সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ১০ – মাসালায়ে শাফায়াত

মাসালায়ে শাফায়াতের বিভিন্ন দিক

[নবুয়াতের মর্মকথার সাথে শাফায়াতের বিষয়টি দু’কারণে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রথম কারণ এই যে, নবী করীম (সা) এবং অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত যারা প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা শাফায়াতের আকীদা-বিশ্বাসকে মুক্তির ঢাল মনে করত এবং বলত যে, এ কতো তারা নবী ও বুযুর্গানের আওলাদ এবং অপরদিকে দেব-দেবীদেরকে পূজা আর্চনার দ্বারা সন্তুষ্ট করত। এসব দেবদেবী আল্লাহর দরবারে তাদের জন্যে সুপারিশকারী এবং সে জন্যে তারা আল্লাহর অতি প্রিয়পাত্র। অতএব পাপের জন্যে খোদার শাস্তির ভয় অর্থহীন। কুরআন শাফায়াতের এ ধারণা খণ্ডন করেছে।

দ্বিতীয় কারণ এই যে, কেয়ামতের দিনে আম্বিয়ায়ে কেমার (কিছুসংখ্যক নেক-বান্দাহগণও) তাঁদের এমন কিছু অনুসারীর শাফায়াত করবেন যারা সামগ্রিকভাবে খোদার মর্জি মোতাবেক জীবনযাপন করতে গিয়ে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি করে ফেলেছেন অথবা তাদের দ্বারা গোনাহের কাজও হচ্ছিল এবং তারা বারবার অনুতপ্ত হয়ে সংশোধনের চেষ্টাও করছিল।

এ দু’টি কারণের জন্যে আমরা মনে করলাম যে, শাফায়াত প্রসঙ্গ শীর্ষক একটি অধ্যায় মৌলিক আলোচন্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, এ বিষয়ে মাওলানার কলম থেকে মূল্যমান কথা বেরিয়েছে।–(সংকলকবৃন্দ)।]

শাফায়াতের প্রসঙ্গটি কুরআনে একাধিক জায়গায় সুস্পষ্টভাবে ব্যাক্যা করা হয়েছে। এ শাফায়াত (সুপারিশ) কে করতে পারে এবং কে করতে পারে না, কোন অবস্থায় করা চলে, কোন অবস্থায় চলে না, কার জন্যে করা চলে, কার জন্যে করা চলে না, কার পক্ষে ফলদায়ক আর কার পক্ষে নয় –এসব জানা কারও পক্ষে কঠিন নয়। শাফায়ত সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা-বিশ্বাস মানুষের পথভ্রষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ। এ জন্যে কুরআন এ বিষয়টি এত সুস্পষ্টভাবে বর্ণণা করেছে যে, এতে কোনো রকম সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশই থাকতে দেয়নি। যেমন সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াতে (আয়াতুল কুরসীতে) বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯১ পৃষ্ঠায়)

“আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবকিছু কেবল তাঁরই। আল্লাহর সামনে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে এমন কে আছে?”

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯১ পৃষ্ঠায়)

“মানুষের কাছে যা দৃশ্যমান সবই তিনি জানেন। আর আল্লাহর জানা বিষয়সমূহের কোনোটাই তাদের জ্ঞানের আওতায় আসতে পারে না। তবে তিনি স্বয়ং কাউকে কিছু জানাতে চান তো সে আলাদা কথা”।

আল্লাহর ওপর কারও প্রভাব খাটে না

মুসলিম মনীষী, ফেরেশতা এবং অন্যান্য সত্তা সম্পর্কে মুশরিকদের ধারনা ছিল যে, আল্লাহর দরবারে তারা খুব প্রভাবশালী। যে বিষয় নিয়ে তাঁরা বেঁকে বসেন তা না করিয়ে ছাড়েন না এবং আল্লাহর কাছ থেকে যা খুশী তাই আদায় করতে পারেন। উল্লিীখত আয়াতের প্রথমাংশে তাদের এ ধারণা খণ্ডন করা হয়েছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, প্রভাব খাটানো তো দূরের কথা, বড় বড় নবী এবং ঘনিষ্ঠতম ফেরেশতাও বিশ্বজগতের সেই বাদশাহের সামনে বিনা অনুমতিতে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস রাখেন না।

দ্বিতীয়াংমে যে তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয়েছে তা দ্বারা শিরকের ভিত্তির ওপর আরো একটা আঘাত হানা হয়েছে। প্রথমাংশে আল্লাহ তায়ালার নিরংকুশ ও সীমাহীন কর্তৃত্ব-প্রভুত্বের এবং সর্বময় এখতিয়ারের ধারণা পেশ করে বলা হয়েছিল যে, তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার করা শক্তিও কারোর নেই। এখন আর একদিক দিয়ে বলা হচ্ছে যে, অন্য কেউ তার কাজে হস্তক্ষেপ করবেই বা কেমন করে? কারণ তাদের তো বিশ্বজগতের ব্যবস্থাপনা ও তাঁর গূঢ় রহস্য সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই নেই। মানুষ, জ্বিন, ফেরেশতা কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টি সকলেরই জ্ঞান অসম্পূর্ণ ও সীমাবদ্ধ। কারো দৃষ্টি বিশ্বজগতের সকল তত্ত্বের ওপর পরিব্যপ্ত নয়। তারপর যদি কোনো ছোটখাট ব্যাপারে কোনো লোকের স্বাধীন হস্তক্ষেপ বা অটল সুপারিশ চলতে দেয়া হয় তাহলে জগতের সমস্ত শৃঙ্খলাই বিনষ্ট হয়ে যাবে। বিশ্বজগতের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার কথা দূরে থাক, বান্দা নিজের ভাল-মন্দই বুঝবার যোগ্যতা রাখে না। তার ভাল-মন্দও বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও পরিচালকই পুরোপুরি জানেন। তখন তাঁর দেয়া বিধান ও নির্দেশের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

শাস্তিযোগ্য লোকদের জন্যে কোনো সুপারিশ নেই

সূরা আনআমে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯২ পৃষ্ঠায়)

“এবং এখন আমি তোমাদের সাথে তোমাদের সেসব সুপারিশকারীদেরকে দেখছি না যাদের সম্পর্কে তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের কার্যসিদ্ধির ব্যাপারে তাদেরও কিছু ভূমিকা আছে? তোমাদের পারস্পরিক সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তোমরা যাদের ধারণা করেছিল তারা তোমাদের থেকে সরে পড়েছে”।

এ সূরার অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯২ পৃষ্ঠায়)

“(হে মুহাম্মদ!) তুমি এই (অহী ভিত্তিক জ্ঞান) দ্বারা সেইসব লোককে উপদেশ দাও যারা আল্লাহর কাছে হাযির হওয়ার ভয়ে ভীত থাকে সেখানে এমন অবস্থায় হাযির হতে হবে যখন সেখানে তিনি ছাড়া আর কোনো সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী থাকবে না। এতে করে হয়ত বা তারা (সাবধান হয়ে) খোদা ভীরুতার পথ অবলম্বন করবে”।–(সূরা আল আনআমঃ ৫১)

