সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কুরআনের দৃষ্টিতে দ্বীন

(আরবী************************************পিডিএফ ৩৪৯ পৃষ্ঠায়)

“তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের সেই নিয়ম-পদ্ধতি নির্ধারিত করেছেন –যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেণ এবং (হে নবী) যা এখন আমি অহীর মাধ্যমে তোমার কাছে পাঠালাম এবং যার নির্দেশ ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে ইতিপূর্বে দিয়েছি এ তাকীদের সাথে যে, দ্বীন কায়েম কর এবং এ ব্যাপারে বহুধা বিচ্ছিন্ন হয়ো না”।–(সূরা শূরাঃ ১৩)

এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ (সা) কোনো নতুন ধর্মের প্রবর্তক নন। আর আগেকার নবীদের মধ্য থেকে কোনো নবীও কোনো আলাদা ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবর্তক ছিলেন না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে একই দ্বীন পেশ করে এসেছেন এবং নবী মুহাম্মদ (সা)-ও তাই পেশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম হযরত নূহের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা মহাপ্লাবনের পর বর্তমান মানব জাতির তিনিই ছিলেন প্রথম নবী। তারপর শেষ নবী মুহাম্মদ (সা)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর হযরত ইবরাহীমের নাম নেয়া হয়েছে। আরবরা তাঁকে নিজেদের ধর্মীয় নেতা বলে মানতো। সবশেষে হযরত মূসা ও হযরত ঈসার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। খৃষ্টান ও ইহুদীরা তাদেরকে নিজ নিজ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মনে করে তাকে। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, এ পাঁচজন নবীকেই এ দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আসল বক্তব্য এই যে, দুনিয়াতে যতনভী এসেছেন সকলে দ্বীন নিয়ে এসেছেন। এখানে কেবল নমুনাস্বরূপ পাঁচজন প্রসিদ্ধ নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা দুনিয়ার সর্বজনবিদিত আসমানী শরীয়াতগুলো তাঁদের মাধ্যমেই পাওয়া গেছে।

এ আয়াতটি থেকে ‘দ্বীন’ তথা সত্য ধর্ম ইসলাম ও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। তাই এ আয়াত নিয়ে গভীর বিচার-বিবেচনা করে তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

আভিধানিক বিশ্লেসণ

আরবী ভাষায় ‘দ্বীন’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথাঃ

একঃ ক্ষমতা, পরাক্রম ও আধিপত্য, শাসন ও কর্তৃত্ব অন্যকে আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা অন্যের ওপর সার্বভৌম ক্ষমতা (Sovereignty) প্রয়োগ করা, তাকে নিজের গোরাম ও অনুগত বানানো। যথা (আরবী**********) অর্থাৎ সে মানুষকে আনুগত্য করতে বাধ্য করেছে। (আরবী**************) অর্থাৎ আমি তাদেরকে পরাভূত করেছি এবং তারা বশ্যতা স্বীকার করেছে। (আরবী***********) অর্থা আমি সেই জাতিকে অনুগত করলাম এবং দাস বানিয়ে নিলাম। (আরবী*********) অর্থাৎ অমুক ব্যক্তি শক্তিশালী ও সম্মানিত হলো। (আরবী**************) অর্থাৎ আমি তাকে এমন কাজ করতে বাধ্য করলাম যা সে করতে রাজী ছিল না। (আরবী**************) অর্থাৎ অমুক ব্যক্তিকে একটি অপছন্দনীয় কাজে বাধ্য করা হলো। (আরবী**************) অর্থাৎ আমি তার ওপর শাসন ও কর্তৃত্ব চালালাম। (আরবী**************) অর্থাৎ আমি অমুককে জনগণের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব অর্পণ করলাম। এ অর্থে হুতিয়্যা নিজের মাকে সম্বোধন করে বলেঃ

(আরবী************** পিডিএফ ৩৫০ পৃষ্ঠায়)

“তোমাকে স্বীয় সন্তানদের অভিভাবিকা বানানো হয়েছিল। ফলে তুমি তাদেরকে আটার চেয়েও সূক্ষ্ম বানিয়ে ছেড়েছ”।

হাদীসে আছেঃ

(আরবী************** পিডিএফ ৩৫০ পৃষ্ঠায় )

“যে ব্যক্তি আপন প্রবৃত্তিকে বশে এসেছে এবং পরকালের কল্যানকর কাজে নিয়োজিত হয়েছে, সে-ই প্রকৃত বুদ্ধিমান”।

এ কারণেই যে ব্যক্তি দেশ জাতি এবং গোত্রের ওপর বিজয়ী ও কর্তৃত্বশীল হয়ে তাকে (আরবী**************) (দাইয়ান) বলা হয়। আশা আলহারমাযী রসূলুল্লাহ (সা)-কে(আরবী**************) ‘হে জননেতা ও আরব অধিপতি’ বরে সম্বোধন করেছিল। এদিক দিয়ে (আরবী**************) অর্থ দাস এবং (আরবী**************) অর্থ দাসী। আর (আরবী**************) অর্থ বাঁদীর ছেলে। কবি আখতাল বলেনঃ (আরবী**************) ‘সে (বাঁদী) আমাকে বাঁদীর ছেলে হিসেবে লালন করেছে’। পবিত্র কুরনে আছেঃ

(আরবী***************************************** পিডিএফ ৩৫০ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “তোমরা যদি সত্যই কারও গোলাম, অনুসারী ও অধীনস্থ না হয়ে থাক তবে মরণোন্মুখ বাঁচাতে পার না কেন? বেরিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরিয়ে আন না কেন?”

