আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – পঞ্চম খন্ড

স্ত্রীর যদি স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে সে ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দশ হলোঃ

আরবী হবে

-কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশঙ্কা করে তবে তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চাইলে কোন দাষ নেই, এবং আপোষ-নিস্পত্তিই শ্রেয়।

অসন্তুষ্টি দূর করার জন্য আপোষ-মীমাংসা করে নেওয়া তো একটি সাধারণ ব্যাপার। এর জন্য আল্লাহ পাকের এক বিশেষ হুকুম নাযিলের কি প্রয়োজন ছিল? হযরত আয়িশা (রা) বলেন, এ আয়াত সেই স্ত্রীর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে যার স্বামী তার কাছে তেমন আসে না। অথবা স্ত্রীর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে যার স্বামী তার কাছে তেমন আসে না। অথবা স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়ার কারণে স্বামীকে-তৃপ্ত করতে সক্ষম নয়। এমন বিশেষ অবস্থায় স্ত্রী যদি তালাক নিতে না চায় এবং স্ত্রী অবস্থায় থেকে স্বামীর নিকট প্রাপ্য নিজের অধিকার ছেড়ে দেয়, তাহলে এমন আপোষ-নিষ্পত্তি খারাপ নয়। বরং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেয়ে তা উত্তম।

আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা আল-বাকারার ২৩৮তম আয়াতে বলেছেনঃ

আরবী হবে

-তোমরা সমস্ত নামাযের প্রতি যত্মবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। ‘মধ্যবর্তী নামায’ বরতে কি বুঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা) ও হযরত ‘উসামার (রা) মতে, মধ্যবর্তী নামায হলো জুহরের নামায। কোন কোন সাহাবীর মতে ফজরের নামায। হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, মধ্যবর্তী নামায বরতে আসরের নামায বুঝানো হয়েছে। তিনি নিজের এই তাফসীরের উপর এতখানি দূঢ় প্রত্যয়ী ছিরেন যে, নিজের মাসহাফখানির পার্শ্বটীকায় আরবী হবে কথাটি লিখিয়ে দিয়েছিলেন। হযরত আয়িশার (রা) দাস আবু ইউনসু বলেন, তিনি আমাকে একনানি কুরআন লেখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছবে, আমাকে জানাবে। আমি যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছরাম, তখন তিনি আবরী হবে কথাটি লেখান।

তারপর বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট থেকে এমনই শুনেছি।

মূলত আরবী হবে কুরআনের আয়াত নয়, রবং আবরী হবে এর তাফসীর। সূরা আল-বাকারার ২৮৪তম আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ

আবরী হবে

-তোমরা তোমাদের মনে যা কিছু আছ তা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে হিসাব নেবেন। তারপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দিবেন।

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় মানুষের অন্তরে মুহূর্তের জন্য যে সকল ভাব ও কর্পনার উদয় হয় আল্লাহ তার সবকিছুরই হিসাব নিবেন। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত যে সকল ওসওসা এবং কল্পনার উদয় হয় তারও পাকড়াও যদি আল্লাহ করেন তাহলে মানুষের পরিমাত্রণ পাওয়া অসম্ভব হবে। হযরত ‘আলী (রা) ও ইবন ‘আববাস (রা) বলেন, এ আয়াতের হুকুম একই সূরার ২৮৬তম, আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে। আয়াতটির অর্থ নিম্নরূপঃ

‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনকাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে।’

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন উমারও (রা) উপরোক্ত মত পোষণ করেন। কোন এক ব্যক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট উপরোক্ত আয়াতের অর্থ জিজ্ঞেস করে। সাথে সাপথে যে সূরা আন-নিসার ১২৩তম আয়াতটি পেশ করে। আয়াতটির অর্থঃ ‘যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পারে।’ প্রশ্নকারীর বক্তব্য ছিল, এই যদি অবস্থা হয় তাহলে আল্লাহর মাগফিরাত ও রহমত বান্দা কিভাবে লাভ করবে এবং সে মুক্তির আশাই বা কেমন করে করবে? হযরত ‘আয়িশা (রা) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করার পর সর্বপ্রথম মুতিই আমার কাছে প্রশ্ন করেছো। আল্লাহর বাণী সত্য। তবে আল্লাহ তা‘য়ালা তার বান্দাদের ছোট ছোট ভুল-ত্রুটি নানা রকম মুসীবত ও বিপদের বিনিময়ে ক্ষমা করে দেন। একন মুমিন ব্যক্তি যখন অসুস্থ হয় অথবা তার উপর কোনবিপদ আসে, এমন কিপটেকে কোন জিনিস রেখে ভুলে যায় এবং তা তালাশ করতে করতে অস্থির হয়ে পড়ে এর সবকিছুই তার মাগফিরাত ও রহমত লাভের কারণ ও বাহানা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সোনা আগুনে পুড়ে যেমন নিখাঁদ হয়ে যায় তেমনি মুমিন ব্যক্তিও পাক-সাফ হয়ে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।

সূরা আন-নিসার ষষ্ঠ আয়াতে ইয়াতীমের মাল সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

আরবী হবে

-যারা সচ্ছল তারা অবশ্যই ইয়াতীমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে।

এ আয়াতের নির্দেশ ইয়াতীমদের ওলীদের সম্পর্কে। হযরত ইবন ‘আববাস (রা) বর্ণনা করেন যে, উল্লেখিত আয়াতের হুকুম নিম্নোক্ত সূরা নিসার ১০ম আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছেঃ

আরবী হবে

-যারা ইয়াতীমের অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে।

কিস্ত্ত পরবর্থী আয়াতে তো তাদের জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল খায়। এ কারণে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, যে আয়াতে খাওয়ার অনুমতি আছেসেটি সেইসব লোকদের জন্য যারা ইয়াতীমের বিষয় সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য দেখা শোনা করে। এমন ওলী যদি সচ্ছর হয় তাহলে তাদের বিনিময় গ্রহণ করা উচিত নয়। আর যদি দরিদ্র হয় তাহলে তার মর্যাদা অনুযায়ী কিছু গ্রহণ করতে পারে। মূলত হযরত ‘আয়িশার (রা) এ তাফসীরের ভিত্তিতে দুইটি আয়াতে অর্থে কোন বিরোধ থাকে না। উপরের উদ্ধৃত আয়াতসমূহের মত আরোবহু আয়াতের তাফসীর হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে হাদীস ও তাফসীর গ্রস্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

আল হাদীসঃ

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাস্তব সত্তাই হচ্ছে মূলত ইলমে হাদীসের বিষয়বস্ত্ত। এই কারণে যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভের সুযোগ পপেয়েছিলেন, এ সুযোগটি পেয়েছিলেন। হিজরাতের তিন বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজরাতের পরে অবশ্য ছয় মাসের জন্য স্বামীর দীদার থেকে মাহরূম থাকেন। মদীনায় আসার অল্প কিছুদিন পর স্বামীর ঘরে চলে যান, তারপর থেকে আর বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁর শৈশব জীবনেই ইসলামের প্রথম পর্বটি অতিবাহিত হয়। কিন্তু তা হলে কি হবে, তাঁর স্বাভাবগত মেধা ও স্মৃতিশক্তি সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমদের মধ্যে একমাত্র হযরত সাওদা (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সহাবস্থানের বা্যাপারে হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। তাঁর দৈহিক ও মানসিক শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হতে চলেছিল। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের কয়েক বছর পূর্বেই তিনি স্বামী সেবায় অক্ষম হয়ে পড়েছিরেন। অপর দিকে হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন উঠতি বয়সের এক নারী। সেই বয়সে দিন দিন তাঁর বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার উন্নতি ঘটছিল। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পার্থিব জীবনের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত তিনি সেবার সুযোগ লাভ কনের। এই কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সার্বিক অবস্থা এবং শরীয়াতের যাবতীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে তাঁর অবগতির ছিল সবার চেয়ে বেশি।

হযরত সাওদা (রা) ছাড়া অন্য বেগমগণ হযরত ‘আয়িশার (রা) পরে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হন। যেহেতু হযরত সাওদা (রা) বার্ধক্যের কারণে নিজের বারির দিনটি হযরত ‘আয়িমার (রা) দান করেন, তাই অন্যরা যখন প্রতি আট দিনে একদিন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেতেন তখন হযরত ‘আয়িশা (রা) পেতেন দুইদিন। আর যে মসজিদ ছিল আল্লাহর রাসূলের (রা) গণশিক্ষাকেন্দ্র, সৌভাগ্যক্রমে হযরত ‘আয়িশার (রা) ঘরটি ছির তারই সাথে। এই সকল কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস ও জীবনধারা সম্পর্কে অবগতির ব্যাপারে বেগমগনেল কেউই হযরত ‘আয়িশার (রা) সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেন নি।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত বেশি যে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেগমগণ তথা সকল মহিলা সাহাবীদের শুধু নন হাতে গোনা চার-পাঁচজন পুরুষ সাহাবী ছাড়া আর কেউই তাঁর সমকক্ষতা দাবি করতে পারেন না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা), হযরত ‘উমার (রা), হযরত ‘উসমান (রা), হযরত ‘আলী (রা) প্রমুখের মত বড় বড় সাহাবীরা তাঁদের দীর্ঘ সুহবত বা সাহচার্য, তীক্ষ্ণ বোধ ও মেধা শক্তি ইত্যাদি কারণে ‘আয়িশা (রা) থেকে মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক উর্ধ্বে ছিলেন। তবে একজন স্ত্রী স্বাভাবিকভাবে স্বামী সম্পর্কে এক মাসে যতটুকু জ্ঞান লাভ করতে পারে, আত্মীয়-বন্ধুরা বহু বছরেও তা পারে না। অন্যদিকে উল্লেখিত উঁচু স্তরের সাহাবীরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকারে পর পরই খিলাফতের শুরু দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস বর্ণনায় সময় ও সুযোগ খুব কমই পেয়েছেন। তারপরেও তাঁদের বর্ণিত হাদীস বা সংরক্ষিত আছে তা বিচার ও বিধি বিধান সংক্রান্ত। সেগুলিই আমাদের ফিকাহ শাস্ত্রের ভিত্তি। মূলত হাদীস বর্ণনার মূল দায়িত্ব পালন করেছেন যাঁরা খিলাফত পরিচালনার দায়িত্ব থেকে মুক্ত ছিলেন।

তাছাড়া ঐসবল উঁচু মর্যাদার সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত কম হওয়ার আরো একটি কারণ আছে। তাঁদের যুগ ছির পূর্ণভাবে সাহাবীদের যুগ। সে সময় একজনের অন্যজনের নিকট রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাণী বা কর্ম সম্পর্কে প্রশ্নকরার খুব কমই প্রয়োজন পড়তো। সুতরাং হাসীদ বর্ণনার সুvাগও হতো অতি অল্প। যাঁরা রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখেন নি বা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগ লাভ করেননি সেই পরবর্তী প্রজন্ম হলেন তাবে‘ঈন। মূলত তাঁদের যুগ শুরু হয় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের বিশ-পঁচিশ বছর পরে। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবন সম্পর্কে খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন। কিন্তু তখন ঐসব উঁচু স্তরের সাহাবী দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। অন্যদিকে অল্পবয়সী সাহাবীরা তখণ জীভনের মধ্য অথবা শেষ স্তরে এসে পৌছেছেন। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তাবে‘ঈদের জানার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। এ কারণে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে যে সকল সাহাবীর নাম হাদীরে গ্রন্থসমূহে দেখা যায় তাঁরা প্রায় সকলে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতের সময়ে কম বয়সী সাহাবী।

যে সকল সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এক হাজারের ঊর্ধ্বে তাঁরা হলেন মাত্র সাতজন। নিম্নে তাঁদের নাম ও বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা উল্লেখ করা হলোঃ

১। হযরত আবু হুরাইরাহ (রা)৫৩৬৪

২। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা)২৬৬০

৩। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা)২৬৩০

৪। হযরত জাবির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রা)২৫৪০

৫। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)২৬৮৬

৬। হযরত আবু সা‘ঈদ আল-খুদরী (রা)২২৭০

৭। হযরত ‘আয়িশা সিদ্দীকা (রা)২২১০

উপরে উল্লেখিত নামের পাশের সংখ্যা অনুযায়ী হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে হযরত ‘আয়িশার (রা) স্থান সপ্তম। অবশ্য এই তালিকাটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়। অনেকের মতে হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) ও হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) ছাড়া আর কেউ হযরত ‘আয়িশা (রা) চেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেননি। তাঁদের মতে অধিক হাসীদ বর্ণনাকারী হিসেবে হযরত ‘আয়িশার (রা) স্থান তৃতীয়।

অধিক হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে যাঁদের নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদেরকে অধিকাংশ উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশার (রা) ইনতিকালের পরেও জীবিত ছিলেন। সুতরাং তাঁদের বর্ণনার ধারাবাহিকতা আরো কিছুকাল অব্যাহত ছিল। পুরুষদের তুলনায় হযরত ‘আয়িশার (রা) অতিরিক্ত কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল। যেমন তিনি ছিলেন একজন পর্দাানশীল নারী। পুরুষ বর্ণনাকারীদের মত প্রতিটি মজলিসে উপস্থিত থাকতে পারতেন না এবং শিক্ষার্থীরাও ইচ্ছা করলেই যখন তখন তাঁর কাছে যেতে পারতো না। অন্যদের মত তিনি তৎকালীন ইসলামী খিলাফতের বড় বড় শহরসমূহে যাওয়ার সুযোগ পাননি। পুরুষ বর্ণনাকারীদের মত তিনি যদি সকল পুযোগ-সুবিধা লাভ করতে সমর্থ হতেন তাহলে তাঁরই স্থান হতো সবার উপরে।

পূর্বের আলোচনা থেকে জানা গেছে, হযরত ‘আয়িশার (রা) সর্বমোট বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা দুই হাজার দুইশো দশ (২২১০)। তার মধ্যে সহীহাইন-বুখারী ও মুসলিমে ২৮৬টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ১৭৪টি মুত্তাফাক আলাইহি, ৫৩টি শুধু বুখারীতে এবং ৬৯টি মুসলিমে এককভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই হিসেবে বুখারীতে সর্বমোট ২২৮টি এবং মুসলিম ২৪৩টি হাদীস এসেছে। এছাড়া হযরত ‘আয়িশার (রা) অন্য হাদীসগুলি বিভিন্ন গ্রন্থে সনদ সহকারে সংকলিত হয়েছে। ইমাম আহমাদের (রা) মুসনাদের ৬ষ্ঠ খন্ডে (মিসর) হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণিত সকল হাদীস সংকলিত হয়েছে। মুসলিম উম্মার নিকট হযরত ‘আয়িশার (রা) যে উঁচু মর্যাদা ও বিরাট সম্মান তা তাঁর অধিক হাসীদ বর্ণনার জন্য নয়, বরং হাদীসের গভীর ও সূক্ষ্ণ তাৎপর্য এবং মূল ভাবধারানুধাবনই প্রধান কার। সাহাবীদের মধ্যে অনেকেই এমন আছেন যাঁদের বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা খুবই অল্প। কিন্তু তাঁরা উঁচু স্তরের ফকীহ সাহাবীদের অন্তর্গত। যাঁরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাণরি মূল তাৎপর্য অনুধাবন না করে যা কিছু শুনেছেন তাই বর্ণনা করে দিয়েছেন, তাঁদের বর্ণনার সংখ্যা বেশি। আমরা দেখতে পাই যে, সকল সাহাবী বেশি হাদীস বর্ণনাকরী হিসেবে প্রসিদ্ধ তাঁদের মধ্যে কেবল হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাসি (রা) ও হযরত ‘আয়িশা (রা) ফকীহ ও মুজতাহিদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। কথিত আছে শরীয়াতের যাবতীয় আহকামের এক-চতুর্থাংশ তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাই আল্লামা জাহাবী বলেছেনঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফকীহ (গভীর জ্ঞানসম্পন্ন) সাহাবীরা তাঁর কাছ থেকে জানতেন। একদল লোক তাঁর নিকট থেকেই দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

বর্ণনার আধিক্যের সাথে সাথে দীনের তাৎপর্যের গভীর উপলব্ধি এবং হুকুম-আহকাম বের করার প্রবল এক ক্ষমতা হযরত ‘আয়িশার (রা) মধ্যে ছিল। তাঁর বর্ণনাসমূহের এ এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, আহকাম ও ঘটনাবলী বর্ণনার সাথে সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর কারণও বলে দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এখানে অন্যান্য রাবীর (বর্ণনাকারী) বর্ণনার সাথে একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

জুম‘আর দিন গোসল করা সম্পর্কে সহীহ বুখারীতে হযরত ‘আবদুল্লাহর ইবন ‘উমার (রা), হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা) ও হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে বর্ণনা এসেছে। এখানে তিন জনের বর্ণনার নমুনা দেয়া হলো। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে শুনেছি, তোমাদের যে ব্যক্তি জুম‘আয় আসে, সে যেন অবশ্যই গোসল করে আসে।

হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা) বলেনঃ

আরবী হবে

-রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ প্রত্যেক বালিগ ব্যক্তির উপর জুম‘আর দিনের গোসল ওয়াজিব।

একই বিষয়ে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা নিম্নরূপঃ

আরবী হবে

-মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী থেকে এবং মদীনার বাইরের বসতি থেকে আসতো। তারা ধুলো বালির মধ্য দিয়ে আসতো। এতে তারা ঘামে ও ধুলো-বালিতে একাকার হয়ে যেত। একবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট অবস্থান করছেন, এমন সময় তাদেরই এক ব্যক্তি তাঁর কাছে আসে। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমরা যদি এই দিনটিতে গোসল করতে তাহলে ভালো হতো।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অন্য একটি বর্ণনা এভাবে এসেছেঃ

