সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

রিসালাত ও তদসংক্রান্ত ইসলামী বিধান

রসূলের আনুগত্য সম্পর্কে এ কথা সর্ববাদীসম্মত যে, কোনো রসূল ব্যক্তি হিসেবে আনুগত্যের অধিকারী নন। মূসা (আ)-এর আনুগত্য ও অনুসরণ এ জন্যে নয় যে, তিনি মূসা বিন ইমরান, ঈসা (আ) ও এ জন্যে আনুগত্য পেতে পারেন না যে, তিনি ঈসা ইবনে মিরয়াম। অনুরূপভাবে নবী মুহাম্মদ (সা)ত-এর আনুগত্য এ জন্যে অনিবার্য নয় যে, তিনি মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ। আনুগত্য ও অনুসরণ যা কিছু করতে হয় তা শুধু এ জন্যে যে, এ মহান ব্যক্তিগণ আল্লাহর রসূল। আল্লাহ তাঁদেরকে যে সত্য জ্ঞান ও হেদায়াত দান করেছেন তা সাধারণ মানুষকে করেননি। তিনি তাঁদেরকে দুনিয়ায় জীবনযাপন করার জন্যেই তাঁরই মর্জি মতো ঐসব সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন যা সাধারণ মানুষ নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী অথবা নবীগণ ব্যতীত অন্য লোকের সাহায্যে লাভ করতে পারে না। এখন যে সম্পর্কে মতভেদ তা হচ্ছে এই যে, রসূলের (সা) আনুগত্য ও অনুসরণ কোন কোন বিষয়ে এবং তার সীমারেখা কি।

একটি দলের দৃষ্টিকোণ

একটি দল বলে যে, রসূল (সা) যে কিতাব আল্লাহর তরফূ থেকে নিয়ে এসেছেন আনুগত্য ও অনুসরণ শুধু সেই কিতাবের করতে হবে। এ কিতাব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার পর রসূলের (সা) রিসালাতের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। তারপর তিনি অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ। অন্যান্য মানুষ যদি আমীর এবং জাতীয় নেতা হয় তাহলে নিছক আইন-শৃঙ্খলার (Discipline) প্রয়োজনে তার আনুগত্য করতে হয় কিন্তু সেটা কোনো ধর্মীয় দায়িত্ব নয়। অন্যান্য মানুষ যদি জ্ঞানী, বিজ্ঞ ও আইন রচয়িতা হয় তবে তার গুণাবলীর (Merits) জন্যে তার অনুসরণ করা হবে। তবে সেটা হবে সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন ব্যাপার, অপরিহার্য কর্তব্য নয়, তাই রসূলের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই করতে হবে। কিতাব পৌঁছে দেয়া ছাড়া অন্য সব ব্যাপারে তাঁর মর্যাদা নিছক ব্যক্তিগত। ব্যক্তি হিসেবে তিনি আমীর বা নেতা হলে তাঁর আনুগত্য ঐ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকাকাল পর্যন্ত –স্থায়ীভাবে নয়। তিনি যদি বিচারক হয়ে থাকেন তবে তার বিচার-ফায়সালা তার নির্দিষ্ট গণ্ডির (Jurisdiction) ভেতরেই কার্যকর হবে। সেই গণ্ডীর বাইরে একজন বিজ্ঞ বিচারক হিসেবে তাঁর বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত বড়জোর একটি নযীর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে কিন্তু আইন রচয়িতা ও বিধানদাতা হিসেবে তাঁর মর্যাদা স্বীকৃত হবে না। তিনি যদি একজন প্রাজ্ঞ মনীষী হন তাহলে তিনি যেসব জ্ঞান ও নৈতিকতার কথা বলবেন তার গুণগত মানের দিক দিয়ে তা গ্রহণ করা যেতে পারে যেমন অন্যান্য জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিতদের এ জাতীয় কথা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। শুধুমাত্র একজন রসূলের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরিয়েছে বলেই তাঁকে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হবে না। অনুরূপভাবে তিনি যদি একজন চরিত্রবান মানুষ হয়ে থাকেন এবং চালচলন, আচার-ব্যবহার ও লেনদেনে তাঁর জীবন যদি একটি অতি উত্তম ধরনের জীবন বলে বিবেচিত হয় তবে আমরা সেচ্ছায় তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করব, যেমন একজন সাধারণ মানুষের নিষ্কলুষ জীবনকেও আদর্শ হিসেবে মেনে নেয়ার ব্যাপারে আমরা স্বাধীন। তবে তার কোনো কাজ বা কথা আমাদের জন্যে নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয় আইনের মর্যাদাসম্পন্ন হবে না।

দ্বিতীয় একটি দলের দৃষ্টিভঙ্গী

অপর একটি দল অভিমতে সামান্য রদবদল করেছে। তাদের বক্তব্য হলো, রসূলের (সা) কাজ শুধু কিতাব পৌঁছে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং কিতাবে সন্নিবেশিত নির্দেশসমূহ বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দেয়াও তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিলযাতে মুসলিম জাতি তা হুবহু অনুসরণ করতে পারে। ইবাদাত ইত্যাদি সম্পর্কে কিতাবের বিধিসমূহের যে বিস্তারিত বাস্তব কার্যপদ্ধতি রসূল (সা) শিক্ষা দিয়েছেন তাও মেনে চলা ধর্মীয় দায়িত্ব এবং তা কিতাবেরই অনুসরণ বলে গণ্য হবে। কিন্তু কিতাবে সন্নিবেশিত বিধিসমূহ ছাড়া রসূল ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যথা বিচারপতি, সমাজ সংস্কারক, মনীষী, নাগরিক ও দলের সদস্য হিসেবে যেসব কাজ সমাধা করেছেন তার কোনোটাই এমন কোনো শাশ্বত ও বিশ্বজনীন আইনের উপকরণ হতে পারে না, যার অনুসরণ ও আনুগত্য করা একটা ধর্মীয় কর্তব্য বলে বিবেচিত হতে পারে।

তৃতীয় দলের অভিমত

তৃতীয় দলের মতে, রসূল (সা)-এর রিসালাতের দায়িত্ব ও মর্যাদা তাঁর জীবনের একটি বিরাট অংশে পরিব্যাপ্ত। নৈতিকতা, সামাজিক আচার-আচরণ, অর্থনৈতিক লেনদেন, প্রশাসনিক ও আইনগত বিচার-ফায়সালা এবং অনুরূপ আরও বহু বিষয়ে রসূলের কথা ও কাজ স্বয়ং আল্লাহর বিধানেরই অন্তর্ভুক্ত। তাদের মতে, এসব বিষয়ে রসূলের কথা ও কাজ সমগ্র উম্মতের জন্যে উত্তম ও অবশ্য পালনীয় আদর্শ। তবে তারা তাঁর ব্যক্তি জীবন ও নবী জীবনের মধ্যে পার্থক্য করার পক্ষপাতি। তাঁরা মনে করেন যে, রসূলের (সা) জীবনের কিছু কিছূ ব্যাপার এমন রয়েছে যা তাঁর নবী জীবনের বহির্ভূত এবং অনুকরণযোগ্য আদর্শ জীবনকে আলাদা করে দেখাতে পারেননি এবং কোন সীমার ওপরে গিয়ে রসূল (সা) নিছক একজন মানুষের মর্যাদা লাভ করেন তা বলতে পারেননি।

চতুর্থ দলের অভিমত

চতুর্থ দলের অভিমত এই যে, রসূল (সা)-এর ব্যক্তিগত জীবন ও নবী জীবন যদিও মর্যাদার দিক দিয়ে দু’রকমের বলেই বিবেচিত কিন্তু বাস্তবে তা একই এবং তাদের মধ্যে কার্যকরভাবে কোনো পার্থক্য করা সম্ভব নয়। রিসালাতের পদমর্যাদা দুনিয়ার অন্যান্য পদ-মর্যাদার মত নয় যে, দায়িত্বশীল যতক্ষণ তাঁর আসনে বসে আছেন ততক্ষণই দায়িত্বশীল, আর যখনই আসন থেকে নামলেন অমনি সাধারণ মানুষের দলভুক্ত হয়ে গেলেন। রসূল যে মুহুর্তে রিসালাতের দায়িত্ব লাভ করেন তখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঐ দায়িত্বে বহাল থাকেন। এ সমগ্র সময়টায় তিনি যে রাজ্যের প্রতিনিধিরূপে প্রেরিত হয়েছেন, সে রাজ্যের নীতি-বিরোধী কোনো কাজে এক মুহুর্তের জন্যেও লিপ্ত হতে পারেন না। তিনি নেতা বা রাষ্ট্রনায়ক হোন, কিংব সমাজের একজন সাধারণ সদস্য হোন; স্বামী, পিতা, ভাই কিংবা আত্মীয় ও বন্ধু হোন, তাঁর জীবনের সকল কার্যকলাপের ওপর রিসালাতের দায়িত্ব সর্বতোভাবে কর্তৃত্বশীল। রিসালাতের দায়িত্ব ও মর্যাদা এক মুহুর্তের জন্যেও তাঁর সত্তা থেকে আলাদা হয় না। এমনকি তিনি নামাযের ইমামতি করার সময় যেমন আল্লাহর রসূল (সা) আপন স্ত্রীর নির্জন সান্নিদ্যে অবস্থান করার সময়েও তেমনি আল্লাহর রসূল (সা)। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি যা-ই করেন আল্লাহর নির্দেশেই করেন। তিনি সবসময় আল্লাহর কঠোর তদারকীর অধীনে থাকেন। তাই প্রতিটি কাজ তিনি আল্লাহর নির্ধারিত সীমার ভেতরে থেকে করতে বাধ্য থাকেন। এভাবে নিজের কথা, কাজ ও যাবতীয় আচার-আচরণের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দেন যে, মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের গোটা ব্যবস্থা এসব মূলনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত এবং এ চৌহদ্দির মধ্যে মানুষের কাজকর্মের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এ মহান দায়িত্ব তিনি সরকারী পর্যায়ে যেমন সুষ্ঠুভাবে পালন করেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও তেমনি। কোনো ব্যাপারে যদি তাঁর সামান্য একটু পদস্খলন হয় তাহলে তাঁকে তৎক্ষণাৎ হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়। কোনো তাঁর ভুল গোটা মুসলিম উম্মতের ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য। তাঁকে রসূল হিসেবে পাঠানোর উদ্দেশ্যই এই যে, তিনি সমাজের মধ্যে জীবন-যাপন করার ভেতর দিয়ে জনগণের সামনে একজন সত্যিকার মুসলমানের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবেন। শুধু যে ব্যক্তিগত কার্যকলাপে তাদের পথ প্রদর্শন করে তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে উৎকৃষ্ট মুসলমানে পরিণত করবেন তা নয় –বরং সেই সাথে ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বিদান বাস্তবায়িত করে একটি যথার্থ ইসলামী সমাজ গড়ে তুলবেন। এ জন্যেই তাঁর ভুল-ভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। যতে করে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে তাঁর অনুকরণ করা যায় এবং তাঁর কথা ও কাজকে ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত মানদণ্ডরূপে গ্রহণ করা যায়। অবশ্য নবীর কথা ও কাজের অনুকরণ ও অনুসরণে বাধ্যবাধকতার স্তরভেদ যে রয়েছে তা অনস্বীকার্য। কোনোটা অত্যাবশ্যক তথা ফরজ বা ওয়াজে পর্যায়ের, কোনোটা অপেক্ষাকৃত উত্তম বা মুস্তাহাব পর্যায়ের, আবার কোনোটা শুধুমাত্র পূর্ণতা অর্জন পর্যায়ের কিন্তু মোটের ওপর নবীর সমগ্র জীবনই আদর্শ। মানব সন্তান তাঁর অনুসরণ করে নিজেকে তাঁর মতো করে গড়ে তুলবে –এ উদ্দেশ্যেই তাঁকে পাঠান হয়েছে। এ আদর্শের অনুকরণে যে ব্যক্তি যতবেশী অগ্রগামীহবে সে ততই পূর্ণ মানুষ ও পূর্ণ মুসলমান হতে পারবে কিন্তু যে ব্যক্তি এর অনুকরণে নুন্যতম অত্যাবশ্যক পর্যায়েরও নীচে থাকবে সে তার পশ্চাদপদতার অনুপাতেই গুনাহগার, নাফরমান, পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত হবে।

