সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

রসূল (সা)-এর ব্যক্তি জীবন ও নবী-জীবনের পর্যালোচনা

“স্বাধীনতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী” এবং “রসূলের আনুগত্য ও অনুকরণ” শীর্ষক আমার দু’টো প্রবন্ধের আরবী অনুবাদ দামেস্কের ‘আল-মুসলিমুন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন সিরিযার সুধীবৃন্দ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, প্রবন্ধ দু’টোতে একটু গরমিল দেখা যায়। এ গরমিল দূর করার দরকার। দামেস্কের এক ভদ্রলোক আমার প্রথম প্রবন্ধটিতে নিম্নলিখিত প্রশ্ন তোলেনঃ

“মানুষ হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা) কি আমাদের একজন সাধারণ মানুষের মতই? মানুষ হিসেবে তাঁর মনেও কি অন্যান্য মানুষের ওপর নিজের ব্যক্তিগত আধিপত্য বিস্তারের লিপ্সা ও তাদের নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রতাপের অধীনে আনার অভিলাষ বিদ্যমান ছিল? তা যদি থেকে থাকে তবে নবী হিসেবে তাঁর নিষ্পাপ হওয়া এবং মানুষ হিসেবে তাঁর রক্ষাকবচ লাভের অর্থ থাকতে পারে? তাঁর নবুয়াত পূর্ব মানবিক জীবন ও নবী-জীবন কি এক হয়ে গেছে, না আলাদা আলাদা রয়ে গেছে? তাঁর জীবনের এ দু’টো দিককে বিচ্ছিন্ন করা কি সম্ভব, যাতে করে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর আনুগত্য করা এবং মানুষ মুহাম্মদের বিরোধিতা করার স্বাধীনতা লাভ করা চলে? তিনি নবী হিসেবে যা বলেছেন তা অবশ্য পালনীয় এবং মানুষ হিসেবে যা বলেছেন, তার বিরোধিতা করার অধিকার আমাদের রয়েছে। কিন্তু কোন মূলনীতির আলোকে আমরা এ দু’ধরনের কথার মাঝে ভেদরেখা টানতে পারি? নবীর ব্যক্তিগত মতের বিরোধিতা করায় কি কোনোই বাধা নেই? মুহাম্মদ (সা) কি মুসলমানদের এরূপ ধারণা দিতেন যে, মানুষ হিসেবে তাঁর আনুগত্য করা জরুরী নয়? নিজের ব্যক্তিগত মতের সাথে দ্বিমত পোষণে কি তাদের উৎসাহিত করতেন? এ যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতেই হযরত ওমর (রা) মানুষ হিসেবে হযরতের বিরোধিতা করেছিলেন এ কথা কি সত্য?”

আমার নিম্নলিখিত নিবন্ধটি এসব প্রশ্নের উত্তরেই লেখা হয়েছিলঃ

‘আল-মুসলিমুন’-এর ষষ্ঠখণ্ডের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম সংখ্যায় আমার যে দু’টো প্রবন্ধ “স্বাধীনতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি” এবং “রসূলের আনুগত্য ও অনুকরণ” শিরোনামে ছাপা হয়েছে, সে সম্পকেৃ আমাকে বলা হয়েছে যে, নিবন্ধ দু’টিতে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রয়েছে যার সুরাহা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রথম প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে, নবীর ব্যক্তি জীবন ও নবী-জীবন আলাদা আলাদা। ইসলাম দাওয়াত দেয় নবী-জীবনের আনুগত্যের, ব্যক্তিবীজনের আনুগত্যের নয়। কিন্তু “দ্বিতীয় প্রবন্ধে নবীর এ দুই পৃথক জীবনের কথা অস্বীকার করা হয়েছে এবং জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, নবীর একই জীবন –নবী জীবন। এ স্ববিরোধীতা নিরসনের উপায় জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া আমার প্রথম প্রবন্ধ “স্বাধীনতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি” সম্পর্কে দামেস্কের এক ভদ্রলোক কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নগুলো আল-মুসলিমুনের ৭ম সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। শুরুতে আমরা তা উদ্ধৃত করেছি। উভয় প্রশ্ন অনেকটা অভিন্ন ধরনের। তাই একই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে উভয় প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।

