সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবুয়াতের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে কিছু মৌলিক তত্ত্ব

অধ্যায় ১ : নবুয়াতের মর্মকথা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

মানবতার জন্যে আল্লাহর পথনির্দেশ

বিশ্বজাহাদের প্রভু, সমগ্র পৃথিবী, আকাশ ও সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা, মালিক ও শাসনকর্তা, তাঁর সুবিশাল সাম্রাজ্যের এ অংশে –যাকে আমরা পৃথিবী বলে জানি –মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাকে জানার, চিন্তা করার ও বুঝবার শক্তি দিয়েছেন। ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা দিয়েছেন। যাঁচাই-বাঁছাই-নির্বাচন করার ও ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন। নিজের এখতিয়ার খাটাবার অধিকার দান করেছেন। মোটকথা, এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন দান করে তাকে পৃথিবীতে নিজের খলীফা বা প্রতিনিধির পদে অধিষ্ঠিত করেছেন।

বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এ পদে অধিষ্ঠিত করার সময় তার মনে ভালভাবে এ কথা বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন যে, তিনিই মানুষ ও সমগ্র বিশ্বজগতের একমাত্র মালিক, সমল আনুগত্যের অধিকারী ও শাসনকর্তা! তাঁর এ সাম্রাজ্যে মানুষ স্বাধীন নয়, অন্য কারও অধীনও নয় বরং তিনি ছাড়া আর কেউ মানুষের আনুগত্য, দাসত্ব, বন্দেগী ও পূজা-উপাসনা লাভর অধিকারীও নয়। দুনিয়ার এ জীবনে মানুষকে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়ে পাঠান হচ্ছে টিকই, কিন্তু আসলে তার জন্য পরীক্ষার একটি সময়কাল। তাদের কৃতকর্মসমূহ বিচার করে তাদের মধ্যে কে পরক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে আর কে ব্যর্থকাম হয়েছে সে সিদ্ধান্ত তিনিই গ্রহণ করবেন। মানুষের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র এটি হবে যে, তারা আল্লাহকে তাদের একমাত্র মাবুদ, উপাস্য ও শাসনকর্তা বলে মেনে নেবে। তিনি যে বিধান দেবেন সে অনুযায়ী দুনিয়ায় কাজ করবে এবং দুনিয়াকে পরীক্ষাগার মনে করে এ চেতনা সহকারে জীবনযাপন করবে যে শেষ বিচারের সময় সফলকাম হওয়াই হচ্ছে তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে এ থেকে ভিন্নতর প্রত্যেকটি দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়াই হচ্ছে তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে এ থেকে ভিন্নতর প্রত্যেকটি দৃষ্টিভঙ্গিই হবে ভ্রান্তির শিকার। যদি মানুষ প্রথম দৃষ্টিভঙ্গীটি অবলম্বন করে (যা অবলম্বন করার স্বাধীনতাও তাদের রয়েছে। তাহলে দুনিয়ায় তাদের বিপর্য ও অশাস্তির সম্মুখীন হতে হবে এবং দুনিয়ার জীবন শেষ করে আখেরাতের জীবনে পদার্পণ করার পর নিক্ষিপ্ত হবে চিরন্তন দুঃখ, মর্মবেদনা ও বিপদের গর্তে –যার নাম জাহান্নাম।

‘মুসলিম’ (অনুগত) হয়ে থাকার নির্দেশ

বিশ্বজগতের প্রভু মানুষকে পৃথিবীতে অনুগত হয়ে বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ধরনের আদি মানুষ আদম (আ) ও হাওয়া এবং তাঁদের সন্তান-সন্তুতিদেরকে পৃথিবীতে কিভাবে কাজ করতে হবে সে পথও দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এ প্রথম মানুষ তাঁর সৃষ্টিলগ্নে মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলেন না, বরং পৃথিবীতে পূর্ণ আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে আল্লাহ তাঁর জীবনের সূচনা করেছিলেন। তিনি সত্য অবগত ছিলেন। তাঁকে তাঁর জীবন যাপন করার বিধানও দান করা হয়েছিল আর জীবন পদ্ধতি ছিল আল্লাহর আনুগত্য (অর্থাৎ ইসলাম) এবং তিনি নিজের সন্তানদেরকে আল্লাহর অনুগত (মুসলিম) হয়ে পৃথিবীতে বসবাস করার শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিলেন।

