আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – পঞ্চম খন্ড

আসহাবে রাসূলের জীবনকথা

[পঞ্চম খন্ড]

ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ


স্ক্যান কপি ডাউনলোড


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ভূমিকা

আল্লাহ পাকের বিশেষ মেহেরবানীতে ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৫ম খন্ড’ প্রকাশিত হচ্ছে। অল্প কথায় বাংলাভাষী পাঠকদের নিকট সাহাবায়ে কিরামের (রা) পরিচয় তুলে ধরাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ইতিপূর্বে প্রকাশিত চারটি খন্ডে পুরুষ সাহাবীদের জীবনকথা আমরা আলোচনা করেছি। ৫ম খন্ডে এগারো জন ‘উম্মাহাতুল মুমিনীন’ এর জীবনকথা আলোচনা করা হয়েছে। এ এগারো জন ছিলেন হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আযওয়াজে মুতাহ্হারাত’ বা পুতঃপবিত্র সহধর্মিণী।

ইসলামের পুরুষ নারীকে সমান দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। উভয়ের সমান দায়িত্ব ও সমান অধিকার ঘোষিত হয়েছে। এ বিশ্বে ইসলামের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় পুরুষের যেমন ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবদান রয়েছে, তেমনি আছে নারীরও। পুরুষরা যেমন যুলুম-অত্যাচারের শিক্ষার হয়েছেন, জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, নারীরাও তেমনি যুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন, দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা ইসলাম বিরোধশিক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। মোটকথা, এ বিশ্ব ইসলামকে বিজয়ী করতে মহিলা সাহাবীরা কোন অংশে পুরুষ সাহাবীদের থেকে পিছিয়ে থাকেননি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা প্রধান হয়ে উঠেছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত ও রিসালাতের উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছেন একজন নারী, সর্বপ্রথম সালাত আদায় করেছেন একজন নারী। ইসলামের জন্য নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তাই আমরা পুরুষ সাহাবীদের পাশাপাশি মহিলা সাহাবীদের জীবন ও কর্মের কতা পাঠকদের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

আরকী ভাষায় রচিত ‘আসমা আর-রিজাল’ (চরিত্র-অভিধান) শাস্ত্রের প্রায় সকর গ্রান্থে মহিলা সাহাবীদের পরিচয় ও জীবনকথা আলোচিত হয়েছে। ইবন মুন্দাহ্ (হিঃ ৩৯৫), আবু নু‘আইম, ইবন ‘আবদিল বার (হিঃ ৪৬৩), আবু মূসা ইসফাহানী (হিঃ ৫৮১) প্রত্যেকেই নিজ নিজ গ্রন্থে মহিলা সাহাবীদের জীবনী আলেচনা করেছেন। ইবন ‘আবদিল বার তাঁর ‘আল ইসতী ‘আব’ গ্রন্থে মোট ৩৯৮ জন মহিলা সাহাবীর জীবনী আলোচনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবন সা‘দের (হিঃ ২৩৩) ‘আত-তাবাকাত আল-কুবরা’ গ্রন্থে মোট ৬২৭ জন মহিলার জীবনী এসেছে। তার মধ্যে ৯৩ জন সাহাবী নন এমন মহিলাও আছেন। তাঁর গ্রন্থের ৮ম খন্ডে মহিলাদের জীবনী সন্নিবেশিত হয়েছে। ‘আল্লামা ইবনুল আসীর ‘তারিখ আন-নিসা’ শিরোনামে মহিলাদের জীবনীর উপর একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে রচিত বিভিন্ন গ্রন্থেও নামটি পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে গ্রন্থটি দুষ্প্রাপ্য। ইবনুল আসাীরের আরেকটি উলে্খযেগ্য গ্রন্থ ‘উসুদুল গাবা ফী মা ‘ রিফাতিস সাহাবা’। এর একটি খন্ডে শুধু মহিলাদের জীবনকথা এসেছে। এ গ্রন্থে মোট ১০২২ জন মহিলা সাহাবীর নাম পাওয়া যায়। হিজরী নবম শতকের আরেকজন বিখ্যাত লেখক আল্লামা ইবন হাজার আল-আসকিলানী (হিঃ ৮৫২)। তিনি ‘তাহযীবুত তাহযীব’ ও ‘আল-ইসবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা’ নামে দুইখানি বৃহদাকৃতির গ্রন্থ রচনা করেন। ‘তাহযীবুত তাহযীব’-এর ১২ তম খন্ডে ৩২২ জন মহিলার জীবনী আলেচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু মঞিলা তাবে’ঈর জীবনীও আছে। তবে ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে ১৫৪৫ জন মহিলা সাহাবীর জীবনকথা স্থান পেয়েছে। এ গ্রন্থেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মহিলা সাহাবীর নাম ও পরিচয় পাওয়া যায়্ তবে উপরে বিভিন্ন গ্রন্থে মহিলা সাহাবীদের যে সংখ্যা উলে্খ করা হয়েছে তার মধ্যে অনেক নামের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ইমাম আয-যাহাবীর (হিঃ ৭৪৮) ‘সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা’ ও ‘তাজকিরাতুল হুফফাজ’-দুইখানিবড়[ আকারে গ্রন্থ। তাতে তিনি বহু মহিলা সাহাবীর জীবনী সন্নিবেশ করেছেন। উল্লেখিত গ্রন্থগুলিই মূলতঃ সাহাবীদের উপর রচিত মৌলিক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থগুলির সবই আমাদের সামনে রয়েছে।

হযরত রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাঁরা ঘরের জীবনে সার্বিকভাবে সাহায্য করেছেন এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পারিবারিক জীবনের আদর্শের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ত৭ারা হলেন-‘আযওয়াজে মুতাহ্হারাত’। আল্লাহ পাক তাঁদেরকে ‘উম্মুহাতুল মুমিনীন’ (ঈমানদারদের মা) বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা মুসলিম নারীদের মডেল বা আদর্শ। ৫ম খন্ডে আমরা তাঁদের কথাই আলোচনা করেছি। তাঁদের সংখ্যা মোট এগারো জন। রাল্লুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল নয়।

বর্তমান সময়ে আমরা মুসলিমরা যখন পাশ্চাত্য জীবন দর্শন দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত এবং ইসলামের ‘আকীদা-বিশ্বাস, কৃষ্টি-কালচার, আইন-কানুন ইত্যাদি সবই তাদের দৃষ্টি দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করছি, বিশেষতঃ নারী স্বাধীনতা ও প্রগতির নামে ইসলাম বিরোধী যে কর্মতৎপতরা প্রবল বেগে বয়ে চলেছে তখণ রাসূলুল্লাহর ((সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একাধিক স্ত্রী গ্রহণের বিষয়টি একচন ঈমানদারের মনেও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। আমরা সে প্রশ্নের জবাব দানের চেষ্টা এখানে করবো না। কারণ এ প্রশ্ন নতুন নয়, বরং খ্রীস্টান-ইহুদীরা তা বহুকাল আগেই উত্থাপন করেছে এবং মুসলিম মনীষীরা যুগে যুগে নানাভাবে তাদের জবাব দিয়ে এসেছেন। আমরা আর তার পুনরাবৃত্তি করতে চাইনা। আমরা আমাদের পাটকদেরকে যে কতাগুলি স্মরকণ করিয়ে দিতে চাই তা হলো, একচন সত্যিকার মুমিনের অবশ্যই এ বিশ্বাস থাকতে হবে যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোটা জীবন স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত ছিল। নিজের ইচ্ছায় তিনি কিচুই করতেন না বা বলতেন না। সুতরাং তিনি যে বিষেগুলি করেছেন তা সবই আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশে করেছেন। দ্বিতীয়তঃ খীস্টান-ইহুদীদের প্রচার-প্রপাগান্ডায় যে প্রশ্ন আমাদের মনে দেখা দেয়, সেই রকম কোন প্রশ্ন কি কোন পুরুষ বা মহিলা সাহাবীর মনে কখননও দেখা দিয়েছিল? ইতিহাস অন্তত সে কথা বলে না। তাহলে আমরা আজ কেন বিভ্রান্ত হবো? আসলে এ জগতের সকল সৃষ্টির মালিক একমাত্র আল্লাহ। একজন মালিকের অধিকার আছে তার মালিকানাধীন বস্ত্ত যাকে এবং যত পরিমাণ খুশী দান করার। সে ক্ষেত্রে যেমন কারও কোন প্রশ্ন করার অধিকার থাকে না, এ ক্ষেত্রেও তাই। আল্লাহ তাঁর নবীকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এগারো জন স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দান করেছেন, যেমন একজন মুমিন পুরুষকে শর্তসাপেক্ষে চার জন স্ত্রী গ্রহণের সুযোগ রেখেছেন। এটাই ছিল আল্লাহর হিকমাত। মূলত এ সবই ঈমানের ব্যাপার। আমাদের ঈমান হতে হবে সাহাবায়ে কিরামের ঈমানের মত। আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাবতীয় কর্ম ও আচরণ আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতিতে হয়েছে-এ বিশ্বাস শক্ত হলে কোন সংশয়, কোন অবান্তর প্রশ্ন অন্তর মাঝে উঁকি দিতে পারে না। যেমন পারেনি সাহাবায়ে কিরামের (রা) মনে।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ যেদিন থেকে তাঁর সাথে বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হন এবং আল্লাহ তাঁদেরকে মুমিন বা বিশ্বাসীদের মা বলে ঘোষণা দেন সেদিন থেকেই জগতের সকল মুসলিমের অন্তরে এক বিশেষ মর্যাদা ও সম্মারে আসন তাঁরা লাভ করেছেন। প্রতিটি মুসলিম নব-নারী মায়ের থেকেও বেশি সম্মান ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাঁদেরকে দেখে এসেছেন। মুসলিম উম্মার নিকট থেকে তাঁরা যে মর্যাদার আসন লাভ করেছেন, বিশ্বের নারী জাতির ইহিাসে তার দ্বিতীয় কোন নজীর নেই।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক বেগমের ইনতিকাল হলে হযরত আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। লোকেরা প্রশ্ন করলো, আপনি এ সময় সিজদা করছেন কে? বললেনঃ ‘যখন কিয়ামতের কোন নিদর্শন দেখো তখন তোমরা সিজদা করে থাক। তাহলে আযওয়াজে মুতাহ্হারাত-এর মুত্যুর চেয়ে কিয়ামতের বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে?’ (আবু দাউদঃ কিতাবুস সালাত, বাবুস সুজূদ ইনদাল আয়াত)

মক্কার অদূরে ‘সারাফ’ নামক স্থানে হযরত মায়মুনার (রা) ইনতিকালের সময় হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) উপস্থিত ছিলেন। লাশ খাটিয়ায় উঠানোর সময় তিনি লোকদের বলেনঃ ‘ইনি মায়মূনা, তাঁর লাশ আদবের সাথে উটাবে, বেশি নাড়াচাড়া করবে না। (নাসাঈঃ কিতাবুন নিকাহ, জিকরু আমরি রাসূলিল্লাহ সা. ফিন-নিকাহ ওয়া আযওয়াজিহি)

কোনকোন সাহাবী আযওয়াজে মুতাহ্হারাতকে এত বেশি পরিমাণ ভালোবাসতেন যে, তাঁদের জন্য নিজের অনেক বিষয় সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে দিয়েছেন। হযরত ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আউফ (রা) তাঁদের জন্য্কটটি বড় বাগিচা ওয়াক্ফ করেন, যা চার হাজার দিরহামে বিক্রি করা হয়েছিল (তিরমিযীঃ মানাকিবু ‘আবদির রহমান ইবন ‘আউফ)

খুলফায়ে রাশেদুন-এর প্রত্যেক খলীফা ‘আযওয়াজে মুতাহ্হারাত’-এর খুবই সমাদর ও সম্মান করতেন। হযরত ‘উমার (রা) তাঁর খিলাফতকালে তাঁদের সংখ্যা অনুযায়ী নয়টি পিয়ালা বানিয়েছিলেন। কোন ফল বা কোন খাবার জিনিস যখন তাঁর নিকট আসতো তখন নয়টি পিয়ালা করে তাঁদের প্রত্যকের নিকট পাঠাতেন। (মুওয়াত্তা ইমাম মালিকঃ কিতাবুয যাকাত)

উটের যুদ্ধের সময় হযরত আলী (রা) সহ অন্যান্য সাহাবী জনতা উম্মুল মুমিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, ইতহাসের কোথাও কি তার তুলনা পাওয়া যায়?

হযরত যায়িদ ইবন হারিসার (রা) সাথে বিয়ে হয় হযরত যায়নাব বিনত জাহাশের (রা)। প্রায় বছর খানেক তাঁরা একসাথে ঘর করেন। বনিবনা না হওয়ায় ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ‘ইদ্দত শেষ হওয়ার পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই যায়িদকেই পাটালেন যায়নাবের (রা) কাছে বিষেয়র পয়গাম দিয়ে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়নাবকে (রা) বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছেন, তাই যায়িদের অন্তরে যায়নাবের (রা) প্রতি এত বেশি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমবোধ সৃষ্টি হয় যে, তিনি যায়নাবের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারেননি। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ত৭ার সাথে কথা বলেন। এসব অলীক কোন কিস্সা-কাহিনী নয়, সবই বাস্তব সত্য।

হিজরী ২৩ সনে যখন খলীফা ‘উমার (রা) ‘আমীরুল হাজ্জ’ হিসেবে হজ্জে যান তখন অত্যন্ত শ্রদ্দা ও সম্মানের সাথে ‘আডওয়াজে মুতাহ্হারাত’কেও সফলসঙ্গী করেন। হযরত ‘উসমান (রা) ও হযরত ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আউফের (রা) উপর তাঁদের নিরপত্তা ও দেখাশুনার সার্বিক দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁরা দুইজন ‘আযওয়াজে মুতাহ্হারাতে’র বাহনের আগে পিছে চলতেন, কাউকে তাঁদের কাছে ঘেঁঘতে দিতেন না। যখন কোথাও যাত্রাবিরতি করতেন, কাউকে তাঁদের তাঁবুর ধারে কাছে আসতে দিতেন না। (তাবাকাতঃ ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আউফের জীবনী)

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর উম্মাহাতুল মু’মিনীনের অনেকে দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। মুসলিম উম্মাহ যে তাঁদেরকে কী পরিমাণ সম্মান ও শ্রদ্ধা করেছেন তা আমরা তাঁদের জীবনীতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। মোটকথা, তাঁদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানো একজন মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব ও কর্তব্য। মুসলিম উম্মাহ কোনকালেই সে দায়িত্ব ও কর্তব্য বিস্মৃত হয়নি। আমরাও যখন তাঁদের জীবনী পাঠ করবো, তখন আমাদের অন্তরেও তাঁদের সম্পর্কে একটা পবিত্র চিন্তা ও ভাব বজায় রাখবো।

আসহাবে রাসূলের জীবকথা বাংলাভাষী পাঠকদের নিকট তুলে ধরার চিন্তা ও পরিকল্পনা মূতলঃ বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার-এর পরিচালক অধ্যাপক এ.কে.এম. নাজির আহমদ সাহেবের। তাঁর আগ্রহ ও উৎসাহ এ কাজ এতদূর এগিয়ে আনতে আমাকে অনগ্রাণিত করেছে। নানাভাবে তিনি আমাকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে চলেছেন। এ জন্য আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এবং দু’আ করি আল্লাহ যেন তাঁকে এর ভালো প্রতিদান দেন।

সাহাবীদের জীবনকথা লেখার ব্যাপারে পাঠকদের নিকট থেকেও অনেক মূল্যবান উপদেশ ও পরামর্শ পাওয়া গেছে।ানেক পরামর্শ আমরা গ্রহণকরতে পারিনি বলে দুঃখিত। এ গ্রন্থের তথ্যসমূহ আরবী-উর্দূর নির্ভরযোগ্য সূত্রুসমূহ থেকে গ্রহণকরার চেষ্টা করছি। উম্মাহাতুল মুমিনীর-এর সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে যথাযথ ভাষা ব্যবহারেও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। তা সত্ত্বেও যদি তথ্য ও ভাষাগত কোন অসংগতি পাঠকদের নিকট ধরা পড়ে তাহলে তা আমরা দৃষ্টিগোচর করার জন্য অনুরোধ করছি। বাংলার মুসলিম মা-বোনদের উপর ‘উম্মাহাতুল মুমিনীর’-এর বিশ্বাস আল্লাহ পাক আমাদের এ শ্রমটুকু কবুল করুন। আমীন \

৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৯

২১ ভাদ্র, ১৪০৬মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ

সহযোগী অধ্যাপক

 আবরী বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা-১০০০।

 

খাদীজা বিনত খুওয়াইলদ (রা)

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা)। তাঁর ডাকনাম ‘উম্মু হিন্দা’ ও উম্মুল কাসিম’ এবং উপাধি বা লকব ‘তাহিরা’। পিতা খুওয়াইলিদ ইবন আসাদ মক্কার কুরাইশ খান্দানের বনু আসাদ শাখার সন্তান। পিতৃবংশের উর্ধ্বপুরুষ ‘কুসাঈ’-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নসবের সাথেতাঁর নসব মিলিত হয়েছে। অর্থাৎ খাদীজা বিনতে খুলয়াইলিদ ইবন আসাদ ইবন ‘আবদুল ‘উয্যা ইবন কুসাঈ। এই ‘কুসাঈ রাসূলুল্লাহরও (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ৪র্থ ঊধ্বতন পুরুষ। হযরত খাদীজার (রা) মাতা ফাতিমা বিনতে যায়িদও ছিলেন কুরাইশ বংশীয়া। যুবাইর ইবন বাক্কার বলেনঃ জাহিলী যুগেই খাদীজার লকব ছিল ‘আত-তাহিরা’। বয়স ও বুদ্ধি হওয়ার পর পুতঃপবিত্র চরিত্রের জন্য এ লকব পান। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও হযরত খাদীজার (রা) মধ্যে ফুফু-ভাতিজার দূর সম্পর্ক ছিল। এ কারণে, নবুওয়াত লাভের পর হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর চাচাতো ভাই য়ারাকা ইবন নাওফিলের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন, ‘আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। সম্ভবত বংশগত সম্পর্কের ভিত্তিতেই তিনি একথা বলেছিলেন।

হযরত খাদীজার (রা) পরিবারটি ছিল মক্কার এক অভিজাত ও বিত্তবান পরিবার। তাঁর জন্ম হয় ‘আমুল ফীল’ (হাতীর বছর)-এর ১৫ বছর পূর্বে, মুতাবিক হিঃপৃঃ ৬৮/খ্রীঃ ৫৫৬ সনে মক্কা নগরীতে। হাকীম ইবন হিযাম বলেন, আমার ফুফু খাদীজা আমার চেয়ে দুই বছরের বড়। আমার জন্ম হাতীর বছরের তোরো বছর আগে।

হযরত খাদীজার (রা) পিতা খুওয়াইলিদ ইবন আসাদ নিজ খান্দানের একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মক্কায় এসে চাচাতো ভাই ‘আবদুদ দার ইবন কুসাঈ-এর হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ হয়ে স্থায়অ আবাস গড়ে তোলেন। এখানেই মক্কার মেয়ে ফাতিমা বিন্ত যায়িদকে বিয়ে করেন। এই ফাতিমা উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজার জননী। খুওয়াইলিদ ছিলেন ফিজার যুদ্ধে নিজ গোত্রের কমান্ডার। তিনি ছিলেন বহু সন্তানের জনক। প্রথম পুত্র হিযাম, এই হিযামের পুত্র প্রখ্যাত সাহাবী হাকীম জাহিলী যুগে মক্কার দারুন নাদওয়া’র পরিচালনভার লাভ করেছিলেন। দ্বিতীয় সন্তান খাদীজা (রা)। তৃতীয় সন্তান ‘আওয়াম প্রখ্যকাত সাহাবী হযরত যুবাইরের (রা) পিতা। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফুফু এবং হযরত হামযার (রা) আপন বোন হযরত সাফিয়্যা বিনত ‘আবদিল মুতাতইলব ছিলেন আওয়ামের স্ত্রী তথা যুবাইরের (রা) মা। অর্থাৎ খাদীজার (রা) ছোট ভাই-বউ। চতুর্থ সন্তান হালা। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মেয়ে হযরত যায়নাবের (রা) শ্বাশুড়ী, তথা আবুল ‘আস ইবন রাবী’র মা। আবুল ‘আস রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বড় জামাই। পঞ্চম সন্তান রুকাইয়া। তাছাড়া, বালাজুরী খালিজা ও রাকীকা নাম্নী তাঁর আরও দুই মেয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। খঅলিদার বিয়ে হয় ‘ইলাজ ইবন আবী সালামার সাথে, আর রাকীকার বিয়ে হয় ‘আবদুল্লাহ ইবন বিজাদের সাথে। হযরত খাদীজার (রা) ভাই-বোনদের মধ্যে একমাত্র হালা (রা) ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেন।

হযরত খাদীজার (রা) বাল্য ও কৈশোর জীবনের তেমন কোনতথ্য সীরাতের গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় না। তবে সেই জাহিলা সমাজে তিনি যে অতি পুতঃপবিত্র স্বভাব-বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন সে কথা বিভিন্নভাবে জানা যায়। পিতা খুওয়াইলিদ মেয়ের এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে তৎকালীন আরবের বিশিষ্ট্য তাওরাত ও ইনজীল বিশেষজ্ঞ ওয়ারাকা ইবন নাওফিলকে তাঁর বর নির্বাচন করেছিলেন, কিন্তু কেন যে সে বিয়ে হয়নি সে সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা নীরব। শেষ পর্যন্ত আবু হালা হিন্দা ইবন যুরারা আত-তামীমীর সাথে থ৭ার প্রথম বিয়ে হয়।াজহিলা যুগেই তাঁর মৃত্যু হয়। আবু হালার মৃত্যুর পর আতীক ইবন আবিদ, মতান্তরে আয়িজ-এর সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ কথা বলেছেন ইবন ‘আবদিল বারসহ অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ। তবে কাতাদার সূত্রে জানা যায়, তাঁর প্রথম স্বামী ‘আতীক, অতঃপর আবু হালা। ইবল ইসহাকও এ মত পোষণ করেছেন বলে ইউনুস ইবন বুকাইর বর্ণনা করেছেন। বালাজুরী বলেছেন, দ্বিতীয় স্বামী ‘আতীকের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তাপর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ে করেন।

হযরত খাদীজার (রা) পিতা কখন মারা যান, সে সম্পর্কে সীরাতের গ্রন্থাবলীতে দুই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাঁর বিয়ের সময় পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন এবং বিয়ের পর কোন এক সময় মারা যান। কেউ কেউ বলেছেন ফিজার যুদ্ধে তিনি মারা যান। ঐতিহাসিক আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, খাদীজার (রা) পিতা ফিজার যুদ্ধের পূর্বে মারা যান এবং তাঁর চাচা ‘আমর ইবন আসাদ তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ে দেন। তিনি আরও বলেছেন, ফিজারের পূর্বে যে তাঁর পিতা মারা যান সে ব্যাপারে আমারদের সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে ইজমা রয়েছে। কোন দ্বিমত নেই। ইমাম সুহায়লীও একথা বরেছেন।

পিতার মৃত্যু বা স্বামী থেকে বিচ্ছিন্নতা বা অন্য যে কোন কারণেই হোক, কুরাইশ বংশের অনেকের মত হযরত খাদীজাও (রা) ছিলেন একজন মস্তবড় ব্যবসায়ী। ইবন সা’দ তাঁর ব্যবসা সম্পর্কে বলেছেনঃ ‘খাদীজা ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও সম্পদশালী ব্যবসায়ী মহিলা। তাঁর বাণিজ্য সম্ভার সিরিয়া যেত এবং তাঁর একার পণ্য কুরাইশদের সকলের পণ্যের সমান হতো।’ ইবন সাহদেব এ মস্তব্য দ্বারা হযরত খাদীজার (রা) ব্যসায়ের পরিধি উপলব্ধি করা যায়। অংশীদারী বা মজুরীর বিনিময়ে যোগ্য লোক নিয়োগ করে তিনি দেশ-বিদেশে মাল কেনাবেচা করতেন।

মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন চবিবশ-পঁচিশ বছরের যুবক। এর মধ্যে চাচা আবু তালিবের সাথে বা একাকী কয়েকটি বাণিজ্য সফরে গিয়ে ব্যবসা সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছেন। ব্যবসায়ে তাঁর সততা ও আমানতদারীর কথাও মক্কার মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। সবার কাছে তিনি তখন ‘আল-আমীন’। তাঁর সুনামের কথা খাদীজার (রা) কানেও পৌঁছেছে। বিশেষতঃ তার ছোট ভাই-বউ সাফিয্যার কাছে ‘আল আমীন’ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে বহু কথাই শুনে থাকবেন।

এ সময় হযরত খাদীজা (রা) সিরিয়ায় পণ্য পাঠাবার চিন্তা করলেন। এজনব্য যোগ্য লোকের সন্ধান করছেন। অবশেষে মুহাম্মদ ইবন ‘আবদিল্লাহকে নিয়োগ দান করেন। যেভাবে তিনি নিয়োগ রাভ করেন, সে সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা আমরা এখানে তুলে ধরছি।

হযরত ইয়া’লার বোন নাফীসা বিন্ত মুনইয়া বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন পঁচিশ বছরে পদার্থণ করেছেন, তখন আবু তালিব একদিন ত৭াকে ডেকে বললেনঃ ‘ভাতিজা! আমি একজন বিত্তহীন মানুষ, সময়টাও আমাদের জন্য খুব সন্কটজনক। মারাত্মক অভাবের কবলে আমরা নিপতিত। আমাদের কোন ব্যবসা বা অন্য কোন উপায়-উপকরণ নেই। তোমার গোত্রের একটি বাণিজ্য কাফিলা সিরিয়া যাচে। খাদীজা তার পণ্যের সাথে পাঠানোর জন্য কিছু লোকের খোঁজ করছে। তুমি যদি তার কাছে যেতে, হযতো তোমাকে সে নির্বাচন করতো, তোমার চারিত্রিক নিস্কুলুষতা তার জানা আছে। যদিও তোমার সিরিয়া যাওয়া আমি পছন্দ করিনে এবং ইহুদীদের পক্ষ থেকে তোমার জীবনের আশস্কা করি। বতুও এমনিটি না করে উপায় নেই। জবাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সম্ভবতঃ সে নিজেই লোক পাঠাবে। আবু তালিব বললেনঃ হয়তো অন্য কাউকে সে নিয়োগ দিয়ে ফেলবে। চাচা-ভাতিজার এ সংলাপের কথা খাদীজার কানে গেল। তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট লোক পাঠিয়ে বললেনঃ অন্য লোকের আপনাকে যে পারিশ্রমিক দিবে, আমি তার দ্বিগুণ দিব।

বালাজুরী বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স যখন বিশ বছর তখন আবু তালিক একদিন বললেনঃ ভাতিজা! খাদীজা বিনত খুওয়াইলিক একজন ধনবতী ব্যবসায়ী মহিলা। তার এখন প্রেয়োজন তোমার মত একজন সৎ, বিশ্বস্ত ও চরিত্রবান লোকের। আমি যদি তোমার ব্যাপারে কথা বলি, হয়তো সে তার কোন ব্যবসায়ে তোমাকে দায়িত্ব দিতে পারে। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ চাচা! আপনি যা ভালো মনে করেন, করুন।

আবু তালিব খাদীজার নিকট গেলেন এবং তাঁর কোন ব্যবসায় মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়োগর ব্যাপারে কথা বললেন। খাদীজা প্রস্তাব শুনে আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে সিরিয়া পাঠিয়ে দিলেন।

‘আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন ‘আকীল বলেছেনঃ আবু তালিক মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ভাতিজা! শুনেছি খাদীজা অমুককে দুইটি জওয়ান উটের বিনিময়ে মজুর হিসেবে নিয়োগ করেছে। তোমার ব্যাপারে আমরা এতে রাজি হবো না। তুমি তার সাথে কথা বলতে চাও? বললেনঃ চাচা আপনি যা ভালো মনে করেন। এরপর আবু তালিক খাদীজার নিকট যেতে বলেনঃ খাদীজা! তুমি কি মুহাম্মদকে মজুরীর বিনিময়ে নিয়োগ করতে চাও? শুনেছি তুমি অমুককে দুইটি জাওয়ান উটের বিনিময়ে নিয়োগ করেছো। মুহাম্মদের ব্যাপারে চার উটের কমে আমরা রাজি হবো না।

উল্লেখিত বর্ণনাগুলি দ্বারা বুঝা যায়, হয়রত খাদীজা (রা) একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি বহু শ্রমিক কর্মচারী নেয়াগ করতেন। তাঁর বৃদ্ধিও ছিল প্রখর। তাই তিনি যথাসময়ে মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্বাচনে এবং তাঁর উপর ব্যবসায় দায়িত্ব প্রদানে মোটেই ভুল করেননি। আর এই নিয়োগ লাভের ব্যাপারে জনাব আবু তালিব মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। নিয়োগ লাভর পর জনাব আবু তালিব রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, এ তোমার প্রতি আল্লাহর একটি অনুগ্রহ। খাদীজার (রা) পণ্য-সামগ্রী নিয়ে তাঁর বিশ্বস্ত দাস মায়সারাকে সংগে করে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিরিয়ার দিকে বেরিয়ে পড়লেন। যাত্রাকালে চাচারা তাঁর সহযোগীদের সতর্ক করে দিলেন তাঁর প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য। কাফিলা সিরিয়া পৌঁছলো। পথে এক গীর্জার পাশে একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন তিনি। মায়সারা গেছের একটু দূরে কোনকাজে। গীর্জার পাদ্রী এগিয়ে গেলেন মায়সারার দিকে। জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘গাছের নিচে বিশ্যামরত লোকটি কে?’

মায়াসারা বলেনঃ ‘মক্কার হারামবাসী কুরাইশ গোত্রের একটি লোক।’ পাদ্রী বললেনঃ ‘এখন এ গাছের নিচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি একজন নবী ছাড়া আর কেউ নন।’ পাদ্রী আরও জানতে চানঃ তাঁর চোখ দুইটি কি লালচে?’ মায়াসারা বললেনঃ হ্যাঁ। এই লাল আভা কখনও দূর হয় না। পাদ্রী বললেনঃ তিনি নী। তিনিই আখিরুল আম্বিয়া-শেষ নবী।

রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মায়সারাকে সংগে নিয়ে বাজারে পণ্য বিক্রি করেন। এক পর্যায়ে সেখানে এক ব্যক্তির সাথে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু বিবাদ হয়। লোকটি রাসূলকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেঃ আপনি লাত ও উয্যার নামে শপথ করে বলুন। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমি তো কক্ষণও তাদের নামে শপথ করিনা। আমি তাদের প্রত্যাখ্যাত করি। লোকটি বললোঃ আপনার কথাই ঠিক। অতঃপর সে মায়সারাকে বলেঃ আল্লাহর কসম! তিনি একজন নবী।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদীজার (রা) বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে কোন বাজারে গিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে সামান্য মতবিরোধ আছে্ একটি মতে, তিনি সিরিয়ার ‘বুসরা’ বাজার গিয়েছিলেন। আল্লাম আয-যিরিকলী ‘হাওরান’ বাজারের কথা উলে্খ করেছেন। তাবারী ইবন শিহাব যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিরিয়া নয়, বরং ইয়ামনের একটি হাবশী বাজারে গিয়েছিলেন। তবে সিরিয়া যাওয়ার বর্ণনাটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিরিয়ার বাজারে পণ্যদ্রব্য বিক্রী করলেন এবং যা কেনার তা কিনলেন। তাপর মায়সারাকে সঙ্গে করে মক্কার পথে রওয়ানা হলেন। পথে মায়সারা লক্ষ্য করলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উটের উপর সওয়ার হয়ে চলেছেন, আর দুইজন ফিরিশতা দুপুরের প্রচন্ড রোদে তাঁর মাথার উপর ছায়া বিস্তার করে রেখেছেন। এভাবে মক্কায় ফিরে খাদীজার (রা) পণ্য সামগ্রী বিক্রী করলেন। ব্যবসায়ে এবার দ্বিঘুণ অথবা দ্বিগুণের কাছাকাছি মুনাফা হলো। এই সফরে আলআহ তা’আলা মায়সারার অন্তরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় ভালেবাসা সৃষ্টি করে দেন। তিনি যেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাসে পরিণত হন। যখন তাঁরা মক্কার অদূরে ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে তখন মায়সারা বলেনঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আপনি খাদীজার কাছে যান এবং আলাহ আপনার সাথে যে আচরণ করেছেনতা তাঁকে অবহিত করুন।

তাঁরা ব্যবসা থেকে মক্কায় ফিরে আসলেন। দাস মায়সারা অত্যন্ত সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে সফরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাবতীয় কর্মকান্ড, পাদ্রীর মন্তব্য, ফিরিশতার ছায়াদান, দ্বিগুণ মুনাফা ইত্যাদি বিষয়ের একটি বিস্তারিত রিপোর্ট মনিব খাদীজার ৯রা) নিকট পেশ করেন। মায়সারা একথাও বলেনঃ আমি তাঁর সাথে খেতে বসতাম। আমাদের পেট ভরে যেত, অথচ অধিকাংশ খাবার পড়ে থাকতো। এ সফরের ঘটনাবলী বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে সব বর্ণনার বিষয়বস্ত্ত এই আছে।

হযরত খাদীজা (রা) ছিলেন তৎকালীন মক্কার একজন বিচক্ষণ বুদ্ধিমতী ও দৃঢ়চেতা ভদ্রমহিলা। তাঁর ধন-সম্পদ, ভদ্রতা ও লৌকিকতায় মকাকর সর্বস্তরের মানুষ মুগ্ধ ছিল। তিনি ছিলেন বংমত কৌলিন্যের দিক দিয়ে কুরাইশদের মধ্যমণি। অনেক অভিজাত কুরাইশ যুবকই তাঁকে সহধর্মিনী হিসেবে পাওয়ার প্রত্যাশী ছিল। তাদের অনেক প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল এবং সেজন্য প্রচুর অর্থও ব্যয় করেছিল। তিনি তাঁদের সকলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজেই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট বিয়ের পয়গাম পাঠান। হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ে করার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে সাধারণভাবে যে কথাটি বলা হয় তা হলো, বিশ্বস্ত দাস মায়সারার মুখে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নৈতিক গুণাবলী ও অলৌকিক ঘটনাবলীর কথা শুনে তিনি মুগ্ধ হন এবং বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। হয়তো এটাই মূল কারণ। তবে এর পশ্চাতে বর্ণনা করেছেন। সিরিয়া থেকে ফেরার সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চলতে চলতে এক সময় মক্কায় প্রবেশ করলেন। তখন ছির দুপুর বেলা। খাদীজা (রা) তখন তাঁর ঘরের ছাদে। তিনি সেখাকে দাঁড়িয়ে দেখলেন, মুহাম্মদ উটের উপর বসে আছেন এবয় দুইজন ফিরিশতা তাঁকে ছায়াদান করে আছে। তিনি সঙ্গের অন্য মহিলাদেরকে এ দৃশ্য দেখান। এছাড়া আর একটি ঘটনার কথা আল মাদায়িনী ইবন ‘আববাসের (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। জাহিলী যুগে মেয়েদের কোন এক উৎসব উপলক্ষে মক্কার মেয়েরা এক স্থানে সমবেত হয়। তখন দূরে এক অপরিচিত ব্যক্তি দেখা যায়। লোকটি আরও নিকটে এসে উঁচু গলায় ঘোষণা করেঃ ওহে মক্কার মহিলারা! তোমরা শুনে রাখ। খুব শিগগির তোমাদের এ মক্কা নগরীতে একজন নবীর আবির্ভাব হবে। তাঁর নাম হবে আহমাদ। তোমাদের মধ্যে যার পক্ষে সম্ভব সে যেন তাঁর স্ত্রী হয়। ইন ইসহাক বর্ণনা করেছেনঃ খাদীজা ৯রা) দাস মায়দসারার মুখে পাদ্রীর মন্তব্য ও দুইজন ফিরিশতা কর্তৃক মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়াদানের কথা শুনে ওয়ারাকা ইবন নাওফিলের নিকট যেয়ে তাঁকে এসব কথা বলেন। খাদীজার কথা শুনে তিনি বলেনঃ খাদীজা! তোমার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে মুহামম্দ এই উম্মাতের নবী। আমি জেনেছি, খুব শিগগির এই উম্মাতের একজন নবী আসবেন। এ তাঁরই সময়। এরপর ওয়ারাকা প্রতীক্ষা করতে থাকেন। সম্ভবতঃ উল্লেখিত সকল ঘটনা হযরত খাদীজার (রা) সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।

এখানে ওয়ারাকা ইবন নাওফিলের একটু সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। কারণ হযরত খাদীজার ৯রা) জীবনকে সটিক ধারায় চলমানরাখতে তাঁকে আমরা বারবার দৃশ্যপটে দেখতে পাই। ইসলামের সূচনা পর্বের ইতিহাসে সকাল বেলার সূর্যের সোনালী আভার মত তিনি ওয়ারাকা ইবন নাওফিল ইবন আসাদ ইবন ‘আবদুল ‘উয্যা। তাঁর মায়ের নাম হিন্দা বিনত আবী কাবীর। তিনি আসমানী কিতাবের ও মানুষের জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন। ত৭ার কোন সন্তানাদি ছিল না। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবী হিসেবে আত্মপ্রকাশের পূর্বেই যাঁরা তাঁর উপর ঈমান আনেন এবং মারা যান তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

বিয়ের প্রস্তাব কিভাবে এবং কেমন করে হয়েছিল সে সম্পর্কে নানা রকম বর্ণনা রয়েছে। তবে খাদীজাই (রা) যে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কনিকট প্রস্তাবটি পেশ করেন। সে ব্যাপারে প্রায় সব বর্ণনা একমত।

একটি বর্ণনায় এসেছে, নাফীসা বিন্ত মুনইয়া বলেন, মুহাম্মদ সিরিয়া থেকে ফেরার পর তাঁর মনোভাব জানান জন্য খাদীজা (রা) আমাকে পাঠালেন। আমি তাঁকে বললামঃ মুহাম্মদ! আপনি বিয়ে করছেন না কেন? বললেন, বিয়ে করার মতো অর্থ তো আমার হাতে নেই। বললামঃ যদি আপনাকে একটি সুন্দরের প্রতি আহবান জানানো হয়, অর্থ-বিত্ত, মর্যাদা ও অভিজাত বংশের প্রস্তাব দেওয়া হয়, রাজি হবেন? বললেনঃ কে তিনি? বললামঃ খাদীজা। বললেনঃ এ আমার জন্য কিভাবে সম্ভব হতে পারে? বললামঃ সে দায়িত্ব আমার। তিনি রাজি হয়ে গেলেন।

ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খাদীজা ছিলেন বিচক্ষণ ও মুদ্ধিমতী মহিলা। তিনি দূতের মাধ্যমে মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ‘হে আমার চাচাতো ভাই! আপনার বিশ্বস্ততা, সততা ও উন্নত নৈতিকতা আমাকে মুদ্ধ করেছে। সম্ভবতঃ এই দূত নাফীসা বিনত মুনইয়া।

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, খাদীজা (রা) নিজেই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে কথা বলেন এবং তাঁর পিতার নিকট প্রস্তাবটি উত্থাপনের জন্য রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান এই বলে যে, দারিদ্রে্যর কারণে হয়তো খাদীজার পিতা তাকে প্রত্যাখ্যান করবেন। অবশেষে খাদীজা নিজেই বিষয়টি তাঁর পিতার কাছে উত্থাপন করেন এবং তাঁর সম্মাতি আদায় করেন।

অনেকে এমন কথা বলেছেন যে, প্রথমখোদীজা (রা) নাফীসাকে পাঠান বিয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মনোভাব জানানর জন্য। তিনি ইতিবাচক সাড়া পেয়ে সরাসরি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে কথা বলেন। আর এটা সম্ভবত এ কারণে যে, তৎকালীন আরবে মেয়েদের, বিশেষত অভিজাত বংশের মেয়েদের বিয়ে-শারীর ব্যাপরে আলোচনা ও সিদ্ধান্গত গ্রহণের অধিকার ছিল। তাই পিতা অথবা চাচা জীবিত থাকতেও খাদীজা নিজেই নিজেই বিয়ের সকল পর্যায় অতিক্রম করেন।

আল-কালবী বলেনঃ খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলে পাঠালেন, তিনি যেন তাঁর চাচা আমর ইবন আসাদের নিকট আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দান করেন। ‘আমার তখন থুথুড়ে বুড়ো। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)খাদীজর প্রস্তাবের কথা চাচাদের বললেন। তিনি তাঁর দুই চাচা আবু তালিব ও হাযাকে সঙ্গে করে একটি নির্দিষ্ট দিনে খাদীজার গৃহে যান। খাদীজা ছাগল জবাই করে আপ্যায়নের আয়োজন করেন। চাচা আমর ও খান্দানের লোকদেরও ডাকেন। চাচাকে পানীয় পান করান। পানাহারের পর্ব শেষ হলে খাদীজা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আপনি আবু তালিবকে আমার চাচা ‘আমরের নিকট আমার বিয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করতে বলুন। অতঃপর আবু তালিব বিয়ের খুতবা পাঠ করে খাদীজার সাথে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ের কাজ সমাধা করেন। এই বিয়ের অল্প কিছুদিন পর খাদীজার (রা) চাচা মারা যান।

এ প্রসঙ্গে হযরত খাদীজার (রা) পিতা সম্পর্কিত কয়েকটি বর্ণনাও দেখতে পাওয়া যায়। ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে ইবন ‘আববাস (রা) থেকে বণৃনা করেছেন। খাদীজার (রা) পিতা এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না। একদিন খাদীজা (রা) তাঁর গৃহে পিতার সাথে আরও কিচু কুরাইশ ব্যক্তিবর্গকে পানাহারে আমন্ত্রণ জানালেন। তারা পরিতৃপ্তি সহকারে পানাহার করে মাতাল হয়ে পড়লে খাদীজা (রা) পিতাকে বললেনঃ মুহাম্মদ আমাকে বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছেন। আপনি এ বিয়েতে সম্মাতি দিন। পিতা সম্মতি দান করেন। খাদীজা (রা) প্রথা অনুযায়ী পিতাকে নতুন পোশাক পরান। জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি প্রম্ন করেনঃ আমার এ নতুন পোশাক কেন? খাদীজা (রা) বলেনঃ তোমাকে আমি আবু তালিবের এই ইয়াতীমের সাথে বিয়ে দিব? আমার জীবনের শপথ! কক্ষণও তা হয় না। খাদীজা (রা) প্রতবিাদের সুরে বলেনঃ আপনি আমার ব্যাপারটি নিয়ে নিজেকে কুরাইশদের নিকট নির্বোধ প্রতিপন্ন করতে চাচ্ছেন? আপনি তাদের জানাতে চাচ্ছেন যে, আপনি মাতাল ছিলেন। খাদীজার (রা) এ কথায় তিনি সম্মতি দান করেন। আল আ’মাশ জাবির ইবন সামুরা থেকেও এ রকম কথা বর্ণনা করেছেন। ইমাম যুহরীও এরকম কথা উল্লেখ করেছেন।

আবু মিহলায বর্ণনা করেছেন। খাদীজার (রা) পিতাকে মদপান করিয়ে মাতলা করা হয়। তাপর মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাকা হয় এবং তাঁর দ্বারা বিয়ের কাজ সমাধা করা হয়। অতঃপর প্রথা অনুযায়ী বৃদ্ধকে নতুন পোশাক পরানো হয়। সুস্থ হয়ে বৃদ্ধ প্রশ্ন করেনঃ আমার গায়ে এ নতুন পোশাক কেনৎ লোকেরা বলতোঃ এ পোশাক আপনার মেয়ের স্বামী মুহাম্মদ আপনাকে পরিয়েছেন। তিনি রাগে ফেটে পড়েন এবং হাতে অস্ত্র তুলে নেন। বনু হাশিমও প্রতিরোধের জন্য অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে যায়। শেষমেষ একটা আপোষ-মীমাংসা হয়ে যায়।

অন্য একটি সনদে এ রকম বর্ণিত হয়েছে যে, খাদীজা (রা) তাঁর পিতাকে অতিরিক্ত মদপান করিয়ে অচেতন কর ফেলেন। গরু জবেহ করেন, পিতার গায়ে রং লাগান এবং নতুন পোশাক পরান। তিনিসুস্থ হয়ে জানতে চানঃ এ গরু জবেহ কেন, আপনি আমাকে মুহাম্মাদের সাথে বিয়ে দিয়েছন, তাকি মনে নেই? তিনি বললেনঃ না, আমি তা করিনি। কুরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে আমি মত দিইনি। আর মুহাম্মদের সাথে আমি তোমাকে বিয়ে দিয়েছি? আমরা আগেই উল্লেক করেছি, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের সময় খাদীজার পিতা বেঁচে ছিলেন কি না সে ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ আছে। সুতরাং এ ব্যাপারেও মতপার্থক্য আছে যে, এ বিয়েতে খাদীজার (রা) অভিভাবক (ওয়ালী) কে হয়েছিলেন। কেউ কেউ চাচা ‘আমর ইবন আসাদের কথা বলেছেন, আবারানেকে ভাই ‘আমর ইবন খুওয়াইলিদের নাম উল্লেখ করেছেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ে দেন। কারণ ফিজার যুদ্ধের পূর্বে তাঁর পিতা মারা যান। ইবন ‘আবাবস (রা) আরও বলেনঃ ‘আমর সে সময় থুথুড়ে বুvাড়। তিনি ছাড়া আসাদের আর কোন সন্তান তখন জীবতি ছিলেন না। আর আমরেরও কোন সন্তান ছিল না। মুহাম্মদ ইবন ‘উমারও বলেছেন ফিজারের পূর্বে খাদীজার (রা) পিতা মারা যান। আর খাদীজার (রা) বিয়ের ব্যাপারে তাঁর পিতাকে জড়িয়ে যেসব বর্ণনা এসেছে সবই অসত্য ও অমূলক। তাঁর চাচাই তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ে দেন।

যাই হোক, পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষের লোকদের উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাচা আবু তালিব আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের খুতবা পাঠ করেন। সংক্ষিপ্ত হলেও খুতবাটি সাহিত্য-উৎকর্ষের দিক দিয়ে জাহিলী যুগের আরবী গদ্য সাহিত্যের একটি মডেল হিসেবে চিহ্নিত। আরব ঐতিহাসিক ও সাহিত্য-রসিকরা খুতবাটি সংরক্ষণ করেছেন। পাঠকদের অবগতির জন্য আমরা তা এখানে তুলে ধরছি।

আরবি হবে

‘‘সকল প্রসংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে ইবরাহীমের বংশধর ও ইসমাঈলের ফসলের অন্তর্গত করেছেন। আমাদেরকে দান করেছেন একটি সম্মানিত শহর ও মানুষের উদ্দীষ্ট একটি গৃহ। মানুষের উপর আমাদেরকে কর্তৃত্ব দান করেছেন। মুহাম্মদ ইবন ‘আবদুল্লাহকে যে কোন কুরাইশ যুবকের সাথে পাল্লায় ওজন দেওয়া হোক না কেন, কল্যাণ মাহাত্ম্য ও ন্যায়নিষ্ঠায় তাঁর পাল্লা অবশ্যই ভারী হবে-যদিও বিত্ত-বৈভবে সে সর্বনিম্নে। তবে অর্থ-সম্মদ ক্ষণস্থায়ী ও অপসৃয়মান ছায়াস্বরূপ। খাদীজা বিনত খুওয়াইলদের প্রতি তাঁর আগ্রহ আছে এবং তার প্রতিও খাদীজার একই রকম ঝোঁক আছে। আপনারা যে পরিমাণ মাহর চান, তা আদায় করার দায়িত্ব আমার।’’

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খাদীজার (রা) বিয়েতে দেন-মাহর কত ধার্য হয় সে সম্পর্কে কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য আছে। একটি বর্ণনায় এসেছে, চাচা ‘আমরের পরামর্শে পাঁচশো স্বর্ণমুদ্রা ধার্য হয়। আল-কালবী বলেনঃ মাহর নির্ধারিত হয় বারো উকিয়া স্বর্ণ। এক উকিয়া চল্লিশ দিরহারেম সমান। ইমাম জাহাবী ইবন ইসহাকের সূত্রে বলেছেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদীজাকে (রা) ‘বিল বাকরাহ’ দেন-মাহর দান করেন।

হযরত খাদীজা (রা) নিজেই উভয় পক্ষের যাবতীয় খরচ বহন করেছিলেন। তিনি দুই উকিয়া সোনা ও রূপো রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পাঠান এবং তা দিয়ে উভয়ের পোশাক ও ওয়ালীমার বন্দোবস্ত করতে বলেন।

এভাবে খাদীজা (রা) হলেন ‘উম্মুল মুমিনীন’। এ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াত প্রকাশের পনেরো বছর পূর্বের ঘটনা। অবশ্য তখন তাঁদের উভয়ের বয়স সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য আছে।

আল-কালবী ইবন ‘আববাসের (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন খাদীজাকে (রা) বিয়ে করেন তখন খাদীজার (রা) বয়স আটাশ (২৮) বছর। তবে বিশেষজ্ঞরা এ বর্ণনাটির সনদ দুর্বল বলে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। যুরকানী ‘শারহুল মাওয়াহিব’ গ্রন্থে বিয়ের সময় খাদীজার (রা) বয়স চল্লিশ বছর বলে উলে্খ করেছেন। ইমাম জাহবী বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স তখন পাঁচিশ এবং খাদীজা (রা) তাঁর চেয়ে পনেরো বছরের বড়। হযরত খাদীজার (রা) ভাতিজা হাকীম ইন হিযামও এ রকম কথা বলেছেন। আল-ওয়াকিদী নাফীসা বিনত মুনইয়ার সূত্রে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স চবিবশ বছর বলে বর্ণনা করেছেন। কোন কোন বর্ণনায় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স পঁচিশ ও খাদীজার (রা) বয়স ছেচল্লিশ। তেমনিভাবে তেইশ ও আঠাশ বছরের কথাও এসেছে। সর্বাধিক সঠিক মতটি হলো পঁচিশ ও চল্লিশ।

বিয়ের পনেরো বছর পর নবী কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াত লাভ করেন। পূর্ব তেকেই খাদীজা (রা) স্বামী মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবী হওয়া সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিলেন। সহীহ বুখরীর ‘ওহীর সূচান’ অধ্যায়ে একটি হাদীসে বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। হযরত ‘আয়িশা (রা) অতি চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।

‘‘রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি প্রথম ওহীর সূচনা হয় ঘুমে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। স্বপ্নে যা কিছু দেখতেন তা সকাল বেলার সূর্যের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তাপর নির্জনে থাকতে ভালোবাসতেন। খানাপিনা সঙ্গে নিয়ে হিরা গুহায় চলে যেতেন। সেখানে কয়েকদিন ‘ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। খাবার শেষ হয়ে গেলে আবার খাদীজার (রা) কাছে ফিরে আসতেন। খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আবার গুহায় ফিরে যেতেন। এ অবস্থায় একদিন তাঁর কাছে সত্যের আগমন হলো। ফিরিশতা এসে তাঁকে এমন জোরে চেপে ধরলের যে, তিনি কষ্ট অনুভব করলেন। ছেড়ে দিয়ে আবার বললেনঃ পড়ুন। তিনি আবারও বললেনঃ আমি পড়া-লেখার লোক নই। ফিরিশতা দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারও তাঁর সাথে প্রথম বারের মতো আচরণ করলেন। অবশেসে বললেনঃ

আরবী হবে

‘‘পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নাম। যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছে মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড থেকে। পড়ুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিছেন মানুষকে যা সে জানতো না।’’

রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরলেন খাদীজাকে (রা) ডেকে বললেনঃ ‘আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও, কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও।’ তিনি ঢেকে দিলেন। তাঁর ভীতি কেটে গেল। তিনি খাদীজার (রা) নিকিট পুরো ঘটনা খুলে বললেন এবং নিজের জীবনের আশস্কার কথা ব্যক্ত করলেন। খাদীজা (রা) বললেনঃ

আরবী হবে

‘‘না, তা কক্ষণো হতে পারে না। আল্লাহর কসম! তিনি আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার বনধন সুদৃঢ়কারী, গরীব-দুঃখীর সাহায্যকারী, অতিথিপরায়ণ ও মানুষের বিপদে সাহায্যকারী।’’

অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে করে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফিলের নিকট নিয়ে যান। সেই জাহিলী যুগে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। হিব্রু ভাষায় ইনজীল কিতাব লিখতেন। তখন তিনি বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন। খাদীজা (রা) বললেনঃ ‘শুনুন তো আপনার ভাতিজা কি বলে।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘ভাতিজা তোমার বিষয়টি কি?’ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরো ঘটা বর্ণনা করলেন। সব কথা শুনে ওয়ারাকা বললেনঃ এতো সেই ‘নামূস’-আল্লাহ যাকে মূসার (আ) নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোসা! সেদিন যদি জীবিত ও সুস্থ থাতাম, সেদিন তোমার দেশবাসী তোমাকে দেশ থেকে বের করে দিবে।’ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘এরা কি আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে?’ তিনি বললেনঃ হাঁ, তুমি যা নিয়ে আসেছো, যখনই কোন ব্যক্তি তা নিয়ে এসেছে, সারা দুনিয়া তাঁর বিরোধী হয়ে গেছে। যদি সে সময় পর্যনত আমার শক্তিথাকে এবং আমি বেঁচে থাকি, আমাকে সব ধরনের সাহায্য করবো।

ইমাম যুহরী বলেনঃ খাদীজা (রা) প্রথম যিনি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন। তাপর রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রিসালাত লাভ করেন। রিাসালাত লাভ করে ঘরে ফেরার পথে প্রতিটি পাথর, প্রতিটি গাছ তাঁকে সালাম জানাতে থাকে। ঘএেসে খাদীজাকে (রা) বলেন, যে সত্তাকে আমি স্বপ্নে দেখি বলে তোমাকে বলতাম, তিনি জিবরীল। প্রকাশ্রে আমাকে দেখা দিয়েছেন। আমার প্রতিপালনক তাঁকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। তাপর তিনি খাদীজাকে (রা) ওহীর সকল ঘটনা খুলে বলেন। তাঁর কথা শুনে খাদীজা (রা) বলেনঃ ‘সুসংবাদ, আল্লাহ আপনার কল্যাণ ছাড়া অকল্যাণ করবেন না। আল্লাহর নিকট থেকে যা এসেছে তা গ্রহণকরুন। তা অবশ্যই সত্য’।

এরপর খাদীজা (রা) ছুটে যান উতবা ইবন রাবী’আর দাস ‘আদ্দাসের নিটক। তিনি ছিলেন নিনাওয়ার অধিবাসী একজন নাসারা। খাদীজা (রা) আল্লাহর নামে কসম খেয়ে ‘আদ্দাসের নিকট জানতে চানঃ জিবরীল সম্পর্কে তোমার কি কিচু জানা আছেৎ ‘আদ্দাস বললেনঃ কুদ্দুস, কুদ্দুস-পবিত্র, পবিত্র! খাদীজা (রা) বলেনঃ তুমি তাঁর সম্পর্কে যা কিছু জান আমাকে একটু বল। ‘আদ্দাস বললেনঃ জিবরীল হচ্ছেন আল্লা ও তাঁর নবীদের মধ্যের আমীন বা পরম বিশ্বাসী সত্তা। তিনি মূসা (আ) ও ঈসার (আ) নিকট এসেছেন। ‘আদ্দাসের নিকট থেউেঠে খাদীজা (রা) যান ওয়ারাকার নিটক। দুইজনের কথা শুনে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট ফিরে আসেন।

ইবন ইসহাক বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ওহী লাভের পর আমি গুহা থেকে বের হলাম। আমি যখন পাহাড়ের মাঝামাঝি তখন আকাশের দিকে একটি ধ্বনি শুনতে পেলাম। কেউ যেন আমাকে বলছেঃ মুহাম্মদ আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি মাথা উঁচু করতেই দেখলাম, একজন ধবধবে পরিষ্কার লোকের আকৃতিতে জিবরীল দাঁড়িয়ে। তাঁর দুই খানি পা মহাশূন্যের দুই দিগন্ত। তিনি আমাকে বললেনঃ মুহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরীল। আমি স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখতে লাগলাম। আকাশের যে দিকেই তাকালাম একই দৃশ্য দেখতে পেলাম। আমি ছাঁয় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। এদিকে আমার ফিরতে দেরী দেখে খাদীজা আমার খোঁজে লোক পাঠালেন। তাঁরা মক্কার উঁচু ভূমিতে আমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও না পেয়ে খাদীজার নিকট ফিরে আসলো। আমি কিন্তু তখন একই স্থানে সিথর দাঁড়িয়ে।

এক সময় জিবরীল অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি ঘরে ফিরে খাদীজার রান ঘেঁষে বসলাম। খাদীজা বললোঃ আবুল কাসিম! আনি কোথায় ছিলেন? আমি আপার খোঁজে লোক পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা মক্কার উঁচু ভূমিতে খোঁজাখুজি করে কোথাও না পেয়ে ফিরে এসেছে। আমি তখন সকল ঘটনা খুলে বললাম। আমার কথা শুনে খাদীজা বললোঃ আমার চাচাতো ভাই, আপনি অটল থাকুন। খাদজীরার জীবন যাঁর হাতে, সেই সত্তার শপথ! আমি আশা করি, আপনি এই উম্মাতের নবী হবেন।’ তারপর তিনি রাসূলকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়ে ওয়ারাকার নিকট চলে যান।

ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার আজইয়াদ এলাকায় একাকী আছেন। তিনি দেখেন যে, একজন ফিরিশতা এক পায়ের উপর আরেকটি পা দিয়ে আকাশের দিগন্তে বসে আছেন। তিনি চেঁচিয়ে বলছেন-‘ইয়া মুহাম্মাদ! আমি জিবরীল।’ রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভয় পেয়ে দ্রুত খাদীজার (রা) কাছে ফিরে এসে বললেনঃ আমার ভয় হচ্ছে, আমি কাহিন’ হয়ে না যাই। খাদীজা (রা) বললেনঃ আমার চাচাতো ভাই! আপনি এমন কথা বলবেন না। তা হতে পারে না। আনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, সত্য বলেন, আমানত ফেরত দেন। আপনার চরিত্র তো অতি মহৎ।

আবূ মায়সারা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী লাভের প্রথম পর্বে একাকী নির্জনে কোথাও গেলে-‘ইয়া মুহাম্মদ’ ডাক মুনতে পেতেন। তিনি ভয় পেয়ে যেতেন। একথা খাদীজাকে (রা) জানালেন। খাদীজা (রা) বললেনঃ আল্লাহ আপনার কোন অকল্যাণ করবেন না। তারপর তিনি আবু বকরের (রা) সাথে রাসূলকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়ারাকার নিকট পাঠিয়ে দেন।

ইমাম যুহরী থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট প্রথম ওহী লাভের পর বেশ কিছু দিন যাবত ওহী আসা বন্ধ থাকে। ইসলামের পরিভাষায় এ সময়কে ‘ফাতরাতুল ওহী’ বলে। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারুণ চিন্তাগ্রন্ত হয়ে পড়েন। তিনি হেরা গুহায় যেতে থাকেন। এ সময় একদিন জিবরীলকে উপরে দেখতে পান এবং ভীত-সন্তুস্ত হয়ে খাদীজার (রা) কাছে দুত ফিরে এসে বলেনঃ আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। খাদীজা (রা) কম্বল দিয়ে ঢেকে দেন। এ অবস্থায় নাযিল হয় সূরা আল-মুদ্দাসসির। জাবির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রা) থেকে একই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তবে তিনি সূরা আল-মুয্যাম্মিল নাযিলের কথা বলেছেন।

খাদীজা (রা) এ সময় একদিন পরীক্ষা করতে চাইলেন। ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন। খাদীজা (রা) একদিন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমার চাচাতো ভাই! আপনার সাথী (জিবরীল আ.) যখন আপনার নিকট আসেন তখন কি আপনি আমাকে একটু জানাতে পারেন? এরপর জিবরীল যখন আসলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদীজাকে (রা) বললেন, এই জিবরীল এসেছেন। খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের ডান উরুর উপর বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কি এখন তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন? বললেনঃ হাঁ, দেখতে পাচ্ছি। খাদীরা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাম উরুর উপর বসিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ এখন কি তাঁকে দেখা যায়ৎ বললেন হাঁ, দেখা যায়। অতঃপর খাদীজা (রা) নিজের ওড়না ফেলে দিয়ে বুক উন্মুক্ত করে ফেললেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেনঃ এখনও কি তাঁকে দেখা যায়? বললেনঃ না, এমন দেখা যায় না। তখন খাদীজা (রা) বললেনঃ সুসংবাদ! আল্লাহর শপথ, তিনি অবশ্যই ফিরিশতা। কো শয়তান নয়। কারণ, এ অবস্থায় ফিরিশতা নিশ্চয় লজ্জা পাবে।

একদিন হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য আহার-সামগ্রী নিয়ে তাঁর খোঁজে মক্কার উঁচু ভূমির দিকে চলেছেন। পথে জিবরীল (আ) এক অপরিচিত ব্যক্তি রূপ ধরে আবির্ভূত হন এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। খাদীজা (রা) ভীত হয়ে পড়েন। তিনি শস্কিত হয়ে ওঠেন এই ভেবে যে, না জানি লোকটি তাঁকে অপহরণ করে কিনা। পরে খাদীজা (রা) কথাটি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানালে তিনি বললেন, লোকটি ছিল জিবলীর (আ)। তিনি আমাকে বলেছেন, আমি যেন তোমাকে সালাম জানাই এবং জান্নাতে মণি-মুক্তোর তৈরি একটি বাড়ীর সুসংবাদ দান করি।

পূর্বে উল্লেখিত ঘটনাবলীর সবই ইসলামের অশ্যবহিত পূর্ব সময়ের ও সূচনা পর্বের। এ ধরনের আরও বহু ঘটনার কথা জানা যায় যাতে হযরত খাদীজার (রা) ধৈর্য, বিচক্ষণতা, স্বামীর প্রতি প্রবল আবেগ ও বিশ্বাস এবং সর্ব অবস্থায় স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য ফুঠে উঠেছে। এ সকল ঘটনা পর্যালোচনা করলে আর যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জিবরীলের (আ) আগমনের পূর্বেই তিনি যেন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তাঁর স্বামী একজন অসাধারণ মানুষ হবেন। তিনি হবেন একজন নবী। আর তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তাঁর কাছে এসে সর্বপ্রথম দাবী করলেন, তাঁর নিকট জিবরীল এসেছেন, তিনি ওহী লাভ করেছেন, তখন ক্ষণিকের জন্যও তাঁর মনে কোন দ্বিধা-সংশয় দেখা দেয়নি। তিনি যেন আগে থেকেই এমন একটি সংবাদ পাওয়ার জন্য পুতীক্ষায় ছিলেন, মানসিকভাবে প্রস্ত্তত ছিলেন। তাঁর সে সময়ের বিভিন্ন কর্ম ও আচরণ দ্বারা এ কথাগুলি প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত হয়।

ইসলাম গ্রহণের পর হযরত খাদীজা (রা) তাঁর সকল ধন-সম্পদ-বিত্ত-বৈভব তাবলীগে দীনের লক্ষ্যে ওয়াক্ফ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যবসা-বাণিজ্য ছেআেল্লাহর ইবাদাত এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। সংসারের সকল আয় বন্ধ হয়ে যায়। সেই সাথে বাড়তে থাকে খাদীজার (রা) চুশ্চিন্তা। তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে সব প্রতিকূল অবস্থায় মুকাবিলা করেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ

আরবি হবে

‘‘মুশরিকদের প্রত্যাখ্রান ও অবিশ্বাসের কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে ব্যথা অনুভব করতেন, খাদীজার (রা) দ্বারা আল্লাহ তা দূর করে দিতেন। কারণ, তিনি রাসূলকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্ত্বনা দিতেন, সাহয় ও উৎসাহ যোগাতেন। তাঁর সব কথাই তিনি বিনা দ্বিধায় বিশআস করতেন। মুশরিকদের সকল অমার্জিত আচরণ তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে ইবন ইসহাক আরও বলেনঃ

আরবি হবে

‘‘রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য খাদীরা (রা) ছিলেন ইসলামের ব্যাপারে সত্য ও সঠিক উযীর। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল বিদপ-আপদে তাঁর কাছে মরেন কতা বলতেন, অভিযোগ করতেন।’’ নুবুওয়াতের সপ্তম বছর মুহাররম মাসে কুরাইশরা মুসলিমদের বয়কট করে। তাঁরা ‘শিয়াবে আবু তালিবে’ আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে হযরত খাদীজাও (রা) সেখানে অন্তরীণ হয়। প্রায় তিনটি বছর বনু হাশিম দারুণ অভাব ও দুর্ভিক্ষের মাঝে অতিবাহিত করে। গাছের পাতা ছাড়া জীভন ধারণের আর কোন ব্যবস্থা প্রায় তাদের ছিল না। স্বামীরাথে হযরত খাদীজা (রা) হাসিমুখে সে কষ্ট সহ্য করেন। এমন দুর্দিনে তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে নানা উপায়ে কিছু খাদ্য খাবারের ব্যবস্থা মাঝে মাঝে করতেন। তাঁর তিন ভাজিতা-হাকীম ইবন হিযাম, আবুল বুখতারী ও যুম’আ ইবনুল আসওয়াদ সকলে ছিলেন কুরাইশ নেতৃবর্গের অন্যতম। অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বিভিন্নভাবে একঘরে করা মুসলিমদের কাছে খাদ্যশস্য পাঠানোর ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

একদিন হাকীম ইবন হিযাম চাকরে মাথার কিচু গম উঠিয়ে নিয়ে চলেছেন ফুফু খাদীজার (রা) কাছে। তনি তখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে ‘শি’য়াবে আবী তালিবে’ অন্তরীণ। পথে নরাধম আবু জাহলের সাথে দেখা। সে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললোঃ খাদ্য নিয়ে তুমি বনু হাশিমের কাছে যাচ্ছে? আল্লাহর কসম, এ খাদ্যসহ তুমি সেখানে যেতে পারবে না। যদি যাও, তোমাকে আমি মক্কায় লাঞ্ছিত ও অপমাণিত করবো। এমন সময় আবুল বুখতারী ইবন হাশিম সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেনঃ তোমরা ঝগড়া করছো কেন? আবু জাহল বরলোঃ সে বনু হাশিমের কাছে খাদ্য নিয়ে যাচ্ছে। আবুল বুখতারী বললেনঃ এ খাদ্য তো তার ফুফুর, হাকীমের কাছে ছিল। ফুফুর সে খাদ্য সে দতে যাচ্ছে, আর তুমি তাতে বাধ্য দিচ্ছো? পথ ছেড়ে দাও। কিন্তু আবু জাহল তাঁর কথায় কান দিল না। তখন দুই জনের মধ্যে ভালোরকম একটা মারপিট হয়। এভাবে হাকীম প্রায়ই খাদ্য পাঠাতেন।

আর একদিন হযরত ‘আববাস (রা) কিছু খাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ‘শি‘য়াব’ থেকে বের হলেন। আবু জাহল তাঁর হালমা করার ফন্দি আঁটে। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে রক্ষা কনের্ এ কথা খাদীজা (রা) জানতে পেয়ে চাচা যুম‘আ ইবন আল-আসাদকে লোক মারফত বলে পাঠানঃ আবু জাহল খাদ্য ক্রয়ে বাধা দিচ্ছে। তাঁকে কিছু কথা শুনিয়ে দিন। যুম‘আ খাদীজার (রা) কথামত কাজ করেন। এরপর সে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত হয়।

নামায ফরযের হুকুম হওয়ার আগেই হযরত খাদীজা (রা) ঘরের মধ্যে গোপনে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে একত্রে নামায আদায় করতেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মক্কার উঁচু ভূমিতে তখন জিবীল (আ) আসেন এবং উপত্যকার এক প্রান্তে একটি স্থানে আঘাত করে একটি ঝর্ণার সৃষ্টি করেন। প্রথমে জিবরীল (আ) সেই পানি দিয়ে ওযু করেন, তারপর রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মত ওযু করেন। জিবরীল (আ) নামায পড়েন এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর মত নামায পড়েন। তারপর রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে এসে খাদীজাকে (রা) ওযু শিখান এবং তাকে নিয়ে নামায পড়ে বাস্তব শিক্ষা দেন।

ইবন ইসহাক আরও উল্লেখ করেছেন, একদিন ‘আলি (রা) দেখতে পেলেন তাঁর দুইজন অর্থাৎ নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খাদীজা (রা) নামায আদায় করছেন। ‘আলী (রা) জিজ্ঞেস করলেনঃ মুহাম্মদ, এ কি? রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন নতুন দীনের দাওয়াত ‘আলীর (রা) কাছে পেশ করলেন এবং একথা অন্য কাউকে বলতে বারণ করলেন। এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, উম্মাতে মুহাম্মাদীর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে নামায আদায়ের গৌরব অর্জন করেন।

আফীফ আল-কিন্দী নামক এক ব্যক্তি সে সময় কিছু কেনাকাটার জন্য মক্কায় এসেছিলেন। তিনি হযরত ‘আববাসের (রা) গৃহে অবস্থার করছিলেন। একদিন সকালে লক্ষ্য করলেন, এক যুবক কা’বার কাছে এসে আসমানের দিকে তাকোলো। তারপর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ালো। একজন কিশোর এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর এলা এক মহিলা। সেও তাদের দুই জনের পিছনে দাঁড়ালো। তারা নামায শেষ করে চলে গেল। ‘আফীফ আল কিন্দী দৃশ্যটি দেখলেন। ‘আববাসকে (রা) তিনি বললেন : বড় রকমের একটা কিছু ঘটতে যাচ্চে! আববাস (রা) বললেন ‘আলী এবং মহিলাটি মুহাম্মদের স্ত্রী। আমার ভাতিজার ধারণা, তার ধর্ম বিম্বপ্রতিপালকের ধর্ম। আর সে যা কিচু করে, তাঁরই হুকুরে করে। আমার জানা মতে দুনিয়ায় তারা তিনজনই মাত্র এই নতুন ধর্মের অনুসারী।

হযরত খাদীজর (রা) ইনতিকালের সঠিক সন সম্পর্কে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজতের তিন, চার অথবা পাঁচ বছর পূর্বে তিনি মক্কায় মারা যান বলে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নববী বলেন, তিনি বছর পূর্বের কথাটি সঠিক। তাঁর মৃত্যু হয় আবু তালিবের মৃত্যুর তিনদিন পর।

বালাজুরী বলেনঃ শি‘য়বে আবু তালিব থেকে বনু হাশিম বের হয় নুবুওয়াতের দশম বছরে। এখান থেকে বের হওয়র পর সেই বছর জিলকা‘দ মাসের প্রথম দিকে অথবা শাওয়ালের মাঝামাঝি আবু তালিব মারা যান। আবু তালিব ও খাদীজার (রা) তৃুত্যর মধ্যে সময়ের ব্যবধান সম্পর্কে মতভেদ আছে। যথা ৩৫,২৫, ৫ ও ৩ দিন। খাদীজার (রা) মৃত্যু হয় আগে। তাঁকে মক্কার ‘হাজূন’ গোরস্তানে দাফন করা হয়। তখন জানাযার নামাযের প্রচলন হয়নি। হযরত খাদীজার (রা) ভাতিজা হাকীম ইবন হিযাম বলেনঃ আমরা তাঁকে ঘর থেকে উঠিয়ে নিজ ‘হাজূন’-এ দাফন করি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কবরে নামেন। তাঁর মৃত্যু হয় নুবুওয়াতের দশম বছর রমযান মাসে তখন তাঁর বয়স পঁয়ষট্টি বছর। ইবনুল তাওযীও একথা বলেছেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। খাদীজা (রা) নামায ফরয হওয়ার পূর্বে ইনতিকাল করেন। আর একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর মৃত্যু হয় রমযান মাসে, তখন তাঁর বয়স পঁয়ষট্টি বছর। মক্কার উঁচু ভূমিতে অবস্থিত ‘হাজূন’ গোরস্তানে দাফন করা হয়। কাতাদা ও উরওয়া বলেছেন, হিজরাতের তিন বছর পূর্বে মারা যান। আলওয়াকিদী বলেছেনঃ বনু হাশিমের উপত্যকা থেকেতাঁরা মুক্ত হন হিজরাতের তিন বছর পূর্বে। তাপর আবু তালিব মারা যান। দুই জনের মৃত্যু হয় একই বছর। তবে আবু তালিবের মৃত্যুর তিন দিন পর খাদীজার (রা) মৃত্যু হয়। ইমাম আয-যাহাবী বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের সময় খাদীজার (রা) বয়স ছিল ৪০ বছর তাঁর সাথে জীভন কাটান ২৪ বছর। এই হিসাবে তিনি ৬৪ বছর জীবন লাভ করেন।

পরম শ্রদ্ধেয় চাচ আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী খাদীজার (রা) ওফাতের পর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আর তা ছিল সর্বাধিক কঠিন অধ্যায়। হযরত রাসূলে করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই তাঁদের ওফারেত বছরকে ‘আমুল হুযন’-দুঃখ ও শোকের বছর নামে অভিহিত করতেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অতিপ্রিয় এ দুই ব্যক্তির মৃত্যুতে কুরাইশ পাষন্ডরা একেবারে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা অতি নির্দয়ভাবে থাকে। এ সমই তিনি মক্কাবাসীদের প্রতি হতাশ হয়ে তায়েফ গমন করেন। খাদীজা (রা) জীবিত থাকলে তিনি অন্তত জিনের দুঃখের কথা তাঁকে বলতে পারতেন। ইবন ইসহাক বলেছেনঃ খাদীজার (রা) তিরোধানের পর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর একের পর এক মুসীবত আসতেই থাকে। কারণ, পৌত্তলিক শক্তিকে রুখতে পারে, আবু তালিব ও খাদীজার (রা) মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তখন আর ছিলেন না।

ইবনুল আসীর বলেনঃ

আরবী হবে

‘‘এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মার ইজমা’ হয়েছে যে, হযরত খাদীজা (রা) আল্লাহর সৃষ্টি জগতের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিম হয়েছে।’’

