সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতের স্বপক্ষে কুরআনের যুক্তি

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি-[নবুয়াতে মুহাম্মদী সম্পর্কে কুরআনে যে আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক সন্নিবেশিত হয়েছে তা এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী যে, একটিমাত্র নিবন্ধে তা সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কুরআনের যুক্তি-তর্কের যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মওলানা মওদূদী নিবন্ধে তা সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কুরএনর যুক্তি-তর্কের যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মওলানা মওদূদী করেছেন, তাকে একত্র করলে সেটা একটা আলাদা পুস্তকের রূপ নেবে। এসব দিক বিবেচনা করে আমরা কয়েকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি নিয়ে মাওলানার সংক্ষিপ্ত আলোচনাকে এখানে উদ্ধৃত্ত করছি।–(সংকলক)]

কুরআনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১০৯ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী। তুমি এর আগে কোনো বই-কিতাব পড়তেও না এবং নিজ হাতে লিখতেও না। তা যদি হতো তাহলে বাতিলপন্থীরা সন্দেহে পড়ে যেতে পারতো। আসলে এ হলো জ্ঞানীদের অন্তরে উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী”।–(সূরা আল আনকাবুতঃ ৪৮-৪৯)

এ আয়াতে বর্ণিত যুক্তির মূল সূত্র এই যে, হযরত (সা) নিরপেক্ষ ছিলেন। তার দেশবাসী, আত্মীয়-স্বজন,পরিবার-পরিজন ও স্বগোত্রীয় লোকেরা হযরতকে ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে ‘যৌবনকাল’ পর্যন্ত স্বচক্ষে দেখেছে। তিনি যে সারা জীবনে কোনো বই পড়েননি এবং কখনো কলম ধরেননি, তা তারা ভাল করেই জানতো।

হযরত (সা)-এর নিরক্ষর হওয়াটাই নবুয়াতের প্রমাণ

তিনি যে নিরপেক্ষ ছিলেন সেই বাস্তব ব্যাপারটার উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেনঃ এ থেকে স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীনকালের আসমান কিতাবসমূহের শিক্ষা, সাবেক নবীদের জীবনকাহিনী, অতীতের বিভিন্ন ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস, আদিম জাতিসমূহের ইতিবৃত্ত এবং অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সংক্রান্ত যে গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞানরাশী এ নিরপেক্ষ নবীর মুখ দিয়ে বের হচ্ছে, তা অহী ছাড়া আর কোন উপায়ে তার আয়ত্ত হওয়া সম্ভব ছিল না। তাঁর যদি লেখাপড়া জানা থাকতো এবং লোকেরা তাকে বই-কিতাব পড়তে এবং গবেষণা ও তত্বানুসন্ধান করতে দেখে থাকতো তাহলে বাতিলপন্থী লোকদের এমন সন্দেহ করার একটা ভিত্তি হয়তো থাকতো যে, এ বিপুল জ্ঞানসম্ভার অহীর মাধ্যমে না হয়ে লেখাপড়া ও জ্ঞানান্বেষণের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু নবীর নিরেট নিরপেক্ষতা এ ধরনের কোনো সন্দেহের আদৌ কোনো অবকাশ থাকতে দেয়নি।–[কুরআনের এরূপ দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা ও নিখুঁত যুক্তি প্রদর্শনের পরও যারা হযরত (সা)-কে শিক্ষিত প্রমাণ করার চেষ্টা করে তাদের ধৃষ্টতায় অবাক না হয়ে পারা যায় না। অথচ একানে কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় হযরত (সা)-এর নিরক্ষকরতাকে তার নবুয়াতের স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। যেসব রেওয়ায়াতের ওপর নির্ভর করে বলা হয় যে, হযরত (সা) শিক্ষিত ছিলেন বা পরে লেখাপড়া শিখেছেন। প্রথমতঃ তা গোড়াতেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যোগ্য। কেননা কুরআনরে পরিপন্থী কোনো রেওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তা ছাড়া সেগুলো এত দুর্বল যে, সেগুলোকে যুক্তির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণই করা যায় না। এর মধ্যে একটা হলো হোদায়বিয়ার সন্ধি সংক্রান্ত বুখারীর বর্ণনা। এতে বলা হয়েছে যে, সন্ধির চুক্তি লেখার সময় মক্কার কাফেরদের প্রতিনিধি হযরত (সা)-কে বললেন, মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ থেকে ‘রসূলুল্লাহ’ কেটে দিয়ে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ) লিখে দাও। হযরত আলী ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কাটতে রাজী হলেন না। তখন হযরত (সা) সন্ধি পত্রটা তার হাত থেকে নিয়ে নিজেই ঐ শব্দটা কেটে দিলেন এবং ‘মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ’ লিখে দিলেন। সাহাবী বারা ইবনে আজেবের বরাত দিয়ে বর্ণিত এই হাদীসটা বুখারীর চার জায়গায় এবং মুসলিমে দু’জায়গায় উদ্ধৃত হয়েছে এবং প্রত্যেক জায়গায় এর পার্থক্য রয়েছে। এক বুখারীর সন্ধিসংক্রান্ত অধ্যায়ে এক বর্ণনার ভাষা এ রকমঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১১০ পৃষ্ঠায়)

“হযরত রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-কে বললেনঃ এ কথাটা কেটে দাও। হযরত আলী (রা) বললেন, ওটা আমি কাটতে পারবো না। অবশেষে হযরত নিজ হাতেই তা কেটে দিলেন।

দুইঃ বুখারীর অন্য রেওয়ায়াতের ভাষা এ রকমঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১১০ পৃষ্ঠায়)

