সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ৫ – খতবে নবুয়াত

খতবে নবুয়াতের তাৎপর্য ও তার যুক্তি

 

খতবে নবুযাতের নির্ভুল ব্যাখ্যা

যতদিন পর্যন্ত মানুষের সভ্যতা-সংস্কৃতি এমন এক সীমায় উপনীত হয়নি, যাতে করে কোনো নবীর বাণী ব্যাপকভাবে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এমন কোনো মানবগোষ্ঠীর উদ্বব হয়নি যারা নবীর বাণী, তাঁর শিক্ষা ও চারিত্রিক আদর্শ সংরক্ষিত করে তাকে বিশ্বের সকল এলাকায় ছড়িয়ে দিতে পারে, ততদিন পর্যন্ত নবুয়াতের ধারাবাহিকতা জারী থাকে। বিভিন্ন দেশে ও জাতির মধ্যে নবী প্রেরিত হতে থাকেন। কিন্তু যখন একদিকে মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়, যার ফলে একজন নবীর বাণী দুনিয়া জোড়া রূপ নিতে সক্ষম হয় এবং অন্যদিকে সত্য-নির্দেশ গ্রহণকারী এমন একটি মানবগোষ্ঠী সংগঠিত হয় যে, আল্লাহর কিতাব এবং কিতাব বহনকারী নবীর জীবন ও তাঁর পূর্ণাঙ্গ কার্যকর নেতৃত্বকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত করার যোগ্যতা অর্জন করে, তখন নবুয়াতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে আর কোনো নবী প্রেরণের প্রয়োজন-[যারা খতবে নবুয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মানবিক জ্ঞানের জন্যে এর প্রয়োজন নেই বলে দাবী করে, তারা আসলে নবুয়াতের ধারাবাহিকতার অবমাননা ও তার ওপর আক্রমণ চালায়। এ ব্যাখ্যার অর্থ দাঁড়ায়ঃ জ্ঞানের একটি বিশেষ অবস্থা পর্যন্তই নবীর এ হেদায়াতের প্রয়োজন হয়, এরপর মানুষ নবীর নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী থাকে না।-লেখক] থাকেনি।

রসূলে করীম (সা)-এর পূর্বের যুগের বিশেষ অবস্থা

প্রথমদিকে প্রত্যেক জাতির মধ্যে আলাদা আলাদা নবী আসতেন। তাদের শিক্ষা তাদের জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এর কারণ সে সময় দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি পরস্পর থেকে আলাদা ছিল। তাদের মধ্যে বেশী মেলামেশা ছিল না। প্রত্যেক জাতি যেন তার নিজের স্বদেশের সীমার মধ্যে বন্দী ছিল। এ অবস্থায় কোনো সাধারণ শিক্ষা সকল জাতির মধ্যে বিস্তার লাভ করা কঠিন ছিল। এছাড়া বিভিন্ন জাতির অবস্থাও সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। অজ্ঞতা ছিল অনেক বেশী। এ অজ্ঞতার কারণে আকীদা-বিশ্বাস ও চরিত্রের মধ্যে যেসব ত্রুটি জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন স্থানে তার আকৃতি ছিল বিভিন্ন। এ জন্যে প্রয়োজন যেসব ক্রটি জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন স্থানে তার আকৃতি ছিল বিভিন্ন। এ জন্যে প্রয়োজন ছিল আল্লাহর নবী প্রত্যেক জাতিকে পৃথক শিক্ষা ও হেদায়াত দেবেন, ধীরে ধীরে ভুল চিন্তাগুলো নির্মূল করে চিন্তাগুলো ছড়াবেন, জাহেলী পদ্ধতি বর্জন করে ধীরে ধীরে তাদেরকে উন্নত পর্যায়ের আইন মেনে চলা শেখাবেন এবং শিশুদেরকে যেভাবে শিক্ষা দিয়ে ও পরিচর্যা করে গড়ে তোলা হয় তাদেরকেও ঠিক তেমনিভাবে গড়ে তুলবেন। আল্লাহ জানেন, এভাবে জাতিদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে কত হাজার বছর শেষ হয়ে গেছে। যা হোক উন্নতি লাভ করতে করতে একদিন সে সময়টি এসে গেল যখন মানবজাতি শৈশবাবস্থায় সীমা পেরিয়ে সাবালকত্বের বয়সে পৌঁছে গেল। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরির উন্নতির সাথে সাথে জাতিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। চীন-জাপান থেকে নিয়ে ইউরোপ-আফ্রিকার দূরবর্তী দেশগুলো পর্যন্ত নৌ-চলাচল ও স্থলপথে সফর শুরু হয়ে গেল। অধিকাংশ জাতির মধ্যে বর্ণমালার প্রচলন হল। জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারলাভ করল এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার আদান-প্রদান শুরু হল। বড় বড় দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার জন্ম হল। তারা বিরাট-বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে কয়েকটি দেশ ও জাতিকে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীন করল। এভাবে মানবজাতির পূর্বের বংশধরদের মধ্যে যে ব্যবধান, দূরত্ব ও বিচ্ছেদ ছিল তা ধীরে ধীরে কম হতে থাকল। এখন সমগ্র বিশ্বের জন্যে ইসলামের একক শিক্ষা ও একক শরীয়ান পাঠানোর মতো পরিবেশ সৃষ্টি হল। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে মানুষের অবস্থার এতটা উন্নতি সাধিত হয়েছিল যে, তারা নিজেরাই একটি সবার উপযোগী একক ধর্ম প্রত্যাশা করছিল। বৌদ্ধধর্ম যদিও কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম ছিল না এবং সেখানে মাত্র কয়েকটি নৈতিক বিধানেরই অস্তিত্ব ছিল, তবুও তা ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে একদিকে চীন-মঙ্গোলিয়া ও জাপান পর্যন্ত এবং অন্যদিকে আফগানিস্তান ও বুখারা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বৌদ্ধধর্ম প্রচারকরা এ ধর্ম প্রচার করতে করতে বহু দূরদেশে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এর কয়েকশ’ বছর পর ঈসায়ী ধর্মের আবির্ভাব হল। হযরত ঈসা (আ) ইসলামের শিক্ষা নিয়ে এলেও তাঁর তিরোধানের পর ঈসায়ী ধর্ম নামে একটি পঙ্গু ও বিকৃত ধর্ম তৈরী করে নেয়া হল। ঈসায়ীরা এ ধর্মটি ছড়িয়ে দিল ইরান থেকে নিয়ে ইউরোপের অতি দূরদেশ পর্যন্ত। এসব ঘটনা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রকাশ করছে যে, তদানীন্তন বিশ্ব স্বতঃস্ফুর্তভাবে একটি বিশ্বধর্মের প্রত্যাশা করছিল। এ জন্যে নিজেকে এতটা প্রস্তুত করে নিয়েছিল যে, তখনও পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল ধর্ম না পাওয়অ গেলেও সে অপরিপক্ক ও অসম্পূর্ণ ধর্মগুলোকেই মান জাতির মধ্যে ছড়ানো শুরু করে দিল।

দ্বীনের পূর্ণতা ও খতমে নবুয়াত

এ সময় সারা দুনিয়ায় ও সারা দুনিয়ার মানব জাতির জন্যে একজন নবী অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে আরব দেশে পাঠানো হল; তাঁকে ইসলামের পরিপূর্ণ শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ আইন দান করে সারা দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব অর্পন করা হয়।

তাই নিসন্দেহে বর্তমান যুগে মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষা ও কুরআন মজীদ ছাড়া ইসলামের সত্য-সরল পথ জানার দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। মুহাম্মদ (সা) সমগ্র মানবজাতির জন্যে আল্লাহর নবী। নবীর সিলসিলা বা ধারাবাহিকতা তাঁর ওপর খতম করে দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের জন্যে যে পরিমাণ নির্দেশ ও বিধান দান করতে চাচ্ছিলেন তা সব তাঁর এ শেষ নবীর মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন আল্লাহর এ শেষ নবীর ওপর ঈমান আনা সত্যসন্ধানী ও আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে ইচ্ছুক প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্যে অপরিহার্য। তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তা মেনে চলা এবং যে পদ্ধতি শিখিয়েছেন তা অনুসরণ করা তাদের অপরিহার্য কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

খতমে নবুয়াতের প্রমাণ

নবুয়াতের তাৎপর্য অনুধাবনকারী ব্যক্তির জন্যে এ কথা উপলব্ধি করা মোটেই কঠিন নয় যে, নবীর জন্ম প্রতিনিদন হয় না এবং প্রত্যেক জাতির মধ্যে সমসময় একজন নবী থাকা অপরিহার্য নয়। নবীর শিক্ষা ও হেদায়াতের জীবনই হচ্ছে নবীর জীবন। যতদিন তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত বেঁচে থাকেন। আগের নবীদের যুগ শেষ হয়ে গেছে। কারণ তাঁরা যে শিক্ষা দিয়েছিলেন লোকেরা তা বিকৃত করে ফেলেছে। যেসব গ্রন্থ তাঁর এনেছিল সেগুলোর একটিও আজ তাদের আসল অবস্থায় নেই। তাঁদের অনুসারীরাও আজ এ দাবী করতে পারবে না যে, তাদের নবী যে গ্রন্থ এনেছিলেন তা আসল ও অবিকৃত অবস্থায় তাদের নিকট আছে। তারা নিজেদের নবীদের জীবন চরিতও বিস্মৃত হয়েছে। আগের নবীদের কোনো একজনেরও জীবনের নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ঘটনাবলী আজ কোথাও পাওয়া যায় না। এমনকি তাঁরা কোন যুগে কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কি কাজ করেছিলেন তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাঁরা কোথায় জীবনযাপন করেছিলেন এবং কি কাজ করেছিলেন তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাঁরা কোথায় জীবনযাপন করেছিলেন, কি শিক্ষা দিয়েছিলেণ এবং কোন সব কথা ও কাজ থেকে মানুষকে বিরত রেখেছিলেন এ কথাও নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতের যুগ এখনও চলছে। কারণ তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত জীবিত রয়েছে। তিনি যে কুরআন দিয়েছিলেণ তা তার আসল শব্দাবলীসহ অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান আছে। তার মধ্যে কোথাও একটি হরফের হেরফের হয়নি। একটি নোকতা বা জের-জবরের ওলট-পালট হয়নি। তাঁর জীবনের ঘটনাবলী, তাঁর কথা ও কর্ম সবকিছু যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। চৌদ্দশ’ বছর অতীত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ইতিহাসে আজো এসবের চেহারা এতই সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল যেন আমরা স্বচক্ষে হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে দেখছি। দুনিয়ায় কোনো ব্যক্তির জীবন রসূল করীম (সা)-এর ন্যায় এতবেশী সংরক্ষিত নয়। আমরা আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ব্যাপারে সবসময় রসূলে করীম (সা)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারি। রসূলে করীম (সা)-এর পর অন্য কোনো নবীর প্রয়োজন না থাকার এটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

একজন নবীর পর আর একজন নবী আসার কেবল তিনটি মাত্র কারন হতে পারে।

এক. প্রথম নবীর শিক্ষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তাকে পুনর্বার পেশ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

দুই. প্রথম নবীর শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ নয় এবং তার মধ্যে সংশোধন ও পরিবর্ধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

