সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ৭ – রসূলের মানবত্ব

নবীত্ব ও মানবত্ব

 

জাহেলী দৃষ্টিভঙ্গীঃ পয়গম্বর মানুষ হতে পারে না

প্রত্যেক যুগেই অজ্ঞ লোকেরা এরূপ ভুল ধারণা পোষণ করতো যে, মানুষ নবী হতে পারে না। তাই যখনই কোনো নবী এসেছেন তখন তাকে পানাহার, স্ত্রী-পুত্র-পরিজনসহ রক্ত-মাংসের শরীর নিয়ে জীবন যাপন করতে দেখে সিদ্ধান্ত করে যে, ইতি নবী নন, মানুষ; আবার তার ইন্তিকালের বেশ কিছুকার পর তাঁর ভক্ত-অনুরক্তদের মধ্যে এমন কিছু লোক জন্মগ্রহণ করে যারা প্রচার করতে শুরু করে যে, তিনি মানুষ ছিলেন না। কেননা তিনি নবী ছিলেন। এভাবে কেউ নবীকে খোদা, কেউ বা খোদার পুত্র, আবার কেউ খোদার অবতাররূপে বরণ করে নিয়েছে। মোটকথা একই ব্যক্তি কি করে নবী ও মানুষ –দুই-ই হতে পারে, তা ছিল লোকদের বুদ্ধির অগম্য।

মক্কার মুশরিকদের দৃষ্টিভঙ্গী

প্রথমত মক্কাবাসীরা মানুষের নবী হওয়াটাই আশ্চর্যজনক মনে করতো। তারা ভাবতো, আল্লাহর বাণী বহন করে আসতে হলে ফেরেশতা আসবে, রক্ত-মাংসের মানুষ আসতে পারে না –যার বেঁচে থাকার জন্যে খাদ্যের প্রয়োজন। তবুও যদি মানুষকে রসূল করে পাঠানো হয়ে থাকে তবে তার রাজা-বাদশাহ বা দুনিয়ার মহান ব্যক্তিদের মতো কোনো সত্তা হওয়া উচিত ছিল –যাকে এক নজর দেখার জন্যে মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকবে এবং যার সাক্ষাৎ লাভ অতি কষ্টসাধ্য ও দুর্লভ ব্যাপার হবে। এমন তো হতে পারে না যে,  যে ব্যক্তি জুতা পায়ে খটাখট শব্দ করে বাজারে চলাফেরা করবে তার মতো একজন সাধারণ মানুষকে খোদার পয়গম্বর বানানো হবে। তারা ভাবতো, প্রত্যেক পথচারী প্রতিদিন অবাধে যার সাক্ষাৎ পায়, যার মধ্যে কোনো দিক দিয়েই কোনো রকম অসাধারণত্ব কেউ দেখতে পায় না, তাকে কে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে? অন্য কথায়, তাদের মতে নবীর প্রয়োজন যদি আদৌ থেকে তঅকে, তবে তা সাধারণ মানুষের হেদায়াতের জন্যে নয়, বরং মানুষকে অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড দেখাবার এবং জারিজুরি দেখিয়ে তাদেরকে প্রভাবিত করার জন্যে। অথবা নিদেনপক্ষে একজন ফেরেমতা তার সাথে থাকবে যে হর-হামেশা একটা চাবুক হাতে নিয়ে লোকদের বলবে, “এ ব্যক্তির কথা মেনে চল, নইরে এখনই আল্লাহর আযাব নামিয়ে দিচ্ছি”। তাদের মতে এ তো বড় আশ্চর্যের ব্যাপার যে, বিশ্বস্রষ্টা একজন মানুষকে নবুয়াতের মত বিরাট পদমর্যাদা দিয়ে একেবারে একাকী পাঠিয়ে দিলেন, আর সে লোকের অন্ততপক্ষে রসূলের ভালো রোজগারের একটা ব্যবস্থা করে দেয়া আল্লাহর উচিত ছিলো। আল্লাহর রসূলের আর্থিক অবস্থা আমাদের একজন মামুলী সরদারে চেয়েও শোচনীয় হবে, এ কেমন কথা! যার হাতে নেই টাকা কড়ি, যার কপালে জোটেনি একটা ফলমূলের বাগান, সে কি না দাবী করে আমি বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর নবী।

নবুয়াত ও খোদা-প্রেরিত সম্পর্কে জাহেলী ধ্যান-ধারণা

অজ্ঞ লোকদের মধ্যে সর্বদা এ ভ্রান্ত ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, যে ব্যক্তি খোদা কর্তৃক প্রেরিত হবেন, তিনি অবশ্যই মানব ঊর্ধ্ব কোন সত্তা হবেন। তাঁর দ্বারা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হওয়া উচিত। তিনি এক ইশারায় পাহাড়কে সোনা বানিয়ে দিবেন। তিনি হুকুম করবেন আর অমনি পাহাড় সোনা হয়ে যাবে। মানুষকে অতীত ও ভবিষ্যতের সব অবস্থা তার জানা থাকবে। তিনি বলে দেবেন হারানো জিনিস কোথায় আছে, রোগী মরবে না বাঁচবে, গর্ভবতীর পেটে পুত্র অথবা কন্যা, নয় অথবা মাদী আছে। তারপর তাকে হতে হবে মানবীয় দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্ব্ যার ক্ষুৎ পিপাসা লাগে, ঘুমোতে হয়, যার স্ত্রী-পুত্র-পরিজন আছে, যার কেনাবেচা করে প্রয়োজন মেটাতে হয়, যার ধার-কর্জ করার দরকার পড়ে এবং যাকে অভাব-দৈন্য বিব্রত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়, সে খোদার প্রেরিত পুরুষ কিবাবে হতে পারে? এ ধরনের ধ্যান-ধারণা হযরত রসূলে করীম (সা)-এর দাবী শুনতো তখন তার কাছ থেকে অদৃশ্য জগতের তত্ত্ব ও তথ্য জাততে চাইত এবং অলৌকিক ঘটনাবলীর দাবী করতো। তাকে সাধারণ মানুষের মত দেখে বলতো, ইনি কেমন নবী, যিনি পানাহার করেন, স্ত্রী ও সন্তানাদি নিয়ে গৃহসংসার করেন –এবং হাটবাজারে যত্রতত্র চলাফেরা করেন।

