সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ৪- বিশ্বনেতা

বিশ্বনেতা

(সারা দুনিয়ার সার্বজনীন উত্তরাধিকার)

-[এটা একটা বেতার ভাষণ। দেশ বিভাগের কয়েক বছর আগে ১৯৪১ সালে অল ইণ্ডিয়া রেডিও থেকে এটা প্রচার করা হয়। এ ভাষণের শ্রোতা শুধু মুসলমান ছিল না। হিন্দু, শিখ, খৃষ্টান এবং পারসিকরাও ছিল।–(সংকলকবৃন্দ)]

আমরা মুসলমানরা হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে বিশ্বনেতা বলে থাকি। সরল ভাষায় এর অর্থ হল দুনিয়ার সরদার। হিন্দী ভাষায় এর অনুবাদ হবে জগতগুরু। ইংরেজিতে Leader of the world দৃশ্যতঃ এটা একটা বিরাট উপাধি। তবে যে মহান ব্যক্তিকে এ উপাধি দেয়া হয়েছে তাঁর কর্মকাণ্ড সত্যিই এমন যে তাঁকে বিশ্বনেতা বললে এতটুকু অতিরঞ্জিত হবে না। বরং একেবারে তা হবে বাস্তব সত্য।

চিন্তা করে দেখুন, কোনো ব্যক্তিকে দুনিয়ার নেতা বরে মেনে নেয়ার পয়লা শর্ত এই যে, তিন কখনো বিশেষ জাতি বর্ণ বা শ্রেণীর কল্যাণের জন্যে নয় বরং সারা দুনিয়ার মানুষের কল্যাণেল জন্যে কাজ করেছেন। একজন দেশপ্রেমিক বা জাতীয়তাবাদী নেতা আপন জাতির সেবা করেছেন বলে তাঁকে যত খুশী শ্রদ্ধা জানাতে পারেন কিন্তু আপনি যদি তার দেশ ও জাতির লোক না হন তাহলে তিনি কিছুতেই আপনার নেতা হতে পারে না। যে ব্যক্তির সমস্ত ভালবাসা, মঙ্গল কামনা ও সমস্ত জনকল্যাণমূলক তৎপরতা কেবল চীন স্পেন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, তার সাথে একজন ভারতবাসীর কি সম্পর্ক যে তাকে নেতা বলে মেনে নেবে? সে যদি নিজের জাতিকে অন্যান্য জাতির চেয়ে উত্তম মনে করে এবং অন্যান্য জাতির লোক তাকে ঘৃণা করতে বাধ্য হবে। সকল জাতির লোক কোনো এক ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা বলে মানতে পারে কেবল তখন, যখন তিনি সকল মানুষ ও সকল জাতিকে একচোখে দেখেন, সকলের সমান কল্যাণকামী হন এবং হিতকামনায় কিছুতেই এক জাতিকে অন্য জাতির ওপর প্রাধান্য দেন না।

সারা দুনিয়ার মানুষের নেতা হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত এই যে, তাঁর দেয়া আদর্শ ও মূল নীতিসমূহ যেন সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে পথপ্রদর্শক হয় এবং তাতে মানব জীবনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান নিহিত থাকে। নেতা শব্দের মানেই হল দিশারী বা পথপ্রদর্শক। নেতার প্রয়োজন এ জন্যেই হয় যে, কোন পথে চললে কল্যাণ ও মঙ্গল হবে তা তিনি দেখাবেন। কাজেই যিনি সারা বিশ্বের মানুষকে তাদের সবার কল্যাণের পথ বলে দিতে পারেন তিনিই বিশ্বনেতা।