তিন. প্রথম নবীর শিক্ষা একটি বিশেষ জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং অন্য জাতিদের জন্যে আর একজন পৃথম নবীর প্রয়োজন।–[চতুর্থ কারণ হিসেবে আর একটি কারণও দেখানো যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, এক নবীর উপস্তিতিতে তাঁর সাহায্যের জন্যে আর একজন নবীও পাঠানো যায়। কিন্তু আমি এ কারণটির উল্লেখ করিনি। কারণ কুরআন মজীদে এরমাত্র দু’টি দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। ঐ দু’টি ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত থেকে সাহায্যকারী নবী পাঠাবার কোনো সাধারণ নিয়ম আল্লহার নিকটে আছে বলে সিদ্ধান্ত করা যায় না।–গ্রন্থকার]

একঃ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষা ও হেদায়াত জীবিত আছে। তাঁর দ্বীন কি ছিল, তিনি কি হেদায়াত নিয়ে এসেছিলেন, কোন্ ধরনের জীবন পদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন এবং কোন পদ্ধতিগুলো তিন খতম করার ও বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, যে কোন সময় তা জানা যেতে পারে। এ বিষয়গুলো জানার উপায় পুরোপুরি সংরক্ষিত রয়েছে। কাজেই তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াতগুলো যখন তখন সেগুলোকে নতুন করে উপস্থাপিত করার জন্যে কোনো নবী আসার প্রয়োজন নেই।

দুইঃ রসূলে করীম (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়াকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের শিক্ষা দান করা হয়েছে। এখন আর তার মধ্যে কিছু কমানো বাড়ানোর প্রয়োজন নেই এবং তার মধ্যে এমন কোনো অভাব বা কমতিও নেই, যা পূরণ করার জন্যে কোনো নবী আসার প্রয়োজন হয়। কাজেই দ্বিতীয় কারণটিও দূর হয়ে গেল।

তিনঃ রসূলে করীম (সা)-কে কোনো বিশেষ জাতির জন্যে নয় বরং সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্যে তাঁর শিক্ষা যথেষ্ট। ফলে তৃতীয় কারণটিও দূর হয়ে গেল।

এ জন্যেই রসূলে করীম (সা)-কে খাতামুন নাবীয়ীন বা শেষ নবী বলা হয়েছে। অর্থাৎ নবুয়াতের ধারাবাহিকতা তিনি পর্যন্ত এসে শেষ হয়ে গেছে। এখন দুনিয়ার জন্যে আর কোনো নবীর প্রয়োজন নেই বরং এর পরিবর্তে এমন সব লোকের প্রয়োজন যারা রসূলে করীম (সা)-এর পথে নিজেরা চলবেন ও অন্যদেরকেও চালাবেন, তাঁর শিক্ষা অনুধাবন করবেন, তার ওপর আমর করবেন এবং যে আইন নিয়ে তিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন সারা দুনিয়ায় তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত করবেন।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে হেদায়াতের উপায়

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী, আমি সমগ্র মানব জাতির জন্যে তোমাকে সুসংবাদকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে পাঠিয়েছি কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না”।–(সূরা আস সাবাঃ ২৮)

এর অর্থ হলো,  তুমি কেবল এ শহর, এ দেশ বা এ যুগের লোকদের জন্যে নও, বরং কিয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ার মানুষ ও জাতির জন্যে প্রেরিত হয়েছ কিন্তু তোমার সমকালীন দেশবাসীরা তোমার মর্যাদা ও কদর বুঝে না। তাদের কাছে যে কত বড় মহান মহিমান্বিত ব্যক্তিকে পাঠান হয়েছে এ অনুভূতি তাদের নেই। নবী করীম (সা)-কে কেবল নিজের দেশ ও নিজের যুগের জন্যে পাঠান হয়নি বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্যে তাঁকে পাঠান হয়েছে এ কথা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আর আমার প্রতি এ কুরআন অহী হিসে পাঠান হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটি পৌঁছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী বলে দাওঃ হে লোকেরা, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রসূল”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আর আমি তোমকে কেবলমাত্র সমগ্র বিশ্বের রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“তিনি মহান বরকতপূর্ণ যিনি নিজের বান্দার ওপর কুরআন নাযিল করেছেন, যাতে তিনি হতে পারেন সমগ্র বিশ্বের জন্যে সতর্ককারী”।–(সূরা আল ফুরকানঃ১)।

রসূলে করীম (সা) নিজেও এ একই বক্তব্য বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আমাকে সাদা-কালো নির্বিশেসে সকলের জন্যে পাঠানো হয়েছে”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আমাকে সাধারণভাবে সমগ্র মানব জাতির জন্যে পাঠান হয়েছে। অথচ আমার আগে প্রত্যেক নবীকে কেবল তাঁর নিজের জাতির জন্যেই পাঠান হয়েছিল”।–(আবদুল্লাহ ইবনে উমর বর্ণিত, মুসনাদে আহমদ থেকে)।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“প্রথমে প্রত্যেক নবীকে বিশেষ জাতির কাছে পাঠানো হত আর আমাকে পাঠান হয়েছে সমগ্র মানব জাতির কাছে”।–(বুখারী ও মুসলিম থেকে, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত)।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আমাকে নবী করে পাঠানো সাথে কিয়ামতের সম্পর্ক ঠিক এমনি –একথা বলে রসূলুল্লাহ (সা) নিজের হাতের দু’টো আঙ্গুল উঠালেন”।–(বুখারী ও মুসলিম)।

এ কথার অর্থ হচ্ছে, যেমন এ দু’টো আঙ্গুলের তৃতীয় কোনো আঙ্গুলের অন্তরাল নেই, তেমনি আমার ও কিয়ামতের দশ্যে নবুয়াতের কোনো অন্তরাল নেই। আমার পরেই কিয়ামত আসছে। কিয়ামত পর্যন্ত আমিই নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকব।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদদানকারী ও ভীতিপ্রদর্শনকারী

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“তোমাকে তো আমি হকের সাথে পাঠিয়েছি সুসংবাদদানকারী ও ভীতি প্রদর্শনাকরীরূপে। আর এমন কোনো জাতি নেই যার মধ্যে কোনো সতর্ককারী পাঠান হয়নি”।–(সূরা ফাতেরঃ ২৪)।

প্রথম আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, হে নবী! মানুষকে সতর্ক করে দেয়া ছাড়া তোমার আর কোনো কাজ নেই। এরপরও যদি কারও টনক না নড়ে এবং সে গোমরাহীর অতলে ডুবতে থাকে তাহলে তোমার ওপর তার কোনো দায়িত্ব নেই। অন্ধদেরকে দেখাবার এবং বধিরদেরকে শোনাবার দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয়নি।

দ্বিতীয় আয়াতে যে কথা বলা হয়েছে তা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। তার মূল বক্তব্য হচ্ছে, দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে এমন কোনো জাতির অভ্যুদ্বয় হয়নি যার হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ তায়ালা কোনো নবী পাঠাননি। সূরা আর রা’আদের ৭ম আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী******) সূরা আল হিজরের ১০ম আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী***********)। সূরা আল নাহলের ৩৬ আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী*****)। সূরা আশ শূ’আরার ২০৮ আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী*******) কিন্তু এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার জন্যে দু’টি কথা অবশ্যি বুঝে নিতে হবে। এক, একজন নবীর দাওয়াত যে এলাকা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে সে এলকার লোকদের জন্যে তিনিই যথেষ্ট। কাজেই প্রত্যেক জনবসতি ও প্রত্যেক গোত্রের জন্যে যে পৃথক পৃথক নভী পাঠাতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দুই, একজন নবীর দাওয়াত ও হেদায়াতের নিদর্শন এবং তাঁর নেতৃত্বের পদাংক যতদিন দুনিয়ায় সংরক্ষিত থাকবে ততদিন কোনো নতুন নবীর প্রয়োজন হয় না। জাতির প্রত্যেক পুরুষের জন্যে পৃথক করে নবী পাঠাবারও প্রয়োজন নেই।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে আল্লাহর রহমত

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে এটা আসলে পৃথিবীবাসীদের জন্যে আমার রহমত”।–(সূরা আল  আম্বিয়াঃ ১০৭)

এ আয়াতটির আর একটি অনুবাদ এও হতে পারেঃ “আমি তোমাকে পৃথিবীবাসীদের জন্যে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি। উভয় অবস্থায়ই এর প্রকৃত অর্থ হচ্চে, রসূলে করীম (সা)-এর আগমন প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির জন্যে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ। কারণ তিনি এসে সুপ্ত দুনিয়াকে জাগ্রত করেন। তাকে হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করার জ্ঞানদান করেন। সর্বোপরি তাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জাতিয়ে দেন, কোনটি ধ্বংসের পথ এবং কোনটি শান্তি ও নিরাপত্তার পথ। মক্কার কাফেররা রসূলে করীম (সা)-এর নবুয়াতকে নিজেদের জন্যে বিপদ ও কষ্টের কারণ মনে করত। তারা বলত, এ ব্যক্তি আমাদের জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, নখ থেকে গোশত ছাড়িয়ে আলাদা করে দিয়েছে। এর জবাবে বলা হয়ঃ হে নির্বোধের দল, তোমরা যাকে বিপদ মনে করছ সে আসলে তোমাদের জন্যে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে রসূল

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ বলে দাও। হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার জন্যে সেই আল্লাহর রসূল হিসেবে এসেছি যিনি পৃথিবী ও আকাশেল শাসন কর্তৃত্বের মালিক”।–(সূরা আল আরাফঃ ১৫৮)। “প্রত্যেক উম্মতের জন্যে একজন রসূল আছেন”।–(সূরা আল ইউনুসঃ ৪৭)।

‘উম্মত’ শব্দটি এখানে শুধুমাত্র জাতির প্রতিশব্দ হিসেবে আনা হয়নি বরং একজন রসূলের আগমনের পর তাঁর দাওয়াত যতগুলো লোকের কাছে পৌঁছে যায় তারা সবাই তাঁর উম্মত, এ অর্তে শব্দটি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। তাছাড়া এ জন্যে রসূলের জীবিত থাকা এবং তাদের মধ্যে সশরীরে অবস্থান করার কোনো প্রয়োজন নেই বরং রসূলের তিরোধানের পরেও যতদিন তাঁর শিক্ষা জীবিত থাকে এবং যতদিন প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে –তিনি আসলে কোন বিষয়ের শিক্ষা দেন তা জানার পথ খোলা থাকে, ততদিন দুনিয়ার সমস্ত অধিবাসী তাঁর উম্মত গণ্য হবে। সামনের আলোচনায় যে বিধানের কথা বলা হয়েছে তা তাদের ওপর কার্যকর হবে। এ প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ (সা)-এর আগমনের পর সারা দুনিয়ার মানুষ তাঁর উম্মত এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তারা তাঁর উম্মত থাকবে যতক্ষণ কুরআন নির্ভুল ও অবিকৃত অবস্থায় বিরাজ করবে। তাই আয়াতে বলা হয়নি “প্রত্যেক জাতির জন্যে একজন রসূল আছেন” বরং বলা হয়েছে “প্রত্যেক উম্মতের জন্যে একজন রসূল আছেন”।

আল্লাহ প্রত্যেক জনবসতিতে একজন নবী পাঠাবার পরিবর্তে সারা দুনিয়ার জন্যে হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন।