 

সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতি

কিন্তু পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মানুষ ধীরে ধীরে সঠিক জীবন পদ্ধতি (দ্বীন) থেকে বিচ্যুত হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। গাফলতি ও অবহেলা করে তারা এ জীবন পদ্ধীত বিলুপ্ত করে বসে এবং অসৎ মনোভাব ও দুষ্ট কার্যকলাপের মাধ্যমে একে বিকৃতও করে ফেলে। পৃথিবী ও আকাশের বিভিন্ন মানবিক, অমানবিক, কাল্পনিক ও বস্তুসত্তাকে তারা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অংশীদারে পরিণত করে। আল্লাহ প্রদত্ত সত্য জ্ঞানের মধ্যে তারা বিভিন্ন রকমের কল্পনা, ভাববাদ, মতাদর্শ ও দর্শনের মিশ্রণ ঘটিয়ে নিজেদের প্রবৃত্তি, ঝোঁক প্রবণতা ও একদেশদর্শী মনোভাব অনুযায়ী এমন জীবনবিধান তৈরী করে নেয় যার ফলে আল্লাহর জমিন যুলুমে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আল্লাহ মানুষকে যে সীমিত স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন তারপর এটা কি করে হতে পারে যে তিনি নিজের সৃষ্টিক্ষমতা ব্যবহার করে বিপথগামী লোকদেরকে জোর করে সঠিক পথের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন? আর তিনি মানুষের বিভিন্ন গোত্র ও জাতিকে পৃথিবীতে কাজ করার জন্যে যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তারপর বিদ্রোহ দেখা দেয়ার সাথে সাথেই তিনি সকল মানুষকে ধ্বংস করে দেবেন –এটাও ঠিক হয় না। মানব সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই মানুষের স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে নির্ধারিত সময়কালের মধ্যে মানুষের পথ-প্রদর্শনের দায়িত্বও তিনি নিয়েছেন। কাজেই নিজের ওপরে আরোপিত এ দায়িত্ব পালনের জন্যে তিনি মানুষের মধ্য থেকেই এমন সব লোকদেরকে ব্যবহার করা শুরু করলেন যাঁরা তাঁর ওপর ঈমান রাখতেন এবং তাঁর ইচ্ছা ও আদেশের অনুগত ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে তাঁর প্রতিনিধি বানালেন। তাদের কাছে নিজের বাণী পাঠালেন। তাঁদেরকে সত্য জ্ঞান দান করলেন। সঠিক ও নির্ভুল জীবনবিধান দান করলেন। পথভ্রষ্ট আদম সন্তানদেরকে সঠিক পথের দিকে আহবান জানাবার জন্যে তাদেরকে নিযুক্ত করলেন।

