সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বিশ্বনবী সম্পর্কে তাওরাত ও ইঞ্জিলের ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত ঈসা (আ)-এর গুরুত্বপূর্ণ উক্তি

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১২০ পৃষ্ঠায়)

“মরিয়মের ছেলে ঈসার কথাটা মনে কর। তিনি বলেছিলেনঃ হে ইসরাঈলের বংশধর! আমি তোমাদের কাছে রসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। আমার আগে যে তাওরাত এসে রয়েছে, আমি তার সত্যতা ঘোষণা করতে এসেছি”।–(সূরা আছ-ছাফঃ৬)

এ কথাটার তিন রকম ব্যাখ্যা হতে পারে এবং তিনটি ব্যাখ্যাই সঠিক। প্রথম ব্যাখ্যা এই যে, আমি কেনো আলাদা ও অভিনব ধর্ম নিয়ে আসিনি। হযরত মূসা (আ) যে ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন আমিও সেটাই নিয়ে এসেছি। আমি তাওরাতকে খণ্ডন করতে আসিনি বরং তাকে সমর্থন ও তার সত্যতা ঘোষণা করছি। আল্লাহর প্রত্যেক রসূলেরই চিরন্তন রীতি পূর্ববর্তী রসূলের সমর্থন করা ও তার সত্যতা ঘোষণা করা। আমিও সেই রীতি মেনে চলছি। সুতরাং আমার রসূল হওয়াকে স্বীকার করে নিতে তোমাদের ইতস্ততঃ করার কোনো কারণ নেই।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা এই যে, তাওরাতে আমার রসূল হয়ে আসা সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে আমার রিসালাত দ্বারা তা সত্যায়িত বা পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং আমার বিরোধিতা করার পরিবর্তে তোমাদের বরং এ বলে আমাকে স্বাগত জানানো উচিত যে, আগেকার নবীরা যে নবীর আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন সে নব এসে গেছে।

কুরআনের আলোচ্য কথাটাকে এর পরবর্তী কথার সাথে মিলিয়ে পড়লে এর তৃতীয় যে ব্যাখ্যা দাঁড়ায় তা হলো এই যে, আমি আল্লাহর রসূল আহমদ (সা)-এর শুভাগমন সম্পর্কে তাওরাতের দেয়া ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য বলে ঘোষণা করছি এবং নিজেও তাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করছি। হযরত মূসা (আ) স্বজাতিকে সম্বোধন করে বিশ্বনবীর আবির্ভাব সম্পর্কে যে আগম সুসংবাদ দিয়েছিলেন, এ তৃতীয় ব্যাখ্যার আলোকে হযরত ঈসা (আ)-এর এ উক্তি সেই সুসংবাদেরই সমর্থন ও সত্যায়নের শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

তাওরাতের সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী

জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত সেই ভাষণে মূসা (আ) বলেনঃ “তোমার প্রভু তোমার জন্যে তোমারই মধ্য থেকে অর্থাৎ তোমারই ভাইদের মধ্য থেকে আমার মত একজন নবীর আবির্ভাব ঘটাবেন। তোমরা তাঁর কথা শুন। ‘হাওরেবে’ থাকাকালে সম্মেলনের দিন তুমি তোমার প্রভুর কাছে যে, আবেদন জানিয়েছিলে, সে অনুসারেই এ আবির্ভাব ঘটবে। তুমি বলেছিলেঃ আমার প্রভুর সম্বোধন যেন আমাকে আর শুনতে না নয় আর এমন ভয়াবহ আগুনও দেখতে না হয় যার দরুন আমার মরারও ফুসরত হয় না। প্রভু আমাকে বলেছেন, ওরা যা বলে ঠিকই বলে। আমি তাদের জন্যে তাদের ভাইদের মধ্যে থেকে একজন নবী পাঠাবো, আমার কথাই তাঁর মুখ দিয়ে প্রচারিত করবো এবং আমি যা বলতে বলবো সে শুধু তাই বলবে। সে আমার নাম নিয়ে আমার যে কথাগুলো বলবে তা যে, শুনবে না আমি তার কাছ থেকে তার হিসেব নেব”।–(ব্যতিক্রম পস্তুক, অধ্যায় ১৮, আয়াত ১৫-১৯)

এটা তাওরাতের সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী। মুহাম্মদ (সা) ছাড়া আর কারও বেলায় এটা খাটে না। এতে হযরত মূসা (আ) তাঁর জাতিকে আল্লাহর এ প্রতিশ্রুতি জানিয়ে দিচ্ছেন যে, “আমি তোমার জন্যে তোমার ভাইদের মধ্য থেকে একজন নবী পাঠাবো। এটা জানা কথা যে, একটা জাতির ‘ভাইয়েরা’ বলতে সে জাতিরই কোনো পরিবার বা গোত্র বুঝায় না। জাতির ভাই বলতে সেই জাতির সমবংশীয় অন্য একটা জাতিকে বুঝায়। এ কতার মর্ম যদি এ হতো যে, বনী ইসরাঈলের মধ্য থেকেই কোনো নবীর আবির্ভাব ঘটবে তাহলে বলা হত ‘আমি তোমাদের জন্যে স্বয়ং তোমাদের মধ্য হতেই একজন বী পাঠাবো’। সুতরাং বনী ইসরাঈলের ভাই অর্থ অনিবার্যভাবে বনী ইসমাঈলই হতে পারে। কেননা সেটা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর হওয়ার কারণে নবী ইসরাঈলের সমবংশীয়। তাছাড়া এ ভবিষ্যদ্বাণী বনী ইসরাঈলের কোনো নবীর ওপর যে প্রযোজ্য হতে পারে না তার আরো একটা কারণ রয়েছে। সেটা এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর পর বনী ইসরাঈলে একজন নবী আসেননি, বহুসংখ্যক নবী এসেছেন। সারা বাইবেলে সেই নবীদের বিবরণ রয়েছে।

এ ভবিষ্যদ্বাণীর আরো একটা বিষয় লক্ষণীয়। যে নবী আসবেন তিনি হযরত মূসা (আ)-এর মতোই নবী হবেন। বলাবাহুল্য, এর অর্থ আকার-আকৃতি বা জীবনেতিহাসের সাদৃম্য নয়। কেননা এদিক দিয়ে কোনো ব্যক্তিই অন্য ব্যক্তির মতো হয় না। শুধু মাত্র নবী হওয়ার দিক দিয়ে সাদৃশ্য এ দ্বারা বুঝায় না। কেননা হযরত মূসা (আ)-এর পরে যত নবী এসেছেন, তাদের সাথে এদিক দিয়ে সাদৃশ্য ছিল। তাই হযরত মূসা (আ)-এর মত হওয়ার বৈশিষ্ট্যের দাবীদার কোনো বিশেষ একজন নবী হতে পারেন না। সাদৃশ্যের এ দু’টো দিক সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তের পর সাদৃশ্যের যে দিকটা অবশিষ্ট থাকে এবং যা পরবর্তী নবীর বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য, সেটা হলো, শুধু পৃথক শরীয়াত তথা পৃথক আইন ব্যবস্থা। যে নবী আসবেন তিনি হযরত মূসা (আ)-এর মত আরাদা আইন ব্যবস্তা নিয়ে আসবেন –এটাই তার ভবিষ্যদ্বাণীর মর্মকথা। মুহাম্মদ (সা) ছাড়া আর কেউ এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নন। কেননা তার আগে বনী ইসরাঈলের যত নবী এসেছেন তারা হযরত মূসা (আ)-এর আনীত আইন ব্যবস্থারই অনুসারী ছিলেন। আলাদা আইন ব্যবস্থা নিয়ে কেউ আসেননি।

তাওরাতের উক্তির এ ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা পরবর্তী উক্তি থেকে আরো বেশী করে প্রতিপন্ন হয়। “হাওরেবে থাকাকালে সম্মেলনের দিন তুমি তোমার প্রভুর কাছে যে আবেদন জানিয়েছিলেন সে অনুসারেই ঐ নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তুমি বলেছিলেঃ আমার প্রভুর সম্বোধন যেন আমাকে আর শুনতে না হয় আর এমন ভয়াবহ আগুনও আর দেখতে না হয় –যার দরুন আমার মরারও ফুরসত হয় না। প্রভূ আমাকে বলেছেনঃ ওরা যা বলে ঠিকই বলে। আমি তাদের জন্যে তাদের বাইদের মধ্য থেকেই এজন নবী পাঠাবো। আমার কথাই তার মুখ দিয়ে প্রচারিত করবো। আমি যা বলতে বলবো সে শুধু তাই বলবে”। হযরত মূসা (আ)-কে সর্বপ্রথম শরীয়াতের বিধান দেয়া হয় যে আবেদনের কথা এখানে বলা হয়েছে, তার তাৎপর্য এই যে, ভবিষ্যতে যদি আমাদেরকে কোনো শরীয়াত তথা আইন ব্যবস্থা দেয়া হয় তাহলে সেই ভয়ংকর অবস্থায় যেন দেয়া না হয় যে অবস্থার বিবরণ কুরআনেও আছে, বাইবেলেও আছে। (দেখুন সূরা বাকারাহঃ আয়াত ৫৫, ৫৬, ৬৩; সূরা আরাফঃ আয়াত ১৫৫-১৭১; বাইবেল নির্গমন পুস্তক ১৯:১৭-১৮)-এর জবাবে হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাইলকে জানান যে, আল্লাহ তোমাদের এব আবেদন মঞ্জুর করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আমি তাদের জন্যে এমন নবী পাঠাবো যার মুখ দিয়ে আমার কথা প্রচার করবো। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আইন ব্যবস্থা দেয়ার সময় হাওরেব পাহাড়ের উপত্যকায় যে ভয়াবহ অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল তা আর হবে না। বরং এখন যে নবীকে এ দায়িত্ব দেয়া হবে তাকেই শুধু আল্লাহর বাণী কণ্ঠস্থ করিয়ে দেয়া হবে এবং তিনি তা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। এ সুস্পষ্ট ঘোষণাটা একটু তলিয়ে দেখলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সা)-ই এ ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব লক্ষ্য। হযরত মূসার পর স্বতন্ত্র শরীয়াতের অধিকারী কেবল তিনিই হয়েছিলেন। হাওরেব পাহাড়ের পাদদেশে শরীয়াত প্রদানের সময় বনী ইসরাঈলীদের যে বড় গণ-জমায়েত হয়েছিল, মুহাম্মদ (সা)-কে শরীয়াত প্রদান করার সময় তেমন কোনো সম্মেলন হয়নি। আর সেখানে যে ধরনের অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল, শরীয়াতের নির্দেশ জারী করার সময় তেমন অবস্থা আর কখনো হয়নি।