যুহরী, কাতাদা, মূসা ইবন ‘উকবা, ইবন ইসহাক, আল-ওয়াকিদী ও সা‘ঈদ ইবন ইয়াহইয়া বলেছেনঃ

আরবি হবে

‘‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর সর্বপ্রথম ঈমান আনেন খাদীজা, আবু বকর ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম।’’

হযরত হুজাইফা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন :

আরবি হবে

‘‘আল্লাহ ও মুহাম্মাদের প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারে খাদীজা (রা) বিশ্বের সকল নারীর অগ্রবর্তিনী।’’

সা‘ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেছেনঃ

আরবি হবে

-‘নারীদের মধ্যে খাদীজা (রা) প্রথম মুসলিম।’

ইমাম নববী বলেনঃ যুহরী ও ‘আলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দল উল্লেখ করেছেন যে, খাদীজা (রা) আল্লাহ ও রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনেন। আর এ কথার উপর ইজমা’ হয়েছে বলে ইমাম সা‘লাবী বর্ণনা করেছেন। ইসলাম গ্রহণের সময় হযরত খাদীজার (রা) বয়স হয়েছিল পঞ্চাশ বছর। তাঁর ইসলাম গ্রহণের প্রভাব তাঁর পিতৃকূলের লোকদের উপরও পড়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের সময় পিতৃকূল বনু আসাদ ইবন ‘আবদিল ‘উযযার পনেরো জন বিখ্যাত ব্যক্তি জীবিত ছিলেন। তাঁদের দশজনই ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্য পাঁটজন কাফির অবস্থায় বদর যুদ্ধে নিহত হয়।

হযরত খাদীজা (রা) ছিলেন বহু সন্তানের জননী। প্রথম স্বামী আবু হালার ঔরসে হালা ও হিন্দ নামে দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। হিন্দ বদর, মতান্তরে উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে অংশগ্রহণ করেন। তবে বালুজাুরীর বর্ণনায় বুঝা যায়, প্রথম স্বামীর ঘরে একটি মাত্র ছেলে ছিল, তাঁর নাম হিন্দ। পিতার নামে নাম রাখা হয়। তিনি ছিলেন একজন প্রাঞ্চলভাষী বাগ্মী পুরুষ। উটের যুদ্ধে তিনি ‘আলীর (রা) পক্ষে শাহাদাত বরণ করেন। দ্বিতীয় সআবমী ‘আতীকের ঔরসে হিন্দা নাম্মী এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও ইসলাম গ্রহণকরে সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। অবশ্য একটি বর্ণনা মতে প্রথম পক্ষেতাঁর তিনটি সন্তান জন্মলাভ করে দুই ছেলে হিন্দা ও হারিস। হারিসকে এক কাফির ক‘বার রুকনে ইয়ামানীর নিকট শহীদ করে ফেলে। এক কন্যা যায়নাব। আর দ্বিতীয় পক্ষের মেয়েটির ডাকনাম ছিল উম্মু মুহাম্মদ। তার বিয়ে হয় সায়ফী ইবন উমাইয়্যার সাথে। মুহাম্মাদ নামেতাঁর এক ছেলে হয়। এ কারণে তাঁকে উম্মু মুহাম্মদ নামে ডাকা হতো।

ইবন ইসহাক বলেন, একমাত্র ইবরাহীম ছাড়া রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল সন্তান হযরত খাদীজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা হলেনঃ আল-কাসিম, আত-তায়্যিব, যায়নাব, রুকাইয়া, উম্ম কুলসুম ও ফাতিমা (রা)। ইবন হিশাম বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বড় ছেলে আল কাসিম। তারপর আত-তায়্যিব ও আত-তাহির। বড় মেয়ে রুকাইয়া, তারপর যায়নাব, উম্মু কুলসুম ও ফাতিমা (রা)।

ইবন ইসহাক আরও বলেন, আল-কাসিম, আত-তায়্যিব ও আত-তাহির জাহিলী যুগেই মারা যান। আর মেয়েদের সকলে ইসলামী যুগ লা করেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে মদীনায় হিজরাত করেন।

ইবন ইসহাক ও ইবন হিশামের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, আত-তাহির ও আত-তায়্যিব ভিন্নুই ছেলে। অথচ এ দুইটি নাম রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছেলে হযরত ‘আবদুল্লাহর দুইটি লকব বা উপাধি। আল ওয়াকিদী বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে হযরত খাদীজার (রা) আল কাসিম ও ‘আবদুল্লাহ নারে দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করেন। নুবুওয়াত লাভের পর ‘আবদুল্লাহর জন্ম হয় বলে তাঁকে আত-তাহির বলা হতো। এছাড়া চার মেয়েও জন্মগ্রহণকরেন। মোট ছয় সন্তানের মা হয়। প্রথম সন্তান আল-কাসিম। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে দুগ্ধপোষ্য বয়সে মক্কায় মারা যান। তাঁর নাম অনুসারে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুনিয়াত বা উপনাম হয় আবুল কাসিম। মৃত্যুর পূর্বে তিনি পা পা করে হাঁটা শিখেছিলেন। বালাজুরীর মতে মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র দুই বছর।

ইমাম আস-সুহাইলী বর্ণনা করেছেন, আল-কাসিম মারা যাওয়ার পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদীজার (রা) কাছে যান। তিনিকাঁদতে বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লুহ! আমার দুধের টুকরো মারা গেছে। যদি সে দুধ পান শেষ করা পর্যন্ত বেঁচে থাকতো তাহলে আমার দুঃখ ছিল না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ তুমি চাইলে জান্নাতের মধ্য থেকে তার কণ্ঠস্বর তোমাকে শোনাতে পারবো। খাদীজা (রা) বলেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশি ভালো জানেরন। এই বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় আল-কাসিমের মৃত্যু জাহিলী যুগে নয়, বরং ইসলামী যুগে হয়েছে।

দ্বিতীয় সন্তান হযরত যায়নাব (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বড় মেয়ে। খালাতো ভাই আবুল আস ইবন রাবী‘র সাথে বিয়ে হয়। আবুল ‘আসের মা হালা বিনত খুওয়াইলিদ।

তৃতীয় সন্তান হযরত ‘আবদুল্লাহ। তাঁকেই আত-তায়্যিব ও আত-তাহির বলা হয়। যেহেতু নুবুওয়াত লাভের পর ত৭ার জন্ম হয়, তাই এ নামে আখ্যায়িত করা হয়। শিশু বয়সে মক্কায় ইনতিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর কাফিররা, বিশেষতঃ ‘আস ইবন ওয়ায়িল রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবতাব’ বা নির্বংশ বলে উপহাস করতে থাকে। তখন নাযিল হয সূরা আল কাওসার-এর এ আয়াতঃ

আরবী হবে

-যে আপনার শত্রু, সে-ই লেজকাটা, নির্বংশ।

অবশ্য এ ব্যাপারে প্রথম সন্তানের মৃত্যুর কথাও বর্ণিত হয়েছে। চতুর্থ সন্তান হযরত রুকাইয়া (রা)। তাঁর প্রথম বিয়ে হয় উতবা ইবনআবী লাহাবের সাথে। ইসলামের সাথে চরম দুশমনীর কারণে সে হযরত রুকাইয়াকে তালাক দেয়। তাপর হযরত ‘উসমানের (রা) সাথে বিয়ে হয়। হিজরাতের পর মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবদ্দশায় ইনতিকাল করেন। পঞ্চম সন্তান হযরত উম্মু কুলসুম (রা)। তাঁর প্রথম বিয়ে হয় মু‘আত্তাব, মতান্তরে ‘উতাইবা ইবন আবী লাহাবের সাথে। সেও প্রবল ইসলাম বিদ্বেষের কারণে স্ত্রী উম্মু কুলসুমকে তালাক দেয়। তারপর বোন রুকাইয়ার মৃত্যুর পর হযরত ‘উসমানের (রা) সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এ কারণে হযরত ‘উসমানের (রা) উপাধি হয় ‘জিন-নূরাইন’।

ষষ্ঠ সন্তান হযরত ফাতিমা (রা) চতুর্থ খলীফা হযরত ‘আলীর (রা) স্ত্রী এবঙ হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইনের (রা) মা।

উল্লেখ্য যে, ইবরাহীম ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাসী হযরত মারিয়া আল কিবতিয়ার (রা) গর্ভজাত সন্তা। এই মারিয়াকে মিসরের শাসক ‘মাকাওকাস’ উপহার হিসেবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পাঠান। মোটকথা, একমাত্র ইবরাহীম ছাড়া রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল সন্তানের জননী হলেন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)।

হযরত খাদীজা (রা) সন্তানদের খুব আদর যত্ম করতেন। আর্থিক সচ্ছলতাও ছির সন্তানদের প্রতিপালন ও দুধ পানকরানোর জন্য ধাত্রী নেয়াগ করতেন। সন্তান প্রসবের আগেই সব ব্যবস্থা করে রাখতেন। সাফিয়্যার দাসী সালামাকে মজুরীর বিনিময়ে সন্তানদের দেখাশুনার জন্য নিয়োগ করেন। সালামা তাদেরকে দুধপান ও আহার করাতেন।

হযরত খাদীজা (রা) যে তাঁর সকল সন্তানকে কী পরিমাণ ভালোবাসতেন এবং তাদের মঙ্গল কামনায় কেমন অস্থির থাকতেন, একটি বর্ণনায় তা কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেঠে। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশ্ন করলেনঃ ইহা রাসূলাল্লাহ! আপনার ঔরসে আমার যে সকল সন্তান হয়েছে এবং শিশু অবস্থায় মারা গেছে পরকালে তাদের অবস্থান কোথায় হবে? বললেনঃ জান্নাতে। তিনি আবার জানতে চাইলেনঃ আমার পৌত্তলিক স্বামীদে ঔরসে যে সন্তান হয়েছে এবং মারা গেছে, তারা কোথায় যাবে? বললেনঃ জাহান্নামে। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ কোন রকম কর্ম ছাড়াই? বললেনঃ আল্লাহ জানেন বেঁচে থাকলে কেমন কর্ম তারা হয়তো। এ বর্ণনায় সন্তানদের জন্য তাঁর আকুলতা তা প্রকাশ পেয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজার (রা) ফলীলাত, মহাত্ম্য ও মর্যাদা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। আমরা অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করি, আরবের সেই ঘোর অন্ধকার দিনে কিভাবে এক মহিলা সম্পূর্ণ দ্বিধাহীন চিত্তে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন করছেন। তাঁর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ও সংশয় নেই। নেই ওহী লাভের প্রথম দিনটি, ওয়ারাকার নিকট গমন এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবী হওয়া সম্পর্কে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা সবকিছুই গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয়।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াত লাভের পূর্ব থেকে খাদীজা (রা) যেন দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন-তিনি নবী হবেন। তাই জিবরীলের (আ) আগমনের পর ক্ষণিকের জন্যও তাঁর মনে একটুও ইতস্তাতঃ ভাব দেখা দেয়নি। এতে তাঁর গভীর দূরদৃষ্টি ও তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নুবুওয়াত লাভের আগে ও পরে সর্বদাই তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্মান করেছেন, তাঁর প্রতিটি কথা প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করেছেন। পাঁচিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে কোন প্রকার সন্দেহ দানা বাঁধতে পারেনি। সেই জাহিলী যুগেও তিনি ছিলেন পুতঃপবিত্র। কখনও মূর্তি পূজা করেননি। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন তাঁকে বললেনঃ ‘আমি কখনও লাত-‘উযযার ইবাবাদ করবো না।’ খাদীজা (রা) বললেনঃ লাত-‘উযযার প্রসঙ্গ ছেড়ে দিন। তাদের কথাই উঠাবেন না।

নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর প্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারিণী এবং তাঁর সাথে প্রথম সালাত আদায়কারিণীই শুধু তিনি নন। সেই ঘোর দুর্দিনে ইসলামের জন্য তিনি যে শক্তি যুগিয়েছেন চিরদিন তা অম্লান হয়ে থাকবে। ইসলামের সেই সূচনা লগ্নে প্রকৃতপক্ষেই তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরামর্শদাত্রী। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের পর নিজের সমস্ত সম্পদ তিনি স্বামীর হাতে তুলে দেন। যায়িদ ইবন হারিসা (রা) ছিলেন খাদিজার (রা) প্রিয় দাস। তাকেও তিনি স্বামীকে উপহার দেন।

ইবন হিশাম বলেনঃ খাদীজার (রা) ভাতিজা হাকীম ইবন হিযাম সিরিয়ার বাজার থেকে অনেকগুলো দাস কিনে আনেন। তাদের মধ্যে যায়িদ ইবন হারিসাও একজন। ফুফু খাদীজা গেলেন ভাতিজা হাকীমের সাথে দেখা করতে। ভাতিজা বললেনঃ ফুফু, এ দাসগুলির মধ্যে যেটি পছন্দ হয়, আপনি বেছে নিন। খাদীজা (রা) যায়িদকে পছন্দ করে নিয়ে আসেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়িদকে দেখে পছন্দ করেন। খাদীজা (রা) তা বুঝতে পেরে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপহার দেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে পালিত পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে; হাকীম তাঁর ফুফু খাদীজার (রা) জন্য যায়িদকে (রা) আরবের ‘উকাজ মেলা থেকে কিনে আনেন। আর এ কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন খাদীজার (রা) পণ্য নিয়ে মায়সারার সাথে সিরিয়া যান, সেই সফরে যায়িদকে খাদীজার (রা) জন্য কিনে আনেন। বিয়ের পর খাদিজা (রা) যায়িদকে উপহার হিসেবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতে তুলে দেন।

হযরত খাদীজা (রা) স্বামী রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্বামীর বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদেরকেও সম্মান করতেন, খোঁজ খবর নিতেন এবং তাঁদের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়াতেন। একবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুধমাতা হালীমা আসলেন দেখা করতে। খাদীজা (রা) আপন শাশুড়ীর মত মর্যাদা ও সম্মান দিয়ে তার সেবা-যত্ম করলেন। হালীমা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তাঁদের অঞ্চলে খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে পশু-পাখমিারা গেছে এবং অভাব দেখা দিয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের সমস্যা নিয়ে হযরত খাদীজার (রা) সাথে কথা বললেন। খাদীজা (রা) হালীমাকে চল্লিশটি ছাগল ও উট দান করলেন তাঁর খান্দানের মধ্যে বণ্টনের জন।

আবু লাহাবের দাসী সুওয়ায়বা ছিলেন রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আর এক দুধমাতা। তিনি মাঝে মাঝে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট আসতেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতি সম্মান দেখাতেন, এবং তাঁর সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। খাদীজাও (রা) তাঁকে খুবই সম্মান ও সমাদয় করতেন। তিনি সুওয়ায়বাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দানের উদ্দেশ্যে আবু লাহাবের নিকট তাঁকে কেনার প্রস্তাব করেন; কিন্তু সে বিক্রী করতে রাজি হয়নি।

মক্কার একজন বিত্তশালী মহিলা হওয়া সত্ত্বেও নিজ হাতে স্বামীর সেবা করতেন। সন্তানদের প্রতিপালনসহ গৃহকর্মের যাবতীয় দায়িত্ব নিজ পালন করতেন। স্বামীর আহার, বিশ্রাম ইত্যাদির তদারক নিজে করতেন হযরত আবু হুরাইরার (রা) একটি হাদীসে এসেছে, তিনি বলেনঃ

আরবী হবে

-একদিন জিবরীল (আ) নবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই যে খাদীজা আসছেন পাত্রে করে আপনার জন্য তরকারি, খাদ্যসামগ্রী অথবা পানীয় কিচু নিয়ে আপনি তাঁর রব ও আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম বলবেন এবং জান্নাতে মণি-মুক্তার তৈরি একটি বাড়ীর সুসংবাদ দান করবেন।

এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘর-গৃহস্থালীর যাবতীয় দায়িত্ব অন্যের উপর ছেড়ে না দিয়ে নিজই সম্পন্ন করতেন।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খাদীজাকে (রা) গভীরভাবে ভালোবাসতেন। খাদীজার (রা) মৃত্যুর পরও আজীবন তাঁর স্মৃতি ও তাঁর অবদান মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হয়নি। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বহু আচরণ এবং বহু মন্তব্যে তা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি খাদীজাকে (রা) দেখিনি। তা সত্ত্বেও তাঁকে যে পরিমাণ ঈর্ষা করতাম, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য কোন স্ত্রীকে সে পরিমাণ ঈর্ষা করিনি। কারণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব বেশি বেশি তাঁকে স্মারণ করতেন। তিনি যখনই কোন ছাগল জবেহ করতেন, তার কিচু অংশ কেটে খাদীজার বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন। আমি যদি বলতাম, দুনিয়াতে যেন খাদীজা ছাড়া আর কোন নারী নেই। তিনি বলতেন, খাদীজা এমন ছিল। তাঁর থেকেই আমি সন্তান লাভ করেছি।

‘আয়িশা (রা) আরও বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার খাদীজার কথা আলোচনা করলেন। আমি একটু কটূক্তি করে বললামঃ তিনি তো একজন বৃদ্ধা। তাছাড়া এমন, এমন। আল্লাহ তাঁর পরিবত©র্ উত্তম নারী আপনাকে দান করেছেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তাঁর চেয়ে উত্তম নারী আমাকে দান কনেনি। মানুষ যখন আমাকে মানতে অস্বীকার করেছে, তখন সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে। মানুষ যখন বঞ্চিত করেছে, তখন সে তার স্মপদে আমাকে অংশীদার করেছে। আল্লা তার সন্তান আমাকে দান করেছেন এবং অন্যদের সন্তান থেকে বঞ্চিত করেছেন।আমি বললামঃ আমি আর কক্ষণও তাঁকে নিয়ে আপনাকে তিরস্কার করবো না।

আরেকটি বর্ণনায় এসেছে। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ খাদীজার মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গৃহে কোন ছাগল জবেহ হলেই বলতেনঃ কিছু গোশত তোমরা খাদীজার বান্ধবীদের বাড়ীতে পাঠাও। একদিন তিনি খাদীজার আরোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ আমি খাদীজার বান্ধবীদের ভালোবাসি। ‘আয়িশা (রা) আরও বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদীজার কথা উঠলেই তাঁর কিচু প্রশংসা নাকরে বিরত হতেন না। তিনি খাদীজার কিছু আলাচনা না করে প্রতিদিন ঘর থেকে বরে হতেন না। আর একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখে খাদীজার (রা) আলোচনা শুনে ‘আয়িশা (রা) অনুতপ্ত হয়ে মনে মনে বলেনঃ হে আল্লাহ, যদি তুমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাগ দূর করেন দাও, তাহলে আর কক্ষণও ত৭ার সম্পর্কে কোন মন্দ কথা উচ্চারণ করবো না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে বললেনঃ তুমি এমন কথা কি করে বলতে পারৎ মানুষ যখন আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তখন সে আশ্রয় দিয়েছে। আরেকবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশাকে (রা) বলেনঃ আল্লাহ আমার অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছন।’

আবুল ‘আস ইবনুর রাবী’ মক্কার একজন সৎ বিশ্বস্ত ও বিত্তবান ব্যবসায়ী যুবক। খাদীজার (রা) বোন হালা বিনত খুওয়াইলিদের ছেলে। খালা খাদীজা (রা) তাঁকে নিজের ছেরেন মতই দেখতেন। তিনি নেজের মেয়ে হযরত যায়নাবের (রা) সাথে আবুল আসের বিয়ে দিতে চাইলেন। রাসূর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অমত করলেন না। বিয়ে হলে গেল। বিয়ের সময় হযরত খাদীজা (রা) মমেয়ে যায়নাবকে (রা) যে সখল নজিস উপহার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি সোনার হার ছিল।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াত লাভ করলেন। খাদীজার (রা) কন্যারা মুসলমান হলেন। কিন্তু আবূল ‘আস অমুসলিমই থেকে গেলেন। খাদীজা (রা) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরত করলেন। মেয়ে যায়নাব (রা) মক্কায় স্বামীর কাছে থেকে গেলেন। আবুল ‘আস মক্কায় কুরাইশদের সাথে বদরে গেলেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়তে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! বন্দী হয়ে তিনি মদীনায় শ্বশুর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পৌঁছলেন। মুক্তিপণের বিনিময়ে যুদধবন্দীদের মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত হলো। ন্দীদের আপনজনেরা মক্কা থেকে মুক্তিপণের অর্থ পাঠালো। যায়নাব (রা) স্বামীর মুক্তিপণ বাবদ যে অর্থ সম্পদ পাঠালেন তার মধ্যে একটি সোনার হার ছিল। মূলতঃ সেটি ছির মা খাদীজার (রা) দেওয়া বিয়ের হারটি। হারটি দেখে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মনটি ব্যথা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো খাদীজার (রা) স্মৃতি। তিনি সাহাবীদের বললেনঃ তোমরা পারলে যায়নাবের বন্দীকে ছেড়ে দাও এবঙ অর্থও ফেরত দাও। সাহাবীরা রাজি হলেন। তাঁরা কোন মুক্তিপণ ছাড়াই আবুল ‘আসকে মুক্তি দিলেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

আরবি হবে

-খাদীজার (রা) বোন হালা বিনত দওয়াইলিদ একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চাইলেন। (দুই বোনের গলার স্বর ও অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গি একই রকম ছিল বলে) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদীজার (রা) অনুমতি চাওয়ার কথা মনে করে হতচকিত হয়ে ওঠেন। তারপর (স্বাভাবিক হয়ে) তিনি বলে উঠরেনঃ ইয়া আল্লাহ! এ তো দেখছি হালা। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ এতে আমার ভাবী ঈর্ষা হলো। আমি বললামঃ কুরাইশ বুড়ীদের এক লাল গালের বুড়ী, যে শেষ হয়ে গেছে কতকাল আগে, তার আবার কি স্মরণ করেন। আল্লাহ তো তার চাইতেও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন।

মুহাম্মদ ইবন সালামা থেকে বর্ণিত হয়েছে। হযরত খাদীজার (রা) ইনতিকালের পর হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এত শোকাতুর হয়ে পড়েন যে তাঁর জীবন-আস্কা দেখা দেয়। অবশেষে তিনি ‘আয়িশাকে (রা) বিয়ে করেন।

হযরত খাদীজার (রা) ফযীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বহু বাণী ও মন্তব্য হাদীসে ও সীরাতের গ্রন্থবলীতে পাওয়া যায়। আমাদের পূর্বের আলোচনায় তার কিচু পেশ করছি। এখানে আরও কয়েকটি বাণী তুলে ধরছি।

হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

আরবী হবে

 বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাদের জন্য চারজনই যথেষ্ট।

আনাস (রা) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

আরবী হবে

-বিশ্বের নারী জাতির মধ্যে সর্বোত্তম হলেনঃ মারইয়াম, আসিয়া, খাদীজা বিনত খুওয়াইলদ ও ফাতিমা (রা)।

‘আলী (রা) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে শুনেছিঃ

আরবি হবে

-খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ তাঁর সময়ের সর্বোত্তম নারী। মারইয়াম বিনত ইমরাত তাঁর সময়ের সর্বোাত্তম নারী।

‘আবদুল্লাহ ইবনুল ‘আববাস (রা) থেকে বর্নিত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

আরবী হবে

মারইয়াম বিনত ইমরানের পরে ফাতিমা, খাদীজা ও ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া জান্নাতের অধিবাসী মহিলাদের নেত্রী।

‘আবদুল্লাহ ইবনুল আববাস (রা) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে এসেছেঃ জান্নাতের অধিকারী নারীদের মধ্যে খাদীজা, ফাতিমা, মারইয়াম ও আসিয়া সর্বোত্তম। ইমাম নাসাঈ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বহুবার বলতে শুনেছিঃ

আরবী হবে

-খাদীজা (রা) জগতের সর্বোত্তম নারী।

ইমাম আয-যাহাবী হযরত খাদীজার (রা) স্থান ও মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ তাঁর ফযীলাত অনেক। তাঁর সময়ের বিশ্বের সকল নারীর নেত্রী। যে সকল নারী (বিদ্রঅ, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায়) পূর্ণতা লাভ করেছেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, অতি সম্মাণিতা, ধর্মপরায়ণা, নিস্কলুষ চরিত্রের অধকারিণী এক ভদ্রমহিলা। তিজিান্নাতের অধিকারিণী। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং অন্য বিবিগণের উপর তাঁর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তাঁর প্রতি অতিমাত্রায় সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তিনি তাঁর পূর্বে এবং তাঁর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একাধিক সন্তানের জননী। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বোত্তম জীবন সঙ্গিনী। তাঁকে হারিয়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন। নিজের ধন-সম্পদ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য ব্যয় করেছেন, আর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। আল্লাহ পাকতাঁর নবীর মাধ্যমে তাঁকে জান্নাতের মণি-মুক্তার তৈরি একটি বাড়ীর সুসংবাদ দান করেছেন।

অনেকগুলি সূত্রে একথা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ হে খাদীজা, জিবরীল তোমাকে সালাম জানিয়েছেন।’ তাঁর মধ্যে কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, জিবরীল বলেন, ‘হে মুহাম্মদ আপনি আপনার রব ও আমার পক্ষ থেকে খাদীজাকে সালাম বলুন।’ জবাবে খাদীজা বলেনঃ

আরবী হবে

হযরত আনাসের (রা) একটি বর্ণনায় হযরত খাদীজার (রা) জাবাবটি এসেছে এ রকমঃ

আরবী হবে

হযরত খাদীজা (রা) নবী মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বামী হিসেবে গ্রহণকরে, অটল হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে এবং নিজর সবকিছু তাঁর হাতে তুলে দিয়ে মানব জাতির অপার কল্যাণ সাধনকরে গেছেন। তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করে আমরা শেষ করতে পারবো না। আল্লাহ পাক ও জিবরীলের (আ) মত আমরাও তাঁর প্রতি অগণিত বার সালাম পেশ করে আমাদের কথার সমাপ্তি টানছি।

 

সাওদা বিনত যাম‘আ (রা)

হযরত সাওদা (রা) সেই ভাগ্যবতী মহিলা যাঁকে হযরত রাসূলে কারীম (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজার (রা) মৃত্যুর পর বিয়ে করেন। শুধূ তাঁকে নিয়েই তিনি প্রায় তিন বছর বা তার চেয়ে কিচু বেশি সময় দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত কনের। তারপর উম্মুল মুমিননীন হযরত ‘আয়িশাকে (রা) ঘরে তুলে আনেন।

হযরত সাওদা মক্কায় বিখ্যাত কুরাইশ বংশের একটি শখা গোত্র বনু ‘আমের ইবন লুই-এর সন্তান। পিতা যাম‘আ ইবন কায়স কুরাইশ বংশীয় এবং মাতা শামূস বিত কায়স মদীনার বিখ্যাত নাজ্জার গোত্রীয়। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাদা ‘আবদুল মুত্তালিবের মা সালমাও ছিলেন এই নাজ্জার খান্দানের মেয়ে। সাওদার নান কায়স ইবন ‘আমর এবং সালমা বিনত ‘আমর ছিলেন ভাই-বোন। হযরত সাওদার ডাকনাম ছির ‘উম্মুল আসওয়াদ।

জাহিলী যুগে হযরত সাওদার প্রথম বিয়ে হয় সাকরান ইবন আমরের সাথে। সাকরান ছিরেন সাওদার চাচাতো ভাই। বিখ্যাত চার সাহাবা-সুহাইল ইবন আমর, সাহল ইবন আমর সালীত ইবন আমর ও হাতের ইবন আমর ছিলেন সাকরানের ভাই। হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াত লাভের প্রথম পর্বে হযরত সাওদা ও তাঁর স্বামী সাকরান ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা উভয়ে প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী ভাগ্যবান ও ভাগ্যবতী নর-নারীদের অন্তর্গত। তাঁদের উভয়ের ইসলাম গ্রহণের সময়কাল একই। কুরাইশদের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য মক্কার অসহায় মুসলিমদের প্রথম দলটি যখন হাবশায় হিজরাত করেন তখনও এই মুসলিম পরিবারটি মক্কার মাটি আকড়ে পড়ে থাকে। কিন্তু তাদের অত্যাচারে মাত্রা যখন সীমা অতিক্রম করতে লাগলো তখন মক্কার মসলিমের দ্বিতীয় একটি দল হাবশায় হিজরাতের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন। সাওদা তাঁর স্বামীসহ এই দলটি সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। কয়েক বছর সেখানে অবস্থানের পর আবার মক্কার ফিরে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরাতের কিছুকাল পূর্বে সাকরান মুসলিম অবসথায় মক্কায় মারা যান। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে মক্কায় দাফন করেন।

একথাও বর্ণিত হয়েছে যে প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় দলটির সাথে স্বামীসহ তিনি হাবশায় হিজরাত করেন। আবু উবাউদাহ ও মা‘মারসহ একদল সীরাত বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সাকরান হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসেন। তারপর মুরতাদ হয়ে অথবা কৃস্টধর্ম গ্রহণ করে আবার হাবশায় ফিরে যান এবং সেখানেই মারা যান। বালাজুরী বলেন, প্রথম বর্ণনাটি সঠিক।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় হিজরাতের প্রায় তিন বছর পূর্বে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজার (রা) ইনতিকালের পর তিনি হযরত সাওদাকে (রা) বিয়ে করেন।

হযরত খাদীজা (রা) ছিরেন হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথমা এবয় প্রিয়তমা স্ত্রী। একাকীত্বের অস্থিরতায়, বিপদ-আপদের ভয়াবহতায়, এবং অত্যাচারী-উৎপীড়কের নিষ্ঠুর পৈশচিকতায় তিনি ছিলেন প্রিয় স্বামীর একান্ত সংগিনী। প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে সান্ত্বনা দিতেন, সমবেদনা প্রকাশ এবং পাশে থেকে সকল বাধা অতিক্রমে সাহায্য করতেন। এতমন একজন অন্তরঙ্গ স্ত্রী ও বান্দবীর তিরোধানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারুণ বিমর্ষ ও বেদনাহত হয়ে পড়েন। তাঁর বিচ্ছেদ ব্যথায় এত কাতর হয়ে পড়েন যে জীবনও সংকটজনক হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া খাদীজা ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্তানদের জননী এবং গৃহকর্ত্রী। তাঁর অনুপস্থিতিতে মাতৃহারা সন্তানদের লালন-পালন ও ঘর সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু পৌত্তলিকদের জ্চালাতন ও উৎপাতের মাত্রাও বেড়ে যায়। রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) এমন অবস্থা তাঁর সাহাবীদেরকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তোলে।

‘উসমান ইবন মাজ‘উন (মৃ. হিঃ ২) একজন বড় মাপের সাহাবী। তাঁর স্ত্রী খাওলা বিনত হাকীম একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট গেলেন। নানা কথার ফাঁকে এক সময় তিনি বলে ফেললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহর! আপনি আবর বিয়ে করুন! প্রশ্ন করেছেনঃ পাত্রী কে? খাওলা বললেনঃ বিধবা এবং কুমারী-দুই রকম পাত্রীই আছে। এখন আপনি যাকে পছন্দকরেন তার ব্যাপারে কথা বলা যেতে পারে। তিনি আবার জানতে চাইলেনঃ পাত্রী কে? খাওলা বললেনঃ বিধবা পাত্রী সাওদা বিনত যাম‘আল আর কুমারী পাত্রী আবু বকরের মেয়ে ‘আশিয়া’। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ ব্যাপারে ভূমিকা পালনের জন্য মেয়েরা অধিকতর যেগ্য।&ভাবে তিনি সম্মতি দান কনের।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্মতি পেলে খাওলা গেলেন সাওদার গৃহে। সাওদার পিতা তখন জীবনের প্রান্ত সীমায়। পার্থিব সকল কর্মতৎপরতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছেন। খাওলা তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে ‘আনঈম সাবাহান! (সুপ্রভাত) বলে জাহিলী রীতিতে সম্ভাষণ জানান।

বৃদ্ধ প্রশ্ন করেনঃ কে তুমিঃ খাওলা উত্তর দেনঃ আমি খাওলা বিনত হাকীম। বৃদ্ধ খাওলাকে স্বাগত জানিয়ে কাছে বসান। খাওলা বিষের পয়গাম পেশ করেন এভাবেঃ মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তলিব সাওদাকে বিয়ের প্রস্তাব করেছেন। বৃদ্ধ বলেন, এতো অভিজাত কুফু। তোমার বান্ধধবী সাওদা কি বলে? খাওয়া বলেন তার মত আছে। বৃদ্ধ সাওদাকে ডাকতে বলেন। সাওদা উপস্থিত হলে বলেনঃ আমার মেয়ে! এই মেয়ে (খাওলা) বলছে, মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তাকে পাঠিয়েছে। অভিজাত পাত্র। আমি ত৭ার সাথে তোমার বিয়ে দিতে চাই, তুমি কি রাজি? সাওদা বলেনঃ হাঁ রাজি। তখন বৃদ্ধ খাওলাকে বলেনঃ তুমি যাও, মুহাম্মদকে ডেকে আন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বরবেশে উপস্থিত হন এবং সাওদার পিতা সাওদাকেতাঁর হাতে তুলে দেন।

কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, বিয়ের পূর্বে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং সাওদার সাথে সরাসরি আলোচনা করেন। হাতে পারে খাওলা এ আলোচনার ব্যবস্থা করেন। ইমাম আহমাদ আবদুল্লাহ আবআসের (রা) একটি বর্ণনা সংকলন করেছেন। তনি বলেছেনঃ রাসূল (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) তাঁর গোত্রের সাওদা নামের একটি মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি ছিলেন মুসীবতের বাস্তব রূপ। পাঁচ অথবা চয়টি ছেলে-মেয়ে রেখে স্বামী মারা গেছেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেনঃ আমার প্রস্তাবে রাজিহতে তোমার বাধা কিসের? সাওদা বললেনঃ আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর নবী! সৃষ্টি জগতের মধ্যে আপনি আমার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে আমার কোন বাধা নেই কিন্তু আমার ভয়, আমার এই সন্তানগুলি সকাল-সন্ধ্যা সর্বক্ষণ আপনাকে বিরক্ত করবে, আপনার সেবা থেকে আমাকে বিরত রাখবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এছাড়া আর কোন বাধা আছে? সাওদা বললেনঃ না, আর কোন বাধা নেই। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহর তোমাকে করুণা করুন। সর্বোত্তম নারী তারা যারা উটের পিঠে পিছন দিকে চড়ে। কুরাইশদের সৎকর্মশীলা নারী তারা যারা তাদের শিশুসন্তানের প্রতি মমতাময়ী এবং স্বামীদের প্রতি যত্মশীলা।

বুকাইর ইবনল আশাজ্জ থেকে বর্ণিত হয়েছে। সাকরান সাওদাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে এসে মারা যান। ‘ইদ্দত পালনের পর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব করেন। সাওদা বলেনঃ তুমি তোমার গোত্রের কাউকে বিয়ের কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্বাদও। অতঃপর সাওদা হাতেব ইবন ‘আমর আল-‘আমেরীকে দায়িত্ব দেন। তিনিই সাওদাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ে দেন। এই হাতেব (রা) একজন মুহাজির ও বদরী ব্যক্তি।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়েতে সাওদার ওলী কে হয়েছিলেন সে সম্পর্কে দুই রকম ধারণাপাওয়া যায়। ১. সাওদার পিতা নিজেই ওলী হয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। ২. সালীত ইবন আমর অথবা হাতেব মতান্তরে আবু হাতেব ইবন আলর আল-‘আমেরী। কেউ কেউ বলেছেন, সাওদার পিতা সম্ভবত বার্ধক্যের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। এ কারণে হাতেব অতবা সালীতকে ওলী নিয়োগ করেছিলেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ সালীত ও আবু হাতেব উভয়ে এই বিয়ের সময় মক্কায় ছিলেন না। ত৭ারা ছিলেন হাবশায়। সুতরাং তাঁদের ওলী হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকে চার শোর দিরহাম মাহর দান করেন।

আল-ওয়াকিদী বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাওদার বিয়ে হয় নুবুওয়াতের দশম বছরে রমযান মাসে। যেহেতু সাওদা ও ‘আয়িশার (রা) বিয়ে কাছাকাছি সময়ে হয়েছিল, এ কারণে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায় যে, কার বিয়েটি আগে সম্পন্ন হয়েছিল। এ সম্পর্কে যত বর্ণনা আছে তা পর্যালোচনা করলে দুই রকমের ধারণা পাওয়া যায়। প্রথমতঃ খাওলা একই সাথে ‘আয়িশা ও সাওদার বিয়ের প্রস্বাব দেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুইটি প্রস্বাবেই সম্মতি দিয়ে খাওলাকে পাত্রী পক্ষের সাথে কথা বলার অনুমতি দান করেন। খাওলা প্রথমে ‘আয়িশার পরিবারের সাথে কথা বলেন এবং বিয়ের ব্যবস্থা করেন। এরপর সাওদার বিয়ের ব্যবসথা হয়। ইমাম আহমাদ ‘আয়িমার (রা) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ সাওদা প্রথম মহিলা যাঁকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার পরে বিয়ে করেন। আর এটাই ‘আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ‘আকীলের মত।

পক্ষান্তরে বুকাইর ইবনুল আশাজ্জের বর্ণনা মতে, খাদীজার (রা) পরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকে বিয়ে করেন। ইবন হিববানও একথা বলেছেন। ‘আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম বলেনঃ খাদীজার (রা) মৃত্যুর পর এবং আয়িশাকে বিয়ের আগে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াতের দশম বছরে রমযান মাসে সাওদাকে বিয়ে করেন। মক্কায় তাঁকে নিয়ে ঘর করেন এবং তাঁকে নিয়ে মদীনায় হিজরাত করেন।

আবু সালমা ইবন আবদির রহমান ও ইয়াহইয়া ইবন ‘আবদির রহমান-উভয়ে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুমতি পেয়ে খাওলা যথাক্রমে সাওদা ও আয়িশার নিকট প্রসতাব নিয়ে যান এবং তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা কনের। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকে নিয়ে মক্কায় ঘর-সংসার করেন। আর আয়িশার বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। মদনায় হিজরাতের পর তাঁকে ঘরে তুলে নেন। খাদীজার পরে এবং আয়িশার পূর্বে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকেবিয়ে করেন-একথা বলেছেন ইবন ইসহাক, কাতাদাহ, আবু ‘উবাইদাহ, ইবন কুতায়বাহ্ ও আরো অনেকে।

ইবন ইসহাক রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীদের ক্রমধারা এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ১. খাদীজা, ২. সাওদা, ৩. আয়িশা, ৪. হাফসা, ৫. যয়নাব বিন্ত খুযায়মা, ৬. উম্মু হাবীবা, ৭. উম্মু সালমা, ৮. যয়নাব বিন্ত জাহাশ, ৯. জুওয়াইরিয়্যা, ১০. সাফিয়্যা, ১১. মায়নূনা (রা)।

হযরত সাওদার ভাই ‘আবদুল্লাহ ইবন যাম‘আ এই বিয়ের সময় পর্যন্ত অমুসলিম ছিলেন। বিয়ের সময় তিনি গৃহে ছিলেন না। বিয়ের কাজ শেস হওয়ার পর জানতে পেরে ক্রোধে উত্তেজনায় ফেটে পড়েন। দুঃখ ও ক্ষোভে মাথা কুটতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন আদর্শ মুসলমান হয়। তিনি আমরণ তাঁর সেই দেরন আচরণের জন্য সর্বদা দুঃখ প্রকাশ করতেন। হযরত সাওদার বিয়ের সকয়কাল নিয়েও সীরাত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটু মতবিরোধ দেখা যায়। তাবাকাতসহ বিভিন্ন গ্রন্থ নুবুওয়াতের দশম সনের কথা বর্ণিত হয়েছে। আর যুরকানী (৩/৪৬০) অষ্টম সনের কথা লিখেছেন। মূলতঃ এই বিরোদের কারণ হলো হযরত খাদীজার (রা) মৃত্যুর সময়কাল নিয়ে মতবিরোধ।

কিছু কিছু বর্ণনায় এসেছে, হযরত সাওদা (রা) তাঁর প্রথম স্বামীর জীবদ্দশায় দুইটি স্বপ্ন দেখেন এবঙ স্বামীর নিকট বর্ণনা করলে তিনি যে তা‘বীর বা ব্যাখ্যা করেন তা সত্যে পরিণত হয়। হিশাম ইবন মুহাম্মদদের সূত্রে ইবন সা‘দ লিখেছেন, সাওদা তাঁর প্রথম স্বামী সাকরানের জীবদ্দমায় একবার স্বপ্নে দেখেলেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) কাছে এসে একখানি পা তাঁর কাঁধে রাখলেন সাওদা স্বপ্ন কথা স্বামীকে জানালে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যদি এ স্বপ্ন দেখে থাক তাহলে আমার মৃত্যু হবে এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তোমার বিয়ে হবে।

আর একবার স্বপ্নে দেখেন, তিনি বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন। পঠাৎ আকাশ থেকে দাঁদ ভেঙ্গে তাঁর ওপর এসে পড়ে। স্বামী স্বপ্নের কথা শুনে বলেন, খুব শিগগির আমি মারা যাচ্ছি। আর আমার মৃত্যুর পর তোমার দ্বিতীয় বিয়ে হবে। সেই দিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্প কিছুদিন পর মারা যান।

অধ্যাপক আহমাদ ‘আতিয়্যা ত৭ার আ্ল-কামুস আল-ইসলামী (৩/৫৫৭) গ্রন্থে কোন সূত্রের উল্লেক ছাড়াই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকে বিয়ে করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেনঃ সাওদা ছিলেন বয়স্কা বিধবা মহিলা। স্থুলকায় ও চলনে ছিলেন ভারী। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সয়ার হাত বাড়িয়ে দেন তাঁর বার্ধক্যে সাহায্য এবং জীবনে তিনি যে দুর্ভোগ লাভ করেছেন, তার কিছুটা লাঘবের জন্য।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নুবুওয়াতের এয়োদশ বচরে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনায় পৌঁছে একটু স্থির হওয়ার পর যায়িদ ইবন হারিসাকে আবার মক্কায় পাঠান সাওদাসহ অন্যদের নেওয়ার জন্য। আয়িশা (রা) বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় পৌঁছে যায়িদ ইবন হারিসা ও আবু রাফে‘কে দুইটি উট ও পাঁচ শো দিরহাম দিয়ে মক্কায় পাঠান। অতঃপর আমরা সকলে মদীনার দিকে বেরিয়ে পড়ি। যায়িদ ও আবু রাফে‘ মদীনায় ফিরে যান ফাতিমা, উম্মু কুলসুম, সাওদা, উম্মু আয়মান ও উসামাকে নিয়ে। দশম হিজরীর বিদায় হজ্জে হযরত সাওদা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরসঙ্গী ছিলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে অন্য লোকদের মুযদালাফা থেকে যাত্রার আগেই মীনায় চলে যাবার অনুমতি দান করেন। আয়িশা (রা) বলেনঃ মুযদালাফার রাতে সাওদা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট মানুষের ভীড়ের আগে মীনায় চলে যাওয়ার অনুমতি চান। সাওদা ছিলেন ভারী মহিলা। তিনি দ্রুত চলাফেরা করতে পারতেন না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে অনুমতি দান করেন।

একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধমিণীগণ সকলে তাঁর পাশে বসা আছেন। এমন সময় একন প্রশ্ন করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সর্বপ্রথম কার মৃত্যু হবে? বললেনঃ যার হাত সবচেয়ে দীর্ঘ। উপস্থিতকলের এই উক্তির সরল অর্থ বুঝলেন। ত৭ারা নিজেদের হাত মমেপ দেখলেন, সাওদার হাতসবার চেয়ে দীর্ঘ। ত৭ারা বিশআস করলেন, সাওদার মৃত্যুর হবে সাবর আগে। কিনউত যখন হযরত যয়নাব বিনত খুযায়মা সবার আগে মারা গেলেন তখন বুঝা গেল, হাত দীর্ঘ হওয়া অর্থ দানশীলতা। দান করা ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কাজ। আযওয়াকে মুতাহ্হারাত (পবিত্র স্ত্রীগণ)-এর মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম মারা যান। সাওদা তখন জীবিত।

হযরত সাওদার (রা) মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের দারুণ মতভেদ রয়েছে্ আল-ওয়াকিদী বলেন, আমাদের নিকট এটাই সঠিক যে, হিজরী ৫৪ সনের শাওয়াল মাসে তাঁর মৃত্যু হয়। ইবনুল ইমামদ আল-হাম্বলী খলীফা হযরত মু‘য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকারে হিজরী ৫৫ সনের মতটি সর্বাধিক সঠিক বলে মনে করেছেন। ইবনহাজার বলেন, বুখারী তাঁর তারীখে সহীহ সনেদে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ‘উমারের (রা) খিলাফতকালের শেষদিকে তাঁর ইনতিকাল হয়। ইমাম জাহাবী জোর দিয়ে বলেছেন যে, খালীফা উমারের খিলাফতকালের শেষ দিকে তাঁর ইনতিকাল হয়। উমার (রা) শাহাদাত লাভকরেন হিজরী ২৩ সনের জিলহজ্জ মাসের শেষ দিকে। এ কারণেসাওদার্নতিকাল তারও আগে হয়ে থাকবে। বালাজুরী বলেন, হিজরী ২৩ সনে তিনি মারা যান। খলীফা উমার (রা) তাঁর জানাযার নামায পড়ান। ইবন হিবচÿান বলেন, হিজরী ৬৫ সনে তিনিমারা যান। আবার একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, খলীফা উসমারে (রা) খিলাফতকালে প্রায় আশি বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর হয়। হযরত সাওদার (রা) সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে অধিকাংশ সীরাত গ্রন্থকার কোন আলোচনা করেননি। তবে এতটুকু জানা যায় যে, হযরত রাসূলে পাকের সাথে বৈবাহিক জীবনে তাঁর কোন সন্তান হয়নি। প্রথম স্বামী সাকরানের পক্ষের একটি ছেলে, যার নাম ‘আবদুর রহমান’ পারস্যের জালুলার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীদের মধ্যে সাওদার চেয়ে দীর্ঘদেহী আর কেউ ছিলেন না। হযরত আয়িশা (রা) বলেছেন, যে একবার তাঁকে দেখেছে তার চোখ থেকেতিনি গোপন হতে পারতেন না। যুরকানী বর্ণনা করেছেন, তাঁর কাঠামো ছিল লম্বা। আল্লামা শিবলী নু‘মানী বলেছেন, তিনি ছিলেন স্থুলকায়। একথা ইমাম জাহাবীও বলেছেন। এ কারণে বিদায় হজ্জের সময় মানুষেল ভীড়ের আগে তিনি মুযদালাফা থেকে মীনায় চলে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুমতি লাভ করেছিলেন।

হযরত সাওদার (রা) সূতে মাত্র পাঁচটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার ম¨্যধ ইমাম বুখারী মাত্র একট হাসীদ বর্ণনা করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস, ইবনুল যুবাইর এবং ইয়াহইয়া ইবন আবদিল্লাহ আল-আনসারী তাঁর থেকে হাদীস শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন।

হিজরাতের প্রায় তিন বছর পূর্বে হযরত সাওদা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) ঘরে আসেন। নুবুওয়াতের দশম বছরের রমযান মাস থেকে ত্রয়োদশ হিজরীর রবী‘উল আওয়াল মাস পর্যন্ত প্রায় তেরো বছর স্ত্রী হিসেবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্নিধ্য ও সাহচর্য লাভের যৌভাগ্য অর্জন করেন। কিচু আগে-পরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাওদা ও আয়িশার বিয়ে হয়। বিয়ের পর আয়িশা (রা) প্রায় তিনবছর পিতৃগৃহে অবসআন করেন। এ সময় সাওদাই ছিলেন মূলতঃ এক গৃহিনী। এ সময় তিনি অতি সুষ্ঠুভাবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘর-গৃহস্থালীর যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন। মাতৃহারা কন্যা ফাতিমাসহ অন্য কন্যাদের লালন-পালনের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। সম্ভবতঃ তখন পর্যন্ত নবী পরিবারের সদস্য হযরত আলীরও তত্ত্বাবধান করেন। মোটকথা, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনের এক কঠিন ও সংকটময় পর্বে হযরত সাওদা (রা) জীবন সংগিনী হিসাবে কঠিন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে খাদীজার (রা) শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেন।

প্রথম হিজরী সনে আয়িশা (রা) যখন স্বামীগৃহে আসেন তখন সতীন সাওদা বিদ্যমান। এ অবস্থায় একে অপরের ভাগ বসানোর কল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু এই স্বাভাবিক অনুমানের একেবারে বিপরীত ছিল এই দুইজনের অবস্থা। তাঁদের সংসার জীবনের সবকিছু ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও ঐক্যের। গার্হস্থ্য জীবনের অধিকাংশ বিষয়ে সাওদা ছিলেন ‘আয়িমার বান্ধবী। আয়িশা (রা) বলেনঃ সাওদা ছাান্য কোনমহিলাকে দেখে আমার এমন ইচ্ছা হয়নি যে, তার দেহে যদি আমার প্রাণটি হোত।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে তিনি সকল আযওয়াজে মুতাহহারাত’ (পবিত্র স্ত্রীগণ) অপেক্ষা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারিণী ছিলেন। বিদায় হজ্জে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মাহাতুল মুমিনীন’ এর (ঈমানদারদের মাতাগণ) উদ্দেশ্যে বলেন, আমার পরে তোমরা ঘরে অবস্থান করবে। হযরত সাওদা (রা) এই নির্দেশের উপর এত কঠোরভাবে আলম করেন যে, হজ্জের উদ্দেশ্যেও আর কখনও ঘর থেকে বের হননি। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পর তাঁর অন্য সহধর্মিণীগণ হজ্জ করতেন; কিন্তু সাওদা ও যয়নাব বিনত জাহাশ রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদেশ কঠোরভাবে পালন করতেন। ঘর থেক বের হতেন না। সাওদা (রা) বলতেন, আমি হজ্জ ও উমরা-দুটোই আদায় করেছি। এখন আল্লাহর নির্দেশ মত ঘরে বসে থাকবো।

হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আখলাক ও স্বভাব-চরিত্রের এক অনুপম দিক ছিল দানশীলতা। সাহাবীদের মধ্যে যিনি যত বেশি তাঁর নিকটে থাকার সুযোগ পেয়েছেন তাঁর মধ্যে এই বিশেষ গুণটির ছাপ পড়েছে অধিক। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্নিধ্য ও সাহচর্য্য থেকে তাঁর সহধর্মিণীগণই সর্বাধিক মাত্রায় গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই বিশেষ গুণটি তাঁদের সকলের মধ্যে সাধারণভাবে পাওয়া গেলেও একমাত্র আয়িশা (রা) ছাড়া সাওদার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন, একবার খলীফা হযরত ‘উমার (রা) হযরত খাওদার (রা) নিকট একটি থলি পাঠান। তিনি বহনকারীকে প্রশ্ন করেন। তলিতে কি? বললোঃ দিরহাম। থলিতে খেজুরের মত দিরহাম পাঠানো হয়-একথা বলে তক্ষণি দিরহাম মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন।

ইছার বা নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দান করাও ছিল তাঁর চরিত্রের এক উজ্জ্বল দিক। তিনি এবং আয়িশা (রা) কিচু আগে-পরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বৈবাহিক জীবন শুরু করেন। তবে আয়িশা (রা) অপেক্ষা তাঁর বয়স ছিল বেশি। এ কারণে তাঁর জীবনে বার্ধক্য এসে যায় এবং তার মধ্যে পুরুষের প্রতি আকর্ষণে ভাটা পড়ে। তাই তিনি স্বামী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে নিজের ভাগের রাতটি সতীন আয়িশাকে (রা) দান করেন। এ সম্পর্কে একবার হযরত ‘আয়িশা (রা) উরওয়াকে বললেনঃ ভাতিজা! রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীদের জন্য তার বণিআটত রাতে অবস্থানের ব্যাপারে কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিতেন না।ানেক দিন এমন গেছে তিনি আমাদের সকলের নিকট এসে ঘুরে গেছেন, কোন স্ত্রীকেই স্পর্শ করেননি। শেষে সেই স্ত্রী নিকট রাত কাটিয়েছেন যার জন্য রাতটি নির্ধারিত ছিল্ সাওদা বিনত যাম’আর যখন বার্ধক্য এসে যায় এবং এই ভয় পেয়ে যান যে না জানি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে দেন, তখন তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ভাগের রাতটি আমি আয়িশাকে (রা) দিলাম। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর এ আবেদন মঞ্জুর করেন।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। হযরত সাওদার (রা) স্বামী সান্নিধ্যের সময়টুকু আয়িশাকে (রা) দান করার বিষয়টি হাসীদ ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে এসেছে। কিন্তু তারই পাশাপাশি সীরাতের গ্রন্থসমূহে এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় যাতে দেখা যায়, সাওদার (রা) জীবনোবর্ধক্য এসে যাওয়ায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে এক তালাক দান করেছিলেন। তারপর তাঁর বিনীত অনুরোধে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তালাক প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু মুহাদ্দিসদের নিকট বর্ণনাগুলি অতি দূর্বল বিধায় গুরুত্বহীন। আর এটাই সঠিক যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কোন স্ত্রীকে তালাক দান করেননি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনের এক বিশেষ সময়ে যাঁকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন এবং যিনি অতি দক্ষতার সাথে খাদীজার (রা) দায়িত্ব পালনকরেন, তাকে বার্ধক্যে রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল-াম) দূরে ঠেলে দেবেন, এমন কথা কেমন করে ভাবা যায়? তাই মুহাদ্দিদসগণ এসব বর্ণনায় বিশ্বাস করেননি। কোন নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থেও এসব বর্ণনা স্থান পায়নি। কিন্তু তা না পেলে কি হবে? আধুনিক ইতিহাস লেখকদের অনেকে সাওদা (রা) সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) আদর্শ গৃহিণী হতে পারেননি।

এ সম্পর্কিত বিভিন্ন পর্যালোচনা করলে যে তথ্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো, সাওদার জীবনে বার্ধক্য এসে যায়। স্বামীকে তুষ্ট করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। এদিকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একাধিক স্ত্রী বিদ্যামান ছিল। আর তিনি ছিলেন আদল ও ইনসাফের মূর্ত প্রতীক। সকল স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দান করতেন। স্ত্রীদের জন্য যতটুকু সময় ব্যয় করতেন, তা সকলের জন্য সমানভাবে ভাগ করতেন। এভাবে সাওদাসহ আরো কয়েকজন স্ত্রী সমানভাবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাম ও প্রশান্তি লাভের সময়ের ভাগ পেতেন। কিন্তু মূলতঃ তাঁদের বয়সের কাণে তাঁরা রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশান্তি দিতে অক্ষম ছিলেন। স্বেচ্ছায় নিজের অধিকার সতীন আয়িশার (রা) অনুকহলে ছেড়ে দিয়ে রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দায়মুক্ত কনে। আয়িশার (রা) একটি বর্ণনা দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয়। তিনি বলেনঃ সাওদা বৃদ্ধা হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট আমার স্থান কি এবং তিনি যে আমাকে বেশি কাছে পেতে চান, তা নি বুঝতে পারেন। তিনিভয় পেয়ে যান, যা জানি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ত৭াকে পৃথক করে দেন। তাই তিনি বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার বারির দিনটি আয়িশাকে দানকরলাম। আপনি এ ব্যাপারে দায়মুক্ত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর্ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। হযরত সাওদা ছিলেন একটু রুক্ষ প্রকৃতির মহিলা। হযরত আয়িমার (রা) সীমাহীন শ্রদ্ধার পাত্রী ছিলেন তিনি। তা সত্ত্বেও তিনি বলেছন, সাওদা খুব দ্রুত রেগে যেতেন। পর্দার হুকুম নাযিলের পূর্ব থেকে হযরত উমার (রা) এ বিষয়ে নির্দেশ দানের জন্য প্রায়ই রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) নিকট দাবী জানাতেন। যেহেতু এ ব্যাপারে আল্লারহ কোন নির্দেশ আসেনি তাই তিনি চুপ থাকতেন। সে সময় মক্কার কোন গৃহের অভ্যন্তরে পায়খানার ব্যবস্থা ছিল না। পায়খানা থাকাটা তারা শোভন মনে করতো না। সে সময় মেয়েরাও প্রাকৃতিক কর্ম সমাধার অন্য রাতের বেলা বাড়ীর বাইরে খোলা ময়দানেচলে যেত। হযরত সাওদা ছিলেন স্থুলকায় ও দীর্ঘদেহী। বহু মানুষের মধ্যেও তাকে চেনা যেত। একদিন রাতে তিনি বাইরে যাচ্ছেন। পথে উমারের দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি চেঁচিয়ে বলে ওঠেনঃ আপনাকে আমি চিনে ফেরেছি। উমারের এমন আচরণে সাওদা যেমন লজ্জা পেলেন, তেমনি রেগেও গেলেন। ফিরে এসে উমারের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট অভিযোগ কনের। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হিজাবের আয়াত নাযিল হয়।

হিজাবের আয়াত নাযিলের কারণ সম্পর্কে দারুণ মতভেদ আছে। একটি বর্ণনা তো উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় একটি বর্ণনা এই যে, হযরত ‘উমার (রা) রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আপনার নিকট ভালো-মন্দ সকল ধরনের লোকের সমাগম হয়। আপনি যদি তাদেরকে পর্দা করারি নির্দেশ দিতেন, ভালো হতো। ইবন জারীর তাঁর তাফসীরে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের সাথে আহার করছিলেন। হরযত ‘ইয়শাও ভোজনে অংশীদার ছিলেন। তাঁর হাতে এক ব্যক্তি হাতের ছোঁয়া লাগে। ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে খুব খারাপ লাগে। এই ঘটনার পর হিজাবের আয়াত নাযিল হয়। তবে সাধারণভাবে একথা প্রসিদ্ধ যে, হযরত যয়নাবের (রা) ওলীমার আহার পর্ব উপলক্ষে ‘আয়াতে হিজাব’ নাযিল হয়। ইবন হাজার এই বর্ণনাগুলির সমন্বয় করেছেন এভাবেঃ হিজাবের আয়াত নাযিলের একটি কারণ ছিল। তার মধ্যে যয়নাবের ঘটনাটি ছিল সর্বশেষ। আর সেটাই আয়াতের শানে নুযুল। কারণ উক্ত আয়তের মধ্যেই ঘটনাটির প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।

রুক্ষ স্বভাবের হলেও সাওদার (রা) মধ্যে সারল্য ভাবও ছিল। তাঁর কোন কোন কথায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হেসে দিতেন। একদিন তিনি রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কাল রাতে আমি আপনার সাথ নামায পড়েছি। আপনি এত দীর্ঘ সময় রুকুতে ছিলেন যে, আমার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। এ কারণে আমি দীর্ঘক্ষণ নাক চেপে ধরে রেখেছিলাম। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কথায় মৃদু হেসে দেন।

তিনি একবার ‘আয়িশা ও রাফসার (রা) সাথে যাচ্ছেন। তাঁরা একটু কৌতুক করে বললেন, আপনি কি কিছু শুনেছেন? তিনি প্রশ্ন করলেনঃ কোন বিষয়ে? তাঁরা বললেনঃ দাজ্জাল বের হয়েছে। এ কথা শুনে তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। পাশেই একটি তাঁবুতে কিছু লোক আগুন পোহাচ্ছিল। তিনি হঠাৎ সেই তাঁবুর মধ্যে ঢুকে পড়েন। হযরত হাফসা ও হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর কান্ড দেখে হাসতে হাসতে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পৌঁছেন এবং তাদের কৌতুকের কথা বলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসে তাঁবুর দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন, এখনো দাজ্জাল বের হয়নি। তখন সাওদা বেরিয়ে আসেন। গায়ে তাঁর মাকড়সার জাল গেলে ছিল, বাইরে এসে তা সাফ বলেন। অনেকের নিকট এ বর্ণনাটির সূত্র দুর্বল এবং বর্ণনাটি সন্দেহযুক্ত।

হযরত সাওদার (রা) সরলতার আরো বহু ঘটনা আছে। রাসূলাল্লাহ (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) নিজের জন্য যে মধু পান হারাম করে নেন তার পিছনে ছিল দাম্পত্য জীবনের একটি মধুর ঘটনা। আর সেই ঘটনার সাথে সরলভাবে সাওদাও জড়িয়ে পড়েন বলে অনেকের ধারণা। সংক্ষেপে ঘটনাটি এই রকমঃ

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিস্টি পছন্দ করতেন। তিনি স্ত্রী যয়নাব বিনত জাহাশ, মতান্তরে হাফসার ঘরে গেলে মধুর শরবত পান করতেন। এতে ‘আয়িশার মনে কিছুটা ঈর্ষার সৃষ্টি হয়। তিনি চাইলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাতে সেখানে আর মধু পান না করেন। তাই সাওদার সাথে ফন্দি আঁটলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মধু পানের পর যখন তাঁদের নিকট আসবেন তখন তাঁরা প্রত্যেকেই বলবেন, আপনার পবিত্র মুখ থেকে ‘মুগফুর’-এর গন্ধ বের যাচ্ছে। এতে হয়তো রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মধু পান ছেড়ে দিবেন। কারণ, তিনি কোন রকম দুর্গন্ধ পছন্দ করেন না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মধু পান করে যখন তাঁদের কাছে গেলেন, তাঁরা পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে একই কথা বললেন। দ্রুত ফল হলো। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের জন্য মধু হারাম করে বসলেন। তখন সূরা আযত-তাহরীম-এর ১-৩ নং আয়াত নযিল হয়।

হযরত সাওদার (রা) অন্তরটি ছিল অতি কোমল। আপনজনদের দুঃখ-কষ্ট দেখে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। তাঁর প্রথম স্বামী সাকরান ইবন আমরের ভাউ সুহাইল ইবন ‘আমরকে বদরে বন্দী করে মদীনায় আনা হয়। চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে তিনি মুক্তিলাভ করেন। এ সম্পর্কে ইবন ইসহাক বলেনঃ বদরের বন্দীদের যখন মদীূনায় আনা হয় তখণ সাওদা ছিলেন ‘আফসরার ছেলে ‘আউফ ও মু‘য়াওজিবের গৃহে। এটা পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার আগে। এমন সময় বদরের বন্দীদের আগমনের কথা ঘোষণা করা হলো। সাওদা বাড়ী ফিরে এস রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘইে পেলেন। হঠাৎ কক্ষের এক কোণে বন্দী আবু ইয়াযীদ সুহাইল ইবন আমরকে দেখতে পেলেন। গলার সাথে তার হাত দুটি রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। এ দৃশ্র দেখে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বলে উঠলেনঃ আবু ইয়াযীদ! তোমরা এভাবে ধরা দিলে? সম্মানের সাথে মরতে পারলে না? সাওদা বলেনঃ ঘরের মধ্য থেকে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল-াম) এ কণ্ঠস্বরে আমি সম্বিত ফিরে পাইঃ সাওদা! তুমি কি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছো? সাওদা বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি বআবু ইয়াযীদ সুহাইলকে এ অবস্থায় দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করুন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) বললেনঃ আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।

হিজরী ৮ম সনে যয়নাব বিনত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় ইনতিকাল করেন। তাঁকে গোসল দেন সাওদা, উম্মু আয়মান ও উম্মু সালামা।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খায়বারে সাওদার (রা) জীবিকার ব্যবস্থা করে যান। ‘আবদুর রহমান আল-আ‘রাজ মদীনায় বিভিন্ন মজলিসে বলতেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকে ৮০ ওয়াসাক খেজুর ও ২০ ওয়সাক গম বা যবের দ্বারা তাঁর জীবিকার ব্যবস্তা করেন।

 

আয়িশা সিদ্দীকা (রা)

উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা সিদ্দীকা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রিয়তমা স্ত্রী। তাঁর ডাকনাম বা কুনিয়াত উম্মু ‘আবদিল্লাহ এবং উপাধি সিদ্দীকা। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাঁর অন্য একটি উপাধি আল-হুমায়রা। তিনি ফরসা সুন্দরী ছিলেন। এ কারণে আল-হুমায়রা বলা হতো।১ উরওয়া বলেনঃ একবার হিজাবের হুকুম নাযিলের পূর্বে উয়ায়না ইবন হিসন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তখন আয়িশা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। উয়ায়না আয়িশার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ ‘আল-হুমায়রা’ (সুন্দরীটি) কে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জবাব দেনঃ এ হচ্ছে আবু বকরের মেয়ে ‘আয়িশা।২ অনেকে এই বর্ণনাটিকে ভিত্তিহীন মনে করেছেন।৩

আবদুল্লাহ ছিলেন ‘আয়িশার (রা) বোন আসমার (রা) ছেলে। ইতিহাসে তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর নামে প্রসিদ্ধ। কুনিয়াত হয় কোন সন্তানের নামের সাথে। আয়িশা (রা) ছিলেন নিঃসন্তান। তাই তাঁর কোন কুনিয়াত ও ছির না। সেকালের আরবে কুনিয়াত ছির শরাফত ও আভিজাত্যের প্রতীক। অভিজাত শ্রেণীর লোকদের নাম ধরে ডাকার নিয়ম ছিল না। কুনিয়াত বা উপনামেই তাদেরকে সম্বোধন করা হতো। একদিন আয়িশা (রা) স্বামী রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আপনার অন্য স্ত্রীগণ তাঁদের পূর্বের স্বামীদের সন্তানদের নামে নিজেদের কুনিয়াত ধারণ করেছেন, আমি কার নামে কুনিয়াত ধারণ করি? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তোমার বোনের ছেলে আবদুল্লাহর নামে। সেই দিন থেকে তাঁর কুনিয়াত বা ডাকনাম হয় ‘উম্মু ‘আবদিল্লাহ’-‘আবদুল্লাহর মা।৪

একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘আয়িশা (রা) একটি পুত্র সন্তানের মা হন এবং শিশুকালেই তাঁর মৃত্যু হয়। তার নাম রাখা হয় ‘আবদুল্লাহ।৫ সেই সন্তানের নামেই তাঁর কুনিয়াত হয়। ইবন হাজার ‘আসিকিলানী-বলেন, এ বর্ণনা সঠিক নয়।৬ তাছাড়া বিভিন্ন সহীহ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ কয়েছে যে, তিনি নিঃসন্তান ছিলেন।৭

আয়িশার (রা) পিতা খলীফাতু রাসূলিল্লাহ, আস্-সিদ্দীকুল আকবর আবু বকর (রা) এবং মাতা উম্মু রূমান যয়নাব বিনত ‘আমের, মতান্তরে ‘উমাইর আলী-কিনানী। পিতার দিক দিয়ে তিনি কুরাইশ গোত্রের বনু তাইম শাখার এবং মাতার দিক দিয়ে বনু কিনানার সন্তান। মা গানাম ইবন মালিক কিনানার মেয়ে।8 রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আয়িশার (রা) বংশধারা পিতৃকূলের দিক দিয়ে উপরের দিকে সপ্তম/অষ্টম পুরুষে এবং মাতৃকূলের দিক দিয়ে একাদশ/দ্বাদশ পুরুষে মিলিত হয়েছে।৯

‘আয়িশা (রা) পিতা আবু বকর (রা) হিজরী ১৩ সনে ইনতিকাল করেন। মা উম্মু রুমান সম্পর্কে অধিকাংশ ঐতিহাসিক লিখেছেন যে, তিনি পাঁচ অথবা ছয় হিজরীতে ইনতিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কবরে নেমে তাঁকে দাফন করেন এবং জানাযার নামায পড়েন।১০ কিন্তু এ তথ্য সঠিন নয়। কারণ, নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত যে, তিনি উসমানের (রা) খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। হিজরী ৬ষ্ঠ সনের ইফক (‘আয়িশার (রা). চরিত্রে কলম্ব আরোপ)-এর ঘটনা সংক্রান্ত সকল হাদীসে তাঁর নাত এসেছে। হিজরী নবম সনের ‘তাখঈর’ (যে কোন একটি জিনিস বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার)-এর ঘটনার সময়ও তিনি জীবিত ছিলেন। এ কথা তাবাকাত, বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনাসমূহে জানা যায়। ইমাম বুখারী ‘তারীখে, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনাসমূহে জানা যায়। ইমাম বুখারী তারীখে সাগীর’ গ্রন্থে তাঁর নামটি ঐসকল লোকদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন যাঁরা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফতকালে ইনতিকাল করেন। তিনি প্রথম বর্ণনাটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। হাফেজ ইবন হাজার আত-তাহযীব’ গ্রন্থে একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করে প্রমাণ করেছেন যে, ইমাম মুখারীর বর্ণনা সঠিক।১১

‘আয়িশার (রা) মা উম্মু রূমানের (রা) প্রথম বিয়ে হয় ‘আবদুল্লাহ ইবন আল-হারিস আল-আযদীর সাথে। আবদুল্লাহ স্ত্রী উম্মু রূমানকে নিয়ে মক্কায় আসেন এবং আবু বকরের সাথে মৈত্রী চুক্তি করে সেখানে বসবাস করতে থাকেন। এটা ইসলাম-পূর্ব কালের কথা। আত-তুফাইল নামে তাঁদের একটি পুত্র সন্তান হয়। আবদুল্লাহ মারা যান এবং আবু বকর (রা) উম্মু রূমানকে বিয়ে করেন।১২ এখানে তাঁর দুইটি সন্তান হয়-আবদুল্লাহ ও আয়িশা। হযরত আয়িশার (রা) জন্মের সঠিক সময়কাল সম্পর্কে তারিখ ও সীরাতের গ্রন্থবলীতে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। এ কারণে তাঁর জন্মসন সম্পর্কে বেশ মতপার্থক্য দেখা যায়। সাইয়্যেদ সুলায়মান নাদবী বলেনঃ ঐতিহাসিক ইবন সা‘দ লিখেছেন এবং কোন কোন সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁকে অনুসরণ করে বলেছেন নুবুওয়াতের চতুর্থ বছরের সূচনায় আয়িশা জন্মগ্রহণ করেন এবং দশম বছরে ছয় বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু এ কথা কোনভাবেই সঠিক হতে পারে না। কারণ নুবুওয়াতের চতুর্থ বছরের সূচনায় তাঁর জন্ম হলে দশম বছরে তাঁর বয়স ছয় বছর নয়, বরং সাত বছর হবে। মূলত আয়িশার (রা) বয়স সম্পর্কে কয়েকটি কথা সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত। তা হলো, হিজরাতের তিন বছর পূর্বে ছয় বছর বয়সে বিয়ে হয়। প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে নয় বছর বয়সে স্বামী গৃহে যান এবং এগারো হিজরীর রাবীউল আওয়াল মাসে আঠারো বছর বয়সে বিধবা হন। এই হিসাবে তাঁর জন্মের সঠিক সময়কাল হবে নুবুওয়াতের পঞ্চশ বছরের শোষের দিক। অর্থাৎ হিজরাত পূর্ব নবম সনের শাওয়াল মাসে, মুতাবিক জুলাই, ৬১৪ খ্রিস্টাব্দ।১৩

উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেইশ বছরের নুবুওয়াতী জীবনের প্রায় তেরো বছর মক্কায় এবং দশ মদীনায় অতিবাহিত হয়। নাদবী সাহেবের বর্ণনা, মতে আয়িশার (রা) যখন জন্ম হয় তখন নুবুওয়াতের চার বছর অতিক্রান্ত হয়ে পঞ্চম বছর চলছে। ইমাম জাহাবী বলেনঃ আয়িশা (রা), ফাতিমার চেয়ে আট বছরের ছোট। আয়িশা বলেছেন, তিনি মক্কায় একজন বৃদ্ধ অন্ধ হাতী চালকের সাক্ষাৎ পেয়েছেন।১৪

‘আয়িশা (রা) কখন কিভাবে মুসলমান হয় সে সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রা) বড় সৌভাগ্য যে, তাঁরই গৃহে সর্বপ্রথম ইসলামের আলো প্রবেশ করে। এই কারণে হযরত আয়িশা ঐ সকল বাগ্যবান ও ভাগ্যবতী নব-নাবীদের একজন যাঁদের কর্ণকুহরে মুহূর্তের জন্যও কুফর ও শিরকের আওয়ায় পৌঁছেনি। আয়িশা (রা) বলেনঃ যখন থেকে আমি আমার বাবা-মাকে চিনেছি তখন থেকেই তাঁরদেরকে মুসলমান পেয়েছি।১৫ ইমাম জাহাবী শুধু বলেছেনঃ আয়িশা ইসলাম গ্রহণ করেন।১৬ কিন্তু কখন কিভাবে, তা বলেননি। ইবন হিশাম যাঁরা আবু বকরের (রা) হাতে ইসলাম গ্রহণকরেন, তাঁদেরকে একটা স্বতন্ত্র শিরোনামে উল্লেখ করেছেন। সেখানে আয়িমার (রা) নামটিও এসেছে।১৭

আয়িশাকে (রা) ওয়ায়িল-এর স্ত্রী দুধপান করান। এই ওয়ায়িল-এর ডাকনাম ছিল আবুল ফুকায়‘য়াস। তাঁর ভাই আফলাহ-যিনি আয়িশার দুধচাচা-পরবর্তীকালে মাঝে মাঝে ‘আয়িশার (রা) সাথে দেখা করতে আসতেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনমতি নিয়ে ‘আয়িশা (রা) তাঁর সামনে যেতেন। তাঁর দুধ-ভাইও মাঝে মাঝে দেখা করতে আসতেন।১৮

