আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – পঞ্চম খন্ড

হযরত ‘উসমানের (রা) খিলাফাতকাল প্রায় বারো বছর। এ সময়ের প্রথম অর্ধাংশে সকল প্রকার ঝামেলা ও হৈ-হাঙ্গামা মুক্ত শান্ত পরিবশে বিরাজমান ছিল। তারপর ধীরে ধীরে জনগণের পক্ষ থেকে নানা রকম অভিযোগ উঠতে থাকে। হযরত ‘আয়িশা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘উসমানকে (রা) উপদেশ দিয়েছিলেন, যদি আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে কখনও খিলাফতের জামা পরান তাহলে স্বেচ্ছায় তা যেন খুলে না ফেলেন।১৮৮

মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) খুবই গ্রহণযোগ্যতা ছিল। আল্লাহ তা‘আলারvাষণা অনুযা্য়ী তিনি ছিলেন মুসলমানদের মা। হিজায, ইরাক, মিসর তথা খিলাফতের প্রতিটি অঞ্চলে তাঁকে মায়ের মত মানা হvাত। লোকেরা তাঁর নিকট এসে নিজেদের নানা অভিযোগ ও অসুবিধার কথা বলতো, আর তিনি উপদেশ ও সান্তুনা দিতেন।

হযরত ‘উসমানের (রা) খিলাফতের প্রথম পর্ব পর্যন্ত বড় মাপের প্রজ্ঞাবান সাহাবীরা জীবিত ছিলেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করা হতো। খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে যোগ্যতা অনুযায়ী তাঁদেরকে নিয়োগ দান করা হতো। পূর্ববর্তী দুই খলীফার সময়ে কারো কোন অভিযোগ ছিল না। সে সময় যাঁরা উচ্চাভিলাষী যবক ছিলেন-যেমন ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর, মুহাম্মদ ইবন আবী বকর, মারওয়ান ইবনহাকাম, মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা, সা‘ঈদ ইবন আল-আস প্রমুখ, তাঁরা বড়দের সাহায্য করতেন। খিলাফত এবং ইমারাতের কোন উঁচু পদ ছির তাঁদের জন্য দুরাশা মাত্র।

‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ছিলেন হযরত সিদ্দীকে আকবরের নাতী এবং রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফুফাতো ভাই ও হাওয়ারী যুবাইয়ের (রা) ছেলে। তিনি নিজেকে খিলাফতের একজন হকদার মনে করতেন।

মুহাম্মদ ইবন আবী বকর ছিলেন প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) ছোট ছেলে এবং উম্মুল মুমিনীন আয়িশার (রা) বৈমাত্রেয় ভাই। এই মুহাম্মাদের মাকে আবু বকরের মৃত্যুর পর আলী (রা) বিয়ে করেন। এ কারণে আলীর (রা) নিকট লালিত-পালিত হন।১৮৯ আর আলীও (রা) তাঁকে ছেলের মত দেখতেন।

মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা বেড়ে ওঠেন হযরত উসমানের (রা) তত্ত্বাবধানে। বয়স হলে খলীফা উসমানের (রা) নিকট কোন একটি বড় পদের আশা করেন। খলীফা তাঁকে যোগ্য মনে না করায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে মদীনা ছেড়ে মিসর চলে যান।

‘মারওয়ান ও সা‘ঈদ ইবন ‘আস উভয়ে উমাইয়্যা বংশের দুই নব্য যুবক ছিলেন। উঁচু মর্যাদার অধিকারী মুহাজিরদের ইনতিকালের পর তাঁদের সন্তানরাও খিলাফতের নিকট বহু কিছু প্রাপ্তির আশা নিয়ে এগিয়ে আসেন। হযরত ‘উসমান (রা) উমাইয়্যা খান্দানের লোক ছিলেন। তাই তিনি যখনই মারওয়ান ও সা‘ঈদ ইবন ‘আসের মত লোকদের উঁচুপদ দান করলেন, তখন কুরাইশ-খান্দানের অন্যসব উচ্চাভিলাষী যুবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। এ কারণে মুহাম্মদ ইবন আবী বকর ও মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা ‘উসামন (রা) বিরোধী বিক্ষোভে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করেন। তাছাড়া এই সকল নওজোয়ানের মধ্যে উঁচু স্তরের সাহাবায়ে কিরামের মত সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতা, সততা, আমানতদারি, তাকওয়া খোদাভীতি ছিল না। এ কারণে জনসাধারণ ও সৈনিকদের মধ্যে যাঁরা প্রথম স্তরের সাহবীদেরকে দেখেছিলেন, তারা এই লোকদের নেতৃত্ব ও শাসনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আরবরা ছির চির স্বাধীন। মরু প্রকৃতিতে তারা স্বাধীন আবহাওয়ায় বেড়ে উঠতো। প্রত্যেকেই নিজ জি গোতের আনুগত্য করতো এবং নিজের গোত্রকে অন্য গোত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতো। ইসলামী সাম্যের আদর্শ তাদের সকল আভিজাত্য ভুলিয়ে দেয় এবং তাদেরকে একই স্তরে নামিয়ে আনে। প্রথম স্তরের সাহাবায়ে কিরাম (রা) ইসলামী সাম্যের শিক্ষা সমুন্নাত রাখলেও তাঁদের পরবর্তী নতুন প্রজম্নের কর্মকর্তা ও পদাধিকারী ব্যক্তিরা যেমন তা ভুলে বসেন, তেমনি অন্যদেরকেও ভুলিয়ে দেন। তাঁরা প্রকাশ্যে নিজেদের মজলিস ও দরবারে নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা ও গোত্রীয় আভিজাত্য প্রকাশ করতে শুরু করেন। অন্যান্য আরব গোত্রসমূহ তাঁদের এমন মনোভাব ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তারা ছিল সম অধিকারের দাবীদার। অন্যদিকে নওমুসলিম আনারব গোষ্ঠী কুরাইশ বা বনু উমাইয়্যা কোন আরব গোত্রেরই শাসন সহ্য করতে পারছিল না। এই জন্য খিলাফতের অভ্যন্তরে যে কোন ধরনের হৈ-হাঙ্গামায় অতি উৎসাহের সাথে তারা অংশগ্রহণ করতো।

আরব-আজমের মিলনস্থলরূপে যে কয়টি শহর চিহ্নিত ছিল তার মধ্যে কূফান্যতম। ইসলামী খিলাফতের ফিতনার সূচনা এই শহর থেকেই হয়। এটি ছির আরব গোত্রসমূহের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। সা‘ঈদ ইবনুল ‘আস ছিলেন এই কূফার ওয়ালী। রাতের বেলা তাঁর দরবারে সকল গোত্রের সর্বদাদের মাজমা বসতো। সাধারণত আরবদের যুদ্ধ বিগ্রহ ও আরব গোত্রসমূহের মর্যাদার তারতম্য বিষয়ে আলোচনা হতো। আর বিষয়টি এমন ছিল যে, কোন গোত্রই অন্য গোত্র থেকে মর্যদায় খাটো মনে করতো না। অনেক সময় আলোচনা তর্ক-বির্তক, ঝগড়া-ঝাটি ও মারামারিতে রূপ নিত। এ ক্ষেত্রে সা‘ঈদ ইবন ‘আসের মুখে নিজেকে কুরাইশ বংশজাত বলে গর্বের সাথে প্রকাশ করা আগুনে তেল ঢালার মত কাজ করতো। তাঁর এমন কর্মপন্থায় গোত্রীয় নেতাদের অভিযোগ সৃষ্টি হয়। মূলত তা একটি ফিতনার রূপ ধারণ করে।

ঠিক এই সময়ে ইবন সাবা নামক এক ইহুদী মুসলমান হয়। ইহুদীদের নিয়ক হলো, শক্র হিসেবে যদি শক্রর ক্ষতি না করতে পারে তাহলে রূপ পাল্টে বন্ধু হয়ে যায়। তারপর ধররে ধীরে গোপন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমের শক্রর সর্বনাশের চূড়ান্ত করে ছাড়ে। অতীতে খৃষ্টধর্মের সাথে তারা এমন আচরণই করেছিল।

এই ইহুদীর সন্তান ইবন সাবা জনগণের মধ্যে এই কথা প্রচার কতে থাকে যে, হযরত ‘আলী (রা) প্রকৃত পক্ষে খিলাফতের হকদার। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর খলীফা হওয়ার ব্যাপারে অসীয়াতকরে গিয়েছিরেন। সর্বশক্তি দিয়ে সে তাঁর এই ভ্রান্তবিশ্বাস প্রচার করতে থাকে। খিলাফতের বিভিন্ন ছোটখাট রাজনৈতিক হৈ-চৈ কে বাহানা বানিয়ে সে তার ষড়যন্ত্রের জালকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়। সে গোটা খিলাফত চষে ফেলে। কূফা, বসরা, মিসর তথা যেখানে বড় বড় সৈন্য ছাউনী ছিল সেখানে কিছু না কিছু বিপ্লবপন্থী সে তৈরি করে। সে মিসরকে এবিপ্লবপন্থীদের কেন্দ্র বানিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিবর্গকে ঐক্যবদ্ধ করে ফেলে। ইতিহাসে এটাকে ‘সাবায়ী’ আন্দোলন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

খলীফা উসমানের (রা) সময়ে আক্রি্কাতেই অধিকাংশ যদ্ধ-বিগ্রহ চলছিল। একারণে সেনাবাহিনীর বৃহত্তর অংশ সেখানেই থাকতো। যুদ্ধে অংশগ্রহণের বাহানায় মুহাম্মদ ইবন আবী বকর ও মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা স্বাধীনভাবে সৈন্যদের সাথে মেলামেশার সুযোগ পেতেন এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষের বীজ রোপণ করতেন। ফলে অল্প দিনের মধ্যে মিসর ‘উসমান (রা) বিরোধী বিদ্রোহের কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ওঠে। আর সেই সময় ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী সারাহ মিসরের ওয়ালী ছিলেন। মুহাম্মদ ইবন আবী বকর, মুহাম্মদ আবন আবী হুজায়ফা ও অন্যরা ‘আবদুল্লাহ ইবন আবী সারাহও খলীফা ‘উসমানের (রা) বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আন্দোলন শুরু করে দিলেন। এভাবে তাঁরা মিসরে নতুন রাজনৈতিক দলের নেতা পরিণত হলেন।

হজ্জের মওসুম এসে গেল। পারস্পরিক যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত মুতাবিক কূফা, বসরা ও মিসর থেকে এক হাজার মানুষের একটি দল হজ্জের বাহানায় হিজাযের দিকে যাত্রা করলো এবং মদীনার কাছাকাছি এসে শিবির স্থাপন করলো। হযরত ‘আলী (রা) ও অন্য বড় বড় সাহাবীরা তাদেরকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। তারা কিছুদূর যেতে আবার ফিরে আসে এবং মিসরের গবর্ণরের নিকট লেখা একটি চিঠি দেখায়। তাতে মিসরের গভর্নরের প্রতি খলীফার নির্দেশ ছিল, মিসরী বিদ্রোহীদের নেতৃবৃন্দকে মিসর প্রত্যাবর্তনের পরপরই হত্যা অথবা বনঈ করার। বিদ্রোহীদের ধারণা মতে, এই পত্রখানি ছিল খলীফার সেক্রেটারী মারওয়ানের হাতের লেখা। এ কারণে তারা সমবেতভাবে খলীফা উসমানের (রা) বাড়ী ঘেরাও করে এবং খলীফার নিকট দুইটি প্রস্তাব পেশ করে। হয় তিনি মারওয়ানকে বিদ্রোহীদের হাতে অর্পণ করবেন অথবা তিনিনিজেই পদত্যাগ করবেন। হযরত ‘উসমান দুইটি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) তখন মদীনায়। তিনি বৈমাত্রেয় ভাই মুহাম্মদ ইবন আবী বকরকে ডেকে বুঝালেন এবং খলীফার বিরুদ্ধে এমন চরম সিদ্ধান্ত থেকে বিতর থাকতে বলরেন। কিন্তু তিনি বোনের কথায় কান দিলেন না।

 মদীনায় যখন এমন একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান, তখন হযরত ‘আয়িশা (রা) প্রতিবছরের মত হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় চলে গেলেন। অবশ্য তিনি মুহাম্মদ ইবন আবী বকরকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে রাজি করাতে পারেনী। তারপর কিছুদিন হযরত ‘উসমান (রা) নিজ গৃহে অবরুদ্ধ থাকেন এবং অবশেষে বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদান বরণ করেন।

হযরত ‘উসমান (রা) বিদ্রেীহাীদের হাতে শাহাদাত বরণ করলেন। এখন একজন নতুন খলীফা নির্বাচনের পালা। স্বাভাবিক ভাবেই সকলের দৃষ্টি সেই চারজন জীবিত বিশিষ্ট সাহাবীর প্রতি পড়ার কথা, যাঁরা খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) মনোনীত ছয় সদস্যের খলীফা গ্যানেলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। তারা হলেনঃ তাহলা, যুবাইর, সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস ও আলী (রা)। এ সময় সা‘দ (রা) একেবারেই নিজেকে দূরে সরিয়ে মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে চয়ে যান। বসরার অধিবাসীরা তালহার (রা) পক্ষ অবলম্বনকারী ছিল। মিসরবাসীদের একাংশ ছিল যুবাইরের (রা) পক্ষে; কিন্তু অপর অংশ এবং বিপ্লবীদের গরিষ্ঠ অংশ ছিল আলীর (রা) পক্ষে। ‘আলীর (রা) সমর্থকদের মধ্যে আগ্রণী ভূমিকা পালন করছিলেন আশতার নাখ‘ঈ, ‘আম্মার ইবন ইয়াসির ও মুহাম্মদ ইবন আবী বকর (রা)। এমনিভাবে প্রত্যেক দল বা গোষ্ঠী নিজেদের পছন্দনীয় ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে থাকে। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ‘উমারের (রা) ছেলে ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার, তৃতীয় খলীফা হরত ‘উসমানের (রা) ছেলে আবান ও প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) ছেলে আবদুল রহমানের নামটিও প্রস্তাবে আসে। দীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা ও কর্ত-বির্তকের পর বিদ্রেহীদের চাপ ও মদীনাবাসীদের ইচ্ছায় হযরত ‘আলীকে (রা) খলীফা নির্বাচন করা হয়।১৯০

মদীনায় যখন এ সকল ঘটনা ঘটছে তখন সিরিয়ায় হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা) স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছেন এবং মুহাম্মদ ইবন আবী হুজায়ফা মিসরে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে বসে আছেন। মদীনার পবিত্র ভূমিতে পবিত্র মাসে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খলীফা এবং মুসলিম জাহানের ইমামের এমন নৃশংস হত্যাকান্ড সর্বশ্রেণীর মানুষর অন্তরে দারুণ ছাপ ফেলে। পূর্বে যাঁরা হযরত ‘উসমানের (রা) কর্মপদ্ধতির সমালোচক ছিলেন, তাঁরাও এহেন ঘৃণিত কাজের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। হযরত ‘আয়িশাও (রা) এই শ্রেণীর লোকদের অন্যতম। এমন বাড়াবাড়ি তাঁরে কেউই চাননি। এই ঘটনার পূর্বে আশতার নাখ‘ঈ একদিন ‘আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর পানাহ্! আমি ইমামদের ইমামকে হত্যার কথা বলতে পারি? এতেই ফিতনাবাজ লোকেরা রটিয়ে দেয় যে, উসমান (রা) হত্যাকান্ডে ‘আয়িশারও (রা) সমর্থন ছিল। তাছাড়া, মাুষের এমন ধারণার আরেকটি কারণ ছিল। তা হলো তাঁর ছোট সৎ ভাই মুহাম্মদ ইবন আবী বকর (রা) ছিলেন বিদ্রোহীদের অন্যতম নেতা।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর ভাইকে ‘উসমান (রা) বিরোধী হঠকারী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হযরত ‘আয়িশা (রা) পরবর্তীকালে একবার হযরত ‘উসমানের (রা) আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি কখনও চাইনি যে ‘উসমানের (রা) কোন রকম অসম্মান হোক। আমি যদি তা চেয়ে থাকি তাহলে আমারও যেন ত৭ার মত পরিণতি হয়। হে ‘উবাইদুল্লাহ ইবন ‘আদী! (আদী ছিলেন ‘আলীর রা. পক্ষে) একথা জানার পর কেউ যেন তোমাকে ধোঁকা দিতে না পারে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের কর্মকান্ডকে কেউ ততদিন অসম্মান করতে পারেনি যতদিন তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়নি। যে ‘উসমানের সমালোচনা করেছে, সে এমন সব কথা বলেছে যা বলা উচিত ছিল না। আমরা তাদের কর্মকান্ডকে গভীরভাবে দেখেছি, তাতে বুঝেছি তা সাহাবীদের কর্মকান্ডের ধারে কাছেও ছির না।’ ইতহিাস ও সীরাতের গ্রন্থে হযরত ‘আয়িশার (রা) এ জাতীয় এমনানেক কথা পাওয়া যায়, যা দ্বারা বুঝা যায় ‘উসমান (রা) এ জাতীয় এমন অনেক কথা পাওয়া যায়, যা দ্বারা বুঝা যায় ‘উসমান (রা) হত্যার ব্যাপারে তার কোন রকম ভূমিকা ছিল না। তাঁর প্রতি যে দোষারোপ করা হয়েছিল তা ছিল বিদ্রোহীদের একটি অপপ্রচার মাত্র।

মদীনার এই মর্মবিদারী ঘটনায় তৎকালীন গোটা মুসলিম উম্মাহ শোকে কাতর হয়ে পড়ে। সাহাবায়ে কিরামের ছোট্ট একটি দল, যাঁরা নিজেদের দেহের রক্ত দিয়ে গড়া উদ্যান তছনছ হতে দেখছিলেন-স্থির থাকতে পারলেন না। তাঁরা এর একটা দফারফা করার জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনিজন মহান সাহাবীঃ উম্মুল মুমিনীন হযরত ‘আয়িশা, হযরত যুবাইর ও হযরত তালহা (রা)। হযরত তালহা (রা) ছিলেন কুরাইশ খান্দারন লোক এবং প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (লা) কন্যার স্বামী, ইসরামের আদি পর্বের একজন সুমলমান এবং রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল-াহ ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) আমলে সংঘটিত সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদ। যুবাইর ইসলামের একজন বীর সৈনিক। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফূফাতো ভাই এবং প্রথম খলীফার কন্যা হযরত আসমার (রা) স্বামী। উভয়ে ছিলেন দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) মনোনীতখলীফা প্যানেলের অন্যতম সদস্য।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মদীনায় যখন খলীফা উসমান (লা) বহিরাগত বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ তখন হযরত আয়িশা (রা) প্রতি বছরের অভ্যাসমত হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় চলে যান। হজ্জ শেষ করে মদীনায় ফিরছিলেন, এমন সময় খলীফা উসমানের (রা) শাহাদাতের খবর পেরেন। সামনে কিচুদূর অগ্রসর হতেই হযরত তালহা ও যুবাইরের (রা) সাক্ষাৎ পেলেন। তাঁরা খলীফা হযরত আলীর (রা) অনুমতি নিয়ে মদীনা থেকে বেরিয়ে মক্কার দিকে যাচ্ছেন। তাঁরা তখন হযরত আয়িশার (রা) নিকট মদীনার আইন-শৃঙ্খলার যে চিত্রতুলে ধরেছিলেণ তাবারী সহ বিভিন্ন প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। তার কিচু অংশ নিম্নরূপঃ১৯১