“অতপর হযরত আলী (রা)-কে তিনি বললেন! রসূলুল্লাহ শব্দটা কেটে দাও। আলী (রা) বললেনঃ না, খোদার কছম, আপনার নাম আমি কখনো কাটবো না। অতপর হযরত (সা) সন্ধি পত্র নিয়ে নিলেন এবং তাতে লিখলেনঃ এটা আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদের সম্পাদিত চুক্তি”।

তিনঃ বারা ইবনে আজেবের বরার দিয়ে জিজিয়া অধ্যায়ে সন্তিবেশিত হয়েছে বুখারীর তৃতীয় বর্ণনা। তাতে বলা হয়েছেঃ (আরবী*****************পিডিএফ ১১০পৃষ্ঠায়)

“হযরত (সা) নিজে লিখেতে জানতেন না। তিনি হযরত আলী (রা)-কে বললেন ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কেটে দাও। হযরত আলী (রা) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি ওটা কখনো কাটবো না তখন হযরত (সা) বললেনঃ তাহলে যেখানে শব্দটা লেখা আছে, সে জায়গাটা আমাকে দেখিয়ে দাও। তিনি হযরত (সা)-কে জায়গাটা দেখালেন। তখন হযরত (সা) নিজ হাতে শব্দটা কেটে দিলেন।

চারঃ বুখারীর চতুর্থ বর্ণতা সন্নিবেশিত হয়েছে কিতাবুল মাগাজীতে (যুদ্ধ-বিগ্রহ সংক্রান্ত অধ্যায়) সেটা এইঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১১০ পৃষ্ঠায়)

“তখণ হযরত (সা) সন্ধিপত্র হাতে নিলেন। অথচ তিনি লিখতে পারতেন না। তিনি লিখলেনঃ এটা আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদের সম্পাদিত চুক্তি”।

পাঁচঃ বারা ইবনে আজেব থেকে মুসলিমের কিতাবুল জিহাদে আরো একটা বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, হযরত আলী (রা) অস্বীকার করায় হযরত নিজ হাতে ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কেটে দেন।

ছয়ঃ মুসলিম শরীফের অপর রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত আলী (রা)-কে রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কোথায় আমাকে দেখিয়ে দাও। হযরত আলী (রা) জায়গাটা দেখালেন। তখন হযরত সেই শব্দটা কেটে দিয়ে সেখানে লিখলেন ‘আবদুল্লাহ’র ছেলে। রেওয়ায়াত সমূহের ভাষায় এ তারতম্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মাঝখানের বর্ণনাকারীর হযরত বারা ইবনে আজেবের বক্তব্য অবিকলভাবে উদ্ধৃত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ‘আবদুল্লাহ’ শব্দটা হযরত নিজ হাতেই লিখেছিলেন। আসল ঘটনা এমনও হয়ে থাকতে পারে যে, হযরত আলী (রা) যখন ‘রাসূলুল্লাহ’ শব্দটা কাটতে অস্বীকার করেন তখন হযরত সেই জায়গা কোটতা হা হযরত আলী (রা)-এর কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ে নিজ হাতে কেটে দেন এবং তারপর হযরত আলী (রা) বা অন্য কোনো লেখককে দিয়ে “ইবনে আবদুল্লাহ” লিখিয়ে নিয়েছেন। অন্যান্য রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, হয়ত আলী ও মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) ও দু’জন লেখন সন্ধিপত্র লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। (ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ২১৭) সুতরাং একজন লেখক যে কাজ করতে রাজী হননি, সে কাজ অন্য লেখককে দিয়ে করিয়ে  নেয়া হয়ে থাকলে সেটা বিচিত্র কিছু নয়।

মুজাহেদের বরাত দিয়ে ইবনে আবি শায়বা ও আমর ইবনে মায়বার উদ্ধৃত অন্য একটি বর্ণনার ভিত্তিতে হযরত রসূলুল্লাহ (সা) লেখাপড়া জানতেন বলে দাবী করা হয়ে থাকে। সেই বর্ণনাটি এইঃ (আরবী*****************পিডিএফ ১১১ পৃষ্ঠায়)

“হযরত রসূলুল্লাহ (সা) ইন্তেকালের পূর্বে লেখাপড়া শিখে নিয়েছিলেন”। কিন্তু সনদের বিচারে এ বর্ণনা খুবই দুর্বল। হাফেজ ইবনে কাছীর এ বর্ণনাকে ভিত্তিহীন ও দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন। দ্বিতীয়তঃ হযরত (সা) যদি সত্যিই পরবর্তীকালে লেখাপড়া শিখে থাকতেন তাহলে কথাটা ব্যাপক জানাজানি হত। অনেক ছাহাবী এর বর্ণনা দিতেন, হযরত (সা) কার কার কাছ থেকে লেখাপড়া শিখলেন তাও প্রকাশ পেত। কিন্তু একমাত্র আওন ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া আর কেউ এ বর্ণনা দেননি। আওনের কাছ থেকে এটা জানতে পারেন মুজাহিদ। আওনও ছাহাবী নন, একজন তাবেয়ী (সাহাবীদের অব্যাবহিত উত্তর পুরুষ) এবং তিনিও নিশ্চিত করে জানাননি যে, কোন ছাহাবী বা ছাহাবীদের কাছ থেকে তিনি এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এদিক থেকেও এ বর্ণনায় দুর্বলতা স্পষ্ট। এমন দুর্বল বর্ণনার ভিত্তিতে বাস্তব ঘটনাকে খণ্ডনকারী কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।]