আয়িশার (রা) বাল্যজীবন অন্যসব শিশুদের মতই কেটেছে। তবে একটু ভিন্নতর ছিল। বাল্যকালেই ত৭ার তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যসব শিশুদের মত খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। সমবয়সী প্রতিবেশী মেয়েরা তাঁর কাছে আসতো এবং তিনি অধিকাংশ সময় তাদের সাথে খেলতেন। কিন্তু সেই বয়সে খেলার মধ্যেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্মান ও মর্যাদার প্রতি সজাগ থাকতেন। অনেক সময় এমন হতো যে, তিনি অন্যদের সাথে পুতুল নিয়ে খেলছেন, এমন সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের গৃহে এসেছেন এবং হঠাৎ তাঁদের মধ্যে হাজির হয়েছেন। ‘আয়িশা (রা) পুতুলগুলি তাছাতাড়ি লুকিয়ে ফেলতেন এবং অন্যসাথীরা রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখামাত্র ছুটে পালাতো। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিশুদের ভালোবাসতেন। তাঁদের খেলাধুলাকেও খারাপ মনে করতেন না। তিনি পালিয়ে যাওয়া শিশুদের ডেকে ডেকে ‘আয়িশার সাথে খেরতে বলতেন।১৯ শিশুদের খেলাগুলির মধ্যে দুইটি খেরা ছিল তাঁর সর্বাধিক প্রিয়। পুতুল খেলা ও দোল খাওয়া।২০ একদিন ‘আয়িশা (রা) পুতুল নিয়ে খেলছেন, এমন সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসে পড়লেন। পুতুলুগুলির মধ্যে একটি দুই ডানাওয়ালা ঘোড়াও ছিল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ঘোড়ার তো কোন ডানা হয় না। ‘আয়িশা সাথে সাথে বলে উঠলেনঃ কেন? সুলায়মান আলাইহিস সালামের ঘোড়াগুলির তো ডানা ছিল-একথা কি আপনি শোনেনি? ‘আয়িশার (রা) এমন উপস্থিত জবাব শুনে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমনভাবে একটু হেসে দেন যে, তাঁর দাঁত দেখা যায়।২১

এই ঘটান দ্বারা ‘আয়িশার (রা) স্বাভাবগত উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, ইতিহাস-ঐতিহ্যের জ্ঞান, এবং তীক্ষ্ণ মেধার অনুমান করা যায়।

সাধারণত শৈশবকালের কথা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়। কিন্তু ‘আয়িশার (রা) ছোটবেলার সব কথাই স্মৃতিতে ছিল। হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন তখন ‘আয়িশার (রা) বয়স আট/নয় বছরের বেশি হবে না। কিন্তু হিজরাতের ঘটনার যত বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা আর কোন সাহাবী দিতে পারেননি।২২

ইমাম বুখারী সূরা আল-কামার-এর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। ‘আয়িশার (রা) বলেন, যখন এই আয়াতঃ

আরবী হবে

মক্কায় নাযিল হয় তখন আমি ছোট্ট মেয়ে, খেলছিলাম।২৩ ছোটবেলায় হযরত ‘আয়িশার (রা) মাঝে মাঝে মাঝে ক্ষেপিয়ে তুরতেন। তিনিও মেয়েকে শাস্তি দিতেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এতে কষ্ট অনুভব করতেন। একবার তিনি উম্মু রূমানকে বলেন, আমার খাতিরে তাকে আর শাস্তি দিবেন না। একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার পিতৃগৃহে এসে দেখেন, দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে ‘আয়িশা কাঁদছেন। তিনি উম্মু রূমানকে বলেন, আপনি আমার কথায় গুরুত্ব দেননি। উম্ম রূমান বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ‘‘ এ মেয়ে আমার বিরুদ্ধে তার বাপের কাছে লাগায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যা কিছুই করুক না কেন, তাকে কষ্ট দিবেন না। আল্লামাহ সাইয়্যেদ সুলায়মান নাদবী ‘মুসতাদরিকে হাকেম’-এর বরাত দিয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথমা স্ত্রী হযরত খাদীজা বিন্ত খুওয়াইলিদ। তাঁকে বিয়ে করার সময় রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স ছির পঁচিশ এবং খাদীজার (রা) চল্লিশ। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে পঁচিশ বছর ঘর করার পর নুবুওয়াতের দশম বছর রমযান মাসে হিজরাতের তিনি বছর পূর্বে খাদীজা (রা) ইনতিকাল করেন। তখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স পঞ্চাশ এবং কাদীজার পঁয়ষট্টি।

সাওদার (রা) জীবনীতে আমরা উল্লেখ করেছি যে, খাদীজার (রা) ইনতিকারের পর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিমর্ষ দেখে ‘উসমান ইবন মাজে’উনের স্ত্রী খাওলা বিনত হাকীম বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি আবার বিয়ে করুন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানতে চাইলেন-কাকে? খাওয়া বললেনঃ বিধবা ও কুমারী দুই রকম পাত্রীই আছে। যাকে আপনার পছন্দ হয় তাঁর বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবার জানতে চাইলেনঃ তারা কারা? খাওলা বললেনঃ বিধবা পাত্রীটি সাওদা বিনত যাম‘আ, আর কুমারী পাত্রীটি আবু বকরের মেয়ে ‘আয়িশা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ভালো। তুমি তার সম্পর্কে কথা বলো।২৪

হযরত খাওলা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্মতি পেয়ে প্রথমে আবু বকরের (রা) বাড়ী এসে প্রস্তাব দেন। জাহিলী আরবের রীতি ছিল, তারা আপন ভাইয়ের সন্তানদের যেমন বিয়ে করতো না, তেমনি সৎ ভাই, জ্ঞাতি ভাই বা পাতানো ভাইয়ের সন্তানদেরকেও বিয়ে করা বৈধ মনে করতো না। এ কারণে প্রস্তাবটি শুনে আবু বকর বললেনঃ খাওলা! আয়িশা তো রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাতিজী। তার সাথে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ে হয় কেমন করে? খাওলা (রা) ফিরে আসতেন এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আবু বকর আমার দীনী ভাই। আর এ ধরনের ভাইদের সন্তানদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। আবু বকর (রা) প্রস্তাব মেনে নেন এবং খাওলাকে বরেন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে আসতে।২৫

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে ‘আয়িশার (রা) বিয়ের প্রস্তাব আসার আগে জুবাইর ইবন মুত‘ইম ইবন আদীর সাথে তাঁর বিয়ের কথা হয়েছিল। এ কারণে তার কাছেও জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন ছিল। হযরত আবু বকর (রা) মুত‘ইম ইবন আদীর আছে যেয়ে বরলেনঃ তুমি তোমার ছেলের সাথে ‘আয়িশার বিয়ের প্রস্তাব করেছিল। এমন তোমাদের সিদ্ধান্ত কী, বল। মুত‘ইম তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস কররেন। মুত‘ইমের পরিবার তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। এ কারণে তাঁর স্ত্রী এ প্রস্তাবে মত নেই। তখন আবু বকর (রা) মুত‘ইমের দিকে ফিরে বললেনঃ আমার এ প্রস্তাবে মত নেই। তখন আবু বকর (রা) মুত‘ইমের দিকে ফিরে বলরেনঃ তোমার স্ত্রী কী বলে? মুত‘ইম বললেনঃ সে যা বলেছে, আমারও মত তাই। তারপর ফফেএেসে খাওলাকে বললেনঃ আপনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে আসুন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এলেন এবং আবু বকর বিয়ে পড়িয়ে দিলেন।২৬ বালাজুরী অবশ্য অন্য কারো সাথে ‘আয়িশার প্রস্তাবের কথা সঠিক নয় বরে উল্লেখ করেছেন।২৭

‘আয়িশা (রা) ও সাওদার (রা) বিয়ে একই সময় হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাওদাকে বিয়ের পরই ঘরে তুরে নেন এবং শুধু তাঁকে নিয়ে তনি বছর ঘর করার পর ‘আয়িশার (রা) ঘরে নিয়ে আসেন।২৮

এই বিয়ে অতি সাদামাটা ও অড়ম্বরহীনভাবে সম্পন্ন হয়। ‘আতিয়্যা (রা) এই বিয়ের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-‘আয়িশা অন্য মেয়েদের সাথে খেলছিলেন। তাঁর সেবিকা এসে তাঁকে নিয়ে যায় এবং আবু বকর (রা) এসে বিয়ে পড়িয়ে দেন।’

এই বিয়ে যে কত অনাড়ম্বর ও অনুষ্ঠানহীন অবস্থায় শেষ হয়েছিল তা অনুমান করা যায় খোদ ‘আয়িশার (রা) একটি বর্ণনা দ্বারা। তিনি বলছেনঃ যখন আমার বিয়ে হয়, আমি কিচুই জানতাম না। আমার বিয়ে হয়ে গেছে। তারপর মা আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেন।২৯

‘আয়িশা (রা) বলেনঃ বিয়ের সময় আমি এক ছোট্ট মেয়ে। ‘হাওফ’ নামক এক প্রকার পোশাক পরি। বিয়ের পর ছোট্ট হওয়া সত্ত্বেও আমার মধ্যে লজ্জা এসে যায়। উল্লেখ্য যে, ‘হাওফা’ হলো চামড়ার তৈরি পায়জামার মত এক ধরণের পোশাক, যা শিশুদের মাঝদেহ বরাবর পরা থাকে। ‘আয়িশারকে (রা) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কত দেন মাহর দান করেছিলেন, সে বিষয়ে মত পার্থক্য আছে। ইবন সা‘দের বর্ণনাসমূহের মাধ্যমে জানা যায়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাহর হিসেবে ‘আয়িশাকে (রা) একটি ঘর দান করেন যার মূল্য ছির পঞ্চাশ দিরহাম।৩০ ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন চারশো’ দিরহামের কথা। ইবন সা‘দের অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, যা খোদ ‘আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ মাহর ছিল বারো উকিয়া ও এক নশ-যা পাঁচশো দিরহামের সমান।৩১ সহীহ মুসলিমে আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীগণের মাহর সাধারণত পাঁচশো দিরহাম হতো।৩২ মুসনাদে আহমাদে ‘আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁর মাহর ছিল পাঁচশো।

‘আয়িশাকে (রা) বিয়ে করার পূর্বেই রাসূরে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। একদিন স্বপ্নে দেখেন যে, এক ব্যক্তি কোন একটি জিনিস এক টুকরো রেশমে জড়িয়ে তাঁকে দেখিয়ে বলরেন, এটি আপনার। তিনি খুলে দেখেন তার মধ্যে ‘আয়িশা (রা)।৩৩

‘আয়িশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তিন রাত আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম। একজন ফিরিশতা রেশমের একটি খন্ডে কিচু একটা মুড়ে এনে বললো, এ আপনার স্ত্রী। মাথার দিক থেকে আমি খুলে দেখলাম, তার মধ্যে তুমি। আমি বললাম, এ যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে তাহলে হোক।৩৪

ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ জিবরীল (আ) তাঁর একটি প্রতিকৃতি সবুজ রেশমের একটি টুকরোয় জড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট নিয়ে এসে বলেনঃ ইনি হবেন দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার স্ত্রী।৩৫

‘আয়িশার (রা) বিয়ের সঠিক সময়কাল নিয়ে একটু মতভেদ আছে। আল্লামা বদরুদ্দীন ‘আয়নী সহীহ আল-বুখারীর ভাষ্যে রিখেছেনঃ ‘আয়িশার (রা) বিয়ে হিজরাতের দুই বছর পূর্বে, আবার বলা হয়ে থাকে তিন বছর পূর্বে এবং একথাও বলা হয়েছে যে, দেড় বছর পূর্বে হয়েছিল’৩৬ কিচু কিছু বর্ণনায় জানা যায়, খাদীজার (রা) ইনতিকারের তিন বছর পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশাকে (রা) বিয়ে করেন। কোন কোন সীরাত বিশেষজ্ঞ বলেন, যে বর খাদীজার (রা) মৃত্যু হয় সেই বছর ‘আয়িশার (রা) বিয়ে হয়।৩৭

সুলায়মান নাদবী বলেনঃ খাদীজার (রা) ওফাতের তারিখ দ্বারা ‘আয়িশার (রা) বিয়ের সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু খাদীজার (রা) ওফাতের তারিখও সর্বসম্মত নয়। সেখানেও মতভেদ আছে। এ ক্ষেত্রে খোদ ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারতো। কিন্তু বুখারী ও মুসনাদে তাঁর থেকেও ভিন্ন দুইটি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় এসেছে খাদীজার (রা) ওফাতের তিন বছর পর তাঁর বিয়ে হয়।৩৮ অপর বর্ণনাটিতে খাদীজার (রা) ওফাতের বছরে বিয়ের কথা এসেছে।৩৯

অধিকাংশ গবেষকের সিদ্ধান্ত এবং নির্বরযোগ্য বর্ণনাসমূহের গরিষ্ঠ অংশ যা সমর্থন করে তা হলো, খাদীজা (রা) নুবুওয়াতের দশম বছরে হিজরাতের তিন বছর পূর্বে রমযান মাসে ইনতিকাল করেন এবঙ তার এক মাস পরে শাওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশাকে (রা) বিয়ে করেন। তখন ‘আয়িশার (রা) বয়স ছয় বছর। এই হিসাবে হিজরাত পূর্ব তিন সনের শাওয়াল, মুতাবিক ৬২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ‘আয়িমার (রা) বিয়ে হয়। আল-ইসতী‘য়ার গ্রন্থাগার ইবন ‘আবিদল বার এই মত সমর্থন করেছেন। মূলত বিয়ে হয়েছিল খাদীজার (রা) ওফাতের বছরেই এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় তিন বছর পরে যখন নয় বছর বয়সে তাঁকে ঘরে তুলে নেন। ‘আয়িশার (রা) একটি বর্ণনা যা ইবন সা’দ নকল করেছেন, তাতে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।৪০

বিয়ের পর ‘আয়িশা (রা) প্রায় তিন বছর পিতৃগৃহে অবস্থান করেন। দুই বছর তিন মাস মক্কায় এবং সাত/আট মাস হিজরাতের পর মদীনায়।

মক্কায় পৌত্তলিকদের যুলুম-নির্যাতনের মাত্রা যখন সহ্যের সীমা ছেড়ে গেল, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন মদীনায় হিজরাতের সিদ্ধান্ত নিলেন। ‘আয়িশা (রা) বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আবু বকরের গৃহে আসতেন। একদিন অভ্যাসের বিপরীতে চাদর দিয়ে মাথা-মুখ ঢেকে দপরের সময় উপস্থিত হন। আবু বকরের (রা) কাছে তখন তাঁর দুই মেয়ে ‘আয়িশা ও আসমা বসা। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আবু বকর! আপনার কাছে বসা লোকগুলিকে একটু সরিয়ে দিন, আমি কথা বলতে চাই। আবু বকর বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখানে অন্য কেউ নেই। আপনারই ঘরের লোক। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসলেন এবং হিজরাতের সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করেন। ‘আয়িশা ও আসমা দুই বোন মিলে সফলের জিনিসপত্র গোছগাছ করেন। তারপর দুইজন মদীনার পথ ধরেন। তাঁরা তাঁদের পরিবার-পরিজনকে মক্কায় শক্রদের মধ্যে ছেড়ে যান।৪১

মদীনায় একটু স্থির হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা থেকে পরিবার-পরিজনকে মদীনায় নেওয়ার জন্য যায়িদ ইবন হারিসা (রা) ও আবু রাফেহকে (রা) মক্কায় পাঠাদন। তাঁদেরকে দুইটি উট ও পাঁচশো দিরহাম দেন-যা আবু বরক (রা) রাসূরকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রয়োজন পূরণর জন্য দিয়েছিলেন। আবু বকরও (রা) তাঁদের সাথে আবদুল্লাহকে বলে পাঠান যে, সে যেন ‘আয়িশা, আসমা এবং তাঁদের মা উম্মু রূমানকে নিয়ে মদীনায় চলে আসে।

এই সকল লোক যখন মক্কা থেকে যাত্রা করেন তখন তালহা ইবন ‘আবদিল্লাহ হিজরাতের উদ্দেশ্যে তাঁদের সহযাত্রী হন। আবু রাফে’ ও যায়িদ ইবন হারিসার সঙ্গে ফাতিমা, উম্ম কুলসুম, সাওদা বিনত যাম‘আ উম্ম আয়মান ও উসামা ইবন যায়িদ এবং ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী বকরের (রা) সঙ্গে উম্ম রূমান, ‘আবদুল্লাহর দুই বোন-‘আয়িশা ও আসমা ছিলেন।৪২

এই কাফেলা মক্কা থেকে যাত্রা করেন যখন হিজাযের বনু কিনানার আবাসস্থল আল-বায়দ’ পৌঁছে তখন ‘আয়িশা (রা) ও তাঁর মা উম্মু রূমান (রা) যে উটের আরোহী ছিলেন সেই উটটি তাঁদের নিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে পালালো। প্রতি মুহূর্তে তাঁরা আশংকা করতে তাকেন, এই বুঝি হাওদাসহ ছিটকে পড়ছেন। মেয়েদের যেমন স্বভাব, মার নিজের জানের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, কলিজার টুকরা ‘আয়িশার (রা) জন্য অস্থির হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেন। অনেক দূর যাওয়ার পর উটটি ধরে বশে আনা হয়। সবাই নিরাপদে ছিলেন এবং নিরাপদেই মদীনায় পৌঁছেন। হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন মসজিদে নববী ও তার আশে-পাশে ঘর-বাড়ী নির্মাণ করছিলেন। তারই একটি ঘরে সাওদা (রা) এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্যাদের থাকার ব্যবস্থা হয়।৪৩

‘আয়িশা (রা) আপনজনদের সাথে মদীনার বনু হারেস ইবন খাযরাজের মহল্লায় অবতরণ করেন এবং সাত-আট মাস সেখানে মায়ের সাথে বসবাস করেন। মক্কা থেকে মদীনায় আগত অধিকাংশ মুহাজিরে নিকট মদীনার আবহাওয়া অনুকূলে ছিল না। বহু নারী-পুরুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আবু বকর (রা) ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন। অল্প বয়সী মেয়ে ‘আয়িশা (রা) পিতার সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এসে পিতার অবস্থা জানালে তিনি আবু বকরের (রা) জন্য দু‘আ করেন। আবু বকর (রা) সুস্থ হয়ে ওঠেন।

পিতাকে সুস্থ করে তোলার পর ‘আয়িশা (রা) নিজেই শয্যা নিলেন। এবার পিতা মেয়ের যেবায় মনোযোগী হলেন। আবু বকর (রা) অসুস্থ মেয়ের শয্যার কাছে যেতেন এবং অত্যন্ত দরদের সাথে তাঁর মুখে মুখ ঘঁষতেন। অসুস্থতা এত মারাত্মক ছিল যে, ‘আয়িমার (রা) মাথার প্রায় সব চুল পড়ে যায়।৪৪

বিপদ-আপন থেকে মুক্ত হওয়ার পর আবু বকর (রা), মতান্তরে উম্মু রূমান (রা) একদিন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার স্ত্রীকে ঘরে তুলে নিচ্ছেন না কেন? বললেনঃ এমন আমার হাতে মাহর আদায় করার মত অর্থ নেই। আবু বরক (রা) বললেনঃ আমার অর্থ গ্রহণ করুন। আমি ধার দিচ্ছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বারো উকিয়া ও এক নশ (= পাঁচশো দিরহাম) আবু বকরের (রা) নিকট থেকে ধার নিয়ে ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠিয়ে দেন।

মদীনা ছিল যেন ‘আয়িশার শ্বশুর বাড়ী। আনসারী মহিলারা নববধূকে বরণকরে নেওয়ার জন্য আবু বকরের (রা) গৃহে আসলেন। ‘আয়িশা (রা) তখন বাড়ীর আঙ্গিনায় খেজুর গাছে রতলায় অন্য মেয়েদের সাথে খেলছেন। মা উম্মু রমান (রা) তাকে ডাক দিলেন। মায়ের ডাক কানে যেতেই হাঁফাতে হাঁফাকে ছুটে আসেন। তারপর সেই কক্ষে নয়য়ে যান যেখানে অতিথি মহিলারা তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিলেন। বনবধূ কক্ষে প্রবশে করতেই মহিলারা বলে উঠলেনঃ তোমার আগম শুভ ও কল্যাণময় হোক। তাঁরা নববধুকে সাজালেন। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপস্থিত হলেন।৪৫

এক পেয়ারা দুধ ছাড়া সেই সময় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামেনে আর কিছুই উপস্থাপন করা হয়নি। আসমা বিনত ইয়াযীদ ছিলেন ‘আয়িশার (রা) একজন খেরার সাথী। তিনি বলেছেন, আমি ছিলাম ‘আয়িশার বান্ধবী। আমি তাকে সাজিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট উপস্থাপন করেছিলাম। আমার সাথে অন্যরাও ছিল। আমরা এক পেয়ারা দুধ ছাড়া সেই সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে দেওয়ার মত আর কিছুই পাইনি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পেয়ারা থেকে সামান্য একটু দুধ মুখে দিয়ে ‘আয়িশার দিকে এগিয়ে দেন। ‘আয়িমা নিতে লজ্জা পাচ্ছে দেখে আমি তাকে বললামঃ ‘রাসূলুল্লাহর দান ফিরেয়ে দাও না।’ তখন সে অত্যন্ত লাজুক অবস্থায় গ্রহণ করে এবং সামান্য পান করে রেখে দিতে যায়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেনঃ তোমার সাথীদের দাও। আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ সময় আমাদের পান করার ইচ্ছা নেই। তিনি বললেনঃ মিথ্যা বলবে না। মানুষের প্রতিটি মিথ্যা লেখা হয়। অপর একটি বর্ণনায় এসেছেঃ ক্ষুধা ও মিথ্যা একত্র করো না। মিথ্যা লেখা হয়। এমন কি ছোট ছোট মিথ্যাও।৪৬

সহীহ বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে একথা জানা যায় যে, ‘আয়িশার (রা) স্বামীগৃহে গমন হয় প্রথম হিজরীর শাওয়ার মাসে। ‘আল্লামা ‘আয়নী লিখেছেন, হিজরী দ্বিতীয় সনে বদর যুদ্ধের পর তিনি স্বামীগৃহে যান।৪৭ এ ধরনে একটি কথা ‘আয়িশা (রা) থেকেও বর্ণিত আমাকে হিজরাতের তিন বছর পূর্বে বিয়ে করেন এবঙ হিজরাতের আঠারো মসের মাথায় শাওয়াল মাসে আমার সাথে বাসর করেন। বিয়ের সময় আমি ছয় বছরের এবং বাসরের সময় নয় বছরের এক মেয়ে।৪৮ কিন্তু এ বর্ণনা সঠিক হতে পারে না। কারণ, এই বর্ণনার ভিত্তিতে ‘আয়িশার (রা) তখন বয়স হবে দশ বছর। অতচ হাদীস ও ইতিহাসের সকল গ্রন্থ এ ব্যাপারে একমত যে, সেই সময় তাঁর বয়স ছিল নয় বছর।৪৯

‘আয়িশার (রা) বিয়ে ও স্বামীগৃহে গমন উভয় কাজই সম্পন্ন হয় শাওয়াল মাসে। এ কারততিনি আজীবন এ ধরনের অনুষ্ঠান শাওয়াল মাসে করতে পছন্দ করতেন। তিনি বলতেনঃ আমার বিয়ে ও স্বামীগৃহে গমন-দুটোই হয় শাওয়ালে। আর এ কারণে স্বামীর নিকট আমর চেয়ে অধিক ভাগ্যবতী আর কে ছিল।৫০

রাসূল কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে নববীর পাশে নির্মিত ছোট্ট একটি ঘরে ‘আয়িশাকে (রা) এনে উঠান। আজ যেখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুয়ে আছেন সেটাই ‘আয়িশার (রা) ঘর। পরবর্তীকালে ‘আয়িশা (রা) বলতেনঃ এখন আমি যে ঘরে আছি, আমার এই ঘরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে প্রথম এনে উঠান। তিনি এখানেই ওফাত পেয়েছেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরের দরজা সোজাসুজি মসজিদের একটি দরজা বানিয়ে নেন।৫১ পূর্বের বর্ণনাসমূহ থেকে প্রত্যেকেই বুঝতে পারে, ‘আয়িশার (রা) বিয়ে, স্বামীগৃহে গমন, তথা প্রতিটি অনুষ্ঠান কত আড়ম্বরহীন ও সাদামাটা ছিল। তাতে অতিরঞ্জিত প্রদর্শনী বা বাহুল্য ভাবের কিছু ছিল না।

‘আয়িশার (রা) বিয়ের মাধ্যমে তৎকালীন আরবের বহু কূসংস্কার ও কুপ্রথামর বিলোপ ঘটে। তারা সকল প্রকার ভাই, এমনকি মুখে বরা ভাইয়ের মেয়েকেও বিয়ে করা বৈধ মনে করতো না। এ কারণে খাওলার (রা) প্রস্তাব শুনে আবু বকর (রা) বলে ওঠেনঃ এটা কি বৈধ? ‘আয়িশা তো রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাতিজী। একথা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কানে গেলে তিনি ভাতিজী। একথা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কানে গেলে তিনি বললেনঃ আবু বকর আমার ইসলামী ভাই। তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে বৈধ।

আর একটি কুপ্রথা হলো, শাওয়াল মাসে তারা বিয়ে-শাদী করতোনা। অতীতে কোন এক শাওয়াল মাসে আরবে প্লেগ দেখা দেয়। এ কারণে তারা এ মাসটিকে অশুভ বলে বিশ্বাস করতো এবং এ মাসে তারা কোন বিয়ের অনুষ্ঠান করতো না।৫২

তৎকালীন আরবের কিছু লোকের এ বিশ্বাসও ছিল যে, এ মাসে নববধূকে ঘরে আনলে তাদের সম্পর্ক টেনে না। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এমন বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে ‘আয়িশার (রা) এ বিয়ে কুঠারাঘাত করে। নববধূকে ঘরে আনার অনুষ্ঠানটি হয় দিনের বেলায়। এটাও ছিল প্রচলিত প্রতার বিপরীত।৫৩

আরেকটি প্রথা, ছিল দুলহানের আগে আগে তারা আগুন জ্বালাতো। নব দস্পতির প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হতো কোন মঞ্চে অথবা অভ্যন্তরে। এই সকল কুপ্রথার মূলোৎপাটন ঘটে এই বিয়ের মাধ্যমে।

শিক্ষা-দীক্ষা

প্রাচীন আরবে যেখানে পুরুষদেরই লেখা-পড়ার কোন প্রচলন ছিল না সেখানে মেয়েদের তো কোন প্রশ্নই আসেনা। ইসলামের সূচনাকালে মক্কার গোটা কুরাইশ খান্দানে মাত্র ১৭ (সতেরো) ব্যক্তি লিখতে-পড়তে জানতো। তাদের মধ্যে একজন মাত্র মহিলা ছিলেন-শিফা বিনত ‘আবদিল্লাহ।৫৪ ইসলাম পড়া-লেখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় খুব দ্রুত এর প্রসার ঘটে।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীগণের মধ্যে হাফসা (রা) ও উম্মু সালামা (রা) কিছু লেখাপড়া জানতেন। হযরত হাফসা (রা) খোদ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশে শিফা বিনত ‘আবদিল্লাহর (রা) নিকট লিখতে ও পড়তে শেখেন।৫৫ সে সময় আরো কিছু মহিলা সাহাবী লেখাপড়া শেখেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একাধিক স্ত্রী গ্রহণ, বিশেষত ‘আয়িশাকে (রা) অপরিণত বয়সে গ্রহণের মধ্যে বহুবিধ কল্যাণ নিহিত ছিল। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহচর্যের বরকত যদিও অগণিত পুরুষকে সৌভাগ্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিচ্ছিল, তথাপি স্বাভাবিক কারণে সাধারণ মহিলারা এ সৌভাগ্য লাভে সক্ষম ছিল না। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীদের মাধ্যমেই তার সাহচর্যের ফয়েজ ও বরকতের রহস্য গোটা বিশ্বের নারী জাতির মধ্যে প্রচালিত ও প্রসারিত হওয়া সম্ভব ছিল।

একমাত্র ‘আয়িশা সিদ্দীকা (রা) ছাড়া অন্য সকল আযওয়াজে মুতাহ্হারাত বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হন। এদিক দিয়ে একমাত্র ‘আয়িশা (রা) শুধুমাত্র নুবুওয়াতের ফয়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হন। শৈশব ও কৈশ্যের বয়স হলো মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের প্রকৃত নময়। সৌভাগ্য বশত এ বয়সের পুরোটা সময় তাঁর নবীর প্রশিক্ষণ লাভ করেন যাতে বিশ্বের মানব জাতির অর্ধেক অংশের জন্য আলোর বার্তিকা হয়ে যান।

গোটা কুরাইশ খান্দানের মধ্যে কুষ্ঠি বিদ্যা ও কাব্যশাস্ত্রে আবু বকর (রা) ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও জ্ঞানি ব্যক্তি। ‘আয়িশা (রা) এমন পিতার তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হন। ফলে বংশগতভাবে তাঁর মধ্যে এ দুইটি শাস্ত্রের প্রীতি ও পারদর্শিতা সৃষ্টি হয়।

হযরত আবু বকর (রা) নিজের সন্তানদের সুশিক্ষা ও আদব-আখলাকে শিক্ষাদেরন প্রতি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। ক্ষেত্র বিশেসে কঠোরতাও করতেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রনথাবলীতে তার প্রমাণও পাওয়া যায়। একবার ছেলে ‘আবদুর রহমানকে মারতে উদ্যত হন শুধু এই কারণে যে, মেহমানদের খাবার দিতে দেরী করেছিলেন। বিয়ের পরেও ‘আয়িশা (রা) নিজের কোন ভুল-ক্রটির জন্য পিতাকে দারুণ বয় করতেন।৫৬ অনেক ক্ষেত্রে পিতা তাঁকে ভীষণ বকাঝকা করতেন। মাঝে মধ্যে গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করতেন না।৫৭ একবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বাঁচিয়ে নেন।৫৮ আর একবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপস্থিতিতে ‘আয়িশার (রা) পাঁজরে জোরে থাপপড় মারেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন বলে ওঠেনঃ আবু বকর! আল্লাহ আপনাকে মাফ করুন! আমরা এমনটি চাইনি।৫৯ হযরত ‘আয়িশার (রা) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের প্রকৃত সূচনা হয় স্বামীর ঘরে যাওয়ার পর। এ সময়ে তিনি পড়তে শেখেন। তিনি দেখে দেখে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি লিখতে জানতেন না।৬০ হাদীসে এসেছে, তাঁর জন্য কুরআন লেখালেখির কাজ করতেন তাঁর দাস জাকওয়ান।৬১ তবে কিছু বর্ণনায় এসেছে-‘অমুক চিঠির জবাবে তিনি একথা লেখেন।’ সম্ভবত বর্ণনাকারীরা ‘লিখিয়েছেন’ কথাটির স্থলে ‘লেখেন’ বলে দিয়েছেন। সাধারণ তএমনই হয়ে থাকে। যাহোক, লেখা ও পড়া মানুষের জ্ঞানের বাহ্যিক মাপকাঠি। প্রকৃত জ্ঞানের মাপকাঠি তার থেকে অনেক উঁচু স্তরে। মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার পূর্ণতা ও পবিত্রতা অর্জন, দীনের আবশ্যকীয় বিষয় ও শরীয়াতের গূঢ় রহস্য জানা এবং আল্লাহর কালাম ও আহকামে নববীর জ্ঞান লাভই হচ্ছে সর্বোত্তম শিক্ষা। হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন এই সকল জ্ঞানের ভান্ডার তাছাড়া ইতিহাস, সাহিত্য ও চিকিৎসা বিদ্যায় ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান। ইতিহাস ও সাহিত্যের জ্ঞান অর্জন করেন পিতার নিকট থেকে।৬২ চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল ও স্থান থেকে যে সকল লোকজন ও প্রতিনিধিরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরবারে আসতো তাদের নিকট থেকে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলিতে অধিকাংশ সময় অসুস্থ থাকতেন। আরবের চিকিৎসকরা যেখানে যে ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ দিতেন, ‘আয়িশা (রা) স্মৃতিতে তা ধরে রাখতেন।

একদিন ‘উরওয়া ‘আয়িশাকে (রা) বললেনঃ আমি আপনার ফিকহ, কাব্য ও প্রাচীন আরবের ইহিহাসের জ্ঞান দেখে বিস্মিত হইন। কারণ এ জ্ঞান অর্জন আপনার জন্য সম্ভব। কিন্তু আপানর ‘তিবব’ বা চিকিৎসা বিদ্যার জ্ঞান দেখে বিস্মিত না হয়ে পারিনা। এ জ্ঞান আপনি কিভাবে ও কোথা থেকে অর্জন করেন? ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ ‘উরওয়া! রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর শেষ জীবনে অসুস্থ থাকতেন। আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে তেকে তাঁর কাছে লোক আসতো। তারা নানা রকম ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ দিত। আর আমি সেইভাবে চিকিৎসা করতাম। সেখান থেকেই এই জ্ঞান অর্জন করেছি। অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘উরওয়া প্রশ্ন করেনঃ এই তিবেবর জ্ঞান আপনি কোথা থেকে অর্জন করেছেন? আয়িশা (রা) জবাব দেনঃ আমি অথবা অন্য কোন লোক অসুস্থ হলে যে ওষুধ ও ব্যবসথাপত্র দেওয়া হয়, সেখান থেকে শিখেছি। তাছাড়া একজন আরেকজনকে যেসব রোগ ও ওষুধের কথা বলে আমি তাও মনে রাখি।৬৩

দীনী জ্ঞান অর্জনের তো কোন নির্দিষ্ট সময় ছিল না।শরী‘য়াতের মহান শিক্ষক ঘরেই ছিলেন। রাত-দিন তাঁর সাহচর্য লাভে ধন্য হতেন। প্রতিদিন মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা‘লীম ও ইরশাদের মসজিলস বসতো। মসজিদের গাঁ ঘেঁষেই ছির হযরত ‘আয়িশার (রা) হুজরা। এ কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাইরে লোকদের যে শিক্ষা দিতেন, ‘আয়িশা (রা) ঘরে বসেই তাতে শরিক থাকতেন। কখনো কোন কথা দূরত্ব বা অন্য কোন কারণে বুঝতে না পারলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে এলে জিজ্ঞেস করে বুঝে নিতেন।৬৪ কখনো কখনো তিনি মসজিলসের কাছাকাছি চলে যেতেন।৬৫ তাছাড়া রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহিলাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সপ্তাহে একটি দিন তাদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট করে নেন।৬৬

দিবা-রাত্র ইলম ও হিকমাত বা জ্ঞান-বিজ্ঞারে অসংখ্য বিষয়ের আলোচনা তাঁর কানে আসতো। তাঁর নিজেরও অভ্যাস ছিল, প্রতিটি বিষয় দ্বিধাহীন চিত্তে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে উপস্থাপন করা। তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তিনি শান্ত হতেন না। একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ

আরবী হবে

কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেওয়া হবে, সে শাস্তি ভোগ করবে।

‘আয়িশা (রা) বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ তো বলেছেন-

আরবী হবে

অর্থাৎ তার থেকে সহজ হিসাব নেওয়া হবে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ হলো আমলের উপস্থাপন। কিন্তু যার আমলের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে তার ধ্বংস অনিবার্য।৬৭

একবার ওয়াজ-নসীহতের সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ কিয়ামতের দিন সকল মানুষ নগ্ন অবস্থায় উঠবে। ‘আয়িশার (রা) মনে খটকা লাগলো। তিনি বলে উঠলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! নারী-পুরুষ এক সঙ্গে উঠবে। তাহলে একে অন্যের প্রতি কি দৃষ্টি পড়বে না? রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ সময়টা হবে অতি ভয়ংকর। অর্থাৎ একজনের অন্যজনের ব্যাপারে কোন খবরই থাকবে না।৬৮

একদিন ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, কাফির-মুশরিকরা যে ভালো কাজ করে তার সাওয়াব তারা পাবে কিনা? ‘আবদুল্লাহ ইবন জাদ‘আন নামে মক্কায় একজন সৎ স্বভাব ও কোমল অন্তরের মুশরিক ছিল। সে ইসলাম-পূর্ব যুগে কুরাইশদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-ফাসাদ মীমাংসার উদ্দেশ্যে কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে একটি বৈঠকে সমবেত করে। তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন। ‘আয়িশা (রা) প্রশ্ন করেনঃ ‘‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবন জাদ‘আন জাহিলী যুদে মানুষের সাথে সদয় ব্যবহার করতো। দরিদ্র ও অনাহারক্লিষ্টদেরকে আহার করাতো। তার এ কাজ কি উপকারে আসবে না?’’ তিনি জবাব দিলেনঃ না, ‘আয়িশা। সে কোনদিন একথা বলেনি যে, হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন তুমি আমাকে ক্ষা করে দিও।

জিহাদ ইসলামের একটি অন্যতম ফরয। ‘আয়িশাল ((রা) ধারণা ছিল, অন্য ফরযের ক্ষেত্রে যেমন নারী-পুরুষের কোন প্রভেদ নেই, মেতনি এ ক্ষেত্রেও তাই হবে। একদিন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশ্ন করেই বসলেন। উত্তর পেলেনঃ হজ্জ হলো নারীদের জিহাদ।৫৯

আর একদিন প্রশ্ন করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! জিাহদ হচ্ছে সর্বোত্তম আমল। আমরা নারীরা কি জিহাদ করবো না? বললেনঃ না। তবে সর্বোত্তম জিহাদ হচ্ছে হজ্জে মাবরূর।৭০

বিয়েতে বর-কনে উভয়ের সম্মতি থাকা শর্ত। কুমারী মেয়েরা অকে ক্ষেত্রে লজ্জায় মুখে সম্মতি প্রকাশ করে না। এ কারণে ‘আয়িশা (রা) একদিন প্রশ্ন করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! বিয়েতে তো মেয়ের সম্মতি প্রয়োজন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ, প্রয়োজন। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ মেয়েরা তো লজ্জায় চুপ থাকে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তার চুপ থাকাই সম্মতি।৭১

একদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাজাজ্জুদ নামায আদায়ের পর বিতর না পড়েই বিশ্রামের জন্য একটু শোয়ার ইচ্ছা করলেন। ‘আয়িশা (রা) বলে উঠলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি বিতর না পড়েই শুয়ে যাচ্ছেন? রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমার চোখ তো ঘুমায়, কিন্তু অন্তর ঘুমায়না।৭২ বাহ্যত ‘আয়িশার (রা) এ ধরনের প্রশ্ন বেয়াদবী বলে মেন হয়। কিন্তু তিনি সাহসিকতা না দেখালে উম্মাতে মুহাম্মাদী নুবুওয়াতের গূঢ় রহস্য থেকে অজ্ঞ থেকে যেত।

ইসলামে প্রতিবেশীর বহু অধিকারের কথা এসেছে। আর এই অধিকারনের সুযোগ আসে বেশীর ভাগ মেয়েদেরই। কিন্তু প্রতিবেশী একাধিক হলে কাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে? তাই ‘আয়িশা (রা) একদিন প্রশ্ন করলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জবাব দিলেনঃ যে প্রতিবেশীর দরজা তোমার ঘরের অধিক নিকটবর্তী, তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।৭৩ একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে না, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন না। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে কেউ তো মৃত্যুকে পছন্দ করে না।? রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমার কথার এই অর্থ নয়। অর্থ হলো, মুমিন ব্যক্তি যখন আল্লাহর রহমত, রিজামন্দী এবং জান্নাতের অবস্থার কথা শোনে তখন তার অন্তর আল্লাহর জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। আল্লাহও তার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকেন। আর কাফির ব্যক্তি যখন আল্লাহর আজাব ও অসন্তুটির কথা শোনে তখন সে আল্লাহর সামনে যেতে অপছন্দ করে। আল্লাহও তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন।৭৪

একবার এক ব্যক্তি যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাক্ষাৎ করতে এলো, তিনি অনুমতি দিয়ে বললেনঃ ‘তাকে আসতে দাও। সে তার গোত্রের খুব খারাপ লোক।’ লোকটি এসে বসলো। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত ধৈয্য, মনযোগ ও আন্তরিকতা সহকারে তার সাথে কথা বললেন। আয়িশা (রা) খুব অবাক হলেন। লোকটি চলে গেলে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তো লোকটিকে ভালো জানতেন না। কিন্তু সে যখন এলো, তার সাথে এমন আন্তরিকতা ও নম্রভাবে কথা বললেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘আয়িশা! সবচেয়ে খারাপ মানুষ ঐ ব্যক্তি যার ভয়ে মানুষ তার সাথে মেলামেশা ছেড়ে দেয়।

একবার এক ব্যক্তি এসে কিছু সাহায্য চাইলো। হযরত ‘আয়িশার (রা) ইঙ্গিতে দাসী কিছু জিনিস দিতে চললেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘আয়িশা! গুনে গুনে দিবে না। তাহলে আল্লাহও তোমাকে গুনে গুনে দিবেন।৭৫ আর একটি টুকরাও যদি হয়, ভিক্ষুককে তাই দিয়ে জাহান্নাম থেকে বাঁচ। সেটি একজন ক্ষুধার্ত মানুষ খেলে তো কিচু হবে এবং তার পেট ভরবে। এর থেকে আর ভারো কি হতে পারে।

আর একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ! আমাকে দরিদ্র অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখ, দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং কিয়ামতের দিন দরিদ্রদের সাথেই উঠাও। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ কেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ সম্পদহীনরা সম্পদশালীদের চেয়ে চল্লিশ বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে। ‘আয়িশা, কোন ভিক্ষুককে কিচু না দিয়ে ফিরিয়ে দিবে না। তা সে খোরমার একটি টুকরাই হোক না কেন। দরিদ্রদের ভালোবাসবে এবং তাদেরকে নিজের পাশে বসাবে।৭৬

হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাসমূহ হযরত ‘আয়িশা (রা) এ জাতীয় অসংখ্য জিজ্ঞাসা ও তার জবাব বর্ণিত হয়েছে। মূলতঃ এগুলিই ছিল তাঁর নিত্যদিনের পাঠ। বিভিন্ন নৈতিক উপদেশ ছাড়ও নামায, হজ্জ, যাকাত, তথা দীন ও দুনিয়ার অসংখ্য কথা রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত ‘আয়িশাকে (রা) অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে শেখাতেন। ‘আয়িশাও (রা) অতি আগ্রহ সহকারে শিখতেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তা আমল করতেন।

হযরত ‘আয়িমার (রা) মধ্যে জানার আগ্রহ ছিল অতি তীব্র। যে সখল মুহূর্তে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসন্তুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো তখনও তিনি জিজ্ঞসা করা থেকে বিরত থাকতেন না। মূলতঃ তিনি স্বামী হযরত রাসূলে পাকের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। তাই তাঁর কাএেত খোলামেলা ও দুঃসাহসী হতে পারতে। একবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কারণের স্ত্রীদের উপর বিরক্ত হয়ে অঙ্গীকার করেন যে, আগামী একমাস কোন স্ত্রীর কাছেই যাবেন না। ঊনত্রিশ দিন এই অঙ্গীকারের উপর অটল থাকেন। ঘটনাক্রমে সেই চন্দ্র মাসটি ছিল ঊনত্রিশ দিনের। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরের মাসের প্রথম তারিখ অর্থাৎ ৩০তম দিনে ‘আয়িশার (রা) নিকট যান। আপতঃদৃষ্টিতে ‘আয়িশা (রা) উল্লাসিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, তিনি প্রশ্ন করেছেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বলেছেন, একমাস আমাদের কাছে আসবেন না। একদিন আগে কিভাবে আসলেন? রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘আয়িশা! মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়।

সংসার জীবনঃ হযরত ‘আয়িশা (রা) পিতৃগৃহ থেকে বউ হয়ে যে ঘরে এসে ওঠেন তা কোন আলিশান অট্টালিকা ছিল না। মদীনার বনু নাজ্জার মহল্লার মসজিদে নববীর চারপাশে ছোট্ট ছোট্ট কিছু কাঁচা ঘর ছিল, তারই একটিতে তিনি এসে ওঠেন। ঘরটি ছিল সমজিদের পূর্ব দিকে। তার একটি দরজা ছিল পশ্চিম দিকে মসজিদের ভিতরে। ফলে মসজিদ ঘরের আঙ্গিনায় পরিণত হয়। হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতেন। তিনি যখন মসজিদে ই‘তিকাফ করতেন, মাথাটি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন, আর আয়িশা (রা) চুলে চিরুনী করে দিতেন।৭৭ কখনো মসজিদে বসেই ঘরের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে কোন কিছু ‘আয়িশার (রা) নিকট থেকে চেয়ে নিতেন।৭৮

ঘরটির প্রশস্ততা ছির ছয় হাতেরও বেশি। দেয়াল ছিল মাটির। খেজুর পাতা ও ডালের ছাদ ছিল। তার উপরে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য কম্বল দেওয়া যেত। এতটুকু উঁচু ছিল যে, একজন মানুষ দাঁড়ালে তার হাতে ছাদের নাগাল পাওয়া যেত। এক পাল্লার একটি দরজা ছিল, কিন্তু তা খনো বন্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি।৭৯ পর্দার জন্য দরজায় একটি কম্বল ঝুলানো থাকতো। এই ঘরের লাগোয়া আর একটি ঘর ছিল-যাকে ‘মাশরাবা’ বলা হতো। একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকা কালে এক মাস এখানেই কাটান।

ঘরে আসবাবপত্রের মধ্যে ছিল-একটি খাট, একটি চাটাই, একটি বিছানা, একটি বালিশ, খোরমা-খেজুর রাখার দুইটি মটকা, পানির একটি পাত্র এবং পান করার একটি পেয়ালা। এর বেশি কিছু নয়। বিভিন্ন হাদীসে একাধিক স্থানে এইসব জিনিসের নাম বাসিন্দাদের রাতের বেলা একটি বাতি জ্বালানোর সামর্থ ছিল না। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ একাধারে প্রায় চল্লিশ রাত চলে যেত ঘরে বাতি জ্বলতো না।

ঘরে সর্বসাকুল্যে দুইটি মানুষ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ‘আয়িশা (রা)। কিচুদিন পর ‘বুরায়রা’ (রা) নাম্নী একজন দাসী যুক্ত হন।৮০ যতদিন ‘আয়িশা ও সাওদা মাত্র দুই স্ত্রীই ছিলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন পর পর আয়িশার (রা) ঘরে রাত কাটাতেন। পরে আরো কয়েকজনকে স্ত্রীর মর্যাদা দান করলে এবং হযরত সাওদা (রা) স্বেচ্ছায় স্বীয় বারির দিনটি আয়িশাকে (রা) দান করলে প্রতি নয় দিনে দুই দিন ‘আয়িশার (রা) ঘরে কাটাতেন।৮১

ঘর-গৃহস্থালীর গোছগাছ ও পরিপাটির বিশেষ কোন প্রয়োজন পড়তো না। খাদ্য খাবার তৈরি ও রান্নাবান্নার সুযোগ খুব কমই আসতো। হযরত ‘আয়িশা (রা) নিজেই বলতেনঃ কখনো একাধারে তিন দিন এমন যায়নি যখন নবী পরিবারের লোকেরা পেট ভরে খেয়েছেন।৮২ তিনি আরো বলতেনঃ মাসের পর মাস ঘরে আগুন জ্বলতো না।৮৩ এ সময় খেজুর ও পানির উপরই কাটতো।৮৪ খায়বার বিজয়ের পর হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আযওয়াজে মুতাহহারাতের (পবিত্র সহধর্মিণীগণ) প্রত্যেকের জন্য বাৎসরিক ভাতা নির্ধারণ করে দেন।৮৫ আবদুর রহমান আল-আ‘রাজ মদীনায় তাঁর মজলিসে বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) জীবিকার জন্য খায়বারের ফসল থেকে আশি ওয়াসাক খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক যব মতান্তরে গম দিতেন।৮৬ কিন্তু তাঁর দানশীলতার কারণে এই পরিমাণ খাদ্য সারা বছরের জন্য কখনো যথেষ্ট ছিল না।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) সব সময় নবী-পরিবারে উপহার-উপঢৌকন পাঠাতেন। বিশেষ করে যেদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) ঘরে অবস্থান করতেন, লোকেরা ইচ্ছা করেই সেই দিন বেশি করে হাদিয়া-তোহফা পাঠাতেন।৮৭

অনেক সময় এমন হতো যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাইরে থেকে এসে জিজ্ঞেস করতেনঃ ‘আয়িশা! কিছু আছে কি? তিনি জবাব দিতেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিছুই নেই। তাপর সবাই মিলে রোযা রাখতেন।৮৮ অনেক সময় কোন কোন আনসার পরিবার দুধ পাঠাতো। তাই পান করেই পরিতৃপ্ত থাকতেন।৮৯ উম্মু সালামা (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময় আমাদের অধিকাংশ দিনের খাবার ছিল দুধ।৯০

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘর-গৃহস্থলীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছির হযরত বিলালের (রা) উপর। তিনি সারা বছরের খাদ্যশস্য বণ্টন করতেন। প্রয়োজন পড়লে ধার-কর্জ করতেন।৯১

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ওফাত পান তখন গোটা আরব ইসলামের ছায়াতলে এসে গেছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর অর্থ-সম্পদ এসে বাইতুলমালে জমা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেদিন ওফাত পান সেদিন হযরত ‘আয়িশার (রা) ঘরে একদিন চলার মতও খাবার ছিল না।

হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালেও হযরত ‘আয়িশা (রা) খায়বারে উৎপাদিত ফসল থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ শস্য পেতেন। খলীফা হযরত ‘উমার (রা) সবার জন্য গনদ ভাতার প্রচলন করেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীদের প্রত্যেকের জন্য বাৎসরিক দশহাজার দিরহাম নির্ধারণ করেন। কিন্তু ‘আয়িশার (রা) জন্য নির্ধারণ করন বারো হাজার। এর কারণ স্বরূপ তিনি বলতেনঃ ‘আয়িশা ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রিয়তমা স্ত্রী।৯২ একটি বর্ণনায় এসেছে, খলীফা ‘উমার (রা) তাঁর সময়ে খায়বারে উৎপন্ন ফসলের অংশ অথবা ভূমি গ্রহণের এখতিয়ার দান করেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) তখণ ভূমি গ্রহণ করেন।৯৩

অর্থ-সম্পদ যা কিছু তাঁর হাতে আসতো-গরীব-মিসকীনদের মধ্যে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। খলীফা হযরত উসমান (রা) থেকে নিয়ে আমীর মু‘য়ারিয়া (রা) পর্যন্ত উপরে উল্লেখিত ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ছিলেন হযরত আয়িশার (রা) ভাগ্নে-যিনি আমীর মু‘য়াবিয়ার (রা) পরে হিজাযের খলীফা হন। তিনি খালার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন। কিন্তু যেদিন বাইতুল মাল থেকে ভাতা না আসতো সেদিন তাঁর গৃহে অভূক্ত থাকার উপক্রম হতো।৯৪

স্বাভাগতভাবে হযরত ‘আয়িশার (রা) তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও বোধ থাকা সত্ত্বেও বয়স কম হওয়ার কারণে মাঝে মধ্যে ভুল-ত্রুটি হয়ে যেত। ঘরে গম পিষে আটা বানিয়ে ঘুমিয়ে যেতেন, ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলতো।৯৫ একদিন তিনি নিজ হাতে আটা পিষে রুটি তৈরি করেন। তারপর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসার প্রতীক্ষায় থাকেন। সময়টি ছিল রাতের বেলা। এক সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসলেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। ঘুমে হযরত ‘আয়িশার (রা) চোখ দুইটি বন্ধ হয়ে এলো। এই ফাঁকে প্রতিবেশীর একটি ছাগল ঘরে ঢুকে সবকিছু খেয়ে ফেললো। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স্কা স্ত্রীদের তুলনায় তিনি খাদ্য-খাবার ভালো পাকাতে পারতেন না।৯৬

দাম্পত্য জীবন

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ‘আয়িশার (রা) যুগল জীবন এবঙ তাঁদের মধ্যের মধুর সম্পর্কের একটি চিত্র আমাদের সামনে থাকা দরকার। ইসলাম নারীকে না অতি পবিত্র মনে করে দেবীর আসনে বসিয়েছে, আর না তাকে কেবল পুরুষের ভোগের বস্ত্ত বলে মনে করেছে। নারী সম্পর্কে প্রাচীন ও আধুনিক কালের পৃথিবীর মানুষের ধারণা মূলত এমনই। তাই কোনকালেই কোন সমাজে নারী সঠিক মর্যাদা লাভ করেনি। একমাত্র ইসলামই সঠিক মর্যাদা দিয়েছে। ইসলাম নারীর সর্বোত্তম যে পরিচিতি তুলে ধরেছে তা হচ্ছে, এই দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় বিশ্বের নারী হলো পুরুষের প্রশান্তি ও সান্ত্বনার উৎস। কুরআন ঘোষণা করেছেঃ

আরবী হবে

আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পার এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।

(সূরা আর রূম-২১)

আল্লাহ পাকের এই ঘোষণার বাস্তব চিত্র আমরা দেখতে পাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ‘আয়িশার (রা) দাম্পত্য জীবনের মধ্যে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন।৯৭

আরবী হবে

-তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম। আমি আমার স্ত্রীদের নিকট তোমাদের সকলের চেয়ে উত্তম।

তাঁদের নয় বছরে দাম্পত্য জীবনে ছিল গভীর ভালোবাসা, পারস্পরিক সহমর্মিতা, সীমাহীন আবেগ ও নিষ্ঠা। কঠিক দারিদ্র্য, অনাহার, তথা সকল প্রতিকূল পরিবেশেও তাঁদের এ মদুর সম্পর্কে একদিনের জন্যও কাটল দেখা যায়নি। কোন রকম তিক্তা ও মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়নি।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশাকে (রা) গভীরভাবে ভালোবাসতেন। একথা গোটা সাহাবী সমাজের জানা ছিল। এ কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেদিন ‘আয়িশারর (রা) ঘরে কাটাতেন সেদিন তাঁরা বেশি বেশি হাদিয়া তোহফা পাঠাতেন। এতে অন্য স্ত্রীরা ক্ষুব্ধ হতেন। তাঁরা চাইতেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেন লোকদের নির্দেশ দেন, তিযযেদিন যেখানে থাকেন লোকেরা যেন সেখানেই যা কিছু পাঠাবার, পাঠায়। কিন্তু সে কথা বলার হিম্মত কারো হতো না। এই জন্য তাঁরা সবাই মিলে তাঁদের মনের কথা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাসূলে পাকের কলিজার টুকরো ফাতিমাকে (রা) বেছে নেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফাতিমার (রা) বক্তব্য শুনে বললেন, ‘মা, আমি যা চাই, তুমি কি তা চাও না? ফাতিমা পিতার ইচ্ছা বুঝতে পারলেন। তিনি ফিরে এলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীরা আবার তাঁকে পাঠাতে চাইলেন; কিন্তু তিনি ছিলেন একজন বয়স্কা, বুদ্ধিমতী ও রসিক মহিলা। তিনি বেশ কায়দা করে ত৭াদের মনের কথা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেনঃ উম্মু সালামা! আয়িশার ব্যাপারে তোমরা আমাকে বিরক্ত বরবে না। কারণ ‘আয়িশা ছাড়া আর কোন স্ত্রীর লেপের নীচে আমার উপর ওহী নাযিল হয়নি।৯৮ ইমাম জাহাবী বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই জবাব দ্বারা প্রতীয়মান হয়, অন্যদের তুলনায় ‘আয়িশাকে (রা) সর্বাধিক ভালোবাসার অন্যতম কারণ হলো, আলত্মাহর নির্দেশ। আল্লাহর নির্দেশেই তিনি ‘আয়িশাকে (রা) এত ভালোবাসতেন।৯৯

হযরত ‘আমর ইবনুল ‘আস (রা) ‘জাতুস সালাসিল’ যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে একদিন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস কররেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? বললেনঃ আয়িশা। তিনি আবার বলরেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার জিজ্ঞাসা পুরুষ সম্পর্কে। বলরেনঃ ‘আয়িশার পিতা।১০০

একবার ‘উমার (রা) মেয়ে উম্মুল মুমিনীন হাফসাকে (রা) উপদেশ দিতে গিয়ে বললেনঃ তুমি ‘আয়িশার সাথে পাল্লা দিতে যেও না। কারণ, সে তো রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রিয়তমা।১০১

এবার এক সফরে চলার পথে ‘আয়িশার (রা) উটনীটি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তাঁকে নিয়ে দৌড় দেয়। এতে রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এতই অস্থির হয়ে পড়েন যে, তাঁর মুখ দিয়ে তখন উচ্চারিত হতে শোনা যায়ঃ ‘ওয়া আরূসাহ!’ হায়! আমার বধূ!১০২

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্তিম রোগ শয্যায় বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলেনঃ আজ কি বার?কক সবাই বুঝলো, তিনি ‘আয়িশার বারির দিনটির অপেক্ষা করছেন। সুতরাং তাঁকে ‘আয়িমার (রা) ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। ওফাত পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। ‘আয়িশার (রা) রারে উপর মাথা রেখে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।১০৩ তেরো দিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ ছিলেন। তার মধ্যে পাঁচ দিন অন্য স্ত্রীদের ঘরে এবং আট দিন ‘আয়িশার (রা) ঘরে কাটান।

পরবর্তীকালে ‘আয়িশা (রা) বলতেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ঘরে আমার বারির দিনে এবং আমারই বুকে ইনতিকাল করেন। জীবনের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে ‘আবদুর রহমান ইবন আবী বকর (রা) একটি কাঁচা মিসওয়াক হাতে করে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখতে আসেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই মিসওয়াকটির দিকে বার বার তাকাতে লাগলেন। বুঝলাম, তিনি সেটা চাচ্ছেন। আমি সেটা নিয়ে ধুয়ে নিজে চিবিয়ে বরম করে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিলাম। তিনি সেটা দিয়ে সুন্দর করে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিলাম। তিনি সেটা দিয়ে সুন্দর করে মিওয়াক করলেন। তারপর আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন, কিন্তু হাতটি পড়ে গেল। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সেই মহান আল্লাহর প্রশংসা যিনি তাঁর রাসূলের পার্থিব জীবনের শেষ হুমূর্তটিতে তাঁর ও আমার থুতু মিলিত করেছেন। ১০৪

অনেকের মনে করে থাকে ‘আয়িশার (রা) প্রতি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন আবেগ ও মুগ্ধতার কারণ তাঁর রূপ-লাবণ্য। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রাসূরে পাকের সহধর্মিণীদের মধ্যে জুওয়াইরিয়া, যায়নাব ও সাফিয়্যা (রা) ছিলেন সর্বাধিক সুন্দরী। তাঁদের সৌন্দর্য্যের কথা হাসীদ, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে বিদ্যমান। কিন্তু ‘আয়িশার (রা) রূপ লাবণ্যের কথা দুই একটি স্থান ব্যতীত তেমন কিছু উল্লেখ নেই। যেমন একবার উমার (রা) হাফসাকে (রা) উপদেশ দিতে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেন। আর তা শুনে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটু হেসে দেন।১০৫ মূলতঃ উমারের এ সম্বব্য দ্বারা এতটুকু প্রমাণিত হয় যে, ‘আয়িশা (রা) হাফসার (রা) চেয়ে প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য।

আসল কথা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা বলেছেন, তাই তিনি বলেছেনঃ বিয়ের জন্য কনের নির্বাচন চারটি গুণের ভিত্তিতে হতে পারে। ১. ধন-সম্পদ ২. রূপ-সৌন্দর্য, ৩. বংশ মর্যাদা, ৪. দীনদারী। তোমরা দীনদারীর সন্ধান করবে।১০৬ এ কারণে যাঁর দ্বারা দীনের বেশি খিদমাত হওয়া সম্ভব ছিল স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক ভালোবাসার পাত্রী ছিলেন। ‘আয়িশার (রা) সমঝ-বুঝ, চিন্তা-অনুধ্যান, হুকুম-আহকাম স্মৃতিতে ধাণ ক্ষমতা অন্য স্ত্রীদের তুলনায় অতিমাত্রায় অতিমাত্রায় বেশি ছির। মূলতঃ এসব গুণই তাঁকে স্বামীর প্রিয়তমা করে তুলেছিল। আল্লামা ইবন হাযাম ‘আল-মিলাল ওয়ান নিহাল’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করে একথা প্রমাণ করেছেন। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।১০৭

আরবী হবে

-পুরুষদের মধ্যে কামালিয়াত বা পূর্ণতা অর্জন করেছেন অনেকে, কিন্তু নারীদের ম¨্যধ মারইয়াম বিনত ইমরান এবং ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া ছাড়া আর কেউ পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি। তবে গোটা নারী জাতির উপর ‘আয়িশার মর্যাদা যাবতীয় খাদ্য সামগ্রীসর উপর সারীদের মর্যাদার মত।

‘আয়িশাকে (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এত বেশি ভারোবাসার তাৎপর্য এই হাসীদ দ্বারা বুঝা যায়। তাঁর মুগ্ধতা ‘আয়িশার (রা) রূপ-যৌবন ও যৌন্দর্য্যে ছির না; বরং তা ছির তাঁর অন্তর্গত গুণাবলী ও পূর্ণতায়। আর এই অন্তর্গত গুণাবলীতে ‘আয়িশার (রা) পরে স্থান ছির উম্মু সালামার (রা) এ কারণে বয়স্কা ওহয়া সত্ত্বেও তিনিও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গভীর ভারোবাসার পাত্রী ছিরেন। হযরত খাদীজা (রা) পঁয়ষট্টি বছর বয়স রাভ করে ওয়াত পান, অথবা তাঁর ভালোবাসা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হৃদয়ের এত গভীরে ছির যে, তাতে ‘আয়িশাও (রা) ঈর্ষা পোষণ করতেন।১০৮

স্বামী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি ছিল ‘আয়িশার (রা) বুকভরা পবিত্র ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় অন্য কেউ ভাগের দাবিদার হলে তিনি কষ্ট পেতেন। কখনো রাতে ‘আয়িমার (রা) ঘুম ভেঙ্গে গেলে পাশে স্বামীকে না পেলে অস্থির হয়ে পড়তেন। একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশে স্বামীকে পেলেন না। রাতে ঘরে বাতিও জ্বলতো না। অন্ধকারে এদিক ওদিক হাতছাতে লাগলেন। অবশেষে এক স্থানে স্বামীর কদম মুবারাক খুঁজে পেলেন। তিনি সিজদায় পড়ে আছেন।১০৯

আরো একবার একই অবস্থায় অবতারণা হলো। ‘আয়িশা (রা) মনে করলেন, তিনি হয়তো অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে গেছেন। তিএিদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। দেখলেন, স্বামী এক কোণে নীরবে তাসবীহ পাঠে নিমগ্ন আছেন। ‘আয়িশা (রা) নিজের অমূলক ধারণার জন্য লজ্জিত হরেন। তিনি আপর মনে বলে উঠলেনঃ আমার মা-বাবা উৎসর্গীত হোক! আমি কোন ধারণায় আছি কোন ধারণায় আছি, আর তিনি আছেন কোন অবস্থায়।১১০

অন্য এক রাতের ঘটনা। ‘আয়িশা (রা) মধ্যরাতে জেগে উঠলেন। পাশে স্বামীকে না পেয়ে এখানে সেখানে খোঁজাখোঁজি করতে করতে কবরস্থানে পৌঁছে দেখলেন, তিনি দু‘আ ও ইসতিগফারে নিমগ্ন। তিনি আবার নীরবে ফিরে আসলেন। সকালে একথা স্বামীকে জানালে তিনি বললেনঃ হাঁ, রাতে আমার সামেন দিয়ে কোন একটা জিনিস যাচ্ছিল মনে হয়েছিল। তাহলে সে তুনিই হবে।’

একবার এক সফরে ‘আয়িশা (রা) ও হাফসা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফর সঙ্গিনী ছিলেন। রাতে চলার পথে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িমার (রা) বাহনের পিঠে বসে তাঁর সাথে কথা বলতে বরতে চলতেন।

একদিন ‘আয়িশা ও হাফসা (রা) পরামর্শ করে উট বদল করে নিলেন। রাতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যথারীতি ‘আয়িশার (রা) উটের পিঠে উঠে এলন এবং হাফসার (রা) সাথে কথা বলতে বলতে পথ চললেন। এদিকে ‘আয়িশা (রা) স্বামী সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে কাতর হয়ে পড়েন। পরবর্তী মানযিলে কাফেরা থামলে তিনি বাহনের পিঠ থেকে নেমে পড়েন এবং ঘাসের মধ্যে নিজের চরণ দুইখনি ডুবিয়ে দিয়ে আপন মনে বলতে থাকেনঃ ‘হে আল্লাহ! আমি তো আর তাঁকে কিছু বরতে পারিনে। আপনি একটা বিচ্ছু অথবা সাপ পাঠিয়ে দিন, আমাকে দংশন করুন!১১১

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধমির্ণীদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণরি মহিলা ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ অভিজাত পরিবারের মেয়ে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে এমন দীন-হীন অবসথায় জীবন যাপনকরতে গিয়ে তাঁদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এ জন্য তাঁরা সমবেতভাবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জীবন যাপনের মান বৃদ্ধির আবদার করতে থাকেন। এরই প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। যাতে তাঁদেরকে এ চূড়ান্ত কথা বলে দেওয়া হয় যে, যাঁরা ইচ্ছা স্বেচ্ছায় সম্পর্ক ছিন্ন করচলে যেতে পারেন অথবা এই দীন-হীন অবস্থা মেনে নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে জীবন যাপন করতে পারেন। দইয়শা (রা) ছিলেন যেহেতু কম বয়স্কা, তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)তাঁকে মা-বাবর সাথে পরামর্শ করে জানিয়ে দেন। বলেনঃ আমি আল্লাহর রাসূলকেই চাই।’ সবার আগেই তিনি এ সিদ্ধান্ত দেন এবং রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুরোধ করে বলেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এ সিদ্ধান্তের জন্য আপনি অন্য কাউকে বরবেন না।১১২

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক সময় ‘আয়িশার (রা) রানের উপর মাথা রেখে শুয়ে যেতেন। একদিন রাসূল (রাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) সেই অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছেন, এমন সময় আবু বকর (রা) কোন এক কারণে মেয়ের উপর উত্তোজিত হয়ে তাঁর ঘরে ঢুকে পড়েন এবং তাঁর পার্শ্বদেশে ধাক্কা দেন। কিন্তু ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরামের ব্যাঘাত হতে পারে, তাই মোটেই নড়াচড়া করলেন না।১১৩

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সকল বস্ত্রে ইনতিকাল করেন, ‘আয়িশা (রা) অতি যত্মের সাথে তা সংরক্ষন করেন। একবার এক সাহাবীকে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)একটি চাদর ও কম্বল দেখিয়ে বলেন, এই কাপড়ের তনি ইনতিকাল করেন।১১৪

রাসূরে কারীমের গোটা জিন্দেগী মানবজাতির জন্য আদর্শ। এ কারণে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে কুশী করার জন্য কেমন আচরণ করবে, আমরা তাও ‘আয়িশা (রা) ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে দেখতে পাই। আমরা কখনো কখনো রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) সাথে দারুণ উদার ও খোলামেলা দেখতে পাই। ‘আয়িশার (রা) অতি তুচ্ছ কোন তামাশা বা খেরাধুলা দেখেও তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)একজন আনসারী মেয়েকে প্রতিপালন করেন। খুব সাদামাটা ঘরে এসে বললেনঃ ‘আয়িশা! কোন গান-গীত তো নেই।১১৫

একবার ঈদের দিন কিছু হাবশী লোক নিযা হেলিয়ে দুলিয়ে পালোয়ানীর কসরত দেখাচ্ছিল। ‘আয়িশা (রা) স্বামীর নিকট এই খেলা দেখার আবদার কররেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে আড়াল কের দাঁাড়িয়ে থাকলেন এবং ‘আয়িশা (রা) সেই খেলা উপভোগকররেন। যতক্ষণ ‘আয়িশা (রা) ক্লান্ত হয়ে নিজেই সরে না গেলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ততক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।১১৬

একবার ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (রাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) সাথে একটু উঁচু গলায় কথা বলছিলেন। এমন সময় পিতা আবু বকর (রা) এসে উপস্থিত হলেন। তিনি মেয়ের এমন বেয়াদবী দেখে রেগে গেলেন এবং মারার জন্য হাত উঁচু করলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্রুত মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে ‘আয়িশাকে রক্ষা করলেন। আবু বকর (রা) চরে গেলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)‘আয়িশাকে বললেনঃ আলতো, আমি তোমাকে কিভাবে বাঁচালাম?১১৭

একবার একটি মেয়েকে সঙ্গে করে রাসূর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে বললেন, তুমি এই মেয়েটিকে চেন? আয়িশা (রা) বললেনঃ না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ সে অমুকের দাসী। তুমি কি তার গান শুনতে চাও? ‘আয়িশা (রা) শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। দাসীটি দীর্ঘক্ষণ গান গাইলো। এক সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সম্পর্কে মন্তব্য করলেনঃ শয়তান তার নাকের ছিদ্রে বাদ্য বাজায়। অর্থাৎ এ ধরনের গান রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)অপছন্দ করেন। ‘আয়িশাকে (রা) খুব করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাঝে মধ্যে তাঁকে গল্পও শোনাতেন।১১৮ আবার কখনো কখনো ধৈর্যসহকারে ‘আয়িশার (রা) গল্পও শুনতেন। কিন্তু এমন ঘনিষ্ঠ ও আনন্দঘন মুহূর্তেও যদি আজানের ধ্বনি কানে আসতো, তিনি তকষুনি সোজা বেরিয়ে যেতেন, যেন কাকেও চেনের না।১১৯

একবার এক সফরে ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরসঙ্গিহী ছিলেন। চরার পথে এক পর্যায়ে রাসূর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল সঙ্গীকে আগে চলার নির্দেশ দিলেন। তারপর ‘আয়িশাকে বললেনঃ এসো, আমরা দৌড়াই।দেখি কে আগে যেতে পারে। ‘আয়িশা (রা) ছিলেন হালকা পাতলা। তাই তিনি আগে চলে যান। তার কিছুকাল পরে এমন দৌড় প্রতিযোগিতার সুযোগ আরেকবার আসে। ‘আয়িশা (রা) বলেন, তখন আমি মোটা হয়ে গিয়েছিরাম। তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার আগে চলে যান। তখন তিনি বলেনঃ এ হচ্ছে ঐ দিনের বদলা।১২০

রাসূলে কারীমের (রাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) ‘আয়িশার (রা) সাথে যখন পানাহারে সুযোগ হতো তখন একই দস্তরখানে এক থালায় আহার করতেন। একবার পর্দার হুকুমের আগে তাঁরা এক সাথে আহার করছেন, এমন সময় ‘উমার (রা) এসে উপস্থিত হলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)তাঁকে খেতে ডাকলেন এবং তিনজন এক সাথে খেরেন।১২১ পানাহারের মধ্যে প্রেম-প্রীতির অবস্থা এমন ছিল যে, ‘আয়িশার (রা) যেখানে মুখ লাগাতেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঠিক সেখানেই মুখ রাগিয়ে পান করতেন।১২২ রাতে যেহেতু ঘরে বাতি জ্বালতো না, তাই অন্ধকারে কেতে বসে মাঝে মাঝে উভয়ের হাত একই টুকরোর উপর গিয়ে পড়তো।১২৩

সীরাত ও হাদীসের গ্রন্থসমূহে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আয়িশার (রা) প্রেম-গ্রীতি ও মান-অভিমানের এক চমৎকার দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ইসলাম যে মানুষের স্বাভাবগত নির্মল আগে-অনুভূতিকে অস্বীকার করেনি তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁদের আচরণের মধ্যে। কখনো কখনো তাঁদেরকে দেখা যায় সাধারণ মানুষের মত আবেগপ্রবণ। আমাদের তুলে গেলে চলবে না যে, ‘আয়িশা (রা) যেমন একজন নবীর স্ত্রী, তেমনি একজন নারীও বটে। আবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেমন একজন নবী ও রাসূর তেমনি একজন স্বামীও বটে সুতরাং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাঁদের এমন বহু আচরণ ও মান-অভিমানের কথা ও ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যা অতি চমকগ্রদ ও শিক্ষাণীয়।

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরলোকগত প্রথমা স্ত্রী খাদীজাকে (রা) প্রায়ই স্মরণ করতেন। একবার তিনি খাদীজার (রা) কথা আলোচনা করছেন, ‘আয়িশা (রা) বলেন উঠলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এইবৃদ্ধার কথা এত স্মারণ করেন কেন। আল্লাহ তো আপনাকে তাঁর চেয়ে ভালো স্ত্রী দান করেছেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ আমাকে তাঁর থেকে সন্তান দান করেছেন।১২৪

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন খাদীজার (রা) প্রশংসা শুরু করলেন এবং দীর্ঘক্ষণ প্রশংসা করতে থাকলেন। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ এতে আমার অন্তর্দাহ হলো। বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি একজন কুরাইশ বৃদ্ধা, যার ঠোঁট লাল এবং যার মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়েছে, এত দীর্ঘ সময় তার প্রশংসা করছেন। আল্লাহ তো তাঁর চেয়ে ভারা স্ত্রী দান করেছেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চেহারার রং পাল্টে গেল। তিনি বললেনঃ খাদীজা আমার এমন স্ত্রী ছিল যে, মানুষ যখন আমাকে নবী বলে মানতে অস্বীকার করে তখন সে আমার প্রতি ঈমান আনে, মানুষ যখন আমাকে সাহায্য করতে চায়নি তখন সেতার অর্থ-বিত্ত সহকারে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ তার মাধ্যমেই আমাকে সন্তান দিয়েছেন। যখন অন্য স্ত্রীরা আমাকে সন্তান থেকে রঞ্চিত করেছে।১২৫

একবার ‘আয়িশার (রা) মাথায় ব্যথা হলো। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন অন্তিম রোগলক্ষণ শুরু হতে চলেছে। তিনি ‘আয়িশাকে (রা) বললেনঃ তুমি যদি আমার সামনে মারা যেতে, আমি নজি হাতে তোমাকে গোসল দিয়ে কাফন পরাতাম এবং তোমার জন্য দু’আ করতাম। আয়িশা (রা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার মরণ কামনা করছেন। যদি এমন হয় তাহরে আপনি তো এই ঘরে নতুন একজন স্ত্রীকে এনে উঠাবেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ খতা শুনে মৃতু হেসে দেন।১২৬

‘ইফক’ বা চরিত্রে কলস্ক আরোপের ঘটনার পর যখন ওহী দ্বারা ‘আয়িশার (রা) পবিত্রতা ঘোষিত হয় তখন তাঁর মা বললেনঃ যাও, স্বামীর কাছে কৃতজ্ঞমতা প্রকাশ কর। ‘আয়িশা (রা) ত্বরিৎ অভিমানের সুরে জবাব দিলেনঃ আমি এক আল্লাহ ছাড়া-যিনি আমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন, আর কারো প্রতি কৃতজ্ঞ নই।

একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘আয়িশা! তুমি আমার প্রতি কখন খুশী বা অখুশী থাক, আমি তা বুঝতে পারি। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ কিভাবে? বললেনঃ অখুশথিাকলে কসম খাও ‘ইবরাহীমের আল্লাহর কসম’ বলে, আর খুশী থাকলে বলঃ ‘মুহাম্মাদের আল্লাহর কসম।১২৭

স্বামীর সেবা

হাদীসের গ্রন্থাবলীর বিভিন্ন স্থানে ‘আয়িশার (রা) স্বামী-সেবার কথা ছড়িয়ে আছে। এখানে আমরা তার থেকে কিছু তুলে ধরছি। ঘরে খাদেম থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজ হাতে সব কাজ করতেন। নিজ হাতে আটা পিষতেন, খাবার তৈরি করতেন, বিছানা পারতেন, ওযুর পানি এসে রাখতেন, সআবমীর কুরবারীন পশুর গলার রশি পাকাতেন, স্বামীর মাথায় চিরুনী করে দিতেন, দেহে আতর লাগিয়ে দিতেন, কাপড় ধুতেন, রাতে শোয়ার সময় মিসওয়াক ও পানি মাথার কাছে এনে রাখতেন, মিসওয়াক দুয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতেন।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে মসজিদে যান। একজনসাহাবী বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কম্বলে তো কোন ময়লার দাগ দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে তিনি কম্বরটি খুলে একজন খাদেমের হাতে ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠিয়ে দেন। আয়িশা (রা) পানি আনিয়ে নিজ হাতে কম্বলটি ধুয়ে, শুকিয়ে আবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট পাঠিয়ে দেন।১২৮

কায়স আল-গিফারী (রা) ছিলেন আসহাবে সুফফার অন্যতম সদস্য। তিনি বর্ণনা করেছেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তোমরা সবাই আজ ‘আয়িশার ঘরে চলো। তিনি আমাদের সঙ্গে করে ঘরে গিয়ে বললেনঃ ‘আয়িশা! আমাদের সকলকে আহার করাও। আয়িশা (রা) আমাদের সকলকে পাকানো খাবার খাওয়ালেন এবং ধুধ ও পানি পান করালেন।১২৯ সম্ভবত এটা হিজাবের হুকম নাযিলের আগের ঘটনা।

‘আয়িশা (রা) স্বামীর প্রিয়তমা স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও অতি আগ্রহ ভরে অন্যদের চেয়ে বেশি মাত্রায় স্বামীর সেবা করতেন। স্বামীর আরাম-আয়েশ ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সর্বদা সজাগ থাকতেন। বার বার স্বামীর মিসওয়াকটি ধোয়ার প্রয়োজন পড়তো। এই কাজটির সুযোগ এককভাবে ‘আয়িশা (রা) লাভ করতেন।১৩০

স্বামীর আনুগত্য ও অনুসরণঃ

ইসলামে স্ত্রীর অন্যতম গুণ হলো স্বামীর আনুগত্য ও অনুসরণ করা। ‘আয়িশা (রা) স্বামী সাহচর্যের দীর্ঘ নয় বছরে তাঁর কোন নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ বামান্য করা তো দূরের কথা,&শারা-ইঙ্গিতেও যদি তিনি কোন অপছন্দের কথা বুঝিয়েছেন, তাও ‘আয়িশা (রা) সাথে সাথে পরিহার করেছেন। একবার তিনি অতি যত্ম সহকারে দরজায় একটি ছবিওয়ালা পর্দা টানালেন। রাসূর (সাল্ল-াল্ল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় পর্দার প্রতি দৃষ্টি পড়লো। সাথে সাথে তাঁর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে ‘আয়িশা (রা) সবকিছু বুঝে ফেললেন। তিনি বললেনঃ আমায় ক্ষমা করুন! আমার অপরাধ কোথায় বলবেন কি? রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ যে ঘরে ছবি থাকে সেখানে ফিরিশতা প্রবেশ করে না। একতা শোনার পর ‘আয়িশা (রা) পর্দাটি ছিঁড়ে ফেললেন।১৩১

স্বামীর জীবদ্দশায় বহু স্ত্রীই স্বামীর পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর আয়িশা (রা) যে পরিমাণ স্বামীর আনুগত্য এবং হুকুম তামীর করেছেন, তার কোন তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। রাসূলুলত্মাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকারের পর তিনি দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ে স্বামীর প্রতিটি আদেশ ও ইচ্ছা তেমনিভাবে পালন ও পূরণ করেছেন যেমন তাঁর জীবনকালে করতেন।

রাসূল কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশা (রা) দানশীলতা শিক্ষা দিয়েছিলেন। আমরণ তিনি এ গুণটি অতি নিষ্ঠার সাথে ধারণ করে থাকেন। একবার তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জিহাদের অনুমতি চাইলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ নারীদের জিহাদ হলো হজ্জ। এই বাণী শোনার পর থেকে এমন কঠোরতার সাথে আমল করতে থাকেন যে, তাঁর জবিনের খুব কম বছরই হজ্জ ছাড়া অতিবাহিত কয়েছে।১৩২

একবার এক ব্যক্তি কিছু কাপড় ও কিচু নগর অর্থ ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠালো। তিনি প্রথমে গ্রহণকরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফেরত পাঠালেন। তারপর আবার লোকটিকে ডেকে এনে তা গ্রহণ করেন এবং বলেনঃ আমার একটি কথা মনে এসে গেল।১৩৩

একবার ‘আরাফাতের দিন ‘আয়িশা (রা) রোযা রাখলেন। প্রচন্ড গরমের কারণে মাথায় পানির ছিটা দিচ্ছিরেন। একজন রোযা ভেঙ্গে ফেলার পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেনঃ আমি যখন রাসূরুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট থেকে মুনেছি যে, আরাফাতের দিন রোযা রাখলে সারা বচরের পাপ মোচন হয়ে যায়,তখন তা কিভাবে ভাংতে পারি?১৩৪

রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাশতের নামায পড়তে দেখে সারা জীবন তিনি এই নামায পড়েছেন। তিনি বলতেনঃ আমার পিতাও যদি কবর থেকে উঠে এসে আমাকে এ নামায পড়তে নিষেধ করেন, আমি তাঁর কথা মানবো না।১৩৫ একবার এক মহিলা ‘আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করলোঃ মেহেদী লাগানো কেমন? জবাব দিলেনঃ আমার প্রিয়তমের মেহেদীর রং খুব পছন্দ ছিল, তবে গন্ধ পছন্দ ছিল না। হারাম নয়। ইচ্ছা হলে তুমি লাগাতে পার।

গৃহ অভ্যন্তরে স্বামী-স্ত্রীর দীনী জীবন

‘আয়িমার (রা) ঘরটি ছির একজননবীর আবাসস্থল। সেখানে বিত্ত-বৈভবের কোন ছোঁয়া ছির না। পার্থিত ঐশ্বর্যের প্রতি তাঁদের কোন পরোয়াও ছিল না। ‘আয়িশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্ল-াল্ল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভ্যাস ছির যখন ঘরে আসতেন, একটু উঁচু গলায় নিম্নের কথাগুলি বার বার উচ্চারণ করতেন।১৩৬

আরবী হবে

‘আদম সন্তানদের মালিকানায় যদি ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ দুইটি উপত্যকা হয়, তাহলে সে তৃতীয়টির লোভ করবে। তার লোভের মুখ শুধুমাত্র মাটিই ভরতে পারে। আল্লাহ বলেন, ধন-সম্পদ তো আমি নামায কায়েম এবং যাকাত দানের জন্য সৃষ্টি করেছি। যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহও তার দিকে ফিরে আসেন।’

মানুষের লোভের যে কোন শেষ নেই, এবং ধন-সম্পদ দানের মূল উদ্দেশ্য কি, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই ছিল তার আসল লক্ষ্য।

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘ঈশার নামায আদায়ের পর ঘরে আসতেন। মিসওয়াক করে সাথে সাথে শস্যা নিতেন। মাঝ রাতে জেগে তাজাজ্জুদ নামায আদায় করতেন। রাতে শেষভাবে ‘আয়িশাকে (রা) জাগিয়ে দিতেন। তিনি উঠে স্বামীর সাথে নামাযে অংশগ্রহণ করতেন। সবশেষে বিতর নামায আদায় করতেন। সুবহে সাদিক হওয়ার পর রাসূলে পাক (সাল্ল¬াল্ল-াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের সুন্নাত আদায় করে কাত হয়ে একটু শুয়ে যেতেন এবং ‘আয়িশার (রা) সাথে কিচু কথা-বার্তা বলতেন।১৩৭ তারপর ফজরের ফরয আদায়ের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হতেন। কখনো কখনো সারা রাত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ‘আয়িশা (রা) আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমাম হতেন, ‘আয়িশা (রা) হতেন মুক্তাদী। কুসূফ ও খুসূক (সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ) এর অবস্থায় রাসূল (সাল্ল¬াল্ল-াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামায়ের দাঁড়ালে তিনিও দাঁড়িয়ে যেতেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে জামা’য়াতের ইমামতি করতেন, আর তিনি ঘরে ইকতিদা করতেন।১৩৮

পাঞ্চেগানা নামায ও তাহাজ্জুদ ছাড়াও রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখে তিনি চাশতের নামাযও নিয়মিত পড়তেন। প্রায়ই রোযা রাখতেন। মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে এক সাথে রোযা পালন করতেন। রমযানের শেষ দশদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মকজিদে ইতিকাফ করতেন। ‘আয়িশাও (রা) এতে শরিক হতেন। মসজিদের আঙ্গিনায় তাঁবু টানিয়ে ঘিরে নিতেন। ফজর নাযমাযের পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু সময়ের জন্য সেখানে আসতেন।১৩৯

হিজরী ১১ সনে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজ্জের সফরসঙ্গী হন। হজ্জ ও উমরার নিয়েত কনের। কিন্তু স্বাভাবিক নারী প্রকৃতির কারণে যথাসময়ে তাওয়াফ করতে পাররেন না। দারুণ কষ্ট পেলেন। কাঁদতে শুরু কররেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাহির থেকে এসে কাঁদতে দেখে কাঁদতে শুরু কররেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাহির থেকে এসে কাঁচতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস কররেন এবং তাঁকে করণীয় মাসয়ারা বাতলে দিলেন। তিনি ভাই ‘আবদুর রহমান ইবন আবী বকরকে (রা) সাথে নিয়ে অসমাপ্ত আবশ্যকীয় কাজ সমাপন করলেন।১৪০

আমাদের মত সাধারণ মানুষর মনে এমন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, রাসূলে কারীম (সাল্ল¬াল্ল-াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি গৃহ অব্যন্তরে আরাম ও বিম্রামের সময় রিসালাতের দায়িত্ব পালনে একটু শিথিলতা (নাউজুবিল্লাহ) দেখাতেন? এমন ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক। পূর্বেই আমরা ‘আয়িশার (রা) মন্তব্য উল্লেখ করেছি-‘রাসূর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের সাথে কথা বলতেন। আজানের ধ্বনি কানে যেতেই উঠে দাঁড়াতেন। তখন মনে হতো তিনি যেন আমাদের চেনেনই না।’ ‘আয়িশা (রা) খুব সাধ করে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুশী করার জন্য ছবিওয়ালা পর্দা টানালেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্তুটির পরিবর্তে বিরক্তি প্রকাশ করলেন।

একবার ‘আয়িশা (রা) এক ইহুদীকে-যে তাঁকে মৃত্যুর অভিশাপ দিয়েছির, কঠোর ভাষায় প্রত্যুত্তর করেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাথে বরেনঃ আয়িশা! আল্লাহাতি দয়াবান। তিনি দয়া ও কোমলতা পছন্দ করেন। আর একবার আয়িশা (রা) নিজ হাতে আটা পিষে রুটি বাণিয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। এই সুযোগে প্রতিবেশীর একটি ছাগল ঘরে ঢুকে সব খেয়ে ফেলে। ‘আয়িশা (রা) দৌড়ে ছাগলটি ধরে কয়েক ঘা বসিয়ে দিতে গেলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাধা দিয়ে বললেনঃ ‘আয়িশা! প্রতিববেশীকে কষ্ট দিও না।

সতীন ও তাদের সন্তানদের সাথে সম্পর্কঃ

আমাদের জানা মতে এ পৃথিবীতে একজন নারীর সবচেয়ে অসহনীয় বিষয় হলো সতীনের অস্তিত্ব। ‘আয়িশার (রা) এক সাথে সতীন ছিলেন একজন থেকে নিয়ে আটজন পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহান সাহচর্যের দৌলতে তাঁরেদ সকলের দৃহয়ের যাবতীয় আবিলতা দূর হয়ে তা স্বচ্ছ আননায় পরিণত হয়। সতীন ও তাঁদের সন্তান-সন্তুতিদের সাথে ‘আয়িশার (রা) জীবন যাপনের যে চিত্র আমরা পাই তা বিশ্বের নারী জাতির জন্য এক অতুলনীয় আদর্শ হয়ে আছে।

খাদীজা (রা) যদিও ‘আয়িশার (রা) সময়ে বেঁচে ছিরেন না, তবে রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হৃদয় মাঝে তিনি সর্বদা জীবিত ছিলেন। তনি ‘আয়িশার (রা) কাছে সবসময় খাদীজার (রা) স্মৃতিচারণ করতেন। এ কারণে ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ ‘আমি যে পরিমাণ খাদীজাকে ঈর্ষা করতাম না। আর তা এই জন্য যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে খুব বেশি স্মারণ করতেন, অন্য কেউ তা করতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক খাদীজার (রা) নামে কুরবানী করা, খাদীজার বান্ধবীদের নিকট হাদীয়া-তোহফা পাঠানো, ইসলামের প্রথম পর্বে তাঁর যাবতীয় অবদান, যথাঃ স্বামীকে সান্ত্বনা ও ধৈর্য ধারণের উপদেরশ দান, যাবতীয় উপায়-উপকরণ দিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি কর্মকান্ডের কথা কিন্তু আয়িশাই (রা) এই উম্মাতকে জানিয়েছেন। আল্লাহ পাক যে, খাদীজাকে (রা) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, সে কথাটিও তিনি জানিয়েছেন।১৪১ এতেই তাঁর হৃদয়ের স্বচ্ছতা ও প্রশস্ততার কথা অনুমান করা যায়।

সাওদার (রা) প্রশংসার ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ ‘একমাত্র সাওদা ছাড়া অন্য কোন নারীকে দেখে আমার মধ্যে এমন আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি যে, তাঁর দেহে যদি আমার প্রাণটি হতো।’ মায়মূনার (রা) মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরহেযগার ছিলেন।’১৪২ সাফিং্যা (রা) চমৎকার খাবার তৈরি করতে পারতেন। তাঁর এই পারদর্শিতা তিনি স্বীকার করেন এইভাবে আমি তাঁর চেয়ে ভালো খাবার তৈরি করতে পারে এমন কাউকে দেখিনি।’ সতীনদের সাথে তাঁর উঠা-সবা ও আচার-আচরণের অনেক কথা হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে বিদ্যামান আছে-যাতে তাঁর উদারতা, মহানুভবতা ও উন্নত নৈতিকতার চিত্র ফুঠে উঠেছে। ‘আয়িশার (রা) মধুর ব্যবহার ও আচারণ সকলকে খুশী করেছিল। আর তাই ‘ইফক (কলস্কা আরোপ) এর ঘটনার সময়-যখন তাঁর দিশেহারা অবস্থা, তখন তাঁর অন্যতম সতীন যয়নাবকে (রা) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জবাব দিয়েছিলেনঃ আমি তো তাঁর মধ্যে শুধু ভালো ছাড়া কিছু জানিনে।’১৪৩

‘আয়িশা (রা) নিঃসন্তান ছিলেন। তবে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য স্ত্রীদের বেশ কয়েকজন সন্তান ছিলেন। তাঁদের সাথে ‘আয়িশার (রা) সম্পর্ক ছিল আদর্শ মানের। যয়নাব, রুকাইয়্যা, উম্মু কুলসুম ও ফাতিমা-এই চার কন্যা ছিলেন খাদীজার (রা) সন্তান। ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে আসার পূর্বে একমাত্র ফাতিমা (রা) ছাড়া অন্যদের বিয়ে হয়ে যায় এবং সবাই নিজ নিজ স্বামীর ঘরে চরে যান। হিজরী ৬ষ্ঠ সনে রুকাইয়্যা এবং হিঃ ৮ম ও ৯ম সনে যথাক্রমে যয়নাব ও উম্মু কুলসুম ইনতিকাল করেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে তাঁদের সাথে ‘আয়িশার (রা) তিক্ত সম্পর্কের একটি ঘটনাও পাওয়া যায় ন। বরং এ সকল কন্যা সম্পর্কে ১আয়িশার (রা) যে সব মন্তব্য ও আচারণের কথা পাওয়া যায় তাতে তাঁদের; সাথে তাঁর গভীর হৃদ্যতার কথা জানা যায়। যয়নাব, যিনি আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করেন, তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই বাণীটি ‘আয়িশা (রা) বর্ণনা করেছেনঃ সে আমার অতি ভালো মেয়ে ছিল, আমাকে ভালোবাসার কারণে তাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে।’ এই যয়নাবের মেয়ে উমামাকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী পরিমাণ স্নেহ ও আদর করতেন তা ‘আয়িশাই (রা) বর্ণনা করেছেন।

‘আয়িশা (রা) যখন স্বামীগৃহে আসেন তখন কুমারী মেয়ে ফাতিমা (রা) পিতার ঘরে। কিন্তু তিনি বয়সে ‘আয়িশার চেয়ে পাঁচ বছর অতবা ছয় বছরের বড়। এক বছর বা তার চেয়ে কিছু কম সময়ের জন্য এই মা-মেয়ে এক সাথে কাটান। হিজরী ২য় সনের মধ্যে আলীর (রা) সাথে এই মেয়ের বিয়ে হয়। এই বিয়ের উদ্যোগ আয়োজনে অন্য মা-দের সাথে ‘আয়িশার (রা) শরিক ছিরেন। মুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশে তিনি বিশেষ গুরুত্বও প্রদান করেন। ঘর লেপেন, বিছানা তৈরি করেন, নিজের হাতে খেজুরের ছাল দুনে বালিশ বানান, খেজুর ও মানাক্কা অতিথিদের সামনে পেশ করেন এবং কাঠের একটি আলনার মত তৈরি করেন পানির মশক ও কাপড় চোপড় টানোনোর জন্য। ‘আয়িশা (রা) বর্ণনা করেছেনঃ ‘ফাতিমার বিয়ের মত এত চমৎকার বিয়ে আর দেখিনি।১৪৪

ফাতিমার (রা) প্রশংষায় ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ আমি ফাতিমার চেয়ে একমাত্র তার পিতা ছাড়া আর কোন ভালো মানুষ কক্ষণো দেখিনি। একবার এক তারে’ঈ আয়িশাকে (রা) প্রশ্ন করলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবচেয়ে প্রিয় কে ছিলেন? উত্তর দিলেনঃ ফাতিমা। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মত চান-চলন, উঠা-সবায় মিলে যায় একমাত্র ফামিতা ছাড়া আর কাউকে দেখিনি। ফাতিমা যখন তাঁর পিতার সাথে দেখা করতে আসতেন পিতা সোজা দাঁড়িয়ে যেতেন। মেয়ের কপারে চুমু খেতেন এবং নিজের স্থানে বসাতেন। আবার পিতা তার ঘরে গেলে মেয়ে উঠে দাঁড়াতেন, পিতাকে চুমু দিতেন এবং জিনের স্থানে নিয়ে বসাতেন।১৪৫

স্বামীগৃহে ফাতিমা (রা) নিজ হাতে যাবতীয় কাজ করতে করতে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। একদিন পিতার কাছে এসেছিলেন একটি দাসী প্রাপ্তির আবেদন নিয়ে। ঘটনাক্রমে পিতার দেখা পেলেন না। মা ‘আয়িশাকে এ ব্যাপারে কথা বলার দায়িত্ব দিলে তিনি ফিরে গেলেন।১৪৬

আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন। ‘‘একদিন আমরা সকল স্ত্রী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাশে বসে আছি। এমন সময় ফাতিমা সামনের দিক থেআেসলো। তার চলন ছিল বিকল রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মত, একটুও পার্থক্য ছিল না রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত আবেগের সাথে তাকে ডেকে পাশে বসালেন। তারপর চুপে চুপে তার কানে কিছু কথা বললেন। ফাতিমা কাঁদতে লাগলো। তার অস্থিরতা দেখে রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কানে কাকে আবার কিছু বললেন। এবার ফাতিমা হাসতে লাগলো। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ আমি বললামঃ ফাতিমা! রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের বাদ দিয়ে তোমার কাছে গোপন কথা বলেন, আর তুমি কাঁদছো? রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উঠে গেলে আমি ফাতিমার নিকট বিষয়টি জানতেচাইলাম। সে বললোঃ আমি আমার আববার গোপন কথা ফাঁস করবো না।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর ‘আয়িশা (রা) আবার একদিন বিষয়টি জানতেচান। ফাতিমা বলেন, আমার কান্নার কারণ হলো, তিনি আমাকে তাঁর মৃত্যুর কথা বলেছিলেন। হাসির কারণ হলো, তিনি আমাকে বলেনঃ ফাতিমা! এ কি তোমার পছন্দ নয় যে, তুমি সারা পৃথিবীর নারীদের নেত্রী হও?’’১৪৭

উপরে উল্লেখিত এ সকল ঘটনা দ্বারা ‘আয়িশার (রা) সাথে তাঁর সতীন-কন্যাদের কেমন মধুর সম্পর্ক ছিল তা বুঝা যায়। এ ধরনের আরো বহু ঘটনা হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থসমূহে বিদ্যমান।

যুদ্ধ-বিগ্রহ

ইমাম বুখারী বর্ণণা করেছেন। আনাস (রা) উহুদ যুদ্ধের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেনঃ আমি ‘আয়িশা ও উম্মু সুলাইমকে (রা) দেখলাম, তাঁরা কাঁধে করে মশক ভরে পানি এনে আহতদের মুখে ঢালছেন। পানি শেষ হয়ে গেলে আবার ভরে এনে ঢালছেন।১৪৮ উহুদ যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স দশ এগারো বছরের বেশি হবেনা। এই যুদ্ধে তিনি যোগদান করে আহতদের সেবা করেছেন।

ইমাম বুখারী বলেন, বনু মুসতালিক যুদ্ধই হলো আল-মুরাইসী ‘যুদ্ধ। এই যুদ্ধটি কোন্ সনে হয় সে সম্পর্কে অবশ্য সীরাত বিশেষজ্ঞদের একটু মতভেদ আছে। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, এটি হয় ষষ্ঠ হিজরীতে। মূসা ইবন ‘উকবা বলেন চতুর্থ হিজরীতে, আর ‘উরওয়া বলেন, এটা পঞ্চম হিজরীর শা‘বান মাসের ঘটনা।১৪৯ আল-মুরাইসী হলো বনু মুসতালিক গোত্রের একটি ঝর্ণা। তাদের নেতা ছিল আল-হারেস ইবন আবী দারবার। সে তার নিজ গোত্র ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গোত্রের লোকদের রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সংগঠিত করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ খবর অবগত হয়ে তাদেরকে দমন করার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে একটি বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন। এই বাহিনীতে বিপুল সংখ্যক মুনাফিক (কপট মুসলমান) অংশগ্রহণ করে যা অন্য কোন যুদ্ধে কখনো করেনি।১৫০ অবশেষে আল-মুরাইসী‘-এর পাশে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। এই অভিযানে মুনাফিকরা হযরত ‘আয়িশাকে (রা) নিয়ে একটি কুৎসিত ষড়যন্ত্র পাকায় ঘটনাটি আরো একটু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি।

হিজরী ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ সনের শা‘বান মাসে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানতে পারলেন যে, মুরাইসী ‘এর পাশে বসবাসকারী লোকেরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করছে। এ কথা জানার পরপরই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে এই লোকদের দিকে যাত্রা করলেন। মুনাফিক-শ্রেষ্ঠ ‘আবদুল্লাহ ইবন উবাই বিপুল সংখ্যক মুনাফিক সকেঙ্গ নিয়ে এই যাত্রায় নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গে শরিক হলো। ইবন সা‘দ বলেন, ইতিপূর্বে কোন যুদ্ধেই এত সংখ্যক মুনাফিক যোগদান করেনি। অভিযান শেষে এমিুনাফিকরা নানাভাবে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। আল্লাহ পাকের রহমত ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দূরদৃষ্টি ও সুযোগ্য নেতৃত্বে ‘আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের সকল চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

এই সফরেই তারা উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশাকে (রা) কেন্দ্র করে এক ষড়যন্ত্র পাকায়। তারা হযরত ‘আয়িশার (রা) পবিত্র চরিত্রের উপর এক চরম অপমানকর মিথ্যা দোষারোপ করে বসে। মূল কাহিনীটি হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাষায় সহীহ বুখারীসহ বিভিন্ন হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ

রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ম লিছ যখন দূরে কোথাও বের হতেন, কুর‘আ‘র মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন, তাঁর স্ত্রীদের মধ্রে কে তাঁর সঙ্গী হবেন। বনী আল মুসতালিক যুদ্ধের সময় কুর‘আ‘য় আমার নামটি আসে। ফটে আমি তাঁর সফর সঙ্গী হই। ফিরে আসার সময় যখন আমরা মদীনার কাছাকাছি পৌছি, রাতের বেলা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক মানযিরে তাঁবু গেড়ে অবস্থান কনের। রাতের শেষভাবে সেখানে থেকে যাত্রার প্রস্ত্ততি শুরু করা হয়। আমি ঘুম থেকে জেগে সআবভাবিক প্রয়োজন সারার জন্য বাইরে গেলাম। ফিরে আসার সময় অবস্থানের কাছাকাছি স্থানে আসতেই মনে হলো যে, আমার গলার হারটি কোথাও পড়ে গেছে। আতি তা খুজতে রেগে গেলাম। ইতিমধ্যে কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেছে। নিয়ম ছিল যে, রওয়ানা হওয়ার সময় আমি আমার ‘হাওদাজে’ (উঠের পিঠের পালকি) বসে যেতাম, তাপর চারজন লোক তা তুলে উটের পিঠের উপর বেঁধে দিত। এই সময় অভাব অনটনের কারণ আমরা মেয়েরা ছিরাম বড়ই হালকা-পাতলা। আমার ‘হাওদাজ’ উঠানোর সময় লোকেরা টেরই পেলনা যে, আমি ওর মধ্যে নেই। অজ্ঞাসতারে তারা হাওদাজ উটের পিঠে বসিয়ে রওয়ানা হলে গেল।

এদিকে আমি হার খুঁজে পেলাম এবং ফিরে এসে সেখানে কাউকে দেখতে পেলাম ন। ফলে আমি আমার গায়ের দাদর দিয়ে সারা শরীর ঢেকে সেখানেই পড়ে থাকলাম। চিন্তা করলাম, সামনে গিয়ে যখন আমাকে দেখতে পাবে না, তখন তারা আমার তালাশে ফিরে আসবে। এই অবস্থায় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল বেলা সাফওয়ান ইবন মু‘য়াত্তাল আল-সুলামী সেখানে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, সেখানে উপস্থিত হলেন। আমাকে দেখেই তিনি চিনতে পারলেন। কারণ পর্দার নির্দেশ নাযিল হওয়ার আগে তিনি আমাকে কয়েকবার দেখিছিলেন। আমাকে দেখে তিনি উট থামালে এবং বিষ্শয়ের সাথে তাঁর মুখে উচ্চারিত হলো-ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন! রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগম সাহেবা এখানে রয়ে গেছেন।

তাঁর কণ্ঠস্বর কানে যেতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম এবং চাদর দ্বারা মুখ ঢেকে ফেলরাম। তিনি আমার সঙ্গে কোন কথাই বললেন না। নিজের উটটি এনে আমার সামনে বসিয়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালেন। আমি উঠের পিঠে উঠে বসলাম, আর তিনি লাগাম ধরে হেঁটে চললেন। প্রায় দুপুরের সময় আমরা কাফেলাকে ধরলাম-যখন তারা এক স্থানে সবেমাত্র থেমেছে। আর আমি যে পিছনে রয়ে গেছি, সে কথা তাদের কেউ জানতেও পারেনি। এই ঘটনার উপর মিথ্রা দোষারোপের এক পাহাড় রচনা করা হরো। যারা এই ব্যাপারে অগ্রণী ছিল, তাদের মধ্রে ‘আবদুল্লাহ ইবন উবাই ছির সবার চেয়োগ্রসর। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে কি কি কথা বরা হচ্ছে, আমি তার কিভুই জানতে পারিনি।’

অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, সাফওয়ানের উটের পিঠে সওয়ার হয়ে হযরত ‘আয়িশা (রা) যে সময় সৈনিকদের তাঁবুতে উপস্থিত হরেন এবং তিনি পিছনে পড়ে ছিলেন বলে জানা গেল, তখন ‘আবদুল্লাহ ইবন উবাই চিৎকার করে বলে উঠলোঃ ‘আল্লাহর কসম! এই মহিলাটি নিজেকে বাঁচিয়ে আসতে পারেনি। দেখ, দেখ, তোমাদের নবীর স্ত্রী অপরের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে, আর এখন সে প্রকাশ্রভাবে তাকে সংগে নিয়ে চলে এসেছে।’

‘আয়িশা (রা) বলেন, ‘‘মদীনায় ফিরে আসার পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। প্রায় এক মাসকাল আমি শয্যাশায়ী হয়ে থাকলাম। শহরের সর্বত্র এই মিথ্যা দোষারোপের খরব উঠে বেড়াতে লাগলো। নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরী হলো’ না। কিন্তু আমি কিচুই জানতে পারলাম না। একটি খটকা অবশ্র আমার মনে লাগছিলো। তা হলো, অসুস্থ অবস্থায রাসূরে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে রকম লক্ষ্র দিতেন, এবার তিনি তেমন দিচ্ছেন না। তিনি ঘরে এল ঘরের লোকদেরকে শুধু জিজ্ঞেস করতেনঃ ‘ও কেমন আছে’? আমার সংগে কোন কথা বলতেন না। এতে আমার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল, কোন কিছু ঘটেছে হয়তো। শেষ পর্যন্ত তাঁর নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে আমি আমার মায়ের নিকট চরে গেলাম। যাতে মা আমার সেবা-শুশ্রুষা ভালোভাবে করতে পারেন।

একদিন রাতের বেলা প্রকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে ঘরের বাইরে গেলাম। তখনও পর্যন্ত আমাদের সব বাড়ীতে পায়খানা নির্মিত হয়নি। আমরা প্রাকৃতিক প্রয়োজনের জন্য বনে-জঙ্গলেই যেতাম। আমার সংগে মিসতাহ ইবন উসাসা’র মাও ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার পিতার খালাতো বোন। তিনি পথ চরতে গিয়ে হোঁচট খান। তখন অকম্শাৎ ত৭ার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়! ধ্বংস হোক মিসতাহ’। আমি বরলামঃ আপনি কেমন মা? নিজের ছেলের ধ্বংস কামনা কনের! আর ছেলেও এমন, যে বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিল। তিনি বললেনঃ ‘‘মেয়ে! তুমি কি কোন খবরই রাখো না? তারপর তিনি আমাকে সকল কাহিনী বললেন। মিথ্রাবাদীরা আমার সম্পর্কে কি কি বলে বেড়াচ্ছিল, তা সবই শোনালে।’’

উল্লেখ্য যে, মুনাফিকীন ছাড়ও মুষ্টিমেয় কিছু মুসলমান এই মিথ্যার অভিযানে শরিক হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্রে মিসতাহ ইবন উসাসা, ইসলামের প্রখ্যাত কবি হাসসান ইবন সাবিত ও হযরত যয়নাব (রা) এর বোন হামনা বিনত জাহাশ বিশেষ উল্লেকযোগ্য। ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ এই কাহিনী শুনে আমার রক্ত যেন পানি হয়ে গেল। যে জন্য এসছিলাম, সেই প্রয়োজনের কথাও ভুলে গেলাম। সোজা ঘরে ফিরে গেলাম এবং সারা রাত কেঁদে কাটালাম।

এদিকে আমার অনুপস্থিতিকালে রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আলীও উসামা ইবন যায়িদকে (রা) ডাকলেন এবং তাদের নিকট এই বষিয়ে পরামার্শ চাইলেন। উসামা (রা) আমার পক্ষে ভালো কথাই বললেন। বললেনঃ ইয়া রাসূলার্লাহ! আপনার স্ত্রীর মধ্যে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু কখনো দেখতে পাইনী। যা কিছু বলে বেড়ানো হচ্ছে, তা সবই মিথ্যা কথা, রচিত অভিযেগা মাত্র। আর ‘আলী বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের সমাজে মেয়ে লোকের কোন অভাব নেই। আপনি এর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে পারেন। আর আসল ব্যাপার যদি জনতে চান, তাহলে দাসীকে ডেকে অবস্থা জেনে নিতে পারেন।

দাসীকে ডাকা হলো এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। সে বললোঃ ‘আল্লাহর কসম যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন, আমি তাঁর মধ্যে খারাপ কিছুই দেখিনি-যে সম্পর্কে আপত্তি করা যেতে পারে। দোষ শুধু এতটুকুই দেখেছি যে, আমি আটা মেখে রেখে যেতাম, আর বরতাম, একটু দেখবেন। কিন্তু তিনি ঘুমেয় পড়তেন, আর তৈরি আটা ছাগর এসে খেয়ে যেত।’

সেইদিন নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর এক ভাষণে বললেনঃ ‘হে মুসলমানরা, তেমাদের মধ্যে এমন কে আছে-আমার স্ত্রীর উপর মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমাকে যে কষ্ট দিয়েছে-তার আক্রমণ হতে আমাকে বাঁচাতে পারে? আল্লাহর শপথ, আমি আমার স্ত্রীর মধ্যে কোন দোষ দেখতে পাইনি, না সেই লোকটির মধ্যে যার সম্পর্কে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।ভ আমার অনুপস্থিতির সময় সে তো কখনই আমার ঘরে আসেনি।’ এই কথা শুনে হযরত উসাইদ ইবন হুদাইর, কোন কোনবণৃনা মতে হযরত সা’দ ইবন মু‘য়াজ (রা) দাঁড়িয়ে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ। অভিযোগকারী যদি আমাদের বংশের লোক হয়ে থাকে, তাহলে আমরা তাকে হত্যা করবো। আর আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোক হলে আপনি যা বলবেন, তাই করবো।’ এই কথা শুনেই খাযরাজ গোত্র-প্রধান সা‘দ ইবন ‘উবাদা দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেনঃ ‘তুমি মিথ্যা বলছো, তুমি কিচুতেই তাকে মারতে পারবে না। তুমি তাকে হত্যা করার কথা শুধু এই জন্য বলছো যে, সে খাযরাজ গোত্রের লোক। সে তোমাদের লোক হলে তুমি কখনই তাকে হত্যা করার কথা বলতে পারতে না।’ জবাবে তাকে বলা হয়েছিলঃ তুমি তো মুনাফিক, এই জন্য মুনাফিকদের সমর্থন দিচ্ছো।’

এই বাক-বিতন্ডায় মসজিদে নববীতে একটা হট্ট্রাগোলের সৃষ্টি হয়। আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের লোকেরা মসজিদেই লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু নবী কারীম (সাল্ল¬াল্ল-াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে ঠান্ডা করেন এবং পরে মিন্বরের উপর হতে নেমে আসেন।

অন্তত একমাত্র কাল এই মিথ্যা দোষারোপের বানোয়াট কথা সমাজে উড়ে বেড়াতে লাগলো। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠিন মানসিক কষ্ট পেতে থাকলেন। আমি কান্নাকাটি করতে লাগলাম। আমার পিতা-মাতা সীমাহীন দুশ্চিন্তায় ও উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিলেন। শেষ পযন্ত নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন আসলেন এবং আমার পাশে বসলেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি একবারও আমার কাছে বসেননি। আবু বকর ও উম্মু রুমান (আয়িশার পিতা-মাতা) মনে করলেন, আজ হয়তো কোন সিদ্ধান্তমূলক কথা হয়ে যাবে। এই কারণে তাঁরাও নিকটে এসে বসলেন। নবী কারী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আয়িশা, তোমার সম্পর্কে এই সব কথা আমার কানে পৌঁছেছে। তুমি যদি নিষ্পাপ হয়ে থাক, তাহলে আশা করি আল্লাহ তোমার নির্দোষিতা প্রকাশ ও প্রমাণ করে দেবেন। আর তুমি যদি বাস্তবিকই কোন প্রকার গুনাহে লিপ্ত হয়ে থাক, হাতলে আল্লাহর নিকট তাওবা কর, ক্ষা চাও। বান্দাহ যখন গুনাহ স্বীকার করে, তাওবা করে,তখন আল্লাহ মা‘ফ করে দেন।

এই কথা মুনে আমার চোখের পানি শুকিয়ে গেল। আমি পিতাকে বললাম, আপনি রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথার জনাব দিন। তিনি বলরেনঃ মেয়ে! আমি কি বলবো তা বুঝতে পারছিনা।’ আমি আমার মাকে বললাম, আপনিই কিছু বলুন।: তিনি বললেনঃ আমি কি বলবো তা আমার বুঝে আসে না।’ তখন আমি বললামঃ আপনাদের কানে একটা কথা এসেছোমনি তা মনের মধ্যে বসে গেছে। এখন আমি যদি বলি, আমি নির্দোষ-আল্লাহ সাক্ষী, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ-তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি শুধু শুধুই এমনএকটা কথা স্বীকার করে নিই যা আমি আদৌ করিনি-আল্লাহ জানেন যে, আমি তখন হযরত ইয়াকুব (আ) এর নামটি স্বরণ করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তা স্বরণে এলো না। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, এমন অবস্থায় আমি সেই কথা বলা ছাড়া আর কোন উপায় দেখি না, যা হযরত ইউসুফ (আ) এর পিতা বলেছেনঃ

আরবি হবে

এই কথা বলে আমি অপরদিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। আমি মনে মনে বললামঃ আল্লাহ আমার নির্দোষিতা সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। তিনি নিশ্চয়ই প্রকৃত ব্যাপার লোকদের সামনে উম্মোচিত করে দিবেন। তবে আমার সপক্ষে ‘ওহী’ নাযিল হবে, আর তা কিয়ামত পর্যন্ত পড়া হবে, এমন ধাণা আমার মনে কখনো আসেনি। আমি মনে করেছিলাম, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন স্বপ্ন দেখবেন, আর তাতে আল্লাহ আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দিবেন। এরই মধ্রে নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর ‘ওহী’ নাযিল হওয়াকালীন অবস্থা সৃষ্টি হলো। এমনকি তীব্র শীতের মধ্যে তাঁর চেহারা মুবারক হতে ঘামের ফোটা টপ টপ করে পড়তে লাগলো। এমন অবস্থা দেখে আমরা সবাই চুপ হয়ে গেলাম। আমি মনে মনে পূর্ণমাত্রায় নির্ভয় ছিরাম। কিন্তু আমার পিতা-মাতার অবস্থা ছিল বড়ই মর্মান্তিক। আল্লাহ কোন মহাসত্য উদঘাটন করেন, সেই চিন্তায় তারা ছিলেন অস্থির, উদ্বিগ্ন। ‘ওহী’ কালীন অবস্থা শেষ হয়ে গেলে রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুবই উৎফুল্ল দেখা গেল। তিনি হাসি সহকারে প্রথম যে কথাটি বললেন তা ছিল এইঃ ‘আয়িশা, তোমাকে সুসংবাদ। আল্লাহ তোমার নির্দোষিতা ঘোষণা করে ওহী নাযিল করেছেন। অতঃপর তিনি সূরা আন-নূর-এর ১১ আয়াত থেকে ২১ নং আয়তা পর্যন্ত পাঠ করে শুনালেন। আমার মা তখন আমাকে বললেনঃ ‘ওঠা, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুকরিয়া আদায় কর।’ আমি বললামঃ আমি না উনার শুকরিয়া আদায় করবো, আর না আপনাদের দুইজনের। আমি তো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, যিনি আমার নির্দোষিতা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। আপনারা তো এই মিথ্যা অভিযোগকে অসত্য বলেও ঘোষনা করেন নি।১৫১

হযরত ‘আয়িশার (রা) বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপিন করা হয়েছিল, আল-কুরআনের ভাষায় তাকে ‘আল-ইফক’ বলা হয়েছে। এই শব্দ দ্বারা স্বয়ং আর্লাহ তা‘আলার তরফ হতে এইাভিযোগের পরিপূর্ণ প্রতিবাদ করা হয়েছে। ‘ইফক’ শব্দের অর্থ মূল কথাকে উল্টিয়ে দেওয়া, প্রকৃত সত্যের বিপরীত যা ইচ্ছা বলে দেওয়া। এই অর্থের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনপড়া কথা-অর্থে ব্যবহৃত হয়। কোন অভিযোগ সম্পর্কে শব্দটি প্রযোগ হলে তার অর্থ হয়, সুস্পষ্ট মিথ্যা অভিযোগ, মিথ্যা দোষারোপ।১৫২

হযরত ‘আয়িশার (রা) নির্দোষিতা ঘোষণা করে কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়ার পর সুষ্পষ্ঠভাবে মিথ্যা দোষারোপ করার অভিযোগে দুইজন পুরুষ ও একজন নারীর উপর ‘হদ’ (নির্ধারিত শাস্তি) জারি করা হয়। তাঁরা হলেনঃ মিসতাহ ইবন উসাসা, কবি হাসসান ইবন সাবিত ও হামনা বিনত জাহাশ (রা)।১৫৩

তায়াম্মুমের আয়াত নযিলের ঘটনাঃ

আল্লাহ পাক হযরত ‘আয়িশাকে (রা) উপলক্ষকরে মানবজাতিকে বহুবিধ কল্যাণের থ দেখিয়েছেন। ‘ইফকূ কে কেন্দ্র করে মানব সমাজে যৌনাচার ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র রাখার জন্য অনেকগুলি বিধি বিষেধ ও দন্তবিধি গোষণা করেছেন। তেমনি পাক-পবিত্র হওয়ার জন্য পানির বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুমের সুযোগও তাঁকেই কেন্দ্র করে দান করেছেন। এখানে সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা বলে মনে করি।

একবার আর এক সফরে ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সংগে ছিলেন। ইবন সা‘দের মতে, এটাও ছির ‘আল-মুরাইসী’ যুদ্ধ-সফরের ঘটনা।১৫৪ সেই একই হার এবারও তাঁর গলায় ছিল। কাফেলা যখন ‘জাতুল জাইশ’ অথবা আল-বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে, তখন হারটি গলা থেকে আবার ছিঁড়ে কোথায় পড়ে যায়।১৫৫ পূর্বের ঘটনায় তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান হয়েছিল। তাই এবার সাথে সাথে ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবহিত করেন। সময়টি ছিল প্রভাত হওয়ার কাছাকাছি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাত্রা বিরতির নির্দেশ সৈন্যরা যেখানে তাঁবু গেঁড়েছিল সেখানে বিন্দুমাত্র পানি ছিল না। এ দিকে ফজরের নামাযের সময় হয়ে গেল। লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হযরত আবু বকরের (রা) নিকট ছুটে গিয়ে বললো, ‘আয়িশা (রা) সৈন্য বাহিনীকে কী বিপদের মধ্যে ফেলে দিল। আবু বকর (রা) তখন সোজা ‘আয়িশা (রা) কাছে দৌঁড়ে গেলেন। দেখলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) হাঁটুর উপর মাথা রেখে একটু আরাম করছেন। আবু বকর (রা) উত্তেজিত কণ্ঠে মেয়েকে বললেন, তুমি সব সময় মানুষের জন্য নতুন নতুন মুসীবত ডেকে আন। এ কথা বলে তিনি রাগে-ক্ষোভে মেয়ের পাঁজবে কয়েকটি খোঁচা মারেন। কিন্তু ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরামের ব্যাঘাত হবে ভেবে একটুও নড়লেন না।

এদিকে সকাল হলো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুম থেকে গেজে সবকিছু অবগত হলেন। ইসলামী বিধি-বিধানের এ এক বৈশিষ্ট্য যে, সর্বদা তা উপযুক্ত সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলামে এর আগে নামাযের জন্য ওযু ফরয ছিল। কিন্তু এই ঘটনার সময় পানি না পাওয়া গেলে কি করতে হবে, সে সম্পর্কে করণীয় কর্তব্য বলে দিয়ে নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হলঃ

আরবি হবে

‘‘আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী-গমনকরে থাকে, কিন্তু পারে যদি পানি না পায়, তবে পাক-পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করেনাও। তাতে তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয় আল্লাহতা‘আলা ক্ষমাশীল।’’ (আন-নিসাঃ ৪৩)

মূলত তায়াম্মুমের হুকুম একটি পুরষ্কার বিশেষ-যা এ উম্মাতেরই বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তা‘আলার কতই না অনুগ্রহ যে, তিনি ওযু-গোসল প্রভৃতি পবিত্রতার নিমিত্তে এমন এক বস্ত্তকে পানির স্থালাভিষিক্ত করে দিয়েছেন, যার প্রাপ্তি পানি অপেক্ষাও সহজ। আর এ সহজ ব্যবস্থাটি পূর্ণবর্তী কোন উম্মাতকে দান করা হয়নি, একমাত্র উম্মাতে মুহাম্মদীকেই দান করা হয়েছে।

যা হোক, মুসলিম মুজাহিদদের আবেগ-উত্তেজনায় টগবটে দলটি-যারা তখন পানি না পাওয়ার জন্য নিজেদেরকে বিপদগ্রন্থ মনে করছিল, আল্লাহর এ রহমত লাভে ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। হযরত উসাউদ ইবন হুদাউর-যিনি একজন বড় মাপের সাহাবী ছিলেন, আবেগ ভরে বলে উঠলেনঃ‘ওহে আবু বকর সিদ্দীকের পরিবারবর্গ! ইসলামের এটাই আপনাদের প্রথম কণ্যাণ নয়।১৫৬

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, উসাইদ ইবন হুদাইর ‘আয়িশাকে (রা) লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন! আপনার উপর যখনই কোনবিপদ এসেছে-যা আপনি পছন্দ করেন না, তখনই আল্লাহ তার মাধ্যমে আপনার ও মুসলমানদের জন্য কোন না কোন কল্যাণ দান করেছেন।১৫৭

হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা) যিনি কিছুক্ষণ আগেই প্রিয়তমা কন্যাকে শিক্ষাদানের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, গর্বের সাথে এখন তিনি সেই কন্যাকে সন্বোধন করে বলছেনঃ ‘আমার কলিজার টুকরা! আমার জানা ছিল না যে, তুমি এতখানি কল্যাণময়ী। তোমার অসীলায় আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম উম্মাহকে এতখানি বরকত ও আসানী দান করেছেন।১৫৮

উল্লেখ্য যে, ‘আয়িশা (রা) এই হারটি বোন আসমার (রা) নিকট থেকে পরার জন্য ধার নিয়েছিলেন।১৫৯ এরপর কাফেলা চলার জন্য যখন ‘আয়িশার (রা) উটটি উঠানো হয় তখন সেই উটের নিচে হারটি পাওয়া যায়।১৬০

ঈলা বা তাখঈর-এর ঘটনা :

রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) যুগর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা অনেক। তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুইটি হলোঃ তাহরীম ও ঈলা বা তাখঈর-এর ঘটনা। তাহরীম হলো মধু সংক্রান্ত সেই ঘটনা যা হযরত হাফসার (রা) জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। অপর ঘটনাটির প্রতি পূর্বে কোথাও কোথাও ইঙ্গিত করা হলেও বিশদ আলোচনা হয়নি, তাই এখানেবর্ণনা করা হলো।

এটা হিজরী ৯ম সন, মতান্তরে আহযাব ও বনু কুরাইজার সমসাময়িক কালের ঘটনা।১৬১ তখন আরবের দূর-দূরান্তের ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামের বাইতুল মালে প্রতিনিয়ত সম্পদ জমা হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিবারের লোকরা যে অভাব-অনটন ও মিতব্যয়িতার ভিতর দিয়ে চলছিলেন, তার কিছু ইঙ্গিত পূর্বেই এসে গেছে। খাইবার বিজয়ের পর যে পরিমাণ শস্যদানা ও খেরারমা খেজুর আযওয়াজে মুতাহ্হারাতের সারা বছরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা ছির খুবই অপ্রতুল। তাছাড়া তাঁদের প্রত্যেকের চিল অতিথি সেবার অভ্যাস ও দান-খায়রাতের হাত। এ কারণে তাঁদের জীবন যাপনের মান ছিলাতি নিম্ন পর্যায়ের। তাদের প্রতিটি দিন কাটতো অনাহার-অর্ধাহারে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের আগে তাঁরা নিজের পিতৃপৃহে অথবা পূর্বের স্বামীর ঘরে অত্যন্ত বিরাসী জীবন যাপন করতেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতে অর্থ-সম্পদের আধিক্য দেখে তাঁরা একযোগে তাঁদের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির দাবি জানান।

এ কথা ‘উমারের (রা) কানে গেলে প্রথমে তিনি নিজের মেয়ে হাফসাকে (রা) এই বলে বুঝালেন যে, তুমি তোমার জীবিকার পরিমাণ বৃদ্ধির দাবী জানাচ্ছো। তোমার যা প্রয়োজন হয় আমার কাছেই চাইতে পার।তারপর হযরত ‘উমার (রা) এক এক করে উম্মাহাতুল মুমিনীনের প্রত্যেকের দরজায় যেয়ে তাঁদেরকে বুঝান। হযরত উম্মু সালামা বলেনঃ উমার! আপনি তো প্রতিটি ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেই থাকেন, এখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীদের ব্যাপারও হস্তক্ষেপ করা আরম্ভ করলেন।’ একথা শুনে উমার (রা) অপমাণিত হয়ে চুপ হয়ে গেলেন।’

একদিন আবু বকর ও উমার (রা) দু’জন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট উপস্থিত হয়ে দেখলেন, রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘিরে তাঁর স্ত্রীরা বসে আছেন এবং তাঁদের জীবিকার পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য তাঁকে চাপচাপি করছেন। উভয়ে নিজনিজ মেয়ে-আয়িশা ও হাফসাকে মারতে উদ্যত হলেন। তখন তাঁরা এই অঙ্গীকার করে আপন আপন পিতার হাত থেকে রক্ষা পেলেন যে, আগামীতে তাঁরা আর জীবিকা বৃদ্ধির দাবী জানিয়ে রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কষ্ট দেবেন না।

অন্য স্ত্রীরা তাঁদের দাবীর উপর অটল থাকলেন ঘটনাক্রমে এই সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান এবং পাঁজরে গাছের একটি মূলের সাথে ধাক্কা গেলে আহত হন।১৬২

হযরত ‘আয়িশার (রা) হুজরা সংলগ্ন আর একটি ঘর ছির যাকে ‘আল-মাশরাবা বলা হতো। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, আগামী এক মাস কোন স্ত্রীর কাছেই যাবেন না।এই ঘটনাটি মুনাফিকরা প্রচvার করে দেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সকল স্ত্রীকে তালাক দান করেছেন। একথা শুনেসাহাবা-ই-কিরাম মসজিদে সমবেত হন। ঘরে ঘরে একটা অস্থিরতার ভাব বিরাজ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীরা কান্নাকাটি শুরু করে দেন। সাহাবীদের মধ্র থেকে কেউই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট থেকে ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ের সাহস করলেন না।

হযরত উমার (রা) খবর পেয়ে-মসজিদে নববীতে এসে দেখলেন, সাহাবায়ে কিরাম বিমর্ষ অবস্থায় চুপচাপ বসে আছেন। তিনি রাসূলে পাকের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে দুইবার কোন সাড়া পেলেন না। তৃতীয় বারের মাথায় অনুমতি পেয়ে ঘরে ঢুকে দেখেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি চৌকির উপর শুয়ে আছেন, তাঁর পবিত্র দেহে মোটা কম্বলের দাগ পড়ে গেছে। উমার (রা) ঘরের চার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখলেন, সেখানে কয়েকটি মাটির পাত্র ও শুকনো মাশক ছাড়া আর কোন জিনিস নেই। এ অবস্থা দেখে উমারের (রা) চোখে অশ্রু নেমে এলো। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন? জবাব দিলেনঃ না। উমার বললেনঃ আমি কি এ সুসংবাদ মুসলমানদের মধ্য প্রচার করে দিব? রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুমতি পেয়ে উমার (রা) গলা ফাটিয়ে আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে ওঠেন।

এই মাসটি ছিল ২৯ দিনের। আয়িশা (রা) বলেনঃ আমি একটি একটি করে দিন গুণতাম। ২৯ দিন পূর্ণ হলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।’ রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বপ্রথম আয়িশা (রা) ঘরে যান। তিনি আরজ করেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তো এক মাসের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আজ তো উনত্রিশ দিন হলো। তিনি বললেনঃ কোন মাস ২৯ দিনেও হয়।১৬৩

যেহেতু আযওয়াজে মুহাহ্হারাত জীবন-যাপনের মান বৃদ্ধির দাবীদার ছিলেন অন্যদিকে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীদের সন্তুষ্টির জন্য পার্থিব ভোগ-বিলাস দ্বারা নিজেকে কলুষিত করতে পারেন না।এই জন্য আল্লাহ তা‘আলা ‘তাখঈর’-এর আয়া নাযিল করেন। ‘তাখঈর’ অর্থ ইখতিয়ার ও স্বাধীনতা দান করা। অর্থাৎ স্ত্রীদের মধ্যে যাঁর ইচ্ছা দরিদ্র্য ও অভাব-অনটর মেনে নিয়ে আল্লাহর রাসূলের সাথে সংসার ধর্ম পালন করেন। আর যাঁর ইচ্ছা তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন। আয়াতটি নিম্নে উদ্ধৃত হলোঃ

আরবি হবে

‘‘হে নবী! তোমাদের স্ত্রীদের বলঃ তোমরা যদি দুনিয়া ও তার চাকচিক্যই পেতে চাও তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু দিয়ে ভালোভাবে বিদায় করে নিই। আর যদি তোমরা আল্লা ও তাঁর রাসূল ও পরকারে ঘর পেতে চাও, তবে জেনে রাখ তোমাদের মধ্যে যারা নেককার, তাদের জন্য আল্লাহ বিরাট পুরষ্কার নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।’’ (আল আহযাব :২৯)

মুসলিম শরীফে উল্লেখিত হাদীসে হযরত জাবির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রা) সেই সময়কার ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন যে, একদিন হযরত আবু বকর ও হযরত ‘উমার (রা) নবী কারীমের (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খিদমতে হাজির হয়ে দেখতে পেলেন যে, হযরতের পত্মীগণ তাঁর চারপাশে বসে আছেন, আর রাসূলও (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপচাপ বসে আছেন। তিনি হযরত ‘উমারকে (রা) লক্ষ্য করে বললেনঃ তোমরা দেখছো, এরা আমার চারপাশে বসে আছে; আসলে এরা আমার নিকট খরচের টাকা চাচ্ছে।’ এই কথা শুনে উভয় সাহাবী নিজ নিজ কন্যাকে খুব করে শাসিয়ে দিলেন এবং তাঁদেরকে বললেনঃ ‘তোমরা রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কষ্ট দিচ্ছ এবং তাঁর নিকট এমন জিনিস চাচ্ছো যা তাঁর নিকট নেই।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, মারতে উদ্যত হলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদেরকে থামালেন।১৬৪ বস্ত্তত তখন নবী কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কতদূর আর্থিক অনটনের মধ্যে ছিলেন, তা উপরোক্ত ঘটনা হতে স্পষ্ট জানা যায়।

এই আয়াত যখননাযিল হলো, তখন নবী কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বপ্রথম হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে কথা বললেনঃ ‘তোমাকে একটি কথা চলছি।, খুব তাড়াতাড়ি করে জবাব দিও না। তোমার পিতা-মাতার মতামত জেনে নাও।’ তারপর নবী কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে উল্লেখিত আয়াতটি পাঠ করে শোনালেন এবং বললেন, আল্লাহর নিকট থেকে এই হুকুম এসেছে। সাথে সাথে হযরত ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ এবিষিয়ে আমার বাবা-মার নিকট কি জিজ্ঞেস করবো? আমি তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং পরকালের সাফল্যই চাই। ‘আয়িশার (রা) এমন জবাবে রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারুণ খুশী হলেন। তিনি বললেনঃ বিষয়টি যেভাবে তোমার নিকট উপস্থাপন করেছি সেভাবে তোমার অন্য সতীনদের নিকটও করবো। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ অনুগ্রহ করে আপনি আমার সিদ্ধান্তের কথাটি অন্য কাউকে জানাবেন না। কিন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সে অনুরোধ রাখেননি। তিনি যেভাবে ‘আয়িশাকে (রা) কথাটি বলেছিলেন, ঠিক সইেভাবে তাঁর সতীনদেরকেও বলেন। সাথে সাথে এ কথাটিও বলে দেন যে, ‘আয়িশা (র) আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আখিরাতকে গ্রহণ করেছে।১৬৫ তাঁদের প্রত্যেকেই ‘আয়িমার মত (রা) একই জবাব দেন। সীরাতের গ্রন্থসমূহে এই ঘটনা ‘তাখঈর’ নামে অভিহিত হয়েছে। ‘তাখঈর’ অর্থ ইখতিয়ার দান করা। স্ত্রী স্বামীর সাথে থাকবে, নাকি তাঁর নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে-এই দুইটিন কোন একটি গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণকরার ইখতিয়ার স্ত্রীকে অর্পণ করা।

সাইয়েদ আবুল আ‘লা মাওদূদী (রহ) ইবনুল ‘আরাবীর আহকামুল কুরআনের সূত্রে বলেছেনঃ ‘তাখঈর’ এর আয়াত নাযিল হওয়ার সময় হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চারজন বেগম বর্তমান ছিলেন। তাঁরা হলেনঃ হযরত সাওদা (রা), হযরত ‘আয়িশা (রা), হযরত হাফসা (রা) ও হযরত উম্মু সালামা (রা)।১৬৬ তবে আল্লামা ইবনকাসীর হযরত ‘ইকরিমার (রা) সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, সেই সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মোট নয়জন বেগম ছিরেন। পাঁচজন কুরাইশ খান্দানের-‘আয়িমা, হাফসা, উম্মু হাবীবা, সাওদা ও উম্মু সালামা (রা) এবং অন্যরা হলেন-সাফিয়্যা, মাইমুনা, জুওয়াইরিয়া ও যয়নাব বিতন জাহাশ আল-আসাদিয়্যা (রা)।১৬৭ ঘটনার সময়কাল নিয়ে মতভেদের কারণে এই পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্বামীর ইনতিকাল

হযরত ‘আয়িশার (রা) বয়স যখন আঠারো বছর তখন স্বামী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকাল করেন। হিজরী ১১ সনের সফর মাসের পূর্বে কোন একদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) ঘরে এসে দেখেন, তিনি মাথার যন্ত্রণায় আহ উহ করছেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর এ অবস্থা দেখে বললেনঃ তুমি যদি আমার সামনে মারা যেতে, আমি তোমাকে নিজ হাতে গোসল দিয়ে কাফন-দাফন করতাম। ‘আয়িশার (রা) সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া জানালেন এভাবেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তো একথা বলছেন এ জন্য যে, যাতে এই ঘরে অন্য একজন স্ত্রীকে এনে উঠাতে পারেন। একথা শুনে রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের মাথায় হাত রেখে বলে ওঠেনঃ হায় আমার মাথা! বলা হয়েছে, মূলত তখন থেকেই রাসূলাল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়।১৬৮ এরপর তিনি হযরত মায়মূনার (রা) ঘরে গিয়ে শয্যাশয়ী হয়ে পড়েন। এ অবস্থায়ও তিনি নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট স্ত্রীর ঘরে রাত কাটাতেন। কিন্তু প্রত্যেক দিনই জানতে চাইতেন, আগামী কাল তিনি কোথায় থাকবেন? স্ত্রীগণ বুঝতে পারলেন তিনি ‘আয়িশার (রা) কাছেই থাকতে চাচ্ছেন। তাই তাঁরা সবাই অনুমতি দিলেন। সেই দিন থেকে পার্থিবীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ‘আয়িশার (রা) ঘরে অবস্থান করেন।১৬৯

এখন কারো মনে এ প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত ‘আয়িশার (রা) কাছে যাওয়ার জন্য এত ব্যাকুল ছিলেন কেন? তাঁকে অতিমাত্রায় ভালোবসার কারণে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তা নয়। মূলত আল্লাহ ‘আয়িশাকে (রা) যে পরিমাণ বুদ্ধি, মেধা, স্মরণশক্তি, স্বভাবগত পূর্ণতা এবং চিন্তাশক্তি দান করেছিলেন তা জন্য কোন স্ত্রীর মধ্যে ছিল না। সুতরাং এমন ধারণা অমূলক নয় যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদ্দেশ্যে ছিল, তাঁর জীভনের শেষ দিনগুলির যাবতীয় কথা, কাজ ও আচরণ যেন পূর্ণরূপে সংরক্ষিত থাকে। বাস্তবে তাই হয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতে সংক্রান্ত অধিকাংশ সহীহ বর্ণনা ‘আয়িশার (রা) মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছেছে।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোগের তীব্রতা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এক পর্যায়ে তিনি ইমামতির জন্য মসজিদে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েন। সহধর্মিণীগণ সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট থেকে শেখা কিছু দু‘আ পড়ে তাঁরা ফুঁক দিচ্ছিলেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) কিছু দু‘আ পড়ে ফুঁক দিয়েছিলেন।১৭০

ফজরের নামাযে সমবেত মুসল্লীরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপেক্ষায় বসে ছিলেন। তিনি কয়েকবার ওঠার চেষ্টা করতেই অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। অবশেষে তিনি আবু বকরকে (রা) ইমামতি করার নির্দেশ দিলেন। ‘আয়িশা (রা) বলেন, আমার ধারণা হলো, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্থলে যিনিই দাঁবাবেন মানুষ তাঁকে অপাংক্তেয় ও অশুভ মনে করবে। এজন্য আমি বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবু বকর একজন নরম দিলেন মানুষ। তাঁরা দ্বারা এ কাজ হবে না। তিনি কেঁদে ফেলবেন। অন্য কাউকে নির্দেশ দিন। কিন্তু তিদ্বিতীয়বার একই নির্দেশ দিলেন। তখন ‘আয়িশা (রা) হাফসাকে (রা) অনুরোধ করলেন কথাটি আবার রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন্তব্য করলেনঃ ‘তোমরা সবাই ইউসুফের সঙ্গিনীদের মত। বলে দাও, আবু বকর ইমামতি করবেন।১৭১

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ হয়ে পড়ার পূর্বে কিছু নগদ অর্থ ‘আয়িশার (রা) নিকট রেখে খরচ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। এখন এই প্রবল রোগের মধ্যে সে কথা স্মরণ হলো। ‘আয়িশাকে (রা) বললেনঃ সেই দিরহামগুলি কোথায়? ওগুলি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে ফেল। মুহাম্মদ কি বিরূপ ধারণা নিয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হবে? তখনই সেই অর্থ দরিদ্র লোকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়।১৭২

এখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ সময়। ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথার কাছে বসা এবং তিনিও ‘আয়িশার (রা) সিনার সাথে ঠেস দিয়ে বসে আছেন। ‘আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুস্থতার জন্য দু‘আ করে চলেছেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাত তাঁর হাতের মধ্যেই। হঠাৎ নি টান দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলেনঃ

আরবী হবে (আল্লাহুমা ওয়ার রাফীকিল আ‘লা)

অর্থাৎ, আল্লাহ! আমি সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুকেইগ্রহণ করছি।১৭৩

‘আয়িশা (রা) বলেনঃ সুস্থ অবস্থায় তিনি বলতেন, প্রত্যেক নবীর মরণকালে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনের যে কোন একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই শব্দগুলি উচারণের পর আমি বুগগেলাম যে, তিনি আমাদের থেকে দূরে থাকেই কবুল করেছেন।১৭৪ তিনি আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনার তো বড় কষ্ট হচ্ছে। বললেনঃ কষ্ট অনুপাতে প্রতিদানও আছে।

‘আয়িশার (রা) হযরত রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামলে নিয়ে বসে আছেন। হঠাৎ তাঁর দেহের ভার অনুভব করলেন। চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, তিনি আর নেই। আস্তে করে পবিত্র মাথাটি বালিশের উপর রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।১৭৫

হযরত ‘আয়িশার (রা) সবচেয়ে বড় সম্মান ও মর্যাদা এই যে, তাঁরই ঘরের মধ্যে, এক পাশে রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র দেহ সমাহিত করা হয়।১৭৬

একবার হযরত ‘আয়িশা (রা) স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর ঘরে একের পর এক তিনটি চাঁদ ছুটে এসে পড়ছে। তিনি এই স্বপ্নের কথা পিতা আবু বকর সিদ্দীককে (রা) বলেন। যখন রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ঘরে দাফন করা হলো তখন আবু বকর (রা) মেয়েকে বললেন, সেই তিন চাঁদের একটি এই এবং সবচেয়ে ভালোটি।১৭৭ পরবর্তী ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, তাঁর স্বপ্নের দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাঁদ ছিলেন আবু বকর (রা) ও ‘উমার (রা)।

হযরত ‘আয়িশা (রা) আঠারো বছর বয়সে বিধবা হন এবং এ অবস্থায় জীভনের আরো আটচল্লিশটি বছর অতিবাহিত করেন। যতদিন জীবিত ছিলেন, কবর পাকের পাশেই ছিলেন। প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের পাশেই ঘুমাতেন। একদিন রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বপ্নে দেখার পর সেখানে ঘুমোনো ছেড়ে দেন। হযরত ‘আমারকে (রা) ‘আয়িশার (রা) ঘরে দাফন করার পূর্ব পর্যন্ত হিজাব ছাড়া আসা-যাওয়া করতেন। কারণ, তখন সেখানে যে দুই জন শায়িত ছিলেন, তাঁদের একজন স্বামী এবং অপরজন পিতা। তাঁদের পাশে ‘উমারকে (রা) দাফন করার পর বলতেন, এখন ওখানে যেতে গেলে হিজাবের প্রয়োজন হয়।

আল্লাহ পাক আযওয়াজে মুতাহ্হারাতের (পবিত্র সহর্ধমিণীগণ) জন্য দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ইবন ‘আববাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি ইচ্ছা করলো যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর তাঁর কোন এক স্ত্রীকে বিয়ে করবে। ইে হাদীসের বর্ণনা সূত্রের একজন বর্ণনাকারী সুফইয়ানকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলোঃ তিনি কি ‘আয়িশা (রা)? সুফইয়ান বললেনঃ বর্ণনাকারীরা তাই উল্লেখ করেছেন। সুদ্দী বলেনঃ যে ব্যক্তি এমন ইচ্ছা করেছিলেন, তিনি হলেন তালহা ইবন ‘উবাইদিল্লাহ। এরই প্রেক্ষিতে নিম্নের আয়তাটি নাযিল হয়ঃ১৭৮

আরবী হবে

‘আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর পত্মীগণকে বিয়ে করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ।১৭৯

অপর আয়াতে আল্লাহ পাক আযওয়াজে মুতাহ্হারাতকে মুসলমানদের জননী বলে ঘোষণা দেন।১৮০

আরবী হবে

‘নাবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা।’

মূলকথা হলো, আযওয়াজে মুতাহ্হারাত-যাঁরা তাঁদের জীবনের একটি অংশে মহানবীর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবন সঙ্গিনী ছিলেন, তাঁদের বাকী জীবনটাও স্বামীর শিক্ষা ও কর্মের অনুশীলন এবং চার-প্রসারে অতিবাহিত করবেন। তাঁরা মুসলমানদের মা। তাঁদের দায়িত্ব হবে সন্তানদের তা‘লীম ও তারবিয়্যাত (শিখ্সা ও প্রশিক্ষণ) দান করা। তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্বয়ং আল্লাহ বলে দিয়েছেন এভাবেঃ১৮১

‘হে নবী পত্মীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পর পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না। ফলে সেই ব্যক্তি কু-বাসনা করে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে। তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থানকরবে-প্রথম জাহিলী যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। যামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পুত-পবিত্র রাখতে। আল্লাহর আংাত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে সঠিত হয়, তোমরা সেগুলো স্মারণ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্ব বিষখেবর রাখেন।’

হযরত ‘আয়িশার (রা) বাকী জীবন ছির উপরে উদ্ধৃত আল্লাহর বাণীর বাস্তব ব্যাখ্যাস্বরূপ। হযরত রাসূল কারীমের (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর উম্মুল মুমিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) সম্মাণিত পিতা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাফন-দাফন ও খলীফা নির্বাচনের ঝুট-ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়ার কিচুদিন পর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ চাইলেন, হরত উসমানকে (রা) তাঁদের পক্ষ থেকে খলীফার নিকট পাঠাবেন উত্তরাধিকারের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য। তখন ‘আয়িশা (রা) তাঁদেরকে স্মরণকরিয়ে দিলেন যে, রাসূল কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর জীবদ্দশায় বলেছিলেন, ‘আমার কোন উত্তারাধিকারী থাকবে না। আমার পরিত্যক্ত সবকিছু সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে।১৮২ এ কথা শুনে সবাই চুপ হয় যান।

আসলে রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষয়-সম্পত্তি এমন কী-ইবা রেখে গিয়েছিলেন, যা তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হতে পারতো? হাদীসে এসেছে, তিনি দিরহাম ও দীনার, চতুস্পদ জন্তু, দাস-দাসী কিছুই মীরাছ হিসেবে রেখে যাননি।১৮৩

তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল হিসেবে কয়েকটি বাগ-বাগিচা তিনি নিজের অধীনে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবদ্দশায় তার আয় যে যে খাতে ব্যয় করতেন, খিলাফতে রাশেদাও তা একই অবস্থায় বহাল রাখেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণের ব্যয় নির্বাহ করতেন এরই আয় থেকে, আবু বকরও (রা) তা বহাল রাখেন।১৮৪

পিতৃবিয়োগ

হযরত আবু বকর (রা) মাত্র দুই বছর খিলাফত পরিচালনার সুযোগ পান। হিজরী তেরো সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর যখন অন্তিম দশা তখন মেয়ে ‘আয়িশা (রা) পিতার শিয়রে বসা ছিলেন। এর আগে সুস্থ অবস্থায় তিনি মেয়েকে কিছু বিষয়-সম্মতি ভোগ-দখলের জন্য দিয়েছিরেন। এখন অন্য সন্তানদেরও বিষয়-সম্মতির প্রয়োজনের কথা মনে করে বললেনঃ আমার কিলজার টুকরো মেয়ে! তুমি কি ঐ বিষয়-সম্পত্তি তোমার অন্য ভাইদের দিয়ে দিবে? মেয়ে বললেনঃ অবশ্যই দব। তারপর তিনি মেয়েকে জিজ্ঞেসকরেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাফনে মোট কতখানা কাপড় ছিল? মেয়ে বললেনঃ তিনখানা সাদা কাপড়। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কোন দিন ওফাত পান? বললেনঃ সোমবার। আবার জিজ্ঞেস করলেন, আজ কি বার? বললেনঃ সোমবার বললেনঃ তাহলে আজ রাতে আমাকেও যেতে হবে। তারপর তিনি নিজের চাদরটি দেখেলেন। তাতে জাফরানের দাগ ছিল। বললেনঃ এইকাপড়খানি ধুয়ে তার উপর আরো দুইখানি কাপড় দিয়ে আমাকে কাফন দিবে। মেয়ে বললেনঃ এই কাপড় তো পুরানো। বললেনঃ মৃতদের চেয়ে জীবিতদেরই নতুন কাপড়ের প্রয়োজন বেশি।১৮৫ সেই দিন রাতেই তিনি ওফাত পান। হযরত ‘আয়িশার (রা) হুজরার মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাশে, একটু পায়ের দিকে সরিয়ে তাঁকে দাফন করা হয়। হযরত ‘আয়িশার (রা) হুজরায় পতিত এটা হলো দ্বিতীয় চাঁদ। এত অল্প বয়সে স্বামী হারানোর মাত্র দুই বছরের মধ্যো তিনি পিতাকে হারালেন।

খিলাফতে ফারুকীঃ

হযরত ফারুকে আজমের (রা) খিলাফতে কালটি ছির সর্বদিক দিয়ে উৎকর্ষমন্ডিত। তিনি প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নগদ ভাতা নির্ধারণ করে দে। একটি বর্ণনা মতে, তিনি আযওয়াজে মুতাহ্হারাতের প্রত্যেকের জন্য বাৎসিক বারো হাজার করে দিতেন।১৮৬ অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, অন্য আযওয়াজে মুতাহ্হারাতের প্রক্যেককে দশ হাজার এবং আয়িশাকে (রা) বারো হাজার দিতে। এমন প্রাধান্য দানের কারণ উমার (রা) নিজেই বলে দিয়েছে। আমি তাঁকে দুই হাজার এই জন্য বেশি দিই যে, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক প্রিয়পাত্রী।

আযওয়াজে মুতাহ্হারাতের সংখ্যা অনুযায়ী খলীফা উমার (রা) নয়টি পিয়ালা তৈরি করান। যখন কোন জিনিস তাঁর হাতে আসতো, নয়টি ভিন্ন ভিন্ন পিয়ালা সকলের নিকট পাঠাতেন। হাদিয়া-তোহফা বণ্টনের সময় এতখানি খেয়াল রাখতেন যে, কোন জন্তু জবেহ হলে তার মাথা থেকে পায়া পর্যন্ত তাঁদের নিকট পাঠাতেন।