‘আমরা মদীনা থেকে বেদুইন ও সাধারণ মানুষের হাত থেকে কোন রকম পালিয়ে এসেছি। আমরা জনগণকে এমন অবস্থায় ছেড়ে এসেছি যে, তারা কিংবর্তব্যবিমূঢ়। তারা যেমন সত্যকেচিনতে পারছে না, তেমনি মিথ্যাকেও অস্বীকার করতে সক্ষম হচ্ছে না। নিজেদেরকে রক্ষাও করতে পারছেনা।’

হযরত আয়িশা (রা) বললেন, এখন আমাদের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করা উচিত। এ সময় তিন নিম্নের এ চরণটি আবৃত্তি করেনঃ

আরবী হবে

-যদি আমার কাওমের নেতারা আমার আনুগত্য করতো তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে এ বিপদ থেকে বাঁচাতে পারতাম।

তিনি আবার মক্কায় ফিরে গেলেন। খলীফার শাহাদাতের খবর মক্কায় ছড়িয়ে পড়লৈ চতুর্দিক থেকে মানুষ কাছে ছুটে আসতে লাগলো। ‘উমরা বিনত আবদির রহমান থেকে বর্ণিত হয়েছে। সে সময় উম্মু মুমিনীন বলেনঃ১২৯ সেই কাওমের (সম্প্রদায় মত অন্য কোন কাওম নেই যারা নিম্নোক্ত আয়াতের হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করেঃ১৯৩

আরবী হবে

-যদি মু’মিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা আলত্মাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে।

হজ্জের মওসুম ছিল। ঘোষনার সাথে সাথে হারাম শরীফ থেকের কয়েকশো মানুষ সাড়া দিল। আবদুল্লাহ ইবন আমের বসরা থেকে প্রচুর নগদ অর্থ নিয়ে এসে আয়িশার (রা) সাথে যোগ দিল। ই‘য়ালা ইবন মুনাইয়্যা ইয়ামন থেকে সাত শো উট ও ছয় লাখ দিরহাম এনে আয়িশার (রা) হাতে দিল।১৯৪ এই বাহিনী কোন দিকে যাত্রা করবে তা ঠিক করার জন্য হযরত আয়িশার (রা) আবাস গৃহে পরামর্শ বৈঠক বসালো। আয়িমার (রা) মত ছিল মদীনার দিকে যাত্রা করার। কারণ সাবায়ী ও বিদ্রোহীরা সেখানেই অবস্থান করছিল। সেদিন তাঁর এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ইসলামী উম্মার ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। কিন্তু তাঁরা এই সদ্ধান্তে আসেন যে, উসমানের (রা) রক্তের বদলা গ্রহণের জন্য বসরা ও কূফা থেকে-যেখানে হরত তালহা ও যুবাইরের (রা) প্রচুল সমর্থক ছিল, সামরিক সাহায্য নেওয়া হবে। অতঃপর এই কাফেলা মক্কা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) তখন মক্কায়। তাঁকেও বসরার দিকে যাওয়ার অনুরোধ করা হলো। আমি মদীনার মানুষ, মদীনাবাসীরা যা করে, আমি তাই করবো’-একথা বলে তিনি এই কাফেলার সাথেবসরার দিকে চরতে অস্বীকৃতি জানালেন। অন্যান্য উম্মাহতুল মুমিনীন-যাঁরা আয়িশার (া) সাথে মদীনায় ফেরার প্রস্ত্ততি নিয়েছিলেন, কেউ এই কাফেলার সাথে বসরার দিকে গেলেন না। একমাত্র হাফসা (রা) যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বারণ করায় তিনিও আর গেলেন না। তবে অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনীন ও মক্কার সাধারণ মানুষ ‘জাতুল ইরাক’ পর্যন্ত বসরাগামী কাফেলাকে এগিয়ে দেন। তাঁরা সেদিন ইসলামের এমন দুর্দিন দেখে এমন কান্নাকাটি ও মাতাম করেছিলেন যে আর কোনদিন তেমন দেখা যায়নি। এ কারণে ইতিহাসে এ দিনটিকে ইয়াউমুন নাহীব’ বা কান্নার দিন বলা হয়।১৯৫ উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা) একটি উটের উপর সাওয়ার হয়ে কাফেলার সাথে বসরার দিকে চললেন। ইতিহাসের এক মন্তবড় ট্রাজেডির সাক্ষী এই উটের একটু পরিচয় দেওয়া এখানে অগ্রাসঙ্গিক হবে না বলে মনে করি। উিটটি উম্মুল মুমিনীনকে কে দিয়েছিল, সে সম্পর্কে দুই ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। ই‘য়ালা ইবন মুনাইয়্যা আশি দীনার দিয়ে খরিদ করে তাঁকে দেন। উটটির নাম ছিল আল-আসকার’। মতান্তরে উটটি ছিল উরাইনা’ গোত্রের এক ব্যক্তির। উরায়নী গোত্রের সেই লোকটি বর্ণনা করেছেঃ১৯৬ আমি একটি উটে চড়ে চলছি। এমন সময় এক অশ্বারোহী এসে আমাকে বললোঃ তুমি কি তোমার এ উটটি বেচবে? বললামঃ হ্যাঁ বেচতে পারি। লোকটি বললোঃ কত দাম? বললামঃ এক হাজার দিরহমা। বললোঃ তুমি কি পাগল? বললামঃ কেন? আল্লাহর কসম! এর উপর সোয়ার হয়ে আমি যাকেই ধরতে চেয়েছি, সফল হয়েছি। আর এই পিঠে থাকা অবস্থায় কেউ আমাকে ধরতে পারেনি। সে বললোঃ তুমি যদিজানতে, উটটি আমি কার জন্য কিনতে চাই। এটা আমি বিনতে চাই উম্মুূল মু’মিনীন আয়িশার (রা) জন্য। বললামঃ তাহলে আমি বিনা মূল্যেই দিলাম। সে বললোঃ তা হয় না, তুমি বরং আমার সাথে কাফেলার কাছে চলো, আমরা তোমাকে একটি মাদী উট ও অনেক দিরহাম দিব। আমি তার সাথে কাফেলার কাছে গেলাম। তারা আমাকে বিনিময়ে একটি মাদী উট ও চার মতান্তরে ছয় শো দিরহমা দিল।’ এই উরানী লোকটিকে পথ প্রদর্শক হিসেবে কাফেলার সাথে নেওয়া হয়।

কাফেলার যাত্রাপথে মানুষ যখন শুনতে পেল, এই বাহিনীর পুরোধা উম্মুল মুমিনীন, তখন বহু লোক অত্যন্ত আবেগ ও উৎসাহের সাথে যোগদান করলো। এভাবে এক মানযিল পথ অতিক্রম করতেনা করতে তিন হাজারের একটি বাহিনী তৈরি হয়ে গেল। হযরত উসমানের (রা) গোত্র বনু উমাইয়্যার যুবকদের ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কি হতো পারতো? সে সময়ের পরিস্থিতি তাদের এত প্রতিকূল ছিল যে, চতুর্দিক থেকে তাড়া খেয়ে তারা পালিয়ে মক্কায় এসে বড় হচ্ছিল। হযরত আয়িশার (রা) ঘোষণা ছিল তাদের জন্য এক মহা সুযোগ। তারা সকলে তাঁর বাহিনীর মধ্যে ঢুকে গেল।

বনু উমাইয়্যার ইবনুল ‘আস ও মারওয়ান ইবনুল হাকামও কাফেলার সাথে বের হলেন। মারুজ জাহরান’ মতান্তরে ‘জাতু ইরাক’ পৌঁছে সা‘ঈদ ইবনুল ‘আস তাঁর দলীয় লোকদের বললেনঃ ‘তোমরা যদি উসমান (রা) হত্যার বদলা নিতে চাও তাহলে আগে এই লোকদের হত্যা কর। তাঁর ইঙ্গিত ছিল তালহা, যুবাইর, প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতি। কারণ বনু উমাইয়্যাদের মধ্যে সাধারণভাবে এ ধারণা প্রচলিত ছিল যে, উসমানের (রা) হত্যাকারী কেবল তারাই নয় যারা তাঁকে হত্যা করেছে অথবা তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বাইরে থেকে এসেছে, বরং ঐ সকল ব্যক্তির সকলে তাঁর সত্যাকারীদের মধ্যে পরিগণিত যাঁরা বিভিন্ন সময়ে হযরত উসমানের (রা) কর্মপদ্ধতির সমালোচনা করেছেন এবং তারাও যাঁরা হাঙ্গামার সময় মদীনায় ছিলেন, কিন্তু তাঁকে রক্ষার জন্য যুদ্ধকরেননি। মাওয়ান বললেনঃ আমরা তাঁদের (তালহা, যুবাইর ও আলী রা.) একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লড়াবো। যাঁর পরাজয় হবে, তিনি এমনিই শেষ হয়ে যাবেন। আর যিনি জয়ী হবেন, এত দুর্বল হয়ে পড়বেন যে, অতি সহজেই আমরা তাঁকে কাবু করে ফেলতে পারবো।’১৯৭

আসলে বনু উমাইয়্যাদের আসল উদ্দেশ্যে ছিল হযরত আয়িশার (লা) আপোষ-মীমাংসার আহবান ও আন্তরিক চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া। শুধু তাই নয়, আয়িশার (রা) নেতৃত্বে তৃতীয় আরেকটি শক্তির উত্থান হচ্চে দেখে তাদের অনেকে এই বাহিনীর মধ্যে নানাভাবেবিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। তারা প্রশ্ন তোলে আলীকে (রা) পরাভূত করার পর তালহা ও যুবাইরের মধ্যে কে খলীফা হবেন? হযরত আয়িশা (রা) জানতে পেরে এ প্রপাগান্ডা থামিয়ে দেন। তারপর আরেকটি প্রশ্ন তোলা হয়-খিরাফতের ফায়সাপলা না হয় পরে হবে, কিন্তু এ মুহূর্তে নামাযের ইমাম হবেন কে? হযরত আয়িমা (লা) তাহলা ও যুবাইরের (রা) ছেলেদের নামাযের ইমামতির জন্য একদিন করে নির্ধারণ করে দিয়ে এ ফিতনাও থামিয়ে দেন।

চরার পথে হাওয়াব’১৯৮ নামক জলাশয়ের নিকট পৌঁছলে এই বিশাল কাফেলা দেখে সেখানকার কুকুর হাঁকডাক আরম্ভ করে দেয়। ‘আয়িশা (রা) জিজ্ঞেস করেন স্থানটির নাম কি? বলা হলো, ‘হাওয়াব’। তখন তাঁর স্মরণ হয় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি বাণী, একবার তিনি বেগমদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ আল্লাহ জানেন তোমাদের মধ্যে কাকে দেখে হাওয়াবের’ কুকুরগুলি ডাকবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ কহতেই হযরত আয়িশা (লা) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই ভবিষ্যদ্বাণস্মিরণ হতেই আয়িমা (লা) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একদিন একরাত কাফেলা এখানে থেকে থাকে।১৯৯ অবশেষে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকে পঞ্চাশ ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, এটা হাওয়াব নয়। তখন তিনি নিশ্চিন্ত হন। তাছাড়া হযরত যুবাইর তখন বলেনঃ আপনি ফিরে যাবেন। কিন্তু হতে পারে আল্লাহ তা‘য়ালা আপনার দ্বারা এই বিবাদ মীমাংসা করে দেবেন।২০০ কোন কোন বর্ণনায় কথাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ ত৭ার (‘আয়িশার (রা.) সঙ্গীদের কেউ কেউ বললেন, পিছনে না ফিরে সামনে অগ্রসর হোন। লোকেরা যখন আপনাকে দেখতে পাবে তখন আল্লাহ তাদের মধ্যে একটা মীমাংসা করে দেবেন। সামনে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায় আছেন, তখন তাঁকে বলা হলো, আপনি দ্রুত চলুন, পিছন থেকে আলীর (রা) বাহিনী আসছে। এ সকল বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় হযরত আয়িশার (রা) বসরার দিকে চলার উদ্দেশ্য ছির কেবল ইসলাহ ও মীমাংসা।

কূফাঃ

মক্কা মু‘য়াজ্জামা, মদীনা মুনাওয়ারা ও বসরার পরে আরবের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল কূফা। হযরত আবু মূসা আল আশ‘য়ারী (রা) ছিলেন তথাকার ওয়ালী। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে নিজেরদর দাবীর যৌক্তিকতা তুলে ধরে তার সমর্থন কামনা করছিল। মহান সাহাবী হযরত আবু মূসা (রা) এই বিবাদের গুরুত্ব উপলদ্ধি করে নিজের প্রভাবের দ্বারা ও খুতবার মাধ্যমে এর থেকে দূরে থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানালেন। হযরত আয়িশা (রা) কূফার নেতৃবৃন্দের নামে পৃথক পৃথক চিঠি পাঠালেন। এদিকে হযরত আলীর (রা) পক্ষ থেকে হযরত আম্মার ইবন হয়াসির ও ইমাম আল-হাসান (রা) কূফায় পৌঁছলেন। হযরত আম্মার কূফার জামে‘ মসজিদে প্রদত্ত এক ভাষণে তৎকালীন ঘটনাবলী স্পষ্টভাবে তুলে দরেন। সেই ভাষণে তিনি হযরত আয়িশার (রা) সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনার পরে বলেন, এ সব কিচু সঠিক। কিন্তু আল্লাহ ও ব্যাপারে তাঁর পরীক্ষা নিচ্ছেন। আম্মারের (রা) এ ভাষণ কূফাবাসীদের উপর দারুণ প্রভাব ফেলে। কয়েক হাজার মুসলমান তাঁর আবেদনে সা দেন। তা সত্ত্বেও কূফাবাসীর মনে এই দ্ভিধা ও সংকোচ কাজ করতে থাকে যে, একদিকে রাসূলুল্লাহর (সাল্ল-াল্ল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগম উম্মুল মুমিনীন, আর অন্যদিকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্যার স্বামী এবং চাচাতো ভাই-এই দুই জনের কার সাথে যাওয়া যেতে পারে।

এই দিকে হযরত আয়িশা (রা) বসরার সন্নিকটে পৌঁছে লোক মারফত শহরের আরব নেতৃবৃন্দের প্রত্যেকের নিকট চিঠি পাঠালেন। পরে বসরা পৌঁছে কোন কোন নেতার গৃহেও গেলেন। শহরের একজন নেতা তাঁর আহবানে সাড়া দিচ্ছিলেন না। তিনিনিজে তাঁর গৃহে যেয়ে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। সে বললোঃ ‘আমার মায়ের কথা না মানতে পেরে আমার লজ্জা হচ্ছে।’২০১

হযরত আলীর (লা) পক্ষ থেকে তখন বসরার ওয়ালী ছিলেন ‘উসমান ইবন হুনাইফ। তিনি প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য ইমরান ইবন হুসাইন ও আবুল আসওয়াদকে পাঠালন। তাঁরা হযরত আয়িশার (রা) নিকট উপস্থিত হয়ে ওয়ারীল পক্ষ থেকে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চান। আয়িশা (রা) তাঁদেরকে বলেন, ‘আল্লাহ কসম’ আমার মত ব্যক্তিরা কোন কথা গোপন রেখে ঘর থেকে বের হতে পারে না। আর না কোন মা প্রকৃত ঘটনা তার সন্তানদের কাছে লুকাতে পারে।’ তারপর তিনি তারে সামনে মদীনার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন এবং উসমান (রা) হত্যাকারীদের শাস্তিদান ও উম্মাতের মধ্যে যে দ্বন্দ-সংঘাত দেখা দিয়েছে তা মিটিয়ে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সব শেষে তিনি বলেনঃ২০২ ‘তোমাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করা এবং খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা আমার কাজ।’ তারপর তিনি পাঠ করেনঃ২০৩

আরবী হবে

-তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভালো নয়; কিন্তু যে সলা-পরামর্শ দান-খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধিস্তাপন কল্পে করতো, তা স্বতন্ত্র।

এই দুই ব্যক্তি হযরত আয়িশার (রা) নিকট থেকে উঠে হযরত তালহা ও যুবাইরের (রা) কাছে যান। তাঁদের থেকেবিদায় নিয়ে আবার হযরত আয়িশার (রা) নিকট যান। তখন তিনি বলেনঃ আবুল আসওয়াদ, তোমার প্রবৃত্তি যেন তোমাকে দোযখের দিকে নিয়ে না যায়। তারপর তাদেরকে এ আয়াতটি পাঠ করে শোনানঃ২০৪

আরবী হবে

‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে।

‘আয়িশার (রা) বক্তব্যের প্রভাব এই হলো যে, প্রতিনিধিদ্বয়ের একজন সদস্য-ইমরান নিজেকে এই বিবাদ থেকে দূরে সারিয়ে নিলেন এবং বসরার ওয়ালীকেও তাঁর মত করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তিনি বিরত হলেন না; বরং সবরায় হযরত আলীর (রা) পক্ষে জনমত সৃষ্টি চেষ্ট চালিয়ে যেতে লাগলেন। এদিকে তাহলা, যুবাইর ও আয়িশা (রা) বক্তৃতা-ভাষণের মাধ্যমে বসরার জনগণকে তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহবান জানাতে থাকলেন। একদিন এক সমাবেশে তাহলা ও যুবাইর (লা) বক্তৃতা করার পর শ্রোতাদের মধ্যে দ্বিধা-সংশয় লক্ষ্য করে হযরত আয়িশা (রা) অত্যন্ত ধীরস্থীর ও গম্ভীর গলায় হামদ ও না‘ত পেশ করার পর নিম্নোক্ত ভাষণটি দান করেনঃ২০৫

