সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায়

বড় বড় শহরে আমরা দেখি বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে শত শত কল-কারখানা চলছে। ট্রাম ও রেলগাড়ি চলছে। রাতে অকস্মাৎ হাজার হাজার বাতি জ্বলে ওঠে, গরমের সময় ঘরে গরে মাথার ওপর পাখা ঘোরে। কিন্তু এসব ঘটনা দেখে আমরা একটুও অবাক হই না। এসব জিনিসের উজ্জ্বল ও গতিশীল হবার পেছনে যে কারণ রয়েছে, সে ব্যাপারেও আমাদের মধ্যে কোন দ্বিমত দেখা যায় না। এর কারণ কি? এর কারন, যেসব তারের সাথে এ বাতিগুলো সংযুক্ত হয়েছে সেগুলা আমরা স্বচক্ষে দেখি। এ তারগুলো যে বিজলী ঘরের সাথে সংযুক্ত তার অবস্থাও আমরা জানি। আমরা এও জানি, ঐ ইঞ্জিনিয়ার বিজলীর কাজ করছে। আর এ উৎপাদিত শক্তিটির সাহায্যে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। কাজেই বিজলীর চিহ্ন দেখে তার কার্যকারণ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে কোন প্রকার মতবৈষম্য দেখা না দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, এ কার্যকারণগুরোর সমগ্র পর্যায় আমাদের অনুভূতির অন্তর্ভূক্ত এবং আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। মনে করুন এ বাতিগুলো জ্বলে উঠত, পাখাগুলো বন বন করে ঘুতর, ট্রাম ও রেলগাড়ী ছুটে চলত, কল-কারখানা ও মেশিনের চাকা ঘুরত কিনউত যে তারগুলোর সাহায্যে এসবগুলোর মধ্যে বিজলী সরবরাহ করা হয় সেগুরো অদৃশ্য থাকত, বিজলী ঘরও আমাদের অনুভূতির নাগালের বাইরে থাকত, বিজলী ঘরে যারা কাজ করছে তাদের শক্তির সাহায্যে এ কারখানাটি পরিচালনা করছে, এ কথাও আমরা জানতে পারতাম না, তাহলে এ অবস্থায় বিদ্যুতের ঐ চিহ্নগুলো দেখে আমাদের মন কি নিশ্চিত হত? সে সময় ঐ চিহ্নগুলোর কার্যকারণের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ঐকমত্য থাকত কি? বলা বাহুল্য, এর জবাব নেতিবাচকই হবে। কেন? কারণ যখন চিহ্নগুলোর কার্যকারণ প্রচ্ছন্ন থাকে এবং কারো পক্ষে তা জানা সম্ভব হয় না, তখন মনে বিস্ময়ের সাথে অস্তিরতার সৃষ্টি হওয়া, মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিবৃত্তির এই সুগভীল রহস্যের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওা এবং এ রহস্যটি সম্পর্কে ধারণা, অনুমান ও মতামত বিভিন্ন হওয়া একান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার।

কথাটি আরো একটু স্পষ্ট করে বলা যাক। ইতিপূর্বে যে বিষয়টি নিছক অনুমান করা হয়েছিল, মেনে নিলাম বাস্তবে ও কার্যত সেটির অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ সত্যিই হাজার হাজার লাখো লাখো বিজলী বাতি জ্বলছে, লাখো লাখো-বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরছে, গাড়ী ছুটে চলছে, কারখঅনা ও মেশিনের চাকা ঘুরে চলছে কিন্তু সেগুলোর মধ্যে কোন শক্তি কাজ করছে এবং তা আসছেই বা কোথা থেকে সে কথা জানার কোন মাধ্যমই আমাদের কাছে নেই। লোকেরা এ চিহ্নগুলো দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছে।

