সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হাদীসের আলোকে ‘প্রতিশ্রুত মসীহ’-এর তাৎপর্য

নতুন নবুয়াতের দিকে আহবানকারীরা সাধারণত অজ্ঞ মুসলমানদেরকে বলেন যে, হাদীসে ‘প্রতিশ্রুত মসীহের’ আগমনের কথা আছে এবং ‘মসীহ’ নবী ছিলেন। কাজেই তাঁর আগমনের ফলে খতমে নবুয়াত কোনো দিক দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে না। বরং খতমে নবুয়াতও সত্য এবং প্রতিশ্রুত মসীহ-এর আগমনও সত্য।

এ প্রসঙ্গে তাঁরা আরও বলেন, হযরত ঈসা ইবনে মরিয়াত (আ) ‘প্রতিশ্রুত মসীহ’ নন। তাঁর তো মৃত্যু হয়েছে। হাধীসে যার আগমনের খবর দেয়া হয়েছে তিনি হলেন ‘মাসীলে মসীহ’ –অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ)-এর অনুরূপ একজন মসীহ। আর তিনি অমুক’ ব্যক্তি যিনি সম্প্রতি আগমন করেছে। তাঁকে মেনে নেয়া খতমে নবুয়াত বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়।

এ প্রতারণায় পর্দা ভেদ করার জন্যে আমরা এখানে হাদীসের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলো থেকে এ ব্যাপারে উল্লিখিত প্রামাণ্য হাদীসমূহ সূত্রসহ নকল করছি। এ হাদীসগুলো প্রত্যক্ষ করে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে বুঝতে পারবেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) কি বলেছিলেন আর আজ তাঁকে কিবাবে চিত্রিত করা হচ্ছে।–[প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কুরআনের সাথে প্রতিশ্রুত মসীহ’র আসা না আসার ব্যাপাটির কোনো সম্পর্ক নেই। হাদীসের ওপরই এর যাবতীয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। কাজেই যদি কোনো মসীহকে আসতে হয়, তাহলে সেই মসীহেরই আসার কথা যার উল্লেখ নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলোতে পাওয়া যায়। আর মসীহ সংক্রান্ত হাদীসগুলো না মানলে মসীহের আসার প্রশ্নই দেখা দেয় না। এ আকিদার ভিত্তি তো থাকবে হাদীসের ওপর কিন্তু যেসব নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য মসহিহের আসার খবর দেয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অযথা নানান ত্রুটি দেখানো হবে নিচক ভাঁড়ামি।–(গ্রন্থকার)।]

হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ সম্পর্কিত হাদীস

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৯৬ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ইবনে মরিয়ম ন্যায় বিচারক শাসকরূপে অবতীর্ণ হবেন। অতপর তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর ধ্বংস করবেন-[ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলা ও শূকর ধ্বংস করার অর্থ হচ্ছে, একটি স্বতন্ত্র ধর্ম হিসেবে খৃষ্ট ধর্মের বিলুপ্ত হয়ে যাবে। খৃষ্ট ধর্মের সমগ্র কাঠামোটা এ আকীদার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে, আল্লাহ তাঁর একমাত্র পুত্রকে [অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ)-কে ক্রুশে বিদ্ধ করে অভিশপ্ত মৃত্যুদান করেছেন এবং এতেই সমস্ত মানুষের গোহাহের কাফফারা হয়ে গেছে। অন্যান্য নবীদের উম্মতের সঙ্গে খৃষ্টানদের পার্থক্য হচ্ছে এই যে, এরা কেবল আকিদাটুকু গ্রহণ করে খোদার সমগ্র শরীয়াত নাকচ করে দিয়েছে। এমনকি শূকরকেও এরা হালাল করে নিয়েছে –যা সকল নবীর শরীয়াতে হারাম ছিল। কাজেই হযরত ঈসা (আ) নিজে এসে বলবেন, আমি আল্লাহর পুত্র নই, আমাকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়নি এবং আমি কারও গোনাহের কাফফারা হইনি, তখন খৃষ্ট ধর্ম-বিশ্বাসের বুনিাদই সমূলে উৎপাটিত হবে। অনুরূপভাবে যখন তিনি বলবেন, আমার অনুসারীদের জন্যে আমি শূকর হালাল করিনি এবং তাদেরকে শরীয়াতের বিধি-নিষেধ থেকে মুক্তিও দেইনি, তখন খৃষ্ট ধর্মের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য নির্মূল হয়ে যাবে।] এবং যুদ্ধ খতম করে দেবেন (বর্ণনাস্তরে যুদ্ধের পরিবর্তে ‘জিযিয়া’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে অর্থাৎ জিযিয়া খতম করে দেবেন)।–[অন্য কথায় বলা যায়, তখন ধর্মের বৈষম্য ঘুচিয়ে মানুষ একমাত্র দ্বীন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর ফলে আর যুদ্ধের প্রয়োজন হবে না এবং কারও থেকে জিযিয়াও আদায় করা হবে না।–(গ্রন্থকার)।] তখন ধনের পরিমাণ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করার লোক থাকবে না এবং (অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছবে যে, মানুষ আল্লাহর জন্যে) একটি সিজদা করে নেয়াটাকেই দুনিয়া ও দুনিয়ার সমস্ত বস্তুর চেয়ে বেশী মূল্যবান মনে করবে।

অন্য এক হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনা নিম্নরূপঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ১৯৭ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “হযরত ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না”।….এরপর যা কিছু বলা হয়েছে তা উপরোল্লিখিত হাদীসের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল।–(বুখারী, কিতাবুল মাযালিম, বাবু কাসরিস সালীব; ইবনে মাজা কিতাবুল ফিতান, বাবু ফিতনাতি দাজ্জাল)।

(আরবী******************************পিডিএফ ১৯৭ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তখন তোমাদের অবস্থা কেমন হবে যখন তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন ইবনে মরিয়াম এবং সে সময়ে তোমাদের ইমাম নিযুক্ত হবেন তোমাদের মধ্য থেকেই?”-[অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ) নামাযে ইমামতি করবেন না। মুসলমানদের পূর্ব নিযুক্ত ইমামের পেছনেই নামায পড়বেন।–(গ্রন্থকার)।]

