সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কাদিয়ানদের আরও কিছু বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা

 

কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট বিরুদ্ধাচরণ

আল্লাহ ও তাঁর রসূল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিধানের মাধ্যমে যখন কোনো বিষয়ের মীমাংসা করে দেন তখন সেই সুস্পষ্ট বিধানকে দূরে সরিয়ে রেখে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে অসম্পর্কিত আয়াত ও হাদীস থেকে নিজের প্রয়োজন মতো অর্থ বের করা এবং বের করা এবং কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট বিধানের সম্পূর্ণ বিপরীত আকীদা পোষণ করা আর সেই অনুযায়ী কাজ করে যাওয়া চরম গোমরাহী বরং আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে নিকৃষ্টতম বিদ্রোহ। যে  ব্যক্তি প্রকাশ্যে আল্লাহ ও তার বিধানের পরিপন্থী কোন পথ অবলম্বন করে, সে অপেক্ষাকৃত ছোট ধরনের বিদ্রোহ করে। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁদেরই ঘোষণা ও বিধান বিকৃত করে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা কোনো ছোটখাটো বিদ্রোহ নয়। এ কাজ যারা করে তাদের সম্পর্কে আমরা কোনোক্রমেই এ কথা ভাবতে পারি না যে, তারা আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশ মেনে চলে। সায়্যেদিনা মুহাম্মদ (সা) শেষ নবী কি না এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন কি না –এ প্রশ্নের মীমাংসার জন্যে আমরা (আরবী**************) এবং (আরবী*****) প্রভৃতি আয়াতের দিকে মনসংযোগ করতে পারতাম যদি আল্লাহ ও তাঁর রসূল বিশেষ করে ঐ প্রশ্নের জবাব কুরআন ও হাদীসের কোথাও না দিয়ে দিতেন। কিন্তু যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ আয়াতে এবং রসূলের পক্ষ থেকে অসংখ্য নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হাসীদে আমরা বিশেষ করে এ প্রশ্নের দ্ব্যর্থহীন জবাব পেয়ে গেছি তখন (আরবী*********) এবং (আরবী*******) প্রভৃতি আয়াতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্দ করা এবং সেগুলো থেকে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট বিধান বিরোধী অথবা গ্রহণ করা একমাত্র সেই ব্যক্তিরই কাজ হতে পারে, যার দিলে বিন্দুমাত্রও আল্লাহর ভয় নেই এবং যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাসই করে না যে, মরার পরে একদিন তাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। এর দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে, যেমন দেশের দণ্ডবিধি আইনের একটি ধারায় একটি কাজকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু এক ব্যক্তি এ অপরাধটিকে বৈধ কর্ম প্রমাণ করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে। এ উদ্দেশ্যে সে ঐ বিশেষ ধারাটিকে বাদ দিয়ে আইনের অমান্য অসম্পর্কিত ধারার মধ্যে সামান্যতম কোনো ইঙ্গিত বা ছোটখাত কোনো অস্পষ্ট বক্তব্য অনুসন্ধানে প্রতৃত্ত হয়েছে। তারপর এগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে আইনের সুস্পষ্ট ধারা যে কাজটিকে সাক্ষ্য প্রমাণ যদি দুনিয়ার পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও আদালত গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে আল্লাহর আদালতে তা কেমন করে গৃহীত হবার আশা করা যেতে পারে?