‘জনগণ উসমানের (রা) কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতো, তাঁর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দোষ-ত্রুটি প্রচার করতো। মানুষ মদীনায় এসে আমাদের কাছে পরামর্শ ও উপদেশ চাইতো। আমরা তাদেরকে সন্ধি ও আপোষ-মীমাংসার যে উপদেশ দিতাম তা মেনে নিত। উসমানের (রা) বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ ছিল, আমরা সে বিষয়ে গভীরভাবে খতিয়ে দেখে তাঁকে একজন নিষ্পাপ পরহেযগার ও সত্যবাদী ব্যক্তি হিসেবে পেতাম। আর শোরগোলকারীদেরকে দেখতাম তারা পাপাচারী ও ধোঁকাবাজ। তাদের অন্তরে ছিল এক কথা, আর মুখে ভিন্ন কথা। তাদের সংখ্যা যখন বৃদ্ধি পেল তখন তারা বিনা কারণে এবং বিনা দোষে উসমানের (রা) গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে। অতঃপর যে রক্ত প্রবাহিত করা বৈধ ছিল না, তা তারা করেছে, যে ধন-সম্পদ লুটপাট করা সঙ্গত ছিল না, তা করেছে, আর যে পবিত্র ভূমির মর্যাদা রক্ষা করা তাদের উপর ফরয ছিল, তারা তার অমর্যাদা ও অসম্মান করেছে। সাবধান! এখন যে কাজ করতে হবে এবং যার বিরোধিতা করা উচিত হবে না, তাহলো ‘উসমানের (রা) হত্যাকারীদের প্রেফতার করা এবং শক্তভাবে আল্লাহর হুকুম ও বিধান বলবৎ করা। আল্লাহ বলেছেনঃ২০৬

আরবী হবে

-আপনি কি তাদের দেখেছেন, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে-আল্লাহর কিতাবের প্রতি তারে আহবান করা হয়েছিলো যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

ইবন আবদি রাবিবহি আল-আন্দালুসী হযরত আয়িশার (রা) এ সময়ের একটি ভাষণ তাঁর গ্রন্থে সংকলন করেছেন, যা ভাষা ও বাকশৈলীর দিক দিয়ে অতি চমৎকার। এখানে তাঁর অনুবাদ দেওয়া হলোঃ২০৭

‘ওহে জনমন্ডলী! চুপ করুন! চুপ করুন! আপনাদের উপর আমার মায়ের দাবী আছে। আপনাদেরকে উপদেশ দানেরও অধিকার আমার আছে। একমাত্র খোদা-দ্যোহী মানুষ ছাড়া কেউ আমার প্রতি কোন প্রকার দোষারোপ করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বুকে মাথা রেখে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আমি তাঁর প্রিয়তমা বেগমদের অন্যতম। আল্লাহ পাক অন্য মানুষ থেকে আমাকে র্বভাবে সংরক্ষণ করেছেন। আমার সত্তা দ্বারা মুমিন ও মুনাফিকের পরিচয় নির্ণিত হয়েছে এবং আমাকে উপলক্ষ্য করে আল্লাহ আপনাদের জন্য তায়াম্মুমের বিধান দান করেছেন।

আমার পিতা এ পৃথিবীর তৃতীয় মুসলমান এবং ছাওর পর্বতের গুহায় দুইজনের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় এবং তাঁর গলায় খিলাফতের মালা পরিয়ে ইনতিকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পর যখন ইসলামের রশি দুলতে থাকে তখন আমার পিতাই তা শক্ত হাতে মুট করে ধরেন। তিনিই নিফাক (কপটতা)থ-এর লাগাম টেনে ধরে, ধর্মত্যাগের ঝর্ণা ঘুকিয়ে ফেলেন, এবং ইহুদীদের আগুণে ফুঁ দেওয়া বন্ধ করে দেন। আমরা সেই সময় চোখ বন্ধ করে ধোঁকাবাজি, বিশ্বাসহীনতা ও ফিতনা-ফাসাদের প্রতীক্ষায় ছিলাম। …হ্যাঁ, এখন আমি মানুষের প্রশ্নের লক্ষ্রবস্ত্ততে পরিণত হয়েছি। কারণ, আমি বাহিনী নিয়ে বের হয়েছি। আমার এ বের হওয়ার উদ্দেশ্য পাপ ও ফিতনার অনুসন্ধান নয়-যা আমি নিশ্চিহ্ন করতে চাই, যা কিছু আমি বলছি সত্য ও ন্যায়ের সাথে বলছি। আমার ওজর-আপত্তি তুলে ধরা এবং আপনাদেরকে জ্ঞাত করানোর জন্য বলছি। আল্লাহ পাক নবী মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর দরূদ ও সালাম নাযিল করুন।’

জনগণ নীরবে মনোযোগ সহকারে তাঁর ভাষণ শুনছিল। ত৭ার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ প্রতিপক্ষের লোকদের অন্তরেও তীরের ফলার মত গেঁথে যাচ্ছিল। তাদেরানেকে স্বপক্ষ ত্যাগ করে আয়িশার (রা) সেনাক্যাম্পে এসে যোগ দেয়।

বসরায় পেঁছে হযরত আয়িশা (রা) কূফার ওয়ারী এবং কূফা ও বসরার আশে পাশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট তাঁর এভাবে আগমনের উদ্দেশ্যে ও তাদের করণীয় কর্তব্য বর্ণনা করে চিঠি লেখেন। উল্লেখ্য যে, ‘আললী (রা) ও আয়িশা (রা) চূড়ান্ত পর্যায়েরর মুখোমুখি-যাকে উটের যুদ্ধ বলা হয়-হওয়ার আগে উভয় পক্ষের লোকদের ম¨্য ছোটখাট অনেক সংঘর্ষ হয় এবং তাতে বহু লোক হতাহত হয়। অবশেষে বসরায় আয়িশার (রা) কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ দিকে হযরত আপলী (রা) হযরত মু‘য়াবিয়াকে (লা) নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মদীনা থেকে সিরিয়া যাত্রার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন। এমন সময় বসরার এই সমাবেশের কথা অবগত হয়ে এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করার জন্য সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্র হলেন। কিন্তু বহু সংখ্যক সাহাবী এবং তাদেরানুগামী লোকেরা যারা মুসলমানদের এই গৃহযুদ্ধকেএকটি ফিতনা বা পরীক্ষা বলে মনে করছিলেন, এ যাত্রায় আলীর (রা) সহগামী হতে রাজি হলেন না।২০৮ হিজরী ৩৬ সনের রবী‘উস সানী মাসে হযরত আলী (রা) মদীনা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করেন।২০৯ সেদিন বহু সাহাবীর আলীর (রা) পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন না করার ফল এই হলো যে, সেই উসমান (রা) হত্যাকারীরা-যাদেরকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য আলী (রা) সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনীর মধ্যে ঢুকে গেল। যা একদিকে যেমন তাঁর দুর্নামের কারণ হয়ে দাঁড়ালো, তেমনি নানা সমস্যারও। বসরা শহরের অদূরে যেদিন উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) এবং আমীরুল মুমিনীন আলীর (রা) বাহিনীদ্বয় পরস্পর মুখোমুখি হন, সেদিন মুসলিম উম্মাহর প্রতি সহানুভূতিশীল মানুলে বিরাট একটি দল আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালালেন ঈমানদার লোকদের এই দুইটি দলকে সংঘাত-সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখার জন্য। তাঁদের চেষ্টায় আপোষ মীমাংসার কথাবার্তা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলীর (রা) বাহিনীতে উসমান (রা) হত্যাকারীরা বিদ্যমান ছিল-যারা বুঝেছিল, যদি আপোষ-মীমাংসা হয়ে যায় তাহলে তাদের রক্ষা নেই,ান্যদিকে উম্মুল মুমিনীনের বাহিনীতে সেই লোকেরা ছিল, যারা দুইটি দলকে লড়িয়ে উভয়কে দুর্বল করে ফেলতে চাচ্ছিল। এ কারণে সৎ লোকেরা যে যুদ্ধটিকে ঠেকাতে আগ্রাণ চেষ্ট করেছিলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা অপশক্তি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে শেষ পর্যন্ত তা বাধিয়ে দিল এবং উটের যুদ্ধ হয়েই গেল।২১০

উটের যুদ্ধ

হযরত আলী (রা) মদীনা থেকে মাত্র সাতশো লোক সংগে করে যাত্রা করেছিলেন। কূফা থেকে আরো সাতহাজার লোক যোগ দেয়। একটি ছোট্ট বাহিনী নিয়ে তিনি বসরায় পৌঁছেন। উভয় বাহিনী রণক্ষেত্রে মুখোমুখি হলো। আরবের প্রতিটি গোত্রের লোক সেদিন দুই ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুদার গোত্রের এক ভাগ অন্য ভাগের সামনে দাঁড়ায়। এমনিভাবে আযদসহ অন্য সকল গোত্রও-একাংশ আরেক অংশের বিপক্ষে দাঁড়ায়। সত্যিই যে এস মর্মবিদারী দৃশ্য। সে দিন উবয় দলের, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রতিটি সদস্য ছিলেন সত্যের সিপাহী। প্রত্যেকে দূঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন যে তারা সত্যের উপর আছেন। কেউই নিজের অবস্থান থেকে বিন্দু মাত্র সরতে ইচ্ছুক ছিলেন না। কুফার কোন কোন গোত্রের নেতারা তাদের স্বগোত্রীয় বসরী নেতাদের মসজিদে যান্ বেং তাঁদেরকে এই ঝগড়া থেকে দূরত্ব বজায় রাখার আহ্না জানান। কিন্তু তাঁরা জবাব দেয়ঃ আমরা কি উম্মুল মুমিনীনকে একাকী ছেড়ে দেব?

তা সত্ত্বেও উভয় পক্ষের লোকদের দূঢ় বিশ্বাস ছিল, ব্যাপারটি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে না। একটা নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত হয়ে যাবে। একজন গোত্রীয় নেতা হযরত আলীর (রা) নিকট যেয়ে একটা আপোষ-মীমাংসায় পৌঁছার জন্য তাকিদ দিলেন। তিনি তো প্রথম থেকেই রাজি ছিলেন। আলীর (রা) নিকট থেকে উক্ত নেতা তালহা, যুবাইর ও মুমিনীন‘‘ এই কর্মকান্ডে আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? বললেনঃ উসমানের (রা) হত্যকারীদের শাস্তি দান এবং আপোষ-মীমাংসার আহবান। গোত্রীয় নেতা বললেনঃ উম্মুল মুমিনীন! একটু ভেবে দেখুন তো, পাঁচ শো মানুষের শাস্তির জন্য পাঁচ হাজার মানুসের রক্ত ঝরিয়েছেন এবং পাঁচ হাজারের জন্য আপনাকে হাজার হাজার মানুষেল রক্ত ঝরাতে হবে। এ কেমন ইসলাহ ও সংশোধন হলো? লোকটির বক্তব্য এত স্পষ্ট ও মক্তিশালী ছিল যে, উম্মুল মুমিনীন নিরুত্তর হয়ে গেলেন। তিনি আপোষ করতে রাজি হলেন এবং সবাই মিলে সিদ্ধান্তে এসে গেলেন।২১১

এখন উভয় পক্ষ নিশ্চিন্ত। যুদ্ধ-বিগ্রহের চিন্তা তাদের অন্তর থেকে দূর হয়ে গেল। সবকিছু ঠিকঠাক মত নিষ্পাত্তির ব্যাপারে কারো কোন সনে্হদ থাকলো না। কিন্তু উবয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান দুস্পৃতিকারীরা দেখলো, যদি আপোষ-মীমাংসা হয়ে যায় তাহলে তাদের বিপদের অন্ত নেই। তাছাড়া তাদের বহু বছরের পরিকল্পনা ও চেষ্টা সাধনা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারা তখন সক্রিয় হয়ে উঠলো। সাবায়ী দলের বিরাট একটি সংখ্যা আলীর (রা) পক্ষে ছিল। আলাপ-আলোচনার পর উভয় দলের রোকেরা যখন রাতের শেষ প্রহরে ঘুমিয়ে ছিল তখন এই সাবায়ীরা আক্রমণ করে বসলো। এই কিছু সংখ্যক পাপাত্মা হঠাৎ করে চতুর্দিকে আগুন জ্বালিয়ে দিল। ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে প্রত্যেকে নিজের অস্ত্রটি হাতে তুলে নিল। প্রত্যেক গ্রুপ ও দলের নেতারা বিশ্বাস করলো, প্রতিপক্ষ তাদের নিদ্রার সুযোগে চুক্তি ভঙ্গ করে আক্রমণ করে বসেছে। হযরত আলী (রা) লোকদের থামাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন।

সকাল পর্যন্ত এ হৈ হাঙ্গামা চলতে থাকে। হৈ চৈ হযরত আয়িশা (রা) জিজ্ঞেস করেনঃ কি হয়েছে? জানতে পারলেন, লোকেরা যুদ্ধ করে দিয়েছে। বসরার কাজী কা‘ব ইবন সুওয়ার হযরত আয়িশার (রা) নিকট এসে বললেন, আপনি উটের পিঠে চড়ে চলুন। হতে পারে লোকেরাপনার মাধ্যমে সন্ধি করে নেবে।২১২ তিনি লোহার লৈতরি হাওদা উটের পিঠে বেঁধে তাঁরম¨্য বসে সৈন্যবাহিনীর মাঝ বরাবর চলে আসেন। এদিকে হযরত আলী (লা) তাঁর প্রতিপক্ষ হযরত তালহা ও হযরত যুবাইরকে ডেকে আনেন। এই তিন মহান সাহাবী ঘোড়ার উপর বসা অবস্থায় কিছুক্ষণ এক স্থানে অবস্থান করেন। বদর-উহুদের সহযোদ্ধাত্রয়ীর আজ এমন অবস্থান! সত্যি সে এক পীড়াদায়ক দৃশ্য। আলী (রা) তাঁদের দুইজনকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণকরিয়ে দেন। তাঁদেরও স্মারণ হলো। সাথে সাথে যুবাইর (রা) যুদ্ধের ইচ্ছা অন্তর থেকে মুছে ফেলেন। ছেলে ‘আবদুল্লাহ পাশেই ছিলেন। তিনি পিতাকে ভীরু, কাপুরুষ বলে তিরস্কার করেন। যুবাইর জবাব দেন, লোকেরা জানে আমি ভূীরু নই। তবে আলী (রা) আমাকে একটি কথা স্মারণ করে দিয়েছে, যা আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে শুনেছি। আশি শপথ করছি, তাঁর বিরুদ্ধে আমি আর লড়বো না।২১৩

তিনি ঘোড়ার লাগামে টান দিয়ে মুখ গুরিয়ে রণক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। ইবন জুরমূয নামক এক সাবায়ী তাকে অনুসরণ করে এবং পথিমধ্যে সে নামাযে সিজদারত অবস্থায় তরবারির এক আঘাতে তাঁর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

হযরত তালহাও (লা) রণক্ষেত্র থেকে সরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি উমাইয়্যা গোত্রের মারওয়ানের দৃষ্টিতে পড়ে যান। সে বুঝেছিল, যদি তালহা জীবিত ফেরে তাহলে উমাইয়্যা খান্দানের প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। সে তাঁকে তাক করে একটি বিষাক্ত তীর ছোড়ে। তীরটি তাঁর পায়ে বেধে। কোনভাবেই রক্ত পড়া বন্ধ করা গেল না। এই আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এদিকে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা) কা‘ব ইবন সুওয়ারকে ডেকে তাঁর হাতে নিজের কুরআনের কপিটি দিয়ে বলেন, যাও এটি দেখিয়ে মানুষকে আপোষ-মীমাংসার আহবান জানাও। তিনি কুরআনখুলে উভয় দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেলেন। দৃষ্কৃতিকারীরা দূর থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ে। ফলে তিনিও শাহাদাত বরণ করেন।

দুপুর হয়ে গেল। আক্রমণ ছির অতর্কিত। হযরত আয়িশার (রা) বাহিনীর অধিনায়করা শেষ পর্যন্ত এই ফিতনা থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিলেন। এ কারণে তাঁর বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়লো। এই যুদ্ধের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, উভয় পক্ষের গরিষ্ঠ অংশের বিশ্বাস ছিল, প্রতিপক্ষ আমাদের মুসলিম ভাই। এ কারণে, প্রত্যেকে তার প্রতিপক্ষের হাত পা বা অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। সবাই চেষ্টা করছিল যাতে মাথা ও বুকে আঘাত না লাগে। উদ্দেশ্য; হাত-পা কাটা গেলেও যাতে জীবনে বেঁচে থাকে। তারা আন্তরিকভাবে কামনা করছিল, যুদ্ধ বন্ধু হোক। রণক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থানে নৈকিদের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হাত-পায়ের স্তহপ হয়ে গিয়েছিল।

সাবায়ীদের বাসনা ছিল, আয়িশাকে (লা) হাতের মুঠোয় পেলে চরমভাবে অবমাননা করা হবে। সুতরাং হযরত তালহা ও যুবাইরের (রা) শাহাদাতের পর কূফাবাসীরা তাঁর উপর আক্রমণের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে।২১৪ হযরত আয়িশার (রা) বাহিনীর লোকেরাও চতুর্দিক থেকে গুটিয়ে যায়। উম্মুল মুমিনীনের উটটি একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল। চতুর্দিক থেকে নিক্ষিপ্ত তীর-বর্শা এসে আঘাত করছিল তাঁর বর্ম আচ্ছাদিত হাওদায়। সন্তানেরা ডানে-বামে সাম–পিছন থেকে আক্রমণ প্রতিহত করে চলচিল। তখন তাদের অনেকের মুখেএ দুইট চরণ উচ্চরিত হচ্ছিল।২১৫

আরবী হবে

-হে আমাদের মা, হে আমাদের সেই মা-যাঁকে আমরা সর্বোত্তম বলে জানি! আপনি কি দেখছেন না, কত বীর সন্তানকে আহত করা হচ্ছে এবং তাদের হাত ও মাথা কাটা যাচ্ছে?