আসলে সমস্যাটির দু’টো দিক রয়েছে। একটা হলো তাত্ত্বিক দিক। এতে বিচার-বিবেচনার বিষয় হলো, আসল নিরেট সত্যটা কি। আর দ্বিতীয় হলো, বাস্তব দিক। এতে বিচার্য বিষয় হলো, নবীর ব্যক্তিত্ব থেকৈ পথনির্দেশ লাভ করতে হলে কি তাঁর গোটা জীবনকেই আমাদের জন্যে নবী বলে মেনে নিতে হবে এবং তিনি কি শুধুই নবী? অথবা তাঁকে দু’ভাগে ভাগ কর তার নবী-জীবনের আনুগত্য করতে হবে এবং বাকীটা বাদ দিতে হবে?

একঃ আলোচনার তাত্ত্বিক দিক

প্রথমে তাত্ত্বিক দিকটা আলোচনা করা যাক। পবিত্র কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, নবীদের ব্যক্তি জীবন ও নবী-জীবনে পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা মানুষকে নিজের দাসে পরিণত করতে আসেন না, তাঁরা আসেন মানুষকে আল্লাহর বান্দাহ বা গোলাম বানাতে।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৬ পৃষ্ঠায়)

“কোনো মানুষের জন্যে এটা মোটেই সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে কিতাব, শাসন ক্ষমতা ও নবুয়াত দান করবেন আর পরক্ষণেই সে মানুষকে বলবে, তোমরা আল্লাহর বান্দাহ না হয়ে আমার বান্দাহ হয়ে যাও”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৭৯)

তাদের ওপর এক সাথে দু’টো দায়িত্ব অর্পণ করা হতো। প্রথমতঃ মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল মানুষ বা বস্তুর গোলামি থেকে মুক্ত করা, এমনকি তাঁর নিজের গোলামী থেকেও। দ্বিতীয়ত, তাদেরকে আল্লাহর একক গোলামীর অধীনে আনা।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৬ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী,) আপনি বলুনঃ হে আহলে কিতাবগণঙ এসো এমন একটা কথার দিকে যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সমান। সে কথা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও দাসত্ব করবো না, তার সাথে কাউকে শরীক করবো না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে নিজের রব বানাবো না”।–(আলে ইমরানঃ ৬৪)

ইসলাম সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যাপারে রসূরে নিরঙ্কুশ আনুগত্যের যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার বলে নয়, বরং তা শুধু এ জন্যে যে, আল্লাহ কিসে খুশী হন এবং কি তাঁর নির্দেশ, তা  কেবল রসূলের মাধ্যমেই তিনি জানান। তাই রসূলের আনুগত্য স্বয়ং আল্লাহরই আনুগত্য বলে ঘোষিত হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৭ পৃষ্ঠায়)

“আমি যে রসূলই পাঠিয়েছি তা এ জন্যে যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর আনুগত্য করা হোক”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬৪)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৭ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো”।–(সূরা আন নিসাঃ ৮০)

এর সাথেই এ কথাও কুরআন ও বহুসংখ্যক হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, হযরত রসূলুল্লাহ (সা) যে কথা বা কাজ আল্লাহর নির্দেশে নয় বরং নিজের মতানুসারে বলেছেন বা করেছেন সে কথা বা কাজের সে রকম নিরঙ্কুশ আনুগত্য তিনি কখনো দাবী করেননি যে রকম আনুগত্য তিনি আল্লাহর নির্দেশে কিছু বলে বা করে থাকলে দাবী করেছেন। আমার “স্বাধীনতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী” শীর্ষক প্রবন্ধে এর বহু দৃষ্টান্ত আমি দিয়েছি। বিশেষত নবীর নিষেধ সত্ত্বেও হযরত যায়েদের জয়নব (রা)-কে তালাক দেয়া এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের তাতে কোনো অসন্তুষ প্রকাশ না করা –একটা জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আমি এর যে ব্যাখ্যা ঐ প্রবন্ধে দিয়েছি তাছাড়া এর আর কোনো ব্যাখ্যা দেয়াই যেতে পারে না। আর খেজুর গাছের প্রজনন সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সা) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৭ পৃষ্ঠায়)

