সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

খতমে নবুয়াতের আকীদা সম্পর্কে গবেষণামূলক আলোচনা

বর্তমান যুগে একটি দল নতুন নবুয়াতের বিরাট ফিতনা সৃষ্টি করেছে। তারা (আরবী****************************) আয়াতটিতে উল্লেখিত ‘খতামান নাবিয়্যিন’ শব্দের অর্থ করে নবীদের মোহর। এরা বুঝাতে চায়, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর তাঁর মোহরাঙ্কিত হয়ে আরও অনেক নবী দুনিয়ায় আসবেন। অথবা অন্য কথায় বলা যায, রসূলুল্লাহ (সা)-এর মোহরাঙ্কিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ নবী হবেন না।

কিন্তু যে বর্ণনা পরম্পরায় এ আয়াতটি বিবৃত হয়েছে সেই বিশেষ পরিবেশে রেখে একে বিচার করলে সংশ্লিষ্ট শব্দের এ অর্থ গ্রহণের কোন অবকাশই দেখা যায় না। বরং এ অর্থ গ্রহণ করলে এ পরিবেশে শব্দটির ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তা বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। যয়নব (রা)-এর বিয়ের বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিবাদ ও তা থেকে সৃষ্টি নানা প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের জবাব দিতে দিতে হঠাৎ মাঝখানে বলে দেয়াঃ ‘মুহাম্মদ নবীদের মোহর’, অর্থাৎ যত নবী আসবেন তারা সবাই মুহাম্মদ (সা)-এর মোহরাঙ্কিত হয়ে আসবেন; এটা কি নিছক অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক কথা নয়? আগে-পিছের এ বর্ণনার মাঝখানে এ কথাটির আকস্মিক আগমন শুধু অবান্তর নয়, এর মাধ্যমে প্রতিবাদকারীদের জবাবে যে যুক্তি পেশ করা হচ্ছিল তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় প্রতিবাদকারীদের হাতে একটা চমৎকার সুযোগ এসে গিয়েছিল। তারা সহজেই বলতে পারত, আপনার জীবনকালে এ কাজটা সম্পন্ন না করলে ভালই করতেন, কোনো বিপদের সম্ভাবনা থাকত না। এ বদ রসমটা বিলুপ্ত করার এতই যদি প্রয়োজন হয়ে থাকে তাহলে আপনার পরে আপনার মোহরাঙ্কিত হয়ে যেসব নবী আসবেন তাদের যে কেউ এটা বিলুপ্ত করতে পারবেন।

উল্লিখিত দলটি শব্দটির আরেকটি বিকৃত অর্থ নিয়েছে। অর্থাৎ ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ অর্থ ‘আফযালুন নাবীয়্যীন’। এর অর্থ হলো, নবুয়াতের দরজা খোলাই রয়েছে, তবে নবুয়াত পূর্ণথা লাভ করেছে রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর। কিন্তু এ অর্থ গ্রহণ করতে গিয়েও পূর্বোল্লিখিত বিভ্রান্তির পুনরাবির্ভাবের হাত থেকে নিস্তার নেই। পূর্বাপর আলোচনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি পূর্বাপরের ঘটনা পরম্পরার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থবহ কাফের ও মুনাফিকরা বলতে পারতঃ জনাব, আপনার চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন হলেও আপনার পরে আরও নবী তো আসতে থাকতেন, কাজেই এ কাজটা তাদের ওপর না হয় ছেড়ে দিতেন। এ বদ রসমটা নির্মূল করার দায়িত্ব যে আপনাকেই পালন করতে হবে –এরই বা কি এমন অপরিহার্যতা আছে?

খাতামান নাবীয়্যীন শব্দের আভিধানিক অর্থ

পূর্বাপর আলোচনার সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে চূড়ান্তভাবে এ কথা বলা যেতে পারে যে, এখানে খাতামান নাবীয়্যীন শব্দের অর্থ সিলসিলার পরিসমাপ্তি। অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। কিন্তু শুধু পূর্বাপর সম্বন্ধের দিক দিয়েই নয়, আভিধানিক দিক দিয়েও এটিই এর একমাত্র যথার্থ অর্থ। আরবী অভিধান ও প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী ‘খাতাম’ শব্দের অর্থ হলোঃ মোহর লাগান, বন্ধ করা, শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া এবং কোনো কাজ শেষ করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করা।

খাতামাল আমল (আরবী***) অর্থ হলঃ ফারাগা মিনাল আমাল (আরবী*****) অর্থাৎ কাজ শেষ করে ফেলেছে।

খাতামাল ইনাআ (আরবী****) অর্থ হলঃ পাত্রের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, যাতে তার ভেতর থেকে কোনো জিনিস বাইরে না আসতে পার এবং বাইরে থেকে কিছু ভেতরে যেতে না পারে।

খাতামাল কিতাব (আরবী******) অর্থ হলঃ পত্র বন্ধ করে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, ফলে পত্রটি সংরক্ষিত হবে।

খাতামা আলাল কালব (আরবী*******) অর্থ হলঃ কোন পানীয় পান করার পর সব শেষে যে স্বাদ অনুভূত হয়।

খাতিাতু কুল্লি শাইয়িন আকিবাতুহু ওয়া আখিরাতুহু (আরবী**********) অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিসের খাতিমা অর্থ হল তার পরিণাম ও শেষ।

খাতামাশ শাইয়ে বালাগা আ-খেরাহ (আরবী*********) অর্থাৎ কোনো জিনিসকে খতম করার অর্থ হল তার শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া। খতমে কুরআন বলতে এ অর্থই গ্রহণ করা হয় এবং এ অর্থের ভিত্তিতেই প্রত্যেক সূরার শেষ আয়াতকে বলা হয় ‘খাওয়াতিম’।

খাতামুল কওমে আখেরুহুম (আরবী*******) অর্থাৎ জাতির শেষ ব্যক্তিই হচ্ছে খাতামুল কওম। (দ্রষ্টব্যঃ লিসানুল আরব, কামুস ও আকরাবুল মাওয়ারিদ)।–[এখানে আমি মাত্র তিনটি অভিধানের উল্লেখ করলাম। কিন্তু শুধু এ তিনটি অভিধানই কেন, আরবী ভাষার যে কোন নির্ভরযোগ্য অভিধান খুলে দেখলে সেখানে ‘খাতাম’ শব্দের উপরোল্লিখিত অর্থ ও ব্যাখ্যাই পাওয়া যাবে কিন্তু খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা আল্লাহর দ্বীনের সুরক্ষিত দূর্গে সিদকাটার জন্যে এর আভিধানিক অর্থকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। তারা বলতে চান, কোনো ব্যক্তিকে ‘খাতামুশ শোয়ারা’, ‘খাতামুল ফোকাহা’ অথবা ‘খাতামুল মুফাসসিরীন’ বললে এ অর্থ গ্রহণ করা হয় না যে, যাকে ঐ পদবী দেয়া হয় তারপর আর কোনো শায়ের, ফকীহ বা মুফাসসির পয়দা হয়নি। বরং এর অর্থ হয়, ঐ ব্যক্তির উপর উল্লিখিত বিদ্যা বা শিল্পের পূর্ণতার পরিসমাপ্তি ঘটেছেঃ অথচ কোনো বস্তুকে অত্যধিক ফুটিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে এ ধরনের পদবী ব্যবহারের ফলে কখনও খাতাম-এর আভিধানিক অর্থ ‘পূর্ণ’ অথবা ‘শ্রেষ্ঠ’ হয় না এবং শেষ অর্থে এর ব্যবহার ত্রুটিপূর্ণ গণ্য হয় না।

একমাত্র ব্যাকরণ রীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিই এ ধরনের কথা বলতে পারেন। কোনো ভাষারই নিয়ম এ নয় যে, কোনো একটি শব্দ তার আসল অর্থের পরিবর্তে কখনও কখনও পরোক্ষভাবে অন্য কোনো অর্থে ব্যবহৃত হলে সেটাই তার আসল অর্থে পরিণত হবে এবং আসল আভিধানিক অর্থে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কোনো আরবের সামনে যখন বলা হবে, ‘জাআ খাতামুল কওম’ (আরবী*****) তখন কখনও সে মনে করবে না যে, গোত্রের শ্রেষ্ঠ অথবা কামেল ব্যক্তিটি এসে গেছে বরং সে মনে করবে গোত্রের সবাই এসে গেছে, এমনকি শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্তও।