(আরবী******************************পিডিএফ ১৯৭ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ ঈসা ইবনে মরিয়াম অবতীর্ণ হবেন। তিনি শূকর ধ্বংস করবেন ক্রুশ নিশ্চহ্ন করবেন। তাঁর জন্য একাধিক নামায এক ওয়াক্তে পড়া হবে। তিনি এত ধন বিতরণ করবেন যে অবশেষে তার গ্রহীতা পাওয়া যাবে না। তিনি খেরাজ মওকুফ করে দেবেন। রাওহা-[রাওহা মদীনা থেকে ২৫ মাইল দূরে একটি স্থানের নাম] নামক স্থানে অবস্থান করে তিনি সেখান থেকে হজ্জ অথবা উমরাহ করবেন অথবা দু’টোই করবেন”।–[উল্লেখ্য, বর্তমান যুগে যাকে ‘মাসীলে মসীহ’ বা মসীহের সদৃশ গণ্য করা হয়েছে তিনি জীবনে কোনো দিন হজ্ব ও উমরাহ করেননি।–(গ্রন্থকার)]

[রসূলুল্লাহ (সা) এর মধ্যে কোনটা বলেছিলেন সে সম্পর্কে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়ে গেছে।]

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৯৮ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন, [দাজ্জালের আবির্ভাব বর্ণান করার পর রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ] ইত্যবসরে মুসলমানরা তার সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতি করতে থাকবে, কাতারবন্দি হতে থাকবে এবং নামাযের জন্যে ‘ইকামত’ শেষ হবে। এমন সময় ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ) অবতীর্ণ হবেন এবং নামাযে মুসলমানেদর ইমামতি করবেন। আল্লাহর দুশমন দাজ্জাল তাঁকে দেখা মাত্রই এমনভাবে গলিত হতে থাকবে যেমনভাবে লবন পানিতে গলে যায়। যদি ঈসা (আ) তাকে এই অবস্থায় পরিত্যাগ করেন তাহলেও সে গলিত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে হযরত ঈসা (আ)-এর হাতে কতল করাবেন। তিনি দাজ্জালের রক্তে রঞ্জিত নিজের বর্শা ফলক মুসলমানদের দেখাবেন”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৯৮ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমার ও তাঁর [অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ)-এর] মাঝকানে আর কোনো নবী নেই এবং তিনি অবতীর্ণ হবেন। তাঁকে দেখা মাত্রই তোমরা চিনে নিয়ো। তিনি হবেন মাঝারি ধরনের লম্বা গায়ের বর্ণ লাল-সাদায় মেমানো। পরণে দু’টো হলুদ রঙ্গের কাপড়। অথচ তা মোটেই সিক্ত হবে না। তিনি ইসলামের জন্যে লোকদের সাথে যুদ্ধ করবেন। ক্রুশ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করবেন। শূকর ধ্বংস করবেন। জিযিয়া কর রহিত করবেন। তাঁর জামানায় আল্লাহ ইসলাম ছাড়া দুনিয়ার আর সমস্ত মিল্লাত খতম করে দেবেন। তিনি (মসীহ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং দুনিয়ার চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতপর তিনি ইন্তেকাল করবেন এবং মুসলমানরা তাঁর জানাযায় নামায পড়বে”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৯৮ পৃষ্ঠায়)

“হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, আমি রসূলুর্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি, অতপর ঈসা ইবনে মরিয়াম অবতীর্ণ হবেন। মুসলমানদের আমীর তাঁকে বলবেন আসুন আপনি নামায পড়ান। কিন্তু তিনি বলবেন, না তোমরা নিজেরাই একে অপরের আমীর।–[অর্থাৎ তোমদের আমীর তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে হওয়া উচিত।] আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতকে যে ইজ্জত দান করেছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা বলবেন”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৯৯ পৃষ্ঠায়)

“হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) (ইবনে সাইয়াদ প্রসঙ্গে) বর্ণনা করেছেন, অতপর উমর ইবনে খাত্তাব আরজ করলেন, হে রসূলুল্লাহ, অনুমতি দিন, আমি তাকে কতল করি। রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যদি এ সেই ব্যক্তি (অর্থাৎ দাজ্জাল) হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা এর হত্যাকারী নও বরং ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) একে হত্যা করবেন। আর যদি এ সেই ব্যক্তি না হয়ে থাকে, তাহলে জিম্মীদের মধ্য থেকে কাউকে হত্যা করার তোমাদের কোনো অধিকার নেই”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৯৯ পৃষ্ঠায়)

“হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, দাজ্জাল প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, সেই ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ) হঠাৎ মুসলমানদের মধ্যে এসে উপস্থিত হবেন। লোকেরা নামাযের জন্যে দাঁড়িয়ে যাবে। তাঁকে বলা হবে, হে রুহুল্লাহ, অগ্রসর হন। কিন্তু তিনি বলবেন, না তোমাদের ইমামের অগ্রবর্তী হওয়া উচিত। তিনিই নামায পড়াবেন। অতপর ফজরের নামাযের পর মুসলমানরা দাজ্জালের মোকাবেলায় বের হবে। তিনি রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন যখন সেই কাজ্জাব (মিথ্যাবাদী) হযরত ঈসা (আ)-কে দেখবে, তখন গলে যেতে থাকবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। অতপর তিনি দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। তখন অবস্থা এমন হবে যে, গাছপালা এবং প্রস্তরখণ্ড চিৎকার করে বলবে, হে রুহুল্লাহ! ইহুদীটা এই আমার পিছনে লুকিয়ে আছে। দাজ্জালের অনুগামীদের মধ্যে এমন কেউ জীবিত থাকবে না যাকে হযরত ঈসা (আ) কতল করবেন না”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০০ পৃষ্ঠায়)