আরবী হবে

-লোকেরা নিজ হাতে কাজ করতো। যখন তারা জুম‘আর নামাযে যেত তখন সেই অবস্থায় চলে যেত। তখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা যদি গোসল করতে তাহলে ভালো হতো।

আমরা উপরের একই বিষযের তিনটি বর্ণনা রক্ষ্য করলাম। কি কারণে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুম‘আর দিনে গোসলের নির্দেশ দেন, তা হযরত ‘আয়িশার (রা) স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-যা অন্য দুইটি বর্ণনায় নেই।

একবার হযরতত রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিলেন, কুরবানীর গোশত তিন দিনের মধ্যে খেয়ে শেষ করতে হবে। তিন দিনের বেশি রাখা যাবে না। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) ও হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা)সহ আরো অনেক সাহাবী এই নির্দেশকে চিরস্থায়ী বলে মনে করতেন। তাঁদের অনেকে এ ধরনের কথাই লোদের বলতেন। কিন্তু হযরত আয়িশা (রা) এটাকে চিরস্থায়ী বা অকাট্য নির্দেশ বলে মনে করতেন না। তিনি এটাকে একটা সাময়িক নির্দেশ বলে বিশ্বাস করতেন।

বিষয়টি তিনি বর্ণনা করছেন এভাবেঃ

আরবী হবে

-আমরা কুরবানীর গোশত লবণ দিয়ে রেখে দিতাম। মদীনায় আমরা ঐ গোশত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে খাওয়া জন্য উপস্থাপন করতাম। তিনি বললেনঃ তোমরা এই গোশত তিন দিন ছাড়া খাবে না। এটা কোন চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা ছিলনা। বরং তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন এই গোশত থেকে কিছু অন্যদেরকেও খেতে দেয়।

হযরত ‘আয়িশার (রা) অন্য একটি হাদীস যো ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, তাতে তিনি এই নিষেধাজ্ঞাও প্রকৃত কারণ বলে দিয়েছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলোঃ উম্মুল মু’মিনীন! কুরবারীন গোশত তিন দিনের বেশি খাওয়া কি নেষেধ! তিনি বলেনঃ

আবরী হবে

-না। তবে সেই সময় কুরবানী করার লোক কম ছিল। এজন্য তিনি চান, যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদেরকেও যেন ঐ গোশত খেতে দেয়।

ইমাম আহমাদ হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

-এটা সঠিক নয় যে, কুরবানীর গোশত তিন দিন পর খাওয়া যাবে না। বরং সেই সময় খুব কম লোক কুরবানী করতে পারতো। এ কারণে তিনি এই নির্দেশ দেন যে, যারা কুরবানী করে তারা যেন তাদেরকে গোশত খেতে দেয় যারা কুরবানী করতে পারেনি।

ইমাম মুসলিম এই হাদীসটি একটি তথ্যের আকারে বর্ণনা করেছেন। যেমন, এক বছর মদীনার আশে-পাশে এবং গ্রাম এলাকায় অভাব দেখা দেয়। সেবার তিনি এই হুকুম দেন। পরের বছর যখন অভাব থাকলো না তখন ঐ হুকুম রহিত করেন।হযরত সালামা ইবন আকওয়া (রা) থেকেও এ ধরনের একটি বর্ণনা আছে।

কা‘বা ঘরে এক দিকের দেওয়ালের পরে কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়া আছে, যাকে ‘হাতীম’ বলে। তাওয়াফের সময় ‘হাতীমকে’ বেষ্টনীর মধ্যে নিয়েই তাওয়াফ করতে হয়। মানুষের অন্তরে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, যেটি কা‘বার অংশ নয়, সেটিও তাওয়াফ করতে হবে কেন? হয়তো অনেক সাহাবী রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এই প্রশ্নের উত্তর চেয়ে থাকবেন। কিন্তু হাদীসের গ্রন্থসমূহে তাঁদের থেকে তেমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। আমরা হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা থেকে এই প্রশ্নের উত্তর পাই। তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করিঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই দেওয়ালও কি কা‘বা ঘরের অন্তর্গত? বললেনঃ হ্যঁ! বললামঃ তাহলে নির্মাণের সময় লোকেরা এটাকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিল না কেন? বললেনঃ তোমার স্বাজাতির হাতে পুঁজি ছিল না। তাই এটুকু বাদ দেয়। আবার প্রশ্ন করলামঃ তা কা‘বার দরজা এত উঁচুতে কেন? বললেনঃ এজন্য যে, সে যাকে ইচ্ছা ভিতরে যেতে দেবে, আর যাকে ইচ্ছা বাধা দেবে।

হযরত ‘উমার (রা) বলেন, ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা সঠিক হলে বুঝা যায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেদিকেও স্তম্ভ দুইটি এই কারণে চুমো দেননি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন জানতেন যে, কা‘বা ঘর তার মূলভিত্তির উপর সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত নেই, তখন হযরত ইবরাহীমের (আ) শরীয়াতের পুনরুজ্জীবনকারী হিসেবে তাঁর উত্তরাধিকারী নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানা থাকার ব্যাপারে কোন সন্দোহ নেই। তাই তিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রশ্নের উত্তরে বলেছেনঃ আয়িশা! তোমার কাওম যদি তাদের কুফরীর সময়কালের নিকটবর্তী না হতো তাহলে আমি কা‘বাকে ভেঙ্গে আবার ইবরাহীমের মূল ভিত্তির উপর নির্মাণ করতাম। যেহেতু সাধারণ আরববাসী সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছেন, এমতাবস্থায় নতুন করে কা‘বা গৃহ নির্মাণ করলে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারতো, এই আশঙ্কায় তা করা হয়নি। এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, অধিকতর কোন কল্যাণের ভিত্তিতে যদি শরীয়াতের কোন কাজের বাস্তাবায়নে বিলম্ব করা হয় তাহলে তা তিরস্কারযোগ্য হবে না। তবে শর্ত হচ্ছে সেই কাজটির বাস্তবায়ন যদি শরীয়াত তাৎক্ষণিকভাবে দাবী না করে।

হযরত ‘আয়িশার (রা) এই বর্ণনার ভিত্তিতে তাঁর ভাগ্নে হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) স্বীয় খিলাফতকালে কা‘বা ঘর বাড়িয়ে ইবরাহীমের (আ) মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত ইবন যুবাইরের (রা) শাহাদাতের পর খলীফা ‘আবদুল্লাহ মালিক যখন পুনরায় মক্কার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি এ ধারণার ভিত্তিতে যে, ‘আবদুল্লাহ (রা) এ কাজ তাঁর নিজের ইজতিহাদ থেকে করেছেন, ভেঙ্গে ফেলেন এবং পূর্বের মত তৈরি কনের। কিন্তু তিনি যখন জানতে পারলেন ‘আবদুল্লাহ (রা) নিজের ইজতিহাদ থেকে নয়, বরং উম্মুল মু’মিনীনের এ বর্ণনার ভিত্তিতে করেছেন, তখন তিনি নিজের এই কাজের জন্য ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর তাঁকে কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়ে বিশিষ্ট সাহাবীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একটি বর্ণায় এসেছে, হযরত আবু বকর (রা) তখন বলেন, নবীরা যেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সেখানেই দাফন করা হয়। এ কারণে রাসূলে কারীমকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আয়িশার (রা) ঘরে, যেখানে মৃত্যুবরণ করেন, দাফন করা হয়। কিন্তু এর আসল কারণ হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনায় পাওয়া যায়। তিনি বলেনঃ

আবরী হবে

-রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্তিম রোগশয্যায় বলেন, আল্লাহ ইহুদী ও নাসারাদের উপর অভিশাপ বর্ষণ করুন। তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে উপাসনালয় বানিয়ে নিয়েছে। ‘আয়িশা (রা) বলেন, যদি এমন আশঙ্কা না থাকতো তাহলে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর মাঠেই হতো। কিন্তু তিনি কবরকে সমজিদ বানানোর ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করেন।

মূলতঃ রাসূরুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই শঙ্কা প্রকাশের কারণেই তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের স্থলেই দাফন করা হয়।

এমনি ভাবে হিজরাতের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যাও বুখারী বর্ণিত ‘আয়িশার (রা) একটি হাদীস থেকে পাওয়া যায়। সাধারণভাবে হিজরাত বলতে মানুষ বুঝতো নিজের জন্মস্থান ত্যাগ করে মদীনায় এসে বসবাস করা। কিন্তু তিনি বলেন, এখন আর হিজরাত নেই। হিজরাত তো তখন ছিল যখন মানুষ নিজেদের দীন-ধর্মকে বাঁচানোর জন্য প্রাণের ভয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুলের নিকট আসতো। এখন তো আর সে অবস্থা নেই। সুতরাং প্রকৃত হিজরাতও হবে না। এ কারণে ইবন উমার (রা) বলতেনঃ মক্কা বিজয়ের পর আর হিজরাত নেই।

মুহাদ্দিসীন ও জারাহ ও তা‘দীল (সমালোচনা ও মূল্যায়ন) শাস্ত্রবিদদের মতে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহের মধ্যে ভুল-ভ্রান্তি তুলনামূলকভাবে খুব কম। এর বিশেষ কারণও আছে। সাধারণ সাহাবীরা হয়তো একবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কথা শুনতেন বা কোনকাজ করতে দেখতেন, তারপর বুবহু সেই কথা বা কাজের বর্ণনা অন্যদের নিকট দিতেন। এক্ষেত্রে হযরত ‘আয়িশার (রা) রীতি ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন কথা বা ঘটনা ভালোমত বুঝতে পারতেন, অন্যের নিকট বর্ণনা করতেন না। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কথা বা আচরণ বুঝতোক্ষম হলে তিনি বারবার প্রশ্ন করে তা বুঝে নিতেন। হাদীসের গ্রন্থসমূহে তাঁর এ ধরনের বহু জিজ্ঞাসা বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অন্যরা এ সুযোগ খুব কমই পেতেন।

যে সকল হাদীস তিনি সরাসরি শোনেননি, বরং অন্যদের মাধ্যমে শুনেছেন, সেগুলির বর্ণনার ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। চূড়ান্ত রকমের যাচাই-বাছাই, বিচার-বিশ্লেষণ ও খোঁজ-খবর নেওয়ার পর পূর্ণ আস্থা হলে তখন বণৃনা করতেন। একবার প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুলত্মাহ ইবন আমর ইবনুর আ‘স (রা) তাঁকে একটি হাদীস শোনালের। একবছর পর তিনি যখন আসলেন তখনহযরত আয়িশা (রা) এক ব্যক্তিকে তাঁর নিকট পাঠালেন সেই হাদীসটি আবার শুনে আসার জন্য। আবদুল্লাহ (রা) কোনরকম কম-বেশি ছাড়াই পূর্বের মত হাদীসটি হুবহু বর্ণনা কনের। লোকটি ফিরে এসে হাদীসটি আয়িশাকে (রা) শোনান। তিনি তখন মন্তব্য করেন, আল্লাহর কসম, ইবন আমরের কথা স্মারণ আছে।

এই মূলনীতির ভিত্তিতে তিনি যদি কারও নিকট থেকে কোন বর্ণনা গ্রহণ করতেন, আর কেউ যদি সেটি শোনার ইচ্ছা নিয়ে তাঁর কাছে আসতো, তাঁকে মূর বর্ণনাকারীর নিকট পাঠিয়ে দিতেন। আসলে উদ্দেশ্য হতো হাদীসটির বর্ণনা সূত্রের মাঝখানের মাধ্যম যতখানি সম্ভব কমিয়ে দেওয়া এবং আলী সনদে রূপান্তরিত করা। যেমন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে আসরের নামায আদায়ের পর ঘরে এসে সুন্নাত নামায আদায় করতেন। অথচ চূড়ান্ত নির্দেশ ছিল আসরের পরে আর কোন নামায নেই। কিছু লোক হযরত আয়িশার (রা) নিকট এক ব্যক্তিকে পাঠালো একথা জানার জন্য যে, তাঁর সূত্রে যে এই হাদীস বর্ণিত হচ্ছে, এর বাস্তবতা কতটুকু? তিনি বললেন, তোমরা উম্মু সালামার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। হাদীসটির আসল রাবী বা বর্ণনাকারী তিনিই। আর একবার এক ব্যক্তি তাঁকে মোযার উপর মাসেহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলেনঃ আলীর (রা) কাছে যাও। তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরে সংগে থাকতেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) নিজের বর্ণনাসমূহকে যে কোন রকমের ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেমন যুক্ত রেখেছেন, তেমনিভাবে বহুক্ষেত্রে অন্যদের বর্ণনাসমূহও সংশোধন করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সমকালীনদের বর্ণনাসমূহের অতি তুচ্ছ ক্রটি-বিচ্যুতিও অত্যন্ত কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন এবং সংশোধন করে দিতেন। মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় যা ‘ইদরাক’ নামে পরিচিত।

হযরত ‘আয়িশা (রা) বিশ্বাস করতেন, কোন বর্ণনা আল্লাহর কালামের বিরোধী হলে তা সঠিক নয়। পরবর্তীকালে হাদীস শাস্ত্র বিশারদরা এটাকে হাদীস যাচাই বাছাইরের একটি অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই মূলনীতির ভিত্তিতে হযরত ‘আয়িশা (রা) অন্যদের অনেক বর্ণনা সঠিক বলে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আর নিজের জ্ঞান অনুযায়ী সেই সব বর্ণনার প্রকৃত রহস্য ও ভাব বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবন আববাস (রা), হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) এবং আরও কতিপয় সাহাবী বর্ণনা করেছেনঃ

আবরী হবে

অর্থাৎ, পরিবারের লোকদের কান্নার জন্য মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দয়ে হয়।’

হযরত ‘আয়িমাকে (রা) যখন এই বর্ণনাটি শোনানো হলো তখন তিনি তা মানতোস্বীকার করলেন। বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন কথা কক্ষনো বলেননি। ঘটনা হলো, একদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ইহুদীর লাশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, দেখলেন তার আত্মীয় স্বজনরা চিল্লাপাল্লা ও মাতম করতে আরম্ভ করেছে। তখন তিনি বলেনঃ এরা কান্নাকাটি করছে আর তার উপর শাস্তি হচ্ছে। ‘আয়িশার (রা) বক্তব্যের মর্ম হলো, শাস্তির কারণ কান্নাকাটি করা নয়। অর্থাৎ এরা মাতম করছে, আর ওদিকে মৃতব্যক্তির উপর অতীত কৃতকর্মের জন্য শাস্তি হচ্ছে। কারণ, কান্নাকাটি করা তো অন্যের কর্ম। আর অন্যের কর্মফল মৃত ব্যক্তি কেন ভোগ করবে? তাই তিনি বলেন, তোমাদের জন্য কুরাআনই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেছেনঃ

আরবী হবে।

কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।

বর্ণনাকারী ইবন আবী মুলাইকা বলেন, হযরত ইবন ‘উমার (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) এমন বর্ণনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা যখন শুনলেন তখন কোন উত্তর দিতে পারেননি।

ইমাম বুখারী (রা) তাঁর সহীহ গ্রন্থের আল-জানায়িয’ অধ্যায়ে পৃথক একটি অনুচ্ছেদে হযরত ‘আয়িশার (রা) ও ইবন ‘উমারের (রা) বর্ণনা দুইটির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি বরেন, কান্নাকাটি ও মাতম করা যদি মৃত ব্যক্তির জীবিত অবস্থার অভ্যাস থেকে থাকে, আর সে যদি জীবদ্দশায় আপনজনদেরকেও এমন কাজ থেকে বিরত থাকার কথা না বরে থাকে তাহলে তাদের মাতমের আযাব তার উপর হবে। কারণ, তাদের শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব সে তাঁর জীবদ্দশায় পালন করেনি। আল্লাহ বলেনঃ

আরবী হবে

-হে ঈমানদার ব্যক্তিরা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।

আর জীবদ্দশায় পরিবার-পরিজনকে যথাযথ শিক্ষাদান সত্ত্বে্ও যদি তারা মৃত ব্যক্তির জন্য মাতম করতে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে আয়িশার (রা) মতই সঠিক। কারণ আল্লাহ তো বলেছেন, কেউ অপরের বোঝা বহন করব না।’ তিনি আরো বলেছেনঃ

আরবী হবে।

-কেউ যদি তার গুরুভার বহন করতোন্যকে আহবান করে কেউ তা বহন করবে না- যদি সে নিকটবর্তী আত্মীয়ও হয়।

প্রখ্যাত ইমাম ও মুহাদ্দিস হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন মুবারাকও ইমাম বুখারীর মত বলেছেন। তবে কেউ কেউ ইমাম বুখারীর সামঞ্জস্য চেষ্টার প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন এভাবে-কেউ যদি জীবদ্দশায় পরিবার-পরিজনের সঠিক শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব পালন না করে থাকে, তাহলে মৃত্যুর পর সে দায়িত্ব পালন না করার অপরাধের শাস্তি ভোগ করবে। জীÿÿতদের অপরাধের শাস্তি ভোগ করবে কেন? মুজতাহিদদের মধ্যে ইমাম শাফি’ঈ ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু হানীফা (রা) এই মাসয়ালায় হয়রত ‘আয়িশার (রা) মতের অনুসারী।

