সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবী (সা)-এর প্রতি কুরআন ছাড়া অতিরিক্ত অহী নাযিল

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮৪ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! এ অহীকে তাড়াতাড়ি মুখস্থ করার জন্যে জিহবা নাড়িও না। তা মনে করিয়ে দেয়া ও পড়িয়ে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। আমরা যখন পড়তে থাকি তখন তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকো। পরে তার তাৎপর্য বুঝিযে দেয়াও আমাদের দায়িত্ব”।

এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এ থেকে এমন কয়েকটি মূলনীতি প্রমাণিত হয় যা ভালো করে বুঝে নিলে অতীত ও বর্তমানে অনেক বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত এথেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর শুধু কুরআনে সন্নিবেশিত অহীই নাযিল হতো না বরং তাছাড়াও অহীর মাধ্যমে তাঁকে কুরআন বহির্ভুত জ্ঞানও দান করা হতো। কেননা কুরআনের নির্দেশাবলী, তার সূক্ষ্ম ইশারা ইঙ্গিত এবং তার বিশেষ পরিভাষাসমূহের যে মর্মার্থ নবীকে বুঝানো হতো তা যদি কুরআনেই থাকতো তাহলে এ কথা বলার দরকার ছিল না যে, এর মর্ম বুঝানো বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দায়িত্ব আমার। কারণ সে ক্ষেত্রে ঐসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কুরআনেই পাওয়া যেত। সুতরাং স্বীকার করতেই হবে যে, কুরআনের যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আল্লাহর পক্ষ থেকে করা হতো তা অবশ্যই কুরআন বহির্ভূত। এভাবে কুরআন থেকে আমরা গোপন অহীর আর একটা প্রমাণ পেলাম।

দ্বিতীয়ত, কুরআনের মর্ম ও তার নির্দেশাবলীর যে ব্যাখ্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীকে জানানো হয়েছিল তা এ জন্যেই যে, তিনি তদনুযায়ী লোকদেরকে নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে কুরআন বুঝিয়ে দেবেন এবং তার নির্দেশাবলী অনুসারে কাজ করা শিখাবেন। এটা যদি উদ্দেশ্য না হতো এবং এ জ্ঞানকে কেবল নিজের মধ্যেই সীমিত রাখবেন বলে তাকে জানানো হতো, তাহলে তাহতো একটা নিরর্থক কাজ। কেননা নবুয়াতের দায়িত্ব পালনে তার দ্বারা কোনো সাহায্য হতো না। তাই এ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সংক্রান্ত জ্ঞান শরীয়াতের আইন প্রণয়নের উৎস বলে গণ্য হতে পারে না –এ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং সূরা আন নাহলের ৪৪ আয়াতে বলেছেনঃ

(আরবী***************************পিডিএফ ২৮৪ পৃষ্ঠায়)

“আমি তোমার কাছে এই কিতাব নাযিল করেছি এ উদ্দেশ্যে যে, তুমি মানুষকে তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেবে!’-[আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সপ্তম খণ্ড, আন নহল টীকাঃ৪০)] এ ছাড়া কুরআনের চার জায়গায় আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট করে বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর কাজ শুধু আল্লাহর কিতাব পড়ে শুনিয়ে দেয়া নয় –বরং এ কিতাবের শিক্ষা দেয়াও।–(সূরা আল বাকারা, ১২৯ ও ১৫১; সূরা আলে ইমরান, ১৬৪; সূরা জুমুয়া, ২ আয়াত)-[এসব আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমি ‘সুন্নাত কি আইনী হাইসিয়াত’ (সুন্নাতের আইনগত মর্যাদা) নামক গ্রন্থের ৭৪ থেকে ৭৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত করেছি-গ্রন্থকার]

এরপর কুরআনকে মেনে নিয়ে এমন কোনো লোক এ কথা স্বীকার না করে পারে না যে, রসূলুল্লাহ (সা) নিজের কথা ও কাজ দ্বারা কুরআনের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটাই কুরআনের বিশুদ্ধতম, বিশ্বস্ততম ও আসল সরকারী ব্যাখ্যা। কারণ সেটি তার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা নয়, বরং কুরআনের রচয়িতা আল্লাহ তায়ালারই শিখানো ব্যাখ্যা। এ ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে কুরআনের কোনো আয়াত বা শব্দের মনগড়া ব্যাখ্যা দেয়া বিরাট ধৃষ্টতাপূর্ণ কাজ –যা কোনো ঈমানদার মানুষ করতে পারে না।