আমার মতে, এ শেষোক্ত দলই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমি পবিত্র কুরআন ও যুক্তির আলোকে যতবেশী চিন্তা-গবেষণা করি, এ শেষোক্ত মতের সত্যতা সম্পর্কে আমার বিশ্বাস ততই মজবুদ হয়।

শৈশবকাল থেকেই নবীদের তরবিয়তের বিশেষ ব্যবস্থা

পবিত্র কুরআনে নবীদের সম্পর্কে যে বিবরণ পাওয়া যায় তা পড়লে নবুয়াতের তাৎপর্য বুঝা যায়। সে বিবরণের প্রেক্ষিতে আমার মনে হয় না যে আল্লাহ তায়ালা হঠাৎ করে একজন পথচারীকে ধরে এনে তাঁর কিতাব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব অর্পণ করে থাকেন অথবা কিছু সময়ের জন্যে কর্মচারী হিসেবে কাউকে নবুয়াতের জন্যে নিয়োগ করেন যিনি নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট কাজ করে দিয়েই অব্যাহতি পান এবং তারপরে যা খুশী তাই করতে পারেন। পক্ষান্তরে আমি দেখি যে, আল্লাহ যখনই কোনো জাতির কাছে নবী পাঠাতে চেয়েছেন তখন নবুয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারে এমন একজন লোককে বিশেষভাবেই সৃষ্টি করে থাকেন। যে সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলী ও যে শ্রেষ্ঠতম মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি ও যোগ্যতা এ অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদমর্যাদা রক্ষা করার জন্যে প্রয়োজন, তা তাঁর মধ্যে আগে থেকেই তিনি দিয়ে রাখেন। জন্মলগ্ন থেকেই তাঁকে নিজের বিশেষ তত্ত্বাবধানে লালন পালন করেন।

নবুয়াত দানের পূর্বে তাঁকে সব রকমের চারিত্রিক ক্রটি-বিচ্যুতি, গোমরাহী ও অসৎ কাজকর্ম থেকে দূরে রেখেছেন এবং সব রকমের বিপদ ও ধ্বংসকারিতা থেকে তাঁকে রক্ষা করেছেন। তাঁকে এমন পরিবেশে লালন করেছেন যে, নবুয়াতের যোগ্যতা শক্তির সীমারেখা থেকে অগ্রসর হয়ে উত্তরোত্তর কার্যকারিতায় রূপ ধারণ করতে থাকে। অতপর যখন তিনি পূর্ণ পরিণতি লাভ করেন তখন তাঁকে নিজের কাছ থেকে জ্ঞান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও নির্ভুল পথের সন্ধান প্রদান করেন। এভাবেই তাঁকে নবুয়াতের সুমহান মসনদে সমাসীন করেন এবং এ কাজ তাঁকে দিয়ে সুচারুরূপে সুসম্পন্ন করারন। এই মসনদে আরোহন করার পর থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁর জীবন এই গুরু দায়িত্ব পালনেই ছিল উৎসর্গীকৃত। আল্লাহর তরফ থেকে নাযিল হওয়া আয়াতগুলোকে হুবহু আপন জাতির সামনে উপস্থাপিত করা, অতপর আল্লাহর কিতাবের বিস্তারিত জ্ঞান ও তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দেয়া, আর মানুষের আত্মার সার্বিক পরিশুদ্ধিকরণ –এই হল তাঁদের কাজ। এ ছাড়া তাঁদের আর কোনো কাজ ছিল না। রাত দিন, চলাফেরা ও উঠাবসায় প্রতিটি মুহুর্তে এটাই ছিল তাঁদের একমাত্র চিন্তা-ভাবনা যে কিতাবে পথভ্রষ্ট লোকদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবেন আর যারা সঠিক পথে এসেছে কিভাবে তাদের উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণের যোগ্য করে তুলবেন। তারা হলেন এক একজন সার্বক্ষণিক কর্মচারী। কখনও তাঁর বিরতি বা ছুটি ছিল না। তাঁদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও ছিল না। তারা যাতে কোনো গুনাহর কাজ না করতে পারেন সে জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে কড়া প্রহরা নিয়োজিত থাকত। প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও শয়তানের প্ররোজনা থেকে তাদেরকে কঠোরভাবে রক্ষা করা হতো। দৈনন্দিন কার্যকলাপ কিভাবে করবেন তা পুরোপুরি তাদের মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি বরং যেখানেই নিজের খেয়াল-খুশী বা নিজস্ব বিচার-বিবেচনা মতো চলতে গিয়ে সঠিক পথ থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুত হয়েছেন সেখানেই ভুল ধরিয়ে দিয়ে সোজা পথে তাদেরকে চালিত করা হয়েছে কেননা তাদের জন্ম ও নবীর পদে নিয়োগের উদ্দেশ্যেই ছিল এই যে, তারা যেন আল্লার বান্দাদেরকে সঠিক পথে চালিত করেন। তারা যদি এই পথ থেকে এক চুল পরিমাণও সরে যান তবে সাধারণ মানুষ শত শত মাইল দূরে সরে যাবে।

আমার এ বক্তব্যের প্রতিটি অক্ষরের সাক্ষ্যদান করে কুরআন। নবীরা যে জন্মের আগে থেকেই নবুয়াতের জন্যে নির্বাচিত হতেন এবং তাঁদেরকে বিশেষভাবে এই উদ্দেম্যেই সৃষ্টি করা হতো সে কথা বেশ কয়েকজন নবীর অবস্থা থেকে জানা যায়। যেমন হযরত ইসহাকের জন্মের আগেই হযরত ইবরাহীম (আ)-কে তাঁর জন্ম ও নবুয়াত লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল।

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৫ পৃষ্ঠায়)

“আমি ইবরাহীমকে একজন পুণ্যবান নবী হিসেবে ইসহাকের সুসংবাদ দিয়েছিলাম এবং তাঁর ও ইসকাকের ওপর বরকত দান করেছিলাম”।–(সূরা আস সফফাতঃ ১১২-১১৩)

হযরত ইউসুফ সম্পর্কে তাঁর শৈশবকালেই পিতা হযরত ইয়াকুব জানতে পারেন যে, আল্লাহ তাঁকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন এবং ইবরাহীম (আ) ও ইসহাক (আ)-এর ন্যায় তাঁকেও নিয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ আকারে দান করবেন। হযরত যাকারিয়া (আ) পুত্রের জন্যে দোয়া করলে আল্লাহ তাঁকে এভাবে সুসংবাদ দান করেনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৬ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ তোমাকে ইয়াহিয়া নামক সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরমানের সত্যায়নকারী হিসেবে আগমন করবেন। তিনি নেতৃত্ব ও মহত্বের অধিকারী হবেন। তিনি নবী ও পুণ্যবানদের মধ্যে গণ্য হবেন”।

হযরত মরিয়ামের নিকট বিশেষভাবে একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে হযরত ঈসা সম্পর্কে এই বলে সুসংবাদ দেয়া হয় যে, তাঁকে একটি পুত-পবিত্র পুত্রসন্তান দান করা হবে। যখন তঁর সন্তান প্রসবের সময় হলো তখন বিশেষভাবে আল্লাহর পক্ষ তেকে প্রসবকালীন ব্যবস্থাপনা করা হলো।–(সূরা মরিয়ামঃ ২ রুকূ, দ্রঃ)। তারপর সেই ইসরাঈলী মেষচালকের ব্যাপারটাও লক্ষণীয়। আল্লাহ তাঁকে পবিত্র তুয়া উপত্যকায় ডেকে নিয়ে কথাবার্তা বলেন। অন্যান্য মেষচালকের মতো ছিলেন না তিনি মিসরে তাঁকে বিশেষভাবে ফেরাউনের কুশাসন ধ্বংস ও বনী ইসরাঈলকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্যে সৃষ্টি করা হয়। হত্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে তাঁকে একটা বাক্সতে রেখে নদীতে ফেলে দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। যে ফেরাউন তাঁর হাতেই পর্যদস্তু ও ধ্বংস হবে, তার বাড়ীতেই গিয়ে পৌঁছে তাঁর ভাসমান বাক্স। তাঁকে আকর্ষণীয় করে সৃষ্টি করা হয় যাতে ফেরাউনের পরিবার-পরিজনের হৃদয়ে তিনি স্থান করে দিতে পারেন। (আরবী********) তাঁর মুখে যাতে কোনো নারীর দুধ প্রবেশ না করে এবং তার লালন-পালন আল্লাহর বিশেষ তদারকীতে সুসম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। (আরবী**********) এ দৃষ্টান্তগুরো থেকে জান যায নবীগণকে বিশেষভাবে নবুয়াতের জন্যেই পয়দা করা হতো।