আল্লাহর এ নিয়োজিত পয়গম্বরগণ বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে আবির্ভূত হতে থাকেন। হাজার হাজার বছর ধরে তাদের আগমন চলতে থাকে। সংখ্যায়ও তাঁরা ছিলেন অগণিত। তাদের সবার দ্বীন ছিল একই। অর্থাৎ সেই সত্য-সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী ও জীবনবিধান যা প্রথম দিনেই মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। তারা সবাই একই হেদায়াত বা পথের অনুসারী ছিলেন। অর্থাৎ তারা ছিলেন চরিত্র, নৈতিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সেই প্রাথমিক ও চিরন্তন নীতির অনুসারী, যা সৃষ্টির প্রারম্ভেই মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছিল। তাদের সবার একই মিশন ছিল। তাদের মিশন ছিল নিজেদের গোত্র ও জাতিকে এই দ্বীন ও হেদায়াতের দিকে আহবান করা অতপর যারা আহবান গ্রহণ করে নেবে তাদেরকে সংগঠিত করে এমন একটি উম্মত ও দলে পরিণত করা যে নিজে আল্লাহর আইনের অনুগত হবে এবং দুনিয়ায়ও আল্লাহর আইনের আনুগত্য কায়েম করবে এবং এ আইনের বিরোধিতা রোধ করার জন্যে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এ পয়গম্বরগণ প্রত্যেকেই নিজেদের মানবতার জন্যে আল্লাহর পথনির্দেশ

যুগে যথাযথভাবে তাঁদের ওপর আরোপিত মিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সবসময় দেখঅ গেছে বিপুলসংখ্যক লোক তাঁদের আহবান গ্রহণ করতে সম্মত হয়নি। আর যারা এ আহবান গ্রহণ করে মুসলিম উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারাও ধীরে ধীরে নিজেরাই বিকৃত হতে থাকে। এমনটি তাদের মধ্যে কোন কোন উম্মত আল্লাহর হেদায়াতকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে বসে এবং অনেকে আল্লাহর বাণীর মধ্যে নিজেদের পক্ষ থেকে পরিবর্ধন ও বিকৃতি ঘটিয়ে তার চেহারাই বদলে দেয়।

অবশেষে বিশ্বজগতের প্রভু আরব দেশে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়ে দেন ঐ একই দায়িত্ব দিয়ে যে দায়িত্ব দিয়ে তিনি ইতিপূর্বে অতীত নবীগণকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আহবান জানালেন সাধারণ মানুষকে এবং অতীত নবীগণের পথভ্রষ্ট অনুসারীদেরকেও। সবাইকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্য পথের দিকে আহবান জানানো, সবার নিকট নতুন করে আল্লাহর হেদায়াত পৌঁছিয়ে দেয়া এবং যারা এ পথ ও হেদায়াত গ্রহণ করবে তাদেরকে এমন একটি উম্মতে পরিণত করা তাঁর দায়িত্ব ছিল যারা একদিকে আল্লাহর হেদায়াতের ভিত্তিতে নিজেদের জীবন ব্যবস্থা কায়েম করবে এবং অন্যদিকে দুনিয়াবাসীদের সংশোধনের জন্যেও প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।

নবুয়াত ও আদি চুক্তি

(আরবী****************** পিডিএফ ২৯ পৃষ্ঠায়)

“আর [হে নবী (সা)]! লোকদেরকে সে সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দাও যখন তোমার প্রভু বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরকে বের করেছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’ তার জবাব দিয়েছিলঃ ‘হাঁ অবশ্যি আপনি আমাদের প্রভু। আমরা এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি’। এটা আমি এ জন্যে করেছিলান যে, তোমরা কিয়ামতের দিন যেন এ কথা বলতে না পারঃ ‘আমরা তো এ কথা জানতাম না’। অথবা এ কথা না বলতে পারঃ ‘শিরকের সূচনা তো আমাদের বাপ-দাদারা আমাদের পূর্বে করেছিলেন আর আমরা পরে তাদের বংশে জন্মেছি। অতপর আপনি কি আমাদেরকে এমন ভুলের জন্যে পাকড়াও করছেন যা বিভ্রান্ত লোকেরা করেছিল”।