নানানজনের নানান মত

এসবের কারণ অনুসন্ধানে অনেকেই বুদ্ধির ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে। কেউ বল, এগুলো নিজে নিজেই জ্বলে উঠেছে, নিজে নিজেই চলছে। এদের অস্তিত্বের বাইরে এমন কোন বস্তু নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায় নেই যা এদেরকে বা গতি দান করেছে। কেউ বলে, যেসব উপাদানে এগুলো গঠিত হয়েছে সেগুলোর গঠন প্রকৃতিই এসবের মধ্যে আলো ও গতির অবস্থা সৃষ্টি করে দিয়েছে। কারো মতে, এ বস্তু জগতের আড়ালে একদল দেবতা আছে তাদের কেউ বাতি জ্বালায় কেউ ট্রাম ও রেলগাড়ি চালায়, কেউ পাখা ঘুরায়, কেউ কারখানা ও মেশিনের চাকা ঘুরায়। আবার, একদল লোক এ ব্যাপারে চিন্তা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, অবশেষে তারা নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করে বলতে শুরু করেছে আমাদের বুদ্ধি এ তেলেসমাতির গভীরে প্রবেশ করতে অক্ষম। আমরা কেবল এতটুকুই জানি যতটুকু আমরা দেখতে ও অনুভব করতে পারি। এর চাইতে বেশী কিছু আমরা বুঝি না। আর যা কিছু আমরা বুঝি না তাকে আমরা সত্য বলি না আমার মিথ্যাও বলতে পারি না।

এসব লোক নিজেদের মধ্যে বিরোধে লিপ্ত। কিন্তু নিজেদের চিন্তার স্বপক্ষে এবং অন্যের চিন্তার বিপক্ষে তাদের প্রত্যেকের কাছে ধারণা, অনুমান ও কল্পনা ছাড়া জ্ঞানের অন্য কোন মাধ্যম নেই।

 

একটি স্বতন্ত্র দাবী

এ মতবিরোধ চলছিল এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলেন, তোমাদের সব অভিমত রেখে দাও, আমার কাছে জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম আছে যা তোমাদের নেই। সেই মাধ্যম থেকে আমি জানে পেরেছি এসব বাতি, পাখা, ঘড়ি, কারখানা ও মেশিন কতিপয় অদৃশ্য তারের সাথে সংযুক্ত, যেগুলো তোমরা অনুভব করছ না। একটি বড় বিদ্যুৎ ঘর থেকে এ তারগুলোর মধ্যে শক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে যা আলো ও গতির আকারে আত্মপ্রকাশ করছে। এ বিদ্যুৎ ঘরে বিরাট যন্ত্রপাতি আছে। অসংখ্য কর্মচারী ও কারিগর সেগুলো পরিচালনা করছে। আর এরা সবাই একজন বড় ইঞ্জিনিয়ারের অধীন। ইঞ্জিনিয়ার তাঁর নিজের জ্ঞান ও শক্তির সাহায্যে ব্যবস্থাটা কায়েম করেছেন। তাঁলই নির্দেশ ও পরিচালনাধীনে এসব কাজ চলছে।

এরপর আর এক ব্যক্তি আসেন। তিনিও ঐ একই কথা একই প্রকার দাবী সহকারে পেশ করতে থাকেন। অতপর তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ব্যক্তি আসেন। তাঁরাও পূর্ববর্তীদের ন্যায় একই কথা একইভাবে বলতে থাকেন। তারপর আগমনকারীদের একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা চলতে থাকে। এমনকি তাঁদের সংখ্যা শত ও হাজারের অংক পেরিয়ে লাখের অংকে পৌঁছে যায়। তাঁরা সবাই ঐ একই কথা একই দাবী সহকারে পেশ করতে থাকেন। স্থান-কাল-অবস্থার পার্থক্য সত্বেও তাঁদের কথা ও দাবীর মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা যায়নি। তাঁরা সবাই বলেন, আমাদের নিকট জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম আছে যা সাধারণ লোকের নিকট নেই। তাদের সবাইকে পাগল আখ্যা দেয়া হয় বিভিন্ন প্রকার জুলুম-নির্যাতন তাদেরকে জর্জরিত করা হয়। নিজেদের দাবী প্রত্যাহার করার জন্যে তাদেরকে সর্ব প্রকারে বাধ্য করা হয় কিন্তু তাঁরা সবাই নিজেদের দাবীর ওপর অবিচল থাকেন এবং দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদেরকে নিজেদের স্থান থেকে এক চুল পরিমাণও হঁটাতে পারেনি। এই দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে তাঁদের আরো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তাঁরা কেউ মিথ্যাবাদী, চোর, আত্মসাৎকারী, দুষ্কৃতিকারী, জালেম ও হারামখোর ছিলেন না। তাদের বিরোধী ও শত্রুরাও একথা স্বীকার করে। তাঁরা সবাই পবিত্র, কলুষমুক্ত ও অসাধারণ সচ্চরিত্রের অধিকারী মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণের ক্ষেত্রে সমগ্র মানব জাতির মধ্যে তারা একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁদের মধ্যে পাগলামির কোন লক্ষণও দেখা যায় না, বরং বিপরীত পক্ষে তাঁরা উন্নত নৈতিক চরিত্র, আত্মিক পরিশুদ্ধি, পার্থিব বিষয়াবলির উপস্থাপন করা তো দূরের কথা বিশ্বের বড় বড় জ্ঞানী, পণ্ডিত তাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞগণ তার গূঢ় রহস্য ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্যে নিজেদের সারাজীবন ব্যয় করেন।