গায়ের জোরে প্রমাণ করা

তারপর যে আয়াতগুলো থেকে কাদিয়ানীরা তাদের বক্তব্য প্রমাণ করতে চায় সেগুলো পড়ার পর অবাক হতে হয় তাদের প্রমাণ কৌশল দেখে। দেখা যায় ঐ আয়াতগুলোর ঐ অর্থই নয়, যা তারা গায়ের জোরে টেনে-হিঁচড়ে করতে চায়। যেসব আয়াতের ওপর তারা কসরত চালিয়েছে সেগুলোর আসল অর্থ কি দেখা যাকঃ (আরবী*********) সূরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে কেবল এতটুকু যে, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্যকারীরা নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীনদের (সৎ ব্যক্তিবর্গের) সহযোগী হবে। এ থেকে যারা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে তারা হয় নবী হয়ে যাবে, নয়তো সিদ্দীক অথবা শহীদ বা সালেহীন হবে –এ কথা কেমন করে বের হলো? তারপর সূরা হাদীদের ১৯ নম্বর আয়াতটি একবার অনুধাবন করুন। সেখানে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৩ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের ওপর, তারাই হচ্ছে তাদের রবের কাছে সিদ্দীক ও শহীদ”। এ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ঈমান লাভ করার ফলে এক ব্যক্তি কেবলমাত্র সিদ্দীক ও শহীদের মর্যাদা লাভ করতে পারে। আর নবীদের ব্যাপারে বলা যায়, নবীদের সহযোগী হওয়াই ঈমানদারদের জন্যে যথেষ্ট। কোনো কাজের পুরস্কারস্বরূপ কোনো ব্যক্তির নবী হয়ে যাওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। তাই সূরা নিসার আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্যকারীরা নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সাথে অবস্থান করবে। আর সূরা হাদীদের আয়াতে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ ও রসূলের ওপর যারা ঈমান আনবে তারা নিজেরাই সিদ্দীক ও শহীদে পরিণত হবে।

আর সূরা আরাফের ৩৫ নম্বর আয়াতে (আরবী**********) সম্পর্কে বলা হয়েছে এটি একটি বর্ণনাধারার সাথে সম্পর্কিত। সূরা আরাফের ১১ থেকে ৩৬ নম্বর আয়াত পর্যন্ত এ বর্ণনা চলেছে। এ বর্ণনার পূর্বাপর বিষয়বস্তুর মধ্যে রেখে একে বিচার করলে পরিস্কার জানা যায়, মানব জাতির সৃষ্টির প্রতম পর্যায়ে বনী আদমকে এ সম্বোধন করা হয়েছিল। এ আয়াতগুলো পড়ে কেমন করে এ ধারণা লাভ করা যেতে পারে যে, এগুলোর মধ্যে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর নবীদের আগমনের কথা বলা হয়েছে? এখানে তো হযরত আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে যখন বেহেশত থেকে বহিস্কার করে দুনিয়ায় আনা হয় সে সময়কার কথা বলা হয়েছে।

সূরা আরাফের আয়াতের সঠিক অর্থ

কাদিয়ানী সাহেবান সূরা আরাফের ৩৫ নম্বর আয়াতকে তার পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে যে অর্থ বের করে থাকেন তা তাকে যথাস্থানে রেখে বিচার করলে যে অর্থ বের হয় তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আসলে যে বক্তব্য পরম্পরায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে তা সূরা আরাফের দ্বিতীয় ‘রুকূ’ থেকে চতুর্থ রুকূ’র মাঝামাঝি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে দ্বিতীয় রুকূ’তে আদম ও হাওয়ার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তারপর তৃতীয় ও চতুর্থ রুকূ’তে এ কাহিনীর ফলাফলের ওপর মন্তব্য করা হয়েছে। এ পূর্বাপর আলোচনা সামনে রেখে ৩৫ নম্বর আয়াতটি পড়লে পরিস্কার জানা যায় যে, (আরবী******) এর মাধ্যমে সম্বোধন করে যে কথা বলা হয়েছে তা সৃষ্টির সূচনা পর্বের সাথে সম্পর্কিত, কুরআন অবতরণকালের সাথে সম্পর্কিত নয়। অন্য কথায় বলা যায়, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, সৃষ্টির সূচনা পর্বেই আদম সন্তানদেরকে এই বলে সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্যে যে হেদায়াত পাঠানো হবে তার আনুগত্যের ওপর তোমাদের নাজাত নির্ভর করবে।

এ বিষয়বস্তু সম্বলিত আয়াত কুরআনের তিনটি স্থানে সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রত্যেকটি স্থানে হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আ)-এর কাহিনী বর্ণনা প্রসঙ্গে এর অবতারনা করা হয়েছে। প্রথম আয়াকটি এসেছে সূরা বাকারায় (৩৮ নম্বর আয়াত) দ্বিতীয় আয়াতটি সূরা আ’রাফে (৩৫ নম্বর আয়াত) এবং তৃতীয় আয়াতটি সূরা ত্বহায় (১২৩ নম্বর আয়াত)। এ তিনটি আয়াতের বিষয়বস্তুর মধ্যে গভীর সাদৃশ্যের সাথে তাদের পরিবেশ পরিস্থিতির সাদৃশ্যও লক্ষণীয়।

