সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ৮ – দ্বীনে হক

ধর্ম সম্পর্কে জাহেলী ধারণা ও ইসলামী ধারণা

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াত লাভের আগে পৃথিবীতে ধর্ম সম্পর্কে যে সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল তা হলো এই যে, জীবনের অনেকগুলো বিভাগের মধ্যে এও একটা দিক বা বিভাগ। অন্য কথায় বলা যায়, ধর্ম মানুষের পার্থিব জীবনের একটা পরিশিষ্ট। যাতে করে পরকালীন জীবনের মুক্তির ব্যাপারে একে সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মানুষ ও খোদার মধ্যে যে সম্পর্ক ধর্ম কেবলমাত্র তার সাথেই সংশ্লিষ্ট। যে ব্যক্তি পরকালীন জীবনে উচ্চতর মর্যাদা সহকারে মুক্তি কামনা করে, তার উচিত জীবনের অন্য সব বিভাগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে শুধুমাত্র এ বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া। তবে যার এত বড় মর্যাদা কাম্য নয় বরং কোনো মতে মুক্তি পাওয়াকেই যে যথেষ্ট মনে করে, আর সেই সাথে পার্থিব জীবনে খোদা তার ওপর একটু কৃপাদৃষ্টিও রাখুক এবং দুনিয়ার কায়কারবারে অব্যাহত সাফল্য ও উন্নতিও দান করতে থাকুক –এ বাসনা যে পোষণ করে পার্থিব জীবনের সাথে ধর্মকে পরিশিষ্ট হিসেবে সন্নিবেশিত রাখাকে যথেষ্ট মনে করে। জাহেলী ধারনা মতে দুনিয়ার সমস্ত কাজকর্ম যে নিয়ম-কানুন অনুসারে চালু রয়েছে, সেভাবেই চালু থাকবে আর তার সাথে কতিপয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রসম রেওয়াজ পারন করে খোদাকেও তুষ্ট রাখা হবে। মানুষের নিজের সত্তার সাথে অন্যান্য মানুষের সাথে এবং পরিবেশ প্রতিবেশের সাথে যে সম্পর্ক সেটা তার ও তার খোদার মধ্যকার সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। উভয়ের মধ্যে কোনো সংশ্রব নেই।

ধর্ম সম্পর্কে এ ছিল জাহেলিয়াতের ধারণা। এর ভিত্তিতে কোনো মানবীয় সভ্যতা ও কৃষ্টির প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না। সভ্যতা ও কৃষ্টি অর্থে সমগ্র মানব জীবনকেই বুঝায়। তাই যে জিনিস জীবনের একটা পরিশিষ্ট তার ওপর সমগ্র জীবনের ভিত্তি স্থাপন স্পষ্টতঃই সম্ভব নয়। এ জন্যেই চিরকাল দুনিয়ার সর্বত্র ধর্ম একদিকে আর সভ্যতা ও কৃষ্টি অন্যদিকে পরস্পর থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। যদিও এ দু’টি জিনিস একে অপরকে কম বেশী প্রভাবিত না করে পারেনি, কিন্তু সে প্রভাব ছিল বিপরীত ধর্মী ও বিভিন্নমুখী, বহু জিনিসের সমাবেশের ফলে যেমন হয় ঠিক তেমনি। তাই সে প্রভাবকে কোথাও ফলপ্রসু হতে দেখা যায়নি। ধর্ম যখন সভ্যতা-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে, তখন সেখানে বৈরাগ্যবাদ, বস্তুগত বন্ধনের প্রতি ঘৃণা, পার্থিব সুখ-সম্ভোগে অনীহা, উপকরণ নির্ভর জগতের সাথে সম্পর্কহীনতা,মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, বিদ্বেষ এবং সংকীর্ণতার, প্রবণতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ প্রভাব কোনো অর্থেই উন্নয়নমূলক ছিল না বরং ছিল পার্থিব উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এক জগদদ্ল পাথর। অপরদিকে যে সভ্যতা-সংস্কৃতির বুনিয়াদ ছিল বস্তুবাদ ও প্রবৃত্তি পূজা –তা যখনই ধর্মের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে তখন তাকে কলুষিত করে দিয়েছে। এ সভ্যতা-সংস্কৃতি ধর্মের ভিতর প্রবৃত্তি পূজার যাবতীয় নোংরামি ও অপবিত্রতা প্রবিষ্ট করে দিয়েছে। ফলে যেসব অতি নোংরা ও কদর্য কাজকর্ম করতে চায় সেগুরোকে ধর্মীয় খোলস পরিয়ে দেয়া হয়, যাতে করে না আপন বিবেক ভর্ৎসনা করতে পারে, আর না অন্য কেউ এর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে। তারই প্রভাবস্বরূপ কতিপয় ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানের আমরা ভোগ-লালসা পূজা ও নির্লজ্জতায় এমন সব রীতি পদ্ধতি দেখতে পাই, যাকে ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বাইরের স্বধর্মীগণও বলে আখ্যায়িত করে।

ধর্ম ও সভ্যতার এ পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বাদ দিলেও এ সত্যটি পরিস্ফুট হয় যে, পৃথিবীর সর্বত্রই সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রাসাদ ধর্মহীনতা ও চরিত্রহীনতার ভিত্তির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর দুনিয়াদারীর যাবতীয় কাজ-কর্ম দুনিয়াদার লোকের আপন প্রবৃত্তির বাসনা ও নিজেদের যাবতীয় কাজ-কর্ম দুনিয়াদার লোকের আপন প্রবৃত্তির বাসনা ও নিজেদের ত্রুটিপূর্ণ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যেমন খুশী করার জন্যে কিছু ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানও পালন করেছে। অবশ্যি এসব কাজ-কর্ম আপন আপন যুগে ত্রুটিহীন মনে করা হলেও পরবর্তীকালে তা ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে। অবশ্য ধর্ম তাদের জন্যে জীবনের একটা নিছক পরিশিষ্ট ছাড়া আর কিচু ছিল না বলে তা সঙ্গে থাকলেও নিচক পরিশিষ্ট হিসেবেই রয়ে গেছে। সব রকমের সামাজিক বৈষম্য এবং সব রকমের সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তির সাথেই এ পরিশিষ্ট সংশ্লিষ্ট হতে পারতো। পরিশিষ্ট হিসেবে এ ধর্ম প্রতারনা ও দস্যুবৃত্তি ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কার্যকলাপ, সুদখুরি, কার্পণ্য, ব্যভিচার ও বেশ্যাবৃত্তির সাথে সহ অবস্থান করেছে।

দ্বীনের ব্যাপক ও সর্বাঙ্গীন ধ্যান-ধারণা

নবী মুহাম্মদ (সা) যে উদ্দেশ্যে প্রেরিত হন তা এ ছাড়া আর কিছু ছিল না, যে ধর্ম সম্পর্কে জাহেলী তথা অনৈসলামী ধ্যান-ধারণা খণ্ডন করে তিনি একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তামূলক ধারণা উপস্থাপিত করবেন। আর শুধু উপস্থাপিত করেই ক্ষান্ত হবেন না বরং তার ভিত্তিতে সভ্যতা-সংস্কৃতির একটা পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে সাফল্যের সাথে তা পরিচালনা করে দেখাবেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, ধর্ম মানুষের জীবনের নিছক একটা পরিশিষ্ট হরে তা হবে একেবারে অর্থহীন। এমন জিনিসকে ধর্ম নামে আখ্যায়িত করাও ভুল। আসলে ‘দ্বীন’ হলো সেই জিনিস –যা জীবনের অংশ নয় বরং গোটা  জীবন। জীবনের প্রাণশক্তি এবং তার প্রেরনা শক্তি, বোধ ও অনুভূতি শক্তি, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গী, ভারমন্দ নিরূপনের মানদণ্ড। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং পদে পদে যা সঠিক, সরল ও বক্র পথকে আলাদা করে দেখায়, বিপদগামী হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং সত্য সঠিক পথে অবিচল থাকার ও সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার শক্তি যোগায় এবং দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত জীবনের এ অফুরন্ত অভিযাত্রায় মানুষকে সফলতা ও সৌভাগ্যের সাথে প্রত্যেকটি স্তর পাড়ি দিতে সাহায্য করে।

এ ধর্মেরই নাম ইসলাম। এটা জীবনে পরিশিষ্ট হওয়ার জন্যে আসেনি। বরং সত্যি কথা এই যে, পুরানো সেই জাহেলী ধারনা অনুসারে তাকে যদি জীবনের একটা পরিশিষ্ট হিসেবেই গ্রহণ করা হয় তাহরে তার আগমন ও আবির্ভাবের উদ্দেশ্যই পণ্ড হয়ে যায়। খোদা ও মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সাথে সমগ্র সৃষ্টিজগতের সম্পর্ক নিয়ে। মানুষকে এ সত্যটি সম্পর্কে অবহিত করার জন্যে সে এসেছে যে, সম্পর্কের এ বিভাগগুলো আলাদা-আলাদা নয় এবং পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্নও নয় বরং তা একটি সমষ্টির কয়েকটি অবিচ্ছিন্ন ও সমন্বিত অংশ মাত্র। এগুলোর মধ্যে সুষ্ঠু সংযো ও সমন্বয় সাধনের ওপরই মানুষের সার্বিক মুক্তি ও সাফল্য নির্ভরশীল। মানুষ ও তার স্রষ্টার মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটা সুষ্ঠু না হলে মানুষের সাথে সৃষ্টিজগতের সম্পর্ক সুষ্ঠু হতে পারে না। সুতরাং এ সম্পর্ক দু’টি একে অপরের বিশুদ্ধি ও পূর্ণতা সাধন করে এবং উভয়ে মিলে একটি সফল জীবন গড়ে তোলে। এ সফল জীবনের জন্যে মানুষকে মানসিকভাবে ও সক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করাই ধর্মের আসল কাজ। যে ধর্ম এ কাজটি করে না, সেটা ধর্মই নয়। আর যে ধর্ম এ কাজ সম্পন্ন করে, সে ধর্মই ইসলাম। এ জন্যেই আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী***************) ‘আল্লাহর কাছে দ্বীন বলতে একমাত্র ইসলাম’।

একটা বিশেষ চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গী

ইসলাম একটা বিশেষ মনোভঙ্গী (Attitude of mind) এবং সমগ্র জীবন সম্পর্কে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ (Out-look of Life). অতপর সে একটা বিশেষ কর্মপদ্ধতিও যা নির্ধারিত হয় মনোভঙ্গী এবং ঐ দৃষ্টিকোণ থেকে। এ মনোঙ্গী ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে যে কাঠামো তৈরী হয় সেটাই ইসলাম, সেটাই ইসলামী সভ্যতা এবং ইসলামী তামাদ্দুন। এখানে ধর্ম আর তাহযিব-তামাদ্দুন আলাদা আলাদা জিনিস নয় বরং সব মিলে একটা একক সমষ্টি গড়ে তোলে। ঐ একই মনোভঙ্গি ও জীবন দর্শন জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে। মানুষের ওপর খোদার কি অধিকার তার আপন সত্ত্বার কি অধিকার, মা-বাপ, স্ত্রী-সন্তানাদি, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, লেন-দেন, সম্পর্কিত লোকজন, স্বধর্মী-বিধর্মী, শত্রু-মিত্র, এক কথায় সমগ্র মানবজাতির এবং বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তু ও শক্তির কি কি অধিকার রয়েছে –সেসব অধিকার এ জীবনদর্শন নির্ণয় করে এবং তার মধ্যে পূর্ণ ভারসাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত করে। একজন মানুষের মুসলমান হওয়াটাই এ বিষয়ের যথেষ্ট নিশ্চয়তা যে, সে এসব অধিকার পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতার সাথে পালন করবে এবং অন্যায় করে একটি অধিকার অন্যটির জন্যে বিনষ্ট করবে না। তারপর এ মনোভঙ্গী ও জীবনদর্শন মানবজীবনের একটি সুমহান নৈতিক লক্ষ্য ও একটি পূতঃপবিত্র আধ্যাত্মিক গন্তব্যস্থল নির্ধারণ করে দেয়। আর জীবনের সকল চেষ্টা-সাধনাকে তা যে কোনো ক্ষেত্রেরই হোক না কেন, এমন পথে পরিচালিত করতে চায় যা সকল দিক থেকে ঐ একই কেন্দ্রের দিকে আবর্তিত হয়।