দুইঃ আনুগত্য, দাসত্ব, সেবা, কারো বশ্যতা স্বীকার করা, কারও অধীন হওয়া, কারও পরাক্রম ও আধিপত্যের সামনে নতি স্বীকার করা। আরবরা বলে থাকে (আরবী*************) অর্থাৎ আমি অমুক অমুকের সেবা করেছি। হাদীসে আছে, নবী (সা) বলেন, (আরবী*************) “আমি ফেরেশতাদেরকে এমন একটা কলেমার অনুসারী করতে চাই যা তারা মেনে নিলে গোটা আরব জাতি তাদের অনুগত হয়ে যাবে এবং তাদের সামনে মাথা নত করবে”। এ অর্থের আলোকেই জাতিকে (আরবী*************) বলা হয়। খারেজীদের সম্পর্কে যে হাদীস রয়েছে তাতেও ‘দ্বীন’ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে (আরবী*************) ‘তারা দ্বীন (আনুগত্য) থেকে বেরিয়ে যাবে তীর যেমন ধনুক থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায় তেমনিভাবে”।–[এ হাদীসের অর্থ এই নয় যে, খারেজীরা ধর্মত্যাগী হবে। কেননা হযরত আলীকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, “তারা কি কাফের?” তখন তিনি বলেন, (আরবী*************) ‘তারা তো কুফরীকেই ছেড়ে পালালো’। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, (আরবী*************) “তবে কি তারা মুনাফেক?” তিনি বললেন, মুনাফেক আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে। অথচ এরা তো দিনরাত আল্লাহকে স্মরণ করে। সুতরাং এ হাদীসে ‘দ্বীন’ অর্থ আমীরের আনুত্য –এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইবনে আসীর নেহায়া নামক গ্রন্থে লিখেছেনঃ

(আরবী*************)

“হযরত আলীর কথার তাৎপর্য এই যে, যে নেতার আনুগত্য করা ফরয তার আনুগত্য থেকে তাঁরা বেরিয়ে যাবে”।–(২য় খণ্ড, পৃঃ ৪১-৪২)]

তিনঃ শরীয়াত, আইন, রীতিনীতি, আদত , অভ্যাস। সাধারণ কথাবার্তায় এরূপ বলা হয়ে থাকেঃ (আরবী*************) অর্থাৎ এটা চিরাচরিত রীতি। (আরবী*************) অর্থাৎ কেউ ভালো বা মন্দ যে রীতিই মেনে চলুক, তাকে দ্বীন বলা চলে। হাদীসে আছেঃ (আরবী*************) ‘রসূলুল্লাহ (সা) নবুয়াদের আগে স্বজাতির অনুসৃত রীতিনীতি মেনে চলতেন। অর্থাৎ বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার এবং অন্যান্য সামাজিক ও দেশাচার সংক্রান্ত যে রীতি প্রথা তার জাতি মেনে চলতো তা তিনিও মেনে চলতেন।

চারঃ কর্মফল, বদলা, প্রতিদান বা প্রতিশোধ, সিদ্ধান্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ। প্রসিদ্ধ আরবী প্রবচন (আরবী*************) ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’-এর প্রকৃষ্টি উদাহরণ। কুরআনে কাফেরদের উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে (আরবী*************) মৃত্যুর পরে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে নাকি? আমাদের কর্মফল ভোগ করতে হবে নাকি? হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের বর্ণিত হাদীসে রয়েছেঃ (আরবী*************) “তোমরা শাসকদের গালিগালাজ করো না। মন্দ বলা যদি একান্তই জরুরী হয়ে পড়ে তবে বলো, হে আল্লাহ, শাসকরা আমাদের সাথে যেমন আচরণ করছে, তুমিও তাদের সাথে তেমনি আচরণ করো”। এ অর্থেই (আরবী*************) ‘দাইয়ান’ শব্দটি কাজী বা বিচারকের জন্যে ব্যবহৃত হয়। হযরত আলী সম্পর্কে কোনো এক মনীষীর মন্তব্যঃ (আরবী*************) “নবীর পর তিনি মুসলিম জাতির শ্রেষ্ঠ বিচারক ছিলেন”।