হযরত ইবন ‘আববাস (রা) থেকে বর্ণিত হযেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুইবার আল্লাহ রাববুল আলামীনকে দেখেছেন। হযরত মাসরূক (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) প্রশ্ন করলেনঃ আম্মা! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি আল্লাহকে দেখেছেন? ‘আয়িমা (রা) বললেনঃ তুমি এমন একটি কথা বলেছো যা শুনে আমার দেহের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। যে তোমাকে বলে যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহকে দেখেছেন সে মিথ্যা বলে। তারপর তিনি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ

আরবী হবে

-দৃস্টিসমূহ তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না, অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে বেষ্টন করতে পারেন। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী, সুবিজ্ঞ।

তারপর তিনি এই আয়তটি পাঠ করেনঃ

আরবী হবে।

-কোন মানুষের জন্য এমন হওয়ার নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেনঃ কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দাার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোন দূরত পাঠাবেন।

আরো কিচু হাদীসে হযরত ‘আয়িশার (রা) বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। সহীহ মুসিলমে সংকলিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তিনি তো নূর বা জ্যোতি। তাঁকে আমি কিভাবে দেখতে পারি।

মুত‘আ বিয়ে যা একটি নির্দিষ্ট সময় সীমা পর্যন্ত জাহিলী যুগ এবং ইসলামের সূচনাকাল থেকে ৭ম হিজরী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। খায়বার বিজয়ের সময় এ জাতীয় বিয়ে হারাম ঘোষিত হয়। এরপর হযরত ইবন ‘আববাস (রা)সহ আরো কিছু লোক এই বিয়ে জায়েয আছে বলে মনে করতেন। কিন্তু সাহাবীদের গরিষ্ঠ অংশ হারাম বলে বিশ্বাস করতেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) এক ছাত্র একদিন এই মুত‘আ বিয়ের বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। হযরত ‘আয়িশার (রা) তার জবাব হাদীস দ্বারা দেননি। তিনি বলেন, আমার ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব আছে। তারপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেনঃ

আরবী হবে

-এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভূক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কাৃত হবেনা।

এ কারণে এই দুই পদ্ধতি ছাড়া আর কোন পদ্ধতি জায়েয নেই। উল্লেখ্য যে, মুত‘আর মাধ্রমে রাভ করা নারী, স্ত্রী বা দাসী কোনটিই নয়।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন, অবৈধ ছেলে তিনজনের মধ্যে (পিতা-মাতা ও সন্তান) নিকৃষ্টতম।

একথা হযরত ‘আয়িশার (রা) কানে গেলে বলেন, এ কথা সঠিক নয়। ঘটনা হলো, একজন মুনাফিক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দামন্দ করতো। রোকেরা একদিন বললোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকটি জারজ সন্তানও। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল-াম) মন্তব্য করেনঃ সে তিনজনের মধ্যে অধিকতর নিকৃষ্ট। অর্থাৎ তার মা-বাবা তো শুধু অপকর্ম করেছেঃ কিন্তু তারা আল্লাহর রাসূলের নিন্দামন্দা করেনি। আর তাদের সেই অপকর্মের ফসল এই সন্তান আল্লাহর রাসূলের নিন্দামন্দা করে। সুতরাং সে তাদের থেকেও খারাপ। ‘আয়িশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই মন্তব্য ছিল এক বিশেষ ঘটনার জন্য, সবার জন্য নয়। কারণ আল্লাহ তো বলেছেনঃ ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।’ অর্থাৎ অপরাধ মা-বাবার। সন্তান তার জন্য দায়ী হবে কেন?

বদর যুদ্ধে যে সকল কাফির নিহত হয়, তাদেরকে বদরেই একত্রে মাটি চাপা দেওয়া হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বরেনঃ

আরবী হবে

-তোমরা কি তোমদের প্রতিপালকের ওয়াদা সত্য পেয়েছো? সাহাবীরা প্রশ্ন করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহর! আপনি মৃতদেরকে সম্বোধন করছেন? ইবন ‘উমার পিতা ‘উমার (রা) থেকে এবং আনাস ইবন মালিক আবু তালহা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

আরবী হবে

তোমরা তাদের চেয়ে বেশি শুনতে পাওনা। তবে তারা জবাব দিতে পারে না।

হযরত ‘আয়িশার (রা) যখন এই বর্ণনার কথা বলা হলো, তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) একথা নয়, বরং এই বলেছেনঃ

আরবী হবে

-এখন তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছে যে, আমি তাদেরকে যা কিছু বলতাম তা সবই সত্য।

তারপর হযরত ‘আয়িশা (রা) কুরআনের এই আয়াত দুইটি পাঠ করেনঃ

আরবী হবে

-‘আপনি আহবান শোনাতে পারবেন না মৃতদেরকে’

‘আপনি কবরে, শায়িতদেকে শুনাতে সক্ষম নন।’

পরবর্তীকালে মুহাদ্দিসগণ হযরত ‘আয়িশার (রা) যুক্তি-প্রমাণ মেনে নিয়ে দুইটি বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেছেন। প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত কাতাদা (রা) বলেনঃ বদরে নিহতদের কিছু সময়ের জন্য আল্লাহ জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। রাসূলুর্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) একটি মু‘জিযা হিসেবে তাদেরকে সেই সময়ের জন্য শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কোনvানবিষয়ে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যে বর্ণনা পার্থক্য দেখা যায়, তার ভিত্তিানেকটা তাদের বুঝার পার্থক্য।

আল্লাহ প্রদত্ত এই বুঝ শক্তি ও মেধা আবার হযরত ‘আয়িশা (রা) ানেরেক চেয়ে বেশি; পরিমাণে রাভ করেছিলেন। তাঁর এই অতুলনীয় বোধশক্তি ও অনুধাবন ক্ষমতা তিনি কাজে রাগান হাদীস বর্ণনা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে। এখানে আমরা এমন কেয়কটি ঘটনা উল্লেখ করছি যাতে ত৭ার তীক্ষ্ম বোধ ও বুদ্ধির ছাপ ফুটে উঠেছে।

হযরত আবু সা‘ঈদ খুদরীর (রা) জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নতুন কাপড় চেয়ে নিয়ে পরেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘একজন মুসলমান যে লিবাসে (পোশাকে) মারা যায় তাকে সেই লিবাসেই উঠানো। হয়।’ একথা হযরত ‘আয়িশা (রা) জানতে পেরে বলেন, আল্লাহ আবু সা‘ঈদের উপর হরমত বর্ষণ করুন। ‘লিবাস’ বলতে রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) বুঝাতে চেয়েছেন মানুষের ‘আমল বা কর্ম’। অন্যথায় রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তো স্পষ্টভাবে বলেছন, কিয়ামতের দিন মানুষ খালি গা, খারি পা ও খালি মাথায় উঠবে।

ইসলামের নির্দেশ হলো, তালাকপ্রাপ্ত নারী স্বামীর ঘরেই ইদ্দত পালন করবে। এই নির্দেশের বিরোধী ফাতিমা নাম্নী একজন মহিলা সাহাবী তাঁর নিজের জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করতেন। তিনি বরতেন, রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) আমাকে ইদ্দত পালনকারীন সময়ে স্বামীর ঘর থেকে অন্যত্র যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বহু সাহাবীর সামনে প্রমাণ হিসেবে নিজের এই ঘটনা উপস্থাপন করেন। অনেকে তাঁর এই বর্ণনা গ্রহণ করেন, তবে বেশির ভাগ সাহাবী তা মানতে অস্বীকার করেন। ঘটনাক্রমে মারওয়ান যখন মদীনার গভর্নর তখন এই ধরনের একটি মোকদ্দমা দায়ের হয়। এক পক্ষ ফাতিমার বর্ণনাকে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করায়। এ কথা হযরত ‘আয়িশার (রা) জনাতে পেরে ফাতিমাকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন। তিনি বরেন, ফাতিমার এই ঘটনা বণৃনাতে কোন কল্যাণ নেই। রাসূলুল্লাহ(সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ইদ্দত পারনকালীর সময়ে তাকেস্বামীর গৃহ থেকে অন্যত্র যাওয়ারানুমতি অবশ্রই দিয়েছিলেন। তিন্তু তা এই কারণে যে, তার স্বামীর বাড়িটি ছির একটি অনিরাপদ ও ভীতিকর স্থানে।

একধিক সহীহ দাসীস থেকে জানা যায় যে, ছাগলের বাহুর গোশত রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) অধিক পছন্দ ছিল। হযরত ইবন মাস‘উদ (রা) বলেন, নবীর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কাছে বাহুর গোশতই বেশি পছন্দনীয় ছিল। বাহুর গোশতেই বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।

আবূ ‘উবায়েদও বলেনঃ নবী (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) বাহুর গোশতই বেশি পছন্দ করতেন। কিন্তু এ ব্যাপারে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

আবরী হবে

-রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) নিকট বাহুর গোশতইাধক প্রিয় ছির তা নয়, বরঙয প্রকৃত ব্যাপার এই যে, অনেক দিন পর পর তিনি গোশত খাওয়ার সুযোগ পেতেন। তাইাঁকে বাহুর গোশত পরিবেশন করা হতো। কেননা বাহুর গোশত দ্রুত সিদ্ধা হয় এবং গলে যায়। কোন ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিনের কোন অতি ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ বন্ধু যত বেশিই জানুক না কেন, একজন স্ত্রী তার চেয়ে অনেক বেশিই চেনে থাকে। রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্তগোটা দেহ ছির প্রতিটি মুহূর্তের জন্য একটি দুষ্টান্ত ও আদর্শ স্বরূপ। এ কারণে তাঁর জীবনের প্রতিটি সময়ের প্রতিটি কর্ম আইন ও বিধানের মর্যাদা রাভ করেছে। সুতরাংয় বলা চলে, তাঁর বেগমগণ তাঁর সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে জানার যে সুযেগ লাভ করেন তান্যদের জন্য ছিল অসম্ভব। কিছু কিছু মাসয়ালা এমন আছে,…দেখা যায় অন্য সাহাবায়ে কিরাম সেকানে নিজ নিজ ইজতিহাদ অথবা কোন বর্ণনার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, কিন্তু হযরত ‘আয়িশার (রা) নিজের একান্ত ব্যক্তিগতাভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজ পর্যন্ত ঐ সব মাসয়ালায় তাঁরই কথা প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়ে আসছে। পাঠকদেরাবগতির জন্য এখানে স রকম কয়েকটি মাসয়ালা উরে্খ করা হলো।

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার (রা) ফাতওয়া দিতেন, গোসলের সময় মেয়েদের চুলের খোপা খুলে চুল ভিজানো জরুরী। হযরত ‘আয়িশা (রা) একথা শুনে বললেন, তিনি মহিলাদেরকে একথা কেনবলেন দেন না যে, তারা যেন তাদের খোপা কেটে ফেলে। আমি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সামনে গোসল করতাম এবং চুল খুলতাম না।

হযরত ইবন ‘উমার (রা) বলেতেন, অজু অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু দিলে আজু ভেঙে যায়। একথা ‘আয়িশা (রা) শুনে বললেন, রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) চুমু খাওয়ার পর অজু করতেন না। একথা বলে তিনি মৃতু হেসে দেন।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করতেন, নামায আদায়কারী পুরুষের সামনে দিয়ে যদি নারী, গাধা অথবা কুকুর যায়, তাহলে পুরুষের নামায নষ্ট হয়ে যায়। হযরত ‘আয়িশা (রা) একথা শুনে রেগে যান। তিনি বলেন, আমরা, নারীদেরকে তোমরা গাধা ও কুকুরের সমান করে দিয়েছো। আমি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সামনে পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতাম, আর তিনি নামায়ে দাঁড়ানো থাকতেন। যখণ সিজদায় যেতেন, হাত দিয়ে টোকা দিতেন। আমি পা গুটিয়ে নিতাম। তিনি দাঁড়িয়ে গেলে আবার পা ছড়িয়ে দিতান। আবার কখনো প্রয়োজন হলে নিজেকে গুটিয়ে সামনে দিয়ে চলে যেতাম।

হযরত আবু হুরাইয়া (রা) একদিন ওয়াজ করতে গিয়ে বর্ণনা করেন, রোযার দিনে কারো যদি সকালে গোসল করার প্রয়োজন দেখা দেয় সে যেন সেদিন রোযা না রাখে। লোকেরা হযরত ‘আয়িশা (রা) ও হযরত উম্মু সালামার (রা) নিকট গিয়ে একথার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলো। ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কর্ম পদ্ধতি এর বিপরীত ছিল। লোকেরা আবার আবু হুরাইরার (রা) নিকট গিয়ে সতর্ক করলো। অবশেষে তিনি তাঁর পূর্বের ফাতওয়া প্রত্যাহার করেন।

হযরত ‘আবদুল্লাহর ইবন ‘আববাস (রা) ফাতওয়া দিতেন যে, কেউ যদি হজ্জ না করে, শুধু মাত্র কুরবানীর পশু মক্কার হারামে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই পশু সেখানে জবেহ হবে তার উপর সেই সকল শর্ত আপতিত হবে যা একজন হাজীর উপর হয়। একথা শুনেহযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, আমি নিজের হাতে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কুরবানীর পশুর রশি পাকিয়েছি, তিনি নিজ হাতে সেই রশি কুরবানীর পশুর গলায় পরিয়েছেন। তারপর আমার পিতা সেগুলি নিয়ে মক্কায় গেছেন। তা সত্ত্বেও সব কিছু হালাল ছিল। কোন হালাল নিজিসই কুরবানী পর্যন্ত হারাম হয়নি।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, হযরত ‘আয়িশা (রা) অসাদারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারিনী ছিলেন। মূলতঃ স্মৃতিশক্তি আল্লাহ পাকের এক অনুগ্রহ। তিনি পূর্ণমাত্রায় এ অনুগ্রহ লাভ ধন্য হন। ছোট বেলায় খেলতে খেলতে কুরআনের যে সব আয়াত কানে এসেছে, সারা জীবন তা স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। হাদীস শাস্ত্রের নির্ভরতা তো এই স্মৃতি ও মুখস্থ শক্তির উপর। নবুওয়াতী সময়কালের প্রতিদিনের ঘটনা মনে রাখা, প্রতিনয়ত তা হুবহু বর্ণনা করা, রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) মুখ থেকে যে শব্দাবলী যেভাবে শুনেছেন তা সেই ভাবে অন্যের কাছে পৌঁছানো একজন সফল মুহাদ্দিসের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর সমকালীনদের যে ভুলত্রুটি ধরেছেন এবং তাঁদের যে সমালোচনা করেছেন, তাতে তাঁদের মধ্যের মুখস্ত শক্তির পার্থক্য ও ভিন্নতা বিশেষভাবে কাজ করেছে। এখানে এমন কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো যা দ্বারা তাঁর প্রখর স্মৃতি শক্তির প্রমাণ পাওয়া যাবে।

হযরত সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) ইনতিকাল করলেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) চাইলেন, লাশ মসজিদে আনা হোক, তাহলে তিনিও জানাযায় শরীফ হতে পারবেন। লোকেরা প্রতিবাদ করলো। হযরতঃ ‘আয়িশা (রা) বললেন, লোকেরা কত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুহাইল ইবন বায়দার (রা) জানাযার নামায মসজিদেই পড়েছিলেন।

হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমারকে (রা) লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) কতবার উমরা আদায় করেছেন? জবাব দিলেনঃ চারবার। তার মধ্যে একটি ছিল রজব মাসে। উরওয়া (রা) চেঁচিয়ে বলে উঠলেনঃ খালা আম্মা! এ কি বলছে আপনি কি শুনছেন না? তিনি জানতে চাইলেনঃ সে কি বলে? ‘উরওয়া বললেনঃ তিনি বলেন, রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) চারটি ‘উমরা করেছেন, যার একটি রজব মাসে। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ আবু ‘আবদির রহমানের (ইবন ‘উমারের উপনাম) উপর রহম করুন। রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) এমন কোন ‘উমরা করেননি যাতে আমি শরীক থাকিনি। রজবে তিনি কোন ‘উমরা করেননি।

মুহাদ্দিসীন কিরাম, হাদীস বর্ণনার দিক দিয়ে সাহাবা-ই কিরামকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন এবং প্রায় প্রতিটি স্তরে পুরুষ সাহাবীদের সাথে মহিলা সাহাবীরাও আছেন। ১ম স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এক হাজার অথবা তার উর্ধ্বে। হযরত ‘আয়িশা (রা) এই স্তরের অন্তর্গত। ২য় স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা পাঁচ শো অথবা তার উর্ধ্বে, কিন্তু এক হাজারের কম। এই স্তরে কোনমহিলা সাহাবী নেই। ৩য় স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা এক শো অথবা তার ঊর্ধ্বে; কিন্তু পাঁচ শো’র কম। হযরত উম্মু সালামা (রা) এই স্তরের অন্তর্গত। ৪র্থ স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা সংখ্যা চল্লিশ থেকে একশো পর্যন্ত। এই স্তরে বেশির ভাগ মহিলা সাহাবী। যেমন উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মু হাবীবা (রা), উম্মে ‘আতিয়্যা (রা), উম্মুল মু’মিনীন হযরত হাফসা (রা), আসমা বিনত আবী বকর (রা), উম্মু হানী (রা) প্রমুখ। ৫ম স্তরঃ যে সকল সাহাবীর বর্ণনা সংখ্যা চল্লিশ অথবা তার কম। এই স্তরের সদস্যরা অধিকাংশ মহিলা। যেমনঃ হযরত উম্মু কায়স (রা), হযরত ফতিমা বিনত কায়স (রা), হযরত রাবী‘ বিনত মাসউস (রা), হযরত সুবরা নিবত সাফওয়ান (রা), হযরত কুলসুম বিনত হুসাইন গিফারী (রা), হযরত জা‘দা বিনত ওয়াহাব (রা) প্রমুখ।