এর মর্ম এই যে, যারা দুনিয়ার ভোগবাদী জীবনে এমনভাবে মত্ত রয়েছে যে, তাদের মৃত্যুর ভাবনাও নেই এবং একদিন খোদাকে মুখ দেখাতে হবে তাও তাদের মনে নেই দুনিয়ায় আমরা যা ইচ্ছে করতে পারি, আখেরাতে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না, কেননা অমুক আমাদের সুপারিশ করবে, অমুক আমাদের সাহায্য করবে বা অমুক আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে দিয়ে গেছে, তাদেরও এ উপদেশে কোনো লাভ হবে না।

সূরা আল আরাফে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৩ পৃষ্ঠায়)

“(আখেরাতে তারা বলবে) এখন কি আমরা কোনো সুপারিশকারী পাব যারা আমাদের স্বপক্ষে সুপারিশ করবে? তা না হলে আমাদের আবার ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হোক। আমরা আগে যেসব কাজ করতাম তার বদলে অন্য রকম কাজ করে দেখাব”।–(সূরা আল আ’রাফঃ ৫৩)

সূরা ইউনুসে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৩ পৃষ্ঠায়)

“তাঁর অনুমতি ছাড়া শাফায়াত করার অধিকারী কেউ নেই। ইনিই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। অতএব তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদাত কর। এখনও কি তোমরা সাবধান হবে না?”-(আয়াতঃ ৩)

একই সূরায় আরো বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৩ পৃষ্ঠায়)

“তারা আল্লাহ ছাড়া এমন সব সত্তার পূজা-অর্চনা করে যারা তাদের লাভ-ক্ষতি কিছুইক রতে পারে না এবং বলে যে, এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশ করবে। হে মুহাম্মদ! তুমি তাদেরকে বল, আসমান জমীনের কোথাও যে জিনিসের অস্তিত্ব আল্লাহর জানা নেই সেই জিনিসের কথাই কি তোমরা তাঁকে জানাতে চাও? তারা যে শিরক করছে আল্লাহ তার থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধে”।–(সূরা ইউনুসঃ ১৮)

কোনো জিনিস আল্লাহর অজানা থাকার অর্থ হল সে জিনিসের আদৌ কোন অস্তিত্ব নেই। কেননা যত জিনিসের অস্তিত্ব রয়েছে তার সবই আল্লাহর জানা। জাকেই এখানে খুবই সূক্ষ্ম প্রকাশভঙ্গীতে সুপারিশাকরীর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, আকাশে বা পৃথিবীতে তোমাদের জন্যে সুপারিশ করার কেউ আছে বলে আল্লাহ তায়ালার তো জানই নেই। অতপর তোমরা তাঁকে কোন সুপারিশকারীদের কথা জানাচ্ছ?

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৪ পৃষ্ঠায়)

“অন্যায় আচরণকারীদের জন্যে কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধুও থাকবে না এবং থাকবে না কোনো সুপারিশকারী যার কথা শোনা হবে”।–(সূরা মু’মিনঃ ১৮)

শাফায়াত বা সুপারিশ সম্পর্কে কাফেরদের ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসকে খণ্ডন করার জন্যে এ কথা বলা হয়েছে। আসলে তো অপরাধী লোকদের জন্যে সেখানে কোনো শাফায়াতকারী থাকবেই না। কেননা শাফায়াত করার অনুমতি যদি আদৌ পাওয়া যায় তবে তা আল্লাহর প্রিয় ও নেককার বান্দাগণই পাবেন। আর আল্লাহর এসব নেককার বান্দাহ ফাসেক-বদকার লোকদের বন্ধু হবে পারেন না এবং তাদেরকে বাঁচাবার জন্যে সুপারিশ করার কতা তাঁরা চিন্তাও করবেন না। তথাপি কাফের, মুশরিক ও পথভ্রষ্ট লোকেরা যেহেতু সাধারণভাবে বিশ্বাস করে থাকে যে, তারা যেসব সাধু-সজ্জনকে ভক্তি করে ও মানে তারা কোনো মতেই তাদেরকে দোযখে যেতে দেবে না। তারা পথ আগলে দাঁড়াবে এবং তাদেরকে মাফ করিয়েই ছাড়বে। তাই বলা হচ্চে যে, সেখানে এমন কোনো সুপারিশকারীই থাকবে না যার সুপারিশ আল্লাহকে মানতে হবে।

সুপারিশের জন্যে অনুমতির প্রয়োজন

সূরা মরিয়মে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৪ পৃষ্ঠায়)

“সে সময় কেউ সুপারিশ করতে সমর্থ হবে না। অবশ্য যে ব্যক্তি করুণাময়ের কাছ থেকে অনুমমি পেয়েছে তার কথা আলাদা”।–(সূরা মরিয়মঃ ৮৭)

এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি অনুমতি পাবে কেবল তার জন্যেই সুপারিশ করা চলবে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি অনুমতি লাভ করবে কেবলমাত্র সে-ই সুপারিশ করতে করতে পারবে, অন্য কেউ নয়। আয়াতটির বাচনভঙ্গী এমন যে, উভয় অর্থেই তা সমানভাবে প্রযোজ্য।

যে ব্যক্তি করুণাময়ের কাছ থেকে অনুমতি পাবে কেবল তার জন্যেই সুপারিশ করা চলবে –এ কথার তাৎপর্য এই যে, দুনিয়ার জীবনে যে ব্যক্তি ঈমান এনে ও আল্লাহর সাথে কিছুটা সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেকে ক্ষমতার যোগ্য করে নিয়েছে, কেবলমাত্র তারই সুপারিশ লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।–[অর্থাৎ শাফায়াত আল্লাহ তায়ালার প্রতিদান আইন ও ক্ষমতাবিধির আওতাভুক্ত। শাফায়াত লাভের পূর্বশর্ত এইযে, বান্দাকে আল্লাহর সামনে নিজেকে ক্ষমার যোগ্য প্রমাণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, তাওবা সংক্রান্ত মূল নীতিতে ক্ষমাবিধির একটা বিধি বর্ণিত হয়েছে। সেটা হলো এই যে, যারা সারাজীবন একাধারে পাপের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে এবং তার জন্যে কোনো রকম অনুতাপ বা উৎকণ্ঠা বোধ করে না তাদের তাওবা কবুল হবে না। যারা গুনাহর কাজ করার অব্যবহিত পরেই অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করে এবং গুনাহ ত্যাগ করে আত্মশুদ্ধির চেষ্টায় লিপ্ত হয় সে কথা বলার অপেক্সা রাখে না। অনুরূপভাবে ক্ষমাযোগ্য লোকদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছেঃ যারা বড় বড় গুনাহর কাজ ও সর্বজনবিদিত খারাপ কাজগুলো থেকে রিবত থাকে এবং কেবলমাত্র ভুলক্রমে বা অজ্ঞাতসারে যাদের ছোট ছোট পদষ্খলন ঘটে। এ থেকে একজন সাধারন মানুষও অনুমান করতে পারে যে, সে ক্ষমা ও শাফায়াতের অধিকারী হতে পারবে কিনা। তাছাড়া বিভিন্ন হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা) কতকগুলো খারাপ কাজের উল্লেখ করে নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা এসব কাজ করবে আমি তাদের জন্যে সুপারিশ করবো না।–(সংকলকদ্বয়)] আর যে ব্যক্তি অনুমতি লাভ করবে, কেবলমাত্র সে-ই সুপারিশ করতে পারবে –এ কথার অর্থ এই যে, লোকেরা যাদেরকে সাফায়াতকারী বা সুপারিশকার মনে করে নিয়েছে, তারা সুপারিশ করার অধিকারী হবে না। বরং আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন কেবলমাত্র সে-ই সুপারিশ করার জন্যে মুখ খুলতে পারবে।