ইঞ্জিলে নবুয়াতে মুহাম্মদী সুসংবাদ

হযরত ঈসা (আ) নবুয়াতে মুহাম্মদীর যে সুসংবাদ দেন কুরআনে তার উল্লেখ এভাবে করা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১২২ পৃষ্ঠায়)

“মরিয়মের ছেলে ঈসার সেই কথাটা মনে কর। তিনি বলেছিলেনঃ হে ইসরাঈলদের বংশধর! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রসূল হয়ে এসেছি। আমি সেই তাওরাতের সত্যতা স্বীকারকারী যা আগে থেকেই এসে রয়েছে। আর আমার পরে আহমদ নামক যে রসূল আসবেন তার সুসংবাদ দিতে এসেছি”।–(সূরা আছ ছাফঃ ৬)

এটা কুরআনের একটা গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এ আয়াত নিয়ে ইসলাম বিরোধীরা অনেক বাকবিতণ্ডা করেছে। আবার অপরাধমূলক অপব্যাখ্যার চেষ্টাও করেছে। কেননা এতে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ) হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর নাম পরিস্কারভাবে উল্লেখ করে তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন।–[এ ছাড়াও সামগ্রিকভাবে বাইবেলের নানা জায়গায় হযরত (সা)-এর আগমনের ভবিষদ্বাণী রয়েছে। এ সম্পর্কে কুরআনে এক কথায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী********* টীকায়)

“আহলে কিতাব তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে তাঁর কথা লিখিত দেখতে পায়”।–(সূরা আ’রাফঃ ১৪৭)

উদাহরণ স্বরূপ তাওরাত ও ইঞ্জিলের নিম্নলিখিত স্থানগুলোতে মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে পূর্বাভাস লক্ষ্যণীয়। ব্যতিক্রম পুস্তক, অধ্যায় ১৮, আয়াত ১৫-১৯’ মথি পুস্তক, অধ্যায় ২১, আয়াত ৩৩-৪৬; যোহন পুস্তক, অধ্যায় ১, আয়াত ১০-২১; যোহন পুস্তক, অধ্যায় ১৪, আয়াত, ১৫-১৭, ২৫-৩০; যোহন অধ্যায় ১৫, আয়াত ২৫,২৬; যোহন অধ্যায় ১৬, আয়াত ৭-১৫। ৭৭-গ্রন্থকার ও সংকলক বৃন্দ।] এ জন্যে এ বিষয়টা নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

একঃ “মুহাম্মদ” ও “আহমদ”: এ আয়াতে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নাম আহমদ উল্লেখ করা হয়েছে। আহমদের দুই অর্থঃ সর্বাধিক প্রশংসাকারী ও সর্বাদিক প্রশংসিত মানুষের মধ্যে সর্বাধিক প্রশংসনীয়। বিশুদ্ধ হাদীস থেকে জানা যায় যে, এটাও হযরত (সা)-এর অন্যতন নাম ছিল। মুসলিম ও আবু দাউদ তিয়ালিসীর হাদীস গ্রন্থে হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা)-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, হযরত (সা) বলেছেনঃ (আরবী********) “আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ এবং আমি হাশের (সমবেদকারী) এ মর্মে হযরত জোবাইর ইবনে মোতয়েমের সূত্রে বর্ণিত একাধিক হাদীস ইমাম মালেক, বুখারী, মুসলিক, দারামী ‘তিরমিজী’ নাসায়ী নিজ নিজ হাদীসগ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। হযরত (সা)-এর এ নাম সাহাবীদের মধ্যেও প্রচলিত ও জানা ছিল। হাসসান বিন সাবিতের কবিতায় একটি চরণ নিম্নরূপঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১২৩ পৃষ্ঠায়)

“কল্যাণময় আহমদের ওপর আল্লাহ, তার আরশের চারপাশে ভীড় করে থাকা ফেরেশতারা এবং পবিত্র ব্যক্তিগণ দরূদ পাঠিয়েছেন”। ইতিহাস থেকেও জানা যায়, হযরত মুহাম্মদ (সা) শুধু এ নামেই পরিচিত ছিলেন না বরং তাঁর আহমদ নামও সকলের জানা ছিল। আরব জাতির সমগ্র সাহিত্য ভাণ্ডারে হযরত (সা)-এর আগে আর কেউ আহমদ নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায় না। আর হযরত (সা)-এর পরে অসংখ্য রোকের নাম আহমদ ও গোলাম আহমদ রাখা হয়েছে। নবুয়াত যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র উম্মদের কাছে যে এ নামটা সুপরিচিত ও সুবিদিত রয়েছে, সেটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ নাম যদি হযরত (সা)-এর না হতো তাহলে যারা নিজেদের ছেলেদের নাম গোলাম আহমদ রেখেছে, তারা সেই ছেলেদেরকে কোন আহমদের গোলাম বলে মনে করেন?

দুইঃ হযরম মসিহ, হযরত ইলিয়াস (আ) এবং “সেই নবী”: যোহনের (ইউহান্না) ইঞ্জিল সাক্ষী যে হযরত ঈসা (আ)-এর আগমনের সময় বনী ইসরাঈল তিন ব্যক্তির প্রতিক্ষায় ছিল। তাঁরা হলেন, মসিহ, ইলিয়াহ (অর্থাৎ হযরত ইলিয়াস (আ)-এর পুনরার্বিভাব) এবং ‘সেই নবী’।

“এবং ইউহান্না [হযরত ইয়াহিয়া (আ)] সাক্ষ্য দেন যে ইহুদীরা যখন জেরুজালেম থেকে তার কাছে যাজকদের পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কে, তখন তিনি স্বীকার করলেন, অস্বীকার করলেন না। তিনি স্বীকার করলেন যে, আমি মসিহ নই। তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, তাহলে তুমি কে? তুমি কি ইলিয়াহ? তিনি বলেন, না। হবে কি তুমি ‘সেই নবী’? তিনি জবাব দিলেন, না। তখন তারা বললোত, তাহলে তুমি কে? তিনি বললেন, আমি মরুভূমিতে একজন আহবায়কের এ আহবান যে, তুমি আল্লাহর পথ সুগম কর। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলো যে, তুমি যদি মসিহ না হয়ে থাকে, ইলিয়াহও না হয়ে থাক এবং সেই নবীও না হয়ে থাক তবে নবুয়্যত দাবী কর কেন?-(১:১৯-২৫)

এ কথাগুরো থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝা যায় যে, হযরত মসীহ (আ) (ঈসা) এবং হযরত ইলিয়াস (আ) ছাড়াও বনী ইসরাইল আরো একজন নবীর অপেক্ষায় ছির এবং সে নবী হযরত ইয়াহিয়া (আ) নন। সেই নবী যে আসবেন এ বিশ্বাস বনী ইসরাঈলের মধ্যে এত প্রচলিত ছিল যে, শুধু ‘সেই নবী’ বললেই সবাই বুঝে নিত। “যার আগাম খবর তাওরাতে দেয়া হয়েছে” এ কথা না বললেও চলতো। এ থেকে আরও জানা গেল যে, যে নবী সম্পর্কে তারা ইশারা-ইঙ্গিত করছিল তার আগমন অকাট্যভাবে প্রমাণিত ছিল। কেননা হযরত ইয়াহিয়া (আ)-কে যখন এসব প্রশ্ন করা হয় তখন তিনি এ কথা বলেননি যে, আর তো কোনো নবীই আসবেন না। তোমরা কোন নবীর কথা জিজ্ঞাসা করছ?

তিনঃ যোহনের ইঞ্জিলের বক্তব্যঃ এবার যোহনের (ইউহান্না বা ইয়াহিয়া) ইঞ্জিলে ১৪শ’ অধ্যায় থেকে ১৬শ’ অধ্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীগুরো দেখুনঃ

“এবং আমি পিতার কাছে আবেদন করবো যেন তোমাদের জন্যে আর একজন সাহায্যকারী পাঠান যিনি তোমাদের সাথে অনন্তকাল পর্যন্ত থাকবেন, অর্থাৎ সত্যের আত্মা, যাঁকে দুনিয়াবাসী অর্জন করতে পারে না। কেননা তারা তাকে দেখতেও পায় না চিনেও না তোমরা তাঁকে চিন। কেকনা তিনি তোমাদের সঙ্গেই থাকেন এবং তোমাদের মধ্যেই আছেন”।–(১৪:১৬-১৭)

“আমি এ কথাগুলো তোমাদের সাতে থেকেই তোমাদের বলেছি। কিন্তু সাহায্যকারী অর্থাৎ মহিমান্বিত আত্মা যাঁকে পিতা আমার নামে পাঠাবেন তিনি তোমাদের সব কথা শিখাবেন। আর আমি যা কিচু তোমাদেরকে বলেছি তিনি সেসব তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবেন”।–(১৪-২৫-২৬)

‘এরপর আমি তোমাদেরকে বেশী কথা বলবো না। কেননা দুনিয়ার নেতা আসছেন। আমার মধ্যে তাঁর কোনো কিছুই নেই”।–(১৪:৩০)

“কিন্তু যখন সেই সাহায্যকার আসবেন যাঁকে আমি পিতার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে পাঠাবো অর্থাৎ সত্যের আত্মা –যা পিতার কাছ থেকে প্রকাশিত হয় –তখন তিনি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন”।=(১৫:২৬)

“কিন্তু আমি তোমাদের সত্য বলছি যে, আমার চলে যাওয়া তোমাদের জন্যে কল্যাণকর কেননা আমি যদি না যাই তবে সেই সাহায্যকারী আসবেন না। কিন্তু আমি যদি যাই তবে তাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেবো”।–(১৬:৭)

“তোমাদেরকে আমার আরো অনেক কথা বলার আছে। কিন্তু তখন তোমরা তা সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু যখন তিনি অর্থাৎ সত্যের আত্মা আসবেন তখন তোমাদেরকে সমস্ত সত্যের পথ দেখাবেন। কেননা তিনি মনগড়া কথা বলবেন না। কেবল যা শুনবেন তাই বলবেন এবং তেমাদেরকে ভবিষ্যতের খবর জানাবেন। তিনি আমার পরাক্রম প্রকাশ করবেন। কেননা আমার কাছ থেকে পেয়েই তিনি তোমাদেরকে খবর জানাবেন। পিতার যা কিছু রয়েছে তা সবই আমার। এ জন্যেই আমি বললাম যে তিনি আমার কাছ থেকে জানবেন এবং তোমাদেরকে খবর জানাবেন”।–(১৬:১২-১৫_