“হযরত নওয়াস ইবনে সাম’আন কেলবী (রা) দাজ্জাল প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (সা)-এর উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, দাজ্জালের এসব কর্মকাণ্ড চলাকালে আল্লাহ মসীহ ইবনে মরিয়াম (আ)-কে পাঠাবেন। তিনি দামেষ্কের পূর্বাঞ্চলে সাদা মিনারের সন্নিকটে দু’টো হলুদ বর্ণের কাপড় পরিধান করে দু’জন ফেরেশতার কাঁদে হাত রেখে নামবেন। তিনি মাথা নীচু করলে পানি টপকাচ্ছে বলে মনে হবে। আবার মাথা উঁচু করলে মনে হবে যেন বিন্দু বিন্দু পানি মোতির মতো চমকাচ্ছে। তাঁর নিঃশ্বাস যে কাফেরের গায়ে লাগবে এবং এর গতি হবে তাঁর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত –সে আর জীবিত থাকবে না। অতপর ইবনে মরিয়াম দাজ্জালের পেছনে ধাওয়া করবেন এবং লুদের-[এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, লুদ (Lydda) ফিলিস্তিনের অন্তর্গত বর্তমান ইসরাঈল রাষ্ট্রের রাজধানী তেলআবীব থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত। ই্হুদীরা এখানে একটি বিরাট বিমান বন্দর নির্মান করেছে।–(গ্রন্থকার)] দ্বারপ্রান্তে তাকে গ্রেফতার করবেন”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০০ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, দাজ্জাল আমার উম্মতের মধ্যে বের হবে এবং চল্লিশ (আমি জানি না চল্লিশ দিন, চল্লিশ মাস না চল্লিশ বছর)-[এটি সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা)-এর কথা।] পর্যন্ত অবস্থান করবে। অতপর ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ)-কে পাঠাবেন। তাঁর চেহারা উরওয়া ইবনে মাসউদের (জনৈক সাহাবীর মতো) তিনি দাজ্জালের পেছনে ধাওয়া করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। অতপর সাত বছর পর্যন্ত মানুষ এমন অবস্থায় থাকবে যে, দু’জন লোকের মধ্যেও শত্রুতা থাকবে না”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০০ পৃষ্ঠায়)

“হযরত হুযায়ফা ইবনে আসীদ আল গিফারী বর্ণনা করেছেন, একবার রসূলুল্লাহ (সা) আমাদের মজলিসে তাশরীফ আনলেন। তখন আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় লিপ্ত ছিলাম। রসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি আলোচনা করছ? লোকেরা বললো, আমরা কিয়ামতের বিষয় আলোচনা করছি। তিনি বললেন, যতক্ষণ না দশটি নিশানী প্রকাশ হবে ততদিন তা কিছুতেই সংঘটিত হবে না। অতপর তিনি দশটি নিশানী বললেন, যথা –ধূঁয়া, দাজ্জাল, দাব্বাদুল আবদ, পশ্চিম দিক থেকে সুর্যোদয়, ঈসা ইবনে মরিয়ামের অবতরণ, ইয়াজুজ ও মাজুজ, তিনটি প্রকাণ্ড জমি ধ্বস (Land slide) –পূর্বে, পশ্চিমে এবং আরব উপদ্বীপে। অবশেষে একটি প্রকাণ্ড অগ্নি ইয়মেন থেকে উঠবে এবং মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে হাশরের ময়দানের দিকে”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০১ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা)-এর মুক্ত করা গোলাম সাওবান থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমার উম্মতের দু’টো সেনাদলকে আল্লাহ জাহান্নামের আগুণ তেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। তাদের একটি হলো, যারা হিন্দুস্তানের ওপর হামলা করবে। আর দ্বিতীয়টি, যারা হযরত ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ)-এর সাথে অবস্থান করবে”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০১ পৃষ্ঠায়)

“মুজাম্মে ইবনে জারিয়া আনসারী বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি, ইবনে মিরয়াম দাজ্জালকে লুদের দ্বারপ্রান্তে কতল করবেন”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০১ পৃষ্ঠায়)

“আবু উমামা বাহেলী (এক দীর্ঘ হাদীসে দাজ্জাল প্রসঙ্গে) বর্ণনা করেছেন, ফজরের নামায পড়ার জন্যে মুসলমানদের ইমাম যখন অগ্রবর্তী হবেন, ঠিক সেই সময় ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) তাদের ওপর অবতীর্ণ হবেন। ইমাম পেছনে সরে আসবেন ঈসা (আ)-কে অগ্রবর্তী করার জন্যে। কিন্তু ঈসা (আ) তাঁর কাঁদে হাত রেখে বলবেন, না তুমিই নামায পড়াও, কেননা এরা তোমার জন্যেই দাঁড়িয়েছে। কাজেই তিনিই (ইমাম) নামায পড়াবেন। সারাম ফেরার পর ঈসা (আ) বলবেন, দরজা খোল। তখন দরজা খোলা হবে। বাইরে দাজ্জাল সত্তর হাজার সশস্ত্র ইহুদী সৈন্য নিয়ে অপেক্ষা করবে। তার দৃষ্টি হযরত ঈসা (আ)-এর ওপর পড়া মাত্র সে এমনভাবে গলে যেতে থাকবে যেমন লবণ পানিতে গরে যায়। সে পলায়ন করবে। ঈসা (আ) বলবেন, আমার কাছে তোমার জন্যে এমন এক আঘাত আছে যার হাত থেকে তোমার কোনো ক্রমেই নিষ্কৃতি নেই। অতপর তিনি তাকে লুদের পূর্ব দ্বার দেশে গিয়ে গ্রেফতার করবেন এবং আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদেরকে পরাজয় দান করবেন …..এবং জমিন মুসলমানদের দ্বারা এমনভাবে ভরপুর হবে যেমন পাত্র পানিতে ভরে যায়। সবাই কালেমায়ে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া আর কারো বন্দেগী করা হবে না”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০২ পৃষ্ঠায়)

“উসমান ইবনে আবিল আস বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছিঃ …..এবং ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) ফযরের নামাযের সময় অবতরণ করবেন। মুসলমানদের আমীর তাঁকে বলবেন, হে রুহুল্লাহ! আপনি নামায পড়ান। তিনি জবাব দেবেনঃ এই উম্মতের লোকেরা নিজেরাই নিজেদের আমীর। তখন মুসলমানদের আমীর অগ্রবর্তী হয়ে নামায পড়াবেন। অতপর নামায শেষ করে ঈসা (আ) নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে দাজ্জালের দিকে অগ্রসর হবেন। তিনি নিজের অস্ত্র দিয়ে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং তার দলবল পরাজিত হয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে। কিন্তু কোথাও তারা আত্মগোপন করার জায়গা পাবে না। এমনকি গাছও ডেকে বলবেঃ হে মুমিন, এখানে কাফের লুকিয়ে আছে। প্রস্তরখণ্ডও ডেকে বলবে, হে মুমিন, এখানে কাফের লুকিয়ে আছে”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০৩ পৃষ্ঠায়)