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“আমি চাইলে প্রত্যেক জনবসতিতে এক একজন ভীতি-প্রদর্শনকারী পাঠিয়ে দিতাম”।–(সূরা আল ফুরকানঃ ৫১)

অর্থাৎ এ কাজটা আমার ক্ষমতার বাইরে ছিল। আমি চাইলে সব জায়গায় নবীর আবির্ভাব ঘটাতে পারতাম। কিন্তু তা না করে আমি সারা দুনিয়ার জন্যে একজন নবী পাঠিয়েছি। একটি সূর্য যেমন সারা দুনিয়ার জন্যে যথেষ্ট তেমনি এই একটি মাত্র হেদায়াতের সূর্য সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে যথেষ্ট।

কুরআন মজীদে রসূলে করীম (সা)-কে ‘সতর্ককারী’, ‘জ্ঞাতকারী’ এবং ‘গাফলতি’ ও গোমরাহীর অনিষ্ঠকর পরিণতির ভীতিপ্রদর্শনকারী’ উপাদি দেয়া হয়েছে। এই সঙ্গে তাঁকে সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে ভীতিপ্রদর্শনকারী’ উপাধি দেয়া হয়েছে। এই সঙ্গে তাকেঁ সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, কুরআনের দাওয়াত ও মুহাম্মদ (সা)-এর রিসালাত কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্যে নয় বরং সারা দুনিয়ার জন্যে। কেবলমাত্র নিজের যুগের জন্যে নয় বরং আগত সমস্ত যুগের জন্যে। এ বিষয়বস্তুটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে।

যেমনঃ

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“হে মানবজাতি, আমি তেমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রসূল হয়ে এসেছি”।

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“আমার নিকট এ কুরআন পাঠানো হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি আর যাদের কাছে এটি পৌঁছেছে তাদেরকে”। -(সূরা আল আন’আমঃ ১৯)

“আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদদানকারী ও ভীতিপ্রদর্শনকারী করে পাঠিয়েছি”।–(সূরা আস সাবাঃ ২৮)

হাদীসে এ বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ট করে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বারবার বলেছেনঃ (আরবী***********) “আমাকে সাদা-কালো নির্বিশেষে সবার কাছে পাঠান হয়েছে”। তিনি আরো বলেছেনঃ (আরবী**************)

 “ইতিপূর্বে একজন নবীকে বিশেষ করে তাঁর জাতির জন্যে পাঠান হত আর আমাকে পাঠান হয়েছে সাধারণভাবে সমগ্র মানবজাতির জন্যে”।–(বোখারী ও মুসলিম)।

আরও বলেছেনঃ (আরবী**********) “সমগ্র সৃষ্টির জন্যে আমাকে পাঠান হয়েছে আর আমার আগমনের সাথে সাথে নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে”।

আল্লাহর শেষ নবী

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“মানুষের হিসেবের সময় সন্নিকটবর্তী অথচ তারা মুখ ফিরিয়ে গাফলতির মধ্যে রয়েছে”।–(সূরা আম্বিয়াঃ ১)

এর অর্থ হচ্ছে, কিয়ামত নিকটবর্তী। অর্থাৎ যেদিন মানুস তার প্রভু ও প্রতিপালকের কাছে হাজির হয়ে নিজের যাবতীয় কাজের হিসেব পেশ করবে সে দিনটি দূরে নয়। মানবজাতি যে তার ইতিহাসের সর্বশেষ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াত লাভ তারই একটি আলামত। এখন তারা নিজেদের সূচাপর্বের তুলনায় সমাপ্তি পর্বের অধিক নিকটবর্তী। সূচনাকাল ও মধ্যমকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন সমাপ্তিকাল শুরু হয়েছে। এ কথাটিই রসূলে করীম (সা) একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজের দু’টি আঙ্গুল উঠিয়ে বলেনঃ (আরবী************) “আমাকে এমন অবস্থায় পাঠানো হয়েছে যে আমার হাতের এ আঙ্গুল দু’টো পাশাপাশি যে অবস্থায় আছে আমি ও কিয়ামত ঠিক সে অবস্থায় আছি”। অর্থাৎ আমার পর এখন শুধু কিয়ামতের অপেক্ষা। এর মাঝখানে আর কোনো নবী নেই। সৎপথ লাভ করতে চাইলে আমার দাওয়াতের মাধ্যমেই সৎপথ লাভ কর এরপর সৎপর দেখাবার জন্যে আর কোনো পথপ্রদর্শক ও ভীতি প্রদর্শনকারী আসবে না।

খতবে নবুয়াত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“স্মরণ কর, আল্লহ যখন পয়গাম্বরদের থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেনঃ আজ আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি। কাল যদি অন্য কোন রসূল তেমাদের নিকট পূর্ব থেকে রক্ষিত ঐ শিক্ষার সত্যতা ঘোষণা করে তোমাদের কাছে আসে, তাহলে তার ওপর তোমাদের ঈমান আনতে হবে এবং তাকে সাহায্য করতে হবে। এ কথা বলে আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি এর অঙ্গীকার কর এবং এ ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে অঙ্গীকারের গুরুদায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত আছ? তারা জবাবে বললঃ হ্যাঁ, আমরা অঙ্গীকার করছি”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৮১)

এর অর্থ হচ্ছে, প্রত্যেক পয়গাম্বরকে এ অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয়। আর পয়গাম্বরকে যে অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয় তার দায়িত্ব অনিবার্যভাবে তাঁর অনুসারীদের ওপরও বর্তায়। তাদেরকে যে অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয় তা হচ্ছেঃ তোমাদেরকে যে দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারই প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নবী পাঠান হয় তখন তার সাথে তোমাদের সহযোগিতা করতে হবে। তার প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করতে পারবে না। নিজেদেরকে দ্বীনের ইজারাদার মনে করতে পারবে না। সত্যের বিরোধিতা করতে পারবে না। বরং যেখানে যে ব্যক্তিকে আমার পক্ষ থেকে সত্যের পতাকা উত্তোলন করার জন্যে পাঠান হবে তাঁর পতাকাতলে তোমাদেরকে সমবেত হতে হবে।

এখানে অবশ্যি এতটুকু কথা বুঝে নিতে হবে যে, মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে প্রত্যেক নবীকে এ অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয়। এ জন্যেই প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতকে পরবর্তীকালে আগমনকার নবীর খবর দেন এবং তাঁর সাথে সহযোহিতা করার নির্দেশ দিয়ে যান। কিন্তু কুরআন-হাদীসের কোথাও এমন কোনো ইশারাও পাওয়া যায় না যে, হযরত মুহাম্মদ (সা) থেকে এ ধরনের কোনো অঙ্গীকার নেয়া হয় অথবা তিনি উম্মতকে তাঁর পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীর খবর দিয়ে তাদেরকে তাঁর অনুসরন করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন।–[নবুয়াতের ব্যাপারটি বড়ই নাজুক, এ কথা ব্যাখ্যা করার অপেক্ষা রাখে না। নবীকে মানা ও না মানার ওপর মানুষের ঈমান ও কুফরী এবং নাজাত অথবা ধ্বংস নির্ভর করে। কিন্তু কুরআন মজীদে রসূলে করীম (সা)-এর পরে অন্য কোনো নবীর আসার খবর দেয়া তো দূরে থাক বরং রসূলে করীম (সা)-কে শেষ নবী বলা হয়েছে। আর রসূলুল্লাহ (সা) নিজের উম্মতকে ডেকে তাদেরকে পরবর্তীকালে আগমনকার কোনো নবীর ওপর ঈমান আনার নির্দেশ দেবার পরিবর্তে অসংখ্য হাদীসে এ কথা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর পরে আর নবী আসবেন না এবং নবুয়াতের ধারাবাহিকতা তাঁর থেকে শেষ হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দ্বীন ও ঈমানের সাথে কি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কোনো শতুতা ছিল? রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে কোনো নবী আসবেন অথচ আল্লাহ ও তাঁর সূল উভয়ই এমন কথা বলেছেন যার ফলে আমরা তাকে না মেনে কুফরী করছি এবং আখেরাতের আযাবে নিক্ষিপ্ত হচ্ছি? এমনটি কি কোনোক্রমে সম্ভব?-(গ্রন্থকার)]

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬১ পৃষ্ঠায়)

“হে বনী আদম! মনে রেখ, যদি তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে এমন কোন রসূল আসে যে তোমাদেরকে আমার আয়াত শুনায়, তাহলে যে ব্যক্তি নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকবে এবং নিজের সংশোধন করে নেবে তার জন্যে কোনো প্রকার আশংকা ও মর্মবেদনার কোনো প্রশ্নই থাকবে না”।–(সূরা আল আরাফঃ ৩৫)

কুরআন মজীদের যেখানেই আদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে জান্নাত থেকে নির্বাসিত করার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে সেখানেই একথা বলা হয়েছে (এ জন্যে দেখুন সূরা আল বাকারাহঃ ৩৮-৩৯ আয়াত, সূরা আত ত্বহাঃ ১২৩-২৪ আয়াত)। কাজেই এখানেও এ কথাটিকে ঐ একই প্রসঙ্গ সম্পার্কিত মনে করা হবে। অর্থাৎ মানব জীবনের সূছনালগ্নেই এ কথাটি তাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল।

খতবে নবুয়াত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি আয়াতের যুক্তি

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর (হে নবী!) মনে রেখ সেই অঙ্গীকারের কথা যা আমি সকল পয়গাম্বরের কাছ থেকেই নিয়েছি, তোমার কাছ থেকেও নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মরিয়ামের পুত্র ঈসার কাছ থেকে সবার কাছ থেকে পাকাপোক্ত অঙ্গীকার নিয়েছি”।–(সূরা আহযাবঃ ৭)

এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নবী (সা)-কে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, সকল নবীর ন্যায় আপনার কাছ থেকেও আল্লাহ একটি পাকাপোক্ত অঙ্গীকার নিয়েছেন। আপনার কঠোরবাবে এ অঙ্গীকার পালন করা উচিত। এ অঙ্গীকার বলতে কোন অঙ্গীকারটি বুঝাচ্ছে? আগে থেকৈ যে প্রসঙ্গের আলোচনা চলছে সে সম্পর্কে চিন্তা করলে স্পষ্ট জানা যায় নে, এটা এমন একটা অঙ্গীকার যার আওতায় নবী নিজে আল্লহার প্রত্যেকটি হুকুমের অনুগত হবেন এবং অন্যদেরকেও এর অনুগত করবেন। আল্লহার কথাগুরো হুবহু লোকদের কাছে পৌঁছাবেন একং কার্যত সেগুলো প্রবর্তিত করার চেষ্টার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি করবেন না। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। যেমনঃ