-(সূরা আল আরাফঃ ১৭২-১৭৩}

সৃষ্টির আদি যুগে আদমের সমস্ত বংশধরদের নিকট থেকে যে উদ্দেশ্যে স্বীকৃতি আদায় করা হয়েছিল এ আয়াতে তা বলা হয়েছে। সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে, যেসব মানুষ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করবে, তাদের এ অপরাধের জন্যে তারা নিজেরাই পুরোপুরি দায়ী বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে নিজেদের সাফাই গাইতে গিয়ে তারা না জানার ওজর পেশ করার সুযোগ পাবে না এবং নিজেদের ভুলের দায়-দায়িত্ব পূর্ববর্তী বংশধরদের ওপর চাপিয়ে নিজেদেরকে দায়িত্বমুক্তও করতে পারবে না। অন্য কথায়, জন্মলগ্নের এই আদি শপথ ও চুক্তিটিকে আল্লাহ তায়ালা এ কথার দলিল হিসেবে গণ্য করেছেন যে, আল্লাহর একমাত্র ইলাহ এবং একমাত্র রব ও প্রভু হবার সাক্ষ্য প্রত্যেকটি মানুষই ব্যক্তিগত ভাবে নিজের মদ্যে বহন করে আসছে এবং একমাত্র এ জন্যেই কোন ব্যক্তি পরিপূর্ণ অজ্ঞতার মধ্যে অথবা বিভ্রান্ত পরিবেশে লালিত পালিত হবার কারণে নিজের ভুল ও পথভ্রষ্টতার দায়িত্ব থেকে নিজেকে পরিপূর্ণরূপে মুক্ত করতে পারবে –এ কথাবলা ভুল হবে।

এখন প্রশ্ন দেখা দেয়, যদি এই আদি চু্ক্তিটি যথার্থই কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের চেতনা ও স্মৃতিতে এটি সংরক্ষিত আছে কি? আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি কি এ কথা জানে যে, সৃষ্টির পূর্বলগ্নে তাকে তার আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়েছিল এবং তাকে ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই’ এ প্রশ্ন করা হয়েছিল আর সে জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল? জবাব যদি না সূচক হয়ে থাকে তাহলে যে শপথের স্মৃতি আমাদের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাকে কেমন করে আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে?

এর জবাবে বলা যায়, মানুষের চেতনা ও স্মৃতিতে যদি ঐ চুক্তি ও শপথের চিহ্ন তাজা রাখার ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে মানুষকে দুনিয়ার বর্তমান পরীক্ষাগারে পাঠানো আদতেই অর্থহীন হয়ে যেত। কারণ প্রশ্ন আউট করার পরে সত্যিই এ ধরনের পরীক্ষার কোন অর্থই থাকত না। কাজেই স্মৃতি ও চেতনায় এর চিহ্ন তাজা হয়নি ঠিকই কিন্তু অবচেতন মনে (Sub-conscious mind) ও অনুভূতিতে (Intuition) তা অবশ্যই সংরক্ষিত আছে। আমাদের অন্যান্য অনুভূতি ও অবচেতনালব্ধ জ্ঞানের যা অবস্থা এর অবস্থাও তাই। মানুষ আজ পর্যন্ত সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে যা কিছু অর্জন করতে পেরেছে তার সবটুকুর সম্ভাবনা আসলে মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। বাইরের শক্তি ও ভেতরের শক্তিগুলো মিলে যা কিছু করতে সক্ষম হয়েছে তা কেবল এতটুকুই যে, যা প্রচ্ছন্ন ছিল তাকে কার্যত উপস্থিত করেছে। এ কথা সত্য, মানুষের মধ্যে যে বস্তু-বিষয়টির সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন নেই কোন শিক্ষা, অনুশীলনী, পরিবেমের প্রভাব ও আভ্যন্তরীন শক্তি তার মধ্যে কোন ক্রমেই সেটির জন্ম দিতে পারে না। অনুরূপভাবে এ শক্তিগুলো হাজার চেষ্টা করেও মানুষের মধ্যে মানুষের মধ্যে যে বস্তু-বিষয়গুলোর সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন রয়েছে তাদের একটিও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতা রাখে না। বড় জোর তারা এতটুকু করতেপারে সবরকমের বিকৃতি, বিচ্যুতি ও বিপথগামিতার পরও এ বস্তু বিষয়টি ভেতরে প্রচ্ছন্ন থাকবে, আত্মপ্রকাশ করার জন্যে শক্তি প্রয়োগ করতে থাকবে এবং বাইরের আকর্ষণ ও আবেদনের জবাব দেবার জন্যে নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখবে। আমি আগেই বলেছি আমাদের সব রকমের অনুভূতি ও অবচেতনালব্ধ জ্ঞানের ব্যাপারে এই একই কথা বলা যায়ঃ