“সামরা ইবনে জুনদুব (এক দীর্ঘ হাদীসে) বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, অতপর সকাল বেলা ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) মুসলমানদের মধ্যে আসবেন এবং আল্লাহ তায়ালা দাজ্জাল ও তার সেনাবাহিনীকে পরাজয় দান করবেন। এমনকি প্রাচীর ও গাছের কাণ্ডও ডাক দিয়ে বলবে, হে মুমিন, এই যে কাফের একানে আমার পেছনে লুকিয়ে আছে, এসো একে হত্যা করো”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০৩ পৃষ্ঠায়)

“ইমরান ইবনে হোসাইন থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে হামেশা একটি দল হকের ওপর কায়েম থাকবে এবং তারা বিরোধী দলের ওপর প্রতিপত্তি বিসআতর করবে। অবশেষে আল্লাহতায়ালার ফায়সালা এসে যাবে এবং মরিয়ম পুত্র ঈসা (আ) অবতীর্ণ হবেন”।–(মুসনাদে আহমদ)।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০৩ পৃষ্ঠায়)

“হযরত আয়েশা (রা) দাজ্জাল প্রসঙ্গে বলেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ অতপর ঈসা (আ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি দাজ্জালকে কতল করবেন। অতপর ঈসা (আ) চল্লিশ বছর ন্যায়পরায়ণ ইমাম ও শাসক হিসাবে দুনিয়ায় অবস্থান করবেন”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০৩ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা)-এর আজাদকৃত গোলাম সুফায়না দাজ্জাল প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ অতপর ঈসা (আ) অবতীর্ণ হবেন এবং আল্লাহ তায়ালা ‘আফিক’-[আফিককে বর্তমানে ‘ফীক’ বলা হয়। সিরিয়া ও ইসরাঈল সীমান্ত বর্তমান সিরিয়া রাষ্ট্রের সর্বশেষ শহর আফিক। তার সামনে পশ্চিমের দিকে কয়েক মাইল দূরে তাবারিয়া নামে একটি হ্রদ আছে। এটা্ হলো জর্দান নদীর উৎপত্তিস্থল। এর দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড়ের মধ্যভাগে নিম্নভূমিতে একটি রাস্তা রয়েছে। এ রাস্তাটা প্রায় দেড় হাজার ফুট গভীরে নেমে গিয়ে সেই স্থানে পৌঁছায় যেখানে জর্দান নদী তাবারিয়ার মধ্য দিয়ে বের হচ্ছে। এ পথকেই বলা হয় আকাবায়ে আফীক (আফীকের ন্মিন পার্বত্য পথ)।–গ্রন্থকার।] নামক সীমান্ত ঘাটির নিকটে তাকে (দাজ্জালকে) মেরে ফেলবেন”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২০৩ পৃষ্ঠায়)

“হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান দাজ্জাল প্রসঙ্গে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ অতপর যখন মুসলমানরা নামাযের জন্যে তৈরী হবে এমন সময় তাঁদের চোখের সামনে ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি মুসলমানদেরকে নামায পড়াবেন। অতপর সালাম ফিরিয়ে লোকদের বলবেন, আমার ও আল্লাহর এ দুশমনের মাঝখান থেকে সরে যাও …….এবং আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের দলবলের ওপর মুসলমানদেরকে প্রতিপত্তি দান করবেন। মুসলমানরা তাদেরকে ব্যাপকভাবে হত্যা করতে থাকবে। অবশেষে গাছ এবং পাথরখণ্ডও ডেকে বলবেঃ হে আল্লাহর বান্দাহ, হে রহমানের বান্দাহ, হে মুসলমান দেখো, এখানে একজন ইহুদী, একে হত্যা করো। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং মুসলমানরা বিজয় লাভ করবে। তারা ক্রুশ নিপাত করবে, শূকর ধ্বংস করবে এবং জিযিয়া কওকুফ করে দেবে”।

(মুসলিম এ হাদীসটি সংক্ষিপ্ত আকারে এসেছে এবং হাফেজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারী ২য় খণ্ড ৪৫০ পৃষ্ঠায় একে সহীহ গণ্য করেছেন)।

এ একুশটি হাদীস চৌদ্দজন সাহাবী মারফত নির্ভুল সনদসহ হাদীসের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়াও এ ব্যাপারে আরও অসংখ্য হাদীস অন্যান্য হাদীস গ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু আলোচনা দীর্ঘ হবে ভেবে আমরা সেগুলো এখঅনে উদ্ধৃত করিনি। বর্ণনা এবং সনদের দিক দিয়ে অধিকতর শক্তিশালী এবং অধিকতর নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলোই শুধু এখানে উদ্ধৃত করেছি।

এ হাদীসগুলো থেকে কি প্রমাণিত হয়?

যে কোন ব্যক্তি এ হাদীসগুলো পড়ে নিজেই বুঝতে পারবেন যে, এখানে কোনো প্রতিশ্রুত মসীহ ‘মাসীলে মসীহ’ বা ‘বুরুজে মসীহ’র কোনো উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি বর্তমানকালে পিতার ঔরসে ও মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করে কোনো ব্যক্তির এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা) যে মসীহ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন তিনিই সেই মসীহ। আজ থেকে দু’হাজার বছর আগে পিতা ছাড়াই হযরত মরিয়াম (আ)-এর গর্ভে যে ঈসা (আ)-এর জন্ম হয়েছিল এ হাদীসগুলোর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য থেকে তারই অবতরণের সংবাদ পাওয় যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ইন্তিকাল করেছেন, না জীবিত অবস্থায় কোথাও রয়েছেন –এ আলোচনা সম্পূর্ণ অবান্তর। তর্কের খাতিরে যদি এ কথা মেনে নেয়া যায় যে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন, তাহলেও বলা যায়, আল্লাহ তাঁকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন।–[যারা আল্লাহর এই পুনরুজ্জীবনের ক্ষমতা অস্বীকার করেন তাদের সূরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াতটির অর্থ অনুধাবন করা উচিত। এ আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাঁর এক বান্দাকে ১০০ বছর পর্যন্ত মৃত অবস্থায় রাখার পর আবার তাকে জীবিত করেন।–(গ্রন্থকার)] তাছাড়া আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে তাঁর এ বিশাল সৃষ্টি জগতের কোনো এক স্থানে হাজার হাজার বছর জীবিত অবস্থায় রাখার পর নিজের ইচ্ছামতো যে কোন সময় তাঁকে এ দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনতে পারেন। আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রেক্ষিতে এ কথা মোটেই অস্বাভাবিক মনে হয় না। বলাবাহুল্য, যে ব্যক্তি হাদীসকে সত্য বলে স্বীকার করে, তাকে অবশ্যই ভবিষ্যতে আগমনকারীর অস্তিত্বই স্বীকার করতে পারে না। কারণ আগমনকারীর আগমন সম্পর্কে যে বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে হাদীস ছাড়া আর কোথাও তাঁর ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এ অদ্ভুত ব্যাপারটি শুধু এখানেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, আগমনকারীর আগমন সম্পর্কিত ধারণা বিশ্বাস গ্রহণ করা হচ্ছে হাদীস থেকে কিন্তু সেই হাদীসগুলোই আবার যখন সুস্পষ্ট করে এ বক্তব্য তুলে ধরছে যে, উক্ত আগমনকারী কোনো ‘মাসীলে মসীহ’ (মসীহসদৃশ ব্যক্তি) নন বরং তিনি হবেন স্বয়ং ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) তখন তা অস্বীকার করা হচ্ছে।