এখন চতুর্দিক থেকে এ আওযায় উঠতে লাগলো যে, যতক্ষণ না উম্মুল মুমিনীনের উটটি আঘাত করে বসিয়ে দেওয়া যাবে, এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হবে না। বনু দাববা উটের চতুর্দিকে একটা বেষ্টনী করে রেখেছিল। কেউ উটের দিকে এাগানোর চেষ্টা করলেই তাকে তারা জীবিত ছেড়ে দিচ্ছিল না। তারা তখন একটা আবেগ ও উত্তেজনাপূর্ণ সংগীত গেয়ে চলছিল। তার তিনটি শ্লোক নিম্নরূপঃ২১৬

আরবী হবে

-‘আমরা দাববার সন্তান, এই উটের রক্ষক। মৃত্যু আমাদের নিকট মধুর চেয়ে মিষ্টি।

-আমরা মৃত্যুর সন্তান-মৃত্যু যখন আসে। আমরা আফফানের ছেলে উসমানের মৃত্যুর ঘোষণা নিযার ফলার সাহায্যে করি।

-তোমরা আমাদের নেতাকে ফিরিয়ে দাও, তাহলে তোমাদের সাথে কোন দ্বন্দ্ব নেই।’

আবেগ ও উত্তেজনা এমন প্রবল ছিল যে, বনু দাববার একজন একজন করে এগিয়ে গিয়ে উটের লাগাম ধরছিল, প্রতিপক্ষের আঘাতে তার হাত বিচ্ছিন্ন হলে অন্য একজন ছুটে এসে লাগামটি মুঠ করে ধরছিল। এভাবে একই স্থানে উটের লাগাম ধরা অবস্থায় ৭০ (সত্তর) ব্যক্তির হাত বিচ্ছিন্ন হয়।২১৭ এমনিভাবে উম্মুল মুমিনীনের প্রতিপক্ষের যে কোন হাত সে দিন উটের লাগামের প্রতি বাড়ানো হয়েছিল, তা আর আস্ত ফিরিয়ে নিতে পারেনি। হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) নিকটেই দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি বলেনঃ কর্তিতহাত যেন তখন বাতাসে উড়ছিল। এ দৃশ্য দেখে হযরত আলী (রা) ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসেন। আশতার আন-নাখ‘ঈ আবদুল্লাহ বিন যুবাইয়ের কাছে পৌঁছে গেলেন। দুইজনই ছিলেন সাহসী বীর পুরুষ। উভয়ের মধ্যে অসির যুদ্ধ শুরু হলো। দুইজন আহত হলেন। এ অবস্থায় একে আপরকে জড়িয়ে ধরলেন। ইবন যুবাইর (রা) চেঁচিয়ে বলে উঠলেনঃ২১৮

আরবী হবে

অর্থাৎ মালিক ও আমাকে মেরে ফেল। আমার সাথে মালিককেও হত্যা কর।

পরবর্তীকালে আশতার নাখ‘ঈ বলতেনঃ লোকেরা আমাকে মালিকনামে জানতো না, তাই সে দিন রক্ষা পেয়েছিলাম। অন্যথায় আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতো।

বনু দাববার কিছু লোক আলীর (রা) পক্ষেও ছিলেন। তাঁরা দেখলেন উট যদি তাঁদের দৃষিট আড়ালে না আনা যায় তাহলে যেভাবে লোক মারা যাচ্ছে তাতে তাঁদের গোত্র নির্মূল হয়ে যাবে। এমন চিন্তা মাথায় আসার পর দাববা গোত্রের বুজাইর ইবন দালজা’ নামক এক ব্যক্তি পিছন দিক থেকে এসে উটের পায়ে তরবারিরর এমন আঘাত হানেন যে, উট হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ে। আর সাথে সাথে উটকে কেন্দ্র করে আয়িশার (রা) পক্ষে যাঁরা লড়ছিলেন তারা সরে গেলেন। আলীর (রা) কোন রক্ম আঘাত পেয়েছেন কিনা।হাত দেখেই আয়িশা (রা) গর্জে ওঠেনঃ এ কোন মালউনের (অভিশপ্ত) হাত? আয়িশঅ বলেনঃ না, তুমি মুহাম্মদ (প্রশংসিত) নও, তুমি মুজাম্মম (নিন্দিত)। অন্য একটি বর্ণনা মতে আয়িশা প্রশ্ন করেনঃ কে? মুহাম্মাদ বলেনঃ আপনার অনুগত ভাই। আয়িশা (রা) বলেনঃ তুমি অগুগত নও, বরংয় অবাধ্য। মুহাম্মদ প্রশ্ন করেনঃ বোন! আপনি কি কোন আঘাত পেয়েছেন? আয়িশা (রা) জবাব দেনঃ তাতে তোমার কি?

এরই মধ্যে হযতর আলী (লা) উটের কাচে এসে হাজির হলেন। তিনি জানতে চাইলেনঃ আম্মা, আপনি কেমন আছেন? আয়িশা (রা) বললেনঃ ভালো আছি আলী (রা) বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আয়িশা বললেনঃ আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন। ২১৯

হযরত আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) কাছেই ছিলেন। তিনি বললেনঃ মা, আপনার সন্তনদের এ লড়াই কেমন দেখলেন? আয়িশা (রা) বললেনঃ আমি তোমার মা নই। আম্মার (রা) বললেনঃ আপনার পছন্দ না হলেও আপনি আমার মা। আয়িশা (রা) বললেনঃ বিজয়ী হয়েছো বলে গর্ব করছো। যেভাবে বদলা নিয়েছো তাই সংগে নিয়ে এসেছো। জেনে রাখ, যাদের আচরণ এমন হয় তারা কখনও বিজয়ী হতে পারে না।

হযরত আয়িমা (রা) বসরা থেকে সেজা মক্কা মুকাররামায় চলে যান। পরবর্তী হজ্জ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। তারপর মদীনায় ফিরে যান এবং আজীবন সেখানে বসবাস করেন। পরিশুদ্ধির যে পদ্ধতি তিনি অবলম্বন করেন, সারা জীবনতার জন্য আফসোস করেছেন।২২৫ ইবন সা‘দ বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়িশা (রা) বলতেনঃ হায়, যদি আমি বৃক্ষ হতাম,! হায়, যদি আমি পাথর হতাম! হাং, যদি আমি কিছুই না হতাম।২২৬ একথা বলা দ্বারা তার আফসোসের পরিমণ অনুমান করা যায়।

একবার বসরার অধিবাসী এক ব্যক্তি আয়িশার (রা) সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। আয়িশা (রা) তাকে প্রশ্ন করেনঃ তুমি কি আমাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলে? লোকটি জবাব দিলঃ হাঁ। আয়িশা (রা) প্রশ্ন করেনঃ তুমি কি সেই ব্যক্তিকে চেন, যে সেদিন এইচ চরণটি আবৃত্তি করেছিল।:

আবরী হবে

লোকটি বললোঃ সে তো আমার ভাই। বর্ণনকারীর বলেছেন যে, তারপর হযরত আয়িশা (লা) এত কাঁদলেন যে, আমার মনে হলো এ কান্না যেন আর থামবে না। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন, মৃত্যুর সময় তিনি অসীয়াত করেন যে, আমাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের পাশে দাফন করবে না। বাকী‘ গোরস্থানে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে।২২৭ ইবন সা‘দ বর্ণনা করেছেন।অ আয়িশা (রা) মৃত্যুর সময় বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরে একটি নতুন কাজ করেছি। সুতরাং তোমরা আমাকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে।২২৮ একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি যখন আয়াত২২৯

আরবী হবে

(তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে) তিলাওয়াত করতেন তখন এত কাঁদতেন যে, চোখের পানিতে আঁচল ভিজে যেত।২৩০ উটের যুদ্ধের শেষ হওয়ার পর হযরত আয়িশা (রা) আল-কা‘কা ইবন আমরকে বলেছিলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি যদি আজকের এ দিনটির আরো বিশ বছর পূর্বে মারা যেতাম, তাহলে কতনা ভালো হতো।’ আর সে কথা শুনে আলীও (রা) ঠিক একই রকম মন্তব্য করেছিলেন।২৩১

‘আইন ইবন দুরাইয়া আল-মাজাশি’ নামক এক ব্যক্তি এসে হাওদার মধ্যে ইক মারতে থাকে। ‘ধায়িশা (রা) বলেনঃ সরে যাও। তোমার উপর আল্লাহর অভিশাপ। লোকটি বলেঃ আমি শুধু হুমায়রাকে এক নজর দেখতে চাই। হযরত ‘ধায়িশা (রা) তখন লোকটির প্রতি অভিশাপ দিয়ে বলেনঃ ‘আল্লাহ তোমার আবরু-ইজ্জত উন্মুক্ত করুন, তোমার হাত বিচ্ছিন্ন করুন এবং তোমার লজ্জাস্থান প্রকাশ করুন’ পরে লোকটি বসরায় নিহত হয়। তার সকল জিনিসপত্র লুণ্ঠিত হয়ে। হাত-পা কর্তিত ও উলঙ্গ অবস্থায় আযদ গোত্রের এশটি বিরান ভূমিতে তার লাশটি পাওয়া যায়।২২০

হযরত ‘আলী (রা) মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের নেতৃত্বে উম্মূল মুমিনীনকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে তাঁরই পক্ষাবলম্নকারী বসরার এক নেতা- ‘আবদুল্লাহ ইবন খালাফ আল-খুযা’ঈ-এর গৃহে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থ করেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) বাহিনীর আহত সৈনিকরা সেই বাড়ির ঘর ও বাইরের প্রতিটি স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। অুঃপর হযরত ‘আলী (রা), হযরত ইবন ‘ধাববাস (রা) ও আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীনের সাথে সাক্ষাৎ করতে সেখানে যান। হযরত ‘আলী (রা) উম্মূল মুমিনীনকে সালাম করেন এবং কিছুক্ষণ তাঁর পাশে অবস্থান করেন। হযরত ‘আলী (রা) জানতেন যে, এই বাড়িতে প্রতিপক্ষের আহত সৈনিকরা আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কিন্তু তিনি সে বিষয়ে কোন কথাউচ্চারণরণ করলেন না।২২১

উম্মূল মুনিনীন কয়েকদিন বসরায় অবসত্মান করেন। তারপর হযরত ‘আলী (রা) যথাযোগ্য মর্যাদায় ও সম্মানের সাথে মুহাম্মদ ইবনে আবী বকরের (রা) তত্ত্বাবধানে চল্লিশজন সম্ভ্রামত্ম বসরী মহিলা সমভিব্যাহারে তাঁর হিজাযে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। বারো হাজার দিরহামও সাথে দিয়ে দেন।২২২ হযরত ‘আলী (রা) সহ অসংখ্য সাধারণ মুসলামান বহুদূর পর্যমত্ম তাঁদেরকে এগিয়ে দেন। ইমাম হাসান (রা) বহু মাইল পথ সেই কাফেলার সাথে চলেন। হিজরী ৩৬ সনের ১লা রজব শনিবার উম্মূল মুমিনীর বসরা থেকে যাত্রা করেন।২২৩ যাত্রাকালে জনগণকে তিনি বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম, একজন নারীর তার জামাইদের সাথে যে রকম সম্পর্ক থাকে, তাছাড়া অন্য কোন বিদ্বেষমূলক সম্পর্ক তাঁর (‘আলী) ও আমার মধ্যে অুীতে ছিল না। আমার জানা মতে তিনি সৎ লোকদের একজন।’ জবাবে ‘আলী (রা) বলেনঃ ‘ওহে জনমন্ডলী! তিনি সত্য বলেছেন। আমার ও তাঁর মাঝে কোন রেষারেষি নেই। তিনি আপনাদের নবীর স্ত্রী- দুনিয়া ও আখিরাতে।২২৪

হিজরী ৩৬ সনের ১০ই জামাদি-উস-সানী বৃহস্পতিবার ভোর থেকে আসর পর্যমত্ম উটের যুদ্ধ হয়।২৩২ এ যুদ্ধে আহতের সংখ্যা অসণিত। নিহতের সংখ্যা কত, সে ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। ইবনুল ইমাম-আল-হাম্বালী তাঁর ‘শাজারাতুজ জাহাব’ গ্রন্থে তেত্রিশ জাহার, মহামত্মরে সতেরো হাজার উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনুল আসীরসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিক দশ হাজার উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অর্ধেক আলীর (রা) ও অর্ধেক ‘আয়িশার (রা) পক্ষের। ইবনুল আসীর আরো উল্লেখ করেছেন’ একমাত্র বনু দাববার এক হাজার লোক নিহত হয় এবং উটের পাশেই শুধু বনী আদীর সত্তর (৭০) ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়।২৩৩ এই যুদ্ধে ইসলামের এমন অনেক বীর পুরুষ শাহাদাত বরণ করেন, যাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ হাতে গড়ে তোলেন এবং যারা ছিলেন ইসলামের অতি পরীক্ষিত সমত্মান। তালাহ (রা), যুবাইর (রা) প্রমুখ তাঁদের অন্যতম। তাঁদের মৃত্যুতে মুসলিম উম্মাহর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল।

রণক্ষেত্রে হযরত ‘আয়িশার (রা) উট বসে যাওয়ার পর হযরত ‘আলী (রা) একজন ঘোষককে এই ঘোষণা দানের নির্দেশ দেনঃ ‘কেউ কোন পলায়ণাকারীকে ধাওয়া করবে না, কোন আহত সৈনিকের মালামাল লুট করবেনা এবং কোন সৈনিক কোন গৃহে প্রবেশ করবে। বিশেষতঃ নারীদের ব্যাপারে তিনি নির্দেশ দেন এভাবেঃ২৩৪

আরবি লেখা হবে

-‘তোমরা অবশ্যই কারো ইজ্জ্ত-আবরু উন্মুক্ত করবেনা, কোন গৃহে প্রবেশ করবেনা, কোন নারীর উপর চড়াও হবে হবে না- যদিও সে তোমাদের মান-মর্যাদা, তোমাদের নেতা ও সৎ লোকদের নিয়ে উপহাস ও গালিগালাজ করে। নারীদের উপর হাত তুলতে (রাসূলুল্লাহর সা. সময়) আমাদেরকে নিষেধ করা হতো-যখন সেই নারীরা ছিল মুশরিক। তাহলে এখন এই মুসলিম নারীদের উপর হাত তোলা যায় কিভাবে?’

যুদ্ধ শেষে ‘আলী (রা) ময়দানে পড়ে থাকা লাশের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন এবং পরিচিত লাশের কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে তোক বা ‘আয়িশার (রা) পক্ষের-দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। তারপর উভয় পক্ষের সকল লাশ এক স্থানে জমা করার নির্দেশ দিলেন। তিনি ইমাম হয়ে সকলের যানাযার নামায পড়ালেন এবং বড় বড় কবর খুঁড়ে এক সাথে অনেকের দাফনের ব্যবস্থা করলেন। তিনি হযরত তালহা ইবন ‘উবাইদুল্লাহর (রা) লাশের কাছে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেনঃ

আরবি লেখা হবে

তারপর বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম! কোন কুরাইশকে এভাবে পড়ে থাকা আমি পছন্দ করতাম না।’ তারপর তিনি সৈনিকদের পরিত্যক্ত জিনিস সংগ্রহ করে বসরার মসজিদে জমা করার নির্দেশ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ‘শুধু অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া প্রত্যেকেই নিজ নিজ জিনিস সেখান থেকে নিয়ে যেতে পারে। অস্ত্র-শস্ত্র কোষাগারে জমা হবে।’২৩৫

যুদ্ধের পর হযরত ‘আয়িশা (রা) উভয় দলের কে কে নিহত হয়েছে তা জানতে চাইতেন। যখন বলা হতো অমুক নিহত হয়েছে, বলতেন- (আল্লাহ তার প্রতি করুণা করুন)। এই যুদ্ধে নিহতদের সর্ম্পকে হযরত ‘আলী (রা) বলেতেনঃ২৩৬

আরবি লিখতে হবে

-‘আমি অবশ্যই আশা করি এই লোকদের মধ্যে যার অমত্মর আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ছিল তারা সবকাই জান্নাতে যাবে।’

এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার যে, কিছু বিকৃতমনা মানুষের ধারণা, উটের যুদ্ধের মূল কারণ হলো, ‘আলীর (রা) এশটি পুরানো ক্ষোভ ও বিদ্বেষ। ইফকের ঘঁনায় ‘আলী (রা) রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন, ‘ধাপনি ইচ্ছা করলে তাঁকে পরিত্যাগ করতে পারেন’। মঃূলতঃ তখন থেকেই হযরত ‘আয়িশা (রা) ‘আলীর (রা) প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। আর তারই পরিণতি এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কিন্তু আমাদের সামনে হাদীস ও ইতিহাসের যে সকল তথ্য রয়েছে, তাতে এমন ধারণা পোষণের কোন অবকাশ নেই। এাঁ সম্পূর্ণ অমূলক ধারণা। ইহিহাসে এমন বহু তথ্য রয়েছে যাতে বিপরীত চিত্রটিই ফুটে ওঠে। দীর্ঘ হয়ে যাবে বিধায় এখানে আমরা তা উল্লেখ করলাম না। ইতিহাসের সকল তথ্য পর্যালোচনা ষড়যন্ত্রকারী ছাড়া উভয় পক্ষের সকলেই ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপরাধ। সংঘাত ও সংঘর্ষের করেননি। এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র পূর্ণমাত্রায় সফল হয়েছে।

হযরত ‘আলীর (রা) খিলাফতের সময়কাল ছিল মাত্র চার বছর। তারপর হযরত আমীর মু’য়াবিয়া (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী বিশ বছর যাবত

গোটা ইসলামী দুনিয়ার একক শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর খিলাফতকাল শেষ হওয়ার দুই বছর পূর্বে হযরত ‘আয়িশা (রা) ইনতিকাল করেন। হযরত মু’য়াবিয়ার (রা) শাসনকালে তিনি জীবনের আঠারোটি বছর অতিবাহিত করেন। দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নীরবে অতিবাহিত করেন।

একবার হযরত মু’য়াবিয়া (রা) মদীনায় আসেন এবং হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। ‘আয়িশা (রা) তাঁকে বলেন, তুমি এমন নিশ্চিমত্ম মনে একাকী আমার ঘরে এসে গেলে? এও তো সম্ভব ছিল যে, আমি কোন ঘাতককে দাঁড় করিয়ে রাখতাম এবং তুমি ঢোকার সাথে সাথে তোমার কল্লা কেটে ফেলতো। আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) বললেন, এটা দারুল আমান (নিরাপত্তার গৃহ), এখানে আপনি এমন কাজ করতে পারতেন না। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ঈমান অতর্কিত হত্যার শিকল। তারপর হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) প্রশ্ন করেন, আপনার সাথে আমার আচরণ কেমন হচ্ছে? বললেনঃ ভালো। তারপর মু’য়াবিয়া (রা) বলেন, তাহলে আমার ও বনু হাশিমের ব্যাপারটি ছেড়ে দিন, আল্লাহর দরবারে বুঝাপড়া হবে।২৩৭