চারঃ উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বাণী গুলোর তাৎপর্যঃ উপরোক্ত কথাগুলোর সঠিক মর্ম উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে জানা দরকার যে, হযরত ঈসা (আ) ও তার সমসাময়িক ফিলিস্তিনবাসী আরামী ভাষার আঞ্চলিক রূপ সুরিয়ানীতে কথা বলতেন। হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের দুই-আড়াইশো বছর আগেই সেলুকী রাজবংশের শাসনকালে ঐ অঞ্চল থেকে ইবরানী ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তার জায়গায় সুরিয়ানী ভাষা চালু হয়। এ কথা সত্য যে, সেলুকী ও তার পরবর্তী রোম সম্রাটদের শাসনের প্রভাবে এ এলাকায় গ্রীস ভাষারও অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। কিন্তু সেটা একটা বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যারা সরকারী প্রশাসনে বিভিন্ন পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা হতে চায় এবং সে জন্যে অতিমাত্রায় গ্রীসঘেষা হয়ে গেছে, কেবল তারাই গ্রীসভাষা চর্চা করতো। ফিলিস্তিনের সাধারণ রোকেরা সুরিয়ানীর একটা বিশেষ আঞ্চলিক কথা ভাষা ব্যবহার করতো। সে ভাষা আজকার দামেষ্ক অঞ্চলে প্রচলিত সুরিয়ানী থেকে ভিন্ন রকমের ছিল। ফিলিস্তিনবাসী গ্রীস ভাষা সম্পর্কে এত অজ্ঞ ছিল যে, ৭০ খৃষ্টাব্দে জেরুজালেম দখন করার পর রোমক সেনাপতি তাইতুস যখন জেরুজালেমবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষন দেন তখন সুরিয়ানী ভাষায় তার অনুবাদ করতে হয়েছিল। এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ) তার শিষ্যদেরকে যা কিছু বলে ছিলেণ তা সুরিয়ানী ভাষাতেই বলেছিলেন।

দ্বিতীয় যে কথা জানা দরকার তা হলো এই যে, বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত চারটে ইঞ্জিরের সব ক’টাই হযরস ঈসা (আ)-এর তীরোভাবের পর খৃষ্টধর্ম গ্রহণকারী গ্রীস ভাষাভাষীদের লেখা। হযরত ঈসা (আ)-এর কথা ও কার্যকরাপের বিবরণ সুরিয়ানী ভাষাভাষী খৃষ্টানদের কাছ থেকে তাদের গোচরে আসে এবং তা লিখিতভাবে নয় –মৌখিক বর্ণনার আকারে তাদের কাছে পৌঁছে। এসব সুরিয়ানী বর্ণনাগুলোকে তারা ভাষান্তরিত করে লিপিবদ্ধ করে রাখে। এর মধ্যে কোনো একটা ইঞ্জিলও ৭০ খৃষ্টাব্দের আগের লেখা নয়। বিশেষত যোহনের ইঞ্জিল হযরত ঈসা (আ)-এর এক শতাব্দী পর সম্ভবত মধ্য এশিয়ার আফসুস নগরীতে বসে লেখা হয়। তাছাড়া যে গ্রীস ভাষায় এ ইঞ্জিলগুরো প্রথম লেখা হয় তার কোনো আসল কপি রক্ষিত নেই। ছাপাখানা আবিস্কারের আগের যতগুলো গ্রীক পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করা হয়েছে, তার কোনো একটাও চতুর্থ শতকের আগের নয়। এ জন্যে তিনশো বছরের মধ্যে ঐ ইঞ্জিলগুলোতে কত কি রদবদল হয়ে গেছে, তা বলা কঠিন। তাছাড়া খৃষ্টানরা ইঞ্জিলগুলোতে নিজেদের ইচ্ছামত রদবদল করাকে যেভাবে বৈধ মনে করে আসছে, তাতে করে ব্যাপারটা আরো বেশী সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইনসাইক্লোপেডিয়া বৃটেনিকার “বাইবেল” শীর্ষক নিবন্ধের লেখক বলেনঃ

“ইঞ্জিলগুরোতে ইচ্ছাকৃতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। যেমন কোনো কোনো জায়গায় অন্য কোনো উৎস থেকে অনেকখানি কথা হুবহু ইঞ্জিলের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হয়েছে। …..এসক পরিবর্তন ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। যারা মূল গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে কোথাও কোনো কথা পেয়েছে এবং যে কথা গ্রন্থের মান উন্নত করে বা তাকে আরো শিক্ষাবহ করে তোলে, তাকে গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার নিজেদের রয়েছে বলে মনে করতে অভ্যস্ত ছিল তারাই এ ধরনের পরিবর্তন করছে। বেশ কিছু বাড়তি কথা দ্বিতীয় শতাব্দীতেই সংযোজিত হয়েছিল। হবে সেগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল তা জানা যায়নি”।

এ প্রেক্ষাপটে ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ)-এর যে কথাগুরো আমরা পাই তা অবিকলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছিল কিনা এবং তাকে কোনো রদবদল ঘটেছে কিনা, নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, ফিলিস্তিনে মুসলমানদের দখল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও প্রায় তিনশো বছর পর্যন্ত সেখানকার খৃষ্টানদের ভাষা সুরিয়ানী ছিল। খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীতে সুরিয়ানীর বদলে আরবী চালু হয়। এ সুরিয়ানী ভাষাভাষী ফিলিস্তিনবাসীর মাধ্যমে খৃষ্টীয় ধর্ম সম্পর্কে প্রথম তিন শতাব্দীর মুসলমান পণ্ডিতগণ যে তত্যাদি লাভ করেন, তা যারা সুরিয়ানী থেকে গ্রীক অতপর গ্রীক থেকে ল্যাটিন ভাষায় দফায় দফায় ভাষান্তরিত তথ্য লাভ করেছেন তাদের তুলনায় অধিকতর নির্ভরযোগ্য। কেননা হযরত ঈসা (আ)-এর মুখ নিঃসৃত আসল সুরিয়ানী কথাগুরো তাদের কাছে অবিকৃত অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

পাঁচঃ তিনি সারা দুনিয়ার নেতা হবেনঃ উপরোক্ত অনস্বীকার্য তথ্যগুলোর আলোকে এ কথা বিবেচনা করা দরকার যে, যোহনের ইঞ্জিলের উল্লিখিত উক্তিগুলোতে হযরত ঈসা (আ) তাঁর পরে আগমনকারী এক নবীর খবর দিচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তিনি বলেন যে, তিনি সারা দুনিয়ার নেতা হবেন ‘অনন্তকাল তিনি থাকবেন’ সত্যের সকল পথ তিনি দেখাবেন, এবং স্বয়ং তাঁর [হযরত ঈসা (আ)-এর] পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। যোহনের এ উক্তিগুলোতে ‘মহিমান্বিত আত্মা’, ‘সত্যের আত্মা’ প্রভৃতি শব্দ উল্লেখ করে আসল বক্তব্যকে জটিল করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ উক্তিগুলোকে গভীর মনোযোগের সাথে পড়লে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, যে আগমনকারীর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে তা কোনো আত্মা নয়, বরং একজন মানুষ এবং এক বিশেষ ব্যক্তি। সে ব্যক্তির শিক্ষা হবে বিশ্বজনীন, সর্বব্যাপী এবং কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী। সে বিশেষ ব্যক্তির জন্যে উর্দূ অনুবাদ ‘মদদগার’ (সাহায্যকারী) শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। খৃষ্টানরা জোর দিয়ে বলে থাকেন যে, সেটা হলো Paracletus তবে এর মর্ম উদ্ধারে খোদ খৃষ্টান পণ্ডিতেরাই বিভ্রাটে পড়েছেন। মূল গ্রীক ভাষায় Paraclete শব্দ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যথাঃ কোনো জায়গার দিকে ডাকা, সাহায্যের জন্যে ডাকা, ভয় দেখানো বা হুশিয়ার করা, উদ্ধুদ্ধ করা, অনুপ্রাণিত করা, মিনতি করা, ফরিয়াদ করা, প্রার্থনা করা। তাছাড়া এ শব্দটার হেলেনিক (Helenic) অর্থও রয়েছে একাধিক। যথাঃ সান্ত্বনা দেয়া, শান্ত করা, উৎসাক দেয়া। বাইবেলে এ শব্দটা যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে সেসব জায়গায় এর কোনো অর্থই খাপ খায় না। বাইবেল বিশারদ ওরাইজেন (Origen) কোথাও এর অনুবাদ করেছেন Consolator কোথাও Deprecator কিন্তু বাইবেলের অন্যান্য টীকাকার উভয় অনুবাদ নাকচ করে দিয়েছেন। কেননা প্রথমতঃ এ অর্থ গ্রীস ব্যাকরণের দৃষ্টিতে শুদ্ধ নয়। দ্বিতীয়তঃ যেসব বাক্যে এ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে সেখানে এ অর্থ অচল। অন্য কয়েকজন অনুবাদক এর অনুবাদ করেছেন Teacher। অথচ গ্রীস ভাষার প্রয়োগ থেকে এ অর্থটাও গ্রহণ করা যায় না। তারতোলিয়ান ও আগস্টাইন এর অনুবাদ করেছেন Advocate, অন্যান্যরা কেউবা অনুবাদ করেছেন Assistant, কেউবা Comforter, আবার কেউবা Consoler, (দেখুন ইনসাইক্লোপেডিয়া অব বাইবেলিকাল লিটারেচারঃ প্যারাক্লেটস শব্দ)।

এখন মজার ব্যাপার এই যে, গ্রীক ভাষাতেই আর একটা শব্দ রয়েছে, এর Pariclytos-অর্থ ‘প্রশংসিত’। এটা অবিকল ‘মুহাম্মদ’ এর প্রতিশব্দ। উচ্চারণে Paractetus-এর সাথে এ শব্দের চমৎকার সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়। যেসব খৃষ্টীয় পণ্ডিত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে নিজেদের খেয়ালখুশী মত অবাধে রদবদল করতে অভ্যস্ত ছিলেন, তারা যোহনের বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর এ শব্দটাকে নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসের বিপরীত দেখে তার বানানে এই একটু খানি হেরফের দিয়ে থাকলে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। এটা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে যোহনের লেখা আদি গ্রীক ইঞ্জিল কোথাও নেই যে, তাতে এ দু’টো শব্দের মধ্যে আসলে কোনটা ব্যবহার করা হয়েছিল তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

ছয়ঃ মুনহামান্নাঃ কিন্তু যোহন গ্রীক ভাষায় আসলে কোন শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন তা জানতে পারলেও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যেত না। কেননা তিনি যা-ই লিখুন সেটাও অনুবাদ ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমরা আগেই বলেছি, হযরত ঈসা (আ)-এর ভাষা ছিল ফিলিস্তিনী সুরিয়ানী। তাই তিনি নিজের ভবিষ্যদ্বাণীতে যে শব্দই ব্যবহার করে থাকেন না কেন, তা সুরিয়ানী শব্দই হওয়ার কথা। সৌভাগ্যবশতঃ সেই মূল সুরিয়ানী শব্দটা আমরা ইবনে হিশামের সিরাত গ্রন্থে পেয়েছি। সেই সাথে এর গ্রীক প্রতিশব্দ কি তাও আমর ইবনে হিশাম থেকে জানতে পেরেছি। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের সূত্রের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম ইউহান্নাস (ইউহান্না তথা যোহন) এর ইঞ্জিলের ১৫শ’ অধ্যায়ের ২৩শ’ থেকে ২৭শ’ আয়াত এবং ১৬শ’ অধ্যায়ের ১ম আয়াতের পূর্ণ অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন। তাতে গ্রীক ‘ফারাক্লিত’ শব্দের পরিবর্তে সুরিয়ানী ভাষার সুনহামান্না শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অতপর ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশাম তার এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সুরিয়ানী শব্দ মুনহামান্নার অর্থ আরবীতে মুহাম্মদ ও গ্রীক ভাষায় প্যারাক্লেটাস।–(ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ২৪৮)।

উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিক দিক থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সুরিয়ানীই ছিল ফিলিস্তিনবাসীর সাধারণ ভাষা। এ অঞ্চলটা ৭ম শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই ইসলামী শাসনাধীন ছিল। ইবনে ইসহাক ৭৬৮ খৃষ্টাব্দে এবং ইবনে হিশাম ৮২৮ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। অর্থাৎ উভয়ের আমলেই ফিলিস্তিনের খৃষ্টানরা সুরিয়ানী ভাষায় কথা বরতো এবং তাদের উভয়ের পক্ষেই নিজ দেশের খৃষ্টান অধিবাসীদের সাথে যোগাযোগ করতে কোনোই অসুবিধা ছিল না। তাছাড়া সে সময়ে লক্ষ লক্ষ গ্রীকভাষাভাষী খৃষ্টানও মুসলিম অধিকৃত এলাকাগুলোতে বসবাস করতো। এ জন্যে গ্রীক কোন শব্দ সুরিয়ানী ভাষার কোন শব্দের সমার্থক, তা জানাও তাদের পক্ষে কঠিন ছিল না। এখন যদি ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃত অনুবাদে সুরিয়ানী শব্দ মুনহামান্না ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশাম যদি তার এই ব্যাক্যা করে থাকেন যে, আরবতে এর প্রতিশব্দ মুহাম্মদ এবং গ্রীক ভাষায় প্যারাক্লেটাস, তাহলে হযরত ঈসা (আ) মুহাম্মদ (সা)-এর নাম উচ্চারণ করে তাঁরই আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। সেই সাথে এ কথাও জানা হয়ে যায় যে, যোহনের গ্রীক ইঞ্জিলে আসলে Pariclytos শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে খৃষ্টীয় পণ্ডিতগণ তাকে Pariclytos শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে খৃষ্টীয় পণ্ডিতগণ তাকে Pariclytos এ পরিবর্তিত করে দিয়েছেন।

সাতঃ নাজ্জাসীর সাক্ষ্যঃ এর চেয়েও পুরানো ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো আবিসিনিয়ার হিজরতের ঘটনা সংক্রান্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর বর্ণনা। নাজ্জাসী যখন আবিসিনিয়ায় আগত মুসলিম মোহাজেরদেরকে দরবারে ডাকলেন এবং আবু তালেবের ছেলে হযরত জাফর (র)-এর মুখে রসূলুল্লাহ (সা)-এর শিক্ষা ও আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ শুনলেন তখন বললেনঃ

(আরবী******************************************পিডিএফ ১২৭ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদেরকে এবং যে মহানব্যক্তির নিকট থেকে তোমরা এসেছ তাঁকে মুবারকবাদ জানাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রসূল। তিনি সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে আমরা ইঞ্জিলে উল্লেখ করেছিলেন”। বিভিন্ন হাদীসে হযরত জাফর (রা) এবং উম্মে সালমা (রা) থেকেও এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, খৃষ্টীয় ৭ম শতাব্দীর সেই সূচনাকালেই নাজ্জাসী জানতেন যে হযরত ঈসা (আ) একজন নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। এ থেকে আরো জানা যায় যে, ইঞ্জিলে ভবিষ্যতে সেই নবীর এমন স্পষ্ট পরিচয় দেয়া ছিল যার কারণে মুহাম্মদ (সা)-ই যে সেই নবী, তা বুঝতে নাজ্জাসীর কিছুমাত্র ইতস্ততঃ করতে হয়নি। তবে যোহনের ইঞ্জিলের মাধ্যমেই নাজ্জাসী হযরত ঈসা (আ)-এর এই ভষ্যিদ্বাণীর কথা জানতে পেরেছিলেন, না সে সময়ে এ কথা জানার আর কোনো মাধ্যম ছিল তা এই বর্ণনা থেকে জানা যায় না।

আটঃ বারনাবাসের ইঞ্জিলঃ যে চারটে ইঞ্জিলকে খৃষ্টীয় গীর্জা নির্ভরযোগ্য ও স্বীকৃত ইঞ্জিল (Council gospels) বলে স্থির রেখেছে আসলে যে চার ইঞ্জিল হযরত মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী জানার তো নয়ই, এমনকি খোদ হযরত ঈসা (আ)-এর জীবন বৃত্তান্ত এবং তাঁর প্রকৃত শিক্ষা ও নীতি কি ছিল তা জানারও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম নয়। বরং খৃষ্টীয় গীর্জা যাকে বে-আইনী ও সন্দেহভাজন ইঞ্জিল বলে আখ্যায়িত করে থাকে সেই বারনাবাসের ইঞ্জিলেই এর অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত মাধ্যম। খৃষ্টানরা এ কিতাবখানিকে গোপন রাখার জন্যে অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে। শত শত বছর যাবত এটা দুনিয়া থেকে লুপ্ত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে এর ইটালীয় অনুবাদের মাত্র একটা কপি পোপ সিক্সটাসের (Sixtus) লাইব্রেরীতে ছিল। তবে সেটা কাউকে পড়ার অনুমতি দেয়া হতো না। ১৮শ’ শতাব্দীর প্রথম দিকে তা জনটোল্যাণ্ড নামক এক ব্যক্তির হাতে পড়ে। তারপর তা একজন থেকে আর একজনের কাছে হস্তগত হতে হতে ১৭৩৮ সালে ভিযেনার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে উপনীত হয়। ১৯০৭ সালে অক্সফোর্ডের ক্লেরিগুন প্রেস থেকে সেই অনুলিপির ইংরেজী অনুবাদ ছাপা হয়। কিন্তু ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোধ হয় খৃষ্টান জগৎ বুঝতে পেরেছিল যে, এ কিতাব হযরত ঈসা (আ)-এর নামে প্রবর্তিত ধর্মটার মূলোচ্ছেদ করতে চলেছে। এ জন্যে সেই ছাপানো অনুলিপিগুলো বিশেষ ফন্দি করে উধাও করে দেয়া হয়। অতপর সে ইঞ্চিলখানা আর প্রকাশিত হতে পারেনি। একই ইটালীয় অনুলিপির স্পেনীয় ভাষান্তরিত আর একটা কপি ১৮শ’ শতাব্দীতে কোথাও কোথাও পাওয়া যেত। জর্জ সেল তার ইংরেজী অনুদিত কুরআনের ভূমিকায় ঐ অনুলিীপর কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেটা কোথাও উধাও করে দেয়া হয়। আজ তারও কোনো হদীস নেই। আমি অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত ইংরেজী অনুবাদের একটা ফটোস্টেট কপি দেখবার সুযোগ পেয়েছি এবং তা পুংখানুপুংখ পড়ে দেখেছি। আমার অনুভূতি এই যে, এটা একটা অমূল্য সম্পদ। কিন্তু খৃষ্টানরা কেবল জিদ ও হঠকারিতার বশে তা থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত রেখেছে।

খৃষ্টীয় বই-পুস্তকে যেখানেই এ ইঞ্জিরের প্রসঙ্গ এসেছে, একে ভূয়া ও বানোয়াট এবং সম্ভবতঃ কোনো মুসলমান তা রচনা করে মিথ্যামিথ্যি বারনাবাসের নামে চালিয়ে দিয়েছে এই বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে কিন্তু এটা একটা নির্জলা মিথ্যা কথা। এ ইঞ্জিলের স্থানে স্থানে মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে পরিস্কার ভাবিষ্যদ্বাণী (১২৯ পৃষ্ঠার প্রথম লাইনে লেখা অস্পষ্ট আছে**********************) এ মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। প্রথমতঃ এ ইঞ্জিল পড়লেই স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ কিতাব কখনো মুসলমান কর্তৃক রচিত হতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ এটা কোনো মুসলমানের রচিত হয়ে থাকলে মুসলিম সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন হতো এবং মুসলিম বিদ্বানদের বই-পুস্তকে এর বহু উল্লেখ থাকতো। কিনউত বাস্তব অবস্থা এই যে, জর্জ সেলের ইংরেজী অনুদিত (১২৯ পৃষ্ঠার ৪র্থ লাইনের শেষের দিকে লেখা অস্পষ্ট******) ভূমিকা প্রকাশের আগে মুসলমানদের জানাই ছিল না যে, এমন একটা ইঞ্জিলের কখনো অস্তিত্ব ছিল। তাবারী, ইয়াকুবী, মাসউদা, আলবেরুনী, ইবনে হামজা, ইবনে তাইমিয়া প্রমুখ গ্রন্থকারগণ মুসলমানদের মধ্যে খৃষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে বিশেষ ব্যুৎপত্তির অধিকারী ছিলেন। অথচ এদের কারো রচনায় খৃষ্টীয় ধর্মমত সংক্রান্ত আলোচনা প্রসঙ্গে বারনাবাসের ইঞ্জিল সম্পর্কে সামান্যতম আভাস-ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। মুসলিম জাহানের লাইব্রেরীগুলোতে যেসব বই-কিতাব মজুদ ছিল, তার বিশ্বস্ততম তালিকা হলো ইবনে নাদিমের ‘আলফিহরিস্ত’ এবং হাজী খলিফার ‘কাশফুজ জুনুন’। অথচ এ দু’টোতেও তার কোনো উল্লেখ নেই। উনবিংশ শতকের আগে পর্যন্ত কোনো মুসলিম পণ্ডিত বারনাবাসের ইঞ্জিলের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। এর মিথ্যা হওয়ার তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই যে, হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্মেরও ৭৫ আগে পোপ প্রথম গ্লাসিয়াসের আমলে খারাপ আকীদা-বিশ্বাস সম্বলিত ও বিভ্রান্তিকর ধর্মগ্রন্থসমূহের যে তালিকা তৈরী করা হয় এবং একটা যাজকীয় ফতোয়ার মাধ্যমে যা পড়া নিষিদ্ধ করা হয়, বারনাবাসের ইঞ্জিলও তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রশ্ন ওঠে যে, সে সময় এ ভূয়া ইঞ্জিল তৈরী করতে মুসলমান কোত্থেকে এসেছিল?