ইরাক বিজয়ের এক পর্যায়ে মূল্যবান মোতি ভর্তি একটি কৌটা মুসলমানদের হাতে আসে। অন্যান্য মালে গনীমতের সাথে সেটিও খলীফার দরবারে পাঠানো হয়। এই মোতির বণ্টন সকলের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। খলীফা উমার (রা) বললেনঃ আপনারা সকলে অনুমতি দিলে এই মাতাতিগুলি আমি উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠিয়ে দিতে পারি। কারণ, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক দিতে পারি। কারণ, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)সর্বাধিক প্রিয়পাত্রী। পাত্রটি ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠানো হলো। তিনি সেটা খুলে দেখে বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরে ইবন খাওাব আমার প্রতি অনেক বড় বড় অনুগ্রহ দেখিয়েছেন। হে আল্লহ! আগামীতে তাঁর এমনসব অনুগ্রহ লাভের জন্য আমাকে জীবিত রেখো না।

খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) বাসনা ছিল, ‘আয়িশার (রা) হুজরায় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কদম মুবারকের কাছে দাফন হওয়াব। কিন্তু একথা বলতে পারছিলেন না। তাঁর কারণ, যদিও মাটির নীচে চলে গেলে শরীয়াতের দৃষ্টিতে পুরুষদের থেকে পর্দা করা জরুরী নয়, বতুও আদব ও শিষ্টাচারের দৃষ্টিতে দাফনের পরেও তিনি আয়িশার নিকট গায়ের মাহরামই মনে করতেন। একেবারে অন্তিম মুহূর্তে এসব চিন্তায় তিনি বড় পেরেশান ছিলেন। শেষমেষ ছেলেকে পাঠালেন এই বলে যে, ‘উম্মুল মুমিনীনকে আমার সালাম পেশ করে বলবে, ‘উমারের বাসনা হলো তাঁর দুই বন্ধুর পাশে দাফন হওয়ার।’ ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ ‘যদিও আমি ঐ স্থানটি নিজের জন্য রেখেছিরাম, তবে আমি সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’

উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশার (রা) এই অনুমতি পাওয়ার পরেও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে ‘উমার (রা) অসীয়াত করে গেলেন, আমার লাশবাহী খাটিয়া তাঁর দরজায় নিয়ে গিয়ে আবার অনুমতি চাইবে। যদি তিনি অনুমতি দান করেন তাহলে ভিতরে দাফন করবে। অন্যথায় দাফন করবে সাধারণ মুসলমাদের গোরস্থানে। খলীফার ইনতিকালের পর তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হয়। ‘আয়িশা (রা) দি্তীয়বার অনুমতি দান করেন এবং লাশ ভিতরে নিয়ে দাফন করা হয়।১৮৭

আর এভাবে তিনি হলেন হযরত ‘আয়িশার (রা) স্বপ্নের তৃতীয় চাঁদ-যাঁর মাধ্যমে তাঁর স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়।

বিদ্রোহীদের হাতে খলীফা হযরত উসমানের (রা) শাহাদাত বরণ ইসলামের ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ঘটনা। এরই প্রেক্ষিতে উম্মুল মুমিনীন হযরত ‘আয়িশা (রা) সরাসরি তৎকালী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। আর তাঁরপপ্রেক্ষাপটে ঘটে আর এক হৃদয়বিদারক ঘটনা উটের যুদ্ধ। হযরত ‘উসমানের (রা) শাহাদাত পরবর্তী ঘটনাবলীতে তাঁর এভাবে জড়িয়ে পড়া কতটুকু ঠিক বা বেঠিক ছিল, সে বিষয়ে আমরা কোন সিদ্ধান্তে যাবনা। আমরা শুধু বিশ্বাস করবো, তাঁর সকল কর্ম-প্রচেষ্টা নিবন্ধ ছিল দীন ও উম্মাহর কল্যাণের জন্য। ঐতিহাসিক এ সকল ঘটনা বুঝার জন্য একটু বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন।

হযরত ‘উসমানের (রা) খিলাফাতকাল প্রায় বারো বছর। এ সময়ের প্রথম অর্ধাংশে সকল প্রকার ঝামেলা ও হৈ-হাঙ্গামা মুক্ত শান্ত পরিবশে বিরাজমান ছিল। তারপর ধীরে ধীরে জনগণের পক্ষ থেকে নানা রকম অভিযোগ উঠতে থাকে। হযরত ‘আয়িশা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘উসমানকে (রা) উপদেশ দিয়েছিলেন, যদি আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে কখনও খিলাফতের জামা পরান তাহলে স্বেচ্ছায় তা যেন খুলে না ফেলেন।১৮৮

মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) খুবই গ্রহণযোগ্যতা ছিল। আল্লাহ তা‘আলারvাষণা অনুযা্য়ী তিনি ছিলেন মুসলমানদের মা। হিজায, ইরাক, মিসর তথা খিলাফতের প্রতিটি অঞ্চলে তাঁকে মায়ের মত মানা হvাত। লোকেরা তাঁর নিকট এসে নিজেদের নানা অভিযোগ ও অসুবিধার কথা বলতো, আর তিনি উপদেশ ও সান্তুনা দিতেন।

হযরত ‘উসমানের (রা) খিলাফতের প্রথম পর্ব পর্যন্ত বড় মাপের প্রজ্ঞাবান সাহাবীরা জীবিত ছিলেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করা হতো। খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে যোগ্যতা অনুযায়ী তাঁদেরকে নিয়োগ দান করা হতো। পূর্ববর্তী দুই খলীফার সময়ে কারো কোন অভিযোগ ছিল না। সে সময় যাঁরা উচ্চাভিলাষী যবক ছিলেন-যেমন ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর, মুহাম্মদ ইবন আবী বকর, মারওয়ান ইবনহাকাম, মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা, সা‘ঈদ ইবন আল-আস প্রমুখ, তাঁরা বড়দের সাহায্য করতেন। খিলাফত এবং ইমারাতের কোন উঁচু পদ ছির তাঁদের জন্য দুরাশা মাত্র।

‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ছিলেন হযরত সিদ্দীকে আকবরের নাতী এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফুফাতো ভাই ও হাওয়ারী যুবাইয়ের (রা) ছেলে। তিনি নিজেকে খিলাফতের একজন হকদার মনে করতেন।

মুহাম্মদ ইবন আবী বকর ছিলেন প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) ছোট ছেলে এবং উম্মুল মুমিনীন আয়িশার (রা) বৈমাত্রেয় ভাই। এই মুহাম্মাদের মাকে আবু বকরের মৃত্যুর পর আলী (রা) বিয়ে করেন। এ কারণে আলীর (রা) নিকট লালিত-পালিত হন।১৮৯ আর আলীও (রা) তাঁকে ছেলের মত দেখতেন।

মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা বেড়ে ওঠেন হযরত উসমানের (রা) তত্ত্বাবধানে। বয়স হলে খলীফা উসমানের (রা) নিকট কোন একটি বড় পদের আশা করেন। খলীফা তাঁকে যোগ্য মনে না করায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে মদীনা ছেড়ে মিসর চলে যান।

‘মারওয়ান ও সা‘ঈদ ইবন ‘আস উভয়ে উমাইয়্যা বংশের দুই নব্য যুবক ছিলেন। উঁচু মর্যাদার অধিকারী মুহাজিরদের ইনতিকালের পর তাঁদের সন্তানরাও খিলাফতের নিকট বহু কিছু প্রাপ্তির আশা নিয়ে এগিয়ে আসেন। হযরত ‘উসমান (রা) উমাইয়্যা খান্দানের লোক ছিলেন। তাই তিনি যখনই মারওয়ান ও সা‘ঈদ ইবন ‘আসের মত লোকদের উঁচুপদ দান করলেন, তখন কুরাইশ-খান্দানের অন্যসব উচ্চাভিলাষী যুবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। এ কারণে মুহাম্মদ ইবন আবী বকর ও মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা ‘উসামন (রা) বিরোধী বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করেন। তাছাড়া এই সকল নওজোয়ানের মধ্যে উঁচু স্তরের সাহাবায়ে কিরামের মত সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতা, সততা, আমানতদারি, তাকওয়া খোদাভীতি ছিল না। এ কারণে জনসাধারণ ও সৈনিকদের মধ্যে যাঁরা প্রথম স্তরের সাহবীদেরকে দেখেছিলেন, তারা এই লোকদের নেতৃত্ব ও শাসনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আরবরা ছির চির স্বাধীন। মরু প্রকৃতিতে তারা স্বাধীন আবহাওয়ায় বেড়ে উঠতো। প্রত্যেকেই নিজ জি গোতের আনুগত্য করতো এবং নিজের গোত্রকে অন্য গোত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতো। ইসলামী সাম্যের আদর্শ তাদের সকল আভিজাত্য ভুলিয়ে দেয় এবং তাদেরকে একই স্তরে নামিয়ে আনে। প্রথম স্তরের সাহাবায়ে কিরাম (রা) ইসলামী সাম্যের শিক্ষা সমুন্নাত রাখলেও তাঁদের পরবর্তী নতুন প্রজম্নের কর্মকর্তা ও পদাধিকারী ব্যক্তিরা যেমন তা ভুলে বসেন, তেমনি অন্যদেরকেও ভুলিয়ে দেন। তাঁরা প্রকাশ্যে নিজেদের মজলিস ও দরবারে নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা ও গোত্রীয় আভিজাত্য প্রকাশ করতে শুরু করেন। অন্যান্য আরব গোত্রসমূহ তাঁদের এমন মনোভাব ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তারা ছিল সম অধিকারের দাবীদার। অন্যদিকে নওমুসলিম আনারব গোষ্ঠী কুরাইশ বা বনু উমাইয়্যা কোন আরব গোত্রেরই শাসন সহ্য করতে পারছিল না। এই জন্য খিলাফতের অভ্যন্তরে যে কোন ধরনের হৈ-হাঙ্গামায় অতি উৎসাহের সাথে তারা অংশগ্রহণ করতো।

আরব-আজমের মিলনস্থলরূপে যে কয়টি শহর চিহ্নিত ছিল তার মধ্যে কূফান্যতম। ইসলামী খিলাফতের ফিতনার সূচনা এই শহর থেকেই হয়। এটি ছির আরব গোত্রসমূহের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। সা‘ঈদ ইবনুল ‘আস ছিলেন এই কূফার ওয়ালী। রাতের বেলা তাঁর দরবারে সকল গোত্রের সর্বদাদের মাজমা বসতো। সাধারণত আরবদের যুদ্ধ বিগ্রহ ও আরব গোত্রসমূহের মর্যাদার তারতম্য বিষয়ে আলোচনা হতো। আর বিষয়টি এমন ছিল যে, কোন গোত্রই অন্য গোত্র থেকে মর্যদায় খাটো মনে করতো না। অনেক সময় আলোচনা তর্ক-বির্তক, ঝগড়া-ঝাটি ও মারামারিতে রূপ নিত। এ ক্ষেত্রে সা‘ঈদ ইবন ‘আসের মুখে নিজেকে কুরাইশ বংশজাত বলে গর্বের সাথে প্রকাশ করা আগুনে তেল ঢালার মত কাজ করতো। তাঁর এমন কর্মপন্থায় গোত্রীয় নেতাদের অভিযোগ সৃষ্টি হয়। মূলত তা একটি ফিতনার রূপ ধারণ করে।

ঠিক এই সময়ে ইবন সাবা নামক এক ইহুদী মুসলমান হয়। ইহুদীদের নিয়ক হলো, শক্র হিসেবে যদি শক্রর ক্ষতি না করতে পারে তাহলে রূপ পাল্টে বন্ধু হয়ে যায়। তারপর ধররে ধীরে গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমের শক্রর সর্বনাশের চূড়ান্ত করে ছাড়ে। অতীতে খৃষ্টধর্মের সাথে তারা এমন আচরণই করেছিল।

এই ইহুদীর সন্তান ইবন সাবা জনগণের মধ্যে এই কথা প্রচার কতে থাকে যে, হযরত ‘আলী (রা) প্রকৃত পক্ষে খিলাফতের হকদার। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর খলীফা হওয়ার ব্যাপারে অসীয়াতকরে গিয়েছিরেন। সর্বশক্তি দিয়ে সে তাঁর এই ভ্রান্তবিশ্বাস প্রচার করতে থাকে। খিলাফতের বিভিন্ন ছোটখাট রাজনৈতিক হৈ-চৈ কে বাহানা বানিয়ে সে তার ষড়যন্ত্রের জালকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়। সে গোটা খিলাফত চষে ফেলে। কূফা, বসরা, মিসর তথা যেখানে বড় বড় সৈন্য ছাউনী ছিল সেখানে কিছু না কিছু বিপ্লবপন্থী সে তৈরি করে। সে মিসরকে এবিপ্লবপন্থীদের কেন্দ্র বানিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিবর্গকে ঐক্যবদ্ধ করে ফেলে। ইতিহাসে এটাকে ‘সাবায়ী’ আন্দোলন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

খলীফা উসমানের (রা) সময়ে আক্রি্কাতেই অধিকাংশ যদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। একারণে সেনাবাহিনীর বৃহত্তর অংশ সেখানেই থাকতো। যুদ্ধে অংশগ্রহণের বাহানায় মুহাম্মদ ইবন আবী বকর ও মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা স্বাধীনভাবে সৈন্যদের সাথে মেলামেশার সুযোগ পেতেন এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষের বীজ রোপণ করতেন। ফলে অল্প দিনের মধ্যে মিসর ‘উসমান (রা) বিরোধী বিদ্রোহের কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ওঠে। আর সেই সময় ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী সারাহ মিসরের ওয়ালী ছিলেন। মুহাম্মদ ইবন আবী বকর, মুহাম্মদ আবন আবী হুজায়ফা ও অন্যরা ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী সারাহও খলীফা ‘উসমানের (রা) বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আন্দোলন শুরু করে দিলেন। এভাবে তাঁরা মিসরে নতুন রাজনৈতিক দলের নেতা পরিণত হলেন।

হজ্জের মওসুম এসে গেল। পারস্পরিক যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত মুতাবিক কূফা, বসরা ও মিসর থেকে এক হাজার মানুষের একটি দল হজ্জের বাহানায় হিজাযের দিকে যাত্রা করলো এবং মদীনার কাছাকাছি এসে শিবির স্থাপন করলো। হযরত ‘আলী (রা) ও অন্য বড় বড় সাহাবীরা তাদেরকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। তারা কিছুদূর যেতে আবার ফিরে আসে এবং মিসরের গবর্ণরের নিকট লেখা একটি চিঠি দেখায়। তাতে মিসরের গভর্নরের প্রতি খলীফার নির্দেশ ছিল, মিসরী বিদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকে মিসর প্রত্যাবর্তনের পরপরই হত্যা অথবা বনঈ করার। বিদ্রোহীদের ধারণা মতে, এই পত্রখানি ছিল খলীফার সেক্রেটারী মারওয়ানের হাতের লেখা। এ কারণে তারা সমবেতভাবে খলীফা উসমানের (রা) বাড়ী ঘেরাও করে এবং খলীফার নিকট দুইটি প্রস্তাব পেশ করে। হয় তিনি মারওয়ানকে বিদ্রোহীদের হাতে অর্পণ করবেন অথবা তিনিনিজেই পদত্যাগ করবেন। হযরত ‘উসমান দুইটি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) তখন মদীনায়। তিনি বৈমাত্রেয় ভাই মুহাম্মদ ইবন আবী বকরকে ডেকে বুঝালেন এবং খলীফার বিরুদ্ধে এমন চরম সিদ্ধান্ত থেকে বিতর থাকতে বলরেন। কিন্তু তিনি বোনের কথায় কান দিলেন না।

 মদীনায় যখন এমন একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান, তখন হযরত ‘আয়িশা (রা) প্রতিবছরের মত হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় চলে গেলেন। অবশ্য তিনি মুহাম্মদ ইবন আবী বকরকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে রাজি করাতে পারেনী। তারপর কিছুদিন হযরত ‘উসমান (রা) নিজ গৃহে অবরুদ্ধ থাকেন এবং অবশেষে বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদান বরণ করেন।

হযরত ‘উসমান (রা) বিদ্রেীহাীদের হাতে শাহাদাত বরণ করলেন। এখন একজন নতুন খলীফা নির্বাচনের পালা। স্বাভাবিক ভাবেই সকলের দৃষ্টি সেই চারজন জীবিত বিশিষ্ট সাহাবীর প্রতি পড়ার কথা, যাঁরা খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) মনোনীত ছয় সদস্যের খলীফা গ্যানেলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। তারা হলেনঃ তাহলা, যুবাইর, সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস ও আলী (রা)। এ সময় সা‘দ (রা) একেবারেই নিজেকে দূরে সরিয়ে মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে চয়ে যান। বসরার অধিবাসীরা তালহার (রা) পক্ষ অবলম্বনকারী ছিল। মিসরবাসীদের একাংশ ছিল যুবাইরের (রা) পক্ষে; কিন্তু অপর অংশ এবং বিপ্লবীদের গরিষ্ঠ অংশ ছিল আলীর (রা) পক্ষে। ‘আলীর (রা) সমর্থকদের মধ্যে আগ্রণী ভূমিকা পালন করছিলেন আশতার নাখ‘ঈ, ‘আম্মার ইবন ইয়াসির ও মুহাম্মদ ইবন আবী বকর (রা)। এমনিভাবে প্রত্যেক দল বা গোষ্ঠী নিজেদের পছন্দনীয় ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে থাকে। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) ছেলে ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার, তৃতীয় খলীফা হরত ‘উসমানের (রা) ছেলে আবান ও প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) ছেলে আবদুল রহমানের নামটিও প্রস্তাবে আসে। দীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা ও কর্ত-বির্তকের পর বিদ্রেহীদের চাপ ও মদীনাবাসীদের ইচ্ছায় হযরত ‘আলীকে (রা) খলীফা নির্বাচন করা হয়।১৯০

মদীনায় যখন এ সকল ঘটনা ঘটছে তখন সিরিয়ায় হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা) স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছেন এবং মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা মিসরে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে বসে আছেন। মদীনার পবিত্র ভূমিতে পবিত্র মাসে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খলীফা এবং মুসলিম জাহানের ইমামের এমন নৃশংস হত্যাকান্ড সর্বশ্রেণীর মানুষর অন্তরে দারুণ ছাপ ফেলে। পূর্বে যাঁরা হযরত ‘উসমানের (রা) কর্মপদ্ধতির সমালোচক ছিলেন, তাঁরাও এহেন ঘৃণিত কাজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। হযরত ‘আয়িশাও (রা) এই শ্রেণীর লোকদের অন্যতম। এমন বাড়াবাড়ি তাঁরে কেউই চাননি। এই ঘটনার পূর্বে আশতার নাখ‘ঈ একদিন ‘আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর পানাহ্! আমি ইমামদের ইমামকে হত্যার কথা বলতে পারি? এতেই ফিতনাবাজ লোকেরা রটিয়ে দেয় যে, উসমান (রা) হত্যাকান্ডে ‘আয়িশারও (রা) সমর্থন ছিল। তাছাড়া, মাুষের এমন ধারণার আরেকটি কারণ ছিল। তা হলো তাঁর ছোট সৎ ভাই মুহাম্মদ ইবন আবী বকর (রা) ছিলেন বিদ্রোহীদের অন্যতম নেতা।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর ভাইকে ‘উসমান (রা) বিরোধী হঠকারী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হযরত ‘আয়িশা (রা) পরবর্তীকালে একবার হযরত ‘উসমানের (রা) আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি কখনও চাইনি যে ‘উসমানের (রা) কোন রকম অসম্মান হোক। আমি যদি তা চেয়ে থাকি তাহলে আমারও যেন ত৭ার মত পরিণতি হয়। হে ‘উবাইদুল্লাহ ইবন ‘আদী! (আদী ছিলেন ‘আলীর রা. পক্ষে) একথা জানার পর কেউ যেন তোমাকে ধোঁকা দিতে না পারে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের কর্মকান্ডকে কেউ ততদিন অসম্মান করতে পারেনি যতদিন তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়নি। যে ‘উসমানের সমালোচনা করেছে, সে এমন সব কথা বলেছে যা বলা উচিত ছিল না। আমরা তাদের কর্মকান্ডকে গভীরভাবে দেখেছি, তাতে বুঝেছি তা সাহাবীদের কর্মকান্ডের ধারে কাছেও ছির না।’ ইতহিাস ও সীরাতের গ্রন্থে হযরত ‘আয়িশার (রা) এ জাতীয় এমনানেক কথা পাওয়া যায়, যা দ্বারা বুঝা যায় ‘উসমান (রা) এ জাতীয় এমন অনেক কথা পাওয়া যায়, যা দ্বারা বুঝা যায় ‘উসমান (রা) হত্যার ব্যাপারে তার কোন রকম ভূমিকা ছিল না। তাঁর প্রতি যে দোষারোপ করা হয়েছিল তা ছিল বিদ্রোহীদের একটি অপপ্রচার মাত্র।

মদীনার এই মর্মবিদারী ঘটনায় তৎকালীন গোটা মুসলিম উম্মাহ শোকে কাতর হয়ে পড়ে। সাহাবায়ে কিরামের ছোট্ট একটি দল, যাঁরা নিজেদের দেহের রক্ত দিয়ে গড়া উদ্যান তছনছ হতে দেখছিলেন-স্থির থাকতে পারলেন না। তাঁরা এর একটা দফারফা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনিজন মহান সাহাবীঃ উম্মুল মুমিনীন হযরত ‘আয়িশা, হযরত যুবাইর ও হযরত তালহা (রা)। হযরত তালহা (রা) ছিলেন কুরাইশ খান্দারন লোক এবং প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (লা) কন্যার স্বামী, ইসরামের আদি পর্বের একজন সুমলমান এবং রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল-াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) আমলে সংঘটিত সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদ। যুবাইর ইসলামের একজন বীর সৈনিক। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফূফাতো ভাই এবং প্রথম খলীফার কন্যা হযরত আসমার (রা) স্বামী। উভয়ে ছিলেন দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) মনোনীতখলীফা প্যানেলের অন্যতম সদস্য।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মদীনায় যখন খলীফা উসমান (লা) বহিরাগত বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ তখন হযরত আয়িশা (রা) প্রতি বছরের অভ্যাসমত হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় চলে যান। হজ্জ শেষ করে মদীনায় ফিরছিলেন, এমন সময় খলীফা উসমানের (রা) শাহাদাতের খবর পেরেন। সামনে কিচুদূর অগ্রসর হতেই হযরত তালহা ও যুবাইরের (রা) সাক্ষাৎ পেলেন। তাঁরা খলীফা হযরত আলীর (রা) অনুমতি নিয়ে মদীনা থেকে বেরিয়ে মক্কার দিকে যাচ্ছেন। তাঁরা তখন হযরত আয়িশার (রা) নিকট মদীনার আইন-শৃঙ্খলার যে চিত্রতুলে ধরেছিলেণ তাবারী সহ বিভিন্ন প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তার কিচু অংশ নিম্নরূপঃ১৯১

‘আমরা মদীনা থেকে বেদুইন ও সাধারণ মানুষের হাত থেকে কোন রকম পালিয়ে এসেছি। আমরা জনগণকে এমন অবস্থায় ছেড়ে এসেছি যে, তারা কিংবর্তব্যবিমূঢ়। তারা যেমন সত্যকেচিনতে পারছে না, তেমনি মিথ্যাকেও অস্বীকার করতে সক্ষম হচ্ছে না। নিজেদেরকে রক্ষাও করতে পারছেনা।’

হযরত আয়িশা (রা) বললেন, এখন আমাদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করা উচিত। এ সময় তিন নিম্নের এ চরণটি আবৃত্তি করেনঃ

আরবী হবে

-যদি আমার কাওমের নেতারা আমার আনুগত্য করতো তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে এ বিপদ থেকে বাঁচাতে পারতাম।

তিনি আবার মক্কায় ফিরে গেলেন। খলীফার শাহাদাতের খবর মক্কায় ছড়িয়ে পড়লৈ চতুর্দিক থেকে মানুষ কাছে ছুটে আসতে লাগলো। ‘উমরা বিনত আবদির রহমান থেকে বর্ণিত হয়েছে। সে সময় উম্মু মুমিনীন বলেনঃ১২৯ সেই কাওমের (সম্প্রদায় মত অন্য কোন কাওম নেই যারা নিম্নোক্ত আয়াতের হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করেঃ১৯৩

আরবী হবে

-যদি মু’মিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আলত্মাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে।

হজ্জের মওসুম ছিল। ঘোষনার সাথে সাথে হারাম শরীফ থেকের কয়েকশো মানুষ সাড়া দিল। আবদুল্লাহ ইবন আমের বসরা থেকে প্রচুর নগদ অর্থ নিয়ে এসে আয়িশার (রা) সাথে যোগ দিল। ই‘য়ালা ইবন মুনাইয়্যা ইয়ামন থেকে সাত শো উট ও ছয় লাখ দিরহাম এনে আয়িশার (রা) হাতে দিল।১৯৪ এই বাহিনী কোন দিকে যাত্রা করবে তা ঠিক করার জন্য হযরত আয়িশার (রা) আবাস গৃহে পরামর্শ বৈঠক বসালো। আয়িমার (রা) মত ছিল মদীনার দিকে যাত্রা করার। কারণ সাবায়ী ও বিদ্রোহীরা সেখানেই অবস্থান করছিল। সেদিন তাঁর এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ইসলামী উম্মার ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। কিন্তু তাঁরা এই সদ্ধান্তে আসেন যে, উসমানের (রা) রক্তের বদলা গ্রহণের জন্য বসরা ও কূফা থেকে-যেখানে হরত তালহা ও যুবাইরের (রা) প্রচুল সমর্থক ছিল, সামরিক সাহায্য নেওয়া হবে। অতঃপর এই কাফেলা মক্কা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) তখন মক্কায়। তাঁকেও বসরার দিকে যাওয়ার অনুরোধ করা হলো। আমি মদীনার মানুষ, মদীনাবাসীরা যা করে, আমি তাই করবো’-একথা বলে তিনি এই কাফেলার সাথেবসরার দিকে চরতে অস্বীকৃতি জানালেন। অন্যান্য উম্মাহতুল মুমিনীন-যাঁরা আয়িশার (া) সাথে মদীনায় ফেরার প্রস্ত্ততি নিয়েছিলেন, কেউ এই কাফেলার সাথে বসরার দিকে গেলেন না। একমাত্র হাফসা (রা) যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বারণ করায় তিনিও আর গেলেন না। তবে অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনীন ও মক্কার সাধারণ মানুষ ‘জাতুল ইরাক’ পর্যন্ত বসরাগামী কাফেলাকে এগিয়ে দেন। তাঁরা সেদিন ইসলামের এমন দুর্দিন দেখে এমন কান্নাকাটি ও মাতাম করেছিলেন যে আর কোনদিন তেমন দেখা যায়নি। এ কারণে ইতিহাসে এ দিনটিকে ইয়াউমুন নাহীব’ বা কান্নার দিন বলা হয়।১৯৫ উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা) একটি উটের উপর সাওয়ার হয়ে কাফেলার সাথে বসরার দিকে চললেন। ইতিহাসের এক মন্তবড় ট্রাজেডির সাক্ষী এই উটের একটু পরিচয় দেওয়া এখানে অগ্রাসঙ্গিক হবে না বলে মনে করি। উিটটি উম্মুল মুমিনীনকে কে দিয়েছিল, সে সম্পর্কে দুই ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। ই‘য়ালা ইবন মুনাইয়্যা আশি দীনার দিয়ে খরিদ করে তাঁকে দেন। উটটির নাম ছিল আল-আসকার’। মতান্তরে উটটি ছিল উরাইনা’ গোত্রের এক ব্যক্তির। উরায়নী গোত্রের সেই লোকটি বর্ণনা করেছেঃ১৯৬ আমি একটি উটে চড়ে চলছি। এমন সময় এক অশ্বারোহী এসে আমাকে বললোঃ তুমি কি তোমার এ উটটি বেচবে? বললামঃ হ্যাঁ বেচতে পারি। লোকটি বললোঃ কত দাম? বললামঃ এক হাজার দিরহমা। বললোঃ তুমি কি পাগল? বললামঃ কেন? আল্লাহর কসম! এর উপর সোয়ার হয়ে আমি যাকেই ধরতে চেয়েছি, সফল হয়েছি। আর এই পিঠে থাকা অবস্থায় কেউ আমাকে ধরতে পারেনি। সে বললোঃ তুমি যদিজানতে, উটটি আমি কার জন্য কিনতে চাই। এটা আমি বিনতে চাই উম্মুূল মু’মিনীন আয়িশার (রা) জন্য। বললামঃ তাহলে আমি বিনা মূল্যেই দিলাম। সে বললোঃ তা হয় না, তুমি বরং আমার সাথে কাফেলার কাছে চলো, আমরা তোমাকে একটি মাদী উট ও অনেক দিরহাম দিব। আমি তার সাথে কাফেলার কাছে গেলাম। তারা আমাকে বিনিময়ে একটি মাদী উট ও চার মতান্তরে ছয় শো দিরহমা দিল।’ এই উরানী লোকটিকে পথ প্রদর্শক হিসেবে কাফেলার সাথে নেওয়া হয়।

কাফেলার যাত্রাপথে মানুষ যখন শুনতে পেল, এই বাহিনীর পুরোধা উম্মুল মুমিনীন, তখন বহু লোক অত্যন্ত আবেগ ও উৎসাহের সাথে যোগদান করলো। এভাবে এক মানযিল পথ অতিক্রম করতেনা করতে তিন হাজারের একটি বাহিনী তৈরি হয়ে গেল। হযরত উসমানের (রা) গোত্র বনু উমাইয়্যার যুবকদের ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কি হতো পারতো? সে সময়ের পরিস্থিতি তাদের এত প্রতিকূল ছিল যে, চতুর্দিক থেকে তাড়া খেয়ে তারা পালিয়ে মক্কায় এসে বড় হচ্ছিল। হযরত আয়িশার (রা) ঘোষণা ছিল তাদের জন্য এক মহা সুযোগ। তারা সকলে তাঁর বাহিনীর মধ্যে ঢুকে গেল।

বনু উমাইয়্যার ইবনুল ‘আস ও মারওয়ান ইবনুল হাকামও কাফেলার সাথে বের হলেন। মারুজ জাহরান’ মতান্তরে ‘জাতু ইরাক’ পৌঁছে সা‘ঈদ ইবনুল ‘আস তাঁর দলীয় লোকদের বললেনঃ ‘তোমরা যদি উসমান (রা) হত্যার বদলা নিতে চাও তাহলে আগে এই লোকদের হত্যা কর। তাঁর ইঙ্গিত ছিল তালহা, যুবাইর, প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতি। কারণ বনু উমাইয়্যাদের মধ্যে সাধারণভাবে এ ধারণা প্রচলিত ছিল যে, উসমানের (রা) হত্যাকারী কেবল তারাই নয় যারা তাঁকে হত্যা করেছে অথবা তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বাইরে থেকে এসেছে, বরং ঐ সকল ব্যক্তির সকলে তাঁর সত্যাকারীদের মধ্যে পরিগণিত যাঁরা বিভিন্ন সময়ে হযরত উসমানের (রা) কর্মপদ্ধতির সমালোচনা করেছেন এবং তারাও যাঁরা হাঙ্গামার সময় মদীনায় ছিলেন, কিন্তু তাঁকে রক্ষার জন্য যুদ্ধকরেননি। মাওয়ান বললেনঃ আমরা তাঁদের (তালহা, যুবাইর ও আলী রা.) একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লড়াবো। যাঁর পরাজয় হবে, তিনি এমনিই শেষ হয়ে যাবেন। আর যিনি জয়ী হবেন, এত দুর্বল হয়ে পড়বেন যে, অতি সহজেই আমরা তাঁকে কাবু করে ফেলতে পারবো।’১৯৭

আসলে বনু উমাইয়্যাদের আসল উদ্দেশ্যে ছিল হযরত আয়িশার (লা) আপোষ-মীমাংসার আহবান ও আন্তরিক চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া। শুধু তাই নয়, আয়িশার (রা) নেতৃত্বে তৃতীয় আরেকটি শক্তির উত্থান হচ্চে দেখে তাদের অনেকে এই বাহিনীর মধ্যে নানাভাবেবিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। তারা প্রশ্ন তোলে আলীকে (রা) পরাভূত করার পর তালহা ও যুবাইরের মধ্যে কে খলীফা হবেন? হযরত আয়িশা (রা) জানতে পেরে এ প্রপাগান্ডা থামিয়ে দেন। তারপর আরেকটি প্রশ্ন তোলা হয়-খিরাফতের ফায়সাপলা না হয় পরে হবে, কিন্তু এ মুহূর্তে নামাযের ইমাম হবেন কে? হযরত আয়িমা (লা) তাহলা ও যুবাইরের (রা) ছেলেদের নামাযের ইমামতির জন্য একদিন করে নির্ধারণ করে দিয়ে এ ফিতনাও থামিয়ে দেন।

চরার পথে হাওয়াব’১৯৮ নামক জলাশয়ের নিকট পৌঁছলে এই বিশাল কাফেলা দেখে সেখানকার কুকুর হাঁকডাক আরম্ভ করে দেয়। ‘আয়িশা (রা) জিজ্ঞেস করেন স্থানটির নাম কি? বলা হলো, ‘হাওয়াব’। তখন তাঁর স্মরণ হয় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি বাণী, একবার তিনি বেগমদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ আল্লাহ জানেন তোমাদের মধ্যে কাকে দেখে হাওয়াবের’ কুকুরগুলি ডাকবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ কহতেই হযরত আয়িশা (লা) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই ভবিষ্যদ্বাণস্মিরণ হতেই আয়িমা (লা) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একদিন একরাত কাফেলা এখানে থেকে থাকে।১৯৯ অবশেষে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকে পঞ্চাশ ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, এটা হাওয়াব নয়। তখন তিনি নিশ্চিন্ত হন। তাছাড়া হযরত যুবাইর তখন বলেনঃ আপনি ফিরে যাবেন। কিন্তু হতে পারে আল্লাহ তা‘য়ালা আপনার দ্বারা এই বিবাদ মীমাংসা করে দেবেন।২০০ কোন কোন বর্ণনায় কথাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ ত৭ার (‘আয়িশার (রা.) সঙ্গীদের কেউ কেউ বললেন, পিছনে না ফিরে সামনে অগ্রসর হোন। লোকেরা যখন আপনাকে দেখতে পাবে তখন আল্লাহ তাদের মধ্যে একটা মীমাংসা করে দেবেন। সামনে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায় আছেন, তখন তাঁকে বলা হলো, আপনি দ্রুত চলুন, পিছন থেকে আলীর (রা) বাহিনী আসছে। এ সকল বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় হযরত আয়িশার (রা) বসরার দিকে চলার উদ্দেশ্য ছির কেবল ইসলাহ ও মীমাংসা।

কূফাঃ

মক্কা মু‘য়াজ্জামা, মদীনা মুনাওয়ারা ও বসরার পরে আরবের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল কূফা। হযরত আবু মূসা আল আশ‘য়ারী (রা) ছিলেন তথাকার ওয়ালী। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে নিজেরদর দাবীর যৌক্তিকতা তুলে ধরে তার সমর্থন কামনা করছিল। মহান সাহাবী হযরত আবু মূসা (রা) এই বিবাদের গুরুত্ব উপলদ্ধি করে নিজের প্রভাবের দ্বারা ও খুতবার মাধ্যমে এর থেকে দূরে থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানালেন। হযরত আয়িশা (রা) কূফার নেতৃবৃন্দের নামে পৃথক পৃথক চিঠি পাঠালেন। এদিকে হযরত আলীর (রা) পক্ষ থেকে হযরত আম্মার ইবন হয়াসির ও ইমাম আল-হাসান (রা) কূফায় পৌঁছলেন। হযরত আম্মার কূফার জামে‘ মসজিদে প্রদত্ত এক ভাষণে তৎকালীন ঘটনাবলী স্পষ্টভাবে তুলে দরেন। সেই ভাষণে তিনি হযরত আয়িশার (রা) সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনার পরে বলেন, এ সব কিচু সঠিক। কিন্তু আল্লাহ ও ব্যাপারে তাঁর পরীক্ষা নিচ্ছেন। আম্মারের (রা) এ ভাষণ কূফাবাসীদের উপর দারুণ প্রভাব ফেলে। কয়েক হাজার মুসলমান তাঁর আবেদনে সা দেন। তা সত্ত্বেও কূফাবাসীর মনে এই দ্ভিধা ও সংকোচ কাজ করতে থাকে যে, একদিকে রাসূলুল্লাহর (সাল্ল-াল্ল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগম উম্মুল মুমিনীন, আর অন্যদিকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্যার স্বামী এবং চাচাতো ভাই-এই দুই জনের কার সাথে যাওয়া যেতে পারে।

এই দিকে হযরত আয়িশা (রা) বসরার সন্নিকটে পৌঁছে লোক মারফত শহরের আরব নেতৃবৃন্দের প্রত্যেকের নিকট চিঠি পাঠালেন। পরে বসরা পৌঁছে কোন কোন নেতার গৃহেও গেলেন। শহরের একজন নেতা তাঁর আহবানে সাড়া দিচ্ছিলেন না। তিনিনিজে তাঁর গৃহে যেয়ে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। সে বললোঃ ‘আমার মায়ের কথা না মানতে পেরে আমার লজ্জা হচ্ছে।’২০১

হযরত আলীর (লা) পক্ষ থেকে তখন বসরার ওয়ালী ছিলেন ‘উসমান ইবন হুনাইফ। তিনি প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য ইমরান ইবন হুসাইন ও আবুল আসওয়াদকে পাঠালন। তাঁরা হযরত আয়িশার (রা) নিকট উপস্থিত হয়ে ওয়ারীল পক্ষ থেকে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চান। আয়িশা (রা) তাঁদেরকে বলেন, ‘আল্লাহ কসম’ আমার মত ব্যক্তিরা কোন কথা গোপন রেখে ঘর থেকে বের হতে পারে না। আর না কোন মা প্রকৃত ঘটনা তার সন্তানদের কাছে লুকাতে পারে।’ তারপর তিনি তারে সামনে মদীনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন এবং উসমান (রা) হত্যাকারীদের শাস্তিদান ও উম্মাতের মধ্যে যে দ্বন্দ-সংঘাত দেখা দিয়েছে তা মিটিয়ে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সব শেষে তিনি বলেনঃ২০২ ‘তোমাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করা এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা আমার কাজ।’ তারপর তিনি পাঠ করেনঃ২০৩

আরবী হবে

-তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভালো নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান-খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্তাপন কল্পে করতো, তা স্বতন্ত্র।

এই দুই ব্যক্তি হযরত আয়িশার (রা) নিকট থেকে উঠে হযরত তালহা ও যুবাইরের (রা) কাছে যান। তাঁদের থেকেবিদায় নিয়ে আবার হযরত আয়িশার (রা) নিকট যান। তখন তিনি বলেনঃ আবুল আসওয়াদ, তোমার প্রবৃত্তি যেন তোমাকে দোযখের দিকে নিয়ে না যায়। তারপর তাদেরকে এ আয়াতটি পাঠ করে শোনানঃ২০৪

আরবী হবে

‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে।

‘আয়িশার (রা) বক্তব্যের প্রভাব এই হলো যে, প্রতিনিধিদ্বয়ের একজন সদস্য-ইমরান নিজেকে এই বিবাদ থেকে দূরে সারিয়ে নিলেন এবং বসরার ওয়ালীকেও তাঁর মত করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তিনি বিরত হলেন না; বরং সবরায় হযরত আলীর (রা) পক্ষে জনমত সৃষ্টি চেষ্ট চালিয়ে যেতে লাগলেন। এদিকে তাহলা, যুবাইর ও আয়িশা (রা) বক্তৃতা-ভাষণের মাধ্যমে বসরার জনগণকে তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহবান জানাতে থাকলেন। একদিন এক সমাবেশে তাহলা ও যুবাইর (লা) বক্তৃতা করার পর শ্রোতাদের মধ্যে দ্বিধা-সংশয় লক্ষ্য করে হযরত আয়িশা (রা) অত্যন্ত ধীরস্থীর ও গম্ভীর গলায় হামদ ও না‘ত পেশ করার পর নিম্নোক্ত ভাষণটি দান করেনঃ২০৫

‘জনগণ উসমানের (রা) কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতো, তাঁর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দোষ-ত্রুটি প্রচার করতো। মানুষ মদীনায় এসে আমাদের কাছে পরামর্শ ও উপদেশ চাইতো। আমরা তাদেরকে সন্ধি ও আপোষ-মীমাংসার যে উপদেশ দিতাম তা মেনে নিত। উসমানের (রা) বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ ছিল, আমরা সে বিষয়ে গভীরভাবে খতিয়ে দেখে তাঁকে একজন নিষ্পাপ পরহেযগার ও সত্যবাদী ব্যক্তি হিসেবে পেতাম। আর শোরগোলকারীদেরকে দেখতাম তারা পাপাচারী ও ধোঁকাবাজ। তাদের অন্তরে ছিল এক কথা, আর মুখে ভিন্ন কথা। তাদের সংখ্যা যখন বৃদ্ধি পেল তখন তারা বিনা কারণে এবং বিনা দোষে উসমানের (রা) গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে। অতঃপর যে রক্ত প্রবাহিত করা বৈধ ছিল না, তা তারা করেছে, যে ধন-সম্পদ লুটপাট করা সঙ্গত ছিল না, তা করেছে, আর যে পবিত্র ভূমির মর্যাদা রক্ষা করা তাদের উপর ফরয ছিল, তারা তার অমর্যাদা ও অসম্মান করেছে। সাবধান! এখন যে কাজ করতে হবে এবং যার বিরোধিতা করা উচিত হবে না, তাহলো ‘উসমানের (রা) হত্যাকারীদের প্রেফতার করা এবং শক্তভাবে আল্লাহর হুকুম ও বিধান বলবৎ করা। আল্লাহ বলেছেনঃ২০৬

আরবী হবে

-আপনি কি তাদের দেখেছেন, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে-আল্লাহর কিতাবের প্রতি তারে আহবান করা হয়েছিলো যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ইবন আবদি রাবিবহি আল-আন্দালুসী হযরত আয়িশার (রা) এ সময়ের একটি ভাষণ তাঁর গ্রন্থে সংকলন করেছেন, যা ভাষা ও বাকশৈলীর দিক দিয়ে অতি চমৎকার। এখানে তাঁর অনুবাদ দেওয়া হলোঃ২০৭

‘ওহে জনমন্ডলী! চুপ করুন! চুপ করুন! আপনাদের উপর আমার মায়ের দাবী আছে। আপনাদেরকে উপদেশ দানেরও অধিকার আমার আছে। একমাত্র খোদা-দ্যোহী মানুষ ছাড়া কেউ আমার প্রতি কোন প্রকার দোষারোপ করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বুকে মাথা রেখে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আমি তাঁর প্রিয়তমা বেগমদের অন্যতম। আল্লাহ পাক অন্য মানুষ থেকে আমাকে র্বভাবে সংরক্ষণ করেছেন। আমার সত্তা দ্বারা মুমিন ও মুনাফিকের পরিচয় নির্ণিত হয়েছে এবং আমাকে উপলক্ষ্য করে আল্লাহ আপনাদের জন্য তায়াম্মুমের বিধান দান করেছেন।

আমার পিতা এ পৃথিবীর তৃতীয় মুসলমান এবং ছাওর পর্বতের গুহায় দুইজনের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় এবং তাঁর গলায় খিলাফতের মালা পরিয়ে ইনতিকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পর যখন ইসলামের রশি দুলতে থাকে তখন আমার পিতাই তা শক্ত হাতে মুট করে ধরেন। তিনিই নিফাক (কপটতা)থ-এর লাগাম টেনে ধরে, ধর্মত্যাগের ঝর্ণা ঘুকিয়ে ফেলেন, এবং ইহুদীদের আগুণে ফুঁ দেওয়া বন্ধ করে দেন। আমরা সেই সময় চোখ বন্ধ করে ধোঁকাবাজি, বিশ্বাসহীনতা ও ফিতনা-ফাসাদের প্রতীক্ষায় ছিলাম। …হ্যাঁ, এখন আমি মানুষের প্রশ্নের লক্ষ্রবস্ত্ততে পরিণত হয়েছি। কারণ, আমি বাহিনী নিয়ে বের হয়েছি। আমার এ বের হওয়ার উদ্দেশ্য পাপ ও ফিতনার অনুসন্ধান নয়-যা আমি নিশ্চিহ্ন করতে চাই, যা কিছু আমি বলছি সত্য ও ন্যায়ের সাথে বলছি। আমার ওজর-আপত্তি তুলে ধরা এবং আপনাদেরকে জ্ঞাত করানোর জন্য বলছি। আল্লাহ পাক নবী মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর দরূদ ও সালাম নাযিল করুন।’

জনগণ নীরবে মনোযোগ সহকারে তাঁর ভাষণ শুনছিল। ত৭ার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ প্রতিপক্ষের লোকদের অন্তরেও তীরের ফলার মত গেঁথে যাচ্ছিল। তাদেরানেকে স্বপক্ষ ত্যাগ করে আয়িশার (রা) সেনাক্যাম্পে এসে যোগ দেয়।

বসরায় পেঁছে হযরত আয়িশা (রা) কূফার ওয়ারী এবং কূফা ও বসরার আশে পাশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট তাঁর এভাবে আগমনের উদ্দেশ্যে ও তাদের করণীয় কর্তব্য বর্ণনা করে চিঠি লেখেন। উল্লেখ্য যে, ‘আললী (রা) ও আয়িশা (রা) চূড়ান্ত পর্যায়েরর মুখোমুখি-যাকে উটের যুদ্ধ বলা হয়-হওয়ার আগে উভয় পক্ষের লোকদের ম¨্য ছোটখাট অনেক সংঘর্ষ হয় এবং তাতে বহু লোক হতাহত হয়। অবশেষে বসরায় আয়িশার (রা) কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ দিকে হযরত আপলী (রা) হযরত মু‘য়াবিয়াকে (লা) নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মদীনা থেকে সিরিয়া যাত্রার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। এমন সময় বসরার এই সমাবেশের কথা অবগত হয়ে এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করার জন্য সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্র হলেন। কিন্তু বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাদেরানুগামী লোকেরা যারা মুসলমানদের এই গৃহযুদ্ধকেএকটি ফিতনা বা পরীক্ষা বলে মনে করছিলেন, এ যাত্রায় আলীর (রা) সহগামী হতে রাজি হলেন না।২০৮ হিজরী ৩৬ সনের রবী‘উস সানী মাসে হযরত আলী (রা) মদীনা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করেন।২০৯ সেদিন বহু সাহাবীর আলীর (রা) পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন না করার ফল এই হলো যে, সেই উসমান (রা) হত্যাকারীরা-যাদেরকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য আলী (রা) সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে ঢুকে গেল। যা একদিকে যেমন তাঁর দুর্নামের কারণ হয়ে দাঁড়ালো, তেমনি নানা সমস্যারও। বসরা শহরের অদূরে যেদিন উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) এবং আমীরুল মুমিনীন আলীর (রা) বাহিনীদ্বয় পরস্পর মুখোমুখি হন, সেদিন মুসলিম উম্মাহর প্রতি সহানুভূতিশীল মানুলে বিরাট একটি দল আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালালেন ঈমানদার লোকদের এই দুইটি দলকে সংঘাত-সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখার জন্য। তাঁদের চেষ্টায় আপোষ মীমাংসার কথাবার্তা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলীর (রা) বাহিনীতে উসমান (রা) হত্যাকারীরা বিদ্যমান ছিল-যারা বুঝেছিল, যদি আপোষ-মীমাংসা হয়ে যায় তাহলে তাদের রক্ষা নেই,ান্যদিকে উম্মুল মুমিনীনের বাহিনীতে সেই লোকেরা ছিল, যারা দুইটি দলকে লড়িয়ে উভয়কে দুর্বল করে ফেলতে চাচ্ছিল। এ কারণে সৎ লোকেরা যে যুদ্ধটিকে ঠেকাতে আগ্রাণ চেষ্ট করেছিলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অপশক্তি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে শেষ পর্যন্ত তা বাধিয়ে দিল এবং উটের যুদ্ধ হয়েই গেল।২১০

উটের যুদ্ধ

হযরত আলী (রা) মদীনা থেকে মাত্র সাতশো লোক সংগে করে যাত্রা করেছিলেন। কূফা থেকে আরো সাতহাজার লোক যোগ দেয়। একটি ছোট্ট বাহিনী নিয়ে তিনি বসরায় পৌঁছেন। উভয় বাহিনী রণক্ষেত্রে মুখোমুখি হলো। আরবের প্রতিটি গোত্রের লোক সেদিন দুই ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুদার গোত্রের এক ভাগ অন্য ভাগের সামনে দাঁড়ায়। এমনিভাবে আযদসহ অন্য সকল গোত্রও-একাংশ আরেক অংশের বিপক্ষে দাঁড়ায়। সত্যিই যে এস মর্মবিদারী দৃশ্য। সে দিন উবয় দলের, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রতিটি সদস্য ছিলেন সত্যের সিপাহী। প্রত্যেকে দূঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন যে তারা সত্যের উপর আছেন। কেউই নিজের অবস্থান থেকে বিন্দু মাত্র সরতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কুফার কোন কোন গোত্রের নেতারা তাদের স্বগোত্রীয় বসরী নেতাদের মসজিদে যান্ বেং তাঁদেরকে এই ঝগড়া থেকে দূরত্ব বজায় রাখার আহ্না জানান। কিন্তু তাঁরা জবাব দেয়ঃ আমরা কি উম্মুল মুমিনীনকে একাকী ছেড়ে দেব?

তা সত্ত্বেও উভয় পক্ষের লোকদের দূঢ় বিশ্বাস ছিল, ব্যাপারটি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে না। একটা নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত হয়ে যাবে। একজন গোত্রীয় নেতা হযরত আলীর (রা) নিকট যেয়ে একটা আপোষ-মীমাংসায় পৌঁছার জন্য তাকিদ দিলেন। তিনি তো প্রথম থেকেই রাজি ছিলেন। আলীর (রা) নিকট থেকে উক্ত নেতা তালহা, যুবাইর ও মুমিনীন‘‘ এই কর্মকান্ডে আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? বললেনঃ উসমানের (রা) হত্যকারীদের শাস্তি দান এবং আপোষ-মীমাংসার আহবান। গোত্রীয় নেতা বললেনঃ উম্মুল মুমিনীন! একটু ভেবে দেখুন তো, পাঁচ শো মানুষের শাস্তির জন্য পাঁচ হাজার মানুসের রক্ত ঝরিয়েছেন এবং পাঁচ হাজারের জন্য আপনাকে হাজার হাজার মানুষেল রক্ত ঝরাতে হবে। এ কেমন ইসলাহ ও সংশোধন হলো? লোকটির বক্তব্য এত স্পষ্ট ও মক্তিশালী ছিল যে, উম্মুল মুমিনীন নিরুত্তর হয়ে গেলেন। তিনি আপোষ করতে রাজি হলেন এবং সবাই মিলে সিদ্ধান্তে এসে গেলেন।২১১

এখন উভয় পক্ষ নিশ্চিন্ত। যুদ্ধ-বিগ্রহের চিন্তা তাদের অন্তর থেকে দূর হয়ে গেল। সবকিছু ঠিকঠাক মত নিষ্পাত্তির ব্যাপারে কারো কোন সনে্হদ থাকলো না। কিন্তু উবয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান দুস্পৃতিকারীরা দেখলো, যদি আপোষ-মীমাংসা হয়ে যায় তাহলে তাদের বিপদের অন্ত নেই। তাছাড়া তাদের বহু বছরের পরিকল্পনা ও চেষ্টা সাধনা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারা তখন সক্রিয় হয়ে উঠলো। সাবায়ী দলের বিরাট একটি সংখ্যা আলীর (রা) পক্ষে ছিল। আলাপ-আলোচনার পর উভয় দলের রোকেরা যখন রাতের শেষ প্রহরে ঘুমিয়ে ছিল তখন এই সাবায়ীরা আক্রমণ করে বসলো। এই কিছু সংখ্যক পাপাত্মা হঠাৎ করে চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দিল। ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে প্রত্যেকে নিজের অস্ত্রটি হাতে তুলে নিল। প্রত্যেক গ্রুপ ও দলের নেতারা বিশ্বাস করলো, প্রতিপক্ষ তাদের নিদ্রার সুযোগে চুক্তি ভঙ্গ করে আক্রমণ করে বসেছে। হযরত আলী (রা) লোকদের থামাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন।

সকাল পর্যন্ত এ হৈ হাঙ্গামা চলতে থাকে। হৈ চৈ হযরত আয়িশা (রা) জিজ্ঞেস করেনঃ কি হয়েছে? জানতে পারলেন, লোকেরা যুদ্ধ করে দিয়েছে। বসরার কাজী কা‘ব ইবন সুওয়ার হযরত আয়িশার (রা) নিকট এসে বললেন, আপনি উটের পিঠে চড়ে চলুন। হতে পারে লোকেরাপনার মাধ্যমে সন্ধি করে নেবে।২১২ তিনি লোহার লৈতরি হাওদা উটের পিঠে বেঁধে তাঁরম¨্য বসে সৈন্যবাহিনীর মাঝ বরাবর চলে আসেন। এদিকে হযরত আলী (লা) তাঁর প্রতিপক্ষ হযরত তালহা ও হযরত যুবাইরকে ডেকে আনেন। এই তিন মহান সাহাবী ঘোড়ার উপর বসা অবস্থায় কিছুক্ষণ এক স্থানে অবস্থান করেন। বদর-উহুদের সহযোদ্ধাত্রয়ীর আজ এমন অবস্থান! সত্যি সে এক পীড়াদায়ক দৃশ্য। আলী (রা) তাঁদের দুইজনকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণকরিয়ে দেন। তাঁদেরও স্মারণ হলো। সাথে সাথে যুবাইর (রা) যুদ্ধের ইচ্ছা অন্তর থেকে মুছে ফেলেন। ছেলে ‘আবদুল্লাহ পাশেই ছিলেন। তিনি পিতাকে ভীরু, কাপুরুষ বলে তিরস্কার করেন। যুবাইর জবাব দেন, লোকেরা জানে আমি ভূীরু নই। তবে আলী (রা) আমাকে একটি কথা স্মারণ করে দিয়েছে, যা আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে শুনেছি। আশি শপথ করছি, তাঁর বিরুদ্ধে আমি আর লড়বো না।২১৩

তিনি ঘোড়ার লাগামে টান দিয়ে মুখ গুরিয়ে রণক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। ইবন জুরমূয নামক এক সাবায়ী তাকে অনুসরণ করে এবং পথিমধ্যে সে নামাযে সিজদারত অবস্থায় তরবারির এক আঘাতে তাঁর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

হযরত তালহাও (লা) রণক্ষেত্র থেকে সরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি উমাইয়্যা গোত্রের মারওয়ানের দৃষ্টিতে পড়ে যান। সে বুঝেছিল, যদি তালহা জীবিত ফেরে তাহলে উমাইয়্যা খান্দানের প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। সে তাঁকে তাক করে একটি বিষাক্ত তীর ছোড়ে। তীরটি তাঁর পায়ে বেধে। কোনভাবেই রক্ত পড়া বন্ধ করা গেল না। এই আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এদিকে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা) কা‘ব ইবন সুওয়ারকে ডেকে তাঁর হাতে নিজের কুরআনের কপিটি দিয়ে বলেন, যাও এটি দেখিয়ে মানুষকে আপোষ-মীমাংসার আহবান জানাও। তিনি কুরআনখুলে উভয় দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেলেন। দৃষ্কৃতিকারীরা দূর থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ে। ফলে তিনিও শাহাদাত বরণ করেন।

দুপুর হয়ে গেল। আক্রমণ ছির অতর্কিত। হযরত আয়িশার (রা) বাহিনীর অধিনায়করা শেষ পর্যন্ত এই ফিতনা থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিলেন। এ কারণে তাঁর বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়লো। এই যুদ্ধের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, উভয় পক্ষের গরিষ্ঠ অংশের বিশ্বাস ছিল, প্রতিপক্ষ আমাদের মুসলিম ভাই। এ কারণে, প্রত্যেকে তার প্রতিপক্ষের হাত পা বা অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। সবাই চেষ্টা করছিল যাতে মাথা ও বুকে আঘাত না লাগে। উদ্দেশ্য; হাত-পা কাটা গেলেও যাতে জীবনে বেঁচে থাকে। তারা আন্তরিকভাবে কামনা করছিল, যুদ্ধ বন্ধু হোক। রণক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থানে নৈকিদের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হাত-পায়ের স্তহপ হয়ে গিয়েছিল।

সাবায়ীদের বাসনা ছিল, আয়িশাকে (লা) হাতের মুঠোয় পেলে চরমভাবে অবমাননা করা হবে। সুতরাং হযরত তালহা ও যুবাইরের (রা) শাহাদাতের পর কূফাবাসীরা তাঁর উপর আক্রমণের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে।২১৪ হযরত আয়িশার (রা) বাহিনীর লোকেরাও চতুর্দিক থেকে গুটিয়ে যায়। উম্মুল মুমিনীনের উটটি একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল। চতুর্দিক থেকে নিক্ষিপ্ত তীর-বর্শা এসে আঘাত করছিল তাঁর বর্ম আচ্ছাদিত হাওদায়। সন্তানেরা ডানে-বামে সাম–পিছন থেকে আক্রমণ প্রতিহত করে চলচিল। তখন তাদের অনেকের মুখেএ দুইট চরণ উচ্চরিত হচ্ছিল।২১৫

আরবী হবে

-হে আমাদের মা, হে আমাদের সেই মা-যাঁকে আমরা সর্বোত্তম বলে জানি! আপনি কি দেখছেন না, কত বীর সন্তানকে আহত করা হচ্ছে এবং তাদের হাত ও মাথা কাটা যাচ্ছে?

এখন চতুর্দিক থেকে এ আওযায় উঠতে লাগলো যে, যতক্ষণ না উম্মুল মুমিনীনের উটটি আঘাত করে বসিয়ে দেওয়া যাবে, এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হবে না। বনু দাববা উটের চতুর্দিকে একটা বেষ্টনী করে রেখেছিল। কেউ উটের দিকে এাগানোর চেষ্টা করলেই তাকে তারা জীবিত ছেড়ে দিচ্ছিল না। তারা তখন একটা আবেগ ও উত্তেজনাপূর্ণ সংগীত গেয়ে চলছিল। তার তিনটি শ্লোক নিম্নরূপঃ২১৬

আরবী হবে

-‘আমরা দাববার সন্তান, এই উটের রক্ষক। মৃত্যু আমাদের নিকট মধুর চেয়ে মিষ্টি।

-আমরা মৃত্যুর সন্তান-মৃত্যু যখন আসে। আমরা আফফানের ছেলে উসমানের মৃত্যুর ঘোষণা নিযার ফলার সাহায্যে করি।

-তোমরা আমাদের নেতাকে ফিরিয়ে দাও, তাহলে তোমাদের সাথে কোন দ্বন্দ্ব নেই।’

আবেগ ও উত্তেজনা এমন প্রবল ছিল যে, বনু দাববার একজন একজন করে এগিয়ে গিয়ে উটের লাগাম ধরছিল, প্রতিপক্ষের আঘাতে তার হাত বিচ্ছিন্ন হলে অন্য একজন ছুটে এসে লাগামটি মুঠ করে ধরছিল। এভাবে একই স্থানে উটের লাগাম ধরা অবস্থায় ৭০ (সত্তর) ব্যক্তির হাত বিচ্ছিন্ন হয়।২১৭ এমনিভাবে উম্মুল মুমিনীনের প্রতিপক্ষের যে কোন হাত সে দিন উটের লাগামের প্রতি বাড়ানো হয়েছিল, তা আর আস্ত ফিরিয়ে নিতে পারেনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) নিকটেই দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি বলেনঃ কর্তিতহাত যেন তখন বাতাসে উড়ছিল। এ দৃশ্য দেখে হযরত আলী (রা) ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসেন। আশতার আন-নাখ‘ঈ আবদুল্লাহ বিন যুবাইয়ের কাছে পৌঁছে গেলেন। দুইজনই ছিলেন সাহসী বীর পুরুষ। উভয়ের মধ্যে অসির যুদ্ধ শুরু হলো। দুইজন আহত হলেন। এ অবস্থায় একে আপরকে জড়িয়ে ধরলেন। ইবন যুবাইর (রা) চেঁচিয়ে বলে উঠলেনঃ২১৮

আরবী হবে

অর্থাৎ মালিক ও আমাকে মেরে ফেল। আমার সাথে মালিককেও হত্যা কর।

পরবর্তীকালে আশতার নাখ‘ঈ বলতেনঃ লোকেরা আমাকে মালিকনামে জানতো না, তাই সে দিন রক্ষা পেয়েছিলাম। অন্যথায় আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতো।

বনু দাববার কিছু লোক আলীর (রা) পক্ষেও ছিলেন। তাঁরা দেখলেন উট যদি তাঁদের দৃষিট আড়ালে না আনা যায় তাহলে যেভাবে লোক মারা যাচ্ছে তাতে তাঁদের গোত্র নির্মূল হয়ে যাবে। এমন চিন্তা মাথায় আসার পর দাববা গোত্রের বুজাইর ইবন দালজা’ নামক এক ব্যক্তি পিছন দিক থেকে এসে উটের পায়ে তরবারিরর এমন আঘাত হানেন যে, উট হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ে। আর সাথে সাথে উটকে কেন্দ্র করে আয়িশার (রা) পক্ষে যাঁরা লড়ছিলেন তারা সরে গেলেন। আলীর (রা) কোন রক্ম আঘাত পেয়েছেন কিনা।হাত দেখেই আয়িশা (রা) গর্জে ওঠেনঃ এ কোন মালউনের (অভিশপ্ত) হাত? আয়িশঅ বলেনঃ না, তুমি মুহাম্মদ (প্রশংসিত) নও, তুমি মুজাম্মম (নিন্দিত)। অন্য একটি বর্ণনা মতে আয়িশা প্রশ্ন করেনঃ কে? মুহাম্মাদ বলেনঃ আপনার অনুগত ভাই। আয়িশা (রা) বলেনঃ তুমি অগুগত নও, বরংয় অবাধ্য। মুহাম্মদ প্রশ্ন করেনঃ বোন! আপনি কি কোন আঘাত পেয়েছেন? আয়িশা (রা) জবাব দেনঃ তাতে তোমার কি?

এরই মধ্যে হযতর আলী (লা) উটের কাচে এসে হাজির হলেন। তিনি জানতে চাইলেনঃ আম্মা, আপনি কেমন আছেন? আয়িশা (রা) বললেনঃ ভালো আছি আলী (রা) বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আয়িশা বললেনঃ আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন। ২১৯

হযরত আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) কাছেই ছিলেন। তিনি বললেনঃ মা, আপনার সন্তনদের এ লড়াই কেমন দেখলেন? আয়িশা (রা) বললেনঃ আমি তোমার মা নই। আম্মার (রা) বললেনঃ আপনার পছন্দ না হলেও আপনি আমার মা। আয়িশা (রা) বললেনঃ বিজয়ী হয়েছো বলে গর্ব করছো। যেভাবে বদলা নিয়েছো তাই সংগে নিয়ে এসেছো। জেনে রাখ, যাদের আচরণ এমন হয় তারা কখনও বিজয়ী হতে পারে না।

হযরত আয়িমা (রা) বসরা থেকে সেজা মক্কা মুকাররামায় চলে যান। পরবর্তী হজ্জ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। তারপর মদীনায় ফিরে যান এবং আজীবন সেখানে বসবাস করেন। পরিশুদ্ধির যে পদ্ধতি তিনি অবলম্বন করেন, সারা জীবনতার জন্য আফসোস করেছেন।২২৫ ইবন সা‘দ বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়িশা (রা) বলতেনঃ হায়, যদি আমি বৃক্ষ হতাম,! হায়, যদি আমি পাথর হতাম! হাং, যদি আমি কিছুই না হতাম।২২৬ একথা বলা দ্বারা তার আফসোসের পরিমণ অনুমান করা যায়।

একবার বসরার অধিবাসী এক ব্যক্তি আয়িশার (রা) সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। আয়িশা (রা) তাকে প্রশ্ন করেনঃ তুমি কি আমাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলে? লোকটি জবাব দিলঃ হাঁ। আয়িশা (রা) প্রশ্ন করেনঃ তুমি কি সেই ব্যক্তিকে চেন, যে সেদিন এইচ চরণটি আবৃত্তি করেছিল।:

আবরী হবে

লোকটি বললোঃ সে তো আমার ভাই। বর্ণনকারীর বলেছেন যে, তারপর হযরত আয়িশা (লা) এত কাঁদলেন যে, আমার মনে হলো এ কান্না যেন আর থামবে না। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন, মৃত্যুর সময় তিনি অসীয়াত করেন যে, আমাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের পাশে দাফন করবে না। বাকী‘ গোরস্থানে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে।২২৭ ইবন সা‘দ বর্ণনা করেছেন।অ আয়িশা (রা) মৃত্যুর সময় বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরে একটি নতুন কাজ করেছি। সুতরাং তোমরা আমাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে।২২৮ একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি যখন আয়াত২২৯

আরবী হবে

(তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে) তিলাওয়াত করতেন তখন এত কাঁদতেন যে, চোখের পানিতে আঁচল ভিজে যেত।২৩০ উটের যুদ্ধের শেষ হওয়ার পর হযরত আয়িশা (রা) আল-কা‘কা ইবন আমরকে বলেছিলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি যদি আজকের এ দিনটির আরো বিশ বছর পূর্বে মারা যেতাম, তাহলে কতনা ভালো হতো।’ আর সে কথা শুনে আলীও (রা) ঠিক একই রকম মন্তব্য করেছিলেন।২৩১

‘আইন ইবন দুরাইয়া আল-মাজাশি’ নামক এক ব্যক্তি এসে হাওদার মধ্যে ইক মারতে থাকে। ‘ধায়িশা (রা) বলেনঃ সরে যাও। তোমার উপর আল্লাহর অভিশাপ। লোকটি বলেঃ আমি শুধু হুমায়রাকে এক নজর দেখতে চাই। হযরত ‘ধায়িশা (রা) তখন লোকটির প্রতি অভিশাপ দিয়ে বলেনঃ ‘আল্লাহ তোমার আবরু-ইজ্জত উন্মুক্ত করুন, তোমার হাত বিচ্ছিন্ন করুন এবং তোমার লজ্জাস্থান প্রকাশ করুন’ পরে লোকটি বসরায় নিহত হয়। তার সকল জিনিসপত্র লুণ্ঠিত হয়ে। হাত-পা কর্তিত ও উলঙ্গ অবস্থায় আযদ গোত্রের এশটি বিরান ভূমিতে তার লাশটি পাওয়া যায়।২২০

হযরত ‘আলী (রা) মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের নেতৃত্বে উম্মূল মুমিনীনকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে তাঁরই পক্ষাবলম্নকারী বসরার এক নেতা- ‘আবদুল্লাহ ইবন খালাফ আল-খুযা’ঈ-এর গৃহে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থ করেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) বাহিনীর আহত সৈনিকরা সেই বাড়ির ঘর ও বাইরের প্রতিটি স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। অুঃপর হযরত ‘আলী (রা), হযরত ইবন ‘ধাববাস (রা) ও আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীনের সাথে সাক্ষাৎ করতে সেখানে যান। হযরত ‘আলী (রা) উম্মূল মুমিনীনকে সালাম করেন এবং কিছুক্ষণ তাঁর পাশে অবস্থান করেন। হযরত ‘আলী (রা) জানতেন যে, এই বাড়িতে প্রতিপক্ষের আহত সৈনিকরা আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কিন্তু তিনি সে বিষয়ে কোন কথাউচ্চারণরণ করলেন না।২২১

উম্মূল মুনিনীন কয়েকদিন বসরায় অবসত্মান করেন। তারপর হযরত ‘আলী (রা) যথাযোগ্য মর্যাদায় ও সম্মানের সাথে মুহাম্মদ ইবনে আবী বকরের (রা) তত্ত্বাবধানে চল্লিশজন সম্ভ্রামত্ম বসরী মহিলা সমভিব্যাহারে তাঁর হিজাযে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। বারো হাজার দিরহামও সাথে দিয়ে দেন।২২২ হযরত ‘আলী (রা) সহ অসংখ্য সাধারণ মুসলামান বহুদূর পর্যমত্ম তাঁদেরকে এগিয়ে দেন। ইমাম হাসান (রা) বহু মাইল পথ সেই কাফেলার সাথে চলেন। হিজরী ৩৬ সনের ১লা রজব শনিবার উম্মূল মুমিনীর বসরা থেকে যাত্রা করেন।২২৩ যাত্রাকালে জনগণকে তিনি বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম, একজন নারীর তার জামাইদের সাথে যে রকম সম্পর্ক থাকে, তাছাড়া অন্য কোন বিদ্বেষমূলক সম্পর্ক তাঁর (‘আলী) ও আমার মধ্যে অুীতে ছিল না। আমার জানা মতে তিনি সৎ লোকদের একজন।’ জবাবে ‘আলী (রা) বলেনঃ ‘ওহে জনমন্ডলী! তিনি সত্য বলেছেন। আমার ও তাঁর মাঝে কোন রেষারেষি নেই। তিনি আপনাদের নবীর স্ত্রী- দুনিয়া ও আখিরাতে।২২৪

হিজরী ৩৬ সনের ১০ই জামাদি-উস-সানী বৃহস্পতিবার ভোর থেকে আসর পর্যমত্ম উটের যুদ্ধ হয়।২৩২ এ যুদ্ধে আহতের সংখ্যা অসণিত। নিহতের সংখ্যা কত, সে ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। ইবনুল ইমাম-আল-হাম্বালী তাঁর ‘শাজারাতুজ জাহাব’ গ্রন্থে তেত্রিশ জাহার, মহামত্মরে সতেরো হাজার উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনুল আসীরসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিক দশ হাজার উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অর্ধেক আলীর (রা) ও অর্ধেক ‘আয়িশার (রা) পক্ষের। ইবনুল আসীর আরো উল্লেখ করেছেন’ একমাত্র বনু দাববার এক হাজার লোক নিহত হয় এবং উটের পাশেই শুধু বনী আদীর সত্তর (৭০) ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়।২৩৩ এই যুদ্ধে ইসলামের এমন অনেক বীর পুরুষ শাহাদাত বরণ করেন, যাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ হাতে গড়ে তোলেন এবং যারা ছিলেন ইসলামের অতি পরীক্ষিত সমত্মান। তালাহ (রা), যুবাইর (রা) প্রমুখ তাঁদের অন্যতম। তাঁদের মৃত্যুতে মুসলিম উম্মাহর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল।

রণক্ষেত্রে হযরত ‘আয়িশার (রা) উট বসে যাওয়ার পর হযরত ‘আলী (রা) একজন ঘোষককে এই ঘোষণা দানের নির্দেশ দেনঃ ‘কেউ কোন পলায়ণাকারীকে ধাওয়া করবে না, কোন আহত সৈনিকের মালামাল লুট করবেনা এবং কোন সৈনিক কোন গৃহে প্রবেশ করবে। বিশেষতঃ নারীদের ব্যাপারে তিনি নির্দেশ দেন এভাবেঃ২৩৪

আরবি লেখা হবে

-‘তোমরা অবশ্যই কারো ইজ্জ্ত-আবরু উন্মুক্ত করবেনা, কোন গৃহে প্রবেশ করবেনা, কোন নারীর উপর চড়াও হবে হবে না- যদিও সে তোমাদের মান-মর্যাদা, তোমাদের নেতা ও সৎ লোকদের নিয়ে উপহাস ও গালিগালাজ করে। নারীদের উপর হাত তুলতে (রাসূলুল্লাহর সা. সময়) আমাদেরকে নিষেধ করা হতো-যখন সেই নারীরা ছিল মুশরিক। তাহলে এখন এই মুসলিম নারীদের উপর হাত তোলা যায় কিভাবে?’

