সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবী মুহাম্মদ (সা)-ও মানুষ ছিলেন

মক্কার কাফেররা বলতো যে, মুহাম্মদ (সা) রসূল নন। কেননা তিনি মানুষ।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৩ পৃষ্ঠায়)

“তারা বলে যে, এ কেমন রসূল, যে খাবার খায় এবং বাজারে চলাফেরা করে?”

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৩ পৃষ্ঠায়)

“এ যালেমরা পরস্পরে এই বলে কানাঘুষা করেঃ এ লোকটি (মুহাম্মদ সা.) তোমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া আর কি? তা সত্ত্বেও তোমরা কি দেখে শুনে যাদুর শিকার হবে?”-(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৩)

প্রাচীন জাহেলী ধ্যান-ধারণা

পবিত্র কুরআন মক্কার কাফেরদের এ জাহেলী ধ্যাণ-ধারণা খণ্ডন করতে গিয়ে বলে যে, এটা কোনো নতুন অজ্ঞতা নয় যা পথমবারের মত তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। বরং অতি প্রাচীনকাল থেকে সকল অজ্ঞ লোক এ ভ্রান্ত ধারণায় লিপ্ত ছিল যে, মানুষ কখনো রসূল হতে পারে না আর রসূল কখনো মানুষ হতে পারে না। নূহ (আ)-এর জাতির নেতা ও সর্দাররা যখন হযরত নূহের রিসালাত অস্বীকার করে তখন তারা এ কথাই বলেছিলঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৩ পৃষ্ঠায়)

“এ লোকটি তোমাদের মতই একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। সে চায় তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে। অথচ আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে ফেরেশতা পাঠাতেন। আমরা তো আমাদের বাপ-দাদার কাছে এমন কথা কখনো শুনিনি যে, মানুষ রসূল হয়ে আসে”।

আ’দ জাতিও হযরত হুদ সম্পর্কে একই কথা বলেছিলঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৩ পৃষ্ঠায়)

“এ ব্যক্তি তোমাদের মত মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমরা যা খাও তাই খাই এবং তোমরা যা পান করো তাই পান করে। এখন যদি তোমরা তোমাদের মত একজন মানুষের আনুগত্য মেনে নাও, তাহলে তোমরা বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।–(সূরা মু’মিনুনঃ ৩৩-৩৪)

সামুদ জাতি হযরত সালেহ (আ) সম্পর্কেও একই কথা বলেছিলঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৩ পৃষ্ঠায়)

“আমরা কি নিজেদের মধ্যকার একজন মানুষেরই আনুগত্য মেনে নেব?”-(সূরা আল কামারঃ ২৪)

প্রায় সকল নবীই এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। কাফেররা এ কথাই বলতো যে- (আরবী********) “তোমরা আমাদেরই মত মানুষ ছাড়া কিছু নও”। আর নবীরা তাদের জবাব দিতেন যে,

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৪ পৃষ্ঠায়)

“বস্তুত আমরা তোমাদের মত মানুষ ছাড়া আর কিছু নই। তবে আল্লাহর তার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন”।–(সূরা ইবরাহীমঃ ১১)

হেদায়াত প্রাপ্তির পথে বাধা

এরপর কুরআন শরীফ বলে যে, এ জাহেলী ধারণাই প্রত্যেক যুগে মানুষকে হেদায়াত গ্রহণ করা থেকে দূরে রেখেছে। আর এ কারণেই বিভিন্ন জাতির ঘাড়ে নেমে এসেছে লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগ।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৪ পৃষ্ঠায়)

“ইতিপূর্বে যারা কুফরী করেছে এবং নিজেদের কৃতকর্মের স্বাদ উপভোগ করেছে, অতপর আরো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি যাদের জন্যে রয়েছে, তাদের খবর কি তোমরা পাওনি? তাদের এমন অবস্থা এ জন্যে হয়েছিল যে, তাদের কাছে তাদের রসূল অকাট্য প্রমাণাদি নিয়ে আসতো। কিন্তু তারা বলতো, একজন মানুষ আমাদের হেদায়াত করবে নাকি? এ জন্যে তারা কুফর করলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিল”।–(সূরা আত তাগাবুনঃ ৫-৬)

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৪ পৃষ্ঠায়)

“মানুষের কাছে যখন হেদায়াত এসেছে তখন তার প্রতি ঈমান আনার পথে একমাত্র প্রতিবন্ধকতা ছিল তাদের এ কথা যে, আল্লাহ কি মানুষকে রসূল করে পাঠিয়েছেন?”-(সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৯৪)

