সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কুরআনের দৃষ্টিতে নবুয়াতের পদ ও দায়িত্ব

[হাদীস অস্বীকারকারীদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও সন্দেহ-সংশয় নিরসনার্থে এ প্রবন্ধ লেখা হয়েছিল।–(সংকলক)]

রসূলের কাজ চার প্রকারের

পবিত্র কুরআনের চার জায়গায় নবী (সা)এর দায়িত্ব সম্পর্কে নিম্ন বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছেঃ

 

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭১ পৃষ্ঠায়)

“এবং স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল এ ঘরের (কা’বা) ভিত্তিস্থাপন করছিলেন……………….(তখন তাঁরা দো’য়া করেন) হে আমাদের রব! এ লোকদের জন্যে তাদের মধ্য থেকেই এমন একজন রসূল পাঠাও, যিনি তাঁদেরকে তোমার আয়াত পড়ে শোনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন”।(সূরা বাকারাঃ ১২৭-১২৯)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭১ পৃষ্ঠায়)

“যেমন আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের ভেতর থেকেই একজন রসূল পাঠিয়েছি যিনি তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শোনান, তোমাদের পরিশুদ্ধ করেন, তোমাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন এবং এমন আরো অনেক কিছু শিক্ষা দেন যা তোমরা জানতে না”।–(সূরা আল বাকারাঃ ১৫১)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭১ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ মুমেনদের ওপর যথার্থ অনুগ্রহ করেছেন যখন তাদের জন্যে তাদের ভেতর থেকেই একজন রসূল পাঠিয়েছেন যিনি তাদেরকে তাঁর আয়াত পড়ে শোনান, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৬৪)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭১ পৃষ্ঠায়)

“তিনিই সেই আল্লাহ যিনি নিরক্ষর লোকদের মধ্যে তাদের ভেতর থেকেই একজন রসূল পাঠিয়েছেন যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত পড়ে শোনান, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন”।–(সূরা আল-জুমুআঃ২)

এ আয়াতগুলোতে বার বার যে কথা বলা হয়েছে তা এই যে, আল্লাহ তাঁর রসূরকে শুধু কুরআনের আয়াত পড়ে শুনিয়ে দেয়ার জন্যে পাঠাননি, বরং তাঁকে পাঠানোর আরও তিনটি উদ্দেশ্য ছিল।

প্রথমত, তিনি মানুষকে কিতাব শিক্ষা দেবেন।

দ্বিতীয়ত, উক্ত কিতাবের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করার কৌশল ও পদ্ধতি শিক্ষা দেবেন।

তৃতীয়ত, তিনি ব্যক্তি ও সমাজ কাঠামোকে পরিশুদ্ধ করবেন। অর্থাৎ স্বয়ং প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দোষত্রুটি দূর করবেন যাতে করে তাদের মধ্যে উত্তম গুণাবলী সৃষ্টি হয় এবং নিখুঁত সমাজ ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করে।

এটা সুস্পষ্ট যে, কুরআনের আয়াত পড়ে শুনাবার পর কিতাব ও তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দেয়া শুধু মাত্র অতিরিক্ত কোনো কাজ ছিল। নতুবা তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা নিরর্থক হতো। অনুরূপভাবে ব্যক্তি ও সমাজের প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে তিনি যেসব কর্মপন্থা গ্রহণ করতেন তাও কুরআন আবৃত্তির অতিরিক্ত কাজই ছিল। নতুবা প্রশিক্ষণ কাজের পৃথকভাবে উল্রেখ করার কোনো অর্থ হয় না। এখন প্রশ্ন হলো, কুরআন আবৃত্তি করে শুনিয়ে দেয়া ছাড়া শিক্ষা ও প্রশিক্ষণদাতার এই যে, দু’টি দায়িত্ব তিনি লাভ করেছিলেন তা কি তিনি নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গ্রহণ করেছিলেন, না আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ঐ দু’টি দায়িত্বে নিয়োগ করেছিলেন? পবিত্র কুরআনের এ সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার পর এ কিতাবের ওপর যার ঈমান আছে, সে কিভাবে এ কথা বলার দুঃসাহস করতে পারে যে, এ দায়িত্ব দু’টি তাঁর রিসালাতের অংশ ছিল না এবং এ দায়িত্বের অধীন তিনি যেসব কাজ সম্পাদন করতেন তা রসূল হিসেবে নয় বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পাদন করতেন? এমন দুঃসাহস করা যদি সম্ভব না নয় তাহলে কুরআনের কথাগুলো কেবল আবৃত্তি করে শুনিয়ে দেয়ার পর অতিরিক্ত যে কাজ নবী (সা) কিতাব ও তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে করলেন এবং নিজের কথা ও কাজ দ্বারা ব্যক্তি ও সমাজের প্রশিক্ষণের যে কাজ সমাধা করলেন তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্জিত ও প্রামাণ্য সনদ বলে স্বীকার না করা খোদ রিসালাতকেই অস্বীকা করার শামিল নয় কি?

আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যা দানকারী হিসেবে রসূলের ভূমিকা

সূরা আন নাহলে আল্লাহ বলেছেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭২ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) আমি এ গ্রন্থে তোমার কাছে নাযিল করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি মানুষের জন্যে নাযিল করা এ শিক্ষা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দেবে”।–(আয়াতঃ ৪৪)

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কুরআনে আল্লাহ যেসব নির্দেশ ও উপদেশ দিয়েছেন তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করাও নবীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একজন সাধারন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন লোকও অন্ততপক্ষে এ কথাটা বুঝতে পারে যে, কোনো বই পড়ে শুনিয়ে দেয়াতেই তার ব্যাক্যা বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়ে যায় না, বরং ব্যাখ্যাকারীকে বইয়ের মূল কথার চেয়ে বেশী কিচু বলতে হয় যাতে শ্রোতা বইয়ের বক্তব্য ভালো করে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। যদি বইয়ের কোনো কথা কোনো ব্যবহারিক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে ব্যাক্যাকারী বাস্তব কর্মপ্রদর্শনের (Practical Demonstration) দ্বারা জানিয়ে দেন যে, এভাবে কাজ করাকে গ্রন্থকার পছন্দ করেন। তা না হলে, কেউ যদি কিতাবের বিষয়বস্তুর অর্থ ও ব্যাখ্যা বিশ্রেষণ জিজ্ঞেস করে এবং তাকে কিতাবেরই শব্দগুলো শুনিয়ে দেয়া হলে এটাকে কোনো শিশুও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বলে গ্রহণ করবে না। এখন জিজ্ঞাস্য এই যে, এ আয়াতের বক্তব্য অনুসারে নবী (সা) ব্যক্তি হিসেবে কি কুরআনের ব্যাখ্যাকারী ছিলেন, না তাকে ব্যাখ্যাকারী নিযুক্ত করা হয়েছিল। এখানে তো আল্লাহ তায়ালা রসূরের ওপর কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্যেই এটা বলছেন যে, রসূল তাঁর কথা ও কাজের দ্বারা এর মর্ম বিশ্লেষণ করবেন। তাহলে কুরআনের ব্যাখ্যা দানের যে দায়িত্ব তাঁর হাতে ন্যস্ত ছিল, তাকে কি করে তাঁর রিসালাতের সামগ্রিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা করা সম্ভব? কিভাবেই বা তাঁর আনিত কুরআনকে গ্রহণ করার পর তাঁর প্রদত্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকে অস্বীকার করা যায়? এটা কি রিসালাতকেই অস্বীকার করার নামান্তর হবে না?

বস্তুত, যারা তৎকালে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতকে এই বলে অস্বীকার করতো যে, আল্লাহর কিতাব কোনো মানুষের মাধ্যমে আসতে পারে না, তাদের বিরুদ্ধে যেমন এ আয়াতটি একটি অকাট্য দলিল, তেমনি আজকে যারা হাদীস অস্বীকার করে এবং নবীর ব্যাখ্যা বিশ্লেসণ ছাড়াই শুধুমাত্র কুরআনকে গ্রহণ করার পক্ষপাতী, তাদের বিরুদ্ধেও এ আয়াত অকাট্য প্রমাণ। তারা এ প্রসঙ্গে সাধারণত চারটি বক্তব্য পেশ করে থাকে। কখনো বলে, নবী আদৌ কোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেননি, কেবল আল্লাহর কিতাব পৌঁছে দিয়েছেন। কখনো বলে, শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাবই অনুসরণযোগ্য, নবীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। কখনো বলে, এখন শুধু আল্লাহর কিতাবই নির্ভরযোগ্য অবস্থায় বর্তমান আছে, নবীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হয় আদৌ নেই, নতুবা থাকলেও নির্ভরযোগ্য অবস্থায় নেই। এই চারটি মতই কুরআনের উক্ত আয়াতের সাথে সংঘর্ষশীল। বিশেষভাবে প্রথম মতটির অর্থ দাঁড়ায় এই যে, যে উদ্দেশ্যে আল্লাহর কিতাবকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে না পাঠিয়ে অথবা সরাসরি মানুষের হাতে না পৌঁছে দিয়ে নবীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল, নবী সেই উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আর চতুর্থ মতটি কুরআন ও নবী মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াত উভয়কেই অস্বীকার করার ঘোষনা ছাড়া আর কিছু নয়। এরুপ ঘোষণাকারীদের জন্যে অতপর নতুন নবুয়াত ও নতুন অহীর দাবীদারদের পথ অবলম্বন করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। কেননা আয়াতটিতে আল্লাহ তায়ালা নবীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকে নবুয়াতের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে যেমন অপরিহার্য বলে গণ্য করেছেন তেমনি নবীর নবুয়াতের প্রয়োজনীয়তা এবং স্বার্থকতাও কেবলমাত্র আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যাদানের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হতে পারে বলে ঘোষণা করছেন। এমতাবস্থায় নবীর দেয়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দুনিয়ায় অবশিষ্টই নেই, হাদীস অস্বীকারকারীদের এ উক্তি যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহরে দু’টো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে। প্রথমতঃ একটা অনুকরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে নবুয়াতে মুহাম্মদীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত বলে ধরে নিতে হয় (নাউযুবিল্লাহ) এবং নবী মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক হযরত হুদ, সালেহ, শোয়াইব প্রমুখ পূর্বতন নবীদের সম্পর্কের অনুরূপ বলে মেনে নিতে হয়। পূর্বতন নবীদের প্রতি আাদের ঈমান আনতে হয়, তাঁদের দাওয়াত সত্য বলে স্বীকৃতিও দিতে হয় কিন্তু তাঁদের কোনো অনুকরণযোগ্য আদর্শ আমাদের কাছে নেই বলে আমরা তাঁদের অনুকরণ করতে পারি না এবং বাধ্যও নই। এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলে নতুন নবীর প্রয়োজন অনুভূত হওয়া একটা স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। এর পরে একজন নির্বোধই খতমে নবুয়াত নিয়ে জিদ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নবীর ব্যাখ্যা ছাড়া কুরআন এককভাবে হেদায়াতের জন্যে স্বয়ং আল্লাহর বিবেচনাতেই যখন যথেষ্ট নয়, তখন কুরআনের তথাকথিত মান্যকারীরা যত বড় গলায়ই তাকে যথেষ্ট বলে ঘোসনা করুক, সে কথা গ্রহণীয় হতে পারে না। বাদীর দাবী এক রকম, আর সাক্ষীর সাক্ষ্য আর এক রকম হলে দু’টোর কোনোটাই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হরে বলতেই হয় যে, স্বয়ং কুরআনই একখানা নতুন কিতাবের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ দিচ্ছে। আল্লাহর অভিসম্পাত হোক এহেন ঈমা-বিধ্বংসী মতামত প্রচারকারীদের ওপর। বস্তুত এভাবে তাঁরা হাদীস বর্জনের মাধ্যমে আসলে ইসলামেরই সর্বনাশ করতে চেষ্টা করছে।