সূরা ত্বা-হায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৫ পৃষ্ঠায়)

“করুণাময় যাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন এবং যার কথা শোনা পছন্দ করবেন, সে ছাড়া অন্য কারো শাফায়াত ফলবতী হবে না। তিনি মানুষের আগের ও পেছনের সব অবস্থা জানেন। অন্যরা সেটা পুরোপুরি জানে না”।–(সূরা ত্বা-হাঃ ১০৯-১১০)

প্রথম আয়াতটির দু’অর্থ হতে পারেঃ প্রথমত, অনুবাদে যে অর্থ ব্যক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, “করুণাময় আল্লাহ যার জন্যে শাফায়াতের অনুমতি দেবেন এবং যার সম্বন্ধে কথা শোনা পছন্দ করবেন সেই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও জন্যে শাফায়াত ফলবতী হবে না”। কেয়ামতের দিন নিজের খেয়াল-খুশী মত কথা বলা দূরের কথা, কেউ টুঁ শব্দটিও করার সাহস পাবে না। কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিই সুপারিশ করতে পারবে যার পক্ষে সুপারিশ করার জন্যে আল্লাহর তরফ থেকে অনুমতি পাওয়া যাবে। কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ দু’টো কথাই বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। একদিকে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৫ পৃষ্ঠায়)

“তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে এমন কে আছে?”-(সূরা আল বাকারাঃ ২৫৫) এবং

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৫ পৃষ্ঠায়)

“তারা কারও সুপারিশ করতে পারে না। কেবলমাত্র সেই সব লোকের সুপারিশ করতে পারে যাদের পক্ষে সুপারিশ শুনতে (আল্লাহ) রাজী হন এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত থাকে”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ২৮)

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৫ পৃষ্ঠায়)

“আকাশে কত ফেরেশতা এমন রয়েছে যাদের সুপারিশ কোনো কাজ হয় না। অবশ্য আল্লাহর অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করলে এবং যার জন্যে তিনি সুপারিশ শুনতে চান ও পছন্দ করেন তার জনে সুপারিশ করলে সে কথা স্বতন্ত্র”।–(সূরা আন নাজমঃ ২৬)

শাফায়াতের ওপর বিধি নিষেধ আরোপের কারন

শাফায়াতের ওপর এই বিধি নিষেধ আরোপের কারণ সূরা ত্বা-হায় বর্ণিত হয়েছে। ফেরেশতাই হোন, নবীই হোন অলীই হোন আর যিনিই হোন কারো জানা নেই এবং জানা থাকতেও পারে না যে, কার আমলনামা কি ধরনের, দুনিয়ার জীবনে কে কি করত এবং আল্লাহর আদালতে কে কি ধরনের আচরণ, স্বভাব-চরিত্র ও দায়-দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে এসেছে। পক্ষান্তরে আল্লাহ সকলের অতীত ক্রিয়াকলাপের সার্বিক জ্ঞান রাখেন এবং এখন তার কি অবস্থা, নেককার হয়ে থাকেল কতখানি নেককার হয়েছে, পাপী হয়ে থাকলে কোন পর্যায়ের পাপী, ক্ষমার যোগ্য কিনা, চরম শাস্তি পাওয়ার যোগ্য না তার শাস্তি লাঘব করা যেতে পারে, না কিছু অনুকম্পা দেখানও যেতে পারে, সেসব একমাত্র আল্লাহরই সঠিকভাবে জানা রয়েছে।–[অন্য কথায় বলা যায় যে, শাফায়াত মূলত এক ধরনের সাক্ষ্যদান। যে ব্যক্তির আমলনামা পেশ করা হচ্ছে, সে মোটামুটিভাবে কি ধরনের লোক ছিল, শাস্তির যোগ্য না ক্ষমার যোগ্য, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়ার কাজই এ দ্বারা সম্পন্ন হয়।–(সংকলকদ্বয়)] এমতাবস্থায় ফেরেশতা, নবী ও নেককার লোকদেরকে সুপারিশের অবাধ স্বাধীনতা কি করে দেয়া যায় যে, প্রত্যেকে যার জন্যে যে ধরনের সুপারিশ করতে চাইবে তা করতে পারবে? একজন সাধারণ কর্মকর্তা তার ক্ষুদ্র বিভাগটিতে যদি প্রত্যেক আত্মীয় ও বন্ধুর সুপারিশ শুনতে আরম্ভ করে তাহলে দু’চার দিনেই গোটা বিভাগটার বারোটা বাজিয়ে ছা্ড়বে। তাই যদি হয় তাহলে আকাশ ও পৃথিবীর যিনি সর্বময় প্রভু তাঁর কাছ থেকে কিভাবে আশা করা যেতে পারে যে, তাঁর দরবারে সুপারিশের অবাধ স্বাধীনতা থাকবে এবং প্রত্যেক বুযুর্গ আল্লাহর দরবারে গিয়ে যাকে খুশী ক্ষমা করিয়ে নেবে? অথচ কোনো বুযুর্গেরই জানা নেই যে, যাদের সুপারিশ তাঁরা করছেন তাদের আমলনামা কেমন। দুনিয়ায় যে অফিসারেরই কিছুমাত্র দায়িত্ববোধ রয়েছে তাঁর নীতি এমন হয় যে, তাঁর কোনো বন্ধু যদি তাঁর কোনো অধীনস্থ অপরাধী কর্মচারী সম্পর্কে সুপারিশ করেন, তাহলে তিনি বলে, “এ লোক কাজকর্মে যে কত বড় ফাঁকিবাজ, দায়িত্বহীন, ঘুষখোর এবং জনসাধারণকে সে যে কত বেশী হয়রান করে তা আপনি জানেন না। আমি তার ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। তাই দয়া করে আপনি এ ব্যক্তি সম্পর্কে আমাকে সুপারিশ করবেন না।–[নবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর সমসাময়িক মুসলমানদেরকে এই বলে বার বার সাবধান করেছেন, “আমার পরে যারা আমার নীতি-পদ্ধতি বদলাবে তাদেরকে সেই হাউজে কাওসার থেকে হটিয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে তার ধারে ঘেঁষতে দেয়া হবে না। আমি বলবো, এরা আমার অনুসারী। তখন আমাকে বলা হবে, আপনার তিরোধানের পর ওরা কি করেছে তা আপনি জানেন না। এরপর আমিও তাদের তাড়িয়ে দেবো এবং বলবো, দূর হয়ে যাও”। বহুসংখ্যক হাদীসে এ বিবরণ পাওয়া যায়।-(গ্রন্থকার) বুখারী কিতাবুল রিকাক, কিতাবুল ফিতান, মুসলিম-কিতাবুল তাহারাত, কিতাবুল ফাজায়েল, মুসনাদে আহমাদ ইবনে মাসউদ ও আবু হুরাইরার বর্ণনা, ইবনে মাজাহ কিতাবুল মানাসিক প্রভৃতি দ্রষ্টব্য।]

