সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

s1

সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সাইয়েদ আবুল  আ’লা মওদুদী

অনুবাদঃ আব্বাস আলী খান


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সূচনা

 وَإِن مِن أُمَّةٍ إِلّا خَلا فيها نَذيرٌ

“এমন কোন জাতি ছিল না যাদের মধ্যে কোন সাবধানকারী আগমন করেনি”।

-(সূরা ফাতেহাঃ ২৪)

وَلَقَد بَعَثنا فى كُلِّ أُمَّةٍ رَسولًا أَنِ اعبُدُوا اللَّهَ وَاجتَنِبُوا الطّٰغوتَ

“এবং আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন পয়গম্বর পাঠিয়েছি, যিনি এই বলে আহবান জানিয়েছেন, আল্লাহর বন্দেগী কর এবং তাগুতের আনুগত্য থেকে দূরে থাক”।

-(সূরা আন নাহলঃ ৩৬)

هٰذا نَذيرٌ مِنَ النُّذُرِ الأولىٰ

“পূর্ববর্তী ভীতি প্রদর্শনকারীদের মধ্যে ইনি একজন ভীতি প্রদর্শনকারী”।

-(সূরা আন নাজমঃ ৫৬)

إِنَّكَ لَمِنَ المُرسَلينَ

“(হে মুহাম্মদ) তুমি অবশ্যই একজন রসূল”। -(সূরা ইয়াসীন)

قُل ما كُنتُ بِدعًا مِنَ الرُّسُلِ

“(হে মুহাম্মদ) বল, আমি কোন অভিনব রসূল তো নই”।

-(সূরা আল আহকাফঃ ৯)

وَما مُحَمَّدٌ إِلّا رَسولٌ قَد خَلَت مِن قَبلِهِ الرُّسُلُ

“মুহাম্মদ একজন রসূল ব্যতীত কিছু নন এবং তার আগেও অনেক রসূল অতীত হয়ে গেছেন”। -(সূরা আলে ইমরানঃ ১৪৪

قولوا ءامَنّا بِاللَّهِ وَما أُنزِلَ إِلَينا وَما أُنزِلَ إِلىٰ إِبرٰهۦمَ وَإِسمٰعيلَ وَإِسحٰقَ وَيَعقوبَ وَالأَسباطِ وَما أوتِىَ موسىٰ وَعيسىٰ وَما أوتِىَ النَّبِيّونَ مِن رَبِّهِم لا نُفَرِّقُ بَينَ أَحَدٍ مِنهُم وَنَحنُ لَهُ مُسلِمونَ

فَإِن ءامَنوا بِمِثلِ ما ءامَنتُم بِهِ فَقَدِ اهتَدَوا ۖ  o

“বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপরে এবং ঐ শিক্ষার ওপরে যা আমাদের ওপরে নাযিল করা হয়েছে এবং ঐ শিক্ষার ওপরে যা নাযিল করা হয়েছিল ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানদের ওপরে এবং যা কিছু দেয়া হয়েছিল মূসা, ঈসা এবং অন্যান্য নবীগণের ওপর তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে, তার ওপরেও ঈমান এনেছি। তাদেঁর মধ্যে আমরা কোন পার্থক্য নির্ণয় করি না এবং আমরা আল্লাহর অনুগত। অতএব এরাও যদি এভাবে ঈমান আনে যেমন তোমরা এনেছ, তাহলে তারাও সরল-সঠিক পথে রয়েছে বলা যাবে”।

-(সূরা আল বাকারাহঃ ১৩৬-১৩৭)।

لَقَد مَنَّ اللَّهُ عَلَى المُؤمِنينَ إِذ بَعَثَ فيهِم رَسولًا مِن أَنفُسِهِم يَتلوا عَلَيهِم ءايٰتِهِ وَيُزَكّيهِم وَيُعَلِّمُهُمُ الكِتٰبَ وَالحِكمَةَ وَإِن كانوا مِن قَبلُ لَفى ضَلٰلٍ مُبينٍ

“প্রকৃতপক্ষে ঈমান আনয়নকারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট মেহেরবানী যে, তিনি তাদের জন্য স্বয়ং তাদেরই মধ্য থেকে এমন এক রসূলের উত্থান ঘটিয়েছেন যিতি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শুনান, তাদের তাযকিয়া বা মুদ্ধি করেন, তাদেরকে কিতাব এবং হিকমত শিক্ষা দেন। অন্যথায় তারা তো সুস্পষ্ট গুমরাহির মধ্যে পড়ে ছিল”। -(সূরা আলে ইমরানঃ ১৬৪)।