মূল্যবোধের সিদ্ধান্তকর মানদণ্ড

উল্লিখিত কেন্দ্রটি একটি সিদ্ধান্তকর জিনিস। সবকিছুর মূল্যমান নিরূপিত হয় তার নিরীখেই। সকল জিনিস পরীক্ষা করা হয় এ মাপকাঠিতেই। এ কেন্দ্রীয় লক্ষ্যে পৌঁছুতে যে জিনিসই সহায়ক হয় তাকেই গ্রহন এবং যে জিনিসই প্রতিবন্ধক হয় তাকে বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করা হয়। ব্যক্তিজীবনের ক্ষুদ্রতম ও নগণ্যতম ব্যাপার থেকে শুরু করে সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনের বড় বড় ব্যাপারেও এ মানদণ্ড সমানভাবে কার্যকর। এই মানদণ্ডই ঠিক করে দেয় যে, একজন মানুষকে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণে, পোমাক পরিধানে, নর-নারীর পারস্পরিক সম্পর্কে, লেন-দেনে, কথাবার্তায়, এক কথায় জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে কোন কোন সীমারেখার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে এবং কি কি বিধি-নিষেধ মেনে চরতে হবে –যাতে করে সে তার গন্তব্য মুখী রাস্তার ওপর বহাল থেকে এগিয়ে যেতে পারে এবং পথচ্যুত হয়ে বাঁকা রাস্তায় চলতে আরম্ভ না করে। একই মানদণ্ডে এও স্থির করা হয় যে, সামষ্টিক জীবনে ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধন কোন নীতিমালা অনুসারে রচনা করা প্রয়োজন –যাতে সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং সমাজ জীবনের যেসব পথে চললে লক্ষ্যচ্যুত হতে হয় সেসব পথে ধাবমান না হয়। আর আকাশ ও পৃথিবীর যেসব বস্তু মানুষের আয়ত্তে আসবে এবং যেগুলোকে মানুষের বশ্মীভূত করা হবে সেগুলোকে সে কিতাবে ব্যবহার করবে যাতে করে সেগুলো তার উদ্দেশ্য সাধনের সহায়ক হতে পারে। লক্ষ্য পথে এগিয়ে যাওয়ার সহায়ক এবং কি কি ও কোন কোন পন্থা পরিহার করবে যাতে অনৈসলামী দলগুলোর সাথে মৈত্রীস্থাপনে ও শত্রুতা অবলম্বনে, যুদ্ধ ও সন্ধিতে উদ্দেশ্যের অবিনয়তায় এবং পার্থক্যে বিজয়কালে এবং বিজিত অবস্থায়, জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যা অর্জনে সভ্যতা ও কৃষ্টির আদান-প্রদানে ইসলামী দলকে কোন মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে –যাতে করে বহিঃসম্পর্কের এ বিভিন্ন দিকে তারা যেন নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয় বরং যতখানি সম্ভব ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় অথবা সচেতন বা অবচেতনভাবে, সেই উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে মানব গোষ্ঠীর অজ্ঞ ও পথভ্রষ্ট লোকেরও সাহায্য সহযোগিতা গ্রহণ করবে। কারণ প্রাকৃতিক দিক দিয়ে তাদের উদ্দেশ্যেও তাই যা ইসলামপন্থীদের।

মসজিদ থেকে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত

মোদ্দাকথা, ওটা একই দৃষ্টিভঙ্গী না মসজিদ থেকে বাজার ও কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত ইবাদাতের রীতি-পদ্ধতি থেকে রেডিও ও বিমান পরিচালনা পদ্ধতি পর্যন্ত, অযু-গোসল, পবিত্রতা ও পেশাব-পাখানার খুঁটিনাটি মাসলা-মাসায়েল থেকে সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি পর্যন্ত, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রকৃতি রাজ্যের নিদর্শনাবলীর চূড়ান্ত পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক আইন-কানুনের বিরাট তত্ত্বানুসন্ধান পর্যন্ত জীবনের সকল তৎপরতা, চেষ্টা-সাধনা এবং চিন্তা ও কর্মের সকল বিভাগ ও শাখা-প্রশাখাকে এমন এক একক বস্তুতে পরিণত করে যার অংশগুলোর মধ্যে একটা উদ্দেশ্যপূর্ণ ধারাবাহিকতা ও সংযোগ-সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। অতপর এ অংশগুলোকে একটা মেশিনের অংশাবলীর মতো পরস্পরকে এমনভাবে সংযুক্ত করে দেয়া হয় যে, মেশিনটা চালু হওয়ার পর তার থেকে একই ধরনের ফল পাওয়া যায়।

বিপ্লবাত্মক মতবাদ

ধর্মীয় জগতে এটি ছিল একটি বিপ্লবাত্মক মতবাদ। কিন্তু জাহেলিয়াতের ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন মন-মস্তিষ্কে এ মতবাদ স্থান লাভ করতে পারেনি। আজকের দুনিয়া খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীর তুলনায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে অনেক বেশী অগ্রসর। তথাপি আজও  এতটা অনগ্রসরতা ও অন্ধ কুসংস্কার বিদ্যমান যে, প্রাচীন জাহেলিাতের অজ্ঞ লোকেরা এ বিপ্লবাত্মক মতবাদ যেমন গ্রহণ করতে পারেনি, তেমনি ইউরোপের প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ শিক্ষিত যুবকরাও এ মতবাদ উপলব্ধি করতে পারেনি। ধর্ম সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা হাজার হাজার বছর ধরে বংশানুক্রমে চলে আসছে তার প্রভাব এখনো তাদের মন-মস্তিষ্কে বদ্ধমূল হয়ে আছে। যুক্তিভিত্তিক সমালোচনা ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বানুসন্ধানের উচ্চাঙ্গ প্রশিক্ষণের পরও তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়নি। খানকা ও মসজিদের অন্ধকারে হুজরাখানায় যারা থাকেন, তারা যদি ধার্মিকতার অর্থ নির্জনে বসে ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ জপ করা বুঝে থাকেন এবং দ্বীনদারিকে ইবাদাতের গণ্ডির মধ্যে সীমিত মনে করেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ তারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন তো বটেই। অজ্ঞ জনসাধারণ যদি ধর্মকে ঢাক-ঢোল বাজানো মহররমের তাযিরা এবং গান-বাজনায়, মাসয়ালা জানার মধ্যেই সীমিত মনে করে তাতেও আশ্চর্যের কিছুই নেই। কেননা তারা তো অজ্ঞই। কিন্তু এলমের নূর সংরক্ষণকারী আমাদের এসব বুযগৃদের কি হলো যে, তাদের মন থেকে জরাজীর্ণতার অন্ধকারে দূরীভূত হচ্ছে না কেন? তারাও ইসলাম ধর্মকে ঐ অর্থেই একটি ধর্ম মনে করে যে অর্থে একজন অমুসলিম জাহেলী ধারণার বশবর্তী হয়ে মনে করে।

দ্বীনে হক কাকে বলে?

-[১৯৪৩ সালের পহেলা মার্চ দিল্লীর জামেয়া মিল্লিয়াতে প্রদত্ত ভাষণ।]

কুর্বান যে দাবীসহ তার উপস্থাপিত মতাদর্শের দিকে মানব জাতিকে আহবান জানায় তা তার নিজস্ব ভাষায় নিম্নরূপঃ

(আরবী***********************************পিডিএফ ৩১৭ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর নিকটে দ্বীন বলতে শুধু ইসলাম”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৯)

সচরাচর কুরআনের এ বাক্যটির এরূপ সাদাসিধা ব্যাক্যা দেয়া হয়ে থাকে যে, আল্লাহর নিকটে সত্য ধর্ম হলো একমাত্র ইসলাম। আর ‘ইসলাম’ সম্পর্কে মানুষের সাধারণ ধারণা এই যে, এটা একটা ধর্মের নাম। আজ থেকে তেরশ’ বছর আগে আরব দেশে এ ধর্মের উদ্ভব হয় এবং নবী মুহাম্মদ (সা)-এর ভিত্তিস্থাপন করেন। ‘ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন’ শব্দগুলো আমি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করেছি। কারণ শুধু অমুসলিমগণই নয়, বরং বেশ কিছু সংখ্যক শিক্ষিত মুসলমানও নবী মুহাম্মদ (সা)-কে ইসলাম প্রবর্তক বলে ও লিখে থাকেন। ভাবখানা এই যে, ইসলামের সূচনাই যেন তাঁর থেকেই হয়েছে এবং তিনিই এর প্রতিষ্ঠাতা (Founder)। এ কারণে একজন অমুসলিম যখন কুরআন অধ্যায়ন করতে করতে এ বাক্যটিতে এসে পৌঁছে, তখন সে ভাবে, সকল ধর্মই নিজেকে সত্য এবং অন্যান্য ধর্মকে অসত্র ও বাতিল বরে যেমন ঘেঅষণা করে থাকে, কুরআনও তেমনি উপস্থাপিত ধর্মকে সত্য বলে ঘোষনা করছে। এ কথা চিন্তা করে সে আয়াতটি অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হয়। আবার একজন মুসলমান যখন এ আয়াতটি পড়ে তখন সে-ও কোনো চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন বোধ করে না। কারণ এ বাক্যে যে ধর্মকে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলা হয়েছে, সে নিজেও তাকে তাই বলে মানে। অথবা যদি কিছু চিন্তা-ভাবনা করার জন্যে তার মনে কোনো আলোড়নের সৃষ্টি হয় তাহরে তা সাধারণত এ জন্যে যে, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ও অনুরূপ অন্যান্য ধর্মের সাথে ইসলামের তুলনা করে ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু আসলে কুরআনের এ বাক্যটি এমন যে, একজন চিন্তাশীল জ্ঞানপিপাসুর উচিত এ নিয়ে গভীরবাবে চিন্তা-ভাবনা করা। এ যাবত এর ওপরে যতখানি চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছে তার চেয়ে অধিক চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন।

কুরআনের এ দাবীটি যথাযথভাবে হৃদয়ংগম করার জন্যে সর্বপ্রথম আমাদের ‘আদ্বীন’ এবং ‘আল ইসলাম’ শব্দ দু’টোর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হবে।

আদ্বীনের তাৎপর্য

আরবী ভাষায় ‘দ্বীন’ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর এক অর্থ বিজয়, পরাক্রম, বশীভূত করা ও দখল করা। আর এক অর্থ আনুগত্য ও দাসত্ব। তৃতীয় অর্থ প্রতিফল ও প্রতিদান। চতুর্থ অর্থ নিয়ম-পদ্ধতি ও জীবন বিধান। এখানে এ শব্দটি চতুর্থ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ দ্বীনের অর্থ হলো জীবন যাপনের সেই ব্যবস্থা ও বিধান অথবা চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি যা মেনে চলতে হবে।

কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, কুরআন শুধু ‘দ্বীন’ বলছে না বরং ‘আদ্বীন’ বলছে। ইংরেজীতে This is a way of life বলার পরিবর্তে This is the way of life বললে অর্থের যে পার্থক্য হয় এখানেও তাই হচ্ছে। অর্থাৎ কুরআনের দাবী এ নয় যে, আল্লাহর নিকেট ইসলাম একটা জীবন ব্যবস্থা। বরং তার দাবী হলো, একমাত্র ইসলামই সত্যিকার এবং সঠিক জীবনপদ্ধতি বা চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি।

তারপর এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, কুরআন এ শব্দকে কোনো সংকীর্ণ বা সীমাবদ্ধ অর্থে ব্যবহার করেনি বরং ব্যাপকতম অর্থে ব্যবহার করেছে। জীবন পদ্ধতি বা জীবন ব্যবস্থা অর্থ জীবনের কোনো বিশেষ দিক বা বিভাগের পদ্ধতি নয় বরং সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজেরও পদ্ধতি। একটা বিশেষ দেশ, জাতি বা যুগের জীবন পদ্ধতি নয় বরং সকল যুগের সকল মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনপদ্ধতি। সুতরাং কুরআনের দাবীর মর্ম এ নয় যে, খোদার নিকেট পূজা-অর্চনা, ঊর্ধ-জগৎ সংক্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস এবং মরণোত্তর জীবনের ধারণার একটা সঠিক সমষ্টি এমন এক বস্তু যার নাম ইসলাম। এর তাপর্য এটাও নয় যে, ব্যক্তিবর্গের ধর্মীয় চিন্তা ও কর্মের (পাশ্চাত্যের পরিভাষায় ধর্ম শব্দটি যে সংকীর্ণ অর্থে গৃহীত হয়েছে, সেই অর্থে) একটা বিশুদ্ধ পদ্ধতির নাম ইসলাম। উপরন্তু কুরআনের দাবীর মর্ম এও নয় যে, আরব দেশের লোকের জন্যে অথবা অমুক শতাব্দী পর্যন্ত সকল মানুষের জন্যে অথবা শিল্প-বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত যারা দুনিয়ায় এসেছে, তাদের জণ্যে একটা বিশুদ্ধ ও নির্ভুল জীবন ব্যবস্থাকেই ইসলাম নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে বরং তার সুস্পষ্ট দাবী এই যে, সকল যুগের সমগ্র মানবজাতির জন্যে দুনিয়ার জীবন যাপনের একটি মাত্র পন্থা ও পদ্ধতি আল্লাহর দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ ও সঠিক এবং তারই নাম ‘আল ইসলাম’।–[অত্যন্ত আশ্চর্যের কথা যে, এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী কোনো স্থানে কুরআনের এক অভিনব তাফসীর করা হয়েছে। যার দৃষ্টিতে দ্বীনের মর্ম বান্দাহ ও খোদার ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যেই সীমিত এবং তামাদ্দুন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এ তাফসীর যদি স্বয়ং কুরআন থেকেই গ্রহণ করা হয়ে থাকে তাহলে নিসন্দেহে তা মজার জিনিসই হবে। কিন্তু আমি দীর্ঘ আঠারো বছর যাবত কুরআনের গভীর তত্ত্বানুসন্ধানের ব্যাপৃত থেকে যা বুঝতে পেরেছি তার ভিত্তিতে নির্ভয়ে এ কথা বলতে পারি যে, আধুনিক তাফসীরকারগণ যত মনগড়া ব্যাখ্যাই দিন না কেন, কুরআন ‘আদ্বীন’ শব্দকে কোনো সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করেনি বরং একে সকল কালের সকল মানুষের জন্যে ‘সমগ্র জীবনের চিন্তা ও কর্মের বিধান’ অর্থেই ব্যবহার করেছি। (একটি তুর্কী সাংবাদিক প্রতিনিধিদল ১৯৪৩ সালে ভারত সফরে এসে উক্ত মন্তব্য করেছিলেন। গ্রন্থকার সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন)]