বিশ্বনেতা হওয়ার তৃতীয় অপরিহার্য শর্ত হল, তার পথনির্দেশনা যেন কোনো বিশেষ সময় বা কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ না হয়, বরং সকল অবস্থায় ও সকল যুগে তার উপযোগিতা ও স্বার্থকতা একই রকম থাকে, একই রকম নির্ভুল ও সঠিক সাব্যস্ত হয় এবং একই রকম অনুকরণযোগ্য হয়। যে নেতার নেতৃত্ব এক সময়ে উপযোগী ও অন্য সময় অনুপযোগী হয় –এক সময় চালু এবং অন্য সময়ে অচল হয়ে যায়, তাঁকে বিশ্বনেতা বলা যায় না। বিশ্বনেতা শুধুমাত্র তিনিই হতে পারেন যাঁর নেতৃত্ব ততদিন কার্যকর থাকবে বিশ্বজগত যতদিন টিকে থাকবে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে জরুরী শর্ত এই যে, তিনি যেন শুধু আদর্শ দিয়েই ক্ষান্ত না থাকেন বরং নিজের দেয়া আদর্শকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করে দেখিয়ে দেন এবং তার ভিত্তিতে একটা প্রাণবন্ত ও জাগ্রত সমাজ গঠন করেন। কেবল আদর্শ দিয়েই যিনি কর্তব্য সমাধা করেন তিনি বড়জোর একজন চিন্তাবিদ হতে পারেন; নেতা হতে পারেন না। নেতা হতে হলে আদর্শকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দেয়া অপরিহার্য।

এবার দেখা যাক, যে ব্যক্তিকে আমরা বিশ্বনেতা বলে থাকি, এ চারটি শর্ত তাঁর মধ্যে কতদূর পূর্ণ রয়েছেঃ

প্রথমে পয়লা শর্ত নিয়ে ভেবে দেখুন। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনী পড়ে দেখরে এক নজরেই বুঝতে পারা যায় যে, এ কোনো জাতীয়তাবাদী বা দেশপ্রেমিকের জীবনী নয় –বরং একজন মানবপ্রেমিক ও একটা বিশ্বজনীন মতবাদের প্রবক্তার জীবনী। তাঁর দৃষ্টিতে সকল মানুষ চিল সমান। কোনো বিশেষ বংশ, শ্রেণী, জাতি, বর্ণ অথবা দেশের বিশেষ স্বার্থ নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতেন না। ধনী-গরীব, বড়লোক-ছোটলোক, সাদা-কালো, আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, আর্য-অনার্য এসবের কোনো ভেদাভেদ তিনি মানতেন না। এসবকে তিনি একই মানব জাতির সদস্য মনে করতেন। তাঁর মুখ থেকে সারাজীবনেও এমন একটা শব্দ বা বাক্যও কেউ শোনেনি আর জীবনে তিনি এমন একটা কাজও কখনো করেননি যার দ্বারা সন্দেহ হতে পারে যে সমগ্র মানবজাতির পরিবর্তে একটা বিশেষ মানব শ্রেণীর স্বার্থের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এ কারণেই তাঁর জীবিতকালেই আরবদের মত হাবশী, ইরানী, রোমক, মিসরীয় এবং ইসরাঈলীরাও তার সহযোগী ও সহকর্মী হয়। আর তাঁর ইন্তিকালের পর পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে প্রত্যেক বর্ণ ও সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে তাদের স্বজাতির মতই নিজেদের নেতারূপে গ্রহণ করেছে। তাঁর সেই নির্বেজাল মানবতাবাদের কল্যাণেই আজ  একজন সুদূর ভারতবাসীর-[এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ভাষণ যখন প্রচারিত হয় তখন ভারত বিভক্ত হয়নি।–(সংকলকবৃন্দ)] মুখেও লোকে সহস্রাধিক বছর পূর্বে আরবে জন্মগ্রহণকারী সেই মানুষটির প্রশংসা শুনতে পায়।

এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত দু’টো একত্রে বিচার করা যাক। হযরত মুহাম্মদ (সা) বিশেষ জাতি ও বিশেষ দেশসমূহের সাময়িক ও আঞ্চলিক সমস্যাবলী নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করেননি। তার পরিবর্তে তিনি দুনিয়ার মানবজাতির যেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা, তার সমাধানে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। কেননা সেই বড় সমস্যাটার সমাধান হলেই সকল মানুষের যাবতীয় খুঁটিনাটি সমস্যার আপনাআপনিই সবাধান হয়ে যায়। সেই বড় সমস্যাটা হলো এইঃ

“বিশ্বজগতের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা প্রকৃতপক্ষে যে নীতি অনুসারে চলছে, মানুষের জীবনের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাও ঠিক সেই নীতি অনুসারেই চলা উচিত। কেননা মানুষ বিশ্বজগতেরই একটা অংশ যদি সমষ্টির বিরুদ্ধে চলে তাহলে বিপর্যয় ও বিশৃংখলা অনিবার্য হয়ে পড়ে”।

এ কথাটা ভাল করে বুঝবার সহজ পন্থা হচ্চে, নিজের দৃষ্টিকে একটু প্রসারিত করে স্থান ও কালের গণ্ডীর বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। গোটা পৃথিবীটার ওপর ব্যাপকভাবে নজর দিয়ে কল্পনা করতে হবে, সৃষ্টির আদিকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে অনন্তকাল পর্যন্ত দুনিয়ায় বসবাসকারী সকল মানুস যেন চোখের সামনে রয়েছে। তারপর ভাবতে হবে, মানুষের জীবনে যত আপদ-বালাই ও বিপর্যয় আসে, বা আসতে পারে, তার মূল কারণ কি এবং কি হতে পারে। এ প্রশ্ন নিয়ে যতই চিন্তা করা যাবে এবং যত বিচার-বিশ্লেষণ ও গবেসণা করা যাবে, তার একটা উত্তরই পাওয়া যাবে।

সে উত্তর হলঃ

“স্রষ্টার বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ ও অবাধ্যতাই সমস্ত বিপদ-আপদ ও বিপর্যয়-বিশৃংখলার মূল কারণ”।

কেননা স্রষ্টার অবাধ্য হওয়ার পর মানুষের সামনে দু’টো পথ খোলা থাকে। এ দু’টোর কোনো না কোনো একটা সে গ্রহণ না করে পারে না। হয় সে নিজেকে স্বেচ্ছাচার ও দায়িত্বহীন ভেবে যা খুশী তাই করে এবং এ কারণে সে হয়ে যায় যালেম। অথবা সে স্রষ্টা বাদে অন্যান্য শক্তির আনুগত্য করে এবং এতে করে দুনিয়াতে অসংখ্য রকমের বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার উদ্ভব ঘটে। উভয় অবস্থাতেই এমন খারাপ পরিণতি দেখা দেয় কেন? এর সরল ও সুস্পষ্ট জবাব এই যে, এ করম করা যেহেতু বাস্তবতার পরিপন্থী, তাই অনিবার্যভাবেই এর খারাপ পরিণতি দেখা দেয়। এ বিশ্বজগত বাস্তাবিকপক্ষে খোদারই সাম্রাজ্য। পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, বাতাস, পানি, আলো –এসব কিছুরই মালিক তিনি। মানুষ তাঁর এ সাম্রাজ্যে জন্মগত প্রজা ও দাস (Born Subject)। এ গোটা সাম্রাজ্য যে নিয়েমে চলছে, তারই একটা অংশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ যদি সেই নিয়মের বিরুদ্ধে চলে তাহলে তার এ আচরণের ধ্বংসাত্মক পরিণতি দেখা দেয়া অবশ্যম্ভাবী। সে যদি মনে করে যে, তার ওপর কোনো কর্তৃত্বাশীল সত্তা নেই এবং কারও কাছে সে দায়ীও নয়, তবে তার এ ধারণা হবে প্রকৃত অবস্থার পরিপন্থী। তাই সে যখস স্বেচ্ছাচারী হয়ে দায়িত্বহীনভাবে কাজ করে এবং নিজের জীবন কোন নিয়মে চারাবে তা সে নিজেই ঠিক করে, তখন অনিবার্যভাবে তার ফল খারাপ হয়ে দেখা দেয়। ঠিক একইভাবে স্রষ্টা ছাড়া অন্য কাউকে ক্ষমতাশালী ও কর্তৃত্বশীল মেনে নেয়া, তাকে বয় করা বা তার কাছ থেকে কিছু লাভ করার লালসা পোষণ করা এবং তার প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের সামনে মাথা নত করাও প্রকৃত সত্যের পরিপন্থী। কেননা আসলেই স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ এ মর্যাদার অধিকারী নয়। তাই এর ফলাফলও বিষময় ও পৃতিবী জুড়ে যে সত্যিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তার সামনে মানুষকে মাতা নত করতে হবে, নিজের আমিত্ব ও স্বকীয়তা তার সামনে বিসর্জন দিতে হবে। আনুগত্য ও দাসত্বকে শুধুমাত্র তার জন্যে নির্দিষ্ট করতে হবে এবং নিজের জীবনের নীতি ও বিধান নিজে নিজেই রচনা করা বা অন্যের দ্বারা রচিত করার পরিবর্তে সেই কর্তৃত্বের মারিকের কাছ থেকেই নিতে হবে।