অসাধারণ যোগ্যতা ও বিশেষ কর্মক্ষমতা

উল্লেখ্য যে, এভাবে যাঁদের জন্ম, তাঁরা সাধারণ মানুষের মতো নন। তাঁরা অসাধারণ যোগ্যতা নিয়ে আবির্ভূত হন। তাঁরা অত্যন্ত পবিত্র ও সৎ স্বভাবের মানুষ। তাঁদের মন-মস্তিষ্কের প্রকৃতি ও  কাঠামো এমন যে, তাঁরা যে কথাই বলেন অত্যন্ত সোজা ও সরলভাবেই বলেন। ভ্রান্ত পদক্ষেপ এবং বক্র দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের এমন কোনো প্রবণতাই তাঁদের স্বভাব-প্রকৃতিতে নেই। জন্মগতভাবে তাঁদেরকে এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যে, তাঁরা বিনা ইচ্চা ও শুধু তীব্র অনুভূতি ও দিব্যজ্ঞানের (Intvition) দ্বারা নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে পারেন, যা অন্যান্য মানুষ দীর্ষ চিন্তা গবেষণার পরও পারে না। জ্ঞান তাঁদের অর্জন করতে হয় না। তাদের জ্ঞান সহজাত ও খোদাপ্রদত্ত। কোনটা হক, কোনটা বাতিল এবং কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক –সে জ্ঞান মজ্জাগত। স্বভাবতই তাঁরা সঠিক চিন্তা করেন, সঠিক কথা বলেন। উদাহরণস্বরূপ হযরত ইয়াকুব (আ)-এর উল্লেখ করা যেতে পারে। হযরত ইউসুফের স্বপ্নের বৃত্তান্ত শোনা মাত্রই তাঁর মনে খটকা জন্মে। ছেলেটির ভাইয়েরা তাকে বেঁচে থাকতে দেবে না। ভাইয়েরা ইউসুফকে  খেলার জন্যে সাথে করে নিয়ে যেতে চায়। হযরত ইয়াকুব শুধু যে তাদের অসদুদ্দেশ্যই ধরে ফেলেন তাই নয়, রবং পরবর্তী সময়ে তারা যে মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন তাও নির্ভুলভাবে জুঝতে পারেন। তিনি বলেন, (আরবী*************) (আমার আশংকা হয় যে তোমরা ওর দিকে লক্ষ্য রাখবে না, এমন এক মুহুর্তে ওকে বাঘে খেয়ে ফেলবে।) এরপর যখন ইউসুফের ভাইয়েরা রক্তমাখা জামা এনে দেখাল তখন হযরত ইয়াকুব তা দেখখেই বললেন, (আরবী**************) “তোমাদের প্রবৃত্তি একটা কঠিন কাজ তোমাদের জন্যে সহজ করে দিয়েছে”। আবার ইউসুফের ভাইয়েরা যখন মিসর থেকে ফিরে এসে বলল, আপনার ছেলে চুরি করেছে এবং তাঁর যাতে বিশ্বাস হয় সে জন্যে বলল, সেই গ্রামের লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন যেখান থেকে আমরা এলাম; তখন আবার তিনি সেই একই জবাব দেন যে, তোমাদের প্রবৃত্তি একটা কঠিন কাজ তোমাদের জন্যে সহজ করে দিয়েছে। অতপর তিনি ছেলেদের আবার এই বলে মিসজ পাঠান (আরবী********************) (যাও ইউসুফ ও তার ভাইয়ের খোঁজ কর)। ব্যাপারটা এমন যেন দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইউসুফ বেঁচে আছেন এবং মিসরেই আছেন। এরপর হযরত ইয়াকুবের ছেলেরা হযরত ইউসুফের জামা নিয়ে যকণ মিসর থেকে রওনা দিল তখন হযরত ইয়াকুব দূর থেকেই হযরত ইউসুফের ঘ্রাণ পেতে থাকেন। এসব ঘটনা থেকেই উপলব্ধি করা যায় যে, নবীদের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক শক্তি-সামর্থ্য কত প্রবল ও অসাধারণ। এটা শুরু হযরত ইয়াকুবেরই বৈশিষ্ট্য নয় –সকল নবীরই একই অবস্থা। হযরত ইয়াহিয়া সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৭ পৃষ্ঠায়)

“আমি শৈশবকালেই তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা দান করেছিলাম”।–(মরিয়মঃ ১২-১৩)।

হযরত ঈসা (আ) যখন মায়ের কোলে তখন তাঁকে দিয়ে ঘোষণা করান হয়ঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৭ পৃষ্ঠায়)

“তিনি আমাকে বরকতের অধিকার করে সৃষ্টি করেছেন –যেখানেই আমি থাকি না কেন –আর আজীবন নামায ও যাকাত পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাকে তিনি আমার মায়ের হক আদায়কারী করে পয়দা করেছেন। আমাকে বলপ্রয়োগকারী ও অসৎ বানাননি”।

মহানবী (সা) সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন (আরবী**************) “নিশ্চয়ই তুমি নৈতিক চরিত্রের উচ্চ শিখরে”।–(সূরা কলমঃ ৪)

এগুলো হলো নবীদের জন্মগত ও স্বভাবগত গুণ-বৈশিষ্ট্য যা নিয়ে তাঁরা জন্মগ্রহণ করেন। অতপর আল্লাহ তাঁদের এসব সহজাত গুণ-বৈশিষ্ট্যকে আরও উৎকর্ষ প্রদান করে সক্রিয় ভূমিকার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। অবশেষে তাঁদেরকে সেই মহান বস্তু দান করেন যাকে কুরআনের ভাষায় এলম ও হুকুম (জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা) এবং হেদায়াত (পথনির্দেশ) ও বাইয়েনা (সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী) প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়েছে। হযরত নূহ (আ) তাঁর জাতিকে বলেনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“আমি আল্লাহর কাছ থেকে সেই জ্ঞান লাভ করেছি যা তোমরা লাভ করনি”।

হযরত ইবরাহীম (আ)-কে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর ওপর আল্লাহর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করান হয় (সূরা আনআম )। সে পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি যখন নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করে ফিরলেন তখন আপন পিতাকে বললেনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার পিতা! আমি এমন এক জ্ঞান লাভ করেছি যা আপনি লাভ করেননি। সুতরাং আপনি আমার অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সোজা পথ দেখাব”।–(সূরা মরিয়ামঃ ৪৩)

হযরত ইয়াকুব সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“নিশ্চিতভাবেই তিনি আমার দেয়া জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তবে অধিকাংশ লোক সে রহস্য জানে না”।–(সূরা ইউসুফঃ ৬৮)

হযরত ইউসুফ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“তিনি যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন আমি তাকে জ্ঞান ও বিচার-ফায়সালার ক্ষমতা প্রদান করি”।–(সূরা ইউসুফঃ ২২)।

সূরা কাসাসের ১৪ আয়াতে হযরত মূসা (আ) সম্পর্কেও এ কথা বলা হয়েছে। হযরত লূতকেও একই জ্ঞান ও বিচার-ফায়সালার ক্ষমতা দেয়া হয়।–(সূরা আম্বিয়াঃ ৭৪)

স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সা)-কেও এই অসাধারণ জ্ঞান দান করা হয়ঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও তত্ত্বজ্ঞান এবং তোমাকে সেই জ্ঞান দান করেছেন যা আগে তুমি জানতে না”।–(সূরা নিসাঃ ১১৩)

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“তুমি বরে দাও যে, আমি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল পথে আছি”।–(সূরা আনআমঃ ৫৭)

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৯ পৃষ্ঠায়)

“বল এই হলো আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে ডাকি। আমি নিজে এবং আমার অনুসারীরা দিব্যজ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন”।–(সূরা ইউসুফঃ ১০৮)

এই জ্ঞান ও বিচার-ফায়সালার ক্ষমতার দরুন নবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এতখানি পার্থক্য সৃষ্টি হয় যতখানি পার্থক্য থাকে একজন চক্ষুষ্মান ও অন্ধের মধ্যে।

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৮ পৃষ্ঠায়)

“আমি কেবল আমার কাছে যে অহী আসে তার অনুসরণ করি। (হে মুহাম্মদ!) বলুন, অন্ধ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষ কি সমান হতে পারে?”-(সূরা আনআমঃ ৫০)

এ আয়াতগুলোতে যে জিনিসটির কথা বলা হয়েছে সেটি শুধু কিতাব নয় –বরং তা হচ্ছে নবীদের অন্তরে সদাপ্রোজ্জ্বল এক জ্যোতি। এ জন্যে কিতাব থেকে আলাদাভাবে এর উল্লেখ করা হয়েছে। এ জিনিসটিকে নবীদের গুণ-বৈশিষ্ট্যরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁরা ঐ আলোকরশ্মির সাহায্যে তথ্যানুসন্ধান করেন এবং তাঁদের সামনে যেসব সমস্যা প্রতিনিয়ত হাজির করা হয় তারও সমাধান খোঁজেন। বিজ্ঞ মনীষীগণ একে ‘গোপন অহী’ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ এটা একটা অন্তর্নিহিত পথনির্দেশিকা ও আত্মস্থ উপলব্ধি –যা প্রতিমুহুর্তে তাঁদের কাছে বর্তমান থাকে এবং যে কোন ব্যাপার তাঁরা তাঁর সাহায্য নিয়ে থাকে। অন্যান্য লোক দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পরও যেসব বিষয়ের গূঢ়তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে না এবং ভুল ও নির্ভুল নির্ণয় করতে পারে না, সেসব বিষয়ে নবীর দৃষ্টি আল্লাহ প্রদত্ত জ্যোতি ও দিব্যজ্ঞানের বলে মুহুর্তের মধ্যেই নিগূঢ়তম রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়।

নবীদের তত্তাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণে আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থা

কুরআন থেকে আমরা এ কথাও জানতে পারি যে, আল্লাহ তায়ালা নবীদেরকে শুধু যে তত্ত্বজ্ঞান, বিচার-ফায়সালার ক্ষমতা এবং অসাধারণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন তা নয়, বরং সেই সাথে তিনি তাঁদের ওপর বিশেষ দৃষ্টিও রাখেন, ভুল-ভ্রান্তি থেকে তাঁদেরকে রক্ষা করেন এবং পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করেন তা মানুষের প্রভাবেই হোক কিংবা শয়তানের প্ররোচনায় অথবা নিজ প্রভৃতির কুমন্ত্রণা হোক। এমনকি নিজের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও তাঁরা যদি ভুল করেন তাহরে আল্লাহ তৎক্ষণাৎ তাঁদেরকে শুধরে দেন। হযরত ইউসুফের ঘটনাই ধরুন। মিসরের তৎকালীন জনৈক উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তার স্ত্রী যখন ইউসুফকে তাঁর ফাঁদে প্রায় ফেলেছিল, তখন আল্লাহ তাঁর সুস্পষ্ট ‘প্রমাণ’ দেখিয়ে দুষ্কর্ম থেকে রক্ষা করেন।

(আরবী************************************পিডিএফ ২৪৯ পৃষ্ঠায়)

“সে (মহিলাটি) ইউসুফের প্রতি অসৎ অভিপ্রায় পোষণ করলো। ইউসুফও তার প্রতি করতো যদি না সে আপন প্রতিপালকের প্রমাণ দেখতে না পেতো। এমনটি হলো এ জন্যে যাতে করে আমি তাকে খারাপ ও বেহায়াপনার কাজ থেকে ফিরিয়ে দিতে পারি। কেননা সে ছিল এমন বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে আমি আমার জন্যে নির্দিষ্ট করে নিয়েছি”।–(সূরা ইউসুফঃ ২৪)।

হযরত মূসা ও হারুনকে যখন ফেরাউনের কাছে যেতে বলা হল তখন ফেরাউন তাদের ওপর অত্যাচার করতে পারে ভেবে তাঁরা ভীত হয়ে পড়লেন। তখন আল্লাহ বলেন, ভয় কর না। আমি তোমাদের সাথে আচি এবং সবকিছু দেখছি ও শুনছি (সূরা তাহাঃ ৪৫-৪৬) মানবিক দুর্বলতা হেতু তারা ভীত হয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা অহী দ্বারা এ মারাত্মক দুর্বলতা দূর করে দেন।