কুরআনের মুফাসসিরগণ অন্যান্য আয়াতের ন্যায় সূরা আ’রাফের এ আয়াতটিকেও হযরত আদম ও হাওয়া (আ)-এর কাহিনীর সাথে সম্পর্কিত গণ্য করেন। আল্লামা ইবনে জারীর (র) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে এ আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হযরত আবু সাইয়্যার আস সুলামীর বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ “আল্লাহ তায়ালা এখানে হযরত আদম (আ) ও তাঁর পরিজনদেরকে একই সঙ্গে ও একই সময়ে সম্বোধন করেছেন”। ইমাম রাযী (রা) তাঁর তাফসীরে কবীর গ্রন্থে এ আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ “যদি নবী করীম (সা)-কে মবেআধন করা হয়ে থাকে, অথচ তিনি শেষ নবী, তাহলে এর অর্থ হবে, আল্লাহ তায়ালা এখানে উম্মতদের ব্যাপারে নিজের নীতি বর্ণনা করছেন”। আল্লামা আলুসী তাঁর তাফসীরে রুহুল মা’আনী গ্রন্থে বলেছেনঃ “প্রত্যেক জাতির সাথে যে ব্যাপারটি ঘটে গেছে সেটাই এখানে কাহিনী আকারে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মতকে বনী আদম অর্থে গ্রহণ করলে মারাত্মক ভুল ও সুস্পষ্ট অর্থের বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। কারণ রসূল শব্দটি একবছনে না বলে বহুবচনে ‘রসূল’ (আরবী***) বলা হয়েছে”। আল্লামা আলুসীর বক্তব্যের শেষাংশের অর্থ হচ্ছে, যদি এখানে উম্মতে মুহাম্মদীয়াকে সম্বোধন করা হতো, তাহলে তাদেরকে কখনো এ কথা বলা যেতো না যে, “তোমাদের মধ্যে কখনো রসলগণ আসবেন”। কারণ এ উম্মতের মধ্যে একজন রসূল [মুহাম্মদ (সা)] ছাড়া অন্য কোনো রসূল আসার প্রশ্নই ওঠে না।

সূরা মুমিনুনের আয়াতের অর্থ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৪ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “হে রসূলগণ! পাক-পবিত্র খাদ্য খাও এবং ভালো কাজ করো, অবশ্যি তোমরা যা কিছু করো আমি তা সব জানি”।–(সূরা আল মুমেনুনঃ৫১)

এ আয়াতটিকে এর পূর্বাপর সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন না করলে, কাদিয়ানীরা এর যে অর্থ করেছে তা করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। যে বক্তব্য প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে তা দ্বিতীয় রুকূ’ থেকে শুরু করে অবিচ্ছিন্নভাবে চলে এসেছে। এসব আয়াতে হযরত নূহ (আ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত সমস্ত নবী ও তাদেঁর জাতির কথা আলোচনা করে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক দেশে ও প্রত্যেক যুগে নবীগণ মানুষদেরকে একটি শিক্ষাই দিয়ে এসেছেন, তাদের পদ্ধতিও ছিল এক ও অভিন্ন এবং তাঁদের ওপর আল্লাহ তায়ালা একই ধরনের অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। বিপরীতপক্ষে পথভ্রষ্ট জাতিরা হামেশা আল্লাহর পথ ত্যাগ করে দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়েছে”। এ বর্ণনা প্রসঙ্গে এ আয়াতটি কোনোক্রমেই নিম্নোক্ত অর্থে নাযিল হয়নিঃ “হে রসূলগণ! যারা মুহাম্মদ (সা)-এর পরে আসবে, তোমরা পাক-পবিত্র খাদ্য খাও এবং ভালো কাজ কর”। বরং এ আয়াতটির অর্থ হচ্ছে নূহ (আ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা) পর্যন্ত যত নবী এসেছিলেন তাঁদের সবাইকে আল্লাহ তায়ালা এই একই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তোমরা পাক-পবিত্র খাদ্য খাও ও ভালো কাজ কর।