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্ধারিত করে দিয়েছেন সেই দ্বীনটি যার হেদায়াত তিনি করেছিলেন নূহকে এবং যা নাযিল করা হয়েছিল (হে মুহাম্মদ) তোমার ওপর আর যার হেদায়াত করা হয়েছিল ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই তাকীদ সহকারে যে, তোমরা দ্বীন কায়েম কর এবং তার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি কর না”।–(সূরা আশ শূরাঃ ১৩)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর (হে মুসলমানরা)! স্মরণ কর আল্লাহর সেই অনুগ্রহকে যা তিনি তোমাদের ওপর তাঁর কিতাব নাযিল করা হয়েছিল এই মর্মে যে, তোমরা এর শিক্ষা বর্ণনা করবে এবং একে গোপন করবে না”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৮৭)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর স্মরণ কর, যখন আমি বনী ইসরাঈলদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদাত করবে না”।–(সূরা আল বাকারাঃ ৮৩)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“তাদের কাছ থেকে কি কিতাবের অঙ্গীকার নেয়া হয়নি? তোমাদের ওপর আমি যা নাযিল করেছি তা শক্ত করে ধর আর তার মধ্যে যে হেদায়াত আছে তা স্মরণ কর। আশা করা যায় তোমরা আল্লাহর নাফরমানী থেকে বাঁচতে পারবে”।–(সূরা আল আরাফঃ ১৬৯-১৭১)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর হে মুসলমানরা, স্মরণ কর আল্লাহর সেই অনুগ্রহকে যা তিনি তোমাদের ওপর করেছেন আর সেই অঙ্গীকারকে (স্মরণ কর) যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছেন যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনেছি ও আনুগত্য করেছি”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ৭)

বিশেষ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা এ অঙ্গীকারটি যে কারনে স্মরণ করাচ্ছেন তা হচ্ছে এই যে, নবী (সা) শত্রুদের নিন্দার ভয়ে মুকে ডাকা (রক্তের নয়) সম্পর্কের ব্যাপারে জাহেলী যুগের প্রচলিত রীতি ভাঙ্গতে ইতস্তত করছিলেন। ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি মেয়ের সাথে বিয়ে সংক্রান্ত। তাই তিনি বারবার লজ্জা পাচ্ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, আমি যতই সদিচ্চা সহকারে নিছক সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে এ কাজটি করি না কেন শত্রুরা বলতেই থাকবে, আসলে নিজের ইন্দ্রিয় লালসা চরিতার্থ করার জন্যেই এ কাজ করা হয়েছে এবং এ ব্যক্তি শুধুমাত্র জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্যে সংস্কারকের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। তাই আল্লাহ রসূলুল্লাহ (সা)-কে বলছেনঃ তুমি আমার নিয়োগকৃত পয়গাম্বর। অন্য সব পয়গাম্বরদের ন্যায় তোমার সাথেও আমার পাকাপোক্ত অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমি যে নির্দেশ দেব তা তুমি নিজে পালন করবে এবং অন্যদেরকেও তা পালন করার নির্দেশ দেবে। কাজেই তুমি কারোর নিন্দা-অপবাদের পরোয়া করো না। কাউকে লজ্জা কর না। কারও ভয় কর না। তোমাকে দিয়ে আমি যে কাজ করাতে চাই নির্দ্বিধায় তা কর।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পরবর্তী নবীগণ ও তাঁদের উম্মতদের থেকে যে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল এ অঙ্গীকার থেকে একটি দল সেই অর্থ নিয়েছে। তাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, তারা পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীর ওপর ঈমান আনবেন এবং তাঁর সাথে সহযোগিতা করবেন। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ঐ দলটির দাবী হচ্ছে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পরও নবুয়াতের দরজা খোলা আছে এবং নবী করীম (সা)-এর নিকট থেকেও এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে যে, তাঁর পর যে নবী আসবে তাঁর উম্মত তাঁর ওপর ঈমান আনবে কিন্তু আয়াতের পূর্বপর বক্তব্য দ্ব্যর্থহীনভাবে এ ব্যাখ্যাটির ভ্রান্তি ঘোষণা করছে। যে কথা বর্ণনা প্রসঙ্গে এ আয়াতটি উক্ত হয়েছে তাতে এ কথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে, রসূলে করীম (সা)-এর পরেও নবী আসবেন এবং তাঁর উম্মতকে সেইসব নবীর ওপর ঈমান আনতে হবে। এ অর্থ গ্রহণ করলে আয়াতটি এখানে একেবারেই বেখাপ্পা ও সম্পর্কহীন হয়ে পড়বে। তাছাড়া আয়াতের শব্দগুলোর এমন কোনো সুস্পষ্ট অর্থ হয় না যা থেকে এখানে কোন ধরনের অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে তা বুঝা যেতে পারে। কাজেই এখানে কোন ধরনের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে তা জানার জন্যে আমাদের কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে যেকানে নবীদের কাছ থেকে গৃহীত অঙ্গকিারের উল্লেখ করা হয়েছে। যদি সমগ্র কুরআন মজীদে একটি মাত্র অঙ্গীকারের উল্লেখ থাকত এবং তা হত পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের সম্পর্কে, তাহলে এখানেও অঙ্গীকার প্রসঙ্গে ঐ অঙ্গীকারের কথাই বলা হয়েছে এ কথা সঙ্গতভাবেই চিন্তা করা যেত। কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে কুরআন অধ্যয়নকারী ব্যক্তিমাত্রই জানে, এ গ্রন্থে নবীগণ ও তাঁদের উম্মতদের কাছ থেকে গৃহীত বহু অঙ্গীকারটির অর্থগ্রহণ করা সঙ্গত হবে পূবৃাপর আলোচনার সাথে যার সম্পর্ক রয়েছে। যে অঙ্গীকারের আলোচনার কোন সুযোগই এখানেই নেই, এখানে সেটির অর্থ গ্রহণ করা কোন ক্রমেই সঙ্গত হবে না। এ ধরনের ভুল অর্থ গ্রহণ করার ফলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোনো কোনো লোক কুরআন থেকে হেদায়াত গ্রহণ করার পরিবর্তে কুরআনকেই হেদায়াত দান করার প্রচেষ্টা চালায়।

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬৪ পৃষ্ঠায়)

“অতপর তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে –যে একটি মিথ্যা কথা তৈরী করে তাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করে অথবা আল্লাহর যথার্থ আয়াতগুলোকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। অবশ্যি অপরাধীরা কখনও সাফল্য লাভ করতে পারে না”। -(সূরা ইউনুসঃ ১৭)

কোনো কোনো নির্বোধ লোক ‘সাফল্য’কে দীর্ঘায়ু, পার্থিব সমৃদ্ধি বা পার্থিব উন্নতি অর্থে গ্রহণ করেছেন। এভাবে তারা এ আয়াতটি থেকে এ অর্থ গ্রহণ করতে চান যে, যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করার পর জীবিত থাকেন অথবা দুনিয়ায় খুব উন্নতি করেন অথবা তাঁর দাওয়াত বিস্তার রাভ করে, তাঁকে সত্য নবী হিসেবে মেনে নেয়া উচিত। কারণ তিনি সাফল্য লাভ করেছেন। যদি তি সত্য নবী না হতেন তাহলে মিথ্যা নবুয়াতের দাবী করার সাথে সাথেই তাকে হত্যা করা হত অথবা অনাহারে তাকে মেরে ফেলা হত এবং তার দাওয়াত দুনিয়ায় ছড়াতে পারত না কিন্তু কুরআন থেকে এ ধরনের অজ্ঞজনোচিত যুক্তি-প্রমাণ একমাত্র সেই ব্যক্তিই উপস্থাপন করতে পারে, যে কুরআনের পারিভাষিক শব্দ ‘ফালাহ’-এর অর্থ জানে না অথবা কুরআনে বর্ণিত বিধি অনুযায়ী আল্লাহ অপরাধীদের জন্যে যে অবকাশ দান –বিধি নির্ধারণ করেছেন সে সম্পর্কে অবহিত নয় এ বর্ণনা প্রসঙ্গে এ শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা বোঝে না।

প্রথম কথা হচ্ছে, অপরাধী সাফল্য লাভ করতে পারে না। এ কথাটি আয়াতটির আলোচনা প্রসঙ্গে এমন অর্থে বলাই হয়নি যার ফলে এটি কারও নবুয়াতের দাবী যাচাই করার মানদণ্ডে পরিণত হয় এবং সাধারণ লোকেরা নিজেরাই নবুয়াতের দাবীদারদেরকে সেই মানদণ্ডে যাচার করার পর যাকে সাফল্য লাভকারী হিসেবে পেত তার দাবী মেনে নেয়ার এবং যাকে অকৃতকার্য দেখত তার দাবী অস্বীখার করার সিদ্ধান্ত নিত। বরং এ কথা এখানে যে অর্থে বলা হয়েছে তা হচ্ছে, “আমি নিশ্চিতভাবে জানি অপরাধীরা সাফল্য লাভ করতে পারে না। তাই মিথ্যা নবুয়াতের দবী করে আমি নিজেই এ অপরাধ করতে পারি না বরং তোমাদের ব্যাপারে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, তোমরা সত্য নবীকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার অপরাধ করছ, তাই তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে না”।

ফালাহ বা সাফল্য কুরআনের পার্থিব সাফল্যের সীমিত অর্থেও ব্যবহৃত হয়নি। বরং এর অর্থ হচ্ছে এমন একটি নিরবচ্ছিন্ন সাফল্য যার ফলশ্রুতিতে কোনো প্রকার ক্ষতির নামগন্ধও নেই। পার্থিব জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তার মধ্যে সাফল্যের কোনো দিক না থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। কোনো একজন সুস্পষ্ট গোমরাহীর আহবানকারী দুনিয়ায় আরামের জীবনযাপন করতে পারে, পার্থিব সমৃদ্ধি ও উন্নতির শীর্ষে আরোহন করতে পারে, তার গোমরাহীর দাওয়াত বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে এবং চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করতে পারে কিন্তু কুরআনের পরিভাষায় যাকে সাফল্য বলা হয়েছে এটা সে সাফল্য নয় রবং এটা সুস্পষ্ট ক্ষতি ও ব্যর্থতা। আবার এমনও হতে পারে, একজন সত্যের আহবায়ক দুনিয়ায় কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন, বিপদ-মুসিবত, দুঃখ-কষ্টের চাপে তিনি নিপিষ্ট হয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে পারেন। তাঁর দলে একজন লোকও যোগদান না করতে পারে কিন্তু কুরআনের ভাষায় এটা ক্ষতি ও ব্যর্থতা নয় বরং এটিই যথার্থ সাফল্য।

এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ কতা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা অপরাধীদের পাকড়াও করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেন না বরং তাদেরকে সংশোধিত হবার জন্যে যথেষ্ট সময়-সুযোগ দেন। আর এই সময়-সুযোগকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে যদি তারা আরও বেশী বিগড়ে গিয়ে থাকে তাহরে আল্লাহর পক্ষ তেকে তাদেরকে অবকাশ (মুহলত) দেয়া হয় এবং অনেক সময় তাদের ওপর অনুগ্রহ ধারা বর্ষণ করা হয়। এর ফলে তারা নিজেদের অন্তর্দেশে লুকানো সমস্ত দুষ্কৃতির পুরোপুরি প্রকাশ করে দেয় এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমন শাস্তির অধিকারী হয় যা অসৎ গুণাবলী সমন্বিত হবার কারণে যথার্থই তাদের প্রাপ্য। কাজেই কোনো মিথ্যা দাবীদারের রশি লম্বা হয়ে গেলে এবং তার হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবার প্রমান মনে করা একটি মারাত্মক ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে। আল্লাহ অবকাশ বা ঢিল দেয়া ও সুযোগ-সুবিধা দানের আইন সমস্ত অপরাধীদের ন্যায় মিথ্যা নবুয়াতের দাবীদারদের জন্যেও সমানভাবে কার্যকর। শেষোক্তদেরকে ঐ আইনের আওতা বহির্ভুত মনে করার পক্ষে কোনো যুক্তি-প্রমাণ নেই। আবার শয়তানকে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ যে সুযোগ দিয়েছেন সেখানে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, তুমি যত রকমের প্রতারণা-প্রবঞ্চনা করবে সব চলতে দেয়া হবে কিন্তু নিজের পক্স থেকে তুমি যত রকমের প্রতারনা-প্রবঞ্চনা করবে সব চলতে দেয়া হবে কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে তুমি কোনো মিথ্যা ও ভণ্ড নবী দাঁড় করালে সে প্রতারণাটি কোনোক্রমেই কার্যকর হতে দেয়া হবে না।