উপরে এই স্তরগুলির আলোচনা দ্বারা আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হাদীস শাস্ত্রে হযরত ‘আয়িশার (রা) মর্যাদা বা স্থান কোথায়। আমরা দেখতে পেলাম তাঁর স্থান সর্বোচ্চ স্তরে।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশা (রা) সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া পিতা হযরত আবু বকর (রা), ‘উমার (রা), ফাতিমা (রা), সা‘দ (রা) এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে যাঁরা হাদীস শুনেছেন এবং হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের সংখ্যা অনকে। তাঁদের মধ্যে সাহাবী ও তাবে‘ঈ উবয় শ্রেণীর লোক আছেন। ‘আল্লামা জাহাবী প্রায় দুই শো’ লোকের নাম উল্লেখ করার পর বলেছেন, এছাড়া আরো অনেকে।

সাহাবীদের বর্ণনা ও হাদীসের লেখা-লেখি ও গ্রন্থাবদ্ধের কাজ হিজরী প্রথম শতর্কের মাঝামাঝি শুরু হয়ে যায়। এ শতকের প্রন্তসীমায় উমাইয়্যা খালীফা হযরত ‘উমার ইবন আবদিল আযীয (রহ) খিলাফতের মসনদে আসীন হন। তাঁর সময়ে মদীনার কাজী ছিলেন ইতিহাস-প্রসিদ্ধ ব্যক্তি আবু বকর ইবন ‘আমর ইবন হাযাম আল আনসারী। কুরআন-হাদীসে তিনি এক বিশাল পান্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর এই পান্ডিত্যের পিছনে তাঁর খালা হযরত ‘উমরার অবদান ছির সবচেয়ে বেশি। এই ‘উমরা ছিলেন হযরত ‘আয়িশার (রা) ছাত্রী ও তাঁর তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত। খলীফা ‘উমার ইবন আবদিল আযীয, আবু বকর-কে নির্দেশ দেন, তিনি যে ‘উমরার বর্ণনাসমূহ লিখে তাঁর কাছে পাঠান।

‘ইলমে ফিকহ্ ও কিয়াস

আল-কুরআন ও আল-হাদীস বা আস-সুন্নাহ হলো দলিল ও প্রমাণ, আর ফিকহ হলো তার সিদধান্ত ও ফলাফল। কুরআন ও হাদীসের উপর ভিত্তি করে যে সকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তাই হলো ফিকহ ও কিয়াস। এই ইল্মে ফিকহ ও কিয়াসে হযরত ‘আয়িশা (রা) যে কি পরিমাণ পারদর্শী ছিলেন তা পূর্বের আল-কুরআন ও আল-হাদীসে তাঁর পারদর্শিতার আলোচনা থেকে কিছুটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এখানে ফিকহ ও কিয়াসে তাঁর উসূল বা নীতিমালা কি ছিলো সে সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা হলো।

রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবনকালে তিনি নিজেই ছিলেন যাবতীয় ফাতওয়া ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। কোন সমস্যার উদ্ভব হলে তিনিই তার সামাধান বলে দিতেন। রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ইনতিকালের পর উঁচু স্তরের সাহাবীগণ, যাঁরা শরীয়াত ও আহকামে ইসলামীর গভীর তাৎপর্য বিষয়ে দক্ষ ছিলেন, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ‘উমারের (রা) সামনে যখন কোন নতুন সমস্যার উদ্ভব হতো থখন তিনি ‘আলিম সাহাবীদেরকে এমত্র করে তাঁদের নিকট সিদ্ধান্ত চাইলেন। তাঁদের মধ্যে কারো কাছে যদি বিশেষ কোন হাদীস থাকতো তিনি তা বর্ণনা করতেন। অন্যথায় কুরআন ও হাদীসের অন্য কোন হুকুমের উপর কিয়াস বা অনুমান করে সিদ্ধান্ত দিতেন। খিলাফতে রাশেদার তৃতীয় খলীফা পর্যন্ত এই ফিকহ একাডেমী ছিল মদীনাকেন্দ্রিক। হযরত ‘উসমানের (রা) খিলাফতকালে অরাজকতা ও অশান্তি মাথাচাড়া দেয় এবং বহু মানুষ মদীনা ছেড়ে মক্কা, তায়িফ, দিমাশক, বসরা প্রভৃতি স্থানে আবাসন পড়ে তোলে। অতপর হযরত ‘আলী (রা) খলীফা হলেন। তিনি কুপকে বানালেন ‘দারুল খিলাফা’। এসব কারণে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) দারসগাহের মেধারবী শিক্ষার্থীদের অনেকই মদীনা ছেড়ে অন্য শহরে চলে যান। তবে এর ফলে জ্ঞান চর্চার বেষ্টনী ও পরিধি আরো বিস্তার লাভ করে। কিন্তু তার সম্মিলিত রূপ বা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। যা কিছু বিদ্যামন ছিল তা কেবল মদীনাতেই।

উঁচু স্তরের সাহাবীদের পরে মদীনায় হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার, হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস, হযরত আবু হুরাইরা ও হযরত ‘আয়িশা (রা)-এ চারজন বেশির ভাগ সময় ফিকহ ও ফাতওয়ার কাজ করেন। কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান যেখানে নেই সেখানে এ চারজনের নীতিও ছির ভিন্ন। ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘উমার ও আবু হুরাইরার (রা) রীতি ছির যে, উপস্থিত মাসয়ালা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ কোন হুকম বা পূর্ববর্তী খলীফাদের কোন আমল যদি থাকতো, তারা তা বলে দিতেন। আর যদি তা না থাকতো তাঁরা নীরব থাকতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন ‘আববাস (রা) এ ক্ষেত্রে কুরআন, সুন্নাহ ও পূর্ববর্তী খলীফাদের সময়ে সমাধানকৃত মাসয়ালার উপর কিয়াস করে নিজের বোধ ও বুদ্ধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিতেন। এক্ষেত্রে হযরত ‘আয়িশা (রা) উসুল ছিল, প্রথমে তিনি কুরআন থেকে সমস্যার সমাধান খুঁজতেন। সেখানে না পেলে সুন্নাহর দিকে দৃষ্টি দিতেন। সেখানে ব্যর্থ হলে নিজের বুদ্ধি অনুযায়ী কিয়াসকরতেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) ইজতিহাদ ও ইসতিমবাতের (গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ) রীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে ইতিপূর্বে কিছু আলাচনা আমরা করেছি। এখানে আরো কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি।

কুরআনে এসেছে;

আরবী হবে

-‘‘তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন ‘কুরূ’ পর্যন্ত।’’ অর্থাৎ তার ইদ্দতের সময়সীমা তিন ‘কুরূ’। এই ‘কুরূ’-এর অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে। হযরত ‘আয়িশার (রা) এক ভাতিজীকে তার স্বামী তালাক দেয়। তিন ‘তুহূর’ অর্থাৎ পবিত্রতার তিনটি মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পর যখন নতুন মাস শুরু হয় তখন তিনি তাকে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে আসতে বলেন। কিছু লোক তাঁর এ কাজের প্রতিবাদ করে বলেন, এটা কুরআনের হুকুমের পরিপন্থী। তাঁরা তাঁদের মতের সপক্ষে কুরআনের উপরে উল্লেখিত আয়াতটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। জবাবে উম্মুল মু’মিনীন বলেন, ‘তিন কুরূ’-তা ঠিক আছে। তবে তোমরা কি জান ‘কুরূ’-এর অর্থ কি? ‘কুরূ’ অর্থ ‘তুহুর’ (পত্রিবতা)। মদীনার সকল ফকীহ এ মাসয়ালায় হযরত ‘আয়িশার (রা) অনুসরণ করেছেন। তবে ইরাকীরা ‘কুরূ’ অর্থ হায়েজ (মাসিকের বিশেষ দিনগুলি) বুঝেছেন।

হযরত যায়িদ ইবন আরকাম (রা) এক মহিলার নিকট থেকে বাকীতে আট শো দিরহামে একটি দাসী খরীদ করলেন। শর্ত করেন যে ভাতা পেলে মূল্য পরিশোধ করবেন। মূল্য পরিশোধের পূর্বেই তিনি উক্ত দাসীটি নগদ ছয়শো দিরহামে আবার সেই মহিলার নিকট বিক্রি করেন। মহিলা ক্রয় বিক্রয়ের এ বিষয়টি হযরত ‘আয়িশার (রা) অবহিত করেন। হযরত ‘আয়িশা (রা) মিহিলাকে বলেন, তুমিও খারাপ কাজ করেছো এবং যায়িদ ইবন আরকামও। তুমি তাঁকে বলে দিবে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সাথে জিহাদ করে যে সাওয়াব অর্জন করেছিলেন তা বরবাদ হয়ে গেছে। তবে তিনি যদি তাওবা করে নেন।

এই বিশেষ অবস্থায় হযরত ‘আয়িশা (লা) অতিরিক্ত দুই শোধ দিরহামকেসুদ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আয়িশা (রা) সূরা আল-বাকারার ২৭৫তম আয়াতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দানের ক্ষমতা অর্পণ করে এবং স্ত্রী সে ক্ষমতা স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়ে উক্ত স্বামীকে যেমেন নেয় তাহলেও কি সেই স্ত্রীর উপর কোন তালাক পড়বে? এ প্রশ্নে হযরত ‘আলী (রা) ও হযরত যায়িদের (রা) মতে একতালাক হয়ে যাবে। কিন্তু হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, একতালাকও হবে না। তিনি তাঁর মতের সপক্ষে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সেই ‘তাখঈর-এর ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেণ, রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তাঁর স্ত্রীদেরকে এই ইখতিয়ার বা স্বাধীনতা দিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁকে ছেড়ে পার্থিব সুখ-ঐশ্বর্য গ্রহণ করতে পারেন অথবা তাঁর সাথে থেকে এই দারিদ্র্য ও অনাহারকে বরণ করতে পারেন। সবাই দ্বিতীয় অবস্থাটি গ্রহণ করেন। এতে কি তাদের উপর এক তালাক পতিত হয়েছে?

কেউ যদি কোন দাস মুক্ত করে তাহলে সেই মনিব ও মুক্তিপ্রাপ্ত দাসের মধ্যে ইসলামী বিধান মতে এক প্রকার সম্পর্ক সৃষ্টি হয় যাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘আল-ওয়ালা’ (অভিভাবকত্ব) বলে। যার ফলে মুক্তিদানকারী মনিব মুক্তিপ্রাপ্ত দাসের সম্পদের উত্তারাধিকারী হতে পারে, এবং আইনগতভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস পূর্বের মনিবের বংশের লোক বলে স্বীকৃতি প্রাপ্ত হয়। এ কারণে এ ‘নাল-ওয়ালা’ সম্পর্কের গুরুত্ব অভ্যাধিক। একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস একবার হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে বললো, আমি ‘উতবা ইবন আবী লাহাবের দাস ছিলাম। তারা স্বামী-স্ত্রী আমাকে এই শর্তে বিক্রী করে দেয় যে, আমি মুক্ত হলে আমার ‘আল-ওয়ালা’-এর অধিকারী হবে সে। এখন আমি মুক্ত। আমার এই ‘আল-ওয়ারা’ এর সম্পর্কে হবে কার সাথে? ‘উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে, না যে মুক্ত করেছে তার সাথে? হযরত আয়িশা (রা) বললেন, ‘বারীরা’ নাম্নী দাসীর অবস্থাও ছিল এমন। রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) আমাকে বলেন যে, বারীরাকে খরীদ করে আযাদ করে দাও। তুমিই তার ‘আল-ওয়ারা’ এর অধিকারিণী হবে-বিক্রয়কারী আল্লাহর হুকুমের পরিপন্থী যত শর্তই আরোপ করুন না কেন।

হযরত বারীরা (রা) ছিলেন একজন দাসী। তাঁর মনিব তাঁকে এ শর্তে বিক্রী করতে চায় যে, তিনি মুক্ত হলে তাঁর আল-ওয়ারা-এর অধিকারী সে হবে। হযরত বারীরা (লা) হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট এসে নিজের অবস্থার কথা তাঁকে বলেন। হযরত আয়িশা (রা) তাঁকে ক্রয় করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন; কিন্ত তাঁর মনিবের আল-ওয়ালার শর্তটি মানতে রাজি হলেন না। রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ঘরে এলে তিনি বিষয়টি অবহিত করেন। রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ‘আয়িশাকে (রা) বলেন-তুমি নির্দ্বিধায় তাঁকে ক্রয় করে মুক্তি দিতে পার। আল্লাহর কিতাবের বিরোধী শর্ত স্বাভাবিকভাবেই রহিত হয়ে যাবে। বারীরা (রা) দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। দাসী অবস্থায় যার সাথে বিয়ে হয়েছিল, মুক্ত হয়ে তাঁকে আর স্বামী হিসেবে গ্রহণকরলেন না। লোকেরা তাঁকে সাদাকা দিত। তিনি সেই সাদাকা থেকে কিছু খাদ্য বস্ত্ত রাসূলকে (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তা গ্রহণ করতেন।

হযরত বারীরার (রা) এ ঘটনা থেকে হযরত ‘আয়িশা (রা) শরীয়াতের একাধিক হুকুম বের করেছেন। তিনি বলতেনঃ বারীরার মাধ্যমে ইসলালেম তিনটি বিধান জানা যায়। যথাঃ

  1. মুক্তিদানকারী ব্যক্তিই হবে আল-ওয়ালার অধিকারী।
  2. দাসত্ব অবস্থায় যদি একটি দাস ও একটি দাসীর বিয়ে হয় এবং পরে স্ত্রী দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়, কিন্তু স্বামী দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, তাহলে দাস স্বামীকে গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার স্ত্রী লাভ করে।
  3. যদি দান-সাদাকা পাওয়ার উপযুক্ত কোন ব্যক্তি কোন কিছু দান-সাদাকা হিসেবে পায় এবং সে তা থেকে কিচু এমন ব্যক্তিকে হাদিয়া হিসেবে দেয় যে সাদাকা পাওয়ার উপযুক্ত নয়, তাহলে সে ব্যক্তির জন্য তা গ্রহণ করা জায়েয হবে।

বিদায় হজ্জ কিছু কম-বেশি প্রায় একলাখ মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। উঁচু স্তরের সকল সাহাবী এ সফরে রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) সফরসঙ্গী ছিলেন। এ সফরের যাবতীয় ঘটনা সকলের জানা থাকার কথা। হযরত ‘আয়িশাও (রা) নিজের ঘটনাবলী স্মৃতিতে ধরে রাখেন। বিভিন্ন হাদীসেতা হুবহু বর্ণিতও হয়েছে। তবে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনাসমূহ ফকীহ ও মুজতাহিদদের মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে। হযরত ‘আয়িশা (রা) ঠিক হজ্জের অনুষ্ঠানগুলি আদায়কালীন সময়ে মধ্যে নারী প্রকৃতির বিশেষ অবস্থা দেখা দেওয়ায় হজ্জের কিচু অনুষ্ঠান আদায়ে অপারগ হয়ে পড়েন। এতে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) তাঁকে সান্ত্বানা দেন এবং তাঁরই নির্দেশে তিনি ‘তানঈম’-এ নতুন করে ‘ইহরাম’ বেঁধে কা‘বার তাওয়াফ করেন। হাফেজ ইবন কায়্যিম (রা) হযরত ‘আয়িশার (রা) এ বর্ণনাটি নকল করার পর বলেছেনঃ

আরবী হবে

-হযরত ‘আয়িশার (রা) এ হাদীস থেকে হজ্জের অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মূলনীতি গৃহীত হয়েছে। যেমনঃ

  1. যে ব্যক্তি হজ্জের সাথে ‘উমরার নিয়্যেত অর্থাৎ ‘কিরান’ হজ্জের নিয়্যেত করবে তার জন্য একটি তাওয়াফ ও সা‘ঈ করলে হয়ে যাবে।
  2. নারীদের ক্ষেত্রে শারীরিক বিশেষ অবস্থান প্রেক্ষিতে ‘তাওয়াফুল কুদুম’ রহিত হয়ে যাবে।
  3. নারীদের বিশেষ অবস্থা দেখা দিলে হজ্জের পরে ‘উমরার নিয়্যেত করা জায়িয।
  4. নারীরা বিশেষ অবস্থঅয় শুধু কা‘বার তাওয়াফ ছাড়া হজ্জের অন্য সব কাজ আদায় করতে পারবে।

5.‘তান‘ঈম’ ‘হারাম’-এর অন্তর্ভূক্ত নয়। হারাম-এর বাইরে।

6.‘উমরা এক বছরে, রবং এক মাসেও দুইবার আদায় করা যায়।

  1. কেবলমাত্র হযরত ‘আয়িশার (রা) এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, মক্কার বাইরের লোকেরা মক্কা থেকেই (তান‘ঈম) ইহরাম বেঁধে উমরা আদায় করতে পারে।

