সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবীদের মানবত্ব

-[এখানে মাত্র কয়েকজন নবীর উল্লেখ করা হয়েছে। -যারা মানুষ ছিলেন বলে কুরআনের স্পষ্টোক্তি করা হয়েছে কিংবা গ্রন্থাকার তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।–(সংকলকদ্বয়)]

হযরত আদম (আ) মানুষ ছিলেন

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯৮ পৃষ্ঠায়)

“আমি প্রথমে তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করলাম, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করলাম। অতপর ফেরেশতাদেরকে হুকুম করলাম, আদমকে সিজদা করো”।–(সূরা আল আরাফঃ ১১)

ওপরে যা বলা হলো তার পরিস্কার অর্থ এইঃ

“আমি প্রথমে তোমাদের সৃষ্টির পরিকল্পনা করলাম এবং সৃষ্টির উপাদান তৈর করলাম। তারপর সেই উপাদানকে মানবীয় আকৃতি দান করেছি। অতপর যখন একজন জীবন্ত মানুষ হিসেবে আদম (আ) অস্তিত্ব লাভ করলো তাকে সিজদা করতে ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলাম”।

আদম (আ)-কে যে সিজদা করানো হলো তা আদম হওয়ার কারণে নয়,বরং মানবজাতির প্রতিনিধি হিসেবে, কুরআনের অন্যান্য স্থানে এ আয়াতের এ ব্যাখ্যাই দেয়া হয়েছে। যেমন সূরা সাদের ৫ম রুকূতে আছেঃ

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯৮ পৃষ্ঠায়)

“সে সময়টার কথা ভেবে দেখ যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি মাটি দিয়ে একজন মানুষ তৈরী করার সিদ্ধান্ত করেছি। যখন আমি তাকে পুরাপুরি তৈরী করে ফেলব আমার রূহগুলোর মধ্য থেকে একটা তার মধ্যে ফুঁকে দিব তখন তোমরা তার সামনে সিজদায় পড়ে যাবে”।–(সূরা সাদঃ ৭১-৭২)-[এ বর্ণনা থেকে থেকে প্রমাণিত হলো যে, প্রথম নবীই মানুষ ছিলেন –এটা ইসলামের সর্ববাদীসম্মত আকীদা।–(গ্রন্থকার)]

হযরত নূহ (আ) মানুষ ছিলেন

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯৮ পৃষ্ঠায়)

“(হযরত নূহ) বললেন, আমি তোমাদের বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে এবং আমি এও বলি না যে, আমি অদৃশ্য জগতের জ্ঞান রাখি। আমি এমন দাবীও করি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি এ কথাও বলতে পারি না যে তোমাদের চোখে যারা ঘৃণ্য আল্লাহ তাদেরকে কখনোই কেনো কল্যাণ দান করেননি। তাদের অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন। আমি এমন কথা বললে যালেমের মধ্যে গণ্য হবো”।–(সূরা হুদঃ ৩১)

বিরোধীরা যে বলতো, তুমি তো আমাদেরই মত একজন মানুষ, তারই জবাবে এ কথা বলা হয়েছে। হযরত নূহ বলেন, সত্যি আমি একজন মানুষই বটে। আমি মানুষ ছাড়া অন্যকিছু হওয়ার দাবী কি কখনো করেছি যে, তোমরা এসব আপত্তি তুলছ? আমার কেবল অন্যকিছু হওয়ার দাবি কি কখনো করেছি যে, তোমরা এসব আপত্তি তুলছ? আমার কেবল এটুকুই দাবী যে, আল্লাহ আমাকে জ্ঞান ও কর্মের সোজা ও সঠিক পথ দেখিয়েছেন। এ কথার সত্যতা তোমরা যেভাবে খুশী যাচাই করে দেকে নাও। কিন্তু এটা কেমন যাঁচাই যে, তোমরা কখনো আমাকে গায়েবী খবরাদি জিজ্ঞেস করো, কখনো এমন সব উদ্ভট জিনিস চাও যেন আল্লাহর ধনভাণ্ডারের সমস্ত চাবিকাঠি আমার হাতেই রয়েছে। আবার কখনো আমার মানুষের মত আহার বিহার নিয়ে প্রশ্ন তোল, যেন আমি ফেরেশতা হওয়ার দাবী করেছি। যে ব্যক্তি আকীদা-বিশ্বাস, আখলাক ও সমাজ ব্যবস্থার সঠিক পথ দেখবার দাবী করে, তাকে ঐসব ব্যাপারে যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস করতে পার। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে, অমুকের গর্ভবতী মহিষী নর, না মাদী প্রসব করবে, তোমরা তাই জিজ্ঞেস করছ। মনে হয় যেন মানব জীবনের জন্যে নির্ভুল নৈতিক ও তামাদ্দুনিক মূলনীতি নির্ণয়ের সাথে মহিষীর গর্ভধারণের কোনো সম্পর্ক আছে।