এই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, মানুষের পক্ষ থেকেই কিছু লোককে খাতামুশ শোয়ারা, খাতামুল ফোকাহা, খাতামুল মুহাদ্দিসীন ইত্যাদি উপাধি দেয়অ হয়েছে। আর যে ব্যক্তিকে সে খাতামুশ শোয়ারা বা খাতামুল ফোকাহা উপাধি দিচ্ছে তারপর এ গুণের অধিকারী আর কোনো ব্যক্তির জন্ম হবে কিনা এ কথা জানার কোনা ক্ষমতাই মানুষের নেই। তাই তার গুণটিকে অথ্যধিক বড় করে দেখবার এবং তার কামালিয়াতের স্বীকৃতি দেয়ার জন্যেই মানুষের ভাষায় এ ধরনের উপাধি বিশিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই কিন্তু যখন আল্লাহ তায়ালা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো একটি বিশেষ গুণ তার ওপর খতম হয়ে গেছে বলে চিহ্নিত করে দেন, তখন তাকেও মানুষের প্রয়োগকৃত শব্দের ন্যায় পরোক্ষ অর্থে ব্যভহার করার কোনো কারণ দেখি না। আল্লাহ যদি কাউকে খাতামুশ শোয়ারা বলতেন, তাহলে নিসন্দেহে তার অর্থ হতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পর আর কোনো নবীর জন্ম হওয়া অসম্ভব। কারণ আল্লাহ গায়েব এবং ভবিষ্যতের কথা জানেন কিন্তু মানুষ গায়েব এবং ভবিষ্যতের কথা জানে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে খাতামুন নাবীয়্যীন বলে দেয়া আর মানুষের পক্ষ থেকে কাউকে খাতামুশ শোয়ারা উপাধি কেমন করে এক পর্যায়ে হতে পারে?-(গ্রন্থকার)]

এ জন্যেই সমস্ত অভিধান বিশারদ ও তাফসীরকারগণ একযোগে খাতামুন নবীয়্যীন শব্দের অর্থ করেছেন ‘আখেরুন নাবীয়্যীন’ –অর্থাৎ নবীদের শেষ। আরবী অভিধান ও প্রবাদ অনুযায়ী ‘খাতাম’ –এর অর্থ ডাকঘরের মোহর নয়, চিঠির ওপর যার ছাপ লাগিয়ে চিঠি পোস্ট করা হয়, বরং এর অর্থ হচ্ছে সেই মোহর যা খামের মুখে এ উদ্দেশ্যে লাগানো হয় যে, তার ভেতর থেকে কোনো জিনিস বাইরে আসতে পারবে না এবং বাইরের কোনো জিনিস ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণী

কুরআনের পূর্বাপর আলোচনা ও আভিধানিক দিক দিয়ে শব্দটির যে অর্থ হয় রসূলুল্লাহ (সা)-এর বিভিন্ন ব্যাখ্যাও তা সমর্থন করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে কতিপয় হাদীসের উল্লেখ করছিঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৭৯ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ বনী ইসরাঈলীদের নেতৃত্ব করতেন আল্লাহর রসূলগণ। যখন কোনো নবী ইন্তেকাল করতেন তখন অন্য নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন কিন্তু আমার পরে কোনো নবী হবে না, হবে শুধু খলীফা”।–(বুখারী, মানাকিব অধ্যায়)

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৭৯ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত হল এই যে, এক ব্যক্তি একটি দালান তৈরী করল এবং খুব সুন্দর ও শোভনীয় করে সেটি সজ্জিত করল। কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের স্থান শূণ্য ছিল। দালানটির চতুর্দিকে মানুস ঘুরে ঘুরে তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছিল এবং বলছিল, এ স্থানে একটা ইট রাখা হয়নি কেন? কাজেই আমিই সেই ইট এবং আমিই সেই নবী। (অর্থাৎ আমার আসার পর নবুয়াতের দালান পূর্ণতা লাভ করেছে, এখন এর মধ্যে এমন কোনো শূন্য স্থান নেই যাকে পূর্ণ করার জন্যে আবার কোনো নবীর প্রয়োজন হবে”।–(বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, বাবু খাতামুন নাবীয়্যীন)।

এই একই বিষয়বস্তু সম্বলিত চারটি হাদীস শরীফে কিতাবুল ফাযায়েলের ‘বাবু খাতামুন নাবীয়্যীন’-এ উল্লেকিত হয়েছে। শেষ হাদীসটিতে নিম্নোক্ত অংশটুকু বর্ধিত হয়েছে (আরবী********) অর্থাৎ ‘তারপর আমি এসে নবীদের সিলসিলা খতম করে দিলাম’। ৱ

এই হাদীসটি তিরিমিযী শরফে একই শব্দ সম্বলিত হয়ে কিতাবুল মানাকিবের ‘বাবু ফাযালিন নবী’ এবং কিতাবুল আদাবের ‘বাবুল আমসালে’ বর্ণিত হয়েছে।

মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালাসীতে হাদীসটি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত হাদীসের সিলসিলায় উল্লেখিত হয়েছে। এর শেষ অংশটুকু হল (আরবী******) অর্থাৎ আামর মাধ্যমে নবীদের সিলসিলা খতম করা হল।

মুসনাদে আহমদ সামান্য শাব্দিক হেরফেরের সাথে এ ধরনের হাদীস হযরত উবাই ইবনে কা’ব, হযরত আবু সাঈদ খুদরী এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮০ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ ছ’টা ব্যাপারে অন্যান্য নবীদের ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। (ক) আমাকে পূর্ণ অর্থব্যঞ্জক সংক্ষিপ্ত কথা বলার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। (খ) আমাকে শক্তিমত্তা ও প্রতিপত্তি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। (গ) গণীমতের অর্থ-সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে। (ঘ) পৃথিবীর যমীনকে আমার জন্যে মসজিদে (অর্থাৎ আমার শরীয়াতে নামায কেবল বিশেষ ইবাদতগাহে নয়, দুনিয়ার প্রত্যেক স্থানে পড়া যেতে পারে) এবং মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে (অর্থাৎ শুধু পানিই নয়, মাটির সাহায্যে তায়াম্মুম করেও পবিত্রতা হাসিল অর্থাৎ অযু ও গোসলের কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে) পরিণত করা হয়েছে। (ঙ) আমাকে সারা দুনিয়ার জন্যে রসূল বানানো হয়েছে এবং (চ) আমার ওপর নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে”।–(মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮০ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ রিসালাত ও নবুয়াতের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে। কাজেই আমার পর আর কোনো রসূল ও নবী আসবে না”।–(তিরমিযী, কিতাবুল রুইয়া, বাবু যিহাবিন নবুয়াহ, মুসনাদে আহমদ, আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণিত)।

 

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেনঃ আমি মুহাম্মদ এবং আমি আহমদ। আমি বিলুপ্তকারী, আমার সাহায্যে কুফরকে বিলুপ্ত করা হবে। আমি সমবেতকারী, আমার পরে লোকদেরকে হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে। (অর্থাৎ আমার পরে শুধু কিয়ামতই বাকি আছে) আমি সবার শেষে আগমনকারী (এবং সবার শেষ আগমনকারী হচ্ছে সেই) যার পরে আর নবী আসবে না”।–(বুখারী ও মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, বাবু আসমাইন নবী; তিরমিযী, কিতাবুল আদাব, বাবু আসমাইন নবী মুয়াত্তা, কিতাবু আসমাইন নবী; মুসতাদরাক হাকেম, কিতাবুত তারিখ, বাবু আসমাইন নবী)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি তার উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করেননি। (কিন্তু তাদের যুগে সে বহির্গত হয়নি) এখন আমিই শেষ নবী এবং তোমরা শেষ উম্মত। দাজ্জাল নিসন্দেহে এখন তোমাদের মধ্যে বহির্গত হবে”।–(ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতানা, বাবুদ দাজ্জাল)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“আবদুর রহমান ইবনে জুবাইর বলেনঃ আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আসকে বলতে শুনেছি, একদিন রসূলুল্লাহ (সা( নিজের ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের মধ্যে তাশরীফ আনলেন। তিনি এভাবে আসলেন যেন আমাদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তিনবার বললেন, আমি উম্মী নবী মুহাম্মদ। তারপর বললেন, আমার পর আর কোনো নবী নেই”।–(মুসনাদে আহমদ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা)-এর বর্ণনা)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমার পরে আর কোনো নবুয়াত নেই। আছে কেবল সুসংবাদদানকারী কথার সমষ্টি। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! সুসংবাদদানকারী কথাগুলো কি? জবাবে তিনি বললেন, ভাল স্বপ্ন। অথবা বললেন, কল্যাণময় স্বপ্ন। অর্থাৎ আল্লাহর অহী নাযিল হবার এখন আর কোনো সম্ভাবনা নেই। বড়জোর এতটুকু বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যদি কাউকে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয় তাহলে শুধু ভাল স্বপ্নের মাধ্যমেই তা দেয়া হবে”।–(মুসনাদে আহমদ, আবুত তোফায়েল বর্ণিত, নাসাঈ, আবু দাউদ)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮২ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেনঃ আমার পর যদি কোনো নবী হত তাহলে উমর ইবনে খাত্তাব সে সৌভাগ্য লাভ করত”।–(তিরমিযী, কিতাবুল মানাকিব)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮২ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-কে বলেনঃ আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসা (আ)-এর সাথে হারুন (আ)-এর সম্পর্কের মত। কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবী নেই”।–(বুখারী ও মুসলিম, কিতাবু ফাযায়েলিস সাহাবা)।