ব্যাপক অর্থবোধক পরিভাষা

আরবরা এ ‘দ্বীন’ শব্দটিকে উল্লিখিত অর্থগুলোর মধ্যে কখনো একটির এবং কখনো অপরটির জন্যে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতো। কিন্তু এ চারটি বিষয় সম্পর্কে আরবদের ধারণা পুরোপুরি সুস্পষ্টও ছিল না এবং তেমন উচ্চ ধারণাও ছিল না। সে জন্যে এ শব্দটিতে কিছু অস্পষ্টতা থেকে গিয়েছিল। ফলে এটা যথারীতি কোনো চিন্তাধারার পারিভাষিক শব্দ হতে পারেনি। কুরআন যখন নাযিল হয় তখন সে এ শব্দকে নিজের বক্তব্যের উপযুক্ত বাহন পেয়ে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অর্থে একে ব্যবহার করে এবং একে তার বিশেষ পরিভাষা রূপে গ্রহণ করে। কুরআনের ভাষায় তাই ‘দ্বীন’ শব্দটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার অভিব্যক্তি ঘটে। কুরআনের মর্ম অনুসারে মানুষ কারও সার্বভৌমত্ব ও প্রভুত্ব মেনে নিয়ে এবং তার আনুগত্য গ্রহণ করে যে বিশেষ আচরণ করে ও যে বিশেষ কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করে তাকেই ‘দ্বীন’ বলা হয়। আর ‘দ্বীন’কে আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করে তাঁর দাসত্ব করার তাৎপর্য এই যে, মানুষ আল্লাহর দাসত্বের সাথে আর কারও দাসত্ব মিশ্রিত করবে না, বরং কেবলমাত্র তাঁরই বন্দেগী, তাঁরই বিধানের অনুসরণ এবং তাঁরই আদেশ ও নির্দেশের আনুগত্য করবে, তাঁরই ফরমানবরদারীর মাধ্যমে সম্মান, উন্নতি ও পুরস্কারের আশা করবে এবং তাঁর নাফরমানী করলে অপমান লাঞ্ছনা ও শাস্তি পেতে হবে জেনে যেন সাবধান থাকে। সম্ভবত দুনিয়ার কোনো ভাষাতেই কোনো পরিভাষা এত ব্যাপক অর্থবোধক নয়। এ যুগের ‘স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি অনেকটা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু এখনো দ্বীনের পরিপূর্ণ অর্থবোধক হতে তার আরও ব্যাপকতা ও প্রশস্ততা অর্জনের দরকার।

একটি ভুল ধারণা

যে ‘দ্বীন’ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা সকল নবীদের নিকট একই ছিল এবং তাঁদের শরীয়াত ছিল বিভিন্ন ধরনের (আরবী*************) ‘তোমাদের মধ্যে প্রত্যেক উম্মতের জন্যে আমি একটি শরীয়াত ও একটি পথ নির্ধারিত করেছি’। কুরআনের বিধান অন্তর্ভুক্ত নয় বরং শুধুমাত্র তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, কিতাব ও নবুয়াত মেনে নেয়া ও আল্লাহর ইবাদাত করাই ‘দ্বীনে’র বক্তব্য। বড়জোর যেসব মৌল নৈতিক বিধান সকল নভীর বেলায় একই রকম ছিল, তা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দ্বীনের ঐক্য এবং শরীয়াতের বিভিন্নতার প্রতি স্থুল ও ভাসমান দৃষ্টি দেয়ার ফলেই এরূপ মত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। এটা একটা মারাত্মক অভিমত। এর সংশোধণ না হলে পরবর্তীতে দ্বীন ও শরীয়াতের মধ্যে বিভ্রান্তিকর বিভেদ সৃষ্টির প্রয়াস চলতে পারে। এরূপ বিভেদে লিপ্ত হয়েই সেন্ট পল শরীয়াতবিহীন দ্বীনের ধারণা পেশ করে হযরত ঈসা (আ)-এর উম্মতকে পথভ্রষ্ট করেছেন। শরীয়াতকে যখন দ্বীন থেকে আলাদা জিনিস বরে মনে করা হবে, তখন মুসলমানরাও খৃষ্টানদের মত শরীয়াতের বিধানকে গুরুত্বহীন বিবেচনা করবে এবং তার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ত লক্ষ্যবহির্ভুত বিধায় তাকে পাশ কাটিয়ে যাবে। কেবল আকীদা-বিশ্বাস ও মৌল নৈতিক শিক্ষাকে পুঁজি করে নিশ্চিন্ত হবে। এ ধরনের আন্দাজ অনুমান দ্বারা দ্বীনের তাৎপর্য নির্ণয় করার নির্দেশ এখানে দেয়া হয়েছে তার অর্থ কি শুধু আকীদা বিশ্বাস ও মৌল নৈতিক শিক্ষা, না শরীয়াতের আইন-বিধানও তার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন শরীফ অধ্যয়ন করলে আমরা দেখতে পাই, আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক শিক্ষা ছাড়া নিম্নলিখিত জিনিসগুলোও ‘দ্বীনে’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছেঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৩৫৩ পৃষ্ঠায়)

একাগ্রচিত্তে দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করে তাঁর ইবাদাত করা, নামায কায়েম করা ও যাকাত দেয়া ছাড়া অন্য কোনো নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হয়নি। এটাই হরো সঠিক পথের অনুসারী জাতির দ্বীন”।–(সূরা আল বাইয়েনাঃ ৫)