বিবেক-বুদ্ধির আদালতে

একদিকে বিভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর দল এবং অন্যদিকে একক দাবীদারগণের দল। বিবেক-বুদ্ধির আদালতে উভয় দলের মোকদ্দমা পেশ করা হয়। বিচারক হিসেবে বিবেক-বুদ্ধির দায়িত্ব হচ্ছে প্রথম নিজের মর্যাদা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে, তারপর উভয়পক্ষের অবস্থা অনুধাবন করে উভয়ের তুলনামূলক পর্যালোচনার পর কার কথা অগ্রগণ্য সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিচারকের নিজের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আসল ব্যাপার জানার কোন মাধ্যম তার নেই। তিনি নিজে সত্য সম্পর্কে অবগত নন। তাঁর সামনে আছে কেবলমাত্র উভয় পক্ষের বক্তব্য, যুক্তি-প্রমাণ, তাদের ব্যক্তিগত অবস্থা এবং বাইরের চিহ্ন ও নিদর্শনাবলী। অনুসন্ধানীর দৃষ্টিতে এগুলো করতে হবে। কিন্তু অধিকতর সম্ভাবনার বেশী অন্য কোন সিদ্ধান্ত তিনি দিতে পারেন না। কারণ তাঁর টেবিলে যা কিছু তথ্য বিবরণী আছে তার ভিত্তিতে প্রকৃত সত্যের দ্বারোঘটন করা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। দু’পক্ষের মধ্যে এক পক্ষের বক্তব্যকে তিনি অগ্রাধিকার দিতে পারেন কিন্তু চূড়ান্ত নিশ্চয়তা সহকারে কোন পক্ষের বক্তব্যকে সত্য ও কোন পক্ষের বক্তব্যকে মিথ্যা বলতে পারেন না।

মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের অবস্থা

মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের অবস্থা হচ্ছেঃ

একঃ সত্য সম্পর্কে তাদের মতামত বিভিন্ন। কোন একটি বিষয়েও তাদের মধ্যে মতৈক্য নেই। এমনকি এই মতবাদের অনুসারী দলের ব্যক্তির মধ্যেও অনেক সময় মতবিরোধ দেখা যায়।

দুইঃ তারা নিজেরাই স্বীকার করে যে, তাদের কাছে জ্ঞানের কোন অনন্য মাধ্যম নেই। তাদের প্রত্যেকটি দল বড় জোর এ দাবীই পেশ করছে যে, তার অনুমান অন্যের নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায় তুলনায় বেশী শক্তিশালী কিন্তু তারা সবাই নিজেদের অনুমানকে অনুমান বলে স্বীকার করে।

তিনঃ জর অনুমানের ওপর তাদের বিশ্বাস, ঈমান ও প্রত্যয় অবিচল বিশ্বাসের পর্যায়ভুক্ত নয়। তাদের মধ্যে মত পরিবর্তনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। প্রায়ই দেখা গেছে, তাদের এক ব্যক্তি গতকাল পর্যন্ত অত্যন্ত জোরেশোরে যে মতটি পেশ করছিল, আজ সে নিজেই তার সেই মতের বিরোধিতা করছে এবং অন্য একটি মত পেশ করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স,বুদ্ধি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের মত পরিবর্তন হতে দেখা দেছে।

চারঃ একক দাবীদারদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে তাদের কাছে একটি ই মাত্র যুক্তি রয়েছে, তা হচ্ছে এই যে, নিজেদের দাবীর স্বপক্ষে তাদের কাছে কোন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তারা সেই অদৃশ্য তার দেখানে পারেনি যেগুলোর ব্যাপারে তাদের দাবী ছিল যে, সেগুলোর সাথে বাতি ও পাখা সংযুক্ত রয়েছে। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যুতের অস্তিতত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তারা কাউকে বিদ্যুত ঘর দেখানে পারেনি। সেখানকার যন্ত্রপাতি ও মেশিনগুলো দেখানে পারেনি। এমনটি ইঞ্জিনিয়ারের সাথেও কাউকে দেখা-সাক্ষাত করাতে পারেনি। তাহলে কেমন করে তাদের দাবীকে সত্য বলে মেনে নেয়া যায়?