বুখারী ও মুসলিম তাবুক যুদ্ধের বর্ণনা প্রসঙ্গে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমদে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত দু’টি হাদীস হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হাদীসের শেষাংশ হল (আরবী********) ‘মনে রেখো আমার পর আর কোনো নবুয়াত নেই’। আবু দাউদ তিয়ালিসী, ইমাম আহমদ এবং মুহাম্মদ ইসহাক এ সম্পর্কে যে বিস্তারিত হাদীস উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, তাবুক যুদ্ধে রওয়ানা হবার পূর্বে রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-কে মদীনা তাইয়েবার হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে রেখে যাবার সিদ্ধান্ত করেন। এ ব্যাপারটি নিয়ে মুনাফিকরা তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে। তিনি গিয়ে রসূলুল্লাহ (সা)-কে বলেন, “হে আল্লহার রসূল! আপনি কি আমাকে শিশু ও মেয়েদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন? তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ ‘আমার সাথে তোমার সম্পর্ক তো মূসা (আ)-এর সাথে হারুণের সম্পর্কের মতো”। অর্থাৎ তুর পাহাড়ে যাবার সময় হযরত মূসা (আ) যেমন নবী ইসরাঈলদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে হযরত হারুন (আ)-কে পেছনে রেখে গিয়েছিলেন তেমনি মদীনার হেফাজতের জন্যে আমি তোমাকে পেছনে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রসূলুল্লাহ (সা)-এর মনে সন্দেহও জাগে যে, হযরত হারুন (আ)-এর সঙ্গে এবাবে তুলনা করার ফলে হয়ত পরে এ থেকে কোন ফিতনার সৃষ্টি হতে পারে।তাই পরমুহুর্তেই তিনি কথাটা স্পষ্ট করে বলে দেনঃ ‘তবে মনে রেখ, আমার পরে কোনো ব্যক্তি নবী হবে না’।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮২ পৃষ্ঠায়)

“হযরত সাওবান বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ …..আর কথা হচ্ছে এই যে, আমার উম্মতের মধ্যে তিরিশ জন মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হবে। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমার পর আর কোনো নবী নেই”।–(আবু দাউদ, কিতাবুল ফিতান)।

এই বিষয়বস্তু সম্বলিত আর একটি হাদীস আবু দাউদ ‘কিতাবুল মালাহিম’-এ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী ও হযরত সাওবান এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে এ হাদীস দু’টি বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় হাদীসটির শব্দ হলঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“অর্থাৎ এমনকি তিরিশ জনের মত প্রতারক আসবে। তারা প্রত্যেকেই নিজেকে আল্লাহর রসূল বলে দাবী করবে”।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেনঃ তোমাদের পূর্বে যেসব বনী ইসরাঈল অতীত হয়েছে তাদের মধ্যে অনেক লোক এমন ছিলেন যাদের সঙ্গে কালাম করা হয়েছে (আল্লাহ কথা বলেছেন), তাঁরা নবী ছিলেন না। আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ হয় তবে সে হবে উমর”।–(বুখারী, কিতাবুল মানাকিব)।

মুসলিমে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত যে হাদসি উল্লেখিত হয়েছে তাতে (আরবী****) এর পরিবের্ত (আরবী****)শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু মুকাল্লাম ও মুহাদ্দাস শব্দ দু’টি সমার্থক। অর্থাৎ এমন ব্যক্তি যার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কালাম করেছেন অথবা যার সাথে পর্দাল আড়াল থেকে কথা বলা হয়। এ থেকে জানা যায়, নবুয়াত ছাড়াও যদি এ উম্মতের মধ্যে কেউ আল্লাহর সাথে কালাম করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারতেন তবে তিনি হতেন একমাত্র হযরত উমর (রা)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমার পর আর কোনো নবী নেই আর আমার উম্মতের পর আর কোনো উম্মত নেই”।–(বায়হাকী, কিতুবর রুইয়া; তাবারানী)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমি শেষ নবী এবং আমর মসজিদ (অর্থাৎ মদীনার মসজিদে নববী) শেষ মসজিদ”।–[খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা এ হাদীস থেকে প্রমাণ করে যে, রসূলুল্লাহ (সা) যেমন তাঁর মসজিদকে শেষ মসজিদ বলেছেন, অথচ এটি মেষ মসজিদ নয়; এর পর দুনিয়ায় বেমুমার মসজিদ নির্মিত হয়েছে –অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন, তিনি শেষ নবী। এর অর্থ হলো এই যে, তাঁর পরেও নবী আসবে। অবশ্যি শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে তিনি হচ্ছেন শেষ নবী এবং তাঁর মসজিদ শেষ মসজিদ। কিন্তু আসলে এ ধরনের বিকৃত অর্থই এ কথা প্রমাণ করে যে, এ লোকগুলো আল্লাহ ও রসূল (সা)-এর কালামের অর্থ অনুধাবন করার যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মুসলিম শরীফের যে স্থানে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে সেখানে এ বিষয়ের সমস্ত হাদীস সামনে রাখলেই এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রসূলুল্লাহ (সা( তাঁর মসজিদ কোন অর্থে বলেছেন। এখানে হযরত আবু হুরাইরা (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত মায়মুনা (রা)-এর বর্ণনা ইমাম মুসলিম উদ্ধৃত করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, দুনিয়ায় মাত্র তিনটি মসজিদ এমন রয়েছে যেগুলো সাধারণ মসজিদগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। সেখানে নামায পড়লে অন্যান্য মসজিদের তুলনায় হাজার গুণ বেশী সওয়াব পাওয়া যায়। এ জন্যে একমাত্র এ তিনটি মসজিদে নামায পড়ার জন্যে সফর করা জায়েয। এ তিনটি ছাড়া দুনিয়ার আর যত মসজিদ আছে সেগুলোর সব ক’টিকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে একটিতে নামায পড়ার জন্যে সেদিকে সফর করা জায়েয নয়। এ বিশেষ তিনিট মসজিদের মধ্যে ‘মসজিদুল হারাম’ হচ্ছে প্রথম মসজিদ। হযরত ইবরাহীম (আ) এটি বানিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো ‘মসজিদে আকসা’। হযরত সুলাইমান (আ) এটি নির্মাণ করেছিলেন। আর তৃতীয়টি হচ্ছে মদীনার ‘মসজিদে নববী’। এটি নির্মাণ করেন রসূলুল্লাহ (সা)। রসূলুল্লাহ (সা)-এর বক্তব্যের অর্থ হলো, এখন যেহেতু আমার পর আর কোনো নবী আসবে না, সেহেতু আমার মসজিদের পর আর দুনিয়ায় আর চতুর্থ এমন কোনো মসজিদ নির্মিত হবে না, যেখানে নামায পড়ার সওয়াব অন্যান্য মসজিদের তুলনায় বেশী হবে এবং সেখানে নামায পড়ার উদ্দেম্যে সেদিকে সফর করা জায়েয হবে।–(গ্রন্থকার)] (মুসলিম, কিতাবুল হজ্জ, মক্কা ও মদীনার মসজিদে নামায পড়ার ফযিলত সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ)।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট থেকে বহুসংখ্যক সাহাবী হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন বহু মুহাদ্দিস অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সনদসহ এগুলো উদ্ধৃত করেছেন। এগুলো অধ্যয়ন করার পর স্পষ্ট জানা যায়, রসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে এ কথা পরিস্কার করে দিয়েছেন যে, তিনি শেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী আসবে না। নবুয়াতের সিলসিলা তাঁর ওপর খতম হয়ে গেছে এবং তাঁর পরে যে ব্যক্তি রসূল বা নবী হবার দাবী করবে সে হবে দজ্জাল ও কাজ্জাব।–[খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা নবী করীম (সা)-এর এ সমস্ত হাদীসের মোকাবিলায় হযরত আয়েশা বলে কথিত নিম্নোক্ত বর্ণনার উদ্ধৃতি দেয়। এতে বলা হয়েছেঃ (আরবী**************) অর্থাৎ “বলো, নিশ্চয়ই তিনি খাতামুন নাবীয়্যীন, তবে এ কথা বলো না যে, তাঁর পর আর নবী নেই। কিন্তু প্রথমতঃ নবী করীম (সা)-এ সুস্পষ্ট আদেশের মোকাবিলায় হযরত আয়েশা (রা)-এর কোনো কথা পেশ করা চরম ধৃষ্টতা ও বেআদবী ছাড়া আর কিছুই নয়। অধিকন্তু হযরত আয়েশা (রা)-এর উপরোক্ত উক্তির উল্লেখ নেই। কোনো বিখ্যাত হাদীস লিপিবদ্ধকারী হাদীসটি তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেননি। উপরোক্ত উক্তিটি ‘দুররে মনসুর’ নামক তাফসীর গ্রন্থ এবং ‘তাকমিলায়ে মাজমাউল বাহার’ নামক হাদীস অভিধান থেকে উদ্ধৃত করা হয়। কিন্তু এর সনদের কোনো উল্লেখ নেই।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর অসংখ্য সুস্পষ্ট হাদীস, যেগুলো শ্রেষ্ঠ ও নেতৃস্থানীয় মুহাদ্দিসগণ নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন, সেগুলো অস্বীকার করার জন্যে একজন মহিলা সাহাবীর বলে কথিত দুর্বলতম উক্তি পেশ করা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।] কুরআনের ‘খাতামুন নাবীয়্যীন’ শব্দ এর চেয়ে বেশী শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণীই এখানে সনদ ও চূড়ান্ত প্রমাণ। তদুপরি যখন তা কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা করে তখন তা আরও অধিক শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর চেয়ে বেশী কে কুরআনকে বুঝেছে এবং এর তাফসীর করার অধিকারী তিনি ব্যতীত আর কে হতে পারে? এমন কে আছে যে খতমে নবুয়াতের অন্য কোনো অর্থ বর্ণনা করবে এবং তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, সে সম্পর্কে চিন্তা করতেও আমরা প্রস্তুত।