এখানে কিয়াসে ‘আকলী বা প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিনির্ভর অনুমান সম্পর্কে একটু আলোচনা করা দরকার। কিয়াসে ‘আকলী অর্থ এই নয় যে, যে কেউ নিজের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে শরীয়াতের কোন হুকুম স্মপর্কে সিদ্ধান্ত দান করবে। বরং তার অর্থ হলো, আলিমগণ, যাঁরা শরীয়াতেরও গূঢ় রহস্য এবং দীনী ইলমসমূহে অভিজ্ঞ, কিাত ও সুন্নাহর অধ্যয়ন; গবেষণা এবং নিজেদের জীভনে তা বাস্তবায়নের কারণে তাঁদের মধ্যে এমন এক যোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে যায় যে, যখন তাঁদের সামনে কোন নতুন মাসয়ালা আসে তখন তাঁরা তাঁদের সেই যোগ্যতা বলে বুঝতে সক্ষম হন যে, যদি শারে’ (আ) (বিধানদাতা) অর্থাৎ রাসূল (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবিত থাকতেন, তাহলে তিনি এই জবাব দিতেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কোন অভিজ্ঞ আইনজীবি কোন বিশেষ আদালতের বহু মামলার রায় যিনি দেখেছেন। তারপর তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঐ জাতীয় কোন মোকদ্দমা স্মপর্কে সেই সকল রায়ের উপর অনুমান করে যদি একথা বলে দেন যে, মোকদ্দামাটি এই আদালতে উঠলে তার রায় এমন হবে। তখন তাকে কিয়াসে ‘আকলী বলা হবে। ইসলামী শরীয়াতে নজীর ও ফায়সালা (দৃষ্টান্ত ও সিদ্ধান্ত) সমূহ সম্পর্কে হযরত আয়িশা (রা) যে কতখানি অবহিত ছিলেন তা আমাদের পূর্বের আলোচনায় মোটামুক্তি স্পষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে তাঁর কিয়াসে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা খুব কম থাকাই স্বাভাবিক। এখানে আমরা হযরত ‘আয়িশার (রা) কিয়াসে ‘আকলীর একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি।

রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবদ্দশায় সাধারণভাবে মহিলারা মসজিদে আসতো এবং নামাযের জামায়াতে শরীক হতো। পুরুষদের পিছনে শিশু-কিশোররা এবং তাদের পিছনে মহিলারা সারিবদ্ধ হতো, রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) মহিলাদের মসজিদে আসতে বারণ করতে নিষেধ করেন।

তিনি বলেনঃ

আরবী হবে

রাসূলুল্লাহর (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) ওফাতের পর বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের সাথে আরবদের উঠা-বসা, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও আর্থিক প্রাচুর্যের কারণে মহিলাদের চাল-চলন, সাজ্জা ও বেশ-ভুষায় পরিবর্তন আসে। এ অবস্থা দেখে হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ ‘আজ যদি রাসূলুল্লাহ (সাল¬াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম) জীবিত থাকতেন তাহলে মহিলাদের মসজিদে আসতে বারণ করতেন।’ তাঁর বক্তব্য নিম্নরূপঃ

আরবী হবে

‘‘আমারাহ থেকে বর্ণিত। হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেন, ‘‘আজকাল মহিলারা যে সব নতুন কথা ও কাজের জন্ম দিচ্ছে, যদি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ সময় জীবিত থাকতেন তাহলে তাদের মসজিদে আসা বন্ধ করে দিতেন, যেমন ইহুদী মহিলাদের বন্ধ করা হয়েছিল।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) এ সিদ্ধান্ত যদিও সে সময় বাস্তবায়িত হয়নি, তবে তার ভিত্তি ছিল ঐ কিয়াসে আকলী। তিনি তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝেছিলেন, এক্ষেত্রে শরীয়াতের হুকুম কেমন হতে পারতো।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) ফাতওয়া দিতেন, কোন ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলে তাকেও গোসল করতে হবে। আর যদি কেউ মৃতের খাটিয়া বহন করে তাকে দ্বিতীয়বার ওজু করতে হবে। একথা হযরত ‘আয়িশার (রা) কানে গেলে বলেনঃ

আরবী হবে

‘‘মুসলমান মোর্দাও কি নাপাক হয়ে যায়? আর কেউ যদি কাঠ বহন করে তাতে তার কি হয়?’’

গোসল ওয়াজিব হওয়ার জন্য ধাতু নির্গত হওয়া প্রয়োজন কিনা, সে সম্পর্কে সাহাবীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। হযরত জাবির (রা) বলতেনঃ আরবী হবে ‘পানির জন্য পানি।’ -অর্থাৎ ধাতু নির্গত হলেই কেবল পানি ব্যবহার প্রয়োজন, অন্যথায় নয়। হযরত ‘আয়িশা (রা) এ মতের বিপরীত একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, ‘‘কেউ যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং পানি বের না হলেও তো তোমরা তাকে রজম করে থাক, তাহলে গোসল ওয়াজিব হবে না কেন?’’

সাহবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে হযরত ইবন ‘উমার (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাবতীয় কর্মকে সুন্নাত বলে মনে করতেন এবং সে অনুযায়ী আমল করতেন। ফকীহগণ সুন্নাতকে যে ইবাদী ও ‘আদী দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন, তিনি তা করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাসূরুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন কাজ যে কারণেই করুন না কেন, তা সুন্নাত। তা অনুসরণ করা জরুরী।এ কারণে তিনি সফরের মানযিল-এর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুসরণ করতেন। অর্থাৎ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন সফরে যেখানে যেখানে অবস্থান করেছেন, ইবন ‘উমার (রা) পরবর্তীকালে ঠিক সেখানেই অবস্থান করতেন। যদি কোন মানযিলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘটনাক্রমে পাক-পবিত্র হয়ে থাকেন, তিনিও সেখানে বিনা প্রয়োজনে পাক-পবিত্র হতেন। কিন্তু হযরত ‘আয়িশা (রা) ও হযরত ইবন আববাস (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাতের উপরোক্ত পার্থক্যের প্রবক্তা ছিলেন। তাঁরা ইবন ‘উমারের (রা) মতকে সমর্থন করেননি। হজ্জের সময় রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবতাহ’ উপত্যকায় তাবু গেড়ে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু ‘আয়িশা (রা) এটাকে সুন্নাত মনে করেননি। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছেঃ

আরবী হবে

‘‘আল-আবতাহ উপত্যকায় অবস্থানকরা সুন্নাত নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে এ জন্য অবস্থান করেছিলেন যে, সেখান থেকে বের হওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল।’’

হযরত ‘আয়িশা (রা) বহু ফিকহী মাসয়ালায় তাঁর সমকালীনদের থেকে দ্বিমত পোষণ করেছেন। পরবর্তী কালে হিজাযের পকীহরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরই মতের উপর আমল করেছেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) এসব মতামত ও আমলের বিরাট একটি অংশ ইমাম মালিক (রা) তাঁর আল-মুওয়াত্তা’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন।

তা‘লীম ও ইফতা (শিক্ষাদান ও ফাতওয়ার দায়িত্ব পালন)

ইলম বা জ্ঞান অন্যের নিকট পৌঁছানো ইলমের অন্যতম খিদমাত বলে ইসলাম বিশ্বাস করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন-

আরবী হবে

‘‘উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থির ব্যক্তির নিকট অবশ্যই পৌঁছাবে।’’ হযরত ‘আয়িশা (রা) এ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছিলেন তা আমাদের পূর্বের আলোচনাসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এখানে আমরা আরো একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই।

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতিকালের পর সাহাবায়ে কিরাম (রা) ইসলামী দা‘ওয়াত ও ইলমের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। মক্কা মু‘য়াজ্জামা, তায়িফ, রাহরাইন, ইয়ামান, দিমাশক, মিসর, কুফা, বসরা প্রভৃতি বড় বড় শহর ও নগরে এই মহান শিক্ষকবৃন্দের এক একটি ছোট দল অবস্থান করতেন। খিলাফাত ও সরকারের কেন্দ্র ২৭ বছর পর মদীনা থেকে প্রথমে কুফায় অবস্থান করতেন। খিলাফাত ও সরকারের কেন্দ্র ২৭ বছর পর মদীনা থেকে প্রথমে কুফায় এবং পরবর্তীকালে দিমাশকে স্থানান্তরিত হয়। তা সত্ত্বেও মদীনার রূহানী ও ইল্মী (আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগত) শ্রেষ্ঠত্বের কোন অংশে ভাটা পড়েনি। তখনও মদীনায় হযরত ইবন ‘উমার (রা), হযরত আবু হুরাইয়া (রা), হযরত ইবন ‘আববাস (রা) ও হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা) প্রমুখের পৃথক পৃথক দারসগাহ্ চালু ছিল। তবে সবচেয়ে বড় দারসগাহ্টি ছির হযরত ‘আয়িশার (রা) হুজরাকেন্দ্রিক মসজিদে নববীর সেই বিশেষ স্থান।

মদীনা ছির ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। যিযারত ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে চতুর্দিক থেকে মানুষ সেখানে ছুটে আসতো। যারা আসতো তারা অবশ্যই একবার না একবার উম্মুল মু‘মিনীনের হুজরার দরজায় হাজিরা দিত। তারা সালাম পেশ করতো। তিনি আগন্তুকদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করতেন। কথাবার্তা, সালাম-কালাম, মাসয়ালা জিজ্ঞাসা ও জবাব দান সবই হতো পর্দাার অন্তরাল থেকে। ইরাক, মিসর, শাম প্রভৃতি অঞ্চল থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে তাঁর খিদমতে হাজির হতো এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও ফাতওয়া চাইতো। যে সব শিক্ষার্থী সর্বক্ষণ উম্মুল মু’মিনীনের খিদমতে থাকতো, এসকল আগন্তুক তাদেরকেও সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতো। এ ধররেন একজন শিক্ষার্থী আয়িশা বিনত তালহা বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

‘‘প্রতিটি শহর থেকে মানুষ হযরত ‘আয়িশার (রা) নিকট আসতো। তাঁর সাথে আমার সম্পর্কের কারণে বৃদ্ধরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতো। যুবকরা আমার সাথে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক পড়ে তুলতো। লোকেরা আমার কাছে হাদিয়া-তোহফা পাঠাতো এবং বিভিন্ন শহর থেকে চিঠি-পত্র লিখতো। আমি তা হযরত ‘আয়িশার (রা) সামনে উপস্থাপন করে বলতাম, খালা আম্মা! এ অমুকের চিঠি ও হাদিয়া। তিনি বলতেন, বেটি! তুমি এর জবাব দাও এবং বিনিময়ে তুমিও কিছু পাঠিয়ে দাও।’

স্বাভাবিক ভাবেই পুরুষের চেয়ে মহিলাদেরই ভীড় হতো বেশি। মহিলা বিষয়ক মাসয়ালার সমাধান দানের সাথে সাথে বলে দিতেন, তোমরা পুরুষদেরকেও অবহিত করবে। একবার বসরা থেকে কিছু মহিলা আসে। তিনি তাদের কিছু নসীহত করে বলেন, তোমরা পুরুষদেরকে অবহিত করবে। তাদেরকে অনেক কথা বলতে আমার শরম হয়্ তাদের বলবে তারা যেন পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করে।

নারী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে এবং যে পুরুষদের থেকে হযরত ‘আয়িশার (রা) পর্দা করার প্রয়োজন ছিল না, তাঁরা সকলে হুজরার ভিতরের মসজিদে বসতেন, আর অন্যরা বসতেন হুজরার বাইরে মসিজদে নববীর মধ্যে। দারজায় পর্দা টানানো থাকতো। পর্দার আড়ালে তিনিনিজে বসে যেতেন। লোকেরা প্রশ্ন করতো, তিনি জবাব দিতেন। কোন কোন মাসয়ালায় শিক্ষয়িত্রী ও শিক্ষার্থীর মধ্যে তর্ক-বাহাছ হতো। কখনও কোন মাসয়ালা নিজেই বিস্তারিত বর্ণনা করতেন, লোকেরা নীরবে কান লাগিয়ে শুনতো। তিনি শিক্ষার্থীদের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এবং সঠিক উচ্চারণের দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। একবার তাঁর দুই ভাতিজা আসেন। তাঁরা দুইজন ছিলেন দুই মায়ের সন্তান। একজনের ভাষা তেনম শুদ্ধ ছিল না। তার ভাষায় যথেষ্ট ভুল-ভ্রুটি ছিল। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর ভুল ধরে দিয়ে বলেন, তুমি তেমন ভাষায় কথা বল না কেন যেমন আমরা এই ভাতিজা কথা বলে? হাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি, তাকে তার মা এবং তোমাকে তোমার মা শিক্ষা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, যাঁর ভাষা শুদ্ধ ছিল না, তার মা ছিলেন দাসী।

উপরে উল্লেখিত এ ধরনের অস্থায়ী শিক্ষার্থীরা ছাড়া তিনি বিভিন্ন খান্দানের ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে এবং ইয়াতীম শিশুদেরকে নিজের তত্ত্বাবধানে লালন-পালন করতেন এবং শিক্ষা দিতেন। কখনও এমন হয়েছে যে, শিশু নয়, রবং যারা বড় হয়ে গেছে এমন ছেলেদেরকে তাঁদের দুধ-থালা বা দুধ-নানী হওয়ার কারণে নিজের ঘরের মধ্যে ঢোকার অনুমতি দিতেন। আর যাদের ঘরের ঢোকার অনুমতি ছিল না, এমন গায়ের মুহাররম ব্যক্তিরা আফসোস করে বলতো, ইলম হাসিলের ভালো সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত। কুবায়সা বলতেন, ‘উরওয়া আমার চেয়ে জ্ঞানে এগিয়ে যাওয়ার কারণ হলো, সে ‘আয়িশার (রা) গৃহাভ্যন্তরে যেতে পারতো। ইরাকের সর্বজন মান্য ইমাম নাখ‘ঈ ছোটবেলায় হযরত ‘আয়িশার (রা) সান্নিধ্রে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেছিলেন। এজন্য তার সমকালীনরা তাঁকে ঈর্ষা করতেন।

হযরত ‘আয়িশা (রা) প্রতিবছর হজ্জে যেতেন। হিরা ও সাবীর পর্বতদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে তাঁর তাবু স্থাপন করা হতো। দূর-দূরান্তের জ্ঞান পিপাসুরা সেই তাঁবুর পাশে ভীড় জমাতো। কখনো কখনো কা‘বার চত্বরে যমযমের ছাদের নিচে বসে যেতেন, জ্ঞান পিপপাসুরা সমনে জমায়েত হতো। তিনি যখন চলতেন মহিলারা চারিদিক থেকে ঘিরে রাখতো। ইমামের মত তিনি চলতেন আগে আগে, আর অন্যরা পিছনে। লোকেরা বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান চাইতো এবং সন্দেহ-সংশয় দূর করতে চাইতো, তিনি তাদের সমাধান বলে দিতে সন্দেহ দূর করে দিতেন। তিনি লোকদের যে কোন ধরনের প্রশ্ন করার জন্য উৎসাহ দিতেন। বলতেন, তেমরা তোমাদের মা‘র কাছে যে প্রশ্ন করতে পার, তা আমার কাছেও করতে পার। একবার তিনি হযরত আবু মূসা আল-আশয়ারীকেও (রা) রকম কথা বলেছিরেন। তিনি বলতেন, আমি তোমাদের মা। আসলেই তিনি শিক্ষার্থীদের মায়ের মতই শিক্ষা দিতেন। ‘উরওয়া, কাসেম, আবু সালামা, মাসরূক ও সাফিয়্যাকে মাতৃস্নেহে শিক্ষাদীক্ষা দেন। ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতেন এবং তাদের যাবতীয় খরচও নিজে বহন করতেন। কোন কোন শিক্ষার্থীর সাথে তিনি এমন মাতৃসুলভ আচরণ করতেন যে, তা দেখে তাঁর আপন জনেরাও ঈর্ষা করতেন। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) ছিলেন হযরত আয়িশার (রা) অতি স্নেহের ভাগ্নে। তিনি একবার খালার এক শাগরিদ আসওয়াদকে বলেন, ‘উম্মুল মুমিনীন তোমার কাছে যে সব গোপন কথা বলতেন, তা কিছু আমাকেও বলো।

হযরত ‘আয়িশার (রা) শাগরিদরা তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। হযরত ‘আমারাহ্ ছিলেন আনসার-কন্যা। তিনি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) খালা বলেন ডাকতেন। ইমাম আশ-খা‘বী বলেনঃ আয়িশা (রা) মাসরূক ইবন আজদা‘কে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। হযরত ‘আয়িশার (রা) জ্ঞান ভান্ডার থেকে অসংখ্য মানুষ গ্রহণ করেছেন। তবে যাঁরা শৈশব থেকে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন এবং পরবর্তীকালে ‘আয়িশার (রা) জ্ঞানের সত্যিকার বাহকরূপে মুহাদ্দিসদের নিকট সমাদৃত হন নিম্নে তাঁদের কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলোঃ

1.‘উরওয়াঃ তাঁর পিতা যুবাইর (রা০, মাতা আসমা বিনত আবী বকর (রা)। নানা হযরত আবু বকর (রা) এবং খালা হযরত ‘আয়িশা (রা)। খালা অতি আদরে তাঁকে লালন-পালন করেন। মদীনার জ্ঞান ও মহত্বের শিরোমণিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ইমাম যুহরী ও আরো অনেকে তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁকে সীরাত ও মাগযীশাস্ত্রের ইমাম গণ্য করা হয়। ইমাম যুহরী বলেন, আমি তাঁকে অফুরন্ত সাগররূপে দেখেছি। হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা, ফিকাহ ও ফাতওয়ার জ্ঞানে তাঁর চেয়ে বড় কোন আরিম সে যুগে আর কেউ ছিলেন না। হিজরী ৯৪ সনে ইনতিকাল করেন।