এ থেকে বুজা গেল যে, নামায ও যাকাত দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। অথচ বিভিন্ন শরীয়াতে এ উভয় কাজ সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের বিধান রয়েছে। অতীতের সকল শরীয়াতে নামাযের রূপ, তার আরকান, রাকায়াত, কেবলা, সময় এবং অন্যান্য বিধান একই রকম ছিল, এ কথা বলা যাবে না। যাকাত সম্পর্কেও একই কথা। কেউ দাবী করতে পারবে না যে, সকল শরীয়াতে যাকাত ফরয হওয়ার নেসাব, তার হার এবং আদায় ও বণ্টনের ব্যাপারে একই বিধান চালু চিল। শরীয়াতের এ বিভিন্নতা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা এ দু’টো জিনিসকে দ্বীনের অংগীভূত বলে ঘোষণা করেছেন।

(আরবী****************************************পিডিএফ ৩৫৩ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃতদেহ, রক্ত, শুকরের গোশত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে জবাই করা জানোয়ার এবং ঐ সব যা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে, আঘাত খেয়ে, টক্কর খেয়ে, উঁচু স্থান থেকে পড়ে ও হিংস্র জন্তুর আক্রমণে মৃত্যুবরণ করেছে। শুধু জীবিত পেয়ে যে জানোয়ারকে তোমরা জবাই করেছ, তা হালাল। উপরন্তু কোনো মন্দিরে জবাই করা জানোয়ার হারাম। পাশা খেলে ভাগ্য নির্ধারণও তোমাদের জন্যে হারাম। এসবই নাফরমানীর কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছে। কাজেই তাদেরকে ভয় কর না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্যে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, আমার নেয়ামত তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে ইসলামকেই মনোনীত করলাম”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ৩)

এ থেকে বুঝা গেল, শরীয়াতের এসব বিধানও দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত।

(আরবী****************************************পিডিএফ ৩৫৩ পৃষ্ঠায়)

“যারা আল্লাহ ও আখেরাতের বিশ্বাসস্থাপন করে না, আল্লাহ ও রসূল যা হারাম করেছে তা হারাম করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না, তাদের সাথে যুদ্ধ করো”।–(সূরা আত তাওবাঃ ২৯)

এ থেকে বুঝা গেল যে, আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস স্থাপন করা ছাড়াও আল্লাহ ও তাঁর রসূল হালাল হারামের যে বিধান দিয়েছেন তা মানা ও পালন করাও দ্বীনের আওতাভুক্ত।

(আরবী****************************************পিডিএফ ৩৫৪ পৃষ্ঠায়)

“ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ –উভয়কেই একশ’ বেত্রঘাত কর। আর আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করো না –যদি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয়ে থাক”।–(সূরা আন নূরঃ ২)

এ থেকে জানা গেল যে, ফৌজদারী বিধিও দ্বীনের আওতাভুক্ত।

শরীয়াতের বিধানকে স্পষ্টভাষায় দ্বীন বলে অভিহিত করার চারটি দৃষ্টান্ত দেয়া হলো। এ ছাড়া গভীর বিচার-বিবেচনা সহকারে অধ্যয়ন করলে জানা যাবে যে, যেসব গুনাহের কাজ করলে জাহান্নামে যেতে হবে বলে আল্লাহ হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন যেমন ব্যভিচার, সুদ, মুসলমান হত্যা, এতিমের মাল ভক্ষণ, অন্যায় পন্থায় অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা ইত্যাদি এবং যেসব অপরাধের দরুন আল্লাহর আযাব অবধারিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেমন সমমৈথুন ও লেনদেনে দুর্নীতি ইত্যাদি, সেসব থেকে বিরত থাকাও দ্বীনের অঙ্গ। কেননা জাহান্নাম ও খোদায়ী আযাব থেকে রক্ষা করা ছাড়া দ্বীনের আর কি স্বার্থকতা থাকতে পারে? এমনিভাবে শরীয়াতের যেসব বিধি অমান্য করা চিরতরে দোযখে ‘নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ, তাও দ্বীনের অংশরূপে গ্রহণীয়। উদাহরণস্বরূপ উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধির উল্লেখ করা যেতে পারে। এ বিধির বর্ণনা করার পর উপসংহারে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৩৫৪ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অমান্য করবে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লংঘন করবে, আল্লাহ তাকে দোযকে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। তার জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি”।–(সূরা আন নিসাঃ ১৪)

এমনিভাবে যেসব জিনিস হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেমন –জুয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য ইত্যাদি –সেসব জিনিসের নিষিদ্ধকরণ যদি অপ্রয়োজনীয় হুকুমত জারী করেছেন যার বাস্তবায়তন তাঁর বাঞ্ছিত নয়। অনুরূপভাবে যেসব কাজকে আল্লাহ ফরয বলে ঘোষণা করেছেন যেমনঃ রোযা, হজ্জ ইত্যাদি –সেসব কাজ এ অজুহাতে দ্বীনের বহির্ভূত করা যেতে পারে না যে, রমযানের ত্রিশ রোযা আগেকার শরীয়াতে ছিল না এবং কা’বার হজ্জ হযরত ইবরাহীমের বংশধরের মধ্যে কেবল ইসমাঈলের শরীয়াতভুক্ত ছিল।