এ ছোট উদাহরণটা থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে যে, এ আয়াতে শাফায়াত সম্পর্কে যে নীতি বর্ণিত হয়েছে তা কত বিশুদ্ধ, যুক্তিসঙ্গত ও ইনসাফপূর্ণ। আল্লাহর কাছে শাফায়াতের দরজা বন্ধ হবে না। যেসব নেক বান্দা দুনিয়ায় মানুষের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁদেরকে সুপারিশ করার আগে অনুমতি নিতে হবে এবং যে ব্যক্তির জন্যে আল্লাহ তাঁদেরকে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন কেবল তার জন্যেই সুপারিশ করতে পারবেন। তাছাড়া সুপারিশের জন্যেও শর্ত থাকবে যে, তা যেন সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত হয়। (আরবী********) (এবং যা বলবে তা ঠিক বলবে) আল্লাহর এই উক্তি সুস্পষ্ট করে সে কথাই বলছে। এমন অসঙ্গত সুপারিশ সেখানে করা চলবে না যে, এক ব্যক্তি দুনিয়ায় হাজার হাজার মানুষের হক মেরে এসেছে, আর একজন বুযুর্গ দাঁড়িয়ে এই বলে সুপারিশ করবেন, “হুজুর! তাকে পুরস্কৃত করে ধন্য করুন”।–[বরঞ্চ নবীগণ নিজ নিজ উম্মতের অপরাধী ও পথভ্রষ্ট লোকদেরকে শাস্তি দেয়ার সুপারিশই করবেন। যেমন দল সম্পর্কে নবীর নিম্নরূপ উক্তি কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে।

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৭ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার প্রভু! আমার জাতি এ কুরআনকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে দিয়েছিল”।]

সূরা নাবায় ইরশাদ করা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৭ পৃষ্ঠায়)

“যেদিন রূহ এবং ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন সেদিন আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া আর কেউ কথা বলতে পারবে না এবং সে যা বলবে তা ঠিক বলবে”।–(সূরা আন নাবাঃ ৩৮)

এখানে কথা বলার অর্থ সুপারিশ করা। বলা হচ্ছে যে, তা করা হবে দু’টি শর্তে। প্রথমত, যে ব্যক্তিকে যে অপরাধীর জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি আল্লাহর তরফ থেকে দেয়া হবে, কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি তার জন্যে সুপারিশ করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, সুপারিশকারী যেন সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত কথা বলে। কোনো অসঙ্গত সুপারিশ যেন না করে। আর যার জন্যে সুপারিম করবে সে যেন দুনিয়ায় অন্তত কায়েমায়ে হকের স্বীকৃতিদানকারী হয়ে থাকে। অর্থাৎ শুধু সে গুনাহগার ছিল কাফির ছিল না এমন হয়।

মুশরিকদের কল্পিত সুপারিশকারী

সূরা আল আম্বিয়ায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৭ পৃষ্ঠায়)

“যা কিছু তাদের সামনে আছে তাও তিনি জানেন, যা কিছু তাদের জ্ঞানের অগোচরে তাও তিনি জানেন। যাদের স্বপক্ষে সুপারিশ শুনতে আল্লাহ রাজি তাদের ব্যতীত আর কারও সুপারিশ তারা করবে না এবং তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে”।

মুশরিকরা দু’টো কারণে ফেরেশতাদেরকে উপাস্য মনে করত। প্রথমত, তারা তাদেরকে আল্লাহর সন্তান-সন্ততি মনে করত। দ্বিতীয়ত তাদের পূজা করে তারা তাদেরকে আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী বানাতে চাইতো। (আরবী*******************) (তারা বলত, এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারীঃ সূরা ইউনুসঃ ১৮) এবং (আরবী*****************) (আমরা নৈকট্য লাভে আমাদের সাহায্য করবে।–(সূরা জুমারঃ ৩) এ দু’আয়াতে এ উভয় কারণ খণ্ডন করা হয়েছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কুরআন শাফায়াতের মুশরিকী ধারণা-বিশ্বাসকে খণ্ডন করতে গিয়ে প্রায়ই গুরুত্ব দিয়ে এ কথা বলে তাকে, “তোমরা যাদেরকে সুপারিশকারী বরে মনে কর তারা গয়েবের (অদৃশ্যের) কোনো খবর রাখে না আর আল্লাহ তাদের জানা-অজানা সব ব্যাপারই জানেন”। এ কথা দ্বারা আল্লাহ মানুষকে যে বিষয়টি বুঝানো চান তাহলোঃ প্রত্যেক মানুষের অতীত-ভবিষ্যত এবং গোপন-প্রকাশ্য সব ব্যাপার যখন তার জানে না তখন সুপারিশ করার শর্তহীন ও নিরংকুশ ক্ষমতা তারা কিভাবে পেতে পারে? এ জন্যে ফেরেশতা, নবী বা অন্য কোনো বুযুর্গ প্রত্যেকেরই সুপারিশ করার ক্ষমতা শর্তাধীন। শর্ত হল, আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক কারও জন্যে সুপারিশ করতে অনুমতি দেয়া। যে কোনো ব্যক্তির জন্যে আপন ইচ্ছানুসারে সুপারিশ করার অধিকার কারও থাকবে না। আর সুপারিশ শোনা বা না শোনা এবং তা কবুল করা বা না করা যখন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন, তখন এ ধরনের ক্ষমতাহীন সুপারিশকারীদের কি অধিকার থাকতে পারে কারো পূজা-উপাসনা লাভ করার এবং প্রার্থনা ও আকুতি শোনার?