  1. কাসিম ইবন মুহাম্মদঃ তাঁর দাদা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং ফুফু হযরত ‘আয়িশা (রা)। ছোটবেলা থেকেই ফুফুর স্নেহে বেড়ে ওঠেন এবং তাঁর কাছেই শিক্ষা লাভ করেন। বড় হয়ে মদীনার ফিকহর একজন ইমাম হন। মদীনায় সাত সদস্যবিশিষ্ট ফকীহদের যে মজলিস ছিল, তিনি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। আবুয যিয়াদ বলেনঃ ‘আমি কাসিমের চেয়ে বড় ফকীহ যেমন দেখিন, তেমনি সুন্নাতের জ্ঞানে তাঁর চেয়ে বড় জ্ঞানী আর কাউকে দেখেনি।’ ইবন ‘উয়ায়না বলেনঃ ‘কাসিম ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় আলিম।’ হিজরী ১০৬, মতান্তরে ১০৭ সনে ইনতিকাল করেন।
  2. আবু সালামাঃ প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ‘আবদুর রহমান ইবন আউফের (রা) ছেলে। অল্প বয়সে পিতার মৃত্যুর পর তিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) স্নেহে বড় হন। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের মদীনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘আলিম। ইমাম মুহরী বলেনঃ ‘আমি চারজনকে সাগরে মত পেয়েছি। তাঁরা হলেন ‘উরওয়া ইবন যুবাইর, ইবনুল মুসায়্যাব, আবু সালামা ও উবাইদুল্লাহ ইবন ‘আবদিল্লাহ।’ জিহরী ৯৪, মতান্তরে ১০৪ সনে ইনতিকাল করেন।
  3. মাসরূক ইবনুল আজদা’: তাঁর পিতা ছিলেন ইয়ামনের একজন বিখ্যাত অশ্বারোহী। আরবের বিখ্যাত বীর আমর ইবন মা‘দিকারিব ছিলেন তাঁর মামা। ইমাম জাহাবী শা‘বীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়িশা (রা) মাসরূককে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। ইবন সা‘দ বণৃনা করেছেন যে, একবার তিনি উম্মুল মু’মিনীন আয়িশার (রা) সাথে দেখা করতে এলে তিনি মাসরূকের জন্য শরবত তেরি করতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আমার ছেলের জন্য শরবত বানাও। তিনি ‘আয়িশা (রা) থেকে যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন তা অধিকাংশ ইমাম আহমাদ মুসনাদে এবং ইমাম বুখারী তাঁর আল-জামে গ্রন্থ বর্ণনা করেছেন। তাঁকে চেয়ে বড় জঞানপিপাসু আর কাকেও জানিনে। তিনি কাজী শুরাইহ থেকেও বড় মুফতী ছিলেন। কাজী শুরাইহ তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কিন্তু মাশরূপকের কাজী শুরাইহ এর কোন প্রয়োজন হতো না। তিনি কুফার বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন। তবে কোন পারিম্রমিক নিতে না। উঁচুস্তরের আবেদ ব্যক্তি ছিরেন। আবু ইসহাক বলেনঃ একবার তিনি হজ্জে যান। বাড়ি থেকে বের হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত সিজদারত অবস্থায় ছাড়া ঘুমাননি।’ তাঁর স্ত্রী বলেছেনঃ ‘নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা ফুলে যেত।’ হিজরী ৬৩ সনে ইনতিকাল করেন।

5.‘আমারাহ বিনত আবদির রহমানঃ তিনি ছিলেন প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী আস‘য়াদ ইবন যুরারার (রা) পৌত্রী। মহিলাদের মধ্যে হযরত ‘আয়িশার (রা) তা‘লীম-তারবিয়্যাত বা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সর্বোত্তম নমুনা হলেন তিনি। মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে তাঁর নামটি উচ্চারণ করে থাকেন। ‘আয়িশার (রা) হাদীস সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারিনী ছিলেন তিনি’-একথা বরেছেন ইবন হিববান। সুফইয়ান সাওরী বলেনঃ আমারাহ, কাসিম ও উরওয়াব হাদীসই হচ্ছে আয়িশার (রা) সর্বাধিক শক্তিশালী ও প্রমাণিত হাদীস। উম্মুল সম্না ও শ্রদ্ধা করতো। ইমাম বুখারীর র্বণনামতে তিনি ছিলেন উম্মুল মু’মিনীনের সেক্রেটারী। লোকেরা তাঁরই মাধ্যমে হাদিয়া-তোহফা ও চিঠি-পত্র হযরত আয়িশার (রা) নিকট পাঠাতো।

  1. সাফিয়্যা বিনত শায়বাঃ কা‘বার চারি রক্ষক শায়বার কন্যা, সাফিয়্যা। হাদীসের প্রায় সকল গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদীস সংকলিত হয়েছে। হাদীসের সনদে তাঁকে ‘শায়বার কন্যা সাফিয়্যা, ‘আয়িশার (রা) বিশেষ শাগরিদ’ অথবা আয়িশার (রা) সাহচর্যপ্রাপ্ত’-এভাবে পচিয় দেওয়া হয়েছে। মানুষ তাঁর কাছে বিভিন্ন মাসয়ালা এবং হযরত ‘আয়িশার (রা) হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে আসতো। আবু দাউদ বলেনঃ

আরবী হবে

-আমি ‘আদী ইবন ‘আদী আল-কিন্দীর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলাম। মক্কায় পৌঁছোর পর তিনি আমাকে সাফিয়্যা বিনত শায়বার নিকট পাঠালেন। তিনি হযরত ‘আয়িশা (রা) থেকে হাদীস শুনে মুখস্ত করেছিলেন।

7.‘আয়িশা বিনত তালহা (রা): প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তালহার কন্যা। হরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) তাঁর নানা এবং হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর খালা। খালার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। আবু যার‘আ দিমাশকী বলেন, লোকেরা তাঁর সম্মান, মর্যাদা ও শিষ্টাচারিতা দেখে তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

  1. মু‘য়াজা বিনত ‘আবদিল্লাহ আল-‘আদাবিয়্যাঃ একজন বসরী মেয়ে। হযরত ‘আয়িশার (রা) শাগরিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি বহু হাদীস হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাষায়ই বর্ণনা করেছেন। একজন উঁচু স্তরের আবেদা ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর কোন দিন বিছানায় ঘুমাননি। এখানে মাত্র কয়েকজনের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ করা হলো। এছাড়া আরো অনেকে আছেন।

চিকিৎসা বিদ্যা, ইতিহাস, সাহিত্য, কবিতা ও বক্ততা-ভাষণে হযরত ‘আয়িশার (রা) আগ্রহ ও পারদর্শিতা সম্পর্কে যদিও আগে কিছু কিছু আলোচনা এসে গেছে, তা সত্ত্বেও স্বতন্ত্রভাবে আরো কিছু আলোচনা প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। হযরত ‘আয়িশার (রা) ছাত্র-শিষ্যরা বর্ণনা করেছেন যে, ইতিহাস, বক্ততা-ভাষণ, সাহিত্য ও কবিতায় তার বেশ ভালোই দখল ছিল। আর চিকিৎসা বিদ্যায় ছিল মোটামুটি জ্ঞান। হিশাম ইবন উরওয়ার বর্ণনাঃ

আরবী হবে

‘আমি (উরওয়া) কুরআন, ফারায়েজ, হালাল-হারাম (ফিকহ) কবিতা, আরবের ইতিহাস ও নসব (বংশ) বিদ্যায় আয়িশা (রা) অপেক্ষা অধিকতর পারদর্শী আর কাউকে দেখিনি।’

‘উরওয়া আরো বলেনঃ আমি চিকিৎসা বিদ্যায় আয়িশা (রা) অপক্ষো অধিকতর অভিজ্ঞ আর কাউকে পাইনি। তৎকালীন আরবে চিকিৎসার বিদ্যার যথাযথ চর্চা ও প্রচলন ছিল না। সেকালের আরবের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাবিদ ছিলেন হারিস ইবন কালদা। তাছাড়া সারা আরবে ছোট ছোট আরো অনেক চিকিৎসক ছিলেন। এটা নিরক্ষরন সমাজে চিকিৎসার যতটুকু প্রচল হয়ে থাকে, সেকালের আরব সমাজে চিকিৎসাবিদ্যা বলতে তাই বুঝায়। গাছ-গাছড়ার কিচু গুণাগুণ জানা,াসুস্থ ব্যক্তিদের পরীক্ষিত কিছু ওষুধ সম্পর্কে জানা ইত্যাদি। এক ব্যক্তি হযরত ‘আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করে, আপনি কবিতা বলেন, তা মানলাম যে, আপনি আবু বকরের (রা) মেয়ে, বরতে পারেন; কিন্তু আপনি এ চিকিৎসাবিদ্যা কিভাবে আয়ত্ব করেনৎ তিনি জবাব দেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ জীবনে অসুস্থ থাকতেন। আরবের চিকিৎসকরা আসতো। তারা যে ওষুধের কথা বরতো, আমি মনে রাখতাম। আমরা বুঝতে পারি যে, তাঁরা চিকিৎসাবিদ্যা ছির সেই পর্যায়ের। তাছাড়া আরো কিছু রোগীর ব্যবস্থাপত্র তিনি মনে রেখেছিরেন। সেই সময় মুসলিম মহিলারা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে যুদ্ধে যেতেন, তাঁরা আহত সৈনিকদের ব্যান্ডেজ লাগাতেন ও সেবা করতেন। ‘আয়িশা (রা) নিজেও উহুদ যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবা করেছিলেন। এতে ধারণা হয় যে সে যুগের মুসলিম মহিলাদের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর মত এই শাস্ত্রের জ্ঞান থাকতো।

প্রাচীন আরবের ইতিহাস, জাহিলিয়াতের রীতি-প্রথা এবং আরবের বিভিন্ন গোত্র-গোষ্ঠীর বংশ সম্পর্কে হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন একজন সুবিজ্ঞ ব্যাক্তি। হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁরই মেয়ে। বলা চলে পিতার জ্ঞান তিনি উত্তারাধিকার সূত্রে লাভ করেন। এ কারণে আমরা হযরত ‘উরওয়াকে বলতে শুনি-‘আমি আরবের ইতিহাস ও কুষ্ঠিবিদ্যায় ‘আয়িমার (রা) চেয়ে বেশি জানা কাউকে দেখিনি।’ জাহিলী আরবের রীতি-প্রথা ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ তিনি দিয়েছেন, যা হাদীসের গ্রন্থসমূহ সংকলিত হয়েছে। যেমন, আরবে কত রকমের বিয়ে চালু ছিল, তালাকের পদ্ধতি কেমন ছিল, বিয়ের সময় কি গাওয়া হতো, তারা কোন কোন দিন রোযা রাখতো, হজ্জের সময় কুরাইশরা কোথায় অবসথান করতো, মৃত ব্যক্তির রাশ দেখে তারা কি কথা উচ্চারণ করতো ইত্যাদি। সহীহ আল বুখারী, তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতি গ্রন্থে তার এসব বর্ণনা পাওয়া যায়।

ইসলাম পূর্ব আমলে মদীনার আনসারদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ‘বু-য়াস’-এর বর্ণনা৪০১ যেমন ‘আয়িশা (রা) দিয়েছেন, মেতনিতাদের ধর্ম বিশ্বাসের কথা, দেব-দেবীর কথাও বলেছেন। যেমন তারা ‘মুশাল্লাল’ তেমনি তাদের ধর্ম বিশ্বাসের কথা, দেব-দেবীর কথাও বলেছেন। যেমন তারা ‘মুশাল্লাল’ পর্বতের মূর্তির পূজা করতো।৪০২ ইসলামের কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেমন ওহীর সূচনা পর্ব, ওহী কেমন করে হতো, ওহীর সময় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবস্থা কিরূপ দাঁড়াতো, নবুওয়াতের সূচান পর্বের নানা ঘটনা, হিজরাতের ঘটনা, নিজের জীবনের ইফকের ঘটনা ইত্যাদির তিনি আনুপূর্বিক বর্ণনা দিয়েছেন।৪০৩ মজার ব্যাপার হলো, এসব ঘটনার সাথে যারা জড়িত ছিরেন অথবা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেই সব পরিণত বয়সের লোকেরা যেখানে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে তার বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে হযরত ‘আয়িশার (রা) বর্ণনা হাদীসের গ্রন্থসমূহে কয়েকপৃষ্ঠ ছাড়িয়ে গেছে। অথচ অনেক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন একটি শিশু অথবা বড়জোর একজন কিশোরীমাত্র। কুরআন কিভাবে, কি তারতীবে নাযিল হয়েছে এবং নামাযের পদ্ধতির বর্ণনা তিনি দিয়েছেন।৪০৪ তাছাড়া রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওফাতকালীন অবস্থা, কাফন-দাফনের ব্যবস্থা, কাফনের কাপড়ের সংখ্যা, মাপ ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা তো বিশ্বাবাসী তাঁর মাধ্যমে জেনেছে।৪০৫ শুধু কি তাই, তিনি যুদ্ধের ময়দানের অবস্থাও আমাদের শুনিয়েছেন। বদরের ঘটনা,৪০৬ উহুদের অবস্থা, খন্দক ও বনী কুরায়জার কিচু কথা৪০৭, জাতুর রুকা’ যুদ্ধে সারাতুল খাওফ’ (ভীতিকালীন নামায) এর অবস্থা, মক্কা বিজয়কালীণ মহিলাদের বাই‘য়াত, বিদায় হজ্জের ঘটনাবলীর একাংশ ইত্যাদির কথা আমরা তাঁর মুখে শুনতে পাই। রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) নৈশকালীন ইবাদতের কথা, ঘর-গৃহস্থালীর কথা, তাঁর আদব-আখলাক, স্বাভাব-আচরণের কথা তিনি আমাদের শুনিয়েছেন। এমন কি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে সবচেয়ে কঠিন দিন কোনটি গেছে সে কতাও তিনি বলেছেন।৪০৮ মোটকথা, নবীজীবনের একটি স্বচ্ছ ও সঠিক চিত্র তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফত, হযরত ফাতিমা (রা০) ও রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য বিবিগণের দাবী-দাওয়া, বাই‘য়াত ইত্যারিদ কথাও তিনি বর্ণনা করেছেন।৪০৯

একথা ঠিক যে, ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর যে জ্ঞান, তা ছিল তাঁর বাস্তবাভিজ্ঞতালব্ধ। অনেক কিছুই তাঁর সামনে ঘটেছিল। কিন্তু জাহেলী আরবের অবস্থার কথা তিনি কার কাছে জেনেছিলেন? নিশ্চয়ই তা পিতা আবু বকরের (রা) মুখে শুনেছেন।

সাহিত্য

অসংখ্য বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ‘আয়িশা (রা) ছিলেন একজন সুভাষিণী। তাঁর কথা ছিলাতি স্পষ্ট, বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল। মূসা ইবন তালহা তাঁর একজন ছাত্র। ইমাম তিরমিযী ‘মানবিক’ পরিচ্ছেদে তার এ মন্তব্য-

আরবী হবে

বর্ণনা করেছেন। যার অর্থ-আমি ‘আয়িশার (রা) অপেক্ষা অধিকতর প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধভাষী কাউকে দেখিনি।’ মুসতাদিরিকে হাকেমে আহনাফ ইবন কায়সের একটি মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ‘আয়িশার (রা) মুখের চমৎকার বর্ণনা ও শক্তিশালী কথার চেয়ে ভালো কথা আর শুনিনি। হযরত ‘আয়িশার (রা) থেকে যে শত শত হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে তাঁর নিজের ভাষার অনেক বর্ণনাও সংরক্ষিত হয়েছে। সেগুলি পাঠ করলে তার মধ্যে চমৎকার এক শিল্পরূপ পরিলক্ষিত হয়। তাতে রূপক ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর ওহী নাযিলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেনঃ৪১০

আরবী হবে

অর্থাৎ ‘‘প্রথম প্রথম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওহী লাভ করতেন। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন না কেন, তা প্রভাতের দীপ্তির মত উদ্ভাসিত হতো।’’ হযরত ‘আয়িশার (রা) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য স্বপ্নসমূহকে প্রভাতের দীপ্তি ও আভার সাথে তুলনা করেছেন। ওহী লাভের সময় রাসূলুলত্মাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চেহারা মুবারকে ঘাম জমতো। এই ঘামের ফোঁটাকে তিনি উজ্জ্বল মোতির দানার সাথে তুলনা করেছেন। মুনাফিকরা যখন তাঁকে নিয়ে কুৎসা রটনা করেছিলো, তাঁর চরিত্রের প্রতি কলঙ্ক আরোপ করেছিলো, তখন সেই দিনগুলি যে কেমন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তার একটা সুন্দর চিত্র আমরা পাই তাঁর বর্ণনার মধ্যে। সেই সময়ে তাঁর জীবনের একটি রাতের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেনঃ৪১১

আরবী হবে

অর্থাৎ ‘‘সারারাত আমি কাঁদলাম। সকাল পর্যন্ত আমার অশ্রুও মুকায়নি এবং আমি চোখে ঘুমের সুরমাও লাগাইনি।’’ তিনি সে রাতটি বিনিদ্র অবস্থায় এবং চোখের পানি ঝরিয়ে কাটিয়েছেন, সে কথাটি সরাসরি না বলে একটি সুন্দর চিত্রকল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। চোখে ঘুম আসাকে তিনি বেচাখে সুরমা লাগানোর সাথে তুরনা করেছেন। ভাষায় প্রচন্ড অধিকার থাকলেই কেবল এভাবে বরা যায়। একবার তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশ্ন করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি এমন দুইটি চারণভূমি থাকে-যার একটিতে পশু চারিত হয়েছে, আর অন্যটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়েছে। তখন সুরক্ষিত আছে, সিটিতে। মূলতঃ তিনি জানতে চেয়েছেন, যে নারী স্বামীসঙ্গ লাভ করেছে, আর যে লাভ করেনি, এর কোনটি আপনি পছন্দ করেন? আসলে তিনি নিজের সম্পর্কে রাসূরুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইচ্ছার কথা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরাসরি সে কথাটি না বরে একটি উপমার মাধ্যমে চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেন। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহর (সাল-াল¬াহু ‘আলাইহি ওয়া সাল¬াম) বিবিগণের মধ্যে একমাত্র ‘আয়িশা (রা) ছিলেন কুমারী।ান্যরা সকলেই ছিলেন হয় বিধবা, নয়তো স্বামী পরিত্যক্ত।