নয়ঃ বারনাবাসের ইঞ্জিল কিঃ বারনাবাসের ইঞ্জিল থেকে হযরত রসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো উদ্ধৃত করার আগে এ ইঞ্জিলের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া দরকার যাতে করে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় এবং খৃষ্টানরা এ ইঞ্জিলের ওপর এত বিরূপ কেন তাও বুঝা যায়।

যে চারটি ইঞ্জিলকে আইনসম্মত ও বিশ্বস্ত বলে বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার কোনো একটারও লেখক হযরত ঈসা (আ)-এর সাহাবী ছিলেন না। এমন কি হযরত ঈসা (আ)-এর সাহাবীদের কাছ থেকৈ তথ্য সংগ্রহ করে কিতাব শামিল করা হয়েছে –এমন দাবীও কোনো ইঞ্জিলের লেখক করেননি। তারা কোন কোন সূত্রে সথ্য সংগ্রহ করেছেন তারও কোনো বর্ণনা তারা দেননি। ফলে যাদের কাছ থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করেছেন তারা স্বয়ং বর্ণিত রচনাবলীর দর্শক ও কথাগুলোর শ্রোতা ছিলেন, না অন্য কোনো মাধ্যমে তা তাদের গোচলে এসেছে সেটা জানা যায় না। পক্ষান্তরে বারনাবাসের ইঞ্জিলের লেখক বলেন যে, আমি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রবীণতম ১২জন সহচরের অন্যতম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর সাথে ছিলাম এবং যা আমি নিজ কানে শুনেছি ও যা নিজ চোখে দেখেছি এ কিতাবে তাই লিপিবদ্ধ করছি। শুদু তাই নয়। গ্রন্থের উপসংহারে তিনি বলেনঃ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়র সময় হযরত ঈসা (আ) আমাকে বলেছিলেন যে, তাঁর সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করা এবং প্রকৃত ঘটনাগুলো মানুষকে জানানো আমার দায়িত্ব।

এ বারনাবাস কে? বাইবেলের কর্ম-পুস্তকে এ  নামের সাইপ্রাসীয় ইহুদী বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তির কথা বার বার উল্লেখিত হয়েছে। খৃষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসারে এবং হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীদের সাহায্য-সহযোগিতায় তার অবদানের খুবই প্রশংসা করা হয়েছে। তবে সে কখন খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে তা কোথাও বলা হয়নি এবং প্রবীণতম ১২জন সহচরের যে তালিকা তিনটে ইঞ্জিলে দেয়া হয়েছে, তাতেও তার নাম নেই। তাই বাইবেলের সেই বারনাবাসই এ ইঞ্জিলের রচয়িতা না আর কেউ, তা বলা সম্ভব নয়। মথি ও মিরকাস ১ সহচরের যে তালিকা দিয়েছেন, তার সাথে বারনাবাসের দেয়া তালিকার মাত্র দু’টো নামে গরমিল। তার একজন হলো তুমা। বারনাবাস এর বদলে নিজের নাম দিয়েছে। দ্বিতীয় জন শামউন কানানী। বারনাবাস এর জায়গায় ইহুদাহ ইবনে ইয়াকুবের নাম উল্লেখ করেছে। লূকের ইঞ্জিলে এ দ্বিতীয় নামটাও রয়েছে। এ জন্যে যদি অনুমান করা হয় যে, পরে কোনো এক সময় শুধু বারনাবাসকে ১২ সহচরের তালিকা থেকৈ বের করার জন্যে তুমার নাম ঢুকিয়ে দেয়অ হয়েছে তবে তা ভুল হবে না। কেননা এতে করে বারনামাসে ইঞ্জিলকে উপেক্ষা করার পথ সুগম হবে। বস্তুত ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে এ ধরনের হেরফের বা খৃষ্টীয় পণ্ডিতদের দৃষি।টতে কোনো অবৈধ কাজ ছিল না।

বারনাবাসের এ ইঞ্জিলকে যদি কেউ বিদ্বেষমুক্ত মন নিয়ে উদার দৃষ্টিতে পড়ে এবং প্রচলিত চার ইঞ্জিলের সাথে মিলিয়ে দেখে তাহলে এটাকে ঐ চার ইঞ্জিলের চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ মনে না করে পারবে না। এতে হযরত ঈসা (আ)-এর জীবনবৃত্তান্ত আরো বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সে বর্ণনাভঙ্গী থেকে মনে হয়, কেউ সেখানে সত্যি সত্যি সব ঘটনা স্বচক্ষে দেখছিল এবং সেসব ঘটনায় সে স্বয়ং কোনো না কোনো ভাবে জড়িত ছিল। চার ইঞ্জিলের খাপছাড়া কাহিনীগুলোর তুলনায় এর ঐতিহাসিক বিবরণ অধিকতর সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত। এতে করে ঘটনা পরস্পরাকে বুঝতেও আরো বেশী সুবিধা হয়। হযরত ঈসা (আ)-এর উপদেশগুলোও এ ইঞ্জিলে অন্য চারটি ইঞ্জিল অপেক্ষা অনেক বেশী স্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরা হয়েছে। তাওহীদের শিক্ষা, শির্ক খণ্ডন, আল্লাহর গুণাবলী ও ইবাদাতের প্রেরণা এবং মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী সংক্রান্ত আলোচনাগুলো এতে খুবই জোরদার, যুক্তিসমৃদ্দ ও বিস্তারিত। যেসব শিক্ষাপ্রদ উপমার প্রেক্ষাপটে হযরত ঈসা (আ) এসব আলোচনা করেছেন, তার এক শতাংশও অন্য চারটি ইঞ্জিলে নেই। হযরত ঈসা (আ) তাঁর শিষ্যদেরকে কিরূপ বিচক্ষণতা ও নৈপুণ্যের সাথে আল্লহার দ্বীনের শিক্ষা ও তার বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতেন সেটাও খুবই বিস্তারিতভাবে জানা যায় এবং এ ইঞ্জিল থেকে। হযরত ঈসা (আ)-এর ভাষা, বর্ণনাভঙ্গী এবং স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে যার কিছুমাত্র জানা আছে, সে এ ইঞ্জিল পড়ে মানতে বাধ্য হবে যে, এটা পরবর্তী কোনো লোকের মনগড়া কাহিনী নয় বরং এতে হযরত ঈসা (আ) নিজের আসল স্বরূপ প্রচলিত চার ইঞ্জিল অপেক্ষা অনেক বেশী স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। আর চার ইঞ্জিল তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে যে পরস্পর বিরোধিতা দেখা যায়, এ ইঞ্জিলে তার নামগন্ধও নেই।

এ ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ)-এর জীবনবৃত্তান্ত ও তাঁর উপদেশমালা যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তা যথার্থ একজন নবীর জীবন ও শিক্ষার মতই মনে হয়। তিনি নিজেকে একজন বী হিসেবে পেশ করেছেন। অতীতের সকল নবী ও কিতাবের সত্যতা ঘোষনা করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, নবীদের শিক্ষা ছাড়া সত্যোপলব্ধির আর কোনো পথ নেই। যে ব্যক্তি নবীদেরকে উপেক্ষা করে সে আসলে আল্লাহকেই উপেক্ষা করে। তিনি তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত সম্পর্কে অন্য সকল নবীর অনুরূপ আকিতা-বিশ্বাসই প্রচার করেছেন। নামায, রোযা ও যাকাতের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর নামায সম্পর্কে বারনাবাস বারংবার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে জানা যায় যে, আমাদের এ যুগের মতই তিনি ফযর, যোহর, আসর, মাগরেব, এশা ও তাহাজ্জুদের সময়ে নামায পড়তেন এবং সবসময়ই নামাযের আগে ওজু করতেন। অন্যন্য নবীদের সাথে সাথে তিনি হযরত দাঊদ (আ) এবং সোলায়মান (আ)-কেও নবী বলে ঘোষণা করেন। অথচ ইহুদী ও খৃষ্টানরা এ দু’জনকে নবীদের তালিকার বাইরে রেখে দিয়েছে। এ ইঞ্জিল অনুসারে হযরত ইসমাঈল (আ)-কে তিনি জবীহ (যিনি জবাই হয়ে কুরবানী হতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন) বলে স্বীকার করেছেন এবং জনৈক ইহুদী পণ্ডিতকে স্বীকার করিয়ে ছাড়েন যে, নবী ইসরাঈল অনর্থক হযরত ইসহাক (আ)-কে জবীহ সাব্যস্ত করতে গিয়ে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে। অথচ আসলে হযরত ইসমাঈল (আ)-ই জবীহ। আখেরাত, কেয়ামত ও বেহেশত-দোযখ সম্পর্কে তাঁর যে শিক্ষা এ ইঞ্জিলে ব্যক্ত হয়েছে, তা কুরআনের শিক্ষারই কাছাকাছি।

দশঃ খৃষ্টানরা বারনাবাসের ইঞ্জিলের বিরোধী কেনঃ বারনাবাসের ইঞ্জিলে ঘন ঘন রসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনের সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী থাকাই এর প্রতি খৃষ্টানদের বিরূপ হয়ে ওঠার একমাত্র কারণ নয়। কেননা তারা হযরত (সা)-এর জন্মের অকেন আগেই ইঞ্জিলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এর প্রতি তাদের অসন্তোষের আসল কারণ কি তা বুঝতে হলে একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