এ আয়াতটি থেকেও, মুফাসসিরগণ কখনো নবী মুহাম্মদ (সা)এর পর নবুয়াতের দরজা খুরে যাওয়ার অর্থ নেয়নি। আরো বেশী অনুসন্ধান ও মানসিক নিশ্চিন্ততা লাভ করতে চাইলে বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে এ স্থানটির আলোচনা পাঠ করতে পারেন।

হাদীস থেকে কাদিয়ানীদের ভুল প্রমাণ উপস্থাপন

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ ইবরাহীম [রসূলে করীম (সা) –এর পুত্র] বেঁচে তাকলে অবশ্যি নবী হত-এ হাদীসটি থেকেও কাদিয়ানীগণ যে প্রমাণ উপস্থাপন করে তা চারটি কারণে ভুল।

একঃ যে রেওয়ায়াতে এটিকে নবী করীম (সা)-এর উক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে তার সনদ দুর্বল এবং কোনো মুহাদ্দিসও এই সনদকে শক্তিশালী বলেননি।

দুইঃ নববী ও ইবনে আবদুল বারের ন্যায় শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসের বিষয়বস্তুকে অনির্ভরযোগ্য গণ্য করেছেন। ইমাম নববী তাঁর ‘তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “আর কোনো কোনো পূর্ববর্তী আলেম যে কথা লিখে গেছেন যে, যদি ইবরাহীম [মুহাম্মদ (সা)-এর পুত্র] জীবিত থাকতো, তাহলে সে নবী হতো –এ কথাটি সত্য নয়। কারণ এটি গায়েব সম্পর্কে কথা বলার দুঃসাহস এবং মুখ থেকে না ভেবে-চিন্তে একটি কথা বলে ফেলার মতো”।

আল্লামা ইবনে আবদুল বার ‘তামহীদ’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “আমি জানি না, এটি কেমন বিষয়বস্তু। নূহ (আ)-এর পরিবারে এমন সন্তান জন্ম নিয়েছে যে নবীছিল না। অথচ যদি নবীর পুত্রের জন্যে নবী হওয়া অপরিহার্য হত, তাহলে আজ দুনিয়াতে সবাই নবী হত। কারণ সবাই নূহ (আ)-এর আওলাদ”।

তিনঃ অধিকাংশ রেওয়ায়াতে এ হাদীসকে নবী (সা)-এর উক্তির পরিবর্তে সাহাবীগণের উক্তি হিসেবে পেশ করা হয়েছে। আবার তাঁরা এই সঙ্গে এ কথঅ ও সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, যেহেতু নবী (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই তাই আল্লাহ তায়ালা তাঁর পুত্রকে উঠিয়ে নিয়েছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বুখারীর রেওয়ায়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৬ পৃষ্ঠায়)

“ইসমাঈল ইবনে আবী খালেদ বলেন, আমি আবদুল্রাহ ইবনে আবী আওফাকে (সাহাবা) জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি নবী (সা)-এর পুত্র ইবরাহীমকে দেখেছিলেন? তিনি বলেন, সে শৈশবেই মারা যায়। যদি আল্লাহ তায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর কোনো নবী পাঠাবার ফায়সারা করতেন তাহলে তাঁর পুত্রকে জীবিত রাখতেন। কিন্তু রসূলে করীম (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই”।

হযরত আনাস (রা) প্রায় এরই সাথে সামঞ্জস্যশীল একটি রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ২১৬ পৃষ্ঠায়)

“যদি সে জীবতি থাকতো তাহলে নবী হত। কিন্তু সে জীবতি থাকেনি। কারণ তোমাদের নবী হচ্ছেন শেষ নবী”।–(তাফসীরে রুহুল মা’আনীঃ ২২ খণ্ড, ৩ পৃষ্ঠা)