হুজর ইবন ‘আদী (রা) একজন উঁচুসত্মরের সাহাবী, কূফায় ‘আলীর (রা) পক্ষাবলম্নকারীদের একজন অন্যতম নেতা। কিছু লোকের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কূফার গভর্নর আরো কিছু লোকের সাথে তাঁকে গ্রেফতার করে দামেশকে পাঠিয়ে দেন। হুজর ছিলেন কিন্দা গোত্রের লোক। তৎকালনি কূফা ছিল আরবের বড় বড় গোত্রের কেন্দ্রস্থল। সেখানে কিন্দা গোত্রের লোকদেরও বসবাস ছিল। কিন্তু কোন ব্যক্তিই হুজরকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলো না। অথচ সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সেই সময় হুজরের (রা) যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। তাবে তাঁর গ্রেফতারির খবরটি খিলাফতের প্রত্যেকটি অঞ্চলের প্রতিটি মানুষকে ব্যত্থিত ও ক্ষুব্ধ করে। আরবেন বিভিন্ন গোত্রের বহু নেতা তাঁর মুক্তির জন্য সুপারিশ করে, কিন্তু তা সবই প্রত্যাক্যাত হয়। এ খবর মদীনায় ‘আয়িশার (রা) নিকট পৌঁছালে তিনি সুপারিশের উদ্দেশ্যে একজন দূত পাঠান। দুঃখের বিষয় দূত পৌঁছার পূর্বেই হুজরের (রা) মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়ে যায়।২৩৮

পরে হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) যখন মদীনায় এসে হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে সাক্ষাত করেন, তখন তিনি সর্বপ্রথম হুজরের (রা) বিষয়টি উঠান। তিনি বলেনঃ মু’য়াবিয়া! হুজরের ব্যাপারে তোমার ধৈর্য্য ও বিচক্ষণতা কোথায় ছিল। তাঁকে হত্যার ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় করনি।’ মু‘য়াবিয়া জবাব দিলেনঃ ‘তার ব্যাপারে আমার কোন অপরাধ নেই। অপরাধ তাদের যারা তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে।’ অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) বলেন, ‘উম্মূল মুমিনীন! কোন সঠিক সিদ্ধামত্ম দানকারী ব্যাক্তি আমার কাছে ছিল না।’২৩৯ প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত মাসরূক (রহ) বর্ণনা করেন, হযরত ‘আয়িশা (রা) বলতেনঃ আল্লহর কসম! মু‘য়াবিয়া যদি বুঝতো কূফায় সাহস ও আত্নমর্যাদাবোধের কিছু অবশিষ্ট আছে তাহলে কখনও তাদের সামনে থেকে হুজরকে ধরে নিয়ে গিয়ে এভাবে হত্যা করতো না। কিন্তু কালিজা চিবানো হিন্দার২৪০ এই ছেলে ভালো করেই বুঝে গেছে, তখন সেই সব লোক চলে গেছেন। আল্লাহর কসম! কূফা ছিল সাহসী ও আত্নমর্যাদাবোধ সম্পন্ন আরব নেতাদের আবাসভূমি। লাবীদ (রা) যথাযর্থই বলেছেনঃ২৪১

আরবি লেখা হবে

‘‘সেই সব লোক চলে গেছেন- যাদের ছায়াতলে জীবন যাপন করা যায়। এখন এমন উত্তরাধিকারীদের আশ্রয়ে আছি যার চর্মরোগগ্রমত্ম উটের চর্মের মত।’’

‘তারা না কারো উপকারে আসে, আর না তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায়। তাদের সাথে যারা কথা বলে তাদের কেবল দোষ খোঁজা হয়।

ইরাক ও মিসরের কিছু লোক হযরত ‘উসমানের (রা) নিন্দা মন্দ করতো, তেমনিভাবে শামের অধিবাসীরা হযরত ‘আলীর (রা) শানে অশোভন কথা বলতো। আবার খারেজীরা উভয়কে খারাপ বলে জানতো। এ সকল দল ও উপদলের অবস্থা হযরত ‘আয়িশা (রা) জানতে পেরে বলেন, কুরআনে আল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের জন্য রহমত ও মাগফিরাত কামনা করে দু‘আ করতে বলেছেন, আর এই লোকেরা তাঁদেরকে গালি দেয়।২৪২

খারেজীরা হযরত ‘আলীর (রা) দল থেকে পৃথক হয়ে সর্বপ্রথম ‘হারূর’ নামক স্থানে সমবেত হয়। এ কারণে তাদেরকে ‘হারূরিয়্যা’ বল হয়। একবার এক মহিলা হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে প্রশ্ন করলোঃ আচ্ছা, মেয়েদের বিশেষ কিছু দিনের রোযার মত নামায কেন কাজা করতে হবে না? আয়িশা (রা) অত্যমত্ম রাগের সাথে বললেনঃ ‘তুমি কি হারূরিয়্যা!২৪৩ একথা দ্বারা হারূরিয়্যাদের প্রতি তাঁর ঘৃণার অভিব্যাক্তি ঘটেছে।

একবার হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) হযরত ‘আয়িশাকে (রা) একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিতে অনুরোধ করলেন তাঁকে কিছু উপদেশ দানের জন্য। হযরত ‘আয়িশা (রা) জবাবে লিখলেনঃ ‘সালামুন ‘আলাইকু! অতঃপর আমি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেতে শুনেছি, যে ব্যাক্তি মানুষের সন্তুষ্টির পরোয়া না করে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবে, আল্লাহ তাকে মানুষের অসন্তুষ্টির পরিণতি থেকে রক্ষা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি চাইবে, আল্লাহ তাকে মানুষের হাতে ছেড়ে দেবেন। ওয়াস সালামু ‘আলাইকা।’২৪৪

হযরত মু‘য়াবিয়া (রা) জীবনের শেষ পর্যায়ে ছেলে ইয়াযিদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতে চান। তাঁর পক্ষ থেকে মারওয়ান তখন মদীনার গভর্নর। মসজিদে জনসমাবেশে তিনি ইয়াযিদের নাম উত্থাপন করেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাই ‘আবদুর রহমান ইবন আবী বকর (রা) উছে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। সাথে সাথে মারওয়ান তাঁকে গ্রেফতার করতে চাইলেন। ‘আবদুর রহমান দৌঁড়ে বোন ‘আয়িশার (রা) ঘরে ঢুকে যান। মারওয়ান ভিতরে ঢোকার সাহস করলেন না। তিনি ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললেন, এতা সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে নাযিল হয়েছে কুরআনের এ আয়াতঃ

আরবি হবে

-‘আর যে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে বলে ধিক্ তোমাদেরকে।’

পর্দার অমত্মরাল থেকে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলে ওঠেন, আমার নির্দোষিতা ঘোষণার আয়াত ছাড়া আমাদের সম্পর্কে আল্লাহ আর কোন আয়াত নাযিল করেননি।২৪৫ এই প্রতিবাদ দ্বারা বুঝা যায়, তাঁরা ভাই-বোন ইয়াযিদের মনোনয়ন সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেননি। হিজরী ৪৯ সনে হযরত আমীর মু‘য়াবিয়ার (রা) হুজরায় ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবু বকর (রা) ও ‘ুমার ফারুককে (রা) দাফন করা হয়েছে। সেখানে এক কোণে একটি কবর হতে পারে এমন কিছু স্থান খালি ছিল। মৃত্যুর পূর্বে হযরত হাসান (রা) চোট ভাই হযরত ইমাম হুসাইনকে (রা) অসীয়াত করে যান যে, ঐ শূন্য স্থানে তাঁকে দাফন করবে। তাতে যদি কেউ বাধা দেয় তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষে যাবেনা। সাধারণ মুসলমানদের গোরসত্মানে দাফন করবে। হযরত ইমাম হুসাইন যখন বড় ভাইয়ের অসীয়াত বাসত্মবায়ন করতে চাইলেন, হযরত ‘আয়িশা (রা) খুশী মনে অনুমতি দিলেন। হযরত মু‘য়াবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে সে সময় সা’ঈদ ইবনুল ‘আসী মদীনার গর্ভনর ছিলেন, তিনিও কোন বাধা দিলেন না। কিন্তু মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁর কিছু সহযোগীকে নিয়ে শক্তভাবে বাধা দিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যখন হযরত ‘উসমানকে (রা) বিদ্রোহীরা এখানে দাফন করতে দেয়নি তখন আর কেউ অনুমতি পেতে পারে না। হযরত ইমান হুসাইনের (রা) পক্ষে বনু হাশিম এবং মারওয়ানের পক্ষে বনু উমাইয়্যা অস্ত্রহাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। অরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উপক্রম হলো। হযরত আবু হুরাইরা (রা) বিচলিত হয়ে পড়লেন।

তিনি আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা চালালেন। তিনি মারওয়ানকে বললেন, নাতি যদি তার নানার পাশে দাফন হওয়ার ইচ্ছা করে তাতে তুমি নাক গলাতে যাবে কেন। অন্যদিকে ইমাম হুসাইনকে (রা) বললেন, মরহুম ইমামের এটাও অসীয়াত ছিল বাধা আসে তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষে যাবেনা। যাই তোক, হযরত ইমাম হুসাইন (রা) ধৈর্য ধারণ করেন এবং ভাইয়ের লাশ ‘জান্নাতুল বাকীতে তাঁদের মা হযরত ফাতিমাতুয যাহরার (রা) কবরের পাশে দাফন করেন।২৪৬ এ সম্পর্কে ইবন ‘আবদিল বার তাঁর ‘আল-ইসতি‘য়াব’ গ্রন্থে, ইবনুল আসীর ‘উসুদুল গাবা’ গ্রন্থে এবং আল্লামা সুয়ুতী ‘তারীখুল খুলাফা’ গ্রন্থে একই ভাষায় একটি বর্ণনাটি এখানে উপস্থাপন করা হলোঃ২৪৭

-ইমাম হাসান (রা) বলেছেন, ‘আমি ‘আয়িশার (রা) কাছে আবেদন করেছিলাম, আমাকে আপনার ঘরে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে দাফন হওয়ার সুযোগ দিবেন। তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি জানিনে, এ অনুমতি তিনি লজ্জায় পড়ে দিয়েছিলেন কিনা। আমার মৃত্যুর পর তাঁর কাছে আবার অনুমতি চাইবে। যদি তিনি হৃষ্টচিত্তে অনুমতি দেন তাহলে দাফন করবে। আমার মনে হচ্ছে, লোকেরা তোমাদের বাধা দেবে। যদি তারা সত্যিই এমন করে তাহলে এই ব্যাপার নিয়ে তাদের সাথে সংঘাত-সংঘর্ষে যাবে না। আমাকে বাকী’ গোরসত্মানে দাফন করবে। হযরত হাসান (রা) ইনতিকাল করার পর হযরত হুসাইন (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, হাঁ, আমি সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি দিচ্ছি। ব্যাপারটি মারওয়ানের কানে গেলে বললেনঃ হুসাইন ও ‘আয়িশা দুইজনই মিথ্যা বলছে। হাসানকে কখনো সেখানে দাফন করা যেতে পারে না। ‘উসমানকে তারা গোরসত্মানে পর্যমত্ম দাফন করতে দেয়নি। আর এখন তারা হাসানকে ‘আয়িশার ঘরে দাফন করতে চায়।’

ওফাত

হযরত ‘আয়িশা (রা) হিজরী ৫৮ সনের ১৭ রমযান মুতাবিক ১৩ জুন ৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে ৬৬ বছর বয়সে মদীনায় ইনতিকাল করেন। তখন হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) খিলাফতকালের শেষ পর্যায়। মৃত্যুর পূর্বে কিছুকাল রোগগ্রসত্ম অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। অসংখ্য মানুষ সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে দরজায় ভিড় করতো। কেউ কুশল জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ভালো আছি।২৪৮ এ সময় একদিন হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) সাক্ষাতের অনুমতি চান। হযরত ‘আয়িশা (রা) এ কথা চিমত্মা করে তাঁকে সাক্ষাৎ দানে ইতসত্মত করতে থাকেন যে, তিনি হয়তো এসেই তাঁর প্রশংসা শুরু করে দেবেন। কিন্তু বোনের ছেলেরা তাঁকে বুঝান যে, আপনি হচ্ছেন উম্মূল মুমিনীন, আর তিনি হচ্ছেন ইবন ‘আববাস। আপনাকে সালাম এবং বিদায় জানাতে এসেছেন। তখন বললেন, তোমরা যদি চাও, ডেকে আন। হযরত ইবন ‘আববাসকে (রা) ডাকা হলো। উম্মূল মুমিনীনের ধারণা সত্য হলো। ইবন ‘আববাস (রা) বসার সাথে সাথে বলতে শুরু করলেন, ‘সেই আদিকাল থেকেই আপনার নাম উনমূল মু’মিনীন ছিল। আপনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রিয়তমা স্ত্রী। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আপনার দেহ থেকে প্রাণটি বের হয়ে যাওয়ার সময়টুকু শুধু অপেক্ষা। যে রাতে আপনার হারটি হারিয়ে যায়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পানি তালাশ করেন এবং লোকেরা পানি পেলনা, তখন আপনারই কারণে আল্লাহ তা’য়ালা তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল করেছেন। আপনার নির্দোষিতা ও দোষ মুক্তির কথা জিবরীল আমীন (আ) আসমান থেকে নিয়ে এসছেন। এসব আয়াত কিয়ামত পর্যমত্ম প্রতিটি মসজিদে পাঠ করা হবে। এতটুকু শোনার পর তিনি বলেনঃ ইবন ‘আববাস, আমাকে আপনি এই প্রশংসা থেকে মাফ করুণ। আমার তো এটাই পছন্দ ছিল যে, আমার যদি অসিত্মত্বই না হতো।২৪৯

মৃত্যুর পূর্বে অসীয়াত করে যান যে, আমাকে জান্নাতুল বাকীহতে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য স্ত্রীদের সাথে দাফন করবে। মৃত্যু যদি রাতের বেলায় হয় তাহলে রাতেই দাফন করে দিবে। তাঁর ওফাত হয় রাতে বিতর নামাযের পরে। সুতরাং তখনই তাঁকে অসীয়াত মত জান্নাতুল  বাকী’তে দাফন করা হয়। তাঁর ওফাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মদীনায় কান্নার রোল পড়ে যায়। আনসাররা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। জানাযায় এত লোকের সমাগম হয় যে, রাতের বেলা এত জনসমাগম পূর্বে আর কখনও দেখা যায়নি বলে লোকেরা বর্ণনা করেছে। কনো কোন বর্ণনায় এসেছে যে, মহিলাদের ভিড় দেখে ঈদের দিন বলে মনে হচ্ছিল। হযরত উম্মু সালামা (রা) কান্নার আওরায শুনে বলেনঃ ‘আয়িশার (রা) জন্য জান্না অপরিহার্য। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) ছিলেন তখন মদীনার গভর্নর। তিনি জানাযার নামায পড়ান। কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন আবী বকর (রা), ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আবদির রহমান ইবন আবী বকর, ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আতীক, ‘উরওয়া ইবন যুবাইর (রা) এবং ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা)-ভাই ও বোনের এই ছেলেরা তাঁকে কবরে নামান। তাঁর অসিত্মম অসীয়াত অনুযায়ী জান্নাতুল বাকী’ গোরসত্মানে তাঁকে দাফন করা হয়।২৫০

উম্মূল মুমিনীনের ইনতিকালে প্রতিটি মুসলমান গভীরভাবে শোকাভিভূত হন। প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত মাসরূক (রহ) বলেন, আমার যদি একটি কথা স্মরণ না হতো, আমি উম্মূল মুমিনীনের জন্য মাতমের মাজমা’ বসাতাম। ‘উবাইদ ইবন ‘উমাইর এক ব্যাক্তিকে প্রশ্ন করেন, হযরত ‘আয়িশার (রা) মৃত্যুতে করা দুঃখ পান? লোকটি জবাব দেয়, তিনি যাদের মা ছিলেন তারা সবাই দুঃখ পায়। এ সকল কথা ইবন সা’ত বর্ণনা করেছেন।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) কোন সমত্মান জন্মদান করেননি। বোন হযরত আসমার (রা) ছেলে হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরকে (রা) নিজের ছেলেন মত লালন পালন করেন। ‘আবদুল্লাহও মায়ের মত খালাকে ভালোবাসতেন। হিজরাতের পরে মদীনায় মুহাজিরদের ঘরে সর্বপ্রথম এই ‘আবদুল্লাহর জন্ম। মদীনার কাফির-মুনাফিকরা বলাবলি করতো যে, মুসলিম নারীরা মদীনায় এসে বন্ধ্যা হয়ে গেছে। এমনি এক সময়ে তাঁর জন্ম হলে মুসলিমদের মধ্যে খুশীর জোয়ার বয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খেজুর চিবিয়ে নিজ হাতে তার গালে দিয়ে ‘তাহনীক’ করেন। এই ‘আবদুল্লাহকে হযরত ‘আয়িশা (রা) ছেলে হিসেবে মানুষ করেন। এক আনসারী মেয়েকে লালন-পালন করে তিনি বিয়ে দেন বলে হাদীসে উল্লেখ আছে।২৫১ তাছাড়া মাসরূক ইবন আজদা’ ‘উমরা বিনত ‘আয়িশা বিনত তালহা, ‘উমরা বিনত ‘আবদির রহমান আনসারিয়্যা, আসমা বিনত ‘আবদির রহমান ইবন আবী বকর, ‘উরওয়া ইবন যুবাইর, কাসিম ইবন মুহাম্মদ ও তাঁর ভাই, ‘আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযিদ ও আরো অনেক ছেলে-মেয়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হয়। মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের (রা) মেয়েদেরকে তিনিই লালন পালন করে বিয়ে শাদী দেন।২৫২

দৈহিক আকৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছেদ

হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন খুব দ্রুত বেড়ে ওঠা মেয়েদের একজন। নয়-দশ বছর বয়সে তিনি বেশ বেড়ে উঠেছিলেন।২৫৩ ছোটবেলায় একেবারেই হালকা-হাতলা ছিলেন। কিছু বয়স হলে শরীর কিছুটা ভারী হয়ে যায়।২৫৪ গায়ের বর্ণ ছিল সাদা লালের মিম্রণ। উজ্জ্বল চেহারা ও সৌন্দর্যের অদিকারিণী ছিলেন। এ কারণে আল-হুমায়রা বলা হতো।২৫৫