দেশের আইন এবং দ্বীন

সূরা ইউসূফের (আরবী************) (বাদশাহের আইন অনুসারে ইউসুফ নিজের ভাইকে আটক করতে পারতো না) এ আয়াতে দেশের আইনের (Law of the land) অর্থে ‘দ্বীন’ শব্দটি ব্যবহার করে আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের অর্থের ব্যাপকতা সুস্পষ্ট করেছেন। এতে করে তাদের ধারণা অর্থহীন হয়ে যায় –যারা নবীগণের দাওয়াতকে শুধু সাধারণ ধর্মীয় অর্থে এক আল্লাহর পূজা-অর্চণা এবং কতিপয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করার মধ্যে সীমিত মনে করেন এবং মনে করেন মানবীয় তামাদ্দু, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন,আদালত ও অন্যান্য দুনিয়াবী ব্যাপারের সাথে দ্বীনের কোনো সম্পর্ক নেই। আর যদি থেকেও থাকে তাহরে সেসব ব্যাপারে দ্বীনের নির্দেশসমূহ নিছক ঐচ্ছিক সুপারিশ মাত্র। সে অনুসারে কাজ করতে পারলে ভালো, নচেৎ মানুষের স্বরচিত আইন ও বিধান মেনে চলায় কোনো দোষ নেই। এ সরাসরি এক বিভ্রান্তিকর ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে এ ধারণা মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এবং মুসলমানরা যে ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে উদাসীন রয়েছে, তার জন্যে এ ধারণা বহুলাংশে দায়ী। এর কারণে মুসলমানরা কুফরী ও জাহেলী জীবনব্যবস্থাকে শুধু যে মেনে নিয়েছে তাই নয় বরং এটাকে নবীর একটা সুন্নাত মনে করে, সেই জীবনব্যবস্থার অংশীদার ও পরিচালক হতেও রাজি হয়ে গেছে। ফৌজদারী আইনকে দ্বীন বলে আখ্যায়িত করে এ আয়াত তাদের সে ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করেছে। একানে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে বলেচেন যে, নামায, রোযা ও হজ্জ যেমন দ্বীন, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার আইনও দ্বীন। সুতরাং (আরবী************) (ইসলামই আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন) এবং (আরবী************) (যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করছে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না) ইত্যাদি আয়াতে যে দ্বীনের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে, তার অর্থ শুধু নামায-রোযা করাই নয় বরং ইসলামের সামাজিক ব্যবস্থাও। এটাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ব্যবস্থা মেনে চললে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আসল ব্যাপার হল, সূরা মায়েদার (আরবী***************) (আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে একটি শরীয়াত ও একটি পথ নির্ধারণ করেছি) এ আয়াতের বিপরীত মর্ম গ্রহণ করে এ অর্থ করা হয়েছে যে, শরীয়াত যেহেতু প্রত্যেক উম্মতের জন্যে আলাদা ছিল, আর নির্দেশ দেয়া হয়েছে শুধু সেই দ্বনি প্রতিষ্ঠার জন্যে যা সকল নবীর একই ছিল। আর নির্দেশ দেয়া হয়েছে শুধু সেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে যা সকল নবীর একই ছিল। তাই শরীয়াত কায়েম করা দ্বীন কায়েম করার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ আসরে এ আয়াতের তাৎপর্য ঠিক এর বিপরীত। সূরা মায়েদার যে স্থানে এ আয়াত রয়েছে তার পূর্বাপর ৪১ থেকে ৫০ আয়াত পর্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়লে জানা যাবে যে, এ আয়াতের সঠিক মর্ম হল এই যে, যে নবীর উম্মতকে যে শরীয়াতই আল্লাহ দিয়েছিলেন, সেই উম্মতের জন্যে সেটাই ছিল দ্বীন। সেই নবীর আমলে সেই দ্বীন ও শরীয়াতকেই কায়েম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এখন যেহেতু মুহাম্মদ (সা)-এর নবী যুগ, সে জন্যে উম্মতে মুহাম্মধীকে যে শরীয়াত দেয়া হয়েছে, এ যুগের জন্যে সেটাই দ্বীন এবং তা কায়েম করার অর্থই দ্বীন কায়েম করা। এখন এই যে শরীয়াতগুলোর মধ্যে বিভিন্নতা তার অর্থ এ নয় যে, খোদার শরীয়াতগুলো পরস্পর বিরোধী ছিল। বরং তার অর্থ এই যে, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে খুঁটিনাটি বিষয়ে কিছুটা পার্থক্য ছিল। উদাহরণস্বরূপ নামায-রোযার কথাই ধরুন। নামায সকল শরীয়াতেই ফরয ছিল। কিন্তু সকল শরীয়াতেই একই কেবলা ছিল না। নামাযের সময়, রাকায়াত ও আরকান-আহকামও পার্থক্য ছিল। রোযাও সকল শরীয়াতে ফরয ছিল। কিন্তু রমযান মাসের ত্রিশ রোযা সব শরীয়াতে ছিল না। তাই বলে এ কথা বলা ঠিক নয় যে, সাধারণভাবে নামায পড়া ও নির্দিষ্ট সময়ে রোযা রাখা দ্বীন কায়েমের বহির্ভূত। এ থেকে নিভূলভাবে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় তা এই যে, প্রত্যেক নবীর উম্মতের জন্যে সে সময়কার শরীয়াতের নামায ও রোযার যে নিয়ম নির্ধারিত ছিল সেই অনুসারে সেই যুগে নামায পড়া ও রোযা রাখাই ছিল দ্বীন কায়েম করা। আর আজকের যুগে দ্বীন কায়েম করার অর্থ এই যে, এসব ইবাদতগুলোর জন্যে শরীয়াতে মুহাম্মদী যে নিয়ম-বিধি রয়েছে, সে অনুসারে তা সম্পন্ন করা। এ দু’টি উদাহরণ থেকে শরীয়াতের অন্যান্য সকল নির্দেশ অনুমান করা যেতে পারে।