চার, যে রেওয়ায়াতে এ উক্তিটিকে নবী করীম (সা)-এর উক্তি বলা হয়েছে এবং যাকে দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য গণ্য করা হয়েছে যদি তাতে সাহাবায়ে কেরামের এ ব্যাখ্যা না থাকতো এবং মুহাদ্দিসগণের এ উক্তিগুলো সেখানে সংযুক্ত নাও হতো তবুও তা কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতো না। কারণ হাদীসশাস্ত্রের সর্বসম্মত নীতি হচ্ছে, কোনো একটি রেওয়ায়াতের বিষয়বস্তু যদি বহু সংখ্যক নির্ভুল হাদীসের সাথে সংঘর্ষশীল হয় তাহলে তাকে কোনোক্রমেই গ্রহণ করা যেতে পারে না। তাহলে এখন দেখা যাক, একদিকে অসংখ্য নির্ভুল ও শক্তিশালী সনদ সম্বলিত হাদীস, যাতে পরিস্কারভাবে এ কথা বলে দেয়া হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর নবুয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে আর অন্যদিকে এ একটিমাত্র রেওয়ায়াত, যা নবুয়াতের দরজা খোলা থাকার সম্ভাবনা প্রকাশ করে –এ দু’টি অবস্থা পর্যালোচনা কররে এ একটিমাত্র রেওয়ায়াতের মোকাবিলায় অসংখ্য রেওয়ায়াতকে কেমন করে প্রত্যাখ্যান করা যায়?

শেষ কথা

কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফ উভয়ের দৃষ্টিতে নবুয়াত দ্বীনের একটি মৌলিক বিষয়। অর্থাৎ মানুষের ঈমান ও কুফরীর ভিত্তি এরই ওপর স্থাপিত এবং এরই ভিত্তিতে তার আখেরাতে সাফল্য ও ব্যর্থতার ফায়সালা হবে। কোনো সাচ্চা নবীকে না মানলে মানুষ কাফের হয়ে যাবে। আবার মিথ্যা নবীকে মেনে নিলেও কাফের হয়ে যাবে। এ ধরনের মৌলিক গুরুত্বের অধিকারী কোনো বিষয়কে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সা) সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন পদ্ধতিতে পথ দেখিয়েছেন। মানুষের দ্বীন ও ঈমান যাতে বিপদগ্রস্ত না হয় এবং তার গোমরাহীর জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সা) দায়ী না হন এর ব্যবস্থা তাঁরা আগেই করে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আরো একটি প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর আগে কখনো কোনো নবীর যুগে এ কথা বলা হয়নি যে, নবুয়াতের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আর কোনো নবী আসবেন না। এর অর্থ হচ্ছে, নবীদের আসার দরজা তখন খোলা ছিল এবং একন আর কোনো নবী আসবেন না এ কথা বলে কোনো ব্যক্তি কোনো নবুয়াতের দাবীদারের দাবী অস্বীকার করার অধিকার রাখতো না। আবার সে যুগে নবীগণ তাঁদের পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে থাকতেন। তাঁরা নিজেদের অনুসারীরেদ নিকট থেকে পরবর্তীকালে আগমনকার নবীদের আনুগত্য করার শপথ নিতেন। এসব কার্যক্রম এ কথাটিকে আরো শক্তিশালী করতো যে, কোনো ব্যক্তিকে নিজেকে নবী হিসেবে পেশ করলে কোনো প্রকার ভাবনা-চিন্তা না করে এক কথায় তাকে নাকচ করা চলতো না। বরং তার দাওয়াত, ব্যক্তিত্ব, কার্যাবলী ও অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি যথার্থ আল্লাহর নবী না মিথ্যা নবুয়াতের দাবীদার তা জানার চেষ্টা করা হত। কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সা)-এর আগমনের পর এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। এখন ব্যাপারটি শুধু এখানেই শেষ হয়ে যায়নি যে, মুহাম্মদ (সা) তাঁর পরে আর কোনো নবীর আমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেননি এবং উম্মতের নিকট থেকৈ তার প্রতি আনুগত্যের শপথও নেননি বরং বিপরীত পক্ষে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে মুহাম্মদ (সা) শেষ নবী এবং তিনি একটা দু’টা নয়, অসংখ্য নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এ কথা বলে দিয়েছেন যে, তাঁর পরে নবুয়াতের দাবী নিয়ে দাঁড়াবে সে হবে দাজ্জাল। প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর নবীর দৃষ্টিতে কি বর্তমানে মানুষের ইসলাম ও কুফরীর ব্যাপারটি নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ নয়? রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরবর্তী মুমিনগণই কি শুধুমাত্র কুফরীর ফিতনা থেকে বাঁচার অধিকারী ছিল? এ জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণ কি শুধু তাদেরকেই নবুয়াতের দরজা খোলা থাকার এবং নবীদের আগমনের সিলসিলা জারি থাকার কথা দ্ব্যর্থহীণ কণ্ঠে জানাবার ব্যবস্থা করেছিলেন? কিন্তু এখন তারা জেনে-বুঝেই কি আমাদেরকে এ বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন? অর্থাৎ একদিকে থাকছে নবী আসার সম্ভাবনা, যাকে মানা না মানার কারণে আমরা ঈমানদার বা কাফের হয়ে যেতে পারি। আবার অন্যদিকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণ কেবল নবীর আগমনের খবর থেকে আমাদেরকে অনবহিত রেখেই ক্ষান্ত হননি বরং এর থেকেও এগিয়ে এসে তাঁরা অনবরত এমন সব কথা বলে যাচ্ছেন যার ফলে আমরা মনে করছি নবুয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে এবং এ জন্যে নবুয়াতের দাবীদারকে মেনে নিয়ে পারছি না। আপনাদের বিবেক-বুদ্দি সত্যিই কি এ কথা বলে যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল মুহাম্মদ (সা) আমাদের সাথে এ ধরনের প্রতারণা করতে পারেন?