সাহাবীদের ইজমা

কুরআন ও সুন্নাহর পর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা মতৈক্য হচ্ছে তৃতীয় গুরুত্বের অধিকারী। সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে প্রমাণ হয় যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই যেসব লোক নবুয়াতের দাবী করে এবং যারা তাদের নবুয়াত স্বীকার করে নেয় তাদের সবার বিরুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুদ্ধ করেন।

এ প্রসঙ্গে মুসাইলামা কাজ্জাবের ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াত অস্বীকার করেনি বরং তার দাবী ছিল, তাকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াতের অংশীদার করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের পূর্বে সে তাঁর কাছে যে চিঠি লিখেছিল তাতে বলা হয়েছিলঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “আল্লাহর রসূল মুসাইলামার তরফ হতে আল্লাহর রসূল মুহাম্মদের নিকট। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি জেনে রাখুন, আমাকে আপনার সাথে নবুয়াতের কাজে শরীক করা হয়েছে”।–(তারারী, ২য় খণ্ড, ৩৯৯ পৃষ্ঠা, মিসরে মুদ্রিত)। এছাড়াও তাতে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ’ বাক্যটিও বলা হত।

এভাবে সুস্পষ্ট ভাষায় রিসারাতে মুহাম্মদীকে স্বীকার করে নেয়ার পরও তাঁকে কাফের ও ইসলাম বহির্ভূত গণ্য করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে। ইতিহাস থেকে এ কথাও প্রমাণিত যে, বনু হুনায়ফা সরল অন্তঃকরণে (in good faith)  তাঁর ওপর ঈমান এনেছিল। অবশ্যি তারা এ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিল যে, নবী মুহাম্মদ (সা) নিজেই তাকে তাঁর নবুয়াতের কাজে শরীক করেছেন। এ ছাড়াও আর একটা কথা হল এই যে, এমন এক ব্যক্তি তাদের সামনে কুরআনের আয়াতকে মুসাইলামার ওপর অবতীর্ণ আয়াত হিসেবে পেশ করেছিল যে, মদীনা তাইয়েবা থেকে কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে গিয়েছিল। (ইবনে কাসীর লিখিত আল বেদয়া ওয়ান নেহায়া, ৫ম খণ্ড, ৫১ পৃষ্ঠা)। এতদসত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম (রা) তাদেরকে মুসলমান বলে স্বীকার করেননি। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এরপর মুরতাদ হওয়ার কারণে নয়, বরং বিদ্রোহের অপরাধে সাহাবীগণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, এ কথা বলার সুযোগ নেই বিদ্রোহী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যদি কখনও যুদ্দ করতে হয় তাহলে ইসলামী আইন অনুযায়ী তাদের যুদ্ধবন্দীদেরকে গোলাম বানান যাবে না। মুসলমানই বা কেন জিম্মীর বিদ্রোহ ঘোসনা করলে, গ্রেফতার হওয়ার পর তাদেরকেও গোলাম বানান যাবে না। কিন্তু মুসাইলামা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) ঘোষনা করেনঃ তাদের মেয়েদের ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকে গোলাম বানান হবে। গ্রেফতার করার পর দেখা গেলো সত্যিই তাদেরকে গোলাম বানানো হয়েছে। হযরত আলী (রা) তাদের মধ্য থেকেই এক যুদ্ধবন্দিনীর মালিক হন। এ যুদ্ধবন্দিনীর গর্ভজাত পুত্র মুহাম্মদ হানাফীয়া-[হানাফীয়া অর্থ হানাফীয়া গোত্রের মেয়ে।] হলেন পরবর্তীকালে ইসলামের সর্বজন পরিচিত ব্যক্তি।–(আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩১৬-৩২৫ পৃঃ)।

এ থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম যে অপরাধের কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন তা বিদ্রোহজনিত অপরাধ ছিল না বরং সে অপরাধ ছিল এই যে, এক ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা)-এর পর নবুয়াতের দাবী করে এবং লোকেরা তাঁর ওপর ঈমান আনে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের পরপরই এ পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) আর সাহাবীদের সমগ্র দলটি একযোগে তাঁর সহায়তা করেন। সাহাবীদের ইজমার এর চেয়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত কি হতে পারে!

আলেম সমাজের ইজমা

শরয়াতে সাহাবীদের ইজমার পর চতুর্থ পর্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হচ্ছে সাহাবীদের পরবর্তীকালের আলেম সমাজের ইজমা। এদিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় হিজরী প্রথম শতক থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগের সমগ্র মুসরিম জাহানের প্রত্যেক এলকার আলেম সমাজ হামেশাই এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যেঃ

মুহাম্মদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে কোনো ব্যক্তি নবী হতে পারে না এবং তাঁর পর যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করবে বা যে ব্যক্তি এ মিথ্যা দাবী মেনে নেবে, সে কাফের। মিল্লাতে ইসলামীয়ার মধ্যে তার স্থান নেই।

এ ব্যাপারে কতিপয় প্রমাণ উপস্থাপন করছিঃ

একঃ ইমাম আবু হানিফার (৮০-১৫০ হিঃ) যুগে এক ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করে।

সে বলেঃ আমাকে সুযোগ দাও, আমি আমার নবুয়াতের সাংকেতিক চিহ্ন পেশ করব। এ কথা শুনে ইমাম সাহেব বলেনঃ যে ব্যক্তি এর কাছ থেকে কোনো সাংকেতিক চিহ্ন তলব করবে সেও কাফের হয়ে যাবে। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, (আরবী*******) “আমার পর আর কোনো নবী নেই”। (মানাকিব ইমাম আযম আবু হানিফা, ইবনে আহমদ মক্কী লিখিত, ১ম খণ্ড, ১৬১ পৃঃ, হায়দ্রাবাদে প্রকাশিত ১৩২১ হিঃ)।

দুইঃ আল্লামা ইবনে জারীর তাবার (২২৪-৩১০ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত কুরআনের তাফসীরে (আরবী***********) আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ (আরবী***************) অর্থাৎ “যিনি নবুয়াতকে খতম করে দিয়েছেন এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। কাজেই কিয়ামত পর্যণ্ত এর দরজা আর কারো জন্যে খুলবে না”।–(তাফসরে ইবনে জারীর, ২২ খণ্ড, ১২ পৃষ্ঠা)।

তিনঃ ইমাম তাহাবী (২৩৯-৩২১ হিঃ) তাঁর ‘আকীদায়ে সালফীয়া’ গ্রন্থে পূর্ববর্তী নেতৃস্থানীয় আলেমগণ বিশেষ করে ইমাম আবু হানিফা (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র)-এর আকীদা বর্ণনা প্রসঙ্গে নবুয়াত সম্পর্কিত নিম্নোক্ত আকীদা লিপিবদ্ধ করেছেনঃ “আর মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর প্রিয় বান্দা, তাঁর বাছাই করা নবী ও প্রিয় রসূল। আর তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মুত্তাকীদের ইমাম, রসূলদের নেতা ও রব্বুল আলামীদের বন্ধু। তাঁর পরে নবুয়াতের প্রত্যেকটি দাবী গোমরাহী ও স্বার্থপূজারী নামান্তর”।–(শারহুত তাহাবীয়া ফিল আকীদাতিস সালফিয়া, দারুল মা’আরিফ, মিসর, পৃষ্ঠা ১৫, ৮৭, ৯৬,৯৭,১০০ ও ১০২)।

চারঃ আল্লামা ইবনে হাযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) লিখেছেনঃ “নিসন্দেহে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে অহীর সিলসিলা খতম হয়ে গেছে। এর স্বপক্ষে যুক্তি হচ্ছে এই যে, অহী আসে একমাত্র নবীর কাছে এবং মহান আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারও পিতা নয় কিন্তু সে আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী”।–(আল মুহাল্লা, ১ম খণ্ড, ২৬ পৃঃ)।

পাঁচঃ ইমাম গাজ্জালী (৪৫০-৫০৫ হিঃ) বলেনঃ –[ইমাম গাজ্জালীর বক্তব্য তাঁর আসল ভাসায় একানে হুবহু উদ্ধৃত করলাম। এর কারণ হচ্ছে খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা অত্যন্ত জোরেশোরে এ বরাতটির নির্ভূলতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।–(গ্রন্থকার)]