 اليَومَ يَئِسَ الَّذينَ كَفَروا مِن دينِكُم فَلا تَخشَوهُم وَاخشَونِ ۚ اليَومَ أَكمَلتُ لَكُم دينَكُم وَأَتمَمتُ عَلَيكُم نِعمَتى وَرَضيتُ لَكُمُ الإِسلٰمَ دينًا ۚ

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের ওপর উজাড় করে দিলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলাম জীবনবিধান মনোনিত করলাম”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ৩)

 

تَاللَّهِ لَقَد أَرسَلنا إِلىٰ أُمَمٍ مِن قَبلِكَ فَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيطٰنُ أَعمٰلَهُم فَهُوَ وَلِيُّهُمُ اليَومَ وَلَهُم عَذابٌ أَليمٌ

وَما أَنزَلنا عَلَيكَ الكِتٰبَ إِلّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِى اختَلَفوا فيهِ ۙ وَهُدًى وَرَحمَةً لِقَومٍ يُؤمِنونَ

 “খোদার কসম, হে মুহাম্মদ, আমরা তোমার পূর্বে বিভিন্ন উম্মতের জন্য হেদায়েত পাঠিয়েছি। কিন্তু তারপর শয়তান তাদের দুষ্কৃতিকে তাদের জন্যে আনন্দদায়ক বানিয়ে দিয়েছে। আজ সে-ই তাদের অভিভাবক হয়ে পড়েছে এবং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির উপযোগী হয়েছে। এবং আমরা তোমার উপর এ কিতাব নিছক এ জন্যে নাযিল করেছি যে, তুমি তাদের কাছে ঐ সত্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরো –যা নিয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। আর  এ জন্যেও ঐ কিতাব নাযিল করেছি যাতে করে এ হেদায়েত এবং রহমত হতে পারে তাদের জন্যে যারা এর আনুগত্য স্বীকার করে”।

-(সূরা আন নাহলঃ ৬৩-৬৪)

يٰأَهلَ الكِتٰبِ قَد جاءَكُم رَسولُنا يُبَيِّنُ لَكُم كَثيرًا مِمّا كُنتُم تُخفونَ مِنَ الكِتٰبِ وَيَعفوا عَن كَثيرٍ ۚ قَد جاءَكُم مِنَ اللَّهِ نورٌ وَكِتٰبٌ مُبينٌ

يَهدى بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضوٰنَهُ سُبُلَ السَّلٰمِ وَيُخرِجُهُم مِنَ الظُّلُمٰتِ إِلَى النّورِ بِإِذنِهِ وَيَهديهِم إِلىٰ صِرٰطٍ مُستَقيمٍ

 “হে আহলে কিতাব! তোমাদের নিকটে আমাদের রসূল এসে গেছেন, যিনি তোমাদের সামনে সেসব বহু কথা খুলে বলেন যা তোমরা কিতাবের মধ্য থেকে গোপন করো এবং অনেক কিছু তিনি মাফ করে দেন। তোমাদের নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলোক এবং একটি সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে যার মাধ্যমে তিনি ঐসব লোককে নিরাপত্তা ও শাস্তির পথ দেখান, যারা তাঁর পছন্দ মোতাবেক চলে এবং তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন এবং সঠিক পথে তাদেরকে পরিচালিত করেন”। -(সূরা মায়েদাহঃ ১৫-১৬)।

يٰأَيُّهَا النَّبِىُّ إِنّا أَرسَلنٰكَ شٰهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذيرًا

وَداعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذنِهِ وَسِراجًا مُنيرًا

 “হে নবী! আমরা তোমাকে সাক্ষ্য ও সুসংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শনকারী এবং আল্লাহর নির্দেশে তাঁর দিকে আহবানকারী হিসেবে এবং একটি উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে প্রেরণ করেছি”। -(সূরা আল আহযাবঃ ৪৫-৪৬)।