নেতা ও অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে রসূল

সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৪ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) তুমি বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরন কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন। …..আরো বল, তোমরা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য কর। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে (জেনে রাখ) আল্লাহ কাফেরদের পছন্দ করেন না”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৩১-৩২)

সূরা আহযাবে তিনি বলেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৪ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদের জন্যে আল্লাহর রসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। আল্লাহ ও শেষ দিনের সম্পর্কে আশাবাদী এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই এ আদর্শ”।–(আয়াতঃ ২১)

এ দু’টো আয়াতেই আল্লাহ তায়ারা নিজেই তাঁর রসূল (সা)-কে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করছেন। তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছেন। তাঁর জীবনকে অনুকরণযোগ্য বলে ঘোষণা করছেন্ তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, রসূলের আনুগত্য না করলে আমার কাছ থেকে কোনো কল্যাণ প্রত্যাশা করো না। এ আনুগত্য ছাড়া তোমরা আমার ভালবাসা পেতে পার না। আনুগত্য থেকে বিরত থাকা কুফরী। এখন জিজ্ঞেস্য এই যে, নবী মুহাম্মদ (সা) কি নিজেই মানুষের নেতা সেজেছিলেন, না মুসলমানরা তাঁকে নির্বাচিত করেছিল, না আল্লাহ তাঁকে নিয়োগ করেছিলেন? কুরআনের ভাষায় তাঁকে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর পক্ষ তেকে নিয়োজিত ও মনোনিত নেতা বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় তাঁর আনুগত্য ও অনুকরণ করতে অস্বীকার করা কি করে সম্ভব? এর জবাবে যদি কেউ বলে যে, রসূলের আনুগত্যের অর্থ কুরআনের আনুগত্য, তবে তাকে প্রলাপোক্তি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না্ কেননা অর্থ যদি তাই হতো তাহলে (আরবী*********) –এর পরিবর্তে (আরবী***********) (কুরআনের অনুসরণ কর) বলা হতো। আর সে ক্ষেত্রে রসুলের জীবনকে ‘উত্তম আদর্শ’ বলার কোনো অর্থই থাকত পারে না।

আইন প্রণেতা হিসেবে রসূলের ভূমিকা

সূরা আ’রাফে আল্লাহ তায়ালা রসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৫ পৃষ্ঠায়)

“তিনি মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দেন, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখেন, তাদের জন্যে পবিত্র জিনিসগুলো হালাল করেন, অপবিত্র জিনিসগুলো হারাম করেন এবং তাদের ওপর আগে থেকে যেসব বিধি-নিষেধের বোঝা চাপানো ছিল তা থেকে তাদের মুক্ত করেন”।–(সূরা আল আ’রাফঃ ১৫৭)