আল ইসলাম-এর তাৎপর্য

এখানে ‘ইসলাম’ শব্দের ব্যাখ্যা করা যাক। আরবী ভাষায় এর অর্থ অস্ত্র সমর্পণ করা, নত হওয়া, আনুগত্য স্বীকার করা ও আত্মসমর্পণ করা। কিন্তু কুরআন শুধু ইসলাম বলেনি –বলেছে ‘আল ইসলাম’। এটা তার বিশেষ পরিভাষা। এ বিশেষ পরিভাষিক শব্দকে সে যে অর্থে ব্যবহার করেছে তা হলো আল্লাহর সামনে নত হওয়া, তাঁর আনুগত্য করা, তাঁর সামনে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়া এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা। অবশ্য এ আত্মসমর্পণের অর্থ প্রাকৃতিক নিয়মের Law of nature) সামনে আত্মসমর্পণ করা নয়। কেউ কেউ অবশ্য এ ভুল ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এর অর্থ এও নয় যে, মানুষ নিজের কল্পনাশক্তিকে প্রয়োগ করে অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা আল্লাহ কি চান ও কিসে খুশী হন সে সম্পর্কে আপনা থেেকই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে তার আনুগত্য করবে। অন্য কিছু লোক ভাল করে এটাই বুঝে নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাঁর রসূলদের মাধ্যমে চিন্তা ও কর্মের যে পথ ও পদ্ধতি জানিয়ে দিয়েছে, তাই মেনে নিতে হবে এবং নিজের চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা তথা স্বেচ্চাচার বিসর্জন দিয়ে ঐ পথ ও পদ্ধতির আনুগত্য ও অনুসরণ করতে হবে। পবিত্র কুরআন ‘আল ইসলাম’ শব্দ দ্বারা এ কথাই বুঝিয়েছেন। এটা কোনো নতুন যুগ ধর্ম নয় এবং এখন থেকে ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মদ (সা) আরব দেশে এর ভিত্তিস্থাপন চালু করেননি। বরং যেদিন প্রথম পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছির, সেদিনই আল্লাহ মানুষকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তার জন্যে কেবলমাত্র এ ইসলামই সঠিক ও বিশুদ্ধ জীবন ব্যবস্থা। এরপর দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যত নবীই আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের পথপ্রদর্শন হয়ে এসেছেন, তাঁদের সকলেই নিরবিচ্ছিন্নভাবে এ ‘আল ইসলাম’র দিকেই মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। কোথাও এর বিন্দুমাত্র ব্যকিক্রম ঘটেনি। সবশেষে নবী মুহাম্মদ (সা)-ও ঐ একই ‘আল ইসলাম’র দিকে মানব জাতিকে আহবান জানিয়েছেন। অবশ্যি এ কথা আলাদা যে, হযরত (সা)-ও ঐ একই ‘আল ইসলামে’র দিকে মানব জাতিকে আহবান জানিয়েছেন। অবশ্যি এ কথা আলাদা যে, হযরত মূসা (আ)-এর অনুসারীগণ পরবর্তীকালে অন্যান্য বহু বিষয়ের সংমিশ্রণে ইহুদীবাদ নামে ঈসা (আ)-এর অনুসারীগণ ‘খৃষ্টবাদ’ নামে ও ভারতবর্ষ, ইরান, চীন এবং অন্যান্র দেশের নবীদের উম্মতগণও নান রকমের মিশ্র ও জগাখিচুড়ি মতবাদ তৈরী করেছে। আসলে মূসা, ঈসা এবং অন্যান্য জানা-অজানা সকল নবী যে দ্বীনের দাওয়াত দিতে এসেছিলেন তা ছিল খাঁটি ও নির্ভেজাল ইসলাম –অন্য কিছু নয়।

কুরআনের দাবী

এ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পর কুরআনের দাবী আমাদের সামনে একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। তাহলো এইঃ “মানবজাতির জন্যে জীবনযাপনের একমাত্র বিশুদ্ধ আল্লাহ মনোনীত পন্থা ও পদ্ধতি হলো আল্লাহর সামনে মাথা নত করা এবং আল্লাহর নবীদের মাধ্যমে যে চিন্তা ও কর্মের পথ ও পন্থা দেখিয়ে দিয়েছেন তা অনুসরণ করা”। এটাই হচ্ছে কুরআনের দাবী।

এখন আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে যে, এ দাবী মেনে নেয়া উচিত কি না। কুরআন নিজে দাবীর স্বপক্ষে যেসব যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছে তা তো আমরা পর্যারোচনা করবোই্। তবে তার আগে, এ দাবী গ্রহণ করা ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর আছে কি না সে সম্পর্কে নিজেরা একবার তত্ত্বানুসন্ধান করে দেখি না কেন?

জীবনপদ্ধতির আবশ্যকতা

প্রকাশ থাকে যে, মানুষের জীবন যাপনের জন্যে একটা জীবনপদ্দতি অবলম্বন করা সর্বাবস্তায়ই প্রয়োজন। মানুষ তো আর নদী নয়  যে, ভূমির চড়াই-উৎরায়ের ভেতর দিয়ে তার চলার পথ আপনা থেকেই রচিত হয়ে যাবে। মানুষ গাছগাছালি নয় যে, প্রাকৃতিক আইন তার পথ নির্ণয় করে দেবে। সে একটা নিছক প্রাণীও নয় যে, শুধু তার স্বভাব-প্রকৃতিই তার পথ প্রদর্শনের জন্যে যথেষ্ট হবে। জীবনের একটা বিরাট অংশে মানুষ প্রাকৃতিক আইনের অধীন হলেও, তার জীবনের এমন বহুদিক রয়েছে, সেখানে সে কোনো বাঁধাধরা পথ দেখতে পায় না যে অন্যান্য জীব-জানোয়ারের মত অনিচ্ছাকৃতভাবে সে পথে চলতে থাকবে। বরং তাকে বিচার-বিবেচনা করে একটা পথ বেছে নিতে হয়। তার চিন্তাশীল বিবেকের সামনে বিশ্বজগতের অনেক সমস্যা স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপিত হয় বটে, কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার কোন সমাধান সে খুঁজে পায় না। তাই এসব সমস্যা সমাধানের জন্যে তার চিন্তার একটা পথ আবশ্যক। প্রকৃতি তার পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তার মনে কতকগুলো বিক্ষিপ্ত তত্ত্ব ও তথ্য পৌঁছিয়ে দেয় বটে, কিন্তু তাকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজিযে-গুছিয়ে দেয় না। সেসব সাজিযে গুছিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্যে তার একটা জ্ঞাসের পথ প্রয়োজন। ব্যক্তিগত আচার-আচরণের জন্যে তা কিছু রীতি-পদ্ধতির প্রয়োজন, যার মাধ্যমে সে তার এমন সব দাবী পূরণ করতে পারে যার জন্যে প্রকৃতি তাদীদ করে বটে, কিন্তু তা পূরণ করার জন্যে কোনো রুচিসম্মত পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেয় না। তার দাম্পত্য জীবনের জন্যে, পারিবারিক সম্পর্ক-সম্বনন্ধের জন্যে, অর্থনৈতিক লেন-দেন ও কায়কারবারের জন্যে বহু দিক ও বিভাগের জন্যে একটা বিধান তার প্রয়োজন। সে বিধান মতে নিছক ব্যক্তি হিসেবে নয় বরং দল, জাতি ও গোষ্ঠী হিসেবে যেন জীবন যাপন করে সে লক্ষ্যে উপনীত হওয়া যায়, যা স্বভাবতঃই তার বাঞ্ছিত হলেও সে লক্ষ্যকে তার সামনে সুস্পষ্ট করে তুরে ধরেনি এবং সে লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার কোনো পন্থাও নির্ধারণ করেনি।

মানব জীবন অবিভাজ্য

জীবনের এসব বিভিন্ন দিক ও বিভাগে মানুষের কোনো একটা পথ ও পন্থা অবলম্বন করা অপরিহার্য। কিন্তু এগুলো কোনো স্থায়ী, পরস্পর স্বনির্ভর বিভাগ নয়। এ জন্যে এসব বিভিন্ন বিভাগে এমন বিভিন্ন পথ অবলম্বন করা সম্ভব নয় –যার লক্ষ্য আলাদা, পাথেয় আলাদা, যে পথে চলার ঢং ও পদ্ধতি আলাদা, চলার দাবী ও চাহিদা আলাদা এবং গন্তব্যস্থলও আলাদা। কেউ যদি মানুষ ও তার জীবন-সমস্যা উপলব্ধি করার জন্যে বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে একটুখানি চেষ্টা করে তাহলেই সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারতে যে, জীবন সামগ্রিকভাবে একটা গোটা সমষ্টি –যার প্রতিটি অংশ অপর অংশের সাথে এবং প্রতিটি বিভাগ অন্য বিভাগের সাথে ওতপ্রোত জড়িত ও অবিচ্ছেদ্য। এর প্রতিটি অংশ অপর অংশের ওপর প্রভাবশীল ও একে অপর দ্বারা প্রভাবান্বিত। সকল অংশে একই প্রাণশক্তি ছড়িয়ে থাকে এবং এসবের সমন্বয়ে যা তৈর হয় তাকে বলে মানব জীবন। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে মানুষের যা প্রয়োজন, তা জীবনের অনেকগুলো লক্ষ্য নয় বরং একটি মাত্র প্রধান লক্ষ্য। যার অধীনে সকল ছোট-বড় লক্ষ্য সামঞ্জস্যশীল থাকবে এবং প্রধান লক্ষ্যটি অর্জিত হলে অন্য সব কয়টি অর্জিত হবে। তার অনেকগুলো পথের প্রয়োজন নেই –প্রয়োজন একটি মাত্র রাজপথের যার ওপর সে তার জীবনের সব কয়টি দিক ও বিভাগসহ পূর্ণ সামঞ্জস্য সহকারে আপন জীবন লক্ষ্যের দিকে চলতে পারে। দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা, শিক্ষা, ধর্ম, নৈতিকতা, সামাজিকতা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আইন আদালম প্রভৃতির জন্যে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা নয় বরং একটি সার্বিক ব্যবস্থার প্রয়োজন। যার মধ্যে এ সবগুলোই পূর্ণ সামঞ্জস্য সহকারে অবস্থান করতে পারে, যার মধ্যে এসবের জন্যে একই মেজাজ-প্রকৃতির যথোপযুক্ত মূলনীতি থাকবে। সেসবের অনুসরণে ব্যক্তি ও সমষ্টি এবং সার্বিকভাবে গোটা মানবতা সর্বোচ্চ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। সে ছিল জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগ যখন জীবনকে স্থায়ীভাবে আলাদা বিভাগে বিভক্ত করা সম্ভব বলে মনে করা হতো। আজকাল যদি কেউ এ রকম ধারণা পোষণ করে অনর্থক কথা বলতে চায় তাহলে বলতে হবে যে, তয় তারা নিষ্ঠা সহকারে পুরণো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে ধরে আছে এবং সে জন্যে তারা করুণার পাত্র, আর না হয় তারা আসল ব্যাপারটা ভালো করেই জানে এবং জেনে-বুঝেই এ ধরনের কথাবার্তা শুধু এ জন্যে বলে যে, যে ব্যবস্থা তারা কোনো জনপদে প্রচলিত করতে চায়-[অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী ব্যবস্থা। খোদা, কিতাব ও রিসালাতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিছক পার্থিব স্বার্থের উদ্দেশ্যে দেশবাসীর জন্যে একটা জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলা।] তার মূলনীতির সাথে ভিন্নমত পোষণকারীদেরকে এ আশ্বাস দেয়ার প্রয়োজনবোধ করে যে, এ ব্যবস্থার অধীনে তারা তাদের জীবনের অমুক অমুক বিভাগে পূর্ণ নিরাপত্তা যৌক্তিকতা, স্বাভাবিকতা ও বাস্তবতার দিক দিয়ে এটা অসম্ভব। যারা এ কথা বলে থাকে, সম্ভবত তারা নিজেরাও জানে যে, এটা অসম্ভব-[এ বিষয়ে বিশদ আলোচনার জন্যে গ্রন্থাকারের প্রণীত ‘মুসলমান আও মওজুদা সিয়াসী কাশমকাশ’ ১ম ও ২ খণ্ড এবং বিশেষ করেদ দ্বিতীয় খণ্ডের বুনিয়াদী হকুক দ্রষ্টব্য।–(সংকলকদ্বয়)] প্রত্যেক বিজয়ী দ্বীন জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে তার নিজস্ব প্রাণশক্তি ও মেজাজ প্রকৃতি অনুসারে গঠন না করেই পারে না, যেমন লবণ-খনিতে পতিত জিনিস মাত্রই লবণে পরিণত হতে বাধ্য।