আমার এ কথার জবাবে সম্ভবত কোনো ব্যক্তি সূরা আল হক্কার ৪৪ থেকে ৪৭ আয়াতের উদ্ধৃতি দিতে পারে। যেখা বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ ‘যদি মুহাম্মদ আমার নামে কোনো মনগড়া কথা বলে থাকে তাহলে আমি তার হাত ধরে ফেলতাম এবং তার হৃদয়তন্ত্রী কেটে দিতাম’। কিন্তু এ আয়াতগুরোতে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে যথার্থ নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন তিনি যদি মিথ্যে কথা বানিয়ে আল্লাহর অহী হিসেবে পেশ করেন তাহলে তিনি সাথে সাতেই পাকড়াও হবেন। এ বক্তব্য থেকে যে নবুয়াতের দাবীদার পাকড়াও হচ্ছে না সে নিশ্চয়তা সত্য এ যুক্তি পেশ করা একটি নীতিগত বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহর সুযোগদান ও ঢিল দেয়ার বিধানের মধ্যে যে ব্যতিক্রম এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে তা একমাত্র সাচ্চা নবীর জন্যে। এ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, যে ব্যক্তি মিথ্যা নবুয়াতের দাবী করে সেও এ ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা সবাই জানে যে, সরকারী কর্মচারীদের জন্যে যে আইন প্রণীত হয় তা কেবল তাদের ওপরই সে আইন প্রযোজ্য হয় না বরং ফৌজদারী দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাধারণ বদমাশ ও অপরাধীদের সাথে যে ব্যবহার করা হয় তাদের সাথেও একই ব্যবহার করা হবে। তাছাড়া সূরা আল হাক্কার এ আয়াতগুলোতে যা কিছু বলা হয়েছে তাও লোকরেদকে নবী যাচাই করার মানদণ্ড জানাবার জন্যে বলা হয়নি। অর্থাৎ গায়েবের পর্দা ভেদ করে যদি কোনো হাত বের হয়ে আসে এবং অকস্মাৎ তার হৃদয়তন্ত্রী ছিন্ন করে তাহলে মনে করতে হবে সে মিথ্যা ও ভণ্ড, অন্যথায় তাকে সত্য বলে মেনে নিতে হবে। নবীর চরিত্র, কার্যাবলী এবং তিনি যা কিছু পেশ করেছেন তার মাধ্যমে তাঁকে যাচাই করে তিনি সত্য না ভণ্ড নবী তা নির্ধারণ করা যদি সম্ভব না হত তাহলে হয়ত এ ধরনের অযৌক্তির মানদণ্ড মেনে নেবার প্রয়োজন হত।

শেষ নবীর পর নবুয়াতের দাবী

প্রশ্নঃ তরজমানুল কুরআন (জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী) এর ২৩৬ পৃষ্ঠায় আপনি লিখিছেন, “আামর অভিজ্ঞতা হচ্ছে আল্লাহর তায়ালা কখনও মিথ্যাকে সমৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠা দান করেন না। আমি সবসময় এ নীতি অনুসরণ করে এসেছি যাদেরকে আমি সত্যতা ও বিশ্বস্ততা থেকে বেপরোয়া এবং আল্রাহর ভীতিশূন্য পাই তাদের কথার কখনও জবাব দেই না। আল্লাহ তাদের থেকে বদলা নিতে পারেন…… এবং দুনিয়াতেই ইনশাআল্লাহ তাদের হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে যাবে”।

আমি নিবেদন করছি, আমি আহমদী জামায়াতের বইপত্র পড়েছি এবং তাদের কাজের সাথেও জড়িত থেকেছি। সেই প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত প্রশ্ন ক’টি রাখছি।

একঃ এটা কেবল আপনারই অভিজ্ঞতা নয় বরং কুরআন মজীদে আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে ভালবাসেন না”। আর “মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত”। আবার এমন ধরনের মিথ্যাবাদীদের ওপর যে, (আরবী**********) তাদের শাস্তি হচ্ছে তাৎক্ষণিক পাকড়াও এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ (আরবী*************) এ অবস্থায় যদি মীর্জা গোলাম আহাম্মদ মিথ্যুক হয়ে থাকেন তাহলে কি কারণে (ক) এখনও আল্লাহ তায়ালা তাকে পাকড়াও করেননি (খ) দলের সদস্যদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এবং মীর্জা সাহেবের মিশনের মুসলমানদের কাছে যা গোমরাহ বলে পরিচিত –শক্তি বৃদ্দি হচ্ছে কেন আবার বর্তমানে এ দলটির শিকড় দেশের বাইরেও মজবুত হয়ে গেছে। (গ) মীর্জা সাহেব যে বাণী এনেছিলেন তারপর আজ ষাট বছর অথিবাহিত হয়ে গেচে আমরা কতদিন আল্লহার ফায়সালার অপেক্ষা করব বর্তমানে তারা উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করে চলছে। (ঘ) যেসব দল ও ব্যক্তি এ দলটির বিরোধিতা করছে তারা কেন তাদের বিরোধিতা পরিহার করছে না এবং বিষয়টি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করছে না? ৱ

দুইঃ তরজুমানুল কুরআনের ২৪২ পৃষ্ঠায় আপনার দলের একজন জার্মান সমর্থক বার্লিনে আহমদী জামায়াতের সাথে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যদি আপনিও তাদের ইসলাম প্রচারের কাজকে সঠিক মনে করে থাকেন তাহলে পাকিস্তানে তাদেরসাথে সহযোগিতা করছেন না কেন?

উত্তরঃ আপনি একজন নবুয়াতের দাবীদারের ব্যাপারটিকে এত হালকাভাবে দেখছেন! এতবড় একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি মোটেই উপযোগী নয়। আমি যা কিছু লিখেছিলাম তা ছিল একটি সুস্পষ্ট মিথ্যা অভিযোগ সম্পর্কিত। কতিপয় স্বার্থবাদী লোক আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। এ কথাকে আপনি প্রযোজ্য করছেন এমন একজন লোকের ব্যাপারে যিনি আসলে নবুয়াতের দাবী করেছেন। আপনার জানা উচিত একজন নবুয়াতের দাবীদারের ক্ষেত্রে দু’টি অবস্তার যে কোনোটি অবশ্যিই সত্য। যদি তার দাবী সত্য হয়ে থাকে তাহলে তাকে যে মানে না সে কাফের। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তাকে যে মানে সে কাফের। এতবড় একটা নাজুক ব্যাপারের সিদ্ধান্ত কি আপনি কেবল এতটুকু কথার ওপর করতে চান যে, আল্লাহ তায়ালা এখনও তাকে পাকড়াও করেননি, তার দলের শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে আর ‘আমরা আর কতদিন আল্লাহর ফায়সালার অপেক্ষা করব?’ এর অর্থ কি তাহলে এটাই ধরে নিতে হবে যে, যে কোনো ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করার পর তার দল যদি উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি লাভ করতে থাকে এবং আপনার প্রস্তাবিত প্রতীক্ষার মেয়াদের মধ্যে আল্লাহ তাকে পাকড়াও না করেন তাহলে কেবল ততটুকু কথাই তাকে নবী হিসেবে মেনে নেবার পক্ষে যথেষ্ট বিবেচিত হবে আপনার মতে নবুয়াতের যাচাই করার মানদণ্ড কি এটাই (আরবী**********) থেকে আপনি যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন তা আসলে মূলগতভাবে ভুল। এ আয়াতে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মদ (সা) যিনি আসলে আল্লাহর নবী, যদি আল্লাহর অহী ছাড়া কোনো কথা নিজের পক্ষ তেকে বানিয়ে আল্লাহর নামে পেশ করতে থাকে তাহলে তাঁর শ্বাসনালী কেটে দেয়া হবে। এ থেকে যে ব্যক্তি আসলে নবী নয় এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে নবী বলে পেশ করছে তার শ্বাসনালীও কেটে দেয়া হবে এ অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয়। এ ছাড়াও এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যে নবুয়াতের দাবীদারের শ্বাসনালী কেটে দেয়া হবে না সে সত্য নবী আর যার শ্বাসনালী কেটে দেয়া হবে সে ভণ্ড নবী –এ কথাকে মিথ্যা ও সত্য নবী বেছে নেয়ার মানদণ্ড হিসেবে পেশ করেননি। কুরআনের আয়াতের এভাবে টেনে-হিঁচড়ে বিকৃত অর্থ করার পদ্ধতি  নিশ্চয় আপনার নিজস্ব কায়দা নয়, বরং মীর্জা সাহেবের দলের কাছ থেকেই এটা আপনি রপ্ত করেছেন। এ দলটির দিলে যে আল্লাহর ভয় নেই এ থেকেই তা প্রমাণ হয়।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করবে তার কথাকে আপনার পেশকৃত মানদণ্ডে যাচাই করা হবে না। বরং তার কথাকে পরম নিশ্চিন্তে প্রত্যাখ্যান করা হবে। কারণ কুরআন ও হাদীস এ ব্যাপারে দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য রেখেছে। সেখানে বলা হয়েছে, রসূলে করীম (সা)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না। মীর্জা সাহেব ও তার অনুসারীরা নবুয়াতের দরজা উন্মুক্ত থাকার স্বপক্ষে যেসব যুক্তি পেশ করে থাকেন সেগুলো সম্পর্কেও আমি অবহিত কিন্তু আপনাকে আমি জানিয়ে দিতে চাই ঐ যুক্তিগুলো কেবলমাত্র একজন অজ্ঞ ও স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন লোককেই প্রভাবিত করতে পারে। একজন তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি তাদের যুক্তিগুলো দেখার পর কেবলমাত্র তাদের মূর্খতা সম্পর্কেই নিসন্দেহ হতে পারে।

তরজুমানুল কুরআনে জার্মানীর যে চিঠি ছাপা হয়েছে –অর্থ এ নয় যে, ঐ চিঠির সব কথাকে আমরা হুবহু সত্য বলে মনে করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ঐ চিঠির মাধ্যমে আমাদের দেশের মুসলমানদের সামনে জার্মানীর যে চিঠি ছাপা হয়েছে –অর্থ এ নয় যে, ঐ চিঠির সব কথাকে আমরা হুবহু সত্য বলে মনে করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ঐ চিঠির মাধ্যমে এবং তাদেরকে সাহায্য করার জন্যে মুসলমানদের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা। তারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইসলামী দুনিয়ায় কত ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তা তারা কেমন করে জানবে। তারা তো এখন আমাদের। অন্যথায় অজ্ঞতার কারণে তারা যে কোনো ফিতনার শিকার হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্নঃ আপনার জবাব পেয়েছি। দুঃখের বিষয়, তা আমার সংশয় নিরসন করতে পারেনি। আমি তো আপনারই কথা “আল্লাহ নিজেই মিথ্যাবাদীকে শাস্তি দেবেন” তুলে ধরে এর আলোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী যাকে সব মুসলমানই মিথ্যাবাদী মনে করে তার ওপর আল্লাহর শাস্তি আসছে না কেন এবং আল্লাহ কিভাবে এতদিন ধরে নিজের বান্দাদের গোমরাহ প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছেন?