এ হাদীসগুলো থেকে দ্বিতীয় যে বক্তব্যটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ফুটে উঠেছে তা হচ্ছে এই যে, হযরত ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) দ্বিতীয়বার নবী হিসেবে অবতরণ করবেন না। তাঁর ওপর অহী নাযিল হবে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি কোনো নতুন বাণী বা বিধান আনবেন না। শরীয়াতে মুহাম্মদীর মধ্যেও তিনি কোন হ্রাস-বৃদ্ধি করবেন না। দ্বীন ইসলামের পুনরুজ্জীবনের জন্যেও তাঁকে দুনিয়ায় পাঠানো হবে না। তিনি এসে লোকদেরকে নিজের ওপর ঈমান আনার আহবান জানাবেন না এবং তাঁর প্রতি যারা ঈসা আনবে তাদেরকে নিয়ে একটি পৃথম উম্মতও গড়ে তুলবেন না।–[মুসলিম আলেম সমাজ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আল্লামা তাফতাজানী (৭২২-৭৯২ হিঃ) তার শারহে আকায়েদ নাসাফি গ্রন্থে লিখেছেনঃ (আরবী****************************************************************************

এটা প্রমাণিত সত্য যে, মুহাম্মদ (সা) সর্বশেষ নবী। যদি বলা হয়, তাঁর পর হাদীসে হযরত ঈসা (আ) এর আগমনের কথা বলা হয়েছে, তাহলে আমরা বলবো, হ্যাঁ হযরত ঈসা (আ)-এর আগমনের যে কথা বলা হয়েছে তা সত্য। তবে তিনি মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসারী হবেন। কারণ তাঁর শরীয়াত বাতিল হয়ে গেছে। কাজেই তাঁর ওপর অহী নাযিল হবে না এবং তিনি নতুন বিধানও নির্ধারণ করবেন না বরং তিনি মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন”।

আর এ কথাই আল্লামা আলুসী তাফসীরে রুহুল মা’য়ানীতে বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************)

“অতপর হযরত ঈসা (আ) যখন অবতরণ করবেন তখন তিনি স্বীয় নবুয়াতী পদেই অধিষ্ঠিত থাকবেন এবং পূর্বপদ (নবুয়াত) থেকে অপসারিত হবেন না। কিন্তু স্বীয় সাবেক শরীয়াতের অনুসার হবেন না। কেননা তা তাঁর জন্যে এবং অন্যান্য সকল লোকদের বেলায় বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে তিনি মূলনীতি ও খুঁটিনাটি সকল ব্যাপারে এ শরীয়াতেরই (শরীয়াতে মুহাম্মদীর) অনুসারী হবেন। সুতরাং এখন তার কাছে যেমন কোনো ওহী আসবে না, তেমনি কোনো বিধান দেয়ারও কোনো অধিকার তাঁর থাকবে না। বরং তিনিই এ উম্মতের মধ্যে রসূল (সা)-এর প্রতিনিধি (নায়েব) এবং তার মিল্লাতে মুহাম্মদীর শাসকদের একজন শাসকরূপেই কাজ করবেন। (২২শ’ খণ্ড, ৩২ পৃঃ) ইমাম রাযী (রা) এ কথাটি আরো সুস্পষ্ট করে নিম্নোক্ত ভাষায় বলেছেনঃ (আরবী**********************)

“মুহাম্মদ (সা) পর্যন্ত নবীদের যুগ শেষ হয়ে গেছে। মুহাম্মদ (সা)-এর আগমনের পর নবীদের আগমন শেষ হয়ে গেছে। কাজেই বর্তমানে হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের পর তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসারী হবেন, এ কথা মোটেই অযৌক্তিক নয়”।] তাকেঁ কেবলমাত্র একটি পৃথক দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় পাঠানো হবে। অর্থাৎ তিনি দাজ্জালের ফিতনাকে সমূলে বিনাশ করবেন। এ জন্যে তিনি এমনভাবে অবতরণ করবেন যার ফলে তাঁর অবতরণের ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশই থাকবে না। যেসব মুসলমানদের মধ্যে তিনি অবতরণ করবেন তারা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারবে যে, রসূলুল্লাহ (সা) যে ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনিই সেই ব্যক্তি এবং রসূলুল্লাহ (সা)-এর কথা অনুযায়ী তিনি যথাসময়ে অবতরণ করেছেন। তিনি এসে মুসলমানদের দলে শামিল হয়ে যাবেন। মুসলমানদের তদানীন্তন ঈমামের পেছনে তিনি নামায পড়বেন।–[যদিও হাদীসে (৫ ও ২১ নম্বর) বলা হয়েছে যে, ঈসা (আ) অবতরণ করার পর প্রথম নামাযটি নিজে পড়াবেন কিন্তু অধিকাংশ, বিশেষ করে শক্তিশালী কতিপয় হাদীস (৩,৭,৯,১৫ ও ১৬ নম্বর) থেকে জানা যায় যে, তিনি নামাযের ইমামতি করতে অস্বীকার করবেন এবং মুসলমানদের তৎকালীন ইমাম ও নেতাকে অগ্রবর্তী করবেন। মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ সর্বসম্মতভাবে এ মতটি গ্রহণ করেছেন।] সেকালে মুসলমানদের যিনি নেতৃত্ব দেবেন তাকেই অগ্রবর্তী করবেন, যাতে কেউ এ ধরনের সন্দেহ পোষণ করতে না পারে যে, তিনি নিজের পূর্ববর্তী পয়গাম্বরী পদমর্যাদা সহকারে পুনর্বার পয়গাম্বরীর দায়িত্ব পালন করার জন্যে ফিরে এসেছেন। নিসন্দেহে বলা যেতে পারে, কোনো দলে আল্লাহর নবীর উপস্থিতিতে অন্য কোনো ব্যক্তি ইমাম বা নেতা হতে পারেন না। কাজেই নিছক এক ব্যক্তি হিসেবে মুসলমানদের দলে তাঁর অন্তর্ভুক্তি স্বতঃস্ফুর্তভাবে এ কথা ঘোষণা করবে যে, তিনি নবী হিসেবে আগমন করেননি। এ জন্যে তাঁর আগমনের নবুয়াতের দুয়ার উন্মুক্ত হবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