জীবনে ভৌগোলিক ও বংশগত বিভক্তি

মানব জীবনকে আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করা যেমন অর্থহীন ও অযৌক্তিক তার চেয়ে অধিকতর অযৌক্তিক ও অর্থহীন ভৌগোলিক সীমারেখা ও বর্ণ-বংশের ভিত্তিতে ভাগ করা। পৃথিবীর বহু স্থানে মানুষ দেখতে পাওয়া যায়, সন্দেহ নেই এবং নদী-সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত ও বন-জঙ্গল অথবা কৃত্রিম সীমান্তরেখা তাদেরকে বিভক্ত করে রেখেছে। তারপর বিভিন্ন বংশ ও জাতির মানুষও পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ঐতিহাসিক, মনস্তাত্বিক ও অন্যান্য কারণে মানবতার বিকাশ ও উন্নতি বিভিন্ন রূপ লাভ করেছে।

কিন্তু এ পার্থক্যের ওজুহাত তুলে যে ব্যক্তি বলে, প্রত্রেক বংশ, প্রত্যেক জাতি ও ভৌগোলিক জনপদের জন্যে আলাদা আলাদা ‘দ্বীন’ বা জীবন ব্যবস্থা রচনা করা দরকার, সে নিছক একটা প্রলাপোক্তি করে। তার সংকীর্ণ দৃষ্টি বাহ্যিক রূপ ও আকার-আকৃতির পার্থক্যের মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। এ বাহ্যিক রকমফেরের অভ্যন্তরে বিরাজমান মানবতার একক ও অভিন্ন সত্তার অস্তিত্ব সে উপলব্ধি করতে পারেনি। তথাপি এ পার্থক্যগুলো যদি বাস্তবিকই এতবেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে যে, এর কারণে আলাদা আলাদা জীবনব্যবস্থা হওয়া দরকার, তবে আমি বলবো, একটি দেশ ও অপর দেশের মধ্যে এবং একটি বংশ ও অপর একটি বংশের মধ্যে যতখানি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তা যত অতিরঞ্জিত করে লিখতে চান লিখুন। এরপর যে কোনো দেশের স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে, যে কোনো একজন মানুষ ও অপর একজন মানুষের মধ্যে এবং একই পিতা-মাতার দুই সন্তানের মধ্যে যে পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়, তার নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করুন। আমি নিশ্চিত যে, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রথমোক্ত পার্থক্যের চেয়ে দ্বিতীয় পার্থক্যই অধিকতর প্রকট হয়ে দেকা দেবে। তাহলে প্রত্যেকটি মানুষের জন্যেই আলাদা আলাদা জীবনব্যবস্থার সুপারিশ করেন না কেন? বস্তুত ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, স্ত্রী-পুরুষে এবং পরিবারে পরিবারে যে পার্থক্য, তার অভ্যন্তরেও ঐক্যের একটা স্থায়ী উপাদান অবশ্যই লক্ষণীয় এবং তারই ভিত্তিতে একটা জাতি, একটা দেশ ও একটা বংশের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব। আর সে জন্যেই এটা জাতি বা একটা দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্যে একটি মাত্র জীবনব্যবস্থা হওয়া সম্ভব বলে মনে করা যেতে পারে। আর সেটা যখন সম্ভব, তখন জাতীয়, দেশীয় ও বংশীয় পার্থক্যের বিপুলতার মধ্যেও একটি মৌলিক ঐক্যের উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না কেন? আর কেনইবা তার ভিত্তিতে গোটা মানব জাতিকে একটি অখণ্ড একক বলে মনে করা এবং সমগ্র মানব জগতের জন্যে একটি মাত্র দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা রচিত হওয়া সম্ভব হবে না? এ কথা কি সত্য নয় যে, সমস্ত ভৌগোলিক, জাতিগত ও বংশীয় পার্থক্য সত্ত্বেও প্রকৃতি মৌলিক বিষয়গুলোর বিচারে সকল মানুষ সমান, একই প্রাকৃতির নিয়মের অধীন সকল মানুষের পার্থিব জীবন অতিবাহিত হয়, একই দৈহিক নিয়মে সকল মানুষ গঠিত, মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে আলাদা একটা জাতির মর্যাদা দিয়েছে যে বৈশিষ্ট্যসমূহ তাও সকল মানুষের মধ্যে সমানভাবে বিদ্যমান, জন্মগতভাবে প্রাকৃতিক চাহিদা ও দাবিসমূহের সকল মানুষ সমান অংশীদার, একই রকমের দৈহিক ও মনস্তাত্বিক, শক্তির সমাবেশে প্রতিটি মানুষের মানবিক সত্তা গঠিত। সর্বোপরি এ কথাও কি ঠিক নয় যে, মানবজবিনে সক্রিয় ও প্রভাবশালী সমস্ত দৈহিক, মনস্তাত্বিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারণগুলো সকল মানুষের বেলায় একই রকম? এসব ব্যাপারে সকল মানুষ যখন বাস্তবিক পক্ষে সমান, তখন যে মৌলিক নীতি ও আদর্শ সকল মানুষের কল্যাণের জন্যে বিশুদ্ধ ও নির্ভুল, তাও বিশ্বজনীন ও সার্বজনীন হওয়া উচিত। এ মৌলিক নীতি ও আদর্শ এক এক দেশে, এক এক জাতি ও এক এক বংশের জন্যে এক এক রকম হ পারে না। বিভিন্ন জাতি ও বংশ এ মূলনীতি ও আদর্শের আওতায় নিজেদের আলাদা গুণ-বৈশিষ্ট্যের অভিব্যক্তি ঘটাতে এবং আংশিকভাবে নিজেদের জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বিভিন্ন পন্থায়ও করতে পারে এবং তা করাও উচিত। তবে মানুষ হিসেবে মানুষের জন্যে যে নির্ভুল ‘দ্বীন’ বা জীবন ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা সর্বাবস্থায়ই এক ও অভিন্ন হতে হবে। যে জিনিস এক জাতির বেলায় সঠিক তা অন্য জাতির বেলায় ভুল হবে, আর যে জিনিস এক জাতির বেলায় ভুল তা অন্য জাতির বেলায় সঠিক হবে –এ কথা বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

জীবনের কালগত বিভক্তি

বাহ্যিক পার্থক্যের ভিত্তিতে জীবনকে বিভক্ত করার স্বপক্ষে কয়েকটি অসার বক্তব্যের পর্যালোচনা ইতিপূর্বে করা হয়েচে। সে ধরনের আরো একটি অসার বক্তব্য যা খুব নিশ্চয়তা ও পাণ্ডিত্য সহকারে ইদানিং পেশ করা হচ্ছে, অথচ আসলে সেটাই সবচেয়ে অসার ও ভ্রান্ত কথা –তাহলো জীবনের কালগত বিভক্তি। এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, একটা জীবনব্যবস্থা এক সময়ে ঠিক থাকে আবার অন্য সময়ে তা ভুল প্রমাণিত হয়। কেননা জীবনের সমস্যাবলী প্রত্যেক যুগে পরিবর্তনশীল। অথচ জীবনব্যবস্থা ভুল কি নির্ভুল তা নির্ভর করে জীবনের সমস্যাবলীর ওপর। মজার কথা এই যে, মানবজীবন সম্পর্কে এ বক্তব্য উচ্চারণ করা হয়, সেই জীবনকে নিয়েই আবার একই সাথে ক্রমবিকাশের কথাবার্তাও বলা হয়। আর জীবনের ক্রমবিকাশের কথা যখন ওঠে, তখন তাতে প্রভাব বিস্তারকারী, ঐতিহাসিক নিয়ম-কানুনের অনুসন্ধানও চালানো হয়,তার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আহরণ করা হয় বর্তমানের জন্যে শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্যে পথনির্দেশ। এমনকি ‘মানুষের স্বভাব প্রকৃতি’ নামে একটা জিনিসের অস্তিত্ব রয়েছে, এটাও যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করা হয়। আমার জিজ্ঞাসা এই যে, যাঁরা জীবনের কালগত বিভক্তিতে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে মানব জাতির এ অব্যাহত ঐহিহাসিক বিবর্তনের মাঝে যুগ বা কালের সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করার মত কোনো পরিমাপ যন্ত্র আছে কি? আর যদি কোনো সীমানা চিহ্নিত করাও হয় তবে তার কোনো একটি সীমারেখাকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বলা সম্ভব হবে কি যে, এ সীমারেখার অপর পারে জীবনের যেসব সমস্যা ছিল এপারে এসে তা একেবারেই বদলে গেছে, আর অপর পারে যে অবস্থা ছিল এ পারে তা আর অবশিষ্ট নেই? যতি সত্যিই মানুষের জীবন এ রকম বিচ্ছিন্ন কালগত খণ্ডে বিভক্ত হয়ে থাকে, তাহলে ধরে নেয়া উচিত যে, অতীত খণ্ডটি তার পরবর্তী খণ্ডের জন্যে একেবারেই নিরর্থক বস্তু। সে খণ্ডটি অতিক্রান্ত হওয়ার পর সে যুগে মানুষ যা কিছু করেছে তা সব বৃথা হয়ে গেছে। যে যুগে মানুষ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তাতে পরবর্তী যুগের জন্যে কোনোই শিক্ষা নেই। কেননা সে অবস্থাও নেই, সে সমস্যাও আর নেই। তাই সে অভস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ও সেসব সমস্যার সমাধানের নিমিত্ত মানুষ যে চেষ্টা-সাধনার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, তারও কোনো মূল্য নেই। তাহলে তো ক্রমবিকাশ নিয়ে কথাবার্তা বলারও কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। জীবনের ওপর প্রভাবশীল ঐতিহাসিক নিয়ম-কানুনের সন্ধান চালানোরও কোনো স্বার্থকতা থাকে না। থাকতে পারে না। ক্রমবিকাশের কথা যখন উচ্চারণ করা হয় তখন অনিবার্যভাবেই স্বীকার করে নেয়া হয় যে, সেখানে কোনো একটা জিনিস নিশ্চয়ই আছে, যার পরিবর্তন ঘটে এবং সকল পরিবর্তনের মধ্য নিয়েও নিজের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সে ক্রমাগতভাবে বিচরণশীল থাকে। জীবনের নিয়ম-কানুনের কতা যখন আলোচনা করা হয় তখন স্বভাবতঃই এ কতা মেনে নেয়া হয় যে,  এত সব উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া ও আবর্তন-বিবর্তনের মধ্যে একটা শাশ্বত জীবন সত্যও রয়েছে যার একটা নিজস্ব স্বভাব-প্রকৃতি ও স্বতন্ত্র নিয়ম-বিধি বর্তমান। ইতিহাসের নযীর দেখিয়ে যখন কোনো শিক্ষা আহরণ করা হয় তখণ তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, ইতিহাসের এ সুদীর্ঘ রাজপথ পরিভ্রমণ করে যে পথিক ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে এবং একের পর এক মনযিল অতিক্রম করছে, তার নিজস্ব একটা সত্তা ও স্বতন্ত্র একটা চরিত্র রয়েছে। সে সত্তা বিশেষ অবস্থায় বিশেষ পন্থায় কাজ করে এবং এক সময় যা গ্রহণ করে অন্য সময় তা প্রত্যাখ্যান করে ও নতুন জিনিসের দাবী জানায়। এ শাশ্বত সত্য, এ চিরন্তন পরিবর্তনশীল বস্তু এবং ইতিহাসের রাজপথে পরিভ্রমণরত বিভিন্ন মনযিল, তার অবস্থা ও সমস্যাবলী নিয়ে যখন আলোচনা শুরু করা হয়, তখন এমন তন্ময় হয়ে আলোচনা করা হয় যে, স্বয়ং পথিকের কথাই আর মনে থাকে না, রাজপথের মনযিল এবং তার অবস্থা ও সমস্যাহর পরিবর্তন হতে পার্ তাই বলে কি পথিক ও তার স্বকীয়তা পাল্টে যায়? আমি তো দেখতে পাই, সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তার মৌল কাঠামোতে কোনো পরিবর্তনই হয়নি। যে মৌলিক উপাদানে মানুষ হাজার হাজার বছর আগে গঠিত হত আজও সেসব উপাদানেই গঠিত হয়। তার মেযাজ, তার স্বভাব-প্রকৃতির দাবী ও চাহিদা, তার গুণ-বৈশিষ্ট্য, তার আবেগ-অনুভূতি, তার জোঁক-প্রবণতা, তার ক্ষমতা ও যোগ্যতা, তার দুর্বলতা ও সামর্থ, তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং প্রভাব বিস্তার ও প্রভাব গ্রহণের ক্ষমতা, তার ওপর কর্তৃত্বশীল শক্তিগুলো এবং তার প্রাকৃতিক ও মহাজাগতিক পরিবেশ –সবই আগে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে এর মধ্যে কোনো একটি ব্যাপারেও সৃষ্টির আদিকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কণা পরিমাণও পার্থক্য ঘটেনি। বস্তুত ইতিহাসের আবর্তন-বিবর্তন চলাকালে অবস্থার হেরফের এবং তা থৈক উদ্ভুত সমস্যাবলীর পরিবর্তনে স্বয়ং মানুষের মনুষ্যত্বও পরিবর্তিত হয়ে যায় কিংবা মনুষ্যত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলোও পরিবর্তিত হয়ে যায় –এমন দাবী করার ধৃষ্টতা কেউ দেখাতে পারেনা। আর তা যখন পারে না তখন মানুষের জন্যে কাল যা অমৃততুল্য ছিল আজ তা বিষতুল্য হয়ে গেছে, কাল যা সত্য ছিল আজ তা মিথ্যা হয়ে গেছে এবং কাল যা মূল্যবান ছিল আজ তা মূল্যহীন হয়ে গেছে –এ কথা কিভাবে মেনে নেয়া যেতে পারে?