পূর্বেই এ কথা বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক যুগেই লোকেরা এ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করতো যে, মানুষ কখনো নবী হতে পারে না। এ জন্যে যখনই কোনো রসূল এসেছেন, তখন তাকে পানাহার করতে, পরিবারসহ বাস করতে এবং রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে দেখে তারা মত স্থির করে ফেলেছে যে, তিনি নবী নন। কেননা তিনি মানুষ। আবার নবীর ইন্তিকালের কিছুকাল পর তার ভক্ত-অনুরক্তের মধ্যে একদল মানুষের আবির্ভাব ঘটলো যারা বলতে লাগলো যে, তিনি মানুষ ছিলেন না। কেননা তিনি নবী ছিলেন। এরপর কেউ তাকে খোদার পুত্র আবার কেউ বা খোদার অবতার বলতে লাগলো। মোটকথা একই সত্ত্বার মধ্যে নবীত্ব ও মানবত্বের সমাবেশ কি করে হতে পারে –তা ছিল অজ্ঞদের কাছে চিরকাল এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য।

মানুষকেই চিরকাল রসূল বানানো হয়েছে

পবিত্র কুরআন সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, আল্লাহ চিরদিন মানুষকেই রসূল করে পাঠিয়েছেন বস্তুত মানুষের হেদায়াতের জন্যে মানুষই রসূল হতে পারে, কোনো ফেরেশতা বা মানুষের চেয়ে উচ্চতর কোনো সত্তা নয়।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৫ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! আমি তোমার আগে মানুষদেরকেই রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি –যাদের কাছে আমি অহী পাঠাতাম। তোমরা যদি এ কথা না জান, তাহলে জ্ঞানীজনদের কাছ থেকে জেনে নাও। আমি তাদের (নবীদের) এমন শরীর দিয়েছিলাম না যে তারা খাদ্য খাবে না আর তারা চিরঞ্জীবও ছিল না”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭-৮)

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৫ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তাদেরকে বলে দাও যে, পৃথিবীতে যদি ফেরেশতারা নিম্চিন্তে চলাফেরা করতো তবে তাদের কাছে আমি ফেরেশতাই রসূল করে পাঠাতাম”।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৫ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! তোমার আগে যত নবী পাঠিয়েছি তারা সকলেই ছিল মানুষ। যেসব জনপদের বাসিন্দাই তারা ছিল এবং তাদের কাছে আমি অহী পাঠাতাম। তারা কি পৃথিবীতে ঘোরাফেরা করে তাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পরিনতি দেকতে পায়নি? বস্তুত যারা নবীদের কথামত তাকওয়ার জীবন যাপন করেছে, নিশ্চয়ই তাদের জন্যে আখেরাতের বাসস্থান অনেক ভালো। এখনো কি তোমাদের বোধোদয় হবে না?”-(সূরা ইউসুফঃ ১০৯)

এখানে একটা বিরাট বিষয়কে মাত্র দু’তিনটি বাক্যের প্রকাশ করা হয়েছে বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা কররে এ দাঁড়াবেঃ

তারা তোমার কথায় এ জন্যে কর্ণপাত করে না যে, যে ব্যক্তি মাত্র সেদিন তাদেরই শহরে জন্মগ্রহণ করলো এবং তাদের চোকের সামনেই শিশু থেকে যুবক এবং যুবক থেকে বৃদ্ধ হলো, তাকেই যে আল্লাহ হঠাৎ করে একদিন আপন দূত নিযুক্ত করেছেন, তা তারা কি করে বিশ্বাস করবে? কিন্তু এটা কোনো অভিনব ব্যাপার নয় যে, দুনিয়াতে তারাই প্রথম এর সম্মুখীন হয়েছে। ইতিপূর্বেও আল্লাহ তাঁর বহু নবী পাঠিয়েছেন এবং তাঁরা সবাই মানুষ ছিলেন। নবী কখনো এভাবেও আসেননি যে, হঠাৎ করে একজন অচেনা মানুষ কোনো শহরে আবির্ভূত হলো এবং সে বললো যে, তাকে নবী করে পাঠানো হয়েছে। বরং মানুষে সংস্কার-সংশোধনের জন্যে যাদেরকেই পাঠানো হয়েছে তারা সবাই সংশ্লিষ্ট জনপদেরই বাসিন্দা ছিলেন। হযরত ঈসা, মূসা, ইবরাহীম এবং নূহ (আ) কোনো অচেনা-অজানা লোক ছিলেন না। এতদসত্ত্বেও যেসব জাতি ও সম্প্রদায় নবীদের পরিশুদ্ধির আহবানে কর্ণপাত করেনি এবং নিজেদের ভিত্তিহীন চিন্তা, অলীক কল্পনা ও লাগামহীন প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটে চলা অব্যাহত রেখেছে তাদের পরিণাম কি হয়েছে, তা তোমরা নিজেরাই গিয়ে দেখে এস। বাণিজ্যিক সফরে তোমরা আ’দ, সামুদ, মাদিয়ান ও লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের বিধ্বস্ত এলাকা দিয়ে চলাচল করেছ। সেখানে কি তোমরা কোনো শিক্ষা পাওনি? আর দুনিয়াতে তারা যে পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে, তা থেকেই বুঝা যায় যে, পরকালে তারা আরো ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করবে। আর যারা দুনিয়াতে নিজেদের শুধরে নিয়েছে তারা শুধু দুনিয়াতেই সুখী হয়নি, পরকালেও তাদের পরিণাম হবে আরো ভাল।