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯৯ পৃষ্ঠায়)

“তাঁর (হযরত নূহের) জাতির যেসব সর্দার তাঁকে মানতে অস্বীকার করেছিল তারা বললো, এ লোকটি তোমাদের মতই একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। তোমাদের ওপর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করাই তার উদ্দেশ্য। আল্লাহর কাউকে পাঠাতে হলে ফেরেশতাই পাঠাতেন। মানুষ নবী হয়ে আসবে এমন কথা আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমলে কখনো শুনিনি। না ওসব কিছু নয়। আসলে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আরো কিছুদিন দেখে নাও (হয়তো মাথা ঠিক হয়ে যাবে)”।–(সূরা আল মু’মিনুনঃ ২৪-২৫)

মানুষ নবী হতে পারে না –সকল পথভ্রষ্ট লোকদের এ এক সাধারণ ধারণা। এ জন্যেই কুরআন বারবার এ জাহেলী ধারনার উল্লেখ করে তা খতম করেছে। সে জোর দিয়ে বলেছে যে, সকল নবীই মানুষ ছিলেন এবং মানুষের জন্যে নবী মানুষেরই হওয়া উচিত।

(আরবী********************************পিডিএফ ২৯৯ পৃষ্ঠায়)

“জবাবে তাঁর (হযরত নূহের) জাতির নেতৃস্থানীয় যেসব সর্দার তাকে মানতে অস্বীকার করেছিল –তারা প্রত্যুত্তরে বললো আমাদের দৃষ্টিতে তুমি তো আমাদের মতই একজন মানুষ। আর আমরা দেখছি যে, আমাদের মধ্যে যারা নিম্ন শ্রেণীর লোক, কেবল তারাই না বুঝে-শুনে তোমার আনুগত্য গ্রহণ করেছে”।–(সূরা হুদঃ ২৭)

এটা সেই পুরানো জাহেলী ওজর-আপত্তি যা মক্কার লোকেরা মুহাম্মদ (সা)-এর বেলায় উত্থাপন করে বলতো, যে ব্যক্তি আমাদেরই মত একজন সাধারণ মানুষ। খায়-দায় ও চলাফেরা করে ঘুমায়-জাগে এবং পরিবার-পরিজন রাখে। সে যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী হয়ে এসেচে, তা আমরা কিভাবে মেনে নেব।

(আরবী********************************পিডিএফ ৩০০ পৃষ্ঠায়)

“(হযরত নূহ (আ) বললেন,) তোমরা কি আশ্বর্যবোধ করছো যে, তোমাদের কাছে তোমাদেরই আপন জাতির এক লোকের মাধ্যমে তোমাদের প্রভুর স্মারকবাণী এলো যাতে তোমাদেরকে সতর্ক করে দেয়া যায়, তোমরা ভ্রান্ত পথ থেকে বেঁচে যেতে পার –এর তোমরা অনুগৃহীত হতে পার?-(সূরা আল-আ’রাফঃ ৬৩)

হুদ (আ) মানুষ ছিলেন

(আরবী********************************পিডিএফ ৩০০ পৃষ্ঠায়)