এ আয়াত থেকে  সুস্পষ্টরূপে জানা যায় যে, হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ তায়ালা আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (Legislative Powers) প্রদান করেছেন। কুরআনে যেসব হালাল হারাম এবং ভালো কাজ ও মন্দ কাজের বর্ণনা রয়েছে, আল্লাহ বিধি-নিষেধের তালিকা তাতেই সমাপ্ত নয় বরং নবী যা যা করতে বলেছেন বা নিষেধ করেছেন, তাও আল্লাহর আইনের অংশ। কেননা আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করেই নবী এসব বিধি-নিষেধ রচনা করেছেন। সূরা হাশরেও অনুরূপ স্পষ্টোক্তি দেখতে পাওয়া যায়ঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৫ পৃষ্ঠায়)

“রসূল তোমাদের যা দেন, গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন, তা বর্জন করো এবং আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা”।–(আয়াতঃ ৭)

এ দু’টি আয়াতের কোনোটারই এরূপ ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে না যে, এতে কুরআনে সন্নিবেশিত বিধি-নিষেধের কথাই বলা হয়েছে। একে ব্যাখ্যা নয় বরং আল্লাহর আয়াতকে সংশোধন তথা পরিবর্তনের অপচেষ্টা বলাই সংগত হবে। কেননা আল্লাহ এখানে সুস্পষ্টভাবে ভাল কাজের আদেশ দেয়া, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা এবং হালার ও হারাম নির্ধারণ করাকে রসূলের কাজ বলে উল্লেখ করেছেন –কুরআনের কাজ বলে নয়। এখন কেউ কি এ কথা বলতে চায় যে, আল্লাহর ভুল হয়ে গেছে এবং তিনি কুরআনের পরিবর্তে ভুল করে রসূলের নাম করেছেন? –(মায়াযাল্লাহ)

বিচারক হিসেবে রসূল (সা)-এর ভূমিকা

আল্লাহ তায়ালা রসূলুল্লাহ (সা)-কে বিচারক নিযুক্ত করার কথা কুরআনের একাধিক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি আয়াত লক্ষণীয়ঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৫ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) আমি সত্য কিতাব নাযিল করেছি, তোমার কাছে, যেন তুমি আল্লাহর দেখানো যুক্তির আলোকে মানুষের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতে পার”।–(সূরা আন নিসাঃ ১০৫)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৬ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) বল, আমি আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের ওপর ঈমান এনেচি এবং তোমাদের মধ্যে ন্যায়-বিচার করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে”।–(সূরা আশ শূরাঃ ১৫)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৬ পৃষ্ঠায়)

“মু’মিনদেরকে যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ডাকা হয় যাতে করে তিনি তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন, তখন তারা বলে আমরা শুনেছি ও মেনেছি”।–(সূরা আন নূরঃ ৫১)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৬ পৃষ্ঠায়)

“যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহর নাযিল করা কিতাব ও রসূলের দিকে এসো –তখন দেখবে যে মুনাফিকরা তোমার থেকে কেটে পড়ছে”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬১)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৬ পৃষ্ঠায়)

“অতএব, হে নবী তোমার রবের কসম, তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের ঝগড়া-বিবাদে তোমাকে সালিস মানবে এবং তোমার সিদ্ধান্তের প্রতি মনে কোনো প্রকার দ্বিধা-সংকোচ না রাখবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবে”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬৫)

এসব আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সা) স্বনিয়োজিত বা মুসলমানদের নির্বাচিত বিচারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক। তৃতীয় আয়াতটি থেকে জানা যায় যে, বিচারক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব রিসালাতের দায়িত্ব থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন ছিল না। তিনি রসূল হিসেবে বিচারকও ছিলেন। তাই একজন মু’মিন যতক্ষণ রসূলকে বিচারক হিসেবেও তাঁর আনুগত্য মেনে না নেয় ততক্ষণ রিসালাতের প্রতি তার ঈমান সঠিক হতে পারে না। চতুর্থ আয়াতে (আরবী**********) কুরআন ও রসূল এ উভয়কে আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন –যার দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জণ্যে দু’টি শাশ্বত বিচারক উৎস রয়েছেঃ একটি হলো কুরআন আইনের দিক দিয়ে এবং অপরটি হলো বিচারক হিসেবে রসূল। এ দু’য়ের যে কোনোটিই অমান্য করা হবে মুনাফিকের কাজ, মু’মিনের কাজ নয়। শেষ আয়াতে অকাট্যভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি রসূলকে বিচারক হিসেবে মানে না সে মু’মিন নয়। এমনকি কেউ রসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত বা কংকোচ বোধ করলেও ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। কুরআনের এসব স্পষ্টোক্তির পর কারো এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, নবী মুহাম্মদ (সা) বিচারক ছিলেন বটে, তবে রসূল হিসেবে নয়, সাধারণ জজ, ম্যাজিস্ট্রেটদের মতই একজন জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তাই সাধারণ জজ, ম্যাজিস্ট্রেটদের রায় যেমন আইনের উৎস নয়, তেমনি নবীর বিচার-ফায়সালাও আইনের উৎস নয়। কেননা দুনিয়ার সাধারণ ম্যাজিস্ট্রেটদের কেউ এমন মর্যাদার অধিকারী নয় যে, তাঁর রা না মানলে, তাঁর সমালোচনা করলে বা তা মানতে ইতস্তত বোধ করলে ঈমান হারানোর আশংকা থাকবে।

শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রসূলের ভূমিকা

কুরআন বার বার সুস্পষ্ট করে এ কথা বলেছে যে, নবী (সা) আল্লারহ পক্ষ থেকে নিযুক্ত শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন এবং এ পদমর্যাদাও তাঁকে রসূল হিসেবেই দেয়া হয়েছিল।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৭ পৃষ্ঠায়)

“আমি যে রসূলই পাঠিয়েছি, তা শুধু এ জন্যে যে, তাঁকে আল্লাহর অনুমতিক্রমে (Sanction) অনুসরণ করতে হবে”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬৪)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৭ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো”।–(সূরা আন নিসাঃ ৮০)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৭ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) নিশ্চয়ই যারা তোমার কাছে বায়আত করে তারা আল্লাহর কাছেই বায়আত করে”।–(সূরা আল ফাতহঃ ১০)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৭ পৃষ্ঠায়)

“ও হে! তোমরা যারা ঈমান এনেছো –আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের। আর নিজেদের নেক আমল বিনষ্ট করো না”।–(সূরা মুহাম্মদঃ ৩৩)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৭ পৃষ্ঠায়)

“কোনো মু’মিন পুরুষ বা নারীর এ অধিকার নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যখন কোনো বিষয়ের মীমাংসা করে দেন, তখন কোনো মু’মিন পুরুষ ও নাররি এ অধিকার থাকে না যে, তারা সে ব্যাপারে নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহিতে লিপ্ত হয়”।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৭ পৃষ্ঠায়)

“ও হে! তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের! আর তোমাদের উলুল আমর-এর আনুগত্য করো। অতপর যদি কোনো বিষয়ে মতভেদ মতানৈক্য দেখা দেয় তাহলে দেখ আল্লাহ ও রসূল এ বিষয়ে কি বলেছেন –যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয়ে থাক”।–(সূরা আন নিসাঃ ৫৯)

এ আয়াতগুলো থেকে পরিস্কার জানা যাচ্ছে যে, রসূল নিজের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের স্বঘোষিত শাসক নন, অথবা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রনায়কও নন বরং তিনি আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা, তাঁর রিসালাতের পদমর্যাদা ও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা কোনো কিছু নয়। বরং তাঁর রসূল হওয়ার অর্থই হলো এমন একজন শাসক হওয়া যার সর্বতোভাবে আনুগত্য ও অনুসরণ করতে হবে। তাঁর আনুগত্য স্বয়ং আল্লাহরই আনুগত্য। আর তাঁর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ (বায়আত) স্বয়ং আল্লাহর আনুগত্যেরই শপথ গ্রহণ। তাঁর নাফরমানি করার অর্থ স্বয়ং আল্লাহরই নাফরমানি এবং তাঁর পরিণতি এই যে, আল্লাহর কাছে মানুষের কোনো ভাল কাজই কবুল হবে না। আর রসূল যে বিষয়ে ফায়সালা করে দিয়েছেন সে বিষয়ে ঈমানদারগণ (যার মধ্যে সমগ্র উম্মত, তার শাসক এবং “কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব” সবই শামিল) আপনা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহনের অধিকারী নয়।

সর্বশেষে আয়াতে আরও বেশী স্পষ্ট করে অকাট্যভাবে এ বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এ আয়াতে পর পর তিনটি আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছেঃ

প্রথমে আল্লাহর আনুগত্য।

তারপর রসূলের আনুগত্য।

তৃতীয় পর্যায়ে উলুল আমর (যাকে হাদীস অমান্যকারীরা ‘কেন্দ্রীয় নেতত্ব’ বলে উল্লেখ করে থাকেন)-এর আনুগত্য।

এর থেকে প্রথম যে কথাটি জানা গেল তা এই যে, রসূল উলুল আমরের অন্তর্ভুক্ত নন বরং তাঁর মর্যাদা তাদের থেকে আলাদা এবং ঊর্ধ্বে। আল্লাহর পর তাঁর মর্যাদা দ্বিতীয় স্তরে। দ্বিতীয়তঃ উলুর আমর তথা দায়িত্বশীল ও কর্তৃত্বশীলদের সাথে মতবিরোধ করা যেতে পারে। কিন্তু রসূলের সাথে মতবিরোধ চলতে পারে না। তৃতীয়তঃ মতবিরোধের মীমাংসার জন্যে দু’টো গ্রহণযোগ্য উৎসের শরণাপন্ন হতে হবে। এক হলো, আল্লাহ, দ্বিতীয় তারপরই আল্লাহর রসূল। মীমাংসার এ উৎস যদি শুদু আল্লাহ হতেন তাহলে নবীর কথা উল্লেখ করার কোনো অর্থই থাকতো না। এখানে আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া মানে রসূলের জীবদ্দশায় স্বয়ং রসূরের কাছে হাজির হওয়া। আর রসূলের ইন্তেকালের পর তাঁর সুন্নাহ বা হাদীসের শরণাপন্ন হওয়া।