অন্ধ ও চক্ষুষ্মানের পার্থক্য

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৬ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! তুমি তাদেরকে বলো “আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে। আমি ফেরেশতা হওয়ার দাবীও করি না। আমার কাছে যে অহী আসে আমি শুধু তারই অনুসরণ করি। তাদেরকে তুমি জিজ্ঞেস কর, অন্ধ আর চক্ষুষ্মান উভয়ে কি সমান হতে পারে? তোমরা কি চিন্তা-ভাবনা কর না?”-(সূরা আল আনআমঃ ৫০)

অর্থাৎ আমি যেসব তত্ত্ব ও তথ্য তোমাদের সামনে তুলে ধরেছি তা আমি স্বচক্ষে দেখেছি এবং সেগুলো সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছে। অহীর দ্বারা আমাকে ঐ সব তথ্য নির্ভুলভাবে জানানো হয়েছে এবং সেগুলো সম্পর্কে আমার সাক্ষ্য চাক্ষুস সাক্ষ্য। পক্ষান্তরে তোমরা এসব তথ্য সম্পর্কে অজ্ঞ। কেননা এগুলো সম্পর্কে তোমাদের ধ্যান-ধারণা নিছক কল্পনাভিত্তিক অথবা অন্ধ অনুকরণভিত্তিক। তাই অন্ধ ও চক্ষুষ্মানদের মধ্যে যে পার্থক্য, তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সেই পার্থক্য। এ কারণে তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এ জন্যে নয় যে, আল্লাহর ধনভাণ্ডার আমার তাহে আছে। আমি গায়েবের কথা জানি অথবা আমি মানবিক দুর্বলতার ঊর্ধ্বে।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৬ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তোমার আগেও আমি অনেক রসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের সবাইকে আমি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির অধিকারী করেছিলাম”।–(সূরা রা’দঃ ৩৮)

এ হচ্ছে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি আরোপিত কিচু সমালোচনার জবাব। তারা বলতো, ইতি কেমন নবী। যে বিবি-বাচ্চা রাখে? নবীর আবার প্রবৃত্তির লালসার সাথে কি সম্পর্ক?

নবীর ফেরেশতা হওয়া উচিত ছিল (?)

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৭ পৃষ্ঠায়)

“যখন আল্লাহর রসূলগণ তাদের কাছে সামনে ও পেছনে থেকে এলো এবং তাদেরকে বলল, আল্লাহ ছাড়া আর কার দাসত্ব কর না, তখন তারা বলল, আমাদের রব ইচ্ছা কররে ফেরেশতা পাঠাতেন। কাজেই তোমাদেরকে যে উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে তা আমরা মানি না”।–(সূরা হা-মীম আস-সিজদাঃ ১৪)