মিতব্যয়িতা ও অল্পেতুষ্টির কারণে মাত্র এক জোড়া পরিধেয় বস্ত্র রাখতেন। তাই একখানা ধুয়ে অন্যখানা পারতেন।২৫৬ একটি জামা ছিল, যার মূল্য পাঁচ দিরহামের মত হবে। কিন্তু তা সেই আমলে এত মূল্যবান ছিল যে, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে কনেকে সাজানোর জন্য চেয়ে নেওয়া হতো।২৫৭ কখনো কখানো জাফরান দিয়ে রাং করা কাপড় পড়তেন, আবার মাঝে মধ্যে অলঙ্গাকও পরতেন। ইয়ামনের তৈরি সাদা-কালো মোতির একটি বিশেষ ধরনের হার গলায় পরতেন। আঙ্গুলে সোনার আংটি পরতেন।২৫৮ কাসিম ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন, ‘আমি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) ইহরাম অবস্থায় সোনার আংটি এবং হলুদ বর্ণের পোশাক পরতে দেখেছি।’ মাঝে মাঝে একটি রেশমী চাঁদরও ব্যবহার করতেন। পরে সেটি ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরকে দান করেন।২৫৯

পোশাকে ব্যাপারে শরীয়াতের বিধিবিধানের প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। একবার ভাতিজী হাফসা বিনত ‘আবিদর রহমান মাথায় একটি পাতলা ওড়না দিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। তিনি সেটা নিয়ে ফেঁড়ে ফেলেন এবং বলেন, তুমি জান না, আল্লাহ তা’য়ালা সূরা নূর-এ কি বলেছেন। তারপর একটি পুরু ওড়না আনিয়ে তাকে দেন।২৬০ একবার তিনি এক বাড়িতে মেহমান হিসাবে অবসত্মান করেন। গৃহকর্তার বাড়মত্ম বয়সের দুইটি মেয়ে ছিল। তিনি দেখলেন, চাঁদর ছাড়াই তারা নামায পড়ছে। তিনি তাকিদ দিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে আর কোন মেয়ে চাদর ছাড়া নামাড না পড়ে।২৬১

অভ্যাস ও চারিত্রিক গুণাবলী

উম্মূল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) শৈশব থেকে যৌবন পর্যমত্ম সময়কাল এমন এক পবিত্র ব্যাক্তি-সত্তার সাহচর্যে কাটে, এই ধরাধামে যাঁর আগমন ঘটেছিল মহোত্তম নৈতিকতার পূর্ণতা বিধানের জন্য। এই সাহচর্য তাঁকে নৈতিকতার এমন আদর্শ সত্মরে পৌঁছে দেয় যা আধ্যাত্নিক উন্নতির চূড়ামত্ম পর্যায় বলে বিবেচিত। সুতরাং তাঁর নৈতিকতার মান ছিল অতি উঁচুতে। তাঁর হৃদয় ছিল অতি প্রশসত্ম। তাছাড়া তিনি ছিলেন দানশীল, মিতব্যয়ী, ইবাদাতকারিণী এবং দয়াময়ী।

নারী ও অল্পেতুষ্টি-এ যেন পরস্পরবিরোী দুইটি বিষয়। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি দোযখে সবচেয়ে বেশি মহিলাদেরকে দেখেছি। এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলো। বললেন, স্বামীদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা এর কারণ। তবে হযরত ‘আয়িশার (রা) সত্তায় এই দুইটি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁর বৈবাহিক জীবন প্রচন্ড অভাব ও দারিদ্রের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন, কিন্তু কখনো অভিযোগের একটি বর্ণও জিহবায় আনেননি। সুন্দর সুন্দর পোশাক, মূল্যবান অলঙ্কার, আলীশান ইমারাত, মুখরোচক খাদ্য সামগ্রী-এর কোন কিচুই তিনি স্বামীর ঘরে পাননি। অথচ তিনি প্রতক্ষ্য করেছেন যে, গণীমাতের অর্থ-সম্পদ প্লাবনের মত একদিকে আসেছে আর অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও তা থেকে ছিু পাওয়ার বিন্দুমাত্র লোভ ও ইচ্ছা কখনো তাঁকে পেয়ে বসেনি। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পরে একবার তিনি খাবার আনতে বলেন। তারপর বলেন, কখনো আমি পেট ভরে খাইনে। যাতে আমার কান্না না পায়। তাঁর এক শাগরিদ জিজ্ঞেস করলো, কেন? বললেন, আমার সেই অবস্থায় কথা মনে পড়ে যায়, যে অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। আল্লাহর কসম!দিনে দুইবার কখনো তিনি পেট ভরে রুটি ও গোশত খাননি!

আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে সমত্মান থেকে মাহরুম করেছিলেন। তবে তিনি সাধারণ মুসলমিদের সমত্মানদেরকে, বিশেষতঃ ইয়াতীমদেরকে এসে প্রতিপালন করতেন। তাদেরকে শিক্ষা দিতেন এবং তাদের বিয়ে-শাদী দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন।

স্বামী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণমাত্রায় আনুগত্য করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টাই ছিল হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রতি মুহূর্তের চিমত্মা ও কাজ। তাঁর চেহারা সামান্য মলিন ও বিমর্ষ দেখলে তিনি অসিত্মর হয়ে পড়তেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আত্নীয়-স্বজনদের প্রতি এত যত্নবান ছিলেন যে তাঁদের কোন কথা উপেক্ষা করতেন না। একবার বোনের ছেলে ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর খালার সীমাহীন দানশীলতা দেখে শংকিত হয়ে পড়েন এবং বলেন, এখন তাঁর হাত থামানো দরকার। এ কথায় হযরত ‘আয়িশা (রা) এতই রেগে যান যে, ‘আবদুল্লাহর সাথে কথা না বলার কসম করে বসেন। কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাতুল গোত্রের লোকেরা সুপারিশ করলো তখন তিনি আর প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না।২৬২ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বন্ধুদেরকেও তিনি অতি সমাদর ও সম্মান করতেন এবং তাঁদের কোন কথাও উপেক্ষা করতেন না। যথাসম্ভব কারো কোন হাদিয়া-তোহফা ফিরিয়ে দিতেন না।

মুহাম্মদ ইবন আশ’য়াস (রা) ছিলেন একজন সাহাবী। একবার তিনি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) একটি পোসত্মীন (চামড়ার তৈরি জামা) হাদিয়া দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বলেন, এটি গরম, আপনি পরবেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) গ্রহণ করতে রাজি হন এবং প্রায়ই সেটি পরতেন।২৬৩

আয়াতে হিজাব নাযিলের পর থেকে কঠোরভাবে পর্দা পালন করতেন। ইসহাক নামে একজন অন্ধ তাবে’ঈ ছিলেন। একবার তিনি এলেন দেখা করতে। হযরত ‘আয়িশা (রা) পর্দা করলেন। ইসহাক বললেন, আপনি আমার থেকে পর্দা করছেন! আমি তো আপনাকে দেখতে পাইনে। তিনি বললেন, তুমি আমাকে দেখতে পাওনা তাতে কি হয়েছে, আমি তো আমাকে দেখতে পাচ্ছি।২৬৪ একবার হজ্জের সময় অন্য মহিলারা বললেন, উম্মূল মুমিনীন! চলুন, হাজারে আসওয়াদে চুমু দেবেন। বললেনঃ তোমরা যেতে পার। আমি পুরুষদের ভিরেড় মধ্যে যেতে পারিনে।২৬৫ কখনও দিনের বেলায় তাওয়াফের প্রয়োজন হলে ক’বার চত্বর থেকে পুরুষদের সরিয়ে দেওয়া হতো। ২৬৬ শরীয়াতে মৃতদের থেকে পর্দার হুকুম নেই। কিন্তু তিনি এ ব্যাপরেও অতিমাত্রার সতর্ক ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাশে ‘উমারকে (রা) দাফন করার পর, সেখানে পর্দা ছাড়া যেতেন না।

হযরত ‘আয়িশা (রা) কক্ষণো কারো গীবত করতেন না বা কালো সম্পর্কে কোন অশোভন উক্তিও না। তাঁর বহু কথা হাদীসের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তার একটিতেও কোন মানুষের প্রতি খারাপ উক্তি বা কারো সম্মানহানি ঘটে এমন একটি কথাও পাওয়া যায় না। সতীনের নিন্দামন্দ করা নারীদের অনেকেরই স্বভাব। কিন্তু তিনি সতীনদের কেমন উদারচিত্তে প্রশংসা করতেন তা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। কবি হযরত হাসসান ইবন (রা), যিনি ইফ্ক-এর এর ঘটনায় জড়িয়ে হযরত ‘আয়িশার (রা) দুঃখকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনিও হযরত ‘আয়িশার (রা) মজলিসে আসতেন এবং তিনি খুব হৃষ্টচিত্তে তাঁকে বসার অনুমিত দিতেন। একদিন হযরত হাসসান (রা) এসে তাঁর শানে রচিত একটি কাসীদা শুনাতে শুরু করেন। যার একটি শ্লোকের অর্থ ছির এরূপঃ

শ্লোকটি শুনতেই হযরত ‘আয়িশার (রা) বহু পূর্বের সেই ইফক-এর ঘটনা স্মরণ হলো। তারপর তিনি শুধু এতটুকু মমত্মব্য করলেন যে, ‘কিন্তু আপনি এমন নন।২৬৭ হযরত আয়িশার (রা) প্রিয়জনদের অনেকে তাঁর দরবারে হযরত হাসসানের (রা) এভাবে উপস্থিতি সহজে মেনে নিতে পারতেন না। তাঁরা অনেক সময় হাসসানকে (রা) কটু কথা শুনাতে চাইতেন কিন্তু হযরত ‘আয়িশা (রা) অত্যমত্ম শক্তবাবে নিষেধ করতেন। হযরত মাসরূক (রহ) বলেন, ‘একবার আমি উম্মূল মু’মিনীনকে বললাম, আপনি এভাবে তাঁকে আপনার কাছে আসার অনুমতি দেন কেন? বললেন, এখন সে অন্ধ হয়ে গেছে। আর অন্ধত্বের চেয়ে বড় শাসিত্ম আর কি হতে পারে। তাছাড়া সে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পক্ষ থেকে মক্কার পৌত্তলিক কবিদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জবাব দিত।’২৬৮

একবার এক ব্যক্তির আলোচনা চলছিল। প্রসঙ্গক্রমে হযরত ‘আয়িশা (রা) সেই ব্যক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা প্রকাশ করলেন না। লোকেরা বললোঃ উম্মূল মুমিনীন! সেই ব্যক্তি তো মারা গেছে। একথা শুনতেই তিনি তার মাগফিরাত কামনা করে দু’আ করতে শুরু করলেন। লোকেরা তখন বললো, আপনি তো এইমাত্র তাকে ভালো বলেন নি, আর এখন তার মাগফিরাত কামনা করে দু‘আ করছেন। জবাবে তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা মৃতদের সম্পর্কে শুধু ভালো কথাই বলবে।২৬৯

অহংকারের লেশমাত্র তাঁর মধ্যে ছিল না। নিজেকে অতি সাধারণ ও তুচ্ছ মনে করতেন। কেউ তাঁর মুখের উপর প্রশংসা করুক তা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। এ প্রসঙ্গে অমিত্মম শয্যায় হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাসের (রা) সাথে তাঁর আচরণটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। চূড়ামত্ম পর্যাযের বিনীয়ী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে আত্নমর্যাদবোধ ছিল পূর্ণমাত্রায়। তাই স্বামী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাঁর কোন কোন আচরণ প্রেয়সীর মান-অভিমানের রূপ নিত। যেমন, ইফক-এর ঘটনায় যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর নির্দোষ বিষয়ক আয়াত পাঠ করে শোনান এবং মা বলেন, মেয়ে স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তখন তিনি যে জবাব দেন, তাতে একদিকে প্রবল আত্নমর্যাদাবোধ প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রিয়তমের নিকট অভিমানের এক চমৎকার দৃশ্য ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু আমার পরোয়ারদিগারের শুকরিয়া আদায় করবো, অন্য কারো নয়-যিনি আমাকে আমার নির্দোষিতা ও পবিত্রতার ঘোষণা দিয়ে সম্মানিত করেছেন।২৭০ তাছাড়া আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, যখন তিনি স্বামীর প্রতি ক্ষুব্ধ হতেন তখন তাঁর নাম নিয়ে কসম খাওয়া ছেড়ে দিতেন। এ সবই ছিল প্রেয়সীর মান-অভিমানের এক অনুপম দৃশ্য।

আমরা তাঁর আত্নমর্যাদাবোধের চূড়ামত্ম রূপ দেখতে পাই অপর একটি ঘটনাঃয়। যে ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরকে (রা) তিনি মাতৃস্নেহে লালন পালন করেন, আর তিনিও খালা ‘আয়িশাকে (রা) মায়ের মত সম্মান ও সেবা করতেন। তিনি খালা সীমাহীন দানে হাত দেখে একবার মমত্মব্য করে বসেন, এখন তাঁর হাতে বাঁধা দেওয়া উচিত। তাঁর এমন মমত্মব্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) আত্নসম্মান বোধ আহত হয়। তিনি কসম খেয়ে বলেন, ভাগ্নের কোন জিনিসিই আরস্পর্শ করবেন না। ভাগ্নে ‘আবদুল্লাহ (রা) পড়ে গেলেন হমা বিপদেঃ। অবশেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সুপারিশ ও মধ্যস্থতায় তিনি সদয় হন।২৭১

হযরত ‘আয়িশার (রা) মধ্যে প্রবল আত্নমর্যদাবোধ ও ব্যক্তিত্বের সাথে সাথে তীক্ষ্ণ ন্যায়বোধও ছিল। একবার মিসরের এক ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। তিনি লোকটির নিকট জানতে চাইলেন, যুদ্ধের ময়দানে তথাকার তৎকালীন শাসকদের আচরণ তাদের সাথে কেমন হয়ে থাকে। লোকটি জবাবে বললেন, প্রতিবাদ করার মত তেমন কোন আচরণ তাঁদের দৃষ্টিতে পড়েনা। কারো উট মারা গেলে তিনি তাকে অন্য একটি উট দেন, কারো চাকর না থাকলে চাকর দেন, কারো খরচের অর্থের প্রয়োজন হলে তার সে প্রয়োজন পূরণ করেন। তাঁর এ জবাব শুনে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, মিসরবাসীরা আমার ভাই মুহাম্মদ ইবন আবী বকরের সাথে যত খারাপ আচরণ করুক না কেন, তাদের সেই খারাপ আচরণ তোমাদের কাছে আমাকে এ সত্য কথাটি বলতে বিরত রাখতে পারে না যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার এই ঘরের মধ্যেই দু‘আর করেছিলেন- ‘হে আল্লাহ! যে আমার উম্মাতের উপর কঠোরতা করে তুমিও তার উপর কঠোরতা কর, আর যে সদয় হবে, তুমিও তার প্রতি সদয় হও।২৭২

হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন দানের ক্ষেত্রে খুবই দরাজহসত্ম। অমত্মরটাও ছিল অতি উদার ও প্রশসত্ম। বোন হযরত আসমাও (রা) ছিলেন খুবই দানশীল। দুই বোনের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দানশীলতা। ‘আবদুল্লাহ ইবন যবাইর (রা) বলেন, তাঁদের দুইজনের চেয়ে বড় দানশীল ব্যক্তি আর কাকেও দেখিনি। তবে দুইজনের মধ্যে পার্থক্য এই ছিল যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) অল্প অল্প করে জমা করতেন। যখন কিছু জমা হয়ে যেত, তখন সব এক সাথে বিলিয়ে দিতেন। আর হযরত আসমার (রা) অবস্থা ছিল, হাতে কিছু এলে জমা করে রাখতেন না, সাথে সাথে বিলিয়ে দিতেন।২৭৩ অধিকাংশ সময় তিনি ঋণগ্রসত্মাকতেন। বিভিন্ন জরেন নিকট ককে ঋণ গ্রহণ করতেন। লোকেরা যখন বলতো, আপনার এত ঋণ করার প্রয়োজন কি? তিনি বলতেন, ঋণ পরিশোদের যার ইচ্ছা থাকে আল্লাহ তাতে সাহায্য করেন। আমি আল্লাহর এই সাহায্য তালাশ করি।২৭৪ তিনি দান-খয়রাতের ব্যাপারে কম-বেশির চিমত্মা করতেন না। হাতে যা কিছু থাকতো তাই দিয়ে দিতেন। একবার এক মহিলা ছোট ছোট দুই বাচ্চা কোলে করে এসে কিছু সাহায্য চায়। ঘটনাক্রমে সেই সময় তাদেরকে দেওয়ার মতে ঘরে কিছুই ছিল না। খুঁজে খুঁজে একটি মাত্র খেজুর পেলেন। সেটি দুই ভাগ করে বাচ্চা দুইটির হাতে দিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে এলে তাঁকে ঘটনাটি শুনালেন।২৭৫ আর একবার এক ভিক্ষুক এসে সাহায্য চাইলো। হযরত ‘আয়িশার (রা) সামনেই ছিল কিছু আঙ্গুরের দানা। সেখান কে তিনি একটি দানা নিয়ে ভিক্ষুকের হাতে তুলে দেন। ভিক্ষুক দানাটির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে দেখতে থাকে যে, একটি দানা কি কেউ কারো হাতে দেয়! তখন তিনি ভিক্ষুককে লক্ষ্য করে বলেন, দেখ, এই একটি দানারমধ্যে কত দানা রয়েছে।২৭৬ মূলত তিনি সূরা যিলযাল-এর এই আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেনঃ

আরবি হবে

অর্থাৎ, যে ব্যাক্তি একটি অণু পরিমাণ নেক কাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে।