নিসন্দেহে তাঁর আগমন একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানের আমলে প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের আগমনের সাথে তুলনীয়। এ অবস্থায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রদান এসে বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। একজন সাধারণ বোধসম্পন্ন ব্যক্তিও সহজেই একথা বুঝতে পারেন যে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের আমলে অন্য একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রদানের নিছক আগমনেই আইন ভেঙে যায় না। তবে দু’টি অবস্থায় অবশ্যি আইন ভেঙ্গে যায়। এক, প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান এসে যদি আবার নতুন করে রাষ্ট্রপ্রদানের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন। দু্ই, কোনো ব্যক্তি যদি তার প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের কাজটাও অস্বীকার করে বসে। কারণ এটা হবে তার রাষ্ট্রপ্রধান থাকাকালে যেসব কাজ হয়েছিল সেগুলোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার নামান্তর। এ দু’টি অবস্থার কোনো একটি না হলে প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের নিছক আগমনই আইনগত অবস্থার মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন আনতে পারে না। হযরত ঈসা (আ)-এর দ্বিতীয় আগমনের ব্যাপারটিও অনুরূপ। তার নিছক আগমনেই খতমে নবুয়াতের দায়িত্ব পালন করতে থাকনে অথবা কোনো ব্যক্তি যদি তার প্রাক্তন নবুয়াতের মর্যাদাও অস্বীকার করে বসে, তাহলে এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নবুয়াত বিধি ভেঙে পড়বে। হাদীসের বর্ণনা এ দু’টো পথই পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। হাদীসে একদিকে সুস্পষ্টবাবে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই এবং অন্যদিকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, ঈসা (আ) পুনর্বার অবতরণ করবেন। এ থেকে পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে, তার এ দ্বিতীয় আগমন নবুয়াতের দায়িত্ব পালন করার উদ্দেশ্যে হবে না।

অনুরূপভাবে তাঁর আগমনে মুসলমানদের মধ্যে নতুন করে কুফরী ও ঈমানের প্রশ্ন দেখা দেবে না। আজও কোনো ব্যক্তি তাঁর পূর্বের নবুয়াতের ওপর ঈমান না আনলে কাফের হয়ে যাবে। নবী মুহাম্মদ (সা) নিজেও তাঁর ঐ নবুয়াতের ওপর ঈমান না আনলে কাফের হয়ে যাবে। নবী মুহাম্মদ (সা) নিজেও তাঁর ঐ নবুয়াতের ওপর ঈমান রাখতেন। নবী মুহাম্মদ (সা)-এর সমগ্র উম্মত্ও শুরু থেকেই তাঁর ওপর ঈমান রাখে। মুসলমানরা কোনো নবুয়াতের প্রতি ঈমান আনবেন না। বরং আজকের ন্যায় সেদিনও তারা ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ)-এর পূর্বের নবুয়াতের ওপর ঈমান রাখবে। এ অবস্থাটি বর্তমানে যেমন খতমে নবুয়াত বিরোধী নয় তেমনি সেদিনও বিরোধী হবে না। সর্বশেষ যে কথাটি এ হাদীসগুলো এবং অন্যান্য বহুবিধ হাদীস থেকে জানা যায় তা হচ্ছে এই যে, হযরত ঈসা (আ)-কে যে দা্জ্জালের বিশ্বব্যাপী ফিতনা নির্মূল করার জন্যে পাঠানো হবে সে হবে ই্হুদী বংশোদ্ভুত। সে নিজেকে ‘মসীহ’রূপে পেশ করবে। ইহুদীদের ইতিহাস ও তাদের ধর্মীয় চিন্তা-বিশ্বাস সম্পর্কে অনবহিত কোনো ব্যক্তি এ বিষয়টির তাৎপর্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবে না। হযরত সুলায়মান (আ)-এর মৃত্যুর পর যখন বনী ইসরাঈলরা সামাজিক ও ধর্মীয় অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক পতনের শিকার হলো অতপর তাদের এ পতন দীর্ঘায়িত হতে থাকলো এমনকি অবশেষে ব্যাবিলন ও আসিরিয়া অধিপতিরা তাদেরকে পরাধীন করে দেশ থেকে বিতাড়িত করলো এবং তাদেরকে দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত করে দিলো, তখন বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাদেরকে দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত করে দিলো, তখন নবী ইসরাঈলের নবীগণ তাদেরকে সুসংবাদ দিতে থাকলেন যে, আল্লাহর পক্স থেকে একজন মসীহ এসে তাদেরকে সুসংবাদ দিতে থাকলেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন মসীহ এসে তাদেরকে এ চরম লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি দেবেন। এসব ভবিষ্যদ্বাণীর প্রেক্ষিতে ইহুদীরা একজন মসীহর আগমনের প্রতীক্ষায় ছিল। তিনি হবেন বাদশাহ। তিনি যুদ্ধ করে দেশ জয় করবেন। বনী ইসরাঈলদেরকে বিভিন্ন দেশ থেকে এনে ফিলিস্তিনে একত্রিত করবেন এবং তাদের শক্তিশালী রাষ্ট্র কায়েম করবেন। কিন্তু তাদের এসব আশা-আকাঙ্খাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে যখন হযরত ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মসীহ’ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করবে। তারা তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হবে। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইহুদী দুনিয়া সেই প্রতিশ্রুত মসীহর (Promissed Messiah) প্রতীক্ষায় দিন গুণছে, যার আগমনের সুসংবাদ তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। তাদের সাহিত্য গ্রন্থসমূহে এর যে নকশা তৈরি করা হয়েছে তার কল্পিত স্বাদ আহরণ করে শত শত বছর থেকে ইহুদী জাতি জীবন ধারণ করছে। তার বুকভরা আশা নিয়ে বসে আছে যে, এই প্রতিশ্রুতি মসীহ হবেন একজন শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা। তিনি নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত সমগ্র এলাকা –যে এলাকাকে ইহুদীরা নিজেদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এলাকা মনে করে –আবার ইহুদীদের দখলে আনবেন এবং সারা দুনিয়া থেকে ইহুদীদেরকে এনে একত্র করবেন। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করে রসূলুল্লাহ (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে ঘটনাবলী বিশ্লেষণ কররে দেখা যাবে, মহানবী (সা)-এর কথামত ইহুদীদের প্রতিশ্রুত মসীহর ভূমিকা পালনকারী প্রধানতম দাজ্জালের আগমনের জন্যে মঞ্চ সম্পূর্ণ রূপে প্রস্তুত হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনের বৃহত্তর এলাকা থেকে মুসলমানদেরকে বেদখল করা