কাদিয়ানীরা ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ শব্দের ব্যাখ্যা যা খুশী করতে পারে। কিন্তু কমপক্ষে এতটুকু কথা তো তারা অস্বীকার করতে পারবে না যে, নবুয়াতের সিলসিলা খতম করাও এর অর্থ হতে পারে এবং উম্মতের ওলামা ও জনগণের কোটির মধ্যে নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শ’ নিরানব্বই জন এ শব্দের এই অর্থই করে। প্রশ্ন হচ্ছে, নবুয়াতের মতো এমন একটি নাজুক বিষয় –যার ওপর মুসলমানদের ঈমান ও কুফরী নির্ভর করে, আল্লাহর কি এমন একটি ভাষা ব্যবহার করা উচিত ছিল, যা থেকে  মুষ্টিমেয় কয়েকজন কাদিয়ানী ছাড়া সমগ্র উম্মতে মুহাম্মদী এই মনে করেছে যে, এখন আর কোনো নবী আসবেন না? আর নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উক্তিগুলো তো এ ব্যাপারে কোনো প্রকার ভিন্নতর ব্যাখ্যার অবকাশই রাখে না। এ উক্তিগুলোতে দ্ব্যর্থহীনভাবে এ কথা ব্যক্ত করা হয়েছে যে, তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহর নবীর কি আমাদের সাথে এমন কোনো শত্রুতা ছিল যার জন্যে তাঁর পরে নবী আসবেন  অথচ তিনি উল্টো আমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়ে গেলেন যাতে করে আমরা তাকে না মানি এবং কাফের হয়ে হাজান্নামে চলে যাই?

এ অবস্থায় কোনো ব্যক্তি যতই আকর্ষণীয় চেহারা-সুরাতের অধিকারী হোক না কেন, তার ভবিষ্যদ্বাণী শতকরা একশ’ ভাগ সত্য প্রমাণিত হলেও এবং তার হাজারো কৃতিত্ব সত্ত্বেও আমরা তার নবুয়াতের দাবীকে বিবেচনাযোগ্যই মনে করি না। কারণ নবী আসার সম্ভাবনা থাকলে তবেই তো এটা বিবেচনাযো্গ্য হত। আমরা তো প্রত্যেক নবুয়াতের দাবীদারের কথা শুনামাত্রই পূর্ণ নিশ্চিন্ততার সাথে তাকে মিথ্যুক অভিহিত করবো এবং নবুয়াতের স্বপক্ষে আসা তার যুক্তি প্রমাণের ওপর কোনোই গুরুত্বারোপ করবো না। এটা যদি কুফরী হয়ে থাকে তাহলে এর কোনো দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তাবে না। কারণ কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সাফাই পেশ করার জন্যে আমাদের কাছে কুরআন ও রসূলের হাদীস রয়ে গেছে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.