হযরত ‘উরওয়া (রা) বর্ণনা করেন, একবার হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর সামনে পুরো সত্তর হাজার দিরহাম এক সাথে আল্লাহর রাসত্মায় দান করে দিয়ে চাঁদরের কোণা ঝেড়ে ফেলেন।২৭৭ হযরত আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) একবার এক লাখ দিরহাম হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট পাঠালেন। সন্ধ্যা হতে হতে একটি পয়াসও থাকলো না। সবই গরীব-মিসকনীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। ঘটনাক্রমে সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। দাসী বললো, ইফতারীর খাদ্য-সামগ্রী কেনার জন্য কিছু রেখে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বললেনঃ একা যদি আগে স্মরণ করিয়ে দিতে। এ রকম ঘটনা আরো আছে। একবার হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) বড় বড় দুইটি থলিতে ভরে এক লাখ দিরহাম পাঠালেন। তিনি সবগুলি একটি খাঞ্চায় ঢেলে বিলাতে শুরু করেন। সেদিও তিনি রোযা রেখেছিলেন। সন্ধ্যার সময় দাসীকে ইফতারী জন্য আনতে বলেন। দাসী বলেন, উম্মূল মু’মিনীন! এই অর্থ দিয়ে কিছু গোশত ইফতারের জন্য আনাতে পারতেন না? বললেন, এখন তিরস্কার কারো না। তখন কেন স্মরণ করে দাওনি?২৭৮ একদিন তিনি রোযা আছেন। ঘরে একটি রুটি ছাড়া কিছুই নেই। এমন সময় এক মহিলা ভিক্ষুক এসে কিছু খাবার চায়। তিনি দাসীকে বলেন রুটিটি তাকে দিয়ে দিতে। দাসী বলেন, রুটি দিয়ে দিলে সন্ধ্যায় ইফতার করবেন কি দিয়ে? বললেন, এখন রুটিটি দিয়ে দাও তো তারপর দেখা যাবে। সন্ধ্যার সময় কেউ একজন খাসীর গোশত পাঠালো। তিনি দাসীকে বললেন, এই দেখ, তোমার রুটির চেয়েও ভালো জিনিস আল্লাহ পাঠিয়েছেন।২৭৯ নিজের থাকার ঘরটি তিনি আমীর মু’য়াবিয়ার (রা) নিকট বিক্রি করে যে অর্থ পান তা সবই আল্লাহর রাসত্মায় বিলিয়ে দেন।২৮০

স্বভাবগতভাবেই হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী। তাঁর জীবনের বহু ঘটনায় এ সাহসিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাতে ঘুম থেকে জেড়ে একা একাই কবরসত্মানে চলে যেতেন।২৮১ যুদ্ধের ময়দানে এসে দাঁড়িয়ে যেতেন। উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনীতে অস্থিরতা বিরাজমান তখন তিনি পিঠে করে মশকভর্তি পানি নিয়ে আহত সৈনিকদের পান করিয়েছেন।২৮২ খন্দক যুদ্ধের সময় যখন পৌত্তলিক বাহিনী চতুর্দিক থেকে মদীনা ঘিরে রেখেছিল এবং নগরীর ভিতর থেকে ইহুদীদের আক্রমণের আশাঙ্খা ছিল তখনও তিনি নির্ভীক চিত্তে কিল্লা থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম মজাহিদদের যুদ্ধ কৌশল প্রত্যক্ষ করতেন।২৮৩ একবার তো তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জিহাদে গমনের অনুমতি চেয়েই বসেন; কিন্তু অনুমতি পাননি।২৮৪ উটের যুদ্ধে তিনি যে দক্ষতার সাথে সৈন্য পরিচালনা করেন, তাতে তার স্বভাবগত সাহসিকতার চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অমত্মরে ছিল তীব্র আল্লাহ-ভীতি। অমত্মরটিও ছিল অতি কোমল। খুব তাড়াতাড়ি কাঁদতে শুরু করতেন। বিদায় হজ্জের সময় যখন নারী প্রকৃতির কারণে হজ্জের কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারলেন না তখন নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিমত্মা করে অকুলভাবে কান্না শুরু করেন। পরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সান্ত্বনায় স্থির হন।২৮৫ একবার তো দাজ্জালের ভয়ে অস্থির হয়ে কাঁদতে থাকেন।২৮৬ পরবর্তী জীবনে যখনই উটের যুদ্ধের কথা স্মরণ হতো, অসিত্মর হয়ে কাঁদতেন।

একবার কোন একটি কথার উপর কসম করে বসেন। পরে মানুষের পীড়াপীড়িতে কসম ভাংতে বাধ্য হন এবং কাফফরা হিসেবে ৪০টি দাস মুক্ত করেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর হৃদয়ে এত গভীর ছাপ ফেলে যে, যখনই স্মরণ হতো চোখের পানি মুছতে মুছতে আঁচল ভিজে যেত।২৮৭ আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ইফকের ঘটনায় তিনি মুনাফিকদের দোষারোপের কথা জানতে পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পিতামাতার সান্ত্বনা দান সত্ত্বেও চোখের পানি বন্ধ হচ্ছিল না।

একবার এক দরিদ্র মহিলা তার দুইটি ছোট্ট শিশুসমত্মান নিয়ে কিছু সাহায্যের আশা হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট আসে। তখন ঘরে তেমন কিছু ছিল না। তিনি তিনটি খেজুর মহিলার হাতে দেন। মহিলা একটি করে খেজুর তার দুই সমত্মানের হাতে এবং একটি নিজের মুখে দেয়। সমত্মান দুইটি নিজেদের খেজুর খেয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। তখন মহিলা নিজের মুখ থেকে খেজুর বের করে দুই ভাগ করে দুই সমত্মানের মুখে দেয়। নিজে কিছুই খেল না। তিনি মাতৃস্নেহের এমন দুঃখজনক দৃশ্য এবং তার অসহায় অবস্থা দেখে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।২৮৮

রাত-দিনের বেশিরভাগ সময় ইবাদাতে নিমগ্ন াকতেন। চাশতের নামায নিয়মিত পড়তেন। বলতেন, আমার আববাও যদি কবর থেকে উঠে এসে এ নামায পড়তে বারণ করেন তুবুও আমি ছাড়বো না।২৮৯ রাতে ঘুম থেকে জেগে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের পরও এই নামাযের এত পাবন্দ ছিলেন যে, সকাল সকাল উঠে ফজরের নামাযের পূর্বে পড়ে নিতেন। একদিন তিনি এ নামায আদায় করছেন, এমন সময় ভাতিজা কাসেম এসে উপস্থিত হন। তিনি প্রশ্ন করেনঃ ফুফু এ আপনি কোন নামায পড়ছেন? বললেনঃ রাতে আমি পড়তে পারিনি; কিন্তু এখন আমি ছেড়ে দিতে পারিনে।২৯০

তিনি বছরের অধিকাংশ সময় রোযা রাখতেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তিনি সর্বদা রোযা অবস্থায় থাকতেন।২৯১ একবার গরমকালে আরাফাতের দিনে রোযা রাখেন। গরম ও সূর্যের তাপ এত তীব্র ছিল যে, মাথায় পানির ছিটে দেওয়া হচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে তাঁর ভাই ‘আবদুর রহমান (রা) ছিলেন, এই প্রচন্ড গরমে রোযা রাখার এত কি দরকার। ইফতার করে ফেলুন। বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ থেকে শুনেছি যে, আরাফাতের দিনে রোযা রাখলে সারা বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তারপরেও আমি রোযা ভেঙ্গে ফেলবো?২৯২

অত্যমত্ম কঠোরভাবে হজ্জের পাবন্দ ছিলেন। এমন বছর খুব কমই যেত, যাতে তিনি হজ্জ আদায় করতেন না। খলীফা হযরত ‘উমার (রা) তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে হযরত ‘উসমান (রা) ও ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আওফকে (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহধর্মিণীদের সাথে হজ্জে পাঠান।২৯৩ হজ্জের সময় তাঁদের অবস্থানে স্থানসমূহ নির্দিষ্ট ছিল। প্রথমে ওয়াদিনামির-এর শেষ প্রামেত্ম অবস্থান করতেন। সেখানে যখন মানুষের ভিড় হতে লাগলো তখন তার থেকে একটি দূরে আরাফ নামক স্থানে তাবু স্থাপন করতেন। কোনবার ‘জাবালে সাবীর’-এর পাদদেশে অবস্থান নিতেন। আরাফাতের দিন রোযা রাখতেন। মানুষ যখন আরাফা ছেড়ে চলতে শুরু করতো, তখন তিনি ইফতার করতেন।২৯৪

দাস-দাসীদের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। তিনি সুযোগ পেলেই নানা অজুহাতে দাস মুক্ত করতেন। একবার তো একটি মাত্র কসমের কাফফারায় চল্লিশজন দাস মুক্ত করে দেন। তাঁর মুক্ত করা দাস-দাসীর সংখ্যা সর্বমোট ৬৭ (সাতষট্টি) জন।২৯৫ তামীম গোত্রের একটি দাসী ছিল তাঁর। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখে তিনি শুনতে পান যে, এই গোত্রটি হযরত ইসমাঈলের (আ) বংশধর। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইঙ্গিতে তিনি দাসীটিকে মুক্ত করে দেন। মদীনায় বুরায়রা নাম্মী এক দাসী ছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্তি লাভের ব্যাপারে তাঁর মনিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। তারপর তিনি মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে থাকেন। সে কথা হযরত ‘আয়িশার (রা) কানে গেলে তিনি একাই সব অর্থ পরিশোধ করে তাঁকে মুক্ত করে দেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। লোকেরা বলতে লাগলো, কেউ হয়তো জাদু-টোনা করেছে। তিনি এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জাদু করেছো? সে স্বীকার করলো। তিনি আবার পশ্ন করলেনঃ কেন? দাসীটি বললোঃ যাতে আপনি তাড়াতাড়ি মারা যান, আর আমি মুক্ত হই। হযরত ‘আয়িশা (রা) নির্দেশ দেনঃ তাকে একটি মন্দ লোকের নিকট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে একটি দাস ক্রয় করে মুক্ত করে দাও। তাঁর এ নির্দেশ কাযকরী করা হয়।২৯৬ মুসতাদরিকে হাকেম-এর আত-তিবব অধ্যায়ে এসেছে যে, দাসীকে এ শামিত্ম তিনি দিয়েছিলেন তার শরীয়াতবিরোধী কাজে জন্য।

দরিদ্র ও অভাবগ্রসত্মদের সাহায্য তাদের মর্যাদা অনুযায়ী করা উচিত। হযরত ‘আয়িশা (রা) সর্বদা এদিকে দৃষ্টি রাখতেন। একবার একজন সাধারণ ভিক্ষুক তাঁর নিকট আসলো। তিনি তাকে এক টুকরো রুটি দিয়ে বিদায় করলেন। তারপর একটু ভালো কাপড়-চোপড় পরা একজন ভিক্ষুক আসলো। তাকে দেখে একজন মর্যাদাবান মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। তিনি লোকটিকে বসিয়ে আহার করিয়ে বিদায় দেন। উপস্থিত লোকেরা দুইজন ভিক্ষুকের সাথে দুই রকম আচরণের কারণ জানতে চাইলো। বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, মানুষের সাথে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ করা উচিত।২৯৭

শরীয়াতের অতি সাধারণ আদেশ-নিষেধের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। ছোট ছোট নিষিদ্ধ কাজও এড়িয়ে চলতেন। পথ চলতে যদি ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত, সাথে সাথে থেমে যেতেন, যাতে কানে যায়।২৯৮ তাঁর একটি বাড়ীতে একজন ভাড়াটিয়া ছিল। সে দাবা খেলতো। তিনি তাকে বলে দেন, যদি এ কাজ থেকে বিরত না হও, ঘর থেকে বের করে দেব।২৯৯

‘আয়িশা বিনত তালহা বলেন, একটি জিন বার বার হযরত ‘আয়িশার (রা) ঘরে প্রবেশ করতো। তিনি তাকে এভাবে ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করতে থাকেন। এমন কি তাকে হত্যার হুমকি দেন। তবুও সে আসতোকে। একদিন তিনি লোহার একটি দগু দিয়ে জিনটিকে আঘাত করে হত্যা করেন। এরপর তিনি স্বপ্নে দেখেন, কেউ একজন তাঁকে বলছেন, আপনি অমুককে হত্যা করেছেন, অচ তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আপনি যখন পর্দা অবস্থায় থাকতেন তখন ছাড়া তিনি তো আপনার ঘরে ঢুকতেন না। তিনি যেতেন আপনার নিকট রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস শোনার জন্য। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর এই স্বপ্নের কথা পিতাকে বললেন।’ তিনি তাঁকে দিয়াত (রক্তপণ) হিসেবে বারো হাজার দিরহাম সাদাকা করে দেওয়ার জন্য বলেন। ইমাম জাহাবী এ ঘটনা তাঁর সিয়ারু আ‘লাম আননুবালা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, জিনটি সাপের রূপ ধরে আসতো এবং তার দিয়াত হিসেবে হযরত আয়িশা (রা) একটি দাস মুক্ত করেন।

হযরত ‘আয়িশার (রা) স্থান ও মর্যাদা

সহীহ মুসলিমের ‘আল-ফাদায়িল অধ্যায়ে এসেছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘আমি তোমাদের মধ্যে দুইটি বিরাট জিনিস রেখে যাচ্ছিঃ আল্লাহর কিতাব এবং আহলি বায়ত (আবার পরিবার-পরিজন) বিশেষজ্ঞরা বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বাণীর তাৎপর্য হলো, যদিও কিতাবুল্লাহ তার সহজ-সরল ভাষা ও বর্ণানার জন্য সহজেই বোধগম্য এবং বাসত্মবায়নযোগ্য তবুও সর্বদাই দুনিয়াতে এমন সব মানুষের প্রয়োজন থাকবে যারা তার রহস্যসমূহ উদঘাটন করতে পারেন এবং তার ইলমী ও আললী ব্যাখ্যা দিতে পারেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরে এমন ব্যক্তিদের আহলে বায়তের মধ্যে তালাশ করা উচিত।

হযরত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত ‘আয়িশা (রা) সম্পর্কে যে সকল মমত্মব্য ও বাণী রেখে গেছেন, ‘আয়িশাও (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহচার্য ও শিক্ষায় সেভাবে নিজেকে যোগ্য করে তুলেছেন, সর্বোপরি তিনি স্বীয় স্বভাবগত তীক্ষ্ণ মেধা ও যোগ্যতা দ্বারা নিজেকে যেভাবে শানিত করেছেন, তাতে আহলি বায়তের মধ্যে তাঁর যে এক বিশেষ মর্যাদার আসন ছিল, সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। এরই ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং ইসলামী হুকুম্ আহকামের শিক্ষাদান তাঁর চেয়ে ভালো আর কে করতে পারতেন? লোকেরা তো কেবল বাইরের নবীকে প্রত্যক্ষ করতেন, অভ্যমত্মরের নবী থাকতেন তাদের দৃষ্টির আড়ালে। পক্ষামত্মরে হযরত ‘আয়িশা (রা) বাহির ও গৃহাভ্যমত্মর-সর্ব অবস্থার নবীকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করতেন। আর একারণেই আল্লাহর নবী বলেছেনঃ৩০০

আরবি হবে

-নারী জাতির উপর ‘আয়িশার (রা) মর্যাদা তেমন, যেমন সকল খাদ্য-সামগ্রীর উপর সারীদের মর্যাদা। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ‘আয়িশাকে (রা) স্ত্রী হিসেবে লাভের সুসংবাদ পান। তাঁর বিছানা ছাড়া আর কোন স্ত্রীর বিছানায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী লাভ করেননি। মহান ফিরিশতা জিবরীল আমীন তাঁকে সালাম পেশ করেছেন। তিনি দুইবার জিবারীলকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন তাঁর পবিত্রতা ঘোষা করে আয়াত নাযিল করেছেন। আর তিনিই যে আখিরাতে জীবনে রাসূলে পাকের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী হবেন, সে কথাও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানিয়ে গেছেন। এ সকল কথা সহীহ বুখারীর ‘আয়িশার সম্মান ও মর্যাদা অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলতেন, আমি গর্বের জন্য নয়, বরং বাসত্মব কথাই বলছি। আর তা হলো, আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে এমন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা আর কাকেও দান করেননি। (১) ফিরিশতা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বপ্নের মধ্যে আমার ছবি দেখিয়েছেন, (২) আমার সাত বছর বয়সে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বিয়ে করেছেন, (৩) নয় বছর বয়সে আমি স্বামী গৃহে গমন করেছি, (৪) আমিই ছিলাম রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একমাত্র কুমারী স্ত্রী, (৫) যখন তিনি আমার বিছানায় থাকতেন তখনও তাঁর উপর ওহী নাযিল হতো, (৬) আমি ছিলাম রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী, (৭) আমার নির্দোষিতা ঘোষণা করে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে, (৮) জিবরীলকে (আ) আমি স্বচক্ষে দেখেছি, (৯) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, (১০) আমি তাঁর খলীফা ও তাঁর সিদ্দীকের কন্যা, (১১) আমাকে পবিত্র করে সৃষ্টি করা হয়েছে, (১২) আমার মাগফিরাত এবং জান্নাতে আমাকে উত্তম জীবিকা দানের অঙ্গিকার করা হয়েছে, (১৩) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পার্থিব জীবনের সর্বশেষ মুহূর্তে আমার মুখের লালা তাঁর লালার সাথে মিলেছে, (১৪) আমারই ঘরে তাঁর কবর দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরো গৌরব ও মর্যাদার কথা তিনি নিজেও যেমন বলেছেন, তেমনে আরো বহু সাহাবী বর্ণনা করেছেন। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে যা ছড়িয়ে আছে।৩০১

হযরত ‘আয়িশার (রা) এত সব মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য দেখে কোন কোন ‘আলিম মনে করেছেন, তিনি তাঁর পিতা আবু বকর (রা) থেকেও উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। ইমাম জাহাবী বলেন, তাঁদের একথা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘য়ালা প্রত্যেকটি জিনিসের বিশেষ বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। আমরা বরং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, দুনিয়া ও আখিরাতে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী। এর চেড়ে বড় গর্বের বিষয় তাঁর জন্য আর কিছু কি আছে? তা সত্ত্বেও হয়রত খাদীজার এমন বৈশিষ্ট্য আছে যা কেউ অর্জন করতে পারেনি। হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি, অনেকগুলি করণে তাঁর চেয়ে খাদীজার (রা) মর্যাদা অনেক বেশি।’৩০২

হযরত ‘আয়িশা সিদ্দীকার (রা) সারীতে মুবারাকার প্রতি যখন আমরা একটি বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক দৃষ্টিপাত করি তখন কেবল সকল মহিলা সাহাবী নয়, বরং অনেক বড় বড় পুরুষ সাহাবীদের তুলনায় তাঁর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যটি পরিপূর্ণরূপে পাই তা হলো, তিনি জন্ম ও স্বভাবগতভাবে চিমত্মা ও অনুধ্যানশীল মেধা ও মসিত্মষ্ক লাভ করেছিলেন। দীনের তাৎপর্য বিষয়ে গভীর জ্ঞান, ইজতিহাদের ক্ষমতা ও শক্তি, সমালোচনা ও পর্যালোচনার রীতি-পদ্ধতি, ঘটনাবলীর যথাযথ উপলব্ধি, গভীর অমর্ত্মদৃষ্টি এবং শুদ্ধ ও সঠিক সিদ্ধামত্ম ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল অতি উচ্চে।