তৃতীয়ত, কুরআন অধ্যয়নকারী মাত্রই জানে যে, এতে এমন অনেক কথা আছে যা একজন আরবী জানা মানুষ শুধু তার শব্দগুলো পড়েই বুঝতে পারে না যে, তার প্রকৃত মর্ম কি এবং তাতে যে নির্দেশ রয়েছে তা কিভাবে কার্যে পরিণত করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘সালাত’ (আরবী****) শব্দটিই ধরুন পবিত্র কুরআনে ঈমানের পর যে কাজটি সবচেয়ে বেশী তাকীদ সহকারে করতে বলা হয়েছে, তা এই ‘সালাত’ কিন্তু শুধুমাত্র আরবী অভিধানের সাহায্যে কেউ এর সঠিক মর্ম উদ্ধার করতে পারে না। কুরআনে একটির বারবার উল্লেক দেখে বড়জোর এটুকু বুঝা যায় যে, আরবী ভাষায় এ শব্দটাকে কোনো বিশেষ ব্যবহারিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সম্ভবত বিশেষ এক ধরনের কাজকেই ‘সালাত’ বলা হয়েছে –যা ঈমানদার লোকদের করতে হবে। কিন্তু শুধু কুরআন পড়ে কেউ নির্ণয় করতে পারবে না সেই বিশেষ কাজটা কি এবং তা কিভাবে করতে হয়। প্রশ্ন এই যে, আল্লাহ স্বয়ং কুরআন পাঠানোর সাথে সাথে যদি নিজের পক্ষ থেকে একজন শিক্ষক পাঠিয়ে তাকে এই পরিভাষাটির সঠিক মর্ম জানিয়ে না দিতেন এবং ‘সালাত’ সংক্রান্ত নির্দেশ বাস্তবায়নের পদ্ধতি তাকে ভালো করে বুঝিয়ে না দিতেন তাহলে শুধু কুরআন পড়ে দুনিয়ার কোনো দু’জন মুসলমানও কি ‘সালাত’ সংক্রান্ত নির্দেশ বাস্তবায়নের একটি মাত্র পদ্ধতি অবলম্বনে একমত হতে পারতো? অথচ আজ দেড় হাজার বছর ধরে মুসলমানরা বংশানুক্রমিকবাবে একই পদ্ধতিতে নামায পড়ে আসছে। দুনিয়ার সকল এলাকায় কোটি কোটি মুসলমান একইভাবে নামাযের হুকুম প্রতিপালন করে আসছে। এর একমাত্র কারণ এই যে, আল্লাহ তায়ালা রসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে শুধু কুরআনের শব্দগুলোই নাযিল করে ক্ষান্ত হননি, বরং সেই শব্দগুলোর মর্মও তাকে ভালোভাবে উপলব্ধি করিয়ে দেন। আর সেসব মর্ম রসূলুল্লাহ (সা) ঐসব লোকদেরকে বলে শিখিযে দিতে থাকেন যারা কুরআনকে আল্লাহ কিতাব এবং তাকে আল্লাহর রসূল বলে মেনে নিয়েছে।