“তাঁর (হযরত হুদের) জাতির যেসব নেতৃস্থানীয় লোক কুফরী করেছিল, আখেরাতকে মিথ্যা মনে করেছিল এবং যাদেরকে আমি পার্থিব জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি দিয়েছিলাম, তারা বললো, এ লোকটি তোমাদেরই মত একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। তোমরা যা খাও সে ও তাই খায়, তোমরা যা পান করো সে ও সাই পান করে। এখন তোমরা যদি তোমাদেরই মত একজন মানুষের আনুগত্য মেনে নাও, তাহলে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।–(সূরা আল মু’মিনুনঃ ৩৩-৩৪)

কিছু লোক ভুল বুঝেছে যে, এসব তারা পরস্পরে বলাবলি করতো। না, তা নয়। সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করে তাদের নেতারা এসব কথা বলতো। নেতাদের আশঙ্কা ছিল যে, নবীর পবিত্র ব্যক্তিত্ব এবং মনোমুগ্ধকর কথাবার্তায় লোকেরা হয়তো প্রভাবিত হয়ে পড়বে এবং তারা প্রভাবিত হয়ে পড়রে আমরা কাদের সর্দারি চালাব? তাই তারা এভাবে বক্তৃতা দিয়ে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে লাগলো। তারা বলতো ওসব-টবুয়াত আসলে কিছু নয়। নিছক ক্ষমতার লোভ ও গদির মোহে সে এসব কথা বলছে। ভায়েরা! তোমাদের মতই সে রক্ত মাংসের মানুষ। তার মধ্যে আর তোমাদের মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। তা যখন নেই, তখন সে কেন নেতা হবে, আর তোমরাই বা কেন তার আনুগত্য করতে যাবে? এসব কথাবর্তার মধ্যে এ ব্যাপারটা যেন অবিমম্বাদিতভাবে স্বীকৃত ছিল যে, তারা যে তাদের নেতা ও সরদার আছে। তা তাদেরই হওয়া উচিত। তাদের ধারণা –তারা যে রক্ত মাংসের মানুষ এবং খানাপিনা করে সে বিষয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ নেই। কেননা ওটা তো আপনা থেকেই বহাল আছে এবং তা এক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। এখন প্রশ্ন হলো –এ নতুন নেতৃত্বের ব্যাপারে যা এখন প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যাচ্ছে। পরবর্তীকালেও যারা কোনো নবাগত লোকের বিরুদ্ধাচরণ করেছে, একমাত্র ‘ক্ষমতার মোহ’ এ অভিযোগ তুলেই তা করেছে। নবাগত লোকের মধ্যে এ জিনিসটির অস্তিত্ব যখনই অনুভব করেছে বা অস্তিত্ব থাকার সন্দেহ করেছে, তখন তাদের কথাবার্তায় অবিকল ঐ সরদারদের কথাবার্তাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ক্ষমতা ও পদমর্যাদার লোভ ছাড়া আর কোনো জিনিস তাদের কাছে আপত্তিযোগ্য বলে মনে হয়নি। তবে তাদের নিজেদের বেলায় ‘ক্ষমতা লোভের’ অভিযোগ তোলার জো ছিল না। যেন ওটা তাদের স্বাভাবিক খাদ্য। এ খাদ্য অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার দরুন তাদের বদহজম দেখা দিলেও তাতে আপত্তি তোলা চলবে না।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০১ পৃষ্ঠায়)

“তিনি (অর্থাৎ হযরত হুদ) বলেন, হে আমার সম্প্রদায়! আমি কোনো নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত নই। আমি রাব্বুল আলামীনের রসূল। আমার রবের বাণীগুলো তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেই। আর আমি তোমাদের জন্যে নির্ভরযোগ্য হিহাকাঙক্ষী। তোমাদের সাবধানক রার জন্যে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন লোকের মাধ্যমে তোমাদের কাছে আল্লাহর স্মারকবাণী এসেছে। এতে কি তোমরা বিস্মিত হচ্ছো?”-(সূরা আল-আরাফঃ ৬৭-৬৯)