তিনি যে সব কথা বলতেন, যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতেন, তা হতো বিলকুল প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির অনুকূলে। তাঁর এমন কোন বর্ণনা খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হবে যা সমর্থনের জন্য মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকে নানা রকম তাবীল বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। একথা অবশ্য সত্য যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অতি নিকটের মানুষ হওয়ার সুবাদে তিনি তাঁর যাবতীয় কথা ও কাজ অধ্যয়নের খুব চমৎকার সুযোগ লাভ করেছিলেন। কিন্তু যখন আমরা দেখি যে, তিনি ছাড়া আরও অনেক ব্যক্তি এমন ছিলেন যাঁদের নৈকট্য তাঁর চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না তখন আমাদের সামনে হযরত ‘আয়িশার (রা) মেধা ও মননের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘুরে ফিরে সেই একই কথা আসে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখনিঃসৃত বাণী ‘আয়িশা (রা) ছাড়া আরো অনেকে শুনতেন, কিন্তু তিনি যে সিদ্ধামেত্ম পৌঁছাতেন এবং তার প্রকৃত প্রাণসত্তা তাঁর মেধা ও মসিত্মঙ্ক যত যতটুকু অনুধাবন করতে সক্ষম হতো, অন্যরা তা পারতো না।

উম্মূল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারসগাহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী শিক্ষার্থী। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা ছির অতুলনীয়। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তৎকালীন করল নারী অথবা সকল উম্মাহাতুল মু’মিনীন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সহধর্মিণীগণ, যাঁরা বিশ্বের সকল বিশ্বাসীদের মাতা, অথবা সাহাবীদের একটি অংশের উপরই ছিল না, বরং কতিপয় বিশিষ্ট সাহাবী ছাড়া সকল সাহাবীর উপরই ছিল। হযরথ আবু মূসা আল-আশ’য়ারী (রা) বলেন।:৩০৩ আমরা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবীরা কক্ষণো এমন কোন কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হইনি, যে বিষয়ে আমরা ‘আয়িশার (রা) নিকট জানতে চেয়েছি এবং সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান আমরা তাঁর কাছে পাইনি।

হযরত আবু মূসা আল-আশ’য়ারী (রা) একজন অতি উঁচু মর্যাদার সাহাবী। তাঁর উপরোক্ত মমত্মব্য দ্বারা হযরত ‘আয়িশার (রা) জ্ঞানের পরিধি ও বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত ‘আতা ইবন আব রাবাহ-যিনি বহু সাহাবীর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, বলেনঃ৩০৪

হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন মানুষর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ, সবচেয়ে বেশি জানা ব্যক্তি এবং আম জনতার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মতামতের অধিকারিণী।

তাবে’ঈদের ইমাম বলে খ্যাত হযরত ইমাম যুহরী-যিনি একাধিক অতি মর্যাদাবান সাহাবীর তত্ত্বাবধানের লালিত-পালিত হন, বলেনঃ৩০৫

-হযরত ‘আয়িশা (রা) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘আলিম ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর কাছে জানতে চাইতেন।

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত‘ আবদুর রহমান ইবন ‘তাওফের (রা) সুযোগ্য পুত্র আবু সালামা যিনি একজন অতি উঁচু সত্মরের তাবে’ঈ ছিলেন, বলেনঃ৩০৬

‘ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের জ্ঞান, প্রয়োজনে কোন ব্যাপারে সিদ্ধামত্ম দান, আয়তের শানে নুযূল এবং ফরয় বিষয়সমূহে আমি ‘আয়িশা (রা) অপেক্ষা অধিকতর পারদর্শী ও সুনিশ্চিত মতামতের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।

হযরত আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) একদিন দরবারের এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলেন, আচ্ছা, আপনি বলুন তো, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ‘আলিম কে? লোকটি বললোঃ আমীরুল মু’মিনীন! আপনি। আমীর মু‘য়াবিয়া (রা) বললেনঃ না। আমি কসম দিচ্ছি, আপনি সত্য কথাটি বলুন। তখন লোকটি বললোঃ যদি তাই হয়, তাহলে ‘আয়িশা (রা)।

হযরত ‘উরত্তয়া ইবন যুবাইর (রা) বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি হালাল-হারাম, জ্ঞান, কবিতা ও চিকিৎসা বিদূায় উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রা) অপেক্ষা অধিকতার পারদর্শীান্য কাউকে দেখিনি।

অপর একটি বর্ণনায় হযরত ‘উরওয়ার কথাগুলি এভাবে এসেছেঃ

আরবী হবে

-কুরআন, ফারায়েজ, হালাল-হারাম, ফিকাহ, কাব্য, চিকিৎসা, আরবের ইতিহাস ও নসব বিদ্যায় আমি ‘আয়িশার (রা) চেয়ে বড় ‘আলিম আর কাউকে দেখিনি।

প্রখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত মাসরূক (রা)-যিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) তত্ত্বাধনানে লালিত-পালিত হন, একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলোঃ উম্মুল্ মু’মিনীন ‘আয়িশা (রা) কি ফারায়েজ শাস্ত্র জানতেন? তিনি জবাব দিলেনঃ

আরবী হবে

-সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বড় বড় সাহবীদেরকে তাঁর নিকট ফারায়েজ বিষয়ে প্রশ্ন করতে দেখেছি। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস ও সুন্নাতের হিফাজত ও প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব ও কর্তব্য রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বেগমগণও করেছেন। তবে তাঁদের কেউই হযরত ‘আয়িশার (রা) স্তরে পৌঁছতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে মাহমুদ ইবন লাবীদ মন্তব্য করেছেনঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ বহু হাদীস স্মৃতিতে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু কেউ ‘আয়িশা (রা) ও উম্মু সালামার (রা) সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।

এ ব্যাপারে ইমাম যুহরী (রা) সাক্ষ্য দিচ্ছেনঃ

আরবী হবে

-যদি সকল মানুষ ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমদের ইল্ম (জ্ঞান) একত্র করা যেত তাহলে তাদের মধ্যে ‘আয়িশার (রা) ইল্ম বা জ্ঞান অধিকতর প্রশস্ত ও বিস্তৃত হতো।

অপর একটি বর্ণনা মতে ইমাম যুহরী বলেনঃ গোটা নারী জাতির ‘ইল্ম (জ্ঞান) এবং ‘আয়িশার (রা) ‘ইল্ম যদি একত্র করা যেত তাহলে ‘আয়িশার (রা) ‘ইল্মই শ্রেষ্ঠ হতো।’

উপরের বর্ণনাসমূহের প্রেক্ষিতে ‘আল্লামা জাহাবী বলেনঃ ‘তিনি ছিলেন বিশাল জ্ঞান ভান্ডার।’ তিনি আরো বলেনঃ ‘উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে, সার্বিকভাবে মহিলাদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বড় জ্ঞানী ব্যক্তি আর কেউ নেই।’

কোন কোন মুহাদ্দিস ‘আয়িশার (রা) ফযীলাত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি হাদীস বর্ণনা করেনঃ

আরবী হবে

-তোমাদের দীনের একটি অংশ তোমরা হুমায়রা হতে গ্রহণ কর। ইল্ম ও ইজাতিহাদ বা জ্ঞান ও গবষেণায় হযরত ‘আয়িশা (রা) কেবল মহিলাদের মধ্যেই নন, বরং পুরুষদের মধ্যেও বিশেষ স্থান অধিকার করতে সক্ষম হন। কুরআন, সুন্নাহ, ফিকাহ ও আহকাম বিষয়ক জ্ঞানে তাঁর স্থান ও মর্যাদা এত ঊর্ধ্বে যে ‘উমার (রা), ‘আলী (রা), ‘আবদুল্লাহ ইবনে মাস‘উদ (রা), ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) প্রমুখের সাথে তাঁর নামটি নির্ধ্বিধায় উচ্চারণ করা যায়। এখানে সংক্ষেপে আমরা বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা সম্পর্কে একটি আলোচনা উপস্থাপন করছি।

আল কুরআন

আমরা জানি পবিত্র কুরআন দীর্ঘ তেইশ বছর নাযিল হয়। হযরত ‘আয়িশা (রা) নুযূলে কুরআনের চতুর্দশ বছরে মাত্র নয় বছর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে আসেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে তাঁর সহঅবস্থানের সময়কাল দশ বছরের ঊর্ধ্বে নয়। নুযূলে। কুরআনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত হয় তাঁর জ্ঞান-বৃদ্ধি ও বয়োপ্রাপ্তির পূর্বে। কিন্তু এমন অসাধারণ মেধা ও মননের অধিকারী সত্তা তাঁর শৈশব কালকেও বৃথা যেতে দেয়নি। মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিভিন্ন সময় হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রা) গৃহে আসতেন। সিদ্দীকে আকবরও (রা) নিজ গৃহে একটি মসজিদ বানিয়েছিলেন। সেখানে বসে তিনি অত্যন্ত বিনয় ও ভয়-বিহবার চিত্তে কুরআন পাক তিলাওয়াত করতেন।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অস্বাভাবিক স্মৃতিশক্তির জন্য এ সকল পরিবেশ ও অবস্থা থেকে কোন ফায়দা লাভ না করাটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তাই আমরা তাঁকে সূরা ‘আল-কামার-এর ৩য় আয়াত-

আরবী হবে

সম্পর্কে বরতে শুনিঃ

আরবী হবে

আয়াতটি মক্কায় মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর নাযিল হয়। আমি তখন একটি ছোট্ট মেয়ে, খেলা করি।

ইফক (বানোয়াট দোষারোপ)-এর ঘটনা যখন ঘটে তখন হযরত ‘আয়িশার (রা) বয়স ১৩/১৪ বছর হবে। তখন পর্যন্ত কুরআনের খুব বেশি অংশ হিফজ করেননি। তিনি নিজেই বলেছেনঃ

আরবী হবে

-সেই সময় আমি একটি কম বয়সী মেয়ে, খুব বেশি কুরআন পড়িনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তখনই কুরআনের উদ্ধৃতি পেশ করতেন।

আবূ ইউনুস নামে হযরত ‘আয়িশার (রা) একটি দাস ছিল। সে লেখাড়পা জানতো। তিনি এই আবু ইউনুসকে দিয়ে নিজের জন্য কুরআন লিখিয়েছিলেন।

অনারবদের সাথে মেলামেশার কারণে কুরআন পাঠে তারতম্য সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় ইরাকে।

একবার ইরাক থেকে এক ব্যক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) সাথে দেখা করতে আসে। সে বলে, উম্মুল মু’মিনীন! আমাকে আপনার কুরআনটি একটু দেখান। হযরত ‘আয়িশা (রা) কারণ জানতে চাইলে সে বললো, আমাদের ওখানে লোকেরা এখনো পর্যন্ত কুরআন পাঠে কোন ক্রমধারা অনুসরণ করে না। আমি চাই, আমার কুরআনটি আপনার কুরআনের অনুরূপ সাজিয়ে নিই। তিনি বরলেন, সূরাসমূহের বিন্যাস আগ–পিছে হওয়াতে কান ক্ষতি নেই। তারপর নিজের কুরআনটি বের করে প্রত্যেক সূরার আয়াতসমূহ থেকে পাঠ করে লিখিয়ে দেন।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বৈবাহিক জীবনে হযরত ‘আয়িশার (রা) অভ্যাস ছিল যদি কোন আয়াতের অর্থ বোধগম্য না হতো, স্বামী রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। সহীহ হাদীসসমূহে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট বহু আয়াত সম্পর্কে তাঁর প্রশ্নের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ উম্মাহাতুল মুমিনীনের প্রতি নির্দেশ চিলঃ

আরবী হবে

-হে নবী পরিবরের সদস্যবর্গ! আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে।

তাঁরা এই নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ যোগ্যতা ও সাধ্যমত ‘আমল করতেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাজাজ্জুদের নামাযে অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে এবং বিনয় ও বিনম্র চিত্তে কুরআনের বড় বড় সূরা তিলাওয়াত করতেন। সেই সব নামাযে হযরত ‘আয়িশাও (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিছনে ইকতাদা করতেন। একমাত্র হযরত ‘আয়িশা (রা) ছাড়া আর কোন বেগমের বিছানায় কুরআনের নুযূল হয়নি। এমতাবস্থায় নাযিলকৃত আয়াতের প্রথম ধ্বনিটি তাঁর কানেই যেত। তিনি বলছেনঃ ‘সূরা আল-বাকারা ও সূরা আন-নিসা যখন নাযিল হয় তখন আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছেই ছিলাম।

মোটকথা, এ সকল পরিবেশ ও অবস্থার কারণে হযরত ‘আয়িশা (রা) কুরআনের প্রতিটি আয়াতের পাঠ পদ্ধতি, ভার ও তাৎপর্য এবং হুকুম-আহকাম বের করার পন্থা-পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেন। এ কারণে, কোন বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো সর্বপ্রথম তিনি কুরআন পাকের প্রতি দৃষ্টি দিতেন। আকায়েদ, ফিকাহ, আহকাম ছাড়াও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সীরাত ও আখরাক-যা মূলক ইতহাসের সাথে সম্পর্কিত, সবকিছুই তিনি কুরআন পাক দ্বারা বুঝার চেষ্টা করতেন। একবার কিছু লোক তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলো। তারা বললোঃ উম্মুল মুমিনীন! আপনি আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু আখরাকের কথা বর্ণনা করুন! তিনি বললেনঃ তোমরা কি কুরআন পড় না? তাঁর আখলাক হলো আল-কুরআন। তারা আবার প্রশ্ন করলোঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাত্রিকালীন ইবাদাতের পদইত কেমন ছিল? বললেনঃ তোমরা কি সূরা ‘মুয্যাম্মিল’ পড়নি?

সহীহ সনদে সাহাবায়ে কিরাম থেকে কুরাআন কারীমের তাফসীর খুব কমই বর্ণিত হয়েছে। যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) তাফসীরমূরক বর্ণনা কবোরে কম নয়। এখানে তার কয়েকটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোঃ

সাফা ও মারওয়ার পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে দŠŠড়ানো হজ্জের একটি অন্যতম প্রধান কাজ। এসম্পর্কে কুরআন মজীদে নিম্নের আয়াতটি এসেছেঃ

আরবী হবে

-নিঃসন্দেহে ‘সাফা ও ‘মারওয়া’ আল্লাহ তা‘য়ালার নির্দশনগুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা‘বা ঘরে হজ্জ বা ‘উমরা করে, তাদের পক্ষে এ দুইটির তাওয়াফ করাতে কোন দোষ নেই।

একদিন ‘উরওয়া বললেনঃ খালাআম্মা! এই আয়াতের অর্থ তো এটাই যে, কেউ যদি সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ না করে তা হলেও কোন দোষ নেই। ‘আয়িশা (রা) বলরেনঃ ভাগ্নে! তুমি ঠিক বলোনি। যদি আয়াতটির অর্থ তাই হতো যা তুমি বুঝেছো, তাহলে আল্লাহ এভাবে বলতেনঃ

আরবী হবে

-অর্থাৎ ওদের তাওয়াফ না করাতে কোন দোষ নেই। মূলত আয়াতটি আনসারদের শানে নাযিল হয়েছে। মদীনার আউস ও খায়রাজ গোত্রের লোকেরা ইসলাম-পূর্ব জীবনে ‘মানাত’ দেবীর উপাসনা করতো। মানাতের মূর্তি ছিল কুদাইদ-এরকাছে ‘মুশাল্লাল’ পাহাড়ে। এ কারণে তারা সাফা-মারওয়ার তাওয়াফকে খারাপ মনে করতো। ইসলাম গ্রহণের পর তারা রাসূলুল্লারহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট জিজ্ঞেস করে, ইসলামের পূর্বে আমরা এমন করতাম, এখন এর বিধান কি? এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ বলেন, সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ কর, এতে দোষের কিছু নেই। এরপর তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ করেছেন। এখন তা ত্যাগ করার অধিকার কারো নেই।

হযরত ‘আয়িশার (রা) এই তাফসীর দ্বারা যে মূলনীতিটি বেরিয়ে আসে তা হলো, কুরআন বুঝতে হলে আরবদের বাকবিধি ও ব্যবহৃত শব্দের ভিত্তিতে বুঝতে হবে।

সূরা ইউসূফের ১১০তম আয়াতে আল্লাহ পাক বলেনঃ

আরবী হবে

-অবশেষে যখন রাসূলগণ নিরাশ হলেন এবং লোকে ভাবলো যে, রাসূলগণকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে তখন তাদের নিকট আমার সাহায্য আসলো।

হযরত ‘উরওয়া হযরত ‘আয়িশাকে (রা) প্রশ্ন করলেন- আরবী হবে।

(অর্থাৎ রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে) হবে, না-আবরী হবে।

(অর্থাৎ তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে) হবে? ‘আয়িশা (রা) বললেন-আরবী হবে।

(মিথ্যাবদী বলা হয়েছে) ‘উরওয়া বললেনঃ রাসূলগণের তো দূঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তাঁদেরকে মিথ্যাবদী বলা হয়েছে এবং তাঁদের স্বজাতির লোকেরা তাঁদের নবুওয়াতের দাবিকে মিথ্যা বলেছে তখন আরবী হবে অর্থাৎ তাঁরা ধারণা বা অনুমান করলো-কথাটির তাৎপর্য কি? এ কারণে আবরী হবে (তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে) হওয়াই শুদ্ধ হবে। হযরত ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ মা‘য়াজ আলাহ! আল্লাহর নবী-রাসূলগণ কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন ধারা পোষণকরতে পারেন যে, তাঁদেরকে সাহায্যের মিথ্যা প্রতিশ্রুটি দেওয়া হয়েছে? হযরত উরওয়া তখনজানতে চাইলেনঃ তাহলে আয়াতটির অর্থ কি হবে? বললেন? কথাটি বলা হয়েছে রাসূলদের অনুসারীদের সম্পর্কে। যখন তারা ঈমান আনলো, তাঁদের নবুওয়াতকে সত্য বলে স্বীকার করলো তখন স্বাজাতির লোকেরা তাদের উপর অত্যাচার উৎপীড়ন চালালো। সেই সময় আল্লাহর সাহায্য আসতে বিলম্ব হচ্ছে বলে তারা এরূপ মনে করলো। এমন কি রাসূলগণ স্বাজাতির অস্বীকারকারীদের ঈমানের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেলেন। তাঁদের ধারণা হলো আল্লাহর সাহায্যের এই বিলম্বের কারণে ঈমানদারগণ আমাদের মিথ্যাবদী বলে না দেয়। এমন সময় পঠাৎ আল্লাহর সাহায্য এসে যায়।

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