অর্থাৎ আমাদের বর্তমান ধর্ম আল্লাহর পছন্দ না হতো এবং আমাদের এ ধর্ম থেকে বিরত রাখার জন্যে কোনো রসূল পাঠাতে চাইতেন, তবে ফেরেশতা পাঠিয়ে দিতেন। তোমরা যেহেতু ফেরেশতা নও বরং আমাদের মতই মানুষ, তাই আমরা বিশ্বাস করি না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে পাঠিয়েছে এবং এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন যে, আমরা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করে সেই দ্বীন গ্রহণ করবো যা তুমি পেশ করছ। যে জন্যে তোমাকে পাঠানো হয়েছে তা আমরা মানি না –কাফেরদের এ উক্তি বিদ্রুপাত্মক। এর অর্থ এ নয় যে, তারা তাদেরকে আল্লাহর প্রেরিত বলে স্বীকার করতো এবং শুধু তারা কথা অমান্য করতো। এ ধরনের বিদ্রুপ ফেরাউন ও হযরত মূসার সাথে করেছিল। সে তার পরিষদগণকে বলেছিলঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৭ পৃষ্ঠায়)

“যে রসূলকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে, তাকে তো একেবারে পাগল মনে হচ্ছে”।–(সূরা আশ শুয়ারাঃ ২৭)

নবী হলে তো বড়লোক হবে

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৭ পৃষ্ঠায়)

“তারা বলে, এ কুরআন দু’টি শহরের কোনো একজন বড়লোকের ওপর নাযিল হল না কেন?”-(সূরা যুখরুকঃ ৩১)

এখানে দু’টি শহর অর্থ মক্কা ও তায়েফ। কাফেরদের বক্তব্য ছিল, আল্লাহর যদি সত্যিই কোনো রসূল পাঠানো দরকার হত এবং তিনি তার ওপর কিতাব নাযিল করতে চাইতেন, তাহলে আমাদের এ কেন্দ্রীয় শহর দু’টির কোনো নামকরা লোককেই তিনি এ জন্যে বেচে নিতেন। রসূলরূপে মনোনীত করার জন্যে তিনি কিনা খুঁজে পেলেন এমন একজনকে যে আজন্মা এতীম, যার এক কানাকড়িও পৈতৃক সম্পত্তি নেই, যে ছাগর চরিয়ে যৌবন অতিবাহিত করেছে, যে বর্তমানে কালযাপন করছে স্ত্রীর টাকায় ব্যবসা করে, যে কোনো গোত্রের সরদারও নয়, কোনো বংশের মুরুব্বীও নয়। মক্কায় কি অলিদ ইবনে মুগীরা এবং উতবা ইবনে রাবিয়ার মত নামকরা সরদার ছিল না? তায়েফে উরওয়াহ বিন মাস’উদ, হাবিব বিন আমর, কিনানাবিন আবদে আমর এবং ইবনে আবদে ইয়ালিলের মত নেতৃন্থানীয় লোক কি ছিল না? এ ছিল কাফেরদের যুক্তি। প্রথমে তো তারা মানুষের রসূল হওয়াটা মানতেই প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু কুরআনে বার বার যুক্তি প্রমাণ দিয়ে তাদের এ ধারনা পুরোপুরিভাবে খণ্ডন করা হল এবং তাদেরকে বলাহ ল যে, এর আগে সবসময় মানুষই রসূল হয়ে এসেছেন, মানুষের হেদায়াতের জন্যে একমাত্র মানুষেরই রসূল হওয়া সম্ভব, মানুষ ছাড়া অন্য কারো এ কাজ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া যে রসূলই দুনিয়ায় এসেছেন, তিনি হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে আসেননি বরং মানুষের আবাস্থলেই জন্মেছেন, হাটে-বাজারে চলাফেরা করেছেন, সন্তানাদির পিতা ছিলেন, তিনি পানহার থেকেও নিবৃত্ত ছিলেন না।

কুরআনের এসব যুক্তি শুনে তারা নতুন পাঁয়তারা শুরু কররো এবং বলতে লাগল, বেশ মানুষই হযে আসুক তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে অবশ্যই একজন নামকরা, ধনী ও প্রভাবশালী লোক হতে হবে। একটা বিরাট দলপতি হতে হবে এবং জনগণের ওপর তার বিরাট প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকতে হবে। মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ এ মর্যাদার উপযুক্ত কি করে হতে পারে?