যুদ্ধ শেষে ‘আলী (রা) ময়দানে পড়ে থাকা লাশের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন এবং পরিচিত লাশের কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে তোক বা ‘আয়িশার (রা) পক্ষের-দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। তারপর উভয় পক্ষের সকল লাশ এক স্থানে জমা করার নির্দেশ দিলেন। তিনি ইমাম হয়ে সকলের যানাযার নামায পড়ালেন এবং বড় বড় কবর খুঁড়ে এক সাথে অনেকের দাফনের ব্যবস্থা করলেন। তিনি হযরত তালহা ইবন ‘উবাইদুল্লাহর (রা) লাশের কাছে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেনঃ

আরবি লেখা হবে

তারপর বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম! কোন কুরাইশকে এভাবে পড়ে থাকা আমি পছন্দ করতাম না।’ তারপর তিনি সৈনিকদের পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ করে বসরার মসজিদে জমা করার নির্দেশ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ‘শুধু অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া প্রত্যেকেই নিজ নিজ জিনিস সেখান থেকে নিয়ে যেতে পারে। অস্ত্র-শস্ত্র কোষাগারে জমা হবে।’২৩৫

যুদ্ধের পর হযরত ‘আয়িশা (রা) উভয় দলের কে কে নিহত হয়েছে তা জানতে চাইতেন। যখন বলা হতো অমুক নিহত হয়েছে, বলতেন- (আল্লাহ তার প্রতি করুণা করুন)। এই যুদ্ধে নিহতদের সর্ম্পকে হযরত ‘আলী (রা) বলেতেনঃ২৩৬

আরবি লিখতে হবে

-‘আমি অবশ্যই আশা করি এই লোকদের মধ্যে যার অমত্মর আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ছিল তারা সবকাই জান্নাতে যাবে।’

এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার যে, কিছু বিকৃতমনা মানুষের ধারণা, উটের যুদ্ধের মূল কারণ হলো, ‘আলীর (রা) এশটি পুরানো ক্ষোভ ও বিদ্বেষ। ইফকের ঘঁনায় ‘আলী (রা) রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন, ‘ধাপনি ইচ্ছা করলে তাঁকে পরিত্যাগ করতে পারেন’। মঃূলতঃ তখন থেকেই হযরত ‘আয়িশা (রা) ‘আলীর (রা) প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। আর তারই পরিণতি এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কিন্তু আমাদের সামনে হাদীস ও ইতিহাসের যে সকল তথ্য রয়েছে, তাতে এমন ধারণা পোষণের কোন অবকাশ নেই। এাঁ সম্পূর্ণ অমূলক ধারণা। ইহিহাসে এমন বহু তথ্য রয়েছে যাতে বিপরীত চিত্রটিই ফুটে ওঠে। দীর্ঘ হয়ে যাবে বিধায় এখানে আমরা তা উল্লেখ করলাম না। ইতিহাসের সকল তথ্য পর্যালোচনা ষড়যন্ত্রকারী ছাড়া উভয় পক্ষের সকলেই ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপরাধ। সংঘাত ও সংঘর্ষের করেননি। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র পূর্ণমাত্রায় সফল হয়েছে।

হযরত ‘আলীর (রা) খিলাফতের সময়কাল ছিল মাত্র চার বছর। তারপর হযরত আমীর মু’য়াবিয়া (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী বিশ বছর যাবত

গোটা ইসলামী দুনিয়ার একক শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর খিলাফতকাল শেষ হওয়ার দুই বছর পূর্বে হযরত ‘আয়িশা (রা) ইনতিকাল করেন। হযরত মু’য়াবিয়ার (রা) শাসনকালে তিনি জীবনের আঠারোটি বছর অতিবাহিত করেন। দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নীরবে অতিবাহিত করেন।

একবার হযরত মু’য়াবিয়া (রা) মদীনায় আসেন এবং হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। ‘আয়িশা (রা) তাঁকে বলেন, তুমি এমন নিশ্চিমত্ম মনে একাকী আমার ঘরে এসে গেলে? এও তো সম্ভব ছিল যে, আমি কোন ঘাতককে দাঁড় করিয়ে রাখতাম এবং তুমি ঢোকার সাথে সাথে তোমার কল্লা কেটে ফেলতো। আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) বললেন, এটা দারুল আমান (নিরাপত্তার গৃহ), এখানে আপনি এমন কাজ করতে পারতেন না। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ঈমান অতর্কিত হত্যার শিকল। তারপর হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) প্রশ্ন করেন, আপনার সাথে আমার আচরণ কেমন হচ্ছে? বললেনঃ ভালো। তারপর মু’য়াবিয়া (রা) বলেন, তাহলে আমার ও বনু হাশিমের ব্যাপারটি ছেড়ে দিন, আল্লাহর দরবারে বুঝাপড়া হবে।২৩৭

হুজর ইবন ‘আদী (রা) একজন উঁচুসত্মরের সাহাবী, কূফায় ‘আলীর (রা) পক্ষাবলম্নকারীদের একজন অন্যতম নেতা। কিছু লোকের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কূফার গভর্নর আরো কিছু লোকের সাথে তাঁকে গ্রেফতার করে দামেশকে পাঠিয়ে দেন। হুজর ছিলেন কিন্দা গোত্রের লোক। তৎকালনি কূফা ছিল আরবের বড় বড় গোত্রের কেন্দ্রস্থল। সেখানে কিন্দা গোত্রের লোকদেরও বসবাস ছিল। কিন্তু কোন ব্যক্তিই হুজরকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলো না। অথচ সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সেই সময় হুজরের (রা) যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। তাবে তাঁর গ্রেফতারির খবরটি খিলাফতের প্রত্যেকটি অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে ব্যত্থিত ও ক্ষুব্ধ করে। আরবেন বিভিন্ন গোত্রের বহু নেতা তাঁর মুক্তির জন্য সুপারিশ করে, কিন্তু তা সবই প্রত্যাক্যাত হয়। এ খবর মদীনায় ‘আয়িশার (রা) নিকট পৌঁছালে তিনি সুপারিশের উদ্দেশ্যে একজন দূত পাঠান। দুঃখের বিষয় দূত পৌঁছার পূর্বেই হুজরের (রা) মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়ে যায়।২৩৮

পরে হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) যখন মদীনায় এসে হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে সাক্ষাত করেন, তখন তিনি সর্বপ্রথম হুজরের (রা) বিষয়টি উঠান। তিনি বলেনঃ মু’য়াবিয়া! হুজরের ব্যাপারে তোমার ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতা কোথায় ছিল। তাঁকে হত্যার ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় করনি।’ মু‘য়াবিয়া জবাব দিলেনঃ ‘তার ব্যাপারে আমার কোন অপরাধ নেই। অপরাধ তাদের যারা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে।’ অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) বলেন, ‘উম্মূল মুমিনীন! কোন সঠিক সিদ্ধামত্ম দানকারী ব্যাক্তি আমার কাছে ছিল না।’২৩৯ প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত মাসরূক (রহ) বর্ণনা করেন, হযরত ‘আয়িশা (রা) বলতেনঃ আল্লহর কসম! মু‘য়াবিয়া যদি বুঝতো কূফায় সাহস ও আত্নমর্যাদাবোধের কিছু অবশিষ্ট আছে তাহলে কখনও তাদের সামনে থেকে হুজরকে ধরে নিয়ে গিয়ে এভাবে হত্যা করতো না। কিন্তু কালিজা চিবানো হিন্দার২৪০ এই ছেলে ভালো করেই বুঝে গেছে, তখন সেই সব লোক চলে গেছেন। আল্লাহর কসম! কূফা ছিল সাহসী ও আত্নমর্যাদাবোধ সম্পন্ন আরব নেতাদের আবাসভূমি। লাবীদ (রা) যথাযর্থই বলেছেনঃ২৪১

আরবি লেখা হবে

‘‘সেই সব লোক চলে গেছেন- যাদের ছায়াতলে জীবন যাপন করা যায়। এখন এমন উত্তরাধিকারীদের আশ্রয়ে আছি যার চর্মরোগগ্রমত্ম উটের চর্মের মত।’’

‘তারা না কারো উপকারে আসে, আর না তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায়। তাদের সাথে যারা কথা বলে তাদের কেবল দোষ খোঁজা হয়।

ইরাক ও মিসরের কিছু লোক হযরত ‘উসমানের (রা) নিন্দা মন্দ করতো, তেমনিভাবে শামের অধিবাসীরা হযরত ‘আলীর (রা) শানে অশোভন কথা বলতো। আবার খারেজীরা উভয়কে খারাপ বলে জানতো। এ সকল দল ও উপদলের অবস্থা হযরত ‘আয়িশা (রা) জানতে পেরে বলেন, কুরআনে আল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের জন্য রহমত ও মাগফিরাত কামনা করে দু‘আ করতে বলেছেন, আর এই লোকেরা তাঁদেরকে গালি দেয়।২৪২

খারেজীরা হযরত ‘আলীর (রা) দল থেকে পৃথক হয়ে সর্বপ্রথম ‘হারূর’ নামক স্থানে সমবেত হয়। এ কারণে তাদেরকে ‘হারূরিয়্যা’ বল হয়। একবার এক মহিলা হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে প্রশ্ন করলোঃ আচ্ছা, মেয়েদের বিশেষ কিছু দিনের রোযার মত নামায কেন কাজা করতে হবে না? আয়িশা (রা) অত্যমত্ম রাগের সাথে বললেনঃ ‘তুমি কি হারূরিয়্যা!২৪৩ একথা দ্বারা হারূরিয়্যাদের প্রতি তাঁর ঘৃণার অভিব্যাক্তি ঘটেছে।

একবার হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) হযরত ‘আয়িশাকে (রা) একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিতে অনুরোধ করলেন তাঁকে কিছু উপদেশ দানের জন্য। হযরত ‘আয়িশা (রা) জবাবে লিখলেনঃ ‘সালামুন ‘আলাইকু! অতঃপর আমি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেতে শুনেছি, যে ব্যাক্তি মানুষের সন্তুষ্টির পরোয়া না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবে, আল্লাহ তাকে মানুষের অসন্তুষ্টির পরিণতি থেকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি চাইবে, আল্লাহ তাকে মানুষের হাতে ছেড়ে দেবেন। ওয়াস সালামু ‘আলাইকা।’২৪৪

হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) জীবনের শেষ পর্যায়ে ছেলে ইয়াযিদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতে চান। তাঁর পক্ষ থেকে মারওয়ান তখন মদীনার গভর্নর। মসজিদে জনসমাবেশে তিনি ইয়াযিদের নাম উত্থাপন করেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাই ‘আবদুর রহমান ইবন আবী বকর (রা) উছে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। সাথে সাথে মারওয়ান তাঁকে গ্রেফতার করতে চাইলেন। ‘আবদুর রহমান দৌঁড়ে বোন ‘আয়িশার (রা) ঘরে ঢুকে যান। মারওয়ান ভিতরে ঢোকার সাহস করলেন না। তিনি ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন, এতা সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে নাযিল হয়েছে কুরআনের এ আয়াতঃ

আরবি হবে

-‘আর যে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে বলে ধিক্ তোমাদেরকে।’

পর্দার অমত্মরাল থেকে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলে ওঠেন, আমার নির্দোষিতা ঘোষণার আয়াত ছাড়া আমাদের সম্পর্কে আল্লাহ আর কোন আয়াত নাযিল করেননি।২৪৫ এই প্রতিবাদ দ্বারা বুঝা যায়, তাঁরা ভাই-বোন ইয়াযিদের মনোনয়ন সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেননি। হিজরী ৪৯ সনে হযরত আমীর মু‘য়াবিয়ার (রা) হুজরায় ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবু বকর (রা) ও ‘ুমার ফারুককে (রা) দাফন করা হয়েছে। সেখানে এক কোণে একটি কবর হতে পারে এমন কিছু স্থান খালি ছিল। মৃত্যুর পূর্বে হযরত হাসান (রা) চোট ভাই হযরত ইমাম হুসাইনকে (রা) অসীয়াত করে যান যে, ঐ শূন্য স্থানে তাঁকে দাফন করবে। তাতে যদি কেউ বাধা দেয় তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষে যাবেনা। সাধারণ মুসলমানদের গোরসত্মানে দাফন করবে। হযরত ইমাম হুসাইন যখন বড় ভাইয়ের অসীয়াত বাসত্মবায়ন করতে চাইলেন, হযরত ‘আয়িশা (রা) খুশী মনে অনুমতি দিলেন। হযরত মু‘য়াবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে সে সময় সা’ঈদ ইবনুল ‘আসী মদীনার গর্ভনর ছিলেন, তিনিও কোন বাধা দিলেন না। কিন্তু মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁর কিছু সহযোগীকে নিয়ে শক্তভাবে বাধা দিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যখন হযরত ‘উসমানকে (রা) বিদ্রোহীরা এখানে দাফন করতে দেয়নি তখন আর কেউ অনুমতি পেতে পারে না। হযরত ইমান হুসাইনের (রা) পক্ষে বনু হাশিম এবং মারওয়ানের পক্ষে বনু উমাইয়্যা অস্ত্রহাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। অরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উপক্রম হলো। হযরত আবু হুরাইরা (রা) বিচলিত হয়ে পড়লেন।

তিনি আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা চালালেন। তিনি মারওয়ানকে বললেন, নাতি যদি তার নানার পাশে দাফন হওয়ার ইচ্ছা করে তাতে তুমি নাক গলাতে যাবে কেন। অন্যদিকে ইমাম হুসাইনকে (রা) বললেন, মরহুম ইমামের এটাও অসীয়াত ছিল বাধা আসে তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষে যাবেনা। যাই তোক, হযরত ইমাম হুসাইন (রা) ধৈর্য ধারণ করেন এবং ভাইয়ের লাশ ‘জান্নাতুল বাকীতে তাঁদের মা হযরত ফাতিমাতুয যাহরার (রা) কবরের পাশে দাফন করেন।২৪৬ এ সম্পর্কে ইবন ‘আবদিল বার তাঁর ‘আল-ইসতি‘য়াব’ গ্রন্থে, ইবনুল আসীর ‘উসুদুল গাবা’ গ্রন্থে এবং আল্লামা সুয়ুতী ‘তারীখুল খুলাফা’ গ্রন্থে একই ভাষায় একটি বর্ণনাটি এখানে উপস্থাপন করা হলোঃ২৪৭

-ইমাম হাসান (রা) বলেছেন, ‘আমি ‘আয়িশার (রা) কাছে আবেদন করেছিলাম, আমাকে আপনার ঘরে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে দাফন হওয়ার সুযোগ দিবেন। তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি জানিনে, এ অনুমতি তিনি লজ্জায় পড়ে দিয়েছিলেন কিনা। আমার মৃত্যুর পর তাঁর কাছে আবার অনুমতি চাইবে। যদি তিনি হৃষ্টচিত্তে অনুমতি দেন তাহলে দাফন করবে। আমার মনে হচ্ছে, লোকেরা তোমাদের বাধা দেবে। যদি তারা সত্যিই এমন করে তাহলে এই ব্যাপার নিয়ে তাদের সাথে সংঘাত-সংঘর্ষে যাবে না। আমাকে বাকী’ গোরসত্মানে দাফন করবে। হযরত হাসান (রা) ইনতিকাল করার পর হযরত হুসাইন (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, হাঁ, আমি সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি দিচ্ছি। ব্যাপারটি মারওয়ানের কানে গেলে বললেনঃ হুসাইন ও ‘আয়িশা দুইজনই মিথ্যা বলছে। হাসানকে কখনো সেখানে দাফন করা যেতে পারে না। ‘উসমানকে তারা গোরসত্মানে পর্যমত্ম দাফন করতে দেয়নি। আর এখন তারা হাসানকে ‘আয়িশার ঘরে দাফন করতে চায়।’

ওফাত

হযরত ‘আয়িশা (রা) হিজরী ৫৮ সনের ১৭ রমযান মুতাবিক ১৩ জুন ৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৬৬ বছর বয়সে মদীনায় ইনতিকাল করেন। তখন হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালের শেষ পর্যায়। মৃত্যুর পূর্বে কিছুকাল রোগগ্রসত্ম অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। অসংখ্য মানুষ সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে দরজায় ভিড় করতো। কেউ কুশল জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ভালো আছি।২৪৮ এ সময় একদিন হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) সাক্ষাতের অনুমতি চান। হযরত ‘আয়িশা (রা) এ কথা চিমত্মা করে তাঁকে সাক্ষাৎ দানে ইতসত্মত করতে থাকেন যে, তিনি হয়তো এসেই তাঁর প্রশংসা শুরু করে দেবেন। কিন্তু বোনের ছেলেরা তাঁকে বুঝান যে, আপনি হচ্ছেন উম্মূল মুমিনীন, আর তিনি হচ্ছেন ইবন ‘আববাস। আপনাকে সালাম এবং বিদায় জানাতে এসেছেন। তখন বললেন, তোমরা যদি চাও, ডেকে আন। হযরত ইবন ‘আববাসকে (রা) ডাকা হলো। উম্মূল মুমিনীনের ধারণা সত্য হলো। ইবন ‘আববাস (রা) বসার সাথে সাথে বলতে শুরু করলেন, ‘সেই আদিকাল থেকেই আপনার নাম উনমূল মু’মিনীন ছিল। আপনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রিয়তমা স্ত্রী। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আপনার দেহ থেকে প্রাণটি বের হয়ে যাওয়ার সময়টুকু শুধু অপেক্ষা। যে রাতে আপনার হারটি হারিয়ে যায়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পানি তালাশ করেন এবং লোকেরা পানি পেলনা, তখন আপনারই কারণে আল্লাহ তা’য়ালা তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল করেছেন। আপনার নির্দোষিতা ও দোষ মুক্তির কথা জিবরীল আমীন (আ) আসমান থেকে নিয়ে এসছেন। এসব আয়াত কিয়ামত পর্যমত্ম প্রতিটি মসজিদে পাঠ করা হবে। এতটুকু শোনার পর তিনি বলেনঃ ইবন ‘আববাস, আমাকে আপনি এই প্রশংসা থেকে মাফ করুণ। আমার তো এটাই পছন্দ ছিল যে, আমার যদি অসিত্মত্বই না হতো।২৪৯

মৃত্যুর পূর্বে অসীয়াত করে যান যে, আমাকে জান্নাতুল বাকীহতে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে। মৃত্যু যদি রাতের বেলায় হয় তাহলে রাতেই দাফন করে দিবে। তাঁর ওফাত হয় রাতে বিতর নামাযের পরে। সুতরাং তখনই তাঁকে অসীয়াত মত জান্নাতুল  বাকী’তে দাফন করা হয়। তাঁর ওফাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মদীনায় কান্নার রোল পড়ে যায়। আনসাররা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। জানাযায় এত লোকের সমাগম হয় যে, রাতের বেলা এত জনসমাগম পূর্বে আর কখনও দেখা যায়নি বলে লোকেরা বর্ণনা করেছে। কনো কোন বর্ণনায় এসেছে যে, মহিলাদের ভিড় দেখে ঈদের দিন বলে মনে হচ্ছিল। হযরত উম্মু সালামা (রা) কান্নার আওরায শুনে বলেনঃ ‘আয়িশার (রা) জন্য জান্না অপরিহার্য। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) ছিলেন তখন মদীনার গভর্নর। তিনি জানাযার নামায পড়ান। কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবী বকর (রা), ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আবদির রহমান ইবন আবী বকর, ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আতীক, ‘উরওয়া ইবন যুবাইর (রা) এবং ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা)-ভাই ও বোনের এই ছেলেরা তাঁকে কবরে নামান। তাঁর অসিত্মম অসীয়াত অনুযায়ী জান্নাতুল বাকী’ গোরসত্মানে তাঁকে দাফন করা হয়।২৫০

উম্মূল মুমিনীনের ইনতিকালে প্রতিটি মুসলমান গভীরভাবে শোকাভিভূত হন। প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত মাসরূক (রহ) বলেন, আমার যদি একটি কথা স্মরণ না হতো, আমি উম্মূল মুমিনীনের জন্য মাতমের মাজমা’ বসাতাম। ‘উবাইদ ইবন ‘উমাইর এক ব্যাক্তিকে প্রশ্ন করেন, হযরত ‘আয়িশার (রা) মৃত্যুতে করা দুঃখ পান? লোকটি জবাব দেয়, তিনি যাদের মা ছিলেন তারা সবাই দুঃখ পায়। এ সকল কথা ইবন সা’ত বর্ণনা করেছেন।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) কোন সমত্মান জন্মদান করেননি। বোন হযরত আসমার (রা) ছেলে হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরকে (রা) নিজের ছেলেন মত লালন পালন করেন। ‘আবদুল্লাহও মায়ের মত খালাকে ভালোবাসতেন। হিজরাতের পরে মদীনায় মুহাজিরদের ঘরে সর্বপ্রথম এই ‘আবদুল্লাহর জন্ম। মদীনার কাফির-মুনাফিকরা বলাবলি করতো যে, মুসলিম নারীরা মদীনায় এসে বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এমনি এক সময়ে তাঁর জন্ম হলে মুসলিমদের মধ্যে খুশীর জোয়ার বয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খেজুর চিবিয়ে নিজ হাতে তার গালে দিয়ে ‘তাহনীক’ করেন। এই ‘আবদুল্লাহকে হযরত ‘আয়িশা (রা) ছেলে হিসেবে মানুষ করেন। এক আনসারী মেয়েকে লালন-পালন করে তিনি বিয়ে দেন বলে হাদীসে উল্লেখ আছে।২৫১ তাছাড়া মাসরূক ইবন আজদা’ ‘উমরা বিনত ‘আয়িশা বিনত তালহা, ‘উমরা বিনত ‘আবদির রহমান আনসারিয়্যা, আসমা বিনত ‘আবদির রহমান ইবন আবী বকর, ‘উরওয়া ইবন যুবাইর, কাসিম ইবন মুহাম্মদ ও তাঁর ভাই, ‘আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযিদ ও আরো অনেক ছেলে-মেয়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হয়। মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের (রা) মেয়েদেরকে তিনিই লালন পালন করে বিয়ে শাদী দেন।২৫২

দৈহিক আকৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছেদ

হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন খুব দ্রুত বেড়ে ওঠা মেয়েদের একজন। নয়-দশ বছর বয়সে তিনি বেশ বেড়ে উঠেছিলেন।২৫৩ ছোটবেলায় একেবারেই হালকা-হাতলা ছিলেন। কিছু বয়স হলে শরীর কিছুটা ভারী হয়ে যায়।২৫৪ গায়ের বর্ণ ছিল সাদা লালের মিম্রণ। উজ্জ্বল চেহারা ও সৌন্দর্যের অদিকারিণী ছিলেন। এ কারণে আল-হুমায়রা বলা হতো।২৫৫

মিতব্যয়িতা ও অল্পেতুষ্টির কারণে মাত্র এক জোড়া পরিধেয় বস্ত্র রাখতেন। তাই একখানা ধুয়ে অন্যখানা পারতেন।২৫৬ একটি জামা ছিল, যার মূল্য পাঁচ দিরহামের মত হবে। কিন্তু তা সেই আমলে এত মূল্যবান ছিল যে, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে কনেকে সাজানোর জন্য চেয়ে নেওয়া হতো।২৫৭ কখনো কখানো জাফরান দিয়ে রাং করা কাপড় পড়তেন, আবার মাঝে মধ্যে অলঙ্গাকও পরতেন। ইয়ামনের তৈরি সাদা-কালো মোতির একটি বিশেষ ধরনের হার গলায় পরতেন। আঙ্গুলে সোনার আংটি পরতেন।২৫৮ কাসিম ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন, ‘আমি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) ইহরাম অবস্থায় সোনার আংটি এবং হলুদ বর্ণের পোশাক পরতে দেখেছি।’ মাঝে মাঝে একটি রেশমী চাঁদরও ব্যবহার করতেন। পরে সেটি ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরকে দান করেন।২৫৯

পোশাকে ব্যাপারে শরীয়াতের বিধিবিধানের প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। একবার ভাতিজী হাফসা বিনত ‘আবিদর রহমান মাথায় একটি পাতলা ওড়না দিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। তিনি সেটা নিয়ে ফেঁড়ে ফেলেন এবং বলেন, তুমি জান না, আল্লাহ তা’য়ালা সূরা নূর-এ কি বলেছেন। তারপর একটি পুরু ওড়না আনিয়ে তাকে দেন।২৬০ একবার তিনি এক বাড়িতে মেহমান হিসাবে অবসত্মান করেন। গৃহকর্তার বাড়মত্ম বয়সের দুইটি মেয়ে ছিল। তিনি দেখলেন, চাঁদর ছাড়াই তারা নামায পড়ছে। তিনি তাকিদ দিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে আর কোন মেয়ে চাদর ছাড়া নামাড না পড়ে।২৬১

অভ্যাস ও চারিত্রিক গুণাবলী

উম্মূল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) শৈশব থেকে যৌবন পর্যমত্ম সময়কাল এমন এক পবিত্র ব্যাক্তি-সত্তার সাহচর্যে কাটে, এই ধরাধামে যাঁর আগমন ঘটেছিল মহোত্তম নৈতিকতার পূর্ণতা বিধানের জন্য। এই সাহচর্য তাঁকে নৈতিকতার এমন আদর্শ সত্মরে পৌঁছে দেয় যা আধ্যাত্নিক উন্নতির চূড়ামত্ম পর্যায় বলে বিবেচিত। সুতরাং তাঁর নৈতিকতার মান ছিল অতি উঁচুতে। তাঁর হৃদয় ছিল অতি প্রশসত্ম। তাছাড়া তিনি ছিলেন দানশীল, মিতব্যয়ী, ইবাদাতকারিণী এবং দয়াময়ী।

নারী ও অল্পেতুষ্টি-এ যেন পরস্পরবিরোী দুইটি বিষয়। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি দোযখে সবচেয়ে বেশি মহিলাদেরকে দেখেছি। এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলো। বললেন, স্বামীদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা এর কারণ। তবে হযরত ‘আয়িশার (রা) সত্তায় এই দুইটি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁর বৈবাহিক জীবন প্রচন্ড অভাব ও দারিদ্রের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন, কিন্তু কখনো অভিযোগের একটি বর্ণও জিহবায় আনেননি। সুন্দর সুন্দর পোশাক, মূল্যবান অলঙ্কার, আলীশান ইমারাত, মুখরোচক খাদ্য সামগ্রী-এর কোন কিচুই তিনি স্বামীর ঘরে পাননি। অথচ তিনি প্রতক্ষ্য করেছেন যে, গণীমাতের অর্থ-সম্পদ প্লাবনের মত একদিকে আসেছে আর অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও তা থেকে ছিু পাওয়ার বিন্দুমাত্র লোভ ও ইচ্ছা কখনো তাঁকে পেয়ে বসেনি। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পরে একবার তিনি খাবার আনতে বলেন। তারপর বলেন, কখনো আমি পেট ভরে খাইনে। যাতে আমার কান্না না পায়। তাঁর এক শাগরিদ জিজ্ঞেস করলো, কেন? বললেন, আমার সেই অবস্থায় কথা মনে পড়ে যায়, যে অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। আল্লাহর কসম!দিনে দুইবার কখনো তিনি পেট ভরে রুটি ও গোশত খাননি!

আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে সমত্মান থেকে মাহরুম করেছিলেন। তবে তিনি সাধারণ মুসলমিদের সমত্মানদেরকে, বিশেষতঃ ইয়াতীমদেরকে এসে প্রতিপালন করতেন। তাদেরকে শিক্ষা দিতেন এবং তাদের বিয়ে-শাদী দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন।

স্বামী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণমাত্রায় আনুগত্য করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টাই ছিল হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রতি মুহূর্তের চিমত্মা ও কাজ। তাঁর চেহারা সামান্য মলিন ও বিমর্ষ দেখলে তিনি অসিত্মর হয়ে পড়তেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আত্নীয়-স্বজনদের প্রতি এত যত্নবান ছিলেন যে তাঁদের কোন কথা উপেক্ষা করতেন না। একবার বোনের ছেলে ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর খালার সীমাহীন দানশীলতা দেখে শংকিত হয়ে পড়েন এবং বলেন, এখন তাঁর হাত থামানো দরকার। এ কথায় হযরত ‘আয়িশা (রা) এতই রেগে যান যে, ‘আবদুল্লাহর সাথে কথা না বলার কসম করে বসেন। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাতুল গোত্রের লোকেরা সুপারিশ করলো তখন তিনি আর প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না।২৬২ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বন্ধুদেরকেও তিনি অতি সমাদর ও সম্মান করতেন এবং তাঁদের কোন কথাও উপেক্ষা করতেন না। যথাসম্ভব কারো কোন হাদিয়া-তোহফা ফিরিয়ে দিতেন না।

মুহাম্মদ ইবন আশ’য়াস (রা) ছিলেন একজন সাহাবী। একবার তিনি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) একটি পোসত্মীন (চামড়ার তৈরি জামা) হাদিয়া দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বলেন, এটি গরম, আপনি পরবেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) গ্রহণ করতে রাজি হন এবং প্রায়ই সেটি পরতেন।২৬৩

আয়াতে হিজাব নাযিলের পর থেকে কঠোরভাবে পর্দা পালন করতেন। ইসহাক নামে একজন অন্ধ তাবে’ঈ ছিলেন। একবার তিনি এলেন দেখা করতে। হযরত ‘আয়িশা (রা) পর্দা করলেন। ইসহাক বললেন, আপনি আমার থেকে পর্দা করছেন! আমি তো আপনাকে দেখতে পাইনে। তিনি বললেন, তুমি আমাকে দেখতে পাওনা তাতে কি হয়েছে, আমি তো আমাকে দেখতে পাচ্ছি।২৬৪ একবার হজ্জের সময় অন্য মহিলারা বললেন, উম্মূল মুমিনীন! চলুন, হাজারে আসওয়াদে চুমু দেবেন। বললেনঃ তোমরা যেতে পার। আমি পুরুষদের ভিরেড় মধ্যে যেতে পারিনে।২৬৫ কখনও দিনের বেলায় তাওয়াফের প্রয়োজন হলে ক’বার চত্বর থেকে পুরুষদের সরিয়ে দেওয়া হতো। ২৬৬ শরীয়াতে মৃতদের থেকে পর্দার হুকুম নেই। কিন্তু তিনি এ ব্যাপরেও অতিমাত্রার সতর্ক ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাশে ‘উমারকে (রা) দাফন করার পর, সেখানে পর্দা ছাড়া যেতেন না।

হযরত ‘আয়িশা (রা) কক্ষণো কারো গীবত করতেন না বা কালো সম্পর্কে কোন অশোভন উক্তিও না। তাঁর বহু কথা হাদীসের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তার একটিতেও কোন মানুষের প্রতি খারাপ উক্তি বা কারো সম্মানহানি ঘটে এমন একটি কথাও পাওয়া যায় না। সতীনের নিন্দামন্দ করা নারীদের অনেকেরই স্বভাব। কিন্তু তিনি সতীনদের কেমন উদারচিত্তে প্রশংসা করতেন তা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। কবি হযরত হাসসান ইবন (রা), যিনি ইফ্ক-এর এর ঘটনায় জড়িয়ে হযরত ‘আয়িশার (রা) দুঃখকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনিও হযরত ‘আয়িশার (রা) মজলিসে আসতেন এবং তিনি খুব হৃষ্টচিত্তে তাঁকে বসার অনুমিত দিতেন। একদিন হযরত হাসসান (রা) এসে তাঁর শানে রচিত একটি কাসীদা শুনাতে শুরু করেন। যার একটি শ্লোকের অর্থ ছির এরূপঃ

শ্লোকটি শুনতেই হযরত ‘আয়িশার (রা) বহু পূর্বের সেই ইফক-এর ঘটনা স্মরণ হলো। তারপর তিনি শুধু এতটুকু মমত্মব্য করলেন যে, ‘কিন্তু আপনি এমন নন।২৬৭ হযরত আয়িশার (রা) প্রিয়জনদের অনেকে তাঁর দরবারে হযরত হাসসানের (রা) এভাবে উপস্থিতি সহজে মেনে নিতে পারতেন না। তাঁরা অনেক সময় হাসসানকে (রা) কটু কথা শুনাতে চাইতেন কিন্তু হযরত ‘আয়িশা (রা) অত্যমত্ম শক্তবাবে নিষেধ করতেন। হযরত মাসরূক (রহ) বলেন, ‘একবার আমি উম্মূল মু’মিনীনকে বললাম, আপনি এভাবে তাঁকে আপনার কাছে আসার অনুমতি দেন কেন? বললেন, এখন সে অন্ধ হয়ে গেছে। আর অন্ধত্বের চেয়ে বড় শাসিত্ম আর কি হতে পারে। তাছাড়া সে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পক্ষ থেকে মক্কার পৌত্তলিক কবিদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জবাব দিত।’২৬৮

একবার এক ব্যক্তির আলোচনা চলছিল। প্রসঙ্গক্রমে হযরত ‘আয়িশা (রা) সেই ব্যক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা প্রকাশ করলেন না। লোকেরা বললোঃ উম্মূল মুমিনীন! সেই ব্যক্তি তো মারা গেছে। একথা শুনতেই তিনি তার মাগফিরাত কামনা করে দু’আ করতে শুরু করলেন। লোকেরা তখন বললো, আপনি তো এইমাত্র তাকে ভালো বলেন নি, আর এখন তার মাগফিরাত কামনা করে দু‘আ করছেন। জবাবে তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা মৃতদের সম্পর্কে শুধু ভালো কথাই বলবে।২৬৯

অহংকারের লেশমাত্র তাঁর মধ্যে ছিল না। নিজেকে অতি সাধারণ ও তুচ্ছ মনে করতেন। কেউ তাঁর মুখের উপর প্রশংসা করুক তা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। এ প্রসঙ্গে অমিত্মম শয্যায় হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাসের (রা) সাথে তাঁর আচরণটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। চূড়ামত্ম পর্যাযের বিনীয়ী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে আত্নমর্যাদবোধ ছিল পূর্ণমাত্রায়। তাই স্বামী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাঁর কোন কোন আচরণ প্রেয়সীর মান-অভিমানের রূপ নিত। যেমন, ইফক-এর ঘটনায় যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর নির্দোষ বিষয়ক আয়াত পাঠ করে শোনান এবং মা বলেন, মেয়ে স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তখন তিনি যে জবাব দেন, তাতে একদিকে প্রবল আত্নমর্যাদাবোধ প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রিয়তমের নিকট অভিমানের এক চমৎকার দৃশ্য ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার পরোয়ারদিগারের শুকরিয়া আদায় করবো, অন্য কারো নয়-যিনি আমাকে আমার নির্দোষিতা ও পবিত্রতার ঘোষণা দিয়ে সম্মানিত করেছেন।২৭০ তাছাড়া আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, যখন তিনি স্বামীর প্রতি ক্ষুব্ধ হতেন তখন তাঁর নাম নিয়ে কসম খাওয়া ছেড়ে দিতেন। এ সবই ছিল প্রেয়সীর মান-অভিমানের এক অনুপম দৃশ্য।

আমরা তাঁর আত্নমর্যাদাবোধের চূড়ামত্ম রূপ দেখতে পাই অপর একটি ঘটনাঃয়। যে ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরকে (রা) তিনি মাতৃস্নেহে লালন পালন করেন, আর তিনিও খালা ‘আয়িশাকে (রা) মায়ের মত সম্মান ও সেবা করতেন। তিনি খালা সীমাহীন দানে হাত দেখে একবার মমত্মব্য করে বসেন, এখন তাঁর হাতে বাঁধা দেওয়া উচিত। তাঁর এমন মমত্মব্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) আত্নসম্মান বোধ আহত হয়। তিনি কসম খেয়ে বলেন, ভাগ্নের কোন জিনিসিই আরস্পর্শ করবেন না। ভাগ্নে ‘আবদুল্লাহ (রা) পড়ে গেলেন হমা বিপদেঃ। অবশেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সুপারিশ ও মধ্যস্থতায় তিনি সদয় হন।২৭১

হযরত ‘আয়িশার (রা) মধ্যে প্রবল আত্নমর্যদাবোধ ও ব্যক্তিত্বের সাথে সাথে তীক্ষ্ণ ন্যায়বোধও ছিল। একবার মিসরের এক ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। তিনি লোকটির নিকট জানতে চাইলেন, যুদ্ধের ময়দানে তথাকার তৎকালীন শাসকদের আচরণ তাদের সাথে কেমন হয়ে থাকে। লোকটি জবাবে বললেন, প্রতিবাদ করার মত তেমন কোন আচরণ তাঁদের দৃষ্টিতে পড়েনা। কারো উট মারা গেলে তিনি তাকে অন্য একটি উট দেন, কারো চাকর না থাকলে চাকর দেন, কারো খরচের অর্থের প্রয়োজন হলে তার সে প্রয়োজন পূরণ করেন। তাঁর এ জবাব শুনে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, মিসরবাসীরা আমার ভাই মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের সাথে যত খারাপ আচরণ করুক না কেন, তাদের সেই খারাপ আচরণ তোমাদের কাছে আমাকে এ সত্য কথাটি বলতে বিরত রাখতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার এই ঘরের মধ্যেই দু‘আর করেছিলেন- ‘হে আল্লাহ! যে আমার উম্মাতের উপর কঠোরতা করে তুমিও তার উপর কঠোরতা কর, আর যে সদয় হবে, তুমিও তার প্রতি সদয় হও।২৭২

হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন দানের ক্ষেত্রে খুবই দরাজহসত্ম। অমত্মরটাও ছিল অতি উদার ও প্রশসত্ম। বোন হযরত আসমাও (রা) ছিলেন খুবই দানশীল। দুই বোনের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দানশীলতা। ‘আবদুল্লাহ ইবন যবাইর (রা) বলেন, তাঁদের দুইজনের চেয়ে বড় দানশীল ব্যক্তি আর কাকেও দেখিনি। তবে দুইজনের মধ্যে পার্থক্য এই ছিল যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) অল্প অল্প করে জমা করতেন। যখন কিছু জমা হয়ে যেত, তখন সব এক সাথে বিলিয়ে দিতেন। আর হযরত আসমার (রা) অবস্থা ছিল, হাতে কিছু এলে জমা করে রাখতেন না, সাথে সাথে বিলিয়ে দিতেন।২৭৩ অধিকাংশ সময় তিনি ঋণগ্রসত্মাকতেন। বিভিন্ন জরেন নিকট ককে ঋণ গ্রহণ করতেন। লোকেরা যখন বলতো, আপনার এত ঋণ করার প্রয়োজন কি? তিনি বলতেন, ঋণ পরিশোদের যার ইচ্ছা থাকে আল্লাহ তাতে সাহায্য করেন। আমি আল্লাহর এই সাহায্য তালাশ করি।২৭৪ তিনি দান-খয়রাতের ব্যাপারে কম-বেশির চিমত্মা করতেন না। হাতে যা কিছু থাকতো তাই দিয়ে দিতেন। একবার এক মহিলা ছোট ছোট দুই বাচ্চা কোলে করে এসে কিছু সাহায্য চায়। ঘটনাক্রমে সেই সময় তাদেরকে দেওয়ার মতে ঘরে কিছুই ছিল না। খুঁজে খুঁজে একটি মাত্র খেজুর পেলেন। সেটি দুই ভাগ করে বাচ্চা দুইটির হাতে দিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে এলে তাঁকে ঘটনাটি শুনালেন।২৭৫ আর একবার এক ভিক্ষুক এসে সাহায্য চাইলো। হযরত ‘আয়িশার (রা) সামনেই ছিল কিছু আঙ্গুরের দানা। সেখান কে তিনি একটি দানা নিয়ে ভিক্ষুকের হাতে তুলে দেন। ভিক্ষুক দানাটির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে দেখতে থাকে যে, একটি দানা কি কেউ কারো হাতে দেয়! তখন তিনি ভিক্ষুককে লক্ষ্য করে বলেন, দেখ, এই একটি দানারমধ্যে কত দানা রয়েছে।২৭৬ মূলত তিনি সূরা যিলযাল-এর এই আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেনঃ

আরবি হবে

অর্থাৎ, যে ব্যাক্তি একটি অণু পরিমাণ নেক কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।

হযরত ‘উরওয়া (রা) বর্ণনা করেন, একবার হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর সামনে পুরো সত্তর হাজার দিরহাম এক সাথে আল্লাহর রাসত্মায় দান করে দিয়ে চাঁদরের কোণা ঝেড়ে ফেলেন।২৭৭ হযরত আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) একবার এক লাখ দিরহাম হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠালেন। সন্ধ্যা হতে হতে একটি পয়াসও থাকলো না। সবই গরীব-মিসকনীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। দাসী বললো, ইফতারীর খাদ্য-সামগ্রী কেনার জন্য কিছু রেখে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বললেনঃ একা যদি আগে স্মরণ করিয়ে দিতে। এ রকম ঘটনা আরো আছে। একবার হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) বড় বড় দুইটি থলিতে ভরে এক লাখ দিরহাম পাঠালেন। তিনি সবগুলি একটি খাঞ্চায় ঢেলে বিলাতে শুরু করেন। সেদিও তিনি রোযা রেখেছিলেন। সন্ধ্যার সময় দাসীকে ইফতারী জন্য আনতে বলেন। দাসী বলেন, উম্মূল মু’মিনীন! এই অর্থ দিয়ে কিছু গোশত ইফতারের জন্য আনাতে পারতেন না? বললেন, এখন তিরস্কার কারো না। তখন কেন স্মরণ করে দাওনি?২৭৮ একদিন তিনি রোযা আছেন। ঘরে একটি রুটি ছাড়া কিছুই নেই। এমন সময় এক মহিলা ভিক্ষুক এসে কিছু খাবার চায়। তিনি দাসীকে বলেন রুটিটি তাকে দিয়ে দিতে। দাসী বলেন, রুটি দিয়ে দিলে সন্ধ্যায় ইফতার করবেন কি দিয়ে? বললেন, এখন রুটিটি দিয়ে দাও তো তারপর দেখা যাবে। সন্ধ্যার সময় কেউ একজন খাসীর গোশত পাঠালো। তিনি দাসীকে বললেন, এই দেখ, তোমার রুটির চেয়েও ভালো জিনিস আল্লাহ পাঠিয়েছেন।২৭৯ নিজের থাকার ঘরটি তিনি আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) নিকট বিক্রি করে যে অর্থ পান তা সবই আল্লাহর রাসত্মায় বিলিয়ে দেন।২৮০

স্বভাবগতভাবেই হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী। তাঁর জীবনের বহু ঘটনায় এ সাহসিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাতে ঘুম থেকে জেড়ে একা একাই কবরসত্মানে চলে যেতেন।২৮১ যুদ্ধের ময়দানে এসে দাঁড়িয়ে যেতেন। উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনীতে অস্থিরতা বিরাজমান তখন তিনি পিঠে করে মশকভর্তি পানি নিয়ে আহত সৈনিকদের পান করিয়েছেন।২৮২ খন্দক যুদ্ধের সময় যখন পৌত্তলিক বাহিনী চতুর্দিক থেকে মদীনা ঘিরে রেখেছিল এবং নগরীর ভিতর থেকে ইহুদীদের আক্রমণের আশাঙ্খা ছিল তখনও তিনি নির্ভীক চিত্তে কিল্লা থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম মজাহিদদের যুদ্ধ কৌশল প্রত্যক্ষ করতেন।২৮৩ একবার তো তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জিহাদে গমনের অনুমতি চেয়েই বসেন; কিন্তু অনুমতি পাননি।২৮৪ উটের যুদ্ধে তিনি যে দক্ষতার সাথে সৈন্য পরিচালনা করেন, তাতে তার স্বভাবগত সাহসিকতার চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অমত্মরে ছিল তীব্র আল্লাহ-ভীতি। অমত্মরটিও ছিল অতি কোমল। খুব তাড়াতাড়ি কাঁদতে শুরু করতেন। বিদায় হজ্জের সময় যখন নারী প্রকৃতির কারণে হজ্জের কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারলেন না তখন নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিমত্মা করে অকুলভাবে কান্না শুরু করেন। পরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্ত্বনায় স্থির হন।২৮৫ একবার তো দাজ্জালের ভয়ে অস্থির হয়ে কাঁদতে থাকেন।২৮৬ পরবর্তী জীবনে যখনই উটের যুদ্ধের কথা স্মরণ হতো, অসিত্মর হয়ে কাঁদতেন।

একবার কোন একটি কথার উপর কসম করে বসেন। পরে মানুষের পীড়াপীড়িতে কসম ভাংতে বাধ্য হন এবং কাফফরা হিসেবে ৪০টি দাস মুক্ত করেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর হৃদয়ে এত গভীর ছাপ ফেলে যে, যখনই স্মরণ হতো চোখের পানি মুছতে মুছতে আঁচল ভিজে যেত।২৮৭ আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ইফকের ঘটনায় তিনি মুনাফিকদের দোষারোপের কথা জানতে পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পিতামাতার সান্ত্বনা দান সত্ত্বেও চোখের পানি বন্ধ হচ্ছিল না।

একবার এক দরিদ্র মহিলা তার দুইটি ছোট্ট শিশুসমত্মান নিয়ে কিছু সাহায্যের আশা হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট আসে। তখন ঘরে তেমন কিছু ছিল না। তিনি তিনটি খেজুর মহিলার হাতে দেন। মহিলা একটি করে খেজুর তার দুই সমত্মানের হাতে এবং একটি নিজের মুখে দেয়। সমত্মান দুইটি নিজেদের খেজুর খেয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। তখন মহিলা নিজের মুখ থেকে খেজুর বের করে দুই ভাগ করে দুই সমত্মানের মুখে দেয়। নিজে কিছুই খেল না। তিনি মাতৃস্নেহের এমন দুঃখজনক দৃশ্য এবং তার অসহায় অবস্থা দেখে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।২৮৮

রাত-দিনের বেশিরভাগ সময় ইবাদাতে নিমগ্ন াকতেন। চাশতের নামায নিয়মিত পড়তেন। বলতেন, আমার আববাও যদি কবর থেকে উঠে এসে এ নামায পড়তে বারণ করেন তুবুও আমি ছাড়বো না।২৮৯ রাতে ঘুম থেকে জেগে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পরও এই নামাযের এত পাবন্দ ছিলেন যে, সকাল সকাল উঠে ফজরের নামাযের পূর্বে পড়ে নিতেন। একদিন তিনি এ নামায আদায় করছেন, এমন সময় ভাতিজা কাসেম এসে উপস্থিত হন। তিনি প্রশ্ন করেনঃ ফুফু এ আপনি কোন নামায পড়ছেন? বললেনঃ রাতে আমি পড়তে পারিনি; কিন্তু এখন আমি ছেড়ে দিতে পারিনে।২৯০

তিনি বছরের অধিকাংশ সময় রোযা রাখতেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তিনি সর্বদা রোযা অবস্থায় থাকতেন।২৯১ একবার গরমকালে আরাফাতের দিনে রোযা রাখেন। গরম ও সূর্যের তাপ এত তীব্র ছিল যে, মাথায় পানির ছিটে দেওয়া হচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে তাঁর ভাই ‘আবদুর রহমান (রা) ছিলেন, এই প্রচন্ড গরমে রোযা রাখার এত কি দরকার। ইফতার করে ফেলুন। বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ থেকে শুনেছি যে, আরাফাতের দিনে রোযা রাখলে সারা বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তারপরেও আমি রোযা ভেঙ্গে ফেলবো?২৯২

অত্যমত্ম কঠোরভাবে হজ্জের পাবন্দ ছিলেন। এমন বছর খুব কমই যেত, যাতে তিনি হজ্জ আদায় করতেন না। খলীফা হযরত ‘উমার (রা) তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে হযরত ‘উসমান (রা) ও ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আওফকে (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীদের সাথে হজ্জে পাঠান।২৯৩ হজ্জের সময় তাঁদের অবস্থানে স্থানসমূহ নির্দিষ্ট ছিল। প্রথমে ওয়াদিনামির-এর শেষ প্রামেত্ম অবস্থান করতেন। সেখানে যখন মানুষের ভিড় হতে লাগলো তখন তার থেকে একটি দূরে আরাফ নামক স্থানে তাবু স্থাপন করতেন। কোনবার ‘জাবালে সাবীর’-এর পাদদেশে অবস্থান নিতেন। আরাফাতের দিন রোযা রাখতেন। মানুষ যখন আরাফা ছেড়ে চলতে শুরু করতো, তখন তিনি ইফতার করতেন।২৯৪

দাস-দাসীদের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। তিনি সুযোগ পেলেই নানা অজুহাতে দাস মুক্ত করতেন। একবার তো একটি মাত্র কসমের কাফফারায় চল্লিশজন দাস মুক্ত করে দেন। তাঁর মুক্ত করা দাস-দাসীর সংখ্যা সর্বমোট ৬৭ (সাতষট্টি) জন।২৯৫ তামীম গোত্রের একটি দাসী ছিল তাঁর। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখে তিনি শুনতে পান যে, এই গোত্রটি হযরত ইসমাঈলের (আ) বংশধর। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইঙ্গিতে তিনি দাসীটিকে মুক্ত করে দেন। মদীনায় বুরায়রা নাম্মী এক দাসী ছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্তি লাভের ব্যাপারে তাঁর মনিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। তারপর তিনি মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে থাকেন। সে কথা হযরত ‘আয়িশার (রা) কানে গেলে তিনি একাই সব অর্থ পরিশোধ করে তাঁকে মুক্ত করে দেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। লোকেরা বলতে লাগলো, কেউ হয়তো জাদু-টোনা করেছে। তিনি এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জাদু করেছো? সে স্বীকার করলো। তিনি আবার পশ্ন করলেনঃ কেন? দাসীটি বললোঃ যাতে আপনি তাড়াতাড়ি মারা যান, আর আমি মুক্ত হই। হযরত ‘আয়িশা (রা) নির্দেশ দেনঃ তাকে একটি মন্দ লোকের নিকট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে একটি দাস ক্রয় করে মুক্ত করে দাও। তাঁর এ নির্দেশ কাযকরী করা হয়।২৯৬ মুসতাদরিকে হাকেম-এর আত-তিবব অধ্যায়ে এসেছে যে, দাসীকে এ শামিত্ম তিনি দিয়েছিলেন তার শরীয়াতবিরোধী কাজে জন্য।

দরিদ্র ও অভাবগ্রসত্মদের সাহায্য তাদের মর্যাদা অনুযায়ী করা উচিত। হযরত ‘আয়িশা (রা) সর্বদা এদিকে দৃষ্টি রাখতেন। একবার একজন সাধারণ ভিক্ষুক তাঁর নিকট আসলো। তিনি তাকে এক টুকরো রুটি দিয়ে বিদায় করলেন। তারপর একটু ভালো কাপড়-চোপড় পরা একজন ভিক্ষুক আসলো। তাকে দেখে একজন মর্যাদাবান মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। তিনি লোকটিকে বসিয়ে আহার করিয়ে বিদায় দেন। উপস্থিত লোকেরা দুইজন ভিক্ষুকের সাথে দুই রকম আচরণের কারণ জানতে চাইলো। বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মানুষের সাথে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ করা উচিত।২৯৭

শরীয়াতের অতি সাধারণ আদেশ-নিষেধের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। ছোট ছোট নিষিদ্ধ কাজও এড়িয়ে চলতেন। পথ চলতে যদি ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত, সাথে সাথে থেমে যেতেন, যাতে কানে যায়।২৯৮ তাঁর একটি বাড়ীতে একজন ভাড়াটিয়া ছিল। সে দাবা খেলতো। তিনি তাকে বলে দেন, যদি এ কাজ থেকে বিরত না হও, ঘর থেকে বের করে দেব।২৯৯

‘আয়িশা বিনত তালহা বলেন, একটি জিন বার বার হযরত ‘আয়িশার (রা) ঘরে প্রবেশ করতো। তিনি তাকে এভাবে ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করতে থাকেন। এমন কি তাকে হত্যার হুমকি দেন। তবুও সে আসতোকে। একদিন তিনি লোহার একটি দগু দিয়ে জিনটিকে আঘাত করে হত্যা করেন। এরপর তিনি স্বপ্নে দেখেন, কেউ একজন তাঁকে বলছেন, আপনি অমুককে হত্যা করেছেন, অচ তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আপনি যখন পর্দা অবস্থায় থাকতেন তখন ছাড়া তিনি তো আপনার ঘরে ঢুকতেন না। তিনি যেতেন আপনার নিকট রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস শোনার জন্য। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর এই স্বপ্নের কথা পিতাকে বললেন।’ তিনি তাঁকে দিয়াত (রক্তপণ) হিসেবে বারো হাজার দিরহাম সাদাকা করে দেওয়ার জন্য বলেন। ইমাম জাহাবী এ ঘটনা তাঁর সিয়ারু আ‘লাম আননুবালা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, জিনটি সাপের রূপ ধরে আসতো এবং তার দিয়াত হিসেবে হযরত আয়িশা (রা) একটি দাস মুক্ত করেন।

হযরত ‘আয়িশার (রা) স্থান ও মর্যাদা

সহীহ মুসলিমের ‘আল-ফাদায়িল অধ্যায়ে এসেছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘আমি তোমাদের মধ্যে দুইটি বিরাট জিনিস রেখে যাচ্ছিঃ আল্লাহর কিতাব এবং আহলি বায়ত (আবার পরিবার-পরিজন) বিশেষজ্ঞরা বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বাণীর তাৎপর্য হলো, যদিও কিতাবুল্লাহ তার সহজ-সরল ভাষা ও বর্ণানার জন্য সহজেই বোধগম্য এবং বাসত্মবায়নযোগ্য তবুও সর্বদাই দুনিয়াতে এমন সব মানুষের প্রয়োজন থাকবে যারা তার রহস্যসমূহ উদঘাটন করতে পারেন এবং তার ইলমী ও আললী ব্যাখ্যা দিতে পারেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরে এমন ব্যক্তিদের আহলে বায়তের মধ্যে তালাশ করা উচিত।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত ‘আয়িশা (রা) সম্পর্কে যে সকল মমত্মব্য ও বাণী রেখে গেছেন, ‘আয়িশাও (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহচার্য ও শিক্ষায় সেভাবে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছেন, সর্বোপরি তিনি স্বীয় স্বভাবগত তীক্ষ্ণ মেধা ও যোগ্যতা দ্বারা নিজেকে যেভাবে শানিত করেছেন, তাতে আহলি বায়তের মধ্যে তাঁর যে এক বিশেষ মর্যাদার আসন ছিল, সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। এরই ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং ইসলামী হুকুম্ আহকামের শিক্ষাদান তাঁর চেয়ে ভালো আর কে করতে পারতেন? লোকেরা তো কেবল বাইরের নবীকে প্রত্যক্ষ করতেন, অভ্যমত্মরের নবী থাকতেন তাদের দৃষ্টির আড়ালে। পক্ষামত্মরে হযরত ‘আয়িশা (রা) বাহির ও গৃহাভ্যমত্মর-সর্ব অবস্থার নবীকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করতেন। আর একারণেই আল্লাহর নবী বলেছেনঃ৩০০

আরবি হবে

-নারী জাতির উপর ‘আয়িশার (রা) মর্যাদা তেমন, যেমন সকল খাদ্য-সামগ্রীর উপর সারীদের মর্যাদা। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ‘আয়িশাকে (রা) স্ত্রী হিসেবে লাভের সুসংবাদ পান। তাঁর বিছানা ছাড়া আর কোন স্ত্রীর বিছানায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী লাভ করেননি। মহান ফিরিশতা জিবরীল আমীন তাঁকে সালাম পেশ করেছেন। তিনি দুইবার জিবারীলকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন তাঁর পবিত্রতা ঘোষা করে আয়াত নাযিল করেছেন। আর তিনিই যে আখিরাতে জীবনে রাসূলে পাকের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী হবেন, সে কথাও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়ে গেছেন। এ সকল কথা সহীহ বুখারীর ‘আয়িশার সম্মান ও মর্যাদা অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলতেন, আমি গর্বের জন্য নয়, বরং বাসত্মব কথাই বলছি। আর তা হলো, আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে এমন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা আর কাকেও দান করেননি। (১) ফিরিশতা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বপ্নের মধ্যে আমার ছবি দেখিয়েছেন, (২) আমার সাত বছর বয়সে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বিয়ে করেছেন, (৩) নয় বছর বয়সে আমি স্বামী গৃহে গমন করেছি, (৪) আমিই ছিলাম রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একমাত্র কুমারী স্ত্রী, (৫) যখন তিনি আমার বিছানায় থাকতেন তখনও তাঁর উপর ওহী নাযিল হতো, (৬) আমি ছিলাম রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী, (৭) আমার নির্দোষিতা ঘোষণা করে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে, (৮) জিবরীলকে (আ) আমি স্বচক্ষে দেখেছি, (৯) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, (১০) আমি তাঁর খলীফা ও তাঁর সিদ্দীকের কন্যা, (১১) আমাকে পবিত্র করে সৃষ্টি করা হয়েছে, (১২) আমার মাগফিরাত এবং জান্নাতে আমাকে উত্তম জীবিকা দানের অঙ্গিকার করা হয়েছে, (১৩) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পার্থিব জীবনের সর্বশেষ মুহূর্তে আমার মুখের লালা তাঁর লালার সাথে মিলেছে, (১৪) আমারই ঘরে তাঁর কবর দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরো গৌরব ও মর্যাদার কথা তিনি নিজেও যেমন বলেছেন, তেমনে আরো বহু সাহাবী বর্ণনা করেছেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে যা ছড়িয়ে আছে।৩০১

হযরত ‘আয়িশার (রা) এত সব মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দেখে কোন কোন ‘আলিম মনে করেছেন, তিনি তাঁর পিতা আবু বকর (রা) থেকেও উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। ইমাম জাহাবী বলেন, তাঁদের একথা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘য়ালা প্রত্যেকটি জিনিসের বিশেষ বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। আমরা বরং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী। এর চেড়ে বড় গর্বের বিষয় তাঁর জন্য আর কিছু কি আছে? তা সত্ত্বেও হয়রত খাদীজার এমন বৈশিষ্ট্য আছে যা কেউ অর্জন করতে পারেনি। হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি, অনেকগুলি করণে তাঁর চেয়ে খাদীজার (রা) মর্যাদা অনেক বেশি।’৩০২

হযরত ‘আয়িশা সিদ্দীকার (রা) সারীতে মুবারাকার প্রতি যখন আমরা একটি বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক দৃষ্টিপাত করি তখন কেবল সকল মহিলা সাহাবী নয়, বরং অনেক বড় বড় পুরুষ সাহাবীদের তুলনায় তাঁর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যটি পরিপূর্ণরূপে পাই তা হলো, তিনি জন্ম ও স্বভাবগতভাবে চিমত্মা ও অনুধ্যানশীল মেধা ও মসিত্মষ্ক লাভ করেছিলেন। দীনের তাৎপর্য বিষয়ে গভীর জ্ঞান, ইজতিহাদের ক্ষমতা ও শক্তি, সমালোচনা ও পর্যালোচনার রীতি-পদ্ধতি, ঘটনাবলীর যথাযথ উপলব্ধি, গভীর অমর্ত্মদৃষ্টি এবং শুদ্ধ ও সঠিক সিদ্ধামত্ম ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল অতি উচ্চে।

তিনি যে সব কথা বলতেন, যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতেন, তা হতো বিলকুল প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির অনুকূলে। তাঁর এমন কোন বর্ণনা খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে যা সমর্থনের জন্য মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকে নানা রকম তাবীল বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। একথা অবশ্য সত্য যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অতি নিকটের মানুষ হওয়ার সুবাদে তিনি তাঁর যাবতীয় কথা ও কাজ অধ্যয়নের খুব চমৎকার সুযোগ লাভ করেছিলেন। কিন্তু যখন আমরা দেখি যে, তিনি ছাড়া আরও অনেক ব্যক্তি এমন ছিলেন যাঁদের নৈকট্য তাঁর চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না তখন আমাদের সামনে হযরত ‘আয়িশার (রা) মেধা ও মননের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘুরে ফিরে সেই একই কথা আসে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখনিঃসৃত বাণী ‘আয়িশা (রা) ছাড়া আরো অনেকে শুনতেন, কিন্তু তিনি যে সিদ্ধামেত্ম পৌঁছাতেন এবং তার প্রকৃত প্রাণসত্তা তাঁর মেধা ও মসিত্মঙ্ক যত যতটুকু অনুধাবন করতে সক্ষম হতো, অন্যরা তা পারতো না।

উম্মূল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারসগাহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী শিক্ষার্থী। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা ছির অতুলনীয়। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তৎকালীন করল নারী অথবা সকল উম্মাহাতুল মু’মিনীন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সহধর্মিণীগণ, যাঁরা বিশ্বের সকল বিশ্বাসীদের মাতা, অথবা সাহাবীদের একটি অংশের উপরই ছিল না, বরং কতিপয় বিশিষ্ট সাহাবী ছাড়া সকল সাহাবীর উপরই ছিল। হযরথ আবু মূসা আল-আশ’য়ারী (রা) বলেন।:৩০৩ আমরা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবীরা কক্ষণো এমন কোন কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হইনি, যে বিষয়ে আমরা ‘আয়িশার (রা) নিকট জানতে চেয়েছি এবং সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান আমরা তাঁর কাছে পাইনি।

হযরত আবু মূসা আল-আশ’য়ারী (রা) একজন অতি উঁচু মর্যাদার সাহাবী। তাঁর উপরোক্ত মমত্মব্য দ্বারা হযরত ‘আয়িশার (রা) জ্ঞানের পরিধি ও বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত ‘আতা ইবন আব রাবাহ-যিনি বহু সাহাবীর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, বলেনঃ৩০৪

হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন মানুষর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ, সবচেয়ে বেশি জানা ব্যক্তি এবং আম জনতার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মতামতের অধিকারিণী।

তাবে’ঈদের ইমাম বলে খ্যাত হযরত ইমাম যুহরী-যিনি একাধিক অতি মর্যাদাবান সাহাবীর তত্ত্বাবধানের লালিত-পালিত হন, বলেনঃ৩০৫

-হযরত ‘আয়িশা (রা) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘আলিম ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর কাছে জানতে চাইতেন।

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত‘ আবদুর রহমান ইবন ‘তাওফের (রা) সুযোগ্য পুত্র আবু সালামা যিনি একজন অতি উঁচু সত্মরের তাবে’ঈ ছিলেন, বলেনঃ৩০৬

‘ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের জ্ঞান, প্রয়োজনে কোন ব্যাপারে সিদ্ধামত্ম দান, আয়তের শানে নুযূল এবং ফরয় বিষয়সমূহে আমি ‘আয়িশা (রা) অপেক্ষা অধিকতর পারদর্শী ও সুনিশ্চিত মতামতের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।

হযরত আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) একদিন দরবারের এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলেন, আচ্ছা, আপনি বলুন তো, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ‘আলিম কে? লোকটি বললোঃ আমীরুল মু’মিনীন! আপনি। আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) বললেনঃ না। আমি কসম দিচ্ছি, আপনি সত্য কথাটি বলুন। তখন লোকটি বললোঃ যদি তাই হয়, তাহলে ‘আয়িশা (রা)।

হযরত ‘উরত্তয়া ইবন যুবাইর (রা) বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি হালাল-হারাম, জ্ঞান, কবিতা ও চিকিৎসা বিদূায় উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রা) অপেক্ষা অধিকতার পারদর্শীান্য কাউকে দেখিনি।

অপর একটি বর্ণনায় হযরত ‘উরওয়ার কথাগুলি এভাবে এসেছেঃ

আরবী হবে

-কুরআন, ফারায়েজ, হালাল-হারাম, ফিকাহ, কাব্য, চিকিৎসা, আরবের ইতিহাস ও নসব বিদ্যায় আমি ‘আয়িশার (রা) চেয়ে বড় ‘আলিম আর কাউকে দেখিনি।

প্রখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত মাসরূক (রা)-যিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) তত্ত্বাধনানে লালিত-পালিত হন, একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলোঃ উম্মুল্ মু’মিনীন ‘আয়িশা (রা) কি ফারায়েজ শাস্ত্র জানতেন? তিনি জবাব দিলেনঃ

আরবী হবে

-সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বড় বড় সাহবীদেরকে তাঁর নিকট ফারায়েজ বিষয়ে প্রশ্ন করতে দেখেছি। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস ও সুন্নাতের হিফাজত ও প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব ও কর্তব্য রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বেগমগণও করেছেন। তবে তাঁদের কেউই হযরত ‘আয়িশার (রা) স্তরে পৌঁছতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে মাহমুদ ইবন লাবীদ মন্তব্য করেছেনঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ বহু হাদীস স্মৃতিতে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু কেউ ‘আয়িশা (রা) ও উম্মু সালামার (রা) সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।

এ ব্যাপারে ইমাম যুহরী (রা) সাক্ষ্য দিচ্ছেনঃ

আরবী হবে

-যদি সকল মানুষ ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমদের ইল্ম (জ্ঞান) একত্র করা যেত তাহলে তাদের মধ্যে ‘আয়িশার (রা) ইল্ম বা জ্ঞান অধিকতর প্রশস্ত ও বিস্তৃত হতো।

অপর একটি বর্ণনা মতে ইমাম যুহরী বলেনঃ গোটা নারী জাতির ‘ইল্ম (জ্ঞান) এবং ‘আয়িশার (রা) ‘ইল্ম যদি একত্র করা যেত তাহলে ‘আয়িশার (রা) ‘ইল্মই শ্রেষ্ঠ হতো।’

উপরের বর্ণনাসমূহের প্রেক্ষিতে ‘আল্লামা জাহাবী বলেনঃ ‘তিনি ছিলেন বিশাল জ্ঞান ভান্ডার।’ তিনি আরো বলেনঃ ‘উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে, সার্বিকভাবে মহিলাদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বড় জ্ঞানী ব্যক্তি আর কেউ নেই।’

কোন কোন মুহাদ্দিস ‘আয়িশার (রা) ফযীলাত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি হাদীস বর্ণনা করেনঃ

আরবী হবে

-তোমাদের দীনের একটি অংশ তোমরা হুমায়রা হতে গ্রহণ কর। ইল্ম ও ইজাতিহাদ বা জ্ঞান ও গবষেণায় হযরত ‘আয়িশা (রা) কেবল মহিলাদের মধ্যেই নন, বরং পুরুষদের মধ্যেও বিশেষ স্থান অধিকার করতে সক্ষম হন। কুরআন, সুন্নাহ, ফিকাহ ও আহকাম বিষয়ক জ্ঞানে তাঁর স্থান ও মর্যাদা এত ঊর্ধ্বে যে ‘উমার (রা), ‘আলী (রা), ‘আবদুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ (রা), ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) প্রমুখের সাথে তাঁর নামটি নির্ধ্বিধায় উচ্চারণ করা যায়। এখানে সংক্ষেপে আমরা বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা সম্পর্কে একটি আলোচনা উপস্থাপন করছি।

আল কুরআন

আমরা জানি পবিত্র কুরআন দীর্ঘ তেইশ বছর নাযিল হয়। হযরত ‘আয়িশা (রা) নুযূলে কুরআনের চতুর্দশ বছরে মাত্র নয় বছর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে আসেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাঁর সহঅবস্থানের সময়কাল দশ বছরের ঊর্ধ্বে নয়। নুযূলে। কুরআনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত হয় তাঁর জ্ঞান-বৃদ্ধি ও বয়োপ্রাপ্তির পূর্বে। কিন্তু এমন অসাধারণ মেধা ও মননের অধিকারী সত্তা তাঁর শৈশব কালকেও বৃথা যেতে দেয়নি। মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিভিন্ন সময় হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রা) গৃহে আসতেন। সিদ্দীকে আকবরও (রা) নিজ গৃহে একটি মসজিদ বানিয়েছিলেন। সেখানে বসে তিনি অত্যন্ত বিনয় ও ভয়-বিহবার চিত্তে কুরআন পাক তিলাওয়াত করতেন।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অস্বাভাবিক স্মৃতিশক্তির জন্য এ সকল পরিবেশ ও অবস্থা থেকে কোন ফায়দা লাভ না করাটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তাই আমরা তাঁকে সূরা ‘আল-কামার-এর ৩য় আয়াত-

আরবী হবে

সম্পর্কে বরতে শুনিঃ

আরবী হবে

আয়াতটি মক্কায় মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর নাযিল হয়। আমি তখন একটি ছোট্ট মেয়ে, খেলা করি।

ইফক (বানোয়াট দোষারোপ)-এর ঘটনা যখন ঘটে তখন হযরত ‘আয়িশার (রা) বয়স ১৩/১৪ বছর হবে। তখন পর্যন্ত কুরআনের খুব বেশি অংশ হিফজ করেননি। তিনি নিজেই বলেছেনঃ

আরবী হবে

-সেই সময় আমি একটি কম বয়সী মেয়ে, খুব বেশি কুরআন পড়িনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তখনই কুরআনের উদ্ধৃতি পেশ করতেন।

আবূ ইউনুস নামে হযরত ‘আয়িশার (রা) একটি দাস ছিল। সে লেখাড়পা জানতো। তিনি এই আবু ইউনুসকে দিয়ে নিজের জন্য কুরআন লিখিয়েছিলেন।

অনারবদের সাথে মেলামেশার কারণে কুরআন পাঠে তারতম্য সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় ইরাকে।

একবার ইরাক থেকে এক ব্যক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে দেখা করতে আসে। সে বলে, উম্মুল মু’মিনীন! আমাকে আপনার কুরআনটি একটু দেখান। হযরত ‘আয়িশা (রা) কারণ জানতে চাইলে সে বললো, আমাদের ওখানে লোকেরা এখনো পর্যন্ত কুরআন পাঠে কোন ক্রমধারা অনুসরণ করে না। আমি চাই, আমার কুরআনটি আপনার কুরআনের অনুরূপ সাজিয়ে নিই। তিনি বরলেন, সূরাসমূহের বিন্যাস আগ–পিছে হওয়াতে কান ক্ষতি নেই। তারপর নিজের কুরআনটি বের করে প্রত্যেক সূরার আয়াতসমূহ থেকে পাঠ করে লিখিয়ে দেন।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বৈবাহিক জীবনে হযরত ‘আয়িশার (রা) অভ্যাস ছিল যদি কোন আয়াতের অর্থ বোধগম্য না হতো, স্বামী রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। সহীহ হাদীসসমূহে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট বহু আয়াত সম্পর্কে তাঁর প্রশ্নের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ উম্মাহাতুল মুমিনীনের প্রতি নির্দেশ চিলঃ

আরবী হবে

-হে নবী পরিবরের সদস্যবর্গ! আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে।

তাঁরা এই নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ যোগ্যতা ও সাধ্যমত ‘আমল করতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাজাজ্জুদের নামাযে অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে এবং বিনয় ও বিনম্র চিত্তে কুরআনের বড় বড় সূরা তিলাওয়াত করতেন। সেই সব নামাযে হযরত ‘আয়িশাও (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিছনে ইকতাদা করতেন। একমাত্র হযরত ‘আয়িশা (রা) ছাড়া আর কোন বেগমের বিছানায় কুরআনের নুযূল হয়নি। এমতাবস্থায় নাযিলকৃত আয়াতের প্রথম ধ্বনিটি তাঁর কানেই যেত। তিনি বলছেনঃ ‘সূরা আল-বাকারা ও সূরা আন-নিসা যখন নাযিল হয় তখন আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছেই ছিলাম।

মোটকথা, এ সকল পরিবেশ ও অবস্থার কারণে হযরত ‘আয়িশা (রা) কুরআনের প্রতিটি আয়াতের পাঠ পদ্ধতি, ভার ও তাৎপর্য এবং হুকুম-আহকাম বের করার পন্থা-পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেন। এ কারণে, কোন বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো সর্বপ্রথম তিনি কুরআন পাকের প্রতি দৃষ্টি দিতেন। আকায়েদ, ফিকাহ, আহকাম ছাড়াও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সীরাত ও আখরাক-যা মূলক ইতহাসের সাথে সম্পর্কিত, সবকিছুই তিনি কুরআন পাক দ্বারা বুঝার চেষ্টা করতেন। একবার কিছু লোক তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলো। তারা বললোঃ উম্মুল মুমিনীন! আপনি আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু আখরাকের কথা বর্ণনা করুন! তিনি বললেনঃ তোমরা কি কুরআন পড় না? তাঁর আখলাক হলো আল-কুরআন। তারা আবার প্রশ্ন করলোঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাত্রিকালীন ইবাদাতের পদইত কেমন ছিল? বললেনঃ তোমরা কি সূরা ‘মুয্যাম্মিল’ পড়নি?