يَأمُرُهُم بِالمَعروفِ وَيَنهىٰهُم عَنِ المُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيهِمُ الخَبٰئِثَ وَيَضَعُ عَنهُم إِصرَهُم وَالأَغلٰلَ الَّتى كانَت عَلَيهِم ۚ فَالَّذينَ ءامَنوا بِهِ وَعَزَّروهُ وَنَصَروهُ وَاتَّبَعُوا النّورَ الَّذى أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولٰئِكَ هُمُ المُفلِحونَ

“সে (রসূল) তাদেরকে নেকীর আদেশ করে, পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, তাদের জন্য পাক জিনিস হালাল করে এবং নাপাক জিনিস হারাম করে। আর তাদের ওপর থেকে সেসব বোঝা নামিয়ে দেয় এবং এসব বন্ধ কর্তন করে যার দ্বারা তারা অবনমিত ও শৃঙ্খলিত ছিল। অতএব যারা তার ওপর ঈমান আনবে, তার সাহায্য সহযোগিহতা করবে এবং ঐ নূর অনুসরণ করবে যা তার সাথে নাযিল করা হয়েছে তারাই সাফল্য লাভ করবে”। -(সূরা আল আরাফঃ ১৫৭)।

إِنّا أَنزَلنا إِلَيكَ الكِتٰبَ بِالحَقِّ لِتَحكُمَ بَينَ النّاسِ بِما أَرىٰكَ اللَّهُ ۚ وَلا تَكُن لِلخائِنينَ خَصيمًا

“হে মুহাম্মদ! আমরা সত্যসহ এ কিতাব তোমার ওপর নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি আল্লাহর বর্ণিত পদ্ধতিতে লোকের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করতে পার এবং যেন খেয়ানতকারীদের উুিকল না হয়ে পড়”। -(সূরা আন নিসাঃ ১০৫)।

هُوَ الَّذى أَرسَلَ رَسولَهُ بِالهُدىٰ وَدينِ الحَقِّ لِيُظهِرَهُ عَلَى الدّينِ كُلِّهِ ۚ

“আল্লাহ তায়ালাই সেই সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়েত এবং দ্বীনে হকসহ পাঠিয়েছেন, যাতে করে তিনি এ দ্বীনে হক বা সত্য জীবন বিধানকে যাবতীয় জীবন বিধানের ওপর বিজয়ী করতে পারেন”। -(সূরা আল ফাতাহঃ ২৮)।

قُل يٰأَيُّهَا النّاسُ إِنّى رَسولُ اللَّهِ إِلَيكُم جَميعًا الَّذى لَهُ مُلكُ السَّمٰوٰتِ وَالأَرضِ ۖ لا إِلٰهَ إِلّا هُوَ يُحيۦ وَيُميتُ ۖ فَـٔامِنوا بِاللَّهِ وَرَسولِهِ النَّبِىِّ الأُمِّىِّ الَّذى يُؤمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمٰتِهِ وَاتَّبِعوهُ لَعَلَّكُم تَهتَدونَ

“হে মুহাম্মদ! বলে দাও –হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের জন্যে আল্লাহর রসূল, যে আল্লাহর আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক, যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, যিনি জীবন ও মৃত্যুর মালিক। অতএব ঈমান আন আল্লাহর ওপর এবং তাঁর সেই উম্মী রসূলের ওপর যে খোদা ও তাঁর নির্দেশনাবলীর ওপর বিশ্বাস রাখে।

وَأوحِىَ إِلَىَّ هٰذَا القُرءانُ لِأُنذِرَكُم بِهِ وَمَن بَلَغَ ۚ

“এবং বল, আমার প্রতি এ কুরআন অহীর মাধ্যমে পাঠন হয়েছে যাতে করে এর মাধ্যমে তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এ পৌঁছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি”।

ما كانَ مُحَمَّدٌ أَبا أَحَدٍ مِن رِجالِكُم وَلٰكِن رَسولَ اللَّهِ وَخاتَمَ النَّبِيّۦنَ ۗ

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নয় কিন্তু সে আল্লাহর রসূল এবং নবীগণের ধারাবাহিকতা সমাপ্তকারী”। -(সূরা আল আহযাবঃ ৪০)।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