এমনকি একটু তলিয়ে দেখলে বুঝা যাবে যে, স্বয়ং রসূলের জীবদ্দশাতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রসূলের হাদীস বা সুন্নাহ অবলম্বনেই সমস্যার সুরাহা করা হতো। রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগের শেষের দিকে সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামী শাসন বিস্তৃতি লাভ করে। দশ বারো লাখ বর্গমাইল আয়তনের এমন বিরাট ও বিশাল দেশে প্রতিটি বিষয়ে সরাসরি রসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছ থেকে বিচার-ফায়সালা গ্রহণ করা কোনো মতেই সম্ভব ছিল না। তাই অনিবার্যরূপে সে যুগের ইসলামী সরকারে গভর্নর, বিচারক ও অন্যান্য প্রশাসকদের বিচার-ফায়সালা করার জন্যে কুরআনের পরেই আইনের অপর যে উৎসের সাহায্য নিতে হতো তা রসূলের সুন্নাহ বা হাদীস ছাড়া আর কিছু নয়।

নবী (সা)-এর আমলে বিচার বিভাগের কার্যপদ্ধতি

নবী (সা)-এর জীবদ্দশায় যেসব সমস্যা সরাসরি তাঁর নিকট হাজির করা হতো সেসব ব্যাপারে আল্লাহ ও রসূরের অভিপ্রায় কি তা ব্যক্ত করে নিজেই তার মীমাংসা করে দিতেন। কিন্তু ইসলাশী রাষ্ট্রের আওতাভুক্ত সকল অধিবাসী যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতো, সেসব না তাঁর কাছে পেশ করা হতো, আর না তাঁর নিকট থেকে সরাসরি তার সমাধান করে নেয়া হতো। তার পরিবর্তে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর পক্ষ থেকে এমন সব লোক নিযুক্ত থাকতেন যাঁরা জনসাধারণকে দ্বীনের শিক্ষা দান করতেন এবং জনগণ তাদের দৈনন্দিন ব্যাপারসমূহে তাঁদের কাছ থেকেই জেনে নিত যে, আল্লাহ কিতাবের কি নির্দেশ এবং আল্লাহর রসূল কোন ধরনের শিক্ষা দিয়েছেন। এছাড়া প্রত্যেক এলাকায় আমীর, সরকারী কর্মচারী ও কাজী নিযুক্ত থাকতেন যাঁরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মীমাংসা নিজেরাই করে ফেলতেন। এসব লোকের জন্যে (আরবী************)-এর উদ্দেশ্য পূরণ করার যে পদ্ধতি নবী নিজে পছন্দ করতেন তা হযরত মুয়ায বিন জাবাল (রা)-এর প্রসিদ্ধ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছেঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৯ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) যখন মুয়ায বিন জাবালকে বিচারক নিযুক্ত করে ইয়ামানে পাঠান তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কিভাবে বিচার-ফায়সালা করবে? তিনি বলেন, আল্লাহর কিতাবে যে পথনির্দেশ আছে সেই অনুসার্ তখন নবী বলেন, আল্লাহর কিতাবে যদি তা না পাওয়া যায় তাহলে? মুয়ায (রা) বলেন, তাহলে রসূলের সুন্নাহ অনুসারে। নবী পুনরায় বলেন, রসূলের সুন্নাহতেও যদি না পাওয়া যায়, তাহলে? তিনি বলেন, আমি নিজের বিচার-বিবেচনা প্রয়োগ করে ইজতেহাদ করার (সঠিক সিদ্ধান্ত) চেষ্টার করবো। তখন নবী (সা) বলেন, আল্লাহর শোকর –যিনি রসূলের প্রতিনিধিকে রসূলের মনোনিত পন্থা অবলম্বনের ক্ষমতা দিয়েছেন’।–(তিরমিজি, আবু দাউদ)

ইসলামী জীবন ব্যবস্থার শাসনতান্ত্রিক মূলনীতিতে রসূলের মর্যাদা

(আরবী***************************পিডিএফ ২৭৯ পৃষ্ঠায়)

“হে ঈমানদারগণ। আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রসূলের এবং ঐসব লোকের যারা তোমাদের ওপর আদেশ করার অধিকার রাখে। অতপর তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে তা বিবেচনার জন্যে আল্লাহ ও রসূলের দিকে আরোপ কর, যদি তোমরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রেখে থাক। এটাই হচ্ছে বিশুদ্ধ কর্মপন্থা এবং পরিণামের দিক দিয়েও উত্তম”।–(সূরা আন নিসাঃ ৫৯)

এ আয়াতটি ইসলামের গোটা ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি এবং ইসলামী রাষ্ট্রের শাসণতন্ত্রের প্রথম দফা। এতে নিম্নলিখিত মূলনীতিগুলো স্থায়ীভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছেঃ

একঃ ইসলামী বিধানে আসল আনুগত্য আল্লাহ তায়ালার জন্যে নির্দিষ্ট। একজন মুসলমান সর্বপ্রথম আল্লাহর বান্দাহ। আর যা কিছুই হোক, তা এর পরে। প্রত্যেক মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবন এবং সামাজিক ব্যবস্থা –এ উভয়েরই কেন্দ্রবিন্দু ও লক্ষ্য একমাত্র আল্লাহর ফরমাবরদারি ও আনুগত্য। আর যত আনুগত্র তা শুধু তখনই করা যেতে পারে, যদি খোদার আনুগত্যের সাথে তা সংঘর্ষশীল না হয় বরং তাঁর আনুগত্যের অধীন হয়। অন্যথায় আসল এবং মৌলিক আনুগত্যের মোকাবেলায় অন্যান্য সকল আনুগত্যের দাবীদারকে প্রত্যাখ্যান করা হবে। এ কথাটাই রসূলুল্লাহ (সা) এভাবে বলেছেনঃ (আরবী*************) “স্রষ্টার নাফরমানি করে সৃষ্টির আনুগত্য করা চলবে না”।

দুইঃ ইসলামী বিধানের দ্বিতীয় মূলনীতি হলো রসূলের আনুগত্য। এটা কোন আলাদা আনুগত্র নয় বরং আল্লাহর আনুগত্যেরই একমাত্র বাস্তব ও কার্যকররূপ। রসূল অনুসরণযোগ্য এ জন্যে যে, তিনিই আমাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশ পৌঁছানোর একমাত্র বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। তাই রসূলের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্যের একমাত্র উপায় ও পন্থা। রসূলের অনুমোদিত উপায় ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রসূলের আনুগত্য অস্বীকৃতি খোদাদ্রোহীতার শামিল। এ বক্তব্যকে আরো স্পষ্ট করে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮০ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহর আনুগত্য করলো। আর যে ব্যক্তি আমাকে অমান্য করলো সে আল্লাহকে অমান্য করলো। কুরআনেও এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যা পরে আলোচিত হবে”।

তিনঃ উল্লিখিত দু’রকমের আনুগত্যের পর তৃতীয় যে আনুগত্য মুসলমানরেদ জন্যে অপরিহার্য তাহলো এসব উলুল আমর-এর যারা মুসলমানদের মধ্য থেকেই হবে। মূলতঃ এ আনুগত্য উল্লিখিত দু’আনুগত্যেরই অধীণ –তা থেকে স্বতন্ত্র কিছু নয়। কুরআনে এদেরকে ‘উলুল আমর’ বলে উল্লেখ করা হয়েচে। তাদের মধ্যে ঐসব লোক শামির যাঁরা মুসলমানদের সমষ্টিগত জীবনের যাবতীয় বিষয়ের পরিচালক হবেন। তাঁরা মানসিক ও চিন্তার ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী আলেম হতে পারেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসক, বিচারক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যাপারে নেতৃত্ব দানকারী মহল্লা ও বস্তির সরদার মাতব্বরও হতে পারেন। মোটকথা যিনি যে হিসেবে মুসলমানদের ওপর আদেশ করার অধিকারী হবেন তিনি সে হিসেবে মুসলমানদের আনুগত্য পাবারও অধিকারী হবেন। তাঁর সাথে মতবিরোধ করে মুসলমানদের সামাজিক জীবনে বিশৃংখলা ডেকে আনা ঠিক হবে না। তবে শর্ত এই যে, তাঁকে মুসলমান হতে হবে এবং আল্লাহ ও রসূলের অনুগত হতে হবে এবং এ দু’টি শর্ত তাঁর আনুগত্যের জন্যে অপরিহার্য। এ শর্ত যেমন উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, তেমনি হাদীসেও বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। নিম্নের হাদীসগুলো প্রণিধানযোগ্যঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮১ পৃষ্ঠায়)

“উলুল আমর-এর কথা মেনে চলা মুসলমানদের জন্যে অপরিহার্য –তা মনঃপুত হোক বা নাহোক, অবশ্যি যতি পাপ কাজের আদেশ করা না হয়। আর যদি পাপ কাজের আদেশ করা হয়, তাহলে কিছুতে মানা চলবে না”।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮১ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ ও রসূরের নাফমানি হয় এমন কাজে কারও আনুগত্য করা চলবে না –আনুগত্য করতে হবে শুধু ভাল কাজে”।–(বুখারী ও মুসলিম)

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮১ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেন, এমন কিছু লোক তোমাদের শাসক হবে যাদের কিছু কাজ ভালো এবং কিছু কাজ মন্দ হবে। যে ব্যক্তি তাদের মন্দ কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করবে সে অব্যাহতি পাবে। আর যে ব্যক্তি তা অপছন্দ করবে সে-ও রেহাই পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তাতে খুশী থাকবে এবং তা মেনে চলা শুরু করবে তার রেহাই নেই। সাহাবীগণ বললেন, এ ধরনের শাসকদের বিরুদ্ধে আমরা কি যুদ্ধ করবো না? নবী বললেন, যতক্ষণ তারা নামায পড়া অব্যাহতি রাখে ততক্ষণ যুদ্ধ নয়”।–(মুসলিম)