একজন নিরক্ষর মানুষের কুরআনের মতো একখানা কিতাব এনে দেয়া এবং বাহ্যতঃ কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই অসাধারণ প্রতিভা ও পরিপক্ষতার পরিচয় দেয়া নিসন্দেহে অস্বাভাবিক ব্যাপার। জ্ঞানী ও চক্ষুষ্মান লোকদের জন্যে এগুলো ঐ নিরক্ষর ব্যক্তির নবুয়াতের উজ্জ্বলতম নিদর্শন-[“ব্যক্তির কষ্টি পাথরে নবুয়াতে মুহাম্মদী” শীর্ষক নিবন্ধেও এ যুক্তি আলোচিত হয়েছে। তবে সেখানে কুরআনের যুক্তি বিশ্লেষণ না করেই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েচে।–(সংকলক)।] দুনিয়ার যে কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবনী পর্যালোচনা করে দেখা হোক, তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ও তার প্রতিভার বিকাশের যে কার্যকারণ নিহিত থাকে তার পরিবেশেই সে কার্যকারণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তার ব্যক্তিত্ব গঠনের উপাদানগুলো ও তার পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে সুস্পষ্ট মিল পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তিত্বে যে বিস্ময়কর গুণাবলী খুঁজে পাওয়া যায় না। আরবীয় সমাজে তো নয়ই। আশপাশের যেসব দেশের সাথে আরবদের সম্পর্ক ছিল, তাদের সমাজের কোনো দূরবর্তী পরিবেশেও হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তিত্বের উপাদানগুলোর সাথে সামান্য মিল আছে –এমন উপাদানের সন্ধান মেলে না। এ বাস্তব সত্যের প্রেক্ষাপটেই উপরোল্লিখিত নিদর্শনের সমাবেশ ঘটেছে।–[এখানে কুরআন যেসব অভিযোগকারীদের জবাব দিচ্ছে, যারা মহানবী (সা)-এর নবুয়াতকে মেনে নিয়ে নিতে পূর্বশর্ত হিসেবে মোজিজা দেখানো দাবী করত।–(সংকলক)] অজ্ঞ লোকেরা তাঁর ভেতরে কোনো নির্দশনের সন্ধান না পেলেও কিছু আসে যায় না। তবে যাঁরা জ্ঞানী, তাঁরা এসব নিদর্শন দেখে বুঝতে পেরেছেন যে, তিনি এ অভূতপূর্ব প্রতিভার অধিকারী, তিনি একজন নবী ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

(আরবী*****************পিডিএফ ১১২ পৃষ্ঠায়)

“তারা বলে থাকে যে, এ ব্যক্তির ওপর তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিদর্শনাবলী নেমে এল না কেন? তুমি বলঃ নিদর্শনাবলী কেবল আল্লাহর কাছেই থাকে। আমি কেবল পুংখানুপুংখভাবে সতর্ক করতে এসেছি। আমি যে, তোমার কাছে কিতাব নাযিল করেছি এবং তা পড়ে পড়ে তাদেরকে শোনানো হচ্ছে –এটা কি তাদের যথেষ্ট নয়? বস্তুত এতে রয়েছে করুণা এবং মুমিনদের জন্যে উপদেশ”।–(সূরা আল আনকাবুতঃ ৫০-৫১)

অর্থাৎ নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও তোমার ওপর কুরআনরে মত একখানা কিতাব নাযিল হওয়াটাই কি একটা বড় মো’জেজা নয়? এটাই কি তোমার নবুয়াতের ওপর ঈমান আনার জন্যে যথেষ্ট নয়? এরপরও কি আর কোনো মো’জেযার প্রয়োজন থেকে যায়? অন্যান্য মো’জেযার ধরণ আলাদা। সেগুরো যারা দেখেছে কেবল তাদের কাছেই তা পড়িয়ে শোনানো হচ্ছে এবং হবে। তোমরা সবসময় তা দেখতে পার।

নবুয়াত-পূর্ব জীবনকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন

(আরবী*****************পিডিএফ ১১২ পৃষ্ঠায়)

“আমি ইতিপূর্বে একটা অংশ তোমাদের সাথেই কাটিয়েছি”।–(সূরা ইউনুছঃ ১৬)

কুরাইশ পৌত্তলিকদের ধারণা ছিল যে, কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর একটা মনগড়া রচনা। একে তিনি অহেতুক আল্লাহ প্রদত্ত বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন। অপর দিকে মুহাম্মদ (সা)-এর দাবী ছিল এই যে, এটা তাঁর রচনা করা কিতাব নয় বরং আল্লাহর তরফ থেকে অহীযোগে তাঁর কাছে এসেছে। ওপরের আয়াতটা পৌত্তলিকদের ঐ ধঅরণা খণ্ডনে এবং হযরতের এ দাবীর সমর্থনে একটা শক্তিশালী যুক্তি পেশ করেছে। অন্যান্য যুক্তি-প্রমাণ না হয় বাদই গেল। কিন্তু হযরত (সা)-এর বাস্তব জীবনটা তো তাদের চোখের সামনেই রয়েছে। নবুয়াতের আগে তিনি পুরো চল্লিশটা বছর তাদের সাথেই কাটিয়েছেন। তাদেরই শহরে জন্মেছেন। কৈশর-যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন তাদেরই চোখের সামনে। তাঁর ওঠা-বসা, থাকা-খাওয়া, মেলামেশা, লেন-দেন, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি যাবতীয় সামাজিক সম্পর্ক তাদের সাথেই ছিল। তাঁর জীবনের কোনো ব্যাপারই তাদের অজানা বা অগোচর ছিল না। এমন জানাশোনা ও চাক্ষুষ প্রমাণের চেয়ে অকাট্য প্রমাণ আর কি হতে পারে! তাঁর এ জীবন দু’টো জিনিস অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল এবং প্রত্যেক মক্কাবাসীই তা জানতো।