একক দাবীদারগণের অবস্থা

অন্যদিকে একক দাবীদারগণের অবস্থা হচ্ছেঃ

একঃ তাঁরা সবাই ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের দাবীর যাবতীয় মৌলিক বিষয়ে তাদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য বিরাজিত।

দুইঃ তাদের ঐক্যবদ্ধ দাবী হচ্ছে আমাদের কাছে জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম আছে যা সাধারণ লোকদের কাছে নেই।

তিনঃ তাদের একজনও বলেনি যে, আন্দাজ অনুমান বা ধারণা কল্পনার ভিত্তিতে তারা এ কথা বলছেন। বরং তারা সবাই সর্বসম্মতভাবে বলেন যে, ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, তার কর্মচারীরা তাদের কাছে আসে, তিনি তাদেরকে নিজের কারখানা ভ্রমণ করিয়ে সবকিছু দেখিয়ে দিয়েছেন। কাজেই তাদের বক্তব্য হচ্ছে তারা যা কিছু বলছেন অনুমান ও কল্পনার ভিত্তিতে নয়, যথার্থ তত্ত্বজ্ঞান ও পূর্ণ বিশ্বাসের ভিত্তিতে বলছেন।

চারঃ তাদের একজনও নিজেদের বর্ণনার মধ্যে এক চুল পরিমাণ পরিবর্তন করেছেন, এমন কোন নজীর নেই। তাদের প্রত্যেকেই জীবনের প্রথম থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই কথা বলে এসেছে।

পাঁচঃ তাদের চরিত্র যারপরনাই পবিত্র ও কলুষমুক্ত। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, শঠতা ও প্রতারণার চিহ্নও সেখানে নেই। যারা জীবনের সমস্ত ব্যাপারে সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ তারা মাত্র এই একটি ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মিথ্যা বলবে এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই।

ছয়ঃ এ দাবী করার পেছনে তাদের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে, এ কথাও প্রমাণিত নয়। তাদের অধিকাংশই এ দাবীর কারণে চূড়ান্ত পর্যায়ের কষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেন, বিপদের সম্মুখীন হন, কারাযন্ত্রণা ভোগ করেন, শারীরিক নির্যাতনে জর্জরিত হন, দেশ থেকে বিতাড়িত হন। অনেককে হত্যাও করা হয়। এমনকি কাউকে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের সমাগম দেখা যায়নি। কাজেই কোন প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের অভিযোগে তাদেরকে অভিযুক্ত করা যায় না। বরং এহেন চরম অবস্থায় তাদের নিজেদের একক দাবীর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এ কথাই প্রমাণ করে যে, নিজেদের সত্যবাদিতার ওপর তাদের আস্থা ও প্রত্যয় ছিল পর্বত প্রমাণ। তাদের প্রত্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্যেও তাদের কেউ নিজের দাবী প্রত্যাহার করেননি।

সাতঃ তাদের পাগল ও বুদ্ধিলোপ হবারও কোন প্রমাণ নেই্। জীবনের সকল ব্যাপারে দেখা গেছে তারা সবাই চূড়ান্ত পর্যায়ের জ্ঞানী ও স্থির বুদ্ধির অধিকারী। তাদের বিরোধিরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাহলে কেমন করে মেনে নেয়া যেতে পারে যে, বিমেষ করে এই একটি ব্যাপারেই তারা পাগলামির শিকার হয়েছিলেন? আর বিষয়টির গুরুত্বও দেখতে হবে। এটি তাদের জন্যে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর জন্যে সারা দুনিয়ার মানুষের মুকাবিলা করেছিলেন এবং সংগ্রাম করেছিলেন বছরের পর বছর ধরে। এটি ছিল তাদের সমস্ত জ্ঞানগর্ত শিক্ষার মূল যার প্রতি বহু মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরও স্বীকৃতি রয়েছে।