হযরত ‘আয়িশা (রা) প্রাচীন আরবের অনেক লোক কাহিনীও জানতেন এবং সুন্দরভাবে তা বর্ণনাও করতে পারতেণ। হাদীসের কোন কোন গ্রন্থ তাঁর বলা দুই একটি গল্প বর্ণিত হয়েছে। আরবের এগারো সহদরার একটি দীর্ঘ কাহিনী তিনি একদিন স্বামী রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনিয়েছিলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে তাঁর গল্প শোনেন।৪১২ এ গল্পে তাঁর চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং শির্পকারিতা লক্ষ্য করা যায়। শব্দ ও বাক্যালংকারের ছড়াছড়ি দেখা যায়।

বক্তৃতা ভাষণঃ

বাগ্মী ও বাকপটু ব্যক্তিরাই বক্তৃতা-ভাষণ দিতে পারে। এ এক খোদাপ্রদত্ত গুণ। মানুষকে স্ব-মতে আনার জন্য, প্রভাবিত করার জন্য এ এক অসাধারণ শিল্প। সেই আদিকাল থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে সকর জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে এ শিল্পের চর্চা দেখা যায়। সেই প্রাচীন আরবদের মধ্যে এর ব্যাপক চর্চা ছিল। জাহিলী আরবের বড় বড় খতীব এবং তারে খুতবা বা ভাষণের কথা ইতিহাসে দেখা যায়। নানা কারণ ও প্রয়োজনে ইসলামী আমলে এই খুতবা শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নতি ও বিকাশ ঘটে। পুরুষদের গন্ডিাতিক্রম করে নারীদের মধ্যেও এর বিস্তার ঘটে। হযরত ‘আয়িশা (রা) একজন শ্রেষ্ঠ মহিলা খতীভ বা বক্তা ছিলেন। আরবী সাহিত্যের প্রাচীন সূত্রসমূহে হযরত ‘আয়িশা (রা) বহু খুতবা বা বক্ততা সংকলিত হয়েছে। উটের যুদ্ধের ডামাডোলের সময় তিনি যে সকল খুতবা দিয়েছিরেন তাবারীর ইতিহাসে তা সংকলিত হয়েছে। ইবন ‘আবদি রাবিবহি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইকদুল ফরীদ’ এ তার কিছু নকল করেছেন।৪১৩

বাগ্মিতা ও বিশুদ্ধভাষিতা যেমন একজন সুবক্তার অন্যতম গুণ, তেমনি স্পষ্ট উচারণ, উচ্চকণ্ঠ এবং ভাব-গাম্ভীর্যের অধিকারী হওয়াও তার জন্য জরুরি। হযরত ‘আয়িশার (রা) কষ্ঠধ্বনি এমনই ছিল। তাবারী বর্ণনা করেছেনঃ৪১৪

আরবী হবে

‘‘হযরত ‘আয়িশা (রা) ভাষণ দিলেন। তিনি ছিলেন উচ্চকষ্ঠ। তাঁর গরার আওয়ায অধিকাংশ মানুষকে প্রভাবিত করতো। যেন তা কোন সম্ভ্রান্ত মহিলার গলার আওয়ায।’’

আহনাফ ইবন কায়স একজন বিখ্যাত তাবে‘ঈ। সম্ভবত তিনি বসরায় হযরত ‘আয়িশার (রা) একটি ভাষক শোনার সুযোগ লাভ করেছিরেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘আমি হযরত আবু বকর (রা), হযরত উমার (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আলী (রা) এবং এই সময় পর্যন্ত সকল খলীফার ভাষণ শুনেছি; কিন্তু আয়িশার (রা) মুখ থেকে বের হওয়া কথায় সে কলামন্ডিত সৌন্দর্য ও জোর থাকতো তা আর কারও কথায় পাওয়া যেত না।’ আল্লামা সাইয়েদ সুলায়মান নাদভী আহনাফ ইবন কায়সের মন্তব্যের উদ্ধৃতি টেনে বলছেন, আমার মতে, আহনাফ ইবন কায়সের এ কথা অতিরঞ্জিত থেকে মুক্ত নয়, তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ‘আয়িশা (রা) একজন স্বচ্ছন্দ ও শুদ্ধভাষী বক্তা ছিরেন।’৪১৫

আহনাফের মত ঠিক একই রকম মন্তব্য করেছেন হযরত ‘আমীর মু‘য়াবিযা (রা) ও মূসা ইবন তালহা। উটের যুদ্ধের সময়ে তিনি যে সকল বক্ততা ভাষণ দান করেছিলেন, তাতে যে আবেগময় শক্তি ও উত্তাপ দেখা যায় তা অনেকটা তুলনাহীন। পূর্বেই আমরা উটের যুদ্ধের আলোচনা প্রসঙ্গে তাঁর একটি ভাষণের অনুবাদ উপস্থাপন করেছিল। এখানে আমরা তাঁর ঐ সময়ের আর একটি ভাষণের ছোট্ট উদ্ধৃতি টেনে এ আলোচনা সমাপ্তি টানবো।

হযরত ‘আয়িশা (রা) যখন হযরত তালহা ও যুবাইরকে (রা) সঙ্গে নিয়ে বসরায় পৌঁছলেন তখন বসরাবাসীরা ‘আল-মিরবাদ’-এর সমবেত হলো। হমবেত জনমন্ডলীকে সম্বোধন করে প্রথমে তালহা (রা) তারপরে যুবাইর (রা) ভাষণ দিলেন। সবশেষে হযরত ‘আয়িশা (রা) বক্ততা করলেন। সর্বপ্রথম তিনি আল্লাহর হামদ এবং রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করলেন। তারপর বললেনঃ৪১৬

আরবী হবে

‘‘মানুষ উসমানের (রা)াপরাধের কথা বলতো, তাঁর কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রতি দোষারোপ করতো। তারা মদীনায় আসতো এবং তাঁদের সম্পর্কে নানা রকম তথ্য আমাদেরকে জানিয়ে পরামর্শ চাইতো। আমরা বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতাম। আমরা ‘উসমানকে (রা) পবিত্র, খোদাভীরু অঙ্গীকার পালনকারী হিসেবে দেখতে পেতাম। আর অভিযোগকারীরা আমাদের কাছে পাপাচারী, ধোঁকাবাজ ও মিথ্যাবাদী বলে প্রতীয়শান হতো। তারা মুখে যা বরতো, তার বিপরীত কাজ করার চেষ্টা করতো। যখন তারা মুকাবিলা করার মত শক্তিশালী হলো, সম্মিলিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। তারা তাঁর উপর তাঁর বাড়ীতেই হামলা চালালো। যে রক্ত ঝরানো হারাম ছিল তা তারা তাঁর উপর তাঁর বাড়ীতেই হামলা চালালো। যে রক্ত ঝরানো হারাম ছিল তা তারা হালাল করলো, আর যে মাল লুট করা, যে শহরের অবমাননা করা অবৈধ ছির তা তারা বিনা দ্বিধায় ও বিনা কারণে বৈধ করে নিল। শোন! এখন যা কারণীয় এবং যা ব্যতীত অন্য কিচু করা তোমাদের উচিত হবে না, তা হলো ‘উসমানের (রা) হত্যকারীদের ধরা এবং তাদের উপর কিতাবুল্লাহর হুকম কার্যকরী করা। তারপর তিনি সূরা আরে ইমরানের ২৩নং আয়তাটি পাঠ করেনঃ

‘আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে-আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহবান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’

বসরায় তিনি আকেরটি আগুন ঝরা বক্ততা দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে তার কিছু অংশের অনুবাদ উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই দীর্ঘ বক্ততার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য যেন একটা প্রবল আবেগ ও উদ্দীপনা ঢেলে দিয়ে শ্রেতাদের সম্মেহিত করে তুলেছে। এখানে তাঁর মূর ভাষায় কয়েকটি লাইন তুলে ধরা হলো।:৪১৭

আরবী হবে

‘ওহে জনমগুলী চুপ করুন, চুপ করুন। নিশ্চয় আপনাদের উপর আমার মায়ের দাবী আছে, উপদেশ দানের অধিকার আছে। আমার প্রতি কেউ কলঙ্ক আরোপ করতে পারে না-একমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করেছে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমারই বুকে মাথা রেখে ইনতিকাল করেছেন। জান্নাতে আমি হবো তাঁর অন্যতম স্ত্রী। আমার রব আমাকে তাঁর জন্যই সংরক্ষিত রেখেছেন এবং অন্যদের থেকে পবিত্র রেখেছেন। আমার সত্তা দ্বারাই তোমদের মুনাফিকদের তোমাদের মু’মিনদের থেকে পৃথক করেছেন। আমার দ্বারাই আল্লাহ তোমাদেরকে আবওয়ার মাটিতে তায়াম্মুমের সুগো দিয়েছেন। অতঃপর আমার পিতা সেই সাওর পর্বতের গুহায় দুই জনের মধ্যে দ্বিতীয়, আর আল্লাহ ছিলেন তৃতীয়। তিনিই সর্বপ্রথম সিদ্দীক উপাধি লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতি খুশী থাকা অবস্থান ইহলোক ত্যাগ করেছেন…..হ্যাঁ, এখন আমি মানুষের এই প্রশেরনর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছি যে, আমি কিভাবে বাহিনী নিয়ে বের হলাম? এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য কোন পাপের বাসনা ও ফিতনা ফাসাদের অম্বেষণ করা নয়…….।’’

চিঠি-পত্র

আরবী সাহিত্যের নির্ভরযোগ্য প্রাচীন সংকলনসমূহে হযরত ‘আয়িশার (রা) বহু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি দেখেতে পাওয়া যায়। সে সব চিঠি তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিকট লিখেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এ সব চিঠি কি তিনি নিজ হাতে লিখেছিলেন না কেন, তার ভাব ও ভাষা যে হযরত ‘আয়িশার (রা) ছিল না, এমন কোন প্রমাণ নেই। তাই আরবী সাহিত্যের প্রাচীন কালের পন্ডিতরা হযরত ‘আয়িশার (রা) এসব চিঠির সাহিত্যমূল্য বিবেচনা করে নিজেরদ রচনাবলীতেস্থান দিয়ে গেছেন। ইবন ‘আবদি রাবিবহি আল-আন্দালুসীর বিখ্যাত সংকলন-আল-ইকদুল ফরীদ’ এর ৪র্থ খন্ডে তার অনেকগুলি চিঠি সংকলিত হয়েছে। যেমন, তিনি বসরায় পৌঁছে তথাকার এক নেতা যায়িদ ইবন সুহানকে লিখেছেনঃ৪১৮

আরবী হবে

‘‘উম্মুল মুমিনীন ‘আয়িশার (রা) পক্ষ থেকে তার নিষ্ঠাবান ছেলে যায়িদ ইবন সুহানের প্রতি। সালামুন আলাইকা। অতঃপর তোমার পিতা জাহিলী আমলে নেতা ছিলেন, ইসলামী আমলেও। তুমি তোমার পক্ষ থেকে মাসবূক মুসল্লীর অবস্থানে আছে যাকে বলা যায় প্রায় অথবা নিশ্চিতভাবে লাহেক হয়েছে। তুমি তোমার পক্ষ থেকে মাসবূল মুসল্লীর অবস্থানে আছে যাকে বলা যায় প্রায় অথবা নিশ্চিতভাবে লাহেক হয়েছে। তুমি জেনেছো যে, উসমান ইবন আফফান হত্যার মাধ্যমে ইসলামে কী বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমরা তোমাদের কাছে আমার এ চিঠি পৌঁছার পর মানুষকে আলইিবন আবী তালিবের পক্ষাবলম্বন থেকে ঠেকিয়ে রাখবে। তুমি তোমার গৃহে অবস্থান করতে থাক, যতক্ষণ না আমার নির্দেশ তোমার কাছে পৌঁছে। ওয়াস সালাম।’’

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশার (রা) উপরোক্ত চিঠির যে জবাব যায়িদ ইবন সুহান দিয়েছিলেন তা একটু দেখার বিষয়। আমরা সেই চিঠিটি তুলে দিয়ে এ প্রসঙ্গে সমাপ্তি টানছি। যায়িদ ইবন সুহান লিখছেনঃ৪১৯

আরবী হবে

‘‘যায়িদ ইবন সুহানে পক্ষ থেকে উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশার (রা) প্রতি। আপনার প্রতি সালাম। অতঃপর আপনাকে কিছু কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভিন্ন কিছু কাজের। আপনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঘরে অবস্থান করার জন্য, আর আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ ফিতনা দূরীভূত না হয়। আপনি ছেড়ে দিয়েছেন। যা আপনাকে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর আমাদের যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা থেকে বিরত থাকার জন্য আপনি লিখেছেন। ওয়াস সালাম।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) কাব্যপ্রীতি

ইসলাম-পূর্ব আমলের আরবরা ছিল একটি কাব্যরসিক জাতি। তাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে কবি ও কবিতার প্রভাব ছিল অপরিসীম। তাদের নিকট কবির স্থান ছিল সবার উপরে। তারা কÿÿ ও নবীকে এইক কাতারের মানুষ বলে মনে করতো। তাইতো তারা রাসূলুল্লাহকেও (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবি বলে আখ্যায়িত করেছিল। ইবন রাশীকে আল-কায়রোয়ানী জাহিলী আরবে কবির স্থান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ৪২০

আরবী হবে

‘‘আরবের কোন গোত্রে যখন কোন কবি প্রতিষ্ঠা লাভ করতেন তখন অন্যান্য গোত্রের লোকেরা এসে সেই গোত্রকে অভিনন্দন জানাতো। নানা রকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো মেয়েরা সমবেত হয়ে বাদ্য বাজাতো। পুরুষ ও শিশু-কিশোররা এসে আনন্দ প্রকাশ করতো। এর কারণ, কবি তাদের মান-মর্যাদার রক্ষক, বংশের প্রতিরোধক এবং নাম ও খ্যাতির প্রচvারক।’’

প্রাচীন আরবী সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, জাহিলী আরবে যেন কাব্যচর্চার প্লাবন বয়ে চলেছে। অসংখ্য কবির নাম পাওয়া যায় যা গুণেও শেষ করা যাবে না।ইবন কুতায়বা বলেছেনঃ৪২১

আরবী হবে

‘‘কবিরা-যাঁরা কবিতার জন্য তাদের সমাজে ও গোত্রে জাহিলী ও ইসলামী আমলে প্রসিদ্ধিার্জন করেছেন তাঁদের সংখ্যা এত বেশি যে কেউ তা শুমার করতে পারবে না।’’

তিনি আরও বলেছেনঃ৪২২

আরবী হবে

‘‘যারা কবিতা বলেনি-তাদের সংখ্যা খুবই কম-তাদের নাম যদি আমরা উল্লেখ করতে চাই তাহলে অধিকাংশ লোকের নাম উল্লেখ করতে পারবো।’’

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদেম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেনঃ৪২৩

আরবী হবে

অর্থাৎ ‘‘রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আমাদের এখানে আসেন তখন আনসারদের প্রতিটি গৃহে কবিতা বলা হতো।’’

মোটকথা একজন আরব কবি তার কবিতার মাধ্যমে কোথাও যেমন আগুন জ্বালিয়ে দিত তেমনিভাবে কোথাও জীবনের বারি বর্ষণও করতো। এ গুণটি কেবর পুরুষদের সাথে সংযুক্ত ছিল না; বরং নারীরাও এর সাথে প্রযুক্ত ছিল। ইসলামের পূর্বে এবং ইসলামের পরেও শতবর্ষ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে আরবীর এ গুণ বৈশিষ্ট্যটি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। সে আমলের এমন অসংখ্য নারীর পরিচয় পাওয়া যায় যাঁরা কবিতা ও সঙ্গীত রচনায় এমন নৈপুণ্য দেখিয়েছেন যে, তাঁদের কথা আরবী কাব্যজগতের এককেটি যৌন্দর্যে পরিণত হয়েছে।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশার (রা) আরবের সাংস্কৃতিক ইতহাসের এমন একটি পর্বে জন্মলাভ করেন। তাঁর নিজের পরিবারেও কবিতার চর্চা ছিল। পিতা আবু বকর (রা) একজন কবি ছিলেন।৪২৪ প্রখ্যাত তাবে‘ঈ হযরত সা‘ঈদ ইবন আল-মুসয়্যিব বলেনঃ৪২৫

আরবী হবে

‘‘আবু বকর (রা) কবি ছিলেন। ‘উমার (রা) কবি ছিলেন। আর ‘আলী (রা) ছিলেন তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি।’’

তাই বলা চলে পিতার কাছ থেকেই তিনি কাব্যশাস্ত্রের জ্ঞান লাভ করেন। কবিতার আঙ্গিক, বিষয়বস্ত্ত, চিত্রকল্প ইত্যাদি বিষয়ে তিনি যেসব মন্তব্য ও মতামত রেখেছেন তাতে এ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা প্রমাণিত হয়। তাঁর এক গুণমুগ্ধ শাগরিদ আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ বলেছেনঃ৪২৬

আরবী হবে

‘‘রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের মধ্যে কাব্য ও ফারায়েজ শাস্ত্রে ‘আয়িশার (রা) চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে এমন কাউকে আমি জানিনে।’’

হযরত উরওয়া ইবন যুবাইর ঠিক একই রকম কথা বলেছেন।৪২৭ তাঁরান্য একজন শাগরিদ বলেছেন, ‘‘আমি ‘আয়িশার (রা) কাব্য-জ্ঞান দেখে বিম্মিত হইনে। কারণ তিনি আবু বকরের (রা) মেয়ে।’’