হযরত নূহ ছেলেকে ডুবে মরতে দেকে আর্তনাদ করে উঠলেন! (আরবী*****************) “হে খোদা! এ আমার ছেলে”। এ ছিল মানবীয় দুর্বলতা। আল্লাহ তায়ালা তৎক্ষণাৎ তাঁর কাছে এ অর্থ সুস্পষ্ট করে তুলে ধরলেন –যে সে তার ঔরসজাত সন্তান হলে হতে পারে কিন্তু সে তার ‘পরিজনভুক্ত’ নয়। কেননা সে দুষ্কৃতিকারী। পিতৃস্নেহের আবেগে মানবসুলভ দুর্বলতা কিছুক্ষণের জন্যে এ সত্যকে নবীর অন্তর্দৃষ্টি তেকে প্রচ্ছন্ন রাখে যে সত্যের বেলায় পিতা, পুত্র, ভাই-বোন কিছু নয়। অহীর মাধ্যমে চোখের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দিলেন। হযরত নূহ আশ্বস্তবোধ করলেন।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর বেলায়ও বেশ কয়েকবার এ রকম ঘটনা ঘটেছে। কখনও স্বভাবসুলভ দয়া ও করুণা বশে, কখনও কাফেরদের ইসলামে দীক্ষিত করার অদম্য উৎসাহে কখনও কাফেরদের মন জয় করার অভিলাষে, কখনও লোকদের ছোটখাট উপকারের প্রতিদান দেয়ার চেষ্টায়, কখনও মুনাফেকদের মনে ঈমানের প্রেরণা উজ্জ্বীবিত করার বাসনায় এবং কখনও মানবীয় দুর্বলতার কারণে তাঁর পক্ষ থেকে ইজতেহাদী ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে কিন্তু যখনই এ রকম হয়েছে তখনই আল্লাহ প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট অহী দ্বারা তাঁকে সংশোধন করে দিয়েছেন। যেমনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫০ পৃষ্ঠায়)

“তিনি বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরালেন। কেননা তার কাছে অন্ধ লোকটি এসেছিল”।

 

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫০ পৃষ্ঠায়)

“কোনো নবীর কাছে যুদ্ধবন্দী থাকবে এটা কোনো নবীর জন্যে শোভনীয় নয়”।

 

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫০ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী) আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন, তুমি কেন তাদেরকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত থাকার জন্যে অনুমতি দিলে”।–(সূরা আত তওবাঃ ৪৩)।

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫০ পৃষ্ঠায়)

“তাদের জন্যে তোমার ক্ষমা চাওয়া বা না চাওয়া উভয় সমান। তুমি তাদের জন্যে সত্তরবার ক্ষমা চাইলেও আল্লাহ কখনও মাফ করবেন না”।–(সূরা আত তওবাঃ ৮০)

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫১ পৃষ্ঠায়)

“ভবিষ্যতে (মুনাফিকদের) কেউ মারা গেলে তার জানাযা যেন কখনও না কর”।

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫১ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্যে যা হালাল করেছেন তা তুমি হারাম কর কেন?

এ আয়াতসমূহ নবীদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের সাক্ষ্য বহন করে।

কিছু রোক এ আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, নবীদের ভুল হতো। তারা ত্রুটি-বিচ্যুতির ঊর্ধে ছিলেন না। বিশেষ করে হাদীস-বিরোধী আহলে কুরআন দল এ আয়াতগুলোর দ্বারা নবীর ভুল ধরতে বড় আনন্দ পান। অথচ এই আয়াতগুলো দ্বারাই এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাঁর নবীকে ভুল-ত্রুটি থেকে রক্ষা করার এবং তাঁদের জীবনকে সত্যের মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্টিত রাখার দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়টি শুধু উল্লিখিত আয়াতগুলোতেই বর্ণিত হয়নি, কুরআনের আরও কয়েক জায়গায় নীতিগতভাবেও বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫১ পৃষ্ঠায়)

“তোমার ওপর যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকতো তাহলে তাদের মধ্যে একটা দল তোমাকে হক পথ থেকে হটিয়ে দেয়ার সংকল্প করেই ফেলেছিল। তবে আসলে তারা নিজেদেরকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। তারা তোমার কোনো ক্ষতিও করতে পারে না। কেননা আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও তার নিগুঢ় তত্ত্ব নাযিল করেছেন। আর তোমাকে সেই জ্ঞান দিয়েছেন যা তোমার পূর্বে ছিল না”।–(সূরা আন নিসাঃ ১১৩)

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫১ পৃষ্ঠায়)

“আমি তোমার কাছে যে অহী নাযিল করেছি তা থেকে তোমাকে তারা প্রায় বিচ্যুৎ করার উপক্রম করেছিল যাতে তুমি আমার নামে নতুন কিচু বানাও। তাহলে তারা তোমাকে বন্ধুরূপে বরণ করে নিতো। আমি যদি তোমাকে অবিচল না রাখতাম তাহলে তুমি তাদের দিকে কিছুটা ঝুঁকেই পড়তে”।–(সূরা বনি ইসরাঈলঃ ৭৩-৭৪)

(আরবী************************************পিডিএফ ২৫২ পৃষ্ঠায়)

“তোমার আগে আমি যখনই কোনো নবী বা রসূল পাঠিয়েছি এবং যখন সে কোনো বিষয়ে আকাঙ্খা পোষণ করেছে তখন শয়তান তার আশা-আকাঙ্খায় কুমন্ত্রণা দিয়েছে। তবে আল্লাহর রীতি এই যে, নবীর মনে শয়তান যে কুমন্ত্রণাই দেয় আল্লাত তা নির্মূল করে দেন। অতপর নিজের নিদর্শনাবলীকে সুদৃঢ় করেন”।–(সূরা আল হজ্বঃ ৫২)

এই মৌলিক উপদেশগুলো এবং পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তসমূহ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ স্বীয় নবীর জীবনকে বাঞ্ছিত মানদণ্ডে বহাল রাখার দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন এবং নবীর কিছুমাত্র পদসঙ্খলন হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা সংশোধন করার কঠোর ব্যবস্থা করেছেন –সে পদঙ্খলন কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপার হোক বা জন-জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাপারে। আর নীতিগতভাবে এ কথা মেনে নেয়া হলে এর থেকে আপনাআপনি এটাও প্রমাণিত হয় যে, নবীর যেসব কথায় আল্লাহ তায়ালা কোনো আপত্তি করেননি তা সবই আল্লাহর ইপ্সিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। ধরে নিতে হবে যে, আল্লাহ কর্তৃক সেগুলো সবই অনুমোদিত।

আপেক্ষিক পর্যালোচনা

এ পর্যন্ত যে আলোচনা করা হলো তা থেকে নবুয়াতের তাৎপর্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উল্লিখিত চারটি মতের প্রথমটির বক্তব্য অনুসারে নবুয়াতের তাৎপর্য এই দাঁড়ায় যে, একজন মানুষ সারাজীবন সকল দিক দিয়ে অন্য মানুষের মতোই একজন মানুষ হয়ে একটা বিশেষ বয়সে উপনীত হলেই সহসা আল্লাহর অহী নাযিল করার জন্যে তাকে নির্বাচিত করা হয়। তার কাছে নাযিল করা কিতাবখানি ছাড়া তার কোনো মতামত, ধ্যান-ধারনা, সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ ইত্যাদি কোনভাবেই সাধারণ মানুষ থেকে পৃথক ও বিশিষ্ট ধরনের হয় না। দ্বিতীয় মত অনুসারে নবুয়াতের অর্থ এই যে, নবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শুধু এতটুকু পার্থক্য থাকে যে, কিতাব নাযিল করার সাথে সাথে তাকে কিতাবের বিধিসমূহ বাস্তব খুঁটিনাটিও জানিয়ে দেয়া হয়। এটুকু বৈশিষ্ট্য অর্জনের পর তিনি সাধারণ নেতাদের মতোই একজন নেতা ও সাধারণ বিচারকদের মতোই একজন বিচারক। তৃতীয় মতটিকে নবুয়াত সম্পর্কে এরূপ ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে যে, নবুয়াত হলো নবীর মানবীয় সত্তার ওপর আপাতত একটি সাময়িক অবস্থা বা ভাবান্তর মাত্র এবং এ অবস্থা বা ভাবান্তর সৃষ্টির পরও নবীর মানবীয় সত্তা ও নবী সত্তা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে অবস্থান করে। এ ধারণা অনুসারে নবীর জীবনকে দু’টো ভাগে বিভক্ত করা অপরিহর্য হয়ে দাঁড়ায় এবং শুধুমাত্র জীবনের নবুয়াত সম্পর্কিত অংশকেই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় বলে বিবেচিত হয়। বলা বাহুল্য, এ তিনটি মতই ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত।

নবী পূর্ণতম ও শ্রেষ্ঠতম মানবীয় গুণে ভূষিত

পবিত্র কুরআন নবুয়াতের যে পরিচয় তুলে ধরেছে তা থেকে আমরা যা জানতে পারি তা হচ্ছে এই যে, নবী একজন সাধারণ মানুষের মতো জন্মলাভ করে ও বড় হয়ে এক সময়ে হঠাৎ করে নবী নির্বাচিত হন না বরং তিনি নবুয়াতের জন্যেই জন্মলাভ করে থাকেন। তিনি যদিও একজন মানুষ এবং একজন মানুষের জন্যে আল্লাহ যেসব স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা নির্ধারিত করেছেন তিনিও তার ঊর্ধে নন কিন্তু সেই সীমার মধ্যে তিনি পূর্ণতম ও উৎকৃষ্টতম মানুষ। একজন মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণে ও পূর্ণাঙ্গভাবে থাকে। তাঁর দৈহিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিগুলো সর্বাধিক ভারসাম্য সহকারে বিধ্যমান থাকে। তাঁর উপলব্ধি-ক্ষমতা এতো সূক্ষ্ম হয়ে থাকে যে, তিনি ন্যায় ও অন্যায় সংক্রান্ত খোদায়ী জ্ঞানকে কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই কেবল নিজের প্রখর প্রজ্ঞা ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দ্বারাই লাভ করে থাকেন। প্রজ্ঞার সাহায্যে প্রাপ্ত এই খোদায়ী জ্ঞানের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে এ আয়াতেঃ (আরবী*******) (অতপর সৎ ও অসৎ প্রবণতা তার মধ্যে দিয়ে দিয়েছেন)। নবীর স্বভাব প্রকৃতি এতো সুস্থ ও সঠিক থাকে যে, তিনি বাইরের কোনো শিক্ষা লাভ ছাড়াই কেবলমাত্র স্বভাবসুলভ অনুভূতি ও প্রেরণার বলে পাপ পথ বর্জন করে তাকওয়া ও ন্যায়-নীতির পথ অবলম্বন করে থাকেন তাঁর বিবেক ওমন এতো নির্মল এবং নিষ্কলুষ থাকে যে, তিনি প্রয়োজনীয় সকল ব্যাপারে আল্লাহর মনোনীত কর্মপন্থা নির্ভুলবাবে বুঝতে পারেন। কুরআনের এ আয়াতেঃ (আরবী**********) [তাঁর সুস্থ স্বভাব-স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে আল্লাহর অভিপ্রেত পথে চলেন। এটাই হচ্ছে পরিপূর্ণ মানবতা বেং এ গুনের বদৌলতেই তিনি সঠিক অর্থে  এবং বাস্তবে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। বস্তু নবীর এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিণতি ও পরিপক্কতা লাভের পর তাঁকে সর্বসাধারণের পথপ্রদর্শকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আরও জ্ঞানের আলো লাভ করে তিনি হন ‘সিরাজাম মুনীর’ বা উজ্জ্বল প্রদীপ। মানবতার সংস্কার ও কল্যাণের জণ্যে শিক্ষাদীক্ষা ও নির্দেশাবলির মাধ্যম হিসেবে অভিহিত। আর একেই বলা হয় প্রচলিত ভাষায় নবুয়াত ও রিসালাত। সুতরাং এ কথা বলা ঠিক নয় যে, নবুয়াত একটি সাময়িক ব্যাপার যা বিশেষ এক সময়ে নবীর মানব-প্রতিভার ওপর আরোপিত হয়। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, সেটাই হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ মানবতার প্রতিভা যা নবুয়াতের উন্নিত হয়। নবুয়াতের মর্যাদা এমন ব্যক্তির মতো নয় যাকে রাজ প্রতিনিধি (Viceroy)  নিযুক্ত করা হয়। তার স্থলে অন্য কাউকে পাওয়া গেলে তাকেও অনুরূপ রাজ প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হতো। আসলে নবুয়াত একটা জন্মগত জিনিস। নবীর ব্যক্তিসত্তাই হলো তার নবী-সত্তা। পার্থক্য শুধু এই যে, অহী নাযিলের আগে তাঁর নবী-সত্তা নিস্ক্রিয় ও সুপ্ত থাকে, অহী নাযিলের পর তা হয়ে ওঠে সক্রিয়। যেমন কোনো একটি মিষ্টি ফল। মিষ্টি ফল হিসেবেই তার জন্ম, কিন্তু তার মিষ্টতা প্রকাশ পায় একটা বিশেষ সময়ে উপনীত হওয়ার পর।