উপক্রমনিকা

আল্লাহ তায়ালার অশেষ শুকরিয়া যে, যে বিরাট কাজে হাত দেয়া হয়েছিল তা বহুলাংশে সম্পন্ন হয়েছে এবং আশা করা যায় যে, তাঁরই সাহায্যে অবশিষ্ট কাজটুকুও সম্পন্ন হবে।

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর সাথে আমার যে দলগত সম্পর্ক, তার থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যদি নিষ্ঠার সাথে তাঁর দ্বীনী খেদমতের প্রতি নজর দেয়া হয়, তাহলে কোন অন্ধ শ্রদ্ধাবোধ ব্যতিরেকেই এ অনুভূতি জাগে যে, এ যুগে যে ধরনের শক্তিশালী যুক্তি প্রমাণেল সাথে নতুন প্রকাশভংগীতে এবং যেমন বিশদভাবে তিনি ইসলামের মৌল সত্যতা ও তার পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সুস্পষ্ট করে তুরে ধরেছেন, তার দৃষ্টান্ত কালের সুদূর দিগন্তেও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, যে অবদান রেখেছেন তার থেকে অসংখ্য লোকের জীবনের পট-পরিবর্তন হয়েছে। আর এ মহান কাজ মাওলানার জন্যে আখেরাতের বিরাট মূলধন হয়ে রয়েছে।

মাওলানার সাথে পরিচিত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর সাথে আমার আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তার জন্যে আমার একান্ত বাসনা এই যে, মাওলানা প্রজ্ঞা ও চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারের জন্যে বিভিন্ন বর্ণনাভঙ্গী অবলম্বন করা হোক। সেই সাথে মাওলানা ব্যক্তিত্ব, তাঁর সুনাম ও সম্পাদিত কাজকর্মকে আমার ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির কাজে লাগাব –এ ধরনের মানসিকতার ঊর্ধ্বেও আমি রয়েছি।

আজ থেকে দশ-বার বছর আগের কথা। মাওলানা মওদূদী সাহেবের কামরায় আমরা কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু বসে আলাপ করছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে আমি বললাম যে, যদি মাওলানা ভাল মনে করেন তাহলে তাঁর প্রবন্ধাদী থেকে জীবন চরিত কংকলন করা যায়। এতে আমার বন্ধুটি এ কাজের দায়িত্ব তাঁকে দেয়ার জন্যে অনুরোধ জানায়। আমি তাতে রাজি হলাম। কিন্তু কয়েখ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন আমার বন্ধুটি এ কাজের সুযোগ পেলেন না, তখন আমি তাঁর অনুমতি নিয়ে পুনরায় বিষয়টি মাওলানার নিকটে উত্থাপন করলাম। মাওলানা এ প্রস্তাবিত বিষয় ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে কাজ করার জন্যও মোটামুটি কিছু সদুপদেশ দেন।

অবশেষে কাজ শুরু করার পর মনে হল নিজের পক্ষ থেকে একটা গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রণয়ন করার চেয়ে মাওলানার গোটা সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে মূল-বচন সংগ্রহ করে গ্রন্থ সংকলনের কাজ বড় কঠিন ও শ্রমসাপেক্ষ। কারণ তাফহীমুল কুরআনের ছ’খণ্ড ছাড়াও তার বহু সাহিত্য অধ্যয়ন, তার থেকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও উপযোগী মূল-বচন চিহ্নিত করা, অতপর তার অনুলিপি তৈরী করা এবং সর্বশেষে সেগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদভুক্ত করা, বিভিন্ন শিরোনামে বিন্যস্ত করা প্রভৃতি কাজগুলো এতো দুরূহ ছিল যে, বারবার হিম্মত হারিয়ে ফেলতাম এবং মনে করতাম এ বিরাট পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আমর সাধ্যের অতীত।

সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, এ কাজে আমার বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধবের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করেছি। বিশেষ করে মাওলানা আবদুল ওয়াকিল আলীভী এম.এ. প্রায় দেড় বছল ধরে আমার সাথে এমনভাবে কাজ করেছেন যে, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এ কাজে সবচেয়ে বেশী অবদান তাঁরই ছিল।