দ্বীন স্বীয় শাসনক্ষমতা দাবী করে

পবিত্র কুরআন মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট বুঝা যাবে যে, এ মহাগ্রন্থ তার অনুসারীদেরকে কুফরী ব্যবস্থা ও কাফেররেদ প্রজা ধরে নিয়ে পরাজিত ও অনুগত নাগরিকের মত ধর্মীয় জীবনযাপনের কর্মসূচী পেশ করছে না। বরং সে প্রকাশ্যে নিজের শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। চিন্তা, নৈতিকতা, সভ্যতা, আইন-কানুন ও রাজনীতির দিক দিয়ে সত্য দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ –প্রাণ বিসর্জন করার জন্যে সে তার অনুসারীদেরকে আহবান জানায়। এ মহাগ্রন্থ তাদেরকে মানব জীবনের সংশোধনের জন্যে এমন কর্মসূচী দেয়, যার একটি বিরাট অংশের বাস্তবায়ন কেবলমাত্র ঈমানদার লোকদের হাতে শাসনক্ষমতা থাকলেই সম্ভব। এ মহাগ্রন্থ তার নাযিল হওয়ার উদ্দেশ্য এভাবে বর্ণনা করছেঃ

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৩৫৬ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) আমি এ মহাগ্রন্থকে সত্য সহকারে তোমার কাছে নাযিল করেছি যেন আল্লাহ তোমাকে যে আলোক দেখিয়েছেন সেই আলোকে তুমি লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতে পার”।–(সূরা আন নিসাঃ ১০৫)

এ কিতাবে যাকাত আদায় ও বণ্টনের বিধান দেয়া হয়েছে। সে বিধানের পেছনে স্পষ্টত এমন এক সরকারের ধারণা বিদ্যমান যা যাকাত আদায় করে  উপযুক্ত লোকদের মধ্যে বিলিবন্টনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।–(সূরা আত তাওবাঃ ৬০-১৩০)। এ কিতাবে সুদ বন্ধ করার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং যারা সুদ খাওয়া অব্যাহত রাখে তাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে (বাকারাঃ ২৫৭), তা কার্যকর হতে পারে, যদি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে ঈমানদার লোকদের হাতে আসে। এ কিতাবে হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড, (বাকারাঃ ১৭৮), চোরের হস্ত কর্তন (মায়েদাঃ ৩৮), ব্যভিচার ও ব্যভিচারের অপবাদের জন্যে শাস্তি দেয়ার যে হুকুম জারী করা হয়েছে, তা এটা মনে করে দেয়া হয়নি যে, এসব নির্দেশ পালনকারী কাফেরদের আদালতও পুলিশের অধীনে থাকবে। এতে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে (বাকারাঃ ১৯০-২১৬)

একথা মনে করে নয় যে, এ দ্বীনের অনুসারীগণ কাফের সরকারের অধীন সৈনিক হিসাবে ভর্তি হয়ে এ নির্দেশ কার্যকর করবে। ইহুদী ও খৃষ্টানদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায়ের নির্দেশও এতে দেয়া হয়েছে। কিন্তু মুসলমানরা কাফেরদের প্রজা হয়ে তাদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করবে ও তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে, তা হতে পারে না। এ কথা শুধু হিজরতের পরে নাযিল হওয়া সূরাগুরোর বেলায়ই প্রযোজ্য নয়, হিজরতের আগেকার সূরাগুলো পড়লেও একজন চক্ষুষ্মান ব্যক্তি প্রকাশ্যে দেখতে পায় যে, কুরআনের শুরু থেকেই মুমিনদেরকে বিজয়ী ও কর্তৃত্বশীল করার পরিকল্পনা ছিল, কাফের সরকারের অধীন ইসলাম ও মুসলমানরা জিম্মী হয়ে থাকবে –এ পরিকল্পনা কখনো ছিল না।