মানুষের জন্যে কি ধরনের জীবনব্যবস্থা প্রয়োজন

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ইতিহাসের আবর্তন-বিবর্তনকালে মানব সত্তা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলোকে বুঝতে গিয়ে মানুষ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে বিভ্রান্তি ও প্রতারনার শিকার হয়েছে। কোনো সত্যকে অতিরঞ্জিত করে উপলব্ধি করেছে, আবার কোনোটাকে বুঝতে ভুল করেছে, যার ফরে বিভিন্ন সময়ে ভুল জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পরবর্তীকালে বৃহত্তর মানবতা (Humanity at large) পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সে জীবনব্যবস্থায় অসারতা বুঝতে পেরে অনুরূপ আর এক জীবনব্যবস্থার জন্যে তাকে পরিহার করেছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে, মানবজাতির জন্যে প্রত্যেক যুগেই একটা আলাদা জীবনব্যবস্থা তৈরী হবে কেবল যে যুগেরই অবস্থা ও সমস্যার আলোকে এবং সেসব সমস্যার সমাধানেই তা সচেষ্ট হবে। অথচ এরূপ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একমাত্র এ সিদ্ধান্ত যথার্থ হতে পারে যে, এরূপ যুগ ও কালভিত্তিক জীবনব্যবস্থা অথবা অন্য কথায় মৌসুমী ভুঁইফোঁড় ব্যবস্থাকে বার বার পরীক্ষা করা এবং প্রত্যেকটির ব্যর্থতার পর তার স্থলাভিষিক্ত অন্য একটিকে পরীক্ষা করায় মানবজাতির মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়া ছাড়া আর কোনো ফলোদয় হয় না, এতে করে তার অগ্রগতি ব্যাহত হয় এবং তার উন্নতি ও বিকাশ এবং ইপ্সিত চরম লক্ষ্যে পৌঁছাবার পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। আসলে সে চরম মুখাপেক্ষী এমন এক জীবন-ব্যবস্থার যা রচিত হবে তার ও তার সাথে সম্পর্কযুক্ত সকল তত্ব ও তথ্য সম্বন্ধে সম্যক অবহিত হওয়ারপর বিশ্বজনীন শাশ্বত ও চিরন্তন নীতিমালার ভিত্তিতে। সে জীবন ব্যবস্থা অবলম্বন করে সে বর্তনা ও অনাগতকালের সকল পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে নিরাপদে এগিয়ে যেতে পারবে এবং উদ্ভুত যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে জীবনের রাজপথে উঠা-পড়া করে নয় –বরং দ্রুত পদক্ষেপে মনযিলে মকসুদের দিকে দাবিত হতে সক্ষম হবে।

এরূপ জীবনব্যবস্থা কি মানুষ নিজেই রচনা করতে সক্ষম

এটাই হচ্ছে ‘দ্বীন’ জীবন পদ্ধতি অথবা জীবন বিধান –মানুষ যার মুখাপেক্ষী। এখন আমাদের ভেবে দেখতে হবে যে, মানুষ যদি আল্লাহর সাহায্য ছাড়া নিজেই নিজের জন্যে এ ধরনের একটা জীবনব্যবস্থা রচনা করতে চায, তাহলে সে চেষ্টায় তার সফলকাম হওয়া সম্ভব কিনা। আমি এ প্রশ্ন তুলতে চাই না যে, মানুষ আজ পর্যন্ত এরূপ একটা জীবনব্যবস্থা নিজে নিজে তৈরী করতে পেরেছে কিনা। কোনো সে প্রশ্নের জবাব অকাট্যবাবে ই ‘না’ সূচক্ এমনকি এ যুগে যারা খুব গালভরা দাবী তুলে নিজ নিজ জীবন-ব্যবস্থা উপস্থাপিত করছে এবং তার জন্যে একে অপরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম-সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে, তারাও এ দাবী করতে পারবে না যে, তাদের মধ্যে কারো উপস্থাপিত জীবন বিধান ঐসব প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে যার জন্যে মানুষ হিসেবে একটি ‘আদ্বীনের’ মুখাপেক্ষী। কেননা কারও জীবনব্যবস্থা বংশ অথবা জাতিভিত্তিক, কারও জীবনব্যবস্থা ভৌগোলিক, কারওটা শ্রেণীভিত্তিক, আবার কারও জীবনব্যবস্থা সবে অতিবাহিত হয়ে যাওয়া যুগ চাহিদা অনুসারে রচিত। অনাপাতকালের অবস্থা ও সমস্যাবলী তা উপযোগী প্রমাণিত হবে কিনা সে সম্পর্কে কিছুই বলা সম্ভব নয় কেননা যে যুগ অতিক্রান্ত হচ্ছে তার ঐতিহাসিক দাবী কি, তার পর্যারোচনা এখনো করা হয়নি। এ জন্যে আমার প্রশ্ন এটা নয় যে, মানুষ এ ধরনের একটা জীবনব্যবস্থা তৈরী করতে পেরেছে কিনা। বরং প্রম্ন এই যে, তৈরী করতে পারে কিনা।

বস্তুত এটা একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সে জন্যে এর সংক্ষিপ্ত আলোচনা সঙ্গত হবে না। মানব জীবনের সিদ্ধান্তকর প্রশ্নগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তাই ভালো করে বুঝে নেয়া দরকার যে, সে জিনিসটা কি, যা রচনা করার প্রশ্ন এখানে উঠেছে এবং সে ব্যক্তির যোগ্যতাই বা কতটুকু যার সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, এটা রচনা করতে পারে কিনা।

‘আদ্বীন’ বলতে কি বুঝায়

মানুষের জন্যে যে ‘আদ্বীন’-এর অপরিহার্যতা এইমাত্র আমি প্রমাণ করলাত তা সর্ব যুগের সখল অবস্থার জন্যে ছোটবড় ও খুঁটিনাটি সমস্ত বিধি ব্যবস্থা সম্বলিত একটি বিস্তারিত বিধান নয় যা বিদ্যমান থাকাকালে মানুষ তদনুযায়ীই কাজ করবে। বরং তা আসলে এমন সব সার্বিক, আদি ও শাশ্বত মূলনীতি যা সকল অবস্থায় মানুষকে পথ দেখাতে পারে, তার চিন্তা ও দৃষ্টি, চেষ্টা-সাধনা ও অগ্রযাত্রার সঠিক দিক নির্দেশ করতে পারে এবং ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় শক্তি ও শ্রমের অপচয় থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে।

এ উদ্দেশ্যে মানুষের সর্বপ্রথম করণীয় এইযে, তাকে তার নিজের ও বিশ্বজগতের রহস্য কি এবং এ বিশ্বজগতে তার অবস্থান ও মর্যাদা কি সে সম্পর্কে কোনো আন্দাজ অনুমান নয় বরং সুস্পষ্ট ও নির্ভুল জ্ঞান লাভ করতে হবে।

এরপর তাকে এটাও জেনে নিতে হবে যে, এ পার্থিব জীবনই কি তার গোটা জীবন না গোটা জীবনের একটা প্রাথমিক অংশ মাত্র। তার সফর কি কেবল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্তই না এটা সফরের একটা পর্যায় মাত্র।

এরপর অপরিহার্যভাবে তার জন্যে এমন একটা জীবন লক্ষ্য স্থিরীকৃত হতে হবে যা মানুষের ইচ্ছা নির্ভর লক্ষ্য হবে না বরং আদতেই তা মানব জীবনের লক্ষ্য হবে, সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যেই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে লক্ষ্যের সাথে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত এবং সামগ্রিকভাবে গোটা মানবজাতির যাবতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কোনো রকম দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ছাড়াই সুসামঞ্জস্য হতে পারবে।

তারপর তার জন্যে নৈতিকতার এমন কতকগুলো অটুট ও সর্বাত্মক মূলনীতি প্রয়োজন যা তার সহজাত গুণ-বৈশিষ্ট্যের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে এবং সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতিতে তা তাত্ত্বিক ও বাস্তব উভয় পর্যায়ে কার্যকর ও কার্যোপযোগী হতে পারবে। সে যাতে নিজের চরিত্র গঠন করতে পারে, জীবন পথ পরিক্রমায় প্রতিটি স্তরে উদ্ভুত সমস্যাবলীর সমাধানে দিক নির্দেশনা লাভ করতে পারে আর পরিবর্তনশীল অবস্থা ও সমস্যাবলীর সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে যাতে তার নৈতিক আদর্শ ক্রমাগত ভাঙা-গড়ার শিকার না হতে থাকে এবং সে একজন নীতিহীন ও সুবিধাবাদী লোক হিসেবে গণ্য না হয়, সে জন্যেই তার এসব মূলনীতির একান্ত প্রয়োজন।

তারপর তার জন্যে সমাজ ব্যবস্থা সংক্রান্ত কতিপয় স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ব্যাপকভিত্তিক মূলনীতি প্রয়োজন। মানুষের সমাজবদ্ধতার তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য এবং তার স্বভাবগত চাহিদা ও দাবীর সম্যক উপলব্ধির ভিত্তিতে গঠিত হওয়া চাই এসব মূলনীতি। এতে না থাকবে চরম নূন্যতা, না থাকবে সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং ভারসাম্যহীনতা। এ সকল মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতকারী এবং সর্বযুগের মানবজীবনের সকল দিকের গঠন, বিনির্মাণ, উন্নয়ন ও বিকাশ সাধনের সহায়ক।

তারপর ব্যক্তিচরিত্র, সামষ্টিক আচরণ এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চেষ্টা-তৎপরতাকে নির্ভুল পথে চালিত করা ও বিপথগামতা থেকে রক্ষা করার জন্যে তার প্রয়োজন কতকগুরো স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নির্ভুল বিধি-বিধানের যা তার জীবনের রাজপথে পথের দিশারী হিসেবে কাজ করবে এবং প্রত্যেক মোড়ে, প্রত্যেক চৌরাস্তায় এবং প্রত্যেক বিপজ্জনক পর্যায়ে তাকে সাবধান করে তার সঠিক পথ দেখিয়ে দেবে।

তাছাড়া তার জন্যে আরো কতকগুলো ব্যবহারিক বিধিরও প্রয়োজন –যা চিরদিন সার্বজনীনভাবে পালন করতে হবে। আলোচ্য ‘আদ্বীন’ বা স্বয়ংসম্পূণ জীবনব্যবস্থায় মানুষ ও বিশ্বলোকের যে নিগূঢ় তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে, জীবনের যে লক্ষ্য, যে পরিণতি, যে নৈতিক ও সামাজিক মূলনীতি এবং আচরণ নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সাথে মানুষের সম্পর্ক-বন্ধন অটুট রাখার উদ্দেম্যেই এসব ব্যবহার-বিধির প্রয়োজন।