নীরবে দেড়-দু’বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে কাজটি শেষ হবার পর যখন তা মাওলানার সামনে পেশ করা হল তখন তিনিও বিস্ময়বোধ করলেন যে, নবী মুস্তফা (সা)-এর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর জীবন চরিত সম্পর্কে এত উপকরণ তিনি তাঁর প্রবন্ধাদিতে সঞ্চিত করে রেখেছেন। আমাদের মতো অধম লোকের হাতে প্রায় তিন খণ্ড গ্রন্থের প্রাথমিক সংকলন সমাপ্ত হয়েছে দেখে মাওলানাও সন্তোষ প্রকাশ করেন। মৌল আলোচনা, নবুয়াতের মর্যাদা, অহীর ব্যবস্থাপনা, নবীপাকের আগমন, নবীপূর্ব যুগের পরিবেশ পরিস্থিতি, যে জাতিকে সম্বোধন করে দাওয়াত পেশ করা হয়েছে তাদের এবং অন্যান্য বিভিন্ন দলের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে। দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচিত হয়েছে নবী মুস্তপঅ (সা)-এর জন্ম থেকে মদীনায় নিজরত পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলী, তৃতীয় খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে মদীনায় অতিবাহিত নবীপাকের আন্দোলন-জীবনের চরম মুহূর্তগুলো। চতুর্থ খণ্ড সংকলন বাকী আছে। তার মধ্যে থাকবে নবী (সা)-এর সংস্কার কার্যাবলী, শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবনের বিভিন্ন বিভাগের সূচিত পরিবর্তনের চিত্র। আল্লাহ তায়ালা যেন এ খণ্ড সমাপ্ত করার তাওফিকও আমাদেরকে দান করেন।

গ্রন্থটি এমনভাবে সংকলিত করা হয়েছে যে, মাওলানার প্রবন্ধাবলী ও বিভিন্ন মূল বচনকে বিভিন্ন শিরোনামায় সুবিন্যস্ত করা হয়েছে, বিষয়বস্তুর বাঁধন মজবুত করা হয়েছে, যার ফলে প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য বিষয়সমূঞ পর্যায়ক্রমে দৃষ্টিগোচর হয়। অল্প কিছু স্থান এমন আছে যেখানে সংকলকদ্বয়কে নিজের পক্ষ থেকৈ অথবা অন্য কোন গ্রন্থ থেকে কিছু কথা সন্নিবেশিত করতে হয়েছে এবং তার বরাতও উল্লেখ করা হয়েছে। টীকা দু’ধরনের আছে। এক-যা গ্রন্থাকারের মূল প্রবন্ধে সন্নিবেশিত। দুই- যা সংকলদ্বয়ের পক্ষ থেকে সংযোজিত করা হয়েছে। এ দু’ধরনের টীকা আলাদা আলাদাভাবে লিখিত হয়েছে। বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে গ্রন্থকারের প্রবন্ধ থেকে যেসব উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, গ্রন্থের শেষে একত্রে তার উল্লেখ করা হয়েছে।

আনন্দের বিষয় এই যে, মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী তাঁর অসুস্থতা ও ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের এ সংকলন আগাগোড়া পড়ে স্থানে স্থানে সংশোধনও করেছেন এবং তাঁর কিছু মূল-বচন সংযোজনের জন্যে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। এসব সত্ত্বেও এ গ্রন্থ সংকলনে কোথাও কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেলে তার জন্যে আমরাই দায়ী হবো।

এখন আমরা যা কিছুই করেছি এবং যেমনভাবেই করেছি তার জন্যে দোয়া করি যেন আল্লাহ তা কবুল করে নেন এবং পাঠকগণ এর থেকে হেদায়েতের আলোক-রশ্মি লাভ করেন। পাঠকবর্গের নিকটে আমরা এ আবেদনও জানাই যে, কোথাও কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ্য করলে অথবা কোন কিছুর পরিপর্ধন প্রয়োজন মনে করলে আমাদেরকে অবহিত করে বাধিত করবেন। আমরা ইনশাআল্লাহ পরবর্তী সংস্করণে তাঁদের প্রস্তাব-পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেব এবং গ্রন্থখানিকে অধিকতর ভাল করার চেষ্টা করব।

-নঈম সিদ্দিকী

 