আমি মীর্জা সাহেবের লেকা ২৫ খানা বই অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করেছি। এপর এর বিরুদ্ধে লেখা মুসলিম আলেমগণের কয়েকখানা বইও পড়েছি, অবশ্য আমি স্বীকার করছি এ প্রসঙ্গে আপনার কোনো বই আমি পড়তে পারিনি। তবে আলেমগণের বইগুরো সম্পর্কে আমার সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া নিম্নরূপঃ

তারা মীর্জা সাহেবের লেখা বিকৃত করে তার ভুল অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং তা মীর্জা সাহেবের ওপর আরোপ করেছেন।

যে বিষয়ে তারা লেখনী চালিয়েছেন সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন না। পরে আমি তাদের সাথে পত্র যোগাযোগ করি। কিন্তু তাদের অধকাংশই নীরবতা অবলম্বন করেন। মীর্জা সাহেবের বইপত্র থেকে আমি সাধারনত যা কিছু বুঝেছি তা হচ্ছেঃ মীর্জা সাহেব ‘নিজে এবং তার বাণীসমূহ নবী করীম (সা)-এর প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এরই ভিত্তিতেই আমি মীর্জা সাহেবের দাবীর দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন আমার কাছে এ কথা প্রমাণিত সত্য যেঃ

একঃ মীর্জা সাহেবের দাবীসমূহ কুরআন ও হাদীসের বিরোধী নয়।

দুইঃ মীর্জা সাহেবের নবুয়াত রসূলে করমি (সা)-এর মর্যাদা লাঘব করছে না বরং যদি মূসা (আ)-এর বদৌলতে নগরে নগরে নবী হতে পারে তাহলে মুহাম্মদ (সা)-এর মর্যাদার বদৌলতে গ্রামে গ্রামে এমন লোক হতে হবে যারা বলবে, “আমরা শরীয়াতে মুহাম্মদীর ওপর আমল করে আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেছি”। মীর্জা সাহেব নিজেই বলেছেনঃ

                                       “আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি উৎসারিত এ ঝর্ণাধারাটি

                                    মুহাম্মদী কামালিয়াতের সমুদ্রের একটি বারিককণা মাত্র”।

এখন আপনি আবার আমাকে মীর্জা সাহেবের দাবী যাচাই করার অনুমতি দিয়েছেন। মেহেরবানী করে আপনি কি মীর্জা সাহেবের কোনো একটি দাবীকে কুরআন করীমের আলোকে মিথ্যা প্রমাণ করে আমাকে সঠিক পথ গ্রহণে সাহায্য করবেন?

উত্তরঃ আগের চিঠিটাই আপনার সংশয় নিরসন করতে পারত যদি আপনি যথার্থই সংশয় নিরসন করতে চাইতেন। আমি তরজুমানুল কুরআনে যা কিছু লিখেছিলাম তা ছিল সেইসব লোকদের সম্পর্কে যারা আমার ওপর মিথ্যা দোষারোপ করছে। আর এ ব্যাপারে আল্লাহর ওপর আস্থা প্রকাশ রকা হয়েছিল যে, তিনি নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদীদেরকে শাস্তি দেবেন কিন্তু আপনি একে একজন নবুয়াতের দাবীদারের দাবী যাচাই করার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করছেন। আবার মানদণ্ডও এমনভাবে গ্রহণ করেছেন যে, যদি দেখা যায় নবুয়াতের দাবীদার শাস্তি পাচ্ছে না তাহরে তাকে অবশ্যই সত্য নবী বলতে হবে। দুনিয়ায় যে শাস্তি পেয়ে যাবে সে মিথ্যাবাদী ও গোমরাহ আর যে শা্স্তি পাবে না সে সত্যবাদী ও সৎপথপ্রাপ্ত –সত্যিই কি লোকদের সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী এবং সৎপথপ্রাপ্ত বা গোমরাহ হবার জন্যে এটা কোন সঠিক মানদণ্ড?

আপনি অদ্ভুত কথা বলেছেন যে, মীর্জা সাহেবের নবুয়াতের দাবী করার পর ৬০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে আর কতদিন অপেক্ষা করা যায়। নবুয়াতের দাবীর সত্যতা যাচাই করার জন্যে আপনি একটি অদ্ভুত মানদণ্ড পেশ করেছেন। আপনার মতে, একজন মিথ্যা দাবীদারের কোন ধরনের শাস্তি পাওয়া উচিত –কথাটা একটু বিস্তারিতভাবে বলুন। যদি আপনি মনে করে থাকেন, গায়েব থেকে একটি হাত এসে তার কণ্ঠনালী কেটে দিয়ে যাবে তাহলে আমি বলব, এ শাস্তি তো রসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবদ্দমায় মিথ্যা নবুয়াতের দাবীদার মুসাইলামা কাযযাবকেও দেয়া হয়নি। যদি আপনি মনে করে থাকেন, যে নবুয়াতের দাবীদার মানুষের হাতে নিহত হবে সে মিথ্যাবাদী তাহলে সেসব নবীদের সম্পর্কে আপনি কি বলেন যাদের নবুয়াতের সত্যতা আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন এবং এই সঙ্গে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের নিজেদের জাতিরাই তাদেরকে হত্যা করেছে? কুরআনে নিশ্চয়ই আপনি নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি পড়েছেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৬৯ পৃষ্ঠায়)

এ আয়াতগুলোর আলোকে আপনার নিজের চিন্তাধারার নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি। নবীর দাবীকে এ ধরনের মানদণ্ডে যাচাই করা যায় না। নবীর ব্যাপারে যে বিষয়টির পর্যালোচনা করতে হবে তা হচ্ছে এই যে, তাঁর পূর্বেকার আল্লাহর বাণীর আলোকে তাঁর স্থান কোথায়? তিনি কি এনেছেন? তাঁর জীবনধারা কেমন? এ মানদণ্ডে যে ব্যক্তি পুরোপুরি উতরোবে না তাকে কেবলমাত্র আপনি চর্মচক্ষে এ দুনিয়ায় শাস্তি পেতে দেখছেন না বলেই সত্য নবী বলে মেনে নেবেন, এটা একটা মারাত্মক ভুল।

ওপরে আমি যে তিনটি মানদণ্ডের কথা বলেছি তার মধ্য তেকে প্রথমটির কষ্ঠিপাথরে নবুয়াতের দাবীদারের দাবী যাচাই হয়ে পুরোপুরি নির্ভেজাল প্রমাণিত হয়ে না এলে শেষোক্ত কথা প্রমাণ হয়ে যায় যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নতুন নবী আসতে পারবেন না তখন রসূলে করীম (সা)-এর আগমনকারী নবী কি এনেছেন এবং তিনি কেমন লোক তা দেখার কোনো প্রয়োজনই থাকে না। যদিও আমার দৃষ্টিতে মীর্জা সাহেব দ্বিতীয় ও তৃতীয় মানদণ্ডের প্রেক্ষিতে ও নবুয়াতের মর্যাদা থেকে এত দূর অবস্থান করছেন যে, নবুয়াতের দরজা যদি খোলা থাকত তাহলেও অন্ততঃপক্ষে কোনো সুবিবেচক ব্যক্ত তাঁকে বনী বলে ধারণা করতে পারত না কিন্তু কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্তের পর এ আলোচনাকে আমি অপ্রয়োজনীয় বরং আল্লাহ ও রসূলের (সা) মোকাবিলায় চরম দৃষ্টতা মনে করি।

যদি জিজ্ঞেস করেন, নবুয়াতের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে কুরআন ও হাদীসে এর স্বপক্ষে কি যুক্তি আছে, তাহলে একটি পত্রে এর জবাব দেয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদে সময় সুযোগ দেন তাহলে একটি ইনশাআল্লাহ এ বিষয়বস্তুর ওপর আমি একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ লিখব। অন্যথায় সূরা আহযাবের তাফসীরে তো এ প্রসঙ্গ আসবেই তখন আলোচনা করা যাবে।–[কয়েক পৃষ্ঠা পরেই ‘খতমে নবুয়াতের আকীদা সম্পর্কে গবেষণামূলক আলোচনা’ শীর্ষক নিবন্ধে এ আলোচনা আসছে।–(সংকলক)]

খতমে নবুয়াতের বিরুদ্ধে কাদিয়ানীদের আর একটি যুক্তি

প্রশ্নঃ তাফহীমুল কুরআনে সূরা আলে ইমরানের (আরবী*****) আয়াতের ব্যাখ্যায় ৬৯ নম্বর টীকায় আপনি লিখেছেনঃ “এখানে এতটুকু কথা আরও বুঝে নিতে হবে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে প্রত্যেক নবীর কাছ থেকেই এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে আর এরই ভিত্তিতে প্রত্যেক নবীই তাঁর পরবর্তী নবী সম্পর্কে তাঁর উম্মতকে অবহিত করেছেন এবং তাঁকে সমর্থন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সা)-এর কাছ থেকেও এ ধরনের কোন অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল অথবা তিনি নিজের উম্মতকে পরবর্তীকালে আগমনকারী কোনো নবীর বর দিয়ে তার ওপর ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন কুরআন ও হাদীসের কোথাও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায না”।

এ বাক্যগুলো পড়ার পর মনের মধ্যে এ কথার উদয় হলো যে, নবী মুহাম্মদ (সা) এ কথা বলেননি ঠিক কিন্তু কুরআন মজীদের সূরা আহযাবে একটি অঙ্গীকারের উল্লেখ এভাবে করা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************)

এখানে ‘মিনকা’ (তোমার নিকট থেকে) শব্দটির মাধ্যমে নবী করমি (সা)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। আর একানে যে অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে তা সূরা আলে ইমরানে উল্লেখিত হয়েছে। সূরা আলে ইমরান ও সূরা আহযাব এ উভয় সূরায় উল্লিখিত আয়াগুলোর অঙ্গীকারের উল্লেখ থেকে বুঝা যায়, অন্য নবীদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল নবী মুহাম্মদ (সা)-এর থেকেও সেই একই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে।

আসলে আহমদীয়াদের একটি বই পড়ার পর আমার মনে এ প্রশ্ন জেগেছে। সেখানে ঐ সূরা দু’টোর উল্লিখিত আয়াতগুলোকের একটির সাহায্যে অপরটির ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ সঙ্গে ‘মিনকা’ শব্দটির ওপর বিরাট আলোচনা করা হয়েছে।