“আমিও একজন মানুষই বটে। যখন আমি তোমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে কোনো নির্দেশ দিলেই তা মেনে নিও। কিন্তু যখন নিজের মতানুসারে কিছু বলি তখন মনে রেখ, আমি একজন মানুষ মাত্র। -আমি অনুমান করে একটা কথা বলেছিলাম। এ রকম আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে যা বলি তা গ্রহণ করো না। তবে যখন আল্লাহর পক্ষ তেকে কিছু বলি তখন তা গ্রহণ করো। কেননা আমি আল্লাহ সম্পর্কে কখনো অসত্য বলিনি। -তোমাদের পার্থিব জীবন সংক্রান্ত বিষয়ে তোমরাই ভাল জান”।–(মুসলিম)

এতো হচ্ছে নীতিগত পার্থক্য। এখন তার বাস্তব দিকটা দেখা যাক।

দুইঃ বাস্তব ও ব্যবহারিক দিক

মূলত ব্যাপারটা ছিল অত্যন্ত নাজুক ও জটিল। আল্লাহ তায়ালা একজন মানুষকে নিজের একমাত্র প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন এরূপ দ্বৈত দায়িত্ব দিয়ে যে, একদিকে তিনি সগ্র মানব জাতিকে নিজের ব্যক্তিত্বসহ সকল সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করবেন এবং তাদেরকে তিনি স্বয়ং এ স্বাধীনতার ট্রেনিং দেবেন। অপর দিকে সেই মানুষটিই আবার তাদেরকে আল্লাহর নিরঙ্কুশ আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ করবেন এবং আল্লাহর সেই আনুগত্যের উৎস হবে রসূল হিসেবে তাঁরই ব্যক্তিসত্তা। এ দু’টো পরস্পর বিরোধী কাজ একই ব্যক্তিকে একই সময়ে করতে হতো এবং এ দু’টো কাজের সীমানা পরস্পরের সাথে এমন ওৎপ্রোত জড়িত যে, স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রসূল ছাড়া আর কেউ এ দু’য়ের মধ্যে সীমারেখা চিহ্নিত করতে পারতো না। অধিকন্তু তিনটি বিষয় বিবেচনা করলে এর জটিলতা ও নাজুকতা তীব্রতর হয়ে ওঠে। প্রথমত হযরত রসূলুল্লাহ (সা) যখন আল্লাহর নির্দেশের অধীন নিজের আনুগত্য করতে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করতেন তখন তিনি যে রিসালাতের দায়িত্বই পালন করছেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকতো না। কিন্তু যখন তিনি তাঁর একান্ত অনুগত সাহাবীদেরকে তাঁর নিজ ব্যক্তিত্বের মানসিক গোলামি থেকে মুক্তি দিয়ে চিন্তা ও মতামতের স্বাধীনতা প্রয়োগের শিক্ষা দিতেন, যখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামতের মোকাবিলায় তাঁর সামনেই চিন্তার স্বাধীনতা প্রয়োগে উৎসাহ দিতেন এবং দেখিয়ে দিতেন যে, এ ক্ষেত্রে তোমরা স্বাধীন এবং এ ক্ষেত্রে পূর্ণ আনুগত্য করতে তোমরা বাধ্য, তখনও তিনি প্রকৃতপক্ষে রিসালাতের দায়িত্বেরই একটা অংশ পালন করতেন। এ এমন একটা ক্ষেত্র, যেখাতে এসে তাঁর ব্যক্তি জীবন ও নবী-জীবনের পার্থক্য বুঝা এবং সেই পার্থক্য অনুসারে কাজ করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়া এখানে এ দু’টি জীবন পরস্পর এমন ওৎপ্রোতভাবে জড়িত যে, উভয়ের মধ্যে কার্যত কেবল তাত্ত্বিক পার্থক্যটাই থেকে যায়। নিজের ব্যক্তিগত মর্যাদায় কোনো কাজ করতে গিয়েও কার্যত তাতে নবুয়াতের দায়িত্বই পালন করতে দেখা যায়।