হযরত ঈসা (আ)-এর প্রাথমিক অনুসারীরা তাঁকে শুধু নবী মানতো। তাঁরা হযরত মূসা (আ)-এর আনীত আইন ব্যবস্থার (শরীয়াত) অনুসরণ করতো। আকীদা, ইবাদাত ও বিধি-নিষেধের ব্যাপারে তারা বনী ইসরাঈলের অন্যান্যদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন মনে করতো না। ইহুদীদের সাথে তাদের শুধু এতটুকু মতভেদ ছিল যে, তারা হযরত ঈসা (আ)-কে নবী মানার সাথে সাথে মসীহ (বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন নবী) বলেও মানতো। কিন্তু ইহুদীরা তাকে মসীহ বলে মানতে চাইতো না। পরে যখন সেন্টপল এ দলভুক্ত হন তখন তিনি রোমক, গ্রীক এবং অন্যান্য অ-ইহুদী ও অ-ইসরাইলীদের মধ্যেও এ ধর্মপ্রচার করতে শুরু করে দেন এবং এ উদ্দেশ্যে তিনি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রচারিত ধর্মের আকীদা, বিধিনিষেধ ও মূলনীতি পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ অভিনব এক ধর্ম তৈর করেন। এ ব্যক্তি কখনো হযরত ঈসা (আ)-এর সাহচযর্য পাননি। বরং তার জীবদ্দশায় তাঁর কট্টর বিরোধী ছিলেন। এবং তাঁর ইন্তেকালের পর কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁর সহচরদের দুশমন ছিলেন। তারপর যখন এ দলে ঢুকে তিনি একটা নতুন ধর্ম বানাতে শুরু কররেন তখনও তিনি হযরত ঈসা (আ)-এর কোনো উক্তিকে এর ভিত্তি হিসেবে মানুষের সামনে তুরে ধরেননি। কেবল নিজের খেয়াল ও কল্পনাকে তার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। এ নতুন ধর্ম তৈরীর পেছনে তার শুধু এ উদ্দেশ্য নিহিত ছিল যে, এমন একটা ধর্ম হওয়া দরকার যা দুনিয়ার সমস্ত অ-ইহুদীরা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে। তিনি ঘোষণা করেন যে, হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা ইহুদী শরীয়াতের সমস্ত বিধিনিষেদ থেকে মুক্ত। পানাহারের ব্যাপারে তিনি হালাল-হারামের ভেদাভেদ বিলুপ্ত করেন। অ-ইহুদীরা যে জিনিসটা বিশেষভাবে অপছন্দ করতো সেই খাতনার প্রথা রহিত করেন। এমনকি হযরত ঈসা (আ) একজন উপাস্য ও আল্লাহর ছেলে এবং ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে তিনি সমগ্র মানবজাতির আজন্ম পাপের প্রায়শ্চিত করেছেন –এ কথা বিশ্বাস করাকে তিনি ঈমানী কর্তব্য বলে নির্দেশ করেন। কেননা মোশরেকরা এসবের দিকেই ঝোঁকপ্রবণ হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আ)-এর প্রবীণতম সহচরগণ এসব নয়া আমদানী করা ধ্যানধারণার কঠোর বিরোধিতা করেন। কিন্তু সেন্টপল একবার যে দরজা খোরেন সে খোলা দরজা দিয়ে অ-ইহুদী খৃষ্টানদের এক বিরাট ও প্রবল জনস্রোত খৃষ্টধর্মে ঢুকে পড়ে। ঐ মুষ্টিমেয় সংখ্যক রোক কোনোক্রমেই সে জনস্রোতকে রোধ করতে পারেনি। তবুও খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর শেষ নাগদ হযরত ঈসা (আ)-কে উপাস্য মানতো না এমন লোকের সংখ্যা নেহাৎ কম ছিল না। কিন্তু চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম দিকে (৩৫২খৃঃ) নিকাইয়ার (Nicaea) পরিষদ সেন্টপলের সাম্রাজ্য খৃষ্টান হয়ে যায়। সিজার থিওডোসিয়াসের আমলে এ ধর্মমত সাম্রাজ্যের সরকারী ধর্মে পরিনত হয়। এর পর রাষ্ট্রীয়ধর্মের পরিপন্থী সমস্ত বই-পুস্তক যে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং এ ধর্মমতের অনুসারী বই-পুস্তকই যে গ্রহণযোগ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক। ৩৬৭ খৃষ্টাব্দে সর্বপ্রথম আথানাসিয়াস (Athanasius)-এর এক চিঠিতে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত বই-পুস্তকের একটা তালিকা ঘোষণা করা হয়। অতপর ৩৮২ খৃষ্টাব্দে পোপ ডামাসিয়াসের (Damasius)-এর সভাপতিত্বে একটা পরিষদ এ তালিকার মঞ্জুরী দেন। অতপর পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগে পোপ গ্লাসিয়াস (Gelasius) এ তালিকাকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়ার সাথে সাথে প্রত্যাখ্যাত বই-পুস্তকেরও একটা তালিকা ঘোষণা করেন। অথচ সেন্টপল প্রচারিত যে ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে ধর্মগ্রন্থগুলোর গ্রহণযোগ্য ও অগ্রহণযোগ্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, সেসব আকীদা-বিশ্বাসের কোনো একটারও শিক্ষা হযরত ঈসা (আ) নিজে দিয়েছেন বলে কোনো খৃষ্টান পণ্ডিত কখনো দাবী করতে পারেনি। এমনকি গ্রহণযোগ্য ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে যে ক’টা ইঞ্জিল রয়েছে, তার মধ্যেও হযরত ঈসা (আ)-এর নিজের কোনো কথা থেকে এসব ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি সমর্থন পাওয়া যায় না। বারনাবাসের ইঞ্জিল খৃষ্টবাদ সংক্রান্ত এই সরকারী আকীদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী হওয়ার কারণেই প্রত্যাখ্যাত হয়। এর লেখক গ্রন্থের শুরুতেই ঐ গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্য এরূপ বর্ণনা করেনঃ “যারা শয়তাদের প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে ইয়াসু’কে আল্লাহর ছেলে বলে আখ্যায়িত করে তাদের ভ্রান্তধারণা খণ্ডন করা, যারা খাতনাকে নিষ্প্রয়োজন মনে করে এবং হারাম খাদ্যকে হালাল করে দেয় তাদেরও সংশোধন করা। সেন্টপলও এ শয়তানী প্রবঞ্চনার একজন অন্যতম শিকার”। বারনাবাস বলেনঃ হযরত ঈসা (আ)-এর জীবিতাবস্থায় তাঁর মোজযাগুলো দেখে সর্বপ্রথম অংশীবাদী রোমক সৈন্যদের মধ্য কেউবা তাকে খোদা, কেউবা খোদার পুত্র বলতে আরম্ভ করে দেয়। ক্রমে তা সংক্রামক ব্যাধির মত সমগ্র বনী ইসরাইলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হযরত ঈসা (আ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হন। তিনি নিজের সম্পর্কে এ ভুল ধারনার বারংবার কঠোর প্রতিবাদ করেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় নিজে যাওয়ার পরিবর্তে শিষ্যদের পাঠান এবং তার দোয়ায় শিষ্যদের দ্বারাও স্বয়ং হযরত ঈসা (আ)-এর মত মোজেযা সংঘটিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যে, লোকেরা যেন মোজেযা সংগঠনকারীকে খোদা বা খোদার ছেলে মনে করা থেকে বিরত থাকে। এ প্রসঙ্গে বারনাবাস ঐ ভ্রান্ত ও আকীদার বিরুদ্ধে হযরত ঈসা (আ)-এর দেয়া সুদীর্ঘ ভাষণগুলোকে উদ্ধৃত করেছেন এবং এই বিভ্রান্তি ও গোমরাহী ছড়িয়ে পড়ায় হযরত ঈসা (আ) কতখানি বিব্রত বোধ করতেন বিভিন্ন জায়গায় তা ব্যক্ত করেছেন। হযরত ঈসা (আ)-এর ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে ইন্তেকাল করা সম্পর্কে সেন্টপল যে মতবাদ প্রচার করেছেন, বারনাবাস সুস্পষ্টভাবে তা খণ্ডন করেন। তিনি নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন যে, ইহুদা স্ক্রিউতি যখন ইহুদীদের প্রধান ধর্মযাজকের কাছ থেকে ঘুষ খেয়ে হযরত ঈসা (আ)-কে ধরিয়ে দেয়ার জন্যে সিপাইদের সাথে করে নিয়ে আসে তখন আল্লাহর হুকুমে চারজন ফেরেশতা তাঁকে ওপরে তুলে নিয়ে যায়। সেই সাথে স্বয়ং ইহুদী স্ক্রিউতির আকৃতি ও গলার স্বর অবিকল হযরত ঈসা (আ)-এর মত করে দেয়া হয়। ফলে হযরত ঈসা (আ)-এর পরিবর্তে সে নিজেই ক্রুশবিদ্ধ হয়। এবাবে বারনাবাসের ইঞ্জিল সেন্টপলের গড়া খৃষ্ট ধর্মের ভিত্তিই চুরমার করে দেয় এবং কুরআনের বর্ণনাকে পুরোপুরি সমর্থন করে। অথচ কুরআন নাযিল হওয়ার একশো পনেরো বছর আগেই বরনাবাসের ইঞ্জিলে এসব কথা প্রকাশিত হয় এবং সে কারণেই তাকে খৃষ্টীয় ধর্মযাজকরা প্রত্যাখ্যান করে।

এগারঃ বারনাবাসের ইঞ্জিলের বিস্তারিত ভবিষ্যদ্বাণীঃ এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বারনাবাসের ইঞ্জিল আসলে প্রচলিত চার ইঞ্জিলের চেয়ে অধিকতর বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিল। এতে হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষা, জীবনবৃত্তান্ত ও উক্তিসমূহের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। এ ইঞ্জিল দ্বারা নিজেদের ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসকে সংশোধন করা ও হযরত ঈসা (আ)-এর প্রকৃত শিক্ষা অবগত হওয়ায় যে দুর্লভ সুযোগ খৃষ্টানরা পেয়েছিল, তা শুধুমাত্র জিদ ও হঠকারিতার বসে তারা হারিয়ে ফেলে। বস্তুত এটা তাদের চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। যা হোক, বারনাবাস হযরত রসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) এর যেসব ভবিষ্যদ্বাণী হযরত ঈসা (আ)-কে কোথাও হযরত (সা)-এর নাম উচ্চারণ করতে দেখা যায়, কোথাও তিনি শুধু ‘রসূলুল্লাহ’ বলেন, কোথাও ‘মসী’ শব্দ প্রয়োগ করেন, কোথাও তাকে ‘প্রশংসনীয়’ (Admirable) বলে অভিহিত করেন, আবার কোথাও পরিস্কারভাবে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’র সমার্থক বাক্য উচ্চারণ করেন। এ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সব ক’টা উদ্ধৃত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা তার সংখ্যা এতবেশী এবং কোথাও কোথাও তা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ও পূর্বাপর বর্ণনার সাতে যুক্ত হয়ে এতটা বিরাট আকার ধারণ করেছে যে, তার সবগুলো একত্র করলে বেশ একটা মস্তবড় গ্রন্থ হয়ে যেতে পারে। আমি এখানে নমুনাস্বরূপ তার কয়েকটা মাত্র উদ্ধৃত করছিঃ

“আল্লাহর প্রেরিত নবীদের সংখ্যা ছিল এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার। তাঁরা সবাই সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্টভাবে কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমার পরে আসবেন সকল নবী ও পূণ্যাত্মাদের আলোকবর্তিকা। নভীদের যেসব কথায় অস্পষ্টতা ছিল তিনি তা সুস্পষ্ট করে দেবেন। কেননা তিনি আল্লাহর রসূল”।–(অধ্যায়ঃ ১৭)