প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ

এবারে আল্লাহ তায়ালা নবুয়াত ও নবী-সত্তা সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গায় যেসব উক্তি করেছেন তার অর্থ ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যেতে পারে। সহজবোধ্য করার উদ্দেশ্যে আমি এ আয়াতগুলোকে বিশেষ ধারাবাহিকতার সাথে উল্লেখ করছিঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর এ নিয়ম এই যে, তিনি তোমাদেরকে সরাসরি অদৃশ্য সংক্রান্ত জ্ঞান দান করবেন। বরং এ কাজের জন্যে তিনি তাঁর রসূলদের মধ্য থেকে যাকে খুশী নির্বাচন করবেন কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের ওপর ঈমান আন”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৭৯)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“আমি যে রসূলই পাঠিয়েছি তা এ জন্যে যে, আল্লাহর নির্দেশেই তার আনুগত্য করতে হবে”।–[অর্থাৎ রসূল ব্যক্তিগতভাবে আনুগত্য লাভের অধিকারী নন, বরং আল্লাহর অনুমতি বা নির্দেশক্রমেই তাঁর আনুগত্য করতে হয়।–(গ্রন্থকার)]–(সূরা আন নিসাঃ ৬৪)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করল সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য করল”।

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“অস্তমি নক্ষত্রের শপথ। তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্তও নন, বিপথগামীও নন। তিনি মনগড়া কিছু বলেন না। তিনি যাই বলেন তা তাঁর ওপরে অবতীর্ণ অহী ছাড়া আর কিছুই নয়”।–(সূরা আন নাজমঃ ১-৪)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“আমার কাছে যে অহী আসে আমি কেবল তারই অনুসরণ করি”।–(সূরা আল আনয়ামঃ ৫০)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর রসূলের মধ্যে তোমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে”।–(সূরা আল আহযাবঃ ২১)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“(হে মুহাম্মদ!) তুমি বলে দাওঃ তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তাহলে আমার কথা মত চল তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৩১)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“ঈমানদারদের কর্তব্য এই যে, তাদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ডাকা হয় –যাতে করে তিনি (রসূল) তাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতে পারেন, তখন তারা শুধু বলবে, ‘শুনলাম এবং মেনে নিলাম’। এ রকম লোকেরাই কৃতকার্য। এবং তোমরা রসূলের আনুগত্য করলেই সুপথ পাবে”।–(সূরা আন নূরঃ ৫১-৫৪)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) তোমার প্রতিপালকের শপথঙ না, তারা কিছুতেই মু’মিন নয় যতক্ষণ না তারা তাদের দ্বন্দ্ব-কলহে তোমাকে সালিস মেনে নেবে। অতপর তোমার বিচার-ফায়সালায় কোনো রকম সংকোচ বোধ না করে নত মস্তকে পুরোপুরি মেনে নেবে”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬৫)

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৪ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো একটা বিষয়ে একবার ফায়সালা করে দিলে কোনো মু’মিন পুরুষ অথবা নারীর এ অধিকার থাকবে না যে, নিজেদের ব্যাপারে স্বয়ং কোনো ফায়সালা করার এখতিয়ার তাদের থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করল সে প্রকাশ্যে গোমরাহীর মধ্যে পতিত হল”।–(সূরা আহযাবঃ ৩৬) ৱ

এ আয়াত কয়টি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টির সকল মর্ম উদঘাটিত হবে।

নবী ও সাধারণ মানুষের পার্থক্য

প্রথম আয়াতে নবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে এবং কি কারণে তার ওপর ঈমান আনতে হয় তাও বলা হয়েছে। আল্লাহর রীতি এই যে, গায়েব বা অদৃশ্য সংক্রান্ত-[যে কয়টি সত্য ব্যাপার মানুষের ইন্দ্রিয়ানুভূতির আওতার বাইরে অবস্থিত অথচ পার্থিব জগতে মানুষের জন্যে কোনো বিশুদ্ধ ও নির্ভুল জীবনব্যবস্থা রচনায় সেগুলো জানা অপরিহার্য। কুরআনের ভাষায় তাকেই গায়েব বা অদৃশ্য বলা হয়েছে। যেমন মানুষের প্রকৃত পরিচয় কি? সে স্বাধীন, না পরাধীন? পরাধীন হলে কার অধীন? সেই মনিবের সাথে তার সম্পর্ক কি ধরনের? মনিবের কাছে তাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে কি? করতে হলে কোথায়? কিভাবে? কোন মানদণ্ডে? কি কি ব্যাপারে? জবাবদিহি করে সফল হলেই বা কি প্রতিফল, ব্যর্থ হলেই বা কি পরিণতি? এসব প্রশ্নের জবাব –তাও আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে নয় –নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে পাওয়ার আগে মানুষের জীবনের জন্যে কোনো বিধান রচিত হতে পারে না। আয়াতে আল্লাহ যে ‘অদৃশ্য জ্ঞান’-এর কথা উল্লেখ করেছেন, সে অদৃশ্য জ্ঞান এটাই।–(গ্রন্থকার)] জ্ঞান প্রত্যেক মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে দান করেন না বরং কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দান করেন। এ জন্যে সেই বিশিষ্ট ব্যক্তির ওপর ঈমান আনা সাধারণ মানুষের অবশ্য কর্তব্য।

নবীর আনুগত্য শর্তহীন ও সীমাহীন

দ্বিতীয় আয়াতের বক্তব্য এই যে, রসূলের ওপর ঈমান আনার অর্থ তাকে শুধু রসূল বলে স্বীকার করে নেয়া নয় বরং সেই সাথে রসূলের আনুগত্য তথা তার নির্দেশাবলী মেনে চলাও অপরিহার্য। শুধু এ আয়াতে নয়, বরং কুরআনের যেখানে যেখানে এ আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেখানে নির্দেশটি শর্তহীন। কোনো একটি জায়গায়ও এমন কথা বলা হয়নি যে, রসূলের আনুগত্য অমুক ক্ষেত্রে করতে হবে এবং ঐগুলো ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রে আনুগত্যের দরকার নেই। সুতরাং এ কথা নিশ্চিত যে, কুরআনের মতে রসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োজিত এমন একজন শাসনকর্তা যার কর্তৃত্ব নিরংকুশ এবং যার নির্দেশ সর্বক্ষেত্রে সকল অবস্থায় পরিপূর্ণভাবে মান্য করা প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য। অবশ্য রসূল নিজে যদি তাঁর শাসন ক্ষমতাকে খোদায়ী বিধানের অধীন কোনো বিশেষ সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন তবে সেটা তাঁর ইচ্ছাধীন। ইচ্ছা করলে তিনি তা করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সীমার বাইরে মানুষকে চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা দিতে পারেন, স্বয়ং মু’মিনদেরকে রসূলের কর্তৃত্বের সীমা নির্ধারণ করার কোনো ক্ষমতা ও অধিকার দেয়অ হয়নি। তাঁরা চূড়ান্তভাবে ও সবোর্তভাবে তাঁর কর্তৃত্বাধীন এবং তাঁর নির্দেশের অনুগত। রসূল যদি তাদেরকে কৃষি, বাণিজ্য ও কামারগিরি ইত্যাদিরও কোনো একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি গ্রহণের নির্দেশ দিতেন তাহরে নির্দ্বিধায় ও বিনা কংকোচে তাদের সে নির্দেশ মেনে নিতে হতো।

নবীর আনুগত্য সাধারণ মানুষের আনুগত্যের মতো নয়

এ রকম শর্তহীন ও সীমাহীন আনুগত্যের নির্দেশ যখন দেয়া হয়েছে তখন সেটা যে একজন সাধারন মানুষের আনুগত্যের মতো নয়, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিল। কেননা অজ্ঞ কাফেররা তাঁকে নিছক একজন সাধারণ মানুষ বলেই ভাবত। তারা মানুষকে বলতঃ (আরবী************) “সে তোমাদের মতো একজন সাধারণ মানুষ নয় কি?”