(আরবী***********************************************************************************পিডিএফ ১৮৭ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “যদি এ দরজা (ইজমাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করার দরজা) খুলে দেয়া হয়, তাহলে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। যেমন, কোনো ব্যক্তি যদি বলে আমাদের নী মুহাম্মদ (সা)-এর পরে অন্য কোন নবীর আগমন সম্ভব, তাহলে তাকে কাফের আখ্যা দেয়ার ব্যাপারে ইতস্ততঃ করাজে জায়েয প্রমাণ করতে হলে নিসন্দেহে ইজমার আশ্রয় নিতে হবে। কারণ বুদ্ধি তার নাজায়েয হবার সিদ্ধান্ত দেয় না। আর কুরআন ও হাদীসের ব্যাপারে বলা যায়, এ আকীদা সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেঃ ‘আমার পরে আর নবী নেই’ এবং ‘শেষ নবী’ এ বাক্য দু’টির মনগড়া অর্থ করা মোটেই কঠিন হবে না। সে বলতে পারে ‘শেষ নবী’ অর্থ শ্রেষ্ঠ পয়গন্বরদের আগমনের সমাপ্তি। আর যদি বলা হয় ‘নাবীয়্যীন’ শব্দ সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তাহলে এ সাধারনকে বিশ্লেষণ করা তার পক্ষে মোটেই কঠিন হবে না। আমার পরে আর নবী নেই –এ বাক্যটি সম্পর্কে সে বলতে পরে, ‘এ কথা তো বলা হয়নি যে আমার পরে আর রসূল নেই’। রসূল ও নবীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নবীর মর্যাদা রসূলের চেয়ে বেশী। মোটকথা এ ধরনের বহু আজেবাজে কথা বলা যেতে পারে। আর নিছক শাব্দিক বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন মনগড়া অর্থ করার পথ বন্ধ করা সম্ভবও নয়। বরং উপমায় বহিরঙ্গের (মনগড়া) অর্থ করার ব্যাপারে এর চেয়েও দূরবর্তী অর্থের সম্ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। আর এ ধরনের অর্থ গ্রহণকারীদের সম্পর্কে আমরা এ কথা বলতে পারি না যে, তারা কুরআন ও হাদীস অস্বীকার করছে। কিন্তু এদর বক্তব্যের প্রতিবাদে আমরা বলবো, সমগ্র মুসলিম উম্মত সর্বসম্মিলিতভাবে এ শব্দ (অর্থাৎ আমার পরে আর নবী নেই) ও নবী করীম (সা)-এর অবস্থা থেকে এ কথাই বুঝেছে যে, নবী করীম (সা)-এর বক্তব্যের অর্থ ছিলঃ তাঁর অবস্থা থেকে এ কথাই বুঝেছে যে, নবী করীম (সা)-এর বক্তব্যের অর্থ ছিলঃ তাঁর পরে না আর কোনো নবী আসবে, না রসূল। তাছাড়া সমগ্র মুসলিম উম্মত একযোগে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, এ ব্যাপারে কোনো প্রকার তা’বীল, মনগড়া বা দূরবর্তী অর্থ গ্রহণের কোনো অবকাশ নেই। কাজেই এহেন ব্যক্তিকে ইজমা অস্বীকারকারী ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না”। -(আল ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ, আল মাতবা’আতুল আবদীয়া, মিসর, ১১৪ পৃষ্ঠা)।

ছয়ঃ মুহীউস সুন্নাহ বাগাবী (মৃত্যুঃ ৫১০ হিঃ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থ মা’আলিমুত তানযীল-এ লিখেছেনঃ রসূলুল্লাহ (সা)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নবুয়াতের সিলসিলা খতম করেছেন। কাজেই তিনি সর্বশেষ নবী …… ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহ তায়ালা (এ আয়াতে) ফায়সালা করে দিয়েছেন যে, মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী হবে না।–(৩য় খণ্ড, ১৫৮ পৃঃ)।

সাতঃ আল্লামা যামাখশারী (৪৬৭-৫৩৮ হিঃ) তাফসীরে কাশশাফে লিখেছেন যদি তোমরা বল, রসূলুল্লাহ (সা) শেষ নবী কেমন করে হলেন, যেখানে হযরত ঈসা (আ) শেষ যুগে অবতীর্ণ হবেন, তাহলে আমি বলব, রসূলুল্লাহ (সা)-এর শেষ নবী হওয়ার অর্থ হল, তাঁর পরে আর কাউকে নবীর পদে প্রতিষ্ঠিত করা হবে না। হযরত ঈসা (আ)-কে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পূর্বে নবী বানান হয়েছে। পরবর্তীকালে অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীয়াতের অনুসারী হবেন এবং তাঁর কিবলার দিকে মুক করে নামায পড়বেন। অর্থাৎ তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত”।–(২য় খণ্ড, ২১৫ পৃঃ)।

আটঃ কাজী ইয়ায (মৃত্যুঃ ৫৪৪ হিঃ) লিখেছেন, যে ব্যক্তি নিজে নবুয়াতের দাবী করে অথবা নিজের প্রচেষ্টায় নবুয়াত অর্জন করা এবং অন্তত পরিশুদ্ধির মাধ্যমে নবীর পর্যায়ে উন্নীত হওয়া সম্ভব মনে করে (যেমন কোনো কোনো দার্শনিক ও বিকৃতমনা সুফী মনে করেন), এভাবে যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করে না অথচ তার ওপর অহী নাযিল হবার দাবী করে –এ ধরনের সমস্ত লোক কাফের এবং রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। কেননা তিনি খবর দিয়েছেন যে, তিনি শেষ নবী এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না। আবার তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে খবর দিয়েছেন যে, তিনি নবুয়াতের পরিসমাপ্তি টেনেছেন এবং সমগ্র মানব জাতির জন্যে তাঁকে পাঠান হয়েছৈ। সমগ্র মুসলিম সমাজ এ ব্যাপারে একমত যে, এখানে কথাটির বাহ্যিক অর্থই গ্রহণীয় এবং এর দ্বিতীয় কোনো অর্থ গ্রহণ করার সুযোগই এখানে নেই। কাজেই উল্লিখিত দলগুলোর কাফের হওয়া সম্পর্কে কুরআন, হাদীস ও ইজমার দৃষ্টিতে কোনো সন্দেহ নেই।–(শিফা, ২য় খণ্ড, ২৭০-২৭১ পৃঃ)।

নয়ঃ আল্লামা শাহারিস্তান (মৃত্যুঃ ৫৪৮ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত আলমিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে লিখেছেনঃ আর এভাবে যে ব্যক্তি বলে …..মুহাম্মদ (সা)-এর পর কোনো নবী আসবে [হযরত ঈসা (আ) ছাড়া], তার কাফের হবার ব্যাপারে দু’জন লোকের মধ্যেও কোনো মতবিরোধ নেই।–(৩য় খণ্ড, ২৪৯ পৃঃ)।

দশঃ ইমাম রাযী (৫৪৩-৬০৬ হিঃ) তাঁর তাফসীরে কবীর গ্রন্থে ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেনঃ এ বর্ণনা প্রসঙ্গে ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ শব্দ বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, যে  নবীর পরে অন্য কোনো নবী আসবেন তিনি যদি উপদেশ ও নির্দেশাবলীর ব্যাপারে কিছু অপূর্ণ রেখে যান তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তা পূর্ণ করতে পারবেন কিন্তু যাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না তিনি নিজের উম্মতের ওপর খুব বেশী স্নেহশীল হন এবং তাদেরকে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব দান করেন। কারণ তাঁর দৃষ্টান্ত এমন একজন পিতার ন্যায় যিনি জানেন তাঁর মৃত্যুর পর পুত্রের আর কোনো অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক থাকবে না।–(৬ষ্ঠ খণ্ড, ৫৮১ পৃঃ)।

এগারঃ আল্লামা বায়যাবী (মৃঃ ৬৮৫ হিঃ) তাঁর তাফসীরে ‘আনওয়ারুত তানযীল’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ অর্থাৎ তিনিই শেষ নবী। তিনি নবীদের সিলসিলা খতম করে দিয়েছেন। অথবা তাঁর কারণেই নবীদের সিলসিলার ওপর মোহর লাগান হয়েছে। আর তাঁর পরে হযরত ঈসা (আ)-এর নাযিল হওয়ার কারণে খতমে নবুয়াতের ওপর কোনো দোষ আসছে না। কারণ তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বীনের অনুসারী হয়ে নাযিল হবেন।–(৪র্থ খণ্ড, ১৬৪ পৃঃ)।

বারঃ আল্লামা হাফেজ উদ্দীন নাসাফী (মৃঃ ৮১০ হিঃ) তাঁর তাফসীরে মাদারেকুত তানযীল গ্রন্থে লিখেছেনঃ আর রসূলুল্লাহ (সা) হচ্ছেন খাতামুন নাবীয়্যীন। অর্থাৎ তিনিই সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো ব্যক্তিকে নবী করা হবে না। হযরত ঈসা (আ) এর ব্যাপারটি হচ্ছে এই যে, তাঁকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পূর্বে নবীর পদে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। পরে যখন তিনি নাযিল হবেন তখন তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীয়াতের অনুসারী। অর্থাৎ তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর উম্মত।–(৪৭১ পৃঃ)।