চতুর্থত, কুরআনের শব্দগুলোর যে ব্যাখ্যা আল্লাহ তাঁর রসূলকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং রসূল তাঁর কাজ ও কথা দ্বারা উম্মতকে তার যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা জানার মাধ্যম হিসেবে আমাদের কাছে রসূলের সুন্নাহ ও হাদীস ছাড়া আর কিছুই নেই। হাদীস অর্থ নবীর কথা ও কাজ সংক্রান্ত সেসব বর্ণনা –যা বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে এবং বর্ণনাকরীদের নামোল্লেখসহ পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে পরবর্তীদের কাছে পৌছানো হয়েছে। আর সুন্নাহ বলতে সেই রীতি-পদ্ধতি বুঝায় যা নবীর কথা ও কাজের দ্বারা প্রদত্তশিক্ষার ফলে মুসলিম সমাজের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে কার্যকরভাবে চালু হয়েছে। সেই রীতি-পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পরম্পরার মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরগণ পূর্ববর্তী বংশধরের কাছ থেকে পেয়েছে এবং পরবর্তী বংশধরগণ পূর্ববর্তী বংশধরদের সমাজে তা চালু হতেও দেখেছে। জ্ঞানের এ মাধ্যমকে অস্বীকার করলে তার অর্থ দাঁড়াবে, আল্লাহ (আরবী*****) বলে কুরআমের মর্ম রসূলকে বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সে দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন (মায়াযাল্লাহ)। কারণ এ দায়িত্ব শুধু রসূলকে ব্যক্তিগতভাবে কুরআনের মর্ম বুঝানোর জন্যে আল্লাহ গ্রহণ করেননি, বরং রসূলের মাধ্যমে সমগ্র উম্মতকে বুঝানোর জন্যেই গ্রহণ করেছেন। তাই হাদীস ও সুন্নাহকে আইনের উৎসরূপে মানতে অস্বীকার করা মাত্রই ঐ দায়িত্ব পালনে আল্লাহর ব্যর্থতা মেনে নেয়া আপনা থেকেই অনিবার্য হয়ে উঠে (মায়াযাল্লাহ)। এর জবাবে কেউ কেউ বলেন, অনেক জাল হাদীসও তৈরী হয়েছে। আমি বলবো, জাল হাদীস তৈরী হওয়াটাই সবচেয়ে বেশী করে এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রাথমিকযুগে সমগ্র উম্মত রসূলুল্লাহ (সা)-এর কথা ও কাজ যে আইনের মর্যাদা দিত। তা না হলে যারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইত, তারা মিথ্যা হাদীস তৈরী করার প্রয়োজন অনুভব করবে কেন? যারা জালনোট তৈরী করে তারা বাজারে যে মুদ্রা তৈরী করার প্রয়োজন অনুভব করবে কেন? যারা জালনোট তৈরী করে তারা বাজারে যে মুদ্রা চালু আছে, সেই মুদ্রাই জাল করে। অচল মুদ্রা জাল করবে এমন আহম্মক কে আছে? তাছঅড়া যারা জাল হাদীসের ওজুহাত তোলেন তারা হয়তো জানেন না যে, যে মহা মানবের কথা ও কাজ আইনের মর্যাদা রাখে, তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো নকল হাদীস যাতে ছড়ানো সম্ভব না নয়, সেজেন্য মুসলিম জাতি প্রথম থেকৈই কটোর সতর্কতা অবলম্বন করেছে। আর ক্রমশ এ জাল ও নকল বাছাই করার ততই কড়া ব্যবস্থা নিয়েছেন। শুদ্ধ ও অশুদ্ধ হাদীস বাছাই করার এ বিদ্যা এমন এক অসাধারণ বিদ্যা, যা মুসলমান ছাড়া দুনিয়ার আর কোনো জাতি আজ পর্যন্ত উদ্ভাবন করতে পারেনি। এ বিদ্যা অর্জন না করে কেবল প্রাচ্যবিদদের ধোঁকায় বিভ্রনাত্ হয়ে যারা হাদীস ও সুন্নাহকে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেন, তাঁরা চরম হতভাগ্য এ অজ্ঞতাসুলভ ধৃষ্টতা দেখিয়ে তাঁরা যে ইসলামের কত বড় ক্ষতি সাধন করছেন তা তারা জানেন না।

কেবলা নির্ধারণ

কুরআন থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবীর কাছে কুরআন ছাড়াও অহীযোগে নির্দেশ আসতো এবং উভয় প্রকারের অহীও মেনে চলতে তিনি আদিষ্ট হয়েছিলেন।

(আরবী********************************পিডিএফ ২৮৬ পৃষ্ঠায়)