এসব মৌলনীতি ও বিধির সমন্বয়ে গঠিত হয় সেই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সেই জীবন-ব্যবস্থা রচনায় আমাদের আলোচন্য বিষয়। এবার ভেবে দেখতে হবে এরূপ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা রচনা করার প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ মানুষের আছে কিনা।

মানুষের উপায়-উপকরণের পর্যালোচনা

নিজের ‘দ্বীন’ বা জীবনব্যবস্থা রচনার জন্যে অনধিক চারটি উপায়-উপকরণ মানুষের হাতে রয়েছে। এর প্রথমটি হলো ইচ্ছা, দ্বিতীয়টি বুদ্ধিবৃত্তি, তৃতয়িটি পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ এবং চতুর্থটি অতীত অভিজ্ঞতার ঐতিহাসিক প্রমাণচিত্র। এ চারটি ছাড়া পঞ্চম কোনো উপকরণের সন্ধান দেয়া সম্ভব বলে মনে হয় না। এ চারটি উপকরণের প্রত্যেকটি নিয়ে যত বেশী পারেন পর্যালোচনা করে দেখুন তো দেখি। আলোচ্য ‘আদ্বীন’ রচনায় এগুলো মানুষকে সাহায্য করতে পারে কি? আমি নিজের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও তত্ত্বানুসন্ধান করে কাটিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এসব উপকরণ ঐ পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থাটি রচনার কাজে কোনোই সহায়তা করতে পারে না। তবে তা যদি মানব ব্যতীত ঊর্ধলোকস্থ কোনো পথপ্রদর্শক ‘আদ্বীন’ উপস্থাপিত করেন তাহলে তা বুঝতে, চিনতে ও তার সত্যাসত্য যাচাই করতে এবং সে অনুসারে জীবনের বিস্তারিত খুঁটিনাটি বিধি রচনা করতেও এগুলো সহায়ক হতে পারে।

একঃ ইচ্ছাশক্তি

প্রথমে ইচ্ছাশক্তির কথাই ধরা যাক। এটা কি মানুষের পথপ্রদর্শক হতে পারে? ইচ্ছাশক্তি যদিও মানুষের আসল প্রেরণাদায়ক ও কর্মোদ্দীপক শক্তি। কিন্তু এর স্বভাব প্রকৃতিতে যেসব দুর্বরতা বর্তমান, তাতে মানুষকে জীবনের নির্ভুল পথে সন্ধান দেয়ার ক্ষমতা এর কখনোই থাকতে পারে না। পথের সন্ধান দেয়া তো দূরের কথা, এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞানকে বিপথে চালিত করে থাকে। নানা রকমের প্রশিক্ষণ দিয়ে দিয়ে তাকে যতই সংস্কৃতিবান ও মার্জিত করা হোক না কেন, শেষ সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার যখনই তার ওপর ন্যস্ত করা হবে, সে শতকরা নিরানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে নির্ঘাত ভুল সিদ্ধান্তই নেবে। কেননা তার মধ্যে যেসব চাহিদা দেখা যায়, তা তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে কাম্য বস্তু দ্রুত ও সহজলভ্য হয় এমন সিদ্ধান্ত নিতেই বাধ্য করে থাকে। এটা মূলত মানবীয় ইচ্ছাশক্তির স্বভাবগত দুর্বলতা। সুতরাং ইচ্ছা ব্যক্তিত হেকা বা শ্রেণীগত অথবা রুশোবর্ণিত গণইচ্ছা (General will) হোক, মোটকথা কোনো রকমেরই মানবীয় ইচ্ছাশক্তি স্বভাবগতভাবে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা রচনায় সহায়ক হওয়ার যোগ্য নয়। বিশেষত কোনো উচ্চতর বিষয়ে –যথা মানবজীবনের মর্মকথা, তার পরিণতি ও উদ্দেশ্য নির্ণয়ে কোনো প্রকার সহায়তা করার আদৌ কোনো ক্ষমতা তার নেই এবং থাকা সম্ভব নয়।

দুইঃ বুদ্ধিবৃত্তি

এরপর বুদ্ধিবৃত্তির প্রসঙ্গে আসা যাক। এটা যে, শ্রেষ্ঠতম যোগ্যতা ও ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মানবীয় শক্তি, মানুষের জীবনে তার গুরুত্ব ও প্রভাব যে অসাধারণ এবং মানুষের জন্যে তা যে একটি বিরাট প্রেরনাদায়ক শক্তি, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু মানুষের জন্যে একটি ‘আদ্বীন’ রচনা করার দায়িত্ব অর্পণের বিষয়ে বিবেচনা করতে গেলেই প্রশ্ন জাগে যে, এ দায়িত্ব কার বুদ্ধির ওপর ন্যস্ত করা যেতে পারে? যায়েদের না বকরের? না সকল মানুষের? অথবা মানুষের কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর? চলতি যুগের মানুষের না অতীতের, না অনাগতকালের মানুষের? তথাপি এ প্রশ্ন না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু যে প্রশ্নটি মোটেই এড়িয়ে যাওয়া চলে না তাহলে এই যে, মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তির সীমা ও পরিধি বিবেচনা করার পর কেউ বলতে পারবে কি যে, একটা পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা রচনায় তার ওপর নির্ভার করা চলে কিনা এবং এ কাজ তার ওপর ন্যস্ত করা সঙ্গ কিনা? এটা তো জানা কথাই যে, তার সকল সিদ্ধান্তই পঞ্চেন্দ্রিয় তথা অনুভূতি শক্তির সংগৃহীত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। তার সংগৃহীত তথ্য ভুল হবে বুদ্ধিবৃত্তির সিদ্ধান্তও ভুল হবে। তার তথ্য অসম্পূর্ণ হলে বুদ্ধিবৃত্তির সিদ্ধান্তও হবে অসম্পূর্ণ। আর যে ব্যাপারে পাশ্চেন্দ্রিয় আদৌ কোনো তথ্য এনে দেবে না সে ব্যাপারে বুদ্দিবৃত্তি যদি নিজের ক্ষমতা সম্পর্খে সচেতন হয়ে থাকে, তবে কোনো সিদ্ধান্তই নেবে না। আর যদি দাম্ভিক হয় তবে অন্ধকারে নিস্ফল তীর নিক্ষেপ করতে থাকবে। যে বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতা এত সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ সে কিতাবে মানবজাতির জন্যে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (আদ্বীন) রচনার দায়িত্ব ঘাড়ে নেয়ার যোগ্যা হতে পারে? তাছাড়া ‘আদ্বীন’ রচনার কাজটি যেসব উচ্চতর ও জটিল সমস্যা সমাধানের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর কল্পনা, আন্দাজ-অনুমাদন ও আজগুবী ধ্যান-ধারণার ভ্তিততেই সেসব সমস্যার সমাধান করতে হবে? ‘আদ্বীন’ রচনা করার জন্যে যেসব ধারণার ভিত্তিতেই সেসব চিরন্তন নৈতিক মূল্যবোধ অপরিহার্য, সেসব সম্পর্কে পঞ্চেন্দ্রিয় খুবই অসম্পূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে থাকে। এ অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বুদ্ধিবৃত্তি পূর্ণাঙ্গ ও বিশুদ্ধ নৈতিক মূল্যবোধ নির্ণয় করে দেবে, এটা কিভাবে আশা করা যায়? এভাবে ‘আদ্বীনের’ অন্যান্য যেসব উপাদানের কথা আমি উল্লেখ করেছি, তার কোনো একটির জন্যেও পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে কোনো নিখুত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না, যার ভিত্তিতে বুদ্ধিবৃত্তি একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সর্বব্যাপী জীবনব্যবস্থা রচনায় সক্ষম হতে পারে। অধিকন্তু ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি নামক উপাদানটা বুদ্ধিবৃত্তির পেছনে স্থায়ীবাবে লেগেই আছে। সে তাকে নিরেট যুক্তিসিদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেয় না। বুদ্ধিবৃত্তি সোজা পথে চলতে চাইলেও ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি তাকে কিছুটা বাঁকা পথের দিকেই প্রবৃত্ত না করে ছাড়ে না। সুতরাং যদি ধরেও নেয়া হয় যে, মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তি পঞ্চেন্দ্রিয়ের সংগৃহীত তথ্যের বিন্যাস ও সমন্বয় সাধনে এবং তা থেকে প্রমাণ সংগ্রহে ভুল করবে না তথাপি নিজস্ব দুর্বলতার কারণে সে এতটা মক্তি রাখে না যে, তার ওপর এত বড় গুরু দায়িত্ব অর্পণ করা যায়। তার ওপর এ গুরুভার চাপালে তার ওপর ও যুলুব করা হয়, আর যে চাপায় তার ওপরও।

তিনঃ বিজ্ঞান

এখন তৃতীয় উপকরণটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এটি হলো অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ লব্ধ জ্ঞান। একজন বিজ্ঞানের ছাত্র এ জ্ঞানের কদর ও গুরুত্ব যতখানি উপলব্ধি করে আমিও ঠিক ততখানি করি। আমি একে বিন্দুমাত্রও অবজ্ঞা করি না। কিন্তু এ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাকে ব্যাপকতা দান করা যা তার মধ্যে নেই, একেবারেই অবৈজ্ঞানিক কাজ। মানবীয় জ্ঞানের সঠিক তত্ত্ব-যার জানা আছে, সে অস্বীকার করতে পারবে না যে, অতীন্দ্রীয় সমস্যার নিগুঢ় রহস্য তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সে রহস্য উদঘাটন করার প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ তার হাতে নেই। সে সরাসরিভাবে তা পর্যবেক্ষণও করতে পারে না আর যেসব জিনিস নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে, তার ভিত্তিতে যুক্তি প্রমাণ সহকারে তার সম্পর্কে এমন মতামতও প্রতিষ্ঠা করতে সে সক্ষম নয় যাকে ‘বিজ্ঞান’ নামে অভিহিত করা চলে। কাজেই আলোচ্য ‘আদ্বীন’ রচনায় যে ক’টি মৌল সমস্যার সমাধান একেবারে গোড়াতেই জেনে নেয়া অপরিহার্য, বিজ্ঞানের দৌড় যে সে পর্যন্ত পৌঁছায় না, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে, নৈতিক মূল্যবোধ নির্ণয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূলনীতিসমূহ প্রণয়ন এবং বিপথগামিতা রোধকারী সীমারেকা চিহ্নিত করার কাজ বিজ্ঞানের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় কি না? এ প্রশ্নের জবাব জানতে গিয়ে প্রথমেই কথা ওঠে যে, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কোন যুগের বিজ্ঞানের হাতে ঐ দায়িত্ব ন্যস্ত করা যায়। কিন্তু সে কথায় না গিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (আদ্বীন) রচনার কাজ সম্পন্ন করতে কি কি অত্যাবশ্যক শর্ত পালন করা প্রয়োজন, সেটাই আমাদের ভেবে দেখা উচিত। এর জন্যে পয়লা শর্ত এই যে, যেসব প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুনের অধীন মানুষের পার্থিবজীবন অতিবাহিত হয়, তা মানুষের জানা থাকা চাই। দ্বিতীয় শর্ত এই যে, স্বয়ং মানুষের আপন জীবন সংক্রান্ত যাবতীয় তত্ত্ব ও তথ্য তার পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব হওয়া চাই। তৃতীয় শর্ত এই যে, এ উভয় ধরনের জ্ঞান অর্থাৎ মানবজীবন ও প্রাকৃতিক জগত সম্পর্কে জানা সমস্ত তত্ত্ব ও তথ্য একত্র করতে হবে এবং তারপর কোনো এক পূর্ণ পরিপক্ক ও প্রাজ্ঞমস্তিষ্ক কর্তৃক সেগুলোকে নিপুণভাবে বিন্যস্ত করে সেগুলো থেকে নির্ভুল যুক্তি-প্রমাণ আহরণ করে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূলনীতিসমূহ ও ভ্রষ্টতা রোধকারী সীমারেখাসমূহ নির্ণয় করতে হবে। এসব শর্ত আজ পর্যন্ত পূর্ণ হয়নি, আর আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর পরেও তা পূর্ণ হবে এমনটি আশা করা যায় না। হয়তো বা মানবজাতির বিলুপ্তির একদিন আগে তা পূর্ণ হবে। কিন্তু তখন আর তা দিয়ে কোনো কাজই হবে না।