সূরা সাবায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৮ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ যার জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন কেবলমাত্র তার জন্যে ছাড়া আর কারও জন্যে সুপারিশ ফলদায়ক হবে না”।–(সূরা আস সাবা৬ ২৩)

অর্থাৎ কারও স্বয়ং মালিক হওয়া, মালিকানায় অংশীদার হওয়া অথবা খোদার সহযোগী বা সহকর্মী হওয়া তো দূরের কথা, সমগ্র বিশ্বচরাচরে এমন একটি সত্তাও নেই যে, আল্লাহর দরবারে ইচ্ছা মত কারও জন্যে একটু সুপারিশ পর্যন্ত করতে পারে। তোমরা অনর্থক এ ভুল ধারণায় মত্ত হয়ে রয়েছ যে, আল্লাহর কিছু প্রিয় বা প্রভাবশালী বান্দা রয়েছে যারা একটা আবদার করে জিদ ধরলে আল্লাহ তা না মেনে পারেন না। অথচ আসলে সেখানে বিনা অনুমতিতে টু-শব্দটি করার দৃষ্টতা কেউ দেখাতে পারে না। যে অনুমতি পাবে সে-ই কিচু মিনতি জানাতে পারবে এবং যার জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি পাওয়া যাবে, সুপারিশ শুধু তার জন্যেই করা যাবে।

একই আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৮ পৃষ্ঠায়)

“শেষ পর্যন্ত লোকদের মন থেকে উৎকণ্ঠা দূর হলে তারা সুপারিশকারীদেরকে জিজ্ঞেস করবে; তোমাদের প্রভু কি জবাব দিলেন। তারা বলবে, ঠিক জবাবই দিয়েছেন। বস্তুত তিনি পরাক্রান্ত ও মহান”।–(সূরা আস সাবাঃ ২৩)

কেয়ামতের দিন যখন কোনো সুপারিশকারী কারও জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি প্রার্থনা করবে তখন কি অবস্থাটা দাঁড়াবে, এখানে তারই একটা দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এখানে এমন একটি অবস্থা আমরা দেখতে পাই যে, অনুমতি চেয়ে আবেদন পেশ করার পর সুপারিশকারী এবং সুপারিশ প্রার্থী উভয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় অত্যন্ত ব্যাকুল ও অধীরভাবে জবাবের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। অবশেষে যখন অনুমতি এসে যায় এবং সুপারিশকারীর মুখের ভাব দেখে সুপারিম প্রার্থী বুঝতে পারে যে, অবস্থা কিছুটা আশাব্যঞ্জক, তখন তার ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে আসে। সে এগিয়ে গিয়ে সুপারিশকারীকে জিজ্ঞেস করে যে, কি জবাব পাওয়া গেল? সুপারিশকারী জবাব দেয় যে, ঠিক আছে। অনুমনি পাওয়া গেছে।–[কেয়ামতের দিন নবীগণ কি রকম বিনয়ের সাথে সুপারিশ করবেন তার একটা দৃশ্য সূরা মায়েদার শেষ রুকূ’তে দেখানো হয়েছে। সেখানে হযরত ঈসা (আ) তাঁর অনুসারীদের জন্যে কিভাবে সুপারিশ করবেন তার বিবরণ দেয়া হয়েছে। প্রথমে তিনি আল্লারহ প্রশ্নের জবাবে সাক্ষ্য দেবেন। তারপর বলবেনঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৯ পৃষ্ঠায়)

“তুমি যদি তাদের শাস্তি দিতে চাও, তবে তারা তো তোমর বান্দা। (শাস্তি মাথা পেতে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই) আর যদি ক্ষমা করো, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী এবং কুশলী”।–(আয়াতঃ ১১৮) এই তাৎপর্যর্পূণ বাক্যের প্রথমাংশে শাফায়াতের মিনতির সুর রয়েছে –দাবী বা আবদার নেই।–(সংকলকদ্বয়)]

এ বর্ণনা দ্বারা আল্লাহ বুঝাতে চান যে, ওরে বেকুফের দল! যে দরবারের অবস্থা এমন তার সম্পর্কে তোমরা কেমন করে এ ধারণা পোষণ কর যে, সেখানে কেউ গিয়ে আপন ক্ষমতার জোরে তোমাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দেবে বা আল্লাহর কাছে জিদ ধরে বসবে এবং এ কথা বলার দৃষ্টতা দেখাবে যে, এরা আমার ভক্ত। এদেরকে মাফ করতেই হবে।

সূরা আদ দুখানে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৩৯৯ পৃষ্ঠায়)

“সেদিন কোনো আত্মীয়-স্বজন অন্য আত্মীয়-স্বজনের কোনেই কাজে আসবে না। কোথা থেকৈ কোনো সাহায্য আসবে না। অবশ্য স্বয়ং আল্লাহ যার ওপর অনুগ্রহ করবেন তার কথা আলাদা। তিনি পরাক্রমশালী ও করুণাময়”।–(সূরা আদ দুখানঃ ৪১-৪২)

এখানে বিচার দিনে যে আদালন বসবে তার চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। কারো সাহায্য বা সমর্থন কোনো অপরাধীর মুক্তি নিশ্চিত করতে বা তার শাস্তি লাঘব করাতে পারবে না। সেই আসল সার্বভৌমত্ব প্রভুর হাতেই থাকবে সকল ক্ষমতার চাবিকাঠি যাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া কেউ ঠেকাতে সক্ষম নয় এবং যাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সাধ্যও কারও নেই। অনুকম্পা দেখিয়ে কারও শাস্তি লাঘব করা বা রহিত করা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। প্রকৃতপক্ষে তিনি নির্দয় হয়ে ন্যায় বিচার করেন না, বরং সদয় হয়েই ন্যায় বিচার করে থাকেন। কিন্তু কোনা বিচারে তিনি যে ফায়সারা করবেন তা অবশ্যই হুবহু কার্যকর হবে। খোদায়ী আদালতের এ চিত্র ব্যাখ্যা করার পর পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে এ আদালতে যারা অপরাধী সাব্যস্ত হবে, তাদের পরিণতি কি হবে এবং যাদের সম্পর্কে প্রমাণিত হবে যে, তারা দুনিয়াতে আল্লাহকে ভয় করে নাফরমানী থেকে বিরত থেকেছে, তাদেরকে কিভাবে পুরস্কৃত করা হবে।