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৬ পৃষ্ঠায়)

“সে তোমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। উপরন্তু সে চায় তোমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে”।

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৬ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদেরই মতো একজন মানুষের যদি আনুগত্য কর তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।

বস্তুত নবীর আনুগত্য আসলে আল্লাহরই আনুগত্য। কেননা নবী যা কিছুই বলেন আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলেন এবং যা কিছুই করেন আল্লাহর নির্দেশের অধীন করেন। তিনি নিজের খেয়াল-খুশী মতো কিছু বলেন না, কেবলমাত্র আল্লাহর অহী অনুসরণ করেন। কাজেই এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকা উচিত যে তাঁর আনুগত্যে কোন রকম পথভ্রষ্ট বা পিথগামী হওয়ার ভয় নেই।

নবীর পথনির্দেশের জন্যে অহী গায়ের-মতলু-[এমন অহী যা কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই এবং পঠনযোগ্য নয়।–(সম্পাদক)]

এ কথাই তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম আয়াতে যে জিনিসকে অহী বলা হয়েছে কেউ কেউ বলেন যে, তা আল্লাহর কিতাব এবং কিতাব ছাড়া অন্য কোনো অহী নবীর ওপর নাযিল হতো না কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। পবিত্র কুরআন থেকে এ কথা প্রমাণিত যে, নবীদের ওপর শুধু কিতাবই নাযিল করা হতো না বরং তাদের হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ তায়ালা হর-হামেশা তাদের ওপর অহী নাযিল করতেন। এ অহীর আলোকে তাঁরা নির্ভুল পথে চলতেন। দৈনন্দিন সমস্যাবলীতে সঠিক রায় দিতেন এবং ব্যবস্থাবলী কার্যকর করতেন। উদাহরস্বরূপ বলা যায়, হযরত নূহ (আ) তুফান প্রতিরক্ষার জন্যে আল্লাহর তত্ত্বাবধানে ও তাঁর অহী অনুযায়ী নৌকা বানিয়েছিলেন।

(আরবী********************************************পিডিএফ ২৫৭ পৃষ্ঠায়)

“(হে নুহ!) তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার অহী মোতাবেক নৌকা বানাও”।

হযরত ইবরাহীম (আ)-কে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করানো হয় এবং মৃতকে জীবিত করার প্রক্রিয়া দেখানো হয়। হযরত ইউসুফকে স্বপ্নের মর্ম শিক্ষা দেয়া হয়। (আরবী************) “যেসব জ্ঞান আল্লাহ আমাকে দান করেছেন, এ তার মধ্যে একটা”। হযরত মূসা (আ)-এর সাথে তূল পর্বতে কথা বলা হয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার হাতে ওটা কি? তিনি বলেন, এ আমার লাঠি। এ দিয়ে আমি ছাগল চরাই। নির্দেশ দেয়অ হলো লাঠি ফেলে দাও। লাঠি যখন সাপের আকার ধারণ করল তখন হযরত মূসা ভয় পেয়ে ছুটে পালাবার উপক্রম করলেন। তখন অহী এল, (আরবী*********) “হে মূসা! ভয় করো না, সামনে এগিয়ে যাও। তুমি নিরাপদ”। আবার হুকুম জারি হলো, (আরবী*********) “ফেরাউনের কাছে যাও। সে বিদ্রোহী হয়েছে”। তিনি সাহায্যের জন্যে হযরত হারুনকে চাইলেন। তার আবেদন কবুল করা হলো। দু’ভাই ফেরাউনের কাছে যাবার সময় ভয় পাচ্ছেন। আল্লাহ অভয় দিয়ে বললেন, (আরবী*********) “তোমরা ভয় কর না। আমি তোমাদের সাথে আছি। সবকিছূ দেখছি এবং শুনছি”। তারপর ফেরাউনের দরবারে জাদুকরদের বানান সাপ দেখে হযরত মূসা ভয় পেয়ে যান। তখন অহী আসে (আরবী*********) “ভয় কর না, তুমিই জয়ী হবে”। ফেরাউনকে সুপথগামী করার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মূসাকে হুকুম দেয়া হলো, (আরবী*********) “আমার বান্দাদের নিয়ে রাতের আধাঁরে বেরিয়ে পড়। তোমাদের পিছু ধাওয়া করা হবে”। নদীর কিনারে পৌছুলে খোদায়ী ফরমান এল, (আরবী*********) “নদীর ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত কর”।

এখন প্রশ্ন হলো, এতসব অহীর মধ্যে একটাও কি সর্বসাধারণের হেদায়াতের জন্যে কিতাবের আকারে নাযিল করা হয়েছিল কি? এ উদাহরণগুলো থেকে কারও এ কথা বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, নবীদের প্রতি আল্লাহ সবসময় লক্ষ্য রাখেন এবং যখনই মানব সুলভ চিন্তা ও মতামতে তাঁদের ভুল করার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখনই তিনি অহী দ্বারা তাঁদেরকে সঠিক পথে চালিত করেন। সকল মানুষের হেদায়াতের জন্যে যে অহী নবীদের মাধ্যমে পাঠানো হয় এবং আল্লাহর পক্ষ তেকে একটি হেদায়াতনামা ও কার্যোপযোগী সংবিধান হিসেবে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয় তার থেকে এ আলোচ্য অহী আলাদা ধরনের।

নবীর প্রতি অবতীর্ণ গায়ের মতলু অহীর কতিপয় দৃষ্টান্ত

এ ধরনের ‘অহী গায়ের মতলু’ এবং গোপন অহী নবী পাক (সা)-এর ওপর নাযিল হত। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী প্রথমে বায়তুল মাকদেসকে কেবলা বানালেন। আল্লাহর কিতাবে সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশ পাওয়া যায় না। কিন্তু যখন সেই কেবলাকে রহিত করে বায়তুল হারামকে (কা’বা) কেবলা করার নির্দেশ দেয়া হল, তখন বলা হলঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ২৫৮ পৃষ্ঠায়)

“আগে তোমার যে কেবলা ছিল তাকে আমি শুদু এ জন্যে নির্ধারিত করেছিলাম যেন রসূলকে মান্যকারী ও অমান্যকারীর মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়”।–(সূরা আল বাকারাহঃ ১৪৩)

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, প্রথমে বায়তুল মাকদেসকে যে কেবলা বানানো হয়েছিল তা ছিল অহীর ভিত্তিতেই।

ওহোদের যুদ্দের সময় হযরত রসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে বলেছিলেন যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের সাহায্যে ফেরেশতা পাঠাবেন। পরে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে হযরতের সে উক্তিকে এভাবে উল্লেখ করেনঃ (আরবী******************) “আল্লাহ ঐ প্রতিশ্রুতিকে তোমাদের জন্যে সুসংবাদে পরিণত করেছিলেন”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১২৬)

সুতরাং এ প্রতিশ্রুতি যে আল্লাহর পক্ষ থেকেই দেয়া হয়েছিল তা সন্দেহাতীত।

ওহোদ যুদ্ধের পর রসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়তে আদেশ করেন। অথচ এ আদেশের উল্লেখ কুরআনে কোথাও নেই। কিন্তু পরে আল্লাহ নবীর এ আদেশ সত্যায়িত করে বলেন যে, এ আদেশ ছিল তাঁর পক্ষ থেকেই।

(আরবী***********************************পিডিএফ ২৫৮ পৃষ্ঠায়)

“যুদ্ধে আঘাত খাওয়ার পরও যারা পুনরায় আল্লাহ ও রসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে”।

বদর যুদ্ধের জন্যে হযরতের মদীনা থেকে বের হওয়ার উল্লেখ এভাবে করা হয়েছেঃ (আরবী************) “যেভাবে আল্লাহ তোমাকে তোমার ঘর থেকে বের করেছেন”।–(সূরা আল আনফালঃ ৫)

ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো নির্দেশ কুরআনে বর্ণিত হয়নি কিন্তু পরে আল্লাহ এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন যে, তাঁর নির্দেশেই তিনি বেরিয়েছিলেন, স্বেচ্ছায় নয়।

পরে যুদ্ধ চলাকালে আল্লাহ তাঁর নবীকে স্বপ্ন দেখানঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ২৫৮ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ যখন তাদেরকে স্বল্পসংখ্যক করে তোমাকে স্বপ্নে দেখান”।–(সূরা আল আনফালঃ ৪৩)

যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টন করলে মোনাফেকরা নাক সিটকাতে থাকে। তখণ আল্লাহ জানিয়ে দেন যে, এ বন্টন স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশেই হয়েছে।

(আরবী***********************************পিডিএফ ২৫৯ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাদেরকে যা দিয়েছিলেন তাতেই যদি তারা রাজী হয়ে যেত (তাহলে ভাল হত)”।–(সূরা আত তওবাহঃ ৫৯)

হোদায়বিয়ার সন্ধির সময় সকল সাহাবীই সন্ধির বিরোধী ছিলেন। সন্ধির শর্তাবলী সবার কাছেই অগ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছিল। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সা) তা মেনে নেন। পরে আল্লাহ তা সত্যায়িত করে বলেন যে, সে সন্ধি আল্লাহর পক্ষ থেকেই ছিল।

(আরবী***********************************পিডিএফ ২৫৯ পৃষ্ঠায়)

“আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি”।–(সূরা আল ফাতহঃ ১)

উল্লিখিত আয়াতগুলোর সারমর্ম

কুরআনের আয়াতগুলোর আলোকে এ ধরনের আরও বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এখানে সকল আয়াত উল্লেখ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য শুধু এ কথা প্রমাদণ করা যে, নবীসের সাথে আল্লাহর কেবল সাময়িক ও স্বল্পকালীন সম্পর্ক নয় যে যখনই তিনি মানুষের কাছে কোনো বাণী পৌঁছাতে চাইবেন, শুধু তখনই নবীর সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হবে এবং তার পরেই তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তিনি যাকে নবী হিসেবে মনোনিত করেন তার প্রতি সবসময় বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখেন এবং সবসময়ই তাঁকে অহী দ্বারা পথ প্রদর্শন ও নির্দেশ প্রদান অব্যাহত রাখেন। এভাবে নবী যাতে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে নির্ভুলভাবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন এবং তাঁর দ্বারা আল্লাহর অপছন্দনীয় কোনো কাজ বা কথা সংঘটিত না হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করেন। সূরা নাজমের প্রথম আয়াত ক’টিতে এ সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে। এ আলোচনার প্রথমাংশেই আমি বলেছি এবং পবিত্র কুরআনও এ কথ সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, নবীগণকে আল্লাহর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে রাখা হয়, তাদেরকে ভুল-ত্রুটি থেকে রক্ষা করা হয়, মানবসুলভ দুর্বলতাবশত তাদের কোনো পদঙ্খলন হলে তা সংশোধন করে দেন এবং ভুল ধরে দিয়ে সোজা পথে নিয়ে আসেন। পবিত্র কুরআনে হযরত রসূলে করীম (সা) ও অন্যান্য নবীদের ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহ এবং সে সম্পর্কে আল্লাহর সতর্কবাণীসমূহের যে উল্লেখ রয়েছে তার উদ্দেশ্য কখনও এ নয় যে, নবীদের ওপর থেকে মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলুক। তার উদ্দেশ্য এ নয় যে, লোকেরা ভাবুক (নাউজুবিল্লাহ) নবীরা যখন আমাদেরই মতো ভুল করেন তখন নিশ্চিতভাবে তাদের অনুসরণ ও আনুগত্য করা কি করে সম্ভব? বস্তুত আল্লাহ নবীদেরকে নিজেদের খেয়াল-খুশী মত চলার কিংবা নিজ মতামত ও বিচার-বুদ্ধি অনুসারে চলার অবাধ স্বাধীনতা যে দেননি সে কথা জানিয়ে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। যেহেতু তাঁরা সাধারণ মানুষকে সুপথে চালিত করার জন্যেই নিয়োজিত, তাই প্রতিনিয়ত আল্লারহ হুকুম কড়াকড়িভাবে মেনে চলতে এবং কোনো ক্ষুদ্রতম ব্যাপারেও আল্লারহ অপছন্দনীয় পথ অনুসরণ না করতে তাঁদেরকে কঠোরবাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কারণে কুরআনে সাধারণ মানুষের জীবনে আদৌ গুরুত্ববহ নয় এমন সব নগণ্য বিষয়েও নবী (সা)-কে ভর্ৎষনা করা হয়েছে। যেমন একজন মানুষের মধু খাওয়া বা না খাওয়া, একজন অন্ধের দিকে মনোযোন না দেয়া এবং সে তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় হস্তক্ষেপ করল বলে বিরক্ত হওয়া অথবা কারও জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এগুলো মোটেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয় কিন্তু আল্লাহ নবীকে এমন সব ক্ষুদ্র ব্যাপারেও নিজে বা অন্যের মর্জি মতো চলতে দেননি। অনুরূপভাবে যুদ্ধে যাওয়া থেকে কাউকে অব্যাহতি দেয়া এবং কিছু যুদ্ধবন্দীকে পণ দিয়ে ছেড়ে দেয়া একজন নেতার পক্ষে মামুলী ব্যাপার কিন্তু নবীর ক্ষেত্রে এটাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফলে প্রকাশ্য অহীযোগে তাঁকে সাবধান করে দেয়া হল। কেন? কারণ আল্লাহর নবী সাধারণ নেতাদের মতো নন যে, নিজ বিচার-বুদ্ধি অনুযয়ী যা খুশী তাই করতে পারবেন। নবুয়াতের মহান দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে নবীর নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আল্লাহর গোপন অহীর ইঙ্গিত সার্থকভাবে বুঝতে যদি না পারেন এবং আল্লাহর মর্জির বিরুদ্ধে যদি এক চুল পরিমাণও অগ্রসর হন, তাহলে প্রকাশ্য অহী দ্বারা তাঁর সংশোধন করা আল্লাহ জরুরী মনে করেন।