নবী (সা)-এর বাস্তব ক্রিয়াকর্মের সাক্ষ্য

সর্বোপরি নবী মুহাম্মদ (সা)-এর তেইশ বছরব্যাপী রিসালাত যুগের বাস্তব কর্মকাণ্ডের সাথেই উল্লিখিত ভ্রান্ত ব্যাখ্যা সংঘর্ষশীল। তিনি তাবলীগ ও তলোয়াত এ উভয়ের সাহায্যে সমগ্র আরব জাহানকে পদানত করে সেখানে তিনি বিস্তারিত শরীয়াতসহ একটা পরিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা কয়েম করেন –এ কথা কে না জানে? সে রাষ্ট্র আকীদা-বিশ্বাস থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চরিত্র, সভ্যতা ও কৃষ্টি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি ও আইন-আদালত এবং যুদ্ধ ও সন্ধি পর্যন্ত –জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে আপন প্রভাবাধীন করে রেখেছিল। বর্ণিত আয়াতে সমস্ত নবীসহ নবী মুহাম্মদ (সা)-কে দ্বীন কায়েম করার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তাঁর সকল কার্যকরাপ সে নির্দেশেরই বাস্তব ব্যাখ্যা ছিল, এ কথা যদি স্বীকার করা না হয়, তাহলে এর দু’টো অর্থ দাঁড়ায়। হয় রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর (মায়াযাল্লাহ) এ অভিযোগ আরোপ করতে হয় যে, তাকেঁ হুকুম দেয়া হয়েছিল শুধু আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিকতার প্রধান প্রধান মৌলিক বিষয়গুলো প্রচার করার, আর তিনি সে সীমালংঘন করে আপন উদ্যোগে একটা সরকার কায়েম করে বসেছিলেন এবং একটা বিস্তারিত বিধান রচনা করে নিয়েছিলেন যা সকল নবীর শরীয়াতের সম্মিলিত বিধান থেকে আলাদা ধরনের এবং অতিরিক্ত। অথবা স্বয়ং আল্লাহর ওপর এ দোষারোপ করতে হয় যে, তিনি সূরা শূলায় উল্লিখিত ঘোষণা করার পর নিজেই তার বিপরীত কাজ করেছেন এবং আপন নবীকে দিয়ে ঐ সূরায় ঘোষিত দ্বীন কায়েম করার কাজের চেয়ে অনেক বেশী ও পৃথক ধরনের কাজ করে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ কাজ সম্পন্ন হওয়ার তিনি তাঁর প্রথম ঘোষণার পরিপন্থি দ্বিতীয় ঘোষণাও করেন (আরবী***********) (আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম)-মায়াযাল্লাহ

দ্বীন একটা সার্বিক ও ব্যাপক অর্থবোধক পরিভাষা

পবিত্র কুরআন দ্বীন শব্দটিকে এক ব্যাপক অর্থবোধক পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। তার অর্থ এমন একটি জীবনবিধান যার অধীনে মানুষ কারো সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করবে, তার নির্ধারিত সীমারেখা, রীতিনীতি ও আইন কানুনের অধীন জীবন যাপন করবে, তার আনুগত্যের মাধ্যমেই সম্মান, উন্নতি ও পুরস্কারের আশা পোষণ করবে এবং তার নাফরমানী করার ফলে অপমান, লাঞ্ছনা ও শাস্তি ভোগ করতে হবে –এ ভয় তার মনে থাকতে হবে। দুনিয়ার কোনো ভাষাতেই বোধ হয় এমন ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ আর নেই। নিম্নলিখিত আয়াতগুলোদে দ্বীন এ পরিভাষা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছেঃ

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৩৫৮ পৃষ্ঠায়)

‘আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃষ্টান)-এর মধ্যে যারা আল্লাহকেও মানে না (অর্থাৎ তাঁকে একমাত্র সার্বভৌমত্বের মালিক বলে স্বীকার করে না) আখেরাতকেও (অর্থাৎ হিসেব ও প্রতিফলের দিনকেও) মানে না আল্লাহ ও তাঁর রসূল যেসব বস্তু হারাম করেছেন, তাকে হারাম বলে স্বীকার করে না এবং সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত না স্বহস্তে জিজিয়া দেয় এবং বশ্যতা স্বীকার করে, ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে যদ্ধ চালিয়ে যাও’।-(সূরা আত তাওবাঃ ২৯)

এ আয়াতে দ্বীনে হক (সত্য ধর্ম) একটা পারিভাষিক শব্দ। এর দ্বারা কি বুঝাতে চান তা তিনি আয়াতের প্রথম তিনটি কথায় নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন। এ তিনের সমষ্টিকেই দ্বীনে হক বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছেঃ

(আরবী*************************************পিডিএফ ৩৫৮ )

‘ফেরাউন বলল, দাঁড়াও আমি মূসাকে মেরেই ফেলছি এবং এখন তার রবকে ডাকুক। আমার ভয় হয় যে, সে তোমাদের দ্বীনটাই পাল্টে না দেয়, অথবা দেশে ফাসাদ সৃস্টি না করে’।-(সূরা মু’মিনঃ ২৬)

কুরআনে ফেরাউন ও মূসার যত বিবরণ পাওয়া যায় তার প্রেক্ষিতে বিচার-বিবেচনা করলে নিসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, এখানে দ্বীন নিছক কোনো ধর্মের অর্থে ব্যবহার হয়নি। বরং রাষ্ট্র ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থার অর্থে ব্যবহার হয়েছে। ফেরাউনের বক্তব্য ছিল এই যে, মূসা (আ)-এর উদ্দেশ্য যদি সফল হয়, তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থা পাল্টে যাবে। ফেরাউনের সার্বভৌমত্ব ও প্রচলিত আইন-কানুন ও রীতিনীতির ভিত্তিতে যে জীবনব্যবস্থা চালু রয়েছে, তা মূলোৎপাটিত হবে এবং তার জায়গায় হয় কোনো নতুন ব্যবস্থা নতুন বুনিয়াদের ওপর গড়ে ওঠবে অথবা কোনো ব্যবস্থাই গড়ে ওঠবে না বরং দেশ জুড়ে একটা অরাজক পরিস্থিতি উদ্ভব হবে।