প্রথমতঃ নবুয়াতের আগের পুরো চল্লিশ বছরের জীবনে তিনি এমন কোনো শিক্ষাদীক্ষা বা সাহচর্য পাননি –যার মধ্যে নবুয়াতের দাবী করার অব্যাবহিত পরে তিনি যে বহুমুখী জ্ঞানের পরিচয় দেন তার কোনো উৎস খুজেঁ পাওয়া যায়। কুরআনের সূরাগুলোতে যেসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে আলোচিত হয়েছে, কুরআন নাযিলের আগে তাঁকে কখনো সেসব বিষয়ে মাথা ঘামাতে, কথা বলতে ও মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। এমনকি চল্লিশ বছরে পদার্পণ করা মাত্রই হঠাৎ তিনি যে দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন, তার কোনো আয়োজন বা প্রস্তুতির কোনো চিহ্ন তাঁর চালচলন ও কথা বার্তায় পুরো চল্লিশ বছরের মধ্যেও তাঁর কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু বা ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের চোখে পড়েনি। এ থেকে স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তাঁর মস্তিষ্কের ফসল নয় বরং বাইরে কোথাও তার উৎপত্তি ঘটেছে এবং তা তাঁর ভেতরে আমদানি হয়েছে। কেননা মানুষের মস্তিষ্ক জীবনের কোনো স্তরে গিয়ে হঠাৎ কোনো জিনিস উপস্থাপিত করতে সক্ষম নয়। যে স্তরে গিয়েই কেনো কিছু উপস্থাপিত করুক না কেন, তার পূর্ববর্তী স্তরে তার প্রস্তুতি ও বিকাশ বৃদ্ধির লক্ষণসমূহ দেখা যাবেই। এ জন্যেই মক্কার কোনো কোনো চতুর লোক বুঝতে পেরেছিল যে, কুরআনের উৎপত্তি হযরত (সা)-এর মস্তিষ্ক থেকে ঘটেছে –এমন কথা বলা একেবারেই বালখিলাতার শামিল হবে। তাই তারা ভোল পাল্টিয়ে বলতে শুরু করে দিল যে, নেপথ্যে অন্য কোনো ব্যক্তি অবশ্যই রয়েছে যে মুহাম্মদ (সা)-কে এসব কথা শিখিয়ে দেয়। কিন্তু এ কথা আগেকার কথার চেয়েও বাজে কথা সাব্যস্ত হল। কেননা মক্কা তো দূরের কথা, সারা আরবে এম যোগ্যতার অধিকারী মানুষ একজনও ছিল না। যাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলা চলে যে, অমুক এসব বাণী রচনা করেছে বা রচনা করতে সক্ষম। আসলে এমন যোগ্যতা যার থাকে সে কোনো সমাজেই অজানা অচেনা থাকতে পারে না।

হযরত (সা)-এর নবুয়াত পূর্ব জীবনের দ্বিতীয় উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যটা এই ছিল যে, মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, ঠকামি, হীনতা ও ইতরামির পর্যায়ের কোনো দোষ নামমাত্রও তাঁর চরিত্রে পাওয়া যেত না। গোটা সমাজে এমন কথা বলার মত কেউ ছিল না যে, এ দীর্ঘ চল্লিশ বছরের মেলামেশাকালে তাঁর আচরণে এ জাতীয় কোনো দোষত্রুটি দেখতে পেয়েছে। বরঞ্চ যে ব্যক্তিই তাঁর সংস্পর্শে এসেছে সে তাঁকে একজন পরম সত্যবাদী ন্যায়পরায়ণ, সচ্চরিত্র ও বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবেই দেখেছে। নবুয়াতের মাত্র পাঁচ বছর আগেই কা’বা শরীফ মেরামতকালে এক প্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটে। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ কালোপাথর সরিয়ে যথাস্থানে কে নিয়ে রাখবে, তাই নিয়ে কুরাইশ বংশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা এ বলে আপোষ রফা করে যে, কাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম হেরেম শরীফে ঢুকবে তাকেই সালিস মানা হবে। পরদিন দেখা গেল হেরেম শরীফে মুহাম্মদ (সা)-ই প্রথম প্রবেশ করেছেন। তাঁকে দেখা মাত্রই হৈ-চৈ করে উঠলোঃ “এ তো সেই ন্যায়পরায়ণ মানুষটা! আমরা রাজী। এ হলো মুহাম্মদ!” এভাবে নবীর পদে নিয়োগের আগেই আল্লাহ গোটা কুরাইশ বংশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ন্যায়পরায়ণতার স্বপক্ষে সাক্ষ্য নিয়ে নেন। এরপর সেই ‘আল আমীন’ আর কখনো অন্যায় ও অসত্যের আশ্রয় নিতে পারেন, তা ভাবার অবকাশ কি করে থাকতে পারে? যে ব্যক্তি সারা জীবনে কখনো কোনো সামান্য ব্যাপারেও মিথ্যার আশ্রয় নেননি ধোঁকাবাজি-ফেরববাজি করেননি, সে হঠাৎ করে নিজের মনগড়া কয়টা কথা মানুষকে শুনিয়ে দিয়ে তাকে আল্লাহর কথা বলে চালিয়ে দেয়ার মত এত বড় মিথ্যা এবং এমন ভয়ঙ্কর প্রতারণার আশ্রয় নিতে আরম্ভ করে হেবে, এটা কি করে সম্ভব?