(পিডিএফ ২০৮ পৃষ্ঠায় ম্যাপ রয়েছে***************************************)

ইসরাঈল নেতৃবর্গ যেই ইহুদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে

হয়েছে। সেখানে ইসরাঈল নামে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদীরা দলে দলে এসে সেখানে বাসস্থান গড়ে তুলছে। আমেরিকা বৃটেন ও ফ্রান্স তাকে একটি বিরাট সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছে। ইহুদী পুঁজিপতিদের সহায়তায় ইহুদী বৈজ্ঞানিক ও শিল্পবিদগণ তাকে দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশের মুসলিম দেশগুলোর জন্যে তাদের এ শক্তি এক মহাবিপদে পরিণত হয়েছে। এই রাষ্ট্রের শাসকবর্গ তাদের এই উত্তরাধিকার সূত্রে “প্রাপ্ত দেশ” দখল করার আকাঙ্খাটি মোটেই লুকিয়ে রাখেনি। দীর্ঘকাল থেকে আগামীর ইহুদী রাষ্ট্রের যে নীলনকশা তারা পেশ করে আসছে পূর্ববর্তী ম্যাপে তার একটি প্রতিকৃতি দেয়া হলো। এ নকশায় দেখা

(পিডিএফ ২০৯ পৃষ্ঠায় ম্যাপ রয়েছে***************************************)

আসল মসীহ হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের স্থান

যাবে, সিরিয়া, লেবানন ও জর্দানের সমগ্র এলাকা এবং প্রায় সমগ্র ইরাক ছাড়াও তুরস্কের ইস্কান্দারোন, মিসরের সিনাই ও ব-দ্বীপ এলাকা এবং মদীনা-মুনাওয়ারাসহ আরবের অন্তর্গত হিজায ও নজদের উচ্চভূীম পর্যন্ত তারা নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে চায়। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে যে, আগামীতে কোনো একটি বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে তারা ঐসব এলাকা দখল করার চেষ্টা করবে এবং ঐ সময় কথিত প্রধানতম দাজ্জাল তাদের প্রতিশ্রুত মসীহরূপে আগমন করবে। রসূলুল্লাহ (সা) কেবল তার আগমন সংবাদ দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং এই সঙ্গে এ কথাও বলেছেন যে, সে সময় মুসলমানদের ওপর বিপদের পাহাড় ভেঙে পড়বে এবং এক একটি দিন তাদের কাছে এক একটি বছর মনে হবে। এ জ্যে তিনি নিজে মসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চেয়েছেন এবং মুসলমানদেরকেও আশ্রয় চাইতে বলেছেন।

এই মসীহ দাজ্জালের মোকাবেলা করার জন্যে আল্লাহ কোনো ‘মাসীলে মসীহ’কে পাঠাবেন না বরং আসল মসীহকে পাঠাবেন। দু’হাজার বছর আগে ইহুদীরা এই আসল মসীহকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল এবং নিজেদের জানা মতে তারা তাঁকে শূলিবিদ্ধ করে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। এই আসল মসীহ ভারত, আফ্রিকা বা আমেরিকায় অবতরণ করবেন না বরং তিনি অবতরণ করবেন দামেস্কে। কারণ তখন সেখানেই যুদ্ধ চলতে থাকবে। মেহেরবাণী করে পূর্বের দ্বিতীয় নকশাটিও দেখুন। এতে দেখা যাচ্ছে ইসরাঈলের সীমান্ত থেকে দামেস্ক মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মাইলের মধ্যে। ইতিপূর্বে আমি যে হাদীস উল্লেখ করে এসেছি তার বিষয়বস্তু মনে থাকলে সহজেই এ কথা বোধগম্য হবে যে, মসীহ দাজ্জাল ৭০ হাজার ইহুদী সেনাদল নিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করবে এবং দামেস্কের সামনে উপস্থিত হবে। ঠিক সেই মুহুর্তে দামেস্কের পূর্ব অংশের একটি সাদা মিনারের নিকট সুবহে সাদেকের পর হযরত ঈসা (আ) অবতরণ করবেন এবং ফজর নামায শেষে মুসলমানদেরকে নিয়ে দাজ্জালের মোকাবিলায় বের হবেন। তাঁর প্রচণ্ড আক্রমণে দাজ্জাল পশ্চাদপসারণ করে আফিকের পার্বত্য পথ দিয়ে (২১ নং হাদীস দেখুন) ইসরাঈলের দিকে ফিরে যাবে। কিন্তু তিনি তার পশ্চাদ্ধাবন করবেন। অবশেষে লিড্ডা বিমান বন্দরে সে তার হাতে মারা পড়বে (১০, ১৪ ও ১৫ নং হাদীস)। এরপর ইহুদীদেরকে সব জায়গা থেকে ধরে হত্যা করা হবে এবং ইহুদী জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে (৯,১৫ ও ২১ নং হাদীস) হযরত ঈসা (আ)-এর পক্ষ থেকে সত্য প্রকাশের পর ঈসায়ী ধর্মও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। (১,২,৪ ও ৬ নং হাদীস) এবং মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে সমস্ত মিল্লাত একীভূত হয়ে যাবে (৬ ও ১৫ নং হাদীস)।

