঝতে পারেন। তাই হযরত ‘আয়িশা (রা) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ

আরবী হবে

-আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হাতের অধিকারিণী ছিলেন যায়নাব। কারণ, তনি নিজের হাতে কাজ করে উপার্জন করতেন এবং তা দান করতেন।

অনেকে মনে করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ মন্তব্য দ্বারা হযরত যায়নাব বিনত খুযায়মাকে (রা) বুঝিয়েছেন। কিন্তু তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ, হযরত যায়নাব বিনত খুযায়মা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগেই ইনতিকাল করেন।

হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে যেসব বর্ণনা এসেছে তা দ্বারা একথা বুঝা যায় যে, হযরত যায়নাব (রা) খুবই রূপবর্তী মহিলা ছিলেন। একবার হযরত ‘উমার (রা) তার মেয়ে হযরত হাফসাকে (রা) উপদেশ দিতে গিয়ে বলেনঃ

আরবী হবে

-তুমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথার প্রত্যুত্তর করবে না। কারণ তোমার না আছে যায়নাবের রূপ-সৌন্দর্য, আর না আছে ‘আয়িশার স্বামী সোহাগ।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর অন্য বিবিগণ হজ্জ আদায় করলেও হযরত সাওদা (রা) ও হযরত যায়নাব (রা) আর হজ্জ করেননি। তাঁরা আর ঘর থেকে বের হননি। তাঁরা দুইজন আল্লাহ ও রাসূলের (রা) নির্দেশ সেভাবেই বুঝেছিলেন।

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