দ্বিতীয়ত, যেগুলো বাহ্যত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার যেমন খাওয়া-দাওয়া, পোশাক পরিচ্ছদ, বিয়ে-শাদী, স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে বসবাস, সাংসারিক কাজকর্ম, গোসল ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি –এগুলোও রসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবনের পুরোপুরি ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, বরং এগুলোর মধ্যেও শরীয়াতের সীমা, বিধি ও নিয়ম-কানুন সংক্রান্ত শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে মানুষের পক্ষে স্থি করা কঠিন হয়ে পড়ে যে, এগুলোর মধ্যে কোথায় গিয়ে রসূল মুহাম্মদের কাজ শেষ হয় এবং কোথায় গিয়ে ব্যক্তি মুহাম্মদের কাজ শুরু হয়।

তৃতীয়ত পবিত্র কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি যে, নবী-জীবন সামগ্রিকভাবেই একটা আদর্শ –যার প্রতিটি দিক আমাদের জন্যে সত্য ও ন্যায়ের আলোকবর্তিকা। তাঁর কোনো একটা কথা ও কাজ প্রবৃত্তির প্ররোচনা, গোমরাহি ও বিভ্রান্তি দ্বারা বিন্দুমাত্রও কলুষিত নয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনের কয়েকটি বাণী লক্ষণীয়ঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৮ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদের জন্যে আল্লাহর রসূলের জীবনে উৎকৃষ্টতমত আদর্শ রয়েছে”।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৮ পৃষ্ঠায়)

‘হে নবী! আমি তোমাকে (মানবজাতির জন্যে) সাক্ষী, সুসংবাদদানকারী, সতর্ককারী, আল্লাহর ইচ্ছানুসারে তাঁর দিকে আহবানকারী এবং উজ্জ্বল প্রদীপ করে পাঠিয়েছি”।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৬৮ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্টও হয়নি, কুপথগামীও হয়নি। সে প্রবৃত্তির খেয়ালবশে কিছু বলে না, সে যা-ই বলে, তা তার কাছে পাঠানো অহী ছাড়া আর কিছু নয়”।–(সূরা আন নাজমঃ ২-৪)

এসব কারণে নবীর নবী-জীবন ও ব্যক্তি জীবনে পার্থক্য করার কোনো অধিকার শরীয়াত অনুসারে আমাদের নেই, আর কার্যত সে পার্থক্য করা সম্ভবও নয়। আমরা নবী-জীবনের এ দু’ভাগের সীমানা নিজেরা নির্ধারণ করতে পারি না। আমরা নির্দিষ্ট করে এ কথা বলতে সক্ষম নই যে, অমুক বিষয় নবীর নবী-জীবনের আওতাধীন আর অমুক অমুক বিষয় নবীর ব্যক্তি জীবনের আওতাধীন। এ জন্যে একটিকে মেনে নেয়া জরুরী ও অপরটিকে মেনে নেয়া ঐচ্ছিক বলে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। স্বয়ং রসূলুল্লাহরই কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা অথবা তাঁর একাধিক শিক্ষার আলোকে রচিত মূলনীতিই এ পার্থক্য নিরূপনের একমাত্র উপায় হিসেবে গৃহীত হতে পারে।