মানব জীবনের জন্যে মুহাম্মদ (সা) এ মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবই পেশ করেন। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বন্ধন থেকে এ মুক্ত পৃথিবীতে যেখানে মানুষের বসতি রয়েছে। এ একটা মাত্র সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা তাদের জীবনের সমস্ত বিকল ও বিশৃঙ্খল তৎপরতা শুধরে দিতে পারে। এ প্রস্তাবনা অতীত ও ভবিষ্যতের বন্ধন থেকেও মুক্ত। দেড় হাজার বছর আগে এটা যতখানি বিশুদ্ধ ও কার্যকর ছিল ততখানি আজও আছে এবং দশ হাজার বছর পরেও থাকবে।

এখন রইল সর্বশেষ শর্তটি। এ এক ঐতিহাসিক সত্য যে, মুহাম্মদ (সা) শুধু একটা কাল্পনিক আদর্শের রূপরেখা পেশ করেই ক্ষান্ত হননি বরং সেই রূপরেখার ভিত্তিতে একটা জীবন্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে লাখ লাখ মানুষকে খোদার কর্তৃত্বের অনুগত ও বাধ্য হতে উদ্ধুদ্ধ করেছেন। তাদেরকে আপন প্রবৃত্তির দাসত্ব এবং খোদা ছাড়া অন্যান্য সত্তার আনুগত্য থেকে মুক্ত করেছেন। অতপর তাদেরকে সংঘবদ্ধ করে খোদার একক আনুগত্য ও দাসত্বের ভিত্তিতে একটা নতুন নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পত্তন করেছেন। এভাবে সারা দুনিয়ার মানুষকে তিনি বাস্তব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেয়া নীতি ও কর্মসূচী অনুসারে কি ধরনের জীবনধারার তুলনায় কত ভাল, কত পবিত্র ও কত ন্যায়নিষ্ঠ।

এ হল নবী মুহাম্মদ (সা)-এর সুমহান অবদান। এ অবদান রেখে গেছেন বলেই তাঁকে আমরা বিশ্বনেতা বা সারা দুনিয়ার সরদার বলে মানি। তাঁর এ অবদান কোনো বিশেষ জাতির জন্যে ছিল না, ছিল সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার। এতে কারও অধিকার কারও চেয়ে কম বা বেশী নয়। এ উত্তরাধিকার থেকে যে কেউ লাভবান হতে পারে। এর বিরুদ্ধে কারও বিদ্বেষ পোষণের কি কারণ থাকতে পারে তা আমি বুঝি না।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.