পুত্রের জন্যে হযরত নূহ (আ)-এর দোয়া করার দৃষ্টান্ত

সূরা হুদে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যে ইতিবৃত্ত বর্ণনা করা হয়েছে (আয়াত ৬৯ থেকে ৭৬ দ্রষ্টব্য) সেটা কুরাইশদের লক্ষ্য করেই বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর হওয়ার করণে তারা সমগ্র আরবের পীরজাদা, কা’বা শরীফের পূজারী পুরোহিত এবং ধর্মীয়, নৈতিক, রাজনৈতিক ও তামাদ্দুনিক নেতৃত্বের মালিক হয়ে পড়েছিল। এ জন্যে তারা বেশ গর্ব-অহংকারের সাথে বলত যে, তারা যখন আল্লাহর সেই প্রিয় বান্দাহর বংশধর এবং তিনি যখন তাদের সুপারিশ করার জন্যে আল্লাহর দরবারে রয়েছেনই তখন তাদের ওপর আল্লাহর গযব কি করে নাযিল হতে পারে। এ মিথ্যে দর্প চূর্ণ করার জন্যে প্রথমে একটা দৃশ্য দেখান হল যে, হযরত নূহের মত একজন মহান নবী চোখের সামনে আপন কলিজার টুকরাকে ডুবতে দেখেছেন এবং অস্থির হয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন যে, তাঁর ছেলেকে রক্ষা করা হোক কিন্তু এ সুপারিশে ছেলের কোনো লাভ তো হলই না, উপরন্তু বাপকে পাল্টা ধমক খেতে হল। এরপর স্বয়ং হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দৃশ্য দেখান হল। একদিকে তাঁর ওপর আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ এবং অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণ ভাষায় তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়। অপরদিকে আল্লাহর সেই বন্ধু (খলীল) ইবরাহীমই যখন ন্যায়বিচারে হস্তক্ষেপ করেন, তখন তাঁর প্রবল কাকুতি-মিনতি সত্ত্বেও আল্লাহ হযরত লূতের দুষ্কৃতিকারী জাতির ব্যাপারে তাঁর সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন।

অতপর এ সূরা হুদেই পরবর্তী এক আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০০ পৃষ্ঠায়)

“যখন সেই (কিয়ামতের) দিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কারও টু শব্দটি করার ক্ষমতা থাকবে না”।–(সূরা হুদঃ ১০৫)

অর্থাৎ এ আহম্মকের দল অনর্থক মিথ্যে ভরসায় জীবন কাটাচ্ছে যে, অমুক হযরত আমাদের সুপারিশ করে আমাদের বাঁচিয়ে দেবেন, অমুক বুযুর্গ জিদ ধরে বসবেন এবং তার প্রতিটা ভক্তকে ক্ষমা না করিয়ে ছাড়বেন না, অমুক সাহেব আল্লাহর প্রিয়পাত্র। বেহেশতের পথের ওপর অনড় বসে থাকবেন এবং ভক্তদের ক্ষমার পরোয়ানা না নিয়ে তিনি নড়বেন না। অথচ জিদ ধরা আর বেঁকে বসে থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। যত বড় মর্যাদাশালী মানুষ বা ফেরেশতাই হোক না কেন সেখানে একটা কথা বলারও সাহস কারও হবে না। স্বয়ং সে আদালতের প্রধান বিচারপতি আল্লাহ নিজেই যদি কাউকে কিছু বলার অনুমতি দেন তাহলেই কেবল কথা বলা যাবে।–[বিভিন্ন মাযার ও আস্তানায় যারা এ ভেবে নযর-নিয়ায দিয়ে থাকে যে, উক্ত মাযারে শায়িত ব্যক্তিগণ আল্লাহর দরবারে খুবই প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী। তাদের সুপারিশ পাওয়ার আশায় তারা নিজেদের আমলনামাকে কলুষিত করে চলেছে। কেয়ামতের দিন তাদের চরম নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।]

পার্থিব জীবনে আল্লাহর কাছে সুপারিশের মুশরিকী ধারণা

সূরা নাহলে বলা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০১ পৃষ্ঠায়)

“তবুও (এত সব দেখা ও জানা সত্ত্বেও) তারা কি বাতিলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার করে?”-(সূরা আন নাহলঃ ৭২)

মক্কার মুশরিকরা অস্বীকার করত না যে, দুনিয়ার এত সব ভোগের সামগ্রী আল্লাহরই দান। আল্লাহর এ দানের পেছনে আল্লাহর অনুগ্রহ ছিল এটাও তারা অস্বীকার করত না। কিন্তু যে ভুলটা তারা করত তাহলো এই যে, এসব সম্পদের জন্যে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাথে সাথে তারা এমন অনেক সত্তার কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করত যাদেরকে তারা মনে করত যে, এসব সম্পদ লাভের ব্যাপারে তাদেরও হাত ছিল,অথচ এ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো যুক্তি-প্রমাণ ছিল না। এ আচরণকেই কুরআনের ভাষায় ‘আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার করা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দান করলেন একজনে আর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হল অন্য একজনের –এটা কুরআনের দৃষ্টিতে অকৃতজ্ঞতারই নামান্তর। কুরআন নীতিগতভাবে এ কথাও বলছে যে, দাতা সম্পর্কে কোনো প্রকার দলীল-প্রমাণ ছাড়াই এরূপ ধারণা করা যে, তিনি দয়াপরবশ হয়ে দান করেননি বরং অমুকের মধ্যস্থতায়, অমুকের খাতিরে, অমুকের সুপারিশে কিংবা অুমকের হস্তক্ষেপের ফলে করেছেন, তাহলে সেটাও মূলত তাঁর দান অস্বীকার করারই শামিল।

কুরআনের এ দু’টো মৌলিক শিক্ষাই সম্পূর্ণরূপে সঙ্গত ও সাধারণ বিবেকসম্মত। যে কোনো ব্যক্তি সামান্য একটু চিন্তা-ভাবনা করলেই এর যৌক্তিকতা অনুধাবন করতে পারে। মনে করুন, আপনি একজন বিপন্ন মানুষের ওপর দয়াপরবশ হয়ে তাকে সাহায্য করলেন, আর সে তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে আপনার মুখের ওপর অন্য একজনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল যার এ সাহায্যের ব্যাপারে কোনো হাতই ছিল না। হতে পারে আপনি উদারতাবশতঃ তার এ অন্যায় আচরণকে উপেক্ষা করবেন এবং ভবিষ্যতেও তাকে সাহায্য করতে থাকবেন কিন্তু মনে মনে আপনি নিশ্চয়ই বুঝে নেবেন যে, সে একজন চরম অভদ্র ও অকৃতজ্ঞ মানুষ। মনে করুন, এরপর তাকে আপনি ঐ আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, তার ধারণায় আপনি নিজের সদয়তা ও দাশীলতার কারণে তার সাহায্য করেননি, বরং সেই দ্বিতীয় ব্যক্তির খাতিরে করেছেন। অথচ আসরে সে কথা সত্য নয়। এ ক্ষেত্রে আপনি নিশ্চয় নিজেকে অপমানিত বোধ করবেন। তার এ ধারণার এ সুস্পষ্ট অর্থ আপনার কাছে এ হবে যে, সে আপনার সম্পর্কে অত্যন্ত খারাপ মনোভাব পোষণ করে। আপনার সম্পর্কে তার ধারণা এই যে, আপনি কোনো দয়ালু ও দরদী মানুষ নন। বরং বন্ধু-বান্ধবদের খাতির-তোয়াজ করাই আপনার কাজ। ধরবাঁধা কয়েকজন বন্ধুর মাধ্যমে যদি কেউ আসে, আপনি তার সাহায্যে সেই বন্ধুদের মন রক্ষার খাতিরেই করেন। তা না হলে আপনি এমন লোকই নন যে, আপনার দ্বারা কারও কোনো উপকার হতে পারে।