আটঃ তারা নিজেরা কোনদিন এ কতা বলেননি যে, ইঞ্জিনিয়ার বা তার কর্মচারীদের সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাত করিয়ে দেবে। অথবা তার গোপন ও অদৃশ্য কারখানা তোমাদেরকে দেখাতে পারি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে নিজেদের দাবী প্রমাণ করতে পারি। তারা নিজেরাই এ বিষয়টিকে ‘গায়েব’ বা অদৃশ্য আখ্যা দেন। এ বিষয়ে তারা বলেন, আমাদের ওপর আস্থা রাখো এবং আমরা যা কিছু বলি তা মেনে নাও।

বিবেক-বুদ্ধির আদালতের রায়

দু’পক্ষের অবস্থা ও বক্তব্য পর্যালোচনা করার পর আদালত এবার নিজের রায় প্রদান করে। তার রায়ে বলা হয়, কতিপয় চিহ্ন ও নিদর্শন দেখে তাদের ভেতরের কার্যকারণ অনুসন্ধান উভয় পক্ষই করেছেন এবং প্রত্যেকেই নিজের মত ব্যক্ত করেছেন। আপাত দৃষ্টিতে উভয় পক্ষের মত একই রকম মনে হয়। কারণ প্রথমতঃ তাদের কারো মত বুদ্ধিবিরোধী নয়। অর্থাৎ বুদ্ধির আইনের প্রেক্সিতে তাদের কারো মত সম্পর্কে এ কথা বলা যেতে পারে না যে, তার নির্ভুল হওয়া অসম্ভব। দ্বিতীয়তঃ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে তাদের কারোর মতের নির্ভুলতা প্রমাণ করা যেতে পারে না। প্রথম পক্ষের অন্তর্ভুক্ত নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায়।

কোন দল নিজের মতবাদের স্বপক্ষে এমন কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেশ করতে পারে না যার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে প্রত্যেক ব্যক্তিই বাধ্য হয়। দ্বিতীয় পক্ষও এর ক্ষমতা রাখে না এবং তারা এর দাবীদারও নয়। কিন্তু আরও গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করার পর এমন কতকগুরো বিষয় দৃষ্টিগোচর হয় যার ভিত্তিতে সমস্ত মতবাদের মধ্যে দ্বিতীয় পক্ষের মতবাদটিই অগ্রগণ্য মনে হয়।

প্রথমতঃ বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশের এত অধিকসংখ্যক লোকের একটি মতবাদের সমর্থনে এমন ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসা একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হয়। তারা সবাই এক বাক্যে একই দাবী করে চলেছেন যে, তাদের নিকট একটি অসাধারণ জ্ঞানের মাধ্যম রয়েছে এবং ঐ মাধ্যমের সাহায্যে তারা সবাই বাইরের চিহ্ন ও নিদর্শনগুলোর আভ্যন্তরীণ কার্যকারণ জেনে নিয়েছেন। এ বিষয়টি তাদের এ দাবীর সত্যতা মেনে নেয়ার দিকে আমাদেরকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে আমরা দেখি, তারা সবাই যে তথ্য পেশ করেছেন তার মধ্যে সামান্যতম বিরোধও নেই এবং তাদের বিকৃত তথ্য বুদ্ধি বিরোধীও নয়। আবার কিছু লোকের মধ্যে থাকে না তা বুদ্ধির আইনে কোনক্রমেই অসম্ভব গণ্য হতে পারে না।