তেরঃ আল্লামা আলাউদ্দীন বাগদাদী (মৃঃ ৭২৫ হিঃ) তাঁর তাফসীরে খাযেন গ্রন্থে লিখেছেনঃ (আরবী******) অর্থাৎ আল্লাহ রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর নবুয়াত খতম করে দিয়েছেন। কাজেই তাঁর পরে আর কোনো নবুয়াত নেই এবং তাঁর পরে তাঁর নবুয়াতের কোনো অংশীদারও নেই। (আরবী**********) অর্থাৎ আল্লাহ এ কথা জানেন যে, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই।–(৪৭১-৪৭২ পৃষ্ঠা)।

চৌদ্দঃ আল্লামা ইবনে কাসীর (মৃঃ ৭৪ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত তাফসীরে লিখেছেন অতপর আলোচ্য আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই। আর যখন তাঁর পরে কোনো নবী নেই তখন রসূলের প্রশ্নই ওঠে না। কেননা রিসালাত একটা বিশেষ পদপর্যাদা এবং নবুয়াতের পদমর্যাদা সাধারণধর্মী প্রত্যেক রসূল নবী হন কিন্তু প্রত্যেক নবী রসূল হন না। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর যে ব্যক্তি এ পদমর্যাদার দাবী করবে সে হবে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, দাজ্জাল, গোমরাহ এবং অন্যকে গোমরাহকারী। সে যতই প্রাকৃতিক নিয়মে বিপর্যয় সৃষ্টি করে ও জাদুর তেলেসমতী দেখিয়ে মানুষের চোখে ধুম্রজাল সৃষ্টি করুক না কেন তার দাবী মানা যেতে পারে না। …. কিয়ামত পর্যন্ত এ পদমর্যাদার দাবীদার প্রত্যেকটি ব্যক্তির অবস্থা একই ধরনের হবে।–(৩য় খণ্ড, ৪৯৩-৪৯৪ পৃঃ)

পনেরঃ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী (মৃঃ ৯১১ হিঃ) তাঁর তাফসীরে জালালায়েন গ্রন্থে লিখেছেনঃ (আরবী*************) অর্থাৎ আল্লাহ জানেন যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই এবং হযরত ঈসা (আ) নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীয়াত অনুযায়ী আমল করবেন”।–(৭৬৮ পৃঃ)।

ষোলঃ আল্লামা ইবনে নুজাইম (মৃঃ ৯৭০ হিঃ) উসূলে ফিকাহর মহুর কিতাব আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ের-এর ‘কিতাবুস সিয়ারের বাবুর রিদ্দা’য় লিখেছেনঃ যদি কেউ নবী মুহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী মনে না করে, তাহলে সে মুসলমান নয়। কেননা এ কথাগুলো জানা ও এগুলোকে স্বীকার করে নেয়া দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত।–(১৭৯ পৃষ্ঠা)।

সতেরঃ শায়খ ইসমাঈল হাক্কী (মৃত্যু ১১৩৭ হিঃ) তাফসীরে রুহুল বয়ান গ্রন্থে উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ আসেম-[তাজবীদ শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম।–(অনুবাদক)] ‘খাতাম’ শব্দটির ‘তা’ এর ওপর জবর লাগিয়ে পড়েছেন। এর অর্থ হয় খতম করার যন্ত্র, যার সাহায্যে মোহর লাগান হয়।

অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (সা) সকল নবীর শেষে এসেছেন এবং তাঁর সাহায্যে নবীদের সিলসিলার ওপর মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। ফারসীতে একে বলা হবে ‘মোহরে পয়গম্বঁরা’। অর্থাৎ তাঁর সাহায্যে নবুয়াতের দরজা মোহর লাগিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং পয়গম্বরদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য ক্বারীগণ ‘তা’ এর নীচে জের লাগিয়ে পড়েছেন ‘খাতিমুন নাবীয়্যীন’। এর অর্থ হয়, তিনি ছিলেন মোহরকারী। অন্য কথায় বলা যায়, পয়গম্বরদের ওপর মোহরকারী। এভাবে এ শব্দটিও ‘খাতাম’-এর সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর তাঁর উম্মতের আলেম সমাজ এখন উত্তরাধিকার সূত্রে পাবেন একমাত্র তাঁর প্রতিনিধিত্ব। তাঁর ইন্তেকালের সাথে সাথেই নবুয়াতের উত্তরাধিকারেরও পরিসমাপ্তি ঘটেছে এবং তাঁর পরে হযরস ঈসা (আ)-এর নাযিল হওয়ার ব্যাপারটি তাঁর নবুয়াতকে ত্রুটিযুক্ত করবে না। কেননা খাতিমুন নাবীয়্যীনের অর্থ হচ্ছে এই যে, তাঁর পরে আর কাউকে নবী বানান হবে না এবং হযরত ঈসা (আ)-কে তাঁর পূর্বে নবী বানান হয়েছে। কাজেই তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসারীদের মধ্যে শামিল হবেন, রসূলুল্লাহ (সা)-এর কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়বেন এবং তাঁরই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তখন হযরত ঈসা (আ)-এর ওপর অহী নাযিল হবে না এবং তিনি কোনো নতুন আহকাম জারি করবেন না। বরং তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতিনিধি। …..আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের নবীর পরে কোনো নবী নেই। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী********************) অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী। আর রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ (আরবী*****) “আমার পরে আর কোনো নবী নেই”। কাজেই বর্তমানে যে ব্যক্তি বলবে, মুহাম্মদ (সা)-এর পরে নবী আছে, তাকে কাফের বলা হবে। কারণ সে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট ঘোষণাকে অস্বীকার করবে। কারণ সুস্পষ্ট যুক্তি প্রমাণের পর হক বাতিল থেকে পৃথক হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াদের দাবী করবে তার দাবী বাতিল হয়ে যাবে।–(২২ খণ্ড, ১৮৮ পৃষ্ঠা)।

ঊনিশঃ ফতওয়া-ই-আলমগীরীঃ হিন্দুস্তানের বাদশাহ আলমগীরের নির্দেশে বারশ’ হিজরীতে উপমহাদেশের বিশিষ্ট আলেমগণ সম্মিলিতভাবে এ কিতাবটি লিপিবদ্ধ করেন। এতে বলা হয়েছেঃ যদি কেউ মনে করে মুহাম্মদ (সা) শেষ নবী নয়, তাহলে সে মুসলিম নয়। আর যদি সে নিজেকে আল্লাহর রসূল বা পয়গম্বর বলে দাবী করে তাহলে তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা হবে।–(২য় খণ্ড, ২৬৩ পৃষ্ঠা)।

বিশঃ আল্লামা শওকানী (মৃত্যু ১২৫৫ হিজরী) তাঁর তাফসীর ফাতহুল কাদীরে লিখেছেনঃ সমগ্র মুসলিম সমাজ ‘তা’ এর নীচে যের লাগিয়ে ‘খাতিম’ শব্দটি পড়েছেন। একমাত্র আসেব যবর লাগিয়ে পড়েছেন। প্রথমটার অর্থ হল, রসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত নবীদের ধারাবাহিকতা খতম করেছেন অর্থাৎ তিনি সবার শেষে এসেছেন। আর দ্বিতীয়টার অর্থ হল, তিনি সমস্ত পয়গম্বরদের জন্যে মোহরের ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর অর্থ হল, তিনি সমস্ত পয়গম্বরদের জন্যে মোহরের ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর সাহায্যে নবীদের সিলসিলা মোহর এঁটে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর ফলে তাদের দলটি সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়েছে।–(৪র্থ খণ্ড, ২৭৫ পৃষ্ঠা)।

একুশঃ আল্লামা আলুসী (মৃত্যু ১২৮০ হিজরী) তাফসীরে ‘রুহুল মা’আনী’তে লিখেছেনঃ নবী শব্দটি রসূলের চেয়ে বেশী সাধারণ অর্থব্যঞ্জক। কাজেই রসূলের খাতামুন নাবীয়্যীন হবার অর্থ হল এই যে, তিনি খাতামুল মরসালীনও। তিনি শেষ নবী এবং শেষ রসূল এ কথার অর্থ হলো, এ দুনিয়ায় তাঁর নবুয়াতের গুণে গুণান্বিত হওয়ার পরেই মানুষ ও জ্বিনের মধ্য থেকে এ গুণটি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।–(২২ খণ্ড, ৩২ পৃষ্ঠা)। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর যে ব্যক্তি নবুয়াতের অহী লাভ করার দাবী করবে তাকে কাফের বলে গণ্য করা হবে। এ ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে দ্বিমতের অবকাশ নেই।–(২২ খণ্ড, ৩৮ পৃষ্ঠা)। রসূলুল্লাহ (সা) শেষ নবী –এ কথাটি কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ (সা) শেষ নবী –এ কথাটি কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত এটিকে সুস্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করেছে এবং সমগ্র মুসলিম সমাজ এর ওপর আমল করেছে। কাজেই যে ব্যক্তি এর বিরোধী কোন দাবী করবেন, তাকে কাফের গণ্য করা হবে।–(২২ খণ্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা)