“তুমি এযাবত যে কেবলা মেনে চলতে, তা আমি এ জন্যেই নির্ধারণ করেছি যে, কে রসূলের আনুগত্য করে আর কে আনুগত্য করে না তা দেখে নেব”।–(সূরা আল বাকারাঃ ১৪৩)

এটাই সবচেয়ে সুস্পষ্ট আয়াত যা সবরকমের অপব্যাখ্যার মূল্যচ্ছেদ করে দেয়। নবীর কাছে কুরআন ছাড়া আর কোনো অহী আসতো না –এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় এ আয়াত থেকে। কেননা কা’বা শরীফকে কেবলা ঘোষণা করার আগে পর্যন্ত মুসলমানদের যে কেবলা ছিল, সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশ কুরআনে নেই। অথচ ইসলামের শুরুতেই যে নব মুহাম্মদ (সা) কেবলা নির্ধারণ করেছিলেন এবং প্রায় চৌদ্দ বছর পর্যন্ত তিনি ও সাহাবীগণ সেদিকেই মুখ করে নামায পড়তে থাকেন, সে কথা অনস্বীকার্য। চৌদ্দ বছর পর আল্লাহ তায়ালা সূরা আল বাকারার এ আয়াতে নবীর এ পদক্ষেপকে সমর্থন করেন এবং ঘোষণা করেন যে, ঐ কেবলা আমি নির্ধারণ করেছিলাম। আমি রসূলের মাধ্যমে ঐ কেবলা নির্ধারণ করেছিলাম এ জন্যে, কে রসূলের কথামত চলে আর কে চলে না তা আমি দেখতে চেয়েছিলাম। এ থেকে একদিকে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর কুরআন ছাড়াও অহী নাযিল হতো। অপর দিকে এও জানা জেল যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর যেসব নির্দেশের উল্লেখ কুরআনেনেই, সেসব নির্দেশও মুসলমানরা মেনে চলতে আদিষ্ট। এমনকি রসূলের প্রতি মুসলমানদের ঈমান আছে কি নেই, তার পরীক্ষাও আল্লাহ এভাবেই করেন যে, রসূলের মাধ্যমে যে নির্দেশ দেয়া হয় তা তারা মানে কিনা। এখন যদি ‘মেনে নেয়া হয় যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর কুরআন ছাড়া আর কোনো অহী নাযিল হতো না, তাহলে কেবলা সংক্রান্ত সেই নির্দেশ তিনি কিবাবে পেলেন? এ থেকে কি বুঝা যায় না যে, কুরআনে নেই এমন নির্দেশও তিনি পেতেন?

মক্কা বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী

রসূলুল্লাহ (সা) মদিনায় স্বপ্ন দেখলেন যে, তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছেন এবং কা’বা শরীফের তাওয়াফ করছেন। তিনি সাহাবীদেরকে সে কথা জানালেন এবং চৌদ্দশ সাহাবীকে সাথে নিয়ে ওমরাহ করতে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মক্কার কাফেররা হোদায়বিয়া নামক স্থানে তাঁর গতিরোধ করলো। পরিণামে হলো হোদায়বিয়ার সন্ধি। কিছু সাহাবীর মনে দেখা দিল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। হযরত ওপর (রা) তাঁদের পক্ষ থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আমাদেরকে জানাননি যে, আমরা মক্কায় প্রবেশ করবো এবং ওমরাহ করবো?

নবী বললেন, “এ যাত্রায়ই তা হবে –এ কথা কি বলেছি?

এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেনঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৮৭ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ তাঁর রসূলকে নিশ্চয়ই সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তোমরা ইনশাআল্লাহ অবশ্যই শান্তির সাথে মাথা কামিয়ে ও চুল ছেঁটে নির্ভয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে। তোমরা যা জানতে না আল্লাহ তা জানতেন। তাই তার আগেই তিনি এ নিকটবর্তী বিজয় (হোদায়বিয়ার সন্ধি) দান করলেন”।–(সূরা আল ফাতহঃ ২৭)

এ থেকে বুঝা যায় যে, স্বপ্নের মাধ্যমে নবীকে মক্কায় প্রবেশের পদ্ধতি জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মক্কার দিকে যাবেন। কাফেররা তাঁকে বাধা দেবে এবং শেষ পর্যন্ত সন্ধি হবে, সেই সন্ধিসূত্রে পরবর্তী বছর ওমরাও করা যাবে এবং ভবিষ্যতের বিজয়ের পথও খুরে যাবে। এ থেকেও কি বুঝা যায় না যে, কুরআন ছাড়া অন্যান্য উপায়েও তিনি পথনির্দেশ লাভ করতেন?