কয়েকটি লক্ষণীয় দৃষ্টান্ত

হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর আমলে এরূপ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যে, সাহাবীগণ তাঁর কোনো কথা বা কাজ সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করার আগে জিজ্ঞেস করে নিতেন যে, উক্ত কথা বা কাজ আল্লাহর নির্দেশের ভিত্তিতে, না তাঁর ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে। যখন তাঁরা জানতে পারতেন যে, এটা তাঁর ব্যক্তিগত মত কেবল তখনই তাঁরা নিজের বক্তব্য পেশ করতেন। বদর যুদ্ধে হযরত খাব্বাব ইবনুল মুনযির নিজের মত ব্যক্ত করার আগে জিজ্ঞেস করে নেন যে, স্থানটির নির্বাচন অহীর ভিত্তিতে হয়েছে, না নিছক সমর কৌশল হিসেবে। কেননা অহীর ভিত্তিতে হয়ে থাকেল একটুও আগে-পিছে করা আমাদের জন্যে জায়েয হবে না। খন্দক যুদ্ধে হযরত সা’দ বিন মায়া’য বনি গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজের মতামত ব্যক্ত করার আগে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রসূল! এ সিদ্ধান্ত কি অহীর ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে –যে সম্পর্কে আমাদের কথা বলার অবকাশ নেই, না, আপনি কেবল নিজের ইচ্ছায় এরূপ করতে চাচ্ছেন?”

কোনো কোনো সময় হযরত রসূলুল্লাহ (সা) নিজেই জানিয়ে দিতেন যে, অমুক বিষয় নিয়ে তিনি যা বলেছেন তা আল্লাহর হুকুমে বলেননি এবং ইসলামের বিধি হিসেবে জারী করেননি বরং কেবল নিজের ব্যক্তিগত মতই প্রকাশ করেছেন মাত্র। এর উদাহরণস্বরূপ খেজুর গাছের প্রজনন সম্পর্কে তাঁর দেয়া ব্যাখ্যা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

কোনো কোনো সময় নির্দেশের ধরণ দেখেই বুঝা যেত যে, তিনি ব্যক্তিগত পর্যায়েই দিয়েছেন। যেমন হযরত যায়েদকে তিনি বললেনঃ (আরবী**********) “তুমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দিও না। আল্লাহকে ভয় করো”। এ নির্দেশ যে একজন মুমিনকে দেয়া নবীর আইনগত নির্দেশ নয়, বরং পরিবারের একজন কনিষ্ঠ সদস্যকে দেয়া পরিবার প্রধানের উপদেশ –তা স্পষ্টই বুঝা গিয়েছিল। এ জন্যেই হযরত যায়েদ নবীর নির্দেশ সত্ত্বেও যয়নবকে তালাক দিয়ে দেন। এতে আল্লাহ ও রসূর (সা) কোনো প্রকার অসন্তোষ প্রকাশ না করায় বুঝা যায় যে, নবীর নির্দেশ কোন পর্যায়ের, তা হযরত যায়েদ ঠিকমতই বুঝতে পেরেছিলেন।