ওপরে বর্ণিত সবকিছুই আমাদের মধ্যে সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান রয়েছে এবং কার্যত আমাদের থেকে যা কিছু প্রকাশ পায় তার মাধ্যমেই আমরা ওগুলোর অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রমাণ পাই।

এস সবগুলোর আত্মপ্রকাশের জন্যে বাইরে থেকে স্মরণ করিয়ে দেয়া, শিক্ষা ও অনুশীলনীর প্রয়োজন। যা কিছু আমাদের থেকে আত্মপ্রকাশ করে তা আসলে বাইরের মানবতার জন্যে আল্লাহর পথনির্দেশ।

আবেদনের জবাব। আর এ জবাবগুলো আসে আমাদের মধ্যকার ক্রিয়াশীল অস্তিত্বগুলোর পক্ষ থেকে।

ভেতরের ভ্রান্ত প্রবৃত্তি ও বাইরের ভ্রান্ত প্রতিক্রিয়া এ সবগুলোকে দমিত, প্রচ্ছন্ন, বিকৃত করে নিশ্চিহ্ন প্রায় করতে পারে কিন্তু পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে পারে না। এ কারণে আভ্যন্তরীন অনুভূতি ও বাইরের প্রচেষ্টা উভয়েরই মাধ্যমে সংশোধন ও পরিবর্তন (Conversion) সম্ভবপর।

এ বিশ্বজগতে আমাদের আসল মর্যাদা ও বিশ্ব জগতের স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে যে অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানের অধিকারী আমরা হয়েছি তার অবস্থাও ঠিক এই একই পর্যায়ের।

এর অস্তিত্বের প্রমাণ হচ্ছে এই যে, মানব জীবনের সকল যুগে, সর্বকালে, সর্বদেশে প্রত্যেকটি লোকালয়ে বংশ, গোত্র ও ব্যষ্টি মানুষের মধ্যে এর উৎপত্তি ও বিকাশ দেখা যায়। কোন যুগে, কালে দুনিয়ার কোন শক্তি একে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়নি।

যখনই এটি আমাদের জীবনে বাস্তবতঃ কার্যকর হয়েছে তখনই সুফল দানে সক্ষম হয়েছে। এটিই এর সত্যানুযায়ী হবার প্রমাণ।

এর উৎপত্তি, আত্মপ্রকাশ ও বাস্তব আকৃতি লাভের জন্যে সবসময় বাইরের একটি আবেদনের প্রয়োজন দেখা গেছে। এ জন্যেই আল্লাহর নবীগণ আসমানী গ্রন্থসমূহ ও তাদের অনুসারী সত্যের আহবায়কগণ সবাইকে দেখা গেছে এই একই কার্য স্মপাদনে তৎপর। তাই কুরআনে তাদেরকে মুযাক্কির (যে স্মরণ করিয়ে দেয়), যিকির (স্মরণ), তাযকিরাহ (স্মৃতি) এবং তাদের কাজকে কাযতীর (স্মরণ করিয়ে দেয়া) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, নবীগণ, আসমানী গ্রন্থসমূহ ও সত্যের আহবায়কগণ মানুষের মধ্যে কোন নতুন বস্তু বিষয় সৃষি।ট করেন না বরং তাদের আভ্যন্তরদেশে পূর্ব থেকে যে বস্তু বিষয়টি বিদ্যমান ছিল তাকে বিকশিত ও সজীব করেন মাত্র।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.