অর্থাৎ নামায পরিত্যাগ করলে বুঝতে হবে যে, তারা আল্লাহর ও রসূরের আনুগত্য ত্যাগ করেছে। সে ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা বৈধ হবে।

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮১ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেন, তোমাদের নিকৃষ্টতম নেতা হবে তারাই যাদের নিকট তোমরা ক্রোধভাজন হবে এবং তারাও তোমাদের নিকট ক্রোধভাজন হবে। তোমরা তাদের ওপর অভিসম্পাৎ করবে আর তারা তোমাদের ওপর অভিসম্পাৎ করবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এ রকম অবস্থা দেখা দিলে আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবো না? তিনি বললেন, তারা যতক্ষণ তোমাদের মধ্যে নামাযের ব্যবস্থা চালু রাখে ততক্ষণ তা করো না”।–(মুসলিম)

এ হাদীসটিতে ওপরে বর্ণিত শর্তকে আরো কঠোর করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী হাদীস থেকে এরূপ ধারণা করার অবকাশ ছিল যে, শাসকরা কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে নামাযের পাবন্দি করলেই তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না্ কিন্তু এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, নামায পড়ার অর্থ আসলে মুসলমানদের সমষ্টিগত জীবনে নামাযের ব্যবস্থা চালু করা। অর্থাৎ শুদু নিজেরা নামায পড়াই যথেষ্ট নয় বরং সেই সাথে তাদের সরকার নামাযের ব্যবস্থা চালু করবে –এটাও অপরিহার্য। তাতে করে বুঝা যাবে যে, তাদের সরকার অন্তত নীতিগতভাবে একটি ইসলামী সরকার। অন্যথায় বুঝতে হবে যে, সে সরকার ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়েচে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে মুসলমানদের সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া বৈধ হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে অন্য একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, আমাদের কাছ থেকে রসূলুল্লাহ (সা) যে কয়টি অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তার একটি হলোঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮২ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “আমরা যদি আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করি। তবে তাদের কাজকর্মে যদি সুস্পষ্ট কুফরী দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্যে –খোদার কাছে পেশ করার জন্যে আমাদের যুক্তি-প্রমাণ বিদ্যমান থাকবে”।(বুখারী, মুসলিম)

চারঃ আলোচ্র আয়াতে এটা একটা চিরন্তন ও অকাট্য মূলনীতিরূপে নির্ধারিত হয়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আল্লাহর নির্দেশ ও রসূলের হাদীস নীতি-পদ্ধতি (কুরআন ও সুন্নাহ) হলো আইনের মূল উৎস (Final Authority). মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে অথবা শাসক ও শাসিতের মধ্যে যে ব্যাপারেই বিরোধ দেখা দেবে, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তার মীমাংসা করতে হবে এবং সেই মীমাংসা সকলকে বিনা বাক্য ব্যয়ে নতমস্তকে মেনে নিতে হবে। এভাবে জীবনের সকল সমস্যায় আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাহকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত উৎস, অবলম্বন ও সনদরূপে মেনে নেয়াই হলো ইসলামী ব্যবস্থার সেই অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য, যা তাকে অনৈসলামী ও খোদাদ্রোহী ব্যবস্থা থেকে পৃথক করে। এ বৈশিষ্ট্য যে ব্যবস্থায় অনুপস্থিত তা নিসন্দেহে একটা অনৈসলামী ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন যে, জীবনের সকল সমস্যার সমাধানের জন্যে আল্লাহর কিতাব ও রসূলুল্লাহর সুন্নাহকে একমাত্র উৎস ও সনদরূপে কিভাবে গ্রহণ করা যায়? কুরআন ও হাদীসে তো পৌরসভা, রেলওয়ে, ডাকঘর প্রভৃতি সংক্রান্ত বিধি আদৌ লিপিবদ্ধ নেই। আসলে ইসলামের মূলনীতিগুলো বুঝতে না পারার কারণেই এ জাতীয় প্রশ্ন মনে জাগে। মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য এই যে, কাফের অবাধ ও লাগামহীন স্বাধীনতা চায়। আর মুসলমান নিজেকে মূলত আল্লাহর বান্দাহ বা অনুগত দাস বলে স্বীকৃতি দেয়ার পর শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করে, যে ক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। কাপের তার যাবতীয় ব্যাপারে স্বরচিত আইন-কানুন ও নিয়মবিধি অনুসারে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে এবং খোদাপ্রদত্ত কোনো সনদ বা উৎসের আদৌ কোনো প্রয়োজন অনুভব করে না। পক্ষান্তরে মুসলমান তার প্রতিটি কাজে সর্বপ্রথম আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধান কি জানতে চেষ্টা করে। সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো নির্দেশ পেলে তাই মেনে নেয় ও তদনুসারে কাজ করে। সেখানে কোনো নির্দেশ না পেলে কেবলমাত্র সে ক্ষেত্রেই নিজে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আল্লাহ ও রসূলের কোনো নির্দেশ না দেয়া থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ঐ ক্ষেত্রে তাকে মতামত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হয়েচে এবং এ কারণেই সে স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রয়োগ করে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.