সূরা আন নাহলের অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০১ পৃষ্ঠায়)

“তারা আল্লাহর দানকে জানতে পেরেও তা অস্বীকার করে। তাদের অধিকাংশ লোকই এমন যারা সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়”।–(সূরা আন নাহলঃ ৮৩)

এখানে অস্বীকার করা দ্বারা আগে যে আচরণের উল্লেখ আমরা করেছি তাই বুঝান হচ্ছে। পৃথিবীর যাবতীয় জিনিস যে আল্লাহরই দান, তা মক্কা কাফেররা অস্বীকার করত না কিন্তু তারা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ এসব জিনিস তাদের দেবতাদের খাতিরেই দিয়েছেন। এ কারণে তারা এসব দানের জন্যে আল্লাহার সাথে সাথে ঐসব মধ্যস্থ সত্তারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত। এমনকি আল্লাহর চেয়েও তাদের কৃতজ্ঞতা একটু বেশী করেই জানাত। এ আচরণকেই আল্লাহ নাশোকরী, অকৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর দানকে অস্বীকার করা প্রভৃতি নামে আখ্যায়িত করেছেন।

সূরা আল হাজ্বে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০২ পৃষ্ঠায়)

“প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ (তাঁর নির্দেশাবলী প্রেরণের জন্যে) ফেরেশতা ও মানুষ উভয়ের মধ্য থেকে দূত নির্বাচন করে থাকেন। তিনি সবকিছু দেখেন ও শোনেন। তিনি মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সবই জানেন। আর যাবতীয় বিষয় তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়”।–(সূরা আল হাজ্জঃ ৭৫-৭৬)

এর মর্ম হচ্ছে এই যে, মুশরিকগণ সৃষ্টিজগতের যেসব সত্তাকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি হল নবী অথবা ফেরেশতা। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে তারা আল্লাহর নির্বাচিত দূত মাত্র। তাদের মর্যাদা এর চেয়ে বেশী কিছু নয়। শুধু এ মর্যাদার জন্যে তাঁরা খোদা বা খোদার অংশীদার হতে পারেন না।

‘মানুষের যা গোপন এবং যা প্রকাশ্য সবই তিনি জানেন’ এ কথাটা কুরআন শরীফে সাধারণত শাফায়াতের মুশরিকী আকীদা-বিশ্বাস খণ্ডন করার জন্যে বলা হয়ে থাকে। এখানে এ কথা বলার মর্ম এই যে, তোমরা যদি ফেরেশতা, নবী ও পূণ্যবান মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের যাবতীয় চাহিদা পূরণকারী ও সংকট উদ্ধারকারী মনে না ও কর, শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে সুপারিশাকরী ভেবেও যদি তাদের পূজা কর, তবুও ভুল। কেননা সবকিছু দর্শন ও শ্রবণ ক্ষমতার মালিক শুধু আল্লাহ। প্রত্যেকের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু শুধু তিনিই জানেন। দুনিয়ার গোপন ও প্রকাশ্য কল্যাণ-অকল্যাণ কেবল তাঁরই জানা। ফেরেশতা ও নবীসহ কারও জানা নেই কখন কোন কাজ করা সঙ্গত এবং কখন সঙ্গত নয়। এ জন্যে আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম ও ঘনিষ্ঠতম সৃষ্টিকেও তাঁর অনুমতি ছাড়া ইচ্ছামত সুপারিশ করার অধিকার দেননি এবং তেমন কোনো সুপারিশ গ্রহনযোগ্য বলেও গণ্য করেননি।

সূরা যুমারে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০২ পৃষ্ঠায়)

“তারা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে সুপারিশকারী ঠিক করে নিয়েছে? তুমি তাদেরকে বল, তাদের ক্ষমাতর কিছু না থাকলেও এবং তারা কোন কিছুই বুঝতে না পারলেও কি সুপারিশ করতে পারবে? তুমি ঘোষণা করে দাও যে, সমসত্ সুপারিশ কেবল আল্লাহর এখতিয়ারাধীন। তিনিই আকাশ ও পৃথিবীর কর্তৃত্ব প্রভূত্বের মালিক। আবার তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে”।–(সূরা আয যুমারঃ ৪৩-৪৪)

অর্থাৎ এর নিজেরা স্বয়ং এ ধারণা করে বসে আছে যে, আল্লাহর দরবারে এমন কিছু প্রভাবশালী সত্তা থাকবে, যাদের সুপারিশ কিছুতেই অমান্য করা হবে না। অথচ কারো এ শক্তি নেই যে, আল্লাহর দরবারে কেউ স্বয়ং সুপারিশকারী হয়ে দাঁড়াবে। সুপারিশ মঞ্জুল করে নেয়া তো দূরের কথা, আর তাদের সুপারিশকারী হওয়ার কোন দলিল-প্রমাণও নেই। আল্লাহ তায়ালাও কখনও এ কথা বলেননি যে, তাঁর কাছে তাদের এমন কোনো মর্যাদা রয়েছে। আর সে সকল সত্তাও কখনও এ দাবী করেনি যে, তাদের পূজারীদের কার্যসিদ্ধি তারা করে দেবে। অধিকন্তু তাদের বোকামী এই যে, সকল ক্ষমতার আসল মালিককে বাদ দিয়ে তারা এসব মনগড়া সুপারিশকারীকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকার মনে করে নিয়েছে এবং তাদের সকল ভক্তি-শ্রদ্ধা তাদের জন্যে উৎসর্গ করে দিয়েছে।

সূরা আন নজমে এরশাদ হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৩ পৃষ্ঠায়)

“আকাশে কতই না ফেরেশতা রয়েছে। তাদের সুপারিশ কোনই কাজে আসতে পারে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা এমন এক ব্যক্তির স্বপক্ষে সুপারিশের অনুমতি দিয়েছেন যার জন্যে তিনি কোন আবেদন শুনতে চান এবং পছন্দ করেন”।–(সূরা আন নাজমঃ ২৬)

অর্থাৎ সকল ফেরেশতা একত্র হয়ে কারো জন্যে সুপারিশ করলেও তাতে যখন ফায়দা হয় না, তখন তোমাদের এসব মনগড়া খোদার সুপারিশে ফায়দা হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। আল্লাহই হচ্ছেন সর্বময় ক্ষমতার মালিক। ফেরেশতারাও যতক্ষণ আল্লাহর তরফ থেকে অনুমতি না পান কোনো ব্যক্তির পক্ষে তাদের সুপারিশ শুনতে রাজি না হন ততক্ষণ সুপারিশ করার সাহস করেন না।

আল্লাহর ফায়সালা কেউ রুখতে পারে না।

সূরা আর রাআদে এরশাদ করা হয়েছেঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৩ পৃষ্ঠায়)

“এবং আল্লাহ যখন কোনো জাতির বিপর্যয় আনয়নের সিদ্ধান্ত করেন তখ তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কারো থাকে না এবং আল্লাহর মোকাবিলায় এ জাতির কোনো সহযোগী-সাহায্যকারীও থাকে না”।–(সূরা আর রা’আদঃ ১১)