(আরবী*************************************পিডিএফ ৩৫৮ )

“আল্লাহ মনোনীত একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৯)

(আরবী*************************************পিডিএফ ৩৫৮ )

“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীনের সন্ধান করবে, তার সেই দ্বীন মোটেই গ্রহণ করা হবে না”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৮৫)

(আরবী*************************************পিডিএফ ৩৫৮ )

“তিনিই একমাত্র আল্লাহ যিনি তাঁর রসূলকে সঠিক পথনির্দেশনা ও দ্বীনে হকসহ পাঠিয়েছেন, যাতে করে তিনি অন্য সমস্ত দ্বীনের ওপর তাকে বিজয়ী করতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অপসন্ধনীয় হোক না কেন”।–(সূরা তওবাঃ ৩৬)

(আরবী*************************************পিডিএফ ৩৫৯ )

“যতক্ষণ দুনিয়া থেকে সমস্ত কুফরী ব্যবস্থার অবসান না ঘটে এবং দ্বীন শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট না হয়ে যায়, ততক্ষণ তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাও”।–(সূরা আল আনফালঃ ৩৯)

(আরবী*************************************পিডিএফ ৩৫৯ )

“আল্লাহর সাহায্য যখন এসে গেছে এবং বিজয় সূচিত হয়েছে, আর তুমি যখন দেখেছ যে, লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে, তখন এবার তুমি নিজ প্রভুর গুণগান ও প্রশংসা কর, তাঁর তসবিহ পাঠ কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল”।–(সূরা নসর)

এ আয়াতগুলোতে দ্বীন বলতে আকীদা বিশ্বাস, চিন্তাধারা, নৈতিকতা ও বাস্তব ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগকে বুঝানো হয়েছে।

প্রথম দু’টো আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বের (ইসলাম) ভিত্তিতে যে জীবনব্যবস্থা তৈরি হয়, একমাত্র সেটাই আল্লাহর মনোনীত বিশুদ্ধ জীবনব্যবস্থা। এ ছাড়া অন্য কোনো ভূয়া সার্বভৌম সত্তার আনুগত্যের ভিত্তিতে যে জীবনব্যভস্থা তৈরী হয়, বিশ্ব-প্রভুর নিকট তা কখনো গ্রহণযোগ্য নয় এবং প্রকৃতিগতভাবে তা হতেও পারে না। কেননা মানুষ যার সৃষ্টি, যার দাস, যার প্রতিপালিত এবং যার রাজ্যে প্রজা হিসেবে বসবাস করে, সে কখনো এ কথা মেনে নিতে পারে না, মানুষ তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো শক্তির আনুগত্য ও দাসত্বে জীবনযাপনের এবং অন্য কারো নির্দেশ অনুসারে চলবার অধিকার রাখে।

তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর রসূলকে এ বিশুদ্ধ, নির্ভুল ও সত্য জীবনব্যবস্থা অর্থাৎ ইসলাম দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তাকে পাঠানোর উদ্দেশ্য এইযে, তিনি এ জীবনব্যবস্থাকে অন্য সকল জীবনব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করেই ছাড়বেন।

চতুর্থ আয়াতে ইসলামী জীবনব্যবস্থার অনুসারীদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যতোদিন পর্যন্ত দুনিয়া থেকে খোদাদ্রোহীতার ভিত্তিতে গঠিত সকল জীবনব্যবস্থার উচ্ছেদ না হয়েছে এবং বন্দেগী ও আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট না হয়েছে ততোক্ষণ পর্যণ্ত দুনিয়াবাসীর সাথে লড়াই করে যেতে হবে।

পঞ্চম আয়াতে রসূলুল্লাহ (সা)-কে এমন এক সময় সম্বোধন করা হয়েছে যখন তেইশ বছরে অক্লান্ত ও নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টায় আরবে বিপ্লব পূর্ণ হয়েছে। ইসলাম আকারে একটা আকীদাগত, চিন্তাগত, নৈতিক, শিক্ষাগত, সামাজিক, তামাদ্দুনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে বাস্তবে কায়েম হয়ে গেছে এবং আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক দলে দলে এসে এ ব্যবস্থার আওতায় প্রবেশ করছে। এভাবেই নবী মুহাম্মদ (সা)-এর অর্জিত কাজ সম্পন্ন হলো। তাঁকে বলা হচ্ছে যে, এ বিরাট সাফল্যকে নিজের সাফল্য মনে করে তিনি  যেন গর্বিত না হন।

সকল প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি, অক্ষমতা ও সম্পূর্ণতার ঊর্ধে যে সত্তা, তাহলো নবী মুহাম্মদ (সা)-এর রবের সত্তা। অতএব, এ বিরাট কাজ সম্পন্ন হওয়ার জন্যে তাঁকে বলা হচ্ছে, তাঁর রবের তাহবীহ ও গুণগান করতে এবং দীর্ঘ তেইশ বছরের সংগ্রাম-সাধনায় যে ত্রুটি বিচ্যুতি হয়েছে তার জন্যে তাঁর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.