নবীর মানুষ হওয়া অপরিহার্য কেন?

আল্লাহ তায়ালা নবীর ওপর তাঁর বাণী (ইলহামী পয়গাম) প্রেরনের তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯৬ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! আমি এ বানী তোমার ওপর এ জন্যে নাযিল করেছি যাতে করে তুমি মানুষের উদ্দেশ্যে প্রেরিত অহীর ব্যাখ্যা করে তাদের বুঝিয়ে দিতে”।–(সূরা আন নাহলঃ ৪৪)

অহী প্রেরণের এ উদ্দেশ্য সফল হবার জন্যে একজন মানুষের নবী হওয়া অপরিহার্য ছিল। আল্লাহর বাণী ফেরেশতার মাধ্যমেও পাঠানো যেত। এমনকি ছাপানো বইয়ের আকারে সরাসরি প্রত্যেক মানুষের কাছেও পাঠানো যেত। কিন্তু মহাজ্ঞানী, অসীম দয়ালু এবং মহিমান্বিত প্রতিপালক আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে তাঁর বাণী পাঠিয়েছেন, শুধু মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দিয়েই সে উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারে না। সে জন্যে প্রয়োজন ছিল একজন সুযোগ্য মানুষের –যিনি সাথে করে ঐ বাণী নিয়ে আসবেন এবং অল্প অল্প করে মানুষকে পড়ে শোনাবেন। যে ভালো করে বুঝতে না পারে তাকে বুঝিয়ে দেবেন। যার মনে কোনো সংশয় থাকে তিনি তা দূর করবেন। যার মনে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ থাকে তিনি তার জবাব দেবেন। যে তার কথা মানবে না এবং বিরোধিতা ও বাধাদান করবে, তার মোকাবিলায় তিনি এমন আচরণ করে দেখাবেন যা একজন আল্লাহর বাণী বহনকারীর পক্ষে শোভা পায়। যারা মেনে নেয় তাদেরকে জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগ সম্পর্কে নির্দেশ দেন। নিজের জীবনকে তাদের সামনে আদর্শ হিসেবে তুরে ধরবেন এবং তাদেরকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে সারা দুনিয়ার সামনে এমন একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠিত করে দেখাবেন, যার সামগ্রিক বিধি ব্যবস্থা উক্ত আল্লাহর বাণীর বাস্তব ব্যাখ্যারূপে গণ্য হবে।

মানুষের হেদায়াতের জন্যে মানুষই নবী হতে পারে

বাণীবাহকের (পয়গাম্বর) কাজ শুধু এতটুকু নয় যে, তিনি এসে শুধু তার বাণী শুনিয়ে দিবেন। বরং তার কাজ এটাও যে, তিনি যে বাণীর আলোকে মানব জীবনের সংস্কার-সংশোধন করবেন সে বাণীর মূলনীতিসমূহ মানুষের সকল অবস্থার ওপর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করে তাকে দেখাতে হয়। তাঁর জীবনেও সেসব মূলনীতি বাস্তব বহিঃপ্রকাশ হতে হবে। যেসব অসংখ্য রকমারী মানুষ তাঁর বাণী শুনতে ও বুঝতে চেষ্টা করে তাদের মনের বহু জটিল প্রশ্নের সমাধান তাঁকে বের করে দিতে হয়। যারা তাঁর দাওয়াত শোনে ও মানে তাদেরকে সংগঠিত করে প্রশিক্সণ দিতে হয় যাতে করে ঐ বাণীর শিক্ষা অনুসারে একটা সমাজ গড়ে উঠতে পার্ যারা তার দাওয়াতকে অমান্য করে, বিরোধিতা করে ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাদের বিরুদ্ধে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়, যাতে করে বিকৃত ও ভ্রষ্টতার সমর্থকদেরকে পরাজিত করা যায় এবং যে সংস্কার সংশোধনের কাজে আল্লাহ নবীকে পাঠিয়েছেন তা সম্পন্ন করা যায়। এসব কাজ যখন মানুষের সমাজেই করতে হবে, তখন তার জন্যে মানুষ ছাড়া আর কোন্ প্রাণী পাঠানো যেতে পারে? ফেরেশতা পাঠানো হরে তিনি বড় জোর আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিতেন এবং তারপর চলে যেতেন। মানুষের মধ্যে মানুষের মত বাস করে এবং মানুষের মত কাজ করে মানুষের জীবনে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী সংস্কার-সংশোধনের কাজ করে দেখানো ফেরেশতার সাধ্যাতীত। এ কাজের জন্যে একজন মানুষই সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচিত হতে পারে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.