গোপন আলাম

নবী করীম (সা) তার এক বিবিকে গোপনে একটা কথা বললে তিনি সে কথা অন্যদেরকে বলে দেন। নবী তাঁর স্ত্রীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমি যে কথাটা অন্যদেরকে বলে দিয়েছি, তা আপনি নি করে জানলেন? নবী জবাব দেন, যিনি মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ, তিনিই আমাকে জানিয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী********************************পিডিএফ ২৮৮ পৃষ্ঠায়)

“এবং যখন নবী (সা) তার এক বিবিকে গোপনে একটা কথা বললেন এবং সে বিবি সে কথা অন্যদেরকে জানিয়ে দিলেন এবং তারপর আল্লাহ যখন নবীকে ব্যাপারটা সম্পর্কে অবহিত করলেন, তখন নবী সে বিবিকে তাঁর ত্রুটির একটা অংশ জানালেন এবং অপরটা এড়িয়ে গেলেন। নবী যখন তার বিবিকে তাঁর ত্রুটির কথা জানালেন তখন তিনি বললেন, আপনাকে একথা কে জানালো? নবী বললেন, মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহই আমাকে জানিয়েছেন”।–(সূরা আত তাহরীমঃ ৩)

যে অহীর মাধ্যমে আল্লাহ নবীকে তাঁর বিবির গোপন কথা ফাঁস করার বিষয় অবহিত করেছিলেন, সে অহী কুরআনের কোথাও নেই। যদি না থাকে তাহলে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ রসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কুরআন ছাড়াও অনেক পয়গাম পাঠাতেন।

যয়নবের বিয়ে

নবী (সা)-এর পালকপুত্র যায়েদ বিন হারেসা (রা) আপন বিবিকে তালাক দেন এবং তারপর নবী তার তালাক দেয়া বিবিকে বিয়ে করেন। এতে মুনাফিক ও বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে এক মারাত্মক প্রচারাভিযান শুরু করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে। আল্লাহ সূরা আহযাবের একটা গোটা রুকূ’তে এসব অভিযোগের জবাব দেন। তিনি জানিয়ে দেন, আমার নবী এ বিয়ে নিজ উদ্যোগে করেননি, বরং আমার হুকুমে করেছেন।

(আরবী********************************পিডিএফ ২৮৮ পৃষ্ঠায়)

“অতপর যায়েদ যখন তার বিবিকে তালাক দিল, তখন আমি তাকে তোমার সাতে বিয়ে দিলাম, যাতে করে পালন পুত্রের তালাক দেয়া বিবিকে বিয়ে করতে মু’মিনদের কোনো দ্বিধা না থাকে”।–(আয়াতঃ ৩৭)

এ আয়াতে যে ঘটনার উল্লেক রয়েছে, আমি তা আগেই বলেছি। এখন প্রশ্ন হলো, এ ঘটনার আগে আল্লাহ তায়ালা যায়েদের তালাক দেয়া বিবিকে বিয়ে করার যে নির্দেশ হযরত (সা)-কে দেন, তা কুরআনের কোথাও আছে?

গাছ কাটার অনুমতি

রসূলুল্লাহ (সা) বনু নাযীরের ক্রমাগত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে অতিষ্ঠ হয়ে মদীনা-সংলগ্ন তাদের বস্তিগুলো অবরোদ করেন। অবরোধ চলাকালে ইসলামী বাহিনী আশপাশের বাগ-বাগিচার বহু গাছ কেটে ফেলেন, যাতে সৈন্য চলাচলের জন্যে রাস্তা পরিস্কার হয়। এতে বিরোধীরা হৈ-চৈ করে যে, মুসলমানরা ফলবান গাছ কেটে বাগান নষ্ট করে দুনিয়ায় অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এর জবাবে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৮৯ পৃষ্ঠায়)

“তোমরা যেসব খেজুরের গাছ কেটেছ আর যা কাটনি, সবই আল্লাহর অনুমতিক্রমে”।

কেউ কি বলতে পারেন, গাছ কাটার এ অনুমতি কুরআনের কোন আয়াতে নাযিল হয়েছে?