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৪ পৃষ্ঠায়)

“আর হে মুহাম্মদ! এভাবেই আমি তোমার কাছে আপন নির্দেশে একটা রূহ অহী করে পাঠিয়েছি। তা না হলে কিতাব কি আর ঈমান কাকে বলে, সে সম্পর্কে তুমি কিছুই জানতে না”।–(সূরা আশ শূরাঃ ৫২)

বস্তুত নবুয়াত পাওয়ার আগে কখনো হযরত রসূলুল্লাহ (সা) কল্পনাও করতে পারেননি যে, কোনো একখানা কিতাব তাঁর পাওয়া উচিত বা পাওয়া আসন্ন। এমনকি আসমানী কিতাবসমূহ ও তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁর আদৌ কিছু জানাই ছিল না। অনুরূপভাবে আল্লাহর উপর তাঁর ঈমান ছিল সত্য। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, সেই সাথে ফেরেশতা, নবুয়াত, আসমানী কিতাব ও আখেরাত সম্পর্কেও অনেক কিছু বিশ্বাস করতে হয়। মক্কাবাসীর কাছেও তাঁর নবুয়াতের ঘোষণা ছিল একেবারেই আকস্মিক ও অভাবনীয়। সেই আকস্মিক ঘোষণার আগে তাঁর মুখে কেউ কখনো আল্লাহর কিতাব বা অমুক অমুক জিনিসের ওপর ঈমান আনা উচিত বলে কোনো কথা শুনেছে, এমন সাক্ষ্য কেউ দিতে সমর্থ ছিল না। বলা বাহুল্য, কোনো ব্যক্তি যদি আগে থেকে নিজে নিজে নবী সাজার আয়োজন করতে থাকে তবে সে তাঁর নবুয়াত নিয়ে এত উদাসীন হতে পারে না যে, চল্লিশ বছর ধরে যারা তাঁর সাথে দিনরাত মেলামেশা করে তারা তাঁর মুখ থেকে কিতাব ও ঈমান সম্পর্কে একটা কথাও শুনবে না আর ঠিক চল্লিশ বছর পূর্ণ হতেই হঠাৎ ঐসব বিষয়ে সে অনর্গল বক্তৃতা দিতে শুরু করবে।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৪ পৃষ্ঠায়)

“তোমার ওপর কিতাব নাযিল করা হবে –এটা তুমি কখনো আশা করতে পারনি। শুধুমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহেই (তা নাযিল হয়েছে) সুতরাং কাফেরদের সাহায্যকারী হয়ো না”।–(সূরা কাসাসঃ ৮৬) মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতের প্রমাণ হিসেবে এ কথা বলা হচ্ছে। হযরত মূসা (আ)-এর ব্যাপারটাই আগে দেখা যাক। তিনি যে নবী হতে যাচ্ছেন এবং একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হতে চলেছেন, তা তিনি ঘূর্ণাক্ষরেও জানতেন না। নবী হওয়ার ইচ্ছা বা আকাংখা তো দূরের কথা, তার সম্ভাবনার ধারণাও তাঁর মনের কোণে কখনোও উঁকি মারেনি। হঠাৎ রাস্তা থেকে ডেকে এনে তাঁকে নবী বানানো হয় এবং তাঁকে দিয়ে এমন বিস্ময়কর কাজ সম্পন্ন করা হয় যার সাথে তাঁর অতীত জীবনের কোনো সাদৃশ্য ছিল না। অবিকল এটাই ঘটেছিল মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনের কোনো সাদৃশ্য ছিল না। অবিকল এটাই ঘটেছিল মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনে। হেরার গুহা থেকে নবুয়াতের ঘোষণা নিয়ে নেমে আসার একদিন আগে পর্যন্ত তাঁর জীবনধারা কি রকম ছিল, তিনি কি কাজ করতেন এবং কি ধরনের কথাবার্তা বলতেন, কি বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন এবং তাঁর তৎপরতা ও প্রবণতা কি ধরনের ছিল, মক্কার লোকেরা তা ভালো করেই জানতো। তাঁর জীবনের ঐ অংশটা পুরোপুরিভাবেই সততা, সত্যবাদিতা বিশ্বস্ততা ও সচ্চারিত্রতার জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল সে কথা সত্য। তা ছিল একজন অতিশয় ভদ্র, নিতান্ত শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ, ওয়াদা ও চুক্তি অটল, অন্যের অধিকার ও পাওনা দিয়ে দেয়ার ব্যাপরে অত্যন্ত যত্নবান এবং অসাধারণ পরোপকারী ব্যক্তির জীবন। এগুলো তাঁর জীবনের প্রধানতম এবং অসাধারণ গুরুত্ববহ বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ভেতরে এমন কোনো জিনিসের অস্তিত্ব ছিল না যা দেখে কারও কল্পনায়ও আসতে পারে যে, এ সাধু-সজ্জ্বন লোকটি অতি শীঘ্রই নবুয়াতের দাবী করে বসবেন। তাঁর সাথে যারা ঘনিষ্ট যোগাযোগ রাখতো, যারা তাঁর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বা বন্ধু-বান্ধব ছিল, তাদের মধ্যে কেউ বলতে পারত না যে, তিনি আগে থেকেই নবী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হেরা গুহার সেই আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুহূর্তটার পর পরই আকস্মিকভাবে তিনি যেসব বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন শুরু করেছিলেন, সেসব বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে যে বিশেষ ধরনের ভাষা পরিভাষা ও শব্দ শুনতে আরম্ভ করে তা আগে কেউ তাঁর কাছে শোনেনি। কখনো তিনি কোনো ওয়াজ-নসিহত বা বক্তৃতা করতে দাঁড়াননি। কখনো কোনো আন্দোলন বা দাওয়াত নিয়েও মাঠে নামেননি। তাঁর কোনো তৎপরতা থেকে এমন আভাসও পাওয়া যায়নি যে, তিনি সামাজিক জীবনের সমস্যাবলীর সমাধান অথবা ধর্মীয় বা নৈতিক সংস্কারের কোনো কর্মসূচী হাতে নেয়ার পরিকল্পনা করছেন। সেই বিপ্লবাত্ম মুহুর্তটার একদিন আগে পর্যন্ত যিনি নিজের সন্তানাদি নিয়ে হাসিখুশীভাবে সময় কাটান, অতিথির যত্ন করেন, গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করেন, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদাচার করেন এবং সময় সময় নিভৃতে গিয়ে ইবাদাত করেন। এমন একজন নিরীহ ভদ্রলোকের সহসা দুনিয়া কাঁপানো এক ঘোষণা দিয়ে জনতার সামনে হাজির হওয়া, এক বিপ্লবাত্মক দাওয়াত দিতে শুরু করা, এক অতুলনীয় সাহিত্য সম্ভার সৃষ্টি করা এবং সারা দুনিয়ার প্রচলিত মত ও পথ থেকে আলাদা এক অভিনব জীবন দর্শন, চিন্তা-পদ্ধতি এবং এক নতুন নৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ে উপস্থিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটা অতীব চাঞ্চল্যকর ও অসাধারণ ঘটনা। একজন মানুষের পদ্ধতি বা আয়োজন এবং কোনো স্বেচ্ছাভিত্তিক উদ্যোগ বা চেষ্টার ফলে তা কখনো দেখা দিতে পারে না। কারণ এ ধরনের যে কোন চেষ্টা, উদ্যোগ-আয়োজন বা প্রস্তুতিকে অনিবার্যভাবে ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের স্তরসমূহ অতিক্রম করেই অগ্রসর হতে হবে। আর সেসব স্তরসমূহ অতিক্রম করেই অগ্রসর হতে হবে। আর সেসব স্তর কখনো কোনো মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী-সহচরদের কাছ থেকে গোপন থাকতে পারে না। হযরত (সা)-এর জীবন যদি এসব স্তর অতিক্রম করে এগুতো তাহলে মক্কায় শত শত লোক বলে উঠতোঃ আমরা জানতাম লোকটা একদিন কোনো না কোনো চাঞ্চল্যকর দাবী তুলবেই। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, মক্কাবাসী হযরত (সা)-এর বিরুদ্ধে আর যত অভিযোগই করুক –এ অভিযোগটা কখনো উত্থাপন করেনি।