সংকলকদ্বয়ের কথা

প্রথম খণ্ড সমএর্ক বলে রাখা দরকার যে, এতে দুনিয়াদী আলোচ্য বিষয়ৈর নামে শ্রদ্ধেয় মাওলানার ঐ সব প্রবন্ধ বক্তৃতা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি সংগৃহীত করা হয়েছে যা একদিকে নবুয়াতের পদমর্যাদা, অহীর ব্যবস্থাপনা, দ্বীন সম্পর্কে ধারণা ও অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে এবং অপরদিকে নবী (সা)-এর আবির্ভাবকাল এবং পূর্ববর্তী সভ্যতার ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্ফুট করে। এ আলোচনা যদিও সরাসরি সীরাতপাক সম্পর্কিত ঘটনাবলী উপস্থাপিত করেনা, তথাপি নবীপাক (সা)-এর ব্যক্তিত্ব, তাঁর পদমর্যাদা এবং তাঁর সর্বাত্মক সংগ্রাম উপলব্ধির এ সহায়ক হবে। এ জন্যে আমরা প্রয়োজন বোধ করেছি যে, তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন করার পূর্বে পাঠকবর্গ এসব পথ-নির্দেশক আলোচনার সাথে পরিচিত হবেন। -সংকলকদ্বয়।

 

০০০

ইসলাম প্রকৃতপক্ষে সেই আন্দোলনের নাম যা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণা-বিশ্বাসের ওপরে মানব-জীবনের গোটা প্রাসাদ নির্মাণ করতে চায়। এ আন্দোলন অতি প্রাচীনকাল তেকে একই ভিত্তির ওপরে এবং একই পদ্ধতিতে চলে আসছে। এর নেতৃত্ব তাঁরা দিয়েছেন, যাঁদেরকে আল্লাহ তায়ালার নবী-রসূল বলা হয়। আমাদেরকে যদি এ আন্দোলন পরিচালনা করতে হয়, তাহলে অনিবার্যরূপে সেসব নেতৃবৃন্দের কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ এছাড়া অন্য কোন কর্মপদ্ধতি এ বিশেষ ধরনের আন্দোলনের জন্যে না আছে, আর না হতে পারে। এ সম্পর্কে যখন আমরা আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ)-এর পদাংক অনুসন্ধানের চেষ্টা করি, তখন আমরা বিরাট অনুবিধার সম্মুখীন হই। প্রাচীনকালে যেসব নবী তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন, তাঁদের কাজকর্ম সম্পর্কে আমরা বেশী কিছু জানতে পারি না। কুরআনে কিছু সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু তার থেকে গোটা পরিকল্পনা উদ্ধার করা যায় না। বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে হযরত ঈসা (আ)-এর কিছু অনির্ভরযোগ্য বাণী পাওয়া যায় যা কিছু পরিমাণে একটি দিকের ওপর আলোকপাত করে এবং তা হলো এই যে, ইসলামী আন্দোলন তার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে কিবাবে পরিচালনা করা যায় এবং কি কি সমস্যার সম্মুখীন তাকে হতে হয়। কিন্তু হযরত ঈসা (আ)-কে পরবর্তী পর্যায়ের সম্মুখীন হতে হয়নি এবং সে সম্পর্কে কোন ইঙ্গিতও পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে একটিমাত্র স্থান থেকে আমরা সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ পথ-নির্দেশ পাই এবং তা হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সা)-এর জীবন। তাঁর দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণে নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে এ পথের চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার জন্যে তাঁর দিকে প্রত্যাবতন করতে আমরা বাধ্য। ইসলামী আন্দোলনের সকল নেতৃবৃন্দের মধ্যে শুধু নবী মুহাম্মদ (সা)-ই একমাত্র নেতা যাঁর জীবনে আমরা এ আন্দোলনের প্রাথকিম দাওয়াত থেকে শুরু করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এবং অতপর রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-পদ্ধীত পর্যন্ত এক একটি পর্যায় ও এক একটি দিকের পূর্ণ বিবরণ এবং অতি নির্ভরযোগ্য বিবরণ আমরা জানতে পারি।