বদর যুদ্ধের পূর্বেকার একটি প্রতিশ্রুতি

বদর যুদ্ধের অবসানের পর যখন গণিমতের মাল বন্টনের প্রশ্ন দেখা দেয়, তখন সূরা আনফাল নাযিল হয় এবং গোটা যুদ্ধের পর্যালোচনা করা হয়। রসূলুল্লাহ (সা) যখন যুদ্ধের জন্যে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, তখন থেকেই পর্যালোচনা শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৮৯ পৃষ্ঠায়)

“যে সময় আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন যে, দু’দলের মধ্যে (অর্থাৎ বণিক দল ও কুরাইশ সেনাদল) একটি দল তোমাদের হাতে আসবে এবং তোমরা চেয়েছিলে যে, দুর্বল দলটি (বণিক দল) তোমাদের হস্তগত হোক। অথচ আল্লাহ চেয়েছিলেন তার বাণীর দ্বারা সত্যকে সত্য করে দেখাতে এবং কাফেরদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে”।–(সূরা আল আনফালঃ ৭)

এখন সমগ্র কুরআনের মধ্যে এমন একটি আয়াত কি চিহ্নিত করা যায় যেখানে আল্লাহ তায়ালা বদরগামী মুসলমানদের কাছে এ ওয়াদা করেছেন যে, দু’টি দলের মধ্যে একটির ওপর তাদেরকে বিজয়ী করবেন?

মুসলমানদের সাহায্য প্রার্থনার জবাব

এ বদর যুদ্ধের পর্যলোচনা প্রসঙ্গে পরবর্তী একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৮৯ পৃষ্ঠায়)

“যখন তোমরা কাতরভাবে সাহায্য প্রার্থনা করছিলে, তখন আল্লাহ তার জবাবে বললেন, আমি তোমাদের সাহায্যের জন্যে পর পর এক হাজার ফেরেশতা পাঠাচ্ছি”।–(সূরা আল আনফালঃ ৯)

আপনারা কি বলতে পারেন মুসলমানদের ফরিয়াদের এ জবাব কুরআনের কোন আয়াতে নাযিল হয়েছিল।

আপনারা (হাদীসে অমান্যকারীগণ) মাত্র একটা উদাহরণ চেয়েছিলেন। আমি কুরআন শরীফ থেকে সাতটি উদাহরন পেশ করলাম। এগুলো থেকে অকাট্যভাবে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, নবীর কাছে কুরআন ছাড়াও অহী নাযিল হতো। এরপর আর কোনো আলোচনা করার আগে আমি দেখতে চাই, আপনারা সত্যের কাছে মাথা নত করতে প্রস্তুত কি না?

আযান ও জুময়ার নামায

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯০ পৃষ্ঠায়)

“হে সেসব লোকেরা, যারা ঈমান এনেছ। জুময়ার দিন যখন নামাযের জন্যে ডাকা হয় তখন যিকরের দিকে ছুটে যাও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও”।–(সূরা জুমুয়াঃ ৯)

এ আয়াতটিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, এতে নামাযের জন্যে মানুষকে ডাকার উল্লেখ রয়েচে। দ্বিতীয়ত, এতে একটি বিশেষ নামাযের জন্যে ডাকার কথা বলা হয়েছে –যা কেবল জুময়ার দিনই পড়তে হয়। তৃতীয়ত, এ আয়াতে এ কথা বলা হয়নি যে, তোমরা নামাযের জন্যে ডাক এবং জুময়ার দিন একটা বিশেষ ধরনের নামায পড়। বর্ণনাভঙ্গী ও পূর্বাপর বর্ণনাধারা থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, লোকেরা নামাযের জন্যে ছুটে যেতে শৈথিল্য দেখাতো এবং বেচাকেনায় মগ্ন থাকতো। এ জন্যে আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে ঐ ডাক ও ঐ বিশেষ নামাযের গুরুত্ব উপলব্ধি করানো উদ্যোগ নেন, যাতে করে লোকেরা তাকে একটা ফরয কাজ মনে করে তাড়াতাড়ি তা সম্পন্ন করতে চলে যায়। এ তিনটি বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে যে মৌল সত্যটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তায়ালা রসূলুল্লাহ (সা)-কে কুরআনে নাযিল হয়নি এমন কতগুলো নির্দেশও নাযিল করতেন এবং সেসব নির্দেশ কুরআনে নাযিল হওয়া নির্দেশাবলীর মতই পালনীয় ছিল।