পক্ষান্তরে হযরত (সা) নিজে যে নবুয়াত লাভে ইচ্ছুক, তার প্রত্যাশী বা তার জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন না, বরং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয়ভাবে হঠাৎ এ ব্যাপারটার সম্মুখীন হন, অহীর সূচনাকালীন অবস্থার বিবরণ সম্বলিত হাদীসগুলোতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। জিবরাঈল (আ)-এর সাথে প্রথম দেখা হওয়া এবং সূরা আলাকের প্রথম ক’টা আয়াত নাযিলের মাধ্যমে নবুয়াতের উদ্বোধন সম্পন্ন হওয়ার পর হযরত (সা) হেরা গুহা থেকে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী উপস্থিত হন। অতপর পরিবার-পরিজনকে বলেনঃ “আমাকে ঢেকে দাও। আমাকে ঢেকে দাও”। কিছুক্ষণ পর যখন ভয় পাওয়ার অবস্থা একটু কেটে গেল, তখন তাঁর জীবনসঙ্গিনী খাদিজা (রা)-কে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বললেনঃ “আমার আশংকা হচ্ছে যে, মরে যাবো”। খাদিজা (রা) তৎক্ষনাৎ বললেনঃ “কখনো নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনো কষ্টে ফেলবেন না। আপনি আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করে থাকেন, অসহায় ও কপর্দহীনকে সাহায্য করেন, অতিথির সমাদর করেন এবং প্রত্যেক ভালো কাজে সহযোগিতা করার জন্যে প্রস্তুত থাকেন। তারপর তিনি হযরত (সা)-কে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা ছিলেন খাদিজা (রা)-এর চাচাতো ভাই এবং আহলে কিতাবের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি হযরত (সা)-এর কাছে সমস্ত ঘটনার বিবরণ শুনে নির্বিকারভাবে বলেনঃ “বলেন কি? এরা আমাকে এখান থেকে বের করে দেবে নাকি?” হযরত (সা) বললেনঃ “বলেন কি? এরা আমাকে এখান থেকে বের করে দেবে নাকি?” ওয়ারাকা জবাব দেনঃ “হ্যাঁ, আপনি যে জিনিস নিয়ে এসেছেন, অতীতে তা নিয়ে যখনই কেউ এসেছে, অমনি দেশবাসী তার শত্রু হয়ে গেছে”।

একজন সাদাসিদে মানুষ যখন অপ্রত্যাশিতভাবে এক অত্যন্ত অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই তার যে ভাবান্তর ঘটনে পারে, এ ঘটনাটার মধ্যে তার একটা নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে। হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর যদি আগে থেকেই নবী হওয়ার মতলব থাকতো নিজের সম্পর্কে যদি ভাবতেন যে, তাঁর মত মানুষের নবী হওয়া উচিত, আর সেই নবুয়াতের অপেক্ষায় নিভৃত ধ্যান মগ্ন হয়ে এ ভাবনায় অস্থির থাকতেন যে, কখন ফেরেশতা আসবে এবং তাঁর কাছে বার্তা বয়ে আনবে, তাহলে হেরা গুহার ঘটনাটা তিনি খুশীতে লাফিয়ে উঠতেন, আনন্দ ও গর্বে উৎফুল্ল হয়ে পাহাড় থেকে নেমে সোজা জনগনের কাছে পৌঁছে যেতেন এবং বড় গলায় নিজের নবুয়াতের কথা ঘোষণা করে দিতেন। কিন্তু কোথায় সেই খুশী আর কোথায় সেই বড় গলা! তিনি সেখানে হলেন অতপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। মন একটু শান্ত হলে স্ত্রীকে কানে কানে সব কথা বললেন। তিনি জানালেন, ‘আজ হেরা গুহায় নির্জনে আমি এ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম। জানি না আমার কি হবে। আমর জীবন বিপন্ন মনে হচ্ছে”। নবুয়াতের একজন উমেদারের যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা, এটা যে তা থেকে কতখানি ভিন্ন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বামীর জীবন, তাঁর স্বভাব ও চিন্তাধারা সম্পর্কে স্ত্রীর চেয়ে বেশী কেউ জানতে পারে না। তাঁর যদি আগে থেকে জানা থাকতো যে, স্বামী নবুয়াতের অভিলাষী এবং কখন ফেরেশতা আসবে, তার অপেক্ষায় সর্বদা প্রহর গুণছেন, তাহলে হযরত খাদিজা (রা) এ ধরনের জবাব দিতেন না। দিতেন অন্য রকম। তিনি বলতেন, ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন? এতদিন ধরে যে জিনিসের সাধ ছিল তা হাতে পেয়েছেন। এখন যান, পীর-মুরিদীর ব্যবসা জুড়ে দিন। নজরনেয়াজ যা আসবে, তার রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তুতি আমি নিচ্ছি। কিন্তু পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে হযরত (সা)-এর জীবনের যে পরিচয় তিনি পেয়েছিলেন তার পরিপ্রেক্ষিতে এক মুহুর্তের মধ্যেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এমন সৎ ও নিঃস্বার্থ মানুষের কাছে আর যেই আসুক, শয়তান আসতে পারে না কিংবা আল্লাহ তাঁকে কোনো কঠিন মুসিবতেও ফেলতে পারেন না। বস্তুত তিনি যা দেখেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য।

ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের অবস্থাও ছিল সেই রকম। তিনি তাঁদের পর ছিলেন না। হযরত (সা)-এর জ্ঞাতি এবং খুবই ঘনিষ্ঠ শ্যালক ছিলেন। একজন খৃষ্টান পণ্ডিত হিসেবে নবুয়াত, কিতাব ও অহ কাকে বলে তা তিনি জানতেন এবং কৃত্রিম ও মনগড়া জিনিস থেকে আসল জিনিস বেছে বের করার ক্ষমতা রাখতেন। বয়সে হযরত (সা)-এর চেয়ে কয়েক বছরের বড় হওয়ায় শৈশব থেকে তাঁর পুরো জীবনটা তিনি দেখেছিলেন। তিনিও তাঁর মুখে হেরার ঘটনা শুনে তৎক্ষণাৎ বলে দিলেনঃ এই আগন্তুক নিশ্চয়ই সেই ফেরেশতা যিনি হযরত মূসা (আ)-এর কাছে অহী নিয়ে আসতেন। কেননা এখানেও হযরত মূসা (আ)-এর মত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সম্পূর্ণ নিখুঁত ও নিষ্কলুষ চরিত্রের একজন সাদাসিদে মানুষ। সর্বতোভাবে স্বচ্ছ ও মুক্ত মন তাঁর। তাঁর মধ্যে নবুয়াতের অভিলাষ থাকা তো দূরের কথা নবুয়াত লাভের কল্পনাও তিনি কখনো করেননি। সহসা তিনি সম্পূর্ণ সজ্ঞান ও সচেতন অবস্থায় প্রকাশ্যে এ অভূতপূর্ব ঘটনার সম্মুখীন হন। এ জন্যেই ওয়ারাকা কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হন যে, এখানে প্রবৃত্তির কোনো প্রবঞ্চনা বা শয়তানের কোনো প্রতারণার হাত নেই। বরং চির চেনা এ সৎ সত্যবাদী মানুষটা নিজের ইচ্ছা বা অভিলাষমুক্ত অবস্থায় যা দেখেছে তা ঠিকই দেখেছে, প্রকৃত সত্যের দর্শনই সে লাভ করেছে। ওয়ারাকা এ সিদ্ধান্ত চিল গাণিতিক হিসেবের মতই নির্ভুল ও অকাট্য।

বস্তুত নবুয়াত পূর্ব জীবনের সর্বাত্মক সততা, সত্যবাদিতা ও নিরেট নিরক্ষরতার প্রেক্ষাপটে এমন আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে অহী নাযিল হওয়া নবুয়াতের সত্যতার এমন এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ, যাকে অস্বীকার করা যে কোনো বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কুরআনে একাধিক স্থানে একে নবুয়াতের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। যেমন সূরা ইউনুসে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৭ পৃষ্ঠায়)

 “হে নবী! তুমি বলঃ আল্লাহর ইচ্ছা না হলে আমি তোমাদেরকে কখনো এ কুরআন পড়ে শোনাতে পারতাম না এবং এর খবরও তোমাদেরকে দিতে পারতাম না। জীবনের একটা (উল্লেখযোগ্য) অংশ তো আমি তোমাদের ভেতরেই কাটিয়েছি। এতটুকু কথাও কি তোমরা বুঝতে পার না?”-(আয়াতঃ ১৬)

সূরা আশ শূরায় আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৪ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তুমি আদৌ জানতে না কিতাব কি জিনিস আর ঈমান কাকে বলে। তবে এই অহীকে আমি একটা জ্যোতিতে পরিণত করেছি। এ জ্যোতি দিয়ে আ নিজের বান্দাদের মধ্যে যাকে খুশী সঠিক পথের সন্ধান দেই”।–(আয়াতঃ ৫২)

তাফহীমুল কুরআন সূরা ইউনুছ, টীকা-২১, আনকাবুত টীকা-৮৮*৯২, শূরা টীকা ৮৪তে এ সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র নিষ্কলুষ জীবন, সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রের ওপর তাঁর শিক্ষা-দীক্ষার বিস্ময়কর প্রভাব এবং কুরআনের উচ্চাঙ্গ আলোচ্য বিষয়সমূহ –এসব অত্যন্ত উজ্জ্বল নিদর্শন। যে ব্যক্তি নবীদের জীবনবৃত্তান্ত এবং আসমানী কিতাবসমূহের শিক্ষা সন্দেহ পোষন করা অত্যন্ত কঠিন।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৮ পৃষ্ঠায়)