“ফারিসী ও লাভীরা বললঃ তুমি যদি মসীহ, ইলিয়াস বা অন্য কোনো নবীও না হয়ে থাক, তাহলে নতুন আদর্শ শিক্ষা দাও কেন এবং নিজেকে মসীহের চেয়েও বড় করে জাহির কর কেন? ইয়াসু [হযরত ঈসা (আ)] জবাব দিলেনঃ আল্লাহ যেসব মোজেযা আমার দ্বারা প্রকাশ করেন তা থেকে পরিস্কার বুঝা যায় যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন আমি কেবল তাই বলি। নচেৎ আসলে আমি নিজেকে তাঁর (মসীহের) চেয়ে বড় বলে গণ্য করার যোগ্য মনে করি না, যেমন তোমরা বলছ। আমি আল্লাহর সেই রসূলের মোজার বাঁধন বা জুতোর ফিতে খুলে দেয়ারও যোগ্য নই –যাকে তোমরা মসীহ বলে থাক। তিনি আমার আগের সৃষ্টি অথচ আসবেন আমার পরে। তিনি সত্য বাণী নিয়ে আসবেন যাতে তাঁর ধর্মের বিস্তৃতির কোনো সীমা না থাকে”।–(অধ্যায়ঃ ৪২)।

“আমি তোমাদেরকে সুনিশ্চিতভাবে বলছিঃ এ যাবত যে নবীই এসেছেন, তিনি কেবল একটা জাতির জন্যে আল্লাহর করুণা নিদর্শন হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। এ জন্যে সেসব নবীর বাণী যে জাতির কাছে তারা প্রেরিত তাদের বাইরে ছড়ায়নি। কিন্তু আল্লাহর রসূল (সা) যখন আসবেন তখন আল্লাহ বলতে গেলে তাঁকে নিজের হাতের মোহর দিয়ে দেবেন। ফলে তাঁর শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত দুনিয়ার সকল জাতিকে তিনি আল্লাহর রহমত পৌঁছিয়ে দেবেন এবং মুক্তির পথ দেখাবেন। খোদাবিমুখ লোকদের ওপর তিনি পরাক্রান্ত ও ক্ষমতাশালী হয়ে আসবেন এবং পৌত্তলিকতাকে তিনি এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করবেন যে, শয়তান অস্থির হয়ে উঠবে”। [এরপর শিষ্যদের সাথে এক দীর্ঘ কথোপকথনে হযরত ঈসা (আ) সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, তিনি হযরত ইসমাঈল (আ)-এর বংশধরের মধ্য থেকে আবির্ভুত হবেন]।–(অধ্যায়ঃ ৪৩)।

“এ জন্যেই তোমাদেরকে আমি বলি যে, আল্লাহর সে রসূল এমন এক প্রদীপ্ত জ্যোতি, যাঁর কাছ থেকে আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি বস্তু আনন্দ লাভ করবে। কেননা বুদ্ধিমত্তা ও উপদেশ, প্রজ্ঞা এবং শক্তি, ভয় ও ভালবাসা, দৃঢ়তা এবং সংযম এগুলো হবে তাঁর চরিত্রের ভূষণ ও প্রেরণার উৎস। তিনি হবেন দানশীল ও দয়া, ন্যায়বিচার, খোদাভীতি এবং ভদ্রতা ও সহিষ্ণুতার উজ্জীবনী শক্তিতে বলীয়ান। আল্লাহ তাঁর অন্য যেসব সৃষ্টিকে এসব গুণে ভূষিত করেছেন, তিনি এসব গুণ তাদের তিনগুণ পেয়েছেন। তাঁর আবির্ভাবের যুগটা যে কত কল্যাণময় হবে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তোমরা নিশ্চিত জেনে রাখ, আমি তাঁকে দেখেছি এবং তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি যেমন প্রত্যেক নবীই তাঁকে দেখেছেন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তাঁর আত্মার প্রতি দৃষ্টিপাত করা মাত্রই আল্লাহ তাঁকে নবুয়াত দান করলেন। আমি যখন তাঁকে দেখলাম, তখন আমার আত্মা প্রশান্তিতে ভরে উঠল। তখন বললাম, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তোমর সহায় হোন এবং আমাকে তোমার জুতোর ফিতে বাঁধার যোগ্য করে দিন। কেননা আমি এতটুকু মর্যাদা পেলেও একজন বড় নবী ও আল্লাহর একজন পূণ্যাত্মায় পরিগণিত হব”।–(অধ্যায়ঃ ৪৪)

“আমি চলে যাওয়ায় তোমরা মর্মাহত হয়ো না এবং ভীত হয়ো না। কেননা আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করিনি। বরং আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা খোদা –যিনি তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আর আমার কথা ভাবছো? আমি এ সময়ে দুনিয়ায় এসেছি দুনিয়াবাসীর মুক্তির দিশারী সেই রসূলে খোদার জন্যে পথ সুগম করতে। …..ইন্দিরিয়াস বলল, “হে ওস্তাদ! আমাদেরকে তাঁর নিদর্শন জানিয়ে দাও যেন আমরা তাঁকে চিনতে পারি’ ইয়াসু জবাব দিলেনঃ তোমাদের জীবিতকালে তিনি আসবেন না। তোমাদের কিছুকাল পরে আসবেন। তিনি এমন সময় আসবেন যখন ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে যাওয়ার দরুন কোনো রকম ত্রিশ জন মুমিন অবশিষ্ট থাকবে। সে অবস্থায় আল্লাহর দুনিয়ার ওপর করুণা করবেন। তিনি আপন রসূলকে পাঠাবেন যার মাথার ওপর সাদা মেঘ ছায়া ফেলবে এবং তা দিয়েই তাঁকে আল্লাহর মনোনীত বান্দা বলে চেনা যাবে। তাঁর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী আল্লাহর সঠিক পরিচয় লাভ করবে। তিনি খোদাবিমুখ লোকদের প্রবল শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবেন এবং দুনিয়া থেকে পৌত্তলিকতাকে নির্মূল করবেন। আমি এ জন্যে খুবই আনন্দিত। কেননা তাঁর মাধ্যমে আমাদের খোদার যথার্থ পরিচয় পাওয়া যাবে, তাঁর মহিমা ঘোষিত হবে এবং দুনিয়াবাসী জানবে যে, আমি যা বলেছি সত্য ও সঠিক বলেছি। আমাকে যারা মানুষের চেয়ে বড় কিছু মনে করবে তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ গ্রহন করবেন। ….তিনি এমন সত্যতা নিয়ে আসবেন যা অন্য সব নবীর আনীত সত্যতা থেকে অধিকতর সুস্পষ্ট”।–(অধ্যায়ঃ ৭২)।

“আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছিল জেরুজালেমে সোলায়মানের মসজিদে –অন্য কোথাও নয়। তবে আমার কথা বিশ্বাস কর যে, সেদিন একদিন আসবে যখন খোদা অন্য একটা শহরে তাঁর রহমত বর্ষণ করবেন। তারপর সব জায়গায় তার সঠিক ইবাদাত সম্ভব হবে এবং আল্লাহ আপন অনুগ্রহে সব জায়গায় সত্যিকার নামায কবুল করবেন। ……আমি আসলে ইসরাঈলের বংশধরের কাছে ত্রানকর্তা নবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি কিন্তু আমার পরে খোদার প্রেরিতমসীহ আসবেন সারা দুনিয়াবাসীর কাছে। তাঁরই জন্যে এই সমগ্র দুনিয়াটা তৈরী করেছে। তখন সারা দুনিয়ায় আল্লাহর ইবাদাত চলবে এবং তাঁর রহমত বর্ষিত হবে”।–(অধ্যায়ঃ ৮৩)।

“(ইয়াসু প্রধান যাজককে বললেন) সেই চিরঞ্জীব খোদার কসম যার জন্যে আমি প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত রয়েছি –দুনিয়ার সকল জাতি যে মসীহের জন্যে অপেক্ষমান, আমি সে মসীহ নই। আমাদের পিতা ইবরাহীমের কাছে আল্লাহ সেই মসীহ সম্পর্কে এ বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ‘তোমার সন্তানের অসিলায় দুনিয়ার সকল জাতি বরকত লাভ করবে’। (আবির্ভাব অধ্যায়ঃ ২২:১৮)। কিন্তু আল্লাহ যখন আমাকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাবেন তখন শয়তান আবার এমন বিদ্রোহ করবে যে দুরাচার লোকেরা আমাকে খোদা ও খোদার ছেলে বলে মানবে। সে কারণে আমার কথা ও শিক্ষাগুলো এতদূর বিকৃত করে দেয়া হবে যে ত্রিশজন মুমিন অবশিষ্ট থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। সেই সময় আল্লাহ দুনিয়ার ওপর করুণা করবেন এবং সেই রসূলকে পাঠাবেন যাঁর জন্যে তিনি দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তিনি দক্ষিণ দিক থেকে প্রবল শক্তি নিয়ে আসবেন এবং মূর্তিগুলোকে মূর্তিপূজারী সমেত ধ্বংস করে দেবেন। যে ক্ষমতার দাপট নিয়ে শয়তান মানুষের ওপর জেঁকে বসেছে, তিনি তা শয়তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবেন। তাঁর ওপর যারা ঈমান আনবে, তিনি তাদের মুক্তির জন্যে আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে আসবেন। যারা তাঁর কথা মত চলে তারাই ভাগ্যবান”।–(অধ্যায়ঃ ১৬)।

“প্রদান যাজক জিজ্ঞেস করলেনঃ আল্লাহর সেই রসূলের পরও কি আর কোনো নবী আসবে? ইয়াসু বললেনঃ যথার্থ নবী আর আসবেন না। তবে অনেক মিথ্যা নবী আসবে। আমি সে জন্যে খুবই উদ্বিগ্ন। কেননা আল্লাহর ন্যায়সঙ্গত ফয়সালার কারণে শয়তান তাদেরকে মাঠে নামাবে এবং তারা আামার ইঞ্জিলের পর্দায়ে নিজেদেরকে লুকাবে”।–(অধ্যায়ঃ ১৭)

“প্রধান ধর্মযাজক জিজ্ঞেস করলঃ সেই মসীহ কি নামে পরিচিত হবেন এবং তাঁর আবির্ভাব কোন কোন নিদর্শন দেখে বুঝা যাবে? ইয়াসু বললেনঃ সেই মসীহের নাম ‘প্রশংসনীয়’। কেননা আল্লাহ যখন তার আত্মাকে সৃষ্টি করেন তখন তাঁর এ নাম তিনি নিজেই রাখেন এবং সেখানে তাঁকে একটা ঊর্ধ-জাগতিক মর্যাদায় রাখা হয়। আল্লাহ তখন তাঁকে বলেনঃ হে মুহাম্মদ! তুমি অপেক্ষা কর। কেননা তোমারই জন্যে আমি বেহেশত, দুনিয়া এবং আরও বহু কিছু সৃষ্টি করব এবং তোমাকে সেসব উপহার দেব। অতপর যে ব্যক্তি তোমার জন্যে কল্যাণ কামনা করবে তার কল্যাণ সাধিত হবে আর যে ব্যক্তি তোমার ওপর অভিসম্পাৎ পাঠাবে তার ওপর অভিসম্পাৎ পাঠান হবে। যখন তোমাকে আমি দুনিয়ায় পাঠাব তখন আমি তোমাকে ত্রাণকর্তা নবী হিসেবে পাঠাব। তোমার কথাই সত্য হবে। আকাশ এবং পৃথিব অটল থাকবে না। কিন্তু তোমর দ্বীন অটল থাকবে। তাঁর পবিত্র নাম হর মুহাম্মদ।–(অধ্যায়ঃ ৯৭)।