নামাযের এ ডাক হলো আযান –যা সারা দুনিয়ার মসজিদগুলো থেকে প্রতিদিন পাঁচবার ধ্বনিত হয়ে থাকে। কিন্তু কুরআনের কোথাও এ আযানের বাক্যগুলো নেই, আর প্রতিদিন পাঁচবার আযান দিতে হবে এমন নির্দেশও কোথাও নেই। এটা নবীর নির্দেশেই চালু হয়েছে। কুরআনে দু’জায়গায় সূরা জুময়ার এ আয়াতে এবং সূরা আল মায়েদার ৩৮তম আয়াতে একে সমর্থন করা হয়েছে। জুময়ার এ বিশেষ নামাযটি –যা দুনিয়ার সকল মুসলমান আদায় করে থাকেন –এ সম্পর্কেও কুরআনের কোথাও কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি এবং এর সময় পদ্ধতিও জানানো হয়নি। এর সময় এবং পদ্ধতি নবী করীম (সা) নিজেই নির্ধারণ করেছেন। কুরআনের আলোচ্য আয়াতটি কেবল এর অপরিহার্যতা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার জন্যেই নাযিল হয়েছে। এ সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ সত্ত্বেও যে ব্যক্তি বলে যে, কেবলমাত্র কুরআনে বর্ণিত নির্দেশই শরীয়াতের নির্দেশ, সে ব্যক্তি আসলে সুন্নাহ ও হাদীসই শুধু অস্বীকার করে না, বরং কুরআনও অস্বীকার করে।

নামাযের নিয়ম-পদ্ধতি

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯১ পৃষ্ঠায়)

“সেই ব্যক্তিকে দেখেছ কি যে, এক বান্দাকে তখন বাধা দেয় যখন সে নামায পড়তে থাকে”।–(সূরা আল আলাকঃ ৯-১০)

এখানে বান্দা অর্থ স্বয়ং রসূলুল্লাহ (সা)। কুরআনের একাধিক জায়গায় এভাবে নবী মুহাম্মদ (সা)-কে বান্দা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমনঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯১ পৃষ্ঠায়)

“পবিত্র সেই সত্তা, যিনি  আপন বান্দাকে এক রাতে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যান”।–(সূরা বনী ইসরাঈলঃ ১)

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯১ পৃষ্ঠায়)

“সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্যে যিনি আপন বান্দার ওপর কিতাব নাযিল করেছেন”।–(সূরা আল কাহাফঃ ১)

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯১ পৃষ্ঠায়)

“আর যখন আল্লাহর বান্দা তাকে ডকার জন্যে দাঁড়ালো, তখন লোকেরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করলো”।–(সূরা আর জ্বিনঃ ১৯)

এ আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর রসূলকে যে বান্দা বলে উল্লেখ করেছেন সেটি তার এক বিশেষ স্নেহসূচক বর্ণনাভঙ্গী। এ আয়াতগুলো থেকে আরো জানা যায় যে, আল্লাহ রসূলুল্লাহ (সা)-কে নবুয়াত দান করার পর নামায পড়ার নিয়ম-পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছিলেন। সে নিয়ম-পদ্ধতি উল্লেখ কুরআনের কোথাও নেই্ কাজেই এখানে আবারও প্রমাণিত হলো যে, রসূলুল্লাহর কাছে শুধু কুরআনের অহীই নাযিল হতো না, বরং কুরআনে নেই এমন অনেক জিনিসও তাকে অহীর মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হতো।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.