উত্তরঃ (আরবী*****************) সূরা আহযাবের এ আয়াতটি থেকে াদিয়ানী সাহেবান যে যুক্তি পেশ করেন তা যদি তারা আন্তরিকতার সাথে পেশ করে থাকেন তাহলে তা তাদের মূর্খতা ও অজ্হতার পরিচায়ক। আর যদি ইচ্ছা করে লোকদেরকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে করে থাকেন তাহলে তাদের গোমরাহী সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তারা সূরা আলে ইমরানের (আরবী****************) আয়াতটি থেকে একটি বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। তাতে নবীগণ ও তাদের উম্মতদের কাছ থেকে আগামীতে আগমনকারী কোনো নবীর আনুগত্য করার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে। আবার দ্বিতীয় একটি বক্তব্য নিয়েছেন সূরা আহযাবের উপরোল্লিখিত আয়াতটি থেকে। এখানে অন্যান্য নবীগণের সাথে সাথে রসূলে করীম (সা)-এর থেকেও অঙ্গীকার নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। অতপর দু’টোকে জুড়ে তারা নিজেরাই এ তৃতীয় বক্তব্যটি বানিয়ে ফেলেছেন যে, নবী করীম (সা) থেকেও আগামীতে আগমনকারী কোনো নবীর ওপর ঈমান আনার ও তাকে সাহায্য-সহযোগিতা দান করার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল অথচ যে আয়াতে আগামীতে আগমনকারী নবীর থেকে অঙ্গীকার নেয়ার কথা বলা হয়েছে সে আয়াতের কোথাও আল্লাহ তায়ালা এ কথা বলেননি যে, এ অঙ্গীকারটি হযরত মুহাম্মদ (সা) থেক্ নেয়া হয়েছে। আর যে আয়াতে হযরত মুহাম্মদ (সা) থেকে একটি অঙ্গীকার নেয়ার কথা বলা হয়েছে সেখানে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, এ অঙ্গীকারটি ছিল আগামীতে আগমনকারী কোনো নবীর আনুগত্যের সাথে জড়িত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দু’টো পৃথক বক্তব্যকে জুড়ে তৃতীয় একটি বক্তব্য যা কুরআনের কোথাও ছিল না তৈরী করার যৌক্তিকতা কোথায়? এর তিনটি যুক্তি বা ভিত্তি হতে পারত। একঃ যদি এ আয়াতটি নাযিল হবার পর নবী করীম (সা) সাহাবীদেরকে একত্রিত করে ঘোসণা করতেনঃ “হে লোকেরা! আল্লাহ আমার কাছ তেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, আমার পর যে নবী আসবেন আমি তার ওপর ঈমান আনব এবং তাকে সাহায্য-সহযোগিতা দান করব। কাজেই আমার অনুগত হওয়ার কারণে তোমরাও এ অঙ্গীকার কর”। -কিন্তু সমগ্র হাদীস গ্রন্থগুরোর কোতাও আমরা এ বক্তব্য সম্বলিত একটি হাদীসও দেখি না। বরং বিপরীত পক্ষে এমন অসংখ্য হাদীস দেখি যেখান থেকে নবী করীম (সা)-এর ওপর নবুয়াতের সিলসিলা খতম হয়ে গেচে এবং তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না এ কথা সুস্পষ্টবাবে প্রকাশিত হয়। এ কথা কি কোনো দিন কল্পনাও করা যেতে পারে যে, নবী করীম (সা)-থেকে এমন ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে আর তিনি তাকে এভাবে অবহেলা করে গেছেন, বরং উল্টো এমন সব কথা বলেছেন যার ভিত্তিতে তাঁর উম্মতের বিরাট অংশ আল্লাহ প্রেরিত কোনো নবীর ওপর ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে?

কুরআনে যদি সকল নবী ও তাঁদের উম্মতদের থেকে একটিমাত্র অঙ্গীকার নেয়ার উল্লেখ থাকত তাহলে সেটি এ বক্তব্য গ্রহণের দ্বিতীয় যুক্তি বা ভিত্তি হতে পারত। আর সে অঙ্গীকারটি হচ্ছে পরবর্তকালে আগমনকারী নবীর ওপর ঈমান আনা। সমগ্র কুরআনে এটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অঙ্গীকারের উল্লেখ থাকত না। এ অবস্থায় এ যুক্তি পেশ করা যেতে পারত যে, সূরা আহযাবের উল্লিখিত আয়াতেও এ একই অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ যুক্তি পেশ করারও কোনো অবকাশ এখানে নেই। কুরআনে একটি নয় বহু অঙ্গীকারের কথা উল্লিখিত হয়েছে। যেমন সূরা বাকারার ১০ রুকূ’তে বনী ইসরাঈল থেকে আল্লাহর বন্দেগী, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও পারস্পরিক রক্তপাত থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে। সূরা আলে ইমরানের ১৯ রুকূ’তে সমস্ত আহলে কিতাবদের থেকে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছেঃ আল্লাহর যে কিতাব তোমাদের হাতে দেয়া হয়েছে তোমরা তার শিক্ষাবলী গেপান করবে না বরং তাকে সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেবে। সূরা আরাফের ২১ রুকূ’তে নবী ইসরাঈল থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছেঃ আল্লাহর নাম হক ছাড়া কোনো কথা বলবে না আর আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং তার শিক্ষাগুরো মনে রাখবে। সূরা মায়েদার প্রথম রুকূ’তে মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসারীদেরকে একটি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যা তারা আল্লাহর সাথে করেছিল তা হচ্ছে, “তোমরা আল্লাহর সাথে শ্রবণ ও আনুগত্যের অঙ্গীকার করছ”। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সূরা আহযাবের সংশ্লিষ্ট আয়াতে যে অঙ্গীকারের উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে অঙ্গীকারটি কি ছিল তা যখন বলা হয়নি তখন এ অঙ্গীকারটি চিহ্নিত করার জন্যে উল্লিকিত বহু অঙ্গকারের মধ্য থেকে কোনো একটি গ্রহণ না করে বিশেষ করে সূরা আলে ইমরানের ৯ রুকূ’তে উল্লিখিত অঙ্গীকারটি গ্রহণ করা হবে কেন? এ জন্যে অবশ্যই একটি ভিত্তির প্রয়োজন। আর এ ভিত্তি কোথাও নেই। এর জবাবে যদি কেউ বলে যে, উভয় ক্ষেত্রে যেহেতু নবীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণের কথা রয়েছে তাই একটি আয়াতের সাহায্যে অন্যটির ব্যাক্যা করা হয়েছে, তাহলে আমি বলব নবীদের উম্মতদের থেকে অন্য যতগুলো অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে কোনোটাই সরাসরি নেয়া হয়নি বরং নবীদের মাধ্যমেই নেয়া হয়েছে। এছাড়াও গভীরভাবে কুরআন অধ্যয়নকারী ব্যক্তিমাত্রই জানেন, প্রত্যেক নবীর থেকে আল্লহার কিতাব মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার ও তার বিধানসমূহের আনুগত্য করার অঙ্গীকার নেয়া হয়।

তৃতীয় যুক্তি বা ভিত্তি হতে পারতো সূরা আহযাবের পূর্বাপর আলোচনা প্রসঙ্গ। সেখানে যদি এ কথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকত যে, একানে অঙ্গীকার বলতে পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের ওপর ঈমান আনার অঙ্গীকার বুঝাত হয়েছে, তাহরে এ বক্তব্য গ্রহণ করা সঙ্গ হত। কিন্তু এখানে ব্যাপারটি তো সম্পূর্ণ উল্টো। পূর্বাপর আলোচনা প্রসঙ্গ বরং এ অর্থ গ্রহণের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করছে। সূরা আহযাব শুরু করা হয়েছে এ বাক্যটির মাধ্যমেঃ

“হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য কর না আর তোমার রব যে অহী পাঠান সেই অনুযায়ী কাজ কর এবং আল্লাহর ওপর আস্থা স্থাপন কর”। এরপর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, জাহেলিয়াতের যুগ থেকে পালকপুত্র নেয়ার যে পদ্ধতি চলে আসছে তা এবং তার সাথে সম্পর্কিত সব রকমের কুসংস্কার ও রীতি-রসম নির্মূল করে দাও। তারপর বলা হচ্ছে, রক্তহীন সম্পর্কের মধ্যে কেবলমাত্র একটি সম্পর্কই এমন আছে যা রক্ত সম্পর্কের চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন। সেটি হচ্ছে, নবী ও মু’মিনদের মধ্যকার সম্পর্ক। এ সম্পর্কের কারণে নবীর স্ত্রীগণ মু’মিনদের নিকট তাদের মায়েদের ন্যায় মযৃাদাসম্পন্ন এবং মায়েদের ন্যায় তাদের ওপর হারাম। এছাড়া অন্য সমস্ত ব্যাপারে একমাত্র রক্ত সম্পর্কই আল্লাহর কিতাব অনুসারে বিবাহ হারাম হওয়া ও মীরাস লাভের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এ বিধান নির্দেশ করার পর আল্লাহ তায়ালা হামেশা সমস্ত নবীদের থেকে এবং সেই অনুযায়ী নবী করীম (সা) থেকেও যে অঙ্গীকারটি নিয়েছেন সে কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এখন একজন সাধারণ বিবেকমান ব্যক্তিমাত্রেই দেখতে পারেন যে, এ আলোচনা প্রসঙ্গে কোথায় পরবর্তীকালে আগমনকারী একজন নবীর ওপর ঈমান আনার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার অবকাশ ছিল? একানে বড়জোর সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার অবকাশ ছিল যাতে আল্লাহর কিতাবকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার, তার বিধানসমূহ মনে রাখার, সেগুরো কার্যকর করার এবং জনসমক্ষে তা প্রকাশ করার জন্যে সকল নবীকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এরপর আর একটু সামনে অগ্রসর হয়ে আমরা দেখছি আল্লাহ তায়ারা নবী করীম (সা)-কে পরিস্কার বরে দিচ্ছেন, আপনি নিজে আপনার পালকপুত্র যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করে জাহেলিয়াতের সেই ভ্রান্ত ধারণা নির্মূল করে দিন যার ভিত্তিতে লোকেরা পালক পুত্রকে নিজেদের ওরসজাত পুত্রের ন্যায় মনে করত। কাফের ও মুনাফিকরা এর বিরুদ্ধে একের পর এক আপত্তি উত্থাপন করে অপপ্রচারে লিপ্ত হলে আল্লাহ তায়ালা ধারাবাহিকভাবে সেগুরোর জবাব দেন।

এক. প্রথমত মুহাম্মদ (সা) তোমাদের মধ্য থেকে কোনো পুরুষের পিতা নন, যার ফলে তার (সেই) পুরুষের) তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে তাঁর ওপর হারাম হতে পার্

দুই. আর যদি তোমরা এ কথা বল যে, সে তার জন্যে হালাল হয়ে থাকলেও তাকে বিয়ে করার এমন কী প্রয়োজন ছিল? তাহলে এর জবাবে বলতে হয় যে, তিনি হচ্ছেন আল্লাহর রসূল। আল্লাহ যে কাজটি খতম করতে চান নিজে অগ্রসর হয়ে সেটি খতম করে দেয়াই হচ্চে তাঁর দায়িত্ব।

তিন. এ ছাড়াও এটি করা তাঁর জন্যে আরও বেশী প্রয়োজন ছিল এ জন্যে যে, তিনি নিছক রসূল নন বরং তিনি শেষ রসূল। জাহেলিয়াতের এ রীতি-রসমগুলোর যদি তিনি বিলোপ সাধন না করে যান তাহলে তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না যিনি এগুলোর বিলোপ সাধন করাবেন।

এই শেষের বক্তব্যটিকে আগের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে পড়লে যে কেউ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলবে যে, এই পূর্বাপর বক্তব্যের মধ্যে নবী করীম (সা)-কে যে অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয় দেয়া হয়েছে তা নিসন্দেহে পরবর্তীকারে আগমনকার কোনো নবীর ওপর ঈমান আনার অঙ্গীকার নয়।