নবীর সত্যনিষ্ঠা পূর্ণ নির্ভরযোগ্য

আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীর এ গুণ-বৈশিষ্ট এ জন্যে বর্ণনা করেছেন যেন নবীর সত্যনিষ্ঠার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা জন্মে এবং আমরা অবিচল বিশ্বাস রাখতে পারি যে, নবীর কথা ও কাজ গোমরাহী, বক্রতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং মানব সুলভ চিন্তা-ধারণার ক্রটি-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি আল্লাহর বর্ণিত সিরাতুল মোস্তামিকের ওপরে অটল। তাঁর পূত চরিত্র ইসলামী নৈতিকতার এমন এক নমুনা যার মধ্যে দোষ-ত্রুটির লেশমাত্র নেই। আল্লাহ তায়ালা বিশেষ করে এ পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত নমুনা এ জন্যে বানিয়েছেন যে, তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেউ তাঁর প্রিয় বান্দা হতে চাইরে যেন নির্ভয়ে ও নিঃসংকোচে তাঁর অনুসরণ-অনুকরণ করতে পারে। ওপরে বর্ণিত ষষ্ঠ ও সপ্তম আয়াতদ্বয়ে এ উদ্দেশ্যই বর্ণনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ আয়তে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্যে আল্লাহর রসূলের (সা) মধ্যে আদর্শ রয়েছে। সপ্তম আয়াতে রসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসরণকে আল্লাহর ভালবাসার পাত্র হওয়ার একমাত্র উপায় বলা হয়েছে।

নবীর গোটা জীবনই ‘উত্তম আদর্শ

এখানেও আমরা দেখতে পাই নবী-জীবনকে যে উত্তম আদর্শ বলা হয়েছে, তাতে কোনো শর্ত বা সীমার উল্লেখ নেই। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে নবীর সমগ্র জীবন, সর্বতোভাবে সকল মানুষের জন্যে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও সকল অবস্থায় অপরিহার্যরূপে অনুসরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ। এ ক্ষেত্রে কোনো দিক দিয়েই কোনোরূপ শর্ত বা সীমারেখা আরোপের কোনোই অবকাশ নেই। নবী-সত্তাকে সামগ্রিকভাবে উত্তম আদর্শ বলা হয়েছে এবং তাঁর সার্বিক আনুগত্যই অপরিহার্য। এর মানে দাঁড়ায় এই যে, তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণ যত বেশী করা হবে এবং নিজ জীবনে তাঁর গুণগত সাদৃশ্য যত বেশী সৃষ্টি করা যাবে ততই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হবে এবং ততই আল্লাহর প্রিয় হওয়া যাবে।

ব্যতিক্রমের পরিধি

কিন্তু হযরতের জীবনকে সামগ্রিকভাবে অনুকরণীয় আদর্শ বা নমুনা ঘোষণা এবং তার সার্বিক আনুগত্যের নির্দেশ দানের অর্থ এই নয় যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তিনি যা কিছুই করেছেন এবং যেভাবে করেছেন, সকল মানুষকে হুবহু সে কাজ ঠিক সেভাবেই করতে হবে এবং তাঁর পবিত্র জীবনকে এমনভাবে অনুসরণ করতে হবে যে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল তা ধরাই যাবে না। কুরআনের উদ্দেশ্য তা নয় এবং হতেও পারে না। আসলে এ একটা সংক্ষিপ্ত ও মৌলিক নির্দেশ। এ নির্দেশ কিভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে তা আমরা স্বয়ং হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর শিক্ষা ও সাহাবীদের জীবন পদ্ধতি থেকে জাননে পারি। এখাতে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। সংক্ষেপে বলতে চাই যে, যেসব কাজ ফরয, ওয়াজিব ও ইসলামের মূল স্তম্ভের মর্যাদাসম্পন্ন, সেগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর হুবহু ও অকিবল আনুগত্য ও অনুকরণ করতে হবে, এক চুল পরিমাণও এদিক-ওদিক করা চলবে না। যেমন নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত, পবিত্রতা অর্জন ইত্যাদির মাসলা-মাসায়েল। এগুলোতে তিনি যা-ই নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইসলামী জীবনের সাধারণ নিয়মাবলী সংক্রান্ত যেমন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যধারা ও তার কুঁটিনাটি বিধি। এসবের মধ্যে কোনো কোনোটা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সা) শুধু নৈতিকতা ও শালীনতা বজায় রাখা এবং যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত থেকেছেন। আর কোনো কোনোটা এরূপ যে, তার আলোকে আমরা কোন কর্মপদ্ধতি ইসলামের সাতে সামঞ্জস্যশীল আর কোনটা সামঞ্জস্যশীল নয় তা নির্ণয় করতে পারি। এ ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে রসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুকরণ করতে চায় এবং সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর হাদীস ও আচরণ বিধি অধ্যয়ন করে সে ব্যক্তি সহজেই জেনে নিতে পারে যে, কোন কোন ব্যাপারে রসূলের (সা) অনুকরণ হুবহু করতে হবে আর কোন কোন ব্যাপারে তাঁর হাদীস ও আচরণবিধি থেকে কেবলমাত্র নৈতিকতা, যৌক্তিকতা এবং হিত ও কল্যাণের সাধারণ মূলনীতিসমূহ রচনা করতে হবে। কিন্তু যারা ঝগড়াটে স্বভাবের লোক, তারা এ ক্ষেত্রে নানারকম ওজুহাত খাড়া করে থাকে। তারা বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) তো আরবীতে কথা বলতেন, আমাদেরও আরবীতে কথা বলতে হবে না কি? তিনি আরব মহিলাদের বিয়ে করেছিলেন, আমাদেরও আরব মহিলাদের বিয়ে করতে হবে না কি? তিনি বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরতেন, আমরাও কি সেই রকম পোশাক পরব? তিনি বিশেষ ধরনের খাবার খেতেন। আমরাও কি সেই খাবার খাব? তিনি বিশেষ এক পদ্ধতিতে লোকজনের সাথে মেলামেশা, উঠাবসা ও আচার-ব্যবহার করতেন আমাদেরও কি হুবহু সেই পদ্ধতিতে এসব করতে হবে? পরিতাপের বিষয়, তারা একটু ভেবেও দেখে না যে, আসল জিনিস ভাষা নয় বরং কথা বলার সেই নৈতিক বিধি যা তিনি সবসময় পালন করে চলতেন্ আরব মহিলা বিয়ে করতে হবে, না অনারব মহিলা সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো যে মহিলাকে বিয়ে করা হোক তার সাথে আমাদের আচরণটা কি রকম হবে, তার অধিকারগুরো আমরা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করবো এবং আামাদের বৈধ আইনগত কর্তৃত্ব তার ওপর কিভাবে প্রয়োগ করব। এ ব্যাপারে নবী (সা) তাঁর মহিষীদের সাথে আচরণের যে আদর্শ রেখে গেছেন তার চেয়ে উত্তম আদর্শ একজন মুসলমানের পারিবারিক জীবনের জন্যে আর কিছু হতে পারে না। হযরত (সা) যে ধরনের পোশাক পরতেন হুবহু সেই ধরনের পোশাক পরাই শরীয়াতের বিধি, এ কথা কে বলেছে? আর যে খাদ্য তিনি খেতেন হুবহু সেই খাদ্যই প্রত্রেক মুসলমানের খাওয়া উচিত, এটাই বা কে আদেশ করল? এসব ক্ষেত্রে অনুকরণের যোগ্য জিনিস হল তাকওয়া, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতা যা তিনি খাওয়া-পরার ক্ষেত্রে মেনে চলতেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, বৈরাগ্যবাদ ও ভোগবাদের মধ্যবর্তী যে ভারসাম্য আচরণের সংক্ষিপ্ত শিক্ষা কুরআন আমাদের দিয়েছে, তাকে কিভাবে বাস্তবায়িত করা যেতে পারে যাতে করে একদিকে অপব্যয় ও অপচয় না হয়, অপরদিকে হালাল জিনিস অনর্থক এড়িয়ে চলাও না হয়। হযরত (সা)-এর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের অন্য সকল ব্যাপারেও এই একই কথা প্রযোজ্য। তাঁর সে মহান পবিত্র জীবনের সমগ্রটাই একজন সত্যিকার খোদাভীরু মুসলমানের জীবনের একটি উৎকৃষ্ট আদর্শ। হযরত আয়েশা (রা যথার্থই বলেছিলেন যে, (আরবী**********) অর্থাৎ তোমরা যদি জানতে চাও যে, পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও ভাবধারা অনুযায়ী একজন ঈমানদার মানুষের দুনিয়ায় কিভাবে জীবন যাপন করা উচিত তাহলে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনধারা অনুশীলন করো। দেখবে, যে ইসলাম কুরআনে সংক্ষিপ্ত, আল্লাহর রসূলের (সা) জীবনে তা বিস্তৃত।

রসূল সার্বক্ষণিক রসূল

আনন্দের বিষয় এই যে, তৃতীয় দলটি প্রথম ও দ্বিতীয় দলের সমমনা নয়। তথাপি কোন কোন হাদীসের দ্বারা তাদের মনে এ সন্দেহ জন্মেছে যে, “রসূলুল্লাহ (সা) হয়তো সকল অবস্থায় ও সকল সময়ে রসূল ছিলেন না এবং তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজ রসূল হিসেবে বলা ও করা হত না”। যেসব রেওয়ায়াত থেকে এই ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো আসলে অণ্য বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। বস্তুত নবী (সা) প্রতি মুহুর্তে ও প্রত্যেক অবস্থায় আল্লাহর রসূলই ছিলেন এবং যে উদ্দেশ্যে তাঁকে নবী করে পাঠান হয়েছিল সেদিকে সমসময় লক্ষ্য রাখাই ছিল তাঁর কাজ। মানুষের চিন্তা ও মতামতের স্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে ছিনিয়ে নেয় এবং মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে অচল অকর্মণ্য করে দেয়ার জন্যে তিনি নবী হননি। তিনি দুনিয়ার মানুসকে কৃষি, শিল্প ও কারিগরি শেখাতে আসেননি এবং লোকের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত কাজ-কারবার পরিচালনা করার জন্যেও তাঁকে পাঠান হয়নি।