চারঃ ইতিহাস

সব শেষে ধরা যাক জ্ঞানের সেই উপায়-উপকরণ যাকে আমরা প্রমাণচিত্র অথবা মানবজাতির আমলনামা বলে থাকি। তার গুরুত্ব ও মঙ্গলকারিতা আমি অস্বীকার করতে পারি না। আমি শুধু বলতে চাই যে, ‘আদ্বীন’ রচনা করার মত বিরাট কাজ সমাধা করতে এটিও যথেষ্ট নয়। একটু তলিয়ে দেখলে পাঠকমন্ডলীও আমার সাথে একমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস। এখানে আমি এ প্রশ্ন তুলছি না যে, এ ঐতিহাসিক প্রমাণচিত্র অতীতকাল তেকে বর্তমানকালের মানুষের কাছে সঠিক ও সার্বিকভাবে পৌঁছেছে কি না। আর এ ঐতিহাসিক প্রমাণচিত্র বা রেকর্ডের সাহায্যে ‘আদ্বীন’ রচনা করার কাজটি সমগ্র মানব জাতির পক্ষ তেকে কার মস্তিষ্কের ওপর ন্যস্ত করা যাবে? হেগেলের না মার্কসের, না আর্নেষ্ট হাইকেলের, না অন্য কারও? আমার জিজ্ঞাস্য শুধু এই যে, অতীত, বর্তমান অথবা ভবিষ্যতের সঠিক কোন তারিখ পর্যন্ত সময়ের প্রমাণচিত্র একটি ‘আদ্বীন’ রচনার জন্যে পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ করতে সক্ষম? তারাই ভাগ্যবান যারা ঐ তারিখের পর জন্মগ্রহণ করবে। আর যারা তার আগে দুনিয়া থেকে বিদায় নিযে যাবে? আল্লাহ তায়ালাই তাদের রক্ষক।

হতামাব্যঞ্জক ফলাফল

আমি যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করলাম, আমার বিশ্বাস, এতে আমি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে অথবা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে কোনো ভুল করিনি। মানবীয় উপায়-উপকরণের যে সমীক্ষা আমি দিয়েছি তা যদি সঠিক হয় তাহলে আর বাধা-বিঘ্নের পরোয়া না করে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি যে, মানুষ নিজের জন্যে অপরিপক্ক, ত্রুটিপূর্ণ, ক্ষণস্থায়ী ও আঞ্চলিক ধাঁচের একটা জীবনব্যবস্থা হয়তো গঠন করতে পারে। কিন্তু একটা পূর্ণাঙ্গ ও কালজয়ী জীবনব্যবস্থা (আদ্বীন) রচনা করা তার পক্ষে কিছুনেই সম্ভব নয়। এটা অতীতেও অসম্ভব ছিল, আজও অসম্ভব। আর অনাগত ভবিষ্যতেও এর সম্ভাব্যতার কোনোই আশা নেই।

এমতাবস্থায় নাস্তিকদের মতানুসারে যদি মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্যে কোনো ‘খোদা’ না-ই থেকে থাকে, তবে তার আত্মহত্যাই করা উচিত। যে পথিকের পথপ্রদর্শকও নেই, পথের সন্ধান লাভের বিকল্প কোনো উপায়ও নেই, চরম হতাশা ছাড়া আর কপারে আর কিছুই জুটতে পারে না। সে পথের বাঝেই একটা পাথরে সজোরে মাথা ঠুকে নিজের সমস্ত সমস্যা চুকিয়ে ফেলুক –এ উপদেশ ছাড়া তার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের তাকে আর কিছুই দেয়ার থাকতে পারে না। আর যদি ‘খোদা’ থেকে থাকে কিন্তু সে খোদা পথপ্রদর্শক খোদা না হন –যেমন দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের একটি গোষ্ঠী এরূপ এক বিশেষ ধাঁচের খোদার অস্তিত্ব প্রমাণে সচেষ্ট রয়েছেন –তাহলে সে তো আরো শোচনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যে খোদা বিশ্বজগতের সকল বস্তু ও প্রাণীর টিকে থাকা ও বিকাশ বৃদ্ধিলাভের জন্যে প্রয়োজনীয় সবকিছুই দিলেন অথচ তার সবচেয়ে বেশী দরকারী জিনিসটা অর্থাৎ তার জীবন যাপনের বিধান ও পদ্ধতিটা দিলেন না, তার তৈরী করা দুনিয়ায় বাস করাই এক মারাত্মক বিপদ। সত্য বলতে কি, এর চেয়ে বড় বিপদ আর কল্পনাই করা যায় না। কেননা ঐ জীবনপদ্ধতি ছাড়া গোটা মানবজাতির জীবনটাই বৃথা হয়ে যায়। এমতাবস্থায় গরীব, অনাথ, রোগী, দুঃখী, আহত ও মযলুম মানুষের জন্যে বিলাপ করা প্রয়োজন। সে বারবার ভুল জীবন দর্শনের ব্যর্থ পরীক্ষা চালায়। চলতে চলতে হোঁচট খেযে পড়ে যায়, তারপর উঠে চলতে আরম্ভ করে, অতপর আবার হোঁচট খায়। আর প্রবিারে যখন হোঁচট খায়, তখন দেমের পর দেশ ও জাতির পর জাতি ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। সে এতই দিশেহারা যে, নিজের জীবনের উদ্দেশ্যটা কি, তাও সে জানে না। কিসের জন্যে সে কাজকর্ম করবে, চেষ্টা-তদবীর চালাবে আর কি নিয়ম-পদ্ধতিতে চালাবে, তাও তার অজানা। যে খোদা তাকে সৃষ্টি করে দুনিয়ায় বসবাস করতে দিয়েছেন তিনি যেন তার এ সমস্ত দুর্গতি নীরবে দেখছেন। যেন কেবল সৃষ্টি করার ভাবনাই তিনি ভাবেন। দুনিয়ার বেঁচে থাকা ও কাজকর্ম করার নিয়ম জানিয়ে দেয়ার কোনো ধার ধারেন না।

একমাত্র আশার আলো

কুরআন আমাদের সামনে এ চিত্রের সর্ম্পূণ বিপরীত অন্য এক অবস্থার চিত্র পেশ করছে। কুরআন বলে, আল্লাহ শুধু সৃষ্টিকর্তা নন, তিনি পথপ্রদর্শকও। তিনি বিশ্বচরাচরে বিরাজমান প্রতিটি জিনিসকে তার স্বভাব-প্রকৃতির দিক দিয়ে প্রয়োজনীয় সকল পথনির্দেশ দিয়েছেন।

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩০ পৃষ্ঠায়)

“যিনি প্রতিটি জিনিসকে তার দৈহিক কাঠামো দিয়েছেন অতপর তাকে পথনির্দেশ দিয়েছেন”।–(সূরা তা-তাঃ ৫০)

এর প্রমাণ দেখতে হলে যে কোন একটা পিঁপড়ে, মাছি বা মাকড়শাকে ধরে দেখা যেতে পারে। এসব নগণ্য সৃষ্টিকে যে খোদা জীবনযাপনের পথ দেখিয়েছেন, সেই একই খোদা মানুষকেও পত দেখিয়েছেন, কাজেই মানুষের জন্যে একমাত্র নির্ভুল ও বিশুদ্ধ কর্মপন্থা হলো সমসত্ দাম্ভিকতা পরিহার করে তার সামনে মাথানত করা এবং নবীদের মাধ্যমে তিনি যে সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বা ‘আদ্বীনের’ পথনির্দেশ পাঠিয়েছেন, তার অনুসরণ করা।

এখন দেখা যাচ্ছে, আমাদের সামনে দু’টো পথ খোরা রয়েছে। মানুষের শক্তি-সামর্থ ও উপায়-উপকরণ পর্যালোচনার পর একটা পথের সন্ধান পাওয়া গেছে। আর কুরআন ঘোষণার মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে আর একটি পথ। আমাদের জন্যে এই দু’টো পথের একটাকে গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। হয় কুরআনের ঘোষনাকে মেনে নিতে হবে, নতুবা নিজেদেরকে নৈরাশ্যের সেই ভয়াল অন্ধকারে ঠেলে দিতে হবে, যেকানে আশার কোনো আলোক রশ্মি নেই। বস্তুত জীবনব্যবস্থা রচনার দু’টো উপকরণ রয়েছে এবং সেই দু’টোর একটা বেছে নিলেই হলো –এরূপ অবস্থার মুখোমুখি আমরা নেই। আসলে আমরা যে অবস্থার সম্মুখীন তা হলো এই যে, জীবনব্যবস্থাকে অর্জনের একটামাত্র উপায় রয়েছে। সেই একমাত্র উপায়কে আমরা গ্রহণ করবো, না তার সাহায্য দ্বারা উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে অন্ধকারে দিশাহারা হয়ে ঘুরে বেড়ানোকেই অগ্রগণ্য মনে করবো, এটাই আমাদের স্থির করতে হবে।

কুরআনের যুক্তি

যে যুক্তিতর্ক আমি এ পর্যন্ত করলাম, তা থেকে আমরা শুধু এ সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারি যে, মানবজাতির কল্যাণের জন্যে কুরআনের দাবীকে মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। অন্য কথায় বলা যায়, কাফের হওয়ার তো উপায় নেই, অগত্যা মুসলমানই হও। কিন্তু কুরআন তার দাবীর সমর্থনে এর চেয়ে অনেক উন্নত ও উৎকৃষ্টমানের যুক্তি-প্রমাণ পেশ করে। সে মানুষকে দায়ে ঠেকে মুসলমান হতে বলে না। বরং খুশী মনে ও স্বেচ্ছায় মুসলমান হতে উদ্ধুদ্ধ করে। এ ব্যাপারে তার বহু যুক্তি-প্রমাণ রয়েছে। তার মধ্যে চারটি যুক্তি-প্রমাণ সবচেয়ে বলিষ্ঠ। এ চারটিই সে বারংবার পেশ করে থাকে।

একঃ মানুষের জন্যে ইসলামই একমাত্র সঠিক জীবনব্যবস্থা। কেননা একমাত্র এটাই প্রকৃত সত্যের সাথে সংগতিশীল। এ ছাড়া আর যত ধারণা-বিশ্বাস সবই সত্যের পরিপন্থী ও অবাস্তব।

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩১ পৃষ্ঠায়)

“তারা কি আল্লাহর ‘দ্বীন’ ছাড়া অন্য কোনো ‘দ্বীন’ চায়? অথচ আসমান ও জমীনে যা কিছু আছে সবই ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় একমাত্র তারই সামনে আনুগত্যের মস্তক অবতন করে এছ এবং তার কাছেইতাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে”।

দুইঃ মানুষের জন্যে এটাই একমাত্র বিশুদ্ধ ও নির্ভুল জীবনব্যবস্থা। কেননা এটাই হলো একমাত্র সত্য। ন্যায়-নীতির বিচারেও এ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা বিশুদ্ধ হতে পারে না। আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩১ পৃষ্ঠায়)

“প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মনিব হলো আল্লাহ –যিনি আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে (বা ছয় যুগে) সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি শাসকের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি দিনকে রাতের পোশাকে আচ্ছাদিত করেন। অতপর আবার রাতের পেছনে দিন প্রবল গতিতে ছুটে চলে। সূর্য, চাঁদ ও তারা সকলেই তাঁর নির্দেশের অনুগত। শুনে রাখ। সৃষ্টি তিনিই করেছেন, আর শাসন-বিধানও চলবে একমাত্র তাঁরই। বস্তুত বিশ্বজগতের মনিব আল্লাহ বড়ই কল্যাণময়”।–(সূরা আল আরাফঃ ৫৪)

তিনঃ যেহেতু যাবতীয় তত্ত্ব ও তথ্যের নির্ভুল জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে এবং সে জন্যে নির্ভুল পথনির্দেশ একমাত্র তিনিই দিতে সক্ষম। তাই তাঁর রচিত এ বিধানই মানুষের জন্যে যথার্থ ও নির্ভুল।

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩২ পৃষ্ঠায়)

“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই গোপন নেই –পৃথিবীতেও না, আকাশেও না”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৫)

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩২ পৃষ্ঠায়)

“মানুষের কাছে যা গোপন ও প্রকাশ্য সবই তাঁর জানা। তাঁর জানা তথ্য থেকে তিনি নিজে যতটুকু মানুষকে জানাতে চান, তাছাড়া আর কিছুই তারা জানতে পারে না”।–(সূরা আর বাকারাঃ ২৫৫)

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩২ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তুমি জানিয়ে দাও যে, একমাত্র আল্লাহর পথনির্দেশই প্রকৃত ও সঠিক পথনির্দেশ”।–(সূরা আল আনআমঃ ৭১)

চারঃ মানুষের জন্যে এটাই একমাত্র সত্য পথ। কারণ এছাড়া ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। এছাড়া অন্য যে পথেই মানুষ চলবে, সে পথ শেষ পর্যন্ত যুলুম ও অবিচারের দিকেই তাকে টেনে নিয়ে যাবে।

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩২ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করবে সে অবশ্যই নিজের ওপর নিজে যুলুম চালাবে”।–(সূরা আত তালাকঃ ১)