গ্রন্থকারের ভূমিকা

সকল যুগে মানুষ ইসলামের নিয়ামত মাত্র দু’টি উপায়ে লাভ করেছে। এক –আল্লাহর কালাম। দুই –নবীগণকে আল্লাহ তায়ালা শুধু তাঁর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার এবং তা শিক্ষা ও উপলব্ধি করার মাধ্যম হিসেবেই পাঠাননি। বরং সেই সাথে তাঁদেরকে বাস্তব নেতৃত্বদান ও পথপ্রদর্শনের নির্দেশও দিয়েছেন, যাতে করে তাঁরা আল্লাহর বাণীর সঠিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্যে মানুষ ও সমাজের সংস্কার সংশোধন করতে পারেন এবং বিকৃত সমাজব্যবস্থার সংশোধন করে একটি সৎ ও সুষ্ঠু সমাজ পুনর্গঠিত করে দেখান

এ দু’টি বিষয় চিরকাল এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করে না মানুষ দ্বীনের সঠিক জ্ঞান লাভ করতে পেরেছে, আর না সে হেদায়াত লাভ করতে পেরেছে। আল্লাহর কিতাবকে নবী থেকে আলাদা করলে তা এক কাণ্ডারীবিহীন তরী হয়ে পড়বে। একজন অনভিজ্ঞ মুসাফির তা নিয়ে জীবন সমুদ্রে যতই ঘুরাফেরা করুক না কেন, গন্তব্যস্থলে কিছুতেই পৌঁছাতে পারবে না আবার নবীকে আল্লাহর কিতাব থেকে আলাদা করুন, তাহলে খোদার পথ পাওয়ার পরিবর্তে মানুষ অখোদাকে খোদা বানাবার বিপদ থেকে কিছুতেই বাঁচতে পারবে না। এ  উভয় পরিণাম পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ভোগ করেছে। হিন্দু জাতি তাদের ধর্মপ্রবর্তকদের জীবন-চরিত বিলুপ্ত করেছে এবং শুধু ধর্মগ্রন্থ নিয়ে ক্ষান্ত হয়ে বসে পড়েছে। পরিণাম এই হয়েছে যে, ধর্মগ্রন্থগুলোও তারা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। খৃষ্টানগণ কিতাবকে উপেক্ষা করে নবীর আঁচল ও তাঁর ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ধরে রইল। পরিণামে তারা আল্লাহর নবীকে আল্লাহর পুত্র, বরং স্বয়ং আল্লাহ বানিয়ে ছাড়ল।

অতীতকালের ন্যায় এ আধুনিক যুগেও মানুষকে ইসলামের নিয়ামত লাভ করতে হলে দু’টি মাধ্যমই অবলম্বন করতে হবে যা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। এক. আল্লাহর কালাম যা একমাত্র কুরআন পাকের আকারেই পাওয়া যেতে পারে। দুই. নবীর আদর্শ যা এখন শুধুমাত্র আরবের নবী মুহাম্মদ (সা)-এর জীবন চরিতের মধ্যেই সংরক্ষিত আছে। পূর্বের ন্যায় আজও যদি ইসলামের সঠিক জ্ঞানলাভ করতে হয় তাহলে তার একমাত্র পন্থা এই যে, কুরআনকে বুঝতে হবে নবী মুহাম্মদ (সা) থেকে এবং নবী মুহা্ম্মদ (সা) কে বুঝতে হবে কুরআন থেকে। এ দু’টিকে একে অপরের  সাহায্যে যে ব্যক্তিই বুঝতে পেরেছে, সে-ই ইসলামকে বুঝতে পেরেছে। অন্যথায় সে দ্বীন উপলব্ধি করা থেকে বঞ্চিত রইল এবং পরিণামে হেদায়াত থেকেও বঞ্চিত রইল।

তারপর কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা) উভয়ের উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও বিশেষ কাজ যেহেতু একই, সে জন্যে সে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কতটুকু হৃদয়ঙ্গম করা যায় তার উপরই সবকিছু নির্ভর করছে। এ বিষয়টি উপেক্ষা করলে দেখা যাবে যে, কুরআন কতকগুলো, শব্দ ও বাক্যের সমষ্টি এবং নবীর জীবন-চরিত কতকগুলো ঘটনার সমাবেশ বৈ আর কিছু নয়। এবং ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও তথ্য অনুসন্ধানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নবী পাকের ব্যক্তিসত্তা ও বর্তমান যুগ সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা যেতে পারে কিন্তু দ্বীনের প্রাণশক্তি উপলব্ধি করা যাবে না কারণ, এ উপলব্ধি কুরআনের নিছক মূল বচন ও ঘটনাপঞ্জীর সাথে নয় বরং ঐ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত যার জন্যে কুরআন নাযিল হয়েছিল এবং যার পতাকা বহনের জন্যে নবী আবির্ভূত হয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা যতটা স্বচ্ছ ও সঠিক হবে, কুরআন ও নবীর জীবন চরিত সম্পর্কে ধারণা ততটা সঠিক হবে। আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা ভ্রান্ত হলে কুরআন ও নবী সম্পর্কে ধারণা ভ্রান্ত হতে বাধ্য।