কোনো প্রকার অস্পষ্টতা ও জড়তা ছাড়াই এ দ্ব্যর্থহীন সত্যটি হাদীস থেকে ফুটে উঠেচে। এ সুদীর্ঘ আলোচনার পর এ ব্যাপারে কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ থাকে না ‘প্রতিশ্রুত মসীহ’র নামে আমাদের দেশে যে কারবার চালানো হচ্ছে তা একটি প্রকাণ্ড জালিয়াতি ছাড়া আর কিছু নয়।

এই জালিয়াতির সবচেয়ে হাস্যকর দিকটি এবার আমি উপস্থাপিত করব। যে ব্যক্তি নিজেকে এই ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখিত মসীহের সাথে অভিন্ন বলে ঘোষণা করেছেন, তিনি নিজে ঈসা ইবনে মরিয়াত হবার জন্যে নিম্নোক্ত রসালো বক্তব্যটি পেশ করেছেনঃ

“তিনি (অর্থাৎ আল্লাহ) বারাহীনে আহমদীয়ার তৃতীয় অংশে আমার নাম রেখেছেন মরিয়াম। অতপর যেমন বারাহীনে আহমদীয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, দৃ’বছর পর্যন্ত আমি মরিয়ামের গুণাবলী সহকারে লালিত হই।…… অতপর মরিয়ামের ন্যায় ঈসার রূহ আমার মধ্যে প্রবেশ করানো হয় এবং রূপকার্থে আমাকে গর্ভবতী করা হয়। অবশেষে কয়েখ মাস পরে যা দশ মাসের চাইতে বেশী হবে না, সেই এলহামের মাধ্যমে, যা বারাহীনে আহমদীয়ায় চতুর্থ অংশে উল্লিখিত হয়েছে, আমাকে মরিয়াম থেকে ঈসায় পরিণত করা হয়। কাজে এভাবে আমি হয়েছি ঈসা ইবনে মরিয়াম”।–(কিশতীয়ে নূহ ৮৭,৮৮,৮৯ পৃষ্ঠা)

অর্থাৎ প্রথমে তিনি মরিয়াম হন। অতপর নিজে নিজেই গর্ববর্তী হন। তার পর নিজের পেট থেকে নিজেই ঈসা ইবনে মরিয়াম রূপে জন্ম নেন। এরপরও সমস্যা দেখা দিলো। কারণ হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী ঈসা ইবনে মরিয়াম দামেস্কে অবতরণ করবেন। দামেস্ক কয়েক হাজার বছর থেকে সিরিয়ার একটি প্রসিদ্ধ সর্বজন পরিচিত শহর। পৃথিবীর মানচিত্রে আজো এই শহরটি এ নামেই চিহ্নিত। কাজেই অন্য একটি রসাত্মক বক্তব্যের মাধ্যমে এ সমস্যাটির সমাধান দেয়া হয়েছেঃ

‘উল্লেখ্য, আল্লাহর পক্ষ থেকে দামেস্ক শব্দটির অর্থ আমার কাছে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, এ স্থানে এমন একটি শহরের নাম দামেস্ক রাখা হয়েছে যেকানে এজিদের স্বভাব সম্পন্ন ও অপবিত্র এজিদের অভ্যাস ও চিন্তার অনুসারী লোকদের বাস।……. কারনে দামেস্কের সাথে সামঞ্জস্য ও সম্পর্ক রাখে।–(এযালায়ে আওহাম, টীকা ৬৩ থেকে ৭৩ পর্যন্ত)

আর একটি জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। হাদীসের বক্তব্য অনুসারে ইবনে মরিয়াম একটি সাদা মিনারের নিকট অবতরণ করবেন। এ সমস্যার সমাধান করে ফেলা হয়েছে অতি সহজে। অর্থাৎ মসীহ সাহেব নিজেই এসে নিজের মিনারটি তৈরি করে নিয়েছেন। এখন বলুন, কে তাঁকে বুঝতে যাবে যে, হাদীসের বর্ণনা অনুসারে দেখা যায়, ইবনে মরিয়ামের অবতরণের পূর্বে মিনারটি সেখানে মওজুদ থাকবে। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে প্রতিশ্রুত মসীহ সাহেবের আগমনের পর মিনারটি তৈরী হচ্ছে।

সর্বশেষ ও সবচেয়ে জটিল সমস্যাটি এখনো রয়ে গেছে। অর্থাৎ হাদীসের বর্ণনা মতে ঈসা ইবনে মরিয়াম (আ) লিড্ডার প্রবেশ দ্বারে দাজ্জালকে হত্যা করবেন। এ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে প্রথমে আবোলতাবোল অনেক কথাই বলা হয়েছে। কখনো বায়তুল মাকদেসের একটি গ্রামকে লিড্ডা বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। (এযালায়ে আওহাম, আঞ্জুমানে আহমদীয়া লাহেরা কর্তৃক প্রকাশিত, ক্ষুদ্রাকার ২২০ পৃষ্ঠা)। আবার কখনো বলা হয়েছে, লিড্ডা এমন সব লোককে বলা হয় যারা অনর্থক ঝগড়া করে। ….. যখন দাজ্জালের অনর্থক ঝগড়া চরমে পৌঁছে যাবে তখন প্রতিশ্রুত মসীহর আবির্ভাব হবে এবং তার সমস্ত ঝগড়া শেষ করে দেবে’। (এযালায়ে আওহাম ৭৩০ পৃষ্ঠা) কিন্তু এতে করেও যখন সমস্যার সমাধান হলো না, তখন পরিস্কার বলে দেয়া হলো যে, লিড্ডা (আরবীতে লুদ) অর্থ হচ্ছে পাঞ্জাবের লুধয়ানা শহর। লুধিয়ানার প্রবেশ দ্বারে দাজ্জালকে হত্যা করার অর্থ হচ্ছে, দুষ্টদের বিরোধিতা সত্ত্বেও মীর্জা সাহেবের হাতে এখানেই সর্বপ্রথম বাইআত অনুষ্ঠিত হয়।–(আল হুদা, ৯৯ পৃষ্ঠা)

যে কোন সুস্থ্য বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি এসব বক্তব্য বর্ণনার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য হবেন যে, এখানে প্রকাশ্যে দিবালোকে মিথ্যাবাদী বহুরূপীর (False Impersonation) অভিনয় করা হয়েছে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.