দ্বিতীয়তঃ বাইরের নিদর্শনগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করলে দ্বিতীয় পক্ষের মতবাদটিই নির্ভুল বলে অধিকতর বিশ্বাস জন্মে। কারণ বাতি, পাখা, গাড়ী ও কারখানা প্রভৃতি নিজে নিজেই উজ্জ্বল বা গতিশীল হয়নি। যতি তাই হতো তাহরে উজ্জ্বল ও গতিশীল হওয়া তাদের নিজেদের ইচ্চাধীন হত। কিন্তু তা দেখা যাচ্ছে না অথবা তাদের আলো ও গতি যেসব উপাদান দিয়ে তারা গঠিত সেগুলার অবশ্যম্ভাবী ফল নয়। কারণ যখন তারা উজ্জ্বল ও গতিশীল থাকে না তখনও তাদের গঠনাকৃতির মধ্যে এ উপাদানগুলোই মওজুদ থাকে। আবার তারা পৃথক বাতিতে আলো না থাকলে পাখাও চলে না, ট্রাম গাড়ী থেকে যায় এবং কারখানার চাকাও ঘোরে না। কাজেই বাইরের নিদর্শনগুলোর ব্যাখ্যার ব্যাপারে প্রথম পক্ষ যতগুলো মতবাদ পেশ করেছিলেন বুদ্ধি ও যুক্তির সাথে তাদের কোন দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। এখানে এ কথাটিই অধিকতর নির্ভুল বলে মনে হয় যে, এসব নিদর্শনের মধ্যে কোন একটি শক্তি সক্রিয় রয়েছে এবং তার প্রান্তভাগ এমন একজন জ্ঞানী ও শক্তিশালীর হাতে রয়েছে যিনি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে এ শক্তিকে বিভিন্ন নিদর্শনের মধ্যে ব্যবহার করছেন।

আর সংশয়বাদীদের বক্তব্য যে, এ কথা তাদের বুদ্ধির অগম্য এবং যা তাদের বুদ্ধি অগম্য তারা তাকে সত্য বা মিথ্যা কিছুই বলতে পারে না –এ কথার জবাবে বলা যায়, বুদ্ধির বিচারে তাও যথার্থ প্রতিপন্ন হয় না। কারণ শ্রোতা কোন ঘটনা শুনে তা বুঝতে পারার ওপরে ঘটনাটির ঘটনা হওয়া নির্ভর করে না। ঘটনাটি সংঘটিত হবার ব্যাপারটির স্বীকৃতি দানের জন্য নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক বহু সাক্ষ্যই যথেষ্ট। যদি আমাদের কাছে কয়েকজন নির্ভরযোগ্য লোক এসে বলে, আমরা পশ্চিম দেশে লোকদেরকে লোহার গাড়ীতে চড়ে বাতাসে উড়ে বেড়াতে দেখেছি এবং আমরা লণ্ডনে বসে নিজের কানে আমেরিকার গান শুনেছি, তাহলে এ ক্ষেত্রে আমরা কেবল এতটুকু দেখব যে, লোকগুরো মিথ্যুক ও পরিহাসকারী নয় তো? এ ধরনের কথা বলার সাথে তাদের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নেই তো? তাদের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেনি তো? যদি এ কথা প্রমাণ হয়ে যায় যে, মিথ্যুক, পরিহাসকারী বা পাগল নয় এবং এ ব্যাপারটির সাথে তাদের কোন স্বার্থ জড়িত নেই, উপরন্তু যদি আমরা দেখি, বহু সত্যনিষ্ট ও বুদ্ধিমান লোক কোনো প্রকার মতদ্বৈততা ছাড়াই পূর্ণ আত্মনির্ভরশীলতা সহকারে এ কথা বলে যাচ্ছে, তাহলে অবশ্যি আমরা তা মেনে নেবো। এখন লোহার তৈরী গাড়ীর বাতাসে উড়ে চলার বা কোনো প্রকার বাস্তব মাদ্রম ছাড়াই এক জায়গায় গান হাজার মাইল দূরে অন্য জায়গায় শ্রুত হবার ব্যাপারটি আমাদের বোধগম্য হলেই বা কি আর না হলেই বা কি?

এ ব্যাপারে এটিই হচ্ছে বিবেক-বুদ্ধির সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের অবস্থা, যাকে ঈমান বলা হয় এভাবে সৃষ্টি হয় না। এ জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে অনুভূতির। এ জন্যে মনের ভেতর থেকে এমন একটি আওয়াজের প্রয়োজন যা মিথ্যা, সংশয় ও দোদল্যমান অবস্থার অবসান সূচিত করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেবেঃ লোকদের যাবতীয় আন্দাজ-অনুমান মিথ্যা। সত্য হচ্ছে একমাত্র সেই কথাটির যা সত্যবাদী লোকেরা নিজেদের আন্দান-অনুমানের ভিত্তিতে নয় বরং প্রত্যয় দীপ্ত জ্ঞান ও গভীর অন্তরদৃষ্টির ভিত্তিতে বিবৃত করেছেন।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.