হিন্দুস্তান থেকে মরক্কো ও আন্দালুসিয়া এবং তুরস্ক থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ আলেম, ফকীহ, মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা এবং মতামত আমি এখানে উল্লেখ করলাম। তাঁদের নামের সাথে সাথে তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু তারিখও উল্লেখ করেছি। এ থেকে প্রথম দৃষ্টিতেই যে কোন ব্যক্তি আন্দাজ করতে পারবেন যে, হিজরীর প্রথম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ এর মধ্যে শামিল আছেন। হিজরী চতুর্দশ শতকের আলেম সমাজের মতামতও আমি এখানে উল্লেখ করতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছা করেই তাদের মতামতের উদ্ধৃতি দেইনি। কারণ তাদের মতামত ও ব্যাখ্যার জবাবে কেউ হয়তো এ কথা বলতে পারেন যে, তাঁরা এ যুগের নবুয়াতের দাবীদারের প্রতি জিদের বশবর্তী হয়ে খতমে নবুয়াতের এ অর্থ বিবৃত করেছেন। তাই আমি পূর্ববর্তী যুগের আলেম সমাজের মতামতের উদ্ধৃতি দিয়েছি। বলা বাহুল্য আজকের যুগের কারও সাথে তাদের কোন বিরোধের প্রশ্নই উঠে না। এসব মতামত থেকে এ কথা চুড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, হিজরীর প্রথম শতক থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম জাহান একযোগে খাতামুন নাবীয়্যীন শব্দের অর্থ নিয়েছে শেষ নবী। প্রত্যেক যুগের মুসলমানরা এ একই আকীদা পোষণ করেছে যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর নবুয়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাপারেও কোনোকারে কোনো মতবিরোধ হয়নি যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পরে যে ব্যক্তিই রসূল অথবা নবী হবার দাবী করবে আর যে ব্যক্তি তার দাবী মেনে নেবে তারা কাফের হয়ে যাবে।

এ আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তিই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন যে, খাতামান নাবীয়্যীন শব্দের যে অর্থ আরবী অভিধান থেকে প্রমাণিত হয়, কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা থেকে যে অর্থ প্রতীয়মান হয়, রসূলুল্লাহ  (সা)-এর যা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সাহাবায়ে কেরাম যে ব্যাখ্যার মতৈক্য প্রকাশ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামের পর থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম সমাজ দ্ব্যর্থহীনভাবে যা স্বীকার করে আসছেন, তার বিপক্ষে দ্বিতীয় কোনো অর্থ গ্রহণ অর্থাৎ কোনো নতুন দাবীদারের জন্যে নবুয়াতের দরজা উন্মুক্ত করার অবকাশ ও সুযোগ থাকে কি? আর সেই সব লোককেও বা কেমন করে মুসলমান বলে স্বীকার করে নেয়া যায় যারা নবুয়াতের দরজা উন্মুক্ত করার নিছক ধারণাই পোষন করেনি বরং এ দরজা দিয়ে এক ব্যক্তি নবুয়াতের দারানে প্রবেশ করেছে এবং তারা তাঁর নবুয়াতের ওপর ঈমানও এনেছে?

এ প্রসঙ্গে আরো তিনটি কথা বিবেচনা করতে হবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

প্রথম কথা হল, নবুয়াতের ব্যাপারটি বড়ই নাজুক। কুরআনের দৃষ্টিতে এ বিষয়টি ইসলামের মৌলিক আকীদার অন্তর্ভুক্ত। এটি স্বীকার করার ও না করার ওপর মানুষের ঈমান ও কুফরী নির্ভর করে। যদি কোনো ব্যক্তি নবী হয়ে থাকেন এবং লোকেরা তাকে না মানে তাহলে তারা কাফের হয়ে যায়। আবার কোনো ব্যক্তি নবী না হওয়া সত্ত্বেও যদি লোকেরা তাকে নবী বলে মেনে নেয় তাহলে তারাও কাফের হয়ে যায়। এ ধরনের নাজুক পরিস্থিতিতে আল্লাহর নিকট থেকে কোনো প্রকার অসতর্কতার চিন্তাই করা যায় না। যদি নবী মুহম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী আসার না থাকত তাহলে আল্লাহ নিজেই কুরআনে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা ব্যক্ত করতেন, রসূলুল্লাহ (সা)-এর মাধ্যমে প্রকাশ্যভাবে তা ঘোষণা করতেন এবং রসূলুল্লাহ (সা)ও কখনও এ দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যেতেন না যতক্ষণ না তিনি সমগ্র উম্মতকে এ ব্যাপারে পুরোপুরি অবগত করতেন যে তাঁর পরে আরও নবী আসবেন এবং তাদেরকে আমাদের মেনে নিতে হবে। আমাদের দ্বীন ও ঈমানের সাথে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সা)-এর কি দুশমনি ছিল যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর নবুয়াতের দরজা তো উন্মুক্ত থাকবে এবং এ দরজা দিয়ে কোনো নবী প্রবেশ করবেন। যার ওপর ঈমান না আনলে আমরা মুসলমান থাকতে পারি না –অথচ আমাদেরকে এ সম্পর্কে শুধু বেখবরই রাখা হয়নি বরং বিপরীত পক্ষে আল্লাহ এবং তাঁর রসূল একযোগে এমন সব কথা বলেছেন, যার ফলে তেরশ’ বছর পর্যন্ত সমগ্র উম্মত এ কথাই মনে করত এবং আজও মনে করে যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না?

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম নবুয়াতের দরজা উন্মুক্ত আছে এবং কোনো নবী এসেও গেছেন। এ অবস্থায় আমরা নির্দ্বিধায় তাকে অস্বীকার করে বসব। ভয় থাকতে পারে একমাত্র আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসাবাদের। কিন্তু কিয়ামতের দিন তিনি আমাদের কাছে এ সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করলে আমরা সোজাসুজি উল্লিখিত রেকর্ডগুলো তাঁর আদালতে পেশ করব। এ থেকে প্রমাণ হয়ে যাবে (মা’আযাল্লাহ) আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতই আমাদেরকে এ কুফরীর মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল। আমরা নির্ভয়ে বলতে পারি, এসব রেকর্ড দেখার পর কোনো নতুন নবীর ওপর ঈমান না আনার জন্যে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শাস্তি দেবেন না। কিন্তু যদি সত্যিই নবুয়াতের দরজা বন্ধ হয়েই থাকে এবং আর কোনো নবী আসার সম্ভাবনা না থাকে আর এ সত্ত্বেও এক ব্যক্তি নবুয়াতের দাবীদারের ওপর ঈমান আনে, তাহলে এ অবস্থায় তার চিন্তা করা উচিত, এ কুফরীর অপরাধ থেকে বাঁচার জন্যে সে আল্লাহর আদালতে এমনকি রেকর্ড পেশ করতে পারে, যার ফলে সে মুক্তি লাভের আশা করতে পারে। আদালতে হাযির হবার পূর্বে তার নিজের জবাবদিহির জন্যে সংগৃহীত দলিল-প্রমাণগুলো এখানেই বিশ্লেষণ করে নেয়া উচিত। আর আমরা যেসব দলিল-প্রমাণ পেশ করেছি সেগুলার সাথে তার নিজের দলিল-প্রমাণগুলো পর্যালোচনা করে তার বিচার করা উচিত যে, যে সাফাইয়ের ওপর নির্ভর করে সে এ কাজ করছে, কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি এর ওপর নির্ভর করে কুফরীর শাস্তি ভোগ করার বিপদ টেনে নিতে পারে?

এখন নতুন নবীর প্রয়োজনটা কি?

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হচ্ছে এই যে, ইবাদাত ও নেক কাজে তরক্কী করে কোনো ব্যক্তি নিজের মধ্যে নবুয়াতের গুণ পয়দা করতে পারে না। নবুয়াত এমন কোনো পুরস্কার নয় যা কোনো বিরাট খেদমতের বিনিময়ে মানুষকে দান করা হয়। বরং এ একটি মর্যাদা যা বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ারা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে দান করে থাকেন। এ প্রয়োজনের সময় যখন আসে তখন আল্লাহ এক ব্যক্তিকে এ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন এবং যখন প্রয়োজন হয় না বা থাকে না, তখন অযথা আল্লাহ একের পর এক নবী পাঠাতে থাকেন না। কোন পরিস্থিতিতে নবী পাঠাবার প্রয়োজন দেখা দেয় –কুরআন মজীদ থেকে এ তথ্য জানার চেষ্টা করলে জানতে পারা যায় যে, শুধুমাত্র চার ধরনের পরিস্থিতিতে নবী প্রেরিত হয়েছেনঃ

একঃ কোনো বিশেষ জাতির মধ্যে নবী পাঠাবার প্রয়োজন দেখা দেয় এ জন্যে যে, তাদের মধ্যে ইতপূর্বে কোনো নবী আসেননি এবং অন্য জাতির মধ্যে পাঠান নবীর পয়গামও তাদের নিকট পৌঁছেনি।

দুইঃ নবী পাঠাবার প্রয়োজন এ জন্যে দেখা দেয় যে, পূর্ববর্তী নবীর শিক্ষা মানুষ ভুলে গেছে অথবা তা বিকৃত করেছে এবং সে নবীর দেখান পথ অনুসরণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তিনঃ পূর্ববর্তী নবীর মাধ্যমে জনগণের শিক্ষা পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি এবং দ্বীনের পূর্ণতার জন্যে অতিরিক্ত নবী প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