এবার বিবেচনা করুন, আলোচ্য আয়াতটি থেকে কাদিয়ানীদের বিবৃত অর্থ গ্রহণ করার জন্যে এ তিনটি ভিত্তিই হতে পারত। এ তিনটি ভিত্তির প্রত্যেকটিই তাদের বক্তব্যের সাথে সম্পর্কহীন বরং তার বিপরীত। এছাড়া তাদের কাছে যদি চতুর্থ কোনো যুক্তি ও ভিত্তি থাকে তাহরে তা তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন। আর এ তিনটি যুক্তির জবাবও তাদের কাচে থেকে নিন। অন্যথায় ন্যায়সঙ্গতভাবে এ কথা মনে করা হবে যে, তারা মূর্খতা ও অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে অন্যথায় আল্লাহর ভয়কে মন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত করে সরল-প্রাণ জনসাধারণকে গোমরাহ করার জন্যে আয়াতের এ অর্থ গ্রহণ করেছে। যা হোক, আমি এটা বুঝতে পারছি না যে, মীর্জা সাহেব যদি নবী হয়ে থাকেন তাহলে এখনও তার ‘সাহাবী’দের যুগ শেষ হয়নি অথচ তার সমগ্র উম্মত বর্তমানে ‘তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈন’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এরপরও তাদের অবস্তা হচ্ছে এই যে, তার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত লোকেরা প্রকাশ্যে আল্লাহর কিতাব থেকে এ ধরনের ভুল ও মিথ্যা যুক্তি পেশ করে যাচ্ছে অথচ এ মুর্খতার বিরুদ্ধে সমগ্র উম্মতের মধ্যে একটি আওয়াজ বুলন্দ হচ্ছে না।

খতমে নবুয়াতের আয়াতের তিনটি যুক্তি

(আরবী****************************পিডিএফ ১৭৪ পৃষ্ঠায়)

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কারও পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী। আর আল্লাহ সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন”।–(সূরা আহযাবঃ ৪০)

সূরা আহযাবের যে পটভূমিকায় খতমে নবুয়াতের আলোচনা এসেছে তা হচ্ছে নিম্নরূপ। আরবে পালকপুত্রকে সম্পূর্ণরূপে নিজের ঔরসজাত পুত্রের মযৃাদা দেয়া হয়েছিল। সে ঔরসজাত পুত্রের মতো মীরাস পেত। মা-ছেরে ও ভাই-বোন যেভাবে এক সংসারে অবস্থান করত পালকপুত্র তেমনি পালক পিতার স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে মিশেমিশে থাকত। পালকপুত্র হয়ে যাবার পর রক্ত সম্পর্কের কারণে আত্মীয়দের মধ্যে যে সম্পর্ক কায়েম হত পালকপুত্র ও পারক পিতার মধ্যে সে ধরনের সব সম্পর্ক কায়েম হয়ে যেত। আল্লাহ এ রসমটি বিলুপ্ত করতে চাচ্ছিলেন। তা্ই প্রথমে বলে দিলেন, মুখে কাউকে ছেলে বলে দিলেই সে তার প্রকৃত ছেলে হয়ে যায় না। (৪নং আয়াত) কিন্তু শত শত বছরের রেওয়াজ ও প্রচলনের কারণে মনের মধ্যে যে মর্যাদাবোধ ও হারাম হওয়ার ধারনা শিকড় গেড়ে বসেছিল তাকে সহজে মূলোৎপাটিত করা সম্ভবপর ছিল না। তাই কার্যতঃ এ প্রথাটি ভেঙ্গে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। ঘটনাক্রমে এ সময় ঘটে গেল হযরত যায়েদ (রা) ও হযরত যয়নব (রা)-এর ব্যাপারটি। রসূলে করীম (সা)-এর পালকপুত্র হযরত যায়েদ তার স্ত্রী যয়নবকে তারাক দিয়ে দিলেন। রসূলে করীম (সা) অনুবব করলেন, এ মারাত্মক জাহেলী প্রথাটি ভাঙ্গার এটাই হচ্ছে মোক্ষম সুযোগ। যতক্ষণ না তিনি নিজে নিজের পালকপুত্রের তারাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করেন ততক্ষন পালকপুত্রকে প্রকৃত ও ঔরসজাত পুত্রের মতো মনে করার জাহেলী ধারণার অবসান হবে না। কিন্তু তিনি এ কথাও জানতেন যে, মদীনার মুনাফিকগোষ্ঠী এবং মদীনার আশপাশের ইহুদী সম্প্রদায় ও মক্কার কাফের সমাজ তাঁর এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মহা হুলস্থুল বাধাবে। তারা এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নাম রটাবার ও ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করবে না। তাই তিনি বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন অনুভব করা সত্ত্বেও ইতস্তত করছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তিনি হযরত যয়নব (রা)-কে বিযে করে নিলেন। ফলে পূর্ব অনুমিত আশংকা অনুযায়ী আপত্তির ঝড় উঠল। নিন্দা ও অপবাদের বন্যা বইতে লাগল। এমনকি নেক মুসলমানের মনেও নানা ধরনের সংশয় ও সন্দেহ জেগে উঠল। এসব আপত্তি, নিন্দাবাদ, অপবাদ ও সংশয়ের জবাবে সূরা আহযাবের পঞ্চম রুকু’র ৩৭ থেকে ৪০ নম্বর পর্যন্ত এ আয়াগুলো নাযিল হয়।

এ আয়াতগুলোর শুরুতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, এ বিয়ে আমার নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে এই যে, মু’মিনদের জন্যে তাদের পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা মোটেই দূষণীয় নয়। তারপর বলেন, আল্লাহর হুকুম কার্যকর করার ব্যাপারে কারও ভয়ে ইতস্তত করা কোনো নবীর কাজ নয়। অতপর নিম্নোক্ত কথাগুলো পেশ করে এ আলোচনার সমাপ্তি টানেনঃ

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুসদের কারও পিতা নন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী”। এখানে এ বাক্যটি থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা আপত্তিকারীদের জবাবে তিনটি যুক্তি পেশ করতে চান। বিরুদ্ধ পক্ষ রসূলে করীম (সা)-এর বিয়ের বিরুদ্ধে যেসব আপত্তি ও অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন এ একটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে সেসবের শিকড় কেটে দেয়া হয়েছে।

তাদের প্রথম আপত্তি ছিল, তাঁরা নিজের শরীয়াতেই ছেলের স্ত্রী বাপের জন্যে হারাম এতদসত্ত্বেও তিনি কেমন করে নিজের ছেলের স্ত্রীকে বিয়ে করলেন? এর জবাবে বলা হয়েছে, এ বিয়ে আপত্তিকর নয়। কারণ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুহাম্মদ (সা)-এর আসল ছেলে ছিলেন না এবং মুহাম্মদ (সা)-ও তার আসল বাপ ছিলেন না। তাই বলা হয়েছে, “মুহাম্মদ (সা) তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নন”। অর্থাৎ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে সে তো মুহাম্মদ (সা)-এর ছেলেই ছিল না। কাজেই তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হবে কেন? তোমরা সবাই জানো মুহাম্মদ (সা)-এর কোন ছেলে নেই।

তাদের দ্বিতীয় আপত্তি ছিল, পালকপুত্র যদি প্রকৃত পুত্র না হয়ে থাকে তাহলে তার পরিত্যক্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা বড়জোর বৈধ হতে পারে কিন্তু তাঁকে বিয়ে করতেই হবে এমন কি অপরিহার্যতা ছিল? এর জবাবে বলা হয়েছে, “কিন্তু তিনি হচ্ছেন আল্লাহর রসূল”। অর্থাৎ রসূল হবার কারণে এ কাজটি তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে যে, তোমাদের প্রচলিত প্রথা যে হালাল বস্তুটি অনর্থক হারাম করে রেখেছে তার ব্যাপারে যাবতীয় রক্ত সম্পর্কের ধারণার অবসান ঘটিয়ে তিনি তাকে হালাল করে দেবেন এবং এ ব্যাপারে সকল প্রকার সন্দেহ-সংশয় নিরসন করবেন।

তৃতীয়তঃ এর অপরিহার্যতার আরও একটি কারণ ছিল এই যে, মুহাম্মদ (সা) নিছক নবী নন বরং তিনি সর্বশেষ নবী”। অর্থাৎ তাঁর পর আর কেনো রসূল তো দূরের কথা কোনো নবীই আসবেন না। আইন বা সামাজিক প্রথার কোনো একটির সংস্কার যদি তাঁর জামানায় সম্ভব না হয়ে থাকে তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তাঁর এ আরব্ধ কাজটি সম্পন্ন করে দেবেন –এর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কাজেই জাহেলিয়াতের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রথাটি তিনি নির্মূল করে যাবেন এটা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। কারণ এখন তাঁর হাতে জাহেলিয়াতের এ প্রথাটির মৃত্যু না ঘটলে কিয়ামত পর্যন্ত এর মৃত্যুর কোনো সম্ভাবনা নেই। তাঁল পরে আর কোনো নবী আসবেন না। তিনি যে কাজটুকু রেখে যাবেন সেটুকু সম্পন্ করার আর কেউ থাকবে না।

এর ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে বলা হলো, “আল্লাহ সব বিষয়ের জ্ঞান রাখেন”। অর্থাৎ আল্লাহ জানেন এ সময় জাহেলিয়াতের এ প্রথাটিকে মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে নির্মূল করার কেন প্রয়োজন ছিল, অন্যথায় কি ক্ষতি হত আল্লাহ জানেন, এখন তাঁর পক্ষ থেকে আর কোনো নবী আসবেন না। কাজেই তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে তিনি যদি এখনই এ প্রথাটিকে নির্মূল করে না দেন তাহলে ভবিষ্যতে এমন আর কোনো ব্যক্তিত্ব থাকবে না যিনি এ প্রথাটির বিরুদ্দাচরণ করলে সারা দুনিয়ার মুসলিম সমাজে এটি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পরবর্তীকালের সংস্কারকগণ এর বিরুদ্ধাচরণ করলেও তাঁদের কারও কর্মকাণ্ডও এমন চিরন্তন ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হবে না যার ফলে প্রত্যেক দেশের ও প্রত্যেক যুগের লোকেরা তা নির্দ্ধিধায় মেনে নেবে এবং তার অনুসারী হবে। তাছাড়া তাঁদের কোনো একজনও এমন ধরনের কোনো পবিত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবেন না যার ফলে তিনি যে এ কাজটি করেছেন অর্থাৎ এটি যে তাঁর সুন্নাত –এ ধরনের কোনো চিন্তাই লোকদের মন থেকে এর বিরুদ্ধে উদ্ভূত যাবতীয় ঘৃণা ও অস্বস্তিকর মনোভাব খতম করে দিয়ে সক্ষম হবে না।

দুঃখের বিষয়, বর্তমান যুগে একটি দল এ আয়াতটির ভুল অর্থ করে একটি বিরাট ফিতনার দরজা খুলে দিয়েছে। তাই খতবে নবুয়াত প্রসঙ্গটির ওপর পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করে এই দলটি যেসব বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে সেগুরো দূর করার জন্যে আমি পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে খতমে নবুয়াতের আলোচনায় প্রবৃত্ত হবো।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.