রিসালাতের আসল উদ্দেশ্যের প্রতি নবীর দৃষ্টি

নবী পাকের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল মাত্র একটাই এবং তা ছিল ইসলামকে আকীদা-বিশ্বাস হিসেবে মানুষের মনে বদ্ধমূল করা এবং বাস্তব কাজের দিক দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রে ও সমাজ ব্যবস্থা কার্যকর করা। এ মূল উদ্দেশ্যটি ছাড়া আর কোনো জিনিসের দিকে তিনি কখনও মনোযোগ দেননি। আর কদাচিৎ কখনও কোনো সময়ে কোনো কিচু বলরেও সাষে সাথে তিনি বলে দিয়েছেন, তোমরা তোমাদের মতামত ও কাজকর্মে স্বাধীন। তিনি বলেছেন, (আরবী****************) “তোমাদের দুনিয়াবী বিষয়ে তোমরাই ভাল জান। সাহাবীগণ অবশ্য নবীর প্রতিটি কথাই রসূলের কথা মনে করে সর্বান্তকরণে তাঁর আনুগত্য করতে প্রস্তুত থাকতেন এবং সর্ববিষয়ে তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা জরুরী মনে করতেন। এ জন্যেই নবী যখনই কোনো দুনিয়াবী বিষয়ে কিছু বলতেন, তখন সাহাবীগণ ভাবতেন, এও হয়তো রসূল হিসেবে দেয়া নির্দেশ। কিন্তু কখনো এমনটি হয়নি যে, তাঁর আগমনের উদ্দেম্যের সাথে সম্পর্কিত নয়, এমন কোনো বিষয়ের নির্দেশ তিনি সাহাবীগণকে দিয়েছেন এবং তা মানতে বাধ্য করেছেন। তেইশ বছরের মধ্যে একটি মুহুর্তের জন্যেও নিজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসীন না হওয়া, কোন বিষয়টি তাঁর উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত এবং কোনটি নয় প্রতি মুহুর্তে সেই সূক্ষ্ম পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজরে অনুসারীদের ওপর পূর্ণ ক্ষমতা ও আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে কোনো অবান্তর বিষয়ে নির্দেশ না দেয়া – এ কথারই প্রমাণ যে, নবীসূলব পদমর্যাদা কখনো তাঁর সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হতো না। তবে দুনিয়াবী ব্যাপারে হযরত যা কিছু বলেছেন তার উৎস অহী ছিল না –এরূপ ধারণা করা ঠিক নয়। অবশ্য এ ধরনের কথাবার্তা তাঁর নির্দেশ ছিল না, নির্দেশ দেয়ার ভঙ্গীতেও তিনি বলেননি, কেউ তাকে নির্দেশ বলে গ্রহণও করিন। তথাপি যে কথাই তাঁর পবিত্র মুখ থেকে বেরিয়েছে, তা আগাগোড়াই নির্ভুল ও সত্য ছিল। উদাহরণস্বরূপ হযরতের চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত যেসব হাদীস পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত বিজ্ঞজনোচিত কথায় পরিপূর্ণ। সেসব হাদীস দেখলে ভাবতেও অবাক লাগে যে, আরবের একজন নিরক্ষর মানুষ, িযনি কখনো চিকিৎসক ছিলেন না, চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে যিনি কোনো গবেষণাও করেননি, তিনি কিভাবে এ বিজ্ঞানের এমন সব তথ্য জানালেন যা আজ শত শত বছরে পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও অভিজ্ঞতার পর সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। হযরতের জ্ঞানগর্ব কথাবার্তায় এ ধরনের শত শত উদাহরণ পাওয়া যায়। এগুলো যদিও রিসালাতের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ব্যপার নয়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর রসূলদের জন্মগতভাবে এমন অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী করেন যা শুধু রিসালাতের দায়িত্ব পালনেই কাজে লাগে তা নয়, বরং সব ব্যাপারেই বিশিষ্টতার নিদর্শন রাখে। জানা কথা যে, কামারি বর্ম নির্মাণ শিল্পের সাথে রিসালাতের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। তথাপি হযরত দাউদ (সা) এ কাজেও অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন। আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন যে, এ শিল্পকর্ম তাঁকে আমিই শিখিয়েছি। (আরবী**********************) “তাকে আমি বর্ম নির্মাণ শিল্প শিখিয়েছি যাতে তোমরা তার সাহায্যে পরস্পরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাও”।–(সূরা আম্বিয়াঃ ৮০)। পাখীর ভাষা শেখার সাথে রিসালাতের দায়িত্ব পালনের কি সম্পর্ক থাকতে পারে? কিন্তু হযরত সুলায়মান (আ) এ কাজে দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি নিজেই বলেন, (আরবী**********) “আমাকে পাখীর ভাষা শেখানো হয়েছে”।–(সূরা আন নামলঃ ১৬) কাঠমিস্ত্রীগিরি ও নৌকা তৈরি করার সাথে রিসালাতের দায়িত্ব পালনের কি সম্পর্ক? কিন্তু আল্লাহ হযরত নূহ (আ)-কে এ কথা বলেননি, একটা মজবুত নৌকা বানিয়ে নাও।বরং বলেছেন (আরবী***********) “আমার তদারকীতে আমার অহীর নির্দেশ অনুসারে নৌকা বানাও”।–(সূরা হুদঃ ৩৭)

নবী জীবনের দুই অংশ

এ আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, নবীদের কাছে কেবল রিসালাতের দায়িত্ব পালনের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রাখে এমন অহী আসতো তা ঠিক নয়। বস্তুত তাঁদের গোটা জীবনই আল্লাহর নির্দেশের অধীন থাকতো। পার্থক্র শুধু এই যে, তাঁদের জীবনের একটা অংশ এরূপ যে, তার অবিকল অনুকরণ করা মুসলমান হওয়ার জন্যে অপরিহার্য শর্ত। আর একটি অংশ এরূপ যে, তার শতকরা একশো ভাগ অনুকরণ সকল মুসলমানের ওপর ফরয তথা অপরিহার্য নয়। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ বান্দাহ হতে চায়, তার জন্যে নবীর সুন্নআতের অনুকরণ পুরোপুরিভাবে করা ছাড়া গত্যান্তর নেই। এ ব্যাপারে এক চুল পরিমাণ ত্রুটি থাকলেও নৈকট্য লাভে ও প্রিয় বান্দাহ হতে ঠিক সেই অনুপাতে কমতি থেকে যাবে। কেননা আল্লাহর প্রিয় হওয়ার জন্যে নবীর অনুকরণ ছাড়া আর কোনো পথ আদৌ নেই। (আরবী***********) “আমার পদানুসরণ করো, তবেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন”।

নবীর নেতৃত্ব ও অন্য নেতৃত্বে পার্থক্য

নবীর নেতৃত্ব ও অন্যান্য নেতার নেতৃত্বে কি পার্থক্য এবং নবীর বিচার-ফায়সালা ও অন্যান্য বিচারকের বিচার-ফায়সালার কি ব্যবধান, উপরোক্ত আলোচনা থেকে তা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। তথাপি আমি শেষের দিকে তিনটি আয়াত উদ্ধৃত করেছি –যা বিষয়টিকে আরো সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। এ আয়াত ক’টি থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ রসূল (সা)-এর নির্দেশের সামনে মাথা নত করে দেয়া এবং তাঁর সিদ্ধান্তসমূহ মেনে নেয়া মু’মিন হওয়ার জন্যে অপরিহার্য শর্ত। যে তা করতে অস্বীকার করবে সে মু’মিনই থাকবে না। এ মর্যাদা কি আর কোনো নেতা বা বিচারকের আছে? যদি না থেকে থাকে তবে এ কথা বলা কত বড় মারাত্মক ভুল যে, “কুরআনে ‘আল্লাহ’ ও ‘রসূল’ শব্দ দু’টি যেখানে যেখানে একত্রে উল্লিখিত হয়েছে সেখানে তার অর্থ নেতৃত্ব”। মাওলানা আসলাম জয়রাজপুরীর এ উক্তিটিই আমার কাছে আপত্তিকর। এ বক্তব্যকে আমি সর্বতোভাবে কুরআনের পরিপন্থী বলে মনে করি। ‘উলিল আমর’ এর আনুগত্য করার বিষয়টা আমিও স্বীকার করি। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর ‘উলিল আমরের আনুগত্য করা অপরিহার্য কর্তব্য। রসূলুল্লাহ (সা) জীবদ্দশায় ইসলামী রাষ্ট্রের যেসব কাজ সমাধা করতেন, এই ‘উলিল আমর’ সেসব কাজ সমাধা করবেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় ব্যাপারে ‘উলিল আমরের সিদ্ধান্ত হবে অকাট্য ও চূড়ান্ত। এমনকি কেউ যদি নিজ জ্ঞানে উলিল আমরের সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও রসূলের পরিপন্থী বলে বুঝতে পারে, তাহলেও নিজের মতের ওপর অবিচল থেকেও তার সিদ্ধান্তকে একটা সীমা পর্যন্ত মেনে চলতে হবে। তাই বলে কুরআনে ‘আল্লাহ ও রসূল’ বলে যা বুঝানো হয়েছে, সেটাই নেতৃত্ব নয় এবং নেতৃত্বের নয় এবং নেতৃতত্বের পক্ষ থেকে জারী করা হুকুম অবিকল আল্লাহ ও রসূলের হুকুম নয়। তাই যদি হয় তবে নেতা ও কর্তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেলে এবং ক্ষমতাসীন ও দায়িত্বশীলগণ কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কার্যকলাপ শুরু করে দিলে মুসলমানরা নিরূপায় ও অসহায় হয়ে পড়বে। অনিবার্য ধ্বংসের পথে ধাবমান জেনেও তাদের পদানুসরণ ও আনুগত্য করা ছাড়া তাদের আর উপায়ান্তর থাকবে না। এ রকম অবস্থায় কেউ যদি রুখে দাঁড়ায় এবং আল্লাহ ও রসূলের পথে চলার দাবী জানায়, তবে মওলানা আসলাম জয়রাজপুরীর ফতোয়া অনুযায়ী পথভ্রষ্ট জালেম শাসকরা সেই বেচারাকে খোদাদ্রোহী ঘোষণা করে হত্যা করতে পারবেন, তাতে কোনো দোষ হবে না। তাঁরা বলতে পারবেন, “আরে ব্যাটা আল্লাহ ও রসূল তো আমরাই। তুই আবার কোন আল্লাহ-রসূলের পথে আমাদের চালাতে চাস?”

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.