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৩২ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুসারে যারা বিচার-ফায়সারা করে না তারাই যালিম”।–(সূরা আর মায়েদাঃ ৪৫)

কুরআনের এসব যুক্তি-প্রমাণের আলোকে প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন মানুষের পক্ষে আল্লাহর সামনে নতি স্বীকার করা ও জীবনের বিধি-ব্যবস্থা তার কাছ থেকেই গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য।

খোদায়ী বিধান যাঁচাই করার মাপকাঠি

এবার সামনে অগ্রসর হবার আগে আমি একটা প্রশ্নের জবাব দেয়া দরকার মনে করছি। আলোচনার এ স্তরে এসে প্রত্যেকের মনেই এ প্রশ্ন জাগে। বিষয়টি নিয়ে যখন চিন্তা-ভাবনা করছিলাম, তখন আমার মনেও ওটা জেগেছিল। প্রশ্নটি হলো, কোনটি আল্লাহর রচিত বিধান, আর কোনটি মানব রচিত বিধান, তা আমরা কি উপায়ে নির্ণয় করতে পারবো? আল্লাহর বিধান বলে যে কেউ একটা বিধান হাযির করে দিলেই তো তা মেনে নেয়া যেতে পারে না। প্রশ্নটির জবাব দিতে খুবই বিস্তারিত আলোচনার দরকার। তবে আমি সংক্ষেপে জবাব দিতে চেষ্টা করবো। বস্তুত মানবীয় চিন্তা ও খোদায়ী চিন্তার পার্থক্য নির্ণয়ের চারটি প্রধান প্রধান মাপকাঠি রয়েছে। সেগুলো একে একে তুলে ধরছি।

মানুষের চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তাতে জ্ঞানের ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতার প্রবাব অনিবার্যবাবেই বিদ্যমান। কিন্তু খোদায়ী চিন্তায় সেটা অসম্ভব। সেখানে অসীম ও নির্ভুল জ্ঞানের সুস্পষ্ট স্বাক্ষর লক্ষণীয়। আল্লাহর বিধানে কখনো একটি বিশেষ যুগের প্রমাণিত বৈজ্হানিক সত্যের পরিপন্থী কোনো বিষয় থাকতে পারে না তাতে এমন কোনো বিষয়ও থাকতে পারে না যাতে সত্যের কোনো একিট দিক বিধান রচয়িতার অগোচরে রয়ে গেছে বলে প্রমাণিত হতে পারে। অবশ্য এ মাপকাঠি প্রয়োগ করতে গিয়ে ভুলে যাওয়া চলবে না যে, জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক ধারণা-কল্পনা ও বৈজ্ঞানিক ধারণা-কল্পনা ও বৈজ্ঞানিক মতবাদ –এসব এক জিনিস নয়। এক সময়ে মানুষের মন-মগজে কিছু কিছু বৈজ্ঞানিক মতবাদ ও বৈজ্ঞানিক ধারণা-কল্পনা প্রভাব বিস্তার করে থাকে এবং লোকেরা ভ্রান্তিবশতঃ তাকেই ‘জ্ঞান’ বলে মনে করে থাকে। অথচ সেগুলোর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা যতখানি, সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও ঠিক ততখানি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ধারনা-কল্পনা ও মতবাদ খুব কমই দেখা গেছে যা শেষ পর্যন্ত যথার্থ ‘জ্ঞান’ বরে সাব্যস্ত হয়েছে।

মানবীয় চিন্তার আর একটি বড় দুর্বলতা হলো দৃষ্টিভঙ্গীর সংকীর্ণতা। পক্ষান্তরে খোদায়ী চিন্তায় দৃষ্টিভঙ্গীর সর্বাধিক পরিমাপ ব্যাপকতা ও বিশালতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। খোদায়ী চিন্তা থেকে উদগত কোনো কথা পর্যালোচনা করলে মনে হবে তার প্রবক্তা আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সবকিছুই স্বচক্ষে দেখ পাচ্ছেন। মনে হবে, তিনি সমগ্র বিশ্বজগতকে ও তার সমসত্ নিগূঢ় সত্য এক নজরে একই সাথে দেখছেন। তার মোকাবিলায় অতি-উচুঁদরে দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের মতামত ও চিন্তাধারাকেও নিতান্ত শিশুসূলভ মনে হবে।

মানবীয় চিন্তার আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তাতে আবেগ, উচ্ছ্বাস ও প্রবৃত্তির কামনা বাসনার সাথে বিবেক-বুদ্ধি ও তত্ত্বজ্ঞানের কোথাও না কোতাও লুকোচুরি ও যোগসাজসে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। পক্ষান্তরে খোদায়ী ব্যবস্থা অবিমিশ্র বুদ্ধিমত্তা ও নির্ভেজাল জ্ঞানের মহিমায ভাস্বর। এ বৈশিষ্ট্য এতই উজ্জ্বল ও স্পষ্ট যে, এর বিধি-ব্যবস্থাসমূহের কোথাও ভাবালুতা ও ঝোঁকপ্রবণতার নাম চিহ্নও পরিদৃষ্ট হয় না।

মানবীয় চিন্তার আর একটা দুর্বলতা এই যে, তার রচিত জীবনব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব, মানুষে মানুষে অযৌক্তি বৈষম্য এবং অযৌক্তিক ভিত্তিতেই একের ওপর অন্যের অগ্রাধিকার দানের উপাদান অনিবার্যবাবে বিদ্যমান। কেননা প্রত্যেক মানুসেরই কিছু ব্যক্তিগত অভিপ্রায় ও অভিরুচি থাকে এবং গোষ্ঠী বিশেষের সাথে তার যোগসূত্র থাকে, আবার গোষ্ঠী বিশেষের সাথে থাকে না। কিন্তু খোদায়ী চিন্তা এ জাতীয় উপাদান থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।

নিজেকে খোদায়ী জীবনব্যবস্থা বলে পরিচয়দানকারী প্রত্যেক ব্যবস্থাকে এ মানদণ্ডে যাচাই করে দেখা যেতে পারে। তা যদি মানবীয় চিন্তা ও জ্ঞান-বুদ্ধির ঐসব দুর্বলতা ও আবীলতা থেকৈ মুক্ত বলে প্রমাণিত হয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যেরূপ ব্যাপক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া অত্যাবশ্যক, সেরূপ হয়, তাহলে সে জীবনব্যবস্থার ওপর নিঃসংকোচে ও নির্দ্বিধায় ঈমান আনা যেতে পারে। এ ব্যাপারে ওজর-আপত্তি থাকার কোনোই কারণ নেই।

ঈমানের দাবী

এখন আমি মৌলিক প্রশ্নাবলীর মধ্যে সর্বশেষ প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করব। সে প্রশ্নটি হল এই যে, মানুষ যখন কুরআনের এ দাবী মেনে নেয় এবং একটি জীবনব্যবস্থাকে খোদায়ী জীবনব্যবস্থা বলে নিশ্চিন্তভাবে জেনে তার ওপর ঈমান আনে, তখন তার করণীয় কী?

আমি শুরুতেই বলছি যে, ইসলামের অর্ত হল মাথানত করা, বাধ্য ও অনুগত্য ও আত্মসমর্পণের সাথে স্বেচ্ছাচারিতা এবং চিন্তা ও কর্মের অবাধ স্বাধীনতার সহাবস্থান সম্ভব নয়। যে জীবনব্যবস্থার প্রতিই ঈমান আনা হবে নিজের সমগ্র জীবন সত্তাকে তার কাছে সপে দিতে হবে। নিজের আয়ত্তাধীন কোনো জিনিসকেই তার আনুগত্যের বাইরে রাখা চলবে না। একাধারে মন ও মস্তিষ্ক, চোখ ও কান, হাত ও পা, পেট ও দেহ, জিহবা ও কলম, সময় ও শ্রম, চেষ্টা-তদবীর ও কাজ-কর্ম, ঘৃণা ও ভালবাসা, শত্রুতা ও মিত্রতা –সবকিছুর ওপরই সে জীবনব্যবস্তার নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও আধিপত্য মেনে নিতে হবে। নিজ ব্যক্তিসত্তার কোনো অংশ এবং কোনো ক্ষেত্রইতার আওতামুক্ত তাকতে পারবে না। নিজের আয়ত্তাধীন কোনো বস্তুকে যতখানি ঐ জীবনব্যবস্থার আনুগত্য ও আওতার বাইরে রাখা হবে এবং তার যে যে দিক বা ক্ষেত্রকে বাইরে রাখা হবে ঠিক ততখানি এবং সেই অনুপাতে ঈমানের দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন হবে। নিজের ঈমান বা বিশ্বাসে যে ব্যক্তি সত্যবাদী ও নিষ্ঠাবান থাকতে ইচ্ছুক, নিজের জীবনকে অসত্য থেকে পবিত্র রাখার জন্যেতার যথাসাধ্য চেষ্টা করা অবশ্য কর্তব্য।

আমি এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথার পুনরাবৃত্তি করতে চাই। মানুষের জীবন যে একটি একক ও অবিভাজ্য সত্তা, সে কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। এ কারণে মানুষের সমগ্র জীবনের জন্যে একটি মাত্র জীবনব্যবস্থা আবশ্যক। একই সাথে একাধিক জীবন বিধান মেনে চলা কেবল ঈমানের দোদুল্যমানতা এবং সিদ্ধান্তের অস্থিরতা ও অপরিপক্কতারই পরিচায়ক। যখন কোনো ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা এবং সে তাকে নিজের ধর্ম বা জীবন বিধানরূপে মেনে নেয় তখন সেটাকে তার জীবনের সকল অংশ ও বিভাগের কার্যকর ধর্ম হিসেবে অবশ্যই মেনে নিতে হবে। তা যদি তার নিজের ব্যক্তিগত ধর্ম, শিক্ষা ও শিক্ষায়তনেরও ধর্ম, কর্মধারারও ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ জীবনেরও ধর্ম, শিক্ষা ও শিক্ষায়তনেরও ধর্ম, কায়কারবার ও জীবিকা উপার্জনেরও ধর্ম, পারস্পরিক মেলামেশা, আচার-আচরণ ও জাতীয় কর্মধারারও ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ জীবনেরও ধর্ম এবং সাহিত্য সংস্কৃতিরও ধর্ম। এতে কোনো ব্যতিক্রম হওয়ার কোনোই কারণ নেই। এক একটি মুক্তা আলাদা আলাদা থাকা অবস্থায় মুক্তা থাকবে আর তা দিয়ে মালা গাঁথরেই অমনি মুক্তাগুলো আলাদা আলাদা থাকা অবস্থায় মুক্তা থাকবে আর তা দিয়ে মালা গাঁথলেই অমনি মুক্তাগুলো সব কলাই-মুসুরের দানায় পরিণত হবে –এটা সম্ভব নয়। ঠিক তেমনি মানুষ ব্যক্তিগতভাবে একটি বিশেষ ধর্ম বা জীবনব্যবস্তার পরিপূর্ণ অনুসারী হবে আর অনেকগুলো মানুষ সংঘবদ্ধ হলেই তাদের সমষ্টিগত জীবনের কোনো কোনো অংশ সেই ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার আনুগত্য থেকে বাদ পড়ে যাবে এটাও সম্ভব নয়। তাছাড়া একজন মানুষ যে ধর্মকে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থারূপে মেনে নিয়ে তার প্রতি ঈমান আনে, তার কাছে তার ঈমানের সবচেয়ে বড় দাবী এ দাঁড়ায় যে, সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে সেই মহান ধর্মের বরকত লাভে ধন্য হওয়ার সুযোগ দেয় এবং সেই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাই যাতে সারা দুনিয়ার কর্তৃত্বশীল ও কার্যকর জীবনব্যবস্থায় পরিণত হয়, তার জন্যে সচেষ্ট হয়। বিজয়ী হয়ে বেঁচে থাকাই যেমন সত্যের স্বভাব ধর্ম, তেমনি সত্যাশ্রয়ী হওয়ারও স্বাভাবিক দাবী হল সত্যকে বাতিলের ওপর বিজয়ী করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা। কোনো সত্যপন্থী মানুষ এ দায়িত্ব পালন না করে স্বস্তি লাভ করতে পারে না। যে ব্যক্তি দেখতে পায় যে, সারা দুনিয়ায় বাতিল শক্তি দোর্দণ্ড প্রতাপে ও প্রবল পরাক্রমে জেঁকে বসে আছে। অথচ তা দেখেও সে এতটুকুও ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হয় না, তার মনে সত্যের প্রতি কিছু অনুরাগ বা আকর্ষণ যদি থেকেও থাকে তবে তা সুপ্ত ও ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে। এ ঘুম যাতে তার সর্বনাশা ঘুমে পরিণত না হয় এবং এ নিস্তব্ধতা যাতে মৃত্যুর নিস্তব্ধতায় রূপান্তরিত না হয়, সে জন্যে তার সাবধান হওয়া উচিত।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.