এটা অতি সত্য যে, কুরআন এবং নবী-চরিত মহাসমুদ্রের ন্যায়। কেউ যদি চায় যে, সে এসবের সকল অর্থ, মর্ম, মঙ্গল ও বরকত লাভ করবে, সে কিছুতেই তা পারবে না। অবশ্যি যতটুকু চেষ্টা করা যেতে পারে তাহল এই যে, সাধ্যমত যত বেশী জ্ঞান তার থেকে লাভ করা যায় এবং তার আলোকে দ্বীনের প্রাণশক্তি যতটা উপলব্ধি করা যায়।

আল্লাহ তায়ালার অসীম দয়ার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে, কুরআন পাক উপলব্ধি করাবার যতটুকু চেষ্টা ও শক্তি আমার ছিল তা কাজে লাগাবার জন্যে তিনি তাফহীমুল কুরআন সমাপ্ত করার তওফীক আমাকে দিয়েছেন। তারপর আমার একান্ত বাসনা ছিল যে, নবী পাকের জীবন-চরিতের উপর কলম ধরি। কিন্তু প্রথম কাজটি সমাধা করতে আমার জীবনের ত্রিশটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এরপর আমার আর এমন শক্তি নেই যে, দ্বিতীয় কাজে হাত দেই, হাত দিতে না পারায় বেদনাটা আমার মনে সর্বদা খচ খচ করছিল, এমন সময় জনাব নঈম সিদ্দিকী ও জনাব আবদুল ওয়াকিল আলভী আমার বিভিন্ন গ্রন্থাদি ও প্রবন্ধাদি থেকে সীরাতের এ সংকলন সমষ্টি আমার সামনে পেশ করলেন। আমি তখন অবাক হয়ে গেলাম যে, এ বিরাট বিষয়ের উপর আমার লেখার মধ্যে এত উপকরণ ছিল। সাথে সাথে তাঁদের এ অক্লান্ত শ্রমের জন্যে তাঁদেরকে স্বতস্ফূর্ত আন্তরিক মুবারকবাদ জানালাম এবং তাঁদের জন্যে দোয়ায়ে খায়েরও করলাম। এ জন্যে যে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এ উপকরণগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে সেগুলোকে তাঁরা যথাযথভাবে সংকলিত করেছেন। যদিও এ উপকরণে সমষ্টি সীরাতের উপর একটি চূড়ান্ত গ্রন্থ প্রণয়নের জন্যে যথেষ্ট নয়, তথাপি এ সংকলনে যেসব বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছে তা ইনশাআল্লাহ, নবীপাক (সা)-এর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর বিরাট অবদান উপলব্ধি করার সহায়ক হবে।

অবশ্যি এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ গ্রন্থে যা কিছু সংযোজিত করা হয়েছে তা আমার গ্রন্থ ও প্রবন্ধ পাঠকগণের ইতিপূর্বেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং চর্বিত চর্বনণ মানুষের কাছে ভালও লাগে না। কিন্তু এ গ্রন্থের পাঠক নিজেই অনুভব করবেন যে, যে কথাগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছিল এবং যা বিগত ত্রিশ-চল্লিশ বছরে বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল, সেগুলো এ গ্রন্থে একত্রে সংকলনের আকারে রয়েছে, বিক্ষিত প্রবন্ধাদি অধ্যয়নে সে উপকারিতা পাওয়া যায় না

আল্লাহ পাকের কাছে এ দোয়াই করি যেন এ গ্রন্থটি তাঁর বান্দাহদের হেদায়াতের এবং আখেরাতে আমার প্রতিদানের উপায় হয়।

-আবুল আ’লা

লাহোর

১৯শে যিলকদ, ১৩৯২ হিজরী

২৫শে ডিসেম্বর, ১৯৭২ খৃষ্টাব্দ

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.