অর্থাৎ বলা হচ্ছে, এমন ভুল ধারণায় কখনও পড়ে থেকো না যে, তোমরা যত কিচুই কর না কেন তোমাদের উপঢৌকনাদির ঘুষ খেয়ে কোনো পীর, ফকীর বা অতীত-ভবিষ্যতের কোনো বুযুর্গ অথবা কোনো জ্বিন বা ফেরেশতা এমন শক্তির অধিকারী হবে যে, তোমাদের খারাপ কাজের পরিণাম থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবে”।

কোন ক্ষেত্রে সুপারিশের দরজা বন্ধ হয়

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৪ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তুমি এসব লোকের (মুনাফেকদের) জন্যে ক্ষমা চাও বা না চাও –তুমি যদি তাদের জন্যে সত্তর বারও ক্ষমা চাও –তথাপি আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না। কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আল্লাহ অবাধ্য লোকদেরকে মুক্তির পথ দেখান না”।–(সূরা আত তাওবাঃ ৮০)

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৪ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তুমি এদের (মুনাফেকদের) জন্যে ক্ষমা চাও বা না চাও, তাদের জন্যে সবই সমান। আল্লাহ কখনও তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ ফাসেক লোকদেরকে কখনও সঠিক পথ দেখান না”।–(সূরা আল মুনাফেকুনঃ ৬)

এ কথাটা প্রথমে সূরা মুনাফেকুনে নাযিল হয়। এর তিন বছর পর সূরা তাওবায় একই কথা আরো জোর দিয়ে বলা হয়েছে।

“এতে আল্লাহ তায়ালা রসূলুল্লাহ (সা)-কে সম্বোধন করে মুনাফেকদের সম্পর্কে বলছেন, ‘তুমি তাদের জন্যে ক্ষমা চাও বা না চাও এমনকি তুমি যদি তাদের জন্যে সত্তর বারও ক্ষমা চাও, তবুও আল্লাহ তাদেরকে মাফ করবেন না। এটা এ জন্যে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের সাথে কুফরী করেছে। আল্লাহ ফাসেক লোকদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন না”।–(সূরা আত তাওবাঃ ৮০)

একই সূরায় কিছু দূর গিয়ে আবার আল্লাহ বলেন, “ওদের কেউ মারা গেলে তার জানাযার নামায কখনও পড় না। এমনকি তার কবরের ওপরও দাঁড়িও না। তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং নাফরমান থাকা অবস্থাতেই মরেছে”।–(সূরা আত তাওবাঃ ৮৪)-[কুরআনের এসব আয়াত এবং আরও কিছু আয়াত থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায় তাহলো এই যে, নবী পাক (সা)-এর ভাষায় এ কথা সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিনে কোন ধরনের লোকের জন্যে এবং কোন কোন কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের জন্যে কোন সুপারিশই ফলপ্রসু হবে না। বিভিন্ন হাদীস এ বিষয়ের অকাট্য প্রমাণ। এ সত্যের আলোকে শাফায়াতের ঐসব প্রচলিত ধারনার কোমোই মূল্য থাকে না –যার প্রভাবে মানুষ উদাসীন হয়ে ইবাদান পরিত্যাগ করে, দ্বীনের নির্দেশণাবলী থেকে বেপরোয়া হয়ে পড়ে এবং মনের ইচ্ছামতো পাপে লিপ্ত হয়।–(সংকলকদ্বয়)]

এ আয়াতে দু’টো বিষয়ে বক্তব্য রাখা হয়েছে। প্রথমত, গুনাহ মাফ করার জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করা হলে তা কেবল হেদায়াত প্রাপ্ত লোকদের বেলায়ই ফলদায়ক হতে পারে। যে ব্যক্তি হেদায়াতের পথ থেকে সরে যায় এবং ফাসেকী ও নাফরমানীর পথ অবলম্বন করে তার জন্যে কোনো সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা স্বয়ং আল্লাহর রসূলও যদি ক্ষমা চান তবুও ক্ষমা করা হবে না। দ্বিতীয়ত, যারা সত্য ও সঠিক পথে চলতে চায় না, আল্লাহ সে পথ তাদের জন্যে সুগম করেন না। কোনো বান্দা নিজেই যদি সঠিক পথ থেকে সরে যায়, এমনকি তাকে সে পথের সন্ধান দিলেও এবং সেদিকে ডাকা হলেও সে যদি অহংকারের সাথে মাথা উঁচু করে সে ডাক প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আল্লাহর কি দরকার পড়েছে যে, তার পেছনে পেছনে হেদায়াত নিয়ে ঘুরবেন এবং তাকে সৎ পথে আসার জন্যে খোশামোদ করবেন?

হাশরের দিন শাফায়াতকারী হিসেবে নবী মুহাম্মদ (সা)

কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে শাফায়াতের ইসলাম সম্মত বিধান এই যে, কেয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি সুপারিশ করতে পারবেন যাকেঁ সুপারিশ করার ক্ষমতা ও অধিকার আল্লাহ স্বয়ং দেবেন আর যার স্বপক্ষে সুপারিশ করার অনুমতি আল্লাহ দেবেন, কেবলমাত্র তার সপক্ষেই সুপারিশ করা চলবে। এ প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত আয়াতগুলো লক্ষণীয়ঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৫ পৃষ্ঠায়)

এ বিধান অনুযায়ী নবী মুহাম্মদ (সা০ আখেরাতে অবশ্যই শাফায়াত বা সুপারিশ করবেন। তবে এ শাফায়াত তিনি করবেন আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং সেইসব খোদাভীরু ঈমানদার লোকের জন্যে যাঁরা যথাসাধ্য নেক কাজ করতে সচেষ্ট থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে বদ কাজ ও অপরের সম্পদ আত্মসাৎ করার কাজে লিপ্ত লোকেরা এবং যারা কখনও আল্লাহকে ভয় করে না তারা নবীর শাফায়াতের যোগ্য নয়। হাদীসে নবী পাকের একটি দীর্ঘ ভাষণ বর্ণিত হয়েছে। অন্যের অর্পিত সম্পদ আত্মসাৎ করা যে কত বড় ভয়ংকর অপরাধ তা তিনি উক্ত হাদীসে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, কেয়ামতের দিন পরের সম্পদ আত্মসাৎকারীরা সে সম্পদের বোঝা ঘাড়ে করে হাজির হবে এবং আমাকে ডেকে বলবে, (আরবী*********) “হে আল্লাহর রসূল (সা)! আমাকে উদ্ধার করুন”। কিন্তু আমি তার জবাবে বলব, (আরবী*********) “আমি তোমার জন্যে কিছুই করতে পারব না। আমি তোমার কাছে আল্লাহর বিধান পৌঁছিয়ে দিয়েছিলাম?”-(মিশকাত বাবে কিসমাতুল গানায়েম আল-গলুলোফীহা)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.