নবী (সা)-এর জীবিকা অন্বেষণ নিয়ে প্রশ্ন

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৮ পৃষ্ঠায়)

“তারা বরে, এ কেমন রসূল, যে পানাহার করে এবং হাটবাজারে চলাফেরা করে? তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠানো হল না কেন –যে তার সাথে থাকত এবং (অমান্যকারীদেরকে) ধমক দিত?”-(সূরা  আল ফুরকানঃ ৭)

অর্থাৎ প্রথমতঃ মানুষের রসূল হওয়াটাই একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। আল্লাহর বাণী নিয়ে কাউকে আসতে হলে ফেরেশতাই আসত । রক্ত-মাংসের মানুষ নয় –যার বেঁচে থাকার জন্যে খাদ্যের প্রয়োজন। তবুও যদি ধরে নেয় যায় যে, মানুষকেই রসুল বানানো হয়ে থাকে, তাহলে তার নিদেন পক্ষে রাজা-বাদশাহ  বা দুনিয়ার অন্য কোনো বিরাট ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক হওয়া উচিত ছিল –যাকে একনজর দেখার জন্যে সবাই উদগ্রীব হত এবং বহু সাধ্য-সাধনার পর যার দর্শন লাভ ভাগ্যে জুটতো। তা না হয়ে একজন সাধারণ মানুষকে বিশ্বস্রষ্টার পয়গাম্বর বানানো হল। যে জুতা পায়ে খট খট করে বাজারে ঘুরে বেড়ায়। একজন সাধারণ পথচারী যাকে প্রতিদিন দেখতে পায়, যার মধ্যে কোনোই অসাধারণত্ব দেখতে পাওয়া যায় না। তাকে কে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে? অন্য কথায় বলা যায়, তাদের মতে, নবীর কোনো দরকার যদি থেকেও থাকে তবে তা মানুষের হেদায়াতের জন্যে নয়, বরং অলৌকিক ক্রিয়াকর্ম দেখাবার জন্যে অথবা নিজের জারিজুরি দেখিয়ে মানুষের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করার জন্যে।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৮ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! তোমার আগে আমি যেসব রসূল পাঠিয়েছিলাম, তারাও সকলে পানাহার করত এবং বাজারে চলাফেরা করত। আসলে আমি তোমাদেরকে পরস্পরের পরীক্ষার উপায় বানিয়ে দিয়েছি। তোমরা কি ধৈর্যধারণ করবে? তোমাদের প্রতিপালক সমকিছু দেখতে পান”।–(সূরা ফুরকানঃ ২০)

‘এ কোন ধরনের রসূল যে খানাপিনা করে এবং বাজারে চলাফেরা করে?’ মক্কার কাফেরদের এ প্রশ্নের জবাব ওপরের আয়াতে দেয়া হয়েছে। এখানে এ কথা মনে রাখা দরকার যে, মক্কার কাফেরগণ হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত ইসমাঈল, হযরত মূসা এবং আরো অনেক নভী সম্পর্কে অবহিত ছিল। এমনকি তাদের রিসালাতকেও তারা স্বীকার করতো। আগের কোন নবী এমন ছিলেন যিনি খাদ্য গ্রহণ করেননি এবং বাজারে চলাফেরা করেননি? এ জন্যেই বলা হচ্ছে যে, মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যাপারে তোমাদের এ অভিনব প্রশ্ন কেন? স্বয়ং হযরত ঈসা (আ)-এর কথাই ধরা যাক, যাঁকে খৃষ্টানরা আল্লাহর পুত্র বানিয়ে রেখেছে এবং যার মূর্তি মক্কার কাফেরগণ কাবা ঘরে রেখেছিল। সেই হযরম ঈসাও বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে আহার করতেন ও বাজারে ঘোরাফিরা করতেন।

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩০৮ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! তোমার পূর্বেও আমি মানুষকেই রসুর করে পাঠিয়েছিলাম এবং তাদের কাছে আমি ওহী পাঠাতাম। তোমরা যদি তা না জান তাহলে আহলে কিতাবকে জিজ্ঞেস কর। তাদেরকে আমি এমন শরীর দেইনি, যার খাওয়ার প্রয়োজন হতো না? আর তারা চিরঞ্জীবও ছিল না”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭-৮)

“এ লোকটি তো তোমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই নয়”। কাফেরদের এ কথার জবাব ওপরের আয়াতে দেয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মদ (সা)-এর মানুষ হওয়াকে তারা প্রমাণ হিসেবে পেশ করতো যে, তিনি নবী ছিলেন না। তার জবাবে বলা হচ্ছে যে, আগের জামানার যেসব মহান ব্যক্তিকে তোমরা আল্লাহর প্রেরিত বলে স্বীকার করতে তারা সকলেই মানুষ ছিলেন এবং মানুষ থাকা অবস্থাতেই তারা আল্লাহর অহী লাভ করতেন।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.