সহীহ সনদে সাহাবায়ে কিরাম থেকে কুরাআন কারীমের তাফসীর খুব কমই বর্ণিত হয়েছে। যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) তাফসীরমূরক বর্ণনা কবোরে কম নয়। এখানে তার কয়েকটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোঃ

সাফা ও মারওয়ার পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে দŠŠড়ানো হজ্জের একটি অন্যতম প্রধান কাজ। এসম্পর্কে কুরআন মজীদে নিম্নের আয়াতটি এসেছেঃ

আরবী হবে

-নিঃসন্দেহে ‘সাফা ও ‘মারওয়া’ আল্লাহ তা‘য়ালার নির্দশনগুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা‘বা ঘরে হজ্জ বা ‘উমরা করে, তাদের পক্ষে এ দুইটির তাওয়াফ করাতে কোন দোষ নেই।

একদিন ‘উরওয়া বললেনঃ খালাআম্মা! এই আয়াতের অর্থ তো এটাই যে, কেউ যদি সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ না করে তা হলেও কোন দোষ নেই। ‘আয়িশা (রা) বলরেনঃ ভাগ্নে! তুমি ঠিক বলোনি। যদি আয়াতটির অর্থ তাই হতো যা তুমি বুঝেছো, তাহলে আল্লাহ এভাবে বলতেনঃ

আরবী হবে

-অর্থাৎ ওদের তাওয়াফ না করাতে কোন দোষ নেই। মূলত আয়াতটি আনসারদের শানে নাযিল হয়েছে। মদীনার আউস ও খায়রাজ গোত্রের লোকেরা ইসলাম-পূর্ব জীবনে ‘মানাত’ দেবীর উপাসনা করতো। মানাতের মূর্তি ছিল কুদাইদ-এরকাছে ‘মুশাল্লাল’ পাহাড়ে। এ কারণে তারা সাফা-মারওয়ার তাওয়াফকে খারাপ মনে করতো। ইসলাম গ্রহণের পর তারা রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জিজ্ঞেস করে, ইসলামের পূর্বে আমরা এমন করতাম, এখন এর বিধান কি? এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ বলেন, সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ কর, এতে দোষের কিছু নেই। এরপর তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ করেছেন। এখন তা ত্যাগ করার অধিকার কারো নেই।

হযরত ‘আয়িশার (রা) এই তাফসীর দ্বারা যে মূলনীতিটি বেরিয়ে আসে তা হলো, কুরআন বুঝতে হলে আরবদের বাকবিধি ও ব্যবহৃত শব্দের ভিত্তিতে বুঝতে হবে।

সূরা ইউসূফের ১১০তম আয়াতে আল্লাহ পাক বলেনঃ

আরবী হবে

-অবশেষে যখন রাসূলগণ নিরাশ হলেন এবং লোকে ভাবলো যে, রাসূলগণকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে তখন তাদের নিকট আমার সাহায্য আসলো।

হযরত ‘উরওয়া হযরত ‘আয়িশাকে (রা) প্রশ্ন করলেন- আরবী হবে।

(অর্থাৎ রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে) হবে, না-আবরী হবে।

(অর্থাৎ তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে) হবে? ‘আয়িশা (রা) বললেন-আরবী হবে।

(মিথ্যাবদী বলা হয়েছে) ‘উরওয়া বললেনঃ রাসূলগণের তো দূঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তাঁদেরকে মিথ্যাবদী বলা হয়েছে এবং তাঁদের স্বজাতির লোকেরা তাঁদের নবুওয়াতের দাবিকে মিথ্যা বলেছে তখন আরবী হবে অর্থাৎ তাঁরা ধারণা বা অনুমান করলো-কথাটির তাৎপর্য কি? এ কারণে আবরী হবে (তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে) হওয়াই শুদ্ধ হবে। হযরত ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ মা‘য়াজ আলাহ! আল্লাহর নবী-রাসূলগণ কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন ধারা পোষণকরতে পারেন যে, তাঁদেরকে সাহায্যের মিথ্যা প্রতিশ্রুটি দেওয়া হয়েছে? হযরত উরওয়া তখনজানতে চাইলেনঃ তাহলে আয়াতটির অর্থ কি হবে? বললেন? কথাটি বলা হয়েছে রাসূলদের অনুসারীদের সম্পর্কে। যখন তারা ঈমান আনলো, তাঁদের নবুওয়াতকে সত্য বলে স্বীকার করলো তখন স্বাজাতির লোকেরা তাদের উপর অত্যাচার উৎপীড়ন চালালো। সেই সময় আল্লাহর সাহায্য আসতে বিলম্ব হচ্ছে বলে তারা এরূপ মনে করলো। এমন কি রাসূলগণ স্বাজাতির অস্বীকারকারীদের ঈমানের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেলেন। তাঁদের ধারণা হলো আল্লাহর সাহায্যের এই বিলম্বের কারণে ঈমানদারগণ আমাদের মিথ্যাবদী বলে না দেয়। এমন সময় পঠাৎ আল্লাহর সাহায্য এসে যায়।

স্ত্রীর যদি স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে সে ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দশ হলোঃ

আরবী হবে

-কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশঙ্কা করে তবে তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চাইলে কোন দাষ নেই, এবং আপোষ-নিস্পত্তিই শ্রেয়।

অসন্তুষ্টি দূর করার জন্য আপোষ-মীমাংসা করে নেওয়া তো একটি সাধারণ ব্যাপার। এর জন্য আল্লাহ পাকের এক বিশেষ হুকুম নাযিলের কি প্রয়োজন ছিল? হযরত আয়িশা (রা) বলেন, এ আয়াত সেই স্ত্রীর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে যার স্বামী তার কাছে তেমন আসে না। অথবা স্ত্রীর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে যার স্বামী তার কাছে তেমন আসে না। অথবা স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়ার কারণে স্বামীকে-তৃপ্ত করতে সক্ষম নয়। এমন বিশেষ অবস্থায় স্ত্রী যদি তালাক নিতে না চায় এবং স্ত্রী অবস্থায় থেকে স্বামীর নিকট প্রাপ্য নিজের অধিকার ছেড়ে দেয়, তাহলে এমন আপোষ-নিষ্পত্তি খারাপ নয়। বরং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেয়ে তা উত্তম।

আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৩৮তম আয়াতে বলেছেনঃ

আরবী হবে

-তোমরা সমস্ত নামাযের প্রতি যত্মবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। ‘মধ্যবর্তী নামায’ বরতে কি বুঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা) ও হযরত ‘উসামার (রা) মতে, মধ্যবর্তী নামায হলো জুহরের নামায। কোন কোন সাহাবীর মতে ফজরের নামায। হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, মধ্যবর্তী নামায বরতে আসরের নামায বুঝানো হয়েছে। তিনি নিজের এই তাফসীরের উপর এতখানি দূঢ় প্রত্যয়ী ছিরেন যে, নিজের মাসহাফখানির পার্শ্বটীকায় আরবী হবে কথাটি লিখিয়ে দিয়েছিলেন। হযরত আয়িশার (রা) দাস আবু ইউনসু বলেন, তিনি আমাকে একনানি কুরআন লেখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে, আমাকে জানাবে। আমি যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছরাম, তখন তিনি আবরী হবে কথাটি লেখান।

তারপর বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট থেকে এমনই শুনেছি।

মূলত আরবী হবে কুরআনের আয়াত নয়, রবং আবরী হবে এর তাফসীর। সূরা আল-বাকারার ২৮৪তম আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ

আবরী হবে

-তোমরা তোমাদের মনে যা কিছু আছ তা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে হিসাব নেবেন। তারপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দিবেন।

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় মানুষের অন্তরে মুহূর্তের জন্য যে সকল ভাব ও কর্পনার উদয় হয় আল্লাহ তার সবকিছুরই হিসাব নিবেন। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত যে সকল ওসওসা এবং কল্পনার উদয় হয় তারও পাকড়াও যদি আল্লাহ করেন তাহলে মানুষের পরিমাত্রণ পাওয়া অসম্ভব হবে। হযরত ‘আলী (রা) ও ইবন ‘আববাস (রা) বলেন, এ আয়াতের হুকুম একই সূরার ২৮৬তম, আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে। আয়াতটির অর্থ নিম্নরূপঃ

‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনকাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে।’

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন উমারও (রা) উপরোক্ত মত পোষণ করেন। কোন এক ব্যক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট উপরোক্ত আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করে। সাথে সাপথে যে সূরা আন-নিসার ১২৩তম আয়াতটি পেশ করে। আয়াতটির অর্থঃ ‘যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পারে।’ প্রশ্নকারীর বক্তব্য ছিল, এই যদি অবস্থা হয় তাহলে আল্লাহর মাগফিরাত ও রহমত বান্দা কিভাবে লাভ করবে এবং সে মুক্তির আশাই বা কেমন করে করবে? হযরত ‘আয়িশা (রা) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করার পর সর্বপ্রথম মুতিই আমার কাছে প্রশ্ন করেছো। আল্লাহর বাণী সত্য। তবে আল্লাহ তা‘য়ালা তার বান্দাদের ছোট ছোট ভুল-ত্রুটি নানা রকম মুসীবত ও বিপদের বিনিময়ে ক্ষমা করে দেন। একন মুমিন ব্যক্তি যখন অসুস্থ হয় অথবা তার উপর কোনবিপদ আসে, এমন কিপটেকে কোন জিনিস রেখে ভুলে যায় এবং তা তালাশ করতে করতে অস্থির হয়ে পড়ে এর সবকিছুই তার মাগফিরাত ও রহমত লাভের কারণ ও বাহানা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সোনা আগুনে পুড়ে যেমন নিখাঁদ হয়ে যায় তেমনি মুমিন ব্যক্তিও পাক-সাফ হয়ে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।

সূরা আন-নিসার ষষ্ঠ আয়াতে ইয়াতীমের মাল সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

আরবী হবে

-যারা সচ্ছল তারা অবশ্যই ইয়াতীমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে।

এ আয়াতের নির্দেশ ইয়াতীমদের ওলীদের সম্পর্কে। হযরত ইবন ‘আববাস (রা) বর্ণনা করেন যে, উল্লেখিত আয়াতের হুকুম নিম্নোক্ত সূরা নিসার ১০ম আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছেঃ

আরবী হবে

-যারা ইয়াতীমের অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে।

কিস্ত্ত পরবর্থী আয়াতে তো তাদের জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল খায়। এ কারণে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, যে আয়াতে খাওয়ার অনুমতি আছেসেটি সেইসব লোকদের জন্য যারা ইয়াতীমের বিষয় সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য দেখা শোনা করে। এমন ওলী যদি সচ্ছর হয় তাহলে তাদের বিনিময় গ্রহণ করা উচিত নয়। আর যদি দরিদ্র হয় তাহলে তার মর্যাদা অনুযায়ী কিছু গ্রহণ করতে পারে। মূলত হযরত ‘আয়িশার (রা) এ তাফসীরের ভিত্তিতে দুইটি আয়াতে অর্থে কোন বিরোধ থাকে না। উপরের উদ্ধৃত আয়াতসমূহের মত আরোবহু আয়াতের তাফসীর হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে হাদীস ও তাফসীর গ্রস্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

আল হাদীসঃ

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাস্তব সত্তাই হচ্ছে মূলত ইলমে হাদীসের বিষয়বস্ত্ত। এই কারণে যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভের সুযোগ পপেয়েছিলেন, এ সুযোগটি পেয়েছিলেন। হিজরাতের তিন বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজরাতের পরে অবশ্য ছয় মাসের জন্য স্বামীর দীদার থেকে মাহরূম থাকেন। মদীনায় আসার অল্প কিছুদিন পর স্বামীর ঘরে চলে যান, তারপর থেকে আর বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁর শৈশব জীবনেই ইসলামের প্রথম পর্বটি অতিবাহিত হয়। কিন্তু তা হলে কি হবে, তাঁর স্বাভাবগত মেধা ও স্মৃতিশক্তি সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমদের মধ্যে একমাত্র হযরত সাওদা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সহাবস্থানের বা্যাপারে হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। তাঁর দৈহিক ও মানসিক শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হতে চলেছিল। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের কয়েক বছর পূর্বেই তিনি স্বামী সেবায় অক্ষম হয়ে পড়েছিরেন। অপর দিকে হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন উঠতি বয়সের এক নারী। সেই বয়সে দিন দিন তাঁর বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার উন্নতি ঘটছিল। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পার্থিব জীবনের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত তিনি সেবার সুযোগ লাভ কনের। এই কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সার্বিক অবস্থা এবং শরীয়াতের যাবতীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে তাঁর অবগতির ছিল সবার চেয়ে বেশি।

হযরত সাওদা (রা) ছাড়া অন্য বেগমগণ হযরত ‘আয়িশার (রা) পরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হন। যেহেতু হযরত সাওদা (রা) বার্ধক্যের কারণে নিজের বারির দিনটি হযরত ‘আয়িমার (রা) দান করেন, তাই অন্যরা যখন প্রতি আট দিনে একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেতেন তখন হযরত ‘আয়িশা (রা) পেতেন দুইদিন। আর যে মসজিদ ছিল আল্লাহর রাসূলের (রা) গণশিক্ষাকেন্দ্র, সৌভাগ্যক্রমে হযরত ‘আয়িশার (রা) ঘরটি ছির তারই সাথে। এই সকল কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস ও জীবনধারা সম্পর্কে অবগতির ব্যাপারে বেগমগনেল কেউই হযরত ‘আয়িশার (রা) সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেন নি।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত বেশি যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ তথা সকল মহিলা সাহাবীদের শুধু নন হাতে গোনা চার-পাঁচজন পুরুষ সাহাবী ছাড়া আর কেউই তাঁর সমকক্ষতা দাবি করতে পারেন না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা), হযরত ‘উমার (রা), হযরত ‘উসমান (রা), হযরত ‘আলী (রা) প্রমুখের মত বড় বড় সাহাবীরা তাঁদের দীর্ঘ সুহবত বা সাহচার্য, তীক্ষ্ণ বোধ ও মেধা শক্তি ইত্যাদি কারণে ‘আয়িশা (রা) থেকে মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক উর্ধ্বে ছিলেন। তবে একজন স্ত্রী স্বাভাবিকভাবে স্বামী সম্পর্কে এক মাসে যতটুকু জ্ঞান লাভ করতে পারে, আত্মীয়-বন্ধুরা বহু বছরেও তা পারে না। অন্যদিকে উল্লেখিত উঁচু স্তরের সাহাবীরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকারে পর পরই খিলাফতের শুরু দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস বর্ণনায় সময় ও সুযোগ খুব কমই পেয়েছেন। তারপরেও তাঁদের বর্ণিত হাদীস বা সংরক্ষিত আছে তা বিচার ও বিধি বিধান সংক্রান্ত। সেগুলিই আমাদের ফিকাহ শাস্ত্রের ভিত্তি। মূলত হাদীস বর্ণনার মূল দায়িত্ব পালন করেছেন যাঁরা খিলাফত পরিচালনার দায়িত্ব থেকে মুক্ত ছিলেন।

তাছাড়া ঐসবল উঁচু মর্যাদার সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত কম হওয়ার আরো একটি কারণ আছে। তাঁদের যুগ ছির পূর্ণভাবে সাহাবীদের যুগ। সে সময় একজনের অন্যজনের নিকট রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাণী বা কর্ম সম্পর্কে প্রশ্নকরার খুব কমই প্রয়োজন পড়তো। সুতরাং হাসীদ বর্ণনার সুvাগও হতো অতি অল্প। যাঁরা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখেন নি বা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগ লাভ করেননি সেই পরবর্তী প্রজন্ম হলেন তাবে‘ঈন। মূলত তাঁদের যুগ শুরু হয় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের বিশ-পঁচিশ বছর পরে। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবন সম্পর্কে খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন। কিন্তু তখন ঐসব উঁচু স্তরের সাহাবী দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। অন্যদিকে অল্পবয়সী সাহাবীরা তখণ জীভনের মধ্য অথবা শেষ স্তরে এসে পৌছেছেন। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তাবে‘ঈদের জানার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। এ কারণে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে যে সকল সাহাবীর নাম হাদীরে গ্রন্থসমূহে দেখা যায় তাঁরা প্রায় সকলে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের সময়ে কম বয়সী সাহাবী।

যে সকল সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এক হাজারের ঊর্ধ্বে তাঁরা হলেন মাত্র সাতজন। নিম্নে তাঁদের নাম ও বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা উল্লেখ করা হলোঃ

১। হযরত আবু হুরাইরাহ (রা)৫৩৬৪

২। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা)২৬৬০

৩। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা)২৬৩০

৪। হযরত জাবির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রা)২৫৪০

৫। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)২৬৮৬

৬। হযরত আবু সা‘ঈদ আল-খুদরী (রা)২২৭০

৭। হযরত ‘আয়িশা সিদ্দীকা (রা)২২১০

উপরে উল্লেখিত নামের পাশের সংখ্যা অনুযায়ী হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে হযরত ‘আয়িশার (রা) স্থান সপ্তম। অবশ্য এই তালিকাটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়। অনেকের মতে হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) ও হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) ছাড়া আর কেউ হযরত ‘আয়িশা (রা) চেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেননি। তাঁদের মতে অধিক হাসীদ বর্ণনাকারী হিসেবে হযরত ‘আয়িশার (রা) স্থান তৃতীয়।

অধিক হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে যাঁদের নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদেরকে অধিকাংশ উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশার (রা) ইনতিকালের পরেও জীবিত ছিলেন। সুতরাং তাঁদের বর্ণনার ধারাবাহিকতা আরো কিছুকাল অব্যাহত ছিল। পুরুষদের তুলনায় হযরত ‘আয়িশার (রা) অতিরিক্ত কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল। যেমন তিনি ছিলেন একজন পর্দাানশীল নারী। পুরুষ বর্ণনাকারীদের মত প্রতিটি মজলিসে উপস্থিত থাকতে পারতেন না এবং শিক্ষার্থীরাও ইচ্ছা করলেই যখন তখন তাঁর কাছে যেতে পারতো না। অন্যদের মত তিনি তৎকালীন ইসলামী খিলাফতের বড় বড় শহরসমূহে যাওয়ার সুযোগ পাননি। পুরুষ বর্ণনাকারীদের মত তিনি যদি সকল পুযোগ-সুবিধা লাভ করতে সমর্থ হতেন তাহলে তাঁরই স্থান হতো সবার উপরে।

পূর্বের আলোচনা থেকে জানা গেছে, হযরত ‘আয়িশার (রা) সর্বমোট বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা দুই হাজার দুইশো দশ (২২১০)। তার মধ্যে সহীহাইন-বুখারী ও মুসলিমে ২৮৬টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ১৭৪টি মুত্তাফাক আলাইহি, ৫৩টি শুধু বুখারীতে এবং ৬৯টি মুসলিমে এককভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই হিসেবে বুখারীতে সর্বমোট ২২৮টি এবং মুসলিম ২৪৩টি হাদীস এসেছে। এছাড়া হযরত ‘আয়িশার (রা) অন্য হাদীসগুলি বিভিন্ন গ্রন্থে সনদ সহকারে সংকলিত হয়েছে। ইমাম আহমাদের (রা) মুসনাদের ৬ষ্ঠ খন্ডে (মিসর) হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণিত সকল হাদীস সংকলিত হয়েছে। মুসলিম উম্মার নিকট হযরত ‘আয়িশার (রা) যে উঁচু মর্যাদা ও বিরাট সম্মান তা তাঁর অধিক হাসীদ বর্ণনার জন্য নয়, বরং হাদীসের গভীর ও সূক্ষ্ণ তাৎপর্য এবং মূল ভাবধারানুধাবনই প্রধান কার। সাহাবীদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন যাঁদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুবই অল্প। কিন্তু তাঁরা উঁচু স্তরের ফকীহ সাহাবীদের অন্তর্গত। যাঁরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাণরি মূল তাৎপর্য অনুধাবন না করে যা কিছু শুনেছেন তাই বর্ণনা করে দিয়েছেন, তাঁদের বর্ণনার সংখ্যা বেশি। আমরা দেখতে পাই যে, সকল সাহাবী বেশি হাদীস বর্ণনাকরী হিসেবে প্রসিদ্ধ তাঁদের মধ্যে কেবল হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাসি (রা) ও হযরত ‘আয়িশা (রা) ফকীহ ও মুজতাহিদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। কথিত আছে শরীয়াতের যাবতীয় আহকামের এক-চতুর্থাংশ তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাই আল্লামা জাহাবী বলেছেনঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফকীহ (গভীর জ্ঞানসম্পন্ন) সাহাবীরা তাঁর কাছ থেকে জানতেন। একদল লোক তাঁর নিকট থেকেই দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

বর্ণনার আধিক্যের সাথে সাথে দীনের তাৎপর্যের গভীর উপলব্ধি এবং হুকুম-আহকাম বের করার প্রবল এক ক্ষমতা হযরত ‘আয়িশার (রা) মধ্যে ছিল। তাঁর বর্ণনাসমূহের এ এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, আহকাম ও ঘটনাবলী বর্ণনার সাথে সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর কারণও বলে দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এখানে অন্যান্য রাবীর (বর্ণনাকারী) বর্ণনার সাথে একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

জুম‘আর দিন গোসল করা সম্পর্কে সহীহ বুখারীতে হযরত ‘আবদুল্লাহর ইবন ‘উমার (রা), হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা) ও হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা এসেছে। এখানে তিন জনের বর্ণনার নমুনা দেয়া হলো। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে শুনেছি, তোমাদের যে ব্যক্তি জুম‘আয় আসে, সে যেন অবশ্যই গোসল করে আসে।

হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা) বলেনঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ প্রত্যেক বালিগ ব্যক্তির উপর জুম‘আর দিনের গোসল ওয়াজিব।

একই বিষয়ে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা নিম্নরূপঃ

আরবী হবে

-মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী থেকে এবং মদীনার বাইরের বসতি থেকে আসতো। তারা ধুলো বালির মধ্য দিয়ে আসতো। এতে তারা ঘামে ও ধুলো-বালিতে একাকার হয়ে যেত। একবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট অবস্থান করছেন, এমন সময় তাদেরই এক ব্যক্তি তাঁর কাছে আসে। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমরা যদি এই দিনটিতে গোসল করতে তাহলে ভালো হতো।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অন্য একটি বর্ণনা এভাবে এসেছেঃ

আরবী হবে

-লোকেরা নিজ হাতে কাজ করতো। যখন তারা জুম‘আর নামাযে যেত তখন সেই অবস্থায় চলে যেত। তখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা যদি গোসল করতে তাহলে ভালো হতো।

আমরা উপরের একই বিষযের তিনটি বর্ণনা রক্ষ্য করলাম। কি কারণে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুম‘আর দিনে গোসলের নির্দেশ দেন, তা হযরত ‘আয়িশার (রা) স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-যা অন্য দুইটি বর্ণনায় নেই।

একবার হযরতত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিলেন, কুরবানীর গোশত তিন দিনের মধ্যে খেয়ে শেষ করতে হবে। তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) ও হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা)সহ আরো অনেক সাহাবী এই নির্দেশকে চিরস্থায়ী বলে মনে করতেন। তাঁদের অনেকে এ ধরনের কথাই লোদের বলতেন। কিন্তু হযরত আয়িশা (রা) এটাকে চিরস্থায়ী বা অকাট্য নির্দেশ বলে মনে করতেন না। তিনি এটাকে একটা সাময়িক নির্দেশ বলে বিশ্বাস করতেন।

বিষয়টি তিনি বর্ণনা করছেন এভাবেঃ

আরবী হবে

-আমরা কুরবানীর গোশত লবণ দিয়ে রেখে দিতাম। মদীনায় আমরা ঐ গোশত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে খাওয়া জন্য উপস্থাপন করতাম। তিনি বললেনঃ তোমরা এই গোশত তিন দিন ছাড়া খাবে না। এটা কোন চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা ছিলনা। বরং তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন এই গোশত থেকে কিছু অন্যদেরকেও খেতে দেয়।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অন্য একটি হাদীস যো ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, তাতে তিনি এই নিষেধাজ্ঞাও প্রকৃত কারণ বলে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলোঃ উম্মুল মু’মিনীন! কুরবারীন গোশত তিন দিনের বেশি খাওয়া কি নেষেধ! তিনি বলেনঃ

আবরী হবে

-না। তবে সেই সময় কুরবানী করার লোক কম ছিল। এজন্য তিনি চান, যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদেরকেও যেন ঐ গোশত খেতে দেয়।

ইমাম আহমাদ হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

-এটা সঠিক নয় যে, কুরবানীর গোশত তিন দিন পর খাওয়া যাবে না। বরং সেই সময় খুব কম লোক কুরবানী করতে পারতো। এ কারণে তিনি এই নির্দেশ দেন যে, যারা কুরবানী করে তারা যেন তাদেরকে গোশত খেতে দেয় যারা কুরবানী করতে পারেনি।

ইমাম মুসলিম এই হাদীসটি একটি তথ্যের আকারে বর্ণনা করেছেন। যেমন, এক বছর মদীনার আশে-পাশে এবং গ্রাম এলাকায় অভাব দেখা দেয়। সেবার তিনি এই হুকুম দেন। পরের বছর যখন অভাব থাকলো না তখন ঐ হুকুম রহিত করেন।হযরত সালামা ইবন আকওয়া (রা) থেকেও এ ধরনের একটি বর্ণনা আছে।

কা‘বা ঘরে এক দিকের দেওয়ালের পরে কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়া আছে, যাকে ‘হাতীম’ বলে। তাওয়াফের সময় ‘হাতীমকে’ বেষ্টনীর মধ্যে নিয়েই তাওয়াফ করতে হয়। মানুষের অন্তরে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, যেটি কা‘বার অংশ নয়, সেটিও তাওয়াফ করতে হবে কেন? হয়তো অনেক সাহাবী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এই প্রশ্নের উত্তর চেয়ে থাকবেন। কিন্তু হাদীসের গ্রন্থসমূহে তাঁদের থেকে তেমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। আমরা হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা থেকে এই প্রশ্নের উত্তর পাই। তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করিঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই দেওয়ালও কি কা‘বা ঘরের অন্তর্গত? বললেনঃ হ্যঁ! বললামঃ তাহলে নির্মাণের সময় লোকেরা এটাকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিল না কেন? বললেনঃ তোমার স্বাজাতির হাতে পুঁজি ছিল না। তাই এটুকু বাদ দেয়। আবার প্রশ্ন করলামঃ তা কা‘বার দরজা এত উঁচুতে কেন? বললেনঃ এজন্য যে, সে যাকে ইচ্ছা ভিতরে যেতে দেবে, আর যাকে ইচ্ছা বাধা দেবে।

হযরত ‘উমার (রা) বলেন, ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা সঠিক হলে বুঝা যায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেদিকেও স্তম্ভ দুইটি এই কারণে চুমো দেননি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন জানতেন যে, কা‘বা ঘর তার মূলভিত্তির উপর সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত নেই, তখন হযরত ইবরাহীমের (আ) শরীয়াতের পুনরুজ্জীবনকারী হিসেবে তাঁর উত্তরাধিকারী নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানা থাকার ব্যাপারে কোন সন্দোহ নেই। তাই তিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রশ্নের উত্তরে বলেছেনঃ আয়িশা! তোমার কাওম যদি তাদের কুফরীর সময়কালের নিকটবর্তী না হতো তাহলে আমি কা‘বাকে ভেঙ্গে আবার ইবরাহীমের মূল ভিত্তির উপর নির্মাণ করতাম। যেহেতু সাধারণ আরববাসী সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছেন, এমতাবস্থায় নতুন করে কা‘বা গৃহ নির্মাণ করলে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারতো, এই আশঙ্কায় তা করা হয়নি। এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, অধিকতর কোন কল্যাণের ভিত্তিতে যদি শরীয়াতের কোন কাজের বাস্তাবায়নে বিলম্ব করা হয় তাহলে তা তিরস্কারযোগ্য হবে না। তবে শর্ত হচ্ছে সেই কাজটির বাস্তবায়ন যদি শরীয়াত তাৎক্ষণিকভাবে দাবী না করে।

হযরত ‘আয়িশার (রা) এই বর্ণনার ভিত্তিতে তাঁর ভাগ্নে হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) স্বীয় খিলাফতকালে কা‘বা ঘর বাড়িয়ে ইবরাহীমের (আ) মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত ইবন যুবাইরের (রা) শাহাদাতের পর খলীফা ‘আবদুল্লাহ মালিক যখন পুনরায় মক্কার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি এ ধারণার ভিত্তিতে যে, ‘আবদুল্লাহ (রা) এ কাজ তাঁর নিজের ইজতিহাদ থেকে করেছেন, ভেঙ্গে ফেলেন এবং পূর্বের মত তৈরি কনের। কিন্তু তিনি যখন জানতে পারলেন ‘আবদুল্লাহ (রা) নিজের ইজতিহাদ থেকে নয়, বরং উম্মুল মু’মিনীনের এ বর্ণনার ভিত্তিতে করেছেন, তখন তিনি নিজের এই কাজের জন্য ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর তাঁকে কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে বিশিষ্ট সাহাবীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একটি বর্ণায় এসেছে, হযরত আবু বকর (রা) তখন বলেন, নবীরা যেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সেখানেই দাফন করা হয়। এ কারণে রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) ঘরে, যেখানে মৃত্যুবরণ করেন, দাফন করা হয়। কিন্তু এর আসল কারণ হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনায় পাওয়া যায়। তিনি বলেনঃ

আবরী হবে

-রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্তিম রোগশয্যায় বলেন, আল্লাহ ইহুদী ও নাসারাদের উপর অভিশাপ বর্ষণ করুন। তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে উপাসনালয় বানিয়ে নিয়েছে। ‘আয়িশা (রা) বলেন, যদি এমন আশঙ্কা না থাকতো তাহলে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর মাঠেই হতো। কিন্তু তিনি কবরকে সমজিদ বানানোর ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করেন।

মূলতঃ রাসূরুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই শঙ্কা প্রকাশের কারণেই তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের স্থলেই দাফন করা হয়।

এমনি ভাবে হিজরাতের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যাও বুখারী বর্ণিত ‘আয়িশার (রা) একটি হাদীস থেকে পাওয়া যায়। সাধারণভাবে হিজরাত বলতে মানুষ বুঝতো নিজের জন্মস্থান ত্যাগ করে মদীনায় এসে বসবাস করা। কিন্তু তিনি বলেন, এখন আর হিজরাত নেই। হিজরাত তো তখন ছিল যখন মানুষ নিজেদের দীন-ধর্মকে বাঁচানোর জন্য প্রাণের ভয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুলের নিকট আসতো। এখন তো আর সে অবস্থা নেই। সুতরাং প্রকৃত হিজরাতও হবে না। এ কারণে ইবন উমার (রা) বলতেনঃ মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরাত নেই।

মুহাদ্দিসীন ও জারাহ ও তা‘দীল (সমালোচনা ও মূল্যায়ন) শাস্ত্রবিদদের মতে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহের মধ্যে ভুল-ভ্রান্তি তুলনামূলকভাবে খুব কম। এর বিশেষ কারণও আছে। সাধারণ সাহাবীরা হয়তো একবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কথা শুনতেন বা কোনকাজ করতে দেখতেন, তারপর বুবহু সেই কথা বা কাজের বর্ণনা অন্যদের নিকট দিতেন। এক্ষেত্রে হযরত ‘আয়িশার (রা) রীতি ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন কথা বা ঘটনা ভালোমত বুঝতে পারতেন, অন্যের নিকট বর্ণনা করতেন না। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কথা বা আচরণ বুঝতোক্ষম হলে তিনি বারবার প্রশ্ন করে তা বুঝে নিতেন। হাদীসের গ্রন্থসমূহে তাঁর এ ধরনের বহু জিজ্ঞাসা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অন্যরা এ সুযোগ খুব কমই পেতেন।

যে সকল হাদীস তিনি সরাসরি শোনেননি, বরং অন্যদের মাধ্যমে শুনেছেন, সেগুলির বর্ণনার ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। চূড়ান্ত রকমের যাচাই-বাছাই, বিচার-বিশ্লেষণ ও খোঁজ-খবর নেওয়ার পর পূর্ণ আস্থা হলে তখন বণৃনা করতেন। একবার প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুলত্মাহ ইবন আমর ইবনুর আ‘স (রা) তাঁকে একটি হাদীস শোনালের। একবছর পর তিনি যখন আসলেন তখনহযরত আয়িশা (রা) এক ব্যক্তিকে তাঁর নিকট পাঠালেন সেই হাদীসটি আবার শুনে আসার জন্য। আবদুল্লাহ (রা) কোনরকম কম-বেশি ছাড়াই পূর্বের মত হাদীসটি হুবহু বর্ণনা কনের। লোকটি ফিরে এসে হাদীসটি আয়িশাকে (রা) শোনান। তিনি তখন মন্তব্য করেন, আল্লাহর কসম, ইবন আমরের কথা স্মারণ আছে।

এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি যদি কারও নিকট থেকে কোন বর্ণনা গ্রহণ করতেন, আর কেউ যদি সেটি শোনার ইচ্ছা নিয়ে তাঁর কাছে আসতো, তাঁকে মূর বর্ণনাকারীর নিকট পাঠিয়ে দিতেন। আসলে উদ্দেশ্য হতো হাদীসটির বর্ণনা সূত্রের মাঝখানের মাধ্যম যতখানি সম্ভব কমিয়ে দেওয়া এবং আলী সনদে রূপান্তরিত করা। যেমন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে আসরের নামায আদায়ের পর ঘরে এসে সুন্নাত নামায আদায় করতেন। অথচ চূড়ান্ত নির্দেশ ছিল আসরের পরে আর কোন নামায নেই। কিছু লোক হযরত আয়িশার (রা) নিকট এক ব্যক্তিকে পাঠালো একথা জানার জন্য যে, তাঁর সূত্রে যে এই হাদীস বর্ণিত হচ্ছে, এর বাস্তবতা কতটুকু? তিনি বললেন, তোমরা উম্মু সালামার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। হাদীসটির আসল রাবী বা বর্ণনাকারী তিনিই। আর একবার এক ব্যক্তি তাঁকে মোযার উপর মাসেহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলেনঃ আলীর (রা) কাছে যাও। তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরে সংগে থাকতেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) নিজের বর্ণনাসমূহকে যে কোন রকমের ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেমন যুক্ত রেখেছেন, তেমনিভাবে বহুক্ষেত্রে অন্যদের বর্ণনাসমূহও সংশোধন করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সমকালীনদের বর্ণনাসমূহের অতি তুচ্ছ ক্রটি-বিচ্যুতিও অত্যন্ত কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন এবং সংশোধন করে দিতেন। মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় যা ‘ইদরাক’ নামে পরিচিত।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বিশ্বাস করতেন, কোন বর্ণনা আল্লাহর কালামের বিরোধী হলে তা সঠিক নয়। পরবর্তীকালে হাদীস শাস্ত্র বিশারদরা এটাকে হাদীস যাচাই বাছাইরের একটি অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই মূলনীতির ভিত্তিতে হযরত ‘আয়িশা (রা) অন্যদের অনেক বর্ণনা সঠিক বলে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আর নিজের জ্ঞান অনুযায়ী সেই সব বর্ণনার প্রকৃত রহস্য ও ভাব বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবন আববাস (রা), হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) এবং আরও কতিপয় সাহাবী বর্ণনা করেছেনঃ

আবরী হবে

অর্থাৎ, পরিবারের লোকদের কান্নার জন্য মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দয়ে হয়।’

হযরত ‘আয়িমাকে (রা) যখন এই বর্ণনাটি শোনানো হলো তখন তিনি তা মানতোস্বীকার করলেন। বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন কথা কক্ষনো বলেননি। ঘটনা হলো, একদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ইহুদীর লাশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, দেখলেন তার আত্মীয় স্বজনরা চিল্লাপাল্লা ও মাতম করতে আরম্ভ করেছে। তখন তিনি বলেনঃ এরা কান্নাকাটি করছে আর তার উপর শাস্তি হচ্ছে। ‘আয়িশার (রা) বক্তব্যের মর্ম হলো, শাস্তির কারণ কান্নাকাটি করা নয়। অর্থাৎ এরা মাতম করছে, আর ওদিকে মৃতব্যক্তির উপর অতীত কৃতকর্মের জন্য শাস্তি হচ্ছে। কারণ, কান্নাকাটি করা তো অন্যের কর্ম। আর অন্যের কর্মফল মৃত ব্যক্তি কেন ভোগ করবে? তাই তিনি বলেন, তোমাদের জন্য কুরাআনই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেছেনঃ

আরবী হবে।

কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।

বর্ণনাকারী ইবন আবী মুলাইকা বলেন, হযরত ইবন ‘উমার (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) এমন বর্ণনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা যখন শুনলেন তখন কোন উত্তর দিতে পারেননি।

ইমাম বুখারী (রা) তাঁর সহীহ গ্রন্থের আল-জানায়িয’ অধ্যায়ে পৃথক একটি অনুচ্ছেদে হযরত ‘আয়িশার (রা) ও ইবন ‘উমারের (রা) বর্ণনা দুইটির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি বরেন, কান্নাকাটি ও মাতম করা যদি মৃত ব্যক্তির জীবিত অবস্থার অভ্যাস থেকে থাকে, আর সে যদি জীবদ্দশায় আপনজনদেরকেও এমন কাজ থেকে বিরত থাকার কথা না বরে থাকে তাহলে তাদের মাতমের আযাব তার উপর হবে। কারণ, তাদের শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব সে তাঁর জীবদ্দশায় পালন করেনি। আল্লাহ বলেনঃ

আরবী হবে

-হে ঈমানদার ব্যক্তিরা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।

আর জীবদ্দশায় পরিবার-পরিজনকে যথাযথ শিক্ষাদান সত্ত্বে্ও যদি তারা মৃত ব্যক্তির জন্য মাতম করতে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে আয়িশার (রা) মতই সঠিক। কারণ আল্লাহ তো বলেছেন, কেউ অপরের বোঝা বহন করব না।’ তিনি আরো বলেছেনঃ

আরবী হবে।

-কেউ যদি তার গুরুভার বহন করতোন্যকে আহবান করে কেউ তা বহন করবে না- যদি সে নিকটবর্তী আত্মীয়ও হয়।

প্রখ্যাত ইমাম ও মুহাদ্দিস হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন মুবারাকও ইমাম বুখারীর মত বলেছেন। তবে কেউ কেউ ইমাম বুখারীর সামঞ্জস্য চেষ্টার প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন এভাবে-কেউ যদি জীবদ্দশায় পরিবার-পরিজনের সঠিক শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব পালন না করে থাকে, তাহলে মৃত্যুর পর সে দায়িত্ব পালন না করার অপরাধের শাস্তি ভোগ করবে। জীÿÿতদের অপরাধের শাস্তি ভোগ করবে কেন? মুজতাহিদদের মধ্যে ইমাম শাফি’ঈ ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু হানীফা (রা) এই মাসয়ালায় হয়রত ‘আয়িশার (রা) মতের অনুসারী।

হযরত ইবন ‘আববাস (রা) থেকে বর্ণিত হযেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুইবার আল্লাহ রাববুল আলামীনকে দেখেছেন। হযরত মাসরূক (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রশ্ন করলেনঃ আম্মা! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি আল্লাহকে দেখেছেন? ‘আয়িমা (রা) বললেনঃ তুমি এমন একটি কথা বলেছো যা শুনে আমার দেহের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। যে তোমাকে বলে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহকে দেখেছেন সে মিথ্যা বলে। তারপর তিনি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ

আরবী হবে

-দৃস্টিসমূহ তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না, অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে বেষ্টন করতে পারেন। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী, সুবিজ্ঞ।

তারপর তিনি এই আয়তটি পাঠ করেনঃ

আরবী হবে।

-কোন মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেনঃ কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দাার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোন দূরত পাঠাবেন।

আরো কিচু হাদীসে হযরত ‘আয়িশার (রা) বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। সহীহ মুসিলমে সংকলিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তিনি তো নূর বা জ্যোতি। তাঁকে আমি কিভাবে দেখতে পারি।

মুত‘আ বিয়ে যা একটি নির্দিষ্ট সময় সীমা পর্যন্ত জাহিলী যুগ এবং ইসলামের সূচনাকাল থেকে ৭ম হিজরী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। খায়বার বিজয়ের সময় এ জাতীয় বিয়ে হারাম ঘোষিত হয়। এরপর হযরত ইবন ‘আববাস (রা)সহ আরো কিছু লোক এই বিয়ে জায়েয আছে বলে মনে করতেন। কিন্তু সাহাবীদের গরিষ্ঠ অংশ হারাম বলে বিশ্বাস করতেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) এক ছাত্র একদিন এই মুত‘আ বিয়ের বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। হযরত ‘আয়িশার (রা) তার জবাব হাদীস দ্বারা দেননি। তিনি বলেন, আমার ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব আছে। তারপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেনঃ

আরবী হবে

-এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভূক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কাৃত হবেনা।

এ কারণে এই দুই পদ্ধতি ছাড়া আর কোন পদ্ধতি জায়েয নেই। উল্লেখ্য যে, মুত‘আর মাধ্রমে রাভ করা নারী, স্ত্রী বা দাসী কোনটিই নয়।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন, অবৈধ ছেলে তিনজনের মধ্যে (পিতা-মাতা ও সন্তান) নিকৃষ্টতম।

একথা হযরত ‘আয়িশার (রা) কানে গেলে বলেন, এ কথা সঠিক নয়। ঘটনা হলো, একজন মুনাফিক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দামন্দ করতো। রোকেরা একদিন বললোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকটি জারজ সন্তানও। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল-াম) মন্তব্য করেনঃ সে তিনজনের মধ্যে অধিকতর নিকৃষ্ট। অর্থাৎ তার মা-বাবা তো শুধু অপকর্ম করেছেঃ কিন্তু তারা আল্লাহর রাসূলের নিন্দামন্দা করেনি। আর তাদের সেই অপকর্মের ফসল এই সন্তান আল্লাহর রাসূলের নিন্দামন্দা করে। সুতরাং সে তাদের থেকেও খারাপ। ‘আয়িশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই মন্তব্য ছিল এক বিশেষ ঘটনার জন্য, সবার জন্য নয়। কারণ আল্লাহ তো বলেছেনঃ ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।’ অর্থাৎ অপরাধ মা-বাবার। সন্তান তার জন্য দায়ী হবে কেন?

বদর যুদ্ধে যে সকল কাফির নিহত হয়, তাদেরকে বদরেই একত্রে মাটি চাপা দেওয়া হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বরেনঃ

আরবী হবে

-তোমরা কি তোমদের প্রতিপালকের ওয়াদা সত্য পেয়েছো? সাহাবীরা প্রশ্ন করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহর! আপনি মৃতদেরকে সম্বোধন করছেন? ইবন ‘উমার পিতা ‘উমার (রা) থেকে এবং আনাস ইবন মালিক আবু তালহা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

আরবী হবে

তোমরা তাদের চেয়ে বেশি শুনতে পাওনা। তবে তারা জবাব দিতে পারে না।

হযরত ‘আয়িশার (রা) যখন এই বর্ণনার কথা বলা হলো, তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) একথা নয়, বরং এই বলেছেনঃ

আরবী হবে

-এখন তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছে যে, আমি তাদেরকে যা কিছু বলতাম তা সবই সত্য।

তারপর হযরত ‘আয়িশা (রা) কুরআনের এই আয়াত দুইটি পাঠ করেনঃ

আরবী হবে

-‘আপনি আহবান শোনাতে পারবেন না মৃতদেরকে’

‘আপনি কবরে, শায়িতদেকে শুনাতে সক্ষম নন।’

পরবর্তীকালে মুহাদ্দিসগণ হযরত ‘আয়িশার (রা) যুক্তি-প্রমাণ মেনে নিয়ে দুইটি বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত কাতাদা (রা) বলেনঃ বদরে নিহতদের কিছু সময়ের জন্য আল্লাহ জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। রাসূলুর্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) একটি মু‘জিযা হিসেবে তাদেরকে সেই সময়ের জন্য শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কোনvানবিষয়ে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যে বর্ণনা পার্থক্য দেখা যায়, তার ভিত্তিানেকটা তাদের বুঝার পার্থক্য।

আল্লাহ প্রদত্ত এই বুঝ শক্তি ও মেধা আবার হযরত ‘আয়িশা (রা) ানেরেক চেয়ে বেশি; পরিমাণে রাভ করেছিলেন। তাঁর এই অতুলনীয় বোধশক্তি ও অনুধাবন ক্ষমতা তিনি কাজে রাগান হাদীস বর্ণনা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে। এখানে আমরা এমন কেয়কটি ঘটনা উল্লেখ করছি যাতে ত৭ার তীক্ষ্ম বোধ ও বুদ্ধির ছাপ ফুটে উঠেছে।

হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরীর (রা) জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নতুন কাপড় চেয়ে নিয়ে পরেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘একজন মুসলমান যে লিবাসে (পোশাকে) মারা যায় তাকে সেই লিবাসেই উঠানো। হয়।’ একথা হযরত ‘আয়িশা (রা) জানতে পেরে বলেন, আল্লাহ আবু সা‘ঈদের উপর হরমত বর্ষণ করুন। ‘লিবাস’ বলতে রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) বুঝাতে চেয়েছেন মানুষের ‘আমল বা কর্ম’। অন্যথায় রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তো স্পষ্টভাবে বলেছন, কিয়ামতের দিন মানুষ খালি গা, খারি পা ও খালি মাথায় উঠবে।

ইসলামের নির্দেশ হলো, তালাকপ্রাপ্ত নারী স্বামীর ঘরেই ইদ্দত পালন করবে। এই নির্দেশের বিরোধী ফাতিমা নাম্নী একজন মহিলা সাহাবী তাঁর নিজের জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করতেন। তিনি বরতেন, রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) আমাকে ইদ্দত পালনকারীন সময়ে স্বামীর ঘর থেকে অন্যত্র যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বহু সাহাবীর সামনে প্রমাণ হিসেবে নিজের এই ঘটনা উপস্থাপন করেন। অনেকে তাঁর এই বর্ণনা গ্রহণ করেন, তবে বেশির ভাগ সাহাবী তা মানতে অস্বীকার করেন। ঘটনাক্রমে মারওয়ান যখন মদীনার গভর্নর তখন এই ধরনের একটি মোকদ্দমা দায়ের হয়। এক পক্ষ ফাতিমার বর্ণনাকে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করায়। এ কথা হযরত ‘আয়িশার (রা) জনাতে পেরে ফাতিমাকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন। তিনি বরেন, ফাতিমার এই ঘটনা বণৃনাতে কোন কল্যাণ নেই। রাসূলুল্লাহ(সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ইদ্দত পারনকালীর সময়ে তাকেস্বামীর গৃহ থেকে অন্যত্র যাওয়ারানুমতি অবশ্রই দিয়েছিলেন। তিন্তু তা এই কারণে যে, তার স্বামীর বাড়িটি ছির একটি অনিরাপদ ও ভীতিকর স্থানে।

একধিক সহীহ দাসীস থেকে জানা যায় যে, ছাগলের বাহুর গোশত রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) অধিক পছন্দ ছিল। হযরত ইবন মাস‘উদ (রা) বলেন, নবীর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কাছে বাহুর গোশতই বেশি পছন্দনীয় ছিল। বাহুর গোশতেই বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।

আবূ ‘উবায়েদও বলেনঃ নবী (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) বাহুর গোশতই বেশি পছন্দ করতেন। কিন্তু এ ব্যাপারে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

আবরী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) নিকট বাহুর গোশতইাধক প্রিয় ছির তা নয়, বরঙয প্রকৃত ব্যাপার এই যে, অনেক দিন পর পর তিনি গোশত খাওয়ার সুযোগ পেতেন। তাইাঁকে বাহুর গোশত পরিবেশন করা হতো। কেননা বাহুর গোশত দ্রুত সিদ্ধা হয় এবং গলে যায়। কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিনের কোন অতি ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ বন্ধু যত বেশিই জানুক না কেন, একজন স্ত্রী তার চেয়ে অনেক বেশিই চেনে থাকে। রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্তগোটা দেহ ছির প্রতিটি মুহূর্তের জন্য একটি দুষ্টান্ত ও আদর্শ স্বরূপ। এ কারণে তাঁর জীবনের প্রতিটি সময়ের প্রতিটি কর্ম আইন ও বিধানের মর্যাদা রাভ করেছে। সুতরাংয় বলা চলে, তাঁর বেগমগণ তাঁর সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে জানার যে সুযেগ লাভ করেন তান্যদের জন্য ছিল অসম্ভব। কিছু কিছু মাসয়ালা এমন আছে,…দেখা যায় অন্য সাহাবায়ে কিরাম সেকানে নিজ নিজ ইজতিহাদ অথবা কোন বর্ণনার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, কিন্তু হযরত ‘আয়িশার (রা) নিজের একান্ত ব্যক্তিগতাভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজ পর্যন্ত ঐ সব মাসয়ালায় তাঁরই কথা প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়ে আসছে। পাঠকদেরাবগতির জন্য এখানে স রকম কয়েকটি মাসয়ালা উরে্খ করা হলো।

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) ফাতওয়া দিতেন, গোসলের সময় মেয়েদের চুলের খোপা খুলে চুল ভিজানো জরুরী। হযরত ‘আয়িশা (রা) একথা শুনে বললেন, তিনি মহিলাদেরকে একথা কেনবলেন দেন না যে, তারা যেন তাদের খোপা কেটে ফেলে। আমি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সামনে গোসল করতাম এবং চুল খুলতাম না।

হযরত ইবন ‘উমার (রা) বলেতেন, অজু অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু দিলে আজু ভেঙে যায়। একথা ‘আয়িশা (রা) শুনে বললেন, রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) চুমু খাওয়ার পর অজু করতেন না। একথা বলে তিনি মৃতু হেসে দেন।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করতেন, নামায আদায়কারী পুরুষের সামনে দিয়ে যদি নারী, গাধা অথবা কুকুর যায়, তাহলে পুরুষের নামায নষ্ট হয়ে যায়। হযরত ‘আয়িশা (রা) একথা শুনে রেগে যান। তিনি বলেন, আমরা, নারীদেরকে তোমরা গাধা ও কুকুরের সমান করে দিয়েছো। আমি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সামনে পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতাম, আর তিনি নামায়ে দাঁড়ানো থাকতেন। যখণ সিজদায় যেতেন, হাত দিয়ে টোকা দিতেন। আমি পা গুটিয়ে নিতাম। তিনি দাঁড়িয়ে গেলে আবার পা ছড়িয়ে দিতান। আবার কখনো প্রয়োজন হলে নিজেকে গুটিয়ে সামনে দিয়ে চলে যেতাম।

হযরত আবু হুরাইয়া (রা) একদিন ওয়াজ করতে গিয়ে বর্ণনা করেন, রোযার দিনে কারো যদি সকালে গোসল করার প্রয়োজন দেখা দেয় সে যেন সেদিন রোযা না রাখে। লোকেরা হযরত ‘আয়িশা (রা) ও হযরত উম্মু সালামার (রা) নিকট গিয়ে একথার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলো। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কর্ম পদ্ধতি এর বিপরীত ছিল। লোকেরা আবার আবু হুরাইরার (রা) নিকট গিয়ে সতর্ক করলো। অবশেষে তিনি তাঁর পূর্বের ফাতওয়া প্রত্যাহার করেন।

হযরত ‘আবদুল্লাহর ইবন ‘আববাস (রা) ফাতওয়া দিতেন যে, কেউ যদি হজ্জ না করে, শুধু মাত্র কুরবানীর পশু মক্কার হারামে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই পশু সেখানে জবেহ হবে তার উপর সেই সকল শর্ত আপতিত হবে যা একজন হাজীর উপর হয়। একথা শুনেহযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, আমি নিজের হাতে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কুরবানীর পশুর রশি পাকিয়েছি, তিনি নিজ হাতে সেই রশি কুরবানীর পশুর গলায় পরিয়েছেন। তারপর আমার পিতা সেগুলি নিয়ে মক্কায় গেছেন। তা সত্ত্বেও সব কিছু হালাল ছিল। কোন হালাল নিজিসই কুরবানী পর্যন্ত হারাম হয়নি।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, হযরত ‘আয়িশা (রা) অসাদারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারিনী ছিলেন। মূলতঃ স্মৃতিশক্তি আল্লাহ পাকের এক অনুগ্রহ। তিনি পূর্ণমাত্রায় এ অনুগ্রহ লাভ ধন্য হন। ছোট বেলায় খেলতে খেলতে কুরআনের যে সব আয়াত কানে এসেছে, সারা জীবন তা স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। হাদীস শাস্ত্রের নির্ভরতা তো এই স্মৃতি ও মুখস্থ শক্তির উপর। নবুওয়াতী সময়কালের প্রতিদিনের ঘটনা মনে রাখা, প্রতিনয়ত তা হুবহু বর্ণনা করা, রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) মুখ থেকে যে শব্দাবলী যেভাবে শুনেছেন তা সেই ভাবে অন্যের কাছে পৌঁছানো একজন সফল মুহাদ্দিসের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর সমকালীনদের যে ভুলত্রুটি ধরেছেন এবং তাঁদের যে সমালোচনা করেছেন, তাতে তাঁদের মধ্যের মুখস্ত শক্তির পার্থক্য ও ভিন্নতা বিশেষভাবে কাজ করেছে। এখানে এমন কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো যা দ্বারা তাঁর প্রখর স্মৃতি শক্তির প্রমাণ পাওয়া যাবে।

হযরত সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) ইনতিকাল করলেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) চাইলেন, লাশ মসজিদে আনা হোক, তাহলে তিনিও জানাযায় শরীফ হতে পারবেন। লোকেরা প্রতিবাদ করলো। হযরতঃ ‘আয়িশা (রা) বললেন, লোকেরা কত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুহাইল ইবন বায়দার (রা) জানাযার নামায মসজিদেই পড়েছিলেন।

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমারকে (রা) লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কতবার উমরা আদায় করেছেন? জবাব দিলেনঃ চারবার। তার মধ্যে একটি ছিল রজব মাসে। উরওয়া (রা) চেঁচিয়ে বলে উঠলেনঃ খালা আম্মা! এ কি বলছে আপনি কি শুনছেন না? তিনি জানতে চাইলেনঃ সে কি বলে? ‘উরওয়া বললেনঃ তিনি বলেন, রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) চারটি ‘উমরা করেছেন, যার একটি রজব মাসে। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ আবু ‘আবদির রহমানের (ইবন ‘উমারের উপনাম) উপর রহম করুন। রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) এমন কোন ‘উমরা করেননি যাতে আমি শরীক থাকিনি। রজবে তিনি কোন ‘উমরা করেননি।

মুহাদ্দিসীন কিরাম, হাদীস বর্ণনার দিক দিয়ে সাহাবা-ই কিরামকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন এবং প্রায় প্রতিটি স্তরে পুরুষ সাহাবীদের সাথে মহিলা সাহাবীরাও আছেন। ১ম স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এক হাজার অথবা তার উর্ধ্বে। হযরত ‘আয়িশা (রা) এই স্তরের অন্তর্গত। ২য় স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা পাঁচ শো অথবা তার উর্ধ্বে, কিন্তু এক হাজারের কম। এই স্তরে কোনমহিলা সাহাবী নেই। ৩য় স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা এক শো অথবা তার ঊর্ধ্বে; কিন্তু পাঁচ শো’র কম। হযরত উম্মু সালামা (রা) এই স্তরের অন্তর্গত। ৪র্থ স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা সংখ্যা চল্লিশ থেকে একশো পর্যন্ত। এই স্তরে বেশির ভাগ মহিলা সাহাবী। যেমন উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা), উম্মে ‘আতিয়্যা (রা), উম্মুল মু’মিনীন হযরত হাফসা (রা), আসমা বিনত আবী বকর (রা), উম্মু হানী (রা) প্রমুখ। ৫ম স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা সংখ্যা চল্লিশ অথবা তার কম। এই স্তরের সদস্যরা অধিকাংশ মহিলা। যেমনঃ হযরত উম্মু কায়স (রা), হযরত ফতিমা বিনত কায়স (রা), হযরত রাবী‘ বিনত মাসউস (রা), হযরত সুবরা নিবত সাফওয়ান (রা), হযরত কুলসুম বিনত হুসাইন গিফারী (রা), হযরত জা‘দা বিনত ওয়াহাব (রা) প্রমুখ।

উপরে এই স্তরগুলির আলোচনা দ্বারা আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হাদীস শাস্ত্রে হযরত ‘আয়িশার (রা) মর্যাদা বা স্থান কোথায়। আমরা দেখতে পেলাম তাঁর স্থান সর্বোচ্চ স্তরে।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশা (রা) সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া পিতা হযরত আবু বকর (রা), ‘উমার (রা), ফাতিমা (রা), সা‘দ (রা) এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে যাঁরা হাদীস শুনেছেন এবং হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের সংখ্যা অনকে। তাঁদের মধ্যে সাহাবী ও তাবে‘ঈ উবয় শ্রেণীর লোক আছেন। ‘আল্লামা জাহাবী প্রায় দুই শো’ লোকের নাম উল্লেখ করার পর বলেছেন, এছাড়া আরো অনেকে।

সাহাবীদের বর্ণনা ও হাদীসের লেখা-লেখি ও গ্রন্থাবদ্ধের কাজ হিজরী প্রথম শতর্কের মাঝামাঝি শুরু হয়ে যায়। এ শতকের প্রন্তসীমায় উমাইয়্যা খালীফা হযরত ‘উমার ইবন আবদিল আযীয (রহ) খিলাফতের মসনদে আসীন হন। তাঁর সময়ে মদীনার কাজী ছিলেন ইতিহাস-প্রসিদ্ধ ব্যক্তি আবু বকর ইবন ‘আমর ইবন হাযাম আল আনসারী। কুরআন-হাদীসে তিনি এক বিশাল পান্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর এই পান্ডিত্যের পিছনে তাঁর খালা হযরত ‘উমরার অবদান ছির সবচেয়ে বেশি। এই ‘উমরা ছিলেন হযরত ‘আয়িশার (রা) ছাত্রী ও তাঁর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত। খলীফা ‘উমার ইবন আবদিল আযীয, আবু বকর-কে নির্দেশ দেন, তিনি যে ‘উমরার বর্ণনাসমূহ লিখে তাঁর কাছে পাঠান।

‘ইলমে ফিকহ্ ও কিয়াস

আল-কুরআন ও আল-হাদীস বা আস-সুন্নাহ হলো দলিল ও প্রমাণ, আর ফিকহ হলো তার সিদধান্ত ও ফলাফল। কুরআন ও হাদীসের উপর ভিত্তি করে যে সকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তাই হলো ফিকহ ও কিয়াস। এই ইল্মে ফিকহ ও কিয়াসে হযরত ‘আয়িশা (রা) যে কি পরিমাণ পারদর্শী ছিলেন তা পূর্বের আল-কুরআন ও আল-হাদীসে তাঁর পারদর্শিতার আলোচনা থেকে কিছুটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এখানে ফিকহ ও কিয়াসে তাঁর উসূল বা নীতিমালা কি ছিলো সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা হলো।

রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবনকালে তিনি নিজেই ছিলেন যাবতীয় ফাতওয়া ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। কোন সমস্যার উদ্ভব হলে তিনিই তার সামাধান বলে দিতেন। রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ইনতিকালের পর উঁচু স্তরের সাহাবীগণ, যাঁরা শরীয়াত ও আহকামে ইসলামীর গভীর তাৎপর্য বিষয়ে দক্ষ ছিলেন, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ‘উমারের (রা) সামনে যখন কোন নতুন সমস্যার উদ্ভব হতো থখন তিনি ‘আলিম সাহাবীদেরকে এমত্র করে তাঁদের নিকট সিদ্ধান্ত চাইলেন। তাঁদের মধ্যে কারো কাছে যদি বিশেষ কোন হাদীস থাকতো তিনি তা বর্ণনা করতেন। অন্যথায় কুরআন ও হাদীসের অন্য কোন হুকুমের উপর কিয়াস বা অনুমান করে সিদ্ধান্ত দিতেন। খিলাফতে রাশেদার তৃতীয় খলীফা পর্যন্ত এই ফিকহ একাডেমী ছিল মদীনাকেন্দ্রিক। হযরত ‘উসমানের (রা) খিলাফতকালে অরাজকতা ও অশান্তি মাথাচাড়া দেয় এবং বহু মানুষ মদীনা ছেড়ে মক্কা, তায়িফ, দিমাশক, বসরা প্রভৃতি স্থানে আবাসন পড়ে তোলে। অতপর হযরত ‘আলী (রা) খলীফা হলেন। তিনি কুপকে বানালেন ‘দারুল খিলাফা’। এসব কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) দারসগাহের মেধারবী শিক্ষার্থীদের অনেকই মদীনা ছেড়ে অন্য শহরে চলে যান। তবে এর ফলে জ্ঞান চর্চার বেষ্টনী ও পরিধি আরো বিস্তার লাভ করে। কিন্তু তার সম্মিলিত রূপ বা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। যা কিছু বিদ্যামন ছিল তা কেবল মদীনাতেই।

উঁচু স্তরের সাহাবীদের পরে মদীনায় হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার, হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস, হযরত আবু হুরাইরা ও হযরত ‘আয়িশা (রা)-এ চারজন বেশির ভাগ সময় ফিকহ ও ফাতওয়ার কাজ করেন। কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান যেখানে নেই সেখানে এ চারজনের নীতিও ছির ভিন্ন। ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার ও আবু হুরাইরার (রা) রীতি ছির যে, উপস্থিত মাসয়ালা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ কোন হুকম বা পূর্ববর্তী খলীফাদের কোন আমল যদি থাকতো, তারা তা বলে দিতেন। আর যদি তা না থাকতো তাঁরা নীরব থাকতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) এ ক্ষেত্রে কুরআন, সুন্নাহ ও পূর্ববর্তী খলীফাদের সময়ে সমাধানকৃত মাসয়ালার উপর কিয়াস করে নিজের বোধ ও বুদ্ধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিতেন। এক্ষেত্রে হযরত ‘আয়িশা (রা) উসুল ছিল, প্রথমে তিনি কুরআন থেকে সমস্যার সমাধান খুঁজতেন। সেখানে না পেলে সুন্নাহর দিকে দৃষ্টি দিতেন। সেখানে ব্যর্থ হলে নিজের বুদ্ধি অনুযায়ী কিয়াসকরতেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) ইজতিহাদ ও ইসতিমবাতের (গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ) রীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে ইতিপূর্বে কিছু আলাচনা আমরা করেছি। এখানে আরো কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি।

কুরআনে এসেছে;

আরবী হবে

-‘‘তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন ‘কুরূ’ পর্যন্ত।’’ অর্থাৎ তার ইদ্দতের সময়সীমা তিন ‘কুরূ’। এই ‘কুরূ’-এর অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে। হযরত ‘আয়িশার (রা) এক ভাতিজীকে তার স্বামী তালাক দেয়। তিন ‘তুহূর’ অর্থাৎ পবিত্রতার তিনটি মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পর যখন নতুন মাস শুরু হয় তখন তিনি তাকে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে আসতে বলেন। কিছু লোক তাঁর এ কাজের প্রতিবাদ করে বলেন, এটা কুরআনের হুকুমের পরিপন্থী। তাঁরা তাঁদের মতের সপক্ষে কুরআনের উপরে উল্লেখিত আয়াতটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। জবাবে উম্মুল মু’মিনীন বলেন, ‘তিন কুরূ’-তা ঠিক আছে। তবে তোমরা কি জান ‘কুরূ’-এর অর্থ কি? ‘কুরূ’ অর্থ ‘তুহুর’ (পত্রিবতা)। মদীনার সকল ফকীহ এ মাসয়ালায় হযরত ‘আয়িশার (রা) অনুসরণ করেছেন। তবে ইরাকীরা ‘কুরূ’ অর্থ হায়েজ (মাসিকের বিশেষ দিনগুলি) বুঝেছেন।

হযরত যায়িদ ইবন আরকাম (রা) এক মহিলার নিকট থেকে বাকীতে আট শো দিরহামে একটি দাসী খরীদ করলেন। শর্ত করেন যে ভাতা পেলে মূল্য পরিশোধ করবেন। মূল্য পরিশোধের পূর্বেই তিনি উক্ত দাসীটি নগদ ছয়শো দিরহামে আবার সেই মহিলার নিকট বিক্রি করেন। মহিলা ক্রয় বিক্রয়ের এ বিষয়টি হযরত ‘আয়িশার (রা) অবহিত করেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) মিহিলাকে বলেন, তুমিও খারাপ কাজ করেছো এবং যায়িদ ইবন আরকামও। তুমি তাঁকে বলে দিবে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সাথে জিহাদ করে যে সাওয়াব অর্জন করেছিলেন তা বরবাদ হয়ে গেছে। তবে তিনি যদি তাওবা করে নেন।

এই বিশেষ অবস্থায় হযরত ‘আয়িশা (লা) অতিরিক্ত দুই শোধ দিরহামকেসুদ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আয়িশা (রা) সূরা আল-বাকারার ২৭৫তম আয়াতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দানের ক্ষমতা অর্পণ করে এবং স্ত্রী সে ক্ষমতা স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়ে উক্ত স্বামীকে যেমেন নেয় তাহলেও কি সেই স্ত্রীর উপর কোন তালাক পড়বে? এ প্রশ্নে হযরত ‘আলী (রা) ও হযরত যায়িদের (রা) মতে একতালাক হয়ে যাবে। কিন্তু হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, একতালাকও হবে না। তিনি তাঁর মতের সপক্ষে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সেই ‘তাখঈর-এর ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেণ, রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তাঁর স্ত্রীদেরকে এই ইখতিয়ার বা স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁকে ছেড়ে পার্থিব সুখ-ঐশ্বর্য গ্রহণ করতে পারেন অথবা তাঁর সাথে থেকে এই দারিদ্র্য ও অনাহারকে বরণ করতে পারেন। সবাই দ্বিতীয় অবস্থাটি গ্রহণ করেন। এতে কি তাদের উপর এক তালাক পতিত হয়েছে?

কেউ যদি কোন দাস মুক্ত করে তাহলে সেই মনিব ও মুক্তিপ্রাপ্ত দাসের মধ্যে ইসলামী বিধান মতে এক প্রকার সম্পর্ক সৃষ্টি হয় যাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘আল-ওয়ালা’ (অভিভাবকত্ব) বলে। যার ফলে মুক্তিদানকারী মনিব মুক্তিপ্রাপ্ত দাসের সম্পদের উত্তারাধিকারী হতে পারে, এবং আইনগতভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস পূর্বের মনিবের বংশের লোক বলে স্বীকৃতি প্রাপ্ত হয়। এ কারণে এ ‘নাল-ওয়ালা’ সম্পর্কের গুরুত্ব অভ্যাধিক। একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস একবার হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে বললো, আমি ‘উতবা ইবন আবী লাহাবের দাস ছিলাম। তারা স্বামী-স্ত্রী আমাকে এই শর্তে বিক্রী করে দেয় যে, আমি মুক্ত হলে আমার ‘আল-ওয়ালা’-এর অধিকারী হবে সে। এখন আমি মুক্ত। আমার এই ‘আল-ওয়ারা’ এর সম্পর্কে হবে কার সাথে? ‘উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে, না যে মুক্ত করেছে তার সাথে? হযরত আয়িশা (রা) বললেন, ‘বারীরা’ নাম্নী দাসীর অবস্থাও ছিল এমন। রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) আমাকে বলেন যে, বারীরাকে খরীদ করে আযাদ করে দাও। তুমিই তার ‘আল-ওয়ারা’ এর অধিকারিণী হবে-বিক্রয়কারী আল্লাহর হুকুমের পরিপন্থী যত শর্তই আরোপ করুন না কেন।

হযরত বারীরা (রা) ছিলেন একজন দাসী। তাঁর মনিব তাঁকে এ শর্তে বিক্রী করতে চায় যে, তিনি মুক্ত হলে তাঁর আল-ওয়ারা-এর অধিকারী সে হবে। হযরত বারীরা (লা) হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে নিজের অবস্থার কথা তাঁকে বলেন। হযরত আয়িশা (রা) তাঁকে ক্রয় করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন; কিন্ত তাঁর মনিবের আল-ওয়ালার শর্তটি মানতে রাজি হলেন না। রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ঘরে এলে তিনি বিষয়টি অবহিত করেন। রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ‘আয়িশাকে (রা) বলেন-তুমি নির্দ্বিধায় তাঁকে ক্রয় করে মুক্তি দিতে পার। আল্লাহর কিতাবের বিরোধী শর্ত স্বাভাবিকভাবেই রহিত হয়ে যাবে। বারীরা (রা) দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। দাসী অবস্থায় যার সাথে বিয়ে হয়েছিল, মুক্ত হয়ে তাঁকে আর স্বামী হিসেবে গ্রহণকরলেন না। লোকেরা তাঁকে সাদাকা দিত। তিনি সেই সাদাকা থেকে কিছু খাদ্য বস্ত্ত রাসূলকে (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তা গ্রহণ করতেন।

হযরত বারীরার (রা) এ ঘটনা থেকে হযরত ‘আয়িশা (রা) শরীয়াতের একাধিক হুকুম বের করেছেন। তিনি বলতেনঃ বারীরার মাধ্যমে ইসলালেম তিনটি বিধান জানা যায়। যথাঃ

  1. মুক্তিদানকারী ব্যক্তিই হবে আল-ওয়ালার অধিকারী।
  2. দাসত্ব অবস্থায় যদি একটি দাস ও একটি দাসীর বিয়ে হয় এবং পরে স্ত্রী দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়, কিন্তু স্বামী দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, তাহলে দাস স্বামীকে গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার স্ত্রী লাভ করে।
  3. যদি দান-সাদাকা পাওয়ার উপযুক্ত কোন ব্যক্তি কোন কিছু দান-সাদাকা হিসেবে পায় এবং সে তা থেকে কিচু এমন ব্যক্তিকে হাদিয়া হিসেবে দেয় যে সাদাকা পাওয়ার উপযুক্ত নয়, তাহলে সে ব্যক্তির জন্য তা গ্রহণ করা জায়েয হবে।

বিদায় হজ্জ কিছু কম-বেশি প্রায় একলাখ মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। উঁচু স্তরের সকল সাহাবী এ সফরে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সফরসঙ্গী ছিলেন। এ সফরের যাবতীয় ঘটনা সকলের জানা থাকার কথা। হযরত ‘আয়িশাও (রা) নিজের ঘটনাবলী স্মৃতিতে ধরে রাখেন। বিভিন্ন হাদীসেতা হুবহু বর্ণিতও হয়েছে। তবে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনাসমূহ ফকীহ ও মুজতাহিদদের মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে। হযরত ‘আয়িশা (রা) ঠিক হজ্জের অনুষ্ঠানগুলি আদায়কালীন সময়ে মধ্যে নারী প্রকৃতির বিশেষ অবস্থা দেখা দেওয়ায় হজ্জের কিচু অনুষ্ঠান আদায়ে অপারগ হয়ে পড়েন। এতে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তাঁকে সান্ত্বানা দেন এবং তাঁরই নির্দেশে তিনি ‘তানঈম’-এ নতুন করে ‘ইহরাম’ বেঁধে কা‘বার তাওয়াফ করেন। হাফেজ ইবন কায়্যিম (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) এ বর্ণনাটি নকল করার পর বলেছেনঃ

আরবী হবে

-হযরত ‘আয়িশার (রা) এ হাদীস থেকে হজ্জের অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মূলনীতি গৃহীত হয়েছে। যেমনঃ

  1. যে ব্যক্তি হজ্জের সাথে ‘উমরার নিয়্যেত অর্থাৎ ‘কিরান’ হজ্জের নিয়্যেত করবে তার জন্য একটি তাওয়াফ ও সা‘ঈ করলে হয়ে যাবে।
  2. নারীদের ক্ষেত্রে শারীরিক বিশেষ অবস্থান প্রেক্ষিতে ‘তাওয়াফুল কুদুম’ রহিত হয়ে যাবে।
  3. নারীদের বিশেষ অবস্থা দেখা দিলে হজ্জের পরে ‘উমরার নিয়্যেত করা জায়িয।
  4. নারীরা বিশেষ অবস্থঅয় শুধু কা‘বার তাওয়াফ ছাড়া হজ্জের অন্য সব কাজ আদায় করতে পারবে।

5.‘তান‘ঈম’ ‘হারাম’-এর অন্তর্ভূক্ত নয়। হারাম-এর বাইরে।

6.‘উমরা এক বছরে, রবং এক মাসেও দুইবার আদায় করা যায়।

  1. কেবলমাত্র হযরত ‘আয়িশার (রা) এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, মক্কার বাইরের লোকেরা মক্কা থেকেই (তান‘ঈম) ইহরাম বেঁধে উমরা আদায় করতে পারে।

এখানে কিয়াসে ‘আকলী বা প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিনির্ভর অনুমান সম্পর্কে একটু আলোচনা করা দরকার। কিয়াসে ‘আকলী অর্থ এই নয় যে, যে কেউ নিজের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে শরীয়াতের কোন হুকুম স্মপর্কে সিদ্ধান্ত দান করবে। বরং তার অর্থ হলো, আলিমগণ, যাঁরা শরীয়াতেরও গূঢ় রহস্য এবং দীনী ইলমসমূহে অভিজ্ঞ, কিাত ও সুন্নাহর অধ্যয়ন; গবেষণা এবং নিজেদের জীভনে তা বাস্তবায়নের কারণে তাঁদের মধ্যে এমন এক যোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে যায় যে, যখন তাঁদের সামনে কোন নতুন মাসয়ালা আসে তখন তাঁরা তাঁদের সেই যোগ্যতা বলে বুঝতে সক্ষম হন যে, যদি শারে’ (আ) (বিধানদাতা) অর্থাৎ রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবিত থাকতেন, তাহলে তিনি এই জবাব দিতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কোন অভিজ্ঞ আইনজীবি কোন বিশেষ আদালতের বহু মামলার রায় যিনি দেখেছেন। তারপর তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঐ জাতীয় কোন মোকদ্দমা স্মপর্কে সেই সকল রায়ের উপর অনুমান করে যদি একথা বলে দেন যে, মোকদ্দামাটি এই আদালতে উঠলে তার রায় এমন হবে। তখন তাকে কিয়াসে ‘আকলী বলা হবে। ইসলামী শরীয়াতে নজীর ও ফায়সালা (দৃষ্টান্ত ও সিদ্ধান্ত) সমূহ সম্পর্কে হযরত আয়িশা (রা) যে কতখানি অবহিত ছিলেন তা আমাদের পূর্বের আলোচনায় মোটামুক্তি স্পষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে তাঁর কিয়াসে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা খুব কম থাকাই স্বাভাবিক। এখানে আমরা হযরত ‘আয়িশার (রা) কিয়াসে ‘আকলীর একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি।

রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবদ্দশায় সাধারণভাবে মহিলারা মসজিদে আসতো এবং নামাযের জামায়াতে শরীক হতো। পুরুষদের পিছনে শিশু-কিশোররা এবং তাদের পিছনে মহিলারা সারিবদ্ধ হতো, রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) মহিলাদের মসজিদে আসতে বারণ করতে নিষেধ করেন।

তিনি বলেনঃ

আরবী হবে

রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ওফাতের পর বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের সাথে আরবদের উঠা-বসা, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও আর্থিক প্রাচুর্যের কারণে মহিলাদের চাল-চলন, সাজ্জা ও বেশ-ভুষায় পরিবর্তন আসে। এ অবস্থা দেখে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ ‘আজ যদি রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবিত থাকতেন তাহলে মহিলাদের মসজিদে আসতে বারণ করতেন।’ তাঁর বক্তব্য নিম্নরূপঃ

আরবী হবে

‘‘আমারাহ থেকে বর্ণিত। হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, ‘‘আজকাল মহিলারা যে সব নতুন কথা ও কাজের জন্ম দিচ্ছে, যদি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ সময় জীবিত থাকতেন তাহলে তাদের মসজিদে আসা বন্ধ করে দিতেন, যেমন ইহুদী মহিলাদের বন্ধ করা হয়েছিল।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) এ সিদ্ধান্ত যদিও সে সময় বাস্তবায়িত হয়নি, তবে তার ভিত্তি ছিল ঐ কিয়াসে আকলী। তিনি তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝেছিলেন, এক্ষেত্রে শরীয়াতের হুকুম কেমন হতে পারতো।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) ফাতওয়া দিতেন, কোন ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলে তাকেও গোসল করতে হবে। আর যদি কেউ মৃতের খাটিয়া বহন করে তাকে দ্বিতীয়বার ওজু করতে হবে। একথা হযরত ‘আয়িশার (রা) কানে গেলে বলেনঃ

আরবী হবে

‘‘মুসলমান মোর্দাও কি নাপাক হয়ে যায়? আর কেউ যদি কাঠ বহন করে তাতে তার কি হয়?’’

গোসল ওয়াজিব হওয়ার জন্য ধাতু নির্গত হওয়া প্রয়োজন কিনা, সে সম্পর্কে সাহাবীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। হযরত জাবির (রা) বলতেনঃ আরবী হবে ‘পানির জন্য পানি।’ -অর্থাৎ ধাতু নির্গত হলেই কেবল পানি ব্যবহার প্রয়োজন, অন্যথায় নয়। হযরত ‘আয়িশা (রা) এ মতের বিপরীত একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, ‘‘কেউ যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং পানি বের না হলেও তো তোমরা তাকে রজম করে থাক, তাহলে গোসল ওয়াজিব হবে না কেন?’’

সাহবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত ইবন ‘উমার (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাবতীয় কর্মকে সুন্নাত বলে মনে করতেন এবং সে অনুযায়ী আমল করতেন। ফকীহগণ সুন্নাতকে যে ইবাদী ও ‘আদী দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন, তিনি তা করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাসূরুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কাজ যে কারণেই করুন না কেন, তা সুন্নাত। তা অনুসরণ করা জরুরী।এ কারণে তিনি সফরের মানযিল-এর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুসরণ করতেন। অর্থাৎ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন সফরে যেখানে যেখানে অবস্থান করেছেন, ইবন ‘উমার (রা) পরবর্তীকালে ঠিক সেখানেই অবস্থান করতেন। যদি কোন মানযিলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘটনাক্রমে পাক-পবিত্র হয়ে থাকেন, তিনিও সেখানে বিনা প্রয়োজনে পাক-পবিত্র হতেন। কিন্তু হযরত ‘আয়িশা (রা) ও হযরত ইবন আববাস (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের উপরোক্ত পার্থক্যের প্রবক্তা ছিলেন। তাঁরা ইবন ‘উমারের (রা) মতকে সমর্থন করেননি। হজ্জের সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবতাহ’ উপত্যকায় তাবু গেড়ে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু ‘আয়িশা (রা) এটাকে সুন্নাত মনে করেননি। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছেঃ

আরবী হবে

‘‘আল-আবতাহ উপত্যকায় অবস্থানকরা সুন্নাত নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে এ জন্য অবস্থান করেছিলেন যে, সেখান থেকে বের হওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল।’’

হযরত ‘আয়িশা (রা) বহু ফিকহী মাসয়ালায় তাঁর সমকালীনদের থেকে দ্বিমত পোষণ করেছেন। পরবর্তী কালে হিজাযের পকীহরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরই মতের উপর আমল করেছেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) এসব মতামত ও আমলের বিরাট একটি অংশ ইমাম মালিক (রা) তাঁর আল-মুওয়াত্তা’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন।

তা‘লীম ও ইফতা (শিক্ষাদান ও ফাতওয়ার দায়িত্ব পালন)

ইলম বা জ্ঞান অন্যের নিকট পৌঁছানো ইলমের অন্যতম খিদমাত বলে ইসলাম বিশ্বাস করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন-

আরবী হবে

‘‘উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থির ব্যক্তির নিকট অবশ্যই পৌঁছাবে।’’ হযরত ‘আয়িশা (রা) এ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছিলেন তা আমাদের পূর্বের আলোচনাসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এখানে আমরা আরো একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর সাহাবায়ে কিরাম (রা) ইসলামী দা‘ওয়াত ও ইলমের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। মক্কা মু‘য়াজ্জামা, তায়িফ, রাহরাইন, ইয়ামান, দিমাশক, মিসর, কুফা, বসরা প্রভৃতি বড় বড় শহর ও নগরে এই মহান শিক্ষকবৃন্দের এক একটি ছোট দল অবস্থান করতেন। খিলাফাত ও সরকারের কেন্দ্র ২৭ বছর পর মদীনা থেকে প্রথমে কুফায় অবস্থান করতেন। খিলাফাত ও সরকারের কেন্দ্র ২৭ বছর পর মদীনা থেকে প্রথমে কুফায় এবং পরবর্তীকালে দিমাশকে স্থানান্তরিত হয়। তা সত্ত্বেও মদীনার রূহানী ও ইল্মী (আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগত) শ্রেষ্ঠত্বের কোন অংশে ভাটা পড়েনি। তখনও মদীনায় হযরত ইবন ‘উমার (রা), হযরত আবু হুরাইয়া (রা), হযরত ইবন ‘আববাস (রা) ও হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা) প্রমুখের পৃথক পৃথক দারসগাহ্ চালু ছিল। তবে সবচেয়ে বড় দারসগাহ্টি ছির হযরত ‘আয়িশার (রা) হুজরাকেন্দ্রিক মসজিদে নববীর সেই বিশেষ স্থান।

মদীনা ছির ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। যিযারত ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে চতুর্দিক থেকে মানুষ সেখানে ছুটে আসতো। যারা আসতো তারা অবশ্যই একবার না একবার উম্মুল মু‘মিনীনের হুজরার দরজায় হাজিরা দিত। তারা সালাম পেশ করতো। তিনি আগন্তুকদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করতেন। কথাবার্তা, সালাম-কালাম, মাসয়ালা জিজ্ঞাসা ও জবাব দান সবই হতো পর্দাার অন্তরাল থেকে। ইরাক, মিসর, শাম প্রভৃতি অঞ্চল থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে তাঁর খিদমতে হাজির হতো এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও ফাতওয়া চাইতো। যে সব শিক্ষার্থী সর্বক্ষণ উম্মুল মু’মিনীনের খিদমতে থাকতো, এসকল আগন্তুক তাদেরকেও সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতো। এ ধররেন একজন শিক্ষার্থী আয়িশা বিনত তালহা বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

‘‘প্রতিটি শহর থেকে মানুষ হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট আসতো। তাঁর সাথে আমার সম্পর্কের কারণে বৃদ্ধরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতো। যুবকরা আমার সাথে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক পড়ে তুলতো। লোকেরা আমার কাছে হাদিয়া-তোহফা পাঠাতো এবং বিভিন্ন শহর থেকে চিঠি-পত্র লিখতো। আমি তা হযরত ‘আয়িশার (রা) সামনে উপস্থাপন করে বলতাম, খালা আম্মা! এ অমুকের চিঠি ও হাদিয়া। তিনি বলতেন, বেটি! তুমি এর জবাব দাও এবং বিনিময়ে তুমিও কিছু পাঠিয়ে দাও।’

স্বাভাবিক ভাবেই পুরুষের চেয়ে মহিলাদেরই ভীড় হতো বেশি। মহিলা বিষয়ক মাসয়ালার সমাধান দানের সাথে সাথে বলে দিতেন, তোমরা পুরুষদেরকেও অবহিত করবে। একবার বসরা থেকে কিছু মহিলা আসে। তিনি তাদের কিছু নসীহত করে বলেন, তোমরা পুরুষদেরকে অবহিত করবে। তাদেরকে অনেক কথা বলতে আমার শরম হয়্ তাদের বলবে তারা যেন পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করে।

নারী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে এবং যে পুরুষদের থেকে হযরত ‘আয়িশার (রা) পর্দা করার প্রয়োজন ছিল না, তাঁরা সকলে হুজরার ভিতরের মসজিদে বসতেন, আর অন্যরা বসতেন হুজরার বাইরে মসিজদে নববীর মধ্যে। দারজায় পর্দা টানানো থাকতো। পর্দার আড়ালে তিনিনিজে বসে যেতেন। লোকেরা প্রশ্ন করতো, তিনি জবাব দিতেন। কোন কোন মাসয়ালায় শিক্ষয়িত্রী ও শিক্ষার্থীর মধ্যে তর্ক-বাহাছ হতো। কখনও কোন মাসয়ালা নিজেই বিস্তারিত বর্ণনা করতেন, লোকেরা নীরবে কান লাগিয়ে শুনতো। তিনি শিক্ষার্থীদের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এবং সঠিক উচ্চারণের দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। একবার তাঁর দুই ভাতিজা আসেন। তাঁরা দুইজন ছিলেন দুই মায়ের সন্তান। একজনের ভাষা তেনম শুদ্ধ ছিল না। তার ভাষায় যথেষ্ট ভুল-ভ্রুটি ছিল। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর ভুল ধরে দিয়ে বলেন, তুমি তেমন ভাষায় কথা বল না কেন যেমন আমরা এই ভাতিজা কথা বলে? হাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি, তাকে তার মা এবং তোমাকে তোমার মা শিক্ষা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, যাঁর ভাষা শুদ্ধ ছিল না, তার মা ছিলেন দাসী।

উপরে উল্লেখিত এ ধরনের অস্থায়ী শিক্ষার্থীরা ছাড়া তিনি বিভিন্ন খান্দানের ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে এবং ইয়াতীম শিশুদেরকে নিজের তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করতেন এবং শিক্ষা দিতেন। কখনও এমন হয়েছে যে, শিশু নয়, রবং যারা বড় হয়ে গেছে এমন ছেলেদেরকে তাঁদের দুধ-থালা বা দুধ-নানী হওয়ার কারণে নিজের ঘরের মধ্যে ঢোকার অনুমতি দিতেন। আর যাদের ঘরের ঢোকার অনুমতি ছিল না, এমন গায়ের মুহাররম ব্যক্তিরা আফসোস করে বলতো, ইলম হাসিলের ভালো সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত। কুবায়সা বলতেন, ‘উরওয়া আমার চেয়ে জ্ঞানে এগিয়ে যাওয়ার কারণ হলো, সে ‘আয়িশার (রা) গৃহাভ্যন্তরে যেতে পারতো। ইরাকের সর্বজন মান্য ইমাম নাখ‘ঈ ছোটবেলায় হযরত ‘আয়িশার (রা) সান্নিধ্রে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেছিলেন। এজন্য তার সমকালীনরা তাঁকে ঈর্ষা করতেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) প্রতিবছর হজ্জে যেতেন। হিরা ও সাবীর পর্বতদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর তাবু স্থাপন করা হতো। দূর-দূরান্তের জ্ঞান পিপাসুরা সেই তাঁবুর পাশে ভীড় জমাতো। কখনো কখনো কা‘বার চত্বরে যমযমের ছাদের নিচে বসে যেতেন, জ্ঞান পিপপাসুরা সমনে জমায়েত হতো। তিনি যখন চলতেন মহিলারা চারিদিক থেকে ঘিরে রাখতো। ইমামের মত তিনি চলতেন আগে আগে, আর অন্যরা পিছনে। লোকেরা বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান চাইতো এবং সন্দেহ-সংশয় দূর করতে চাইতো, তিনি তাদের সমাধান বলে দিতে সন্দেহ দূর করে দিতেন। তিনি লোকদের যে কোন ধরনের প্রশ্ন করার জন্য উৎসাহ দিতেন। বলতেন, তেমরা তোমাদের মা‘র কাছে যে প্রশ্ন করতে পার, তা আমার কাছেও করতে পার। একবার তিনি হযরত আবু মূসা আল-আশয়ারীকেও (রা) রকম কথা বলেছিরেন। তিনি বলতেন, আমি তোমাদের মা। আসলেই তিনি শিক্ষার্থীদের মায়ের মতই শিক্ষা দিতেন। ‘উরওয়া, কাসেম, আবু সালামা, মাসরূক ও সাফিয়্যাকে মাতৃস্নেহে শিক্ষাদীক্ষা দেন। ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং তাদের যাবতীয় খরচও নিজে বহন করতেন। কোন কোন শিক্ষার্থীর সাথে তিনি এমন মাতৃসুলভ আচরণ করতেন যে, তা দেখে তাঁর আপন জনেরাও ঈর্ষা করতেন। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ছিলেন হযরত আয়িশার (রা) অতি স্নেহের ভাগ্নে। তিনি একবার খালার এক শাগরিদ আসওয়াদকে বলেন, ‘উম্মুল মুমিনীন তোমার কাছে যে সব গোপন কথা বলতেন, তা কিছু আমাকেও বলো।

হযরত ‘আয়িশার (রা) শাগরিদরা তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। হযরত ‘আমারাহ্ ছিলেন আনসার-কন্যা। তিনি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) খালা বলেন ডাকতেন। ইমাম আশ-খা‘বী বলেনঃ আয়িশা (রা) মাসরূক ইবন আজদা‘কে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) জ্ঞান ভান্ডার থেকে অসংখ্য মানুষ গ্রহণ করেছেন। তবে যাঁরা শৈশব থেকে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন এবং পরবর্তীকালে ‘আয়িশার (রা) জ্ঞানের সত্যিকার বাহকরূপে মুহাদ্দিসদের নিকট সমাদৃত হন নিম্নে তাঁদের কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলোঃ

1.‘উরওয়াঃ তাঁর পিতা যুবাইর (রা০, মাতা আসমা বিনত আবী বকর (রা)। নানা হযরত আবু বকর (রা) এবং খালা হযরত ‘আয়িশা (রা)। খালা অতি আদরে তাঁকে লালন-পালন করেন। মদীনার জ্ঞান ও মহত্বের শিরোমণিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ইমাম যুহরী ও আরো অনেকে তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁকে সীরাত ও মাগযীশাস্ত্রের ইমাম গণ্য করা হয়। ইমাম যুহরী বলেন, আমি তাঁকে অফুরন্ত সাগররূপে দেখেছি। হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা, ফিকাহ ও ফাতওয়ার জ্ঞানে তাঁর চেয়ে বড় কোন আরিম সে যুগে আর কেউ ছিলেন না। হিজরী ৯৪ সনে ইনতিকাল করেন।

  1. কাসিম ইবন মুহাম্মদঃ তাঁর দাদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং ফুফু হযরত ‘আয়িশা (রা)। ছোটবেলা থেকেই ফুফুর স্নেহে বেড়ে ওঠেন এবং তাঁর কাছেই শিক্ষা লাভ করেন। বড় হয়ে মদীনার ফিকহর একজন ইমাম হন। মদীনায় সাত সদস্যবিশিষ্ট ফকীহদের যে মজলিস ছিল, তিনি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। আবুয যিয়াদ বলেনঃ ‘আমি কাসিমের চেয়ে বড় ফকীহ যেমন দেখিন, তেমনি সুন্নাতের জ্ঞানে তাঁর চেয়ে বড় জ্ঞানী আর কাউকে দেখেনি।’ ইবন ‘উয়ায়না বলেনঃ ‘কাসিম ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় আলিম।’ হিজরী ১০৬, মতান্তরে ১০৭ সনে ইনতিকাল করেন।
  2. আবু সালামাঃ প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ‘আবদুর রহমান ইবন আউফের (রা) ছেলে। অল্প বয়সে পিতার মৃত্যুর পর তিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) স্নেহে বড় হন। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের মদীনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘আলিম। ইমাম মুহরী বলেনঃ ‘আমি চারজনকে সাগরে মত পেয়েছি। তাঁরা হলেন ‘উরওয়া ইবন যুবাইর, ইবনুল মুসায়্যাব, আবু সালামা ও উবাইদুল্লাহ ইবন ‘আবদিল্লাহ।’ জিহরী ৯৪, মতান্তরে ১০৪ সনে ইনতিকাল করেন।
  3. মাসরূক ইবনুল আজদা’: তাঁর পিতা ছিলেন ইয়ামনের একজন বিখ্যাত অশ্বারোহী। আরবের বিখ্যাত বীর আমর ইবন মা‘দিকারিব ছিলেন তাঁর মামা। ইমাম জাহাবী শা‘বীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়িশা (রা) মাসরূককে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। ইবন সা‘দ বণৃনা করেছেন যে, একবার তিনি উম্মুল মু’মিনীন আয়িশার (রা) সাথে দেখা করতে এলে তিনি মাসরূকের জন্য শরবত তেরি করতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আমার ছেলের জন্য শরবত বানাও। তিনি ‘আয়িশা (রা) থেকে যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন তা অধিকাংশ ইমাম আহমাদ মুসনাদে এবং ইমাম বুখারী তাঁর আল-জামে গ্রন্থ বর্ণনা করেছেন। তাঁকে চেয়ে বড় জঞানপিপাসু আর কাকেও জানিনে। তিনি কাজী শুরাইহ থেকেও বড় মুফতী ছিলেন। কাজী শুরাইহ তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কিন্তু মাশরূপকের কাজী শুরাইহ এর কোন প্রয়োজন হতো না। তিনি কুফার বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন। তবে কোন পারিম্রমিক নিতে না। উঁচুস্তরের আবেদ ব্যক্তি ছিরেন। আবু ইসহাক বলেনঃ একবার তিনি হজ্জে যান। বাড়ি থেকে বের হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত সিজদারত অবস্থায় ছাড়া ঘুমাননি।’ তাঁর স্ত্রী বলেছেনঃ ‘নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা ফুলে যেত।’ হিজরী ৬৩ সনে ইনতিকাল করেন।

5.‘আমারাহ বিনত আবদির রহমানঃ তিনি ছিলেন প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী আস‘য়াদ ইবন যুরারার (রা) পৌত্রী। মহিলাদের মধ্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) তা‘লীম-তারবিয়্যাত বা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সর্বোত্তম নমুনা হলেন তিনি। মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর নামটি উচ্চারণ করে থাকেন। ‘আয়িশার (রা) হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারিনী ছিলেন তিনি’-একথা বরেছেন ইবন হিববান। সুফইয়ান সাওরী বলেনঃ আমারাহ, কাসিম ও উরওয়াব হাদীসই হচ্ছে আয়িশার (রা) সর্বাধিক শক্তিশালী ও প্রমাণিত হাদীস। উম্মুল সম্না ও শ্রদ্ধা করতো। ইমাম বুখারীর র্বণনামতে তিনি ছিলেন উম্মুল মু’মিনীনের সেক্রেটারী। লোকেরা তাঁরই মাধ্যমে হাদিয়া-তোহফা ও চিঠি-পত্র হযরত আয়িশার (রা) নিকট পাঠাতো।

  1. সাফিয়্যা বিনত শায়বাঃ কা‘বার চারি রক্ষক শায়বার কন্যা, সাফিয়্যা। হাদীসের প্রায় সকল গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদীস সংকলিত হয়েছে। হাদীসের সনদে তাঁকে ‘শায়বার কন্যা সাফিয়্যা, ‘আয়িশার (রা) বিশেষ শাগরিদ’ অথবা আয়িশার (রা) সাহচর্যপ্রাপ্ত’-এভাবে পচিয় দেওয়া হয়েছে। মানুষ তাঁর কাছে বিভিন্ন মাসয়ালা এবং হযরত ‘আয়িশার (রা) হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে আসতো। আবু দাউদ বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি ‘আদী ইবন ‘আদী আল-কিন্দীর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলাম। মক্কায় পৌঁছোর পর তিনি আমাকে সাফিয়্যা বিনত শায়বার নিকট পাঠালেন। তিনি হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে হাদীস শুনে মুখস্ত করেছিলেন।

7.‘আয়িশা বিনত তালহা (রা): প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহার কন্যা। হরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) তাঁর নানা এবং হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর খালা। খালার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। আবু যার‘আ দিমাশকী বলেন, লোকেরা তাঁর সম্মান, মর্যাদা ও শিষ্টাচারিতা দেখে তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

  1. মু‘য়াজা বিনত ‘আবদিল্লাহ আল-‘আদাবিয়্যাঃ একজন বসরী মেয়ে। হযরত ‘আয়িশার (রা) শাগরিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি বহু হাদীস হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাষায়ই বর্ণনা করেছেন। একজন উঁচু স্তরের আবেদা ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর কোন দিন বিছানায় ঘুমাননি। এখানে মাত্র কয়েকজনের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা হলো। এছাড়া আরো অনেকে আছেন।

চিকিৎসা বিদ্যা, ইতিহাস, সাহিত্য, কবিতা ও বক্ততা-ভাষণে হযরত ‘আয়িশার (রা) আগ্রহ ও পারদর্শিতা সম্পর্কে যদিও আগে কিছু কিছু আলোচনা এসে গেছে, তা সত্ত্বেও স্বতন্ত্রভাবে আরো কিছু আলোচনা প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। হযরত ‘আয়িশার (রা) ছাত্র-শিষ্যরা বর্ণনা করেছেন যে, ইতিহাস, বক্ততা-ভাষণ, সাহিত্য ও কবিতায় তার বেশ ভালোই দখল ছিল। আর চিকিৎসা বিদ্যায় ছিল মোটামুটি জ্ঞান। হিশাম ইবন উরওয়ার বর্ণনাঃ

আরবী হবে

‘আমি (উরওয়া) কুরআন, ফারায়েজ, হালাল-হারাম (ফিকহ) কবিতা, আরবের ইতিহাস ও নসব (বংশ) বিদ্যায় আয়িশা (রা) অপেক্ষা অধিকতর পারদর্শী আর কাউকে দেখিনি।’

‘উরওয়া আরো বলেনঃ আমি চিকিৎসা বিদ্যায় আয়িশা (রা) অপক্ষো অধিকতর অভিজ্ঞ আর কাউকে পাইনি। তৎকালীন আরবে চিকিৎসার বিদ্যার যথাযথ চর্চা ও প্রচলন ছিল না। সেকালের আরবের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাবিদ ছিলেন হারিস ইবন কালদা। তাছাড়া সারা আরবে ছোট ছোট আরো অনেক চিকিৎসক ছিলেন। এটা নিরক্ষরন সমাজে চিকিৎসার যতটুকু প্রচল হয়ে থাকে, সেকালের আরব সমাজে চিকিৎসাবিদ্যা বলতে তাই বুঝায়। গাছ-গাছড়ার কিচু গুণাগুণ জানা,াসুস্থ ব্যক্তিদের পরীক্ষিত কিছু ওষুধ সম্পর্কে জানা ইত্যাদি। এক ব্যক্তি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করে, আপনি কবিতা বলেন, তা মানলাম যে, আপনি আবু বকরের (রা) মেয়ে, বরতে পারেন; কিন্তু আপনি এ চিকিৎসাবিদ্যা কিভাবে আয়ত্ব করেনৎ তিনি জবাব দেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ জীবনে অসুস্থ থাকতেন। আরবের চিকিৎসকরা আসতো। তারা যে ওষুধের কথা বরতো, আমি মনে রাখতাম। আমরা বুঝতে পারি যে, তাঁরা চিকিৎসাবিদ্যা ছির সেই পর্যায়ের। তাছাড়া আরো কিছু রোগীর ব্যবস্থাপত্র তিনি মনে রেখেছিরেন। সেই সময় মুসলিম মহিলারা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে যুদ্ধে যেতেন, তাঁরা আহত সৈনিকদের ব্যান্ডেজ লাগাতেন ও সেবা করতেন। ‘আয়িশা (রা) নিজেও উহুদ যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবা করেছিলেন। এতে ধারণা হয় যে সে যুগের মুসলিম মহিলাদের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর মত এই শাস্ত্রের জ্ঞান থাকতো।

প্রাচীন আরবের ইতিহাস, জাহিলিয়াতের রীতি-প্রথা এবং আরবের বিভিন্ন গোত্র-গোষ্ঠীর বংশ সম্পর্কে হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন একজন সুবিজ্ঞ ব্যাক্তি। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁরই মেয়ে। বলা চলে পিতার জ্ঞান তিনি উত্তারাধিকার সূত্রে লাভ করেন। এ কারণে আমরা হযরত ‘উরওয়াকে বলতে শুনি-‘আমি আরবের ইতিহাস ও কুষ্ঠিবিদ্যায় ‘আয়িমার (রা) চেয়ে বেশি জানা কাউকে দেখিনি।’ জাহিলী আরবের রীতি-প্রথা ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ তিনি দিয়েছেন, যা হাদীসের গ্রন্থসমূহ সংকলিত হয়েছে। যেমন, আরবে কত রকমের বিয়ে চালু ছিল, তালাকের পদ্ধতি কেমন ছিল, বিয়ের সময় কি গাওয়া হতো, তারা কোন কোন দিন রোযা রাখতো, হজ্জের সময় কুরাইশরা কোথায় অবসথান করতো, মৃত ব্যক্তির রাশ দেখে তারা কি কথা উচ্চারণ করতো ইত্যাদি। সহীহ আল বুখারী, তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতি গ্রন্থে তার এসব বর্ণনা পাওয়া যায়।

ইসলাম পূর্ব আমলে মদীনার আনসারদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ‘বু-য়াস’-এর বর্ণনা৪০১ যেমন ‘আয়িশা (রা) দিয়েছেন, মেতনিতাদের ধর্ম বিশ্বাসের কথা, দেব-দেবীর কথাও বলেছেন। যেমন তারা ‘মুশাল্লাল’ তেমনি তাদের ধর্ম বিশ্বাসের কথা, দেব-দেবীর কথাও বলেছেন। যেমন তারা ‘মুশাল্লাল’ পর্বতের মূর্তির পূজা করতো।৪০২ ইসলামের কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেমন ওহীর সূচনা পর্ব, ওহী কেমন করে হতো, ওহীর সময় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবস্থা কিরূপ দাঁড়াতো, নবুওয়াতের সূচান পর্বের নানা ঘটনা, হিজরাতের ঘটনা, নিজের জীবনের ইফকের ঘটনা ইত্যাদির তিনি আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়েছেন।৪০৩ মজার ব্যাপার হলো, এসব ঘটনার সাথে যারা জড়িত ছিরেন অথবা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেই সব পরিণত বয়সের লোকেরা যেখানে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে তার বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা হাদীসের গ্রন্থসমূহে কয়েকপৃষ্ঠ ছাড়িয়ে গেছে। অথচ অনেক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন একটি শিশু অথবা বড়জোর একজন কিশোরীমাত্র। কুরআন কিভাবে, কি তারতীবে নাযিল হয়েছে এবং নামাযের পদ্ধতির বর্ণনা তিনি দিয়েছেন।৪০৪ তাছাড়া রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতকালীন অবস্থা, কাফন-দাফনের ব্যবস্থা, কাফনের কাপড়ের সংখ্যা, মাপ ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা তো বিশ্বাবাসী তাঁর মাধ্যমে জেনেছে।৪০৫ শুধু কি তাই, তিনি যুদ্ধের ময়দানের অবস্থাও আমাদের শুনিয়েছেন। বদরের ঘটনা,৪০৬ উহুদের অবস্থা, খন্দক ও বনী কুরায়জার কিচু কথা৪০৭, জাতুর রুকা’ যুদ্ধে সারাতুল খাওফ’ (ভীতিকালীন নামায) এর অবস্থা, মক্কা বিজয়কালীণ মহিলাদের বাই‘য়াত, বিদায় হজ্জের ঘটনাবলীর একাংশ ইত্যাদির কথা আমরা তাঁর মুখে শুনতে পাই। রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) নৈশকালীন ইবাদতের কথা, ঘর-গৃহস্থালীর কথা, তাঁর আদব-আখলাক, স্বাভাব-আচরণের কথা তিনি আমাদের শুনিয়েছেন। এমন কি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে সবচেয়ে কঠিন দিন কোনটি গেছে সে কতাও তিনি বলেছেন।৪০৮ মোটকথা, নবীজীবনের একটি স্বচ্ছ ও সঠিক চিত্র তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফত, হযরত ফাতিমা (রা০) ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বিবিগণের দাবী-দাওয়া, বাই‘য়াত ইত্যারিদ কথাও তিনি বর্ণনা করেছেন।৪০৯

একথা ঠিক যে, ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর যে জ্ঞান, তা ছিল তাঁর বাস্তবাভিজ্ঞতালব্ধ। অনেক কিছুই তাঁর সামনে ঘটেছিল। কিন্তু জাহেলী আরবের অবস্থার কথা তিনি কার কাছে জেনেছিলেন? নিশ্চয়ই তা পিতা আবু বকরের (রা) মুখে শুনেছেন।

সাহিত্য

অসংখ্য বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন একজন সুভাষিণী। তাঁর কথা ছিলাতি স্পষ্ট, বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল। মূসা ইবন তালহা তাঁর একজন ছাত্র। ইমাম তিরমিযী ‘মানবিক’ পরিচ্ছেদে তার এ মন্তব্য-

আরবী হবে

বর্ণনা করেছেন। যার অর্থ-আমি ‘আয়িশার (রা) অপেক্ষা অধিকতর প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধভাষী কাউকে দেখিনি।’ মুসতাদিরিকে হাকেমে আহনাফ ইবন কায়সের একটি মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ‘আয়িশার (রা) মুখের চমৎকার বর্ণনা ও শক্তিশালী কথার চেয়ে ভালো কথা আর শুনিনি। হযরত ‘আয়িশার (রা) থেকে যে শত শত হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে তাঁর নিজের ভাষার অনেক বর্ণনাও সংরক্ষিত হয়েছে। সেগুলি পাঠ করলে তার মধ্যে চমৎকার এক শিল্পরূপ পরিলক্ষিত হয়। তাতে রূপক ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর ওহী নাযিলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেনঃ৪১০

আরবী হবে

অর্থাৎ ‘‘প্রথম প্রথম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী লাভ করতেন। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন না কেন, তা প্রভাতের দীপ্তির মত উদ্ভাসিত হতো।’’ হযরত ‘আয়িশার (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য স্বপ্নসমূহকে প্রভাতের দীপ্তি ও আভার সাথে তুলনা করেছেন। ওহী লাভের সময় রাসূলুলত্মাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চেহারা মুবারকে ঘাম জমতো। এই ঘামের ফোঁটাকে তিনি উজ্জ্বল মোতির দানার সাথে তুলনা করেছেন। মুনাফিকরা যখন তাঁকে নিয়ে কুৎসা রটনা করেছিলো, তাঁর চরিত্রের প্রতি কলঙ্ক আরোপ করেছিলো, তখন সেই দিনগুলি যে কেমন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তার একটা সুন্দর চিত্র আমরা পাই তাঁর বর্ণনার মধ্যে। সেই সময়ে তাঁর জীবনের একটি রাতের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেনঃ৪১১

আরবী হবে

অর্থাৎ ‘‘সারারাত আমি কাঁদলাম। সকাল পর্যন্ত আমার অশ্রুও মুকায়নি এবং আমি চোখে ঘুমের সুরমাও লাগাইনি।’’ তিনি সে রাতটি বিনিদ্র অবস্থায় এবং চোখের পানি ঝরিয়ে কাটিয়েছেন, সে কথাটি সরাসরি না বলে একটি সুন্দর চিত্রকল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। চোখে ঘুম আসাকে তিনি বেচাখে সুরমা লাগানোর সাথে তুরনা করেছেন। ভাষায় প্রচন্ড অধিকার থাকলেই কেবল এভাবে বরা যায়। একবার তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশ্ন করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি এমন দুইটি চারণভূমি থাকে-যার একটিতে পশু চারিত হয়েছে, আর অন্যটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়েছে। তখন সুরক্ষিত আছে, সিটিতে। মূলতঃ তিনি জানতে চেয়েছেন, যে নারী স্বামীসঙ্গ লাভ করেছে, আর যে লাভ করেনি, এর কোনটি আপনি পছন্দ করেন? আসলে তিনি নিজের সম্পর্কে রাসূরুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইচ্ছার কথা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরাসরি সে কথাটি না বরে একটি উপমার মাধ্যমে চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেন। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) বিবিগণের মধ্যে একমাত্র ‘আয়িশা (রা) ছিলেন কুমারী।ান্যরা সকলেই ছিলেন হয় বিধবা, নয়তো স্বামী পরিত্যক্ত।

হযরত ‘আয়িশা (রা) প্রাচীন আরবের অনেক লোক কাহিনীও জানতেন এবং সুন্দরভাবে তা বর্ণনাও করতে পারতেণ। হাদীসের কোন কোন গ্রন্থ তাঁর বলা দুই একটি গল্প বর্ণিত হয়েছে। আরবের এগারো সহদরার একটি দীর্ঘ কাহিনী তিনি একদিন স্বামী রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনিয়েছিলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে তাঁর গল্প শোনেন।৪১২ এ গল্পে তাঁর চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং শির্পকারিতা লক্ষ্য করা যায়। শব্দ ও বাক্যালংকারের ছড়াছড়ি দেখা যায়।

বক্তৃতা ভাষণঃ

বাগ্মী ও বাকপটু ব্যক্তিরাই বক্তৃতা-ভাষণ দিতে পারে। এ এক খোদাপ্রদত্ত গুণ। মানুষকে স্ব-মতে আনার জন্য, প্রভাবিত করার জন্য এ এক অসাধারণ শিল্প। সেই আদিকাল থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে সকর জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে এ শিল্পের চর্চা দেখা যায়। সেই প্রাচীন আরবদের মধ্যে এর ব্যাপক চর্চা ছিল। জাহিলী আরবের বড় বড় খতীব এবং তারে খুতবা বা ভাষণের কথা ইতিহাসে দেখা যায়। নানা কারণ ও প্রয়োজনে ইসলামী আমলে এই খুতবা শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নতি ও বিকাশ ঘটে। পুরুষদের গন্ডিাতিক্রম করে নারীদের মধ্যেও এর বিস্তার ঘটে। হযরত ‘আয়িশা (রা) একজন শ্রেষ্ঠ মহিলা খতীভ বা বক্তা ছিলেন। আরবী সাহিত্যের প্রাচীন সূত্রসমূহে হযরত ‘আয়িশা (রা) বহু খুতবা বা বক্ততা সংকলিত হয়েছে। উটের যুদ্ধের ডামাডোলের সময় তিনি যে সকল খুতবা দিয়েছিরেন তাবারীর ইতিহাসে তা সংকলিত হয়েছে। ইবন ‘আবদি রাবিবহি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইকদুল ফরীদ’ এ তার কিছু নকল করেছেন।৪১৩

বাগ্মিতা ও বিশুদ্ধভাষিতা যেমন একজন সুবক্তার অন্যতম গুণ, তেমনি স্পষ্ট উচারণ, উচ্চকণ্ঠ এবং ভাব-গাম্ভীর্যের অধিকারী হওয়াও তার জন্য জরুরি। হযরত ‘আয়িশার (রা) কষ্ঠধ্বনি এমনই ছিল। তাবারী বর্ণনা করেছেনঃ৪১৪

আরবী হবে

‘‘হযরত ‘আয়িশা (রা) ভাষণ দিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চকষ্ঠ। তাঁর গরার আওয়ায অধিকাংশ মানুষকে প্রভাবিত করতো। যেন তা কোন সম্ভ্রান্ত মহিলার গলার আওয়ায।’’

আহনাফ ইবন কায়স একজন বিখ্যাত তাবে‘ঈ। সম্ভবত তিনি বসরায় হযরত ‘আয়িশার (রা) একটি ভাষক শোনার সুযোগ লাভ করেছিরেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘আমি হযরত আবু বকর (রা), হযরত উমার (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আলী (রা) এবং এই সময় পর্যন্ত সকল খলীফার ভাষণ শুনেছি; কিন্তু আয়িশার (রা) মুখ থেকে বের হওয়া কথায় সে কলামন্ডিত সৌন্দর্য ও জোর থাকতো তা আর কারও কথায় পাওয়া যেত না।’ আল্লামা সাইয়েদ সুলায়মান নাদভী আহনাফ ইবন কায়সের মন্তব্যের উদ্ধৃতি টেনে বলছেন, আমার মতে, আহনাফ ইবন কায়সের এ কথা অতিরঞ্জিত থেকে মুক্ত নয়, তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ‘আয়িশা (রা) একজন স্বচ্ছন্দ ও শুদ্ধভাষী বক্তা ছিরেন।’৪১৫

আহনাফের মত ঠিক একই রকম মন্তব্য করেছেন হযরত ‘আমীর মু‘য়াবিযা (রা) ও মূসা ইবন তালহা। উটের যুদ্ধের সময়ে তিনি যে সকল বক্ততা ভাষণ দান করেছিলেন, তাতে যে আবেগময় শক্তি ও উত্তাপ দেখা যায় তা অনেকটা তুলনাহীন। পূর্বেই আমরা উটের যুদ্ধের আলোচনা প্রসঙ্গে তাঁর একটি ভাষণের অনুবাদ উপস্থাপন করেছিল। এখানে আমরা তাঁর ঐ সময়ের আর একটি ভাষণের ছোট্ট উদ্ধৃতি টেনে এ আলোচনা সমাপ্তি টানবো।

হযরত ‘আয়িশা (রা) যখন হযরত তালহা ও যুবাইরকে (রা) সঙ্গে নিয়ে বসরায় পৌঁছলেন তখন বসরাবাসীরা ‘আল-মিরবাদ’-এর সমবেত হলো। হমবেত জনমন্ডলীকে সম্বোধন করে প্রথমে তালহা (রা) তারপরে যুবাইর (রা) ভাষণ দিলেন। সবশেষে হযরত ‘আয়িশা (রা) বক্ততা করলেন। সর্বপ্রথম তিনি আল্লাহর হামদ এবং রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করলেন। তারপর বললেনঃ৪১৬

আরবী হবে

‘‘মানুষ উসমানের (রা)াপরাধের কথা বলতো, তাঁর কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রতি দোষারোপ করতো। তারা মদীনায় আসতো এবং তাঁদের সম্পর্কে নানা রকম তথ্য আমাদেরকে জানিয়ে পরামর্শ চাইতো। আমরা বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতাম। আমরা ‘উসমানকে (রা) পবিত্র, খোদাভীরু অঙ্গীকার পালনকারী হিসেবে দেখতে পেতাম। আর অভিযোগকারীরা আমাদের কাছে পাপাচারী, ধোঁকাবাজ ও মিথ্যাবাদী বলে প্রতীয়শান হতো। তারা মুখে যা বরতো, তার বিপরীত কাজ করার চেষ্টা করতো। যখন তারা মুকাবিলা করার মত শক্তিশালী হলো, সম্মিলিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। তারা তাঁর উপর তাঁর বাড়ীতেই হামলা চালালো। যে রক্ত ঝরানো হারাম ছিল তা তারা তাঁর উপর তাঁর বাড়ীতেই হামলা চালালো। যে রক্ত ঝরানো হারাম ছিল তা তারা হালাল করলো, আর যে মাল লুট করা, যে শহরের অবমাননা করা অবৈধ ছির তা তারা বিনা দ্বিধায় ও বিনা কারণে বৈধ করে নিল। শোন! এখন যা কারণীয় এবং যা ব্যতীত অন্য কিচু করা তোমাদের উচিত হবে না, তা হলো ‘উসমানের (রা) হত্যকারীদের ধরা এবং তাদের উপর কিতাবুল্লাহর হুকম কার্যকরী করা। তারপর তিনি সূরা আরে ইমরানের ২৩নং আয়তাটি পাঠ করেনঃ

‘আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে-আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহবান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’

বসরায় তিনি আকেরটি আগুন ঝরা বক্ততা দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে তার কিছু অংশের অনুবাদ উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই দীর্ঘ বক্ততার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য যেন একটা প্রবল আবেগ ও উদ্দীপনা ঢেলে দিয়ে শ্রেতাদের সম্মেহিত করে তুলেছে। এখানে তাঁর মূর ভাষায় কয়েকটি লাইন তুলে ধরা হলো।:৪১৭

আরবী হবে

‘ওহে জনমগুলী চুপ করুন, চুপ করুন। নিশ্চয় আপনাদের উপর আমার মায়ের দাবী আছে, উপদেশ দানের অধিকার আছে। আমার প্রতি কেউ কলঙ্ক আরোপ করতে পারে না-একমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করেছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমারই বুকে মাথা রেখে ইনতিকাল করেছেন। জান্নাতে আমি হবো তাঁর অন্যতম স্ত্রী। আমার রব আমাকে তাঁর জন্যই সংরক্ষিত রেখেছেন এবং অন্যদের থেকে পবিত্র রেখেছেন। আমার সত্তা দ্বারাই তোমদের মুনাফিকদের তোমাদের মু’মিনদের থেকে পৃথক করেছেন। আমার দ্বারাই আল্লাহ তোমাদেরকে আবওয়ার মাটিতে তায়াম্মুমের সুগো দিয়েছেন। অতঃপর আমার পিতা সেই সাওর পর্বতের গুহায় দুই জনের মধ্যে দ্বিতীয়, আর আল্লাহ ছিলেন তৃতীয়। তিনিই সর্বপ্রথম সিদ্দীক উপাধি লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতি খুশী থাকা অবস্থান ইহলোক ত্যাগ করেছেন…..হ্যাঁ, এখন আমি মানুষের এই প্রশেরনর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছি যে, আমি কিভাবে বাহিনী নিয়ে বের হলাম? এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য কোন পাপের বাসনা ও ফিতনা ফাসাদের অম্বেষণ করা নয়…….।’’

চিঠি-পত্র

আরবী সাহিত্যের নির্ভরযোগ্য প্রাচীন সংকলনসমূহে হযরত ‘আয়িশার (রা) বহু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি দেখেতে পাওয়া যায়। সে সব চিঠি তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিকট লিখেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এ সব চিঠি কি তিনি নিজ হাতে লিখেছিলেন না কেন, তার ভাব ও ভাষা যে হযরত ‘আয়িশার (রা) ছিল না, এমন কোন প্রমাণ নেই। তাই আরবী সাহিত্যের প্রাচীন কালের পন্ডিতরা হযরত ‘আয়িশার (রা) এসব চিঠির সাহিত্যমূল্য বিবেচনা করে নিজেরদ রচনাবলীতেস্থান দিয়ে গেছেন। ইবন ‘আবদি রাবিবহি আল-আন্দালুসীর বিখ্যাত সংকলন-আল-ইকদুল ফরীদ’ এর ৪র্থ খন্ডে তার অনেকগুলি চিঠি সংকলিত হয়েছে। যেমন, তিনি বসরায় পৌঁছে তথাকার এক নেতা যায়িদ ইবন সুহানকে লিখেছেনঃ৪১৮

আরবী হবে

‘‘উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশার (রা) পক্ষ থেকে তার নিষ্ঠাবান ছেলে যায়িদ ইবন সুহানের প্রতি। সালামুন আলাইকা। অতঃপর তোমার পিতা জাহিলী আমলে নেতা ছিলেন, ইসলামী আমলেও। তুমি তোমার পক্ষ থেকে মাসবূক মুসল্লীর অবস্থানে আছে যাকে বলা যায় প্রায় অথবা নিশ্চিতভাবে লাহেক হয়েছে। তুমি তোমার পক্ষ থেকে মাসবূল মুসল্লীর অবস্থানে আছে যাকে বলা যায় প্রায় অথবা নিশ্চিতভাবে লাহেক হয়েছে। তুমি জেনেছো যে, উসমান ইবন আফফান হত্যার মাধ্যমে ইসলামে কী বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমরা তোমাদের কাছে আমার এ চিঠি পৌঁছার পর মানুষকে আলইিবন আবী তালিবের পক্ষাবলম্বন থেকে ঠেকিয়ে রাখবে। তুমি তোমার গৃহে অবস্থান করতে থাক, যতক্ষণ না আমার নির্দেশ তোমার কাছে পৌঁছে। ওয়াস সালাম।’’

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশার (রা) উপরোক্ত চিঠির যে জবাব যায়িদ ইবন সুহান দিয়েছিলেন তা একটু দেখার বিষয়। আমরা সেই চিঠিটি তুলে দিয়ে এ প্রসঙ্গে সমাপ্তি টানছি। যায়িদ ইবন সুহান লিখছেনঃ৪১৯

আরবী হবে

‘‘যায়িদ ইবন সুহানে পক্ষ থেকে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশার (রা) প্রতি। আপনার প্রতি সালাম। অতঃপর আপনাকে কিছু কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভিন্ন কিছু কাজের। আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঘরে অবস্থান করার জন্য, আর আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ ফিতনা দূরীভূত না হয়। আপনি ছেড়ে দিয়েছেন। যা আপনাকে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর আমাদের যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা থেকে বিরত থাকার জন্য আপনি লিখেছেন। ওয়াস সালাম।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) কাব্যপ্রীতি

ইসলাম-পূর্ব আমলের আরবরা ছিল একটি কাব্যরসিক জাতি। তাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে কবি ও কবিতার প্রভাব ছিল অপরিসীম। তাদের নিকট কবির স্থান ছিল সবার উপরে। তারা কÿÿ ও নবীকে এইক কাতারের মানুষ বলে মনে করতো। তাইতো তারা রাসূলুল্লাহকেও (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবি বলে আখ্যায়িত করেছিল। ইবন রাশীকে আল-কায়রোয়ানী জাহিলী আরবে কবির স্থান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ৪২০

আরবী হবে

‘‘আরবের কোন গোত্রে যখন কোন কবি প্রতিষ্ঠা লাভ করতেন তখন অন্যান্য গোত্রের লোকেরা এসে সেই গোত্রকে অভিনন্দন জানাতো। নানা রকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো মেয়েরা সমবেত হয়ে বাদ্য বাজাতো। পুরুষ ও শিশু-কিশোররা এসে আনন্দ প্রকাশ করতো। এর কারণ, কবি তাদের মান-মর্যাদার রক্ষক, বংশের প্রতিরোধক এবং নাম ও খ্যাতির প্রচvারক।’’

প্রাচীন আরবী সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, জাহিলী আরবে যেন কাব্যচর্চার প্লাবন বয়ে চলেছে। অসংখ্য কবির নাম পাওয়া যায় যা গুণেও শেষ করা যাবে না।ইবন কুতায়বা বলেছেনঃ৪২১

আরবী হবে

‘‘কবিরা-যাঁরা কবিতার জন্য তাদের সমাজে ও গোত্রে জাহিলী ও ইসলামী আমলে প্রসিদ্ধিার্জন করেছেন তাঁদের সংখ্যা এত বেশি যে কেউ তা শুমার করতে পারবে না।’’

তিনি আরও বলেছেনঃ৪২২

আরবী হবে

‘‘যারা কবিতা বলেনি-তাদের সংখ্যা খুবই কম-তাদের নাম যদি আমরা উল্লেখ করতে চাই তাহলে অধিকাংশ লোকের নাম উল্লেখ করতে পারবো।’’

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদেম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেনঃ৪২৩

আরবী হবে

অর্থাৎ ‘‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আমাদের এখানে আসেন তখন আনসারদের প্রতিটি গৃহে কবিতা বলা হতো।’’

মোটকথা একজন আরব কবি তার কবিতার মাধ্যমে কোথাও যেমন আগুন জ্বালিয়ে দিত তেমনিভাবে কোথাও জীবনের বারি বর্ষণও করতো। এ গুণটি কেবর পুরুষদের সাথে সংযুক্ত ছিল না; বরং নারীরাও এর সাথে প্রযুক্ত ছিল। ইসলামের পূর্বে এবং ইসলামের পরেও শতবর্ষ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে আরবীর এ গুণ বৈশিষ্ট্যটি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। সে আমলের এমন অসংখ্য নারীর পরিচয় পাওয়া যায় যাঁরা কবিতা ও সঙ্গীত রচনায় এমন নৈপুণ্য দেখিয়েছেন যে, তাঁদের কথা আরবী কাব্যজগতের এককেটি যৌন্দর্যে পরিণত হয়েছে।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) আরবের সাংস্কৃতিক ইতহাসের এমন একটি পর্বে জন্মলাভ করেন। তাঁর নিজের পরিবারেও কবিতার চর্চা ছিল। পিতা আবু বকর (রা) একজন কবি ছিলেন।৪২৪ প্রখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত সা‘ঈদ ইবন আল-মুসয়্যিব বলেনঃ৪২৫

আরবী হবে

‘‘আবু বকর (রা) কবি ছিলেন। ‘উমার (রা) কবি ছিলেন। আর ‘আলী (রা) ছিলেন তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি।’’

তাই বলা চলে পিতার কাছ থেকেই তিনি কাব্যশাস্ত্রের জ্ঞান লাভ করেন। কবিতার আঙ্গিক, বিষয়বস্ত্ত, চিত্রকল্প ইত্যাদি বিষয়ে তিনি যেসব মন্তব্য ও মতামত রেখেছেন তাতে এ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা প্রমাণিত হয়। তাঁর এক গুণমুগ্ধ শাগরিদ আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ বলেছেনঃ৪২৬

আরবী হবে

‘‘রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের মধ্যে কাব্য ও ফারায়েজ শাস্ত্রে ‘আয়িশার (রা) চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে এমন কাউকে আমি জানিনে।’’

হযরত উরওয়া ইবন যুবাইর ঠিক একই রকম কথা বলেছেন।৪২৭ তাঁরান্য একজন শাগরিদ বলেছেন, ‘‘আমি ‘আয়িশার (রা) কাব্য-জ্ঞান দেখে বিম্মিত হইনে। কারণ তিনি আবু বকরের (রা) মেয়ে।’’

হযরত ‘আয়িশা (রা) নিজেও একজন কবি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি যে শোকগাঁথাটি রচনা করেন, তার কিছু অংশ আল্লামা আলসী তাঁর বুলুগুল আরিব’ গ্রন্থর ২য় খন্ডে সংকলন করেছেন।

ইমাম বুখারী আবদাবুল মুফরাদ’ গ্রন্থে হযরত উরওয়ার একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, হযরত কা‘ব ইবন মালিকের (রা) একটি পূর্ণ কাসীদা হযরত আয়িশার (রা) মুখস্থ ছিল। একটি কাসীদায় কম-বেশি চল্লিশটি শ্লোক ছিল।৪২৮ হযরত আয়িশা (রা) বলতেনঃ৪২৯

আরবী হবে

‘‘তোমরা তোমাদের সন্তনদের কবিতা শেখাও। তাতে তাদের ভাষা মাধুরীময় হবে।’’

জাহিলী ও ইসলামী যুগের কবিদের বহু কবিতা হযরত ‘আয়িশার (রা) মুখস্থ ছিল। সেই সকল কবিতা বা তার কিছু অংশ সময় ও সুযোগমত উদ্ধৃতির আকারে উপস্থাপন করতেন। তার বর্ণিত বহু কবিতা বা পংক্তি হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থ বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি হযরত আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি কখনও কবিতা আবৃত্তি করেছেন? বললেনঃ হাঁ, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কিছু শ্লোক তিনি আবৃত্তি করতেন। যেমনঃ৪৩০

আরবী হবে

‘‘তুমি যাকে পাথেয় দিয়ে পাঠাওনি সে অনেক খবর নিয়ে তোমার কাছে আসবে।’’

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন শুনলেন ‘আয়িশা (রা) কবি যুহাইর ইবন জানাবের নিম্নোক্ত পংক্তি দুইটি আবৃত্তি করছেনঃ৪৩১

আরবী হবে

‘‘তুমি উঠাও তোমার দুর্বলকে। যার দুর্বলতা তোমার বিরুদ্ধে কোন দিন যুদ্ধ করবে না। অতঃপর সে যা অর্জন করেছে তার পরিণতি লাভ করবে।

সে তোমকে প্রতিদান দিবে, অথবা তোমার প্রশংসা করবে। তোমার কর্মের যে প্রশংসা করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে প্রতিদান দিয়েছেন।’’

পংক্তি দুইটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ‘‘আয়িশা! সে সত্য বলেছে। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।

আবু কাবীর আ-হুজালী একজন জাহিলী কবি। তিনি তাঁরাসৎ ছেলে কবি তায়াববাতা শাররান-এর প্রশংসায় একটি কবিতা রচনা করেন। যার দুইটি পংক্তি নিম্নরূপঃ৪৩২

আরবী হবে

‘‘সে তার মায়ের গর্ভের সকল অশুচিতা এব দুধদানকারী দাত্রীর যাবতীয় রোগ-থেকে মুক্ত। যখন তুমি তার মুখমন্ডলের মজবুত শিরা উপশিরার দিকে দৃষ্টিপাত করবে, তখন তা প্রবল বর্ষণের সাথে বিদ্যুতের চমকের মত চমকাতে দেখবে।’’

হযরত ‘আয়িশ (রা) একদিন উপরোক্ত শ্লোক দুইটি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনিয়ে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ‘‘আপনিই তো এ দুইটি শ্লোকের বেশি হকদার। তাঁর এ কথায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উৎফুল্ল হন।

‘‘আয়িশা (রা) নিম্নের দুইটি বয়েত দিয়ে প্রায়ই মিছাল দিতেনঃ৪৩৩

আরবী হবে

‘‘কালচক্র যখণতার বিপদ মুসীবতসহ কোন জনমন্ডলীর উপর দিয়ে ধাবিত হয় তখন তা আমাদের সর্বশেষ ব্যক্তিটির কাছে গিয়ে থামে। আমাদের এ বিপদ ধেকে যারা উৎফুল্লা হয় তাদের বলে দাও-তোমরা সতর্ক হও। খুব শিগগিরই তোমরাও মুখেমুখি হবে, যেমন আমরা হয়েছি।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাই আবদুর রহমান ইবন আবী বকরের (রা) ইনতিকাল হয় মক্কার পাশে এবং মক্কায় দাফন করা হয়। পরে যখন হযরত ‘আয়িশা (রা) মক্কায় যান তখন ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিম্নোক্ত শ্লোক দুইটি আবৃত্তি করেনঃ৪৩৪

আরবী হবে

‘‘আমরা দুই জন বাদশাহ জাজীমার দুইজন সহচরের মত একটা দীর্ঘ সময় একসাথে থেকেছি। এমনকি লোকে আমাদের সম্পর্কে বলাবলি করতো যে, আমরা আর কখনও পৃথক হবো না।

অতঃপর আমরা যখন বিছিন্ন হয়ে গেলাম তখন আমি ও মালিক যেন দীর্ঘকাল সহঅবস্থান সত্ত্বেও একটি রাতও এক সাথে কাটাইনি।’’

মক্কার মুহাজিরদের শরীরে প্রথম প্রথম মদীনার আবহাওয়া খাপ খাচ্ছিল না। হযরত আবু বকর (রা), হযরত ‘আমির ইবন ফুহায়রা (রা), হযরত বিলাল (রা) এবং আরো অনেকে, এমনকি খোদ ‘আয়িশা (রা) মদীনায় আসার পর প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের ঘোরে তাঁদের অনেকের মুখ থেকে তখন কবিতার পংক্তি উচ্চারিত হতো। এমন কছিু পংক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) স্মৃতিতে ছির এবং তিনি বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ হযরত আবু বকরের (রা) জ্বারের প্রকোপ দেখা দিলে নিম্নোক্ত শ্লোকটি উওড়াতেনঃ৪৩৫

আরবী হবে

‘‘প্রতিটি মানুষ তার পরিবার পরিজনের মধ্যে দিনের সূচনা করে।অথচ মৃত্যু তার জুতোর ফিতার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী।:

হযরত বিলাল (রা) জ্বারের ঘোরে নিম্নের পংক্তি দুইটি জোরে জোরে আওয়াতেনঃ

আবরী হবে

‘‘হায়! আমি যদি জানতে পারতাম যে, কোন একটি রাত আমি মক্কার ইপত্যকায় কাটাবো এবং আমার চারপাশে হজখীর ও জলীল ঘাস থাকবে। অথবা মাজ্জান্নার সরোবরে কোন একদিন আমার বিচরণ ঘটবে, অথবা শামা ও তুফায়েল পর্বতদ্বয় কোনদিন আমার দৃষ্টিগোচর হবো।’’

হযরত ‘‘আমির ইবন ফুহাইরাকে (রা) তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে এই পংক্তিটি আবৃত্তি করতেনঃ৪৩৬

আরবী হবে

‘‘আমি স্বাদ চাখার আগেই মৃত্যুকে পেয়ে গেছি। ভীরু কাপুরুষের মৃত্যু তার উপর দিক থেকেই আসে।’’

বদর যুদ্ধে কুরাইশদের অনেক বড় বড় নেতা নিহত হয় এবং তাদেরকে বদরের কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়। কুরাইশ কবিরা তাদের স্মরণে অনেক আবেগজড়িত মরসিয়া রচনা করেছিল। সেই সকল কবিতার অনেক পংক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) স্মৃতিতে ছিল এবং তিনি তা বর্ণনাও করেছেন। নিম্নের বয়েত দুইটিও তিনি বর্ণনা করেছেন।৪৩৭

আরবী হবে

‘‘বদরের কূপের মধ্যে কতনা নর্তকী ও অভিজাত শরাবখোর পড়ে আছে, তাদের অবস্থা কি? উম্মে বকর তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করছে। আমার স্বগোত্রের লোকদের মৃত্যুর পরে আমার জন্য কোন শান্তি আসতে পারে কি?’’

হযরত সা‘দ ইবন মু‘য়াজ (রা) খন্দক যুদ্ধের সময় আরবী রজয ছন্দের একটি গানের একটি কলি আওড়াতেন, তাও হযরত ‘আয়িশা (রা) মনে রেখেছিলেন। সেটি তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

‘‘হায়! যদি অল্প কিচুক্ষণের মধ্যে উট যুদ্ধের নাগাল পেয়ে যেত। মরণের সময় যখন ঘনিয়ে আসে তখন সে মরণ কতনা সুন্দর।

মক্কার কুরাইশ কবিরা যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দায় কবিতা বলতো তখন মদীনার মুসলমান কবিরা কিভাবে তার জবাব দিতেন, সে কথাও আমরা হযরত ‘আয়িশার (রা) মাধ্রমে জানতে পারি। তিনি বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তোমরা কুরাইশদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর। এ কবিতা তাদের উপর তরবারির আঘাতের চেয়েও বেশি কার্যকর হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) একজন কবি ছিলেন। তিনি একটি কবিতা রচনা করলেন; কিন্তু তা রাসূলুল্লহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তেমন পছন্দ হলো না। তিনি কবি কা‘ব ইবন মালিককে (রা) নির্দেশ দিলেন কুরাইশদের জবাবে একটি কবিতা লিখতে। অবশেষে হযরত হাসসান ইবন সাবিতের পালা এলো। তিনি এসে আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমি তাদের এমন বিধ্বস্ত করে ছাড়বো, যেমন লোকেরা চামড়াকে করে থাকে।’ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। আবু বকর গোটা কুরাইশ খান্দানের মধ্যে কুরাইশদের নসবনামা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। আমারও ত৭ার তিনি আবু বকরের (রা) নিকট যান এবং বংশসূত্রের নানা রকম প্যাঁচ ও জটিলতা সম্পর্কে জেনে আবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এসে বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদের নিকট এমনভাবে বরে করে আনবো, যেমন লোকেরা আটার দলা থেকে চুল টেনে বের করে আনে। তারপর হাসনার (রা) একটি কাসীদা পাঠ করেন যার একটি বয়েত এইঃ

আবরী হবে

‘‘আলে হাশিমের সম্মান ও মর্যাদার শিখর হচ্ছেন মাখযূমের নাতি। আর তোমার বাপ ছিল দাস।’’

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহকে র বলতে শুনেছি, ‘হাসসান! যতক্ষণ তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করতে থাকবে, রুহুল কুদুসের সাহায্য তুমি লাভ করবে।’ তিনি আরও র্বণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একথাও বলতে শুনেছি, ‘হাসসান তারে জবাব দিয়ে দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করেছে।’ এ সব কথা বর্ণনার পর উম্মুল মু’মিনীন আমাদেরকে হাসসানের এ কাসীদাটিও শুনিয়েছেনঃ৪৩৮

আরবী হবে

তুমি করেছো মুহাম্মাদের নিন্দা, আর আমি তার জবাব দিয়েছি। আমার এ কাজের প্রতিদান রয়েছে আল্লাহর কাছে।

তুমি মুহাম্মাদের নিন্দা করছো, যিনি সৎকর্মশীল, ধার্মিক ও আল্লাহর রাসূল। প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা পালন যার স্বাভাব-বৈশিষ্ট্য।

আমার বাপ-দাদা, আমার ইজ্জত-আবরু সবই তোমাদের আক্রমণ থেকে মুহাম্মাদের মান-ইজ্জত রক্ষার জন্য ঢাল স্বরূপ।

তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দা, প্রশংসা বা সাহায্য করুক না কেন, সবই তাঁর জন্য সমান।

জিবরীল আমাদের মধ্যে আছেন। যিনি আল্লাহর বার্তাবাহক ও পবিত্র রূহ-যার সমকক্ষ কেউ নেই।’’

হযরত উসমানের (রা) শাহাদাতের পর মদীনার বিশৃঙ্খল অবস্থার কথা যখন জানতেল তখন তাঁর মুখে নিম্নোক্ত পংক্তিটি উচ্চরিত হলোঃ৪৩৯

আরবী হবে

‘‘যদি আমার সম্প্রদায়ের নেতারা আমার কথা মানতো তাহলে আমিতাদের এই ফাঁদ ও ধ্বংস থেকে বাঁচাতে পারতাম।’’

বসরা পৌঁছার পর তাঁর মুখে নিম্নের দুইটি বয়েত শোনা যেতঃ

আরবী হবে

‘‘অত্যাচারীদের আবাসভূমি ছেড়ে দাও-যদিও সেখানে পানি বিশুদ্ধ থাকে এবং ভীতিগ্রস্তদের চলার মত চল।

ঘাস নির্বাচন কর। অতঃপর দামাদের সবুজ উপত্যকায় রোদের মধ্যে চরতে থাক।’’

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, উটের যু&&দধ কোন কোন বীর নৈসিক রজয় ছন্দের যে চরণ দুইটি আবৃত্তি করেছিলেন, তা হযরত ‘আয়িশার (রা) স্মরণে ছিল। একবার তিনি চরণ দুইটি আবৃত্তি করে খুব কেঁদেছিরেন। সেই চরণ দুইটি এইঃ

আরবী হবে

‘‘হে আমাদের মা! যাঁকে আমরা সর্বোত্তম মা বলে জানি, আপনিকি দেখছেন না, কত বীর আহত হয়েছে, কত মাথা ও হাত ঘাসের মত কাটা গেছে।’’

হিশাম ইবন ‘উরওয়া তাঁর পিতা উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘আয়িশা (রা) বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা কবি লাবীদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করুন।

তিনি বলতেনঃ৪৪০

আরবী হবে

‘‘যাঁদের পাশে বসবাস করা যেত, তাঁরা সব চলে গেছেন। এখন আমি বেঁচে আছি চর্মরোগগ্রস্ত উটের মত উত্তরাসূরীদের মাঝে।’’

তারপর হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

‘‘তিনি যদি আমাদের এ কালের অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী বরতেন! আমি কবি লাবীদের এ রকম হাজারটি বয়েত বলতে পারি। অবশ্য আন্য কবিদের যে পরিমাণ বয়েত আমি বলতে পানি তার তুলনায় এ অতি নগণ্য।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) এ মন্তভ্য থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, তিনি কি পরিমাণ কাব্যরসিক ছিলেন, এ শাস্ত্রে তাঁর কি পরিমাণ দখল ছির এবং কত শত আরবী বয়েত ত৭ার মুখস্থ ছিল। আমরা হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিছি, কী অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি সেখানে রেখেছেন! আরবী কবিতার ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দেখা যায়।

হযরত ‘আয়িশার (রা) এমন কাব্যরুচি এবং শিল্পরস আস্বাদন ক্ষমতা দেখে অনেক কবি তাঁকে নিজের কবিতা শোনাতেন। হযরত হাসসান ইবন সাবিত (রা) আনসারদের মধ্যে কবিত্বের স্বীকৃত উসতাদ ছিলেন। ইফকের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার কারণে হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর প্রতি অসন্তোষ থাকা স্বাভাবিক ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) খিদমতে হাজির হয়ে তাঁকে নিজের কবিতা শোনাতেন।৪৪১ হযরত ‘আয়িশা (রা) তার প্রশংসা করতেন এবং তাঁর বিভিন্ন শুণাবলী বর্ণনা করতেন। তাছাড়া প্রসঙ্গক্রমে নবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জলসার অপর দউজন শ্রেষ্ঠ কবি হযরত কা’ব ইবন মালিক (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার (রা) নামও উলে্খ করতেন।৪৪২

মূলগতভাবে কাব্যচর্চা করা না ভালো, না মন্দ। কবিতাও কথার একটি প্রকার। কথার ভালো মন্দ কবিতার ছন্দের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং বিষয়বস্ত্তর উপর নির্ভরশীল। বিষয়বন্তু যদি খারাপ না হয় তাহলে সেই কবিতায় কোন দোষ নেই। গদ্যেরও ঠিকএকই অবস্থা। ভালোমন্দ নির্ভর করে বিষয়বস্ত্তর উপর।

কবিতার ভালোমন্দ সম্পর্কে হযরত ‘আয়িশা (রা) ঠিক এ রকম কথাই বলেছেনঃ৪৪৩

আরবী হবে

‘‘কিছু কবিতা ভালো হয়, কিছু কবিতা খারাপ হয়। ভালোটি গ্রহণ কর, খারাপটি পরিত্যগ কর।’’

তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ ‘সবচেয়ে বড় গুনাহগার ঐ কবি, যে গোটা গোত্রের নিন্দা করে। অর্থাৎ এক দুই জনের খারাপ কাজের জন্য গাটা গোত্রের নিন্দা করা নৈতিকতার পদক্ষলন এবং কবিত্ব শক্তির অপব্যবহার মাত্র।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, হযরত আয়িশা (রা) এমন এক বিষ্ময়কর প্রতিভা যার বর্ণনা ও মূল্যায়ন কোন সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। তাঁর জীবন ও বিচিত্রমুখী প্রতিভার বিবরণেরজন্য প্রয়েজান একখানি বৃহদাকৃতির গ্রন্থের। আমাদের আলাচনায় আমরা তাঁর কিছু পরিচয় পাঠকবর্গের নিকট তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

 

হাফসা বিতন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)

উম্মুল মু’মিনীন হাফসা (রা) দ্বিতীয় খলীফা ‘উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) কন্যা। মা খুযা‘আ গোত্রের মেয়ে যয়নাব বিনত মাজ‘উন প্রখ্যাত সাহাবী ‘উসমান ইবন মাজ‘উনের আপন বোন। তিনি জিনেও একজন সাহাবী। আবদুল্লাহ ইবন উমার ও হাফসা (রা) আপন ভাই-বোন।১ হাফসা আবদুলত্মাহর চেয়ে ছয় বছরের বড়।২ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। উমার (রা) বলেনঃ মক্কার কুরাইশরা তখন কা‘বা ঘরের পুনঃনির্মাণের কাজে ব্যস্ত।৩

বিয়ের বয়স হলে পিতা উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বনু সাহম গোত্রের সন্তান খুনাইস ইবন হুজাফার সাথেতাঁর প্রথম বিয়ে দেন। এই খুনাইস মক্কায় প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদেরান্যতম। হাবশায় হিজরাতকারী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশায় হিজরাত করেন।৪ অবশ্য মূসা ইবন উকরবা ও আবু মা‘শার তাঁর হাবশায় হিজরাতের কথা উলে্খ করেননি।৫ সেখান থেকে মক্কায় ফিরে এসে আবার মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনায় পৌঁছে কুবার বনু আমর ইবন আওফ গোত্রের রিফা‘য়া ইবন আবদিল মুনজিরের গৃহে আশ্রয় নেন।৬

হাফসার (রা) ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিচু জানা যায় না। তবে এতটুকু নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ‘উমার ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেত৭ার নিজ গোত্র ও খান্দানের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেন। সম্ভবতঃ হাফসাও সেই সময় পরিবারের লোকরেদ সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।৭

স্বামীর সাথে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনায় আসার অর্পকাল পরেই বধবা হন। তখন তাঁর বয়স বিশ বছরও হয়নি।৮ খুনাইসের মৃত্যুর সময়কার নিয়ে কিঞ্চিত মতভেদ আছে। অধিকাংশ সীরাত বিশেষঝে্হর মতে তিনি বদর ও ইহুদ যুদ্ধে যোগদান করেন। উহুদে তাঁর দেহেরে একাধিক স্থানে জখম হয় এবং মদীনায় ফিরে এসে তাতেই মারা যান।৯ ভিন্ন মতে তিনিবদরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে ছিলেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন বা জখম হন এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বদর থেকে মদীনায় ফেরার পর হিজরী দ্বিতীয় সনে তিনি মারা যান।১০

মেয়ে বিধবা হওয়ার পর পিতা উমার (রা) তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবতে লাগলেন। ঘটনাক্রমে সেই সময় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মেয়ে ও হযরত উসমানের (রা) স্ত্রী রুকাইয়্যা (রা) ইনতিকাল করেন! উমার (রা) সর্বপ্রথম উসমানের সাথে দেখা করে তাঁর সাথে হাফসার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। উসমান বিষয়টি ভেবে দেখবো বলে সময় নেন। কয়েক দিন পর, ‘আমি এ সময় বিয়ে করতে চাচ্ছি না’-বলে জবাব দেন। তারপর উমার (রা) গেলেন আবু বকরের (রা) কাছে। বললেনঃ আপনার সাথে আমি হাফসাকে বিয়ে দিতে চাই। আবু বকর (রা) চুপ থাকলেন, কোন জবাব দিলেন না। উসমানের (রা) জবাবে উমার (রা) যতখানি আহত হন তার চেয়ে বেশি হন আবু বকরের (রা) আচরণে। উমার (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খিদমতে হাজির হয়ে মনের দুঃখ প্রকাশ করেন।১১ ইবনুল আসীর বলেন, ওমার (রা) প্রথমে আবু বকরকে (রা) প্রস্তাব করেন, কিন্তু তিনি কোন উত্তর না দেওয়ায় উসমানকে (রা) প্রস্তাব করেন।১২

‘আয়িশার (রা) সাথে বিয়ের মাধ্যমে আবু বকরের (রা) সাথে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। কিন্তু উমারের (রা) সাথে কোন আত্মীয়তা ছিলনা। হাফসার (রা) সাথে বিয়ের মাধ্যমে এমন সম্পর্ক সৃষি।ট হওয়া আল্লাহর মর্জি চিল। উমারের (রা) দুঃখের কথা শুনে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ হাফসাকে বিয়ে করবে উসমানের চেয়েও ভালো এক ব্যক্তি এবং উসমান বিয়ে করবে হাফসার চেয়েও ভালো এক মহিলাকে।১৩ অন্য একটি বর্ণনায় এসেচে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন আমি কি তোমাকে উসমানের চেয়ে ভালো জামাই এবং উসমানকে তোমার চেয়ে ভালো শ্বশুরের সন্দান দেব না? উমার বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! অবশ্যই দেবেন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমার মেয়ে হাফসাকে আমার সাথেবিয়ে দাও, আর আমার মেয়ে উম্মু কুলসুমকে বিয়ে দিই উসমানের সাথে।১৪ এভাবে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে যায়। হাফসার পিতা উমার নিজেই ওলি হয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাফসাকে চার শো দিরহাম দেন মোহর দান করেন।১৫

উমারের (রা) প্রস্তাবে উসমান ও আবু বকরের (রা) সাড়া না দেওয়ার কারণ হলো, তাঁর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাফসার কথা আলোচনা করতে শুনেছিলেন। তারা বুঝেছিলেন, তিনি উমারের (রা) সম্মানার্থে হাফসাকে বিয়ে করতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা এ কথাটি উমারকে বলতে সাহস করেননি এই ভয়ে যে, তাঁদের বুঝার ভুলও হতে পারে।১৬ এ কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে হাফসার বিয়ের কাজ সম্পন্ন হবার পর আবু বকর (রা) একদিন উমারের (রা) সাথে দেখা করে বলেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন হাফসার কথা বলেছিলেন, আমি তাঁর গোপন কথা প্রকাশ করতে চাইনি। এছাড়া আপনার প্রস্তাবের জবাব না দেওয়ার আর কোন কারণ ছিল না।১৭

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে হাফসার বিয়ে কখন হয় সে বিষয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের একটু মতভেদ আছে। এ মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে মূলতঃ তাঁর স্বামীর মৃত্যুর সময় নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে। ইবনুল আসীর বলেন, অধিকাংশ আলেমের মতে হিজরী তৃতীয় সনে এ বিয়ে হয়।১৮ আবু উবাসয়দার মতে, এ বিয়ে হন হিজরী দ্বিতীয় সনে। আর এটাই ইবন আবদিল বার-এর মত। ইবন হাজার আল-ইসাবা গ্রন্থেতৃতীয় সনের মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তাঁর প্রথম স্বামী উহুদে শাহাদাত বরণ করেন। অনেকে বলেন, হিজরাতের ২৫ মতান্তরে ৩০ মাস পরে এ বিয়ে হন। কোন কোন বর্ণনায় ২০ মাস পরের কথাও এসেছে! অথচ উহুদ যুদ্ধ হয় হিজরাতের ৩০ মাসেরও পরে। ইবন সাদ জোর দিয়ে বলেন, তাঁর প্রথম স্বামী বদর থেকে ফেরার পর মারা যান। ইবন সায়্যিদিন নাস বলেন, হিজরাতের ৩০ মাসের মাথায় মা‘বান মাসে এ বিয়ে হয়।২০

হাফসার (রা) মৃত্যুসন নিয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের একটু মতপার্থক্য আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে, তিনি ৪৫ হিজরীর শা‘বান মাসে মদীনায় ইনতিকাল করেন। আমীর মু‘য়াবয়িার ৯রা) খিলাফতকাল এবং মদীনার গভর্ণর তখন মারওয়ান। তিনি জানাযার নামায পড়ান, লাশের সাথে বাকী গোরস্থান পর্যন্ত যান এবং দাফন কার্য শেষ হওয়া পযৃন্ত বসে থাকেন। আলে হাযামের বাড়ী থেকে মুগীরার বাড়ী পর্যন্ত লাশবাহী খাটিয়ায় তিনি কাঁধ দেন এবং সেখানে ত৭ার স্থালে আবু হুরাইরা (রা) কাঁধ দিয়ে কবর পর্যন্ত নিয়ে যান। হাফসার (রা) ভাই আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) এবং তাঁর ছেলেরা-‘আসিম,সালিম, আবদুল্লাহ ও সামযা লাশ কবরে নামান। এভাবে তিনি বাকী গোরস্থানে সমাহিত হন। উল্লেখিত মতটি মা‘মার, যুহরী ও সালিমের সূত্রে আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন।২১ তবে ইবনুল আসীরে ঝোঁক এই দিকে যে, যে সময় হাসান ইবন আলী (রা) আমীর মুয়াবিয়ার (রা) হাতে বাইয়াত করেন সেই সময় হাফসার ওফাত হয়। আর সেটা ৪১ হিজরীর জামাদিউল আওয়াল মাস। আর এই সনকে আমুল জামা‘য়াহ বলা হয়।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি হিজরী ২৭ সনে উসম্যানের (রা) খিলাফতকালে মারা যান। এ মতটির ভিত্তি হলো, ওয়াহাব ইবন মালিক বলেছেন, যে বছর আপ্রিকা বিজয় হয়, সেই বছর তিনি মারা যান। আর আফ্রিকা বিজয় হয় হিজরী ২৭ সনে। কিন্তু এ এক মারাত্মক ভুল। কারণ আফ্রিকা বিঝয় হয় দুইবার। প্রথম বিজয় হয় হিজরী ২৭ সনে, আর দ্বিতীয় বিজয় হয় মু‘য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালে। এ বিজয়ের গৌরবের অধিকারী ছিলেন মু‘য়াবিয়া ইবন খাদিজা (রা)।২২ মৃত্যুকালে হাফসার (রা) বয়স হয়েছিল ৬৩ অথবা ৫৯ বছর।

মৃত্যুর পূর্বে তিনি ভাই আবদুল্লাহ ইবন উমারকে (রা) একই উপদেশ দান করেন যা তাঁর পিতা উমার (রা) তাঁকে মৃত্যুর সময় দান করেছিলেন। পিতা তাঁকে গাবা‘তে যে ভূ-সম্পত্তি দিয়ে যান তিনি আল্লাহর রাসআতয় ওয়াকফ করে দেণ।২৩ হাফসা (রা) কোন সন্তান রেখে যাননি।২৪

হাফসার (রা) সন্তানাদি না থাকলেও তিনি অনেক স্নেহভাজন নারী ও পুরুষ রেখে যান যারা তাঁর নিকট হাদীস মুনেছিলেন এবং তা বর্ণনাও কর