পরবর্তী যুগে নবী-মর্যাদা নির্ণয়ের উপায়

এমন অনেক দৃষ্টান্ত –যা নবী পাক (সা)-এর জীবদ্দশায় দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া আরও অনেক ব্যাপারে এখনও শরীয়াতের মূলনীতির আলোকে এ পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। যেমন নবীর পোশাক ও খানাপিনার ব্যাপারটাই ধরা যাক। এর একটা দিক এই ছিল যে, তিনি যে বিশেষ ধরনের মাপজোখ ও কাটিং-এর পোশাক পরতেন তা সেকালে আরব দেশে প্রচলিত ছিল এবং সে পোশাক তিনি আপন রুচি মতো বেছে নিতেন। এভাবে তিনি যে খাদ্য খেতেন তা তাঁর আমলে আরবদের বাড়ীতে সচরাচর রান্না করা হতো এবং এসব খাদ্য তাঁর রুচি মাফিকই ছিল। এর আর একটা দিক ছিল এই যে, এ খাওয়া-পরার ব্যাপারে তিনি নিজের কথা ও কাজ দ্বারা খাওয়া-পরা সংক্রান্ত ইসলামী রীতি ও ইসলামী বিধি শিক্ষা দিতেন। এর মধ্যে প্রথমটি যে নবীর ব্যক্তিগত জীবনের এবং দ্বিতীয়টি নবী-জীবনের আওতাভুক্ত, সে কথা আমরা স্বয়ং নবীর শেখানো মূলনীতি থেকৈই জানতে পারি। কেননা তিনি যে শরীয়াতের বিধান শিক্ষা দেয়ার জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত হয়েছিলেন, সে শরীয়াত মানব জীবনের এ ব্যাপারটিকে তার আওতাভুক্ত করেনি যে, মানুষ তার পোশাকের কাটছাঁট কি ধরনের করবে এবং তাদের খানা কিভাবে পাকাবে। অবশ্যি শরীয়াত এ জিনিসটিকে তার আওতাভুক্ত করছে যে, সে পোশাক এবং খাদ্যের ব্যাপারে হালাল-হারাম ও জায়েয-নাজায়েয সীমা নির্ধারণ করে দিবে এবং মু’মিনদের চরিত্র ও সভ্যতা সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ভদ্রতা ও শিষ্টাচার মানুষকে শিক্ষা দিবে।

এ পার্থক্য আমরা নবীর কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা দ্বারা জানাতে পারি অথবা তাঁর শেখানো শরীয়াতের মূলনীতি থেকে জানতে পারি উভয় ক্ষেত্রেই নবীর শিক্ষাই এ জ্ঞানের উৎস। অতএব নবীর ব্যক্তি জীবনের আওতাভুক্ত কাজকর্ম নির্ণয় করতেও আমাদেরকে নবী-জীবনেরই শরণাপন্ন হতে হবে। আর নবী-জীবনকে উপেক্ষা করে ব্যক্তি জীবনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগ স্থাপনের কোনো অবকাশ আমাদের নেই। “রসূলের আনুগত্য ও অনুকরন” শিরোনামে লিখিত আমার নিবন্ধে এ বিষয়েই আমি হাদীস বিরোধীদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছি। তাঁদের মৌলিক ভ্রান্তি হলো এই যে, তাঁরা আপন উদ্যোগেই রসূল হিসেবে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ এবং মানুষ হিসেবে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ-এর মধ্যে পার্থক্য করে উভয়ের আওতাভুক্ত কাজগুলোর মধ্যে একটা সীমারেখা টেনে দেন। অতপর নবী-জীবনের যে অংমকে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের মুক্ত করে নিয়েছেন। অথচ নবী মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তি জীবন ও নবী-জীবনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে যে পার্থক্যই থাকে, তা কেবল আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদেরকে ব্যাপারটা জানানো হয়েছে শুধু এ জন্যে যে, আমরা যেন আকীদার বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদকেই প্রকৃত আনুগত্যের অধিকারী মনে করে না বসি। কিন্তু উম্মতের জন্যে কার্যত তাঁর একটা মাত্রই মর্যাদা এবং তাহলো তাঁর রসূল হওয়ার মর্যাদা। এমনকি মানুষ মুহাম্মদের আনুগত্যের ব্যাপারে আমাদের কোনো স্বাধীনতা থাকলে তা রসূল মুহাম্মদেরই প্রদত্ত। রসূল মুহাম্মদই আমাদের সে স্বাধীনতার সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং সে স্বাধীনতা প্রয়োগের শিক্ষাও তিনিই দেন।

এটুকু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর আমার নিবন্ধ দু’টি পড়লে আর কোনো ভুল বুঝাবুঝির অকাশ থাকতে পারে না।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.