চারঃ কোনো নবীর সাহায্য-সহযোগিতার জন্যে আর একজন নবীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

বলা বাহুল্য রসুলুল্লাহ (সা)-এর পর উপরোল্লিখিত কারণগুলোর কোনো একটিও বর্তমান নেই।

কুরআন নিজেই বলছে, রসূলুর্লাহ (সা)-কে সারা দুনিয়ার জন্যে হেদায়াতকারী হিসেবে পাঠান হয়েছ। দুনিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাস এ কথা বলে যে, তাঁর নবুয়অত প্রাপ্তির পর থেকে সমগ্র দুনিয়ার এমন অবস্থা বিরাজ করছে যার ফলে তাঁর দাওয়াত দুনিয়ার সব জাতির মধ্যে পৌঁছতে পারে। এরপরও প্রত্যেক জাতির মধ্যে আলাদা আলাদা পয়গম্বর পাঠাবার কোনো প্রয়োজন থাকে না।

কুরআন এ কথাও বলে এবং এ সঙ্গে হাদীস ও সীরাতের যাবতীয় বর্ণনাও এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর শিক্ষা পুরোপুরি নির্ভুল ও নির্ভেজালরূপে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে কোনো প্রকার বিকৃতি বা রদবদল হয়নি। তিনি যে কুরআন এনেছিলে আজ পর্যন্ত তার মধ্যে একটি শব্দও কমবেশী হয়নি। এবং কিয়ামত পর্যন্তও তা হতে পারবে না। নিজের কথা ও কর্মের মাধ্যমে তিনি যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাও আমরা এমনভাবে পেয়ে যাচ্ছি যেন আমরা তাঁরই যুগে বাস করছি। কাজেই দ্বিতীয় প্রয়োজনটাও খতম হয়ে গেছে।

আবার কুরআন মজীদ রসূলুল্লাহ (সা)-এর মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে পূর্ণতা দান করার কথা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে। কাজেই দ্বীনের পূর্ণতার জন্যেও এখন আর কোনো নবীর প্রয়োজন নেই।

এখন বাকি থাকে চতুর্থ প্রয়োজন। এ সম্পর্কে আমার বক্তব্য হল এ জন্যে যদি কোনো নবীর প্রয়োজন হত তাহলে রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে তাঁর সঙ্গেই তাঁকে পাঠান হত। কিন্তু সবাই জানে, এমন কোনো নবী রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে পাঠান হয়নি। কাজেই এ কারণটাও বাতিল হয়ে গেছে।

এখন আমরা জানতে চাই, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে আর একজন নতুন নবী আসার পঞ্চম কারণটা কি? যদি কেউ বলে, সমগ্র উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, কাজেই তাদের সংস্কারের জন্যে আর একজন নতুন নবীর প্রয়োজন, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করবঃ নিছক সংস্কারের উদ্দেশ্যে দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো নবী এসেছেন কি, যে আজ শুধু এ কাজের জন্যে একজন নবী আসবেন? নবী পাঠাবার কারণ হচ্ছে এই যে, তাঁর ওপর অহী নাযিল করা হয়। আর অহীর প্রয়োজন পড়ে কোনো নতুন পয়গাম দেবার অথবা পূর্ববর্তী পয়গামকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে। আল্লাহর কুরআন ও রসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাত সংরক্ষিত হয়ে যাবার পর যখন দ্বীন পূর্ণতা লাভ করেছে এবং অহীর সমস্ত সম্ভাব্য প্রয়োজন খতম হয়ে গেছে, তখন সংস্কারের জন্যে একমাত্র সংস্কারকের প্রয়োজনই বাকি রয়ে গেছে –নবীর প্রয়োজন নয়।

নতুন নবুয়াত বর্তমান উম্মতের জন্যে রহমতের বার্তাবহ নয়

তৃতীয় উল্লেখযোগ্য কথা হচ্ছে, কোনো জাতির মধ্যে নবী আসার সাথে সাথেই তাদের মধ্যে ঈমান ও কুফরীর প্রশ্ন উঠবে। যারা ঐ নবীকে স্বীকার করে নেবে তারা এক উম্মতভুক্ত হবে। আর যারা তাকে অস্বীকার করবে তারা অবশ্যি আর একটি পৃথক উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ বুদই উম্মতের মতবিরোধ কোনো আংশিক বা খুঁটিনাটি মতবিরোধ বলে গণ্য হবে না। বরং তা একজন নবীর ওপর ঈমান আনার পর্যায়ে এমন একটি মৌলিক মতবিরোধ নেমে আসবে, যার ফলে তাদের একটি দল যতদিন না নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস ত্যাগ করবে ততদিন পর্যন্ত অন্য দলের সাথে কখনও একত্র হতে পারবে না। এ ছাড়াও কার্যতঃ তাদের উভয়ের জন্যে হেদায়াত ও আইনের উৎস হবে বিভিন্ন। কারণ একটি দল তাদের নিজেদের নবীর অহী ও সুন্নাত থেকে আইন প্রণয়ন করবে এবং দ্বিতীয় দলটি এ দু’টিকে তাদের আইনের উৎস হিসেবে মেনে নিতে সরাসরি অস্বীকার করবে। কাজেই তাদের উভয়ের একত্রে একটি সমাজ সৃষ্টি কখনও সম্ভব হবে না।

এ উজ্জ্বল সত্যগুরো পর্যবেক্ষণ করার পর যে কোনো ব্যক্তি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে, ‘খতমে নবুয়াত’ মুসলিম মিল্লাতের জন্যে আল্লাহ তায়ালার একটি বিরাট রহমতস্বরূপ। এরই বদৌলতে সমগ্র মুসলিম মিল্লাত একটি চিরন্তন বিশ্বব্যাপী ভ্রাতৃত্বের শামিল হতে পেরেছে। এ জিনিসটা মুসলমানদেরকে এমন সব মৌলিক মতবিরোধ থেকে রক্ষা করেছে যা তাদের মধ্যে চিরন্তন বিচ্ছেদের বীজ বপন করতে পারতো। কাজেই যে ব্যক্তি নবী মুহাম্মদ (সা)-কে হেদায়াত দানকারী ও নেতা বলে স্বীকার করে এবং তাঁর শিক্ষা ছাড়া ান্য কোনো হেদায়াতের উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায় না সে এ ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং যে কোন সময় এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। নবুয়াতের দরজা বন্ধ না হয়ে গেলে মুসলিম মিল্লাত কখনও এ ঐক্যের সন্ধান পেতো না। কারণ প্রত্যেক নবীর আগমনের পর এ ঐক্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতো।

মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও এ কথাই সমর্থন করে যে, একটি বিশ্বজনীন ও পরিপূর্ণ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করে তাকে সকল প্রকার বিকৃতি ও রদবদল থেকে সংরক্ষিত করার পর নবুয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়াই উচিত। এর ফলে সম্মিলিতভাবে এ শেষ নবীর অনুগমন করে সমগ্র দুনিয়ার মুসলমান চিরকালের জন্যে একই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে এবং বিনা প্রয়োজনে নতুন নতুন নবীর আগমনে উম্মতের মধ্যে বারবার বিভেদ সৃষ্টি হতে পারবে না। নবী ‘যিল্লী’ হোক অথবা ‘বুরুযী’-[পূর্ববর্তী নবীর অনুবর্তি নবীকে ‘যিল্লী’ নবী এবং পূর্ববর্তী নবীর অনুবর্তি নয় এমন নবীকে ‘বুরুযী’ নবী বলা হয়।], ‘উম্মতওয়ালা’ অথবা শরীয়াতওয়ালা ও কিতাবওয়ালা যে কোন অবস্থায়ই যিনি নবী হবেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হবেন তার আগমনের অবশ্যম্ভাবী ফল দাঁড়াবে এই যে, তাঁকে যারা মেনে নেবে, তারা হবে একটি উম্মত আর যারা মানবে না তারা কাফের বলে গণ্য হবে। যখন নবী পাঠাবার সত্যিকার প্রয়োজন দেখা দেয় তখন –শুধুমাত্র তখনই –এ বিভেদ অবশ্যম্ভাবী হয় কিন্তু যখন তার আগমনের কোনো প্রয়োজন থাকে না তখন আল্লাহর হিকমত এবং তাঁর রহমতের নিকট কোনো ক্রমেই আশা করা যায় না যে, তিনি নিজের বান্দাদেরকে অথবা ঈমান ও কুফরীর সংঘর্ষে লিপ্ত করবেন এবং তাদেরকে সম্মিলিতভাবে একটি উম্মতভুক্ত হবার সুযোগ দেবেন না। কাজেই কুরআন, সু্ন্নাহ এবং ইজমা থেকে যা কিছু প্রমাণিত হয়, মানুষের বিবেক বুদ্ধিও তাকে নির্ভুল বলে স্বীকার করে এবং আর দাবী হচ্ছে এই যে, বর্তমান যুগে নবুয়াগের দরজা বন্ধ থাকা উচিত।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.