বারনাবাস লিখেছেন যে, একবার শিষ্যদের কাছে হযরত ঈসা (আ) বলেন, আমরই একজন শিষ্য ইহুদা স্ক্রিউতি আমাকে ত্রিশটি মুদ্রার বিনিময়ে শত্রুদের কাছে বিক্রি করে দেবে। অতপর হযরত ঈসা (আ) বলেনঃ

“আমি নিশ্চিত যে, এরপর যে ব্যক্তি আমাকে বিক্রি করবে, আমার নামে তাকেই হত্যা করা হবে। কেননা আল্লাহ আমাকে পৃথিবীর ওপরে তুরে নেবেন এবং সেই বিশ্বাসঘাতকের চেহারা এমনভাবে পাল্টে দেবেন যে প্রত্যেকে মনে করবে আমিই সেই ব্যক্তি। তবুও তার অপমৃত্যু ঘটার পর কিছুদিন যাবত আমারই অবমাননা করা হবে কিন্তু যখন আল্লাহর পবিত্র রসূল মুহাম্মদ আসবেন তখন আমার সে দুর্নাম ঘুচে যাবে। আমি সেই মসীহের সত্যতা ঘোষণা করেছি বলেই আল্লাহ এ ব্যবস্থা করবেন। আমাকে এ পুরস্কার দেবেন যে, আমি যে জীবিত আছি এবং ঐ অপমৃত্যুর সাথে আমার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা লোকেরা জানতে পারবে।–(অধ্যায়ঃ ১১৩)।

[শিষ্যদেরকে হযরত ঈসা (আ) বললেনঃ] “আমি নিশ্চিতভাবে তোমাদের বলছি যে, মূসার কিতাব থেকে সত্যকে যদি মুছে ফেলা না হত তাহলে আল্লাহ আমাদের পিতা দাউদকে আর একখানা কিতাব দিতেন না। আর যদি দাউদের কিতাবকে বিকৃত করা না হত তাহলে আল্লাহ আমাকে ইঞ্জিল দিতেন না। কেননা আমাদের খোদা পরিবর্তনশীল নন। তাই সবাইকে তিনি একই কথা বলেছেন। সুতরাং যখন আল্লাহর রসূল আসবেন তখন খোদাবিমুখ লোকের দ্বারা কলুষিত আমার কিতাবকে তিনি কলুষমুক্ত করবেন”।–(অধ্যায়ঃ ১২৪)।

দু’টি সন্দেহের জবাব

সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত এ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোতে মাত্র তিনটি জিনিস এমন রয়েছে যা বাহ্য দৃষ্টিতে কিছু সংশয়ের সৃষ্টি করে। প্রথমতঃ এ উদ্ধৃতিগুলোতে এবং বারনাবাসের ইঞ্জিলের আরও বহু স্থানে হযরত ঈসা (আ) নিজের মসীহ হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়তঃ শুধু এ উদ্ধৃতিগুলোতেই নয়, বরং বারনাবাসের ইঞ্জিলের আরও বহু জায়গায় হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর আসল আরবী নাম ‘মুহাম্মদ’ (সা) লেখা হয়েছে। অথচ ভবিষ্যতের কোনো নবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে তার আসল নাম উল্লেখ করা নবীদের প্রচলিত রীতি নয়। তৃতীয়তঃ এতে হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-কে সমীহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

প্রথম সন্দেহের জবাব এই যে, শুধু সন্দেহের জবাব এই যে, শুধু বারনাবাসের ইঞ্জিরেই নয়, লূকের ইঞ্জিলেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ) তাঁকে মসীহ বলতে শিষ্যদেরকে নিষেধ করেছিলেন। লূকের (৯:২০-২১) উদ্ধৃতি লক্ষণীয়ঃ

“তিনি তাদেরকে বললেনঃ কিন্তু তোমরা আমাকে কি বল? পিটার্স বললেনঃ আল্লাহর মসীহ। তখন তিনি তাদেরকে কড়া আদেশ দিলেন যে, এ কথা কাউকে বল না”।

এর কারণ হয়ত এই ছিল যে, বনী ইসরাঈল যে মসীহের অপেক্ষায় ছিল তার সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে, তিনি তরবারীর জোরে শত্রুদের পরাস্ত করবেন। এ জন্যে হযরত ঈসা (আ) বললেন যে, আমি সে মসীহ নই বরং তিনি আমার পরে আসবেন।

দ্বিতীয় সন্দেহের জবাব এই যে, বারনাবাসের ইঞ্জিলের যে ইটালীর অনুবাদ বর্তমানে দুনিয়ায় পাওয়া যায় তাতে অবশ্যই হযরত (সা)-এর নাম মুহাম্মদ লেখা রয়েছে। কিন্তু এ কিতাব কোন কোন ভাষা থেকে অনুবাদের পর অনুবাদের মাধ্যমে ইটালীয় বাষায় উপনীত হয়েছে, তা কেউ জানে না। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, বারনাবাসের মূল ইঞ্জিল সুরিয়ানী ভাষাতেই হওয়ার কথা। কেননা সেটা হযরত ঈসা (আ) ও তার সহচরদের ভাষা ছিল। সেই আসল কিতাব পাওয়া গেলে দেখা যেত যে তাতে হযরত (সা)-এর নাম কি লেখা হয়েছে। তা যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন কেবল এটুকু অনুমান করা যেতে পারে যে, আসলে হযরত ঈসা (আ) হয়ত ‘মুনহামান্না’ শব্দটাই ব্যবহার করে থাকবেন। যোহনের ইঞ্জিল থেকে ইবনে ইসহাকের যে বর্ণনার বরাত আমরা ইতিপূর্বে দিয়েছি, তাতেও এ শব্দটারই উল্লেখ পাওয়া গেছে। হযরত ঈসা (আ) কর্তৃক মুনহামান্না শব্দ ব্যবহৃত হওয়ার পর বিভিন্ন অনুবাদক তার অনুবাদ করেছেন। আর ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখিত ভাবী নবীর নাম অবিকল ‘মুহাম্মদ’ শব্দেরই সমর্থক দেখে পরবর্তীকালের কোন অনুবাদক হয়ত এ নামটাই লিখে দিয়েছেন। তাই বলে এ নামটা পরিস্কারভাবে লেখা থাকাতেই এরূপ সন্দেহ করা চলে না যে, বারনাবাসের গোটা ইঞ্জিলটাই কোন মুসলমানের বানোয়াট রচনা।

তৃতীয় সন্দেহের জবাব এই যে, ‘মসীহ’ শব্দটা একটা ইসরাইলী পরিভাষা। পবিত্র কুরআনে এটা সুনির্দিষ্টভাবে হযরত ঈসা (আ)-এর নামে ব্যবহৃত হওয়ার কারণ শুধু এই যে, ইহুদীরা তাকে ‘মসীহ’ বলে স্বীকার করত না। নচেত এটা কুরআনের পরিভাষাও নয় এবং কুরআনের কোথাও একে ইসরাঈলী পরিভাষার সমার্থক শব্দ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়নি। সুতরাং হযরত ঈসা (আ) যদি রসূলুল্লাহ (সা)-এর নামে মসীহ শব্দ প্রয়োগ করে থাকেন এবং কুরআনে তা না করা হয়ে থাকে তবে তার অর্থ এ দাঁড়ায় না যে, বারনাবাসের ইঞ্জিল হযরত (সা)-কে এমন একটা বিশেষণে ভূষিত করছে যা কুরআন অস্বীকার করে। আসলে বনী ইসরাঈলের প্রাচীন রীতি ছিল এই যে, কোনো জিনিস বা ব্যক্তিকে যখন কোন ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হত তখন সেই জিনিসের ওপর বা সেই ব্যক্তির মাথায় তেল মর্দন করে তাকে পবিত্র (Consecrate) করা হত। ইবরানী ভাসায় এই তেল মর্দনকে ‘মসহ’ বলা হত এবং যার ওপর মর্দন করা হত তাকে বলা হত ‘মসীহ’। ইবাদাতগাহের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে এভাবে তৈল মর্দন করে ইবাদাতগাহের নামে ওয়াকফ করে দেয়া হত। যাজকদেরকে যাজকতার কাজে নিয়োগ করার সময়ও এভাবে ‘মসহ’ করা হত। রাজা বা নবীও যখন আল্লাহর তরফ থেকে রাজত্ব বা নবুয়াতের পদে মনোনীত হতেন তখন তাকে ‘মসহ’ করা হত। বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে বনী ইসরাঈলে একাধিক ‘মসীহ’ আবির্ভূত হতে দেখা যায়। হযরত হারুন (আ) যাজক হিসেবে মসীহ ছিলেন। হযরত মূসা (আ) যাজক ও নবী হিসেবে, তালুত রাজা হিসেবে, হযরত দাউদ (আ) রাজা ও নবী হিসেবে, মালিক ছাদাক রাজা ও যাজক হিসেবে এবং হযরত আল-ইয়াসা নবী হিসেবে মসীহ ছিলেন। পরে অবশ্য কাউকে নিয়োগ করার ব্যাপারে তেল মর্দনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। কেবল আল্লাহর মনোনীত হওয়াই মসীহ হওয়ার শাসিল ছিল। উদাহরণ স্বরূপ এক –সম্রাট পুস্তকের ১৯শ’ অধ্যায়ে উল্লেখ রয়েছে যে, আল্লাহ হযরত ইলিয়াস (আ)-কে (ইলিয়াহ) নির্দেশ দেন, হাজাইলকে মসহ কর যেন এরেমের রাজা হয়, নিমসির ছেলে ইয়ানুকে মসহ কর যেন ইসরাঈলের রাজা নয় এবং আল-ইয়াসকে মসহ কর যেন তোমর জায়গায় নবী হয়। এঁদের কারও মাথায় তেল মর্দন করা হয়নি। কেবল আল্লাহর তরফ থেকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেয়াতেই মসহ করা হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং ইসরাঈলীদের ধারণা অনুসারে ‘মসীহ’ আসলে ‘আল্লাহ’ কর্তৃক নিযুক্ত’ শব্দের সমার্থক। এ অর্থেই হযরত ঈসা (আ) হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-কে মসীহ বলে অভিহিত করেছিলেন। (মসীহ শব্দের ইসরাইলী তাৎপর্যের ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন সাইক্লোপেডিয় অব বাইবেলিকাল লিটারেচার, ‘মেসিয়াহ’ শব্দ)।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.