হযরত ‘আয়িশা (রা) নিজেও একজন কবি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি যে শোকগাঁথাটি রচনা করেন, তার কিছু অংশ আল্লামা আলসী তাঁর বুলুগুল আরিব’ গ্রন্থর ২য় খন্ডে সংকলন করেছেন।

ইমাম বুখারী আবদাবুল মুফরাদ’ গ্রন্থে হযরত উরওয়ার একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, হযরত কা‘ব ইবন মালিকের (রা) একটি পূর্ণ কাসীদা হযরত আয়িশার (রা) মুখস্থ ছিল। একটি কাসীদায় কম-বেশি চল্লিশটি শ্লোক ছিল।৪২৮ হযরত আয়িশা (রা) বলতেনঃ৪২৯

আরবী হবে

‘‘তোমরা তোমাদের সন্তনদের কবিতা শেখাও। তাতে তাদের ভাষা মাধুরীময় হবে।’’

জাহিলী ও ইসলামী যুগের কবিদের বহু কবিতা হযরত ‘আয়িশার (রা) মুখস্থ ছিল। সেই সকল কবিতা বা তার কিছু অংশ সময় ও সুযোগমত উদ্ধৃতির আকারে উপস্থাপন করতেন। তার বর্ণিত বহু কবিতা বা পংক্তি হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থ বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি হযরত আয়িশাকে (রা) জিজ্ঞেস করে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি কখনও কবিতা আবৃত্তি করেছেন? বললেনঃ হাঁ, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কিছু শ্লোক তিনি আবৃত্তি করতেন। যেমনঃ৪৩০

আরবী হবে

‘‘তুমি যাকে পাথেয় দিয়ে পাঠাওনি সে অনেক খবর নিয়ে তোমার কাছে আসবে।’’

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন শুনলেন ‘আয়িশা (রা) কবি যুহাইর ইবন জানাবের নিম্নোক্ত পংক্তি দুইটি আবৃত্তি করছেনঃ৪৩১

আরবী হবে

‘‘তুমি উঠাও তোমার দুর্বলকে। যার দুর্বলতা তোমার বিরুদ্ধে কোন দিন যুদ্ধ করবে না। অতঃপর সে যা অর্জন করেছে তার পরিণতি লাভ করবে।

সে তোমকে প্রতিদান দিবে, অথবা তোমার প্রশংসা করবে। তোমার কর্মের যে প্রশংসা করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে প্রতিদান দিয়েছেন।’’

পংক্তি দুইটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ‘‘আয়িশা! সে সত্য বলেছে। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।

আবু কাবীর আ-হুজালী একজন জাহিলী কবি। তিনি তাঁরাসৎ ছেলে কবি তায়াববাতা শাররান-এর প্রশংসায় একটি কবিতা রচনা করেন। যার দুইটি পংক্তি নিম্নরূপঃ৪৩২

আরবী হবে

‘‘সে তার মায়ের গর্ভের সকল অশুচিতা এব দুধদানকারী দাত্রীর যাবতীয় রোগ-থেকে মুক্ত। যখন তুমি তার মুখমন্ডলের মজবুত শিরা উপশিরার দিকে দৃষ্টিপাত করবে, তখন তা প্রবল বর্ষণের সাথে বিদ্যুতের চমকের মত চমকাতে দেখবে।’’

হযরত ‘আয়িশ (রা) একদিন উপরোক্ত শ্লোক দুইটি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনিয়ে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ‘‘আপনিই তো এ দুইটি শ্লোকের বেশি হকদার। তাঁর এ কথায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উৎফুল্ল হন।

‘‘আয়িশা (রা) নিম্নের দুইটি বয়েত দিয়ে প্রায়ই মিছাল দিতেনঃ৪৩৩

আরবী হবে

‘‘কালচক্র যখণতার বিপদ মুসীবতসহ কোন জনমন্ডলীর উপর দিয়ে ধাবিত হয় তখন তা আমাদের সর্বশেষ ব্যক্তিটির কাছে গিয়ে থামে। আমাদের এ বিপদ ধেকে যারা উৎফুল্লা হয় তাদের বলে দাও-তোমরা সতর্ক হও। খুব শিগগিরই তোমরাও মুখেমুখি হবে, যেমন আমরা হয়েছি।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) ভাই আবদুর রহমান ইবন আবী বকরের (রা) ইনতিকাল হয় মক্কার পাশে এবং মক্কায় দাফন করা হয়। পরে যখন হযরত ‘আয়িশা (রা) মক্কায় যান তখন ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিম্নোক্ত শ্লোক দুইটি আবৃত্তি করেনঃ৪৩৪

আরবী হবে

‘‘আমরা দুই জন বাদশাহ জাজীমার দুইজন সহচরের মত একটা দীর্ঘ সময় একসাথে থেকেছি। এমনকি লোকে আমাদের সম্পর্কে বলাবলি করতো যে, আমরা আর কখনও পৃথক হবো না।

অতঃপর আমরা যখন বিছিন্ন হয়ে গেলাম তখন আমি ও মালিক যেন দীর্ঘকাল সহঅবস্থান সত্ত্বেও একটি রাতও এক সাথে কাটাইনি।’’

মক্কার মুহাজিরদের শরীরে প্রথম প্রথম মদীনার আবহাওয়া খাপ খাচ্ছিল না। হযরত আবু বকর (রা), হযরত ‘আমির ইবন ফুহায়রা (রা), হযরত বিলাল (রা) এবং আরো অনেকে, এমনকি খোদ ‘আয়িশা (রা) মদীনায় আসার পর প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের ঘোরে তাঁদের অনেকের মুখ থেকে তখন কবিতার পংক্তি উচ্চারিত হতো। এমন কছিু পংক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) স্মৃতিতে ছির এবং তিনি বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ হযরত আবু বকরের (রা) জ্বারের প্রকোপ দেখা দিলে নিম্নোক্ত শ্লোকটি উওড়াতেনঃ৪৩৫

আরবী হবে

‘‘প্রতিটি মানুষ তার পরিবার পরিজনের মধ্যে দিনের সূচনা করে।অথচ মৃত্যু তার জুতোর ফিতার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী।:

হযরত বিলাল (রা) জ্বারের ঘোরে নিম্নের পংক্তি দুইটি জোরে জোরে আওয়াতেনঃ

আবরী হবে

‘‘হায়! আমি যদি জানতে পারতাম যে, কোন একটি রাত আমি মক্কার ইপত্যকায় কাটাবো এবং আমার চারপাশে হজখীর ও জলীল ঘাস থাকবে। অথবা মাজ্জান্নার সরোবরে কোন একদিন আমার বিচরণ ঘটবে, অথবা শামা ও তুফায়েল পর্বতদ্বয় কোনদিন আমার দৃষ্টিগোচর হবো।’’

হযরত ‘‘আমির ইবন ফুহাইরাকে (রা) তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে এই পংক্তিটি আবৃত্তি করতেনঃ৪৩৬

আরবী হবে

‘‘আমি স্বাদ চাখার আগেই মৃত্যুকে পেয়ে গেছি। ভীরু কাপুরুষের মৃত্যু তার উপর দিক থেকেই আসে।’’

বদর যুদ্ধে কুরাইশদের অনেক বড় বড় নেতা নিহত হয় এবং তাদেরকে বদরের কুয়োয় নিক্ষেপ করা হয়। কুরাইশ কবিরা তাদের স্মরণে অনেক আবেগজড়িত মরসিয়া রচনা করেছিল। সেই সকল কবিতার অনেক পংক্তি হযরত ‘আয়িশার (রা) স্মৃতিতে ছিল এবং তিনি তা বর্ণনাও করেছেন। নিম্নের বয়েত দুইটিও তিনি বর্ণনা করেছেন।৪৩৭

আরবী হবে

‘‘বদরের কূপের মধ্যে কতনা নর্তকী ও অভিজাত শরাবখোর পড়ে আছে, তাদের অবস্থা কি? উম্মে বকর তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করছে। আমার স্বগোত্রের লোকদের মৃত্যুর পরে আমার জন্য কোন শান্তি আসতে পারে কি?’’

হযরত সা‘দ ইবন মু‘য়াজ (রা) খন্দক যুদ্ধের সময় আরবী রজয ছন্দের একটি গানের একটি কলি আওড়াতেন, তাও হযরত ‘আয়িশা (রা) মনে রেখেছিলেন। সেটি তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

আরবী হবে

‘‘হায়! যদি অল্প কিচুক্ষণের মধ্যে উট যুদ্ধের নাগাল পেয়ে যেত। মরণের সময় যখন ঘনিয়ে আসে তখন সে মরণ কতনা সুন্দর।

মক্কার কুরাইশ কবিরা যখন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দায় কবিতা বলতো তখন মদীনার মুসলমান কবিরা কিভাবে তার জবাব দিতেন, সে কথাও আমরা হযরত ‘আয়িশার (রা) মাধ্রমে জানতে পারি। তিনি বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তোমরা কুরাইশদের নিন্দা করে কবিতা রচনা কর। এ কবিতা তাদের উপর তরবারির আঘাতের চেয়েও বেশি কার্যকর হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) একজন কবি ছিলেন। তিনি একটি কবিতা রচনা করলেন; কিন্তু তা রাসূলুল্লহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তেমন পছন্দ হলো না। তিনি কবি কা‘ব ইবন মালিককে (রা) নির্দেশ দিলেন কুরাইশদের জবাবে একটি কবিতা লিখতে। অবশেষে হযরত হাসসান ইবন সাবিতের পালা এলো। তিনি এসে আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমি তাদের এমন বিধ্বস্ত করে ছাড়বো, যেমন লোকেরা চামড়াকে করে থাকে।’ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। আবু বকর গোটা কুরাইশ খান্দানের মধ্যে কুরাইশদের নসবনামা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ। আমারও ত৭ার তিনি আবু বকরের (রা) নিকট যান এবং বংশসূত্রের নানা রকম প্যাঁচ ও জটিলতা সম্পর্কে জেনে আবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট এসে বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদের নিকট এমনভাবে বরে করে আনবো, যেমন লোকেরা আটার দলা থেকে চুল টেনে বের করে আনে। তারপর হাসনার (রা) একটি কাসীদা পাঠ করেন যার একটি বয়েত এইঃ

আবরী হবে

‘‘আলে হাশিমের সম্মান ও মর্যাদার শিখর হচ্ছেন মাখযূমের নাতি। আর তোমার বাপ ছিল দাস।’’

হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহকে র বলতে শুনেছি, ‘হাসসান! যতক্ষণ তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করতে থাকবে, রুহুল কুদুসের সাহায্য তুমি লাভ করবে।’ তিনি আরও র্বণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একথাও বলতে শুনেছি, ‘হাসসান তারে জবাব দিয়ে দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করেছে।’ এ সব কথা বর্ণনার পর উম্মুল মু’মিনীন আমাদেরকে হাসসানের এ কাসীদাটিও শুনিয়েছেনঃ৪৩৮

আরবী হবে

তুমি করেছো মুহাম্মাদের নিন্দা, আর আমি তার জবাব দিয়েছি। আমার এ কাজের প্রতিদান রয়েছে আল্লাহর কাছে।

তুমি মুহাম্মাদের নিন্দা করছো, যিনি সৎকর্মশীল, ধার্মিক ও আল্লাহর রাসূল। প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা পালন যার স্বাভাব-বৈশিষ্ট্য।

আমার বাপ-দাদা, আমার ইজ্জত-আবরু সবই তোমাদের আক্রমণ থেকে মুহাম্মাদের মান-ইজ্জত রক্ষার জন্য ঢাল স্বরূপ।

তোমাদের মধ্যে থেকে কেউ রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দা, প্রশংসা বা সাহায্য করুক না কেন, সবই তাঁর জন্য সমান।

জিবরীল আমাদের মধ্যে আছেন। যিনি আল্লাহর বার্তাবাহক ও পবিত্র রূহ-যার সমকক্ষ কেউ নেই।’’

হযরত উসমানের (রা) শাহাদাতের পর মদীনার বিশৃঙ্খল অবস্থার কথা যখন জানতেল তখন তাঁর মুখে নিম্নোক্ত পংক্তিটি উচ্চরিত হলোঃ৪৩৯

আরবী হবে

‘‘যদি আমার সম্প্রদায়ের নেতারা আমার কথা মানতো তাহলে আমিতাদের এই ফাঁদ ও ধ্বংস থেকে বাঁচাতে পারতাম।’’

বসরা পৌঁছার পর তাঁর মুখে নিম্নের দুইটি বয়েত শোনা যেতঃ

আরবী হবে

‘‘অত্যাচারীদের আবাসভূমি ছেড়ে দাও-যদিও সেখানে পানি বিশুদ্ধ থাকে এবং ভীতিগ্রস্তদের চলার মত চল।

ঘাস নির্বাচন কর। অতঃপর দামাদের সবুজ উপত্যকায় রোদের মধ্যে চরতে থাক।’’

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, উটের যু&&দধ কোন কোন বীর নৈসিক রজয় ছন্দের যে চরণ দুইটি আবৃত্তি করেছিলেন, তা হযরত ‘আয়িশার (রা) স্মরণে ছিল। একবার তিনি চরণ দুইটি আবৃত্তি করে খুব কেঁদেছিরেন। সেই চরণ দুইটি এইঃ

আরবী হবে

‘‘হে আমাদের মা! যাঁকে আমরা সর্বোত্তম মা বলে জানি, আপনিকি দেখছেন না, কত বীর আহত হয়েছে, কত মাথা ও হাত ঘাসের মত কাটা গেছে।’’

হিশাম ইবন ‘উরওয়া তাঁর পিতা উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘আয়িশা (রা) বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা কবি লাবীদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করুন।

তিনি বলতেনঃ৪৪০

আরবী হবে

‘‘যাঁদের পাশে বসবাস করা যেত, তাঁরা সব চলে গেছেন। এখন আমি বেঁচে আছি চর্মরোগগ্রস্ত উটের মত উত্তরাসূরীদের মাঝে।’’

তারপর হযরত ‘আয়িশা (রা) বলেনঃ

‘‘তিনি যদি আমাদের এ কালের অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী বরতেন! আমি কবি লাবীদের এ রকম হাজারটি বয়েত বলতে পারি। অবশ্য আন্য কবিদের যে পরিমাণ বয়েত আমি বলতে পানি তার তুলনায় এ অতি নগণ্য।’’

হযরত ‘আয়িশার (রা) এ মন্তভ্য থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, তিনি কি পরিমাণ কাব্যরসিক ছিলেন, এ শাস্ত্রে তাঁর কি পরিমাণ দখল ছির এবং কত শত আরবী বয়েত ত৭ার মুখস্থ ছিল। আমরা হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিছি, কী অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি সেখানে রেখেছেন! আরবী কবিতার ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দেখা যায়।

হযরত ‘আয়িশার (রা) এমন কাব্যরুচি এবং শিল্পরস আস্বাদন ক্ষমতা দেখে অনেক কবি তাঁকে নিজের কবিতা শোনাতেন। হযরত হাসসান ইবন সাবিত (রা) আনসারদের মধ্যে কবিত্বের স্বীকৃত উসতাদ ছিলেন। ইফকের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার কারণে হযরত ‘আয়িশা (রা) তাঁর প্রতি অসন্তোষ থাকা স্বাভাবিক ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি হযরত ‘আয়িশার (রা) খিদমতে হাজির হয়ে তাঁকে নিজের কবিতা শোনাতেন।৪৪১ হযরত ‘আয়িশা (রা) তার প্রশংসা করতেন এবং তাঁর বিভিন্ন শুণাবলী বর্ণনা করতেন। তাছাড়া প্রসঙ্গক্রমে নবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জলসার অপর দউজন শ্রেষ্ঠ কবি হযরত কা’ব ইবন মালিক (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার (রা) নামও উলে্খ করতেন।৪৪২

মূলগতভাবে কাব্যচর্চা করা না ভালো, না মন্দ। কবিতাও কথার একটি প্রকার। কথার ভালো মন্দ কবিতার ছন্দের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং বিষয়বস্ত্তর উপর নির্ভরশীল। বিষয়বন্তু যদি খারাপ না হয় তাহলে সেই কবিতায় কোন দোষ নেই। গদ্যেরও ঠিকএকই অবস্থা। ভালোমন্দ নির্ভর করে বিষয়বস্ত্তর উপর।

কবিতার ভালোমন্দ সম্পর্কে হযরত ‘আয়িশা (রা) ঠিক এ রকম কথাই বলেছেনঃ৪৪৩

আরবী হবে

‘‘কিছু কবিতা ভালো হয়, কিছু কবিতা খারাপ হয়। ভালোটি গ্রহণ কর, খারাপটি পরিত্যগ কর।’’

তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ ‘সবচেয়ে বড় গুনাহগার ঐ কবি, যে গোটা গোত্রের নিন্দা করে। অর্থাৎ এক দুই জনের খারাপ কাজের জন্য গাটা গোত্রের নিন্দা করা নৈতিকতার পদক্ষলন এবং কবিত্ব শক্তির অপব্যবহার মাত্র।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, হযরত আয়িশা (রা) এমন এক বিষ্ময়কর প্রতিভা যার বর্ণনা ও মূল্যায়ন কোন সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। তাঁর জীবন ও বিচিত্রমুখী প্রতিভার বিবরণেরজন্য প্রয়েজান একখানি বৃহদাকৃতির গ্রন্থের। আমাদের আলাচনায় আমরা তাঁর কিছু পরিচয় পাঠকবর্গের নিকট তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

 

About ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