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০১ পৃষ্ঠায়)

“তারা বললো, আমাদের প্রতিপালকের ইচ্ছা থাকলে ফেরেশতা পাঠাতেন। তাই তোমাদেরকে যে জন্যে পাঠানো হয়েচে, আমরা তা মানি না”।–(সূরা হা-মীম আস সাজদাহঃ ১৪)

হযরত সালেহ ও শোয়াইব মানুষ ছিলেন

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০১ পৃষ্ঠায়)

“তারা (সামুদ জাতির লোকেরা) জবাব দিল, তোমাকে যাদু করা হয়েছে। তুমি আমাদেরই মত মানুষ ছাড়া আর কি? তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকলে একটা নিদর্শন নিয়ে এস”।–(সূরা আশ শুয়ারাঃ ১৫৩-১৫৪)

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০১ পৃষ্ঠায়)

“তারা বললোঃ তোমাকে যাদু করা হয়েছে। আর তুমি আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নও। আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি”। -(সূরা আশ শুয়ারাঃ ১৮৫-১৮৬)

হযরত মূসা ও হারুন মানুষ ছিলেন

ফেরআউন তার পরিষদগণ হযরত মূসা ও হারুন সম্পর্কে বলেনঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০২ পৃষ্ঠায়)

“ফেরআউন বলতে লাগলো, আমাদেরই মত দু’জন মানুষের ওপর আমরা ঈমান আনবো নাকি? আর তাও এমন দু’জন লোক –যাদের সম্প্রদায় আমাদের দাস”।

সকল নবীই মানুষ ছিলেন

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০২ পৃষ্ঠায়)

“তাদের রসূলগণ তাদেরকে বলরো, সত্যিই আমরা তোমাদের মতই মানুষ ছাড়া আর কিচু নই। তবে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান অনুগৃহীত করেন”।–(সূরা ইবরাহীমঃ ১১)

অর্থাৎ আমরা মানুষ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আল্লাহ অনুগ্রহপূর্বক তোমাদের মধ্য থেকে আমাদেরকে সত্যজ্ঞনা ও পরিপূর্ণ দূরদর্শিতা দান করার জন্যে নির্বাচিত করেছেন। এতে আমাদের কোনো হাত নেই। এটা আল্লাহর এখতিয়ারের ব্যাপার –তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে যা দিতে চান তাই দেন। আমরা এ কথা বলতে পারি না যে, যা কিছু আমাদের কাছে এসেছে তা তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেব। আর এটাও করতে পারি না যে, যেসব তত্ত্ব আমরা জানতে পারি –তা থেকে চোখ বন্ধ করে থাকব।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০২ পৃষ্ঠায়)

“তারা (রসূলদেরকে) জবাব দিল, তোমরা আমাদেরই মত মানুষ ছাড়া আর কিছু নও। বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা সত্তার যেসব পূজা করে আসছি তা থেকে তোমরা আমাদেরকে দূরে রাখতে চাও। আচ্ছা, তাহলে কোনো সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ নিয়ে এসো”।–(সূরা ইবরাহীমঃ ১০)

তাদের বক্তব্য ছিলঃ তোমরা সর্বতোভাবে আমাদের মতই মানুষ। পানাহার করো, ঘুমাও, বিবি-বাচ্চা রাখ, ক্ষুৎ-পিপাসা, রোগ, শোক, ঠাণ্ডা, গরম সবকিছু আমাদের মতই অনুভব করো এবং যেসব মানবিক দুর্বলতা আমাদের আছে, তোমাদেরও তা আছে। তোমাদের মধ্যে কোনো অসাধারণত্ব আমরা দেখতে পাই না। এমতাবস্থায় আমরা কি করে মেনে নেব যে, তোমরা প্রেরিত পুরুষ এবং আল্লাহ তোমাদের সাথে কথা বলেন এবং তোমাদের কাছে ফেরেশতা আসে?

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.