“(তিনি) আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত এমন এক দূত, যিনি পবিত্র গ্রন্থসমূহ পড়ে শুনান। সেসব গ্রন্থে রয়েছে সত্য ও সঠিক রচনাবলী”।–(সূরা বাইয়েনাঃ ২-৩)

এখানে রসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যক্তি সত্তাকে একটা উজ্জ্বল প্রমাণ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা তাঁর নবুয়াতের পূর্বাপর জীবন, নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও কুরআনের মত গ্রন্থ উপস্থাপন, তাঁর শিক্ষা ও সাহচর্যের প্রভাবে মুমিনদের জীবনে অস্বাভাবিক বিপ্লব দেখা দেয়া, সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত আকীদা-বিশ্বাস, অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন ইবাদাত, উৎকৃষ্টতম নির্মল চরিত্র এবং মানবজীবনের জন্যে সর্বোত্তম নীতিমারা ও বিধান শিক্ষা দান। হযরত (সা)-এর কথা ও কাজে পরিপূর্ণ সংগতি ও সামঞ্জস্য এবং সব রকমের বিরোধিতা ও বাধাবিপত্তির মোকাবিলায় অটুঁট মনোবল ও অবিচল নিষ্ঠা নিয়ে নিজের দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখা –এসব অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর আল্লাহর রসূল হওয়ার সুস্পষ্ট নিদর্শন।

কুরআন একটা অলৌকিক রচনা এবং নবুয়াতের প্রমাণ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৮ পৃষ্ঠায়)

“নিসন্দেহে বিশ্ব প্রতিপালকের কাছ থেকেই এ কিতাব নাযিল হয়েছে। তারা কি বরে যে, এটা ঐ ব্যক্তির মনগড়া জিনিস? না। বরং এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ তেকে আসা পরম সত্য”।–(সূরা আস-সাজদাহঃ ২-৩)

এখানে শুধু এ কথা বলা হয়নি যে, এ কিতাব বিশ্ব প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আরো জোর দিয়ে সেই সাথে বলা হয়েছে, নিসন্দেহে এটা আল্লাহর কিতাব। এটা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া কিতাব, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এ নিশ্চয়তাসূচক বাক্যটাকে কুরআন অবতারণের বাস্তব প্রেক্ষাপটে এবং স্বয়ং কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনার আলোকে যদি পড়ে দেখা হয় তাহলে বুঝা যাবে যে, এতে একই সাথে একটিা দাবী উত্থাপন এবং তার প্রমাণ দেখানো হয়েছে। যে মক্কাবাসীর সামনে এ দাবী উত্থাপন করা হয়েছে, তাদের কাছে এ প্রমাণ অজানা ছিল না। যিনি এ কিতাব পড়ে শোনালেন তার গোটা জীবন কিভাবে পড়ে শোনানোর আগের ও পরের জীবন দু’টোই তাদের জানা। এ কিতাবের যে ভাষা ও বাচনভঙ্গী তার সাথে মুহাম্মদ (সা)-এর নিজের ভাষা ও বাচনভঙ্গীর সুস্পষ্ট পার্থক্য তারা দেখতে পেত। তারা পরিষ্কার বুঝতে পারত যে, একই ব্যক্তির দুই রকম বাচনভঙ্গী এত ব্যবধানসহ হতে পারে না। তারা এ কিতাবের পরম অলৌকিক সাহিত্য-সন্দৌর্য লক্ষ্য করছিল। এবং আরবের সমস্ত কবি সাহিত্যিক যে এর সমকক্ষ সাহিত্য সৃষ্টি করতে অক্ষম, তা একই ভাষাভাষী হওয়ার কারণে তারা দিব্য চোখেই দেখতে পাচ্ছিল।–[কুরআনকে উপস্থাপন করাই হয়েছে এই চ্যালেঞ্জ দিয়েঃ (আরবী**** টীকায়) “পার তো এর সমকক্ষ একটা সূরা নিয়ে এস”। এ চ্যালেঞ্জ কুরআনের অলৌকিকত্বকে আরো বেশী সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। এ চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে অক্ষম প্রতিপক্ষ নীরবে স্বীকার করে নিয়েছিল যে, এ সাহিত্য মানব রচিত নয়। কুরআনের এই অলৌকিকত্বকে আল্লাহ হযরত (সা)-এর নবুয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।–(সংকলক বৃন্দ)] আরবের কবি-সাহিত্যিক, বক্তা ও ধর্মযাজকদের ভাষা এবং কুরআনের ভাষার মধ্যে যে কত বড় পার্থক্য এবং কুরআনে বর্ণিত বিষয়বস্তু যে কত উচ্চমানের তাও তাদের অজানা ছিল না। একজন মিথ্যাদাবীদারের সাহিত্যে ও কাজে যে স্বার্থপরতা নিহিত থাকে, কুরআনের সাহিত্য ও তার বাহকের দাওয়াতে সে স্বার্থ পরতার নামগন্ধও তারাদেখতে পায়নি। অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগিয়েও তাঁরা খুঁজে বের করতে সমর্থ ছিল না নবুয়াতের দাবী করে হযরত (সা) নিজের, নিজ পরিবারের, গোত্রের বা জাতির দাওয়াতের দিকে জাতির মধ্য থেকে কি ধরনের লোকেরা আকৃষ্ট হচ্ছে এবং এবং তাদের জীবনে কত বড় বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে, তা তারা স্বচক্ষেই দেখতে পাচ্ছিল। এসব কিছুই ছিল নবুয়াতের দাবীর স্বপক্ষে একটা অকাট্য প্রমাণ। এ পটভূমিতে শুধু এ কথা বলাই যথেষ্ট ছিল যে, এ কিতাব রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকেই যে নাযিল হয়েছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.